Blog

  • দুই সে.মি. দীর্ঘ জিন

    দুই সে.মি. দীর্ঘ জিন

    অনিশা দত্তআইজাক আসিমভ

    [book-name]

    দুই সে.মি. দীর্ঘ জিন

    বেশ কয়েক বছর পূর্বে, এক সাহিত্যসভায় জর্জের সঙ্গে আমার দেখা হয়। আর আমি তার মধ্যবয়সী সুগোল মুখের অকপট সরল দৃষ্টি দেখে মোহিত হয়েছিলাম। তিনি এমনই এক ব্যক্তি ছিলেন, যার হাতে নিশ্চিন্তে ওয়ালেট সমর্পণ করে, সাঁতারে নামা যায়।

    আমার বই-এর পেছনে আমার ফটো থেকে আমাকে দেখামাত্রই তিনি চিনেছিলেন। বলেছিলেন, আমার গল্প, উপন্যাস তাকে কতটা মুগ্ধ করেছে এবং অবশ্যই তাতে তার বুদ্ধিমত্তা ও রুচির পরিচয় পাচ্ছিলাম। আমরা আন্তরিক আগ্রহে করমর্দন করলাম। তিনি জানালেন, ‘আমার নাম জর্জ বিটারনাট। বিটারনাট! মনে রাখার জন্য আমি পুনর্বার উচ্চারণ করলাম, ‘ভারি অসাধারণ নাম!’

    ‘ড্যানিস।’ তিনি জানালেন, ‘এবং অভিজাত। আমি ক্লান্ট বংশোদ্ভূত যিনি ক্যানিউট নামে সুপরিচিত। ড্যানিশ সম্রাট একাদশ শতকে ইংল্যান্ড জয় করেন। আমার পূর্বপুরুষ তার পুত্র ছিলেন। কিন্তু সনাতন বৈধরীতিতে জন্মাননি।’

    ‘অবশ্যই,’ আমি বললাম, যদিও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে মনে করার কোনো কারণ দেখলাম না।

    ‘পিতার পদবী অনুসারে তিনিও ক্লান্ট,’ জর্জ বলে চললেন, ‘আর যখন তাকে রাজার কাছে নিয়ে আসা হল, রাজাধিরাজ ডেন বললেন, ‘আমার পবিত্র ধামে, এই কী আমার উত্তরাধিকারী?’

    ‘না,’ পুরোটা নয়, দ্বারী ছোট্ট ক্লান্টকে কোলে নিয়ে দোলাতে দোলাতে বলল, ‘কারণ এতো অবৈধ সন্তান। মা হচ্ছে রজকিনী, যাকে আপনি —’

    ‘আঃ’ রাজা থামিয়ে দিলেন, ‘সেটাই বেটার।’ এবং তারপর থেকেই তার নাম চালু হয় ‘বেটারক্লান্ট।’ সেটিই একমাত্র নাম। পুরুষানুক্রমে আমার নামেও এসে গেছে। কালের যাত্রায়, উচ্চারণের ফারাকে দাঁড়িয়ে গেল ‘বিটারনাট।’

    এবং জর্জের নীল চোখ আমার দিকে ছলাকলাহীন এক সম্মোহনী দৃষ্টি হানল, যাতে সংশয়ের অবকাশ ছিল না।

    আমি বললাম, ‘আপনি কি দুপুরে আমার সঙ্গে লাঞ্চ করবেন?’ আমি জাঁকজমকের একটি রেস্তোরাঁর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলাম, যা সত্যিই পকেটভারীদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল।

    জর্জ বললেন, ‘আপনার কি মনে হয় না ভোজনশালাটি একটু বেশি উঁচুদরের? অন্য দিকে লাঞ্চ কাউন্টারে হয়তো বা–’

    ‘আরে, আমার অতিথি হয়ে,’ আমি বিশদ হলাম। এবার জর্জ ঠোঁট টিপে বললেন, ‘আমি এখন ভোজনশালাটি ভালর দিকে দেখছি, মনে হচ্ছে, ঘরোয়া আবহাওয়াই পাওয়া যাবে। আচ্ছা ঠিক আছে, চলবে।’

    খেতে খেতে জর্জ বললেন, ‘আমার পূর্বপুরুষ বেটারক্লান্টের এক ছেলে ছিল, যার নাম তিনি রেখেছিলেন ‘স্বোয়েন’ একটি সুন্দর ডেনিস নাম।’

    ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি জানি,’ আমি বললাম, ‘রাজা ক্লান্ট এর পিতার নাম ছিল স্বোয়েন ফর্কবার্ড। এখনকার দিন হলে নামটার বানান হতো স্বেন।’

    জর্জ ভ্রূ কুচকিয়ে বললেন, ‘আমি স্বীকার করে নিচ্ছি, শিক্ষার প্রাথমিক ধাপ আপনি পার হয়ে এসেছেন।

    অপ্রতিভ হয়ে বললাম, ‘দুঃখিত’।

    জর্জ মহান ক্ষমার ভঙ্গিতে হাত নেড়ে সুরার গ্লাসের অর্ডার দিলেন। বলে চললেন, ‘স্বোয়েন বেটারক্লান্ট সুন্দরীদের ভালবাসতেন। সেদিকে তিনি সফল পুরুষ ছিলেন, যেমন আমরা সকলেই। সর্বজনবিদিত রয়েছে, তাকে ছেড়ে আসার সময়, অধিকাংশ মহিলাই মাথা নাড়তেন, বলতেন, ‘উনি এক মহাশক্তিধর উপাসক’! একটু থেমে বললেন, ‘মানে বুঝলেন?’

    ‘না।’ মিথ্যা করে বললাম আমি। ওনার সামনে আর নিজের জ্ঞান জাহির করতে ইচ্ছা করলো না।

    ‘মহাশক্তিধর উপাসক অর্থে এক মহান জাদুকর। সাথে সাথে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল, ‘স্বোয়েন গোপন তন্ত্র-মন্ত্রের সাধনা করছিলেন। সে সময়ে সবই সম্ভব ছিল। আধুনিক নোংরা নাস্তিকতাবাদ তখন ছিল না। তিনি তরুণীদের কোমল বিনম্র ব্যবহারে বিশ্বাসী ছিলেন। যা ছিল নারীত্বের গরিমা। এবং স্বেচ্ছাচার ও কলহপ্রিয়তা সতত বর্জনীয় ছিল।’

    ‘তা বেশ।’ সহানুভূতির সুরে বললাম আমি।

    ‘আর এ জন্য দরকার পড়ত জিনের। কিছু কিছু মিষ্টি জড়িবুটি পুড়িয়ে, কিছু ভুলে যাওয়া শক্তিদের আহ্বান করার রীতি তার জানা ছিল।

    ‘এতে কি সত্যিই কাজ হত মি. বিটারনাট?’

    ‘অনুগ্রহ করে আমাকে ‘জর্জ’ নামে সম্বোধন করবেন। হ্যাঁ, অবশ্যই কাজ হতো। আর তার প্রায়শ অভিযোগ ছিল, সে সময়কার মেয়েরা ছিল মাথা মোটা গোঁয়ার, যারা তাকে রাজার নাতি হিসেবে মান্য করত না, কটু মন্তব্য করত, তার জন্মসূত্র নিয়ে। একদা এক জিন তার পক্ষে ছিল, যাতে তিনি স্বাভাবিক গুণের স্বীকৃতি পেতে পারতেন।

    আমি বললাম, ‘আপনি কি এসব বিষয়ে নিশ্চিত জর্জ?’

    ‘নিশ্চয়ই, গত গ্রীষ্মেই আমি তার নির্দেশিত যাবতীয় গুণাবলী সম্বলিত বইটি পেয়েছি, যার সাহায্যে জিনদের আহ্বান করা হতো। আমি একটা পুরনো ইংরেজদের কেল্লার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে থেকে বইটি পাই। তখন থেকে বইটি আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি। ঠিক কি কি গাছ-গাছড়া পোড়াতে হবে, কোথায় কীভাবে রাখতে হবে, বিভিন্ন শক্তিরূপীর নাম, ভজন-পূজনের রীতিনীতি সব তাতে তালিকাভুক্ত করা আছে। প্রাচীন অ্যাংলো-স্যাক্সন ভাষাতে লেখা, কিন্তু আপনি তো জানেন, আমি বহু ভাষাবিদ। তাই—’

    মৃদু সন্দেহের অবকাশে আমি বলে ফেলি, ‘ঠাট্টা করছেন!’

    ওঁর চাহনি উগ্র হয়ে উঠল, ‘এ রকম ভাবছেন কেন? আমি কি মজা করছি, নাকি? এটা একটি প্রামাণ্য পুস্তক। আমি পদ্ধতি-প্রণালী সকল নিজে পরীক্ষা করেছি।’

    ‘আর, একটা জিন পেয়ে গেছেন!’

    ‘হ্যাঁ, যথার্থ’ স্যুটের বুকপকেট নির্দেশ করে বললেন জর্জ।

    ‘ওইখানে?’

    জর্জ পকেট স্পর্শ করলেন আর মাথা নাড়তে নাড়তে, কোনো কিছু অনুভব করতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ভেতরে উঁকি দিলেন। হতাশ হয়ে বললেন, ‘ইস্ চলে গেছে। সব খতম। কিন্তু তাকে দুষতে পারেন না হয়তো। গতকাল রাতেও সে আমার সঙ্গে ছিল। কারণ, জানেন, সে এই সভা সম্বন্ধে কৌতূহলী ছিল। আমি একটা আই ড্রপারে করে তাকে হুইস্কি খাইয়েছিলাম। তার পছন্দও হয়েছিল হয়তো, একটু বেশিই ভাল লেগে থাকবে। কারণ পানশালার খাঁচায় রাখা কাকাতুয়ার সঙ্গে সে লড়তে চাইছিল আর চিৎকার করে তাকে গালাগাল দিচ্ছিল। ভাগ্যক্রমে জিনের ঘুম এসে গেল, নয়তো অসন্তুষ্ট পাখিটি প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারত। আজ সকালে হয়তো তার মেজাজ ভাল ছিল না। মনে হয় নিজের বাড়ি গেছে, নিজের শক্তি ফিরে পেতে।

    মনে মনে আমি খানিক বিদ্রোহী হয়ে উঠলাম। জর্জ কি আশা করছে, তার এই সব আজগুবি বকুনি আমি বিশ্বাস করব! ‘আপনি কি বলতে চান, আপনার বুকপকেটে এক জিন ছিল?’

    ‘বাঃ, বেশ তো চটজলদি বুঝে ফেললেন,’ জর্জ বললেন, ‘বাঃ বাঃ বাঃ।’

    ‘কত বড় ছিল সেই জিন?’

    ‘দুই সেন্টিমিটার।’

    ‘বাঃ বাঃ, এক ইঞ্চিরও কম!’

    ‘ঠিক বলেছেন। এক ইঞ্চি মানে আড়াই সেন্টিমিটার।’

    ‘আমি বলতে চাইছি, কী ধরনের জিন? মাত্র দু সে.মি. লম্বা!’

    ‘এক রত্তি জিন!’ জর্জ বলেন, কিন্তু বোঝেন তো, একদম না থাকার চেয়ে ছোট্ট জিনই সই!’

    ‘ওতো নিজের মর্জির ওপর নির্ভর করে।’

    ‘ওঃ, আজাজেল্ হচ্ছে তার নাম। এক বন্ধু জিন। আমার সন্দেহ হয়, নিজের ভুতুড়ে জগতে তাকে হয়তো একটু নিচু নজরে দেখা হয়। কারণ, সে অসাধারণভাবে তার শক্তি দিয়ে আমাকে মোহিত করতে উৎসুক। তবে সেই শক্তি, সে আমাকে ধনী করে তুলতে ব্যবহার করবে না, যদিও সুন্দর বন্ধুত্বের নজির হিসেবে সেটুকু করা তার উচিত ছিল। তার বক্তব্য, তার শক্তি শুধু অপরের মঙ্গল সাধনের জন্য।

    ‘আরে রাখুন তো জর্জ! এটা তো নরকের দর্শন হতেই পারে না।’

    জর্জ ঠোঁটে আঙুল রাখল। ‘একথা বলবেন না দাদু। আজাজেল্‌ যারপর নাই অসন্তুষ্ট হবে। সে বলে, তার দেশ মিত্রভাবাপন্ন, সুন্দর উচ্চদৃষ্টিসম্পন্ন এবং সে তার শাসক সম্পর্কে পরম শ্রদ্ধাবান, যার নাম সে জানে না বটে, তবে তাঁকে সর্বেসর্বা বলে উল্লেখ করে।’

    ‘আর, সত্যিই কি সে দয়াপরবশ?’

    ‘যখন সে সক্ষম। এই ধরুন না, আমার ধর্ম মেয়ে জুনিপার পেন্ এর কথা। ‘জুনিপার পেন?’

    ‘হ্যাঁ। আমি আপনার চোখে ঘোর কৌতূহল দেখছি, আপনি যদি তার গল্প শুনতে আগ্রহী হন, তবে সানন্দে আমি বলতে রাজী।’

    ‘জুনিপার পেন’ জর্জ শুরু করলেন, ‘সে ছিল আয়ত নয়না ও সে সময়ে কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, যখনকার গল্প আপনাকে শোনাচ্ছি। একটি সরল মিষ্টি মেয়ে এবং বাস্কেটবল টিমের অনুরাগিনী। বিশেষভাবে কেউ অথবা দীর্ঘকায় তরুণ দল। দলের একজনের প্রতি তার তরুণীসুলভ আকর্ষণ গাঁথা হয়ে গিয়েছিল। সে হল লিয়েন্ডার টমসন। লম্বা, কৃশকায়। তার দীর্ঘ হাতে বাস্কেটবলের বেষ্টন বা অন্য কিছু যা বাস্কেটবলের আকার আয়তনতূল্য, জুনিপারের মনে এমন দৃশ্য, অহরহ আনাগোনা করত। কোনো খেলা চলাকালীন, জুনিপার যদি দর্শকের আসনে থাকত, তবে তার উল্লসিত চিৎকার ছিল, লিয়েন্ডারের লক্ষ্যে।

    জুনিপার আমাকে তার ছোট্ট ছোট্ট মিষ্টি স্বপ্নের কথা বলত, অন্য সমস্ত তরুণীদের মতোই (আমার ধর্ম মেয়ে ছাড়াও)। তার আবেগ সে মন খুলে আমার কাছে প্রকাশ করত। আমার সস্নেহ সাদর আচরণ তার আস্থা জিতে নিয়েছিল।

    ‘ওঃ আঙ্কেল জর্জ, লিয়েন্ডারকে নিয়ে যদি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি, সেটা কি দোষের? আমি তাকে দেখি, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বাস্কেটবল খেলোয়াড় হিসেবে। দীর্ঘমেয়াদী বড় রকমের চুক্তিতে আবদ্ধ পেশাদারী খেলোয়াড়দের উচ্চতম আসনে। এটা কি আমার অতিরিক্ত কিছু চাওয়া! জীবনে যা কামনা করি, তা হল আঙুর লতা ছাওয়া এক প্রাসাদ, যত দূর দেখা যায়, একটি ছোট লাগোয়া বাগান। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভৃত্যগোষ্ঠি, সারা সপ্তাহে ও সারা মাসের পোশাক-আশাক পর পর গোছানো রয়েছে আর…

    আমি তার মজাদার বকবকানি থামিয়ে বললাম, ‘ছোট্ট খুকি, একটা ছোট্ট ত্রুটি থেকে গেছে, তোমার পরিকল্পনায়। লিয়েন্ডার কিন্তু মোটেই খুব বড় বাস্কেটবল খেলোয়াড় নয় আর এটা খানিক অসম্ভবই, যে সে বিশাল অর্থের চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারবে!’

    ‘খুব খারাপ কথা,’ জুনিপার ঠোঁট ফোলাল, ‘কেন ও খুব ভাল বাস্কেটবল খেলোয়াড় নয়?’

    ‘কারণ এভাবেই জগৎ চলে। তুমি কেন না, তোমার নবীন প্রেম এক ভাল বাস্কেটবল খেলোয়াড়কে সমর্পণ কর না! কিংবা এসবের জন্য ওয়াল স্ট্রীটের দালালদের শরণাপন্ন হতে পার, যারা এ বিষয়ে খোঁজ খবর রাখে!’

    ‘আসলে, আমি নিজের সম্পর্কে ভেবে রেখেছি, আঙ্কেল জর্জ। কিন্তু আমি যে লিয়েন্ডারকেই পছন্দ করি। অবশ্য সময়ে সময়ে মনে হয়, জীবনে টাকাটা কি খুবই জরুরী!’

    ‘চুপ কর খুকি,’ আমি আহত হই, ‘আজকালকার মেয়েরা বড় বাচাল। ‘কিন্তু আমি টাকাটা পাবই না বা কেন? ওটা কি খুব বেশি চাওয়া?’

    সত্যিই কি তাই! যাহোক আমার নিজের এক জিন রয়েছে। যদিও সে আমার একরত্তি, তবু মস্ত দিলদার। সে নিশ্চয়ই প্রকৃত প্রেমকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে, দুটি আত্মা যাদের অন্তরে সমস্পন্দন, দ্বৈত চুম্বন ও যৌথ সম্পদের আকাঙ্ক্ষা।

    যখন আমি যথার্থ শক্তির নামে আজাজেকে তলব করলাম, সে মন দিয়ে শুনল। সেই শক্তি কি, তা আমি আপনাকে বলতে পারি না, আপনার কি প্রাথমিক নীতিজ্ঞান নেই? আজাজেল্‌ শুনল, কিন্তু তার মধ্যে প্রকৃত সহানুভূতির অভাব লক্ষ্য করলাম। স্বীকার করছি, আমি তাকে আমাদের গণ্ডীর মধ্যে টেনে এনেছিলাম, সম্ভবত তার তুর্কীয় স্নানের সময়ে। কারণ তার দেহে তখন ছোট্ট তোয়ালে জড়ানো ছিল আর সে কাঁপছিল। চড়া কণ্ঠস্বরে আগের চেয়ে চিৎকার করছিল। (আসলে, আমার মনে হয় না, সেটা সত্যিই তার কণ্ঠস্বর ছিল।) আমার ধারণা, সে যোগাযোগ করছিল কিছুটা অন্তরে অন্তরে টেলিপ্যাথি বা ঐ ধরনের কিছু। কিন্তু তার ফল হয়েছিল আমি শুনেছিলাম বা কল্পনা করেছিলাম এক তারস্বর।

    ‘বাস্কেটবল কি?’ সে জিজ্ঞাসা করল, ‘বাস্কেটের গড়নে একটা বল? তাহলে বাস্কেট কি রকম?’

    আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করতে লাগলাম, কিন্তু জিন তারও গভীরে যেতে চায়। সে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন খেলার পুঙ্খানুপুঙ্খ ছবি তার কাছে স্পষ্ট তুলে ধরছি না। শেষ পর্যন্ত সে বলল, ‘আমাকে বাস্কেট বল খেলা দেখাতে পার?’

    ‘নিশ্চয়ই’ আমি বললাম, ‘আজ রাতেই এক খেলা রয়েছে। আমাকে লিয়েন্ডার টিকেট দিয়েছে। আর তুমি তো আমার পকেটে আসতেই পার।’

    ‘বেশ’ আজাজেল্‌ বলে ‘যখন তুমি খেলা দেখতে যাওয়ার জন্য তৈরি হবে, তখন ডেকে নিও আমায়। এক্ষুনি আমাকে জিগমিগ শেষ করতে হবে।’ জিগমিগ মানে বোধ হয় তুর্কীর স্নান। এবং পরক্ষণেই সে অদৃশ্য হল।

    মানতেই হবে, আমার জোর বিরক্তি ধরে গেল, আজাজেলের এমন নিরাসক্ত অনুদার আচরণে। আমার কাছে আমার ব্যাপারটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। … দাদু, আমার মনে হচ্ছে, ওয়েটার বিল দেওয়ার জন্য আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। ওর কাছ থেকে ওটা নিয়ে, আবার গল্পকে এগিয়ে নিতে দিন।

    আমি তো সে রাতে বাস্কেট বল খেলা দেখতে গেলাম, আজাজেকে পকেটে পুরে। খেলা দেখার জন্য সে পকেট থেকে মাথাটি উঁচুতে রাখছিল আর কেউ যদি তাকে দেখে ফেলত তো মস্ত জিজ্ঞাসা! তার ত্বক উজ্জ্বল লাল ও কপালের ওপর দুটি শিং-এর ছোট্ট ছোট্ট দলা। ভাগ্যিস, সে সবসুদ্ধ বেরিয়ে পড়েনি, কারণ তার গঠনে সবচেয়ে প্রকট আর সবচেয়ে বিশ্রী ছিল তার এক সে.মি. লম্বা মাংসল পুচ্ছ।

    আমি নিজে বাস্কেটবলের সূক্ষ্ম গুণগ্রাহী ভক্ত নই, বরং কী ঘটছে, তা বুঝে নেওয়ার ভার আজাজেলের ওপরই ছেড়ে দিয়েছিলাম। তার বুদ্ধি মানুষের মতন না হয়ে, জিনের বুদ্ধি হলেও তা যথেষ্ট তীক্ষ্ণ ছিল।

    খেলার শেষে সে মন্তব্য করল, খেলার মাঠে গাব্দা-গোব্দা জবরজং, যাচ্ছেতাই মানুষগুলোর ঝাঁপাঝাঁপি থেকে আমার যতদূর মনে হল, যখনই গর্তের মধ্য দিয়ে বলটি গলিয়ে দেওয়া যাচ্ছে, তখনই ভরপুর উত্তেজনা।

    ‘ঠিক তাই’ আমি বলি, ‘তুমি এক বাস্কেট জিতলে।’

    ‘তাহলে, তোমার এই আশ্রিত, এই বোকা বোকা খেলায় এক বীরোচিত খেলোয়াড় হতে পারত, যদি সে প্রতিবারই গর্তের মধ্যে দিয়ে বলটাকে গলিয়ে দিতে পারত।’

    ‘একদম ঠিক।’

    আজাজেল্ চিন্তিত হয়ে লেজ দোলাল। ‘সেটা খুব বেশি কঠিন হবে না। আমাকে শুধু ওর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াগুলি নিয়ন্ত্রিত করে দিতে হবে, যাতে সে দিক নির্ণয়, উচ্চতা, কতটা জোর দিতে হবে ইত্যাদি সঠিক বিচার করতে পারে। এক মুহূর্তের জন্য ফের চিন্তামগ্ন হয়ে চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘দেখা যাক! আমি, খেলা চলাকালীন ওর নিজস্ব ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে বুঝে নিয়েছি। …

    হ্যাঁ হয়ে যাবে। আসলে হয়েই গেছে। তোমার লিয়েন্ডারের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হবে না, বল গর্তের মধ্য দিয়ে গলবেই গলবে।…’

    পরবর্তী নির্ধারিত খেলার জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমি খানিক উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। ছোট্ট জুনিপারকে একটা কথাও বলিনি। কারণ সে পর্যন্ত আমি আজাজেলের দানবিক শক্তি ব্যবহার করিনি এবং ওর কথাবার্তার সঙ্গে কার্যকলাপের কতটা সঙ্গতি থাকছে, সে সম্পর্কেও সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলাম না। তাছাড়া আমি তাকে চমকে দিতে চেয়েছিলাম। (এবং তার পর যা ঘটেছিল, তাতে জুনিপার বিষম বিস্মিত হয়েছিল, আমিও।’)

    অবশেষে খেলার দিন এসেই গেল, এবং খেলা শুরু হল। আমাদের স্থানীয় কলেজ নাদসভিলে টেক, যার বাস্কেটবল টিমে লিয়েন্ডার ছিল নিভু নিভু জ্যোতিষ্ক, আল্ কাপোন রিফর্মেটরি সংস্থার ঢ্যাঙঢেঙে লম্বা ও গাট্টাগোট্টা খেলোয়াড়দের মোকাবিলা করছিল এবং দর্শকদের প্রত্যাশা ছিল অভাবনীয় কিছু ঘটার।

    কিন্তু কতটা অভাবনীয়, এ বিষয়ে আন্দাজ ছিল না। কাপোন-এর পাঁচজন অগ্রণী ভূমিকা নিল আর আমি লিয়েন্ডারকে তীক্ষ্ণ নজরে রাখলাম। মনে হল, কি করে উঠবে, বুঝতে লিয়েন্ডারের কষ্ট হচ্ছে এবং প্রথমে মনে হল, বলকে গর্তে গলিয়ে দিতে তার হাত ঠিক নাগাল পাচ্ছে না। তার তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা এতটাই পাল্টে গিয়েছিল, সে প্রথম প্রথম সমস্ত পেশী, নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিল না। কিন্তু পরক্ষণেই দেখলাম, সে যেন নবীন দেহে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। বল ধরতেই তার হাত থেকে বল যেন পিছলিয়ে গেল। এ এক অদ্ভুত পিছলানো। বেঁকে গেল আকাশে, উঁচুতে এবং টুপ্ করে সিঁধিয়ে গেল গর্তে। দর্শকদের ভিতর বন্য উল্লাস আর লিয়েন্ডার চিন্তিতভাবে গোলের গর্তে তাকিয়ে রইল, কি যে ঘটে গেল, তাতে সে নিজেই বিস্মিত। যাই-ই ঘটুক, পুনরাবৃত্তি হতে থাকল বারংবার। লিয়েন্ডার বল ছোঁয়ামাত্র, বল ফকিয়ে বেঁকে যাচ্ছে। আর বাঁকতে বাঁকতে ঘুরতে ঘুরতে আশ্রয় নিচ্ছে গোলের গর্তে। ঘটনাগুলো এতই দ্রুত ঘটে চলল, কেউ লিয়েন্ডারকে বলের লক্ষ্যে একাগ্র হতে বা কোনো চেষ্টা করতেই দেখতে পেল না। স্পষ্ট এক অদ্ভুত কৌশল মনে করে দর্শক জনতা উত্তরোত্তর উন্মত্ত হয়ে উঠল।

    কিন্তু ততক্ষণে সাংঘাতিক গোলমাল যা ঘটার ঘটেই গেছে। সমগ্র খেলা চরম বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত। দর্শকমণ্ডলী থেকে সিটি মারার সাথে সাথে তীব্র ধিক্কার উঠছে। আমি আজাজেকে যা বলতে ভুলেছিলাম। আসলে, যা সাধারণ বুদ্ধিতেই বুঝে নেওয়া উচিত। আজাজেল্ সেটাই বোঝেনি। আজাজেল্ বোঝেনি দুটি বাস্কেটের একটি নিজের দল ও অন্যটি বিপরীত দলে। প্রতিটি খেলোয়াড়কে অন্য পক্ষের সঠিক বাস্কেটে বলটি ছুঁড়তে হবে। অচেতন বস্তুর শোচনীয় অজ্ঞতা নিয়ে, লিয়েন্ডারের ছোঁয়া বল, বেঁকে যাচ্ছিল সেই বাস্কেটের গর্তে, যেটি লিয়েন্ডারের কাছে রয়েছে। লিয়েন্ডার গোল করছিল, নিজেদের বাস্কেটেই। বল তার হাতের স্পর্শ পাওয়া মাত্র ধাবিত হচ্ছিল, তার নিকটতম বাস্কেটে।

    নার্দস ভিলেরকাচের মিনতিপূর্ণ নিষেধ সত্ত্বেও, লিয়েন্ডারকে বারবার এই কাজটি করতে হচ্ছিল। কোচ ক্লজ (পপ্) ম্যাক ফাং, নরম ওষ্ঠ-আবরণীর আড়াল থেকেই চিৎকার করছিলেন। ফল হয়নি, দীর্ঘশ্বাস ফেলে পপ ম্যাক ফাং দাঁত কিড়মিড় করে উঠলেন আর সর্বসমক্ষে কেঁদেই ফেললেন। কারণ লিয়েন্ডারকে খেলা থেকে বার করে দিতে হবে। লিয়েন্ডারের গলা থেকে সকলে তাঁর আঙুল সরিয়ে দিল, যাতে লিয়েন্ডারকে তখনই বহিস্কার করা যায়।

    বন্ধু, লিয়েন্ডার আর সে লিয়েন্ডার রইল না। স্বভাবতই আমি ভেবেছিলাম, সে সুরার মধ্যে মুক্তি খুঁজবে এবং কঠোর চিন্তামগ্ন সুরাসক্ত মানুষে পরিণত হবে। কিন্তু তা হয়নি। সে অন্তরের অন্তস্তলের গহীনে গেল। পড়াশোনায় ডুবে রইল। সহপাঠীদের অবজ্ঞা ও করুণার দৃষ্টি মাথায় নিয়ে, সে নিয়মিত ক্লাস করে চলল। বইতে মাথা গুঁজে, অহরহ পাঠচর্চায় নিবেদিত হয়ে গেল।

    এত কাণ্ডের পরও কিন্তু জুনিপার তার সঙ্গে ছিল। অশ্রুবর্ষণ না করে ঝাপসা চোখে জুনিপার বলত ‘ওর আমাকে প্রয়োজন।’ স্নাতক হওয়ার পর সব ছেড়ে জুনিপার, লিয়েন্ডারকে বিবাহ করেছিল। জুনিপার লিয়েন্ডারের সঙ্গেই জীবন কাটাচ্ছে। লিয়েন্ডার এখন পদার্থ বিদ্যায় পিএইচডি করে পরিচয়যোগ্য জ্ঞানী পুরুষ।

    তারা দুজন পশ্চিমের দিকে একটা ছোট কো-অপারেটিভে বাস করে। যতদূর জানি, লিয়েন্ডার ফিজিক্স পড়ায়। আর লিয়েন্ডারকে যারা আগে থেকে চিনত স্কটল্যান্ডবাসী সৈনিক হিসেবে, তারা কিন্তু নিজেদের মধ্যে কানাকানি করে বলে, লিয়েন্ডার নোবেল পুরস্কারের জন্য এক সম্ভাব্য প্রার্থী।

    জুনিপার কখনো অনুযোগ জানায় না, সে তার আদর্শ প্রেমিকের প্রতি বিশ্বস্ত। কথায় বা কাজে তার কোনো কিছু খোওয়ানোর আক্ষেপ নেই। তাই বলে, সে বুড়ো ধর্মবাপকে বোকা বানাতে পারবে না।

    আমি খুব ভাল করে জানি, কখনো কখনো তার ঐকান্তিক ভাবনায় ভাসে, এক আঙ্গুরলতাঘেরা প্রাসাদ, যা কখনো তার আয়ত্তে আসবে না। আর পাহাড় ঘেরা দূর দিগন্ত বিস্তৃত তার স্বপ্নের ছোট্ট তালুক, যা তার নাগালের বাইরে।

    ‘এই হল গল্প,’ থামলেন জর্জ। ওয়েটার যা ফেরত এনেছিল, তা তুলে নিয়ে জর্জ, ক্রেডিট কার্ড রসিদের মোট ডলারের পরিমাণটা লিখে নিলেন (হয়তো, তার আয়কর ছাড়ের কাজে লাগবে, মনে হল আমার) তারপর আরো বললেন, ‘আমি যদি আপনি হতাম, তবে বড় রকমের বকশিস ছেড়ে যেতাম।’

    তাই-ই করলাম আমি, তবে খানিক হতবুদ্ধির মতন। জর্জ হেসে বের হয়ে গেলেন। অবশ্য, ফেরত ডলার না নিয়ে, ক্ষতি হয়েছে বলে, আমার অনুতাপ হল না। আমার মনে হল, জর্জের মাত্র একবার মুফতে আহার মিলেছে আর আমি পেয়েছি একটা গল্প। যা আমার মতো করে বলতে পেরে, আহারের তুলনায় অনেক গুণ অর্থ আমি উপার্জন করব। আসলে, আমি স্থির করেই ফেললাম, এখন থেকে মাঝে মাঝেই জর্জের সঙ্গে আমি রাতের খাবার চালু করবো।

  • আজাজেল

    আজাজেল

    আইজাক আসিমভ কল্পবিজ্ঞানের সুবিখ্যাত কথাশিল্পী, অসীম কল্পনাশক্তিতে তার খেয়ালী কলম মেলে। ধরেছেন রূপক কাহিনী গ্রন্থনে। আঠারােটি গল্পকে সংকলনে বন্দী করে আমাদের উপহার দিয়েছেন। যারা রূপক কাহিনী ভালবাসেন এবং আসিমভের অনুরাগী ভক্তবাহিনী, সকলকেই অভিভূত করবে। আজাজেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন, দুই সে.মি. দীর্ঘ। আগুন-লাল-রঙা এক জিন প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও চমৎকার জাদুশক্তির অধিকারী। শুধুমাত্র জর্জ। বিটারনাট, যিনি এক খামখেয়ালী ভাষাবিদ, জিন ও আত্মা আহ্বানের জাদুমন্ত্রে পারদর্শী এবং তারই ইচ্ছায় আজাজেল আবির্ভূত হয়। কিন্তু, আজাজেল তার বিস্ময়কর জাদুবিদ্যা, জর্জের ব্যক্তিগত লাভের খাতিরে ব্যবহৃত হতে অনুমতি দেবে না। জর্জের বন্ধুদের প্রয়ােজন পড়লে, তারা অনুগ্রহ পেতে পারে। কিন্তু একটাই সমস্যা। এই অন্য পার্থিব চমৎকার করিৎকর্মার, পার্থিবব্যঞ্জনা এবং মানবিক দুর্বলতা সম্পর্কে স্বল্পই জ্ঞান আর তার সদিচ্ছাপ্রসূত অবৈধ হস্তক্ষেপ যারপরনাই তামাসা ও অপ্রত্যাশিত বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত হয়। এই কাহিনীগুলির শ্রমসাধ্য সংকলন আজাজেল ও বেচারি বিটারনাটের উদ্ভট ও ব্যর্থ অভিযানসমূহ অনুসরণ করেছে, যখন তারা ভালমনেই কিছু পরিচিত দুর্ভাগাদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছিল। আসিমভের নিজস্ব ভঙ্গিতে এবং বিষমই মজা করে বর্ণিত আজাজেল ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্মল দুষ্টুমি-মাখা আনন্দ দেওয়ার দাবি রাখে। আজাজেল এর সতেরটি গল্প, প্রথম ‘দ্য ফ্যান্টাসি অ্যাণ্ড সায়েন্স ফিকশন’ ও ‘আইজাক আসিমভস সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিন’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। এই সংকলনিটর প্রথম গল্প ‘দুই সে.মি. জিন’ বিশেষ করে এই বইটির জন্যই লেখা।

    [book-name]

    অনিশা দত্তআইজাক আসিমভ

    Azazel by Isaac Asimov

    অনুবাদ : অনিশা দত্ত

    প্রথম প্রকাশ : বইমেলা, ফেব্রুয়ারি ২০০৯

    প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ

    অনুবাদকের উৎসর্গ

    সন্দেশ প্রকাশনার লুৎফর রহমান চৌধুরী প্রীতিভাজনেষু

    সূচনা

    ১৯৮০তে এরিক প্রর্টার নামে এক ভদ্রলোক আমাকে, তার সম্পাদনায় একটি পত্রিকার জন্য মাসিক রহস্য কাহিনী লিখতে অনুরোধ করেন। আমি সম্মত হই, কারণ আমি সজ্জনদের ‘না’ বলতে পারি না আর আমি এ যাবৎ যত সম্পাদকের সংস্পর্শে এসেছি, তারা যথাযথ সজ্জন।

    প্রথম কাহিনী আমি লিখি, এক ধরনের কল্পরহস্য যেখানে দুই সে.মি. লম্বা এক ক্ষুদ্র জিনের কথা বলেছি, নাম দিয়েছিলাম, ‘শঠে শাঠং।’ এরিক প্রর্টারের মনে ধরেছিল ও তিনি তা প্রকাশ করেন। এতে গ্রিসওল্ড নামে এক ভদ্রলোকের কথা বলেছিলাম যিনি ছিলেন মূল বক্তা আর সাথে ছিলেন তিন শ্রোতা। যার মধ্যে আমি নিজেও ছিলাম, যদিও নিজের পরিচয় দিইনি। চারজনে প্রতি সপ্তাহে ইউনিয়ন ক্লাবে মিলিত হতাম, আর আমি ইউনিয়ন ক্লাবেই গ্রিসওল্ডের গল্পের পরিকল্পনা করেছিলাম। যাই হোক, যখন আমি ছোট্ট জিনকে নিয়ে ‘শঠে শাঠং’ নামে দ্বিতীয় কাহিনীর সূচনার চেষ্টা করছিলাম (নতুন কাহিনীর নাম দিলাম, ‘সঙ্গীতের এক রজনী’)।

    এরিক বললেন, ‘না!’ হয়তো বা, এক বাক্যে, উদ্ভট কল্পনার আশ্রয় নিয়েছিলাম। কিন্তু সে চায়নি, আমি সেটা অভ্যাসে রপ্ত করে ফেলি।

    অতএব, আমি ‘সঙ্গীতের এক রজনী’কে এক পাশে সরিয়ে রেখে রহস্য কাহিনীর ধারাবাহিক শুরু করলাম, যাতে কোনো উদ্ভট কল্পনার মিশেলই দিলাম না। এদের মধ্যে তিনটি গল্প (যা এরিক চেয়েছিলেন দুই হাজার থেকে দুই হাজার দুশো শব্দের মধ্যে) ঘটনাক্রমে আমার বই ‘দ্য ইউনিয়ন ক্লাব মিস্ট্রি’তে (ডাবল ডে, ১৯৮৩) সংগৃহীত হয়েছিল। এর মধ্যে ‘শঠে শাঠং’কে অন্তর্ভুক্তি করিনি, কারণ ছোট্ট জিনের বিবৃতি, বাকি গল্পগুলোর সঙ্গে খাপ খেত না।

    ইতিমধ্যে আমি ‘সঙ্গীতের এক রজনী’ নিয়ে মেতেছিলাম। অপচয়কে আমি ঘৃণা করি। আমার কোনো লেখা অপ্রকাশিত থাকুক, আমার সহ্য হয় না। পরিস্থিতি সামলাতে, যাহোক করতে আমি প্রস্তুত। অতএব এরিকের দ্বারস্থ হয়ে বললাম, ‘সেই গল্পটা, ‘সঙ্গীতের এক রজনী’ যেটা তোমার পছন্দ হয়নি, আমি কি অন্য কোথাও প্রকাশ করতে পারি?’

    তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই পারেন। কিন্তু শর্ত থাকবে, চরিত্রগুলোর নাম বদলে ফেলতে হবে। আমি চাই গ্রিসওল্ড ও তার সঙ্গীসাথীরা বিশেষভাবে আমার পত্রিকাতেই বিরাজ করুক।’

    তাই-ই করলাম। গ্রিসওল্ডের নাম বদলিয়ে, ‘জর্জ’ দিলাম আর শ্রোতা হিসেবে রাখলাম একজনকেই। প্রথম পুরুষ হিসেবে, আমি নিজে। সেটা তো হল। আমি ফ্যান্টাসি ও সায়েন্স ফিকশন-এর পত্রিকাতে সেটি বিক্রি করে দিলাম। এরপর ঐ ধরনের এক কাহিনী লিখলাম, ভাবধারা হল জর্জ ও আজাজেলের কাহিনী। জিনের নাম দিলাম আজাজে। এই বইটি (যে হাসি হেরে যায়, ঐ পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমার নিজেরও কল্পবিজ্ঞানের এক পত্রিকা ছিল, ‘আইজাক আসিমভের কল্পবিজ্ঞান পত্রিকা’ আর শাওনা ম্যাককার্থি, তৎকালীন সম্পাদক ‘এফ্‌ অ্যান্ড এসএফ’ পত্রিকায় দেওয়ার বিরোধিতা করলেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন, ‘ছোট্ট জিন আর তার যাদুকে, উন্নত প্রযুক্তির অপার্থি। প্রাণীতে বদলে দিন আর সকল কাহিনী আমার কাছে বিক্রি করে দিন।

    তাই-ই করলাম। আর তখন থেকেই আমার জর্জ ও আজাজেলের কাহিনীগুলো নিয়ে খ্যাপামি ছিল। আমি লিখতে শুরু করলাম আর বর্তমানে আমি এই গল্পগুলো থেকে আঠারোটি নিয়ে ‘আজাজেল্‌’-এ সংকলিত করেছি। মোট আঠারোটি গল্পের অন্তর্ভুক্তি সম্ভব হল। কারণ গল্পগুলো আয়তনে কমাবার তাগিদ ছিল না এরিকের পক্ষে। তাই আমি জর্জ ও আজাজেলের গল্পগুলো দ্বিগুণ দীর্ঘ করতে পেরেছি।

    কিন্তু এবারেও আমি শঠে শাঠংকে এর মধ্যে ঢোকাতে পারলাম না। কারণ পরবর্তী গল্পগুলোর সঙ্গে এর সুর তাল মিলত না। দুটি বিভিন্ন ধারাবাহিকের ধারণার মূল অনুপ্রেরণা থাকায়, শঠে শাঠং-এর বিরূপ ভাগ্যে, দুটি পৃথক ধারায়, কোনোটাতেই খাপ খাওয়ানো গেল না (যাক গে, সঞ্চয়ন তো হয়েই রইল, ভবিষ্যতে কোনো না কোনো রূপে আত্মপ্রকাশ করবে। এর জন্য খুব দুঃখ করার প্রয়োজন নেই)।

    গল্পগুলো সম্পর্কে আমি কিছু যুক্তির অবতারণা করতে চাই, হয়তো আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন। কিন্তু আমি এক প্রকার বাচাল।

    1. যেমন আমি বলেছি, প্রথম গল্পটি বাদ দিই, ছোট্ট জিনের গল্পটি অন্যগুলোর সঙ্গে মিলছিল না। আমার সুন্দরী সম্পাদিকা জেনিফার ব্রেল জোর দিয়েছিলেন কিভাবে আমি ও জর্জ পরস্পরের সাথে পরিচিত হই, এবং জর্জের জীবনে কীভাে ছোট্ট জিনের অনুপ্রবেশ ঘটে। সেই প্রসঙ্গের অবতারণা আবশ্যিক।

      যদিও জেনিফার মধুর স্বভাব, তথাপি সে যখন দৃঢ় মুষ্টিবদ্ধ হয়, তখন তার সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন।

      আমি দুই সে.মি. জিনের গল্প লিখে ফেললাম এবং তার কথামতো বইটিতে প্রথম গল্প হিসাবে অন্তর্ভুক্তি ঘটল। এর পরেও কথা ছিল, জেনিফার চেয়েছিলেন, আজাজেল্‌ সংশয়াতীতভাবে জিনই হোক, অপার্থিব কোনো প্রাণী নয়। অতএব আমরা উদ্ভট রূপকথায় ফিরে এলাম। ‘আজাজেল্’ বাইবেলে উল্লিখিত এক নাম, পাঠকরা একে জিন হিসাবেই গ্রহণ করে থাকেন, যদিও বিষয়টি অপেক্ষাকৃত জটিলতর।

    2. জর্জকে খানিক বিষাদগ্রস্ত হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও আমি নির্জীব ব্যক্তি পছন্দ করি না। তবু জর্জকে আমি ভালবাসি, আপনারাও বাসবেন। প্রথম পুরুষটি (আদতে আইজাক্ আসিমভ্) প্রায়শই জর্জ দ্বারা অপমানিত হয়েছেন এবং অবধারিত কয়েক ডলার খোয়াতে হয়েছে। কিন্তু আমি কিছু মনে করি নি। প্রথম গল্পের শেষে আমি বিশ্লেষণ করেই দিয়েছি, তার গল্পগুলো উৎকৃষ্ট ছিল এবং সেগুলো থেকে আমি যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করেছি। বিশেষত জর্জকে যা দিয়েছি (অবশ্যই কল্পনায় নয়), তার থেকে অনেক বেশি।
    3. অনুগ্রহ করে সতর্ক থাকুন, গল্পগুলো একাধারে হাস্যরস-স্নিগ্ধ ও শ্লেষাত্মক। যদি গল্পের ধরন অতিরঞ্জিত ও ‘আসিমভোচিত’ না হয়, তবে তা উদ্দেশ্যমূলক। একে সতর্কবাণী মনে করবেন। অতিরিক্ত কিছুর প্রত্যাশা করে বইটি কিনবেন না ও পরে পস্তাবেন না। যাক গে, যদি পিজি উডহাউসের সামান্যতম প্রভাবও লক্ষ্য করে থাকেন, তবে বিশ্বাস রাখবেন এটি দৈবক্রমে ঘটেনি।

      আজাজেল্‌ বল খেলা দেখতে যায়।

      সে রাতে আমি বাস্কেট বল খেলা দেখতে গিয়েছিলাম আর আজাজেল্‌ ছিল আমার পকেটে। খেলা দেখার জন্য সে পকেট থেকে মাথাটি উঁচিয়ে রাখছিল, আর কেউ তাকে দেখে ফেললে, মস্ত প্রশ্ন উঠত। তার ত্বক উজ্জ্বল লাল আর তার কপালে সিং- এর দুটি ছোট্ট দলা। ভাগ্যিস, সে সবসুদ্ধ বেরিয়ে আসেনি, কারণ তার সবচেয়ে প্রকট আর সবচেয়ে বিরক্তিকর ছিল এক সে.মি. লম্বা মাংসল লেজ। খেলার শেষে সে মন্তব্য করল, ‘বিশালবপু জবরজং যাচ্ছেতাই মানুষগুলোর, খেলার মাঠে উদ্যম দেখে আমার যতদূর মনে হল, যখনই গর্তের মধ্যে দিয়ে বলটি গলিয়ে ফেলে দেওয়া যাচ্ছে, তখনই ভরপুর উত্তেজনা।

      ‘ঠিক তাই!’ আমি বলি, ‘তুমি এক বাস্কেট জিতলে।

      ‘তাহলে, এই বোকা-বোকা খেলায় তোমার এই আশ্রিত এক বীরোচিত খেলোয়াড় হতে পারত, যদি প্রতিবারই সে গর্তের মধ্যে দিয়ে বলটাকে গলিয়ে দিতে পারত।’

      ‘একদম ঠিক!’

      পরবর্তী নির্ধারিত খেলার জন্য অপেক্ষা করতে করতে, আমি খানিক উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। ছোট্ট জুনিপারকে আমি একটা কথাও বলিনি, কারণ তখনো পর্যন্ত আমি আজাজেলের দানবিক শক্তি ব্যবহার করিনি এবং তার কথাবার্তার সঙ্গে কার্যকলাপের সঙ্গতি থাকবে, সে সম্পর্কেও সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলাম না।

      তাছাড়াও, আমি তাকে চমকে দিতে চেয়েছিলাম। (এবং তার পর যা ঘটেছিল, আমরা দুজনেই যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম)

  • সোনার ঘণ্টা

    সোনার ঘণ্টা

    অনিল ভৌমিক

    [book-name]

    প্রথম প্রকাশ : শুভ দীপাবলী, ১৩৮৬; নভেম্বর, ১৯৭৯।

    অষ্টম মুদ্রণ : শুভ অক্ষয় তৃতীয়া, ১৩৯৪; মে, ১৯৮৭।

    প্রকাশনায়: সুপ্রিয়া পাল; উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির, সি-৩, কলেজ স্ট্রীট মার্কেট, কলিকাতা, ৭০০০০৭ (প্রথম তলা)। প্রতিষ্ঠাতা: শরচ্চন্দ্র পাল; কিরীটিকুমার পাল।

    মুদ্রাকর: সন্তোষী প্রিণ্টার্স, তাপস সাঁতরা; ১৪৩, গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেন, কলিকাতা-৯।

    প্রচ্ছদচিত্র : নারায়ণ দেবনাথ; পরিকল্পনায় : দিব্যদ্যুতি পাল।

    * * *

    সোনার ঘণ্টা প্রসঙ্গে

    ঘণ্টা সোনার কি রূপোর কি নেহাৎই তামার বা পিতলের, সেটা কোন বিচারের কথাই নয়। আসল যা হ’ল বিচার্য তা হচ্ছে ঘণ্টার ধ্বনি। সে ধ্বনি দিয়েই ঘণ্টার সত্যকার পরিচয়।

    ‘সোনার ঘণ্টা’ নামটির দরুণ যে কথাগুলি বলবার সুযোগ পেলাম শ্রীঅনিল ভৌমিকের সেই কিশোর উপন্যাসটি সম্বন্ধে সেগুলি বিশেষভাবে খাটে। বাংলা ভাষায় ছোটদের জন্য লেখা বই-এর সংখ্যা ইদানীং যথেষ্ট বাড়লেও সত্যিকার সার্থক লেখার দেখা খুব কমই মেলে। ‘সোনার ঘণ্টা’ তার মধ্যে একটি বিশেষভাবে সমাদর পাবার বই, একথা অসঙ্কোচে বলতে পারি। গল্পের বিষয় ও বলবার মুন্সিয়ানা সব দিক দিয়েই বইটি মনে রাখবার মত।

    প্রেমেন্দ্র মিত্র

    * * *

    ‘কসবা জগদীশ বিদ্যাপীঠ’-এর

    প্রাক্তন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

    ছাত্রদের উদ্দেশ্যে–


    নিবেদন

    একটি চিত্রকাহিনীই “সোনার ঘণ্টা” উপন্যাসটির মূল প্রেরণা। সেই কাহিনী ঢেলে সাজাতে গিয়ে ঘটনা, চরিত্র সবকিছু আমাকে নতুন ক’রে ভাবতে হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ– ইহুদী জ্যাকব, কাসেম, মকবুল, ফজল, হ্যারি প্রভৃতি চরিত্রগুলো আমারই চিন্তার ফসল। কুয়াশা, ঝড় আর ডুবো পাহাড়ের প্রতিকুলতা পেরিয়ে সোনার ঘণ্টার দ্বীপে যাওয়া ও ফেরা, দু’টো মোহরে খোদিত নক্সার কাহিনী ইত্যাদি ঘটনাগুলিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার মতো  ক’রে আমাকে সাজাতে হয়েছে। অনেকস্থলে চিত্রকাহিনীর ফাঁকও পূরণ করতে হয়েছে। এইভাবে বর্তমান উপন্যাসের পূর্ণরূপ গড়ে উঠেছে।

    সবিশেষ নিবেদন– উপন্যাসটি কিশোরদের জন্য রচিত। তাই কাহিনীর নায়ক ফ্রান্সিসকে নিচক এ্যাডভেঞ্চার বিলাসীরূপে অঙ্কন না ক’রে তাকে একটা জীবন-দর্শনের ভিত্তিভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করেছি। কিশোরদের মনে এই দৃষ্টিভঙ্গীটুকু স্বীকৃতি পেলেই “সোনার ঘণ্টা” রচনা সার্থক ব’লে মনে করবো।

    প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য–  “সোনার ঘণ্টা” প্রথমে ‘শুকতারা’ পত্রিকায় ধারাবাহিক উপন্যাসরূপে প্রকাশিত হয়েছিল।

    দীপাবলী, ১৩৮৬
    অনিল ভৌমিক

    * * *

    আজকের দিনে যেসব জাতি পৃথিবীর উপর প্রভাব বিস্তার করেছে, সমস্ত পৃথিবীর সবকিছুর উপরেই তাদের অপ্রতিহত উৎসুক্য। এমন দেশ নেই, এমন কাল নেই, এমন বিষয় নেই যার প্রতি তাদের মন ধাবিত না হচ্ছে।

  • দ্বিতীয় কল্প : হায় হায়! আমি পাগল!

    দ্বিতীয় কল্প : হায় হায়! আমি পাগল!

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    দ্বিতীয় কল্প : হায় হায়! আমি পাগল!

    অষ্টাহ অতীত। রাজাবাহাদুরের সঙ্গে নিত্য আমার দেখা হয়, নিত্য তিনি আমারে উৎসাহবাক্যে আশা প্রদান করেন; আশ্রিতের প্রতি আশ্রয়দাতার যেরূপ স্নেহ থাকা সম্ভব, আমার প্রতি রাজা মোহনলাল সেইরূপ স্নেহ প্রদর্শন করেন; তাঁর কপট ব্যবহার জেনে শুনেও ঐ প্রকার বাহ্য ব্যবহারে আমি তুষ্ট থাকি। খেলাঘরের খেলার ন্যায় মিথ্যাবস্তুগুলিকে মনে মনে আমি সত্য সাজে সাজাই। কাজকর্ম কোরবো, রাজাবাহাদুর আমারে ভাল ভাল কাজকর্ম দিবেন, এইরূপ আশা করি, এইরূপ আশা পাই। যে সব কথা অন্তরে জাগে, এক এক সময় সে সব কথা ভুলে ভুলে থাকি।

    দিবসে উপবেশনের নিমিত্ত আমার একটি স্বতন্ত্র গৃহ নিদিষ্ট ছিল, প্রয়োজন ব্যতিরেকে কেহ সে গৃহে হঠাৎ প্রবেশ কোত্তেন না। একদিন অপরাহ্ণে একটি ভদ্রলোক সহাস্যবদনে সহসা আমার সম্মুখে উপস্থিত হোলেন। কথাবার্তা কিছুই নাই, লোকটি আপন মনে হাসতে হাসতে আমার বিছানার উপর বোসলেন, হাসতে হাসতে খানিকক্ষণ অনিমেষনেত্রে আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন; ভাব আমি কিছুই বুঝতে পাল্লেম না। তাঁর উপস্থিতির কারণ জানবার অভিলাষে কোন কথাই আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম না। তিনিও নিস্তব্ধ, আমিও নিস্তব্ধ। বিশেষের মধ্যে তাঁর মুখে হাস্য ছিল, আমার মুখ বিস্ময়ভাব প্রকাশক।

    লোকটির পরিচ্ছদ ভদ্রলোকের ন্যায়, চেহারায় কিন্তু তদ্রূপ ভদ্রতার কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না। সচরাচর বড়লোকের দরবারে মোসাহেব লোকের যেরূপ ভাব-ভঙ্গী দৃষ্ট হয়, এই লোকের ভাব-ভঙ্গী সেই প্রকার। বাক্যশ্রবণ না কোল্লে প্রকৃতি বুঝা যায় না; প্রকৃতির বিচারে আমি অক্ষম থাকলেম। লোকটির চক্ষু আমার মুখের দিকে, আমার চক্ষু তাঁর মুখের দিকে। এই ভাবে থাকতে থাকতে হেসে হেসে তিনি আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “তোমার কি কোন প্রকার অসুখ আছে?”

    অদ্ভুত প্রশ্ন! কস্মিনকালেও দেখা-সাক্ষাৎ নাই, আমার সুখাসুখের কথা কেহ তাঁরে বলেও নাই, অকস্মাৎ তিনি আমারে অমন কথা কেন জিজ্ঞাসা করেন? আমি উত্তর কোল্লেম না; দুই তিনবার মস্তকসঞ্চালন কোরে পুনরায় তিনি আপনা আপনি বোল্লেন, “ওহো! সেই কথাই ঠিক বটে। সে রকম না হোলে এ রকমটা হয় না সেই কথাই ঠিক বটে! আত্মগত বাক্যে এইরূপ মন্তব্য দিয়ে পূর্ববৎ হাসতে হাসতে আমারে তিনি বোল্লেন, “দেখি দেখি, তোমার হাতখানি একবার দেখি।”

    আমি মনে কোল্লেম, হয় তো গণকঠাকুর; সামুদ্রিকবিদ্যায় পণ্ডিত; এই মনে কোরে আমি আমার দক্ষিণ করতলটি তাঁর সম্মুখে বিস্তার কোল্লেম। হাস্য কোরে তিনি বোল্লেন, “ও রকম নয়, ও রকম নয়, নাড়ী পরীক্ষা করা আবশ্যক।”

    হাতখানি সরিয়ে নিয়ে বিরক্তভাবে আমি বোল্লেম, “শরীরে আমার কোন পীড়া নাই নাড়ী-পরীক্ষার কিছুই প্রয়োজন আমি দেখছি না।”— আমার কথা তিনি শুনলেন না নিকটে সোরে এসে আমার হাতখানি ধোরে তিনবার তিনি টিপে টিপে দেখলেন, মাথা হেলিয়ে হাতের কাছে কাণ পাতলেন, তার পর হুঁ হুঁ শব্দ উচ্চারণ কোরে পূর্বের ন্যায় তিনবার মস্তকসঞ্চালন কোল্লেন; হাসতে হাসতে বোলতে লাগলেন, “সে রকম কিছু নয় বটে কিন্তু কোথা থেকে তুমি এসেছ? কোন কোন লোক তোমাকে বুঝি অনেক কষ্ট দিয়েছে? তুমি বুঝি দেশে দেশে বেড়িয়ে বেড়িয়ে অতিশয় ক্লান্ত হয়ে পোড়েছ? লোকেরা বুঝি তোমার অন্বেষণে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে? কোথাও বুঝি তুমি স্থির হোতে পাচ্ছো না? নাড়ীর লক্ষণে সেই রকম আমি দেখছি। অজ্ঞাত লোকেরা তোমার পরম শত্রু। কেন তারা তোমার উপর সে রকম দৌরাত্মা করে? কেন তারা তোমার পাছে পাছে দেশে দেশে ঘোরে?”

    যখন তিনি আমার নাড়ী-পরীক্ষা করেন, সে সময় আমি ভেবেছিলেম, তিনি হয় তো বৈদ্যরাজ, শেষের কথাগুলি শুনে মনে কোল্লেম, তা নয়; কেবল বৈদ্যরাজ নয়, গণনাবিদ্যায় তাঁর দক্ষতা আছে। যে সব কথা তিনি বোল্লেন, যদি অন্য কারো মুখে না শুনে থাকেন, তবে তো সে সব কথায় তাঁর পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। পূর্বে যতটা বিরাগ জন্মেছিল, ততটা থাকলো না, গণকঠাকুর মনে কোরে তাঁর গুণপণার উপর আমার কিঞ্চিৎ ভক্তির সঞ্চার হলো। তখনো তিনি মুখ টিপে টিপে হাসছিলেন। হাসে কেন? আমি কষ্টে পোড়েছি, লোকের উপদ্রবে কষ্ট পেয়েছি, সে সব কথা জানতে পেরে কাহার মুখে হাসি আসে? লোকটির স্বভাব বুঝি ঐ রকম, সর্বদাই হাস্য করা বুঝি তাঁর অভ্যাস, এইরূপে বিবেচনা কোরে দুই চারি কথায় আমি বোল্লেম, “আজ্ঞা হাঁ লোকে অকারণে আমার শত্রু হয়েছে, তারা আমারে বিস্তর কষ্ট দিয়েছে, এখনো পৰ্যন্ত ক্ষান্ত হয় নাই, বেশী কথা কি, বাগে পেলে তারা আমারে প্রাণে মাত্তে পারে, সে সব আমি জানতে পেরেছি।”

    গণক, বৈদ্য অথবা সামুদ্রিক এই তিনের মধ্যে লোকটি যাই হোন, বিশ্বাস কোরে আমি তাঁরে বোল্লেম, “শত্রুর কুচক্রে সর্বদাই আমি বিপদাপন্ন।” সেই কথা শুনে সেইভাবে তিনি বোল্লেন, “হোতেই পারে, হোতেই পারে; তুমি মিথ্যাকথা বোলছো না। সত্য সত্যই তোমার পাছে শত্রু লেগেছে। তুমি বেশ ছেলে, কেন তারা তোমার শত্রু হলো, আমি বুঝতে পাচ্ছি না। আচ্ছা, তোমার বাড়ী কোন গ্রামে? তোমার পিতার নাম কি?”

    বিশ্বস্তভাবে আমি উত্তর কোল্লেম, “তা আমি জানি না, বাড়ী-ঘর আমার নাই, মাতা-পিতার পরিচয় আমি অজ্ঞাত, যেখানে যখন আমি যাই, এক একটি মহৎলোকের কাছে আশ্রয় পাই, আমার দুর্দশা শুনে তাঁরা দুঃখপ্রকাশ করেন; সেখানেও আমার সঙ্গে সঙ্গে শত্রু ঘোরে, কোথাও আমি শান্তি পাই না। এই রাজাবাহাদুর পূর্বে আমারে দেখেছিলেন, নিরাশ্রয় দেখে আশ্রয় দিতে চেয়েছিলেন, তাঁর কাছে থাকতে আমি সম্মত হই নাই; মধ্যে কিছুদিন দেখা-শুনা ছিল না, সম্প্রতি তিনি আমারে এইখানে আনিয়াছেন; এখন এইখানেই আমি আছি।”

    একবার ঊর্ধ্ব দিকে দৃষ্টিপাত কোরে লোকটি বোল্লেন, “হাঁ হাঁ; সেই কথাই তো আমি বোলছি, শত্রুর ভয়ে, শত্রুর উপদ্রবে কোথাও তুমি স্থির হোতে পাচ্ছো না। রাজাবাহাদুর আনিয়েছেন, এইখানেই তুমি আছ, সে কথা আমি জানতে পেরেছি; কিন্তু আচ্ছা, কারা তোমার শত্রু, কি কারণে তারা তোমার শত্রু, সে কথা তুমি বোলতে পার? শত্রু পক্ষের নাম তুমি জানো?”

    তাৎক্ষণাৎ আমি কোন উত্তর দিলেম না, মনে কোল্লেম, এ সকল কি কথা? আমার অবস্থার কথা ইনি জানেন; শত্রু লেগেছে, সে কথাও বোলছেন, বোলতে বোলতে শত্রু পক্ষের নাম জিজ্ঞাসা করেন কেন? নাম যদিও আমি জানি, কিন্তু সেই নামের সঙ্গে কতদূরে টান পড়ে সেটা ভাবতে গেলে প্রকাশ কোত্তে সাহস হয় না। শত্রু, আমার একটি নয়, অনেক; কার নাম বোলতে কার নাম আনবো, কোথায় গিয়ে পরিণাম দাঁড়াবে, ঠিক নাই, ফল বরং বিপরীত দাঁড়াবার সম্ভাবনা। এইরূপে চিন্তা কোরে আমি উত্তর কোল্লেম, “গুপ্তশত্রুর নাম নিঃসন্দেহে জানা যেতে পারে না। যাদের উপর আমার সন্দেহ হয়, তারা আমারে কিরূপ বিবেচনা করে, তাও আমি জানি না। অমুক অমুক আমার শত্রু, অমুক অমুক আমার প্রাণবিনাশে উদ্যত, ঠিক ঠিক তা যদি আমি জানতেম তা হোলে আদালতের সাহায্য নিতে পাত্তেম। যারা গোপনে থেকে যুদ্ধ করে, তাদের নাম বোলতে আমি ভয় পাই।”

    লোকটি আমার কথার প্রতিধ্বনি কোরে বোল্লেন, “তা তো বটেই! তা তো বটে! ঠিক কথাই তুমি বোলেছ! নাম বোলতে তুমি ভয় পাও! আমরাও ভয় পাই। আহা! বিস্তর কষ্ট তুমি পেয়েছ! যারা তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে, তারা শাস্তি পাবে; এখানে না পায়, মরণান্তে যমলোকে অথবা অপর কোন পরলোকে অবশ্যই তারা শাস্তি পাবে। ও কি? তুমি অমন কোরে কাঁদ কেন? অসুখ হয়েছে, সেরে যাবে; শত্রু হয়েছে, ধরা পোড়বে; ভয় কি? রাজার বাড়ীতে এসেছ, রাজার বাজী আছ, কিসে তোমার ভয়? রোদন সংবরণ কর; শীঘ্রই আবার আমি তোমার কাছে আসছি, এখান থেকে তুমি কোথাও যেয়ো না।”

    এই সব কথা বোলে, মুখে টিপে হাসতে হাসতে সে লোকটি আমার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কোথাকার লোক?— কে সে? —কি সব কথা বোলে গেল? আমি কাঁদছি! কে তারে বোল্লে আমি কাঁদছি? লোকটা কোন চক্ষে দেখলে আমি কাঁদছি? প্রথমেই তারে দেখে, তার কথা শুনে, আমি মনে কোরেছিলেম, গণকঠাকুর, তার পর ভেবেছিলেম বৈদ্যরাজ, এখন বুঝতে পাচ্ছি, কিছুই না। ভণ্ডলোক! যে সকল লোক কেবল কথা বেচে খায়, পাঁচ রকম কথা বোলে লোকের মন ভুলাবার চেষ্টা পায়, ‘অসাধ্য রোগের অব্যর্থ ঔষধ জানি’ বোলে যারা অবোধ লোকের পয়সা ফাঁকি দেয়, ঐ লোক হয় তো সেই দলের লোক হবে, এইরূপে আমার সন্দেহ হলো।

    সন্দেহের কথাটা মনে মনে আলোচনা কোচ্ছি, সম্মুখে দেখি, আর একটি লোক। যে লোকটিরও অধর ওষ্ঠে মৃদু হাস্য। যে আসে, সেই হাসে, ব্যাপার কি? আমারে দেখলে নূতন লোকের হাসি পায়, পাটনায় এসে আমি কি সেই রকমের কোন আশ্চর্য বস্তু হয়ে পোড়েছি? লোকটি এলো, কৃষ্ণঠাকুরের মত পায়ের উপর পা দিয়ে আমার সম্মুখে দাঁড়ালো, হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “কি হে বালক! তোমারই নাম হরিদাস? জায়গায় জায়গায় তুমি না কি বিস্তর কষ্ট পেয়েছ? অজানা লোকেরা বা কি তোমার উপর বেজায় দৌরাত্ম্য কোরেছে? হায় হায়! এমন লক্ষ্মীছেলে তুমি, এমন চমৎকার রূপ তোমার, হায় হায়। তোমার উপর দৌরাত্ম্য? কেন তারা তোমার উপর দৌরাত্ম্য করে? মানুষ? না ভূত? হাঃ। হাঃ হাঃ! ভূতেরাই তোমার মত ছোট ছোট ছেলেদের উপর প্রতাপ দেখায়! নিশ্চয় তারা ভূত!”

    লোকটি ঝড়ের মত একসঙ্গে কত কথাই বোলে গেল, একটি কথাতেও আমি কোন উত্তর দিলেম না। নূতন লোকে অত কথা কেন বলে, কোন কথার সঙ্গে কোন কথার মিল নাই, বিকারগ্রস্ত রোগীর প্রলাপের ন্যায় প্রায় সকল কথাই অসম্বদ্ধ। লোকটির উদ্দেশ্য কি বুঝা গেল না। তার মুখপানে আমি চেয়ে দেখলেম, কেবল হাস্য; মাঝে মাঝে যতবার চেয়ে দেখেছি, ততবারই দেখেছি, সমভাবে হাস্য। শেষবার যখন আমি দেখলেম, তখন সেই মুখে একটু গাম্ভীৰ্য অনুভূত হলো। গম্ভীরভাব ধারণ কোরে লোকটি তখন আপন মনে বোল্লে, “তাই তো! তাই তো দেখছি! কাণ্ডখানা কি? এত অল্পবয়সে— আচ্ছা, আচ্ছা, —এখনো উপায় আছে।”

    “উপায় আছে” বোলতে বোলতে সেই লোক ধীরে ধীরে বাহির হয়ে গেল। কিসের উপায় আছে, আমি কিছু অনভব কোত্তে পাল্লেম না। সন্ধ্যার পর আর একজন? সেই তৃতীয় ব্যক্তিও পূর্বোক্ত দুইজনের ন্যায় অভিনয় কোরে গেল। প্রথম লোকটির কথায় বরং আমি দুই চারিটি উত্তর দিয়েছিলেম, এদের দুইজনের বক্তৃতার সময় উদাসভাবে আমি মৌন। কেন তারা এসেছিল, কেন তারা ঐ সব কথা বোল্লে, “আহা! আহা!” বোলে কেন তারা দুঃখপ্রকাশ কোল্লে, তারাই তা বোলতে পারে, আমি বোলতে পারি না। তারা নূতন; পরিচ্ছদ-পারিপাট্যে ভদ্রলোক, কথাগুলো কিন্তু ভদ্রলোকের কথার মত বোধ হলো না। আমার কষ্টের কথা উত্থাপন কোরে কেন তারা ততটা বাগাড়ম্বর বিস্তার কোরে গেল, আমার কষ্টের কথায় কেন তারা কষ্ট জানালে, সন্দেহে সন্দেহে তাই আমি ভাবতে লাগলেম।”

    এই ঘটনার পর দশদিন অতিক্রান্ত। যারা ঐরূপে আমার বিস্ময় উৎপাদন কোরেছিল, এই দশদিনের মধ্যে তারা কেহই আর একদিনও আমার সঙ্গে দেখা কোত্তে এলো না। রাজার সঙ্গে আমি দেখা করি, রাজা মিষ্ট মিষ্ট কথা কন, হিতোপদেশ শিক্ষা দেন, হাসির কথা উত্থাপিত হোলে একটু একটু হাস্য করেন, বাগানের কথাটা একবারও আমার সাক্ষাতে আর উত্থাপন করেন না; এই রকমে দিন যায়। একদিন সন্ধ্যার পর রাজা আমারে ডেকে পাঠালেন। যে ঘরে তিনি বসেন, সেটির নাম খাসকামরা, সেই ঘরে গিয়ে আমি উপস্থিত হোলেম।

    দেড় হাত উচ্চ গদীর উপর রাজাবাহাদুর উপবিষ্ট। আশেপাশে অনেক লোক। রাজার অতি নিকটে পাঁচজন; সেই পাঁচজনের মধ্যে একজন রাজগদীস কিনারার উপর হাতের কনুই রেখে, রাজার দিকে একটু হেলে, তাঁর কাণের কাছে কি যেন পরামর্শ দিচ্ছিল। বড় বড় লোকের মজলীসে ঐ রকমের লোক অনেক থাকে। গদীর গায়ে জানু রাখা, কণুই রাখা, মাথা রাখা সেই সব লোকের শ্লাঘাজনক দাম্ভিকতার পরিচয়; তারা ভাবে, আমাদের এইরূপ ভঙ্গী দেখে লোকে ভাবুক, আমরাও এক একজন বড়দলের লোকের মধ্যে গণ্য। বড়লোকের কাণের কাছে মুখ রেখে মিছামিছি মন্ত্র পড়াও ঐরূপ শ্লাঘাবিজ্ঞাপক; অমুক লোক অমুক রাজার অথবা অমুক বাবুর পরম প্রিয়পাত্র, দর্শকলোকের মনে এইরূপ বিশ্বাস উৎপাদন করা সেই সকল অভিমানী লোকের গূঢ় অভিপ্রায়। বড় বড় মজলীসে সর্বদা যাঁরা গতিবিধি করেন, তাঁদের মধ্যে যাঁরা সূক্ষ্মদর্শী, তাঁরা সকলেই জানেন, অনেক লোকেরই ঐ প্রকার অভ্যাস।

    আমি উপস্থিত হোলেম। বেদীর উপর পুরাণবক্তা কথকঠাকুর, মঞ্চোপরি রাজনীতিবক্তা বাগ্মীবাবু, নাট্যশালার রঙ্গমঞ্চে নান্দীপাঠক রসিক নট,—সঙযাত্রার আসরে রাক্ষস-বানররূপী নূতন সং, এই সকল মূর্তির প্রতি দর্শকলোকের চক্ষু যেমন সুস্থিরভাবে আকৃষ্ট থাকে, রাজমজলীসের সমস্ত লোকের চক্ষু সেইরূপে আমার প্রতি সমাকৃষ্ট। সমস্ত চক্ষুর সঙ্গে রাজার চক্ষু প্রথমে আমার দিকে নিক্ষিপ্ত হয় নাই, একটু পরে নেত্রোত্তোলন কোরে আমারে দেখে প্রসন্নবদনে রাজা বোল্লেন, “এসো হরিদাস, বোসো।”

    একটি পাশে চুপটি কোরে আমি বোসলেম। লোকেরা খানিকক্ষণ সমভাবে আমার দিকে চেয়ে থাকলো; দুই একজন একটু একটু হেলে হেলে পরস্পর ফুস ফুস কোরে কি যেন বলাবলি কোত্তে লাগলো, ভাব আমি অনুভব কোত্তে পাল্লেম না। হাঁ, একটি কথা বোলতে আমি ভুলেছি। ইতিপূর্বে তিন সময়ে যে তিনটি লোক আমার কষ্টে সমবেদনা জানাতে আমার ঘরে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে একজনকে ঐ মজলীসে আমি দেখেছিলেম; রাজার অতি নিকটে যে পাঁচটি লোক উপবিষ্ট ছিল। তাদেরই মধ্যে সেই লোক। সেই পাঁচজনের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ কোরে রাজাবাহাদুর আমারে বোল্লেন, “দেখ হরিদাস! এখানে এসে অবধি তুমি যে প্রকার উন্মনা উন্মনা ভাব দেখাচ্ছো, মাঝে মাঝে লোকের সঙ্গে,— কেবল লোকের সঙ্গে কেন, মাঝে মাঝে আমার কাছেও তুমি যে প্রকার অর্থশূন্য তাৎপৰ্যশূন্য কথা কও, তাতে যেন বুঝা যায়, নানা কষ্টে, নানা ভাবনায় তোমার বুদ্ধি বিচলিত হয়েছে, মাথা যেন কেমন খারাপ হয়ে গিয়েছে চাউনীতেও এক এক সময় সেইরূপ লক্ষণ প্রকাশ পায়। এই পাঁচটি বাবু এখানকার লব্ধপ্রতিষ্ঠ ডাক্তার; পরীক্ষা কোরে এই ডাক্তারবাবুরা যেরূপ ব্যবস্থা দিবেন, সেই ব্যবস্থামতেই তোমাকে চোলতে হবে। আমার কাছে তুমি এসেছ, তুমি পীড়িত, যাতে কোরে তোমার চিকিৎসা হয়, সেরূপ বন্দোবস্ত করা আমারই কর্তব্য।”

    পাঁচজনের মুখের দিকে এক একবার চেয়ে, রাজার মুখের দিকে দুটি চক্ষু আমি স্থির কোরে রাখলেম। ডাক্তারের মধ্যে একজন সেই সময় মন্তব্য দিলেন, “পরীক্ষা নিষ্প্রয়োজন, মুখে-চক্ষের ভাব দেখেই প্রকৃত অবস্থা আমরা বুঝতে পেরেছি। বিশেষ, এই নীলাম্বরবাবু যে সব কথা বোলেছেন, তাতে আর নূতন পরীক্ষা করা আমরা আবশ্যক বিবেচনা কোচ্ছি না। রোগ এখনো প্রবল হয় নাই, দুই একটা লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে মাত্র, সামান্য ঔষধেই আরাম হয়ে যাবে।”

    নীলাম্বরবাবুর কথার উপরেই ডাক্তারগুলির পূর্ণ বিশ্বাস। নীলাম্বরবাবু কে? যে তিনটি লোক পূর্বে আমারে ছলনা কোরে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে যাঁকে আমি এই মজলীসে চিনেছি তাঁরই নাম নীলাম্বরবাবু; মোটামুটি পরিচয় পেয়ে এখন আমি চিনলেম, ইনি একজন ডাক্তার। হা জগদীশ্বর! ডাক্তারের সঙ্গে আমার কিসের সম্পর্ক? শরীর আমার বিলক্ষণ সুস্থ, অবস্থাচিন্তনে মন চাঞ্চল্য, কি কারণে চাঞ্চল্য, আমিই তা জানি, সে চাঞ্চল্যের কারণ নিরূপণ করা ডাক্তার-কবিরাজের সাধ্য নয়। তবে কেন আমি ডাক্তারের চক্রে নিক্ষিপ্ত হোলেম?

    উদ্বিগ্ন হয়ে এই রকম আমি ভাবছি, দলের ভিতর থেকে আর একটি লোক একটু মাথা উঁচু কোরে সেই সময় বোলে উঠলেন, “ততদূর বোধ হয় যেতে হবে না; রঘুনাথবাবু বোলছেন, সামান্য ঔষধেই আরাম হবে। আমি শুনেছি, ইংরাজীমতের ডাক্তারখানায় সামান্য ঔষধ থাকে না; যতই সামান্য হোক, সমস্ত ঔষধের শক্তি গরম; এ ছোকরাকে গরম ঔষধ দিবার দরকার নাই। আমার ঘরে পঞ্চানন্দের বিল্বপত্র আছে, সেই বিল্বপত্র ধরে একটু খাইয়ে দিলেই এক রাত্রির মধ্যে এ রোগটা সেরে যাবে।”

    হো হো শব্দে সকলেই হেসে উঠলেন, ম্রিয়মাণ হয়ে আমি মাথা হেঁট কোল্লেম; মনে ভাবলেম, এই জন্য কি রাজাবাহাদুর আমারে পাটনায় আনালেন? গুপ্তরথীরা গুপ্তশর সন্ধান কোরে আমারে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল, সে এক রকম ছিল ভাল, এখন কি না বহুরথী একত্র হয়ে আমার এই ক্ষুদ্রপ্রাণ সংহার কোত্তে উদ্যত। বিদ্রূপের অগ্নিবাণে আমার অন্তরাত্মা যেন জ্বোলে যাচ্ছে! ভাবলো এই রকম, মুখে কিছু বোল্লেম না। বুঝলেম রঘুনাথবাবু একজন ডাক্তারের নাম, রঘুনাথের ব্যবস্থা খণ্ডন কোরে কিম্বা খণ্ডন করবার চেষ্টা কোরে যিনি পঞ্চানন্দের বিল্বপত্রের ব্যবস্থা দিলেন, তিনি একজন কবিরাজ। ধর্মজ্ঞানে জলাঞ্জলি দিয়ে যাঁরা কেবল অর্থ লোভে ডাক্তার-কবিরাজের নাম কলঙ্কিত করেন, তাঁদের অসাধ্য কাৰ্য কিছুই নাই। একবার আমি শুনেছিলেম, একজন অর্থলোভী জমীদার তুচ্ছ বিষয়লোভে আপনার বাড়ীর একটি স্ত্রীলোককে পৃথিবী থেকে তফাৎ করবার অভিপ্রায়ে একজন ডাক্তারের আর দুজন বৈদ্যবংশীয় কবিরাজের গুপ্তসাহায্য গ্রহণ করেন, বিসূচিকা রোগ, এইরূপ প্রকাশ কোরে চিকিৎসকেরা সেই বিধবা বধূটিকে প্রাণঘাতক ঔষধ সেবন করান। অনবরত ঘর্ম হয়; আবীরে ঘর্ম নিবারণ করে, সেই ছলে বিধবার সর্বাঙ্গে সাত সের আন্দাজ আবীর মাখানো হয়; আবীর সেই আবীরাকে অতি শীঘ্র যমালয়ে প্রেরণ করে। ধর্মশীল চিকিৎসকেরা সেই মহৎ কার্যে লক্ষাধিক মুদ্রা পুরস্কার পেয়েছিলেন এইরূপ আমার শুনা আছে, যখন এই পাটনাসহরে বিনা রোগে ডাক্তার-কবিরাজের চিকিৎসায় আমার অদৃষ্টে কি ঘটে, ভগবান কি করেন, কিছুই আমি বোলতে পারি না।”

    মজলীসে অনেক প্রকার পরামর্শ হলো; চুপি চুপি পরামর্শই অনেক, সকলের সকল কথা আমি শুনতে পেলেম না। মজলীস থেকে উঠে আমি আসি আসি মনে কোচ্ছি, এমন সময় রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “দেখ হরিদাস! আমার কথায় তুমি অবহেলা কোরো না; যা আমি বুঝেছি, তাই তোমাকে বোলেছি; তোমার চিকিৎসার জন্যই এই বিজ্ঞ বিজ্ঞ ডাক্তারগুলিকে আমি ডেকেছি। অবহেলা কোরো না, অবাধ্য হয়ো না; ডাক্তার-কবিরাজের অবাধ্য হোলে রোগ তো সারেই না, বরং বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। আমার এই কথাগুলি তুমি মনে রেখো।”

    আমি বিবেচনা কোল্লেম, যাঁর যা কিছু বলবার ছিল, শেষ হয়ে গেল, তবে আর কেন সেখানে বোসে থাকা। ধীরে ধীরে আমি উঠলেম; মজলীসকে নমস্কার কোরে ভগ্নান্তঃকরণে বিদায় চাইলেম। প্রায় আধ ঘণ্টা মজলীসে ছিলেম, অতক্ষণের মধ্যে একটি কথাও আমার রসনা থেকে নির্গত হয় নাই, বিদায়-প্রার্থনাই সে মজলীসে আমার প্রথম কথা।

    কতকগুলি লোক হো হো শব্দে হেসে উঠলেন। হাস্যের কারণ বুঝতে না পেরেও আমি অপ্রতিভ হোলেম। পূর্বে যাঁরা কথা কয়েছিলেন, জানা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে একজনের নাম রঘুনাথ। যিনি রঘুনাথ, তিনি একজন ডাক্তার; আমার প্রস্থানের উপক্রমে বাধা দিয়ে, রাজার নিকট থেকে উঠে এসে তিনি আমারে বোল্লেন, “সত্য সত্যই বুদ্ধির স্থিরতা নাই; কোথায় চোলেছ?— বোসো; তোমার রূপদর্শনের জন্য এখানে তোমাকে আহ্বান করা হয় নাই, তোমার প্রতি আমাদের গুটিকতক জিজ্ঞাস্য আছে বোসো; অত ব্যস্ত হোচ্ছ কেন? তোমার চিকিৎসার জন্য রাজাবাহাদুরের আহ্বানে আমরা এখানে এসেছি;: ব্যাধিটা অগ্রে নির্ণয় করা হোক, তার পর তোমার ছুটি।”

    অপ্রস্তুত হয়ে পুনরায় আমি আসন গ্রহণ কোল্লেম। রাজাবাহাদুর একবার আমার দিকে চাইলেন; কিন্তু মুখে কিছু বোল্লেন না। দশদিন পূর্বে যে তিনটি লোক এসে আমার গৃহে উপস্থিত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন এই মজলীসে উপস্থিত আছেন এ কথা আমি পূর্বে বোলেছি। সেই লোকটি ছাড়া ডাক্তারের দলের অপর চারিটি লোক সে সময় রাজার নিকট থেকে সোরে এসে আমারে ঘিরে বোসলেন; সুস্থির নয়নে ক্ষণকাল আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন। দর্শনকার্যের অবসানে একজন একটউ বিস্ময় প্রকাশ কোরে বোল্লেন, “এ ছোকরা যথার্থ অনেক কষ্টভোগ কোরেছে, অনেক লোক এই ছোকরার শত্রু হয়েছে, এক একটা শত্রুর চেহারার ছায়া এই ছোকরার নেত্র পুতুলীতে দেখা যাচ্ছে।”— প্রতিধ্বনি কোরে আর একজন বোল্লেন, “ঠিক, ঠিক, আমিও যেন তাই দেখতে পাচ্ছি। মানুষ চিনতে পাচ্ছি না, কিন্তু ছায়াগুলো ঘরে ঘরে বেড়াচ্ছে, বেশ দেখা যাচ্ছে।”— তৃতীয় ব্যক্তি বোল্লেন, “শুধু তাই নয়, এ ছোকরা এত বয়স পর্যন্ত নিজের পরিচয় নিজে জানে না, সেই জন্য চক্ষুর পুতুলীতে স্পষ্ট কাহার মুখ দেখা যায় না, কেবল ছায়া দেখা যায়।”—চতুর্থ ব্যক্তির প্রকৃতি কিছু গম্ভীর, মুখের আকৃতিও গম্ভীর। তাঁর মুখে দাড়ী ছিল; দুই হস্তে সেই দীর্ঘ দাড়ীতে ঢেউ খেলিয়ে খেলিয়ে তিনি বোল্লেন, “আপনারা করেন কি? ছায়াবাজীখেলার আলোচনার মত ওসব আপনারা বলেন কি? সাক্ষাতে ওসব কথা বোলতে নাই;  ছোকরাকে বোলতে দিন, পরিচয় অজ্ঞাত থেকে কোন কোন চক্রে কি প্রকারে ঘুরে ঘুরে কি প্রকার কষ্ট পেয়েছে কিম্বা পাচ্ছে, বোলতে দিন। কেমন হে ছোকরা!” আমারে সম্বোধন কোরে সেই গম্ভীর লোকটি বোল্লেন, “কেমন হে ছোকরা! সেই কথাই ঠিক নয়? নিজের পরিচয় তুমি জানো না, অনেক কষ্ট পেয়েছ, অনেক শত্রু তোমার আছে, এই সব কথা ঠিক নয়?”

    বার বার এক কথা; সকলের মুখেই এক কথা; এ সব কথার মানে কি, বক্তাগুলির উদ্দেশ্যই বা কি, কিছুই আমি স্থির কোত্তে পাল্লেম না; মাঝে মাঝে রোগের কথা বলে, এটাও একটা বিষম সমস্যা! যাই হোক, উত্তর দেওয়া কর্তব্য। মজলীস সরগরম, অনেক লোক একত্র,— রাজসভা, রাজা মোহনলাল ঘোষ বাহাদুর স্বয়ং সভাপতি, এ মজলীসে আমার ভাগ্যের কথা প্রকাশ কোল্লে মন্দ হবে না; সকল লোক দয়াশূন্য হবে এমন কখনই সম্ভব নয়। আমার দুঃখের কথা শুনে অবশ্যই কাহার কাহার হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার হোলেও হোতে পারবে, আমার অনুকূলে রাজাবাহাদুরকে তাঁরা দুটি একটি কথা বোল্লেও বোলতে পারবেন, এই ভেবে সেই গম্ভীর লোকটির প্রশ্নের উত্তরে আমি বোল্লেম, “হাঁ মহাশয়! কষ্ট আমি অনেক পেয়েছি। আমার জাতি-জন্মের পরিচয় আমি জানি না;  শৈশবে আমি গুরুগৃহে বাস কোত্তেম, গুরুগৃহে বাস কোত্তেম, গুরুদেবের মৃত্যুর পর একটা বদমাসলোক আমারে দেশান্তরে নিয়ে যায়, তার পর একটি ভাল জায়গায় আমি আশ্রয় পাই, এই রাজাবাহাদুর সে কথা জানেন। তার পর আমার পশ্চাতে শত্রু লাগে, শত্রু একটা নয়, অনেক জায়গায় অনেক; এক একটা শত্রুর নাম আমি জানি, কিন্তু বোলতে ভরসা হয় না। ভগবান যদি—”

    যাঁরা আমারে ঘিরে বোসেছিলেন, আমার মুখে ভগবানের নাম শুনে তাঁরা হো হো কোরে হেসে উঠলেন। একজন বোল্লেন, “তা তো হোতেই পারে! আমাদেরও ও রকম হয়; শত্রুর নাম কোত্তে আমাদেরও ভরসা হয় না। ভগবান যদি সে সব নাম বোলে দেন, তা হোলেই প্রকাশ পায়, তা না হোলে চিরকাল কষ্টভোগ কোরে ছটফট কোরে বেড়াতে হয়। আহা! এ ছোকরা বড়ই কষ্ট পাচ্ছে! আপনার পরিচয়টা পর্যন্ত জানতে পাচ্ছে না, যাকে তাকে পরিচয়ের কথা জেজ্ঞাসা করে; প্রাণ সর্বদা হু হু করে কি না, কাজে কাজেই ঐ রকম; ঐ রকমেই এই দশা ঘোটেছে।”

    ঐ কথাগুলি যিনি বোল্লেন, তিনি আমার দিকে চাইলেন না, শেষে আমার দিকে চেয়ে যেন কতই সদয়ভাবে বোল্লেন, “ভয় পেয়ো না তুমি, অনেক লোকের ওরকম হয়; অল্পদিন চিকিৎসা কোল্লেই আরাম হয়ে যায়, ভয় কিছু নাই। দিবারাত্রি অত ভেবো না, সকল লোকের কাছে ওরকম গল্প কোরো না; তোমার মাথার ঠিক নাই, লোকে সেটা বুঝবে না, বৃথা তুমি ঐ রকম বোকে বোকে ক্লান্ত হয়ে পোড়বে, মাথাটা আরো খারাপ হবে। চুপ কোরে থেকো, আমরা যে রকম ব্যবস্থা কোরে দিব, সেই রকম ব্যবস্থা মতে দিনকতক থাকতে থাকতেই সমস্ত উপসর্গ সেরে যাবে। আচ্ছা, এখন তুমি যেতে পার, দু-দিন পরে আমরা আবার আসবো, সে দিন যদি এই রকম দেখি, তা হোলে চিকিৎসার বন্দোবস্ত ঠিক হবে।”

    রাজাবাহাদুর ঐ সকল কথা শুনলেন, কোন প্রকার অভিপ্রায় প্রকাশ কোল্লেন না। তিনি আমারে আহ্বান কোরেছিলেন, প্রয়োজন কি ছিল, ডাক্তারমহাশয়েরাই সেটি ব্যক্ত কোল্লেন। ডাক্তারগণের বক্তৃতার তাৎপর্য আমার চিকিৎসা করা। কি রোগের চিকিৎসা হবে, আমি বুঝলেম না, অথচ চিকিৎসা হবে আমার। রহস্য ভেদ করা আমার অসাধ্য। আমার জীবনের ঘটনায় প্রায় পদে পদেই রহস্য। একটা রহস্যেরও মর্মভেদে আমি সমর্থ হোলেম না, এটা সামান্য আশ্চর্য ব্যাপার নয়!

    বিদায়কালে রাজাবাহাদুরের দিকে আমি চাইলেম; মুখে যেন একটু একটু হাসি ছিল, আমার দৃষ্টিপাতমাত্রেই সে হাসি লুকালো। —মন্দ নয়! অনেক বড়লোকের এইরূপ অভ্যাস আছে; অনেক অভিমানিনী রমণীরও এইরূপ প্রশংসনীয় অভ্যাস আছে; ক্ষণমাত্রে হাস্য, ক্ষণমাত্রেই গাম্ভীর্য, ক্ষণমাত্রেই বিষণ্ণতা, ক্ষণমাত্রেই চক্ষে জল। হাসা কোত্তে কোত্তে রাজাবাহাদুর গম্ভীরভাব ধারণ কোল্লেন, সেই সময় আমি নমস্কার কোল্লেম। যাও কি থাকো, একটি কথাও তিনি আমারে বোল্লেন না। মজলীসের দিকে চাইতে চাইতে রাজার খাসকামরা থেকে আমি বাহির হোলেম। মজলীসভঙ্গ হলো না, আমারে উপলক্ষ্য কোরে যেরূপ অভিনয় হয়ে গেল, মজলীসী লোকেরা সেই অভিনয় সমালোচনা আরম্ভ কোল্লেন। নিকটে দাঁড়িয়ে থাকলে কথাগুলি আমার কাণে আসতো কিন্তু আমি মনের উদ্বেগে দ্রুতগতি চোলে আসছিলেম, কথা কাণে এলো না, একটা মহোচ্চ হাস্য কোলাহল শ্রবণ কোল্লেম মাত্র। আমারে উপলক্ষ্য কোরেই সেই হাস্য, সেটি বুঝতে আমার বাকী থাকলো না।

    খেলা আমি অনেক রকম দেখেছি, রাজ-মজলীসের ডাক্তারমহাশয়েরা যেরূপ খেলা দেখালেন, সেরূপ খেলা আর কখন কোথাও দেখি নাই। খেলার সামগ্রী হরিদাস। —সত্যই এ সংসারে অনেক লোকের খেলার সামগ্রী হরিদাস। ডাক্তারের মুখে যে কথাগুলি আমি শুনলেম, নিজের চিন্তাগারে প্রবেশ কোরে মনে মনে সেইগুলি আলোচনা কোল্লেম। কথাগুলি যখন কাজে দাঁড়াবে, তখন যে রঙ্গ হবে, তাই ভেবে বড় দুঃখে আমার মুখে একটু হাসি এলো।

    দুদিন গেল। ডাক্তার রঘুনাথ সেইকালে বোলেছিলেন, দুদিন পরে আবার তাঁরা আমার কাছে আসবেন; আমি প্রস্তুত হয়ে থাকলেম। তৃতীয় দিবসের প্রাতঃকাল থেকে বেলা দুই প্রহর পর্যন্ত কেহই এলেন না, রাজাও আমারে ডেকে পাঠালেন না। আড়াই প্রহর, তৃতীয় প্রহর অতীত হয়ে গেল, তখনো পৰ্যন্ত কেহ দেখা দিলেন না, আমিও ঘর ছেড়ে কোথাও গেলেম না। সূৰ্য বোধ হয় আমার নূতন চিকিৎসার ব্যবস্থা দর্শন করা কষ্টকর বিবেচনা কোরে অস্তগমনের উপক্রম কোল্লেন। সন্ধ্যা হয় হয় এমন সময় নূতন ধরণের পোষাকপরা দুটি ভদ্রলোক ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ কোরে আমার সম্মুখে দাঁড়ালেন। পোষাকের ধরণ নূতন হোলেও মুখের ধরণ পুরাতন দেখেই আমি চিনলেম। পঞ্চমমূর্তির মধ্যে যে দুই মূর্তির নাম পাওয়া গিয়েছিলো, তারাই তারা, নীলাম্বরবাবু আর রঘুনাথবাবু দুজনই ডাক্তার, এ পরিচয় বাহুল্য।

    ডাক্তারেরা আমার বিছানার উপর বোসলেন, গম্ভীরবদনে ক্ষণকাল আমার মুখপানে চেয়ে থাকলেন। দর্পণের সাহায্য ব্যতিরেকে নিজের মুখে নিজে দেখা যায় না, আমার মুখের ভাব তখন কি রকম ছিল কিম্বা ডাক্তার দর্শনে কি রকম হয়েছিল, আমি আর জানতে পাল্লেম না; যাঁরা দেখলেন, তারা অল্পক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে, পরস্পর মুখচাহাচাহি কোরে অস্পষ্ট ইংরাজী ভাষায় কি দুই একটি কথা বোল্লেন, ঠিক আমি বুঝতে পাল্লেম না। তাদের উভয়ের নাম আমার শূনা হয়েছিল, চেহারাও বেশ মনে ছিল। যাঁর নাম নীলাম্বরবাবু, আমারে সম্বোধন কোরে তিনি বোল্লেন “তোমার মস্তিষ্কবিকারের একটা প্রধান হেতু আমি বুঝতে পেরেছি; শুনলেম, বাড়ী থেকে তুমি একবারও বাহির হও না। নিয়ত অষ্ট প্রহর এক জায়গায় আবদ্ধ থাকলে, সহজ মানুষেরও চিত্তবিকার ঘটে। আমি বোধ করি, ঔষধসেবনের অগ্রে তুমি যদি প্রতিদিন সকাল বিকাল— সূৰ্যকিরণ যখন প্রখর হয় না,— প্রখর থাকে না, সেই সময়—দুবেলা দুবার খানিক বেড়িয়ে আসতে পার, তা হোলে প্রভাতসমীর আর সন্ধ্যাসমীর সেবনে অনেকটা উপকার হোতে পারে। আমার ইচ্ছা, আজ থেকেই তুমি সেই অভ্যাস সুরু কর।”

    সেই সুপারিসের প্রতিধ্বনি কোরে রঘুনাথবাবু, তৎক্ষণাৎ বোল্লেন, “ঠিক আমার মুখের কথাটা তুমি কেড়ে নিয়েছ, আমিও ঐ কথাটা বোলবো বোলবো মনে কোচ্ছিলেম; আজ থেকে সুরু করাই ভাল।” —বন্ধুবাবুকে এই কথা বোলে, নূতন একটা চুরুট ধোরিয়ে মুখে দিয়ে, আমার দিকে ফিরে, কি যেন ভেবে গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে তিনি বোল্লেন, “তোমার নামটি কি ভাল? —হরি —হাঁ —হরিদাস। —হাঃ হাঃ হাঃ! হরিদাস-নামটা কিছুতেই আমার মনে থাকে না! হাঃ হাঃ হাঃ! যতগুলি হরিদাসকে আমি চিনি, মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে দেখা হয়,—দেখা হোলেই নাম ভুলে যাই!—ওটা হোচ্ছে বাবুজী বৈরাগীদের মুখস্থ করা নাম; আমার মত ইংরাজীওয়ালাদের নয়; আমার মধ্যে ওনামটা যেন কেমন বাধো বাধো ঠেকে।”

    “বাধো বাধো ঠেকে” এই কথা বোলেই বক্তা ডাক্তারটি এক গাল ধূম উদ্গীরণ কোরে আমার মুখের কাছে ছেড়ে দিলেন। দোক্তার দুর্গন্ধ সহ্য কোত্তে না পেরে অন্যদিকে আমি মুখ ফিরালেম। বক্তার মুখের কাছে হাত ঘুরিয়ে ডাক্তার নীলাম্বর হাসতে হাসতে বোল্লেন, “কিছুদিন তুমি চৈতন্যচরিতামৃত পাঠ কর, হরিনাম মুখস্থ হবে, হরিদাস নামটিও আয়ত্ত কোরে রাখতে পারবে। আর একটা পরমার্শ আছে, আর এক সময়ে সে কথা হবে, এখন তুমি হরিদাসকে কি কথা বোলছিলে, বোলে যাও।”

    আর একবার চুরুটের ধূম্র উদ্গীরণ কোরে রঘুনাথবাবু আমারে বোল্লেন, “দেখ হরিদাস! খোলা জায়গার হাওয়া খাওয়া একটা পরম ঔষধ, —সকাল বিকাল দুবেলা। ঠিক সময় হয়েছে, আমাদের সঙ্গে গাড়ী আছে, তুমি প্রস্তুত হও। আজ আমরা তোমাকে হাওয়া খাওয়া ঔষধের প্রথম ফল দেখাব; মনে কর, আজ তোমার হাওয়া খাওয়া বিদ্যার হাতে খড়ী; প্রস্তুত হও।”

    কি আমি শুনলেম, কি আমি বুঝলেম, হঠাৎ যেন একটা সংশয়ের অন্ধকারমূর্তি আমার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। হাওয়া খাওয়া বিদ্যার হাতেখড়ী! ডাক্তারদের মুখের দিকে চেয়ে আমি নীরব হয়ে থাকলেম। ডাক্তারেরা উভয়েই দুই তিনবার আমারে বোল্লেন, “শুভক্ষণ, শুভক্ষণ প্রস্তুত হও, প্রস্তুত হও।” আর আমি অপ্রস্তুত থাকতে পাল্লেম না, ডাক্তারবাবুর অনুরোধ রক্ষা কোত্তে বাধ্য হোলেম। প্রস্তুত হওয়া কি রকম, তা আমি ভাবলেম না, অবসর চাইলেম না, কাপড়ও ছাড়লেম না, যে কাপড়খানি তখন আমার পরা ছিল, সেই কাপড়েই বাবুদের সঙ্গে আমি হাওয়া খেতে বেরুলেম, রাজাবাহাদুরের অনুমতি লওয়াও আবশ্যক বোধ কোল্লেম না।

    সূৰ্যদেব অস্তাচলে গিয়েছিলেন, অল্প অল্প অন্ধকার হয়ে আসছিল, ঘোর অন্ধকার হয় নাই, সময়টা গোধূলি; গোধূলি লগ্নে যাত্রা; —উপর থেকে আমরা নেমে এলেম। দরজার সম্মুখে দিব্য একখানি গাড়ী, দিব্য দুটি কৃষ্ণবর্ণ অশ্ব। রঘুনাথ ডাক্তার আমার একখানি হাত ধোরে গাড়ীতে তুলে দিলেন, তার পর তাঁরা দুজনে আরোহণ কোল্লেন। গাড়ী উত্তরমুখে চোল্লো। অশ্বেরা টপাটপ শব্দে দ্রুতবেগে ছুটে ছুটে যেতে লাগলো।

    কতদূরে গেলেম, ঠিক বুঝতে পাল্লেম না, অনুমানে বুঝলেম, এক কোশের বেশী। গাড়ীর ভিতর ডাক্তারেরা নানা রকম গল্প জুড়েছিলেন; গল্পের দিকে আমার কাণ ছিল না, মন ছিল না, সারা পথ আমি অন্যমনস্ক।

    সমবেগে আর খানিক দূরে এগিয়ে গিয়ে গাড়ীখানা থামলো, ডাক্তারেরা নামলেন, আমারেও নামালেন। সেই সময় আমি একবার চতুর্দিকে চেয়ে চেয়ে দেখলেম, অন্ধকার। বেশী দূর দেখা গেল না, তথাপি আমি বুঝতে পাল্লেম, পাটনায় এসে অবধি সে পথে আর কখনো আমি আসি নাই। রাস্তার বামদিকে প্রকাণ্ড একখানা বাড়ী; ফটকে প্রকাণ্ড একটা লণ্ঠন জ্বলছিল, পাথরের পুতুলের মত দুইজন দ্বারপাল বড় বড় দুটো বন্দুক ঘাড়ে কোরে দরজার দুই ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা নিষ্পন্দ। পথ দেখিয়ে দেখিয়ে ডাক্তারেরা আমারে সেই বাড়ীর ভিতর নিয়ে গেলেন। অকস্মাৎ দূর দূর কোরে আমার বুক কেঁপে উঠলো! কেন বোলতে পারি না, আমার মনে তখন যেন কোন প্রকার অমঙ্গল আশঙ্কার সঞ্চার হলো! গোধূলিলয়ে যাত্রা; এরূপ যাত্রাতে মঙ্গলফল হয়, এই কথাই লোকে বলে, আমার মন কেন বলে অমঙ্গল, কেমন কোরে জানবো?

    বাড়ীর ভিতর আমরা প্রবেশ কোচ্ছি, ঠাঁই ঠাঁই আলো জ্বোলছে দেখছি, শারি শারি কতই ঘর। যে দিক দিয়ে আমরা যাচ্ছি, সে দিকের দরজা বন্ধ। দুই ধারেই ঘর, মধ্যস্থলে সুঁড়ী পথ। প্রকাণ্ড বাড়ী, কোন দিকে কত ঘর, একদিক দর্শনে সেটা জানা গেল না। যাচ্ছি, এক একবার বামে দক্ষিণে চক্ষু ফিরাচ্ছি, মাঝে মাঝে এক একদিকে সেই রকমের অপ্রশস্ত এক একটা সুঁড়ীপথ দেখতে পাচ্ছি। ডাক্তারেরা আমারে সোজা পথেই নিয়ে চোলেছেন। বাতাসের লেশমাত্র নাই। অনেক দূর গিয়ে দক্ষিণধারে দেখলেম, একটা ঘরের দরজা খোলা। ঘরে আলো ছিল; দেখলাম ঘরটা দিব্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আমারে অগ্রবর্তী কোরে ডাক্তারেরা সেই ঘরে প্রবেশ কোল্লেন। ঘরের একধারে একটি পরিষ্কার বিছানা, আর কোন আসবাবপত্র ছিল না। কেবল একদিকে দুটি বড় বড় মাটির কলসী, মুখে দুখানা কাচের বাসন ঢাকা; বোধ হলো, জলের কলসী। বিছানার উপর আমারে বোসতে বোলে নীলাম্বরবাবু আমার নিকটেই বোসলেন, রঘুনাথবাবু বেরিয়ে গেলেন।

    ঘরটি পরিষ্কার বটে, কিন্তু কেমন একটা দুর্গন্ধ আমার নাসারন্ধ্রে প্রবেশ কোত্তে লাগলো। ঘরেই গন্ধ অথবা বাহিরের দুর্গন্ধ এসে ঘরটিকে দুর্গন্ধময় কোচ্ছিল, সেটা আমি অনুভব কোত্তে পাল্লেম না। কিয়ৎক্ষণ নীরবে বোসে থেকে, মৃদুস্বরে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, এ আমি কোথায় এলেম? আমারে কোথায় নিয়ে এলেন?” মাথা নেড়ে নেড়ে নীলাম্বরবাবু একটু হাসলেন; আমার কথার কোন উত্তর দিলেন না। হাওয়া খাবার প্রস্তাব যখন হয়, তখন আমার মনে একটা সংশয় এসেছিল, সেই সংশয় এখন প্রবল হয়ে উঠলো। অমঙ্গল আশঙ্কাই বড় বেশী। বাম অঙ্গের ঘন ঘন স্পন্দন। কি যে সেই আশঙ্কা, কেন যে সেই আশঙ্কা, তার মূল কারণ তখন আমি কিছু স্থির কোত্তে পাল্লেম না; সন্দেহই প্রবল।

    রঘুনাথবাবু পুনঃপ্রবেশ কোল্লেন; সঙ্গে একটি লোক। কৃষ্ণযাত্রার আসরে বাসুদেবের যেমন সজ্জা, সেই লোকটির সজ্জাও সেইরূপে। লোকটি দীর্ঘাকার, কৃষ্ণবর্ণ, একহারা, মুখখানা কিছু গোল, চক্ষু ছোট, নাসিকা খর্ব, ঠোঁট পুরু, চোমরা গোঁফ, মাথার ঝাঁকড়া চুল, একখানা হাত একটু ছোট, সে হাতের অঙ্গুলি খুব মোটা মোটা, গণনায় একটি কম, বয়স অনুমান চল্লিশ বৎসর। অঙ্গুলিনির্দেশে আমারে দেখিয়ে দিয়ে ডাক্তার রঘুনাথ সেই লোকটিকে বোল্লেন, “দেখ অনাদি! এই বালকটি কিছুদিন এই বাড়ীতে থাকবে, যেন কোন অযত্ন না হয়; আহারে, শয়নে, ভ্রমণে বালক যেন কোন প্রকার কষ্ট না পায়। তোমার হস্তে এটিকে আমরা সমর্পণ কোল্লেম, আমাদের উপদেশমত কাজ কোল্লে তুমি প্রচুর পুরস্কার পাবে। বড়লোকের ছেলে, এখানে থেকে এ ছেলে যদি আরাম হয়, —বুঝলে অনাদি, —এখানে থেকে এ ছেলে যদি আরাম হয়, আরাম হবেই নিশ্চয়, —যদি বেশ আরাম হয়, তা হোলে তোমাকে আর এখানে চাকরী কোত্তে হবে না। সে কথাই বা কেন, একেবারেই হয় তো চাকরী কোত্তে হবে না; বাড়ী পাবে, পুকুর পাবে, আম-কাঁঠালের বাগান পাবে, দিব্য সুন্দরী একটি বৈষ্ণবীকে বিয়ে কোত্তে পারবে। সেবা-যত্নে এ ছোকরাকে খুসী রাখতে পাল্লে দু-একখানি কোম্পানীর কাগজও পাবে, কোন কষ্টই থাকবে না;— বুঝলে কি না?”

    রঘুনাথের সঙ্গে যে লোকের নবপ্রবেশ, সে লোকটার নাম অনাদি। ঘন ঘন চক্ষের পলক ফেলে। অনাদিকে ঐরূপ উপদেশ দিয়ে, আশ্বাস দিয়ে, আমার দিকে চেয়ে রঘুনাথ বোল্লেন “দেখ ছোক— ঐ দেখ! আবার ভুলে গিয়েছি! কতবার মনে করি, ইষ্টমন্ত্রের মত জপ করি, তবু মনে থাকে না! —ইষ্টমন্ত্র! —হাঁ হাঁ— দেখ হরিদাস! এইখানেই তোমার চিকিৎসা হবে; এই অনাদি ঠাকুরটি অহরহ তোমার সেবায় নিযুক্ত থাকবে। অনাদি ঠাকুর বেশ লোক, তোমাদের মত ছেলেদের আদর-যত্ন কোত্তে অনাদি যেমন জানে, এমন তার এ বাড়ীর একটা লোকও না। অনাদিঠাকুর ব্রাহ্মণ বুঝতে পেরেছ আমার কথাটা? —জাতিতে এই অনাদিঠাকুর একটি ব্রাহ্মণ; ব্রাহ্মণের যত প্রকার কর্তব্য কাৰ্য আছে, অনাদিঠাকুর সব জানে। তুমি বেশ থাকবে, এইখানেই তুমি থাকো, স্বচ্ছন্দে থাকো, বেপরোয়া থাকো; আমরা মাঝে মাঝে এসে দেখে যাব, নূতন ব্যবস্থা কোরে যাব, কোন ভয় নাই।”

    আমার চক্ষে জল এলো, অন্তরে অন্তরে আমি কাঁপছিলেম, এই সময় বাহ্য অবয়বে বিলক্ষণ কম্প! কাঁপতে কাঁপতে নীলাম্বরবাবুর দিকে আমি চাইলেম। হা অদৃষ্টে! নীলাম্বরবাবুও রঘুনাথের কথায় সায় দিলেন। হায় হায়! আর আমি কার মুখ চাই? এ দুটো লোক কে? সত্যই কি ডাক্তার? উঃ! ডাক্তার সেজে এ দুটো লোক আমারে এই বাড়ীতে কয়েদ কোরে রেখে যাচ্ছে! এটা কিসের বাড়ী? কাদের বাড়ী? জনমানবের সঞ্চার নাই, এত বড় বাড়ীতে কেবল এই একটা অনাদি দেখলেম, আর কোন লোকের সাড়া-শব্দ পাওয়া গেল না, মূর্তিও দেখা গেল না। কি ব্যাপার! না না, অবশ্যই লোক আছে। লোক না থাকলে ফটকে পাহারা থাকবে কেন? এতগুলো আলো জ্বোলবে কেন? অবশ্যই লোক আছে। কি রকম লোক তারা?

    কত যে আমি ভাবলাম, কিছুই এখন মনে নাই; সত্য সত্যই আমি কেঁদে ফেল্লেম! বিস্তর মিনতি কোরে নীলাম্বরবাবুকে বোল্লেম, “কেন আপনারা আমারে এই বিজন বাড়ীতে ফেলে যাচ্ছেন? আমি আপনাদের কাছে কি অপরাধ কোরেছি? হাওয়া খেলে শরীর সুস্থ হবে; আপনাদের সঙ্গে আমি হাওয়া খেতে এলেম, আপনারা আমারে ভাল হাওয়া খাওয়ালেন! হাওয়া খাওয়ার সাধ আমার মিটেছে, আর হাওয়া খাব না, দোহাই আপনার, দয়া কোরে আমারে এখান থেকে নিয়ে চলুন! আমার যেন মনে হোচ্ছে, উপর থেকে কে যেন আমারে বোলে দিচ্ছে, এটা রাক্ষসের পুরী; এ পুরীতে কিছুতেই আমি থাকতে পারবো না! দু-দিন থাকলেই হয় তো আমার প্রাণ যাবে! পায়ে ধরি, আপনি আমারে সঙ্গে কোরে নিয়ে চলুন!”

    মৃদুহাস্য কোরে নীলাম্বরবাবু বোল্লেন, “ভয় কর কেন? এখানে তোমার কোন ভয় নাই, এইখানেই তোমার চিকিৎসা হবে। রাজবাড়ীতে বেশী লোকের গোলমাল সেখানে তুমি শীঘ্র শীঘ্র আরাম হোতে পারবে না, এখানে থাকলে শীঘ্রই আরাম হবে, রঘুনাথবাবু যে যে কথা বোল্লেন, সমস্তই সত্যকথা; এখানে তোমার সেবাযত্ন বেশ হবে, ছেলেমানুষী কোরো না, পাগলের মত বোকো না, শান্ত হয়ে থাকো, কেঁদো না, চুপ কর, কাল আবার আমি আসবো।”

    এই সব কথা বোলে ব্যস্তভাবে নীলাম্বরবাবু উঠে দাঁড়ালেন, রঘুনাথ দাঁড়িয়েই ছিলেন, দুজনে একসঙ্গে বেরিয়ে যেতে লাগলেন। “যাবেন না, যাবেন না, যাবেন না! আমারে এখানে একা ফেলে রেখে আপনারা চোলে যাবেন না! দোহাই আপনাদের আমি আপনাদের সঙ্গে যাব, কখনই আমি এখানে থাকবো না! এ জীবনে কষ্ট আমি অনেক ভুগেছি, আবার এই নূতন কষ্টের মুখে আমারে নিক্ষেপ কোরে আপনারা যাবেন না, যাবেন না, যাবেন না!” কাঁদতে কাঁদতে এই সব কথা বোলতে বোলতে ঘরের চৌকাঠের ধার পর্যন্ত আমি ছুটে গেলেম; চৌকাঠ পার হয়ে তাঁরা তখন বাইরে গিয়েছিলেন। অনাদিটা ঘরের মধ্যেই ছিল, দাঁত-মুখ খিচিয়ে দু-হাত দিয়ে সে আমারে জাপটে ধোল্লে! লোকটা রোগা বটে, কিন্তু জোর খুব; ধস্তাধস্তি কোরেও আমি তার হাত ছাড়াতে পাল্লেম না। বাহির থেকে মুখ ফিরিয়ে নীলাম্বরবাবু বোল্লেন, “ঐ কথাই তো কথা, ঐ তো তোমার রোগ; অনেক কষ্ট ভুগেছ, এখানে থাকতে পারবে না, লোকের কথা শুনবে না, ঐ তো তোমার রোগ। সেই জন্যই তো তোমাকে এখানে আনা হয়েছে। ও রকম যদি কর, এ জন্মে তোমার ও রোগ সারবে না। থাকো, গোলমাল কোরো না। অনাদির সঙ্গে লড়ালড়ি কোরো না, আমরা চোল্লেম!”

    ডাক্তারেরা চোলে গেলেন, অনাদি আমারে আটকে রাখলে। ঝাড়া এক ঘণ্টাকাল আমি চীৎকার কোরে কাঁদলেম, ধমক দিয়ে দিয়ে অনাদি আমারে বশে আনবার চেষ্টা কোল্লে, কিছুতেই আমি শান্ত হোতে পাল্লেম না। খানিক পরে সেই ঘরে একটা স্ত্রীলোক এলো তার হাতে একটা চাবীর তাড়া। হেসে হেসে চাবীওয়ালা মুখ-চক্ষু ঘুরিয়ে অনাদিকে বোল্লে, “এই যে গো! এই যে তুমি দিব্য একটি নূতন শীকার পেয়েছ! বেশ হয়েছে; সদরদরজায় চাবী পোড়েছে, দরোয়ান এসে আমার হাতে এই চাবীর তাড়াটা দিয়ে গেল। ছেড়ে দাও, শীকারটিকে অমন কোরে ধোরে রেখেছ কেন? ছেড়ে দাও! আর পালাবার উপায় নাই।”

    মানুষের গন্ধ পেয়ে যে সকল বিষধর সর্প ফণা তুলে গর্জন করে, ওঝাদের কাছে সেই সকল সৰ্প যেন কেঁচো হয়। এখানেও আমি সেই রকম দেখলেম। অনাদিঠাকুর এতক্ষণ আমার উপর তর্জন-গর্জন কোচ্ছিল, সেই স্ত্রীলোকের দুটি একটি কথা শুনে একেবারে ঠাণ্ডা; আমারে ছেড়ে দিয়ে কতই যেন ভাল-মানুষ হয়ে, সেই স্ত্রীলোকের সঙ্গে রহস্যালাপ আরম্ভ কোল্লে। আমি সেই অবসরে ধীরে ধীরে পাশ কাটিয়ে বিছানার উপরে গিয়ে বোসলেম। হৃদয় অত্যন্ত ভারী, মনে যেন কিছুই নাই, কিছুই যেন চিন্তা কোত্তে পাচ্ছি না, সম্মুখে আলো আছে, তবুও যেন আমি চারিদিকে অন্ধকার দেখছি, তখন আমার এই রকম অবস্থা। ভাগ্যক্রমে আপনা আপনি আমি এক একটা প্রবোধ প্রাপ্ত হই; যতই কেন মহাবিপদ উপস্থিত হোক না, তাদৃশ বিপদে আমি বড় একটা অবসন্ন হই না। বাল্যাবধি পরমেশ্বরে আমার অচল বিশ্বাস; যা যখন হবার হয়, নিশ্চয়ই তা তখন হয়, যা হবার নয়, তা কখন হয় না, সংসারে মানুষের ভাগ্যে যা যখন ঘটে, সমস্তই সেই ইচ্ছাময়ের ইচ্ছা, এইরূপে আমার ধারণা; সেই ধারণাই আমার প্রবোধ। সংসারচক্রের এক এক আবর্তনে আমি এক এক প্রকার অবস্থা প্রাপ্ত হোচ্ছি; পাটনায় এই এক নূতন অবস্থা! এ অবস্থা আমার চিরদিন থাকবে না, দয়াময় অবশ্যই একদিন আমার প্রতি সদয় হবেন, সেই বিশ্বাসে, সেই আশ্বাসে আপন মনে আমি এক প্রকার সান্ত্বনা পেলেম। গৃহমধ্যে অনাদি আর সেই চাবীওয়ালী। অলক্ষিতে সেই যুগলমূর্তির দিকে কটাক্ষপাত কোরে আমি তাদের রহস্যালাপ শ্রবণ কোত্তে লাগলেম।

    অনাদি বোল্লে, “তুই ভাই আজ আমাকে যে হাসান হাসিয়েছিস জন্মেও আমি তেমন হাসি হাসি নাই; লোকেরা যখন চুপচাপ কোরে থাকে, তোর হাসিটা তখন খুব বাড়ে; তাই চিত্তোরি। তুই আমার প্রাণের সহচরী। তুই হাসিস, তুই হাসাস, তাতেই আমি বেঁচে থাকি। তোর হাসি যেন বরফের মত ঠাণ্ডা; হাটের কলরবের আগুনে আমার প্রাণ যখন জ্বোলে পুড়ে যায়, সেই সময় তুই হাসির ফোয়ারা খুলে দিস, জ্বালা-যন্ত্রণা সব আমি ভুলে যাই, হৃদয় জুড়িয়ে যায়; শুভক্ষণে বিধাতা তোর সঙ্গে আমার— বুঝলি চিতোরি,— তোর সঙ্গে আমার মিলন কোরে দিয়েছেন, জন্মেও আর ছাড়াছাড়ি হবে না। তুই বুঝলি? তুই আমার মাথার চুল, মুখের গোঁফ, চক্ষের তারা, বুকের মাংস, গায়ের লোম, তুই আমার সব। সেই একদিন তারা যখন—”

    এই পর্যন্ত বোলতে বোলতে অনাদিঠাকুর হঠাৎ থেমে গেল। যতগুলি কথা তার মুখে উচ্চারিত হলো, তার প্রকৃত তাৎপৰ্য আমি হৃদয়ঙ্গম কোত্তে পাল্লেম না; অনেক কথার অর্থ নাই; বুঝলেম, কেবল তাদের দুজনের প্রেমসম্বন্ধ। স্ত্রীলোকটির নামও পাওয়া গেল, নামটা খুব নূতন বটে; নতুন পুরাতন বিচার করা অনাবশ্যক, নামটি কিন্তু পাওয়া গেল; নাম হোচ্ছে চিতোরী। আমার দিকে চেয়ে, পুনরায় চিতোরীকে সম্বোধন কোরে অনাদিঠাকুর বোল্লে, “দেখ চিতোরী! সেই একদিন তারা যখন সেই রকম বাড়াবাড়ি কোচ্ছিল না, থাক সে কথা—” আবার এইখানে থেমে, আবার আমার দিকে চেয়ে একটু একটু চুপি চুপি বোলতে লাগলো, এই নূতন ছোকরাটা দেখছি অকালপক্ক; ভূতে পেয়েছে; সেই যে দুটি বাবু এসেছিল, ছোকরাকে তারা আমার হাতেই সোঁপে দিয়ে গেল, সেবা কোত্তে বোলে গেল; হো হো হো! কিন্তু ভাই চিতোরী! সেবা যদি তুই কোত্তে পারিস, খুব বড় একটা দাঁও মারা যাবে। দেখিস কিন্তু, কোন রকমে যেন না পালায়! সব সময় আমি—”

    এই সময় কে যেন কারে খুব চীৎকার কোরে ডাকলে। কাণ খাড়া কোরে শুনে, তাড়াতাড়ি চোলতে চোলতে অনাদিঠাকুর তাড়াতাড়ি বোলে গেল, “থাক তুই এইখানে, যেমন যেমন বন্দোবস্ত কোত্তে হয়, করিস; সব তুই জানিস, আমি যাই; আবার কে কোথায় কি হাঙ্গামা বাধিয়েছে, থামাই গিয়ে; ভাল ঝকমারীতেই পোড়েছি! রাত্রেও দু-দণ্ড স্থির হবার যো নাই।”

    অনাদিঠাকুর কোথাকার হাঙ্গামা থামাতে গেল, চিতোরী এসে আমার বিছানার উপর বোসলো; গা ঘেঁষে বোসলো না, হাতখানেক তফাতে। যে সুরে চিতোরী প্রথমে অনাদির সঙ্গে কথা কোয়েছিল সে সুরটা বদল কোরে আর এক রকম নূতন সুরে কি গোটা কতক কথা আমারে বোল্লে, আমার মন তখন অন্যদিকে ছিল, অর্থ বুঝলেম না, উত্তর দিতেও পাল্লেম না; চিতোরী আমার মুখপানে চেয়ে রইলো। আমি তখন আর একখানা ভাবছিলেম; অনাদিঠাকুর হাঙ্গামা থামাতে গেল, কিসের হাঙ্গামা? এ বাড়ীতে কি হাঙ্গামা হয়? কি রকম জায়গা? যে একটা চীৎকার শুনলেম, সেটাও কেমন বিকট। অনাদি ইতিপূর্বে একবার বোলেছিল, “হাটের কলরব”, এখানে কি হাট আছে? রাত্রেই কি হাট বসে? একটা লোকের চীৎকারেই কি হাট হয়? বোধ হয়, সে রকম হাট না হবে। কেন না, অনাদি বোলেছিল, “হাটের কলরবের আগুন”, সে আগুন আবার কি প্রকার? ভাল হাওয়া খেতে বেরিয়েছিলেম, হাওয়ার বদলে আগুনের ভিতরে এসে পোড়েছি; সত্যই আগুন! শরীর যেন সেই আগুনে দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে!

    এই সব আমার মনের কথা। মনের কথা মনে মনে, মুখে কিছুই ফুটলো না। মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চিতোরী সেই সময়ে আবার বোল্লে, “কথা কও না কেন? বোবা না কি? অত কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেম, খাতির নাই, কোথাকার ছোকরা? এটা বুঝি তোমার শ্বশুরবাড়ী? কথা কোইতে বুঝি লজ্জা হয়? পাঠশাল কখনো দেখেছো? পাঠশালে বজ্জাতী কোল্লে ঘোড়া বেত পিঠে পড়ে, নাড়ুগোপাল হোতে হয়, জানো সে সব শাস্তি? এটাও একটা পাঠশালা; এখানেও সেই রকম শাস্তি আছে, এখানেও সেই রকম হবে; কথা শোনো, কথা কও, রাত্রি অনেক, খাবে কি? পেট তোমার কি চায়? পেট তোমার সঙ্গে আছে, না আর কোথাও রেখে এসেছো? কথা কও, উত্তর কর, বল, রাত্রে তুমি খাবে কি?”

    অনাদি চোলে যাবার পর চিতোরী প্রথমে আমারে যে সব কথা বোলেছিল, সে সব কোন ভাষার কথা, আমি বুঝি নাই, চিতোরী নামটা যেমন আমার কর্ণে নূতন, চিতোরীর ভাষাও সেই রকমের নূতন বোধ হয়েছিল। চিতোরী কি? রাজপুতানার চিতোর রাজ্যের মেয়েমানুষেরা কি চিতোরী নামে পরিচিতা হয়? এ চিতোরীর বাড়ী কি তবে চিতোরে?—তাই যেন বোধ হয়।

    চিতোরীর প্রথমবারের কথাগুলোও বোধ হয় চিতোরী ভাষা; এবারের কথাগুলো হিন্দী বাঙ্গলা মিশানো? জিহ্বার একটু একটু আড়ষ্ট আছে, এইমাত্র তফাৎ।

    কথাগুলো রুক্ষ রুক্ষ; চিতোরী কিন্তু দেখতে দিব্য সুশ্রী। তাদৃশী সুশ্ৰী রমণীর এ প্রকার কর্কশ কথা, এটাও আমার আশ্চৰ্য বোধ হলো। সুস্থিরনয়নে চিতোরীর অস্থিরনয়ন দর্শন কোরে আমি তার পূর্ব-প্রশ্নের উত্তর কোল্লেম, “রাত্রে আমি কিছুই খাব না, কিছুমাত্র ক্ষুধা নাই; তোমার যদি অন্য কাৰ্য থাকে, স্বচ্ছন্দে চোলে যাও, আমারে একটু বিশ্রাম কোত্তে দাও; আমার শরীর অসুস্থ, মন অসুস্থ, আমি অতিশয় পরিশ্রান্ত, অত্যন্ত ক্লান্ত, কিছুই আমি খাব না।”

    চক্ষু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মুচকে মুচকে হেসে, একখানা হাত নেড়ে চিতোরী বোল্লে “তা হবে না যাদুধন! খেতেই হবে, এখানকার নিয়ম সে রকম নয়; মানুষকে আরাম করবার জন্য এখানে আনা হয়। তুমি তো তুমি, তোমার মত কত ছোকরা, কত ছুকরী, কত পুরুষমানুষ, কত মেয়েমানুষ এখানে বাস করে, সকলকেই দুবেলা পেট ভোরে খেতে হয়। সহজে না খেলে, জোর কোরে খাওয়ানো হয়, আমি তোমাকে ভাল ছেলে দেখছি। সেই জন্যই ভালকথা বোলছি, ভালমুখে জিজ্ঞাসা কোচ্ছি, কি খেতে ইচ্ছা হয়; কি খাবে বল, আমি এনে দিব, না যদি বল, অনাদিঠাকুরের যে রকম ইচ্ছা হবে, সেই রকম জিনিস তোমাকে খেতে হবে— খেতেই হবে।”

    বড় দায়েই আমি ঠেকলেম। ক্ষুধা না থাকলেও খেতে হবে, না খেলে এরা জোর কোরে খাওয়াবে, কথা না শুনলে বেত লাগাবে, চিতোরী এই রকম ভয় দেখালে। চিতোরী মেয়েমানুষ, চিতোরীর মুখে যখন ঐ রকম কথা, তখন না জানি, অনাদিঠাকুর আরো কত উগ্রমূর্তি ধারণ কোরবে। সেটা ভাল নয়। মনে মনে এই রকম আলোচনা কোরে চিতোরীকে আমি বোল্লেম “একান্তই তোমরা যদি না ছাড়, এখানে যদি দুষ্প্রাপ্য না হয়, তবে আমারে কিঞ্চিৎ দুধ আর একপাত্র জল দিও, তাই দিলেই ঠিক হবে, তাই খেয়েই আমি শুয়ে থাকবো। চিতোরী উঠলো না; একটু পরে অনাদি এলো; আমার মুখের কথাগুলি চিতোরীর মুখে অনাদি শ্রবণ কোল্লে। ব্যবস্থা মঞ্জুর। অল্পক্ষণ পরে দুধ-জল পান কোরে আমি শয়ন কোল্লেম। কি বোলবো? —প্রকৃতই হোক কিম্বা কল্পিতই হোক, রহস্যালাপের ভাবে আমি বুঝলেম, এরা স্ত্রী-পুরুষ,—দম্পতী; ঘরের দরজায় চাবী দিয়ে অনাদিদম্পতি নিজস্থানে চোলে গেল।

    সে সময় যদি আমার নিদ্রা আসতো, তবে এক প্রকার ভালই হোতো; তা হলো না; তেমন অবস্থায় শীঘ্র নিদ্রা হয়ও না। পাটনায় আসা অবধি এই দিনের হাওয়া খাওয়ার ব্যবস্থা পর্যন্ত আলোচনা কোত্তে কোত্তে প্রায় এক ঘণ্টা পরে নিদ্রা এলো, আমি ঘুমালেম। শেষরাত্রে কিম্বা ঊষাকালে বহুকণ্ঠমিশ্রিত একটা ভয়ঙ্কর কলরব শুনে আমি জেগে উঠলেম। বিভীষণ চীৎকার! চীৎকারধ্বনিতে অত বড় বাড়ীখানা যেন ভূমিকম্পনের মত কেঁপে উঠলো! কত দূর পর্যন্ত সেই চীৎকারধ্বনির প্রতিধ্বনি হোতে লাগলো। অনাদির একটা কথা সার্থক বোধ হলো, হাটের কলরব;— সত্যই যেন হাটের কলরব! অনুমান কোল্লেম, সত্যই এখানে হাট আছে।

    পুনরায় সেই প্রকার কলরব! বোধ হলো যেন গগনভেদী চীৎকারধ্বনি! রুদ্ধদ্বার শিবমন্দিরমধ্যে চীৎকার কোল্লে যেমন গম্ভীর আওয়াজ হয়, মধ্যে মধ্যে সেইরূপ ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর আওয়াজ আমার শ্রবণকুহরে প্রবেশ কোত্তে লাগলো। রাত্রি দুই প্রহরের পর আমার নিদ্রা হয়েছিল, ঊষাকালে ভীম চীৎকারে জাগরণ। যতক্ষণ আমি ঘুমিয়েছিলেম, ততক্ষণের মধ্যে সে প্রকার চীৎকার হয়েছিল কি না, বোলতে পারি না; জাগরণ কোরে অবধি দুই তিনবার সেইরূপে হৃদয়কম্পন, গৃহ কম্পন, ভীষণ চীৎকারধ্বনি আমি শুনলেম! কোথা থেকে সেই সকল চীৎকার আসছে, কারা চীৎকার কোচ্ছে, ঠিক নির্ণয় কোত্তে পাল্লেম না; অনুমানে বোধ হলো, বাড়ীর মধ্যেই চীৎকার; শত শত লোকের চীৎকার! দেশে বিদেশে, অনেক স্থানে আমি ভ্রমণ কোরেছি, চীৎকারও অনেক প্রকার শুনেছি, কিন্তু এমন চীৎকার কখনো আমার কর্ণে প্রবেশ করে নাই। একবার মনে হয় মানুষে, একবার মনে হয় জানোয়ার। কত লোক এ বাড়ীতে থাকে, কত লোক আছে, কেন আছে, তারা এখানে কি করে, কেন তারা ঐ রকম রণরঙ্গ-উত্তেজন সিংহনাদ করে, তাও আমি বুঝলেম না। যে ঘরে আমি ছিলেম, এই সময় সেই ঘরের দ্বার উদ্ঘাটিত হয়ে গেল।

    প্রবেশ কোলে অনাদি, চিতোরী আর একজন দীর্ঘাকার লোক। নূতন লোকের পরিধান খুব চোস্ত চুড়ীদার পায়জামা, ফরাসীছিটের চিত্র-বিচিত্র বুকবন্ধ চাপকান, মাথায় একটা সবুজবর্ণের বাধা পাগড়ী, হাতে একগাছা মনুষ্যপ্রমাণ প্রকাণ্ড যষ্টি। লোকটার মুখ দেখলে ভয় হয়। মুখখানা চৌগোঁফফা; বড় বড় রক্তবর্ণ দুই চক্ষু।

    তখন প্রভাত। কিছু পূর্বেই আমি জেগেছিলেম, চীৎকার শুনে ভয় পেয়েছিলেম, নিশ্চয়ই আমার চক্ষে আতঙ্কলক্ষণ ছিল, নূতন লোকটা আমার আপাদমস্তক রক্তচক্ষে নিরীক্ষণ কোল্লে; অনাদির দিকে চেয়ে, গভীরগৰ্জনে বোল্লে, “ঠিক বটে! কিন্তু ঠাণ্ডা আছে। চক্ষু দেখে বোধ হয়, রক্ত খুব গরম! তোমরা এই বালককে ঠাণ্ডা জিনিষ খেতে দিও, পাঁচ সাতটা ডাব নারিকেল পুকুরের পাঁকের ভিতর পুতে রেখে, সাত আট ঘণ্টা পরে তুলে সেই সকল ডাবের জল ঘণ্টায় ঘণ্টায় খাইয়ে দিও, আট দশ কলসী ঠাণ্ডা জলে স্নান করিও, আহারের ব্যবস্থা খাতাপত্রে যেরূপ লেখা আছে, সেইরূপে চোলবে। খবরদার! নূতন নূতন এ ছোকরাকে ঘরের বাহিরে নিয়ে যেয়ো না; সকলের পক্ষে যে রকম ব্যবস্থা। এ ছোকরার পক্ষে সে রকম ব্যবস্থা হবে না, ডাক্তারমহাশয়েরা সেই কথা বোলে গিয়েছেন; সে রকম ব্যবস্থা হবে না কিম্বা এ ছোকরার পক্ষে খাটবে না, সেটা আমি বুঝি নাই, ডাক্তারদুটিকে সে কথা আমি জিজ্ঞাসাও করি নাই। ছেলেটির বয়স কম, চেহারাও ভাল, কিন্তু রক্ত খারাপ। এখন বাহিরে বেড়াবার সময় নয়, যখন সময় হবে, সময় যখন আমি ঠিক বুঝবো, তখন ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে উচিতমত বন্দোবস্ত করা যাবে।”

    ব্যবস্থা বন্দোবস্তের এইরূপ উপদেশ দিয়ে, যষ্টিধারী নূতন লোক পুনর্বার আমার দিকে চাইতে চাইতে ঘর থেকে বেরুলো; ভাবে আমি বুঝলেম, সে লোকের ক্ষমতা কিছু অধিক; এখানে সেই লোকের প্রভুত্ব চলে, হুকুম চলে, বাসিন্দালোকের আহারাদির ব্যবস্থা করার ভারও সেই লোকের উপর।

    লোক চোলে গেল; অনাদি থাকলো, চিতোরীও থাকলো। আমার মাথার উপর খিলানকরা ছাদ, সেই ছাদের উপর গুম গুম কোরে অনেক মানুষের পায়ের শব্দ হোতে লাগলো। মানুষেরা যেন লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটাছুটি কোচ্ছে কিম্বা আহ্লাদে উন্মত্ত হয়ে নৃত্য কোচ্ছে, সেইরূপ শব্দ। ভয় আছে, সন্দেহ আছে, বিস্ময় আছে, সেই তিন ভাবের মধ্যবর্তী হয়ে অন্যদিকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “ও সকল কিসের শব্দ! আমার মাথার উপর মানুষেরা ও সব কি কোচ্ছে? একটু আগে দুই তিনবার আমি ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর চীৎকার শব্দ শুনেছি, একসঙ্গে বহু লোকের চীৎকার। কারা এখানে তেমন কোরে চীৎকার করে? কেন করে? বাড়ীতে কারা থাকে? বাড়ীখানা কার? এ বাড়ীতে কি হয়?”

    “কিসের চীৎকার, তাও বুঝি তোমাকে বোলতে হবে? কিছু‍ই বোলতে হবে না; থাকো কিছুদিন এখানে, থাকতে থাকতে সমস্তই জানতে পারবে; থাকতে থাকতে তোমাকেও এই রকম কোত্তে হবে। জায়গাটা বড় মজার জায়গা। দুনিয়ার মজা দেখতে যাদের সাধ হয়, তারাই এই বাড়ীতে আসে। দেখে যায়, শিখে যায়, ঐ রকম নেচে কুঁদে আমোদ করে যায়, শেষকালে আরাম হয়ে, দূরস্ত হয়ে ঘরে চোলে যায়।” —আমার বিস্ময়সূচক প্রশ্নে কৌতুকে উপরপড়া হয়ে চিতোরী এই সকল কথা বোলে উঠলো।

    কি উৎপাত! জিজ্ঞাসা কোল্লেম অনাদিকে, ব্যঙ্গ কোরে উত্তর কোল্লে, চিতোরী। উত্তরের কোন কথার মর্ম আমি বুঝে উঠতে পাল্লেম না; রাত্রে চিতোরীকে এক রকম দেখেছিলেম, এখন দেখলেম আর এক রকম। চিতোরী আমার সঙ্গে ঐ রকম পরিহাস কোত্তে লাগলো, অনাদিঠাকুর মুখে টিপে টিপে হাসতে আরম্ভ কোল্লে। আমি বিরক্ত হোলেম; আর কোন কথা আমি তখন জিজ্ঞাসা কোল্লেম না, মাথা হেঁট কোরে মৌনভাবে বোসে থাকলেম।

    রৌদ্রের তেজ বৃদ্ধি হবার অগ্রেই সেখানকার লোকেরা আমারে বাসী জলে স্নান করিয়ে দিলে, তত শীঘ্র পাঁকে পোতা হলো না, বড় বড় দুটো তাজা ডাবের শীতল জল আমারে খাইয়ে দিলে, উদর যেন পরিপূর্ণ হয়ে গেল। ভোরে একটু ক্ষুধাবোধ হয়েছিল, এখন আর কিছুমাত্র ক্ষুধা থাকলো না। অনাদিঠাকুর ঘণ্টাখানেক পরে আমার আহারসামগ্রী এনে হাজির কোল্লে; আমি বোল্লেম, “খাব না”, অনাদিঠাকুর সে কথা শুনলে না, কাজে কাজে যৎকিঞ্চিৎ মুখে দিয়ে বড় বড় ঢেঁকুর তুলে আমি আচমন কোল্লেম। আমার আচমন করা দেখে অনাদি চিতোরী উভয়েই যেন একটু চোমকে গেল। অনাদি চাইলে চিতোরীর মুখের দিকে, চিতোরী চাইলে অনাদির মুখের দিকে; শেষকালে দুইজনই চাইলে আমার মুখের দিকে। আমি ভ্রূক্ষেপ কোল্লেম না।

    এই রকমে আট দিন। এক ভাব। প্রথম রজনী প্রভাতে যেমন চীৎকার আমি শুনেছিলেন, যে রকম শব্দ পেয়েছিলেম, অবিচ্ছেদে ঐ আট দিন ঠিক সেই রকম শুনলাম। বোলতে হয় সেই রকম। বোল্লেমও সেই রকম; বাস্তবিক দিন দিন বরং উচ্চমাত্রার শ্রীবৃদ্ধি! একদিন জিজ্ঞাসা কোরে চিতোরীর মুখে পরিহাস শুনেছিলেম, অনাদিকে নিস্তব্ধ দেখেছিলেম, তদবধি আর কোনদিন আমি সে সকল উপসর্গের কারণ জিজ্ঞাসা করি নাই;— জিজ্ঞাসা করি নাই বটে, কিন্তু মনে মনে ভয়বিস্ময়ের অবিচ্ছেদ ক্রীড়া। সে সকল ক্রীড়া কেবল আমিই অনুভব কোল্লেম।

    অষ্টম রজনীতে বিশ্রামের জন্য যখন আমি শয়ন কোল্লেম, গৃহদ্বারে যখন চাবী বন্ধ হলো, সেই সময় আমার মনের সঙ্গে আমার প্রাণের কথা। রাজা মোহনলাল ঘোষ বাহাদুর আমারে পাটনায় আনালেন, ফলবাগানে যা কিছু বলবার, তা আমারে বোল্লেন, তার পর তিনবার তিন জন লোক এসে আমারে পরীক্ষা কোরে গেল। পরীক্ষার পর রাজাবাহাদুর একদিন এক সভা কোল্লেন, সভায় আমারে বিলক্ষণ অপ্রস্তুত হোতে হলো। লোকেরা জিজ্ঞাসা কোল্লে আমার কষ্টের কথা, আমিও বার বার বোল্লেম আমার কষ্টের কথা। বার বার কেহ যদি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক কথা কয়, লোকে তারে পাগল মনে করে; রাজসভার লোকেরা আমারে পাগল বিবেচনা কোল্লে। ডাক্তার বোলে যারা পরিচয় দিয়েছিল, তারা আমার চিকিৎসা করবার ব্যবস্থা দিলে। চিকিৎসা! —কিসের চিকিৎসা;— তারা ভাবলে আমি পাগল; যে ঔষধে পাগল ভাল হয়, সেই রকম ঔষধ তারা আমার জন্য ব্যবস্থা কোরবে, এইরূপ আভাষ দিলে। তার পর দুটি ডাক্তার আমার কাছে গিয়ে নূতন রকম আত্মীয়তা জানালে; আমারে সন্ধ্যাকালের হাওয়া খাওয়াবে বোলে ফাঁকি দিয়ে এই বাড়ীতে নিয়ে এলো। আবার এসে দেখে যাবে বোলে, অনাদির হাতে আমারে সোঁপে দিয়ে হাসতে হাসতে তারা প্রস্থান কোল্লে; আর এলো না। নীলাম্বর আর রঘুনাথ।

    কোথায় তারা আমারে রেখে গেল? লক্ষণে যে রকম আমি বুঝতে পাচ্ছি, লাফালাফি, হাঁকাহাঁকির যে রকম ঘটা, তাতে আমার যেন মনে হোচ্ছে, এ বাড়ীতে যারা আছে, তারা সকলেই পাগল! এটা পাগলাগারদ! ধূর্ত ডাক্তারেরা ধূর্ততা কোরে আমারে বাতুলালয়ে রেখে গিয়েছে! আমি পাগল! হায় হায়! লোকের চক্রেই আমি পাগল। ভাঁড়ের গল্পে শুনেছিলেম, “দশচক্রে ভগবান ভূত!” মোহনলালের ডাক্তারেরা পাঁচজন, পঞ্চচক্রে আমিও এক রকম ভূত হয়েছি! সহজ মানুষে যদি পাগল হোতে পারে, তবে ভূত হওয়া বড় আশ্চৰ্য নয়! আমি ভূত।— আমি পাগল!— পাগলা গারদে আমি বন্দী! লোকের কুচক্রে কি যে হোতে পারে না, বিশ্বাসী জ্ঞানবান পণ্ডিতেরাও সে তত্ত্বের মীমাংসা কোত্তে অক্ষম।

    আমি পাগল! মানুষের চক্রান্তেই আমি পাগল! পর্যায়ে পর্যায়ে যে যে স্থানে যতপ্রকার বিপদের মুখে আমি নিক্ষিপ্ত হয়েছি, মানুষের চক্রান্তই সেই সমস্ত বিপদের মূল। আমার সম্বন্ধে একটিও দৈব বিপদ নয়, পূর্ণবিশ্বাসে এ কথা আমি বোলতে পারি। এখন আমি পাগল;— পাটনার পাগলাগারদে বন্দী। অমরকুমারী কি আমার এ অবস্থা জানতে পাচ্ছেন? অমরকুমারী এখন কোথায়!— ঢাকায় কিম্বা মাণিকগঞ্জে কিম্বা মুর্শিদাবাদে? আমি কোথায় আছি, অমরকুমারী কি তা জানেন?

    এই সব কথা ভাবতে ভাবতে আর একটা বড় কথা আমার মনে পোড়লো। ত্রিপুরায় জয়শঙ্করবাবু আমার বন্ধুবান্ধবগণকে চিঠি লেখার সংকল্পের পথে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, পাটনায় এসে সেই বাধা অতিক্রম কোরে, সাতখানি পত্র লিখে ডাকযোগে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আমি প্রেরণ কোরেছি। যাঁর যাঁর নামে শিরোনাম, নিশ্চয়ই তাঁরা যথা সময়ে সেই সকল পত্র প্রাপ্ত হয়েছেন। উত্তরপ্রাপ্তির ঠিকানা আছে, রাজা মোহনলাল ঘোষ বাহাদুরের বাটী,— পাটনা। অমরকুমারী যদি মুর্শিদাবাদে থাকেন, শান্তিরামের মুখে অথবা মণিভূষণের মুখে আমার বর্তমান ঠিকানা তিনি জানতে পেরেছেন — অবশ্য জানতে পেরেছেন; জানতে পেরে এখন তিনি কি মনে কোচ্ছেন? যে “ভাব” তাঁর মনে উদয় হয়েছে, মনে মনে আমিও তা জানতে পাচ্ছি। কেবল জানামাত্র, ফলাংশে নূতন গোলমাল।

    পত্রগুলি যাঁরা পেয়েছেন, তাঁরা অবশ্যই উত্তর লিখে পাঠাবেন। কোথায় পাঠাবেন। রাজা মোহনলালের বাড়ীতে, রাজা মোহনলাল দয়া কোরে সে সকল পত্র আমার কাছে পাঠাবেন, সে আশা নাই;— পত্রগুলি আমি পাব না। পাগলাগারদে আমি কয়েদ আছি, ডাকঘরের লোকেরা এ অদ্ভুত ঠিকানা জানবে না, এখানে এসে আমার সঙ্গে দেখাও কোরবে না, পত্রগুলি আমি পাব না। বন্ধুলোকগুলির শারীরিক মানসিক শুভ সমাচার, অমরকুমারীর শারীরিক মানসিক অবস্থাও আমি জানতে পাব না। তাঁদেরও উদ্বেগবুদ্ধি হবে, আমারও উদ্বেগ দিন দিন বাড়তে থাকবে। দ্বিতীয়বার পত্র-লিখনেরও আর এখন আমার সুবিধা নাই। কতদিন যে এই রকমে যাবে, গণনা কোরে তার সীমাও আমি নিরূপণ কোত্তে পাচ্ছি না।

    বাতুলালয়ে অষ্টম রজনীতে আমার মনোমধ্যে এই সকল ভাবনা সমূদিত। এই সকল ভাবনার সঙ্গে হঠাৎ একটা তর্ক আমার মনে উঠলো। পূর্বে আমি শুনেছিলেম, যে সকল লোককে সরকারী লোকেরা পাগলাগারদে রাখে, সে সকল লোকের চিকিৎসা নতুন প্রকার। গারদের লোকেরা পাগলগুলিকে ধরে, মারে, বাঁধে, যন্ত্রণা দেয়, ভয় দেখায়, ফস্ত খোলে, এক এক জনের সম্মুখে পুতিগন্ধযুক্ত ঘৃণাকর বস্তু রেখে দেয়;— আরো কত কি করে, সব কথা আমি শুনি নাই। এরা আমারে কয়েদ কোরে রেখেছে, একজন পুরুষ আর একজন স্ত্রীলোক নিত্য নিত্য আমার সেবা-শুশ্রূষা কোচ্ছে, একজন একদিন এসে তদারক কোরে গিয়েছে, চিতোরী, মধ্যে মধ্যে ঠাট্টাতামাসার কথা কয়, এই পর্যন্ত; তা ছাড়া কেহই আমার উপর কোন প্রকার দৌরাত্ম্য করে না। কেন করে না, তাও আমি মনে মনে এক রকম অনুমান কোল্লেম। এখন সেটা বলা হবে না; ভাগ্যক্রমে কোন লোকের অনুগ্রহে যখন আমি এই পিশাচপুরী থেকে খালাস পাব, তখন সে অনুমানের কথাটা সকল লোককে জানাবো।

    রাত্রের কার্য নিদ্রা। আমার কার্য চিন্তা। বিশেষতঃ এই গারদঘরে। নানা দুর্ভাবনায়, দু-একটা সু-ভাবনায় সমস্ত রজনী আমি জাগরণ কোল্লেম। রজনী অবসানে। প্রভাতে—ঠিক প্রভাতে না, অথবা অল্পে অন্ধকার থাকতে দরজার চাবী খুলে এক জোড়া নর-নারী গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লে; অনাদি আর চিতোরী। নিত্যনিয়মিত কাজগুলি সমাপ্ত হবার পর তারা দুজনে আমার নিকটে এসে বোসলো। অনাদিঠাকুর সত্য সত্য চিতোরীর স্বামী কি না, জানি না, কিন্তু আমি অনুমান কোরেছি স্বামী; অনুমানমতেই পূর্বে পরিচয় দিয়েছি “দম্পতি।” স্বামীর মুখপানে চেয়ে চিতোরী একটু মুচকে মুচকে হেসে আমার দিকে ফিরে বোল্লে, “হরিদাস।— এই দেখ, আমি তোমার নাম পেয়েছি! — হরিদাস! আজ তোমারে একটা সুসংবাদ দি! — আজ বৈকালে এক জায়গায় তোমার নিমন্ত্রণ হবে; সেখানে তুমি অনেক রকম নূতন নূতন মজা দেখতে পাবে।” এই কটী কথা বোলে, উঠে দাঁড়িয়ে তিনবার করতালি দিয়ে, কতই যেন উল্লাসে চিতোরী আপনা আপনিই বোল্লে, “ভারী মজা! ভারী মজা! ভারী মজা!”

    কতই যেন আহ্লাদে ঐ কথাগুলি বোলে, বেশ আড়খেমটা তালে, চিতোরী সেইখানে হেলে দুলে নৃত্য আরম্ভ কোরে দিলে! অনাদিঠাকুর একটিও কথা বোল্লে না, আমার মুখের দিকে চাইতে চাইতে চঞ্চলভাবে উঠে দাঁড়ালো; উভয়েই একসঙ্গে বেরিয়ে গেল। আর একবার তারা এসেছিল; আমার আহারের আয়োজন কোরে দিয়ে খানিকক্ষণ সেখানে থাকলো, আমি আহার কোল্লেম; প্রাণধারণের জন্য আমার আহার করার অনিচ্ছায় যৎকিঞ্চিৎ খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ কোরে বিছানার ধারে আমি বোসলেম। পুনর্বার পূর্বরূপ করতালি দিয়ে, কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে পূর্বরূপ স্বরেই চিতোরী তিনবার বোল্লে “ভারী মজা! ভারী মজা! ভারী মজা!” কিছুই ভাব বুঝতে না পেরে আমি ভাবতে লাগলেম, না জানি, কি মজাই এরা আমারে দেখাবে!

  • প্রথম কল্প : পাটলীপুত্র

    প্রথম কল্প : পাটলীপুত্র

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    প্রথম কল্প : পাটলীপুত্র

    যত অল্প সময়ে পৌঁছান যেতে পারে, বিশেষ চেষ্টা কোরে আমরা পাটনা-সহরে পৌঁছিলাম। পাটনার প্রাচীন নাম পাটলীপুত্র। এক সময়ে পাটলীপুত্রের সবিশেষ সমৃদ্ধি ছিল। বুদ্ধাধিকার সময়ে এখানে বৌদ্ধধর্মের বিশেষ আলোচনা হতো। পাটনায় উপস্থিত হয়ে অনেক লোকের মুখে আমরা শুনলেম, পূর্বের সে শ্রীসমৃদ্ধি এখন কিছু নাই। গঙ্গা আছেন, পাটনা নামে সেই পাটলীপুত্র বিদ্যমান আছে, ব্যবসায়ী মহাজনমণ্ডলীর কলরব আছে, ভূমির উর্বরতাশক্তির অধিক লাঘব হয় নাই, কিন্তু পূর্বে পূর্বে এই নগরী সন্দর্শন কোরে লোকে যেমন প্রীতি প্রাপ্ত হতো, আজকাল সেই প্রীতিকর দৃশ্য বিলুপ্ত। ঠিকানায় পৌঁছিবার অগ্রে অনেকক্ষণ আমরা নগর দর্শন কোল্লেম। বড় বড় মহাজন, প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ মহাজনী গদী, বিবিধ পণ্যদ্রব্য সেখানে বিস্তর। খাপরেলের ঘর অসংখ্য; দেশপর্যটকেরা সকলেই বলেন, পাটনায় যত খোলার ঘর, এত খোলার ঘর আর কোথাও নাই; দর্শন কোরে আমরাও জানতে পাল্লেম, পর্যটকবর্গের কথাই সত্য, এত খোলার ঘর আর কোথাও নাই।

    যে পল্লীতে মোহনলাল বাবুর কুঠী, অন্বেষণ কোরে সেই পল্লীতে আমরা উপস্থিত হোলেম। পল্লীর মধ্যে অধিক লোকের কুঠী দেখা গেল না। একটি লোককে জিজ্ঞাসা কোরে জানলেম, রাজা মোহনলাল ঘোষ বাহাদুর সম্প্রতি স্থানান্তরে গিয়েছেন, শীঘ্রই ফিরে আসবেন; কুঠীবাড়ীতে লোকজন আছে, সেইখানে গেলেই বিশেষ বৃত্তান্ত জানতে পারা যাবে। কোথায় সেই কুঠীবাড়ী, সেই লোকটিকে আমরা জিজ্ঞাসা কোল্লেম, লোকটি আমাদের সঙ্গে কোরে বাড়ীখানি দেখিয়ে দিলো। বাড়ীখানি অতি সুন্দর; আমরা বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ কোল্লেম।

    বাড়ীখানি অতি সুন্দর; জায়গা অনেক, চারিদিক প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, মধ্যস্থলে ইমারত; ধারে ধারে ফুলবাগান, মধ্যে মধ্যে অপরাপর ফলকর বৃক্ষ; স্থানটি রমণীয়। দোতালা কুঠী; আমরা দোতালায় গিয়ে উঠলেম; একটি ঘরের সম্মুখে গিয়ে দেখি, ঘরের মধ্যে ঢালা বিছানা, সারি সারি পাঁচ সাতটি তাকিয়া, প্রত্যেক তাকিয়ার পার্শ্বে সুন্দর সুন্দর বৈঠকোবিষ্ট এক একটি হুঁকা। একটি তাকিয়ার কাছে একটি লোক; —দিব্য স্থূলাকার, শ্যামবর্ণ, গলদেশে যজ্ঞোপবীত, কণ্ঠে ছোট ছোট সোণার মাদুলী-গাঁথা তিন-নর তুলসী-মাল্য; মস্তকের মধ্যস্থলে টাক পড়া, পার্শ্বের চুলগুলি অল্প পক্ক, অল্প অপক্ক, বয়স অনুমান পঁয়তাল্লিশ কি ছচল্লিশ বৎসর। লোকটির সম্মুখে বৃহৎ একটা লাল কাপড়ের দপ্তর, দপ্তরের পার্শ্বে বৃহৎ একটা বাকস, বাকসের উপর অনেকগুলি কাগজপত্র ছড়ানো। লোকটি একখানি পত্রিকা চক্ষের নিকটে ধারণ কোরে মনে মনে পাঠ কোচ্ছিলেন; পাঠে তন্মনস্ক। অন্য বিষয়ে অন্য মনস্ক ছিলেন, অন্য দিকে দৃষ্টি ছিল না, আমরা গিয়ে চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়েছিলেম, প্রথমে তিনি দেখতে পান নাই; তার পর পত্রিকার উপর থেকে চক্ষু তুলে, আমাদের দেখে, গম্ভীরবদনে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কে আপনারা? কোথা থেকে আসছেন? কি চান?”

    আমরা তখন গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেম। আমি বোল্লেম, “রাজা বাহাদুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার অভিলাষ; তিনি আসতে বোলেছিলেন, তন্নিমিত্তই আমাদের আসा।”

    লোকটি আমাদের বোসতে বোল্লেন; দুটি তাকিয়ার নিকটে পাশাপাশি হয়ে আমরা দুইজনে বোসলেম। যেরূপ গদিয়ানীভাবে সেই লোকটি সেইখানে বোসে ছিলেন, তাতে কোরে আমার বোধ হলো, তিনি হয় তো একজন সরকার অথবা মহুরী অথবা খাতাঞ্জী। যাই তিনি হোন, স্থূলাঙ্গদর্শনে আমি তাঁরে দেওয়ানজী বোলেই অনুমান কোল্লেম? জমিদারী সেরেস্তার নিম্নপদস্থ কর্মচারীকে দেওয়ানজী বোলে সম্মান দিলে খাতির পাওয়া যায়, তাই মনে কোরে আমি তারে দেওয়ানজী বোলে সম্বোধন কোরবো, এইরূপ ভাবছি, এমন সময় আর একটি লোক সেই গৃহে প্রবেশ কোরে সসম্ভ্রমে বোল্লে, “দেওয়ানজী মশায়! একজন ঘোড়সোয়ার এসেছে, একখানা চিঠি এনেছে, যদি বলেন, সেই লোককে আমি এখানে নিয়ে আসি। চিঠিখানি আমি চাইলেম, দিলে না;— বোল্লে, মহারাজের হাতে দিবার আদেশ। আমি বোল্লেম, ‘মহারাজ বাড়ীতে নাই,’ কথাও শুনলে না। চিঠি আমাকে দিলে না।”

    দেওয়ানজী মহাশয় গাত্রোত্থান কোল্লেন; আমাদিগের দিকে চেয়ে আর একবার বোল্লেন, “বসুন আপনারা, আমি আসছি।” যে লোক খবর দিতে এসেছিল, তার দিকে ফিরে তিনি আদেশ দিলেন, “বাবুদের তামাক দে রে!”— বোলেই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। চাকরটি সেইখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো।

    তামাক আমিও খাই না, ছোটবাবুও খান না; তামাক আনতে নিষেধ কোরে চাকরটিকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “রাজাবাহাদুর কোথায় গিয়েছেন? কবে আসবেন?” চাকর উত্তর কোল্লে, “কোথা গিয়েছেন, তা আমি জানি না; গত রাত্রে আসবার কথা ছিল, আসেন নাই; আজ রাত্রে আসতে পারেন; যদি না আসেন, কল্য নিশ্চয়।”

    চাকরের সঙ্গে আর আমাদের কোন কথা ছিল না; সে চোলে গেল, আমরা দুইজনে দেওয়ানজীর অপেক্ষায় সেইখানে বোসে থাকলেম।

    দেওয়ানজী ফিরে এলেন। কোথাকার সোয়ার, কিসের পত্র, সে কথা জিজ্ঞাসা করা আমাদের অনধিকারচর্চা; আমরা আগন্তুক, সে কথার সঙ্গে আমাদের কোন সম্বন্ধই ছিল না; সুতরাং আমরা পূর্ববৎ নিস্তব্ধভাবেই বোসে থাকলেম। নিজাসনে আসীন হয়ে দেওয়ানজী তখন আমাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা কোল্লেন। আমার পরিচয় আমি। আমি হরিদাস, রাজাবাহাদুরের আহ্বানে আমি এখানে উপস্থিত, এই পর্যন্ত আমার পরিচয়। ছোটবাবুর পরিচয়ে কিছু বেশী কথা। তিনি পরিচয় দিলেন, “নাম মিহিরচাঁদ চৌধুরী, পিতা জয়শঙ্কর চৌধুরী, নিবাস ত্রিপুরা; আমার পিতাঠাকুর মহাশয় সম্প্রতি পাটনায় এসেছিলেন, রাজাবাহাদুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল, এই হরিদাস, আমাদের বাড়ীতে ছিল, আমার পিতার মুখে রাজাবাহাদুর সে কথা শুনেছিলেন, হরিদাসকে এখানে পাঠাবার জন্য পিতাকে অনুরোধ কোরেছিলেন, হরিদাস চিনবে না, একাকী আসতে পারবে না, সেই কারণে হরিদাসের সঙ্গে তিনি আমারে পাঠিয়ে দিয়েছেন।”

    শান্তদর্শনে দেওয়ানজী আমাদের উভয়ের বদন নিরীক্ষণ কোরে, কি যেন পূর্বকথা স্মরণ কোরে প্রশান্তস্বরে বোল্লেন, “ঠিক কথা বটে; এখন আমার মনে পোড়লো। রাজাবাহাদুর আপনার পিতার কাছে হরিদাসের নাম কোরেছিলেন বটে, হরিদাসকে এখানে পাঠাবার কথা বোলেছিলেন বটে, এই বালকটির নাম হরিদাস?”

    মিহিরবাবু উত্তর কোল্লেন, “হরিদাসের পরিচয় হরিদাস নিজ মুখেই প্রদান কোরেছে; আমিও পুনরায় বোলছি, এই বালকের নাম হরিদাস। বালকটি খুব ভাল; হরিদাসের শরীরে অনেক গুণে।”

    দেওয়ানজী বোল্লেন, “সন্তুষ্ট হোলেম, আপনারা থাকুন, রাজাবাহাদুর একটি বিশেষ কার্যের নিমিত্ত আজ তিন দিন হলো, একটি বন্ধুলোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ কোত্তে গিয়েছেন, আজ রাত্রে প্রত্যাগমন করবার কথা। এইমাত্র মাজিষ্ট্রেট সাহেবের এক পত্র নিয়ে একজন সওয়ার এসেছিল, ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব আগামী কল্য এইখানে উপস্থিত হয়ে রাজাবাহাদুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ কোরবেন, পত্রের মর্ম এইরূপ। পত্রের উত্তরে রাজাবাহাদুরের অনুপস্থিতির কথা আমি লিখে দিয়েছি। আপনারা থাকুন, আজ রাত্রে না হয়, কল্য আমি হরিদাসকে রাজসমীপে পরিচিত কোরে দিব।”

    আমরা থাকলেম। দেওয়ানজীর সুবন্দোবস্তে, সম্ভবমত আদর-যত্নে আমাদের কিছুমাত্র কষ্ট হলো না। রাত্রে রাজাবাহাদুর এলেন না, পরদিন বেলা দশটার সময় প্রত্যাগত হোলেন। দেওয়ানজীকে পুরোবর্তী কোরে রাজার সঙ্গে আমরা সাক্ষাৎ কোল্লেম। মিহিরচাঁদের পরিচয় পেয়ে রাজাবাহাদুর হর্ষ প্রকাশ কোল্লেন। নতুন কোরে আমার পরিচয় দিতে হলো না, আমারে তিনি চিনতেন; অনেক দিনের পর সাক্ষাৎ হোলে পরিচিত লোককে যে ভাবে জিজ্ঞাসা কোত্তে হয়, সেইভাবে তিনি আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কেমন আছ হরিদাস? দীর্ঘকালের পর তোমাকে আমি দেখলেম। এত দিন তুমি কোথায় ছিলে। তোমার জন্য আমার বড় কষ্ট হয়। তুমি আমার অবাধ্য, সেই জন্যই নিজের দোষে তুমি কষ্ট পাও। এখন অবধি আমার কাছেই তুমি থাকো; আমার বাধ্য থাকলেই তোমার ভাল হবে।”

    নম্রভাবে উচিতমত উত্তর প্রদান কোরে আমি মৌন অবলম্বন কোল্লেম। অনেক দিনের অনেক পূর্বকথা আমার স্মরণ হলো। বাবু মোহনলালের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে, তিনি রাজা হয়েছেন, আমার প্রতি তাঁর মনোভাবেরও পরিবর্তন হয়েছে, এইরূপ আমি ভাবলেম। বারাণসীধামে দুখানি পত্রিকা দর্শন কোরে আমার উপর তিনি যেরূপ রুষ্ট হয়েছিলেন, সে ভাব এখন নাই, ইহাই যেন আমি বুঝলেম।

    যতক্ষণ আমি ঐ সকল কথা আলোচনা কোল্লেম, রাজাবাহাদুর ততক্ষণ নিস্তব্ধ ছিলেন; সহসা মৌনভঙ্গ কোরে আমারে তিনি বোল্লেন, “ত্রিপুরায় জয়শঙ্করবাবুর বাড়ীতে তুমি ছিলে, তিনি মহৎ লোক, তাঁর কাছে তোমার কোন প্রকার অযত্ন ছিল না, সে সব আমি শুনেছি। তিনি এখানে এসেছিলেন; তাঁর মুখেই আমি তোমার সমাচার পেয়েছিলেম; পেয়েছিলেম বটে, কিন্তু কি প্রকারে কার সঙ্গে তুমি ত্রিপুরায় উপস্থিত হয়েছিলে, সেটা আমি জানতে পারি নাই, তিনিও কিছু বলেন নাই। ত্রিপুরায় তুমি কেন গিয়েছিলে? —সেখানে তোমার কি কোন বিশেষ প্রয়োজন ছিল?”

    কেন জানি না, রাজার প্রশ্ন শুনে হঠাৎ আমি চোমকে উঠলেম; ভাব গোপন কোরে উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা না; বিশেষ অবিশেষ কোন প্রয়োজনই আমার সেখানে ছিল না; কি জন্য গিয়েছিলেম, কিরূপে গিয়েছিলেম, তাও আমি বোলতে পারি না। যে দিন আমি—”

    বোলতে বোলতে একবার আমি থাকলেম; ত্রিপুরার প্রথমদিনের কথা আমার মনে পোড়লো, আমি কাঁপলেম। প্রথমদিন জয়শঙ্করবাবু আমারে নেশাখোর বোলে তিরস্কার কোরেছিলেন; রাজাবাহাদুরের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তা আছে, ‘আমি নেশাখোর’ এ কথাটা যদি তিনি রাজাকে বোলে গিয়ে থাকেন, হয় তো বোলে থাকবেন, এমন যদি হয়, তা হোলে আমার উপর রাজাবাহাদুরের একটা কুসংস্কার জন্মেছে, ইহাই সম্ভব। সত্যকথা কি, জয়শঙ্করবাবু সে সবও হয় তো বোলে থাকবেন, রাজা হয় তো সেই কথা চেপে রেখে আমার মুখে কোন প্রকার নূতন কথা শ্রবণ করবার কৌশল প্রকাশ কোচ্ছেন, এইরূপ আমি ভাবলেম। প্রথমে যা ভেবেছিলেম, জয়শঙ্করবাবুদের তিরস্কার সহ্য করবার পর যে সব কথা আমার মনে হয়েছিল, সেই সব কথা যদি ঠিক হয়, তবে তো মোহনলালবাবুর কাছে আমাকে সর্বদা সাবধান হয়ে থাকতে হবে, পদে পদে কুণ্ঠিত হয়ে চোলতে হবে, সেটা নিশ্চয়। মনের কথা মোহনবাবুকে আমি, বোলবো কি না, একটু চিন্তা কোল্লেম। কৌশলক্রমে কিঞ্চিৎ আভাস দেওয়া ভাল; পরিশেষে সেই সিদ্ধান্তই অবধারিত হলো।

    কথাগুলি লিখতে যতক্ষণ গেল, ভাবতে ততক্ষণ লাগে নাই। যে পর্যন্ত বোলতে বোলতে আমি থেমেছিলেম, সেই সূত্র ধারণ কোরে রাজাকে আমি বোল্লেম, যে দিন আমি জয়শঙ্করবাবুর বাড়ীতে উপস্থিত হই, সে দিন আমি অজ্ঞান ছিলেম। কে আমারে অজ্ঞান কোরেছিল, তা আমি জানি না; অজ্ঞান অবস্থায় কারা আমারে ত্রিপুরায় ফেলে গিয়েছিল, তাও আমি বোলতে পারি না; জয়শঙ্করবাবু যত্ন কোরে আমারে আশ্রয় দিয়েছিলেন, এই পর্যন্ত আমি বোলতে পারি।”

    তাচ্ছল্যব্যঞ্জক হাস্য কোরে রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “ওটা তোমার বুদ্ধির ভ্রম। মাঝে মাঝে তোমার এক একটা খেয়াল হয়, এটাও সেই প্রকার একটা খেয়াল। কে তোমাকে অজ্ঞান কোরে একটা জায়গায় ফেলে দিয়ে যাবে? কার এত দায় পোড়েছিল? কেনই বা তোমাকে অন্যলোকে একটা অজানা জায়গায় নিয়ে যাবে? ও সব কথা মনে কোরো না। ভাল লোকের আশ্রয়ে ছিলে, আমার কাছে এসেছ, শান্ত হয়ে থাকো, ও সব খেয়াল ছেড়ে দাও। শিষ্টশান্ত হয়ে কাজকর্ম কর, আমার পরামর্শ মত চল, সংসারে একজন মনুষ্য বোলে গণ্য হোতে পারবে। চিরদিন কি এইরূপে ছেলেমানুষ থাকবে? উদাসীনের মত চিরদিন কি দেশে বিদেশে পথে পথে ঘুরে ঘুরে বেড়াবে? ঐ রকম হয়ে ঘুরে বেড়ানো কি ভাল? স্থির হয়ে আমার কাছে থাকো; কাজকর্ম শিক্ষা কর, মঙ্গল হবে।”

    আর আমি কিছু বোল্লেম না; ভাগ্য বিরূপ থাকলে মনে সর্বদাই কু-গায়; কু-ভাবনা আমার গেল না। রাজাবাহাদুর আমাদের সেইখানে বোসতে বোলে গৃহান্তরে প্রবেশ কোল্লেন, চাকরেরা গৃহপরিষ্কারাদি নানা কার্যে ব্যস্ত হয়ে বেড়াতে লাগলো; দেওয়ানজী মহাশয় মরুব্বী আনা জানিয়ে এটা ওটা সেটা পাঁচ প্রকার হকুমজারী কোত্তে লাগলেন; রাজাও ব্যস্ত। ফল, ফুল, মাখন, মিছরি প্রভৃতি বিবিধ দ্রব্য আমদানী হোতে লাগলো। সেই সব আয়োজন দর্শন কোত্তে কোত্তে ভগবান মরীচিমালী অস্তাচল-শিখরে প্রস্থান কোল্লেন : সন্ধ্যা হলো; ঘরে ঘরে পরিষ্কার পরিষ্কার দীপাধারে পরিষ্কার পরিষ্কার বার্তী জ্বোলে উঠলো : বিচিত্র নাচঘরের ন্যায় একটি প্রশস্ত ঘরে ইংরাজী ধরণের মজলীস সাজানো হলো। বাড়ীতে কি একটা উৎসব আছে, কারা যেন আসবেন, অনেকেই এইরূপ বিবেচনা কোল্লেন।

    রাত্রি যখন আটটা, কি নয়টা, সেই সময় ফটকে একখানা গাড়ী এসে লাগলো। গাড়ীর পশ্চাতে একজন ঘোড়সওয়ার। একজন খানসামা দ্রুতগতি উপরে এসে সংবাদ দিলে, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব। রাজাবাহাদুর উপরে ছিলেন, তাড়াতাড়ি নেমে গেলেন, অভ্যাগত দুটি সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে উপরে এসে উঠলেন। শেষে আমরা জানত পাল্লেম, একজন ম্যাজিস্ট্রেট আর একজন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের নবাগত বন্ধু। যেখানে মজলীস হয়েছিল, আমরা সে ঘরে প্রবেশ কোল্লেম না; ঘরের দুইধারে রঙ্গিন উদ্দীপরা দুইজন আরদালী দাঁড়ালো, দ্বারের কপাট রুদ্ধ হয়ে গেল।

    কি প্রয়োজনে ম্যাজিস্ট্রেটের আগমন, সেটি আমি জানলেম না, জানবার জন্য আগ্রহও প্রকাশ কোল্লেম না। গৃহমধ্যে পান-ভোজন, কথোপকথন ও অন্যান্য কার্য সমাপ্ত হোলে, সাহেবেরা বিদায় হোলেন, ভোজনান্তে আমরাও বিশ্রাম করবার অবকাশ পেলেম।

    পাঁচদিন অতীত। মোহনবাদকে বারংবার রাজাবাহাদুর বোলে উল্লেখ করা আমার বেশ কিছু কষ্টকর বোধ হোতে লাগলো; বলি রাজাবাহাদুর, কিন্তু যেন বাধ বাধ করে। সম্বোধনে রাজাবাহাদুর কেন, অবাধে মহারাজ বলা যায়; কিন্তু অপরের কাছে পরিচয় দিবার সময় একটু থেমে থেমে সাবধান হোতে হয়। মোহনরাজা অথবা মোহনলাল রাজা, এরূপ উচ্চারণ শ্রবণে নীরস। যত দিনের জানানো, তত দিন আমি মোহনবাবু অথবা মোহনলালবাবু বোলে এসেছি। এখন তিনি নূতন রাজা হয়েছেন, রাজাবাহাদুর বোলতে হবে, না বলাটা ধৃষ্টতা, বলা চাই, ক্রমে ক্রমে অভ্যাস করা আবশ্যক। এই পাঁচদিন রাজাবাহাদুর আমারে বেশ আদর-যত্ন কোল্লেন, স্নেহ-মমতা জানালেন মিষ্টকথা বোল্লেন; তুষ্ট হয়েও আমি তুষ্ট হোতে পাল্লেম না। অতুষ্টির কি কারণ, পাঠক মহাশয় সেটি অনুভবে হৃদয়ঙ্গম কোরবেন। রাজার কাছে আমি আদর-যত্ন পেলেম আমার অপেক্ষা মিহিরবাবু কিছু বেশী পেলেন; পাওয়াই উচিত। একে তিনি নূতন তাতে আবার ব্রাহ্মণ, তার উপর আবার মিত্রকুমার। আমার অপেক্ষা মিত্রকুমারের অধিক সমাদর অবশ্যই সামাজিক রীতির গৌরববর্ধক; সমাজের প্রথাই এইরূপ; সমাদরে বাস্তবিক আমি সন্তোষলাভ কোল্লেম।

    পাঁচদিন পরে মিহিরচাঁদবাবু বিদায় হোলেন; তাঁরে প্রণাম কোরে রাজা-বাহাদুর বোলে দিলেন, “তোমার পিতাঠাকুরকে আমার প্রণাম দিও; হরিদাস এসেছে, ভাল আছে, থাকতে থাকতে ভাল হবে, এ কথাও তাঁরে বোলো।” মিহিরবাবু আশীর্বাদ কোল্লেন। আমাদের আসবার রাহাখরচ আর মিহিরবাবুর প্রতিগমনের রাহাখরচ রাজাবাহাদুর দিলেন। আমার সঙ্গে প্রিয়সম্ভাষণ কোরে মিহিরবাবু স্বদেশে প্রস্থান কোল্লেন। এইখানে আর একটি কথা বোলে রাখা আবশ্যক। প্রায়শ্চিত্তের ছলে পায়রাবাবুকে নেড়া করা, ‘কানকাটা কানাই’ প্রকাশ করা, কি প্রকার রহস্য, পাটনায় উপস্থিত হয়ে মিহিরবাবু নিৰ্জনে একদিন আমারে সেই কথা জিজ্ঞাসা কোরেছিলেন। কানাইয়ের স্থূল স্থূল পরিচয় তাঁর কাছে আমি ব্যক্ত কোরেছিলেম। শুনে তিনি ঘৃণার সঙ্গে বিস্ময় প্রকাশ কোরে বোলেছিলেন, “তবে আর রুদ্রাক্ষ-খোপে বাসা কোরে থাকতে পারবে না, লোকের কাছে বোঁচা-মুখ দেখাতে লজ্জা হবে, পায়রা অচিরেই রুদ্রাক্ষের বাসা ছেড়ে উড়ে পালাবে!” হাস্য কোরে আমি বোলেছিলেম, “সেটাও একপ্রকার দ্বিতীয় প্রায়শ্চিত্ত। তাদৃশ নরাধমের পনঃ পূনঃ প্রায়শ্চিত্ত হওয়াই কৃষ্ণের ইচ্ছা।”

    মিহিরবাবু চোলে গেলেন, আমি থাকলেম। আদর পাই, যত্ন পাই, রাজার মুখের মিষ্ট মিষ্ট বাক্য পাই, রাজাদেশে সামান্য সামান্য কাজ-কর্ম ও নির্বাহ করি, এই রকমে একমাস। নিত্য নিত্য মনে করি, রাজাকে আমি মনের কথা জানাব; চিরজীবনের ঘোর অন্ধকার সংশয়টা ভঞ্জন করবার প্রয়াস পাব, অবকাশ পাই না। তিনি বড়লোক, আমি গরীব, শীঘ্র কোন কথা জিজ্ঞাসা কোত্তেও সাহস হয় না। রাজাকে নিৰ্জনে না পেলে সে সব কথা জিজ্ঞাসা করা ভাল নয়, নিৰ্জনে পাবারও অবসর ঘটে না। আরও একপক্ষ অপেক্ষা কোল্লেম।

    বসন্তকাল উপস্থিত। বসন্তে আকাশমণ্ডল নিৰ্মল, প্রকৃতি প্রসন্নমুখী, তরুলতা প্রফুল্ল, বিহঙ্গকুল প্রফুল্ল, সুখলালিত মানবকুলও প্রফুল্ল। আমার মত অভাগা চিরদুঃখী ব্যতীত সকলেই প্রফুল্ল।

    একদিন অপরাহ্ণে রাজাবাহাদুর মোহিনীমোহন বসন-ভূষণে সজ্জিত হয়ে উপর থেকে নেমে আসছেন, আমি সেই সময় একটা কাজের জন্য তাড়াতাড়ি নীচে থেকে উপরে উঠছিলেম, সিঁড়ির পথে দেখা হলো। থোমকে দাঁড়িয়ে সস্নেহ-সম্ভাষণে রাজা আমারে বোল্লেন, “এসো হরিদাস! আমি তোমার তত্ত্ব কোচ্ছিলেম, কোথায় ছিলে তুমি? এসো!”

    বোলেই তিনি অগ্রে অগ্রে সোপানাবলী অতিক্রম কোত্তে লাগলেন, কথার ভাবনা বুঝতে না পেরে পূর্বস্থানেই আমি দাঁড়িয়ে থাকলেম। পশ্চাতে মুখ ফিরিয়ে রাজা পুনরায় আমারে আহ্বান কোরে বোল্লেন, “ভাবছ কি? এসো!”

    তখন আমি তাঁর মনের কথা বুঝতে পাল্লেম; যে কার্যে যাচ্ছিলেম, সে কার্যে আর যাওয়া হলো না, সন্দিগ্ধচিত্তে রাজার সঙ্গে সঙ্গে নেমে ফটক পর্যন্ত এলেম। ফটকে গাড়ী ছিল, রাজাবাহাদুর আরোহণ কোল্লেন, আমারেও আরোহণ কোত্তে বোল্লেন; নতবদনে আমি রাজাজ্ঞা পালন কোল্লেম।

    গঙ্গাতীরের রাস্তার অদূরে একটি মনোহর উদ্যান; সেই উদ্যানে শকট পৌঁছিল; আমরা অবরোহণ কোল্লেম। গাড়ীতে যতক্ষণ ছিলেম, ততক্ষণের মধ্যে আমি একটিও কথা কহি নাই, একখানা ইংরাজী খবরের কাগজে চক্ষু রেখে রাজাবাহাদুর অন্যমনস্ক ছিলেন, তিনিও আমারে কোন কথা জিজ্ঞাসা করেন নাই। গাড়ী থেকে নেমে রাজা যখন উদ্যানের পুষ্পবাটিকায় পরিক্রমণ করেন, আমি তখন তাঁর পশ্চাতে ছিলেম। রৌদ্রের উত্তাপ ছিল না, সুখস্পর্শ সমীরণ আমাদের অঙ্গস্পর্শ কোচ্ছিল, নানা কুসমের সৌরভে চিত্ত প্রমোদিত হোচ্ছিল, উদ্যানের শোভা দর্শনে আমি পরিতৃপ্ত হোচ্ছিলেম, উদ্যানপালেরা দূরে দূরে স্ব স্ব কার্যে নিযুক্ত ছিল, নিকটে কেহই ছিল না; নির্জন-আলাপের উত্তম অবসর।

    উদ্যানের স্থানে স্থানে উপবেশনযোগ্য সুন্দর সুন্দর বেদী; বেদীর ধারে ধারে শ্বেতপ্রস্তর নির্মিত-চীনের মৃত্তিকানির্মিত নানা প্রকার সুন্দর সুন্দর পুতুল; দিব্য সুদৃশ্য! কুসমকাননের মধ্যস্থলে একটি শ্বেতবর্ণ ধারাযন্ত্র; সেই ফোয়ারার একদিকে ময়ূরের মুখ, একদিকে সিংহমুখ, একদিকে হংসমুখ, একদিকে এক অসুরের মুখ, উপরিভাগে বিচিত্র পক্ষযুক্ত একটি সুন্দরী পরী; যন্ত্রগাত্রের চারিমুখ দিয়ে নির্ঝরের ন্যায় ঝর ঝর শব্দে স্নিগ্ধ সলিল বর্ষিত হোচ্ছিল। সেই সকল শোভা দর্শন কোত্তে কোত্তে রাজাবাহাদূর নিকটস্থ একটি বেদীর উপর উপবেশন কোল্লেন, প্রসন্ন-নয়নে আমার দিকে চেয়ে আমারেও বোসতে বোল্লেন। যে বেদীতে রাজা, সে বেদীতে না বোসে নিকটবর্তী আর একটি বেদীতে আমি উপবেশন কোল্লেম।

    প্রতিদিন মনোমোহিনী শোভা দর্শনে আমার চিত্ত পুলকিত হোচ্ছিল, কিন্তু আমার অন্তরসাগরে অহরহ অনুক্ষণ যেরূপ চিন্তা-তরঙ্গের খেলা, সে খেলার বিরাম ছিল না। রাজাকে একটি কথা জিজ্ঞাসা করা আমার ইচ্ছা; স্থান নির্জন, সময় রমণীয়; রাজাবাহাদুরের মেজাজ তখন বেশ ঠাণ্ডা, মনোগত কথা জিজ্ঞাসা করবার উপযুক্ত অবসর বটে; কিন্তু সহসা কি কথা বোলে মনের কথা উত্থাপন করি, তাই আমি ভাবতে লাগলেম। অবসর হয়েও অবসর হয় না; রাজার দৃষ্টি তখন অন্যদিকে ছিল, অপাঙ্গে তাঁর মুখের ভাব নিরীক্ষণ কোরে আমি বুঝলেম, আমার ন্যায় তিনিও যেন কোন প্রকার চিন্তায় অন্যমনস্ক। সেই ভাবে রাজার মুখের দিকে আমি চেয়ে আছি, হঠাৎ আমার দিকে ফিরে, কি যেন ভেবে তিনি আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি ভাবছো হরিদাস?”

    কি আমি ভাবছি, আমিই তা জানতেম। শৈশবে জ্ঞানের সঞ্চার হওয়া অবধি সর্বদা যে কথা আমি ভাবি, সেই ভাবনা আমার সহচরী। ভাবনাকে অন্তরে রেখে আমি উত্তর কোল্লেম, “উদ্যানটী অতি সুন্দর। এ উদ্যানে যা কিছ দর্শন কোচ্ছি, সমস্তই যেন আমার চক্ষে নতুন বোধ হোচ্ছে; পুতুলগুলি যেন সজীব বিবেচনা কোচ্ছি; পুতুলেরা যেন বাতাসের সঙ্গে কথা কোচ্ছে, এই ভাব আমার মনে আসছে; বাতাসে দলে দলে ফুলগুলি যেন আহ্লাদে আহ্লাদে ঢোলে ঢোলে পোড়ছে, পবনদেবের সঙ্গে যেন খেলা কোচ্ছে তাই আমি দেখছি।”

    ঈষৎ হাস্য কোরে রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “তা তো দেখছো, কিন্তু ভাবছো কি? দেখতে পাই, সর্বদাই কি তুমি ভাবো। পূর্বেও দেখেছি, এখনো দেখছি, একই ভাব। এখন আর তুমি নিতান্ত ছেলেমানুষটি নও, ক্রমেই বয়স বাড়ছে, উদাসীনের মত সর্বক্ষণ ভেবে ভেবে তোমার বুদ্ধিশক্তি দুর্বল হয়ে আসছে; ও সব ভাবনা ছেড়ে দাও। তোমাকে সংসারী হোতে হবে, সংসারী হবে, সংসারের মানুষগুলিকে চিনতে হবে, সংসারের প্রকৃতি বুঝতে হবে, সেগুলি কি তুমি একবারও ভাবো না? অন্য ভাবনা ছেড়ে দাও। যাতে কোরে মানুষের মত হোতে পার, সেই চেষ্টা কর; আমার কাছে যথেষ্ট সহায়তা পাবে।”

    সুরে সুরে সুর মিলে গেল; ঠিক সুরে আমার হৃদয়-বীণা বেজে উঠলো। সূত্র অন্বেষণ কোচ্ছিলেম, উত্তম সূত্র পেলেম; উত্তম সুবিধা; ভাগ্যে যা থাকে, তাই হবে, এই সূত্রে মনের কথা আমি প্রকাশ করি। রাজা যদি সদয় হন, আশা পূর্ণ হবে; কথা শুনে রাজা যদি রুষ্ট হন, আশা ভেসে যাবে; যত দিন বাঁচবো, এই রকমে অকূলপাথারে ভেসে ভেসে বেড়াবো। আজ আমার ভাগ্যপরীক্ষার শেষদিন, মনের কথা প্রকাশ করা কর্তব্য। ভেবে ভেবে দৃঢ়সঙ্কল্প হয়ে ধীরে ধীরে আমি বোল্লেম, “যা আপনি আজ্ঞা কোচ্ছেন, তা ঠিক। সংসারে যখন এসেছি, তখন সংসারের পদ্ধতিতে সংসারী হওয়াই উচিত; কিন্তু পন্থা অবলম্বনের মূলতত্ত্ব আমি অপরিজ্ঞাত। এ সংসারে কে আমি, কে আমার জন্মদাতা, কে আমার জননী, এত বড় বিশ্বসংসারে আমার আপনার লোক কেহ আছেন কি না জন্মাবধিই সেটী আমি জানলেম না। আমি আছি কেবল এইটুকু মাত্র জানি, আর কিছুই আমি জানি না। আপনি বোলছেন, ‘উদাসীনের মত সর্বক্ষণ ভেবে ভেবে বুদ্ধিশক্তি দুর্বল হয়ে আসছে’; যথার্থই তাই, যথার্থই আমি উদাসীন; সংসারে আমি এসেছি, সংসারে আমি আছি সংসারেই ভ্রমণ কোচ্ছি, কিন্তু সংসারটী কি, তা আমি জানি না। এমন অবস্থায় জীবন আমার বিড়ম্বনা জ্ঞান হয়। কেন বেঁচে আছি, তাও আমি বুঝতে পাচ্ছি না। আপনি যদি সদয় হয়ে আমার পরিচয়টি আমারে বোলে দেন, তা হোলে—”

    অকস্মাৎ রাজার মুখের সেই প্রফুল্লভাব তিরোহিত। আমার ঐ অর্ধোক্তি শ্রবণে যেন কতই বিস্ময়ভাব প্রকাশ কোরে রুক্ষস্বরে তিনি বোল্লেন, “পরিচয়? —তোমার? তোমার পরিচয় আমি কি জানি? পাগলের মত তুমি কি কথা কও? কোথাকার কে তুমি কিছুই আমি জানতেম না; আমার শ্বশুরের বাড়ীতে তোমাকে আমি প্রথম দেখি, দেখে তোমার প্রতি আমার দয়া হয়েছিল, নিজ বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে যত্ন কোরে রাখবো, লেখাপড়া শিখাবো, কাজকর্ম শিক্ষা দিব, ঐরূপ আমার ইচ্ছা হয়েছিল; সে কথা তোমাকে আমি বোলেছিলেম। তুমি শুনলে না, আমার সৎপরমর্শ গ্রাহ্য কোল্লে না, আপন বুদ্ধিতে পথে পথে ঘুরে বেড়াতে লাগলে, তথাপি চৈতন্য হলো না। তার পরেও দুবার তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, তখনো আমি তোমার ভাল চেষ্টা করেছিলেম, তাও তোমার ভাল লাগলো না। লোকের কাছে অকারণে তুমি আমার নিন্দা কোল্লে তাও আমি ভুলে গিয়েছিলেম, ছেলেমানুষ বোলে ক্ষমা কোরেছিলেম; তদবধি তুমি আর আমার সঙ্গে দেখা কোল্লে না। নিরাশ্রয় দেখে তোমাকে আশ্রয় দিবার নিমিত্ত কত চেষ্টা আমি কোরেছি, সমস্তই বিফল হয়েছে। দয়াবশে কত সন্ধানের পর সন্ধান পেয়ে এখানে তোমাকে আমি আনিয়েছি, ভবিষ্যতে আর কোন কষ্ট না পাও, তার উপায় আমি কোরবো, স্বীকার কোরেছি, তাতেও তুমি সন্তুষ্ট থাকছো না। কোথাকার কথা কোথায়! আমার কাছে তুমি তোমার পরিচয় চাও! তোমার পরিচয় আমি কিরূপে জানবো?”

    কঠোর কর্কশকণ্ঠে রাজাবাহাদুর এই সব কথা বোল্লেন, আমি কিন্তু ভয় পেলেম না; মনের উপদেশে আরো বরং অধিক সাহসে তৎক্ষণাৎ আমি বোল্লেম, “সব আপনি জানেন, কেন প্রতারণা করেন? গরীব দেখে কেন আমার কথাগুলি উড়িয়ে উড়িয়ে দেন? সমস্তই আপনি জানেন; দয়া করুন। দয়া কোরে বলুন, কে আমি, কোথা আমার জন্ম, কোথায় আমার জনক-জননী, কোথায় কোথায় কে আমার আপনার লোক বর্তমান আছেন, অনুগ্রহ কোরে সেই কথাগুলি আমারে বলুন! সমস্তই আপনি জানেন।”

    পূর্ববৎ রুক্ষস্বরে রাজাবাহাদুর বোলে উঠলেন, “কি আমি জানি? তুমি একজন বিদেশী বালক, তোমার পরিচয় আমি কেমন কোরে জানবো? কোথায় তোমার জন্ম, কে তোমার বাপ, কে তোমার মা, সে সব কথা আমি কি জানি? আমাকে তুমি ও রকমে বিরক্ত কোরো না। যদি ভাল চাও, ঠাণ্ডা হয়ে কিছুদিন আমার কাছে থাকো, পাগলামী দেখিও না। আমি অঙ্গীকার কোচ্ছি, সেই রকমে থাকলে আমি তোমার ভাল চেষ্টা করব; ও রকম পাগলামী দেখালে এখানে তুমি জায়গা পাবে না। বার বার আমি বোলছি, তোমার পরিচয়ের কোন কথাই আমি জানি না।”

    রাজা মোহনলাল আমারে ভয় দেখালেন, “পাগলামী দেখালে এখানে জায়গা পাবে না” বোল্লেন। যেটা আমার সত্যকথা, রাজা বোল্লেন, সেইটি আমার পাগলামী। আমি ভয় পেলেম না;  কোন প্রকার ভয়ের লক্ষণ না দেখিয়ে তৎক্ষণাৎ আমি বোল্লেম, “কেন আপনি গোপন করেন? গরীব বোলে কেন আপনি আমারে অন্ধকারে রাখতে চান? কিছুই যদি আপনি জানেন না, তবে রুদ্রাক্ষগ্রামের জয়শঙ্করবাবুকে সে কথা আপনি কিরূপে বোলেছিলেন?”

    কিঞ্চিৎ চমকিতভাবে রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “কি আমি বোলেছিলেম? জয়শঙ্করের মুখে কি কথা তুমি শুনেছ? তোমার পরিচয় জয়শঙ্কর যেমন জানেন, আমিও সেইরূপে জানি। জয়শঙ্করের কাছে কি কথা আমি বোলেছিলেম? কিছুই ত আমার মনে হয় না। তুমি যদি—”

    সত্য সত্যই আমি যেন তখন পাগলের মত হোলেম। যদিও অশিষ্টতা, যদিও অনুচিত, তথাপি আমি রাজার কথায় বাধা দিয়ে উত্তেজিতস্বরে বোল্লেম, “কিছুই আপনার মনে হয় না? আচ্ছা, আমিই মনে কোরে দিচ্ছি। জয়শঙ্করবাবুর মুখে আমি শুনেছি, তাঁরে আপনি বোলেছিলেন, আমি আপনার জাতি; আপনিও যে জাতি, আমিও সেই জাতি। জাতির কথা যদি আপনি জানেন, তবে আমার জন্মের কথাও অবশ্য আপনার জানা আছে, এই আমার বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসেই এখানেই আমি এসেছি। কেন আপনি অস্বীকার করেন? কেন আর আমারে অন্ধকারে রাখেন? জাতি-জন্ম সম্বন্ধে চিরদিন আমি অন্ধকারে থাকি, সেইটিই কি অপনার ইচ্ছা? আপনার তুল্য মহৎলোকের সে রকম ইচ্ছা থাকা শোভা পায় না। দয়া করুন! যদি আমি আপনার কাছে কোন অপরাধ কোরে থাকি, ক্ষমা করুন! দয়া কোরে সত্যকথা বলুন! বিস্তর কষ্ট আমি পেয়েছি, আর কষ্ট সহ্য হয় না! আমার কষ্টের অনেক কথা আপনি জ্ঞাত আছেন। যারা আমার উপর দৌরাত্মা করে, তাদের মধ্যে কোন কোন লোককে আপনি জানেন। আপনার উপদেশে একজন—”

    রাজা যেন কেমন এক রকম অস্থির হোলেন; অস্থির হয়েই বেদীর উপর থেকে নেমে দাঁড়ালেন; দুই চক্ষু রক্তবর্ণ কোরে সরোষে আমারে বোল্লেন, “আমি কি তবে মিথ্যাকথা বোলছি? যারা যারা তোমার উপর দৌরাত্মা করে, তাদের কি আমি জানি? আমার উপদেশে তোমার উপর দৌরাত্ম্য হয়? আমি কি তোমারে অন্ধকারে রাখছি? কি সব কথা তুমি বল? এ সব কথা শুনলে লোকে আমাকে কি বোলবে? তোমাকেই বা কি ঠাওরাবে? ও সব কথা তুলো না, ও সব কথা বোলো না; যা যা আমি বলি, আমার বাধ্য হয়ে তাই তুমি কর, বাচালতা দেখিও না; আমি যেন বুঝতে পাচ্ছি, দেশে দেশে ঘুরে ঘুরে তোমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। হোতেই পারে; হোতেই পারে; অনেক লোকের এই রকম হয়। আমি বরং তোমার চিকিৎসা করাবো; এখানে ভাল ভাল কবিরাজ আছে, ডাক্তার আছে, ভাল ভাল ঔষধ আছে, চিকিৎসকের ব্যবস্থামত চোল্লে শীঘ্রই তুমি আরাম হোতে পারবে।”

    এই সব কথা বোলতে বোলতে একবার আকাশপানে চেয়ে রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “আর বেলা নাই, চল আমরা কুঠীতে ফিরে যাই। যে সব কথা আজ তুমি আমাকে বোল্লে, নিকটে লোকজন থাকলে, ও রকম কথা বোলো না; লোকে কেবল প্রলাপ মনে কোরবে, তোমাকে উপহাস কোরবে, পাগল মনে কোরে হাততালি দিবে, গায়ে ধূলা দিবে; সাবধান! চল এখন!”

    আমার মনের ভিতর তখন কিরূপ ভাবের উদয় হলো, বিশ্ববিধাতা ভিন্ন আর কেহ সে ভাব জানতে পারেন না। রাজা চোল্লেন, নিস্তব্ধ হয়ে আমিও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চোল্লেম। অতঃপর শকটারোহণে কুঠীতে গিয়ে উপস্থিত হোলেম। সে রাত্রে সকল রাত্রি অপেক্ষা আমি অধিক অসুখী। বাবু মোহনলাল রাজা উপাধি পেয়েছেন, সম্প্রতি তাঁর ঐশ্বর্য বৃদ্ধি হয়েছে। আমি ভেবেছিলেম, পদমর্যাদা ও ধনমর্যাদার সঙ্গে তাঁর পূর্বপ্রকৃতির পরিবর্তন হয়ে থাকবে; কিন্তু পুষ্পকাননে আজ তিনি যেরূপ অভিনয় কোল্লেন, তাতে বুঝলেম, কপটতা আরো যেন বেশী পরিমাণে বর্ধিত হয়েছে। নিশ্চয় আমি বুঝতে পাচ্ছি, আমার পরিচয় তিনি জানেন; পূর্বে যতটকু বুঝেছিলেম, এখন তদপেক্ষা অনেকটা পরিষ্কার বুঝেছি; কিন্তু সেই পরিচয়টি তিনি আমার কাছে প্রকাশ কোরবেন না, অপ্রকাশ রাখতে তিনি যেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, লক্ষণে এইরূপ বুঝা গেল কিন্তু কেন? আমার পরিচয় আমার কাছে প্রকাশ কোল্লে তাঁর কি কোন প্রকার ক্ষতির সম্ভাবনা আছে? আমি আমার পরিচয় জানতে পাল্লে তাঁর কি কোন প্রকার ইষ্টসিদ্ধির আঘাত হবে? গরীবের পরিচয় বোলে দিলে তাঁর অভিনব রাজা উপাধিতে কি কোন প্রকার আঘাত পাবে? বহু-চিন্তা কোরেও কিছুই আমি অবধারণ কোত্তে পাল্লেম না, হতাশে কেবল এইটুকুমাত্র অবধারণ কোল্লেম যে, চিরদিন আমারে জাতি-জন্মের পরিচয়ে অন্ধকারেই থাকতে হবে। কেন না, ঐ মোহনলালবাবু ভিন্ন আর কেহ এই হতভাগ্য হরিদাসের সত্য পরিচয় জ্ঞাত আছে, এমন বোধ হয় না, বোধ হয়, রক্তদন্ত কিছু কিছু, জানতে পারে; কিন্তু তার মুখে সত্যকথা বাহির করা দূরাশামাত্র। এত বড় একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এই বাবু, মোহনলাল,— অভিনব রাজা মোহনলাল, ইনি যখন এতদূর কৃপণতা কোচ্ছেন, তখন সেই একটা ধড়ীবাজ ডাকাত,— নরহন্তা অনুমান কোল্লেও মিথ্যা অনুমান হয় না, — সেই পাষণ্ড দস্যু আমার সম্বন্ধে সত্যকথা বোলবে কোনক্রমেই সেটা সম্ভব মনে করা যায় না; তবে আর কার কাছে আমার অভীষ্টসিদ্ধির আশা?— আশা নাই! সূতিকাগারে আমি যেমন ছিলেম, কোথায় এলেম, কোথায় ছিলেম, কে আমি কিছুই জানতেম না, মৃত্যুকাল পর্যন্ত সেইরূপেই আমারে ঘোর অন্ধকারে থাকতে হবে, বিধাতার হয় তো ইচ্ছাই তাই। এখন আমি কি করি? পরিচয়প্রাপ্ত হবার আশা তো দূরে গেল! বিনা পরিচয়ে যাঁদের কাছে আমি এক রকমে পরিচিত হয়েছিলেম, যাঁদের কাছে আমি ভালবাসা পেয়েছিলেম, যাঁরা আমারে আদর-যত্নে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাঁরাই বা কে কোথায় থাকলেন? অমরকুমারী কোথায় রইলেন? অমরকুমারীর কাছে জীবনঋণে ঋণী আমি, সে ঋণ পরিশোধ কোত্তে পাল্লেম না। দুই জেলার দুই জায়গায় দুই মোকদ্দমা; সে দুই মোকদ্দমার কিরূপ নিষ্পত্তি হলো, জানতে পাল্লেম না। ত্রিপুরায় যখন ছিলেম, বন্ধুবান্ধবগণকে চিঠি লিখে তত্ত্ব জানবার আশা কোরেছিলেম, জয়শঙ্কর চৌধুরী বাধা দিয়াছিলেন, আশা ফলবতী হয় নাই। এখন আমি পাটনায়, এখন আমি সে বিষয়ে স্বাধীন; চিঠি আমি লিখবো, সে কথা রাজাকে জানাব না। কি জানি, যে রকম প্রকৃতি, তাতে কোরে রাজা যদি জয়শঙ্করের মত আমার অভিলাষের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ান; তা হোলে মনোরথসিদ্ধি হবে না। রাজাকে জানাব না, সেই পরামর্শই ভাল। আপন সংকল্প আপনিই জানবো আর কাহাকেও জানতে দিব না;  দিনমানেও লিখবো না; কল্য রাত্রিতে বাড়ীতে নিশুতি হবে, বাড়ীর সকলে যখন ঘুমাবে, সেই সময় আমি পত্রগুলি লিখে রাখবো।

    এই আমার সংকল্প; দৃঢ়সংকল্প। দিবসের শেষভাগে সুখীলোকে সুখময় স্থানে ভ্রমণ করে; শরীর সুস্থ হয়, মন সুস্থ হয়, নিশাকালে সুখে নিদ্রা যায়। অসুখী লোকে তাদৃশ রমণীয় স্থান পরিভ্রমণ কোরে সুস্থ হোতে পারে না, নিদ্রাও তারে আলিঙ্গন করে না। আমি অসুখী, রাজার সঙ্গে পুষ্পকুঞ্জ পরিভ্রমণ কোরে এলেম, উপকার পেলেম? —দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল, প্রাণের ভিতর আঘাত লাগলো, নিদ্রাদেবী আমারে একবারও দয়া কোল্লেন না; সমস্ত রজনী আমি অসুখী হয়েই জাগরণ কোল্লেম। একটি সুখ, ঐ কল্পনা; — বন্ধবান্ধনগণকে চিঠি লিখবো।

    রজনী প্রভাত। সূর্যোদয়ের পূর্বে গাত্রোত্থান কোরে আমি একবার নীচে নেমে এলেম, সম্মুখের রাস্তাটি উদাসনয়নে দর্শন কোল্লেম; সে ভাব আমার মনে কেন উদয় হয়েছিল, আমি নিজেই তা জানতেম না। অপরাপর স্থানে, অপরাপর সময়ে, যে যে বাড়ীতে আমি আশ্রয় পেয়েছিলেম, সেই সকল বাড়ীতে একটি না একটি অনুগত লোকের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা ঘোটেছিল। বাবু হোক, সরকার হোক, সামান্য একজন চাকর হোক, যেই হোক, একটি না একটি লোকের সঙ্গে আমার সম্ভাব সঞ্চারিত হতো; কথা কহিবার দোসর পেতেম; এখানে সেটি ঘটে নাই। প্রথমে দেখেছিলেম, দেওয়ান।

    আমার সঙ্গে কথা কোয়েছিলেন, এখনো কথা হয়, কিন্তু সে সকল কথা যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। অপরাপর লোকের সঙ্গেও কথা হয়, সে সকল কথাতেও কোন রস থাকে না। রাজার সঙ্গেও কথা চলে, কিন্তু সেই সকল কথায় আমার হৃদয়ের ভার যেন আরো বেশী বেশী গুরুভার মনে হয়। মনের কথা বোলতে পারি, পাটনার রাজবাড়ীতে তেমন সুখের সুখী, দুঃখের দুঃখী একটি লোকও পাই না, বাড়ী থেকে বেরিয়ে সহর দেখতে যাই না, সর্বদাই আমারে বাড়ীর মধ্যে বাস কোত্তে হয়। রাজাবাহাদুর আমারে গত কল্য উদ্যানে নিয়ে গিয়েছিলেন, সুখী হব ভেবেছিলেম, বিপরীত হয়ে গেল।

    আজ আমি রাস্তা দেখছি কেন? পালিয়ে যাবার জন্য কি?—তা নয়; চিঠি লিখতে হবে। কাগজ, কলম, কালি, ডাকের টিকিট আবশ্যক আছে। রাজবাড়ীতে সমস্যা আছে, সমস্তই হয় তো পেতে পারি, কিন্তু আমি চাইবো না; মনের কথা কাহাকেও জানতে দিব না; রাজকিঙ্করগণের মধ্যে কাহাকেও সেই উপকরণগুলি সংগ্রহ কোরে দিবার অনুরোধ কোরবো না, বাজার থেকে নিজেই সেইগুলি খরিদ কোরে আনা আমার অভিলাষ; সেই নিমিত্তই রাস্তা-দর্শন। কোন দিক দিয়ে কোথায় যেতে হবে সেইটি আমি ঠিক কোরে রাখলেম। অপর হেন কাহাকেও কিছু না বোলে রাজবাড়ী থেকে আমি বেরুলেম। এ বাড়ীকে বারম্বার আমি রাজবাড়ী বোলছি কেন? ভদ্রাসন না হোলেও মোহনবাবু এখন রাজা; অতএব বাড়ীর নাম এখন রাজবাড়ী।

    প্রয়োজন সিদ্ধ কোরে সন্ধ্যার মধ্যেই আমি ফিরে এলেম। দিনমানেও রাজার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল, সন্ধ্যার পরেও সাক্ষাৎ হলো, পূর্বদিনের কোন কথাই তিনি উত্থাপন কোল্লেন না, তাঁর মুখের ভাবেও কোন প্রকার বিরক্তিলক্ষণ লক্ষিত হলো না, আমি সে প্রসঙ্গে তাঁরে কোন কথা বোল্লেম না। নিত্য যেমন হয়ে থাকে, সেই রকম পাঁচ প্রকার মজলিসী কথায় সম্ভবমত পরিতৃপ্ত হওয়া গেল। রাত্রি দশটা। আহারাদির পর সকলে স্ব স্ব স্থানে শয়ন কোল্লেন, আমার শয়নের জন্য যে ঘরটি নির্দিষ্ট হয়েছিল, সেই ঘরে আমি বোসলেম।

    এক ঘণ্টাকাল অনেক রকম আমি ভাবলেম, তার পর চিঠি লেখা আরম্ভ কোল্লেম। ঘরের দরজা বন্ধ করা হয়েছিল; কি আমি কোচ্ছি, হঠাৎ কেহ এসে দেখতে পাবে, সে ভয় ছিল না, নির্ভয়ে আমি চিঠি লিখতে লাগলেম। সাতখানি চিঠি; কাশীতে রমণবাবুর নামে একখানি, বরদায় রাজকুমার রণেন্দ্ররাও বাহাদুরের নামে একখানি; মুর্শিদাবাদে দীনবন্ধু বাবু, পশুপতিবাবু, শান্তিরাম দত্ত, মণিভূষণ দত্ত, এই চারি নামে চারিখানি আর মাণিকগঞ্জে হরিহরবাবুর নামে একখানি, এই সাতখানি। মোড়ক কোরে শিরোনাম লিখে, সেই পত্রগুলি আমি শয্যাতলে রেখে দিলেম; পরদিন প্রভাতে প্রভাতী-বায়ু সেবন-ব্যাপদেশে সেগুলি আমি স্বয়ং ডাকঘরের ডাকবাক্সে দিয়ে এলেম। একটা ভাবনা দূর হলো।

  • নবম কল্প : দারণ কলঙ্ক—কলঙ্কভঞ্জন

    নবম কল্প : দারণ কলঙ্ক—কলঙ্কভঞ্জন

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    নবম কল্প : দারণ কলঙ্ক—কলঙ্কভঞ্জন

    সপ্তাহ অতীত। এই সপ্তাহের মধ্যে একরাত্রেও ভূতের নৃত্য, ভূতের হুঙ্কার, ভূতের কুন্দন, ইত্যাকার কোন অদ্ভুত শব্দই শ্রুতিগোচর হয় নাই। কেবল আমার নিজের কথা বোলছি না, বাড়ীর কেহই কিছু শ্রবণ করেন নাই। অষ্টম দিবসে প্রাতঃকালে বড়বাবু প্রফুল্লবদনে আমার শয়নগৃহে প্রবেশ কোরে আমারে বাহাদুরী দিয়ে বোল্লে, “হরিদাস, তুমি বীরপুরুষ, যুদ্ধক্ষেত্রের বীরপুরুষের হস্তপদবিশিষ্ট সজীব মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করেন, সে যুদ্ধে জয়-পরাজয় উভয়ই আছে। তুমি ভূতের সঙ্গে যুদ্ধ কোরেছ, তোমার প্রতাপে ভূতেরা পরাজিত হয়ে পলায়ন কোরেছে। যথার্থই তুমি বীরপুরুষ! এখন অবধি আমি তোমাকে সহোদর তুল্য বিবেচনা কোরবো, তোমার পরামর্শ মতই কার্য কোরবো। লোকে যেমন নিরুপদ্রবে মনের সুখে নিজ বাড়ীতে বাস করে, এখন অবধি তুমি সেইরূপে মনের সাথে এই বাড়ীতে বাস কর। কর্তা ফিরে এসে যদি কোন বিরুদ্ধে কথা বলেন, আমি তাঁকে তোমার গুণের কথা বোলে ঠাণ্ডা কোরে রাখবো।”

    বাহাদুরী পেলেম; বীরপুরুষ হোলেম; কর্তা আমাদের সুনয়নে দেখবেন, সেরূপ আশ্বাসও পেলেম, কিন্তু একটি কথাও আমার ভাল লাগলো না। সে বাড়ীতে কি একটা যে গুপ্তকাণ্ড আছে, অনুমানে সেইটি চিন্তা কোরে আমি নীরব হয়ে থাকলেম; অকৃতজ্ঞ হোলেম না, মৌনভাবে দুইহাত তুলে বড়বাবুকে নমস্কার কোল্লেম।

    রামদাস আসে যায়, কত রকমের কত কথা কয়, রূপসী আসে যায়, অভ্যাসমত আপন মনে পাঁচ রকমের গল্প করে, যাবার সময় এক একবার আঁখি ঠেরে চোলে যায়। ছোটবাবু আসেন যান, আমার সঙ্গে বেশ আত্মীয়তা দেখান, এক একদিন আমারে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের এক একদিক্ দেখিয়ে আনেন, এই রকমে দিন যায়। বড়বাবুর মুখে সেই উপদেবতার কথা ভিন্ন আর অন্যকথা প্রায়ই শুনতে পাই না; গতকথা নিয়ে অত আলোচনা কেন তাঁর, সেটাও ঠিক বুঝতে পারি না।

    আর এক সপ্তাহ অতীত। একদিন বৈকালে ছোটবাবুর সঙ্গে আমি একটি সরোবরতীরে ভ্রমণ কোচ্ছি, গুটিকতক হংস-হংসী সেই সরসীজলে খেলা কোরে বেড়াচ্ছে, দেখে দেখে মনে আমার একটা ভাব উদয় হলো। ছোটবাবুকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আপনাদের গ্রামে পায়রাবাবু আছেন, মানুষের আকার ধারণ কোরে পায়রাবাবু সংসারধামে ক্রীড়া করেন, এই সকল হংসের মধ্যে কোন হংস নরমমূর্তি ধারণ কোরে হংসবাবু কেন হয় না; প্রণয়-সংসারে আমি সংসারী নই, বাস্তবিক প্রণয়পদার্থটি যে কি, তাও আমি বুঝি না। এ সংসারে বিহঙ্গকুলে হংস-হংসী আর কপোত-কপোতী বিমল প্রেমের দৃষ্টান্তে প্রসিদ্ধ পায়রাবাবুর ক্রীড়া দর্শনে একটি হংসবাবুর ক্রীড়া দর্শন কোত্তে আমার অভিলাষ হয়; হংসের বাক্যশ্রবণে কৌতূহল জন্মে। তার কি কোনরূপ উপায় হোতে পারে না?”

    ছোটবাবু বোল্লেন, “তোমার কথা আমি বুঝতে পাল্লেম না, হংসের বাক্য-শ্রবণে কৌতূহল, সে কৌতূহলের অর্থ কি? হংসেরা কি কথা কয়? সৃষ্টি কালাবধি হংসের মুখে কেহ কখন বাক্য শ্রবণ করে নাই।”

    সমান আগ্রহে তৎক্ষণাৎ আমি বোল্লেম, “কেহ কখন শ্রবণ না কোল্লে আমার মনে সে ভাবের উদয় হোতো না। শ্রীহর্ষ দেবের হংসের মুখে নলরাজা কথা শুনেছিলেন, দয়মতীদেবীও হংসমুখে পরিণয়-সম্বন্ধ শ্রবণ কোরেছিলেন, প্রণয়-বিজ্ঞানে অনভিজ্ঞ থাকলে আমি কেন হংসবাক্য শুনতে পাব না, তাই আমি ভাবি; বিশেষতঃ পায়রা যখন নরাকার ধারণ করে, তখন হংস অপারগ থাকে কেন? আচ্ছা, ছোটবাবু, সেই পায়রাবাবুটি আপনাদের গ্রামে কতদিন আছেন? এখানে তাঁদের কয়পুরুষের বাস?”

    খানিকক্ষণ বিস্মিতনেত্রে আমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে কিঞ্চিৎ সঙ্কুচিতস্বরে ছোটবাবু বোল্লেন, “বংশাবলীর তত্ত্ব তুমি জানতে চাও? বেশী দিনের খবর আমি বোলতে পারবো না, পায়রাবাবুর পিত্রালয় এই গ্রামে বটে, কিন্তু এ গ্রামে পায়রাবাবুর জন্ম হয় নাই; মাতামহালয়ে জন্ম, মাতামহালয়েই তিনি প্রতিপালিত। জন্মাবধি এ গ্রামে তিনি আসেন নাই, সম্প্রতি এসেছেন। তাঁর প্রকৃত নামটি কি, তাও আমরা জানি না। কথা কবার সময় তাঁর গলাটি একটু ফুলে ফুলে উঠে, বক বকম, বক বকম শব্দের ন্যায় এক রকম ঘড় ঘড় শব্দ হয়, সেই জন্য দাদা রসিকতা কোরে তাঁর নাম দিয়েছেন ‘পায়রাবাবু’। দেখাদেখি— দাদার মুখে শুনে শুনে, গ্রামের পাঁচজনেও বলে পায়রাবাবু।”

    কথা শুনলেম, কি আমি ভাবলেম, আর একটি কথা জিজ্ঞাসা করবার ইচ্ছা হলো। জ্বলন্ত আগ্রহে, জ্বলন্ত কৌতুহলে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “কোথায় পায়রাবাবুর মাতামহালয়?”— ছোটবাবু বোল্লেন, “বীরভূমজেলা।”

    আমার সর্বশরীর কেঁপে উঠলো। আর তখন ছোটবাবুর দিকে ভাল কোরে আমি চাইতে পাল্লেম না। বিস্ময়ের বিকাস হোলে মানুষের নয়নের দীপ্তি কেমন একপ্রকার দাঁড়ায়; বীরভূম জেলার নাম শ্রবণে আমার মনে এক মহাবিস্ময়ের উদয় হয়েছিল। সে সময় আমার চক্ষু দর্শন কোরে ছোটবাবু যদি কোন প্রকার বিস্ময়লক্ষণ বুঝতে পারেন, ভাল হবে না, সেই জন্যই ছোটবাবুর দিকে ভাল কোরে চাইতে পাল্লেম না; মাথা হেঁট কোরে মনে মনে বোল্লেম, “যা ভেবেছি, তাই, সেই লোক না হোলে এতদূর ধড়ীবাজী আর কার মাথায় যোগায়?”

    কি ভাব আমার মনে উদয়, নয়নে আমার কোন ভাবের বিকাস, ছোটবাবু সেটি অনুভব কোল্লেন না, আমার চক্ষের দিকেও চেয়ে দেখলেন না, হঠাৎ আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “পায়রাবাবুর বংশপরিচয় জানতে তোমার এত আগ্রহ কেন?”

    বিভ্রাট! আগ্রহের হেতুবাদটা কি জানাই? অল্পক্ষণ চিন্তা কোরে একট উদাসীনভাবে আমি বোল্লেম, “এমন কিছু আগ্রহ নয়, বিশেষ কোন হেতুও নাই, তবে কি না, পায়রাবাবু একটি পাকালোক, কুকুর বশীভূত করবার বিশেষ ক্ষমতা তিনি ধরেন, কুকুরেরাও তাঁর সঙ্গে বেশ খেলা করে। পুরুষানুক্রমে কুকুরপোষার সখ না থাকলে এতটা দক্ষতা জন্মে না, এইজন্য আমি জিজ্ঞাসা কোরেছিলেম, এ গ্রামে তাঁর কয় পুরুষের বাস? জিজ্ঞাসা করবার আর কোন কারণ ছিল না।”

    আসল কথা আমি গোপন রাখলেম। কথাটা আমি উলটে নিলেম, ছোটবাবু কিন্তু ধোত্তে পাল্লেন না; ধরবার কোন সম্ভাবনাও ছিল না, আমার সংক্ষিপ্ত উত্তর শ্রবণ কোরেই তিনি সন্তুষ্ট হোলেন। বেলাও শেষ হয়ে এলো, বাড়ীতে আমরা ফিরে এলেম।

    সেই রাত্রে আর এক অভিনব কাণ্ড। রাত্রিকালে আমার আহারের পর প্রথম প্রথম ঘরের দরজায় চাবী বন্ধ হতো, এখন বড়বাবু আমার প্রতি সদয়, এখন আর চাবী বন্ধ হয় না। অন্দরেই আমি আহার করি, সামান্য সামান্য দুই একটা কাজের অছিলায় রূপসী আমার শয়ন-ঘরে আসে; নিত্য যেমন আসে, যে রাত্রের কথা আমি বোলছি, সে রাত্রেও সেইরূপ এসেছিল, রাত্রি দশটার পূর্বেই আবার চোলে গিয়েছিল। তার পর, রাত্রি যখন অনেক, বাড়ীর সকলে যখন নিদ্রাগত, সেই সময় রূপসী আবার চুপি চুপি দরজা ঠেলে, টিপি টিপি ঘরের ভিতর প্রবেশ কোল্লে, নিঃশব্দে দরজাটা ভেজিয়ে দিলে। আমি তখনো ঘুমাই নাই। যে রাত্রে কিছু বেশী চিন্তা থাকে কিম্বা কোন প্রকার নূতন চিন্তা উপস্থিত হয়, সে রাত্রে অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমার ঘুম হয় না। আমি জেগেই ছিলেম; যা যা হোচ্ছে, ঘরে তখনো আলো ছিল, বেশ আমি দেখতে পাচ্ছি। রূপসী আমার বিছানার কাছে এসে দাঁড়ালো। কি করে, কি মতলব, জানবার জন্য কপটে সেই সময় আমি নয়ন মুদিত কোল্লেম; অনুমানে বুঝলেম, রূপসী আমার বিছানার উপর বোসলো। কিছু‍ই আমি বোল্লেম না, চক্ষু খুলে একবার চাইলেমও না। রূপসী ক্ষণকাল নিশ্চেষ্ট; তার পর ধীরে ধীরে একবার আমার বাহুমূল স্পর্শ কোল্লে, ধীরে ধীরে নাড়া দিলে, আমি জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতে লাগলেম, অঙ্গসঞ্চালন কোল্লেম না; কি ভেবে রূপসী তখন আমার হাত থেকে আপনার হাতখানা একবার সোরিয়ে নিলে, কিন্তু উঠলো না। ক্ষণকাল চুপ। আবার সেই রকম অঙ্গস্পর্শ।

    কোন প্রকার স্বপ্ন দর্শন কোরে কিম্বা ঘুমের ঘোরে কোন প্রকার শব্দ শ্রবণ কোরে মানুষ যেমন হঠাৎ শঙ্কিত-ভাবে জেগে উঠে, ভাণ কোরে সেই রকম ভাব দেখিয়ে, আমি সেই সময় একবার নয়ন উম্মীলন কোল্লেম; কেবল নেত্রোন্মীলন মাত্র নয়, চমকিতভাবে বিছানার উপর উঠে বোসলেম। কাঁচা ঘুমে আশু জাগরিত লোকে সম্মুখস্থ ব্যক্তিকে যেরূপ চমকিতভাবে ত্বরিত প্রশ্ন করে রূপসীকে সম্মুখে দেখে সেই ভাবে আমি ত্বরিত প্রশ্ন কোল্লেম, “রূপসি! এত রাত্রে তুমি এখানে কি জন্য?”

    শয্যা পরিত্যাগ না কোরেই দিব্য সপ্রতিভ ভঙ্গীতে একটু মৃদুস্বরে রূপসী উত্তর কোল্লে, “আমি তোমারে একটি কথা জিজ্ঞাসা কোত্তে এসেছি। সন্ধ্যার পর যখন এসেছিলেম, তখন মনে ছিল না, সেইজন্য আবার এসেছি।”

    সহসা আমার অন্তরে বিষম সন্দেহের সঞ্চার। সংশয়াকুললোচনে কিঙ্করীর মুখখানে চেয়ে আমি বোল্লেম “জিজ্ঞাসা করবার আর কি তুমি সময় পাও নাই? যখনি ইচ্ছা, তখনি আসছো, যতবার ইচ্ছা ততবার আসছো, একটা কথা জিজ্ঞাসা করবার আর কি সময় হয় না?”

    রূপসী।— সময় হয়, কিন্তু নির্জন হয় না। কথাটা নির্জনে জিজ্ঞাসা করবারই কথা। রোজ রোজ মনে করি, জিজ্ঞাসা কোরবো, এক একদিন ভুলে যাই, এক একদিন কেহ না কেহ এখানে উপস্থিত থাকে, অবসর পাই না।

    আমি।— বুঝলেম, বুঝলেম, আবশ্যকটা বুঝলেম, আচ্ছা, আচ্ছা, বল দেখি, এত রাত্রে কি তোমার জিজ্ঞাসা?

    রূপসী।— জিজ্ঞাসা— জিজ্ঞাসা— জিজ্ঞাসা—

    আমি।— (কিঞ্চিৎ উত্তেজিত-স্বরে) এত রাত্রে ঘুম ভাঙিয়ে বোলতে বোলতে আবার থামা মারো কেন? ঘোরফের আমি বুঝি না কথাটা কি, খোলসা কোরেই বল? কি তুমি জিজ্ঞাসা কোত্তে চাও?

    রূপসী।— কথা? চাই? একটি কথা; বেশী এমন কিছুই না, কেবল একটি মাত্র কথা। তুমি যদি—

    আমি।— (বিরক্ত হইয়া) গৌরচন্দ্রিকা ছেড়ে দাও, আসল কথাটা কি, বোলতে হয় তো বল, না হয় তো চোলে যাও।

    রূপসী।— (আমার দিকে একটু হেলিয়া মৃদুস্বরে) রাগ কর কেন? রাগ কর কেন? ভাল কথাই আমি বোলছি, ভাল কথা বোলতে আমি এসেচি। রোজ রাত্রে তুমি একলাটি এইখানে শুয়ে থাকো, ভয় করে না?

    আমি।— ভয়? —কিসের ভয়? —ভূতের?

    রূপসী।— না, না, না, সে ভয় তো তুমি এক রকম ঘুচিয়ে দিয়েচ সে কথা বোলচি না; বোলচি এই— ভয় অনেক রকম। এত বড় একটা বাড়ী, তাতে আবার লোকে বলে হানাবাড়ী— মানুষ কম, তারাও আবার অন্য মহলে, এ বাড়ীতে একা থাকতে রেতের বেলা তোমার ভয় করে না?

    আমি।— কিছুতেই আমার ভয় নাই। আমি ভয় পাই না, আমার ভয় হয় না, তুমি আবার কি নূতন ভয়ের কথা বোলতে এসেছ? আচ্ছা ধর, ভয় যদি থাকে, তুমিই বা তার কি উপায় কোতে পার?

    রূপসী।— আমি? —আমি? —ভয়ের? —না, —নূতন? —না, — নয়। দেখে অবধি তোমাকে আমি বড় ভালবেসেচি, তোমার জন্যই আমার ভয় হয়। ভালবেসেচি বোলেই সর্বক্ষণ যেন আমার মনে হয়, তুমি হয় তো ভয় পাও।

    আমি।— যেন তোমার মনে হয়, আমি হয় তো ভয় পাই, এ কথার উত্তর আমি কি দিব? তুমি এক জায়গায় চাকরী কর, আমি সেই জায়গায় নূতন এসেছি, তোমার সঙ্গে আমার দেখা-শুনা হয়, আমি ভয় পাই না, তুমি ভাব, হয় তো আমি ভয় পাই, এত টান কিসের? এত ভালবাসা কিসের?

    রূপসী।— টান? —ভালবাসা? এত কথা, এত কথা? —ভাব দেখি হরিদাস! আহাহা! কি সুন্দর নামটি তোমার! হরিদাস! —ইচ্ছে করে, নামটি লিখে মালা গেঁথে, গলায় পরি। —আহাহা! —কি সুন্দর রূপখানি তোমার! — কি সুন্দর মুখখানি তোমার! কি সুন্দর চক্ষু দুটি! —কি সুন্দর চুলগুলি! —আহাহা! রংটকু যেন কাঁচা সোণা! ইচ্ছা করে, সর্বকর্ম ত্যাগ কোরে রাতদিন ঐরূপখানি আমি দেখি! —আহাহা! কি মিষ্ট বচনগুলি তোমার! —কাণে যেন মধু ঢেলে দেয়! —ইচ্ছা করে, রাতদিন ঐ মধুমুখের মধু খেয়ে ভালবাসার ভাবে বিভোর হয়ে থাকি! —আচ্ছা, হরিদাস! কত ভালবাসি আমি তোমারে, আমার প্রাণ তা জানে; তুমি কি আমারে ভালবাস না? —একটুও ভালবাসতে পার না?

    আমি দেখলেম, বেগতিক। এতক্ষণ অতটা বুঝতে পারি নাই। এতক্ষণের পর স্বৈরিণীর মনের ভাব কি তা আমি বুঝে নিলেম। কথার ভাবেই মনের ভাব, কেবল তাও না— শেষকথাগুলো বলবার সময় ছুঁড়ি আমার মুখের কাছে মুখ আনবার উপক্রম কোরেছিল! সামান্য একটা চাকরাণীর এতদূর বুকের পাটা! ত্বরিত গতিতে বিছানা থেকে নেমে ঘরের মাঝখানে গিয়ে আমি দাঁড়ালেম। রূপসী তখন ফ্যাল-ফ্যাল-চক্ষে আমার দিকে চেয়ে থাকলো। আমি তখন একটু জোরে জোরে বোলতে লাগলেম, দেখ রূপসি! এখান থেকে চোলে যাও! এখনি এ ঘর থেকে বেরিয়ে যাও! একতিল যদি বিলম্ব কর, এখনি আমি গোলমাল বাধাব, এখনি আমি বড়বাবুকে ডাকবো। বাড়ীর সব ঘুমন্ত লোকগুলিকে এখনি আমি জাগাব, ভালমুখে এখনো বোলছি, গরীবের মেয়ে, কলঙ্কের ডালি মাথায় কোরে কেন এই চাকরিটি খোয়াবে? বেরিয়ে যাও, শিষ্টশান্ত হয়ে আপনার ঘরে গিয়ে শয়ন কর।”

    আমি ভেবেছিলেম, ঐ সব কথা শুনে চাকরাণীটা ভয় পাবে, ভয় পেয়েই হয় তো ছুটে পালাবে; কিন্তু কি আশ্চর্য, একটুও ভয় পেলে না, বিছানা থেকে লাফিয়ে পোড়ে উগ্রমূর্তিতে আমার দুহাত তফাতে এসে দাঁড়ালো। সেই রোগা শরীর যেন ফুলে উঠলো, কতই যেন দীর্ঘাকার দেখাতে লাগলো, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চক্ষু যেন জোনাকীর মত জ্বোলে উঠলো। স্বৈরিণী তখন আমার মুখের কাছে মুষ্টিবদ্ধ দক্ষিণহস্ত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গৰ্জনস্বরে বোল্লে, “আচ্ছা —আচ্ছা —আচ্ছা! থাকো থাকো —থাকো। থাকো তুমি! —এতখানি ভালবেসেছিলেম, সেই ভালবাসার তুমি এই প্রতিফল দিলে! —আচ্ছা দাও! — দেখবো আমি তোমাকে! কলঙ্কের ডালি! —আরে আমার কলঙ্কের ডালি রে! — দেখবো আমি, কেমন কোরে তুমি কলঙ্কের ডালি ঝেড়ে ফেলো! আমাকে তুমি চেনো না যাদু! —আগুন —আগুন! —আগুন! — উঃ! —বুকের ভিতর আগুন জ্বোলছে! — প্রাণের সঙ্গে ভালবেসে যৌবনধন ডালি দিতে চাইলেম, তার কি না এই ফল! এত অপমান! —এত যন্ত্রণা!— উঃ! দেখবো আমি তোমাকে! — মেয়েমানুষ আমি। দেখবো আমি তোমাকে! কেমন কোরে কলঙ্ক কাটাও, দেখবো আমি! — দেখবো দেখবো! দেখবো!”

    এই রকমে শাসিয়ে শাসিয়ে নাগিনী তখন যেন যষ্টি তাড়িতা নাগিনীর ন্যায় ফোঁস ফোঁস গর্জন কোত্তে কোত্তে চপলাগতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিশ্বাস ফেলে, দরজা বন্ধ কোরে আমি শয়ন কোল্লেম। দুটি ভাবনা আমার নূতন সহচরী। পায়রাবাবুর মাতামহালয় বীরভূমজেলা। যে দিন আমি রাঙামামীর দূত হয়ে ঔষধের মোড়ক বিলী কোত্তে গিয়েছিলেম, সে দিন জানতেম না, বাবুটির নাম পায়রাবাবু; সে দিন জেনেছিলেম সেজোবাবু! মুখখানি দেখে সেজোবাবুকে আমি আর এক বাবু অনুমান কোরেছিলেম, বীরভূমজেলার নাম শুনে, এ রাত্রে সেই অনুমানটি ঠিক মনে হোচ্ছে। ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া বাবরীচুল, সেই সব চুলে কাণদুটি ঢাকা। বাবুটি যে দিন তাজ মাথায় দিয়ে এসেছিলেন, সে দিনের ভঙ্গীতেও কতক কতক বুঝতে পারা গিয়েছিল। ছদ্মবেশী লোকের পরচুল খুলে দিলে আসল রূপ যেমন চেনা যায়, পায়রাবাবুকে নেড়া কোরে দিতে পাল্লে, সেইরূপ চেনা যেতে পারে। বরদারাজ্যে যে কথা আমার শুনা হয়েছে, সে কথা যে ঠিক নয়, এমন আমি মনে কোত্তে পাচ্ছি না। একটা গল্প মনে পোড়লো। একগ্রামে একটি বাবু ছিল; বাবুটি কুচকুচে কালো, লম্বে প্রায় চারি হাত, অঙ্গে মাংস অনেক, মস্তকটি অল্প অল্প চুলে ঢাকা, বাবুর মাথায় কি রকম রোগ ছিল, অধিক চুল রাখলে সেই রোগটা বাড়তো, সুতরাং হপ্তায় হপ্তায় বাবুটিকে নেড়া হোতে হতো। বাবুটির দুটি তিনটি মোসাহেব ছিল, বাবুর নেড়ামূর্তি দর্শন কোরে সেই মোসাহেবরা বৃহৎ বৃহৎ তারিফ কোত্তো। কেন কোত্তো, তার কারণ ছিল। গজকুম্ভের ন্যায় বাবুর মাথায় উঁচু নীচু দুটি তিনটি ঢিবি; কেশশূন্য হোলে সেই ঢিবিগুলি বেশ জেগে উঠতো, অত্যন্ত কদাকার দেখাতো। মোসাহেবেরা সেই সময় বাবুর মুখের কাছে হেঁট হয়ে পাঁচজনের সাক্ষাতে আমোদ কোরে বোলতো, “নেড়া হোলে আমাদের বাবুর চেহারার যেমন খোলতা হয়, আর কাহারো চেহারা তেমন খোলে না। অনেকেই ত সময়ে সময়ে নেড়া হয়ে থাকে, ছি ছি! কিম্ভুতকিমাকার দেখায়। আমাদের বাবু নেড়া হোলে কার্তিকের মত রূপ ফোটে।”

    গল্পের ভাব এইরূপে। পায়রাবাবুকে যদি সেইরূপ প্রশংসায় ফালিয়ে তুলে একবার নেড়া কোরে দেওয়া যায়, তা হোলেই রঙ-তামাসা ধরা পড়ে। সজ্জাপারিপাট্য ভদ্রলোকের মত;— “দেখি তোমার চুল কেমন, দেখি তোমার কাণ কেমন,” হঠাৎ ভদ্রলোককে এমন কথা বলা ভদ্রলোকের উচিত হয় না। ছোটবাবুকে সুপারিশ কোরে পায়রাটিকে একদিন নেড়া করাই সুপরামর্শ। প্রথম চিন্তাটার সেই পর্যন্তই বিরাম। দ্বিতীয় চিন্তা রূপসী দাসীর অভিসার। রূপসীর অত্যন্ত দুঃসাহস! কুপথে আমার প্রবৃত্তি লওয়াবার অভিলাষে দুশ্চারিণী ঘোর নিশীথসময়ে এই ঘরে প্রবেশ কোরেছিল, হতমনোরথ হয়ে প্রতিশোধের ভয় দেখিয়ে গেল। নাগিনী আমারে দেখবে, নাগিনী আমারে দেখাবে, আমার মাথায় কলঙ্কের ডালি চাপাবে, এই রকম ভয়প্রদর্শন। পারে তা, দুষ্টবুদ্ধিতে কুলটারা সব কোত্তে পারে, জানি; আমি কিন্তু ভয় পাচ্ছি না। মনে জানছি, সামান্য একটা চাকরাণীর কথায় আমার ভয় পাবার কোন কারণ নাই; চরিত্রের প্রতি আমার অধিক দৃষ্টি, চরিত্ররক্ষায় সর্বদা আমি সাবধান, পাপিনী আমার কি প্রকারে অপকার কোত্তে পারবে? —কিছুই পারবে না। এই বিশ্বাসে সে ভাবনাটা আমি মন থেকে দূরে কোরে দিলেম; সে পক্ষে একরকম নিশ্চিন্ত হয়েই থাকলেম।

    রূপসীকে আমি বার বার নাগিনী বোলে উল্লেখ কোচ্ছি; দৃষ্টান্তে নাগিনী বোলছি না, বাস্তবিক তার একটা নাম যেন নাগিনী, অনেকেই এইরূপে বিবেচনা কোরবেন, পাঠকের মনে সংশয় জন্মিবারও সম্ভাবনা; সে সংশয়ের হেতু আমি রাখবো না। চাকরাণীর কাজ করে, কিন্তু চেহারায় রূপসীকে চাকরাণী বোলে বোধ হয় না, এই কারণে রামদাসকে একদিন আমি জিজ্ঞাসা কোরেছিলেম, রূপসীটা কে?—রামদাস বোলেছিল “ছোটবাবুর জন্মের অগ্রে এই বাড়ীতে একজন চাকর ছিল, তার নাম লবকুমার লাগ; তারা স্ত্রীপুরুষে এই বাড়ীতে থাকতো, তাদেরই কন্যা ঐ রূপসী। ছোটবাবুর যখন জন্ম হয়, রূপসী তখন ছোট ছিল, বড় হয়ে এখন এই বাড়ীতেই দাসীবৃত্তি কোচ্ছে।”—বঙ্গের কোন কোন জেলার ইতরশ্রেণীর লোকেরা দন্ত্য “ন” স্থলে “ল” উচ্চারণ করে, সেই অভ্যাসে নবকুমার নাগকে রামদাস বোলেছিল, ‘লবকুমার লাগ’; সুতরাং নাগের কন্যাকে আমি নাগিনী বোলে পরিচয় দিলেম।

    সে রাত্রের দুটি চিন্তাকেই ঐ প্রকারে বিদায় দিয়ে আমি নিদ্রাভিভূত হয়েছিলেম। পরদিন প্রভাতে আমার ঘরের নিয়মিত কার্যগুলি রামদাস এসে নির্বাহ কোরে গেল, রূপসী এলো না। তদবধি রূপসী আর আমার সঙ্গে দেখা করে না, আমি যখন অন্দরে যাই, রূপসী তখন আমারে দেখে, মুচকে মুচকে দুষ্টহাসি হেসে, মুখ ঘুরিয়ে অন্য ঘরে প্রবেশ করে। ক্রমাগত একপক্ষ এই ভাব। কিছুই আমি গ্রাহ্য করি না।

    পক্ষান্তে এক রাত্রে আমি আপন কক্ষে শয়ন কোরে আছি, রাত্রি অনুমান দুই প্রহরের অধিক, অন্দরের ভিতর একটা গোলমাল উঠলো দুই তিনজনের কথা, একটি কণ্ঠস্বর কিছু উচ্চ উচ্চ। সে বাড়ীর সদর অন্দর একমহলে, অতি অল্পমাত্র ব্যবধান, এ কথা পূর্বেই আমি বোলেছি। যে ঘরে আমি শয়ন করি; সে ঘর থেকে অন্দরের উচ্চ উচ্চ কথা বেশ শুনা যায়; বিশেষতঃ গভীর রাত্রে। গোলমালটা ক্রমশই বাড়তে লাগলো। বিছানা থেকে আমি উঠলেম। রূপসীর দুর্বাসনা-প্রকাশের পর থেকে শয়ন-ঘরের দরজায় আমি রাত্রিকালে অর্গলবদ্ধ কোরে রাখি, নিঃশব্দে অর্গলমুক্ত কোরে চুপি চুপি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেম; এত রাত্রে বাড়ীর ভিতর কিসের গোলমাল, খানিকক্ষণ কান পেতে শুনলেম। স্ত্রীলোকের কন্ঠস্বর। স্বর বোলছে, “দেখ ঠাকুরপো, দেখ! তোমার দাদার কীর্তিখানা এসে দেখ; মামীর ঘরে রাসলীলা হোচ্ছে, তোমার দাদা দেই লীলার ঠাকুর হয়েছেন; দরজা খুলে একবার বেরিয়ে এসে দেখ!”

    এই কথার পর একটা বদ্ধ দরজায় গুম গুম কারে শব্দ হোতে লাগলো; একটা দরজার খিলখোলা শব্দও আমি শুনতে পেলাম। তার পর আবার সেই পূর্বস্বরের উচ্চ ধ্বনি। ভূত-শাসনের পরদিন থেকে বড়বাবুর অনুমতিক্রমে বাড়ির বৌমা দুটি আমার সঙ্গে কথা কন; স্বরে বুঝলেম, বড়-বৌমার কণ্ঠস্বর। ডেকে ডেকে তিনি বোলছেন, “ডাকো ঠাকুরপো, ডাকো! চক্ষের উপর দেখ, এই ঘরেই তোমার দাদা! যেদিন থেকে ভূতের উপদ্রব থেমেছে, সেইদিন থেকেই এই রকম হোচ্ছে। দরকার আছে, কার্য আছে, বন্ধুর বাড়ী নিমন্ত্রণ আছে, এই রকম এক একটা অছিলা কোরে বড়বাবু রোজ রোজ সন্ধ্যাকালে বেরিয়ে যান, অনেক রাত্রে ফিরে আসেন, কিছুই আমি জানতে পারি না, তক্কে তক্কে থেকে আজ রাত্রে আমি ধোরে ফেলেছি; জেগেছিলেম, রাঙামামীর ঘরে দুজন মানুষের কথা শুনে, দুজনের হাসির শব্দ পেয়ে, বারান্দায় আমি বেরিয়েছি, কথার আওয়াজে মানুষটিকেও চিনতে পেরেছি; ডাকাডাকি কোল্লেম, কতবার দরজা ঠেল্লেম, কত বকাবকী কোল্লেম, এখন আর সাড়া-শব্দ নাই। নিশ্চয়ই এই ঘরে তোমার দাদা আছেন। কি কেলেঙ্কার! কি কেলেঙ্কার! ডাকো তুমি! দাদাকে ডাকতে সাহস না হয়, মামীকে ডাকো। সব ভুর আজ ভেঙে দিব!”

    এই সব কথা আমি শুনলেম; শব্দে জানতে পাল্লেম, মামীর ঘরের দরজা খোলা হলো। বড়বাবু রেগে রেগে বোলতে লাগলেন, “কি— কিক্ক— কি? হয়েছে কি? অত হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি কিসের জন্য? রাঙামামীর পেটব্যথা কোচ্ছিল, যন্ত্রণায় ছটফট কোচ্ছিল, আমাকে ডেকেছিল, তাই আমি ওষুধের ব্যবস্থা কোত্তে এসেছিলেম; দেখো না এসে, ওষুধের শিশি! হয়েছে কি?”

    বড়-বৌমা আবার চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ব্যঙ্গ কোরে বোল্লেন, “আহাহা! কি আমার ডাক্তার গো! রসের নাগর, গুণের সাগর! পেটের ব্যথার ওষুধ দিতে এসেছিলেন! শোনো ঠাকুরপো, শোনো। তোমার দাদাবাবুর ডাক্তারী বিদ্যার পরিচয়টা একবার শুনে রাখো! ছি ছি ছি! ভদ্রলোকের বাড়ীতে এ কি কারখানা! গলায় দড়ী দিয়ে মোত্তে ইচ্ছা হয়!”

    ছোটবাবুর কোন কথা আমি শুনতে পেলেম না; বড়বাবুও চাপ কোল্লেন, বোধ হলো যেন অন্যদিকে তিনি সোরে গেলেন। আবার বড়-বৌমার কণ্ঠস্বর। মামীকে লক্ষ্য কোরে তিনি বোলতে লাগলেন, “আর তোমাকেও বলি বাছা, তুমি রাঙামামী কুটুম্বুর মেয়ে, কুটম্বর বাড়ীতে রয়েছ, এ সব ঢলাঢলি কেমন কোরে কর? লজ্জা হয় না? ধিক্কি জীবন আর কি! মামী মায়ের সমান, ভাগ্নে সন্তান তুল্লি, ভাগ্নে নিয়ে এই সব কাণ্ড! দড়ী জোটে না? দড়ী কলসী নিয়ে আঘাটায় যাও। সব জ্বালা জুড়িয়ে যাবে; তোমারও যাবে, আমাদেরও যাবে। আমি না জানি কি? তোমাকে জানি, পায়রাকেও জানি, কি রকমে ভূতের নৃত্য হতো, তাও জানি, সব আমি জানি, হাঁস, পায়রা, হীরামন, পেঁচা, দাঁড়কাক, কত রকম ডাক্তার যে তোমার পেটের ব্যথার ওষধ দিতো, কিছুই আমার জানবার বাকী নাই! এখন কি না ঘরের ভিতর বৃন্দাবন বসালে! ভাগ্নে নিয়ে নীলে-খেলা! তুমি রাধা, তিনি শ্যাম! এইবার একটি কাঁদে বাড়ী বলরাম এলেই ঠিক হয়! কি ঠাকুরপো! বলরামের পালাটা গাইতে পারবে? ধিক— ধিক— ধিক! এখন আমাদের মরণই মঙ্গল!”

    এই সময় ছোটবাবু বোধ হয়, কোন রকম থাবাথুবি দিয়ে গোলমালটা থামিয়ে দিলেন, আর কোন উচ্চবাচ্য আমি শুনতে পেলেম না। খানিকক্ষণ সমস্তই চুপচাপ; চুপি চুপি ফিরে এসে ঘরের দরজা বন্ধ কোরে বিছানার উপর আমি বোসলেম। অনিচ্ছায় আমার নাসারন্ধ্র থেকে দুটি নিশ্বাস বহির্গত হলো। কি পাপের ভোগ! ভাগ্যশেষে এমন বাড়ীতেও আমি বাস কোচ্ছি! রক্তবিচার নাই! ওঃ! সেই কথাই বটে বড়-বৌমা ঠিক ধোরেছেন! আমার মনে মনেও একটা খটকা ছিল! ঔষধের মোড়ক নিয়ে আমি রাঙামামীর দৌত্যকার্য কোরেছিলেম! কিসের ঔষধ, এখন আমি বুঝলেম। পায়রাবাবুই রাঙামামীর প্রেমের নাগর! কেবল একটি নয়, বৌমার কথায় তাও আমি বুঝতে পাল্লেম। পালায় পালায় ছাদের উপর অনেক রকম ভূত এসে দক্ষযজ্ঞ ভোগ কোত্তো! ভূতের পালা এখন ফুরিয়ে গিয়েছে, এখন ঘরে ঘরেই বৃন্দাবন! ও! কত দিনে যে এই পাপপুরী থেকে আমি পরিত্রাণ পাব, কিছুই বুঝতে পাচ্ছি না। দুরাচার রক্তদন্ত কত রকম পাপের মূর্তি যে আমাকে দেখাচ্ছে, কত রকম পাপ-কথাই আমাকে শুনাচ্ছে, আমার অন্তরাত্মাই তা জানতে পাচ্ছেন। আবার আমার নাসারন্দ্রে অগ্নিশিখা তুল্য তিনটি দীর্ঘনিশ্বাস বহির্গত।

    বোসে বোসেই আমি রজনীপ্রভাত কোল্লেম। প্রভাতে রামদাস এসে ঘরের কাজগুলি সেরে দিয়ে গেল। রাত্রে কিছু আমি জেনেছি, কিছু আমি শুনেছি, রামদাসকে সে সব কথা কিছু আমি বোল্লেম না। ক্রমে ক্রমে বেলা হলো; কথায় কথায় আমি শুনলেম, শেষরাত্রে বড়বাবু কোথায় চোলে গিয়েছেন, কেহই কিছু বোলতে পারে না। দিন গেল, সন্ধ্যা হলো, রাত্রি এলো, বড়বাবু বাড়ী এলেন না। সকলেই উদ্বিগ্ন। কর্তাগৃহিণী বাড়িতে নাই, বড়বাবু কর্তৃত্ব কোচ্ছিলেন, তিনিও অদৃশ্য! আমার মনে কিছু ভয়ের সঞ্চার হলো! সর্বদাই আমি চিন্তাযুক্ত।

    এই ঘটনার পর আট দশ দিন অতিক্লান্ত। বড়বাবুর দেখা নাই। মামীর ঘরে বৃন্দাবন-লীলার রজনীতে যে সকল কাণ্ড হয়েছিল, এই আট দশ দিনের মধ্যে সে প্রকাণ্ড কাণ্ডের কোন কথা কাহার মুখে প্রকাশ পেলে না; তুষারাবৃত আগ্নেয়গিরির ন্যায় বাহিরে বাহিরে বাড়ীখানা এক রকম ঠাণ্ডা। বোল্লেম আমি ঠাণ্ডা, কিন্তু আমার ভাগ্য-চক্রের ঘর্ষণে এক অভাবনীয় অগ্নিস্ফুলিঙ্গের উৎপত্তি! সেই রুদ্রাক্ষগ্রামেই বড়-বৌমার পিত্রালয়। একটি ভ্রাতুষ্পুত্রের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে বৌমা পিত্রালয়ে যাবেন, রামদাস তাঁর সঙ্গে যাবে, রামদাসের মুখে সেই কথা আমি শুনলেম। আমার মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল। এই দূরন্ত সংসারে বড়বাবু আমার প্রতি সদয়, ছোটবাবু আমার বন্ধু, আমার প্রতি বড়-বৌমার পুত্রতুল্য স্নেহ, রামদাসটিও আমার বিশেষ অনুগত, বাধ্য; বড়বাবু কোথায় চোলে গিয়েছেন, বড় বৌমাও বাড়ীতে থাকছেন না, রামদাসও থাকছে না। বোলতে গেলে আমি এক রকম অসহায় হব। কেন ভাবি অসহায়? —অকস্মাৎ যদি কোন বিপদ ঘটে, ছোটবাবুটি ছাড়া আর কাহাকেও আমি রক্ষাকর্তা পাব না— আর কেহই আমার সহায় হবে না। ছোট-বৌমাটি ছেলে-মানুষ, যদিও তাঁর স্বভাব অতি নির্মল, তথাপি সংসারের কোন কার্যে তাঁর তাদৃশ হাত নাই। কেন এটা আমি ভাবলেম, বিপৎপাতের ভাবী আশঙ্কা হঠাৎ কেন আমার মনে এলো, সে কথা আমি বোলতে পারি না। ঘুঘুর বাসায় আমি আগুন দিয়েছি, কুকুরের মুখোসে গুলী কোরে ভূতের বাসা ভেঙ্গে দিয়েছি, রাঙ্গামামী আমার শত্রু হয়ে আছেন, অভিসারিকার কুৎসিত অভিলাষে আমি উপেক্ষা কোরেছি, রূপসী আমার শত্রু হয়ে আছে, বড়-বৌমা বাড়ী থেকে চোলে গেলে কি জানি কে কোন দিক থেকে কি প্রকার ফ্যাঁসাদ বাধায়, সেই জন্যই আমার ভয়। ভয়ত্রাতা মধুসূদন। বিপদ্‌বারণ মধুসূদনকে স্মরণ কোরে সে ভয়টা তখন আমি চেপে রাখলেম।

    যে দিন আমি এই সব কথা ভাবলেম সত্য সত্যই রামদাসকে সঙ্গে কোরে বড়বৌমা সেইদিন বৈকালে ভ্রাতুষ্পুত্রের অন্নপ্রাশন দেখতে গেলেন। তিনদিন আসবেন না, রামদাসের মুখে সে কথাও আমি শুনেছিলেম। বেলাটুকু চোলে গেল, রামদাস নাই, রূপসী আসে না, সেই পাচিকাই সন্ধ্যাকালে আমার ঘরে আলো দিলেন, রাত্রিকালে আহারের পূর্বে যা কিছু আবশ্যক, সেই প্রাচীনার দ্বারাই অগত্যা আমি সেগুলি সাধন করাতে বাধ্য হোলেম। পরদিন প্রভাতেও তিনি আমার গৃহকার্য নির্বাহ কোরে দিলেন। বেলা দুই প্রহর পর্যন্ত আমি এক প্রকার গৃহশান্তি উপভোগ কোল্লেম; সন্ধ্যার পরে বিনামেঘে বজ্রপাত!

    আহারান্তে ছোটবাবুর সঙ্গে আমি বেড়াতে বেরিয়েছিলেম, সন্ধ্যার পর ফিরে এসে দেখি, যে ঘরে আমি থাকি, সেই ঘরে আমার বিছানার উপর দুটি লোক; —একটি যুবা, আর একটি অর্ধ বৃদ্ধ। দরজার কাছে বাড়ীর দাসী আর পাচিকা। লোক-দুটির বদন গম্ভীর। আমরা আসবার পূর্বে কি তাঁরা বলাবলি কোচ্ছিলেন, আমাদের দেখে হঠাৎ থেমে গেলেন। লোক-দুটিকে পূর্বে আমি দেখি নাই, গৃহে আমরা প্রবেশ করবামাত্র তাঁরা পরস্পর মুখে-চাহাচাহি কোরে কেমন একপ্রকার ভ্রকুটী-ভঙ্গীতে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। তাঁদের সেই গম্ভীর বদনে সেই সময় একপ্রকার বিকৃতভাব লক্ষিত হলো। রূপসীর মুখে চক্ষে উল্লাসলক্ষণ দেখলেম, বিজয়োল্লাসে বীরপুরুষের মুখ-চক্ষু যেরূপ প্রফুল্ল হয়, ঠিক্ যেন সেইরূপ; ভাব আমি কিছুই বুঝতে পাল্লেম না।

    ছোটবাবুর দিকে চেয়ে সেই দুটি লোকের মধ্যে একটি লোক যেন কিছ উদাসীনভাবে বোলেন, “বসো মিহিরচাঁদ।—বস্,” এই পর্যন্ত কথা; আমারে কেহই কিছু, বোল্লেন না। ছোটবাবু বোসলেন। উদ্বেগযুক্ত হয়ে আমিও তাঁর কাছে বোসলেম। আমার দিকেই লোকদুটির ঘন ঘন দৃষ্টি। কিয়ৎক্ষণ সকলেই নীরব। নূতন লোকেরা কি জন্য এসেছেন, ছোটবাবু সেই কথা জিজ্ঞাসা কোরবেন, উপক্রম কোচ্ছেন, এমন সময় একটি বাধা। লোকটি এক নিশ্বাস ফেলে হঠাৎ বোলে উঠলেন, “দিন যায় ত ক্ষণ যায় না। কার মনে যে কি আছে, কে যে কখন কি করে, বুঝে উঠা ভার! দিনের বেলা বাড়ীতে চুরি হয়েছে, বড় আশ্চর্য কথা।”

    যে লোকটির বয়স অধিক, তিনি প্রথম বক্তা। ছোটবাবুর বিস্ময়সূচক প্রশ্নে তিনি উত্তর কোল্লেন, “হাঁ গো, তোমাদেরই বাড়ী,—তোমারই ঘরে! স্নান করবার সময় ছোট-বৌ-মা গলার হারছড়াটি খুলে একটা তাকের উপর রেখেছিলেন, বৈকালে চুলে বাঁধবার সময় খুঁজে দেখলেন হারছড়াটি নাই। তুমি বাড়ীতে ছিলে না, তোমার মামী, পাচিকা ব্রাহ্মণী, বৌমা নিজে আর ঐ রূপসী অনেক জায়গায় অনেক খুঁজেছে, কোথাও সে হার নাই। তোমার মামীর আদেশে রূপসী ছুটে গিয়ে আমাকে সংবাদ দিয়েছিল, বরদাকান্তকে সঙ্গে কোরে তাই আমি এখানে এসেছি। ব্যাপারখানা কি, কিছুতেই তো জানা যাচ্ছে না। ঘরের ভিতর থেকে জিনিস গেল, কেহই খোঁজে পেলে না, এ বড় আশ্চর্য কথা! এসে আবার শূনলেম, রূপসী বোল্লে, ‘সেই ঘরে পালঙের নীচে জলখাবার দুটি গেলাস ছিল, তাও পাওয়া যাচ্ছে না।’ তাজ্জব ব্যাপার! দিনের বেলা বাড়ীর ভিতর কি চোর প্রবেশ কোরেছিল? বাড়ীতে এখন বেশী লোক নাই, এ কাৰ্য কার তবে?”

    পূর্ণ বিশ্বাস না কোরে একটু তাচ্ছল্য-ভাবে ছোটবাবু বোল্লেন, “আছে হয় তো কোথায়, কে হয় তো কোথায় রেখেছে, এখন মনে কোত্তে পাচ্ছে না, একটা ভাল কোরে খুঁজলেই পাওয়া যাবে; চুরি কোত্তে কে আসবে?”

    তিন পা এগিয়ে এসে, হাত নেড়ে নেড়ে রূপসী বোলতে লাগলো “খুঁজতে কি আর আমরা বাকী কোরেছি? তন্ন তন্ন কোরে খুঁজেচি; কোথাও নাই! কোথাও নাই! নিশ্চয় চুরি গিয়েছে! ছোট ছোট সিকি আধূলি নয়, দুটো একটা পয়সা নয়, মস্ত একছড়া দামী হার, বড় বড় দুটো জলের গেলাস, কোথায় লুকিয়ে থাকবে? উড়ে যাবে কি?”

    বিরসবদনে পাচিকা ঠাকুরাণী মৌনবতী। ছোটবাবু চিন্তাযুক্ত। আমি বিস্ময়াপন্ন। কথায় কথায় আমি জানতে পাল্লেম, দুটি আগন্তুক ভদ্রলোকের মধ্যে যিনি বয়োধিক, তিনি এই গ্রামের একজন বদ্ধির্ষ্ণু লোক; — দলপতি; বরদাকান্তটি তাঁর কনিষ্ঠ সহোদর। পল্লীগ্রামে কোন প্রকার অকু ঘটনা হোলে গ্রামের মোড়ল-চৌকিদারকে মধ্যস্থ রেখে তদারক করা হয়, সেই হিসাবে এই দলপতি-মহাশয় এই গ্রামের মোড়ল; নাম রূপচাঁদ ভঞ্জ। রূপসীর বাক্যাবসানে ছোটবাবুকে সম্বোধন কোরে ভঞ্জবাবু বোল্লেন, “কথাও ত ঠিক্ বটে; ছোট-খাটো জিনিস নয়, বড় বড় জিনিস, ঘরের ভিতর কোথাও থাকলে কেনই বা খুঁজে পাওয়া যাবে না? চল দেখি যাই, তুমিও চল, রূপসীও চলুক, ব্রাহ্মণীও চলুন, আমিও তোমাদের সঙ্গে যাচ্ছি। ভাল কোরে অন্বেষণ কোল্লে, বোধ হয়, পাওয়া যেতে পারে। তাতেও যদি না পাওয়া যায়, তবে নিশ্চয় চুরি; নিশ্চয়ই চোরের কাজ।”

    দলপতিবাবু এই কথাগুলি যখন বলেন, তখন কটমট চক্ষে বারকতক আমার দিকে চেয়েছিলেন; ভিতরে ভিতরে রেগেছিলেন, দন্তে দন্তঘর্ষণের কড় মড় শব্দও আমার কর্ণে এসেছিল। আমি কিন্তু এতক্ষণের মধ্যে একটিও কথা কই নাই, কেহ আমাকে কোন কথা জিজ্ঞাসাও করেন নাই, বাবুদের মুখের দিকে চেয়ে চুপ কোরে আমি বোসে ছিলেম। দলপতির অনুরোধে ছোটবাবু উঠে দাঁড়ালেন, দলপতিও উঠলেন, বরদাকান্ত বোসে থাকলেন। যাবার সময় পশ্চাতে একবার চেয়ে ছোটবাবু আমারে বোল্লেন, “যাবে হরিদাস? এসো!”

    মুখ ফিরিয়ে সচকিতে দলপতি জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কারে তুমি ডাকছো?— কে যাবে?—হরিদাস?— কে হরিদাস?”

    আমার দিকে হস্তনির্দেশ কোরে ছোটবাবু উত্তর দিলেন, “এই ছোকরার নাম হরিদাস; এটি এখন আমাদের বাড়ীতেই আছে; বেশ ছোকরা, স্বভাব-চরিত্র বড় ভাল; চরিত্রে কিছুমাত্র দোষ নাই।”

    মুখ ভারী কোরে বক্রদৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে দলপতি-মহাশয় ছোটবাবুকে বোল্লেন, “না না, অন্যলোকের সেখানে যাবার কোন দরকার নাই; তোমাতে আমাতে গেলেই চোলবে; এসো তুমি।”

    দলপতির সঙ্গে ছোটবাবু অন্দরের দিকে গেলেন, ঘনপদক্ষেপে সর্বাঙ্গ সঞ্চালন কোরে রূপসী তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে চোল্লো; সর্বপশ্চাতে ব্রাহ্মণী-ঠাকুরাণীও চোল্লেন। ঘরে থাকলেম আমি আর বরদাকান্ত।

    আমি আর বরদাকান্ত। উভয়ের নিকটে উভয়েই আমরা অপরিচিত। পরিচয়ের অবসর উপস্থিত। আমার পরিচয় যৎসামান্য। বিদেশী বালক, নানা বিপাকে ঠেকে নানা স্থান পর্যটন কোরে গ্রহগতিকে এই গ্রামে এসে উপস্থিত হয়েছি, এই বাড়ীতেই আছি, এই পর্যন্ত আমার পরিচয়; বরদাকান্তের পরিচয় পূর্বে একটু প্রকাশ হয়েছিল, দলপতিবাবুর সহোদর তিনি; কোথাও কাহারো চাকুরী করেন না, সর্বদা বাড়ীতেই থাকেন, পিতার একখানি তালুক আছে, সেই তালুক-সংক্রান্ত বিষয়কৰ্ম দেখেন শুনেন, স্বহস্তেও লেখাপড়া করেন। পরিচয় এই পর্যন্ত। অতঃপর আর কি কথা? —নূতন লোকের সঙ্গে নূতন কথা আমার কিছুই ছিল না, কিন্তু দুজনে এক স্থানে বোসে চুপ কোরেও থাকা যায় না; প্রসঙ্গ-শূন্য দুটি একটি ফাঁকা ফাঁকা কথা তাঁরে আমি বোলছি, তিনি এক একবার হু হাঁ দিচ্ছেন, এক একবার চুপ কোরে থাকছেন; এক একবার আমি তাঁর মুখের দিকে চাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি, কথার দিকে তাঁর মন নাই। কোন বিষয় শ্রবণ কোত্তে কোত্তে শ্রোতার মনে ঘৃণার সঞ্চার হোলে তাঁর মুখের ভাব যেমন হয়, বরদাকান্তের মুখের ভাব তখন সেই প্রকার। কটাক্ষভঙ্গীতে যখন তিনি আমার প্রতি দৃষ্টিপাত করেন, তখন সেই কটাক্ষে বিলক্ষণ ঘৃণার লক্ষণ প্রকাশ পায়। মনে মনে আমার সন্দেহের উদয়।

    কেন তিনি আমারে ঘৃণার চক্ষে দেখেন? তাঁর চক্ষে আমি নূতন, আমার চক্ষেও তিনি নূতন মানুষ, এ ক্ষেত্রে ঘৃণার ভাব কেন আসে? নূতন দর্শনে পরস্পর অনুরাগ-বিরাগ একপ্রকার অস্বাভাবিক। নাটক-নবন্যাসে দুই একটি নায়ক-নায়িকার প্রথম-দর্শনে অভাবনীয় অনুরাগলক্ষণ পাঠ করা যায় বটে, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে সে লক্ষণের তাদৃশ মিলন অনুভূত হয় না। সেই কথাই আমি ভাবছি, ছোটবাবুর সঙ্গে দলপতি মহাশয় সেই ঘরে ফিরে এলেন। দলপতির মুখখানা তখন অত্যন্ত ভার ভার; ছোটবাবুর মুখে সংশয়মাখা। দরজার দিকে আমি চেয়ে দেখলেম, এক ধার থেকে কে একজন উঁকি মেরে মেরে দেখছে। ভাল কোরে দেখে চিনলেম, উঁকি মারছিল রূপসী, রূপসীর চক্ষু যেন তখন কি আহ্লাদে ফিক ফিক কোরে হাসছিল, ভাব কিছু আমি বুঝতে পাল্লেম না।

    একটা কর্তব্যকর্ম সমাধা কোরে যাঁরা ফিরে এলেন, তাঁদের মুখ দেখে সে কার্যের ফলাফল কিছুই বুঝা গেল না; ফলটা ভাল কি মন্দ, কিছুই প্রকাশ পেলে না। অনুমানে আমি যেন মন্দটাই ভেবে নিলেম। তাঁরা বোসলেন না, স্তম্ভিতভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গুটিকতক কথা বলাবলি কোল্লেন। সে সব কথার মর্ম এইরূপ:— “কর্তার ঘরে চাবি বন্ধ, বড়বাবুর ঘরেও চাবি বন্ধ, যে কয়েকটি ঘর খোলা আছে, সেই সব ঘরে তল্লাস করা হয়েছে, চোরা জিনিস পাওয়া যায় নাই। বরদাবাবুকে সম্বোধন কোরে রূপচাঁদবাবু বোল্লেন, তোমরা একবার নেমে দাঁড়াও; এই ঘরটা একবার অন্বেষণ কোত্তে হবে।” বরদাবাবু বিছানা থেকে নামলেন, আমারে কেহই কিছু বোল্লেন না, তথাপি আমিও নামলাম।

    রূপচাঁদবাবু স্বয়ং আমার বিছানাটী উলট-পালট কোরে বিশেষরূপে নিরীক্ষণ কোল্লেন, কিছুই দেখতে পেলেন না। শেষকালে আমার মাথার বালিশের ওয়াড় খুলে অন্বেষণ করবার সময়ে ওয়াড়ের ভিতর থেকে একছড়া হার সোরে পোড়লো। বিস্ময়ব্যঞ্জক চীৎকারস্বরে অনুসন্ধানকারী বোলে উঠলেন,— “এই বটে! এই বটে! দেখ দেখি তোমরা, এই সেই হার কি না?”

    ছোটবাবুর মুখখানি এই সময় অত্যন্ত ম্লান হয়ে এলো। ম্লাননয়নে তিনি একবার আমার মুখের দিকে চাইলেন। তাঁর চক্ষু দুটী যেন ছল ছল কোত্তে লাগলো। নেত্রপ্রান্তে অশ্রুবিন্দুও দেখা গেল। রূপসী সেই সময় ছুটে এসে হার-ছড়াটা হাতে কোরে নিয়ে ত্বরিতস্বরে বোল্লে, “এই সেই হার, এই সেই হার। বাপ্ রে! আমার প্রাণে যে ভয় হয়েছিল, সে কথা আর বোলতে পারি না; চাকরাণী-মানুষ আমি, গরীবের মেয়ে, বাড়ীর লোকেরা হয় তো মনে কোচ্ছিলেন, আমিই চুরি কোরেছি। ধর্ম আছেন কি না, চারিযুগের সাক্ষী তিনি; আমার কোন পুরুষে চোর নয়, ধর্মের কাছে আমি খাঁটী আছি। ধর্মের বিচারে ধর্মে ধর্মে আজ রক্ষা পেলেম।”

    এই সব কথা বোলতে বোলতে কেমন একপ্রকার নয়নভঙ্গী কোরে রূপসী বার বার আমার দিকে চাইতে লাগলো; খানিকক্ষণ কি একটু ভেবে ভেবে আবার বোলে উঠলো, “হার যখন এ ঘরে পাওয়া গিয়েছে, গেলাস-দুটোও তবে এই ঘরেই পাওয়া যাবে। দেখ তোমরা ভাল কোরে; খোঁজ তোমরা ভাল কোরে। এই ঘরেই পাওয়া যাবে। আমার যেন মনে নিচ্ছে, এই ঘরেই—”

    আর তারে বেশী কথা বোলতে না দিয়ে দলপতি-মহাশয় ঘরের এধার ওধার, শয্যাতল, গবাক্ষতল, সমস্ত স্থান অন্বেষণ কোল্লেন, পাকলচক্ষে ঘন ঘন আমার দিকে চাইলেন, অন্বেষণ বিফল হলো। গেলাস পাওয়া গেল না।

    ঘরের উত্তর দেয়ালে এক হাত লম্বা এক হাত চওড়া একখানা তক্তা ঢাকা; এ বাড়ীতে এসে অবধি সেই তক্তাখানা আমি দেখে আসছি। কেন যে সে তক্তা সেখানে আছে, তক্তার ভিতর কি বস্তু যে রক্ষিত আছে, একদিনের জন্যও সেটা আমার জানবার ইচ্ছা হয় নাই; খুলিও নাই, দেখিও নাই, জানিও না, জানতেমও না। হন হন কোরে চোলে গিয়ে রূপসী সেই তক্তাখানা খুলে ফেল্লে, একধারে কবজা আঁটা ছিল, তক্তাখানা ঘুরে এসে দেয়ালের গায়ে লাগলো, ভিতরটা ফাঁক হয়ে গেল;— ছোট একটী কুলুঙ্গী,— সেই কুলুঙ্গীর ভিতর দুটী বড় বড় কাঁসার গেলাস।

    “এই যে গেলাস! এই যে গেলাস! যা আমি মনে কোরেছিলাম, ঠিক তাই মিলে যাচ্ছে। কার মনে যে কি আছে, কে বোলবে? রাঙামামী বোলছিলেন, হরিদাস তেমন ছেলে নয়; আমি তো জানতেন, তেমন হরিদাস নয়; কিন্তু এখন, ধর্ম সে কথা শুনবেন কেন? হাতে নাতে ধোরিয়ে দিলেন।”

    রূপসীর কথা শুনে ঠক ঠক কোরে আমি কাঁপতে লাগলেম, হঠাৎ আমার যেন বাক্‌রোধ হয়ে এলো, একটী কথাও বোলতে পাল্লেম না; চেষ্টা কোল্লেম কিছু বলবার, কথা আসলে ফুটলোই না; ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘর্ম। ভাবতে লাগলেম, একি আশ্চর্য ব্যাপার! এ সব জিনিস আমার ঘরে কেমন কোরে এলো? কে এমন শত্রুতাবাদ সাধলে? কার কাছে আমি কি অপরাধী হয়েছিলেম? ভগবান আমার ভাগ্যে কেন এমন ঘটালেন? ওঃ! বৃথা কলঙ্কের আগুনে কেন আর দগ্ধ হও? বাহির হও! রাত্রিকাল, অন্ধকারে অন্ধকারে এই বেলা বাহির হয়ে যাও! কল্যকার সূর্য যেন আমার এই কলঙ্কিত বদন দর্শন না করেন!

    ভাবলেম অনেক। কতই যে ভাবলেম, ভেবে কিছু কূল-কিনারা পেলেম না। ভাবলেই বা কি হবে? লোকে আমার কথা শুনবে কেন? এত বড় প্রমাণের সম্মুখে লোকে আমার মনোবেদনা বুঝবেই বা কেন? চুতুর্দিক যেন আমি অন্ধকার দেখতে লাগলেম। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেম, সেখান থেকে আর এক পাও নড়তে পাল্লেম না। দুটী চক্ষু দিয়ে অনবরত জলধারা গড়াতে লাগলো।

    আমারও যেমন বাকরোধ, ছোটবাবুরও প্রায় সেইরূপই বাকরোধ হয়েছিল। মোড়লবাবুর উগ্রমমূর্তি দর্শন কোরে উগ্রমূর্তি শ্রবণ কোরে, তিনি তখন অল্প অল্প কম্পিত-কণ্ঠে বোল্লেন, “শুনলেম সব; শুনলেম সব, কিন্তু বুঝলেম না কিছুই, হরিদাস চোর, কিছুতেই আমার বিশ্বাস হোচ্ছে না। এতদিন রয়েছে, একদিনও হরিদাসের স্বভাবে বিন্দুমাত্রও দোষ আমি দেখি নাই; অকস্মাৎ চোর হবে, কিছুতেই আমার বিশ্বাস হয় না; বোধ হয়, এ কাণ্ডের ভিতর কাহার কুচক্র থাকতে পারে।”

    আমি সেই সময় একটু সাহস পেয়ে ছোটবাবুর দুটি পায়ে জোড়িয়ে ধোল্লেম, চক্ষের জলে পা-দুখানি ভিজিয়ে দিলেম, কম্পিত-স্তম্ভিত স্বরে বোল্লেম, “দোহাই ছোটবাবুর! দোহাই ধর্মের! আমি চোর নই; কিছুই আমি জানি না, আমারে নষ্ট করবার মতলবে কে যে এই কুচক্রের সৃষ্টি কোরেছে, কিছুই আমি বুঝতে পাচ্ছি না; আপনি আমারে রক্ষা করুন! দোহাই আপনার থানায় খবর দিবেন না, থানায় আমারে পাঠাবেন না! বহু যন্ত্রণা আমি সহ্য কোরেছি, তত যন্ত্রণা পেয়েও জন্মাবধি আমি নিষ্কলঙ্ক, থানার হাতে সোঁপে দিলে কখনই আমি বাঁচবো না; ঘৃণায়, অপমানে, মিথ্যা অপবাদে প্রাণ আমার আপনা হোতেই ঠিকরে বেরিয়ে যাবে!”

    আমার সকরুণ রোদনে অন্তরে ব্যথা পেয়ে, দলপতির দিকে চেয়ে, গদগদবচনে ছোটবাবু তখন বোল্লেন, “আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, জিনিসগুলি হরিদাসের ঘর থেকে বেরিয়েছে, যদিও স্বচক্ষে আমি দেখলেম, তথাপি হরিদাসকে চোর বোলতে আমার মন চায় না। হরিদাসকে আমি থানায় দিতে পারবো না; যেখান থেকেই যা হোক, জিনিসগুলি পাওয়া গিয়েছে এই মঙ্গল, হরিদাসকে পীড়ন কোত্তে আদৌ আমার ইচ্ছা নাই।”

    মোড়লবাবু রেগে উঠলেন; আসনত্যাগ কোরে দাঁড়িয়ে উঠে সক্রোধে বোলতে লাগলেন, “ইচ্ছা নাই? যদি ইচ্ছা নাই, তবে তোমার বাড়ীর মেয়েরা আমাকে খবর দিয়েছিল কেন? ডেকে পাঠিয়েছিল কেন? ঘরে ঘরে মিটমাট কোরে ঘরের ভিতর চোর পুষে রাখলেই তো ঠিক হতো, ডেকে এনে অপমান করা কি জন্য? থানায় তুমি যাবে না? চোরকে তুমি থানায় তবে দিবে না? আচ্ছা! আচ্ছা! থাক তবে। তুমি বুঝি মনে কোচ্ছো, আমার কান ক্ষমতা নাই? থানার দারোগা আমার আজ্ঞাকারী, মেজেষ্টার সাহেবের ডান হাত আমি, আমার পরামর্শ নিয়ে মেজেষ্টার সাহেব কাজ করে। আমার কথায় চোরকে তুমি থানায় দিতে রাজী নও? —আচ্ছা, আমি তবে চোল্লেম, দেখি, চোরকে তুমি কেমন কোরে রক্ষা কর! এসো হে বরদা! ঝকমারী কোরেছিলেম— এসেছিলেম, এসো!”

    সরোষগর্জনে এই সব কথা বোলতে বোলতে মহাপ্রতাপশালী দলপতিমহাশয় চঞ্চলপদে ঘরের চৌকাঠ পর্যন্ত অগ্রসর হোলেন। চঞ্চলপদে পশ্চাতে ধাবিত হয়ে তাঁর দুখানি হাত ধোরে মিনতিবচনে ছোটবাবু বোল্লেন, “রাগ কোরবেন না মহাশয়, রাগের কথা নয়, যে সব কথা আমি বোল্লেম, ভাল কোরে আপনি বিবেচনা করুন। যদি ঠিক ঠিক প্রমাণ হয়, অগত্যা থানার সাহায্য গ্রহণে আমি অসম্মত হব না; এখনো আমার সন্দেহ দূর হয় নাই, বিষম সন্দেহ আছে। হরিদাসের চরিত্র আপনি জানেন না, সেইজন্যই এত ব্যস্ত হোচ্ছেন; আমরা সকলেই জানি, হরিদাসের স্বভাব নিষ্কলঙ্ক। কর্তা বাড়ী নাই, দাদা বাড়ীতে নাই, বড়-বৌটিও পিত্রালয়ে; তাঁরা আসুন, ইতিমধ্যে আমি আরও ভাল কোরে তত্ত্বটা জানি, যে তত্ত্ব আজ প্রকাশ পেলে, এ তত্ত্বের বিপরীত যদি কিছু প্রকাশ না হয়, তা হোলে—”

    বিরক্ত হয়ে ভঞ্জবাবু বোলে উঠলেন, “তত্ত্ব আবার জানবে কি? তত্ত্ব জানবার আর বাকী কি? তোমার মামীও বোল্লেন, এই দাসীটিও বোল্লে, আজ বৈকালে এই ছোকরা ছোট-বৌমার ঘরে প্রবেশ কোরেছিল, অনেকক্ষণ সেই ঘরে ছিল; স্বকর্ণেই শুনে এলে, সে প্রমাণের উপর বিপরীত প্রমাণ তুমি আর কি জানতে চাও? আমি বাপু, তোমাদের ওসব কথার ভিতর আর থাকতে চাই না, চোর-ডাকাত ধরা যাদের কাজ, তারা যা জানে, তাই কোরবে, আমি এখন রিপোর্ট দিয়ে—”

    শেষকথা না শুনেই অধিক ব্যগ্রতা জানিয়ে ছোটবাবু বোল্লেন, “না মহাশয়! ও কাজ আপনি কোরবেন না; রিপোর্ট এখন পাঠাবেন না। বাড়ীর ভিতর বৌমানুষের ঘরে দিনের বেলা চুরি, এ কথাটা অনেক রকমে ঘোরে; কলঙ্কের ভয় আছে, রিপোর্ট আপনি এখন পাঠাবেন না; হরিদাস বরং এখন এই ঘরের মধ্যেই আটক থাকুক, ঘরের দরজায় আমি সর্বদা চাবীবদ্ধ রাখবো, এই ঘরটাই এক রকম হাজত-গারদ হবে, হরিদাস কোথাও যেতে পাবে না, যদি পালায়, হাজির করবার জন্য আমি দায়ী থাকবো, থানা জানাজানিতে এখন দরকার নাই; অনুগ্রহ কোরে আপনি আমার এই প্রস্তাবে সম্মতিদান করুন।”

    কিঞ্চিৎ শুভগ্রহ। সরলমনে না হউক, আন্তরিক অনিচ্ছায় দলপতিমহাশয় কিঞ্চিৎ ক্রোধ সংবরণ কোল্লেন, ছোটবাবুর অনুরোধে তিনি আমারে তত শীঘ্র পুলিশে পাঠাতে জিদাজিদি কোল্লেন না, ঘরের গারদে আটক রাখাই সাব্যস্ত হলো, বরদাকান্তকে সঙ্গে নিয়ে ভঞ্জবাবু বিদায় হোলেন। ঘরের গারদেই আমি বন্দী হয়ে থাকলেন। আমি পালাবো না, ছোটবাবু, সেটি জানতেন, দিনের বেলায় চাবী দিতেন না, রাত্রিকালে আহারাদির পর চাবী বন্ধ হতো। তিন দিন তিন রাত্রি এই রকম।

    চতুর্থ দিবসে বড়বৌমা বাড়ী এলেন, রামদাসও এলো। রামাদাসকে দোসর পেয়ে আমি অনেকটা ভরসা পেলেম। চোর অপবাদে ঘরের ভিতর আমি কয়েদ, বড়বৌমা সে কথা শুনলেন। যেমন যেমন হয়েছিল, তার উপর দশটা ডালপালা দিয়ে সাজিয়ে রাঙামামী তাঁর কাণ ভারী করবার— মন ভারী করবার চেষ্টা পেলেন; রূপসীও তাতে বাতাস দিলে, বড়বৌমা সে সব কথায় কিরূপ উত্তর দিয়েছিলেন, সে সব আমি শুনতে পেলেম না। রামদাসের মুখে শুনলেম, ছোটবৌমা বোলেছেন, “যেদিনে চুরী হয়, সেদিন বৈকালে হরিদাস আমার ঘরে প্রবেশ করে নাই।” তিনি আরো বোলেছেন, “হরিদাস চুরী কোরবে, এমন কথা তিনি মনের কোণেও স্থান দেন না।” এ সংবাদেও আমার একটু ভরসা হলো। ধর্মে যার অকপট বিশ্বাস, ধর্ম তারে রক্ষা করেন, চিরদিন এইরূপে আমার ধারণা; শাস্ত্রে কবিবাক্যেরও সেইরূপ মর্ম; সেই বিশ্বাস উদ্দেশে ধর্মদেবকে নমস্কার কোরে ভক্তিভাবে ভগবান দীনবন্ধুর করুণাময় নাম আমি জপ কোত্তে লাগলেম।

    এক গৃহস্থের এক গৃহমধ্যে আমি কয়েদ; রামদাস ছিল না, কথার দোসর পেতেম না, পাচিকা ব্রাহ্মণী দুইবেলা আমার আহারসামগ্রী দিয়ে যেতেন, সর্বদাই তাঁর মুখখানি আমি বিষণ্ণ বিষণ্ন দেখতেম। বিষণ্ণনয়নে আমার মুখের দিকে তিনি চেয়ে চেয়ে থাকতেন, কথা কইতেন না; দিবারাত্রি আমি একাকী থাকতেম। তিন দিন এই রকমে কেটেছিল। এখন রামদাস এসেছে, রামদাস মাঝে মাঝে আমার ঘরে আসে, দুটি পাঁচটি কথা কয়, আমি চোর হয়েছি, রামদাস সে কথায় বিশ্বাস করে না, আমার অবস্থা দেখে বরং দুঃখ প্রকাশ করে। রাত্রিকালে যখন চাবী বন্ধ হয়, তখন আর রামদাস আসতে পায় না। রাত্রেই আমার ভীষণ যন্ত্রণা।

    চিন্তা করা আমার অভ্যাস। ভগবান আমারে যত চিন্তা দিয়েছেন, তত চিন্তা বোধ হয়, আর কাহাকেও দেন নাই। চিন্তা ভগবান দেন কি মানুষে দেয় কি আপনাআপনি আসে, সে তত্ত্ব আমি জানি না; কিন্তু শৈশবে যখন গুরগৃহে ছিলেম, তখন অবধিই আমার চিন্তা করা শিক্ষা হয়েছে; দুশ্চিতাই অধিক; স্বভাবতঃ শুভচিন্তা আসে বটে, কিন্তু শুভঘটনা আমার ভাগ্যে প্রায়ই ঘটে না, কাজে কাজে শুভচিন্তাগুলি জলবিম্বের ন্যায় অন্তরেই মিলিয়ে যায়। কিঞ্চিৎ জ্ঞানোদয় হবার সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা আমারে অধিকার কোরেছে, অবিচ্ছেদে আমার হৃদয়ে আশ্রয় নিয়েছে, রাত্রিকালে অধিক পরাক্রম প্রকাশ করে। এখন আমার যেরূপ অবস্থা, এ অবস্থায় অন্য চিন্তা আমি ভুলে যাই। নাম নাই, পরিচয় নাই, আশ্রয় নাই, একটিও আপনার লোক জানা নাই; ছিল কেবল একটি চরিত্র, রেখেছিলেম কেবল একটি চরিত্র, সেই চরিত্র এখন সঙ্কটাপন্ন, প্রতি নিশাকালে সেই চিন্তাই এখন কেবল প্রবলা। রাত্রিতে শুয়ে শুয়ে ভাবি কেবল কি হলো? আমি চোর হোলেম! বিধাতার মনে কি এই ছিল? মানুষের কাছেও আমি অপরাধী নই, বিধাতার কাছেও আমি অপরাধী নই, তবে কেন আমার কপালে এমন ঘোটলো? আমি অদৃষ্টবাদী, অদৃষ্টকেই আমি বলবান জ্ঞান করি। দুই একখানি পুস্তকে আমি পাঠ কোরেছি, কোন কোন লোক অদৃষ্ট মানে না। যারা মানে না, তারা সুখে থাকে কি কষ্টে থাকে, তাও আমি বুঝে উঠতে পারিনে, বোধ হয় যেন তারা বেশী কষ্ট পায়। ভাগ্যফল আমি মানি, সেই কারণেই জন্মাবধি মানুষের অসহ্য কষ্ট আমি সহ্য কোত্তে পাচ্ছি, অদৃষ্টে আছে, ঘোটছে, এই আমার প্রবোধ; ভাগ্য যদি না মানতেম, তা হোলে বোধ হয়, কিছুতেই এ সকল কষ্ট আমি সহ্য কোত্তে পাত্তেম না। চিরজীবন কষ্টে যাবে, চিরজীবন বিপদগ্রস্ত হয়ে থাকতে হবে, কাহারো অদৃষ্টে এমন ফল লেখা থাকে না। কখন না কখন জীবনকালের মধ্যে আমার ভাগ্যে শুভদিনের উদয় হবে, মহাবিপদে পতিত হয়েও সেইটিই আমি ভাবি; সেই শুভ আশা আমার অবসর হৃদয়কে প্রফুল্ল কোরে দেয়, তাতেই আমি বেঁচে আছি। অদৃষ্টবাদে অবিশ্বাস থাকলে বোধ হয় কখনই আমি বাঁচতেম না। লোকে যেটিকে বিধাতার লিখন বলে, আমি সেটিকে বিধাতার ইচ্ছা মনে কোরেই আপনা আপনি সান্ত্বনা প্রাপ্ত হই।

    পাঁচ দিন গেল, চোর অপবাদে পাঁচ দিন আমি বন্দী; থানার গারদে অথবা রাজকারাগারে বন্দী হয়ে থাকলে লোকে যত যন্ত্রণা ভোগ করে, তত যন্ত্রণা আমার হয় না বটে তথাপি আমি যেন মনে করি, অপরাধী বন্দী অপেক্ষা আমার যন্ত্রণা অধিক। অপরাধীরা জানে অপরাধের দণ্ড; আমি জানি কি? —আমি জানি, বিনা অপরাধে বিষম কলঙ্কে অজ্ঞাত লোকের কুচক্রে অকারণে আমি কারাবাসী!

    অকারণ? —অসম্ভব! কারণ ব্যতিরেকে কোন কার্যই হয় না; অকারণে আমার কারাবাস, মূলতত্ত্ব অগ্রাহ্য কোরে কি সাহসে আমি এমন কথা বলি? অকারণে নয়, অবশ্যই কারণ আছে; সে কারণটা কি তবে? ষষ্ঠ যামিনীর অবসানকালে এই তর্ক আমার মনোমধ্যে সমূদিত। মিথ্যা অপবাদে আমার কারাবাসের কারণ কি তবে? ভাবলেম অনেক; যে ক-দিন কয়েদ আছি, সে ক-দিন নিত্য নিত্যই ঐ কথা ভাবি; মনে মনে একটা সন্দেহ জাগে। এই শেষের রাত্রে যেন কার উপদেশে অবধারণ কোল্লেম, কারণসূত্র দুটি মনুষ্য;— দুটি স্ত্রীলোক। বাবুদের রাঙামামী বহু নায়ক-বিলাসে কলঙ্কিনী ছিলেন, বাড়ীতে ভূতের উপদ্রবে সে কলঙ্কে এক রকম চাপা পোড়ে থাকতো; পিণ্ডদানে না হোক, মন্ত্রবলে না হোক, আগ্নেয়াস্ত্রের বলে সে সব ভূত আমি তাড়িয়েছি, রাঙামামী দারুণ মনঃপীড়া প্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁর মনঃপীড়ার প্রধান হেতুই আমি; সেই কারণে আমার উপর রাঙামামীর মর্মান্তিক রাগ হওয়া সম্ভব। তিনি আমার এই কলঙ্কের— এই যন্ত্রণার একটি কারণ। আর এক কারণ রূপসী। —কুৎসিত অভিলাষে রূপসী আমার কাছে প্রেমভিক্ষা চাইতে এসেছিল, ঘৃণা পূর্বক আমি তাকে প্রত্যাখ্যান কোরেছি, প্রতিফল দিবে বোলে রূপসী আমারে ভয়প্রদর্শন কোরে রেখেছিল, অবসর বুঝে সেই কোপ— সেই আক্রোশ জাগিয়ে তুলেছে। রাঙামামী আর রূপসী, উভয়েই আমার শত্রু! কি সূত্রে তাদের সেই কুচক্র প্রকাশ পায়, আপন মনে তার উপায় কল্পনা কোত্তে আমি সচেষ্ট হোলেম। উপায় আমার কল্পনায় এলো না। কল্পনার সঙ্গে ঊষাসতী ধীরে ধীরে বিদায় হয়ে গেলেন। রজনী প্রভাত।

    প্রভাতে আমার কয়েদঘরের চাবী খুলে রামদাস প্রবেশ কোল্লে। গৃহকর্ম সমাধা কোরে ম্লানবদনে রামদাস আমার বিছানার ধারে এসে বোসলো। কাতরনয়নে রামদাসের মলিন বদন নিরীক্ষণ কোরে সন্দিগ্ধস্বরে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “রামদাস! সর্বদা আমি তোমাকে প্রফুল্ল দেখি, আজকাল তুমি এমন হয়েছ কেন? যখন তোমাকে দেখি, তখনি তোমার মুখখানি শষ্ক শুষ্ক, মুখে হাসি নাই, বেশী কথা নাই, কি যেন ভাবো, এই রকম লক্ষণ দেখতে পাই; কারণ কি?”

    ম্লানবদনেই রামদাস উত্তর কোল্লে, “কারণ তুমি; তোমাকে এরা চোর বোলে আটক রেখেছে, বড় আশ্চর্য ব্যাপার! এই কথা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পোড়েছি। এ বাড়ীতে কারা তোমার শত্রু, তা আমি জানতে পাচ্ছিনে; শত্রু পক্ষের কুচক্র ভিন্ন তোমার নামে এত বড় কলঙ্ক আর কিছুতেই সম্ভব হয় না। বাড়ীর ভিতর আমি শুনলেম, বড়-বৌমা বোলছেন, হরিদাস কখনই চোর নয়; ছোট-বৌমা বোলছেন, হরিদাস কখনই চোর নয়; ব্রাহ্মণী বোলছেন, হরিদাসকে সোণার সঙ্গে ওজন করা যায়; সোণাতে বরং খাদ থাকে, হরিদাসে খাদ নাই। এই তো তিনজনের কথা, তবে আর কার কথাতে লোকে তোমাকে অপরাধী বোলে বিশ্বাস কোরবে?”

    রামদাসের কথায় কিঞ্চিৎ উৎসাহ পেয়ে রামদাসকেই আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “তোমার কি রকম বোধ হয়?” রামদাস বোল্লে, “আমার তোমাকে দেবতা বোলে বোধ হয়। কলিকালে দেবতা যদি থাকে, ধৰ্ম যদি থাকে, তারা তবে অবশ্য তোমার মত একটি ক্ষুদ্র দেবতাকে—”

    বারান্দার দিকে মানুষের পদশব্দ। কারা যেন শীঘ্র শীঘ্র সেই ঘরের দিকে চোলে আসছে, এই রকম দ্রুত পদবিক্ষেপের শব্দ। রামদাসের কথা সমাপ্ত হোতে না হোতেই ছোটবাবুর সঙ্গে সেই দলপতিবাবু গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেন। রামদাস আমার বিছানার ধারে বোসে ছিল, এই সময় সোরে গেল;—ঘর থেকে বেরিয়ে গেল না, একটু দূরে দেয়াল ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। উপবেশন করবার অগ্রেই আমারে সম্বোধন কোরে একটু কুণ্ঠিতম্বরে দলপতিবাবু বোল্লেন, “হরিদাস! আগে ঠিক বুঝতে না পেরে আমি তোমাকে অপরাধী বিবেচনা কোরেছিলেম, এখন জানতে পাল্লেম, বিষম কুচক্র। তোমাকে আমি কষ্ট দিয়েছি, সে জন্য তুমি কিছু মনে কোরো না, ভুলচুক সকলেরই আছে; প্রথমে আমার বুঝবার ভুল হয়েছিল; তুমি এখন রাহুগ্রাসমুক্ত পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় সগৌরবে প্রকাশ পাবে, তার আয়োজন হয়েছে। ছোটবাবুর মুখে সকল কথা শ্রবণ কর।”

    উৎফুল্ল-নয়নে ভঞ্জমহাশয়ের মুখপানে আমি চাইলেম, মনের কথা তিনি বোল্লেন, কিম্বা ব্যঙ্গচ্ছলে আমার প্রাণে অধিক বেদনা দিচ্ছেন, সেই তত্ত্বটি জানবার জন্য তাঁর দুটি নয়ন আমি নিরীক্ষণ কোল্লেম। কথা কবার সময় মনের ভাব অনেকটা নয়নে প্রকাশ পায়; রূপচাঁদ ভঞ্জের নয়নে বদনে ব্যঙ্গের লক্ষণ কিছুই দেখা গেল না।

    আমি যেখানে বোসে ছিলেম, তার দুই হাত তফাতে ফুল্লবদনে ছোটবাবু বোসলেন, ছোটবাবুর পার্শ্বে ভঞ্জবাবু উপবেশন কোল্লেন। ছোটবাবুর মুখে কি আমি শুনবো, আগ্রহে আগ্রহে প্রতীক্ষা কোচ্ছি, চক্ষের জল মুছতে মুছতে পাচিকাঠাকুরাণী সেই সময় এসে দেখা দিলেন।

    ছোটবাবু বোল্লেন, “আপনাদের কথাতেই আপনারা ধরা দিয়েছেন, ‘ধৰ্ম্মের কল বাতাসে নড়ে’, এই একটা সাধারণ কথা আছে, উপস্থিত ক্ষেত্রে সেই কথাই মিলে গেল। হরিদাস চুরি করে নাই, সে কথা সপ্রমাণ করবার সাক্ষী-সাবুদ ছিল না, ধর্মই সাক্ষী হোলেন। রূপসী বোলেছে সেই দিন বৈকালে হরিদাস আমাদের শয়নঘরে প্রবেশ কোরেছিল, রাঙামামী সেই কথার পোষকতা কোরেছিলেন। বৈকাল কথাটা মাঝখানে যদি না থাকতো, তা হোলে শীঘ্র শীঘ্র সংশয়ভঞ্জনের সুবিধা হোতো না। রূপসীকে আমি গতরাত্রে অনেক সওয়াল কোরেছিলেম, প্রত্যেক সওয়ালের জবাবেই রূপসী ধরা পোড়েছে। রূপসী ধরা পোড়লেই রাঙামামীর ধরা পড়া হলো, তাতে আর সন্দেহমাত্র নাই। আচ্ছা হরিদাস! রূপসী তো তোমার কাজকর্ম কোরে দিত, তোমার নাম হোলেই ভাল কথা বোলতো, হঠাৎ ভাবান্তরের হেতু কি, তা কি তুমি কিছু বুঝতে পার? কিছু কি অনুমান কোত্তে পার?”

    ভাবতে ভাবতে আমি উত্তর কোল্লেম “পারি কিছু, কিছু, কিন্তু সে কথা এখানে বলবার নয়, সকল লোকের সাক্ষাতে সে কথা আমি বোলতে পারবো না। আপনাদের প্রসাদে যদি আমি কলঙ্কমুক্ত হোতে পারি, তা হোলে সময়ান্তরে আপনাকে আমি নির্জনে সেই কথাগুলি শুনিয়ে দিব। বস্তুতঃ রূপসীর ভাবান্তরের বিশিষ্ট কারণ আছে, এই পর্যন্ত এখন আমি বোলে রাখতে পারি।”

    দলপতির নয়নে ছোটবাবু নয়ন নিক্ষেপ কোল্লেন, ধীরে ধীরে মস্তকসঞ্চালন কোরে দলপতি যেন একটু শিউরে উঠলেন, উভয়ের ঐরূপে ভঙ্গী আর দৃষ্টিবিনিময় আমি দর্শন কোল্লেম; বোধ হলো যেন, ঐ দিন প্রাতঃকালেই দলপতির সঙ্গে ছোটবাবুর তৎসম্বন্ধে কোন প্রকার কথা হয়েছিল, লক্ষণেই সেটি বুঝা গেল; সেই কথা স্মরণেই দলপতির ঐ ভাবে মস্তক সঞ্চালন।

    পাচিকাঠাকুরাণী আমার মুখের দিকে চেয়ে দলপতিকে বোল্লেন “যে কথা রূপসী বলে, সেই কথাটা আমি আর এক রকমে জানি। হরিদাসের কিছুমাত্র দোষ নাই, চন্দ্রসূর্য সাক্ষী কোরে সে কথা আমি বোলতে পারি।”

    রামদাসের দিকে চক্ষু ফিরিয়ে ছোটবাবু আদেশ কোল্লেন, “যাও রামদাস! রূপসীকে এখানে আন!”— আদেশমাত্রেই রূপসীকে আনতে রামদাস অন্দরে গেল। আমি বুঝতে পাল্লেম, আজ আবার নূতন বিচার হবে; এই বিচারের ফলের উপর আমার ভাগ্যফলাফল নির্ভর কোত্তে লাগলো।

    রামদাসের সঙ্গে রূপসী এসে উপস্থিত। আমার দিকে রূপসী আর চায় না, কোন দিকেই চায় না, কতই যেন ভালমানুষ, সেইভাবে মাথাটি হেঁট কোরে আপনার পদনখগুলি নিরীক্ষণ কোত্তে লাগলো। দলপতির দিকে ছোটবাবু, একবার নয়ন ইঙ্গিত কোল্লেন, ইঙ্গিতের তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম কোরে দলপতিমহাশয় কেবল রূপসীকে জিজ্ঞাসা কোত্তে লাগলেন; “রূপসি! হরিদাস যখন সে দিন ছোট বৌ-মার ঘরে প্রবেশ কোরেছিল, তখন বেলা কত?”

    রূপসী।— বেলা? —বেলা বৈকাল।

    দল।— বৈকাল বোল্লে অনেকটা সময় বুঝায়। বেলা দুই প্রহরের পর সন্ধ্যার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত বৈকাল। তার মধ্যে কোন সময় তুমি হরিদাসকে সে ঘরে যেতে দেখেছিলে, সেইটি আমি জানতে চাই। বৈকালে দেখেছিলে, সে কথায় কিছুই স্থির বুঝা যায় না।

    রূপসী।— তবে আমি কি বোলবো?

    দল।—হরিদাসকে যখন তুমি দেখেছিলে, তখন কতখানি বেলা ছিল?

    রূপসী।— বেলা ছিল আন্দাজ চার দণ্ড কি ছয় দণ্ড। আমি যখন—

    এই সময় আমি ভিতরদিকের বারান্দায় বস্ত্রঘর্ষণের খস খস শব্দ শুনতে পেলেম; বুঝতে পাল্লেম, বিচারফল কিরূপ দাঁড়ায়, সেইটি শুনবার জন্য বাড়ীর স্ত্রীলোকেরা, স্ত্রীলোকেরা মানে, বৌ-মা দুটি সেইখানে এসে লুকিয়ে দাঁড়িয়েছেন, উৎকণ্ঠিতা হয়ে অঙ্গবস্ত্র সঞ্চালন কোচ্ছেন। ছোটবাবুর কর্ণ অথবা চক্ষু, সে দিকে ছিল না, রূপসীর অসমাপ্ত কথায় বাধা দিয়ে তিনি একটু উচ্চকণ্ঠে বোলে উঠলেন, “চারি দণ্ড কি ছয় দণ্ড! ধন্য জগদীশ!— আচ্ছা রূপসী! ছয় দণ্ড বেলা থাকতে হরিদাস কোথায় ছিল, তা কি তোমার মনে আছে?”

    রূপসী।— কেন থাকবে না? সেই সময় বৌ-মার ঘর থেকে বেরিয়ে আপনার ঘরে এসেছিল।

    ছোট।— হার আর গেলাস তখন হরিদাসের হাতে ছিল, তা কি তুমি দেখেছিলে?

    রূপসী।— তখন দেখি নাই, তার পর এই ঘরে যখন তল্লাস করা হয়, তখন এই ঘরেই বেরিয়েছে।

    ছোট।— তা তো জানি, বেরিয়েছে। কিন্তু চার ছ দণ্ড বেলা থাকতে হরিদাস কোথায় ছিল, সে কথা তুমি বলতে পার না?

    রূপসী।— কোথায় আর থাকবে? যেখানে থাকে, সেইখানেই ছিল।

    ছোট।— (পাচিকার প্রতি) আপনি কি জানেন? রূপসী যে কথা বোলছে, এই কথাই কি সত্য?

    পাচিকা।— চার ছ দণ্ড বেলা থাকতে রূপসী দুবার হরিদাসের ঘরে এসেছিল। হরিদাস তখন ঘরে ছিল না, এই পর্যন্ত আমি জানি, ছোট বৌমাও তাই জানেন।

    ছোট।— হাঁ! ছোট-বৌ সে কথা আমাকে বোলেছে; সব আমি জানতে পাচ্ছি। রাঙামামী আর রূপসী একপক্ষ। আপনি আর ছোট-বৌ এক পক্ষ। যার বস্তু সে বলে না হরিদাস দোষী, রূপসী বলে হরিদাস চোর, এখনই এ তত্ত্বের মীমাংসা হবে।

    আমি সেই সময় দাঁড়িয়ে উঠে দলপতিকে আর ছোটবাবুকে বিনীতভাবে বোল্লেম, আমার ঘরে চোরা জিনিস বেরিয়েছে, আমি দোষী হয়েছি, রূপসীর সাক্ষ্যবাক্যে সেইটিই সপ্রমাণ হোচ্ছে। এই সঙ্গে আর একটি তত্ত্বের মীমাংসা হোক। ঐ যে দেয়ালের গায় কুলঙ্গী, ঐ কুলঙ্গী আমি কখন দেখি নাই তক্তা ঢাকা থাকতো, কি তো কি, ওদিকে আমি চাইতেম না। ঐ কুলঙ্গীর ভিতর গেলাস- দুটি কি রকমে এসেছিল, সেই কথা আমি—

    আর আমারে কিছু বোলতে না দিয়ে গম্ভীর বদনে ছোটবাবু বোল্লেন, “বাস! বাস! তোমাকে আর কিছু বেশী বোলতে হবে না, সমস্তই আমি বুঝতে পেরেছি, গোড়া ফাঁক।” — আমারে এই পর্যন্ত বোলে দলপতির দিকে চেয়ে তিনি একটু নম্রস্বরে বোল্লেন, “দেখুন রূপচাঁদ কাকা, সে দিন আহারের পর বেলা দুই প্রহরের পূর্বে হরিদাসকে সঙ্গে নিয়ে আমি বেড়াতে বেরিয়েছিলেম, সন্ধ্যার পর ফিরে আসি। রূপসী দেখেছে, বেলা চার দণ্ড কি ছয় দণ্ড থাকতে হরিদাস আমার ঘরে হার চুরি কোরে গিয়েছিল! রূপসীই ফরিয়াদী, রূপসীই সাক্ষী; যোগের সাক্ষী রাঙামামী। এখন আপনি বিবেচনা করুন, এ মামলার জোর কত।”

    ভঞ্জবাবু পূর্বে হোতেই সপ্রতিভ হয়েছিলেন, ছোটবাবুর শেষকথা শ্রবণ কোরে খানিকক্ষণ তিনি অবাক হয়ে থাকলেন। রূপসী সেই অবসরে পালাবার উপক্রম কোচ্ছিল, চৌকাঠ পর্যন্ত এগিয়েছিল; উগ্রস্বরে ধমক দিয়ে ছোটবাবু বোল্লেন, “যাস কোথা? —দাঁড়া! হরিদাসের নামে তুই নালিশ কোরেছিস, হরিদাসকে চোর বোলে ধোরিয়ে দিয়েছিস, তোর কথার প্রমাণেই হরিদাসকে আমরা কয়েদ কোরে রেখেছি, মোকদ্দমা এখনো চোকে নাই, তুই এখন যাস কোথা? —দাঁড়া! শেষকথাগুলো বোলে যা! কত বেলা থাকতে হরিদাসকে তুই আমার ঘরে প্রবেশ কোত্তে দেখেছিলি, রাঙামামীকে তুই কি কি কথা বোলেছিলি, ভাল কোরে মনে কর, ঠিক ঠিক কথা বল!”

    রূপসী কাঁপতে লাগলো; অধোমুখে জড়িতস্বরে আমতা আমতা কোরে বোল্লে, “আমি তো— বেলা— মামীমা— হরি— বৌ— মা—”

    ছোটবাবু তখন আর কি কথাই বা শুনবেন, মোড়লমহাশয়ই বা কি সিদ্ধান্ত কোরবেন? আসল কথা তাঁরা বিলক্ষণ বুঝতে পাল্লেন। পাচিকাঠাকুরাণী চক্ষের জল মার্জন কোরে এক পা এগিয়ে ছোটবাবুকে বোলছিলেন, “রুপসী যখন এই ঘরে আসে, আমি তখন সঙ্গে সঙ্গে আসতে আসতে—”

    “আপনাকে আর কিছু বোলতে হবে না, যা কিছু বোলতে হয়, রূপসী নিজেই বোলবে; নিজেই বলকে।” —ব্রাহ্মণীকে এই রকমে থামিয়ে ছোটবাবু পুনর্বার রূপসীকে বোলতে লাগলেন, “দেখ রূপসী! ছোটবেলা থেকে আমাদের বাড়ীতে তুই আছিস, তোর বাপ এ বাড়ীতে অনেক দিন ছিল, তোর উপরে আমাদের মায়া বোসেছে, সত্যকথা বোলে তোকে আমরা কিছুই বোলবো না, যা যা হয়েছিল, ঠিক ঠিক বল; কার পরামর্শে তুই হরিদাসকে চোর বোলে সাক্ষ্য দিয়েছিলি, ঠিক ঠিক বল; মিথ্যাকথা যদি বলিস, পুলিশে চালান হোতে হবে; মনে রাখিস, সাবধান! মিথ্যাকথা বোল্লে কিছুতেই নিস্তার পাবি নে।”

    পুলিশের নাম শুনে দুই হাতে দুই চক্ষু ঢেকে রূপসী কেঁদে ফেল্লে। ছোটবাবু তখন জোরে জোরে আরো অধিক ধমক দিতে লাগলেন। রূপসীর রোদনে কাহারো হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার হলো না। ছোটবাবুর রুক্ষ প্রশ্ন, রুক্ষ আদেশ; মোড়লবাবুর উগ্র প্রশ্ন উগ্র আদেশ; মাগীটা তখন ফাঁপোরে পোড়ে গেল; কি করে! ছোটবাবুর মুখের দিকে একবার চাইলে, মোড়লের দিকেও চাইলে, দরজার দিকে মুখ ফিরিয়ে ভিতরের বারান্দার দিকেও একবার চেয়ে দেখলে, কোন দিক থেকেই একটি অভয়বাক্য এলো না। প্রথম অভিযোগে যে সকল মুখে হাসি এসেছিল, রূপসীর চক্ষে সে সকল মুখ তখন সক্রোধ বিস্ময়ে রক্তবর্ণ; ভাবদর্শনে নিরুপায় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে রূপসী তখন বোলতে লাগলো— “আমার কোন দোষ নাই—আমি, ঠাকুর দেবতাসাক্ষী— আমি— না, আমার কোন দোষ নাই,” এই রকম খাপছাড়া কথা বলে, আর মাঝে মাঝে এ দিক ও দিক চায়। ধৈর্য ধারণ কোত্তে না পেরে চঞ্চলম্বরে ছোটবাবু বোল্লেন, “ভাল কথায় এখনো বোলছি, সত্যকথা বল। তোর যদি কোন দোষ নাই, তবে হরিদাসের বালিশের ভিতর হারছড়াটা কেমন কোরে এসেছিল? দেয়ালের গায়ে ক্ষুদ্র খোপের ভিতর গেলাস-দুটো কেমন কোরে গিয়েছিল? হরিদাস যখন ঘরে ছিল না, তখন হরিদাসের বিছানার মধ্যে হার রেখেছিল কে? গেলাস-দুটো লকিয়ে রেখেছিল কে?”

    জলপূর্ণ চক্ষু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, চতুর্দিকে চেয়ে চেয়ে, কড়িকাষ্ঠের দিকে চক্ষু তুলে গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে রূপসী উত্তর কোলে, “মামী-মা আমাকে— না না— মামী-মা একদিন— ভূত পালাবার পর পায়রা— না—”

    ভঞ্জবাবু এই সময় ছোটবাবুকে বোল্লেন, “সহজে কথা পাওয়া যাবে না, পুলিশের একজন লোককে—”

    চক্ষের জলে ভেসে, মোড়লবাবুর পায়ের কাছে আছাড় খেয়ে পোড়ে, লুটোপুটি খেতে খেতে রূপসীটা চিৎকার কোরে বোলতে লাগলো, “না বাবা! —বলি বাবা! পুলিশ বাবা! —আমি বাবা! — মামী-মা আমাকে বোলেছিল— তাই জন্যে আমি—”

    এই পর্যন্ত বোলেই রূপসী আবার কান্না আরম্ভ কোল্লে। মৃদু হাস্য কোরে ছোটবাবু বোল্লেন, “তাই জন্যে তুই কি কোরেছিলি? চুপি চুপি হার চুরি কোরে এই ঘরে ঢুকিয়ে রেখেছিলি? গেলাস চুরি কোরে খোপের ভিতর লুকিয়ে রেখেছিলি? কেমন, এই তো তোর কথা? সত্য বল। আমিও সত্য বোলছি, সত্যকথা বোল্লে আমি তোকে পুলিশে দিব না।”

    রোদনের সুরের সঙ্গে নূতন রকম সুর মিশিয়ে গড়াগড়ি খেতে খেতে রূপসী বোলতে লাগলো, “আমি নই—আমি নই; ওগো, আমি তেমন কাজ করি নাই, তেমন কাজ আমি কোত্তেম না—রাঙামামী—”

    বোলতে বোলতে রূপসী আবার থেমে গেল। ছোটবাবু বোল্লেন, “রাঙামামী তোরে কি বোলেছিল? চুরি কোত্তে বোলেছিল? জিনিসগুলি হরিদাসের ঘরে এনে রাখতে বোলেছিল? হরিদাসের মাথায় দোষ চাপাতে বোলেছিল?”

    রূপসী উত্তর কোল্লে, “তাই তো আমি কোরেছিলেম, রাঙামামী শিখিয়ে দিয়েছিল, পায়রাবাবু আমাকে টাকা দিবে বোলেছিল, ভাল একটা চাকরী দিবে বোলেছিল, বুঝতে না পেরে—”

    “বুঝতে না পেরে সেই লোভে তুই আমার ঘরের জিনিস চুরি কোরেছিলি? একটি ভদ্রলোকের ছেলেকে চোর বোলে ধোরিয়ে দিয়েছিলি? পায়রা বাবু যদি তোকে আমার গলায় ছুরি দিবার পরামর্শ দিত, টাকার লোভে— চাকরীর লোভে তাও তুই দিতিস?”

    ছোটবাবুর এইরূপে তীব্র উক্তিতে দাসীটা কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে উঠে হাতযোড় কোরে বোলতে লাগলো, “না বাবা— না বাবা— না গো বাবা! তেমন কর্ম আর আমি কোরবো না। তুমি বরং আমার মাথা মুড়িয়ে দেশছাড়া কোরে দাও, পুলিশের হাতে আমারে ধোরিয়ে দিও না। হরিদাস চোর, এমন কথা আর আমি কখনই বোলবো না।”

    মোড়লবাবু হাসা কোল্লেন, ছোটবাবুও হাস্য কোল্লেন; আমারও হাসি পেয়েছিল, আমি সামলে গেলেম। আর একটা কথা উত্থাপন না কোল্লে সে সময় হাস্য সংবরণ করা যেতো না, সেই জন্য ছোটবাবুকে আমি বোল্লেম, “পায়রাবাবুকে যদি পাওয়া যায়, এই সময় তাঁকে একবার এইখানে হাজির কোত্তে পাল্লে ভাল হয়। একটা কথা এতদিন আমি আপনাকে বলি নাই, ঘটনার বৈচিত্র দেখে অগত্যা আজ সেই কথাটা বোলতে হলো। একদিন রাঙামামীর আমি একটি উপকার কোরেছিলেম, পায়রাবাবুরও উপকার কোরেছিলেম; রাঙামামী আমার মারফতে একদিন একটি ঔষধের মোড়ক পায়রাবাবুর কাছে পাঠিয়েছিলেন, পায়রাবাবুকে তখন আমি পায়রাবাবু বোলে চিনতেম না; রাঙামামী বোলেছিলেন, সেজোবাবু; আমিও জেনেছিলেম সেজোবাবু। সেই উপকার আমি কোরেছিলেম; সেই উপকারের প্রত্যুপকার এই। তাঁদের পরামর্শে, রূপসীর যোগাযোগে আমি চোরদায়ে ধরা পোড়েছিলেম; ভগবানের কৃপায়, আপনাদের অনুগ্রহে আজ আমি অব্যাহতি পেলেম; — নিষ্কলঙ্কে অব্যাহতি। এই সময় একবার পায়রাবাবুকে—”

    ছোটবাবু বোল্লেন, “সময় আছে, পায়রাকে এখন এখানে হাজির করবার দরকার নাই, ডেকে পাঠালেও পায়রা এখানে আসব না। কুকুরের খেলার সময় পায়রা এখানে বিলক্ষণ জব্দ হয়ে গিয়েছে, আমাদের উপর রাগ হয়েছে, সে কি আর এখন এখানে আসতে চায়? সময় আসুক, পাপের প্রায়শ্চিত্ত যে রকমে হয়, আর কিছুদিন যদি তুমি এখানে থাকো, চক্ষুই দেখতে পাবে। এখন তুমি একটা ভয়ানক অপকলঙ্ক থেকে মুক্ত হোলে, এইটিই আমাদের সন্তোষের বিষয়।”

    করযোড়ে নমস্কার কোরে আমি বোল্লেম, “আজ্ঞা হাঁ, আপনাদেরও সন্তোষের বিষয়, সেই সন্তোষে আমারও কলঙ্কভঞ্জন। নষ্টচন্দ্রদর্শনের কলঙ্ক। আমি তো আমি, নষ্টচন্দ্র দর্শনে দ্বারকানাথ শ্রীকৃষ্ণেরও ‘মণিচোরা’ কলঙ্ক হয়েছিল। আমার এই কলঙ্কভঞ্জনে আমি আপনার কাছে চিরজীবনের জন্য কৃতজ্ঞ থাকলেম।”

    এই কথাগুলি বলবার সময় মোড়লবাবুর দিকে আমি একবার বক্রনয়নে কটাক্ষপাত কোল্লেম। ভাব বুঝতে পেরে মিষ্টবচনে মোড়লবাবু আমাকে বোল্লেন, “দেখ হরিদাস! পুনরায় আমি বোলছি, তুমি কিছু মনে করো না; সে সব পূর্বকথা ভুলে যাও। মেয়েমহলে এত বড় একটা চক্র, চক্রের ভিতর এত সৃষ্টি, আগে আমি কিছুই বুঝতে পারি নাই, তোমাকে অনেক অপ্রিয় কথা বোলেছি, তজ্জন্য এখন আমার অনুতাপ আসছে, সে সব কথা তুমি ভুলে যাও; তোমার কলঙ্কভঞ্জনে আমি সুখী হোলেম।”

    প্রসন্নবদনে আমারে ঐ সব কথা বোলে, ছোটবাবুর কাছে বিদায় নিয়ে রূপচাঁদবাবু গাত্রোত্থান কোল্লেন, পুনঃ পুনঃ আত্মীয়তা জানিয়ে সে দিনের মত তিনি বিদায় হয়ে গেলেন। অধোবদনে নেত্রমার্জনা কোত্তে কোত্তে মৃদুপদসঞ্চারে রূপসীদাসী অন্দরে প্রবেশ কোল্লে; ভিতরবারান্দায় যাঁরা আমার মুক্তিমন্ত্র শ্রবণ কোরেছিলেন, তাঁরাও সেখান থেকে সোরে গেলেন। ঘরে আমরা তিনজনে থাকলেম— ছোটবাবু, আমি আর রামদাস।

    আমি কলঙ্কমুক্ত হোলেম, ছোটবাবু আনন্দিত হোলেন, রামদাসের শুষ্কমুখ প্রফুল্ল হয়ে উঠলো। খুসী হয়ে রামদাস বোলতে লাগলো, “মন যেন আগেই সব জানতে পারে। এই ঘটনার ভিতর রূপসী ছিল, ঘটনাটা শুনেই আমি সেটা বুঝতে পেরেছিলেম; রূপসীর সঙ্গে রাঙামামীর যোগ ছিল, তা আমি জানতে পারি নাই। ধর্মের কর্ম; ধর্ম হরিদাসকে রক্ষা কোল্লেন, মিথ্যা অপবাদ রটনার মূল যারা, ধৰ্মই তাদের চিনিয়ে দিলেন।”

    কিঞ্চিৎ অন্যমনস্কভাবে ছোটবাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “পায়রাবাবুকে এখানে একবার হাজির কোল্লে ভাল হয়, এ কথাটা তুমি কেন বোলছিলে?”

    কারণটা প্রকাশ করি কি না করি। প্রকাশে কোন প্রকার দোষ আছে, এইরূপ আমি ভাবলেম। সত্য যদি আমার অনুমানটি ঠিক না হয়, আমি অপ্রস্তুত হব, প্রথমে আমার মনোমধ্যে সেই ভাবের উদয় হলো; তার পর আবার বিবেচনা কোল্লেম, আসল কথা আগেই তো আমি ভাঙবো না, নিশ্চিতরূপে সন্দেহটা দূর হয়ে গেলে মনে কোল্লেম আমি খুলে দিব, স্থূলকথা প্রকাশে দোষ কি? এইরূপে ভেবে আমি উত্তর কোল্লেম “বোধ হয় যেন পায়রাবাবুকে আমি চিনি। ঐ নামে চিনি না, অন্য নামে চিনতেম, অন্যস্থানে দেখেছিলেম, এইরূপে যেন আমার মনে হয়। সত্য সত্য সেই লোকটি এই পায়রাবাবু কি না, একবার পরীক্ষা করবার ইচ্ছা হোচ্ছে; দেখেছিলেম, মুখোমুখি বোসে কথাবার্তা হয় নাই, কিন্তু লোকটির স্বভাব ভাল নয়, নানা প্রমাণে তা আমার জানা হয়েছিল। রাঙামামীর প্রেরিত দূত হয়ে পায়রাবাকে যে দিন আমি ঔষধের মোড়কটি দিতে যাই, সে দিন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল, চেহারা ভাল কোরে দেখতে পাই নাই, তথাপি যেন পূর্বস্মৃতি একটু একটু জেগেছিল। তিনি তখন সেজোবাবু ছিলেন, এখন হয়েছেন পায়রাবাবু। যে রাত্রে আমি ভূত শীকার করি, সে রাত্রে সর্বাঙ্গ বসনাবৃত, রুমালে গালপাটা বাঁধা একটি লোক জনতামধ্যে দর্শন দিয়েছিলেন, বোধ করি, আপনারা সে দিকে ততটা লক্ষ্য রাখেন নাই, আকার-ইঙ্গিতে আমি কিন্তু বুঝেছিলেম, সেই সেজোবাবু। তার পর একরাত্রে এইখানে তাজপরা মূর্তি; সেই রাত্রে কুকুরগুলির কৌতুকাবহ ক্রীড়া। আর একবার সেই মূর্তি দর্শন কোল্লে মনের অভিপ্রায় আমি প্রকাশ কোত্তে পারবো, সেইজন্যই বোলেছিলেম, একবার হাজির কোত্তে পাল্লে ভাল হয়।

    ছোটবাবু বোল্লেন, “হাজির করা বোধ হয় সহজ হবে না; নিজে তিনি যে কথা অস্বীকার করেন, সেই কথাই ঠিক। তিনি বোলছিলেন কুকুর তাঁর নয়, কুকুরেরা দেখালে তারা তাঁরই। মিথ্যাকথা ধরা পড়াতে তিনি পালিয়ে গিয়েছেন, কুকুরেরা, তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়েছে, সব আমরা বুঝেছি, তাও তিনি জানতে পেরেছেন। এখন যদি তাঁকে আমরা ডেকে পাঠাই, তা হোলে—”

    “রাধা-কৃষ্ণ! রাধা-কৃষ্ণ! মহাভারত! মহাভারত!” ছোটবাবুর কথা সায় হোতে না হোতে ঐরূপে পবিত্র নাম উচ্চারণ কোত্তে কোত্তে দ্রুতপদে একটি স্ত্রীলোক সেই ঘরে প্রবেশ কোল্লেন। চকিতনয়নে আমি চেয়ে দেখলেম, রাঙামামী! তাঁর বগলে একটি কাপড়ের পুঁটলী, হাতে একখানি ময়ূরপুচ্ছের পাখা। রোদনের সুরে ছোটবাবুকে তিনি বোলতে লাগলেন, “আর আমার এ বাড়ীতে থাকা হলো না! কর্তাকে বোলো, জন্মের মত আমি বিদায় হোলেম! রূপসী বোলে গেল, আমি তারে শিখিয়ে দিয়েছিলেম; হার চুরি কোরে হরিদাসের বালিশের ভিতর রাখা, সেটা আমারই পরামর্শ, এই কথাই রূপসী বোলেছে; তোমরাও তার কথাই বিশ্বাস কোরেছ, তোমাদের মোড়লবাবু— গাঁয়ের লক্ষ্মী ছেড়ে গিয়েছে কি না, গাঁখানা এখন ভাঙা গাঁ, মোড়লবাবটি সেই ভাঙা গাঁয়ের মোড়ল! প্রথম দিন তিনি বোলেছিলেন, হরিদাসকে থানায় দাও; আজ এসে বোলে গেলেন, হরিদাস ছোকরা রাহুমুক্ত পূর্ণচন্দ্র। দু রাত্রের বিচারের মূল সাক্ষী সর্বনাশী রূপসী। আমি সেই রূপসীর কথায় অপরাধিনী হয়েছি, ধর্মের বিচারে অপরাধিনী হব না, তোমাদের বিচারে আমি ধরা পোড়েছি, এ বাড়ীতে বাস করায় আর আমার মঙ্গল নাই, আমি বাপের বাড়ী চোল্লেম! আরো ভেবে দেখ, মিছামিছি, আমার সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে তোমাদের বড়বৌটি সে রাত্রে কি কাণ্ডই না কোল্লেন! ছি! ছি! ছি! কি কেলেঙ্কার! গৃহস্থ-বাড়ীতে এমন কেলেঙ্কার ভাল কথা নয়, আমাকে নিমিত্তের ভাগী কোরে তোমার দাদাবাবুটি গাঁছাড়া হয়ে গিয়েছেন; গাঁ-ছাড়া কি দেশছাড়া, তাও ঠিক নাই, কর্তা ফিরে এসে আমাকেই দোষী কোরবেন; আসতেই আমি চাই নাই, কর্তাই জেদাজেদি কোরে আমাকে বাড়ীতে এনে রেখেছিলেন। আমার কপাল যখন ভেঙেছে তখনি আমি অকূল পাথারে ডুবেছি; ভাঙা কপাল নিয়ে যেখানে ইচ্ছা, সেইখানেই এখন আমি যেতে পারি। কর্তাকে এই সব কথা বোলো— আমি আমার বাপের বাড়ী চোল্লেম! সেখানে যদি আশ্রয় না পাই, পথের ভিখারিণী হয়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা কোরে বেড়াবো, তোমরা সুখে থাকো।”

    চক্ষের জলের সঙ্গে এই সব বিষাদবাক্য বর্ষণ কোত্তে কোত্তে অস্থিরপদে ঘর থেকে বেরিয়ে রাঙামামী সরাসরি সিঁড়ি দিয়ে নামতে আরম্ভ কোল্লেন, সঙ্গে সঙ্গে ছোটবাবু ছুটলেন, বাবুর সঙ্গে সঙ্গে রামদাসও ছুটলো; কি রঙ্গ হয়, দেখবার জন্য আমিও সিঁড়ির দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেম। ছোটবাবু বিস্তর সাধ্যসাধনা কোল্লেন, “রূপসীর কথায় বিশ্বাস করি নাই” বোলে বিস্তর বুঝালেন, গোঁ ফিরাতে পারেন না। যুবতীমামীর হাত ধোরে টানাটানি কোত্তে পারেন না, পাল্লেনও না; রাঙামামী কত কি বোকতে বোকতে বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলেন।

    সে রাত্রের অভিনয় এই পর্যন্ত। পরদিন প্রাতঃকালে আমি শুনলেম রূপসী পালিয়ে গিয়েছে। উভয়েই আমার কলঙ্করটনার হেতু ছিল,— রাঙামামী আর রূপসী, উভয়েই পালালো। পায়রাটিও উড়েছে কি আছে, জানতে পারা গেল না। আমার নিজের জন্য যে উদ্বেগ জন্মেছিল, সে উদ্বেগটা দূর হয়ে গেল। নির্ভাবনায় দিবা অবসান। রাত্রিকালে আহারাদি কোরে আমি শয়ন কোল্লেম। পাঁচ দিন পাঁচ রাত্রি আমার নিশ্বাস পড়েছিল, সে নিশ্বাসে তীব্র তীব্র অগ্নিকণা আজ রাত্রে আমি স্বচ্ছলে নিশ্বাস ত্যাগ কোল্লেম। অমরকুমারীকে মনে পোড়লো; অমরকুমারী সর্বক্ষণ আমার মনের ভিতর জাগেন, এই রাত্রে মনে পোড়লো, কথাটা যেন অকৃতজ্ঞ হৃদয়ের কথা। তা নয়, চোর অপবাদে আমি প্রায় হতবুদ্ধি হয়েছিলেম, মনে যেন কোন বাসনা— কোন ধারণাই ছিল না; চিন্তাপথে অমরকুমারী আসতেন, চপলার মত চোলে যেতেন; চপলার সঙ্গে ছুটতে পাত্তেম না; নিজের ভাবনাতেই আমি আকুল হয়ে থাকতেম। মানুষের স্বভাবই এইরূপ। মানুষ যখন অভাবনীয় মহাবিপদে পতিত হয়, নিজের পরিত্রাণের চিন্তা ভিন্ন তখন তার মনে অন্যচিন্তা স্থান পায় না, নিজের চিন্তাই বলবতী হয়ে থাকে। সকল চিন্তার উপরেই চিন্তা। এই রাত্রে অমরকুমারীকে মনে পোড়লো, অমরকুমারী কোথায়? এখনো কি ঢাকায়? ঢাকার শাখা-মোকদ্দমা এখনো কি নিষ্পন্ন হয় নাই? আমার কথা কি অমরকুমারীর মনে আছে? লোকে আমারে চোর বোলেছিল, অমরকুমারীর মন কি সে অপবাদের কথা জানতে পেরেছে? আমার প্রতি কি অমরকুমারীর অশ্রদ্ধা জন্মেছে? কত দিনে আবার আমি অমরকুমারীকে দেখতে পাব?— নিৰ্জনে এক জায়গায় বোসে কবে আমি অমরকুমারীকে এই সব কথা জিজ্ঞাসা কোরবো? অমরকুমারীর নাম উচ্চারণ কোল্লে হৃদয় আমার শীতল হয়, দর্শনের আশায় প্রাণ আমার ব্যাকুল হয়; অন্য প্রকারে চিত্ত বিচলিত হয় না, এ রাত্রেও বিচলিত হোচ্ছে না। অমরকুমারী ভাল আছেন; কোন প্রকার অমঙ্গল ঘটনা হোলে বহুদূরে থেকেও অন্তরঙ্গ লোকের মন সে অমঙ্গল জানতে পারে; কোন অমঙ্গল ঘটে নাই, অমরকুমারী ভাল আছেন। অমরকুমারী হয় তো মুর্শিদাবাদে ফিরে গিয়েছেন, শান্তিরাম দত্ত হয় তো তাঁরে পুত্রীরূপে আশ্রয় দিয়েছেন। আবার কি রক্তদন্ত অমরকুমারীর উপর উপদ্রব কোরবে? —না, পারবে না; দীনবন্ধুবাবু অমরকুমারীর রক্ষার উপায়বিধান কোরবেন, পশুপতিবাবু সে কথা আমার কাছে মুক্তকণ্ঠে স্বীকার কোরেছেন। অমরকুমারীর ভয় নাই। আমার ভয় আছে, ভবসংসারের ভয়নিবারণ ভূতভাবন ভবানীপতি এ ভয় আমার ঘুচাবেন। পনেরায় আমি অমরকুমারীকে দেখতে পাব, দেখতে পেয়ে সখী হব, পদ্মমুখে হেসে হেসে পদ্মমুখী আমার সঙ্গে সুখর আলাপ কোরবেন, রজনী দেবী আজ আমারে সেই আশা প্রদান কোচ্ছেন। অমরকুমারীকে ভাবতে ভাবতে অন্যান্য হিতৈষী বন্ধুগণকে হৃদয়াসনে আমি আনয়ন কোল্লেম, হৃদয় জুড়াল; বিরামদায়িনী নিদ্রাদেবী এই সময় আমার প্রতি দয়া কোল্লেন, মঙ্গলময়ী আমাকে হৃদয়ে স্থান দান কোল্লেন। নিদ্রার ক্রোড়ে আমি অচেতন হোলেম।

    নিত্য আমার মনে নূতন নূতন আশার সঞ্চার। আশা সর্বত্র সর্বদা সর্বকার্যে ফলবতী হয় না, তথাপি আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, এই গুণে আশাকে আমি আদর করি। চোরদায় থেকে মুক্ত হয়ে আমি আশা সলিলে অবগাহন কোল্লেম। সে সময়ে আমার মনে কত রকমের কত আশা খেলা কোত্তে লাগলো, এখন সে সব স্মরণ কোত্তে পাচ্ছিনে। আমার প্রতি ছোটবাবুর যে রকম ভালবাসা ছিল বুঝলেম, সে ভালবাসা দিন দিন বেড়ে উঠলো। রামদাসের ভক্তিও দিন দিন বাড়তে লাগলো, বৌমা দুটিও দিন দিন আমারে বেশী আদর কোত্তে লাগলেন, পাচিকার স্নেহ-যত্নও দিন দিন আমি বেশী বেশী অনুভব কোত্তে লাগলেম। এই রকমে আর একমাস কেটে গেল।

    কর্তা বাড়ীতে এলেন। এসে তিনি সর্বাগ্রেই শুনলেন, বড়বাবু গৃহত্যাগী। কারণ-জিজ্ঞাসু হয়ে বাড়ীর পরিবারবর্গের কাছে কিরূপ তিনি শুনেছিলেন, সে সব কথা আমি শুনতে পেলেম না, তবু মনে মনে ভেবে নিয়েছিলেম, প্রাণগতিবাবু, তাঁর রাঙামামীর প্রাণগতি হয়েছিলেন, সেই গৌরবের কথা তিনি শুনতে পান নাই। রাঙামামী বাড়ীতে নাই, এ কথা যখন কর্তা শুনলেন, তখন তার কারণটিও অনলঙ্কৃতভাবে তাঁর কর্ণগোচর হয়েছিল। শুনে তিনি বিমর্ষ হয়েছিলেন; ক্রমে ক্রমে অপরাপর বিবরণ সমস্তই তিনি শুনলেন। ভূতের ক্রীড়ার অবসান। আমিই সেই অবসানের মূলাধার।

    রামদাস এসে আমারে সংবাদ দিলে, ঐ কথা যখন কর্তার কাণে যায়, তখন তিনি এক বিশাল নিশ্বাস পরিত্যাগ কোরেছিলেন; জানতে চেয়েছিলেন, কোন দিন কোন সময়ে ভৌতিকলীলার অবসান। দিনক্ষণ ছোটবাবুর একখানি খাতায় লেখা ছিল, ছোটবাবু সেই খাতাখানি কর্তার কাছে ধোরে দিলেন, কর্তা সেই অক্ষরগুলি দর্শন কোরে নিমীলিত-নয়নে ক্ষণকাল যেন কি গুটিকত মন্ত্র জপ কোল্লেন, এক দুই কোরে অঙ্গলীর পর্ব গণনা কোল্লেন, শেষে আর একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ কোরে বিস্মিতবদনে বোল্লেন, “ওঃ! তবে তো গয়ায় পিণ্ডদানের সপ্তাহপূর্বে সেই ঘটনা। আশ্চৰ্য।”

    এই সব কথা রামদাসের মুখে আমি শুনলেম। কর্তার সঙ্গে আমার যখন সাক্ষাৎ হলো, ভূতের কথা তখনো উঠেছিল, কর্তা কিন্তু আমার সাক্ষাতে তখন “আশ্চৰ্য” বাক্যটি উচ্চারণ কোল্লেন না। ভূতের তিরোধান, বড়বাবুর অদর্শন, রাঙামামীর পলায়ন, রূপসীর পলায়ন, এই সমস্ত প্রসঙ্গে অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে গেল, “আমি কেমন আছি” কর্তা সে কথাটি পৰ্যন্ত জিজ্ঞাসা করবার সময় পেলেন না। সময় পেলেন না কিবা সে কথা জানবার তাঁর দরকার ছিল না, তিনিই তা বোলতে পারেন। গয়ায় গদাধরের পাদপদ্মে পিণ্ডদানের অগ্রে ও অন্য উপায়ে ভূত উদ্ধার হোতে পারে, কর্তার সেটা বিশ্বাস ছিল না, বন্দুকের গুলীতে আমি ভূত উদ্ধার কোরেছি, সে কথাটা তাঁর ভাল লাগলো না, তাঁর মুখের ভাব দেখে তা আমি বুঝতে পাল্লেম। রাঙামামী পালিয়েছে, রূপসী পালিয়েছে, আমিই তার হেতু, বাড়ীর লোকের মুখে সে কথা তিনি শুনেছিলেন, তাতেও যেন আমার উপর তাঁর একটা একটা মন ভার। মনোভাব গোপনে রেখে গুটিকত মিষ্টবচনে আমারে তিনি তুষ্ট করবার চেষ্টা কোল্লেন, আমি তুষ্ট হোতে পাল্লেম না। তাঁর পূর্ব ব্যবহার স্মরণ কোরে আমার দারুণ ভয় হোতে লাগলো।

    গৃহিণী ঠাকুরাণী আমার প্রতি সন্তুষ্ট। অজ্ঞাত লোকেরা আমারে যখন এই বাড়ীতে ফেলে দিয়ে যায়, কর্তা তখন আমারে নেশাখোর বিবেচনা কোরে কাৰ্যে বাক্যে ঘৃণা প্রকাশ কোরেছিলেন; গৃহিণী কিন্তু প্রথমাবধিই আমার প্রতি স্নেহবতী। বাড়ীতে যে কাজ আমি কোরেছি, ভূতগুলোকে তাড়িয়েছি, মিথ্যা মিথ্যা চোর অপবাদে অনেক কষ্ট পেয়েছি, সেই সব কথা শ্রবণ কোরে এবার আমার প্রতি গৃহিণীঠাকুরাণীর অধিক আদর, অধিক যত্ন, অধিক স্নেহ আমি অনুভব কোল্লেম। পুত্রের পরলোকপ্রাপ্তি হোলে জননীর পুত্রশোক উপস্থিত হয়; জ্যেষ্ঠপুত্রের অদর্শনে ততটা না হোক গৃহিণী-ঠাকুরাণী শোকসন্তাপ্ত হয়েছিলেন, কিন্তু আমার প্রতি কোন প্রকার অযত্ন হয় নাই। কর্তা-গিন্নীর প্রত্যাগমনে দিনকতক আমি বরং এক প্রকার সুখেই থাকলেম। কোন প্রকার অপ্রিয়বাক্য আমাকে শুনতে হলো না।

    একদিন সন্ধ্যার পর আমি আপনার ঘরে একাকী বোসে আছি, একজোড়া চসমা চক্ষে দিয়ে, হস্তে একগাছি যষ্টিধারণ কোরে কর্তা সেই সময় সেইখানে এসে উপস্থিত হোলেন; জড়সড় হয়ে বিছানার একধারে আমি সোরে বোসলেম। ঘরের চতুর্দিকে নেত্রপাত কোত্তে কোত্তে কর্তা আমার কাছে বোসলেন।

    কি তাঁর মতলব, কি কথা তিনি বলেন, ভাব বুঝতে না পেরে অবনতমস্তকে আমি ক্ষণকাল নীরব হয়ে থাকলেম। কর্তা হঠাৎ আমারে সম্বোধন কোরে গম্ভীরস্বরে বোল্লেন, “হরিদাস! পূর্বে কি তুমি বর্ধমানে ছিলে? মোহনলাল ঘোষ নামে একটি বাবুর সঙ্গে সেখানে তোমার সাক্ষাৎ হয়েছিল?” —দুই প্রশ্নেই আমি ‘হাঁ’ দিলেম। কর্তা বোল্লেন, “সেই মোহনলালবাবু এখন পাটনায়; তীর্থ কর্ম সমাধা কোরে আমি একবার পাটনায় গিয়েছিলেম, মোহনলালের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি একজন জমীদার। এই জেলায় তাঁর একখানি জমীদারী আছে, মধ্যে মধ্যে কোন কোন বিষয়কার্যের উপলক্ষে পূর্বে পূর্বে তিনি এখানে আসতেন, এইখানেই তাঁর সঙ্গে আমার দেখাশুনো ছিল, আলাপপরিচয় হয়েছিল। পাটনা সহরে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ কোরে অনেক নূতন নূতন কথা আমি জানতে পেরেছি। তিনি বেশ লোক; ভাললোকের প্রতি ভগবানের কৃপা হয়, ভগবানের কৃপা হোলে কমলাও প্রসন্না হন, মোহনলালের প্রতি কমলার শুভদৃষ্টি পতিত হয়েছে। ছিলেন তিনি বড়মানুষ, আছেন তিনি বড়মানুষ, তার উপর সম্প্রতি নূতন সৌভাগ্যের উদয়। তাঁর একটি মাতুলানী সম্প্রতি লোকান্তর প্রাপ্ত হয়েছেন; তিনি বিধবা ছিলেন, সন্তান-সন্ততি জন্মে নাই, প্রায় লক্ষ টাকা উপস্বত্বের বিষয় তাঁর অধিকারে ছিল, অন্য কোন নিকট উত্তরাধিকারী না থাকাতে মোহনলালবাবু সেই বিষয়ের অধিকারী হয়েছেন। কতকগুলি সৎকার্যের পুরস্কারস্বরূপ রাজদরবার থেকে তিনি রাজা উপাধি লাভ কোরেছেন। তাঁর মুখে আমি তোমার অনেক সুখ্যাতি শ্রবণ কোরেছি। ছেলেবুদ্ধিতে তুমি তাঁর অবাধ্য হয়েছিলে, সে জন্য তিনি আপসোস করেন; অন্তরে কিন্তু তোমার উপর তিনি দয়াশূন্য হন নাই। এই সময় তুমি যদি একবার তাঁর সঙ্গে দেখা কোত্তে পার, তা হোলে তোমার বিশেষ উপকার হোতে পারে। আর দেখ— অবস্থাগতিকে তোমার চরিত্রের প্রতি প্রথমে আমার কিছু সন্দেহ জন্মেছিল, তোমাকে আমি তিরস্কার কোরেছিলাম, সে সব কথা তুমি আর মনে কোরো না; প্রকৃত অবস্থা আমি বুঝতে পারি নাই; মোহনবাবুর মুখে তোমার চরিত্রের প্রশংসা শুনে আমি বিশেষ সন্তুষ্ট হয়েছি। চিরদিন এই বাড়ীতে রেখে তোমাকে আমি পুত্রবৎ পালন করি, এই আমার ইচ্ছা। কিন্তু কিছু দিনের জন্য একবার তোমার পাটনায় যাওয়া আবশ্যক। কি বল? — যাওয়ার তোমার ইচ্ছা আছে?”

    কথাগুলি আমি শুনলেম, প্রশ্নমাত্রেই কোন উত্তর দিলেম না। আমার মৌন দর্শন কোরে কর্তামহাশয় কি ভাবলেন, কি বুঝলেন, বোলতে পারি না, নীরবে কিয়ৎক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থেকে সহসা তিনি গাত্রোত্থান কোল্লেন, ঘর থেকে বেরিয়ে চোল্লেন: যাবার সময় আমারে বোলে গেলেন, “আচ্ছা, বিবেচনা কর। পাটনায় যেতে তোমার ইচ্ছা আছে কি না, বিবেচনা কোরে স্থির কর, কল্য আমি তোমার মুখে এই বিষয়ের মীমাংসা শ্রবণ কোরবো।”

    কর্তা চোলে গেলেন, আমি ভাবতে বোসলেম। মোহনলালবাবু লক্ষ টাকার বিষয় পেয়েছেন, রাজা হয়েছেন, আমারে স্মরণ কোরেছেন, কি ভাব? অকস্মাৎ আমার প্রতি কেন তিনি এত সদয়? তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা কাশীধামে। প্রথম প্রথম দিনকতক আদর পেয়েছিলেম। শেষকালে আমি তাঁর বিষনয়নে পড়ি; বুদ্ধির দোষে অথবা আত্মবিশ্বাসে আমি তাঁর চরিত্রের গুটিকতক কথা রমণবাবুর নিকটে ব্যক্ত কোচ্ছিলেম, গোপনে অন্তরালে দাঁড়িয়ে সেই সব কথা শ্রবণ কোরে তিনি আমার উপরে খড়্গহস্ত হয়েছিলেন, তদবধি তাঁর সঙ্গে আর আমার দেখা-সাক্ষাৎ নাই। এত দিনের পর অকস্মাৎ তিনি আমারে স্মরণ কোরেছেন, ভাব কি?— আর কি তবে আমার উপর কোন প্রকার উৎপীড়ন হবে না? বৈরিবেষ্টিত হয়ে আর কি আমারে অহরহ যন্ত্রণা ভোগ কোত্তে হবে না? সমস্ত উপদ্রবই কি থেমে যাবে? তাই যদি সত্য হয়, থামে যদি সত্য, তবে তো আমার গ্রহ সুপ্রসন্ন; কিন্তু তাও কি সম্ভব? দুরাচার রক্তদত্ত তাঁর প্রধান চেলা; কেবল চেলা নয়, বেতনভোগী চাকর। মোহনবাবুর পরামর্শে রক্তদন্ত চলে, বলে, কুকার্য করে, আবশ্যক হোলে মানুষ খুন কোত্তেও প্রস্তুত হয়। আমি ভুক্তভোগী, আমার উপর রক্তদন্তের বিষম আক্রোশ; মোহনবাবু যদি তারে নিবারণ করেন, তা হোলে সংসারে আমি এক প্রকার নিরাপদে থাকতে পারবো। কাশীতে আমি জানতে পেরেছিলেম, মোহনবাবু, একখানি পত্র লিখে রক্তদন্তকে আমার উপর দৌরাত্ম্য কোত্তে নিষেধ কোরেছিলেন; তার পর আবার যে সেই। এখন আমার কি করা কর্তব্য? পাটনায় গিয়ে মোহনবাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা; পাটনায় আমার পরিচিত লোক কেহই নাই, কায়দায় পেয়ে মোহনবাবু, যদি আমারে আটক কোরে ফেলেন, তা হোলে আমি কি উপায়ে রক্ষা পাব? এ দিকে আমার অনেক কাজ বাকী, দুই জেলায় দুই মোকদ্দমা দায়ের, অমরকুমারীর উদ্ধারসাধন আমারই উদযোগ-সাপেক্ষ, কি করি?—যাই কি না যাই? প্রবলপক্ষের মনস্তুষ্টিসাধন করাতে উপকার আছে; মোহনবাবু প্রবল, আমি দুর্বল, তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আমার অসাধ্য। তিনি কুপিত হোলে আমার বিস্তর অনিষ্ট কোত্তে পারেন; তিনি প্রসন্ন থাকলে সংসারে সর্বদা আমারে শঙ্কিত থাকতে হয় না। এই সকল বিবেচনা কোরে, কিঞ্চিৎ সন্দেহ থাকলেও অবশেষে স্থির কোল্লেম, পাটনায় একবার যাওয়াই কর্তব্য।

    কর্তব্য স্থির কোরে বোসে আছি, ছোটবাবু এলেন। কর্তব্য স্থির হোলেও চিত্ত তখন আমার চিন্তাশূন্য ছিল না। আমারে চিন্তানিমগ্ন দর্শন কোরে উপবেশনের অগ্রেই ছোটবাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি ভাবছো হরিদাস? যখন আমি তোমাকে দেখি, তখনি তুমি বিমর্ষ থাকো; কত রকম আমোদজনক ঘটনা হয়, কত রকম আনন্দোৎসব উপস্থিত হয়, সে দিকে তোমার মন থাকে না, সর্বদাই তুমি যেন কি ভাব; এত অল্প বয়সে এত ভাবনা কি তোমার?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “আপনি কখন আসবেন, তাই আমি ভাবছিলেম। আপনি বসুন কতকগুলি কথা আছে।” ছোটবাবু বোসলেন। প্রথমেই আমি কর্তার কথা তুল্লেম, কর্তা আমারে পাটনায় যেতে অনুরোধ কোচ্ছেন; পাটনায় একটি বাবু আছেন, সেই বাবুর সঙ্গে পূর্বে আমার জানাশুনা ছিল— আপনাদের বাড়ীতে আমি আছি, গল্প প্রসঙ্গে কর্তার মুখে সেই কথা জানতে পেরে সেই বাবুটি আমারে স্মরণ কোরেছেন, পাটনায় যেতে বোলেছেন; আমিও এক রকম স্থির কোরেছি, যাওয়া কর্তব্য। আপনি কিরূপ পরামর্শ দেন?”

    ছোটবাবু বোল্লেন, “তোমাকে ছেড়ে দিতে আমার ইচ্ছা হয় না। পরামর্শ কি দিব? পাটনার বাবু কি প্রকৃতির বাবু, তোমার সঙ্গে তাঁর কিরূপ আলাপ, তাঁর কাছে তোমার কিরূপ প্রয়োজন, সে সব না জানলে কি প্রকারে পরামর্শ দেওয়া যায়?” সংক্ষেপে আমি গুটিকতক কথা বোল্লেম, মোহনবাবু আমার ভয়ের কারণ, সে কথা বোল্লেম না, সাক্ষাৎ কোত্তে পাল্লে কোন প্রকার উপকারের সম্ভাবনা আছে, কেবল এই পর্যন্তই ছোটবাবুকে আমি জানালেম। তিনি তখন একটু চিন্তা কোরে বোল্লেন, “কর্তা যদি ইচ্ছা করেন, তুমি যদি ইচ্ছা কর, তবে একবার যেতে পার, কিন্তু বেশী দিন সেখানে থেকো না, শীঘ্র আবার ফিরে এসো। কবে যাবে স্থির কোরেছ?”

    আমি তখন আর একখানা ভাবছিলেম, “কবে যাবে স্থির কোরেছ” এই প্রশ্নের উত্তরের ভূমিকায় আমি বোল্লেম, স্থির এখনো কিছুই করি নাই, আপনার অভিপ্রায় জানবার জন্য অপেক্ষা কোচ্ছিলেম। এখানে এসে আমি অনেক রকম কাজ করেছি। অনেক রকম তাজ্জব ব্যাপার দর্শন কোরেছি, অনেক রকম অদ্ভুত অদ্ভুত কথাও শ্রবণ কোরেছি, একটি কাজ আমার বাকী আছে।” — ছোটবাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, কোন কার্য বাকী?”

    সেই পূর্বকথাই আমি পুনরোল্লেখ কোল্লেম,— পায়রাবাবুকে একবার এই বাড়ীতে হাজির করা। কি কারণে হাজির করা প্রয়োজন, স্পষ্ট কিছু ভাঙলেম না, কেবল এইমাত্র বোল্লেম, “ভূতের ব্যাপারের সঙ্গে পায়রাবাবুর অতি নিকট সম্বন্ধ। ভূতগুলি উদ্ধার হয়ে গিয়েছে, সেই দুঃখে পায়রাবাবু ম্রিয়মাণ আছেন; তাঁরে গুটিকত প্রবোধ বাক্য—”

    হাস্য কোরে ছোটবাবু বোল্লেন, “পায়রাকে প্রবোধ দিয়ে তুমি ঠাণ্ডা কোত্তে পারবে, এমন আমার বিশ্বাস হয় না। পায়রাবাবুটি তুখোড় লোক, বেশী চালাক, সকল রকমে সকল দিকেই তার বুদ্ধি খেলে; অল্পদিনে সে সব আমি বুঝতে পেরেছি। পায়রা এ দেশে ছিল না, নূতন এসেছে, সে কথা তুমি শুনেছ; নূতন লোকের সঙ্গে বেশী ঘনিষ্ঠতা না কোল্লে চরিত্র ধরা যায় না, তথাপি বিনা ঘনিষ্ঠতায় পায়রাকে আমি এক প্রকার চিনে নিয়েছি। পায়রার একটা রোগ আছে; ঔষধের মোড়ক নিয়ে তুমি—”

    হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে রামদাস সেই সময় সংবাদ দিলে, “নূতন বিপদ উপস্থিত! পুলিশের লোক এসেছে! খুনের খবর এনেছে! আমাদের বাড়ীতে যিনি আগে আগে ঠাকুরপূজা কোত্তেন, সেই বামুনঠাকুর সঙ্গে আছেন। চাতালপুর গ্রামের এক মাঠের ধারে একটা গাছতলায় মেয়েমানুষ খুন! এই রকম কথা তারা বোলছে, উপরে আসতে চাচ্ছে, আমি তাদের কি বোলবো?”

    খুনের খবর শুনে চমকিতভাবে ছোটবাবু বোল্লেন, “কোথায় মাঠের ধারে খুন হয়েছে, আমাদের বাড়ীতে তার কি? আচ্ছা, দাঁড়াতে বল গে, আমি যাচ্ছি।”

    রামদাস নেমে গেল। একটু পরে একটি জামা গায়ে দিয়ে ছোটবাবু উপর থেকে নামলেন, অনিশ্চিত ভাবনায় কৌতূহলবশে আমিও সঙ্গে গেলেম; — গিয়ে দেখি, একজন ফাঁড়ীদার ব্রাহ্মণ, আর দুই জন বরকন্দাজ, সঙ্গে একজন ভট্টাচাৰ্য। ভট্টাচাৰ্যকে সম্বোধন কোরে ছোটবাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি মথুরে কাকা? ব্যাপার কি? আপনার সঙ্গে পুলিশ কেন?”

    ছোটবাবু বোল্লেন মথুর কাকা, আমি শুনলেম মথুর কাকা, এখন মথুর কাকা কি উত্তর দেন, সেই কথা শুনবার জন্য তাঁর মুখ-পানে আমি চেয়ে থাকলেম। মথুর কাকা একবার ফাঁড়ীদারের মুখের দিকে চাইলেন, ফাঁড়ীদার বোলতে লাগলো, “চাতালপুরের এক বাগানের এক বৃক্ষতলে একটি স্ত্রীলোকের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে, গলায় দড়ী কিম্বা সর্পাঘাত কিম্বা বিষখাওয়া, তার কোন নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে না। কেহ তাকে খুন কোরেছে কি না, তাও প্রকাশ হোচ্ছে না, কে সেই স্ত্রীলোক, কোথা থেকে এসেছিল, সে কথাও কেহ বোলতে পারে না। গ্রামের কেহ নয়; গ্রামের লোকেরা চিনতে পাচ্ছিল না, দু একজন বোলেছিল, তিন চারি দিন গ্রামের রাস্তার ধারে সেই স্ত্রীলোককে তারা দেখেছে। আর কোন বিশেষ কথা তার কিছুই জানে না। আমি তদারক কোচ্ছিলেম, এমন সময় এই ব্রাহ্মণঠাকুর সেইখানে উপস্থিত হোলেন, লাশ দেখে ইনি চিনতে পাল্লেন। এরি মুখে আমি শুনলেম, সেই স্ত্রীলোক আপনাদের বাড়ীতে ছিল, তার নাম রাধারাণী। কি প্রকারে মোরেছে, চাতালপুরে কেন গিয়েছিল, এই সব কথা আমাদের জানা দরকার। আপনাকে একবার চাতালপুরে যেতে হবে, মোড়ল-চৌকিদার মোতায়েন রেখে আপনার কাছে আমি এসেছি।”

    দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা। ফাঁড়ীদারকে কেহ বোসতে বোল্লে না, আমরাও কেহ বোসলেম না, বরকন্দাজেরা এক এক লাঠি ঘাড়ে কোরে প্রাচীর ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। ফাঁড়ীদারের কথায় ছোটবাবু বোল্লেন, “সে সব কাজ তোমাদের, আমাকে কেন চাতালপুরে নিয়ে যাবার আকিঞ্চন পাও? ভট্টাচাৰ্য মহাশয় চিনতে পেরেছেন, নাম রাধারাণী, সে কথাও বোলেছেন, এখন আমি বুঝতে পাচ্ছি। সে স্ত্রীলোক আমাদের বাড়ীর লোক নয়, কিছুদিন আমাদের বাড়ীতে ছিল, একমাসের বেশী হলো আপন ইচ্ছায় চোলে গিয়েছিল; তার পর কোথায় কি হয়েছে আমরা তার কি জানি? কোথায় কি রকমে মোরেছে, সরকারী ডাক্তারেরা পরীক্ষা কোল্লেই জানতে পারবে। সনাক্ত হয়ে গিয়েছে, তবে আর আমাকে কেন কষ্ট দিতে চাও? তোমরাই বা কষ্ট পেয়ে এতদূর কেন এসেছ? স্বস্থানে ফিরে যাও; ঐরূপ অপঘাতমৃত্যুর তদারকে যেমন যেমন তোমাদের কর্তব্য, আইন যেমন বলে, তাই তোমরা কর গে; আমার সেখানে যাবার কোন দরকার নাই; আমি যাব না।”

    পুলিশের লোক প্রায়ই জুলমবাজ হয়; ভদ্রলোককে অনর্থক কষ্ট দিয়ে ষটচক্র সৃজন কোরে আপনাদের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা পায়। এই ফাঁড়ীদারটী কিছু ভালমানুষ ছিল; বোধ হয় নূতন লোক, পুলিশের কায়দা দস্তুরমত শিক্ষা করে নাই। ছোটবাবুর কাটা কাটা কথাগুলি শ্রবণ কোরে সে লোক আর কোন মারপেঁচের কথা বোল্লে না, আট গড়া পয়সা রাহাখরচ গ্রহণ কোরে অল্পে অল্পে বিদায় হয়ে গেল। কায়দার মধ্যে কেবল এইটুকু দেখলেম, মথুর ভট্টাচাৰ্যকে ছেড়ে গেল না।

    আমরা আবার উপরে গিয়ে উঠলেম; যে সব কথা শুনে এলেম, অননুচ্চস্বরে তারই আলোচনা কোত্তে লাগলেম। রামদাসকে সাবধান কোরে ছোটবাবু বোলে দিলেন, খবরদার, কর্তা যেন এ সব কথা না শোনেন। বাড়ীর মেয়েরাও যেন এ সব কথা শুনতে না পায়। কাহারো কাছে তুমি এ গল্প কোরো না।”

    স্বীকার কোরে রামদাস আপন কর্মে গেল, ছোটবাবুতে আমাতে নির্জনে থাকলেম। ছোটবাবু বোল্লেন, “দেখ হরিদাস, কোথাকার পাপ কোথায়? পাপের প্রায়শ্চিত্ত এই রকমেই হয়। রাঙামামী মোরেছে, আত্মঘাতিনী হয়েছে কিম্বা কেহ তারে খুন কোরে মাঠের ধারে ফেলে গিয়েছে, ঠিক জানা যাচ্ছে না বটে; কিন্তু প্রায়শ্চিত্ত ঠিক হয়েছে। যে রকম ঢলাঢলি আরম্ভ হয়েছিল, আমি তাতে ভয় পেয়েছিলেম; বাড়ীর ভিতর পাছে কোন কাণ্ড ঘটে, বাড়ীর ভিতর পাছে খুনোখুনী হয়, সেই ভয়ে সদাই আমি শঙ্কিত থাকতেম। ভূতের কাণ্ড গেল, দাদার কাণ্ড গেল, তার পর তোমার নামে চোর অপবাদ রটলো, আর কিছু দিন থাকলে আরো যে কত রকম কি কারখানা হোতো, কে বোলতে পারে? ভালোয় ভালোয় আপনাআপনি বিদায় হয়ে গিয়েছিল, জন্মের মত পৃথিবী হোতে বিদায় হয়ে গেল, এক রকম হলো ভাল। সকল পাপের যদি এই রকম হাতে হাতে প্রায়শ্চিত্ত হয়, তা হোলে সংসারের পাপ-তাপ অনেকটা কম হয়ে আসে।”

    ফাঁড়ীদারের কথা আমি শুনেছি, ছোটবাবুর কথাও শুনলেম, কিন্তু ছোটবাবুর শেষের কথাগুলি বিশেষ মনোযোগ দিয়ে শুনলেম না। নূতন একটা কল্পনা মনোমধ্যে সমূদিত হয়ে আমারে কিছু অন্যমনস্ক কোরে দিয়েছিল। ছোটবাবুর কথা সমাপ্ত হলো কিম্বা আরও কিছু, তাঁর বক্তব্য বাকী থাকলো, সে দিকে লক্ষ্য না রেখে হঠাৎ আমি মন্তব্য দিলেম, “হাতে হাতে প্রায়শ্চিত্ত হওয়া খুব ভাল। আর একজন যদি এই সময় একটা প্রায়শ্চিত্ত করে, তা হোলে আমার একটা মনস্কামনা পূর্ণ হয়, মস্ত একটা সন্দেহও জন্মে রয়েছে, সেটাও দূর হয়ে যায়।”

    তাৎপর্যগ্রহণে অসমর্থ হয়ে সকৌতুকে ছোটবাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “আবার কার কি রকম প্রায়শ্চিত্ত হরিদাস? যার পাপ, সে তো আপনার জীবন দিয়ে মহাপ্রায়শ্চিত্ত কোরে গেল, তবে আর তুমি অন্য কোন পাপীর প্রায়শ্চিত্তের কথা বোলছ?”

    আমি একটু ভাবলেম, সহসা যদি অকপটে মনের কথা প্রকাশ করি, তা হোলে হয় তো উপহাসেই ছোটবাবু আমার কথাটা উড়িয়ে দিবেন, একটু বাঁধনী রাখা আবশ্যক। মনে মনে বন্ধনের সূত্র কল্পনা কোরে ছোটবাবুকে আমি বোল্লেম, “আপনাদের গ্রামে অনেক রকম তামাসা আমি দেখলেম, তামাসা-দর্শনে প্রায় সকল লোকেই কৌতুক অনুভব করে, আমোদ অনুভব করে, যারা তামাসা দেখায়, তাদের অনেকের রঙ্গভঙ্গ দর্শনে প্রায় সকলেই অবিচ্ছেদে হাস্য করে; এখানকার তামাসায় আমি দুই প্রকার দেখলেম। হাস্যের উদয় হয়, কতক তামাসায় কষ্ট অনভূত হয়ে থাকে। কতক তামাসায় তামাসগীর লোক এখানে অনেক আছে বোধ হয়। একটি কথা আপনাকে আমি জিজ্ঞাসা কোত্তে চাই; এ গ্রামে কি দুই একজন বহুরূপী পাওয়া যায়? বহরূপীদের তামাসা বড় চমৎকার। একটি বহুরূপীর ক্রীড়াদর্শনে আমার অভিলাষ জন্মেছে, আছে কি কোন বহরূপী?”

    একদৃষ্টে আমার নয়ন নিরীক্ষণ কোরে ছোটবাবু বোপ্পেন, “এ যে দেখছি তোমার অদ্ভুত অভিলাষ। সকল জায়গায় কি বহরূপী থাকে? সকল পল্লীগ্রামে কি বহুরূপী পাওয়া যায়? আমাদের গ্রামে বহুরূপী নাই; তবে মধ্যে মধ্যে দুই একটা মেলার স্থলে দুই একজন বহুরূপী আসে। মধ্যে মধ্যে কখন কখন গৃহস্থ লোকের বাড়ীতেও এক একজন বহুরূপী দেখা দেয়, এই পর্যন্ত আমি জানি। এ গ্রামে বহুরূপী নাই।”

    আবার আমি একটু ভাবলেম; ভেবে ভেবে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “বহরূপীদের কোনপ্রকার সজ্জা এখানকার নিকটবর্তী কোন স্থানে কাহারো নিকটে পাওয়া যেতে পারে না?”— ছোটবাবু বোল্লেন, “যেখানে বহুরূপী নাই, সেখানে বহুরূপীর সাজ পাওয়া অসম্ভব; তবে এখানে যাত্রার দল আছে তাদের কোন রকম সাজ পেলে যদি তোমার কোন কাজে লাগে, তা বরং যোগাড় করা যেতে পারে।”

    না পাওয়ার চেয়ে বরং তা পাওয়াও ভাল, এই বিবেচনা কোরে আমি বোল্লেম, “যাত্রার দলে যারা মুনিগোঁসাই সাজে, তাদের সেই রকমের একটা সাজ পেলে একটি লোকের উপকার হয়। আপনি যদি দয়া কোরে সেই সাজ আমারে আনিয়ে দেন, তা হোলে আমি উপকৃত হই।”

    ছোটবাবু সম্মত হোলেন। আর তখন আমাদের বেশী কথা কিছু হলো না। ছোটবাবু অন্দরে প্রবেশ কোল্লেন। উপর থেকে নেমে গিয়ে আমি রামদাসের অন্বেষণ কোল্লেম, রামদাসকে পেলেম, চুপি চুপি তারে একটি পরামর্শ দিলেম। যেন একটু ভয় পেয়ে রামদাস বোল্লো, “আমায় ও কথা কেন বল? সে কি আমার কর্ম? আমি পারব না। তুমি যদি নিজে পার, চেষ্টা কোরে দেখ; আমি বরং তোমার সঙ্গে থাকবো।”

    রামদাসের শঙ্কিতভাব অনুভব কোরে, মনে মনে হেসে পুনর্বার আমি তারে বোল্লেম “ভয় পাও কেন? সরপট তোমারে কোন কাজ কোত্তে হবে না, সে বাড়ীতে যেতে হবে না, পল্লীর অপর কোন লোককে জিজ্ঞাসা কোরে শুধু কেবল জেনে আসবে সেই লোক এখন এ গ্রামে আছে কি না? সর্বদা বাড়ীতে থাকে কি না? সর্বদা যদি না থাকে, কোন সময় তার দেখা পাওয়া যায়, শুধু কেবল সেইটুকু জেনে আসতে পার আমার কাজ হবে।”

    গণগণেশ্বরে আপন মনে কিয়ৎক্ষণ গুঞ্জন কোরে রামদাস শেষকালে বোল্লে, “তোমার খেলা তুমিই বুঝতে পার, খেলার ভাল-মন্দ তুমিই জানো; আমি তোমাদের হুকমের চাকর, কাজেই আমাকে সব রকম হুকুম তামিল কোত্তে হয়। এখন তুমি যে কথা বোল্লে, সে কাজটা হয় তো আমি পারবো। রাত্রের কথা নয়, প্রভাত হোক, আমি একবার চেষ্টা কোরে দেখে আসবো।”

    কাৰ্যসিদ্ধির আভাষ পেয়ে পুনর্বার আমি বোল্লেম, “প্রভাতে হোক, বেলা এক প্রহরে হোক, দ্বিপ্রহরে হোক, সন্ধ্যার মধ্যে সংবাদটা পেলেই আমি যথাকর্তব্য অবধারণ কোত্তে পারবো; কেবল কথাটিমাত্র এনে দিবে, এই তোমার কাজ।”

    কি একটা চিন্তা কোরে রামদাস বোল্লে, “ঐ পর্যন্ত আমার কাজ, তা আমি বুঝলেম, ভাবতে কথাটা খুব সহজ বটে, কিন্তু আমার মনে যেন কোন প্রকার গোলমাল ঠেকছে। দেখ বাপু, আর যেন কিছু বাড়াবাড়ি করো না; যা করবার, ঢের কোরেছ, তার উপর আর কিছু বেশী হোলে ঢলাঢলি আরো বেশী হবে, আমি কেবল সেই ভয় করি, যে সব কাজ তুমি কোরেছ, এক রকম মানিয়ে গিয়েছে; সে সময় কর্তা বাড়িতে ছিলেন না, ততটা গোলমাল হয় নাই; কর্তা এখন ফিরে এসেছেন, সাবধান হয়ে কাজ কোরো। খবরটা আমি তোমাকে এনে দিব, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।”

    রামদাসের তখন বাড়ির ভিতর কাজ ছিল, রামদাস অন্দরে গেল, আমি আপনার ঘরে গিয়ে এক প্রকার নিশ্চিন্ত হয়ে বোসলেম।

    রাত্রের কার্য এই পর্যন্ত। আহারান্তে ঘরের দরজা বন্ধ কোরে আমি শয়ন কোল্লেম। যেটি আমার নূতন সংকল্প, মনে মনে খানিকক্ষণ সেইটি আলোচনা কোরে, পাকিয়ে রেখে, ভবিষ্যৎ কর্তব্য অবধারণ কোতে লাগলেম। বাধা পোড়ে গেল। আমার গৃহদ্বারে দুই তিনবার জোরে জোরে করাঘাত। শুয়ে শুয়েই আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, কে?— উত্তর পেলেম না। সদরদরজা বন্ধ হয়েছিল, বাহিরের লোক আসবে না; রূপসী পালিয়ে গিয়েছে, রূপসীর ভয়ও ছিল না; আমি উঠলেম। পুনর্বার দ্বারে করাঘাত। ধীরে ধীরে দরজা খুলে আমি পাশ কাটিয়ে সোরে দাঁড়ালেম: গৃহের দীপ তখনো নির্বাপিত হয় নাই; সম্মুখে দেখি— কর্তা।

    অকস্মাৎ আমার তখন কেমন একটা আতঙ্ক এলো। এত রাত্রে কর্তা এ ঘরে কেন? রামদাস বুঝি আমার পরামর্শের কথা কর্তাকে কিছু জানিয়েছে. তাই শুনে কর্তা বুঝি আমারে ধমক দিতে এসেছেন, এইরূপ ভাবনাই আমার আতঙ্কের কারণ। শেষে বুঝলেম; তা নয়; বিছানার উপর উপবিষ্ট হয়ে, নিকটে আমারে ডেকে, প্রফল্লবদনে কর্তা জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “সে কথা মনে আছে হরিদাস? বিবেচনা কোরে কিরূপে স্থির কোরেছ? পাটনায় যেতে ইচ্ছা হয়; মোহনলালবাবু বেশ লোক, তিনি একবার তোমাকে দেখতে চান; দেখা কোল্লে বোধ করি তোমার পক্ষে ভাল হবে; তুমি তোমার নিজের জাতিকুল জানতে না, এখনো জান না; কিন্তু মোহনলালবাবু বোলেছেন, তিনি তোমার জাতিকুল অবগত আছেন। কথার ভাবে আমি বুঝেছি, তুমি তাঁর স্বজাতীয় কোন ভদ্রলোকের সন্তান। তার সময় এখন খুব ভাল, তোমার প্রতিও তিনি বেশ সদয়, এই সময় একবার যদি তুমি দেখা কর, খুব ভালই হবে, এইরূপ আমি বুঝতে পাচ্ছি। যাওয়া যদি তোমার মত হয়, বিলম্ব কারো না, বেশী দিন আর তিনি পাটনায় থাকবেন না; এক মাসের ভিতরেই তিনি শ্রীবৃন্দাবন- যাত্রা ’কারবেন, এইরূপে আমি শুনে এসেছি। কেন আমি তোমাকে এত কথা বোলছি, তা তুমি বুঝতে পেরেছ? তোমার উপকার হোলে, আমি সন্তুষ্ট হব, সেই জন্যই বলা। সন্ধ্যাকালে আমি পাঁজি দেখেছি, আগামী কল্য শুভদিন, কল্যই তুমি যাত্রা কোত্তে পার। রাহাখরচ ইত্যাদি যাহা কিছু প্রয়োজন, সব আমি দিব, কল্যই তুমি যাও, এই আমার ইচ্ছা।”

    কর্তার ইচ্ছায় আমার একটা বড় ইচ্ছা চরিতার্থ করবার বাধা পড়ে, তাই ভেবে, বিনীতভাবে মৃদুস্বরে আমি বোল্লেম, “আজ্ঞা! আপনার ইচ্ছার অবাধ্য হওয়া আমার উচিত হয় না, কিন্তু এখানে আমার একটি বিশেষ কার্য আছে. সপ্তাহের মধ্যে সেকার্য আমি সিদ্ধ কোত্তেও পারবো, এমন আশা রাখি; অনুগ্রহ পূর্বক সপ্তাহের পরে আপনি আর একটি শুভদিন স্থির কোরে দিবেন, সেই দিনেই আমি রওনা হবো। মোহনলালবাবু একমাস পাটনায় থাকবেন, তার মধ্যে আমি সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখা কোত্তে পারবো, তাতে আর কোন সন্দেহ থাকবে না।

    কর্তা বোল্লেন, “আচ্ছা, তবে তাই কোরো, কিন্তু দেখো, বেশী বিলম্ব যেন না হয়।  এখানকার কাজটা সপ্তাহের অগ্রে যাতে সমাধা কোত্তে পার, চেষ্টা কোরো।”

    এইরূপ উপদেশ দিয়ে কর্তা উঠে গেলেন, আবার আমি দরজা বন্ধ কোরে শয়ন কোল্লেম। পাটনায় আমি যাব, ভেবে আমার ভয় হলো কি আহ্লাদ হলো, নিজেই যেন আমি সে ভাবটা স্থির কোত্তে পাল্লেম না। মোহনলালবাবু বর্ধমানে আমার প্রতি যেরূপ সদয়ভাব—নির্দয়ভাব দেখিয়েছিলেন, স্মরণ হলো; ভেলুয়া-চটিতে গৃহদাহের সময় তিনি আমারে যেরূপে আদর কোরেছিলেন, স্মরণ হলো; বারাণসীধামে প্রথম দর্শনে তাঁর প্রসন্নতা আমি লাভ কোরেছিলেম, তার পর অপ্রসন্নতার আক্রমণ, সে কথাও স্মরণ হলো। এখন পাটনায় গিয়ে আদর পাব কিম্বা তাঁর রক্তচক্ষু দর্শন কোরবো, নিশ্চয়তা নাই, এইরূপ আমি ভাবলেম। রক্তচক্ষু দর্শন সত্যই যদি আমার ভাগ্যে ঘটে, তাতেই বা এত কি ভয়? মোহনবাবু মনুষ্য, রাক্ষস নন, রাগের বশে টপ কোরে তিনি আমারে খেয়ে ফেলবেন না; যদি বেগতিক দেখি, পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা কোত্তে পারবো। পাটনায় আমি যাব। মোহনবাবু যেতে বোলেছেন, সেই জন্যই আমারে যেতে হবে, কর্তা যদি এমন কথা বোলতেন, তা হোলে আমি যেতেম না। আজ রাত্রে যে কথা শুনলেম, সেই কথার উপরেই আমার ভবিষ্যৎ আশার প্রধান একটি অংশ নির্ভর কোচ্ছে, সেই জন্যই আমি যাব।

    কর্তা বোলে গেলেন, মোহনলালবাবু বোলেছেন, আমি তাঁর স্বজাতি; এ কথা যদি সত্য হয়, তা হোলে মোহনলালবাবু আমার অপরাপর পরিচয়ও অবশ্য জানেন। যে পরিচয় আমি জন্মাবধি জানি না, সেই পরিচয় আমি তাঁর মুখে শুনতে পাব; মনে একটি উল্লাস জন্মিল; সেই জন্যই আমি যাব।

    একরকম সংকল্প আমি স্থির কোল্লেম, নিশ্চিন্ত হোলেম না; মনে আবার একটা তর্ক উঠলো। পাটনায় আমার কথাটা কেন উঠেছিল? কে তুলেছিলেন? মোহনবাবু কিম্বা জয়শঙ্করবাবু? মোহনবাবু হঠাৎ একজন অপর লোকের কাছে আমার কথা তুলবেন, এমন তো সম্ভব বোধ হয় না; জয়শঙ্করবাবুই তুলে থাকবেন; কিন্তু কেন? আবার মনটা আমার অন্যদিকে ঘুরে গেল; যে সন্দেহটা মনে মনে চাপা ছিল, সেই সন্দেহ আবার জাগলো। অজ্ঞান অবস্থায় ত্রিপুরা জেলায় যারা আমারে ফেলে রেখে গিয়েছে কর্তা সে কথা অস্বীকার কোল্লেও অন্য সূত্রে সে তত্ত্ব আমি জেনেছি। সূত্র কিছু না থাকলেও তাই-ই আমি জানতেম; কেন না অচেতন লোকেরা নিজের চেষ্টায় হেঁটে আসতে পারে না। আমি অচেতন ছিলেম, সেই অবস্থায় জয়শঙ্করবাবু এখানে আমারে দেখেছেন; তাতেই বুঝা গিয়েছে, আমার সঙ্গে অন্য লোক ছিল, আমারে এখানে রেখেই তারা পালিয়েছে। কারা তারা, প্রথমেই আমি অনুমান কোরেছিলেম। বনের ভিতর যারা আমারে ধোরে রেখেছিল, দুশ্চারিণী নবীনকালী যাদের সঙ্গিনী, তারাই ঢাকা থেকে ত্রিপুরায় আমারে এনেছিল, তাতে আর সন্দেহ নাই। তারা যদি নূতন লোক হতো, আমার বিপক্ষদলের সঙ্গে তাদের যদি কোন সংস্রব না থাকতো, তা হোলে এমন ঘটতো না। পূর্বেই আমি স্থির কোরেছিলেম, রক্তদন্তের চক্রের সঙ্গে সঙ্গে নানা দিকে নানা লোক ঘোরে। ঢাকায় যারা আমারে ধোরেছিল, তারা যে রক্তদন্তের লোক কিম্বা রক্তদন্তের শিক্ষিত গুপ্তচরের সহকারী লোক, সেটা নিঃসন্দেহ। রক্তদন্ত মোহনবাবুর পেটাও লোক।

    রক্তদন্ত অথবা রক্তদন্তের চরেরা আমার সম্বন্ধে যে সব কাজ করে, মোহনবাবু অবশ্য সে সব কাজের খবর পান। জয়শঙ্করবাবু ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় মোহনবাবুর কাছে আমার নাম কোরেছিলেন, মোহনবাবু অমনি সদয় হয়ে আমারে দেখতে চেয়েছেন, পাটনায় আমারে যেতে বোলেছেন, কথা কিছু আশ্চৰ্য বটে! কথার ভিতর কিছু, গোলমাল আছে, তাও যেন আমি বুঝতে পাচ্ছি, তত্ত্বও আমি যাব। কোন গতিকে মোহনবাবুর মূখে আমি আমার নিজের পরিচয়টা যদি জেনে নিতে পারি, তা হোলে আমার একটা বিশেষ উপকার হবে, বুকের উপর থেকে ভারী একটা বোঝা নেমে যাবে; অজ্ঞ পরিচয় সর্বদা আমারে অপর লোকের কাছে সঙ্কুচিত হয়ে থাকতে হয়, সে অসঙ্কোচটা দূরে হবে, মাথা উচুঁ কোরে পূর্ণ সাহসে বুক ফুলিয়ে সব জায়গায় আমি বেড়াতে পারবো, সকল লোকের কাছে সপ্রতিভ থাকবো; কেহ পরিচয় জিজ্ঞাসা কোল্লে বোবা হয়ে থাকতে হবে না, কোথাও কাহার কাছে মাথাও হেঁট হবে না। পরিচয় জানবার জন্যই পাটনায় আমি যাব।

    আর একটা কথা আমার মনে হলো। জয়শঙ্করবাবু বোলেছেন, মোহনলালের সঙ্গে তাঁর পূর্বাবধি পরিচয়। ত্রিপুরায় জয়শঙ্করবাবুদের বাড়ীতে আমি আছি, চক্ৰঘূর্ণনে মোহনবাবু হয় তো সে সংবাদ রাখতেন, জয়শঙ্করের মুখে আমার নাম শুনেই হয় তো আর কোন মতলব তিনি স্থির কোরেছেন; সেই মতলব সিদ্ধ করবার অভিপ্রায়েই পাটনায় আমারে যেতে বোলেছেন, এইটাই যেন সম্ভব বোধ হোচ্ছে। হয় হোক, তাই হোক; তবু, আমি যাব।

    রাত্রে আর নিদ্রা হলো না; চিন্তায় চিন্তায় সারা রাত্রিজাগরণ। ঊষাপক্ষিগণ বৃক্ষে বৃক্ষে কলরব আরম্ভ কোল্লে; যে সকল পক্ষী গীত গায়, তাঁদের সুরে তারা ঊষাবন্দনা আরম্ভ কোল্লে; পল্লীবাসী শ্রমজীবী লোকেরাও একে একে জেগে উঠলো, নিকটে নিকটে কত লোকের কত প্রকার অস্পষ্ট কথা আমার শ্রবণগোচর হোতে লাগলো; গবাক্ষপথ দিয়ে ঘরের ভিতর আলো এলো, রজনীপ্রভাত।

    বেলা দুই প্রহরের মধ্যে নূতন ঘটনা কিছুই হলো না। অপরাহ্ণে। রামদাস এসে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ কোল্লে।

    রামদাসকে আমি একটি দৌত্যকার্যে নিযুক্ত কোরেছিলেম, সেই কার্যে সিদ্ধমনোরথ হয়ে চুপে চুপে রামদাস আমারে সংবাদ দিলে, “সে লোক এ গ্রামে আছে, আরো তিন দিন থাকবে, তিন দিন পরে স্থানান্তরে চোলে যাবে।” রামদাসকে তখন আমি আর কোন কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেম না, রামদাস চোলে গেল।

    ঠিক সন্ধ্যার সময় একজন ছোকরাকে সঙ্গে কোরে ছোটবাবু এলেন। ছোকরার হাতে একটা পুঁটলী। ছোটবাবুর আদেশে সেই পুঁটলীটি আমার বিছানার উপর রেখে প্রণাম কোরে ছোকরা শীঘ্র শীঘ্র বিদায় হয়ে গেল। পুঁটলীটি খুলে ছোটবাবু আমারে কতকগুলি জিনিস দেখালেন। একখানি গেরুয়া বসন, একখানি নামাবলী, পরচুলা, শ্বেতবর্ণ দীর্ঘ দাড়ী, শ্বেতবর্ণ গোঁপ, পিঙ্গলবর্ণ জটা, আর একছড়া হরিনামের জপমালা; জিনিসগুলি দর্শন কোরে আমি হাস্য কোল্লেম।

    হাস্য কোরে ছোটবাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “এই তো বহুরূপীর সজ্জা এলো, এ সজ্জাগুলি নিয়ে তুমি কি কোরবে? —আমি উত্তর কোল্লেম, কি আমি কোরবো আজ রাত্রে তা আপনি শুনতে পাবেন না; কাৰ্যসিদ্ধির পর কল্য কিম্বা পরশু সমস্তই আপনি জানতে পারবেন। সে প্রসঙ্গে ছোটবাবু আর কোন কথা বোল্লেন না; অন্য কথা উত্থাপন কোরে আমার গায়ে হাত দিয়ে বোল্লেন, “তুমি কি নিমন্ত্রণে যেতে ভালবাস? আজ আমাদের গ্রামের দক্ষিণপাড়ায় এক বাড়ীতে সত্যনারায়ণের সিন্নী; — সত্যনারায়ণের কথা হবে, কৃষ্ণমঙ্গল গীত হবে, কৃষ্ণভক্তি যাত্রা হবে, খুব ঘটা। আমাদের নিমন্ত্রণ আছে, আমি যাব, কর্তাও যাবেন, তোমার কি যাবার ইচ্ছা আছে?”

    উল্লাসপ্রাপ্ত হয়ে মনে মনে আমি বোল্লেম, সত্যনারায়ণ দীর্ঘজীবী হয়ে থাকুন, ভালই হলো; যে ভাবনা আমি ভাবছিলেম, সত্যনারায়ণের ইচ্ছায় সে ভাবনা অন্তরে গেল, ছোটবাবুর প্রশ্নে উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা না; আজ আমার শরীর বড় ভাল নয়, নিমন্ত্রণে আমি যেতে পারবো না।”

    ছোটবাবু আমারে আর কিছু বোল্লেন না, খানিকক্ষণ সেইখানে বোসে অন্য প্রসঙ্গে দুইটি চারিটি কথা কোয়ে, তিনি অন্দরে প্রবেশ কোল্লেন, আমি এদিকেও প্রস্তুত হোলেম। নিমন্ত্রণে যাব না, তবে আমার প্রস্তুত হওয়া কিসের জন্য, কিঞ্চিৎ পরে তাহার পরিচয়।

    রামদাসকে সঙ্গে নিয়ে কর্তা আর ছোটবাবু বাড়ী থেকে বেরলেন; যে বাড়ীতে নিমন্ত্রণ, সেই বাড়ীতেই গেলেন। কথা আছে, গীত আছে, যাত্রা আছে শীঘ্র তাঁরা ফিরে আসবেন না, তা আমি জানতে পাল্লেম। পাচিকা-ঠাকুরাণী সেই সময় একবার আমার ঘরে এসেছিলেন, তাঁরে আমি বোল্লেম, অসুখ আছে, রাত্রে আজ আমি কিছু আহার কোরবো না। সেই কথা শুনে, তিনি একবার আমার কপালে হাত দিয়ে বিষণ্ন বদনে বোল্লেন, “তাই তো! গা গরম হয়েছে! কপালের শির লাফাচ্ছে। মাথা ব্যথা কোচ্ছে বুঝি? চুপ কোরে শুয়ে থাক; বেশী রাত জেগো না। শীঘ্র যাতে ঘুম হয়, সেই চেষ্টা কর।”

    শয়নের উপদেশ দিয়ে পাচিকা-ঠাকুরাণী অন্তঃপুরে প্রবেশ কোল্লেন। আমি আপনি আপনি হাস্য কোল্লেম। কতকগুলি স্ত্রীলোকের স্বভাব এইরূপে যে, কোন প্রকার অসুখের কথা শুনলে—  অসুখটা সত্যই হউক বা মিথ্যাই হোক— স্নেহ জানিয়ে সেই কথারই পোষকতা করেন, সাবধান থাকবার পরামর্শ দেন। এই পাচিকাটিও তাই কোল্লেন; বাস্তবিক আমার কোন অসুখ ছিল না। ঘরের দরজা বন্ধ কোরে আমি আপনার ইচ্ছামত কাৰ্য কোল্লেম, দর্পণে মুখ দেখলেম, গৃহের প্রদীপটি নির্বাণ কোরে দরজা ভেজিয়ে বারান্দায় বেরুলেম। সে দিকটা অন্ধকার; সদরবাড়ীতে কেহই ছিল না, সিঁড়ির দরজাটি ভেজিয়ে রেখে নিঃশব্দে উপর থেকে নেমে এলেম, বাড়ী থেকে বেরুলেম। বাবুরা নিমন্ত্রণে গিয়েছেন, শীঘ্র শীঘ্র সদরদরজা বন্ধ হবে না, মনে ভরসা থাকলো, ধীরে ধীরে গন্তব্য স্থানে আমি চল্লেম।

    সেই নদীতীর, সেই আম্রবৃক্ষ, নিকটে সেই বাড়ী, বৃক্ষতলে আমি। সত্য বটে আমি; কিন্তু তখন আমারে হরিদাস বোলে চিনতে পারে, তেমন চক্ষু সে অঞ্চলে ছিল না। আমি তখন একজন শ্বেতশ্মশ্রুবিশিষ্ট জটাধারী সন্ন্যাসী। কৌপীন অথবা ব্যাঘ্রচর্মপরিধান করা নাই, অঙ্গে ভস্মলেপন নাই, কেবল মুখের ঠাঁই ঠাঁই শ্বেতচন্দনের রেখা একেছিলেম। সজ্জিত সন্ন্যাসীতে আর আমাতে অতি অল্পমাত্র প্রভেদ। আমার পরিধান গৈরিকবসন, কৃষ্ণ নামাবলীচিত্রিত গৈরিকবসনে সর্বাঙ্গ আচ্ছাদিত, হস্তে জপমালা, মুখে অবিরাম হরিনাম।

    সেই বাড়ীখানির সম্মুখ দরজার কাছে গিয়ে আমি দাঁড়ালেম; উচ্চকণ্ঠে হরিনাম গান কোচ্ছিলেম, একটি স্ত্রীলোক এসে আমারে দেখে গেল। ঔষধের মোড়ক সমর্পণ করবার দিন যে স্ত্রীলোকটি আমার দূতী হয়েছিল, সেই স্ত্রীলোক। আমারে তখন চিনতে পারে কার সাধ্য? সজ্জা সমাপ্ত কোরে দর্পণে যখন আমি মুখ দেখি, তখন আমি নিজেই আমারে চিনতে পারি নাই। স্ত্রীলোকটি আমারে দেখে গেল, অব্যবহিত পরেই বাবু এলেন। আমি সন্ন্যাসী, বাবু আমারে প্রণাম কোল্লেন। যে বাবুকে আমার দরকার, সেই বাবুই তিনি। জয়োচ্চারণ কোরে বাবুকে আমি বোল্লেম আপনার মঙ্গলের জন্যই আমার এখানে আসা; জন্মাবধি আপনি দেশে ছিলেন না, পৈতৃক ভদ্রাসনে নূতন এসেছেন, আপনার মনে কোন প্রকার অশান্তি আছে, গণনা কোরে সে সব আমি জানতে পেরেছি। কিছু দিন এই গ্রামে আমি আছি। গোটাকতক কুকুর সঙ্গে কোরে যে রাত্রে আপনি শিবের মন্দিরের সম্মুখে দিয়ে চোলে আসেন, সেই রাত্রে আপনারে আমি দেখেছিলেম, আপনারে দেখেই আমার দুঃখ উপস্থিত হয়েছিল। বুঝতে পেরেছেন আমার কথা? আপনার মনে কোন প্রকার দুশ্চিন্তা আছে; স্বকৃত কার্যের জন্যই সেই চিন্তা। এখানে আপনার নাম পায়রাবাবু। এখানে আপনার গুটিকতক বন্ধু আছেন, গুটিকতক শত্রুও আছেন, যাতে কোরে বন্ধুবিচ্ছেদ ঘটে, যারা শত্রুপক্ষ, তারা সেই চেষ্টাই কোচ্ছে। আপনি কোন প্রকার উৎকট পাপে— না না, সে কথা এখানে বলা হবে না, আপনার কোন ভয় নাই, শান্তি আছে, হরি আপনাকে শান্তি দিবেন। আপনি আমার সঙ্গে ঐ শিবালয়ে চলুন, আমি আপনার গ্রহশান্তির সুব্যবস্থা কোরে দিব।

    বাবু একটু মুখে বাঁকালেন। হরিনামে তাঁর বিশ্বাস নাই, ধর্মেকর্মে আস্থা নাই, বাড়ীর ভিতর ফিরে যাবার উপক্রম কোল্লেন। আমি তাঁর একখানি হাত ধোরে নরম কথায় চুপে চুপে তাঁর কাণের কাছে বোল্লেম, আমার সম্মুখে থেকে পালিয়ে গেলে তুমি পরিত্রাণ পাবে না, কার্য বড় শক্ত। কুলস্ত্রীর —–সে সব কথা এখানে যদি তুমি শুনতে চাও, ঘরে বাহিরে মহাকলঙ্ক বেঁধে উঠবে; আমি তোমারে চাই। গ্রামে এত লোক থাকতে, খুঁজে খুঁজে তোমাকেই আমি সুপাত্র বোলে ধোরেছি, আমি তোমার ভাল কোরবো; পালিয়ে যাবার চেষ্টা কোরো না; সব কথা আমি জানি। বীরভূমের কথাও জেনেছি, কাশীর কথাও জেনেছি, এখানকার কথাও জানতে পেরেছি। পাপের আগুন হু হু কোরে জ্বোলছে, লুকিয়ে থাকলে সে অগ্নিনির্বাপিত হবে না। আমার সঙ্গে তুমি শিবমন্দিরে চল, শান্তিজলে আমি তোমার অশান্তি-বহ্নি নির্বাণ কোরে দিব।

    পাঠক মহাশয়! বুঝতে পারেন, এই বাবুটিই সেই পায়রাবাবু। আমার মুখে শেষের কথাগুলি শুনে, মনে মনে কি তিনি ভাবলেন, তাঁর জীবনের সমস্ত খবর আমি রাখি, সেটিও যেন বুঝতে পাল্লেন; সেখানে আর আমি বেশী কথা না বলি, সেইরূপে সাবধান হয়ে আমার সঙ্গে শিবমন্দিরে আসতে সম্মত হোলেন।

    নদীতীরে একটি শিবমন্দির; বাবুকে সঙ্গে নিয়ে সেই মন্দিরে আমি এলেম। মন্দিরের দ্বারে চাবি দেওয়া ছিল; মন্দিরের একদিকের বারান্দায় উপবেশন কোরে সংক্ষেপে সংক্ষেপে সমস্ত কথার সারমর্ম তাঁকে আমি শুনিয়ে দিলেম। বাবু ঘন ঘন কেঁপে কেঁপে উঠলেন। ভূতভবিষ্যৎ গণনায় আমি পরম পণ্ডিত, বাবু যেন সেটি বেশ বুঝতে পাল্লেন; আমার কথাগুলি যেন তাঁর অস্থিতে অস্থিতে বিঁধে গেল। আরো একটু খোলসা কোরেই আমি বোল্লেম রাধারাণী মরেছে। আত্মঘাতিনী হয়েছে! তোমার জন্যই রাধারাণীর অপঘাত মৃত্যু। পুলিশ পর্যন্ত জানাজানি হয়েছে, পুলিশে এখনো তোমার নামটা উঠে নাই; কার মনে কি আছে, কে জানে? তদন্তমুখে উঠতে পারে, গণনাতে তাও আমি জানতে পেরেছি, এই বেলা প্রতীকারের চেষ্টা পাওয়া ভাল। বীরভূমে যা তুমি কোরেছ, তার ভিতরেও একটি কুলকন্যা ছিল; সেই কুলকন্যা এখন গুজরাটে, গণনায় সব আমি নখদর্পণে দেখতে পাচ্ছি। সে নায়িকা বেঁচে আছে, রাধারাণী ইহসংসার থেকে বিদায় হয়েছে। মহাপাপ! মহাপাপ!! এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত শীঘ্র শীঘ্র যদি তুমি না কর, পুলিশের হস্তে শীঘ্র তুমি ধরা পোড়বে, ইহলোকে রাজবিচারে শাস্তি পাবে। তার পর পালিশের উপর পুলিশ, সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর—

    এই পর্যন্ত শুনে পায়রাবাবু খানিকক্ষণ নির্বাক হয়ে থাকলেন, চঞ্চল-নয়নে চতুর্দিকে চাইলেন, কাতরবচনে আমারে বোল্লেন, “কি প্রকার প্রায়শ্চিত্ত কোল্লে আমি নিস্তার পাই, দয়া কোরে আপনি আমারে আজ্ঞা করুন।”

    কথার ভাবে আমি বুঝলেম, প্রায়শ্চিত্ত কোত্তে পায়রাবার ইচ্ছা আছে। কিরূপে প্রায়শ্চিত্ত, আমি তা মনে জানতেম; মনে রেখেই প্রকাশ্যে বোল্লেম, এখানে সে কথা বলা হবে না। রাধারাণী মরেছে, দেহ এখন শ্মশানে ভস্ম হয় নাই, সেই দেহ যদি তুমি দর্শন কর, তা হোলেই একরকম প্রায়শ্চিত্ত হয়। দর্শন কোত্তে পারবে কি? পুলিশের সম্মুখে তোমার প্রেমনায়িকার মৃতদেহ দর্শন কোত্তে তোমার সাহস হবে কি?

    আমি সন্ন্যাসী; সংসারের কোন কথাই যেন আমি জানি না, বিশ্বাসে একটু কপট বিস্ময় প্রকাশ কোরে তিনি বোল্লেন, “রাধারাণী? —কে রাধারাণী? রাধারাণীর মৃতদেহ আমি কেন দেখতে যাব? পুলিশ! পুলিশের সঙ্গে আমি কেন দেখা কোরবো? আমি যাব না।”

    মৃদুহাস্য কোরে আমি বোল্লেম, প্রায়শ্চিত্ত কোত্তে রাজী আছ, অথচ রাধারাণীকে জান না; পুলিশের নামে ভয় হয়, কার কাছে তুমি এ চাতুরী খেলাচ্ছ? মানুষের কাছে বরং চাতুরী খাটে, বিদ্যার কাছে খাটে না; জ্যোতির্বিদ্যা প্রভাবে সমস্তই আমি জানতে পেরেছি। একটি বালক একদিন তোমার হস্তে রাধারাণীর প্রেমপত্রিকা প্রদান কোরেছিল, তার পর রাধারাণীর প্রেমাশ্রমের উপদেবতানিপাত; আমার কাছে তুমি এ সব কথা অস্বীকার কোত্তে পার না। যদি কর, অস্বীকার করবার যদি চেষ্টা পাও, পুলিশের সঙ্গে সাক্ষাৎ কর।

    বাবুটির অন্তরে ভয় ছিল, বদনেও ভয়ের চিহ্ন উদিত হয়েছিল। দুই তিনবার আমার মুখে পুলিশের কথা শুনে, সেই ভয়টা এই সময়ে ঘনীভূত হয়ে উঠলো। তখন তিনি আমার প্রসাদভিখারী হয়ে মৃদুবচনে বোল্লেন, “ঐরূপ প্রায়শ্চিত্ত ছাড়া আর আপনি যেরূপে প্রায়শ্চিত্তের বিধি দেন, তাতে আমি প্রস্তুত আছি। আপনি দৈবজ্ঞ, ভূতভবিষ্যৎ উভয় তত্ত্ব আপনি পরিজ্ঞাত, আপনি আমাকে রক্ষা করুন!”

    আমার মনোবাসনা পূর্ণ হবার পূর্বলক্ষণ। রাত্রি প্রায় এক প্রহর। সত্যনারায়ণের সিন্নী রাত্রি এক প্রহর পর্যন্ত, শেষ হোতে বাকী থাকে না; ছোটবাবু যদি যাত্রাগীতি শোনবার আশা না রাখেন, শীঘ্রই ফিরে আসবেন; শীঘ্র শীঘ্র প্রস্থান করাই আমার আবশ্যক। পায়রাকে বোল্লেম, তোমার প্রায়শ্চিত্তটা যাতে অন্য লোকের চক্ষে না পড়ে, তেমন উপায় আমি কোত্তে পারি; তুমি নারীবেশ ধারণ কর। তোমাদের গ্রাম, পাল্কীবেহারা কোথায় পাওয়া যায়, তা তুমি জানো, নারীবেশধারণের অগ্রে একখানা পাল্কী ডাকাও, তার পর যা যা কোত্তে হয়, সে সব আমার ভার। এইখানে আমি থাকলেম, নারীবেশের উপকরণ বাড়ীর ভিতর থেকে সংগ্রহ কোরে আমার কাছে রেখে যাও, তার পর পাল্কী-বেহারা ডাকো। আমি তোমাকে নারী সাজাব; যাও, দুই কার্য কোরে এসো! পালিও না, পালিয়ে নিস্তার পাবে না। ধর্মের চক্ষু সর্বদর্শী, সর্বত্রদর্শী—জলধিজলে ডুবে থাকলেও সে চক্ষু তোমাকে দেখতে পাবে, নিবিড় বনে প্রবেশ কোল্লেও সে চক্ষু তোমাকে আকর্ষণ কোরবে, কিছুতেই পরিত্রাণ পাবে না! যাও, পালিও না!

    ধর্মের কর্ম, পায়রাবাবুকে আমি আপন কায়দায় আনলেম, যা যা বোল্লেম, সমস্তই ঠিকঠাক হলো। বস্ত্রালঙ্কার আর একখানি শিবিকা উপস্থিত। পায়রাকে আমি বধূসজ্জায় সজ্জিত কোল্লেম, পাল্কীর ভিতর বসালেম, সর্দার বেহারার কাণে কাণে ঠিকানা বোলে দিয়ে শিবিকার দ্বার রুদ্ধ কোরে দিলেম। শিবিকা সরাসর বাবুদের বাড়ীর ফটকের কাছে উপস্থিত হলো, শিবিকার সঙ্গে সঙ্গে পদব্ৰজে আমি।

    অবগুণ্ঠনে কপোতীর বচন আবৃত কোরে আমি সেটিকে উপরে নিয়ে তুল্লেম। যে ঘরে আমি থাকি, সে ঘরে তখন আলো ছিল না, অন্ধকারেই নববধূটিকে ঘরের একধারে আমি বসালেম, কথাবার্তা কিছুই নয়। কোথায় আমি এনেছি, পায়রা সেটা বুঝতে পারে না। মন্দিরে বোসে যা আমি ভেবেছিলেম, তাই ঠিক হলো। একটু পরেই ছোটবাবু ফিরে এলেন; হরিভক্তির আকর্ষণে হরিগুণগান শ্রবণের অভিলাষে কর্তা সেই নিমন্ত্রণকর্তার বাড়ীতেই থাকলেন। প্রায়শ্চিত্তের আয়োজনে আমি সুবিধা পেলেম।

    ছোটবাবু এসেছেন, জানতে পেরে, সিঁড়ির পথেই তাঁর সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ কোল্লেম। তাঁর সঙ্গে আলো ছিল, সম্মুখে আমারে দেখে ছোটবাবু স্তম্ভিত হয়ে সিঁড়ির উপর দাঁড়ালেন। আমারে চিন্তে পাল্লেন না। আমি চুপি চুপি তাঁরে বোল্লেম, চমকিত হবেন না; ভাল কোরে আমারে দেখুন; আমি সন্ন্যাসী নয়, আমি হরিদাস। আপনি আমারে বহুরূপীর সাজ এনে দিয়েছিলেন, সেই সজ্জার অভ্যন্তরে আমি হরিদাস। আমি একটি কপোতী ধোরে এনেছি, সেই কপোতীও বহুরূপী; কখন কপোত হয়, কখন কপোতী সাজে। কপোত-কপোতীর প্রেম কবিকূলের প্রেম-সংসারের আদর্শ। কপোতবেশে আমার কপোতী বিশুদ্ধ প্রেমশিক্ষা করে নাই, পাপ হয়েছিল; সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত—”

    আমার হিঁয়ালীর অর্থ ছোটবাবু শীঘ্র বুঝলেন না; কি রকম কপোতী, দর্শনের কৌতূহলে তিনি আমার সঙ্গে গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেন। ঘরের অন্ধকার ঘুচে গেল; দীপাধারে উজ্জ্বল দীপ সংস্থাপিত, অন্ধকার দূরে গেল। ঘরের অন্ধকার গেল, ছোটবাবুর মনের অন্ধকারও দূর হলো; ঘোমটা খুলে কপোতীর মুখখানি তাঁরে আমি দেখালেম। ছোটবাবু বিস্ময়াপন্ন। বিস্ময়ের সঙ্গে হাস্যের সম্বন্ধ অল্প, কিন্তু সবিস্ময়ে ছোটবাবু হাস্য কোলেন। পায়রাবাবু কাঁপতে লাগলেন। ছদ্মবেশ খুলে নিয়ে পায়রাটিকে আমি আবার পায়রাবাবু সাজালেম।

    পরামর্শ স্থির হলো। অতি সহজেই প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাবে, লোক-জানা-জানি হবে না, এরূপ আশা দিয়ে, পায়রার মুখে আমি পাপস্বীকার করালেম। পূর্বকথা সে ক্ষেত্রে প্রকাশ পেলে না। রুদ্রাক্ষগ্রামের ভৌতিক ক্রীড়া পায়রাবাবু কথায় কথায় স্বীকার কোল্লেন; রাধারাণীর সঙ্গে গুপ্তপ্রেম, নিজমুখে তাঁকে স্বীকার কোত্তে হলো।

    ছোটবাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত কি?” আমি ব্যবস্থা দিলেম, মস্তক মুণ্ডন। মন্ত্র পাঠ হয়ে গেল; পাপীর নিজ মুখেই মন্ত্রপাঠ— পাপস্বীকার; বাকী কেবল মস্তকমুণ্ডন। আর কোন প্রকার ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার আবশ্যক হবে না, কেবল মস্তকমুণ্ডনেই ইহলোকে পূর্ণাঙ্গ প্রায়শ্চিত্ত সম্পাদিত হবে। এই রাত্রের মধ্যেই সে কার্যটি সম্পন্ন হোলে ভাল হয়। অন্য লোকে দেখবে না, গ্রামের লোকে জানবে না, রাত্রের কার্য রাত্রের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে; পায়রাবাবু যেখানে ইচ্ছা, রাত্রের মধ্যে সেইখানেই চোলে যেতে পারবেন।

    ব্যবস্থা মঞ্জুর। ছোটবাবুও মঞ্জর কোল্লেন, পায়রাবাবু ও মঞ্জুরী জানালেন। রাত্রের মধ্যেই প্রায়শ্চিত্ত হওয়া স্থির। স্থির বটে, কিন্তু এ রাত্রে নাপিত কোথায় পাওয়া যায়? আমি সন্ন্যাসী; ক্ষৌরকারের কার্যে আমার পাণ্ডিত্য ছিল না, আমি কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্ন হোলেম; উদ্বেগের কারণ ছোটবাবকে জানালেম। ছোটবাবু বোল্লেন, “চিন্তা কি? আমাদের রামদাসটি ক্ষৌরকার,— প্রামাণিক বংশসম্ভূত। কর্তা বোধ হয় প্রভাতের অগ্রে ফিরে আসবেন না, আমাদের সম্মুখে অনেকটা সময়; রামদাস নির্বিঘ্নে মুণ্ডনকার্য সমাধা কোরে দিতে পারবে।”

    রামদাসকে আহ্বান করা হলো, গৃহমধ্যে রামদাস উপস্থিত। পায়রা-দর্শনে রামদাসের বিস্ময়-কৌতুক একত্র। বিস্ময়ে নিস্তব্ধ, কৌতুকে হাস্য। ছোটবাবু তারে পায়রাটির মুণ্ডনকার্য নির্বাহ করবার আদেশ দিলেন। আর এক অভাব। রামদাসের ক্ষুর নাই। সে অভাবটাও অধিকক্ষণ থাকলো না, ছোটবাবুর নিজের একখানি ক্ষুর ছিল, অন্দরে প্রবেশ কোরে সেই ক্ষুরখানি তিনি বাহির কোরে এনে রামদাসের হাতে দিলেন; রামদাস তখন পায়রার সম্মুখে হাঁটু গেড়ে বোসলো।

    এইখানে আর এক রঙ্গ! উপনয়নের অগ্রে বিপ্রবালক এক নতুন আহ্লাদে আমোদিত হয়, কর্ণবেধ ও কেশমণ্ডনের সময় সেই আহ্লাদের সঙ্গে সে যেমন একটু একটু ভয় পায়, বিস্ফোটকে অস্ত্র করবার সময় তীক্ষ্ণছুরিকাধারী ডাক্তার সম্মুখে উপবিষ্ট হোলে রোগী যেমন নূতন যন্ত্রণার ভয়ে আকুল হয়, ক্ষুরাস্ত্রধারী রামদাসকে সম্মুখে দেখে যুগল হস্তে যুগলকর্ণ আচ্ছাদন কোরে পায়রাবাবু সেই রকম আতঙ্ক প্রকাশ কোত্তে লাগলেন; কাঁদো কাঁদো মুখে বোলতে লাগলেন, “মাথার মাঝখানটা কামিয়ে দিলেই ঠিক হয়, বাকী চুলগুলি থাক; সব চুল কামিয়ে দিলে মানুষকে কদাকার দেখায়, এ রকম হোলে লোকের কাছে আমি মুখ দেখাতে পারবো না। মাঝখানটি ছাড়া বাকী চুলগুলি আপনারা রেখে দিতে বলুন। আমি শুনেছি, মস্তকমুণ্ডন না কোরে চুলের মূল্য ধোরে দিলে ভট্টাচার্যেরা তুষ্ট হন। আমার প্রতি সদয় হয়ে তাই করুন, আমি মূল্য দিব।”

    ছোটবাবু আমার মুখের দিকে চাইলেন, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আমি হাস্য কোল্লেম। সম্মুখদিকে ফিরে আমি অভিপ্রায় দিলেম, “এ পাপের সে-রূপ প্রায়শ্চিত্ত নয়, সম্পূর্ণ মুণ্ডন আবশ্যক।” আমার কথাই গ্রাহ্য হলো, ছোটবাবু রামদাসের প্রতি পূর্ণমুণ্ডনের আদেশ দিলেন, উৎসাহযুক্ত হয়ে দশমিনিটের মধ্যে রামদাস সেই আদেশ পালন কোল্লে। পায়রাবাবুর বাবরীচুলগুলি তার পদতলে লুণ্ঠিত হোতে লাগলো। তখনো হস্তদ্বারা পায়রাবাবু আপনার কাণ-দুটি ঢেকে ঢেকে রাখবার চেষ্টা পেলেন, চেষ্টা ফলবতী হলো না। আমি নিকটবর্তী হয়ে, তাঁর হাত দুখানি ধোরে চাঁদমুখখানি ভাল কোরে দেখলেম। পায়রার চক্ষে জল, গাত্রে কম্প, রসনা বাকশূন্য। কারণ কি? —বামকর্ণ অর্ধচ্ছিন্ন, দক্ষিণকর্ণ নাই। এই গ্রামে প্রথম দর্শনাবধি যে সন্দেহ আমার মনে ছিল, সেই সন্দেহই ঠিক। সন্দেহ আর থাকলো না, স্পষ্টই দেখলেম, কাণকাটা কানাই! আর একটি ছোট কথায় বোঁচা কানাই! পাঠকমহাশয় স্মরণ কোত্তে পারবেন, বীরভূমের কানাইবাবু, আপন মাতুলকন্যার সতীত্বরত্ন হরণ কোরে, সেই ভগিনীটিকে কুলের বাহির কোরেছিলেন; কত জায়গায় কত খেলা খেলিয়েছিলেন; এই সেই কানাইবাবু। কত রাজ্য ঘুরে ঘুরে সেই কানাইবাবু এখন ত্রিপুরায় এসে ধরা পোড়লেন। কানাইকে আমি বোল্লেম, “চিনেছি আমি তোমাকে, সত্য তুমি পায়রাবাবু নও, বীরভূমের কানাইবাবু। তোমার নূতন নাম কাণকাটা কানাই! এই তোমার প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গেল, এখন তুমি স্বাধীন, এখানে এখন তুমি নিষ্পাপ, এখন তুমি বিদায় হোতে পার। রাতারাতি প্রস্থান কোল্লে কেহই কিছু জানতে পারবে না। আমার কার্য শেষ হয়ে গেল, আমি এখন চোল্লেম।”

    ছোটবাবুর দিকে চাইতে চাইতে ঘর থেকে আমি একবার বেরিয়ে গেলেম, বাহিরে ছদ্মবেশ পরিত্যাগ কোরে, হরিদাস হয়ে গৃহমধ্যে পুনঃ প্রবেশ কোল্লেম। আমিই সেই সন্ন্যাসী, কানাইবাবু সেটি জানতে পাল্লেন না। দুই হস্তে কর্ণ আবৃত কোরে অধোবদনে তিনি বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলেন।

    কানাইকে কানাই সাজিয়ে একটা সংকল্প আমি সিদ্ধ কোল্লেম। তিন দিন পর আমার পাটনা যাত্রার আয়োজন। একাকী আমি যেতে পারবো না কিম্বা হয় তো অন্য দিকে চোলে যাব এইরূপ সন্দেহ কোরে কর্তা আমার সঙ্গে ছোটবাবুকে পাঠাবেন। ছোটবাবুর হস্তেই আমাদিগের রাহাখরচের টাকা দিবেন, এইরূপে স্থির হলো। চতুর্থ দিবসে ছোটবাবুর সঙ্গে আমি পাটনা যাত্রা কোল্লেম।

  • অনন্ত দ্রাঘিমা

    অনন্ত দ্রাঘিমা

    হলদিপোঁতা ধাওড়া একটি অখ্যাত জনপদের নাম যার বুক ছুঁয়ে চলে গিয়েছে জগৎখালি বাঁধ আর বুড়ি গাং। নির্দিষ্ট কোনও পেশা নেই ধাওড়া পাড়ার মানুষদের। এই জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ নর-নারীই শ্রমজীবী। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তারা শোষণ আর বৈষম্যের বাঘনখে আক্রান্ত। তাদের জীবনে অভাব মাঠ-কেঁচোর মতো সহজলভ্য, শিক্ষা সেখানে তেলহীন লম্ফর পোড়া সলতে। এক অসম লড়াইয়ের উত্তাপ এই সুদীর্ঘ উপন্যাসের গতিকে করেছে বেগবান মানুষ প্রকৃতি নদী ও নারী জীবনের চলমান ছবি হয়ে ঘুরে ফিরে এসেছে নানা অভিঘাতে। দু’ মুঠো ভাত কিংবা রুটির জন্য মানুষ স্বভূমি ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি দিয়েছে। ‘অনন্ত দ্রাঘিমা’য় অভাব দুষ্টক্ষত এবং অভিশাপ। আর সেই অভাব এবং বঞ্চনাকে কেন্দ্র করে গ্রামের বাতাস কেঁপে উঠছে নানা সময়মুখী আন্দোলনে। শহর অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে সেই আগুন উসকে দিতে। গ্রামের ধুলোওড়া বাতাসের ভেতর থেকে তারা অপসারিত করতে চেয়েছে অসাম্যের দানবকে। রঘুনাথ এই পোড় খাওয়া সমাজের একজন। গুয়ারাম, লুলারাম, চুনারাম কিংবা ভিকনাথ তার ব্যতিক্রম নয়। মানবিক মূল্যবোধ আর বিশ্বাসের পলিমাটি দিয়ে গড়া এই ধ্রুপদী উপন্যাস সাহিত্যিক অনিল ঘড়াইয়ের নিরপেক্ষ কলমে হয়ে উঠেছে চিরকালীন আখ্যান।

  • মোহে-নির্মোহে নগ্নতা

    মোহে-নির্মোহে নগ্নতা

    অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book-name]

    মোহে-নির্মোহে নগ্নতা

    খাজুরাহো থেকে কসমিক সেক্সের রি সেনের নগ্নতা, রি সেন থেকে থ্রিএক্স। নগ্ন-নারীর ছড়াছড়ি। শুধু নারীই কেন নগ্ন হয়? উত্তর খুঁজব। তার একটু গৌরচন্দ্রিকা সেরে নিই। শুরুতেই জানিয়ে রাখি, আমি নগ্ন (Nude) আর উলঙ্গ (Naked)-র মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখছি না। আমার কাছে এই পার্থক্য অর্থহীন। আমার আলোচ্য বিষয় ‘পোশাকহীন শরীর’। Nude আর Naked-এর পার্থক্য খুঁজুন বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা। যাই হোক, নগ্নতা বলতে কোন্ অবস্থাকে বুঝব? নগ্নতা বলতে কোনো পোশাকহীন শারীরিক অবস্থাকে বোঝায়, বিবস্ত্র অবস্থা। নৃতত্ত্ববিদরা মনে করেন, আদিম মানুষ নগ্ন অবস্থায় থাকত। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে সম্ভবত ৭২,০০০ বছর আগেই মানব সমাজে নগ্নতা নিবারণের জন্য পোশাকের ব্যবহার শুরু হয়। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রধানত মানুষ পোশাক পরিধান শুরু করল। পোশাক পরিধান করার প্রয়োজনীয়তা কার্যকরী চাহিদা থেকে উদ্ভূত। যেমন বাহ্যিক উপাদান, ঠান্ডা এবং তাপ থেকে সুরক্ষা, শরীরের চুলের ক্ষতি রোধ, এবং শীতপ্রধান অঞ্চলে বসবাস ইত্যাদি। পোশাক পরিধান সাধারণত উষ্ণতা থেকে সুরক্ষা এবং সামাজিক বিবেচনার উপর নির্ভর করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ন্যূনতম পোশাক বা পোশাকহীন অবস্থা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হতে পারে। সাধারণভাবে শালীনতাবোধ নগ্নতাকে সমর্থন করে না। তবে স্থান ও কাল ভেদে শালীনতাবোধের ধারণা বিভিন্ন। সভ্য সমাজে যা শালীন, আদিম সমাজে তা বিপরীত। কোনো কোনো নির্দিষ্ট সমাজব্যবস্থায় চিত্রে, ভাস্কর্যে ও সাহিত্যে নগ্নতাকে নান্দনিকতার এক বিশেষ উপাদান মনে করা হয়।

    বাইবেলে বর্ণিত আদম ও ইভের কাহিনি অনুসারে, ঈশ্বর প্রথম নর ও নারীকে নগ্ন অবস্থায় সৃষ্টি করেছিলেন। এই নগ্নতার জন্য তাঁদের মনে কোনো লজ্জা ছিল না। পরে শয়তান কর্তৃক প্ররোচিত হয়ে ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন করে তাঁরা, যখন জ্ঞানবৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে, তখন তাঁদের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হয় এবং নিজেদের নগ্ন দেখে তাঁরা লজ্জিত হয়ে পড়েন। লজ্জিত হয়ে পড়লে কী হবে। তখন পোশাক কোথায় নগ্নতা ঢাকার জন্য? অতএব গাছের বড়ো বড়ো পাতা, ছাল-বাকলই ছিল শরীর ঢাকার উপাদান। শুরুতে শুধুই নিন্মাঙ্গ ঢাকা হত, তার অনেক পরে ঊর্ধ্বাঙ্গ (মেয়েরা) ঢাকা হতে থাকল।

    যাই হোক, কোনো কোনো প্রাচীন সভ্যতায় নগ্নতাকে অপমানকর বলে মনে করা হত। আদি বাইবেলে ফ্যারাও-শাসনাধীন মিশর ও ইহুদিদের একটি বর্ণনা থেকে এই চিত্র পাওয়া যায়: “আসিরিয়ার সম্রাট এই দুই দে (মিশর ও সুদান) থেকে বন্দিদের বিবস্ত্র অবস্থায় নিয়ে যাবে। যুবা-বৃদ্ধ সকলকেই নগ্ন পদে বিবস্ত্র অবস্থায় পথ চলতে হবে, তাদের অনাবৃত নিতম্ব মিশরের লজ্জার কারণ হবে।” এখানেই শেষ নয়। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতায় খেলাধুলা ও সংস্কৃতির জগতে পূর্ণবয়স্ক ও কিশোরদের নগ্নতার সৌন্দর্যের দিকটি বিশেষভাবে প্রশংসিত হত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বালক, নারী ও বালিকাদের নগ্নতাও প্রশংসা পেত। গ্রিকদের সৌন্দর্য চেতনায় প্রকৃতি, দর্শন ও শিল্পের পাশাপাশি মানবদেহেরও বিশেষ স্থান ছিল।

    গ্রিক শব্দ ‘জিমন্যাসিয়াম’ কথাটির অর্থ ছিল “যেখানে নগ্ন অবস্থায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়”। সেসময় পুরুষগণ খেলোয়াড়রা নগ্ন অবস্থায় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন। কিন্তু সে যুগে অধিকাংশ নগর-রাষ্ট্রেই নারীদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ, এমনকি দর্শকাসনে উপস্থিত থাকার অনুমতিও ছিল না। তবে স্পার্টা ছিল এর এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম, অবশ্যই। রোমানরা গ্রিক সংস্কৃতির অনেক রীতিনীতি গ্রহণ করলেও, নগ্নতা সম্পর্কে তাদের মানসিকতা পৃথক ছিল। সাধারণ স্নানাগার বা সাধারণ শৌচাগার ছাড়া অন্যত্র নগ্নতাকে অনুচিত আখ্যা দেওয়া হত।

    খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে খ্রিস্টধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষিত হলে নগ্ন গ্ল্যাডিয়েটর ক্রীড়া ধীরে ধীরে উঠে যায়। এবং প্রাপ্তবয়স্কদের নগ্নতা পাপের পর্যায়ে পর্যবসিত হত। খ্রিস্টধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি প্রথায় পরিণত হয়। যদিও অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত পশ্চিম ইউরোপে খ্রিস্টানরা নগ্ন অবস্থায় ব্যাপ্টাইজড হতেন। ষষ্ঠ শতাব্দীতে সেন্ট বেনেডিক্ট অফ নার্সিয়া তাঁর নিয়মাবলিতে সন্ন্যাসীদের তাঁদের ডরমিটরিতে সম্পূর্ণ পোশাক পরিহিত অবস্থায় ঘুমানোর পরামরুশ দেন। পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপীয় পুরুষেরা মূলত আলখাল্লা জাতীয় পোশাক পরতেন। তারপর কডপিস, টাইটস ও টাইট ট্রাউজার্সের প্রচলন হয়। এই পোশাকগুলি পুরুষাঙ্গকে ঢেকে রাখলেও তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করত।

    নগ্নতা শারীরিক শাস্তির অংশও হতে পারে। জমায়েত মানুষর সামনে কারোকে অপমান করার প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রেও অনেকসময়ই এই ধরনেরশাস্তির ব্যবহার করা হয়ে থাকে। নাৎসিরা তাদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দিদের জোর করে নগ্ন করে রাখত। স্টিভেন স্পেলবার্গের ‘Schindler’s List’ নামক মুভিটি যাঁরা দেখেছেন তাঁরা নিশ্চয় মনে করতে পারছেন। এমনকি কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ ডাইনি শিকারের সময় অভিযুক্ত ডাইনিদের সম্পূর্ণ নগ্ন করে তথাকথিত ‘ডাইনি চিহ্ন’গুলি পরীক্ষা করা হত। এইসব চিহ্ন নাকি তাদের বিরুদ্ধে বিচারের প্রমাণ হিসাবে পেশ করা হত এবং শাস্তি প্রদান করা হত। ২০০৩ সালে ইরাকের আবু গারিব কারাগারে কুখ্যাত মার্কিন সেনা-কর্মচারীরা এখানে বন্দিদের নগ্ন করে কখনও বেঁধে ও ভীত-সন্ত্রস্ত করে তাদের ফোটো তুলে রাখত।

    নগ্নতা একটি চর্চার নাম। তাই নগ্নতাবাদ একটি আন্দোলনের পরিচয়। নগ্নতাবাদ এক দর্শনের নব্যমার্গ। নগ্নতাবাদ বা প্রকৃতিবাদ হচ্ছে এক ধরনের সামাজিক নগ্নতার ব্যক্তিগত ও জনপ্রকাশ্যরূপ লাভের উদ্দেশ্যে একপ্রকার রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এটি প্রাত্যহিক বা ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা সামাজিক জীবনের ক্ষেত্রে নগ্নতার ব্যবহারকে সংজ্ঞায়িত করতেও ব্যবহৃত হতে পারে। নগ্নতাবাদ ইংরেজি ভাষাতে যেসব পরিভাষায় উচ্চারিত হয়, সেগুলি হল– ‘Social nudity’, ‘Public nudity’, এবং সাম্প্রতিক কালের ‘clothes-free’। কিন্তু কোনোটিই পুরোনো ও সর্বাধিক ব্যবহৃত পরিভাষা ‘Naturism’ (যুক্তরাষ্ট্রে Nudism নামেই বেশি পরিচিত)-এর সমান বিস্তৃতি পায়নি।

    নগ্নতাবাদ কেমন দর্শন? পণ্ডিতরা বলেন, নগ্নতাবাদীদের দর্শন বিভিন্ন সূত্র থেকে আমদানি হয়েছে। এহেন দর্শনের অনেকগুলি এসেছে স্বাস্থ্য ও শারীরিক সামর্থ্য সংক্রান্ত, যা এসেছে বিশ শতকের জার্মানি থেকে। এর পিছনে আছে। প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার ধারণা। এছাড়া সাম্যতার সৃষ্টিও এর পিছনে একটি স্পৃহা হিসাবে কাজ করে। অবশ্য পরে জার্মানি থেকে পরবর্তীতে এই ধারণা ইংল্যান্ড, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। জার্মান নগ্নতাবাদীদের সংগঠন জার্মানিতে পারিবারিক ক্ষেত্রে ও বিনোদনমূলক খেলাধুলায় নগ্নতার প্রসারে কাজ করছে। এই কাজের একটি প্রয়াস হিসাবে তারা জার্মান অলিম্পিক স্পোর্টস ফেডারেশনের সদস্যপদ লাভ করেছে। ফরাসিরা নগ্নতাবাদের প্রসারে দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে নগ্নতা উপভোগের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট স্থানে বড়ো কমপ্লেক্স নির্মাণ করেছে। এই ধারণা পরবর্তীতে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রেও প্রসারিত হয়েছে। এছাড়া নগ্নতাবাদী পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র বা রিসর্ট তৈরি হয়েছে। এই ধারণাটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ক্যারিবীয় অঞ্চলে। নগ্নতাবাদের চর্চা নানাভাবে করা হয়। মার্ক অ্যালাইন ডেসকাম্পস নগ্নতাবাদকে বিভিন্ন প্রকারে ভাগ করেছেন। যেমন –(১) ব্যক্তিগত নগ্নতাবাদ, (২) পারিবারিক নগ্নতাবাদ, (৩) বুনো পরিবেশে নগ্নতাবাদ, (৪) সামাজিক নগ্নতাবাদ। এছাড়াও (৫) সামরিক নগ্নতাবাদ, (৬) ক্যাম্পেইনিং ইত্যাদি।

    ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নগ্নতাবাদ : ঘরে ও বাগানে প্রায় সময়ই নগ্নতাবাদের চর্চা করা হয়। এটি হতে পারে একাকী বা পরিবারের সদস্য সহকারে। কানাডীয় এক সমীক্ষায় যে চিত্রটি নজরে আসে, তা চমকে যাওয়ার মতো। শতকরা ৩৯ ভাগ কানাডিয়ান ঘরে নগ্ন অবস্থায় হাঁটাচলা করেন এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় এই হার শতকরা ৫১ ভাগ। ব্যক্তিগত নগ্নতার মধ্যে আছে নগ্ন অবস্থায় ঘুমোনো। যদিও কিছু ক্ষেত্রে এটি স্বাস্থ্যগত উপকারের জন্যও করা হয়। কারণ দেখা গেছে নগ্ন অবস্থায় ঘুম আসতে সুবিধা হয় এবং অনেক্ষণ। ঘুমোনো সম্ভব। অবশ্য সেই সঙ্গে এটি আরামের কারণেও হতে পারে। তবে অনেকে মনে করেন, কাপড়চোপড় পরে ঘুমোনোর চাইতে না-পরে ঘুমোনোর উপকার বেশি। দাম্পত্য-জীবনে স্বামী-স্ত্রীর নগ্ন হয়ে ঘুমোনো নাকি ভালো। ইউএসএ কটন ২০১৪ সালে এক জরিপ চালিয়ে দেখেছে, জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে যাঁরা নগ্ন হয়ে ঘুমোতে অভ্যস্ত তাঁদের মধ্যে শতকরা ৫৭ ভাগই মনে করেন যে তাঁরা সুখী। পাজামা পরে যাঁরা ঘুমোন তাঁদের মধ্যে সুখী দম্পতি ছিল ৪৮ ভাগ। নিউরোলজিস্ট রাচেল সালাস ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে ২ বছর আগে বলেছিলেন, গুহামানবের মতো আধুনিক ফ্যাশন সচেতন মানুষের গায়ে সুতো না-রেখে ঘুমোনো ভালো। তিনি বলেন– “আমাদের পূর্বসূরীরা একসময় নগ্নই ঘুমোতেন। মাংসাশী প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তাঁরা মূলত গুহায় ঘুমোতেন এবং নগ্ন হয়েই। তাই নগ্ন হয়ে ঘুমোলে আজও আমরা কিছুটা নিরাপদ বোধ করি। অর্থাৎ, ঘরের তাপমাত্রা বেশি হলে নগ্ন হয়ে ঘুমোনো খুবই ভালো। শরীরের ভারী পোশাক ঘুমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। ঘুম বিশেষজ্ঞরা বলেন, শরীরের তাপমাত্রা ঘুমের গভীরতায় প্রভাব ফেলে। ফলে নগ্ন হয়ে ঘুমোলে শরীর অতিরিক্ত তাপ থেকে মুক্ত থাকতে পারে। স্পর্শ অক্সিটোসিন নামক হরমোনের নিঃসরণ ঘটায়। নিঃসন্দেহে নগ্ন হয়ে ঘুমালে আপনার শরীর তুলনামূলভাবে বেশি স্পর্শ পাবে। এতে শরীরে অক্সিটোসিন হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যাবে। যৌন কামনা, বন্ধন দৃঢ় করার জন্য অক্সিটোসিন হরমোন বিশেষভাবে পরিচিত। এছাড়া এই হরমোন মানসিক চাপ কমান, বিশ্বাস-আস্থা বৃদ্ধি করে, হৃদযন্ত্রের চাপ স্বাভাবিক রাখা ও যৌন-প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখার কাজ করে। নগ্ন হয়ে ঘুমোলে শরীর থেকে বুড়িয়ে যাওয়া প্রতিরোধক মেলাটোনিনের নিঃসরণ সহজ হয়। ফলে এইভাবে ঘুমোনো তারুণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে। ভালো ও গভীরভাবে ঘুমোতে সাহায্য করে নগ্ন ঘুম। ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখে ও শরীরের অতিরিক্ত চর্বি পুড়িয়ে ফেলতে সাহায্য করে। ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, পর্যাপ্ত ঘুম না-হলে শরীরে ঘার্লিন হরমোনের প্রবাহ বেড়ে যায়, যা ক্ষুধা বাড়ায় ও ইনসুলিনের প্রবাহকে বৃদ্ধি করে। ফলে বহুমূত্র ও হৃদরোগ সৃষ্টি হতে পারে। গলা ও কোমরবন্ধ পোশাক শরীরের নিন্মাঙ্গে স্বাভাবিক রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এতে নানান রোগ সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। কিন্তু নগ্নভাবে ঘুমে শরীরের রক্ত চলাচলকে স্বাভাবিক থাকে। যা শরীরের পেশি ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অঙ্গকে সতেজ ও স্বাস্থ্যবান রাখতে সাহায্য করে। নগ্ন ঘুম দম্পতিদের সম্পর্কের মধ্যকার বাধা দূর করে। সম্পর্কে আরও নিবিড় করে তোলে। নগ্ন ঘুম সঙ্গীর প্রতি যৌন সম্পর্কের জন্য উন্মুক্ত আহ্বান। চাইলেও কোনো দম্পতি একে অন্যকে পাশ কাটিয়ে ঘুমোতে পারেন না। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যে, নগ্ন ঘুম নিজের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। যৌনসঙ্গীর সামনে নগ্নতা সামাজিকভাবে অনুমোদিত– তবে সবক্ষেত্রে নয়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ কেউ কেবলমাত্র যৌনসংগমের সময়ই আলোতে বা অন্ধকারে নগ্নতাকে অনুমোদন করেন। এছাড়া সঙ্গীর সঙ্গে স্নানের সময় বা স্নানের পরে, চাদর বা কম্বলের আবরণের অন্তরালে, অথবা ঘুমোনোর সময় সঙ্গীর সামনে নগ্নতা অনুমোদিত।

    সামাজিক নগ্নতাবাদ : সামাজিক নগ্নতাবাদ হল সামাজিক প্রেক্ষাপটে নগ্নতার প্রসার। হতে পারে নিজের বাড়িতে নিজের ঘরে বন্ধুদের নিয়ে একটি নগ্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে। হতে পারে নগ্নতা চর্চার জন্য বিশেষভাবে কোনো স্থান তৈরির মাধ্যমে। যেমন– নগ্নতাবাদীদের জন্য ক্লাব, সেন্টার, রিসর্ট, অন্য কোনো সুবিধাজনক স্থান স্থাপনের মাধ্যমে। এই পারিভাষিক ব্যাখ্যাটি অবশ্য স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়। কোনো নগ্নতাবাদী অনুষ্ঠান বা কর্মকাণ্ডে পোশাক পরিধান সাধারণত ঐচ্ছিক। ব্যতিক্রম হল সুইমিং পুল ও সূর্যস্নানের স্থান। কারণ অনুমতি সাপেক্ষে এসব জায়গায় সম্পূর্ণ নগ্নতা আশা করা হয়। কিছু নগ্নতাবাদীদের কাছে এই নিয়মটি কিছুক্ষেত্রে বিতর্কের উৎস। স্বাস্থ্যগত ও নিরাপত্তাজনিত কারণে নগ্নতাবাদীদের জন্য নির্মিত স্থানে কর্মরত কর্মচারীদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে পোশাক পরা বাধ্যতামূলক।

    শালীনতার যে প্রচলিত ধারাটি ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা সামাজিক নগ্নতার বিরোধী নগ্নতাবাদীরা তা প্রত্যাখ্যান করে থাকেন। পরিবর্তে তাঁরা এমন এক সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে চান যেখানে মানুষে নগ্ন মানুষের সাহচর্যে অথবা অন্যান্য নগ্নতাবাদী বা সাধারণ মানুষের সামনে নগ্ন হয়ে থাকতে অস্বস্তিবোধ করবে না। এই প্রথানুযায়ী ইউরোপের অনেক দেশে (বিশেষত জার্মানি, ফিনল্যান্ড ও নেদারল্যান্ড) উভয় লিঙ্গের মানুষেরই দলবদ্ধ অবস্থায় নগ্ন হয়ে স্নান স্বীকৃত। অধিকাংশ জার্মান স্পা-তে মিশ্র নগ্ন স্নানের অনুমতি দেওয়া হয়। জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন ও গ্রিসের সৈকত ও সুইমিং পুলগুলিতে নগ্ন হয়ে স্নান অনুমোদিত। উল্লেখ্য, মহাদেশীয় ইউরোপে নগ্নতাকে অ্যাংলো-স্যাক্সন জগতের রক্ষণশীলতার তুলনায় অনেক লঘু করে দেখা হয়। ‘সনা’ ব্যবস্থার উৎস ফিনল্যান্ডে। এই দেশে এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও ইউরোপের অন্যান্য জার্মানভাষী রাষ্ট্রে সনায় নগ্ন অবস্থান অনুমোদিত। সনা বর্তমান ফিনল্যান্ডে অতি সুপরিচিত। এখানে বর্তমানে প্রতি তিন জন নাগরিকের জন্য একটি করে সনা রয়েছে। বিগত কয়েক দশকে সমগ্র ইউরোপেই সনা অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

    নগ্নতার আরও কয়েকটি প্যাশন আছে। সেগুলিও আলোচনা করব।

    প্রকাশ্য নগ্নতা : প্রকাশ্য নগ্নতা (Public nudity) বলতে ব্যক্তিগত পরিবেশ ছাড়া অন্য কোনো পরিবেশে কোনো ব্যক্তির নগ্ন অবস্থায় অবলীলায় অবস্থান করাকে নির্দেশ করে। এর দ্বারা কোনো ব্যক্তিকে লোকালয়ে বা প্রকাশ্যে নগ্নভাবে বিচরণ বা অবস্থান করাকে বোঝানো হয়। কোনো ব্যক্তির বাড়িতে বা ব্যক্তিগত স্থান বা পরিবেশে নগ্ন অবস্থায় বিচরণ করাকে প্রকাশ্যে নগ্নতা হিসাবে ধরা হয় না। এইসব ব্যক্তিগত স্থান বা বিশেষ পরিবেশের মধ্যে আছে সুইমিং পুল, ব্যায়ামাগার, নগ্নতাবাদীদের জন্য তৈরি ক্লাব বা রিসোর্ট ইত্যাদি। কারণ এসক স্থান নগ্নতাবাদীদের জন্যই বিশেষভাবে স্থাপিত। নগ্নতাবাদ সামাজিক নগ্নতার প্রচার করে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত বিশেষ স্থানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়।

    কিছু ক্ষেত্রে প্রকাশ্য নগ্নতা বৈধ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বিশ্বে বহু দেশ আছে যেখানে নগ্ন সৈকতগুলোতে, বা অন্য কিছু স্থানে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে হলেও প্রকাশ্য নগ্নতাকে বৈধ ধরা হয়। সেসকল স্থানে কোনো ব্যক্তি নগ্নভাবে বিচরণ করার জন্য কোনো আইনত হুমকির স্বীকার হবে না কেউ। সেসব জায়গা ব্যতীত বিভিন্ন সমাজে প্রকাশ্য নগ্নতার গ্রহণযোগ্যতা সমাজ হিসাবে গুরুতপূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়। কারও প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নগ্নতা ব্যবহৃত হলে, অথবা কোনো কারণে এই ব্যাপারটি ঘটলে তা এক্সিবিশনিজম নামে পরিচিত হতে পারে। কিছু মানুষ জনসম্মুখে নিজেদেরকে নগ্ন করে প্রচারণা আকর্ষণ করেন, যাঁরা ‘স্ট্রিকার’ নামে পরিচিত। সাধারণত খেলাধুলা বা সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্ট্রিকিং দেখা যায়।

    বীরোচিত নগ্নতা : এ এক পৌরণিক নগ্নতা। বীরোচিত নগ্নতা আদর্শ নগ্নতা ধ্রুপদি বিদ্যায় বর্ণিত ধ্রুপদী ভাস্কর্যে নগ্নতার প্রয়োগের একটি আদর্শ। এই আদর্শের প্রয়োগ হত, ভাস্করের বিষয়বস্তু যে নশ্বর মানবিক, অর্থাৎ বীর বা অর্ধদৈব কোনো সত্ত্বা, তা বোঝাতে। এই প্রথার সূচনা প্রাচীন ও ধ্রুপদি গ্রিসে। পরবর্তীকালে হেলেনীয় ও রোমান ভাস্কর্যেও এই আদর্শ গৃহীত হয়েছিল। এই ধারণা নারী ও পুরুষ উভয় প্রকার ভাস্কর্যই নির্মিত হয়েছে। নারী ভাস্কর্যগুলি রূপ পেয়েছে ভেনাস ও অন্যান্য দেবীদের মূর্তিনির্মাণ শিল্পে। তিভোলি জেনেরাল বা ডেলোজ ‘সিউডো-অ্যাথলেট’ প্রভৃতি রোমান উদাহরণের ক্ষেত্রে রোমান অতি-বাস্তব গ্রিক দেবতার মতো দেহবিশিষ্ট আবক্ষমূর্তি নির্মাণশৈলীর এক বিপরীত রীতি লক্ষিত হয়। ধারণাটির প্রবর্তনের পর এর মধ্যে নানা পরিবর্তন এসেছে। ধ্রুপদি ভাস্কর্যে নগ্নতার অন্যান্য শৈলীও উদ্ভূত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পরাজিত বীর অথচ বর্বর শত্রুর মূর্তি ডাইং গল নির্মিত হয়েছে প্যাথেটিক নগ্নতা শৈলীতে। টোনিও হোলকারের মতে, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী বা তারও পূর্বের গ্রিক শিল্পরীতি বলে উল্লেখ করেছেন এই শৈলীটিকে। সেই কারণে লক্ষ করবেন গ্রিক দেবদবীরা নগ্নই।

    নগ্নতাবাদীরা বিশ্বাস করেন মানবদেহ কাপড়ের আড়ালে ঢেকে রাখার জন্য সৃষ্টি হয়নি। আর এ বিশ্বাস থেকেই তাঁরা জীবন যাপন করেন নগ্ন হয়ে। কাজেই এটা আশ্চর্যের কিছু নয় যে, কিছু নগ্নতাবাদী তাদের জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিন, বিয়ের দিনটিতে গায়ে কিছু চাপিয়ে থাকতে চাইবেন না। ব্রিটেনের নগ্নতাবাদী যে গোষ্ঠী রয়েছে তাঁদেরকে সাধারণত স্বাচ্ছন্দেই থাকতে দেয় বাকিরা। দ্য ওয়েডিং ফেইরি’ খ্যাত বিয়ের অনুষ্ঠান বিশেষজ্ঞ জর্জ ওয়াটস হাফিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, নগ্ন বিয়ের ধারণাকে তিনি সমর্থন করেন। তিনি বলেন, বিয়েটা শেষপর্যন্ত আপনাকে নিয়ে, যেখানে আপনার আগ্রহ আর পছন্দের বিষয়গুলোর প্রতিফলন হওয়া উচিত। পরিবার ও বন্ধুদের সেখানে সমর্থন থাকা উচিত। আর এর অর্থ যদি এটা হয় যে, পোশাক পরিহার করে নগ্ন হয়ে আপনি স্বীকার করে বলবেন –“তবে তেমনটাই হোক”। হাফিংটন পোস্টের প্রতিবেদনের শেষে বলা হয়, আমাদের মতে যদি দুজন মানুষ একে-অন্যকে ভালোবাসেন আর প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হতে চান তাহলে তাঁরা কী পরছে আর কী পরছে না তাতে কী এসে যায়!

    কোনো কোনো দেশে অল্পসময়ের জন্য আবশ্যকীয় নগ্নতাকে (যেমন সমুদ্রসৈকতে পোশাক পরিবর্তন) অশালীন মনে করা হয় না। তবে সৈকতে দীর্ঘক্ষণ নগ্ন অবস্থায় থাকাটা অশালীন বলে বিবেচিত হয়। যদিও নগ্ন সৈকত (Nudist Zone)-গুলিতে নগ্নতা গ্রহণযোগ্য। পাশ্চাত্য সমাজে নারীদের প্রকাশ্যে স্তন্যপান করানোয় অনেক ক্ষেত্রে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ২০০৭ সালের জুন মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্রুক রায়ান নামে জনৈক মহিলা একটি রেস্তোরাঁয় তাঁর সাত মাসের শিশুপুত্রকে স্তন্যপান করাতে গেলে রেস্টুরেন্টের মালিক আপত্তি জানান। সেদেশে প্রকাশ্যে স্তন্যপান করানো যে আইনসংগত সেই সংক্রান্ত একটি নথি দেখিয়েও তিনি মালিকের অনুমতি পাননি। অগত্যা তাঁকে গাড়ির মধ্যে পুত্রকে স্তন্যপান করাতে হয়। পরে তিনি ওই রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন। উল্লেখ্য, অধিকাংশ মার্কিন অঙ্গরাজ্যেই (২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসের হিসেব অনুযায়ী ৪০টি) মায়েদের প্রকাশ্যে সন্তানকে স্তন্যপান আইনসংগত করে। অনেক পাশ্চাত্য দেশে এবং সূর্যস্নানের মতো কয়েকটি ক্ষেত্রে মহিলাদের স্তন অনাবৃত রাখাকে অশালীন বলে মনে করা হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনেক রাজ্যে অবশ্য প্রকাশ্যে মহিলাদের স্তনবৃন্ত প্রদর্শন ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে পড়ে এবং প্রকাশ্য স্থানে স্তনবৃন্ত প্রকাশ করার উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। যুক্তরাজ্যে পাবলিক অর্ডার অ্যাক্ট অফ ১৯৮৬ অনুসারে নগ্নতাকে হয়রানি, সতর্কীকরণ বা যন্ত্রণা প্রদানের জন্য ব্যবহার করা যায় না। কয়েকটি বিচারের রায় থেকে পাশ্চাত্য সমাজে ‘মুক্তস্তন সমতা’ বা ‘টপফ্রি ইকুয়ালিটি’ আন্দোলনের সূচনা হয়। এই আন্দোলনের মূল বক্তব্য ছিল পুরুষেরা যেমন কোমরের ঊর্ধ্বাংশ অনাবৃত রাখে, মহিলাদেরও তেমনই অধিকার পাওয়া উচিত। এই সূত্রে ইংরেজিতে ‘টপলেস’ শব্দটির যৌন-অনুষঙ্গ এড়াতে ‘টপ-ফ্রি’ শব্দটির প্রচলনও হয়।

    কেউ কেউ নিজের শরীরটাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করার জন্য ব্যগ্র হলেও, অনেকেই নিজ শরীরটাকে জনসমক্ষে উন্মুক্ত করতে চায় না। কারণ বাধ সাধে লজ্জাবোধ। সব জাতি এবং সংস্কৃতিতে নারী-পুরুষ খোলামেলা চললেও সম্পূর্ণ নগ্নতা সবসময়ই কটু দৃষ্টিতে দেখা হয়। কিন্তু পৃথিবীতে এমনও কিছু আচার অনুষ্ঠান চলে আসছে, যার শর্তই নগ্নতা। “ক্ষীণকোটিপীনোন্নতপয়োধরা” নারীকে দর্শন করতে শুধু পুরুষরাই নন, নারীরাও বেশ উপভোগ করে। এখানে দেখে নিন এমনই কিছু খেলা ও উৎসবের তথ্য। বিবস্ত্র হয়ে এসব উদযাপিত হয় আয়োজন। যেমন–

    (১) ফিলিপাইনের স্টেট ইউনিভার্সিটিতে বার্ষিক দৌড়ের আয়োজন হয়, যেখানে ছেলেরা নগ্ন হয়ে অংশগ্রহণ করে।

    (২) ওয়াশিংটনের সিয়াটলে প্রতিবছর বেশ ঝড় তোলে ‘এলিমন্ট সোলাস্টিক প্যারেড’-এর আয়োজন। সেই ১৯৮৯ সাল থেকে এর আয়োজন চলছে। দেহে রং দিয়ে নানা আঁকিবুকি করে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় সাইকেল চালান অংশগ্রহণকারীরা।

    (৩) ভিয়েনার লিওপোল্ট জাদুঘরে ছবি প্রদর্শনীর আয়োজন থাকে, যার নাম ‘নুড মেন ফ্রম ১৮০০ টু টুডে’। এখানে ৩০০টিরও বেশি বিশাল আকারের ছবি আছে। সবই পুরুষের উলঙ্গ ছবি প্রদর্শিত হয়।

    (৪) হাজার হাজার নারী-পুরুষও অংশ নেন। কিন্তু মাত্র ৩০ জনের সুযোগ হয় নগ্ন হয়ে বরফে স্লাইডিং খেলার। এতে বিজয়ী পান এক হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড। ২০০৯ সাল থেকে জার্মানিতে এটি আয়োজিত হয়ে আসছে।

    (৫) ‘দ্য অ্যানুয়েল রস্কিল্ড ফেস্টিভ্যাল’-এর অন্যতম একটি আয়োজন ‘নগ্ন দৌড়’। এতে নারী-পুরুষ নগ্ন হয়ে প্রায় সাত কিলোমিটারের একটি ট্র্যাক পাড়ি দেন।

    (৬) নর্দার্ন নেভাদার ব্ল্যাক রক ডেজার্ট-এর চরমতম খরতাপে অনুষ্ঠিত হয় সপ্তাহব্যাপী আয়োজন বার্নিং ম্যান’। প্রায় ৫০ হাজার মানুষের আগমন ঘটে এই মেলায়। এখানে নগ্নতা উন্মুক্ত।

    (৭) ইউরোপিয়ান ফেস্টিভ্যাল অব ন্যুড ফোটোগ্রাফি এক বিশাল প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এখানে নগ্ন মানুষের শৈল্পিক ছবিগুলি প্রদর্শিত হয়। ফ্রাঞ্চ এবং ইউরোপে নগ্ন ছবির সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী এটি।

    (৮) জাপানে বড় মাপের একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়, যার নাম ‘সাইদাই জি ইয়ো হাদাকা মাতসুরি’। প্রতি ফেব্রুয়ারির তৃতীয় শনিবার ‘সাইদাই-জি টেম্পল’-এ নগ্ন হয়ে অংশ নেন পুরুষরা।

    (৯) এটি এমন এক গণবিবাহের আয়োজন যেখানে সবাই নগ্ন হয়ে বিয়ে করেন।

    (১০) নিউজিল্যান্ডে আয়োজিত হয় ‘নুড রাগবি ইন্টারন্যাশনাল’। অল ব্ল্যাকস এবং ফ্রান্সের খেলার আগে উত্তাপ ছড়ানোর একটি আয়োজন নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে রাগবি খেলা (সূত্র : ইন্ডিয়া টাইমস)।

    ফোটোগ্রাফির আবিষ্কারের প্রায় শুরু থেকেই নগ্নতার ব্যবহার প্রচলিত। বস্তুত ফোটোগ্রাফিতে নগ্নতার মধ্যে সবসময় শৈল্পিক মেধা বিকশিত না-হলেও, নগ্ন ফটোগ্রাফি (Nude Photography)-তে হয়ে থাকে। ফোটোগ্রাফিতে নগ্নতা সাধারণত স্ন্যাপশট। কিন্তু নগ্ন ফোটোগ্রাফি কোনো ব্যক্তির স্থির অবস্থায় তোলা ছবি। শিল্পকৃতি হিসাবে, নগ্ন ফোটোগ্রাফি হল নগ্ন দেহের শৈল্পিক প্রদর্শন। এখানে মানবদেহের রেখা ও রূপই প্রধান উদ্দেশ্য। অনেক ফোটোগ্রাফারই একটি আর্ট ন্যুড ফটোগ্রাফকে ব্যক্তির বদলে মানবদেহের পাঠ মনে করেন। ব্যক্তির ফোটোগ্রাফ, যেখানে তাঁকে হুবহু চেনার উপায় থাকে, তাকে পোর্ট্রেট বলা চলে। কিন্তু অনেক ন্যুড ফটোগ্রাফে ব্যক্তির মুখই দেখা যায় না। ফোটোগ্রাফারেরা অনেক সময় আলোছায়ার চরম ব্যবহার, তৈলাক্ত ত্বক অথবা দেহের গঠন বোঝাতে ছায়ার ব্যবহার করে থাকেন।

    প্রথম যুগের ফোটোগ্রাফাররা অনেক সময়ই নারীদের নগ্নতা ফটোগ্রাফিতে ফুটিয়ে তুলতেন। এঁদের মধ্যে ফেলিক্স-জ্যাক মলিন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এডওয়ার্ড ওয়াটসন, রুথ বার্নার্ড ও জেরি অ্যাভেনেইম প্রমুখ ফোটোগ্রাফাররা শিল্পকর্ম হিসবে দেহের রেখা প্রদর্শন করতে পছন্দ করতেন। ইরোটিক ফোটোগ্রাফি ও পর্নোগ্রাফিতেও অনেক সময় নগ্ন বা অর্ধনগ্ন মডেলদের শৈল্পিক চিত্র বিস্তৃত হয়ে থাকে। স্পেনসার টিউনিক নির্মিত সারা বিশ্বের নানা প্রকাশ্য স্থানে এক দঙ্গল নগ্ন লোকের স্থিতিস্থাপক ফটোগ্রাফি উচ্চ মানের শিল্পমেধার জন্য নন্দিত।

    তথাকথিত সভ্য মানুষ ছাড়া পৃথিবীর সব প্রাণীই নন বিচরণ করে। তবে মানুষও সৃষ্টির শুরু থেকে আর পাঁচটা প্রাণীর মতো নগ্নভাবে বিচরণ করত। লজ্জার নিবারণের জন্য নয়, মানুষ শরীর ঢাকতে শুরু করেছিল নানা প্রাকৃতিক কারণে। চরম প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে বাঁচতেই মানুষ শরীর ঢাকতে থাকে। পরবর্তী সময়ে পোশাকে বৈচিত্র্য আনা হয় শরীরকে সাজাতে। মানুষ যখন নগ্ন ছিল তখন শরীর নিয়ে এমন অদম্য কৌতূহল ছিল না। কৌতূহল ছিল না বলে শরীরের ভাঁজ-বিভঙ্গ দেখার জন্য অস্থিরতাও ছিল না। সারা পৃথিবী জুড়ে অসংখ্য ‘আনসিভিলাইজড’ ও ‘আনকনটাকটেড’ নরনারী গোষ্ঠী আছেন যাঁরা এই একবিংশ শতাব্দীতে আজও কেউ সম্পূর্ণ নগ্ন, কেউ-বা প্রায়-নগ্ন জীবনযাপন করেন। তথাকথিত সভ্য দুনিয়ার সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন– ভারতের ‘জাড়োয়া উপজাতি, ঘানার ‘ক্রোবো’ উপজাতি ইত্যাদি। নিউ গিনির পাপুয়ার এক উপজাতি গোষ্ঠীর কম বয়সি মেয়েরা উদ্ধাঙ্গ অনাবৃত করে পুরুষ-সঙ্গীদের সঙ্গে দেখা করতে যান। অপরদিকে সভ্য দুনিয়ার যেসব নরনারী বিভিন্ন দেশে ন্যুডিস্ট জোনে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বিচরণ করেন। তাঁদের মধ্যে শরীর নিয়ে ন্যূনতম আঁতলেমি নেই। তাঁরা অবলীলায় ভাবলেশহীনভাবে নগ্ন হয়ে ঘোরাফেরা করেন। শুয়ে থাকেন যেমন খুশি, বসে থাকেন যেমন খুশি। আট থেকে আশি– সব বয়সের নরনারী একত্রে নগ্ন হয়ে থাকেন। কারোকে নগ্ন অবস্থায় দেখে কারোর উত্তেজনা হয় না। কেউ কারোর দিকে ঘুরেও দেখে না। জাপানের বহুল আলোচিত লিঙ্গ-উৎসব প্রতিবছর এপ্রিলের প্রথম রবিবার জাপানের কাওয়াসাকি অঞ্চলের লোকেরা সাড়ম্বরে পালন করে একটি ধর্ম অনুষ্ঠান যার নাম কানামারা মাৎসুরি (Kanamara Matsuri)। জাপানের কাওয়াসাকির একটি মন্দিরে এটি অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসবটি প্রধানত ধর্ম বিশ্বাসের অনুষ্ঠান, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পুরুষাঙ্গসদৃশ উত্থিত লিঙ্গ।

    সমস্যা হয় যেসব দেশে নগ্ন হয়ে বিচরণ করার অনুমতি নেই। যেসব দেশে নগ্ন হওয়া অপরাধ, নগ্নতা অপরাধ। সেখানে নগ্নতার আকর্ষণ অদম্য, অপ্রতিরোধ্য। সেখানে নগ্ন শরীর পুঁজিতে রূপান্তরিত হয়। নগ্ন শরীর প্রদর্শনে মধ্য দিয়ে কোটি কোটি ডলার আমদানি হয়। যদিও প্রকৃতির নিয়মে পৃথিবীতে মানুষ নগ্ন হয়েই আসে। কারণ এক অনিবার্যতায় মানুষ তার জন্মলগ্নের নগ্নতা এড়াতে পারে না। শিশু যতই পরিণত হতে থাকে, নগ্নতাও ততটা ঢাকা পড়ে যেতে থাকে। তবে মানবসমাজ পুরোপুরি নগ্নতামুক্ত নয়। পরিণত বয়সের নগ্নতা প্রদর্শন একদিকে যেমন নেতিবাচক ও নিন্দনীয়, অপরদিকে তেমন আকর্ষণীয় ও ‘লাভজনক’। নগ্নতার প্রতি মানুষের চিরন্তন আগ্রহ ও আকর্ষণের কারণে শোবিজের সঙ্গে এটা যেন বাই ডিফল্ট একটা ব্যাপার। এখানে নগ্নতা শুধু ‘শিল্প’ ই নয়, খুব বড় মাপের বাণিজ্যও বটে। অভিনেত্রী পাউলি দাম সিনেমায় এসে শুধু নগ্ন হয়েই তার দাম অনেক বাড়িয়ে ফেলেছেন কি না বলতে পারব না। ‘টেক ওয়ান’-এ স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে শরীরের সামনের অংশ নির্দ্বিধায় উন্মোচন করেছেন ক্যামেরার সামনে। তবে পাওলি আর স্বস্তিকার নগ্নতা উড়িয়ে নস্যি করে দিয়েছে ঋতুপর্ণা (রি) সেন এবং ইন্দিরা ভার্মারা।

    নগ্নচিত্র, নগ্ন মূর্তি, নগ্ন স্কাল্পচার, নগ্ন ভাস্কর্য, নগ্ন ফোটোগ্রাফি, নগ্ন প্রদর্শন, নগ্ননৃত্য, নগ্ন প্রতিবাদ– পৃথিবীব্যাপী এখন নগ্নতা ও নগ্নতা সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের আর্থিক দিকটা অনেক বড়। নগ্নতা বন্ধ হলে কয়েকটি দেশের কিংবা শহরের ট্যুরিজম ব্যাবসা মুখ থুবড়ে পড়বে। যে-কোনো আইনে নগ্নতা ও নগ্নতাকেন্দ্রিক সব কিছু নিষিদ্ধ হলে পৃথিবীতে কত হাজার কোটি ডলারের ব্যাবসা বন্ধ হয়ে যাবে তা বলা কঠিন। তবে এমন হলে থাইল্যান্ড, লাটভিয়া ও কোস্টারিকাসহ অনেক দেশের জিডিপি কমে যাবে, অনেক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যাবে এবং কয়েক মিলিয়ন মানুষ পথে বসবে। নগ্নতা এখন মাল্টি-বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি। নগ্নতার জয়জয়কার এ সময়ে এর ব্যাপ্তি এখন এতটাই বেড়ে গেছে, এটা বন্ধ হলে উচ্চশিক্ষাও প্রভাবিত বা বাধাগ্রস্ত হবে। সম্প্রতি খবরে প্রকাশিত হয়েছে, ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রছাত্রী শিক্ষা খরচ মেটানোর জন্য নগ্ন ফোটো সেশন দিয়ে মোটা অর্থ রোজগার করছেন। সম্প্রতি এক গবেষণা থেকে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ব্রিটেনের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের এ প্রতিবেদনে বলা হয়, নগ্ননৃত্য ক্লাবের এক-তৃতীয়াংশের বেশি সদস্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই উচ্চশিক্ষার খরচ তুলে নিতে অনেকে নগ্ননৃত্যের চর্চা করা শুরু করে। এক শ্রেণির মানুষ যখন নানা কারণে তথা লজ্জা ঢাকতে পোশাকে শরীর ঢাকছে, অপরদিকে আর-এক শ্রেণির মানুষ নগ্ন হতে এবং নগ্ন করাতে ব্যস্ত হয়ে আছেন। কতক্ষণে সংশ্লিষ্ট সেই মানুষটিকে নগ্ন করে তাঁর শরীরটি দর্শন করবেন এবং করাবেন, সেই আনন্দে তাঁরা আটখানা হয়ে থাকেন –আর তিনি যদি নারী হন তাহলে তো কথাই নেই। নগ্ন পুরুষের শরীরের চাইতে নগ্ন নারীর শরীরই চড়া দামে বিকোয়।

    আমাদের কয়েকজনের মধ্যে আর-একটি আচরণ লক্ষ করা যায়। তা হল, কেউ কোনো অপরাধ করলে সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নগ্ন করে গ্রাম ঘোরানো। এর ফলে মানুষকে নগ্ন দৌড় করালে ঠিক কেমন দেখায়, সেটা প্রত্যক্ষ করার জন্যই এই ধরনের ফতোয়া দেওয়া হয়। এও এক ধরনের যৌনতা, ধর্ষকাম। কয়েকটা ঘটনা উল্লেখ করি :

    ঘটনা ১: ভারতে এক নারীর মাথা মুড়িয়ে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে, নগ্ন করে গাধার পিঠে চড়িয়ে ঘোরানো হয়েছে পুরো গ্রাম। নিজের ভাগ্নেকে হত্যা করার অভিযোগে গ্রাম পঞ্চায়েতের রায়ে তাঁকে এই ‘শাস্তি দেওয়া হয়। ঘটনাটি রাজস্থানের রাজধানী জয়পুর থেকে সাড়ে ৩০০ কিলোমিটার দূরে রাজসমন্দ জেলার কুম্ভলগড় এলাকায় ঘটে। (১৭ নভেম্বর, ২০১৪)

    ঘটনা ২ : পশ্চিমবঙ্গের লাভপুর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে রামপুরহাটে অন্য জাতের লোকের জমিতে মজুর খাটার ‘অপরাধে’ গ্রামের মোড়ল তার সঙ্গীদের নিয়ে এক তরুণীর জামাকাপড় ছিঁড়ে বেধড়ক মারধর এবং যৌন নিগ্রহ করেছে। গ্রামের আরো দুই মোড়ল অর্জুন ও শ্রীকান্ত হাঁসদা তরুণীকে নগ্ন করে বেধড়ক মারধর করেন। নগ্ন করেই ঘোরানো হয় গ্রাম। যন্ত্রণায়, লজ্জায় ওই তরুণী মাটিতে পড়ে গেলেও তাকে রেহাই দেওয়া হয়নি। মাটিতে পড়ে থাকা তরুণীর গায়ে প্রস্রাব করে দেন অর্জুন। পরে সেটা চেটে খেতে বাধ্য করান তিনি। (২৩ নভেম্বর, ২০১৪)

    ঘটনা ৩: ভারতে এক নারীকে গণধর্ষণের পর নগ্ন করে গ্রামের মধ্যে ঘুরানো হয়েছে বলে অভিযোগ। জমি সংক্রান্ত এক বিবাদকে কেন্দ্র করে দশজন মিলে ওই সাঁওতাল নারীকে ধর্ষণ করা হয়। অভিযুক্ত দশজনের মধ্যে রয়েছে নারীর স্বামীও। তারপর তাকে গ্রামের মধ্যে নগ্ন করে ঘোরানো হয়। শেষে আক্রান্ত নারীর ছোট ছেলের সামনেই তাকে মূত্র পান করতে বাধ্য করা হয়। (১৩ জুন, ২০১৪)

    ঘটনা ৪ : প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসের অভিযোগে ছেলেকে না-পেয়ে তার মাকে সবার সামনে নগ্ন করে ঘোরানো হল। পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যম ‘ডন’ এর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে পাকিস্তানের উত্তর-পূর্বের বালা গ্রামে। এক গ্রাম্য শালিসে ছেলের মাকে অভিযুক্ত করে তাকে নগ্ন করে ঘোরানো হয়। মহিলা যখন নগ্ন হয়ে হাঁটছিলেন তখন তাকে ঘিরে ছিল চারজন সশস্ত্র ব্যক্তি। (১৫ জুন, ২০১১)

    ঘটনা ৫: ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের জশপুর জেলার পাঠালগাঁও এলাকার এক উপজাতি শিক্ষিকাকে (৩৫) মারধরের পর জনসমক্ষে নগ্ন করে ঘুরিয়েছে গ্রামের খাপ পঞ্চায়েতরা। ওই শিক্ষিকা জানিয়েছেন, একইগ্রামে একই জাতির একটি মেয়ের সঙ্গে তার ভাইপোর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। যখন ওই মেয়ের অন্য ছেলের সঙ্গে বিয়ের কথা চলছিল তখন মেয়েটি তার বাড়িতে এসে ওঠে। এখানে তার ভাইপো বিজেন্দ্রও থাকত। পরে ওই শিক্ষিকা মেয়েটিকে অনেক বোঝালে সে সেখান থেকে চলে যায়। তারপর ওই গ্রামের সরপঞ্চ (গ্রাম পরিষদ প্রধান) শিক্ষিকার বাড়িতে মেয়েটির সন্ধানে আসে। এসময় তিনি অভিযোগ করেন, ওই শিক্ষিকা মেয়েটিকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে ও তার ভাইপো মেয়েটি ধর্ষণ করেছে। গ্রামের মাতব্বরা ওই শিক্ষিকাকে গণহারে পিটুনি দেওয়ার নির্দেশ দেয় ও প্রকাশ্য দিবালোকে সবার সামনে নগ্ন করে।

    বিস্ময়াভূত হলেও সত্যি, একমাত্র নগ্ন হতে রাজি হলেই আপনি কিনতে পারবেন জমি। অন্যথায় জমিও মিলবে না, মিলবে না বাড়ি-ঘর বা বসবাসের সুযোগ। যুক্তরাজ্যের হার্টফোর্ডশায়ারে অবস্থিত স্পিলপ্লাজ নামক গ্রামে এমনই রীতি। কারণ ওই গ্রামে কেউ কোনো কাপড়ই পরে না। তাই সেখানে থাকতে চাইলে তাঁদের মতো করেই থাকতে হবে সকলকে। দক্ষিণ আমেরিকায় ঘনজঙ্গলে কিছু আদিবাসী আছে যাঁরা এখনও তথাকথিত সভ্যতার ছোঁয়া পায়নি। তাঁদের ব্যাপার হলে ভিন্ন কথা ছিল। কিন্তু সভ্যতার পথপ্রদর্শক বলে যাঁরা নিজেদের দাবি করে সেই যুক্তরাজ্যে এমন গ্রামের কথা শুনলে অনেকেই হয়তো অবাক হবেন। তবে গ্রামবাসী অবশ্য নগ্নতার মধ্যে অসভ্যতার কিছু দেখেন না। আর যেখানে ইউরোপ-আমেরিকার সামনের সারির সভ্য দেশগুলির শিক্ষিতরা নগ্নতার দাবিতে আন্দোলন করছেন, রাস্তার মধ্যে কাপড় খুলে ব্যানার হাতে টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন সেখানে ওই গ্রামবাসীকে অসভ্য বলার সুযোগই-বা কোথায়? তাঁরা তো নিজেদের মতো করে থাকছেন, কারও বাড়া ভাতে তো ছাই দিচ্ছেন না। এটা ওই গ্রামেরই মানুষের কথা। তাঁরা গায়ে কাপড়ের কোনো পোশাক না পরলেও রোদ থেকে চোখ বাঁচাতে সানগ্লাস ঠিকই ব্যবহার করেন। গলায় সোনার চেন, এমনকি আঙ্গুলে আংটিও পরেন শখ করে। গ্রামের ভিতর বেশ সমৃদ্ধ বারও আছে। শুধু পোশাকই নেই গায়ে। এই গ্রামের বাসিন্দারা গ্রামটিকে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে পুরনো নগ্নতাবাদী অঞ্চল বলে দাবি করেন। তাঁরা এতটাই নগ্নতাবাদী যে আপনি যদি তাঁদের মতের সঙ্গে একমত না হন তাহলে সেই গ্রামের কেউ আপনার কাছে জায়গা-জমি, বাড়ি-ঘর কিছুই বিক্রি করবে না।

    নগ্ন হওয়া এবং নগ্ন করানো মনুষ্যজাতির একটি আদিম এবং অনিবার্য প্রবৃত্তি। ছলে-বলে-কৌশলে অথবা নানাবিধ বাহানা ও অজুহাতে মানুষ নগ্ন হয়, নগ্ন করে। দুর্বল নারী থেকে দুর্বল দলিত –সবাইকেই নগ্ন করানো যায়। নগ্ন করে হাসি বা মজাক ওড়ানো যায়। সেই নগ্ন শরীর ভিডিও বা স্টিলে বন্দি করে অতি দ্রুত সোস্যাল নেটওয়ার্কগুলিতে ছড়িয়ে দিয়ে চব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় স্বাদ নেওয়া যায়। তথাকথিত সভ্যসমাজে নারীদের একটা অংশ শিল্পের নামে আর্টের নামে চিত্রনাট্যের ডিমান্ড পূরণে ঝপাঝপ নগ্ন হয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লোভে নগ্নতা, যৌনমিলন সবই চলে আসছে আমজনতার অন্দরমহলে। অতঃপর স্বীকৃতি তো দূরে থাক, তাকে পরে আর দূরবিন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায় না।

    শুধু শারীরিক নগ্নতাই নয়, আমাদের সমাজে ও রাজনীতিতেও বিভিন্নমুখী নগ্নতা রয়েছে। নগ্ন হামলা, নগ্ন হস্তক্ষেপ, নগ্ন আচরণ এসবই শরীরের বাইরের নগ্নতা বা নির্লজ্জতার পরিভাষা। প্রকৃতপক্ষে সব ধরনের নগ্নতার সঙ্গে মিশে থাকে নির্লজ্জতা। তবে এখানে তফাত হল, যে উলঙ্গ হয় তাঁর লজ্জাবোধ থাকে না। কারণ উলঙ্গতা এবং নির্লজ্জতা সবসময় সহাবস্থান করে। দু-কান কাটা। একই সঙ্গে একই মানুষ প্রকাশ্যে উলঙ্গ ও লজ্জাবোধসম্পন্ন হতে পারে না। তবে নগ্নতার প্রধান উপাদান নির্লজ্জতা নয়, প্রাপ্তিই মূল বিষয়। রাজনীতিতে যত ধরনের নগ্নতা সবকিছুর পিছনেই আছে অর্থ এবং ক্ষমতা। যেমন নির্বাচনে নগ্ন হামলা ও নগ্ন হস্তক্ষেপের এ এক ‘সাইড ইফেক্ট’ মাত্র।

    ন্যুড থেরাপি, বর্তমানে একটি আকর্ষণীয় থেরাপি। বেশিরভাগ মানুষ এই ধরনের থেরাপির কথা কখনো হয়তো শোনেনি। নগ্ন থেরাপির সত্যিকারের ধারণা অর্জনের জন্য এর শিকড়ে ফিরে যেতে হবে। মনস্তাত্ত্বিক অধ্যয়নের এই ক্ষেত্রটি ১৯৩০-এর দশকে ফিরে এসেছিল। মনোবিজ্ঞানীদের গোষ্ঠীগুলি মানুষের জীবনে সামাজিক নগ্নতার প্রভাবগুলি অধ্যয়ন শুরু করেন। বিশেষ করে একজন মনোবিজ্ঞানী খুব মনোযোগ সহকারে নগ্নতা করেছিলেন। তাঁর নাম হাওয়ার্ড ওয়ারেন। এই মনোবিজ্ঞানী ১৯৩২ সালে পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি জার্মান নুডিস্ট শিবিরে কিছু সময় অতিবাহিত করেছিলেন। এই অভিজ্ঞতা অর্জনের এক বছর পর তিনি সামাজিক নগ্নতা এবং ‘দেহাবরণ’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। অবশেষে নগ্ন থেরাপির আসল অনুশীলনটি পপ আপ হতে করে। ষাটের দশকের শেষে এবং সত্তর দশকের শেষদিকে কিছু সাইকোথেরাপিস্ট নগ্ন সাইকোথেরাপি অনুশীলন করে। নগ্ন থেরাপিস্টদের মতে, নগ্ন থেরাপি মানুষের আত্মবিশ্বাস, নম্নস্তরের বাধা, অন্যের কাছে উন্মুক্ত করার একটি উন্নত ক্ষমতা এবং অন্যন্য অনেক ইতিবাচক সুবিধা ভোগ করতে সাহায্য করে।

    অবশেষে মনে হচ্ছে আমরা কি ক্রমশ আদিম যুগে ফিরে যাচ্ছি? প্রকৃতি যাকে উলঙ্গ শরীর দিয়ে জন্ম দিয়েছে তাঁকে কেন আগাপাছতলা আবরণে মুড়ে পথ চলতে হবে? তবে কি শরীরের সমস্ত পোশাক খুলে ফেলে দিয়ে নগ্ন হতে চাইছি? একসময় কি সারা পৃথিবীই ন্যুডিস্ট জোন হয়ে যাবে? ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি? আমার তো মনে হয় সেদিন বেশিদূর নয়। শুরু কিন্তু হয়ে গেছে!

    সমাপ্ত

  • লিঙ্গপুরাণ

    লিঙ্গপুরাণ

    অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book-name]

    লিঙ্গপুরাণ

    লিঙ্গ (সংস্কৃতে লিঙ্গ্‌ + অ, অথবা শিশ্ন = শশ্‌ + ন) বলতে প্রথমেই যে ছবিটা মানুষের মনে ভেসে ওঠে সেটা হল পুরুষের যৌনাঙ্গ, ইংরেজিতে যেটি PENIS বোঝায়। অপরদিকে লিঙ্গ বলতে GENDER বোঝায়। মানুষ যে শব্দের উপর ব্যক্তিত্ব আরোপ করতে চেয়েছে তার প্রমাণ ভাষায় এই ‘লিঙ্গ’-কল্পনা। পুরুষবাচক শব্দ (কিশোর, পুত্র, দেব ইত্যাদি) পুংলিঙ্গ বলে চিহ্নিত হল, আর স্ত্রীবাচক শব্দ (কিশোরী, পুত্রী, দেবী ইত্যাদি) চিহ্নিত হল স্ত্রীলিঙ্গ হিসাবে। ‘চিহ্নিত’ শব্দটি ব্যবহার করার কারণ ‘লিঙ্গ’ আর ‘চিহ্ন’ সমার্থক। কিন্তু যেসব জিনিস অচেতন, তারা সব যদি ক্লীবলিঙ্গ বলে চিহ্নিত হত, তাহলে তো কথাই ছিল না। কিন্তু এই অচেতন জিনিসগুলোর কিছু চিহ্নিত হল পুংলিঙ্গ হিসাবে, কিছু চিহ্নিত হল স্ত্রীলিঙ্গ হিসাবে।

    গর্ভের শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ বে-আইনি হলেও জন্মের পর নবজাতকের লিঙ্গ-নির্ধারণ করতে শিশুর যৌনাঙ্গের দিকেই তাকাতে হয় সকলকে এবং যৌনাঙ্গ পর্যবেক্ষণ করেই বুঝে নিতে হবে সে নারী না, পুরুষ। শুধু নবজাতকের ক্ষেত্রেই নয়, কোনো প্রাণী পুরুষ না মহিলা সেটা বুঝতে আমরা সংশ্লিষ্ট প্রাণীটির যৌনাঙ্গটিই পর্যবেক্ষণ করতে থাকি।

    লিঙ্গ: লিঙ্গ-নির্ধারণ বোঝাতে শিশ্ন (পুরুষ) অথবা যোনি (মহিলা) দুই-ই বোঝালেও লিঙ্গ আসলে পুরুষের যৌনাঙ্গকেই বোঝায়। পুরুষের যৌনতার জন্য প্রধান অঙ্গ হল তার লিঙ্গ। এটি পুরুষের প্রধান জননাঙ্গ বা যৌনাঙ্গ। এই অঙ্গটি দ্বারা পুরুষ যৌনমিলনে অংশ নেয় এবং মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি লাভ করে। লিঙ্গের দৃঢ়তার উপর নির্ভর করে পুরুষের যৌনমিলনে অংশগ্রহণের ব্যাপারটি। এই লিঙ্গের একই ছিদ্র দিয়ে বীর্য এবং মূত্র নির্গত হয়। লিঙ্গ হল পুরুষের বহিঃযৌনাঙ্গের মধ্যে অন্যতম। লিঙ্গের সামনে একটি আবরণ ত্বক থাকে (মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের এই অংশটি কেটে ফেলা হয়। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত লিখব)। ইংরেজিতে এই ত্বককে বলে ফোর স্কিন। লিঙ্গে অসংখ্য কোশকলা আছে। এগুলোর প্রভাবে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পুরুষের লিঙ্গের ভিতর সবচেয়ে পুরু কৌশিক ঝিল্লির নাম হল করপরা কে ভারনোসা।

    অণ্ডথলি : অণ্ডকোশ হল দুটো বলের মতো থলি, যেখানে শুক্র তৈরি হয়। এগুলোর স্বাভাবিক পরিমাপ হল দেড় ইঞ্চি। এগুলো লিঙ্গের নীচে ঝুলে থাকে। পুরুষের যৌন হরমোন এবং বীর্য উৎপাদনই হল অণ্ডকোশ দুটির কাজ।

    এপিডিডাইমিস; প্রতিটি অণ্ডকোশের উপরের অংশকে এপিডিডাইমিস বলে। এপিডিডাইমিস হল বীর্যের সংরক্ষণের স্থান। টিউব এবং অন্যান্য নালি বেয়ে। বীর্য এপিডিডাইমিস থেকে অণ্ডকোশে চলে আসে।

    ভাস ডিফারেন্স : প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড থেকে দুটো সেমিনাল কোশ সেমিনাল তরলের মিশ্রণ নিয়ে এপিডিডাইমিসে এসে পৌঁছোয়। এই চলাচলের নালি হল ভাস ডিফারেন্স। এটি পুরুষের অভ্যন্তরীণ যৌনাঙ্গ।

    প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড : মূত্রথলির উপরে প্রোস্টেট গ্ল্যান্ডের অবস্থান। এই গ্ল্যান্ডের প্রোস্টেট তরল উৎপাদিত হয় শতকরা ৩৮ ভাগ এবং সেমিনাল তরল উৎপাদিত হয় ৬০ ভাগ, বাকি দুই ভাগ বীর্য উৎপাদিত হয়।

    লিঙ্গের বেশ কিছু সমার্থক শব্দও আছে, যা পুরুষের যৌনাঙ্গই বোঝায়। যেমন– শিশ্ন, পুংস্তু, উপস্থ, ধোন, বাড়া, বংশদণ্ড ইত্যাদি। অপরদিকে যোনি নারীর যৌনাঙ্গকে বলে।

    স্ত্রীযোনির গঠন : স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রাইমেট বর্গের প্রাণীকূলের, স্ত্রীপ্রজনন তন্ত্রের একটি অন্যতম অঙ্গ। জরায়ুর নীচের দিকে ভালভা পর্যন্ত বিস্তৃত নালি। স্বাভাবিক অবস্থায় সামনের দিকে ৬-৬.৫ সেন্টিমিটার এবং ভিতরে দিকে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৮-১০ সেন্টিমিটার। তবে যৌন উত্তেজনা, সন্তান প্রসবের সময় এর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ প্রয়োজন অনুসারে বৃদ্ধি পায়। অসম্ভব একটি নমনীয় গুণের কারণে যৌনমিলনের সময় এবং সন্তান প্রসবের সময় প্রচুর পরিমাণে সম্প্রসারিত হতে পারে। দাঁড়ানো অবস্থায় যোনির শেষপ্রান্ত সামনে-পেছনে জরায়ুর সঙ্গে ৪৫ ডিগ্রির বেশি কোণ উৎপন্ন করে। যোনির ব্যাপ্তির বিচারে একে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এই ভাগ দুটি হল —

    অন্তস্থিত যোনি: এই অংশ বাইরে থেকে দেখা যায় না। এমনকি সজোরে প্রসারিত করলেও বাইরে থেকে এই রন্ধ্রটি স্পষ্ট দেখা যায় না। এর নমনীয় মাংশপেশি গায়ে গায়ে লেগে থাকে বলে বাইরে থেকে অবরুদ্ধ পথ মনে হয়। এর উপরে অংশ জরায়ু-মুখের সঙ্গে যুক্ত থাকে। অবস্থানের বিচারে যোনি মূত্রনালির পিছনে এবং মলদ্বারের সামনে অবস্থিত। যোনির উপরের এক-চতুর্থাংশ রেকটোউটেরিন পাউচ দ্বারা মলাধার থেকে পৃথক থাকে। যোনিদ্বারের ভিতরের অংশের রং হালকা গোলাপি। এর ভিতরের পুরোটাই মিউকাস ঝিল্লি দ্বারা গঠিত। যোনির অভ্যন্তরের তিন-চতুর্থাংশ অঞ্চল উঁচুনীচু ভাঁজে পরিপূর্ণ, এই ভাঁজকে রুগি (rugae) বলে। যোনির পিচ্ছিলতা বার্থোলিনের গ্রন্থি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই গ্রন্থি যোনির প্রবেশ মুখে এবং জরায়ু-মুখের কাছে অবস্থিত। যৌনমিলনের সময় প্রয়োজনীয় পিচ্ছিলকারক তরল ক্ষরিত করার মাধ্যমে এটি লিঙ্গের প্রবেশ জনিত ঘর্ষণ হ্রাসে ভূমিকা রাখে। এবং একই সঙ্গে যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে। প্রতি মাসে ডিম্বক্ষরণের সময় জরায়ু-মুখের মিউকাস গ্রন্থিগুলো বিভিন্ন রকম মিউকাস ক্ষরণ করে। এর ফলে যোনির নালিতে ক্ষারধর্মী অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয় এবং এটি যৌনমিলনের মাধ্যমে প্রবিষ্ট পুরুষের শুক্রাণুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। যোনিমুখ জন্মগতভাবে যোজক কলার একটি পাতলা পর্দা দিয়ে ঢাকা থাকে। এই পর্দাকে বলা হয় যোনিচ্ছদ বা সতীচ্ছদ। একসময় ধারণা ছিল পুরুষের সঙ্গে সঙ্গম ছাড়া বা কোনো অপদ্রব্য প্রবেশ ছাড়া এই পর্দা ছিঁড়ে যায় না। এই পর্দা অক্ষুণ্ণ থাকাটা সতীনারীর লক্ষণ হিসাবে বিবেচনা করা হত (আজও কোনো কোনো দেশে সতীচ্ছদ পরীক্ষা করে অক্ষত হলে অক্ষতযযানির সার্টিফিকেট দেওয়া হয়)। কিন্তু বাস্তবে নানা কারণে এই পর্দা ছিন্ন হতে পারে। ঘোড়ায় চড়া, সাইকেল চালনা, ব্যায়াম চর্চা, দৌড়ঝাঁপ ইত্যাদির কারণে এই পর্দা ছিঁড়ে যেতে পারে।

    বহিঃস্থ যোনিঃ যোনিদ্বার থেকে শুরু হয়ে যোনিনালির বাইরে বিস্তৃত অংশকে বহিঃস্থ যোনির ভিতরে ধরা হয়। এই অংশটিকে বলা হয় ভালভা (Valva) বলে। ভালভা অনেকগুলো ছোটো অংশ নিয়ে তৈরি। এই অংশগুলো হল– যোনিমণ্ডপ; মন্স পিউবিস বা যোনিমণ্ডপ নারীদেহের নিম্নাঙ্গের একটি নির্দিষ্ট এলাকা মানব অঙ্গসংস্থানবিদ্যায় এবং সাধারণ স্তন্যপায়ী প্রাণীতে পিউবিক অস্থি, পিউবিক সিমফাইসিস সংযোগের উপর মেদ কলা জমে থাকা উঁচু ঢিপির (mound) মতো অংশটিকে ‘মন্স পিউবিস’ বা ‘যোনিমণ্ডপ’ বলে। এটি লাতিন শব্দ ‘pubic mound’ থেকে এসেছে, এছাড়া এটি মন্স ভেনেরিস (mound of venus) নামেও পরিচিত। মন্স পিউবিস ভালভার উপরের অংশ গঠন করে। মন্স পিউবিসে আকার সাধারণত শরীরের হরমোন ক্ষরণ ও মেদের পরিমাণের উপর নির্ভর করে। বয়ঃসন্ধির পর এটি প্রসারিত হয়, এর উপরভাগে অংশ রোমে ঢেকে যায়, যা যৌনকেশ নামে পরিচিত। নারীদেহে এই উঁচু অংশটি মেদ কলা দিয়ে গঠিত এবং যথেষ্ট পরিমাণে বড়। যৌনমিলনের সময় এটি পিউবিক অস্থিকে রক্ষা করে।

    মানুষের মন্স পিউবিস যে কয়েকটি অংশে বিভক্ত তার নিম্নভাগে আছে বৃহদ্দোষ্ঠ, এবং অন্য পাশে হলরেখার (লাঙ্গল ফলার দাগ) মতো অংশ, যা যোনিচিরল নামে পরিচিত। ক্লেফট অফ ভেনাস যে সকল অংশ পরিবেষ্টন করে রেখেছে সেগুলো হল– নিম্নোষ্ঠ, ভগাঙ্কুর, যোনির প্রবেশদ্বার এবং ভালভাল ভেস্টিবিউলের অন্যান্য অংশ। মন্স ভেনেরিসের মেদ কলা ইস্ট্রোজেন ক্ষরণে প্রতিক্রিয়াশীল, যা বয়ঃসন্ধি শুরুর সময় একটি স্বতন্ত্র উঁচু অংশের সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে এটি লেবিয়া মেজরার সামনের অংশে, পিউবিক অস্থি থেকে সরে যায়। যোনিওষ্ঠ (Labia) দুইটি মাংসল ভাঁজ যোনিপথকে আবৃত করে রাখে। এর বড়ো ভাঁজটিকে বলা হয় বৃহদ্দোষ্ঠ (Labia majora)। বৃহদ্দোষ্ঠের ভিতরের দিকে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র মাংসল ভাঁজকে বলা হয় ক্ষুদ্রোষ্ঠ (Labia minora)। বৃহদোষ্ঠ বহিঃস্থ অংশ, রঙিন এবং চুল বিশিষ্ট এবং অন্যটি ভেতরের অংশ, যা কোমল ও সেবাসিয়াস ফলিকল সমৃদ্ধ। এই বৃহদ্দোষ্ঠের ভিতরের দিকে থাকে। ভগাঙ্কুর (Clitoris): যোনিওষ্ঠের উপরের দিকে ছোটো বোতামের মতো একটি অংশ থাকে। একে বলা হয় ভগাঙ্কুর। এই অংশটি যোনিমুখ ও মূত্রনালির প্রবেশমুখের উপরাংশে অবস্থিত। এটি যৌন মিলনকালে তৃপ্তি প্রদান করা। যেহেতু এটি একটি অভ্যন্তরীণ অঙ্গ তাই এর বর্ণ চামড়া মতো না-হয়ে ঝিল্লির মতো হয়। এটির উচ্চতা সিকি ইঞ্চি থেকে ১ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। তবে যৌন উত্তেজনা বাড়তে থাকলে এটি শক্ত ও দীর্ঘ হতে থাকে। যোনিচ্ছদ : যযানিচ্ছদ বা সতীচ্ছদ (Hymen) : এটি মিউকাস মেমব্রেন দ্বারা সৃষ্ট একটি পর্দা। এই পর্দা যা যোনির প্রবেশমুখ আংশিক বা সম্পূর্ণ আবরিত করে রাখে। ভালভাল ভেস্টিবিউল (Vulval vestibule) বা ভালভার ভেস্টিবিউল (Vulvar vestibule)। এটি লেবিয়া মাইনরার মধ্যবর্তীস্থানে অবস্থিত ভালভার একটি অংশ, যেখানে ইউরেথ্রাল ও যযানির প্রবেশমুখ উন্মুক্ত। এর প্রান্ত হার্টের লাইন দ্বারা চিহ্নিত। যোনির সম্মুখে, গ্ল্যান্স ক্লিটোরিসের ২.৫ সেন্টিমিটার ভিতরে বহিঃস্থ ইউরেথ্রাল অফিস অবস্থিত। সাধারণত এটিকে স্কিনির ডাক্টের প্রবেশমুখের নিকটে ছোটো, হালকা স্পষ্ট দাগ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। আর ভ্যাজাইনাল অরফিস হচ্ছে মূত্রনালির নীচে ও পিছনে অবস্থিত একপ্রকার মধ্যম। আকৃতিবিশিষ্ট চির; এর আকার সতীচ্ছদের আকৃতির সঙ্গে ব্যাস্তানুপাতিক হারে পরিবর্তিত হয়। বার্থোলিনের গ্রন্থি (Bartholin’s glands)। একে অনেক সময় বৃহৎ ভেসটিবিউলার গ্রন্থি (greater vestibular glands) বলা হয়। দুটি গ্রন্থি নারীর যোনির প্রবেশদ্বারের কাছে একটু নীচে ডানে ও বামে থাকে। খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকে এই গ্রন্থি দুটি সম্পর্কে প্রথম ড্যানিশ শরীরবিদ ক্যাসপার বার্থোলিন দ্য ইয়াঙ্গার (১৬৫৫-১৭৩৮) এদের বর্ণনা দেন। এই বিজ্ঞানীর নামে এই গ্রন্থদ্বয়ের নামকরণ করা হয়। গ্রাফেনবার্গ স্পট বা জি-স্পট : হচ্ছে। যোনিপথের একটি ক্ষুদ্র অংশবিশেষ। এই অংশটি মূত্রথলির নীচে অবস্থিত। এর নামকরণ করা হয়েছে জার্মান স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ আর্নেস্ট গ্রাফেনবার্গের নামানুসারে। যোনিপথের শুরু হতে ১-৩ ইঞ্চির মাঝেই এর অবস্থান। সঙ্গমকালে যোনিমুখের ১-৩ ইঞ্চির ভিতরে নারী সবচেয়ে বেশি পুলক অনুভব করে। এই অধিক সংবেদনশীল অংশকেই জি-স্পট বলা হয়।

    এ তো গেল নারী ও পুরুষের যৌনাঙ্গের বিবরণ। কিন্তু যাঁরা নারী-পুরুষ কোনো লিঙ্গেই অন্তর্ভুক্ত করা হয় না, তাঁদের যৌনাঙ্গের পরিচয় কী? হিজড়ে বা হিজড়া? যৌনাঙ্গের গঠন-বিচারে কারা হিজড়ে? হিজড়ে সাধারণত তিনরকম –(১) প্রকৃত হিজড়ে ( True Hermaphrodite), (২) অপ্রকৃত পুরুষ হিজড়ে (Male Pseudo Hermaphrodite), এবং (৩) অপ্রকৃত নারী হিজড়ে (Female Pseudo Hermaphrodite)

    (১) অপ্রকৃত হিজড়ে (Pseudo Hermaphrodite) : গর্ভে থাকাকালীন সময়ে অন্যান্য শারীরিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মতোই শিশুর যৌনাঙ্গ গঠিত হয়। যৌনাঙ্গ গঠনে ক্রোমোজোমের ভূমিকা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত ক্রোমোজোমের ত্রুটিবিচ্যুতির ফলেই জন্ম নেয় যৌন প্রতিবন্ধী শিশু। ক্রোমোজোমের ভিত্তিতে লিঙ্গ নির্ধারণের ব্যবস্থায় এই যৌন বিকলাঙ্গরা তাই হয়ে উঠে অপ্রকৃত। সাধারণত পাঁচ ধরনের অপ্রকৃত হিজড়ে দেখা যায় —

    (ক) ক্লাইনেফেলটার সিনড্রোম (Klinefelter syndrome) : ১৯৪২ সালে এইচ.এফ. ক্লাইনেফেলটার (H.F Klinefelter) নামে একজন আমেরিকান চিকিৎসক এই রোগ আবিষ্কার করেন। এই শারীরিক ত্রুটি শুধু পুরুষের ক্ষেত্রে দেখা দেয়। প্রতি ১০০০ জন পুরুষের ভিতর ১ জনের এই ত্রুটি দেখা দিতে পারে। টেস্টোস্টেরন (Testosterone) হরমোনের অভাবে এদের শারীরিক গঠনে পুরুষালি পেশির ঘাটতি দেখা দেয়। মুখে দাড়ি-গোঁফ (Facial Hair), যৌনাঙ্গে চুল (Pubic Hair) কম দেখা দেয়। বক্ষ কিছুটা উন্নত হয় ও স্ফীত স্তন দেখা দেয়। ডাক্তারি পরিভাষায় একে গাইনিকোমাস্টিয়া (Gynecomastia) বলে। তবে মাত্র ১০% পুরুষের গাইনিকোমাস্টিয়া লক্ষণযোগ্য হয়। বাকিদের গঠন স্বাভাবিক পুরুষের মতোই। এদের শুক্রাশয় স্বাভাবিকের তুলনায় ছোটো থাকে। সেখানে শুক্রাণু উৎপন্ন হয় না। এরা সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হলেও স্বাভাবিক যৌন জীবন পালন করতে পারে। এরা মানসিক জড়তায় ভোগে।

    (খ) XXY পুরুষ (XXY Male) : আপাত গঠন পুরুষের মতো। এদের যৌনাঙ্গের অস্বাভাবিকতা বয়ঃসন্ধিকালের ভিতর প্রকাশ পায়। শিশ্ন আছে। তবে মূত্রছিদ্রটি (Urethral Orifice) শিশ্নের স্বাভাবিক স্থানে থাকে না। ডাক্তারি ভাষায় একে হাইপোস্পেডিয়াস (Hypospadias) বলে। এদের অণ্ডকোশ শরীরের অভ্যন্তরে থাকে। একে বলে গুপ্ত শুক্রাশয় (Cryptorchidism)।

    (গ) XX পুরুষ (XX): XX পুরুষের সঙ্গে ক্লাইনেফেলটার সিনড্রোমের অনেক মিল আছে। প্রতি ১০,০০০০ জনের ভিতর ৪ অথবা ৫ জনের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এদের স্তন থাকে। তবে সুডৌল, স্ফীত স্তন নয়। এদের অত্যন্ত ক্ষুদ্র, ২ সেন্টিমিটারেরও ছোটো শুক্রাশয় থাকে। সেখানে শুক্রাণু (Spermatozoa) উৎপন্ন হয় না। এদের হাইপোস্পেডিয়াসের সমস্যা থাকে। এরা বেঁটে হয়।

    (ঘ) টার্নার সিনড্রোম (Turner Syndrome) : ১৯৩৮ সালে হেনরি টার্নার ডাক্তারি অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে এই ধরনের রোগের কারণ নির্ণয় করেন। প্রতি ২৫০০ মহিলাদের ভিতর একজনের এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সাধারণত একটি X ক্রোমোজোমের অনুপস্থিতি এই রোগের কারণ। আপাতদৃষ্ট মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সিনড্রোম দেখা দেয়। জন্মের প্রথম তিন বছর এদের উচ্চতা স্বাভাবিক দেখা দিলেও এরপর থেকে উচ্চতা বৃদ্ধির হার কমে যায়। যোনিকেশ (Pubic Hair) খুব কম দেখা দেয়। সাধারণত বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই মেয়েদের ডিম্বাশয় থেকে সেক্স-হরমোন ইস্ট্রোজেন (Estrogen) ও প্রোজেস্টেরন (Progesterone) নির্গত হওয়া শুরু করে। কিন্তু টার্নার সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে সেক্স-হরমোনের প্রকাশ ঘটে না। ফলে রজঃচক্র বা মাসিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। প্রশস্ত বুকে স্তন গ্রন্থির উদ্ভব হয়। গলার দু-দিকের পুরু মাংসল কাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এদের বধির হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে। এরা অস্থি সংক্রান্ত বিভিন্ন অসুবিধা ও অস্বাভাবিকতায় ভোগে। অনুন্নত ডিম্বাশয় ও গর্ভধারণে অক্ষম হলেও টার্নার সিনড্রোমে আক্রান্ত কারও কারও স্বাভাবিক যোনিপথ ও জরায়ু থাকে। কারও কারও ক্ষেত্রে গণিত শিক্ষা অথবা স্মৃতি ধারণ ক্ষমতায় ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

    (ঙ) মিশ্র যৌন গ্রন্থির বিকৃতি (Mixed Gonadal Dysgebesis-MGD) : গোনাড হল দেহের সেক্স অর্গান। পুরুষের থাকে শুক্রাশয় আর নারীর থাকে ডিম্বাশয়। MGD সিনড্রোম-ধারীদের আপাতদৃষ্টিতে পুরুষ বলে মনে হয়। শুক্রাশয় থাকে তবে একটি। এর গঠন জটিল আকারের। প্রতিটা শুক্রাশয়ে ৪০০-৬০০টির মতো শুক্রোৎপাদক নালিকা (Seminiferous Tube) থাকে। এর ৫টি স্তর- স্পার্টাগোনিয়া (Spermatogonia), প্রাথমিক স্পার্টোসাইট (Primary Spermatocyte), carica MATTICOATET (Secondary Spermatocyte), স্পার্মাটিড (Spernatid) ও স্পার্মাটোজোয়া (Sprematozoa)। এই পাঁচটি পর্যায়ের মধ্য দিয়েই শুক্রাণু তৈরি হয়। কিন্তু এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উল্লিখিত ৫টি পর্যায়ে বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে শুক্রাণু গঠন হয় না। শিশ্ন থাকা সত্ত্বেও এদের শরীরে যোনি (Vagina), জরায়ু (Uterus) ও দুটি ফেলোপিয়ান নালির (Fallopian Tube) অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। বিকৃত যৌনগ্রন্থির উপস্থিতির ফলে এদের জননকোশের উৎপত্তি স্থানে গোনাডাল টিউমার (Gonadoblastoma) দেখা দিতে পারে। ২৫% MGD আক্রান্ত ব্যক্তিদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

    (২) প্রকৃত হিজড়ে (True Hermaphroditism) : এদের শরীরে শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয় উভয়ই অবস্থান নেয়। এরা অধিকাংশই পেশিবহুল শরীরের অধিকারী থাকে। শিশ্ন থাকে। অল্প হলেও কারও কারও শিশ্নের পরিবর্তে যোনি থাকে। এবং ভগাঙ্কুর (Clitoris) স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটা বড়ো থাকে। অনেক সময় তা পুরুষ শিশ্নের মতো হয়ে থাকে। এদের মূত্রনালি ও যোনিপথ একসঙ্গে থাকে। একে বলে ইউরোজেনিটাল সাইনাস (Urogenital Sinus)। ফেলোপিয়ান নালি (Fallopian Tube) ও জরায়ু (Uterus) থাকে। জরায়ু অত্যন্ত ছোটো হয়। চিকিৎসার ভাষায় একে বলে হাইপোপ্লাস্টিক বা ইউনিকরনেট (Hypoplastic or Unicornuate)। কৈশোরে স্তন গ্রন্থির প্রকাশ ঘটে ও রজঃচক্র (Menstruation Cycle) শুরু হয়। যাদের বাহ্যিক জননাঙ্গ পুরুষের মতো অর্থাৎ শিশ্ন আছে তাদেরও রজঃচক্র হয়ে থাকে। একে বলে সাইক্লিক হেমাচুরিয়া (Cyckic Hematuria)। এ ধরনের রজঃচক্রের সময় শুক্রাশয়ে ব্যথা হয়।

    কৃত্রিম হিজড়ে বা খোঁজাকরণ হিজড়ে : খোঁজাকরণ বা লিঙ্গ কর্তনের মতো ভয়ংকর আইন-বিরুদ্ধ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড হিজড়ে সম্প্রদায়ের সঙ্গী। অনেকেই হিজড়ে কমিউনিটিতে যোগদানকালে নিজের শিশ্ন স্বেচ্ছায় কর্তন করে। কেউ করতে না-চাইলে তাকে জোর করা হয়। এছাড়া সুশ্রী দেখতে বালকদের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে এনে এদের শিশ্ন ও অণ্ডকোশ কেটে এদের খোঁজা করে দেওয়ার অভিযোগ আছে। এরপর হিজড়ে বানিয়ে যৌন-ব্যবসায় নামানো হয়। লিঙ্গ অপসারণ ব্যয়বহুল ও অনৈতিক হওয়ার কারণে হাতুড়ে ডাক্তারের সাহায্যে এই কর্তনকর্ম সম্পন্ন করে লিঙ্গ-কবন্ধ হয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর রক্তপাতও ঘটে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে মারা যায় সবার অলক্ষ্যেই।

    বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন খতনা হল ইসলাম ধর্মসম্প্রদায়ের মুসলমানি একটি অনুষ্ঠান। কিন্তু এই অনুষ্ঠান শুধু মুসলিম ধর্মেই নয়, অন্য বেশকিছু প্রধান ধর্মেও করা হয়। সিমেটিক ধর্মসম্প্রদায়গুলির মধ্যে এই প্রথা বিদ্যমান। যেসব সম্প্রদায়ের মানুষরা মনে করেন শুধুমাত্র মুসলমানদেরই লিঙ্গ কাটা বা লিঙ্গের অগ্ৰত্বক কাটা, তাদের বলি শুধু মুসলমান নয়, সমগ্র খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে এটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত। তবে গুলিয়ে ফেলবেন না, এই লিঙ্গকর্তন কিন্তু খোঁজাকরণ নয় –এটা হল লিঙ্গের অগ্ৰত্বক ছেদন। লিঙ্গের অগ্ৰত্বক কর্তন করে বা সার্জারির মাধ্যমে অপসারণ করাকে খতনা বলা হয়। নানা কারণে ভিতর ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই খতনা করা হয়ে থাকে। আর-একটু গুছিয়ে বললে যা দাঁড়ায় তা হল, পুরুষদের খতনা বলতে পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগের ত্বক লিঙ্গমুণ্ড পর্যন্ত কেটে ফেলাকে বোঝায়। এর ফলে লিঙ্গমুণ্ড আজীবন অনাবৃত হয়ে পড়ে। মনে করা হয়, বিশ্বাসীদের আদি পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আমলে খতনা প্রথার শুরু। মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টীয় ধর্মবিশ্বাস মতে, আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-কে খতনা করার নির্দেশ দেন। ওই সময় তার বয়স ছিল ৯৯ বছর। এ বয়সে তিনি ঐশী নির্দেশে নিজের খতনা দেন। প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে খতনা দেওয়া হয় ১৩ বছর বয়সে। হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর উত্তর পুরুষ হজরত মুসা (আ.)-এর অনুসারী ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যেও খতনা প্রথার প্রচলন ছিল। হজরত ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন ইহুদি পরিবারে। জন্মের আট দিন পর তারও খতনা করা হয়। এটি একটি ধর্মীয় প্রয়োজনীয়তা হিসাবে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মধ্যে স্বীকৃত বিষয়। অনেক পুরুষের ধারণা খতনা করা হলে লিঙ্গের স্পর্শকাতরতা বেড়ে যায়। এতে করে যৌনমিলনে অধিক আনন্দ লাভ সম্ভব হতে পারে, তবে মাস্টার এবং জনসন মনে করেন খতনা পুরুষের জন্য অধিক যৌন আনন্দ নিশ্চিত করে এই ধারণাটি ভুল। খতনা করা না-হলেও যৌনমিলনে পুরুষ যথেষ্টই অংশ নিতে পারে এবং যৌন আনন্দ লাভ করে। তবে খতনার প্রধান সুবিধাটা হচ্ছে এর ফলে লিঙ্গের অগ্ৰত্বকে যে অবাঞ্ছিত দুর্গন্ধযুক্ত তরল জমে নোংরা অবস্থার সৃষ্টি করে তা থেকে লিঙ্গ রেহাই পেতে পারে। এই অবাঞ্ছিত দুর্গন্ধযুক্ত তরল জমাট বেঁধে লেগমার তৈরি করে। নানা রকম ইনফেকশন হতে পারে। যৌনজীবন বিব্রতকর হতে পারে। ডাক্তারি মতে খতনার ফলে পুরুষের লিঙ্গ পরিচ্ছন্ন থাকে বেশি। যাঁরা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন তাঁদের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই, খতনারও প্রয়োজন হয় না। তবে বর্তমান যুগে যেহেতু ওরাল সেক্স বা শকিং করার প্রবণতা বেড়েছে, সেই কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই যুবক-যুবতীদের মধ্যে যৌনাঙ্গের স্বাস্থ্য ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার প্রবণতা বেড়েছে।

    সেকালে খতনা করা হত হাতুড়ে দিয়ে। সময় বদলেছে। হাইজেনিকের প্রশ্নে আর কোনো আপস নয়। শিক্ষিত, অভিজ্ঞ এবং পেশাদার শল্য চিকিৎসকদের দিয়ে খতনা করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রয়োজন হলেই হবে না, খরচ অনেক। ১০-১৫ হাজারের নীচে নয়। গরিবদের পক্ষে এই খরচ করে মুসলমানি অনুষ্ঠান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এই অসুবিধা দূর করার জন্য বহু জায়গায় ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কেউ হাজার হাজার টাকা খরচ করে মুসলমানির অনুষ্ঠান করে, আর কেউ বয়স পেরিয়ে গেলেও টাকার জন্যে খতনা করাতে পারে না। অতএব এইসব ফাউন্ডেশনগুলি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খতনা করিয়ে থাকে। খতনার পর প্রত্যেককে ১টি করে লুঙ্গি, গামছা এবং ক্ষত শুকানোর জন্যে ফুল কোর্স অ্যান্টিবায়োটিক, পেইনকিলার ও ভিটামিন-সি ট্যাবলেট দেওয়া হয়।

    মূলত খতনা প্রথার উদ্ভব হয় ইহুদি সমাজে। ইহুদিরা এটিকে অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসাবেই মনে করে। খ্রিস্টীয় বিধানে বাধ্যবাধকতা তেমন না থাকলেও এ ধর্মের সূতিকাগার প্যালেস্টাইন ও আরব খ্রিস্টানদের মধ্যে খতনা প্রথার প্রচলন আছে। মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে খতনাকে অবশ্য কর্তব্য বলে ধরা হয়। সাধারণের ভাষায় যা ‘মুসলমানি’ হিসাবে পরিচিত। অনেকেরই ধারণা খতনা না-দিলে মুসলমানিত্ব প্রাপ্ত হয় না। খতনার সঙ্গে মুসলমানিত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে অবশ্য পালনীয় কর্তব্যগুলোকে ‘ফরজ’ বলে অভিহিত করা হয়। সে অর্থে খতনা ‘ফরজ’ নয়। অর্থাৎ এটি পালন না-করলে ধর্মচ্যুতি বা গুণাহর কোনো আশঙ্কা নেই। খতনা মুসলমানদের জন্য একটি অনুসরণীয় স্বাস্থ্যবিধি। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, মহানবি হজরত মোহাম্মদ নিজে খতনা করেছেন। অন্যদেরও খতনা করতে উৎসাহিত করেছেন। যে কারণে মুসলিম সমাজে পুরুষদের ত্বকচ্ছেদকে সুন্নতে খতনা হিসাবে অভিহিত করা হয়। মহানবি যেসব অনুশাসন বা নিয়ম পালন করতেন সেগুলোকেই বলা হয়। সুন্নত। ইসলামের দৃষ্টিতে সুন্নত পালন করা উত্তম। এর মাধ্যমে মহানবির জীবনাদর্শকে অনুসরণ করা হয়। সে হিসাবে এটি একটি পুণ্যের কাজ।

    শুধু পুরুষদেরই খতনা করা হয়, তা কিন্তু নয়। কোথাও কোথাও মেয়েদেরও খতনা করা হয়। মেয়েরা যেন যৌনসুখ উপভোগ করতে না পারে বা সতীত্ব রক্ষার নামে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নারীদের যৌনাঙ্গচ্ছেদ বা এফজিএম করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক হিসেব অনুযায়ী, ওই দুই মহাদেশের ২৯টি দেশের প্রায় ১২০ থেকে ১৪০ মিলিয়ন নারী অমানবিক এই ঘটনার শিকার হয়েছেন। ইউনিসেফের মতে, মেয়েদের যৌনাঙ্গচ্ছেদের কারণে তাঁদের শরীরে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি নানান সমস্যা দেখা দেয়। বিশ্বে কমপক্ষে ১৫ কোটি নারী খতনা প্রথার মতো বর্বরতার শিকার। সুপার মডেল ওয়ারিস দিরির মতে, আফ্রিকায় এখনও কুমারী মেয়েদের খতনা দেওয়া হয়। নারীর জৈবিক চাহিদা কমাতে এ প্রথা চালু হয়েছিল। এ ধারাটি শুধু আফ্রিকাতে নয়, ইউরোপ ও আমেরিকার মতো সভ্য সমাজেও প্রচলিত। সুদানের বিতর্কিত লেখিকা কোলা বুফ তার আত্মজীবনীমূলক বই ‘Diary of a Lost Girl’-এ খতনা প্রথার বীভৎসতার চিত্র তুলে ধরেছেন। নারীবাদী এই লেখিকার বিভিন্ন বিষয়ের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যে কারও দ্বিমত থাকতে পারে। কিন্তু খতনা প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভের প্রতি মনুষ্য চেতনাসম্পন্ন যে কেউ সহানুভূতিশীল হতে বাধ্য। সুদানের এই জনপ্রিয় লেখিকাকেও তাঁর কিশোরী বয়সে খতনা প্রথার শিকার হতে হয়েছিল। আফ্রিকা ও আরব দেশগুলোর নারীরাই খতনা প্রথা শিকার।

    ধর্মীয় প্রথা শুধু নয়, আধুনিক বিজ্ঞানও পুরুষদের খতনার পক্ষে। কারণ কারোর মতে এটি স্বাস্থ্যসম্মত। যে কারণে ধর্মীয় দিক থেকে যাঁরা খতনা প্রথায় অভ্যস্ত নন, তারাও অনেক সময় স্বাস্থ্যগত কারণে খতনা করান। পুরুষদের খতনা চালুর পিছনে ঐশী নির্দেশের কথা বলা হলেও মেয়েদের খতনা কীভাবে চালু হল তার কোনো প্রামাণিক দলিল নেই। তওরাত, জবুর, ইঞ্জিল, কোরান অর্থাৎ সেমেটিক ধর্মাবলম্বীদের কাছে ধর্মগ্রন্থগুলোতে এ সম্পর্কিত কোনো নির্দেশনা নেই। পুরুষের খতনাকে আধুনিক বিজ্ঞানও স্বাস্থ্যসম্মত মনে করে। নারীর খতনা ঠিক এর বিপরীত। ইসলামে মেয়েদের খতনার নির্দেশনা না থাকলেও ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত আরব সমাজে এ কুপ্রথা ব্যাপকভাবে চালু ছিল। সেন্ট জন ফিলবির লেখা ‘Empty Quarter’ বইয়ে আরব মেয়েদের খতনা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়। এর মাধ্যমে বহির্বিশ্বের মানুষ জানতে পারে এ কুপ্রথা সম্পর্কে। সেন্ট জন ফিলবি ১৯৩০ সালে দীর্ঘদিন অবস্থান করার ফলে তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোকজনের সঙ্গে মেশার সুযোগ পান। সৌদি আরবে সউদ পরিবার ক্ষমতায় আসার পর মেয়েদের খতনা নিষিদ্ধ করে। তারপরও বিভিন্ন আরব গোত্রে এ প্রথা দীর্ঘদিন চালু ছিল। এমনকি বেদুইনদের কোনো কোনো গোত্রের মধ্যে এখনও মেয়েদের খতনা চালু রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। “Empty Quarter’ বইয়ে সেন্ট জন ফিলবি সৌদি আরবের মুনাসির বেদুইন গোত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। এ গোত্রের মেয়েরা বিয়ের উপযুক্ত হলে তাদের খতনা করানো হয়। বিয়ের এক বা দুই মাস আগে আয়োজন করা হত তাদের খতনার অনুষ্ঠান। কাহতান, মুররা, বনি হাজির, আজমান ইত্যাদি গোত্রের মেয়েদের খতনা করানো হত জন্মের পরপরই। তাঁবুর মধ্যে খতনা সম্পন্ন করা হত। বিশেষজ্ঞ মহিলা হাজামরা ক্ষুর, কাঁচি এবং সুচ সুতোর সাহায্যে খতনা করত।

    বাংলাদেশ-পাকিস্তান সহ উপমহাদেশের কোথাও মেয়েদের খতনা প্রথা চালু নেই। এসব দেশে অপরিচিত হলেও দুনিয়ার বহু দেশে বিশেষত আফ্রিকা ও আরব দেশগুলোতে মেয়েদের খতনা প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এ প্রথাটি ইতোমধ্যে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও নারী অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য একটি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমন মেয়েদের সেই খতনা? জানা থাকলে ভালো, না-জানলে জেনে নিন। আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চল এবং কোনো কোনো আরব দেশে মেয়েদের যে খতনা প্রথা চালু আছে তাতে ভগাঙ্কুরের বর্ধিত অংশটুকু কেটে ফেলা হয়। পুরুষ ও নারীর খতনার মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। পুরুষদের পুরুষাঙ্গের ত্বকের যে অংশটি কেটে ফেলা হয় তা তেমন স্পর্শকাতর নয়। বরং এটি অনেক সময় স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হয়েও দেখা দেয়। মেয়েদের ভগাঙ্কুর শরীরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্থান নারী তাঁর চরম যৌনানন্দ লাভ করে এই অঙ্গের মধ্য দিয়েই। এটি কেটে ফেললে নারীর যৌনানন্দ চিরকালের মতো শেষ, শুধু সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হয়ে যাবে। ভগাঙ্কুর কেটে ফেললে রক্ত বন্ধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তীব্র যন্ত্রণাদায়ক তো বটেই। বিশ্বে প্রতি বছর কোটি কোটি পুরুষের খতনা হলেও জীবনহানির ঘটনা প্রায় শূন্য। ভোগান্তির পরিমাণও একেবারে কম। পক্ষান্তরে মেয়েদের খতনার জন্য জীবনহানির ঘটনা অহরহ ঘটছে। ভগাঙ্কুরে সৃষ্ট ক্ষতের কারণে দীর্ঘস্থায়ী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকারও হয় হাজার হাজার নারী, নারীশিশু। স্পষ্টভাবে বলা যায়, মেয়েদের খতনা একটি বর্বর প্রথা। নারীবাদিরা কি ঘুমিয়ে আছেন? বন্ধ করুন নারীখতনা!

    কুসংস্কারের বশে খতনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন সব পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়। তা একদিকে যেমন যন্ত্রণাদায়ক, অন্যদিকে স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিও বটে। গত শতাব্দীর শেষ দিকে আফ্রিকার সিয়েরা লিয়নে এমন ধরনের এক গণখতনার ঘটনা ঘটে। ঘটা করে একটা গোত্রের সব কুমারী মেয়ের ভগাঙ্কুরের অংশবিশেষ কেটে ফেলা হয়। যার সংখ্যা ছিল ৬০০। খতনায় যৌনাঙ্গে ক্ষত সৃষ্টি হওয়ায় তাদের অন্তত ১০ জনের জীবন হুমকির সম্মুখীন হয়। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এ প্রথার বিরুদ্ধে শত নিন্দা জানালেও অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। ভাবুন, সিয়েরা লিয়নে মেয়েদের খতনা রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধ। আবার কৃষ্ণ আফ্রিকা অর্থাৎ এ মহাদেশের যে অংশটি মাত্র দু-এক শতাব্দী আগেও সভ্য বিশ্ব থেকে দূরে ছিল তাদের মধ্যে এ কুসংস্কার টিকে থাকার বিষয়টি হয়তো ক্ষমা করা যায়। কিন্তু যে দেশটি বিশ্ব সভ্যতার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত আফ্রিকার সেই মিশরেও মেয়েদের খতনা বর্বরতার যুগকে এখনও লালন করে আসছে। যদিও মিশরে আইনগতভাবে এ প্রথা নিষিদ্ধ। এটিকে নিরুৎসাহিত করতে প্রচার-প্রচারণারও অভাব নেই। তা সত্ত্বেও মিশরীয় সমাজে প্রতিবছর হাজার হাজার মেয়েকে খতনা দেওয়া হয়। মেয়েদের খতনার জন্য পুরুষশাসিত সমাজের কুৎসিত ধারণাই সম্ভবত বেশি দায়ী। মনে করা হয়, খতনা দেওয়া হলে মেয়েদের স্পর্শকাতরতা হ্রাস পাবে। এক্ষেত্রে পুরুষদের আধিপত্য বজায় থাকবে। অন্ততপক্ষে যৌনতার কারণে কোনো পুরুষের সঙ্গে যৌনমিলন ঘটাবে না। ফলে একটা যৌনবিশুদ্ধ নারী কোনো এক পুরুষের মালিকানাধীন থাকবে। এই মানসিকতার জন্যই যুগ যুগ ধরে কুপ্রথাটি টিকে আছে। যদিও ফ্রান্সে মেয়েদের খতনা মারাত্মক অপরাধ হিসাবে বিবেচিত। এ জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু তারপরও সে দেশের সরকার আফ্রিকীয় প্রবাসীদের খতনা প্রথা নিরুৎসাহিত করতে পারেনি।

    হিন্দুদের ক্ষেত্রে ফাইমোসিসের কারণেও লিঙ্গের অগ্ৰত্বক ছেদন করতে হয় কখনো-কখনো। ফাইমোসিস (Phimosis) : পুরুষাঙ্গের সম্মুখে ঝুলতে থাকা বাড়তি চামড়াটুকু (Prepuceal skin) অনেক সময় লিঙ্গের শীর্ষদেশের (Glans penis) সঙ্গে আটকে গিয়ে যে সমস্যা করে তার নামই ফাইমোসিস। বিশেষ করে ছোট্ট ছেলেদের বাবা-মা অনেক সময়ই এই নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় ভোগেন। প্রচলিত ভাষায় একে বলা হয় লিঙ্গ না ফোঁটা। মনে রাখতে হবে শিশুর ৬ বছর বয়স পর্যন্ত পুরুষাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্কদের মতো না-ও ফুটে উঠতে পারে। তাই এ নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই, তবে প্রস্রাব করার সময় যদি ওই বাড়তি চামড়া সহ লিঙ্গের শীর্ষ ফুলে উঠে বা চামড়া ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয় কিংবা শিশুর মূত্রত্যাগে কষ্ট হয়। তবে ধরে নিতে হবে সেটা স্বাভাবিক নয়। বড়োদের ও ফাইমোসিস হয়ে থাকে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ব্যালানাইটিস (Balanitis) রোগের কারণে হয়ে থাকে। বড়োদের এমনটি হলে লিঙ্গ নিয়মিত পরিষ্কার করা সম্ভব হয়না এবং তা থেকে অনেক সময় পুরুষাঙ্গের ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদের যৌনজীবনও বরবাদ হয়ে যেতে পারে। ছোটো অথবা বড়ো যারই ফাইমোসিস হোক-না-কেন, এর একমাত্র চিকিৎসা হল পুরুষাঙ্গের বাড়তি চামড়াটুকু ফেলে দেওয়া। আন্তর্জাতিক এইডস সম্মেলনে ফরাসি গবেষক কেভিন জাঁ বলেন, “(খতনা করার ফলে এইডসের ঝুঁকি হ্রাসের মাত্রা বেশ কম মনে হলেও শুরু হিসাবে এটা কিন্তু কম নয়।” বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস বা (এইচআইভি)-র সংক্রমণ কমানোর লক্ষ্যে পুরুষদের খতনাকে উৎসাহিত করে আসছে। ইসলাম এবং ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এমনিতেই খতনার চল রয়েছে। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মাঝেও পুরুষদের খতনার হার বাড়ছে। এইডস সম্মেলনে প্রকাশ করা নিবন্ধ অনুযায়ী খতনা করলে পুরুষের এইচআইভি সংক্রমণের আশঙ্কা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ কমে। অন্যদিকে নারীর কমে শতকরা ১৫ ভাগ।

    কয়েক মাস আগে জার্মানে একটি চার বছরের ছেলের খতনা করানো নিয়ে এই বিতর্কের শুরু। খতনার সময় চিকিৎসকের ভুলে ওই বাচ্চার পুরুষাঙ্গ থেকে অতিরিক্ত রক্তপাত হলে, তা কোলন শহরের আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আর আদালত রায় দেয়, বাচ্চার ধর্মীয় অধিকার রয়েছে, কিন্তু সেটা তার নিজের শরীরের অধিকারের চেয়ে বেশি নয়। অর্থাৎ বাবা-মার ইচ্ছায় এখন থেকে খতনা করা বন্ধ। আর যদি করাতেই হয়, তাহলে ছেলে বড়ো হলে তার মতামত নিয়ে সেটা করতে হবে। তারপর থেকে এই নিয়ে বিতর্ক চলছে, থামছে না। কারণ কেবল মুসলমান নয়, ইহুদিদের ধর্মীয় আচারের একটি অংশ হচ্ছে এই খতনা। এই রায় নিয়ে পরবর্তীতে শুরু হয় বিতর্ক। কেন-না জার্মানে প্রায় চল্লিশ লক্ষ মুসলমানের বাস। এ ছাড়া রয়েছে প্রায় এক লক্ষ কুড়ি হাজার নিবন্ধনকৃত ইহুদি। মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদিদের মধ্যেও খতনা বিষয়টি প্রচলিত।

    এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন ধর্মীয় নেতা, রাজনীতিক এমনিক গবেষকরা পর্যন্ত। কেউ আদালতের রায়কে বাচ্চার অধিকারের সংরক্ষণ হিসাবে দেখছেন, অনেকে আবার এটিকে ধর্মে আদালতের অহেতুক হস্তক্ষেপ হিসাবে মূল্যায়ন করছেন। এই যেমন ইহুদি নেতা পিনশাস গোল্ডস্মিথ। ইউরোপের রাব্বিদের এই নেতা কোলনের আদালতের রায়ের তীব্র সমালোচনা করে বললেন, “যদি এই রায়কে সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করে এবং এটিকে আইন হিসাবে গ্রহণ করা হয় তাহলে তার অর্থ হচ্ছে জার্মান সমাজের একটি বড় অংশের কোনো ভবিষ্যত এই দেশে নেই” জার্মানির ধর্মনিরপেক্ষ সমাজে রাষ্ট্রীয় কোনো কর্মকাণ্ডে ধর্মীয় প্রভাব গ্রহণ করা হয় না। অন্যদিকে ব্যক্তিগত আচার-অনুষ্ঠানেও রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। তাই খতনার মতো ধর্মীয় আচারকে কেবল ধর্মীয় বিষয় নয়, বাচ্চার শারীরিক অধিকার হিসাবেও অনেকে দেখতে চান। যেমন জার্মান সংসদের নিম্নকক্ষ বুন্ডেসটাগে সবুজ দলের নেত্রী রেনাটে কুনাস্ট বললেন, “আমি চাই জার্মানিতে ইহুদি ও মুসলমানরা যাতে তাদের ধর্মকানুন মেনে চলতে পারে। আবার অন্যদিকে নিজের শরীরের উপর শিশুর যে অধিকার আছে, সেটার প্রতিও আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। এটা কোনো সহজ বিষয় নয়। এবং এই নিয়ে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও যাবে না।”

    তবে আর-এক রাজনীতিক ফোল্কা বেক কিন্তু ভিন্নমত জানালেন। ধর্মীয় সব বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে মত জানিয়ে তাঁর বক্তব্য, “একটি উদার সমাজে রাষ্ট্র কখনো ধর্মীয় সংস্কারের দায়িত্ব তুলে নিতে পারে না, বরং ধর্মীয় সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য এমন একটি উপায় খুঁজে বের করতে পারে।”

    কোলনের আদালতের এই রায় নিয়ে গত জুলাই মাসে জার্মানের সংসদ সদস্যরা একটি খসড়া প্রস্তাব সংসদে তোলেন। এতে খতনার ধর্মীয় অধিকার বহাল রাখার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। তবে অনেকেই আছেন যারা আদালতের রায়কে শ্রদ্ধা করছেন এবং তা মেনে নিয়েছেন। তাদের একজন মেহমেত কিলিশ। জার্মান সংসদের এই মুসলিম সদস্য আদালতের রায় অনুসারে ছেলের খতনা করানো থেকে বিরত থাকছেন। তাঁর কথায়, “এই রায় এলে হয়তো এই গ্রীষ্মেই আমি আমার ১ এবং ৮ বছরের দুই ছেলের খতনা করিয়ে ফেলতাম। এই রায়ের পর আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। এবং এরপর আমরা খতনা না-করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটা আমরা আমাদের সন্তানের সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দিয়েছি। আমরা মনে করি, এটা বাচ্চাদের মতামত নিয়ে করাই ভালো হবে।”

    এরপরও কিন্তু বিতর্ক থামছে না। আদালতের এই রায় মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ কি না, আর সেটা হয়ে থাকলে তা কতটুকু নৈতিক, সেই বিতর্ক এখন আবার শুরু হয়েছে। সমস্যাটি নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন জার্মানির নৈতিকতা পরামর্শ কেন্দ্র। এখানকার একমাত্র মুসলিম সদস্য ইলহান ইলিচ এ প্রসঙ্গে বলেছেন– “নৈতিক দিক থেকে আমি মনে করি যে, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সবকিছুই আইনগতভাবে পরিচালিত হওয়ার দরকার নেই। তবে এখন বিতর্ক যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে আমার সন্দেহ যে আইন–করে বিষয়টির সুরাহা করা আদৌ সম্ভব কি না।”

    ভাবা যায়? শুধুমাত্র লিঙ্গকে কেন্দ্র করেই বাঙালি দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। বাংলা ভাষা দুটি ভিন্ন রূপ পেল– ইসলামাশ্রয়ী মুসলমানি বাংলা আর সংস্কৃতাশ্রয়ী হিন্দু বাংলা। খিলজিরা বাঙালিদের একটি পুরুষাঙ্গের খানিকটা চামড়া কেটে দিয়ে বলল যে তোমরা মুসলমান হয়ে গিয়েছ। তাদের বিশেষ কাজে তেমন। কোনো সমস্যা না-হওয়ায় বাঙালিরা এটাকে কিছু মনে করল না। কার লিঙ্গ ‘কাটা’ আর কারটা ‘আকাটা’ তা তাদের মধ্যে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারল না। “সুন্নতে খতনা’ নামক এ কাজটির মাধ্যমে বাঙালিদের আর-একটি পরিচয় হল বটে, কিন্তু বাঙালি বুঝতে পারল না যে তারা দু-ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এরপর ইংরেজ শাসকরা বুঝতে পারল এই ‘কাটা’ আর ‘আকাটা’-দের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে পারলেই তাদের ঔপনিবেশিক শাসন অনেক সহজ হয়। জনশ্রুতি আছে, ইংরেজরা একদিন দু-দলকে ডেকে ন্যাংটো করে সামনাসামনি দাঁড় করাল। তারপর দেখাল যে “তোমাদের দু-দলের লিঙ্গ একরকম নয়, তোমাদের একদলেরটা কাটা’ এবং অন্য দলেরটা ‘আকাটা। সুতরাং, তোমরা কখনোই এক নও”। তারপর ‘আকাটা’ দলের লিঙ্গে কিছু বিছুটি পাতার গুড়ো দেওয়া হল এবং ‘কাটা’-দের লিঙ্গে মেখে দেওয়া হল কিছু মরিচের গুড়ো। তারপর তাদের জিজ্ঞেস করা হল, “তোমাদের কেমন অনুভূত হচ্ছে?” একদল বলল চুলকানির কথা, অন্য দল বলল জ্বলুনি-পুড়নির কথা। তারপর তাদের বোঝানো হল, “দেখো, তোমাদের চুলকায় আর ওদের জ্বলে পুড়ে যায়। তার মানে এখানেও তোমরা ভিন্ন”। এবার ইংরেজরা ‘কাটা’-দেরকে বোঝাল যে তোমাদের দেশটারও ‘সুন্নতে খতনা করা দরকার। ১৯০৫ সালে ‘বাঙালিত্ব’-এর সুন্নতে খতনা করা হল। একেবারে মাঝখান থেকে কেটে। গোড়ার অংশটা পশ্চিমবঙ্গ, আগার অংশটা পূর্ববঙ্গ। তবে ১৯১১ সালেই কিছু বিশেষজ্ঞ সার্জন (কার্জন?) দ্বিখণ্ডিত বাঙালিত্বকে আবার সেলাই করে জুড়ে দিলেন। তবে বাঙালি এবার দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমান। ১৯৪৭ সালে এসে বাঙালিত্বকে দ্বিখণ্ডিত করে পুনরায় সুন্নতে খতনা করা হল। চেষ্টা করা হল বাঙালির সঙ্গে একেবারেই জাত-গোষ্টি-সমাজ সংস্কৃতিতে ভিন্ন আর-একজন ‘কাটা’-র সঙ্গে জুড়ে দিতে। যেহেতু ভিন্ন জাত গোষ্ঠীর অঙ্গটি বাঙালিদের মতো অর্ধেক কাটা ছিল না, তাই ওটাকে সেলাই করে সংযুক্ত করে দেয়া গেল না; কোনোরকমে সুতো দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হল। বাঙালির প্রাণের ধর্ম ‘বাঙালিত্ব’ এবার আর-একজনের কাটা অঙ্গের সঙ্গে ঝুলে রইল। পাকিস্তানিরা এবার ঝুলে থাকা অর্ধেক বাঙালিত্বর পুনরায় সুন্নতে খতনা করার প্রস্তুতি নিল। বাংলা ভাষাকে বিলুপ্ত করে দিয়ে বাঙালি মুসলমানদের খাঁটি মুসলমান বানানোর পায়তারা করল। সে তো আর-এক গল্প!

    রক্তমাংসের লিঙ্গের তো অনেকটা করা গেল, কিন্তু কৃত্রিম লিঙ্গের আলোচনা না করলে এ প্রবন্ধ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কৃত্রিম লিঙ্গ বা ডিলডো পুংজননেন্দ্রিয় সদৃশ এক ধরনের যৌনখেলনা। বিশেষ করে হস্তমৈথুনের বা এধরনের বিকল্প রতিক্রীড়ার সময় অথবা সঙ্গীর সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার সময় শারীরিক অনুপ্রবেশের উদ্দেশ্যে কৃত্রিম লিঙ্গ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কৃত্রিম লিঙ্গ আকৃতি আকার এবং সামগ্রিক চেহারার দিক দিয়ে দেখতে উলম্ব বা উত্থিত পুরুষ শিশ্নের মতো। এর প্রসারিত বর্ণনা সংযুক্ত রয়েছে ভাইব্রেটর সামগ্রীতে। এই ধরনের লিঙ্গাকৃতির সরঞ্জাম যোনিপথে অনুপ্রবেশের জন্যে ব্যবহৃত হয়, যা মানসিকভাবে পুরুষ-লিঙ্গের মতো ব্যবহার করা যায়। যে সমস্ত পুরুষ ও মহিলারা অ্যানাল সেক্স পছন্দ করেন তাঁরা অনেকে পায়ূপথে অনুপ্রবেশের জন্যেও এটা ব্যবহার করে থাকে। কৃত্রিম লিঙ্গ সব লিঙ্গের মানুষের দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এটা মূলত হস্তমৈথুন এবং অন্যান্য যৌন কার্যকলাপের নিরাপদ বিকল্প উপায়মাত্র। কৃত্রিম লিঙ্গের বস্তুকাম মূল্য আছে। তবে কিছু ব্যবহারকারী অন্য উপায়েও এটি ব্যবহার করে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ পূর্বরাগের সময় চামড়ার উপর চালনা করা। উপযুক্ত আকারের হলে, কৃত্রিম মুখমেহনের জন্য মৌখিক অনুপ্রবেশ কাজেও এর ব্যবহার হয়ে থাকে। কোনো কোনো ব্যক্তি কৃত্রিম লিঙ্গ বিশেষভাবে জি-স্পট উদ্দীপিত করার কাজে ব্যবহার করে।

    কৃত্রিম লিঙ্গ বস্তুত ফাঁপা ধরনের। পুরুষ তার লিঙ্গ এই কৃত্রিম লিঙ্গের ভিতর পুরে নিয়ে নারীর সঙ্গে সঙ্গমে রত হতে পারে। যে সকল পুরুষের লিঙ্গোত্থান সমস্যা আছে তারা এই খেলনা ব্যবহার করে থাকে। এই ডিলডো নামক যন্ত্রটি কোমরে শক্ত করে বাঁধার জন্য চামড়ার স্ট্যাপ থাকে যার কারণে এর নাম স্ট্র্যাপ অন ডিলডো। অন্যদিকে নারী সমকামীরা যোনিভেদের আনন্দ লাভের উদ্দেশ্যে ‘স্ট্র্যাপ-অন ডিলডো’ পরে নিয়ে একজন আরেকজনকে তৃপ্ত করতে পারে। পায়ুপথে ঢোকানো এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কৃত্রিম শিশ্নের অবস্থান করাকে বাট প্লাগ বলা হয়। কৃত্রিম শিশ্নে পায়ুপথে অনুপ্রবেশের পুনরাবৃত্তি অথবা দ্রুতলয়ে খোঁচানোর জন্য ব্যবহৃত।

    ভারতে কিছু বিচার ব্যবস্থায় কৃত্রিম লিঙ্গের বাজারজাতকরণ এবং বিক্রয় অবৈধ। এখন পর্যন্ত দক্ষিণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক স্থানে এবং গ্রেট প্লেইন্সের কিছু স্থানে ‘অশ্লীল সরঞ্জাম’ আইনে কৃত্রিম লিঙ্গ বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ২০০৭ সালে, ফেডারেল আপিল কোর্ট যৌনখেলনা বিক্রি নিষিদ্ধে আলাবামার আইন সমর্থন করে। ১৯৩৮ সালের অশ্লীলতা-বিরোধী আইনে প্রয়োগ (Anti obscenity Enforcement Act) বহাল রাখে ২০০৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর।

    কৃত্রিম লিঙ্গ গ্রিক দানি শিল্পে দেখা যেতে পারে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে, এধরনের দানি শিল্পে একটি দৃশ্য রচিত আছে যেখানে মৌখিক যৌনকর্মে লিপ্ত একজন মহিলা একজন পুরুষের উপর ঝুঁকে আছে এবং অন্য একজন পুরুষ তার পায়ুপথে কৃত্রিম লিঙ্গ প্রবেশের চেষ্টা করছে। ৪১১ খ্রিস্টপূর্বের ‘অ্যারিস্টোফেনিস’ কমেডিতে তরা বহুবার উল্লেখিত, লাইসিসট্রাটা (LYSISTRATA)। সাধারণত কৃত্রিম লিঙ্গ বিভিন্ন আকার-আকৃতির পুরুষ লিঙ্গের বা পুংজনেন্দ্রীয় আকৃতিরও হয়ে থাকে। বর্তমানে নিখুঁতভাবে পুরুষ শারীরস্থান পুনর্গঠন করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ঢঙের এবং আকারের কৃত্রিম শিশ্ন তৈরি হয়ে থাকে। জাপানে প্রাণী অনুরূপ এবং কার্টুন অনুরূপ কৃত্রিম শিশ্ন তৈরি হয়ে থাকে। যেমন হ্যালো কিটি। এটা মূলত খেলনা হিসাবেই বিক্রি হয়ে থাকে। ফলে অশ্লীলতা আইন থেকে বিরত থাকা যায়।

    জাপানের কাওয়াসাকি অঞ্চলের শিন্ট ধর্মাবলম্বী লোকেরা প্রতি বছর এপ্রিলের প্রথম রবিবার সাড়ম্বরে পালন করে একটি ধর্মানুষ্ঠান, যার নাম কানামারা মাৎসুরি (Kanamara Matsuri)। জাপানের কাওয়াসাকির একটি মন্দিরে এটি অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসবটি প্রধানত ধর্ম বিশ্বাসের অনুষ্ঠান যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পুরুষের বংশদণ্ডের মতো উত্থিত লিঙ্গ। পৃথিবী ব্যাপী এটি লিঙ্গ উৎসব (Penis Festival) নামে পরিচিত। পেনিস ফেস্টিভাল অনুষ্ঠিত হয় জাপানের কাওয়াসাকির কানাইয়ামা মন্দিরে, যা ইতিমধ্যেই পেনিস মন্দির হিসাবে পরিচিত হয়ে গেছে। এই মন্দিরের বয়স ৭০০ বছরেরও বেশি। মন্দিরে একসময় যৌনকাজ করা মেয়েরা আসতো প্রার্থনার জন্য, যাতে এসটিডি (Sexually Transmitted Diseases) থেকে মুক্ত থাকতে পারে, এরপর উৎপাদনে (বাচ্চা), এমনকি শস্য উৎপাদনের জন্য এই মন্দিরে ভক্তরা প্রার্থনার জন্য আসেন। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকে প্রথম প্রচলন হয় এই বিচিত্র উৎসবের। যখন স্থানীয় বারবনিতারা বসন্তের শেষে বিশাল অগ্ৰত্বকহীন। পুরুষাঙ্গের রেপ্লিকা নিয়ে মিছিল করে যেত কাওয়াসাকি কানামারা মঠে প্রার্থনা করতে। যেন তারা সারাবছর যে কোনো ধরনের যৌন সংক্রমণ বা রোগ থেকে বাঁচতে পারে।

    মূলত এটি একটি শিন্ট ধর্মীয় উৎসব, যার মাধ্যমে প্রজনন শক্তি বৃদ্ধির জন্য বন্দনা করা হয়। জানা যায়, ১৬০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত যৌনব্যাধি বিশেষ করে সিফিলিস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ঘটা করে এই মেলা উদযাপন করত বারবনিতারা। বর্তমানে এটি পালিত হয় নিরাপদ যৌনতা, এইডস সংক্রমণ রোধ ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সচেতনতার অংশ হিসাবে উৎসবে হাজার হাজার লোক জড়ো হন। সব থেকে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে লিঙ্গ রেলি। মন্দিরের কাঠের লিঙ্গটি নিয়ে রেলিতে বের হন ভক্তরা। সঙ্গে থাকে আরো বড়ো বড়ো লিঙ্গ এবং সবার হাতে হাতে পুরুষদের অবিকল লিঙ্গ সদৃশ খেলনা বা বস্তু। ফেস্টিভালের সময়ে প্রায় নগ্ন মেয়েরা সেখানে লিঙ্গ আকৃতির বিভিন্ন আইসক্রিম, ফাস্টফুড, খেলনা বিক্রি হয়, কেউ ইচ্ছে করে সেগুলো কিনে খেতে পারে, লিঙ্গের উপর বসতে পারে, লিঙ্গের সঙ্গে ছবি উঠতে পারে, লিঙ্গের মাথায় চুমুও খেতে পারে। সাধারণত মেয়েরা আবার এসব ব্যাপার খুবই আগ্রহী হয়ে থাকে। রাস্তায় রাস্তায় ছোটো থেকে বড়ো সবাইকে দেখা যায় পুরুষাঙ্গের আদলে তৈরি চকলেট আর আইসক্রিম চুষতে। অনেককেই ছবির জন্য পোজ দিতে দেখা যায় বিশালাকৃতির পুরুষাঙ্গের পাশে। মাথায় পেনিস সদৃশ টুপি পরিধান করে নাচগান করেন অনেকেই। ৬ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে এই উৎসব চলে টানা ৭ এপ্রিল রাত পর্যন্ত। বর্তমানে প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। মেলাটি। শুধু জাপান নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও আলোচিত হচ্ছে কানামারা মাৎসুরি। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ৫ এপ্রিল উৎসবটি আবার পালিত হবে। এ ফেস্টিভালে আয় হওয়া টাকা এইডস গবেষণার কাজে দান করা হয়, যেহেতু এককালে এখানে যৌনকর্মীরা আসতেন, এসটিডি যাতে না হয় সেই প্রার্থনার জন্য।

    জাপানের সংস্কৃতি চর্চায় রক্ষণশীলতা প্রচণ্ড। পাশাপাশি আছে অবারিত উন্মোচন। পেনিস ফেস্টিভাল বা লিঙ্গ উৎসব এই রকম অবারিত উন্মোচনেরই একটি অন্যতম উদাহরণ।

    লিঙ্গ নামক বিষয়টা নিয়ে যখন এত কথা হলই, তখন বিখ্যাত লিঙ্গটি বাদ গেলে হবে কেন! হ্যাঁ, শিবলিঙ্গের কথাই বলছি। “লীনং বা গচ্ছতি, লয়ং বা গচ্ছতি ইতি লিঙ্গম্” যা লয়প্রাপ্ত হয় তাই লিঙ্গ। আবার কারও মতে সর্বস্তু যে আধারে লয়প্রাপ্ত হয় তাই লিঙ্গম। কিন্তু বৈয়াকরণিকগণের মতে “লিঙ্গতে চিহ্নতে মনেনেতি লিঙ্গম্”। লিঙ্গ শব্দের অর্থ ‘প্রতীক’ বা ‘চিহ্ন’। যার দ্বারা বস্তু চিহ্নিত হয়, সত্য পরিচয় ঘটে তাই-ই লিঙ্গ। অর্থাৎ যার দ্বারা সত্যবিজ্ঞান লাভ হয়, যার সাহায্যে বস্তুর পরিচয় পাওয়া যায় তাকেই বস্তু পরিচয়ের চিহ্ন বা লিঙ্গ বলে। আর এজন্যই দেহ প্রকৃতিতে লীনভাবে অবস্থান করে বলেই চি জ্যোতিকে বলা হয় লিঙ্গ। ভূমা ব্রহ্মের গুহ্য নাম ‘শিব’ এবং ভূমা ব্রহ্মের পরিচায়ক বলে আত্মজ্যোতির উদ্ভাসনের নাম শিবলিঙ্গ। প্রলয়ের কারণ বলে লোকে মহাদেবকে লিঙ্গ বলে। এই লিঙ্গ ব্রহ্মের পরম শরীর। আর এ জন্যই ত্রেতাযুগে রাবণ বধে যাত্রার সময় সেতুবন্ধে শ্রীরামচন্দ্র রামেশ্বরে শিবের পুজো করেন। আবার পরশুরামও পশুপতি শিবের তপস্যা করেই পশুপাত অস্ত্র লাভ করেন। দ্বাপরযুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর স্ত্রী জাম্ববতীসহ উপমন্যু মুনির আশ্রমে গমন করেন এবং তথায় দেবতা, ঋষি ও পিতৃগণের তর্পণান্তে অমিত মহাদেবের লিঙ্গমূর্তিতে পুজো করেন। আবার শ্রীকৃষ্ণ মার্কণ্ডেয় মুনির আশ্রমে গিয়ে ভুতিভূষণ শিবের পুজো করেছিলেন।

    শিবলিঙ্গ হল হিন্দু দেবতা শিবের একটি প্রতীকচিহ্ন। হিন্দু মন্দিরগুলিতে সাধারণত শিবলিঙ্গে শিবের পুজো হয়। শিবলিঙ্গকে অনেক সময় যোনিচিহ্ন (এটাকে অনেকে গৌরীপট্টও বলে) সহ তৈরি করা হয়। সব মিলিয়ে একটি মৈথুনরত প্রতীকই দৃশ্যমান হয়। যোনি হল মহাশক্তির প্রতীক। শিবলিঙ্গ ও যোনির সম্মিলিত রূপটিকে নারী ও পুরুষের অবিচ্ছেদ্য ঐক্যসত্ত্বা এবং জীবনসৃষ্টির উৎস পরোক্ষ স্থান ও প্রত্যক্ষ কালের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে পাশ্চাত্য গবেষকরা লিঙ্গ ও যোনিকে নারী ও পুরুষের যৌনাঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে হিন্দুরা শিবলিঙ্গকে সৃষ্টির পিছনে নারী ও পুরুষ উভয়ের অবদানের কথা স্মরণ করে শিবলিঙ্গের পুজো করেন। একটি সাধারণ তত্ত্ব অনুযায়ী, শিবলিঙ্গ শিবের আদি-অন্তহীন সত্ত্বার প্রতীক এক আদি ও অন্তহীন স্তম্ভের রূপবিশেষ। শিব এক অনাদি অনন্ত লিঙ্গস্তম্ভের রূপে আবির্ভূত, বিষ্ণু বরাহ বেশে স্তম্ভের নিম্নতল ও ব্রহ্মা উধ্বতল সন্ধানে রত। এই অনাদি অনন্ত স্তম্ভটি শিবের অনাদি অনন্ত সত্ত্বার প্রতীক মনে করা হয়। নৃতাত্ত্বিক ক্রিস্টোফার জন ফুলারের মতে, হিন্দু দেবতাদের মূর্তি সাধারণত মানুষ বা পশুর অনুষঙ্গে নির্মিত হয়। সেক্ষেত্রে প্রতীকরূপী শিবলিঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম। কেউ কেউ মনে করেন, লিঙ্গপুজো ভারতীয় আদিবাসী ধর্মগুলি থেকে হিন্দুধর্মে গৃহীত হয়েছে।

    অথর্ববেদে একটি স্তম্ভের স্তব করা হয়েছে। এটিই সম্ভবত লিঙ্গপুজোর উৎস। কারোর কারোর মতে ঘূপস্তম্ভ বা হাঁড়িকাঠের সঙ্গে শিবলিঙ্গের যোগ রয়েছে। উক্ত স্তবটিকে আদি-অন্তহীন এক স্তম্ভ বা স্কম্ভ-এর কথা বলা হয়েছে; এই স্কম্ভ চিরন্তন ব্রহ্মের স্থলে স্থাপিত। যজ্ঞের আগুন, ধোঁয়া, ছাই, মাদক সোমরস ও যজ্ঞের কাঠ বহন করার ষাঁড় ইত্যাদির সঙ্গে শিবের শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির যোগ লক্ষিত হয়। মনে করা হয়, কালক্রমে ঘূপস্তম্ভ শিবলিঙ্গের রূপ নিয়েছিল। লিঙ্গপুরাণে এই স্তোত্রটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি কাহিনির অবতারণা করা হয়। এই কাহিনিতে উক্ত স্তম্ভটিকে শুধু মহানই বলা হয়নি বরং মহাদেব শিবের সর্বোচ্চ সত্ত্বা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

    ভারত ও কম্বোডিয়ায় প্রচলিত প্রধান শৈব সম্প্রদায় ও অনুশাসন গ্রন্থ শৈবসিদ্ধান্ত মতে, উক্ত শৈব সম্প্রদায়ের প্রধান উপাস্য দেবতা পঞ্চানন (পাঁচ মাথা-বিশিষ্ট) ও দশভূজ (দশ হাত-বিশিষ্ট) সদাশিব প্রতিষ্ঠা ও পুজোর আদর্শ উপাদান হল শিবলিঙ্গ। নেপালে দশম শতাব্দীর চার মাথা-বিশিষ্ট পাথরের শিবলিঙ্গ সবচেয়ে প্রাচীন। এখনও পূজিত হয় এমন প্রাচীনতম লিঙ্গটি রয়েছে গুডিমাল্লামে। ক্লস ক্লোস্টারমায়ারের মতে, এটি স্পষ্টতই শিশ্নের অনুষঙ্গে নির্মিত। লিঙ্গটির নির্মাণকাল খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী। শিবের একটি অবয়ব লিঙ্গটির সম্মুখভাগে খোদিত রয়েছে।

    ১৮১৫ সালে ‘A View of the History, Literature, and Religion of the Hindoos’ গ্রন্থে লেখক ব্রিটিশ মিশনারি উইলিয়াম ওয়ার্ড হিন্দুদের অন্যান্য ধর্মীয় প্রথার সঙ্গে লিঙ্গপুজোরও নিন্দা করেছিলেন। তাঁর মতে লিঙ্গপুজো ছিল, “মানুষের চারিত্রিক অবনতির সর্বনিম্ন পর্যায়।” শিবলিঙ্গের প্রতীকবাদটি তাঁর কাছে ছিল “অত্যন্ত অশালীন; সে সাধারণের রুচির সঙ্গে মেলানোর জন্য এর যতই পরিমার্জনা করা হোক-না-কেন।” ব্রায়ান পেনিংটনের মতে, ওয়ার্ডের বইখানা “ব্রিটিশদের হিন্দুধর্ম সম্পর্কে ধারণা ও উপমহাদেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়েছিল।” ব্রিটিশরা মনে করত, শিবলিঙ্গ পুরুষ যৌনাঙ্গে আদলে নির্মিত এবং শিবলিঙ্গের পুজো ভক্তদের মধ্যে কামুকতা বৃদ্ধি করে। অবশ্য ১৮২৫ সালে হোরাস হেম্যান। উইলসন দক্ষিণ ভারতের লিঙ্গায়েত সম্প্রদায় সম্পর্কে একটি বই লিখে এই ধারণা খণ্ডানোর চেষ্টা করেছিলেন।

    মনিয়ার উইলিয়ামস তাঁর ‘Brahmanism And Hinduism’ বইয়ে লিখেছেন, ‘লিঙ্গ প্রতীকটি “শৈবদের মনে কোনো অশালীন ধারণা বা যৌন প্রণয়াকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয় না”। জেনেন ফলারের মতে, লিঙ্গ “পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গে নির্মিত এবং এটি মহাবিশ্ব-রূপী এক প্রবল শক্তির প্রতীক।” ডেভিড জেমস স্মিথ প্রমুখ গবেষকেরা মনে করেন, শিবলিঙ্গ চিরকালই পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গটি বহন করছে। অন্যদিকে এন. রামচন্দ্র ভট্ট প্রমুখ গবেষকেরা মনে করেন, পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গটি অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালের রচনা। এম. কে. ভি. নারায়ণ শিবলিঙ্গকে শিবের মানবসদৃশ মূর্তিগুলি থেকে পৃথক করেছেন। তিনি বৈদিক সাহিত্যে লিঙ্গপুজোর অনুপস্থিতির কথা বলেছেন এবং এর যৌনাঙ্গের অনুষঙ্গটিকে তান্ত্রিক সূত্র থেকে আগত বলে মত প্রকাশ করেছেন।

    রামকৃষ্ণ পরমহংস ‘জীবন্ত-লিঙ্গপুজো’ করতেন বলে কথিত আছে। ১৯০০ সালে প্যারিস ধর্মীয় ইতিহাস কংগ্রেসে রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ বলেন, শিবলিঙ্গ ধারণাটি এসেছে বৈদিক যূপস্তম্ভ বা স্কম্ভ ধারণা থেকে। যূপস্তম্ভ বা স্কম্ভ হল বলিদানের হাঁড়িকাঠ। এটিকে অনন্ত ব্রহ্মের একটি প্রতীক মনে করা হত। জার্মান প্রাচ্যতত্ত্ববিদ গুস্তাভ ওপার্ট শালগ্রাম শিলা ও শিবলিঙ্গের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে তাঁর গবেষণাপত্রে এগুলিকে পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গে সৃষ্ট প্রতীক বলে উল্লেখ করে তা পাঠ করলে, তারই প্রতিক্রিয়ায় বিবেকানন্দ এই কথা বলেছিলেন। বিবেকানন্দ বলেছিলেন, শালগ্রাম শিলাকে পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গ বলাটা এক কাল্পনিক আবিষ্কার মাত্র। তিনি আরও বলেছিলেন, শিবলিঙ্গর সঙ্গে পুরুষাঙ্গের যোগ বৌদ্ধধর্মের পতনের পর আগত ভারতের অন্ধকার যুগে কিছু অশাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তির মস্তিস্কপ্রসূত গল্প। স্বামী শিবানন্দও শিবলিঙ্গকে যৌনাঙ্গের প্রতীক বলে স্বীকার করেননি। ১৮৪০ সালে এইচ. এইচ. উইলসন একই কথা বলেছিলেন। ঔপন্যাসিক ক্রিস্টোফার ইসারউড লিঙ্গকে যৌন প্রতীক মানতে চাননি। ব্রিটানিকা এনসাইক্লোপিডিয়ায় ‘Lingam’ ভুক্তিতেও শিবলিঙ্গকে যৌন প্রতীক বলা হয়নি।

    মার্কিন ধর্মীয় ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ওয়েনডি ডনিগারের মতে– “For Hindus, the phallus in the background, the archetype (if I may use the word in its Eliadean, indeed Bastianian, and non-Jungian sense) of which their own penises are manifestations, is the phallus (called the lingam) of the god Siva, who inherits much of the mythology of Indra (O’Flaherty, 1973). The lingam appeared, separate from the body of Siva, on several occasions… On each of these occasions, Sivas wrath was appeased when gods and humans promised to worship his lingam forever after, which, in India they still do. Hindus, for instance, will argue that the lingam has nothing whatsoever to do with the male sexual organ, an assertion blatantly contradicted by the material.” যদিও অধ্যাপক ডনিগার পরবর্তীকালে তাঁর “The Hindus : An Alternative History” বইতে তাঁর বক্তব্য পরিষ্কার করে লিখেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো কোনো ধর্মশাস্ত্রে শিবলিঙ্গকে ঈশ্বরের বিমূর্ত প্রতীক বা দিব্য আলোকস্তম্ভ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এইসব বইতে লিঙ্গের কোনো যৌন অনুষঙ্গ নেই। হেলেন ব্রুনারের মতে, লিঙ্গের সামনে যে রেখাঁটি আঁকা হয়, তা পুরুষাঙ্গের গ্ল্যান্স অংশের একটি শৈল্পিক অনুকল্প। এই রেখাঁটি আঁকার পদ্ধতি মধ্যযুগে লেখা মন্দির প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত অনুশাসন এবং আধুনিক ধর্মগ্রন্থেও পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠা-পদ্ধতির কিছু কিছু প্রথার সঙ্গে যৌন মিলনের অনুষঙ্গ লক্ষ করা যায়।

    আগামা ধর্মসূত্রের তৃতীয় অধ্যয়ের ১৬-১৭ নং শ্লোকে বলা হয়েছে Lin অর্থ বিলীন হওয়া এবং ga অর্থ উৎপন্ন হওয়া। অর্থাৎ যে মঙ্গলময় সৃষ্টিকর্তা (শিব) থেকে সবকিছু উৎপন্ন হয় এবং প্রলয়কালে সবকিছু যাতে বিলীন হয় তারই প্রতীক এই শিবলিঙ্গ। স্বামী বিবেকানন্দ ১৯০০ সালে প্যরিসে হয়ে যাওয়া ধর্মসমূহের ঐতিহাসিক মূল শীর্ষক সম্মেলনে বিশ্ববাসীর সামনে অথর্ববেদের স্কন্তসুক্তের সাহায্যে তুলে ধরেন যে শিবলিঙ্গ মূলত বিশ্বব্রহ্মান্ডেরই প্রতীক। স্বামী শিবানন্দ বলেন– “এটি শুধু ভুলই নয়, বরং অন্ধ অভিযোগও বটে যে শিবলিঙ্গ পুরুষলিঙ্গের প্রতিনিধিত্বকারী।” তিনি লিঙ্গপুরাণের নিম্নলিখিত শ্লোকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন– “প্রধানাম প্রকৃতির যদাধুর লিঙ্গমুত্তমম গান্ধবর্নরসাহৃনম শব্দ স্পর্শাদি বর্জিতম।”

    শিবপুরাণ, মার্কণ্ডেয়পুরাণ ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, একদা দুর্গার সঙ্গে যৌনমিলনকালে শিব এত বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন যে, তাতে দুর্গার প্রাণনাশের উপক্রম হয়। দুর্গা মনে মনে শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করতে থাকেন, এমন সময় শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হয়ে নিজ সুদর্শন চক্র দ্বারা আঘাত করল উভয়ের সংযুক্ত যৌনাঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়। ওই সংযুক্ত যৌনাঙ্গের মিলিত সংস্করণের নাম বাণলিঙ্গ বা শিবলিঙ্গ, যা হিন্দুসমাজের একটি প্রধান পূজ্য বস্তু এবং ওই শিবলিঙ্গের পুজোর জন্য বহু বড়ো বড়ো শিবমন্দির গড়ে উঠেছে। মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালিয়ে কাসর ঘণ্টা বাজিয়ে হিন্দুসমাজ মহাসমারোহে ওই শিবলিঙ্গ পুজো করে থাকে। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণশ্বরে শিবের সঙ্গমের অবস্থান প্রদর্শনের জন্য পরপর বারোটি মন্দির রয়েছে। ওই মন্দিরগুলিতে যৌনমিলনকালীন সময়ের বারো প্রকারের প্রমত্তাবস্থা প্রদর্শন করা হয়েছে। এতে প্রতিদিন হাজার হাজার মহিলা দর্শনার্থীর সমাগম হয়।

    এক শাস্ত্রীয় কাহিনিতে পাচ্ছি, দেবতারা সব একত্রে মিলিত হয়েছেন, উদ্দেশ্য রাসমেলার পরিদর্শন। কৈলাস থেকে আগত মহাদেব রাসমেলার পরিদর্শনে ইচ্ছা প্রকাশ করলে শ্রীকৃষ্ণ কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, যেহেতু সর্বাধিক বুদ্ধিমান শ্রীকৃষ্ণ সকল বিষয়েই অবগত। নিরাশ না-হয়ে মহাদেব ছদ্মবেশ ধারণ করে রাসমেলার উদ্দ্যেশে রওনা দিলে নৃত্যরত স্বল্পবসনা এক সুন্দরীকে দেখতে পান। সুন্দরী দেখে মহাদেবের পুরুষদণ্ড বিকটাকার ধারণ করল। চতুঃপার্শ্বে ত্রাহি রব– হায়! এ যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস হবার শঙ্কা! অবশেষে শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে দেবদেবীদের সম্মিলিত প্রার্থনায় মহামায়া প্রকট হলেন। মহামায়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ড-জোড়া মহাযোনি সৃষ্টি করলেন। মহাদেবের নিয়ন্ত্রণহীন বিকটাকার পুরুষদণ্ডকে ধারণ করে নিবৃত্ত করলেন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডও অহেতুক বিনাশ থেকে রক্ষা পেল। সেই থেকে প্রচলন হল যোনিতে প্রোথিত মহাদেবের লিঙ্গপুজো। উল্লেখ্য যে, শিবরাত্রির বিশেষ ক্ষণে শিবলিঙ্গকে স্নান করানো পূর্বক অবিবাহিত তনয়ারা উত্তম পুরুষাঙ্গ-ধারী বীর্যবান স্বামী প্রাপ্তির আশীর্বাদ লাভ করেন।”

    ‘লিঙ্গ’ শব্দটি কোল বা অস্ট্রিক ভাষার। ঋগ্বেদে ‘লিঙ্গ’-এর প্রতিশব্দ ‘শিশ্ন’। ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডলের একুশ সুক্ত থেকে জানা যায়– এক শ্রেণির মানুষ শিশ্নোপাসনা করতেন। এরা অভিহিত শিশ্নদেবাঃ নামে। বলা হয়েছে, এই সম্প্রদায়গণ বেদ বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন। তাই তাদের অনার্য রাক্ষসদের সমপর্যায়ের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেছেন বৈদিক ঋষিরা। অনেকের মতে, লিঙ্গপুজো প্রচলিত ছিল মহেনজোদারো এবং হরপ্পায়। শিব অনার্য দেবতা, লিঙ্গ বা শিশ্নও। তাই লিঙ্গ বা শিশ্নই যে শিবলিঙ্গটা, তা সবার কাছে গৃহীত। সেকালের ঋষিরাও শিবলিঙ্গের পুজোর নিন্দা করেছেন। কিন্তু পরে বৈদিক আর্যদের বংশধররা এ পুজোকে মেনে নিয়েছিলেন। এ হচ্ছে আর্যসমাজে অনার্যসমাজের প্রভাবের প্রতিফলন। যুগের ক্রমধারায় এই শিব তো বটেই– শিবলিঙ্গ ও প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী দেবতা হিসাবে অভিষিক্ত হন। শিবলিঙ্গ দুই ধরনের। প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম। মতান্তরে চল আর অচল। মন্দিরে স্থাপিত লিঙ্গ ‘অচল’ আর যেগুলো স্থানন্তরিত হয় সেগুলোকে বলা হয় ‘চল’।

    পুরাণে জানা যাচ্ছে, বিষ্ণুর চক্রে সতীর দেহ খণ্ড-বিখণ্ড হলে শোকার্ত শিব ক্ষোভ এবং লজ্জায় প্রস্তরময় লিঙ্গরূপ ধারণ করেন। কিন্তু তা নিছকই প্রতীক, পুরুষ চিহ্ন নয়। বামনপুরাণেই শিবলিঙ্গ নিয়ে অনেক কাহিনি আছে– এর মধ্যে একটি কাহিনি হল– সতীর দেহত্যাগের পর শিব কামদেবের বাণে কামাসক্ত হয়ে উলঙ্গ অবস্থায় দারুবনে যান এবং সেখানকার মহর্ষিদের কাছে অভিলাষিত ভিক্ষা প্রার্থনা করেন। এ সময় অরুন্ধতি ও অনসূয়া ছাড়া ঋষিপত্নীরা শিবকে দেখে কামার্ত হয়ে পড়েন। ক্রুদ্ধ মহর্ষিদের অভিশাপে শিবের লিঙ্গ খসে পড়ে এবং তা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ব্রহ্মা, বিষ্ণু প্রমুখ এসে শিবকে তার লিঙ্গ গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। এ লিঙ্গের পুজো করতে হবে– এই শর্তে রাজি হলেই শিব তা আবার ধারণ করেন।

    পুরাণেই উল্লেখিত ভিন্ন একটি গল্প হল– কোনো বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য শিব সুন্দর পুরুষ সেজে বনমালা পরে উলঙ্গ অবস্থায় বালখিল্য ঋষিদের পাড়ায় আসেন ভিক্ষাছলে। তাকে দেখে কামার্ত ঋষিপত্নিরাও উলঙ্গ হতে চান এবং শিবকে নিয়ে টানাটানি করতে থাকেন। শিব জানান, পুরুষহীন কোনো নির্জন স্থানে গেলে তিনি এই উলঙ্গব্রতের কারণ বলবেন। এ সময় বালখিল্যরা এসে স্ত্রীদের পিটাতে থাকেন। এক পর্যায়ে এক ঋষিপত্নীর স্পর্শে খসে পরে শিবের লিঙ্গ এবং বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মা এবং অন্যদের স্তবে তুষ্ট হয়ে শিব জানান, এই লিঙ্গের পুজো করলে জগতের শান্তি হবে। সেই থেকে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে প্রচালিত আছে শিবলিঙ্গের পুজো।

    ঋষি মার্কণ্ডেয় সম্পর্কে প্রচলিত জনপ্রিয় উপাখ্যানটির সঙ্গে শিবলিঙ্গের অনুসঙ্গ লক্ষ করা যায় : মৃক ঋষি ও তাঁর পত্নী মরুদবতী পুত্রকামনায় শিবের আরাধনা করেন। তাঁদের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে শিব তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত হন। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তাঁরা কেমন পুত্র চান –দীর্ঘজীবী মূর্খ পুত্র না ক্ষণজীবী জ্ঞানী পুত্র। মৃক ঋষি ক্ষণজীবী জ্ঞানী পুত্ৰই চান। জন্ম হয় মার্কণ্ডেয়ের। মার্কণ্ডেয়ের আয়ু ছিল মাত্র ষোলো বছরের। সে ছিল শিবের ভক্ত। ষোড়শ বছরে পদার্পণ করার পর যখন তার মৃত্যুকাল আসন্ন, তখন সে একটি শিবলিঙ্গ গড়ে পুজোয় বসে। যম তাকে নিয়ে যেতে এলে সে সেই শিবলিঙ্গ ছেড়ে যেতে অস্বীকার করে। যম তাঁর রজ্জু দিয়ে মার্কণ্ডেয়কে বন্ধন করলে, মার্কণ্ডেয় শিবলিঙ্গটিকে আঁকড়ে ধরে এবং শিবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকে। ভক্তবৎসল শিবভক্তের দুর্দশা দেখে শিবলিঙ্গ থেকে আবির্ভূত হন। ক্রুদ্ধ শিব আক্রমণ করেন যমকে। যম পরাভূত হন এবং মার্কণ্ডেয়ের উপর তাঁর দাবি ত্যাগ করে ফিরে যান। শিব যমকে পরাজিত করে মৃত্যুঞ্জয় নামে পরিচিত হন। শিবের বরে মার্কণ্ডেয় অমরত্ব লাভ করেন। মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র মার্কণ্ডেয়ের রচনা মনে করা হয়। তামিলনাড়ুর তিরুক্কদাভুর মন্দিরে শিবের যমবিজয়ের ধাতুচিত্র রয়েছে। নৃসিংহ পুরাণ গ্রন্থেও একই প্রকার একটি কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এই কাহিনি অনুযায়ী, মার্কণ্ডেয় কর্তৃক মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র পাঠের পর বিষ্ণু যমের হাত থেকে মার্কণ্ডেয়কে রক্ষা করেছিলেন।

    সনাতন বা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য ৩৬টি পুরাণ রচিত হয়েছে। এর ১৮টি মহাপুরাণ এবং ১৮টি উপপুরাণ। মহাপুরাণগুলি হল যথাক্রমে– (১) মার্কণ্ডেয়, (২) মৎস্য, (৩) ভাগবত, (৪) ভবিষ্য, (৫) ব্রহ্মাণ্ড, (৬) ব্রহ্ম, (৭) ব্রহ্মবৈবর্ত, (৮) বায়ু, (৯) বামন, (১০) বরাহ, (১১) বিষ্ণু, (১২) অগ্নি, (১৩) নারদ, (১৪) পদ্ম, (১৫) লিঙ্গ এবং (১৬) গরুড়। অপরদিকে ১৮টি উপপুরাণ হল –(১) সনৎকুমার, (২নারসিংহ, (৩) শিব, (৪)শিবধর্ম, (৫)আশ্চর্য, (৬)নারদীয়, (৭)কাপিল, (৮) মানব, (৯) ঔশনস, (১০) আদিত্য, (১১) বারুণ, (১২) কালিকা, (১৩) মাহেশ্বর, (১৪) শাম্ব, (১৫) সেরি, (১৬) পরাশর, (১৭) ভাগবত এবং (১৮) বাশিষ্ঠ।

    মহাপুরাণের পঞ্চদশ পুরাণটিই হল লিঙ্গপুরাণ। কীভাবে লিঙ্গপুরাণ শুরু হচ্ছে তা সূত ও নৈমিষারণ্যবাসী ঋষিগণের কথোপকথনের মাধ্যমে একবার বাংলা তর্জমায় দেখে নিই– ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও আদিরূপে সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়কারী প্রকৃতিপুরুষের নিয়ামক পরমাত্মা শিবকে প্রণাম করি। নারায়ণ, নর, নরোত্তম, দেবী সরস্বতী এবং বেদব্যাসকে নমস্কারপূর্বক জয় অর্থাৎ অষ্টাদশ পুরাণাদি গ্রন্থ উচ্চারণ করবে শৈলেশ, সঙ্গমেশ্বর, স্বর্গস্থিত, হিরণ্যগর্ভ, বারাণসী, মহালয়, রৌদ্র, গোপেক্ষক, শ্রেষ্ঠ পাশুপত, বিঘ্নেশ্বর, কেদার, গোমায়ূকেশ্বর, হিরণ্যগর্ভ, চন্দ্রনাথ, ঈশান্য, ত্রিবিষ্টপ ও শুক্রেশ্বর প্রভৃতি তীর্থ স্থানে যথাবিধি শিবলিঙ্গ পুজো করে মহর্ষি নারদ নৈমিষারণ্যে গমন করলেন। (১-৩) তৎকালে নৈমিষারণ্যবাসী মুনিগণ নারদকে দেখামাত্র আনন্দিত মনে পুজো করে যথাযোগ্য। আসন প্রদান করলেন। তিনিও মুনিবরকর্তৃক পূজিত হয়ে হৃষ্টমনে তাঁদের প্রদত্ত উত্তমাসনে সুখে উপবেশন করে শিবলিঙ্গ মহাত্মা বিষয়কে মনোহর ভাবশালী উপাখ্যান বলতে লাগলেন। ইত্যবসরে সেখানে সর্বপুরাণবেত্তা বুদ্ধিমান সূত স্বয়ং মুনিগণকে প্রণাম করতে উপস্থিত হলে, নৈমিষারণ্যবাসী মুনিগণ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন শিষ্যের অভ্যর্থনার জন্য যথাযযাগ্য সবিনয় সম্ভাষণ ও পুজো বিধান করলেন। (৪-৭) এরপর তাঁদের পুরাণশ্রবণে ইচ্ছা হলে তপস্বী সমস্ত অতি বিশ্বস্ত বিদ্বান রোমহর্ষণ সূতকে শিবলিঙ্গ-মহাত্ম্যপূর্ণ পবিত্র পুরাণ-শাস্ত্র জিজ্ঞাসা করলেন। (৮-৯) হে মহামতে সূত! আপনি পুরাণের জন্য মহর্ষি বেদব্যাসকে উপাসনা করে তাঁর কাছে পুরাণশাস্ত্র অবগত হয়েছেন। হে পৌরাণিকাগ্রগণ্য! সেই জন্য লিঙ্গ-মাহাত্ম্যপূর্ণ স্বর্গীয় পুরাণসংহিতা আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি। ব্রহ্মার পুত্র শ্রীমান মুনিবর নারদ দেবাদিদেব পরমাত্মা মহেশ্বরের সমস্ত তীর্থস্থান পরিভ্রমণ করে লিঙ্গপুজো করে এই স্থানে উপস্থিত আছেন। আপনি, আমরা ও মহর্ষি নারদ সবাই-ই শিবভক্ত; অতএব আপনি মহর্ষি নারদের কাছে (?)। এমন আপনি যা জেনেছেন, তা সবই সফল হতে পারবে। পৌরাণিকাগ্রগণ্য পূণ্যাত্মা সূতকে এমন বললে, তিনি অর্থে ব্রহ্মার পুত্র নারদকে অনম্বর, নৈমিষবাসী মুনিগণকে অভিবাদন করে পুরাণ বলতে আরম্ভ করিলেন। (১০-১৬) আমি লিঙ্গপুরাণ বলার জন্য মহাদেবকে নমস্কার করে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মুনিবর বেদব্যাসকে স্মরণ করছি। শব্দ-ব্ৰহ্ম যার শরীর, যিনি সাক্ষাৎ শব্দ-ব্রহ্মের প্রকাশক, বর্ণমালা যাহার অঙ্গ, তিনি অনেক রূপে স্থিতি করলেও অব্যক্ত স্বরূপ, যিনি অকাব, উকাব ও মকাব স্বরূপ এবং যিনি সূক্ষ্ম, স্থূল, পরাৎপর, ওঙ্কারস্বরূপ, ঋগ যার মুখ, সামগান যার জিহ্বা, যজুৰ্বেদ যার সুদীর্ঘ গ্রীবাদেশ, অথৰ্ব্ববেদ যার হৃদয়, যিনি প্রকৃতিপুরুষের অতীত, জন্ম-মৃত্যুবর্জিত হইলেও তমোগুণযোগে কাল, রুদ্র, রজোগুণযোগে ব্ৰহ্ম, সত্ত্বগুণযোগে সর্বময় বিষ্ণু নামে বিখ্যাত, যিনি নির্গুণ অবস্থায় পরম ব্রহ্ম মহেশ্বর, যিনি প্রকৃতি, পুরুষ, (?), অহংকার, মন, দর্শেন্দ্রিয়, পঞ্চতন্মাত্র ও পঞ্চভূতরূপে বিরাজমান হলেও স্বয়ং এদের অতীত ষড়বিংশ স্বরূপ, সেই মায়ার কারণ সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়-লীলার জন্য লিঙ্গরূপধারী সর্বময় মহেশ্বরকে প্রণাম করে মঙ্গলময় লিঙ্গপুরাণ বলতে আরম্ভ করছি। (১৭-২৩)।

    মৎস্যপুরাণ, শিবপুরাণ, বামনপুরাণ, বায়ুপুরাণ, পদ্মপুরাণ, ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ, অগ্নিপুরাণ, ব্রহ্মপুরাণ, কূর্মপুরাণ, বরাহপুরাণ, ভবিষ্যপুরাণ, ভাগবতপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণগুলিতে কার্তিকের জন্মবৃত্তান্ত জানা যায়, তেমনি লিঙ্গপুরাণেও কার্তিকের জন্মবৃত্তান্ত উল্লেখ আছে। মহর্ষি কশ্যপ ও দিতির পুত্র দানব বজ্রাঙ্গ। বজ্রাঙ্গের স্ত্রী বরাঙ্গী। বজ্রাঙ্গ ও বরাঙ্গীর পুত্রের নাম তারক বা তারকাসুর। বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে তারকাসুর দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠে। দেবতাদের পরাজিত করে সে স্বর্গলোক অধিকার করে এবং দেবতাদের ক্রীতদাসে পরিণত করে। তাঁর অত্যাচারে উৎপীড়িত দেবগণ পরিত্রাণের জন্য পিতামহ ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। ব্রহ্মা দেবতাদের অভয় দিয়ে বলেন– শিব ও পার্বতীর যে অপরাজেয় পুত্র জন্মগ্রহণ করবেন, তিনি সুরাসুরের অবধ্য তারকাসুরকে নিধন করবেন এবং স্বর্গরাজ্য পুনরায় দেবতাদের হবে। যথাকালে তপস্যানিরত শিবকে স্বামীরূপে পাওয়ার জন্য কঠোর পঞ্চাগ্নি তপস্যানির পার্বতীর বিবাহ হয় এবং শিবতেজে পার্বতীর পুত্র কার্তিকেয়র জন্ম হয়। জন্মের পর ছয়জন কৃত্তিকা-মাতৃকা তাঁকে লালন-পালন করেন। শিব ও পার্বতীর অমিততেজা এই পুত্র ছয়মুখে ছয়। কৃত্তিকার স্তনদুগ্ধ পান করেছিলেন। ছয় মুখের জন্য তাঁর নাম ‘ষড়ানন বা ‘ষন্মুখ’। ছয়জন কৃত্তিকা-ধাত্রীজননীর স্তন্যপান করে বর্ধিত হন বলে তাঁর নাম হয় ‘কার্তিকেয়’ বা ‘কার্তিক’। জন্মের ষষ্ঠ দিন দেবসেনাপতিরূপে তাঁর অভিষেক হয় এবং ব্রহ্মার মানসকন্যা দেবসেনার সঙ্গে বিবাহ হয়। সপ্তম দিন তিনি তারকাসুরকে বধ পুরাণগুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান স্কন্দপুরাণ প্রত্যক্ষত তাঁরই নাম বহন করছে।

    শিবমহাপুরাণে আমরা দুই ধরনের শিবলিঙ্গ দেখতে পাই, একটা শুধু স্তম্ভ আকারে। যেমন অমরনাথ ইত্যাদির শিবলিঙ্গ। আর-একটি যোনির উপর। স্থাপিতরূপে, যেরূপে হিন্দু রমণীগণ জল-দুধ ঢেলে মনোবাঞ্ছা পূরণ করার প্রার্থনা করেন। ব্রহ্মা বলল —

    যাবল্লিঙ্গং স্থিরং নৈব জগতাং ত্রিতয়ে শুভ।
    জায়তে ন তদা কাপি সত্যমেতদ্বদাম্যহম্।। (২৫)

    অর্থাৎ যে পর্যন্ত লিঙ্গ স্থিরভাব অবলম্বন না করছে, সেই পর্যন্ত ত্রিজগতের কোথায়ও শুভ হবে না, এটা সত্য বলছে।

    অমরনাথের শিবলিঙ্গ : অমরনাথ গুহা একটি হিন্দু তীর্থক্ষেত্র, যা ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে অবস্থিত। এটি একটি শৈবতীর্থ। এই গুহাটি সমতল থেকে ৩,৮৮৮ মিটার (১২,৭৫৬ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত। জম্মু ও কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর ১৪১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই তীর্থে যেতে পহেলগাঁও শহর অতিক্রম করতে হয়। এই তীর্থক্ষেত্রটি হিন্দুদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যতম পবিত্র স্থান বলে বিবেচিত হয়। গুহাটি পাহাড় ঘেরা আর এই পাহাড়গুলো সাদা তুষারে আবৃত থাকে বছরের অনেক মাস ধরে। এমনকি এই গুহার প্রবেশপথও বরফে ঢাকা থাকে। গ্রীষ্মকালে খুব স্বল্প সময়ের জন্য এই দ্বার প্রবেশের উপযোগী হয়। তখন লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী অমরনাথের উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। অমরনাথের গুহাতে চুঁইয়ে পড়া জল জমে শিবলিঙ্গের আকার ধারণ করে। জুন-জুলাই মাসে শ্রাবণী পূর্ণিমা থেকে শুরু হয় অমরনাথ যাত্রা। শেষ হয় জুলাই-আগস্ট মাসে গুরু পূর্ণিমার সময় ছড়ি মিছিলে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই অমরনাথ যাত্রায় যোগদান করেন।

    গুহার ভিতরে ৪০ মিটার (১৩০ ফুট) ভিতরে গুহার ছাদ থেকে জল ফোঁটায় ফোঁটায় চুঁইয়ে পড়ে। এই চুঁইয়ে পড়া জলের ধারা খাড়াভাবে গুহার মেঝে পড়ার সময় জমে গিয়ে শিবলিঙ্গের আকার ধারণ করে। কখনো-কখনো ৮ ফুট উঁচুও হয় এই শিব লিঙ্গ। তবে গত কয়েকবছর ধরেই সময়ের আগেই বরফলিঙ্গ গলে যাচ্ছে, যা হয়তো উষ্ণায়নের ফল। জুন-জুলাই মাসে শ্রাবণী পূর্ণিমা থেকে শুরু হয় অমরনাথ যাত্রা। শেষ হয় জুলাই-আগস্ট মাসে গুরু পূর্ণিমার সময় ছড়ি মিছিলে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই অমরনাথ যাত্রায় যোগদান করেন। তীর্থ যাত্রার প্রধান উদ্দেশ্যই এই শিবলিঙ্গে পুজো দেওয়া। অমরনাথে কবে থেকে তীর্থযাত্রা শুরু হয় তা জানা যায় না। একটি তথ্যসুত্র থেকে জানা যায় কিংবদন্তী রাজা আরজরাজা ( খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সাল) বরফনির্মিত শিবলিঙ্গে পুজো দিতেন। ধারণা করা হয়, রানি সূর্যমতী ১১ শতকে অমরনাথের এই ত্রিশুল, বানলিঙ্গ ও অন্যান্য পবিত্র জিনিস উপহার দেন। এ ছাড়াও প্রাচীন কিছু পুথি থেকে আরও বেশ কিছু ভিন্ন এ সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় মধ্যযুগে অমরনাথের কথা মানুষে ভুলে গিয়েছিল, কিন্তু পঞ্চদশ শতকে আবার নতুন করে আবিষ্কৃত হয়। প্রচলিত আছে, কাশ্মীর একসময় জলে প্লাবিত হয়ে যায় এবং কাশ্যপ মুনি সে জল নদীর মাধ্যমে বের করে দেন। এরপর ভৃগুমুনি অমরনাথ বা শিবের বা শিবলিঙ্গের দেখা পান।

    পরিশেষে লিঙ্গকে কেন্দ্র করে একটি ভুল ধারণা ভাঙার চেষ্টা করব। সৌদি আরবে অবস্থিত মক্কা শরিফের হাজরে আসওয়াদ পাথরটি কি শিবলিঙ্গ? হিন্দুদের কেউ কেউ তো এমনই বলেন শুনেছি। সত্যটা কী? মহানবি হজরত মোহম্মদ কর্তৃক মক্কা শরিফে স্থাপিত পবিত্র হাজরে আসওয়াদকে (কালোপাথর) লাখ লাখ মুসলমান পাপ থেকে মুক্তি পেতে চুম্বন করে থাকেন। অথচ এই হাজরে আসওয়াদই নাকি শিবলিঙ্গ? এই ধরনের ভিত্তিহীন যুক্তিহীন বিবৃতি থেকে সকলকেই বিরত থাকা উচিত। এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় না, যা দিয়ে সেটাকে শিবলিঙ্গ বলা যায়। পাথর হলেই যেমন শিবলিঙ্গ নয়, তেমনি শালগ্রাম শিলাও নয়। পবিত্র হাজরে আসওয়াদ মোটেই শিবলিঙ্গের আদলে নয়। যে হজরত মোহাম্মদ পৌত্তলিকতায় বিশ্বাসীদের যেভাবে সৌদি আরব থেকে উৎখাত করেছিলেন, সেই মোহম্মদ আহ্লাদ করে মক্কায় শিবলিঙ্গ স্থাপন করেছেন, এটা মোটেই মেনে নেওয়া যায় না। ইসলামের ইতিহাস এবং হজরতের জীবনী পড়লেই জানা যায় এটা কোনো মতেই শিবলিঙ্গ নয়। ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করা অপরাধ এবং অনৈতিক।

    উপসংহারের বিষয় ধর্ষণ। লিঙ্গের সবচেয়ে বড়ো অপচয় এবং জঘন্যতম ব্যবহার হল ধর্ষণ। একশ্রেণির মানসিক বিকারগ্রস্ত পুরুষ নারীদের ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যেই এই অপকর্মটি করে থাকে। এইসব যৌন-প্রতিবন্ধী (Sextual Handicapd) পুরুষরা আসলে লিঙ্গ নামক অস্ত্রটিকে ব্যবহার করে নারীদের হত্যা করে। কিছু আগ্রাসী পুরুষও আছে, যাদের মধ্যে জোর করে ভোগ করার প্রবণতা কাজ করে। প্রাচীনকাল থেকে সামাজ্যবাদীরা এলাকা দখল করতে এসে তলোয়ার-বল্লমের পাশাপাশি নিজেদের লিঙ্গটাকে ব্যবহার করতে ভোলেননি। পছন্দ হলে জোর করে মেয়েদের তুলে এনে ফেলে দেওয়া হত হারেমের অন্ধকারে। নারীদের উপর চড়াও হওয়া এবং ধর্ষণ করা ছিল নিত্য আতঙ্ক। সেই আতঙ্ক কি আজও নেই? অন্যভাবে, অন্য রূপে? আজও সীমান্ত এলাকায় সৈনিকদের বন্দুকের নলের নীচে কত নারী ধর্ষিতা হচ্ছে তার হিসাব কে রাখল! শুধু সৈনিক কেন, সৈনিক নয় এমন মানুষও তো বোয়া তুলসীপাতা নয়। এইরূপ পুরুষদের উত্থিত লিঙ্গ কেউ কর্তন করে না কেন? শুধু আইন দিয়ে ধর্ষণ নির্মূল করা যাবে না। ধর্ষণ নির্মূল করতে হলে মেয়েদের সক্রিয়তা বাড়াতে হবে। সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। নারীর সম্ভ্রম, নারীর আত্মরক্ষার জন্য লিঙ্গ-কৰ্তন আদালত নিশ্চয় সহানুভূতির সঙ্গে দেখবেন।

    জয়তুঃ ভব।

  • মনু, মনুসংহিতা এবং হিন্দুবাদের ভারতবর্ষ

    মনু, মনুসংহিতা এবং হিন্দুবাদের ভারতবর্ষ

    অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book-name]

    মনু, মনুসংহিতা এবং হিন্দুবাদের ভারতবর্ষ

    ঋগবেদে মনুকে মানবজাতির পিতা বলা হয়েছে। তিনি আদিত্য বিবস্বতের পুত্র বলে বিবস্বান, স্বয়ম্ভু ব্ৰহ্মার পুত্র বলে স্বায়ম্ভুব মনু, যাস্কের নিরুক্তে মনু দুস্থানীয় দেবতা, তৈত্তিরীয় সংহিতায় মনু এক পরিবারের পিতা, শুক্ল যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণে সুপ্রসিদ্ধ মনুমৎস্যকথা অংশে তিনি মানবজাতির সৃষ্টিকর্তা। তিনি মানবজাতির পিতা, তাই তিনি নৈতিক ও সামাজিক আদর্শের প্রবর্তক –মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি, যজ্ঞানুষ্ঠানের সৃষ্টিকর্তা, শাসক ব্যবহার বিষয়ে প্রামাণ্য ব্যক্তি, মহর্ষি, বেদবিদ্যায় বিদ্বান, পৃথিবীর উৎপত্তি-স্থিতি-প্রলয়ের কারণ তিনি জানেন।

    পুরাণ মত অনুযায়ী মনু ব্ৰহ্মার দেহ থেকে তৈরি হয়েছেন। সুতরাং, পৃথিবীতে ভগবান ব্রহ্মার একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন মনু। যাকে স্বায়ম্ভব মনু বলা হয়। তবে জানা গেছে ব্রহ্মার ইচ্ছায় ১৪ জন মনু [স্বায়ম্ভব (ব্রহ্মা ও গায়ত্রী থেকে সম্ভূত),স্বরোচিষ, উত্তম, তামস, রৈবত, চাক্ষুষ, বৈবস্বত বা সত্যব্রত,সাবর্ণি, রোচ্য, ভৌত, মেরূ সাবৰ্ণি,ঋভু, ঋতুধামা, বিস্বব] জন্ম নিয়েছেন এবং এদের সবাই ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছেন। স্বায়ম্ভুব মনু ব্ৰহ্মার কাছ থেকে স্মৃতিশাস্ত্র পাঠ করা শিখে তা তার শিস্যদের তা পাঠ করান। পরবর্তীতে ভৃগু নামে একজন মনুর আদেশে এই ধর্মশাস্ত্র ঋষিদের কাছে ব্যাখা করেন। যা এখন ‘মনুসংহিতা নামে পরিচিত। এই মনুসংহিতাই ব্রাহ্মণ্যবাদের আকরগ্রন্থ, প্রাণভোমরা। বলা হয় বেদের পরে মনুসংহিতা সৃষ্টি হয়েছে। ভগবান ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভুব মনুর দেখানো পথ অনুসরণ করে বাকি ১৪ জন মনু এই শাস্ত্র ধারণ ও পরিবর্ধন করেছেন। মুলত “ভগবান ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভুব মনু” এর বর্ণিত শ্লোকগুলিই বাকি মনুরা সম্পাদনা ও টীকা বা ব্যাখ্যা যোগ করেছেন এবং কিছু কিছু আইন ও আচরণ পদ্ধতির প্রবর্তন করেছেন। এরকমই একটা পরিচয় অনেকেই বিশ্বাস করেন।

    এখন প্রশ্ন হল মনু কি সত্যিই ‘ভগবান’ ছিলেন? আমরা এ লেখার পরতে পরতে দেখতে চেষ্টা করব মনু কেমন ভগবান ছিলেন। মনুসংহিতার পাতাতেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারি। উত্তর সেখানেই লুকিয়ে আছে। বস্তুত মনু ছিলেন একজন শাসক বা রাজা, ব্রাহ্মণ-শাসক –ভগবান কখনোই নয়। ভগবান যে নয়, তার প্রমাণ মনুর সৃষ্টিতত্ত্ব। সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি তিন জায়গায় তিন রকম বর্ণনা করেছেন। পড়ুন–

    (১) মনুসংহিতার প্রথম অধ্যায়ের পঞ্চম থেকে উনিশতম শ্লোকে সৃষ্টিতত্ত্বে। বলছেন, আদিতে এই বিশ্ব অন্ধকারময় ছিল, তার অস্তিত্ব বোঝা যেত না, কোনো কিছুরই লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন ছিল না, প্রমাণগ্রাহ্য ছিল না। সব কিছু ছিল অবিজ্ঞেয়। যেন সবদিকে প্ৰসুপ্ত, তারপর অপ্রতিরোধ্য শক্তিসম্পন্ন অন্ধকারনাশক ভগবান স্বয়ংভূ স্বয়ং অব্যক্ত থেকে পঞ্চমহাভূতাদি সকল পদার্থকে ব্যক্ত করলেন। ইন্দ্রিয়ের অগোচর সূক্ষ্ম, সনাতন, সর্বভূতময়, অচিন্তনীয় তিনি নিজেই উদ্ভূত হলেন। তিনি নিজের শরীর থেকে বিবিধ জীব সৃষ্টি করতে ইচ্ছুক হয়ে ভেবে ভেবে প্রথমে জল সৃষ্টি করে তাতে তাঁর বীজ আরোপিত করলেন। সেই বীজ সূর্যতুল্য প্রভাবিশিষ্ট স্বর্ণডিম্বে পরিণত হল। তাতে সমগ্র জগতের পিতামহ ব্রহ্মা স্বয়ং জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর প্রথম বাস ছিল জলে, জলকে যেহেতু নারা বলে অভিহিত করা হত সেইহেতু তাঁকে বলা হত নারায়ণ (নারা + অয়ন বা আশ্রয়)। সেই-ই প্রথম কারণ, যা অব্যক্ত এবং যা সৎও বটে, অসৎও বটে। তার থেকে উদ্ভূত পুরুষকেই লোকে ব্ৰহ্মা বলে। সেই অণ্ড বা ডিম্বে ভগবান এক বছর বসবাস করে তাকে দ্বিধা বিভক্ত করলেন, সেই দুই ভাগ থেকে তিনি সৃষ্টি করলেন স্বর্গ এবং মর্ত। তাদের মাঝখানে অন্তরিক্ষ, আট দিক্‌ এবং সমুদ্র [আধুনিক ভূতত্ত্ববিদদের মতে একদা পৃথিবী দু-ভাগে বিভক্ত ছিল– (i) সমুদ্র বা জলভাগ, যা ‘প্যানথালাসা’ নামে চিহ্নিত এবং (ii) স্থলভাগ, যা ‘প্যানজিয়া’ নামে চিহ্নিত]। নিজের থেকেই তিনি মন উদ্ধৃত করলেন– তা সৎ বটে, অসৎও বটে। মন থেকে উদ্ভূত হল অহংকার এবং মহাত্মা, সত্ত্বাদি ত্রিগুণাত্মক সবকিছু, পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়। অহংকার ও পঞ্চতন্মত্রের সূক্ষ্ম উপাদান নিজের অংশের সঙ্গে মিশিয়ে তিনি সমস্ত জীব সৃষ্টি করলেন। পঞ্চমহাভূত সকল জীবের স্রষ্টার মধ্যে প্রবিষ্ট হন।

    (২) মনুসংহিতা বা মনুস্মৃতির প্রথম অধ্যায়ে বত্রিশতম থেকে একচল্লিশতম শ্লোকে মনু বলছেন, ব্রহ্মা স্বদেহকে দ্বিধা বিভক্ত করলেন –একভাগ হল পুরুষ, অপরভাগ নারী। সেই নারীর থেকে তিনি সৃষ্টি করলেন বিরাজ। এই বিরাজ তপস্যা করোন্তর একটি পুরুষ সৃষ্টি করলেন; এই পুরুষই “মনুসংহিতা”-র প্রবক্তা মনু। জীবসিসৃক্ষু মনু প্রথমে সৃষ্টি করলেন প্রজাপতি স্বরূপ দশজন মহামুনিকে। তাঁরা সৃষ্টি করলেন সপ্তমনু, বিভিন্ন শ্রেণির দেবগণ, মহান ঋষি, যক্ষ, রাক্ষস, গন্ধর্ব, অপ্সরা, সর্প, বিহঙ্গ, বিভিন্ন শ্রেণির পিতৃগণ, বিদ্যুৎ, মেঘ, ক্ষুদ্র-বৃহৎ নক্ষত্ররাজি, বানর, মৎস্য, গোমহিষাদি, হরিণ, মানুষ, কীট, মক্ষিকা ও স্থাবর বৃক্ষাদি।

    (৩) মনুসংহিতা বা মনুস্মৃতির প্রথম অধ্যায়ে চুয়াত্তরতম থেকে আটাত্তরতম শ্লোকে মনু বলছেন, সুপ্তোত্থিত ব্রহ্মা তাঁর মন সৃষ্টি করলেন। ব্রহ্মার সিসৃক্ষার প্রেরণায় উদ্ভূত হল শব্দগুণ আকাশ, আকাশের বিকৃতি থেকে সৃষ্ট হল স্পর্শগুণ বায়ু, বায়ু থেকে উদ্ভব দীপ্তিময় আলোকের, যার থেকে প্রাদুর্ভাব হল জলের, জল থেকে উৎপত্তি হল গন্ধযুক্ত ক্ষিতি বা মাটির।

    অতএব ‘ভগবান’ হলে এমন তথ্যগত ভুল কখনোই হত না। মানুষ বলেই এমনটা হয়। ভুল মানুষের হয়। সময়ে পরিপ্রেক্ষিতে সে সময়ে মানুষের জ্ঞান ছিল সীমিত। তথাকথিত ধর্মগ্রন্থগুলি মানুষের লেখা বলেই এত ভুল আর বিভ্রান্তি। ঈশ্বর বা ভগবানের নামে চালালেই তো হল না। নির্ভুল হতে হয়। মানুষের পক্ষে কখনোই নির্ভুল হওয়া সম্ভব নয়। সেই সময়ে মানুষের যেটুকু জ্ঞানের পরিধি ছিল, সেই জ্ঞানের পরিধিতেই লিখেছে। মনুও ব্যতিক্রম নয়। আসল উদ্দেশ্য শোষণ ও শাসন করা। সেটা সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছে, সেটাই বড়ো কথা।

    সে যাই-ই হোক, প্রভূত স্ববিরোধিতা থাকলেও বলা যায় মনুই হলেন (সম্ভবত) ভারতবর্ষের প্রথম সুশৃঙ্খল এবং বিচক্ষণ প্রজাপালক বা শাসক, যিনি সুসংগঠিত রাষ্ট্রতন্ত্রের স্রষ্টা বা জনকও। রাষ্ট্রপরিচালনার লক্ষ্যে প্রাচীন ভারতবর্ষের প্রথম সংবিধানটি ইনিই প্রণয়ন করেছেন, যা মনুসংহিতা’ নামে পরিচিত। মনুসংহিতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে মনুবাবু খুব উঁচুতে রেখেছেন ক্ষত্রিয় বা শাসক বা রাজাকে এবং ব্রাহ্মণদের। সবচেয়ে নীচে রেখেছেন শূদ্র এবং নারীদের। ক্ষত্রিয় বা শাসক বা রাজাকে এবং ব্রাহ্মণদের উঁচুতে রাখার কারণ তিনি একাধারে ব্রাহ্মণ ও রাজা। শূদ্র এবং নারীদের নীচে রাখার রাখার কারণ শূদ্ররা ভারতবর্ষের বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী এবং নারীদের শক্তি উনি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। উনি বুঝতে পেরেছিলেন নারী অপ্রতিরোধ্য, দুর্দমনীয়, বিধ্বংসী। শূদ্র ও নারীদের মধ্যে অনুশাসনের ভীতি সঞ্চার করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করাই ছিল শাসক তথা আইন-প্রণেতার উদ্দেশ্য। সেটাই স্বাভাবিক। প্রজাদের মনে ভীতি সঞ্চার করে রাষ্ট্র পরিচালনা করাই রাষ্ট্রপ্রধান মনুর কৌশল। সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকগণ দেশের আইন মানতে বাধ্য, ঠিক তেমনই মনুর যুগেও মনুসংহিতা নামক অনুশাসন বা আইন মানা বাধ্যতামূলক ছিল। অমান্য করলে হাত কেটে নেওয়া, পা কেটে নেওয়া, চোখ উপড়ে নেওয়া, শূলে চড়িয়ে হত্যা করা, হিংস্র পশুকে দিয়ে খাইয়ে দেওয়া ইত্যাদি পুরস্কার জুটত কপালে। বিদ্রোহ? এখনও হয়, তখনও হত। বিদ্রোহ দমনও হত অকথ্য পীড়ন দ্বারা। কেমন ছিল মনুর সংবিধান? এই সংবিধান যাতে সকলে অক্ষরে অক্ষরে মান্য করেন সেজন্য অনুশাসন যাঁরা প্রয়োগ করবেন তাঁরা কে সে বিষয়ে মনু নিপুণ হস্তে বর্ণনা করেছেন। প্রথমে আসি ব্রাহ্মণদের কথায়। কারণ মনু প্রথমে ব্রাহ্মণ, পরে রাজা। ব্রাহ্মণ কে সে বিষয়ে মনু কী জানিয়েছেন আমরা দেখব। মনুসংহিতার কাঠামো দ্বারা তিনি ব্রাহ্মণকে প্রকৃতপক্ষে দেবতার আসনে বসিয়ে একটি স্থায়ী বৈষম্যপূর্ণ ধর্ম প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেয়েছেন। প্রতিটি বিধানের কেন্দ্রবিন্দুতে ব্রাহ্মণ। তাঁর স্বার্থকে রক্ষা, সংহত করার নিরঙ্কুশ করাই হচ্ছে মনুর একমাত্র উদ্দেশ্য। এর জন্য যত ধরনের নিষ্ঠুরতা দরকার মনু তা অনায়সেই করেছেন। শুরু করেছেন চারবর্ণের অলৌকিক ও অবিশ্বাস্য জন্ম কাহিনি দিয়ে। মনু বলছেন–

    (১) “উত্তমাঙ্গোদ্ভবাজ্জৈষ্ঠ্যাদব্ৰহ্মণশ্চৈব ধারণাৎ।

    সর্বস্যৈবাস্য সর্গস্য ধর্মততা ব্রাহ্মণঃ প্রভুঃ”(১/৯৩)।

    অর্থাৎ, ব্রহ্মার উত্তমাঙ্গ বা মুখ থেকে উৎপন্ন বলে বর্ণচতুষ্টয়ের মধ্যে বলে এবং বেদ ধারণের কারণে ধৰ্মত ব্রাহ্মণ এই সমগ্র সৃষ্টির প্রভু।

    (২) “ভূতানাং প্রাণিনঃ শ্ৰেষ্ঠাঃ প্রাণিনাং বুদ্ধিজীবিনঃ।

    বুদ্ধিমৎসু নরাঃ শ্ৰেষ্ঠা নরেষু ব্রাহ্মণাঃ স্মৃতাঃ”॥ (১/৯৬)

    অর্থাৎ, সৃষ্ট (স্থাবর জঙ্গমাদির মধ্যে) প্রাণী শ্রেষ্ঠ, প্রাণীদের মধ্যে বুদ্ধিজীবীরা শ্রেষ্ঠ, বুদ্ধিমানদের মধ্যে মানুষ এবং মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ বলে কথিত।

    (৩) “উৎপত্তিরেব বিপ্রস্য মূর্তিধর্মস্য শাশ্বতী।

    স হি ধর্মার্থমুৎপন্নো ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে”॥ (১/৯৮)

    অর্থাৎ, ব্রাহ্মণের দেহই ধর্মের সনাতন মূর্তি। তিনি ধর্মের জন্য জাত এবং মোক্ষলাভের যোগ্য পাত্র।

    (৪) “ব্রাহ্মণো জায়মানো হি পৃথিব্যামধিজায়তে।

    ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং ধর্মকোষস্য গুপ্তয়ে”॥ (১/৯৯)

    অর্থাৎ, জাতমাত্রেই ব্রাহ্মণ পৃথিবীতে সকল লোক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হন এবং সকল সৃষ্ট পদার্থের ধর্মসমূহ রক্ষার জন্য প্রভু হন।

    (৫) “সর্বং স্বং ব্রাহ্মণেসেদ্যং যৎকিঞ্চিৎজ্জগতীগতম।

    শ্রৈষ্ঠেনাভিজনেনেদং সর্বং বৈ ব্রাহ্মণোহহতি”। (১/১০০)

    অর্থাৎ, পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সেই সব ব্রাহ্মণের সম্পত্তি। শ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্য হেতু ব্রাহ্মণ এই সবই পাওয়ার যোগ্য।

    (৬) “স্বমেব ব্রাহ্মণ্যে ভুঙতে স্বং বস্তে স্বং দদাতি চ।

    আনৃশংস্যাদব্রাহ্মণস্য ভুঞ্জতে হীতরে জনাঃ”॥ (১/১০১)

    অর্থাৎ, ব্রাহ্মণ নিজের অন্নই ভক্ষণ করেন, নিজের বস্ত্র পরিধান করেন এবং নিজের দ্রব্য দান করেন। অন্য লোকেরা যা ভোগ করে, তা ব্রাহ্মণের দয়া হেতু করে।

    কী বুঝলেন বন্ধু? ব্রাহ্মণদের আসন পাকা, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। আসুন, এবার। দেখব রাজা কে? রাজার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তটা কেমন সেটাও দেখে নিতে পারি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যাঁরা ছাত্র তাঁরা জানেন রাষ্ট্রর উৎপত্তির বিষয়ে ঐশ্বরিক মতবাদ। যাঁরা জানেন না তাঁদের জন্য বিষয়টি পুনরায় উল্লেখ করলে অত্যুক্তি হবে না বোধকরি। প্রাচীনকালে রাষ্ট্রের ঐশ্বরিক মতবাদ বহুল প্রচলিত ছিল। মধ্যযুগে সেন্ট অগাস্টাইন, সেন্ট পল, সেন্ট টমাস অ্যাকুইনাসের লেখনীতে এই মতবাদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে ১৬৮৮ সালের ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লবের পর থেকে এই মতবাদের গুরুত্ব হ্রাস পেতে শুরু করে। ঐশ্বরিক মতবাদের মূল বক্তব্য ছিল —

    (১) রাষ্ট্র ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন। এই সৃষ্টির পিছনে মানুষের কোনো ভূমিকা নেই।

    (২) রাজা হলেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি। তাই ঈশ্বরের ইচ্ছা রাজার মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়। সেইজন্য রাজার আদেশ বা নির্দেশ, যা আইনরূপে গণ্য হয়ে থাকে, তা মান্য করা সকল মানুষের একান্ত কর্তব্য। রাজার আইন মান্য না করার অর্থ হল ঈশ্বরকে অবমাননা করা।

    (৩) ঈশ্বরের বিধান অনুসারে রাজপদ উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করা যায়। রাজার মৃত্যু হলে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজা হবেন।

    (৪) রাজা যেহেতু ঈশ্বরের প্রতিনিধি সেইহেতু তিনি কখনোই অন্যায় করতে পারেন না। ঈশ্বর ছাড়া তিনি আর কারও কাছে তাঁর কাজের জন্য জবাব দিতে বাধ্য নন।

    (৫) ঈশ্বরের প্রতিনিধি এই রাজার বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ করা যায় না।

    এই ধারণা বা তত্ত্ব শুধু ভারতবর্ষের হিন্দুধর্মেই নয়– এই তত্ত্ব মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি ইত্যাদি সব ধর্মেই প্রচার করা হয়েছে। যেহেতু আমি এই রচনায় শুধুমাত্র মনু এবং মনুসংহিতা নিয়ে আলোচনা করব, সেইহেতু অন্য ধর্মের আলোচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক।

    মনুর বলছেন রাজা কে? রাজশূন্য এই জগতকে রক্ষার জন্য ইন্দ্র, বায়ু, যম, সূর্য, অগ্নি, বরুণ, চন্দ্র এবং কুবের– এই দেবতার সারভূত অংশ নিয়ে পরমেশ্বর রাজাকে সৃষ্টি করেছেন। যেহেতু এই শ্রেষ্ঠ দেবগণের অংশ থেকে রাজার সৃষ্টি হয়েছিল সেইজন্য তিনি সকল জীবকে তেজে অভিভূত করেন।

    “অরাজকে হি লোকেহস্মিন্ সর্বতো বিদ্রুতে ভয়াৎ।

    রক্ষার্থমস্য সর্বস্য রাজানমসৃজৎ প্রভুঃ॥

    ইন্দ্রানিলমার্কাণামগ্নেশ্চ বরুণস্য চ।

    চন্দ্রবিত্তেশয়োশ্চৈব মাত্রা নিত্য শাশ্বতীঃ॥

    যম্মাদেং সুরেন্দ্রাণাং মাত্রাভ্যো নির্মিত নৃপঃ।

    তস্মাদভিভবত্যেষ সর্বভূতানি তেজসা”। (মনুসংহিতা, ৭: ৩-৪-৫)

    রাজা কী? মনু বলছেন–

    (১) তিনি সূর্যের মতো চোখ ও মন সন্তপ্ত করেন। পৃথিবীতে কেউ তাঁকে মুখোমুখি অবলোকন করতে পারে না।

    (২) বালক হলেও রাজাকে মানুষ মনে করে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। ইনি মানুষের রূপে মহান দেবতা।

    (৩) অতি নিকটে গেলে আগুন একমাত্র সেটাই দগ্ধ করে, কিন্তু রাজারূপ আগুন বংশ-পশু-সম্পত্তি সহ দগ্ধ করে।

    (৪) রাজার অনুগ্রহে বিশাল সম্পত্তি লাভ হয়, যাঁর বীরত্বে জয়লাভ হয়, যাঁর ক্রোধে মৃত্যু বাস করে, তিনি প্রকৃতই সর্বতেজোময়। ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজার নিষ্কন্টক সিংহাসনও পাক্কা। কারণ মনু শাসক তথা রাজাও ছিলেন। তদুপরি নিজেই যেহেতু ব্রাহ্মণ, তাই ব্রাহ্মণদের প্রতি রাজাদের কী করণীয় কর্তব্য সেটা উল্লেখ করতে তিনি ভোলেননি। বিশেষ করে দানকর্ম। যেমন– (i) অব্রাহ্মণকে দান সমফল, ব্রাহ্মণব্রুবকে (যিনি ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেও ব্রাহ্মণের আচার-আচরণ পালন করেন না এবং নিজেকে ব্রাহ্মণ বলে শ্লাঘা করেন, তিনিই ব্রাহ্মণব্রুব) দানে দ্বিগুণ ফল, যে বেদাধ্যয়ন শুরু করেছে তাকে দানের ফল লক্ষগুণ, বেদে পারদর্শী ব্রাহ্মণকে দানের ফল অনন্ত। (ii) যুদ্ধে পরাজুখ না। হওয়া, প্রজাপালন ও ব্রাহ্মণ শুশ্রূষা রাজাদের যারপরনাই শ্রেষ্ঠ কাজ।

    তাহলে এবার হাতে রইল নারী এবং শূদ্র। পৃথিবীর সব সুখ নিজেরাই যাতে ভোগ করতে পারেন তার জন্য যা যা করা উচিত সবই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ক্ষত্রিয় এবং ব্রাহ্মণ যেমন পালকের ভূমিকায়, তেমনিই নারী এবং শূদ্র শোষিতের ভূমিকায়। যাতে নারী এবং শূদ্রেরা মাথা-চোখ তুলে দাঁড়াতে না পারে, বিদ্রোহ করতে না পারে সেইসব ব্যবস্থাই বহাল রেখেছিলেন। অল্পকিছু নমুনা আমরা দেখে নিতে পারি। প্রথমেই নারীকে দেখে নেব মনুর চোখে। মনুর চোখে নারীগণ মানুষ পদবাচ্য নন। নারী সম্পর্কেও মনুর বিধান কঠোর ও বৈষম্যমূলক। যেমন– (ক) স্ত্রীলোক পতিসেবা করবে। তাঁর স্বাধীন কোনো সত্তা নেই। (খ) নারীকে কুমারী অবস্থায় পিতা, যৌবনে স্বামী, ও বার্ধক্যে পুত্র রক্ষা করবে। (গ) স্ত্রীলোকের পৃথক কোনো যজ্ঞ, ব্রত বা উপবাস বিধান নেই। (ঘ) স্ত্রীলোকের সাক্ষী হওয়ার বা স্বাধীনভাবে ঋণ করার অধিকার নেই। (ঙ) বিধবা সাধ্বী নারী ব্রহ্মচর্য পালন করবে। পড়ুন–

    (১) স্ত্রী, পুত্র, ভৃত্য, শিষ্য এবং কনিষ্ঠ সহোদর ভ্রাতা অপরাধ করলে সূক্ষ্ম দড়ির দ্বারা কিংবা বেতের দ্বারা শাসনের জন্য প্রহার করবে।

    “ভার্যা পুত্ৰশ্চ দাসশ্চ প্রেষ্যো ভ্রাতা চ সোদরঃ।

    প্রাপ্তাপরাধাস্তাড্যাঃ স্যূ রজ্জ্বা বেণুদলেন বা॥” (৮/২৯৯)।

    (২) পুত্র ও দাস– এরা তিনজনই ধনহীন; এরা তিনজনেই যা কিছু অর্থ উপার্জন করবে তা তাদের যে মালিক তারই হয়।

    “ভার্যা পুত্ৰশ্চ দাসশ্চ ত্রয় এবাধনাঃ স্মৃতাঃ।

    যৎ তে সমধিগচ্ছন্তি যস্য তে তস্য তদ্ধনম্॥” (৮/৪১৬)

    (৩) বেশি নিদ্রা যাওয়া, কেবল বসে থাকার ইচ্ছা, শরীরকে অলংকৃত করা, কাম অর্থাৎ পুরুষকে ভোগ করার আকাঙ্ক্ষা, অন্যের প্রতি বিদ্বেষ, নীচ হৃদয়তা, অন্যের বিরুদ্ধাচরণ করা এবং কুচৰ্মা অর্থাৎ নীচ পুরুষকে ভজনা করা– স্ত্রীলোকদের এই সব স্বভাব মনু এদের সৃষ্টিকালেই করে গিয়েছে।

    “শয্যাসনমলঙ্কারং কামং ক্রোধমনার্জ।

    দ্রোহভাবং কুচৰ্য্যাঞ্চ স্ত্রীভ্যো মনুরকল্পয়ৎ॥” (৯/১৭)।

    (৪) টাকাকড়ি ঠিকমতো হিসাব করে জমা রাখা এবং খরচ করা, গৃহ ও গৃহস্থালী শুদ্ধ রাখা, ধর্ম-কর্ম সমূহের আয়োজন করা, অন্নপাক করা এবং শয্যাসনাদির তত্ত্বাবধান করা- এই সব কাজে স্ত্রীলোকদের নিযুক্ত করে অন্যমনস্ক রাখবে।

    “অর্থস্য সংগ্রেহে চৈনাং ব্যয়ে চৈব নিযোজয়েৎ।

    শৌচে ধর্মেংন্নপ্যাঞ্চ পারিণাহ্যস্য বেক্ষণে॥” (৯/১১)।

    এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়। দিলে রচনাটি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হয়ে যাবে। যাঁরা আরও বেশি জানতে কৌতূহলী তাদের মনুসংহিতার নবম অধ্যায়টি মন দিয়ে পড়তে অনুরোধ করব। একই সঙ্গে এটাও উল্লেখ চাই, মনু তাঁর গ্রন্থে নারীদের বিষয়ে যেটুকু ভালো ভালো আপাত মঙ্গলদায়ক নির্দেশ দিয়েছেন, সেগুলি কোনোটাই নারীদের কথা ভেবে নয়, পুরুষদের কথা ভেবে। কারণ মনু পুরুষ ছিলেন। পক্ষপাতিত্বের শিরোমণি।

    মনু যেটা ছিলেন না, তা হল শূদ্র– কারণ মনু ছিলেন ব্রাহ্মণ। আর তাই শূদ্র জনজাতির প্রতি মনু এত নির্দয়তা, নিষ্ঠুরতা। এঁরা সংখ্যায় বৃহৎ হলেও, মর্যাদায়-অধিকারে অতি ক্ষুদ্র করে দেওয়া হল, ঘৃণ্য করে দেওয়া হল। এবার দেখি শূদ্র সম্পর্কে মনু কী বলেন —

    (১) শূদ্র বা দাসদের নিজস্ব কোনো সম্পত্তি রাখার অধিকার নেই।

    (২) দাস ও শূদ্রের ধন ব্রাহ্মণ অবাধে নিজের কাজে প্রয়োগ করবেন।

    (৩) শূদ্র অর্থ সঞ্চয় করতে পারবে না। কারণ তাঁর সম্পদ থাকলে সে গর্বভরে ব্রাহ্মণের উপর অত্যাচার করতে পারে।

    (৪) প্রভু কর্তৃক পরিত্যক্ত বস্ত্র, ছত্র, পাদুকা ও তোষক প্রভৃতি শূদ্র ব্যবহার করবে।

    (৫) প্রভুর উচ্ছিষ্ট তাঁর ভক্ষ্য।

    (৬) দাস বৃত্তি থেকে শূদ্রের কোনো মুক্তি নেই।

    (৭) যজ্ঞের কোনো দ্রব্য শূদ্র পাবে না।

    (৮) ব্রাহ্মণের পরিবাদ বা নিন্দা করলে শূদ্রের জিহ্বাছেদন বিধেয়।

    (৯) ব্রাহ্মণ শূদ্রের নিন্দা করলে যৎসামান্য জরিমানা দেয়।

    (১০) ব্রাহ্মণ কর্তৃক শূদ্ৰহত্যা সামান্য পাপ। এই রূপে হত্যা পেঁচা, নকুল ও বিড়াল ইত্যাদি হত্যার সমান।

    (১১) শূদ্র কর্তৃক ব্রাহ্মণ হত্যার বিচার মৃত্যুদণ্ড।

    (১২) শূদ্র সত্য কথা বলছে কি না তাঁর প্রমাণ হিসাবে তাকে দিব্যের আশ্রয় নিতে হবে। এতে তাকে জলন্ত অঙ্গারের উপর দিয়ে হাঁটতে হয় অথবা জলে ডুবিয়ে রাখা হয়। অদগ্ধ অবস্থায় অথবা জলমগ্ন না-হয়ে ফিরলে তাঁর কথা সত্য বলে বিবেচিত হবে।

    (১৩) দ্বিজকে (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য) প্রহার করলে শূদ্রের হাত কেটে ফেলা বিধেয়।

    (১৪) ব্রাহ্মণের সঙ্গে একাসনে বসলে তাঁর কটিদেশে তপ্তলৌহ দ্বারা চিহ্ন একে তাকে নির্বাসিত করা হবে অথবা তাঁর নিতম্ব এমনভাবে ছেদন করা হবে যাতে তাঁর মৃত্যু হয়।

    (১৫) দ্বিজের ন্যায় উপবীত বা অন্যান্য চিহ্ন ধারণ করলে শূদ্রের মৃত্যুদণ্ড বিধেয়।

    (১৬) যে পথ দিয়ে উচ্চ বর্ণের লোকেরা যাতায়াত করেন, সেই পথ শূদ্রের মৃতদেহও বহন করা যাবে না।

    (১৭) ব্রাহ্মণের গায়ে থুথু দিলে তার ওষ্ঠছেদন হবে। মূত্রপুরীষ নিক্ষেপ করলে যথাক্রমে যৌনাঙ্গ ছেদন করা হবে এবং অধোবায়ু ত্যাগ করলে গুহ্যদেশ ছেদন করা হবে।

    (১৮) শূদ্র যদি হিংসার বশবর্তী হয়ে ব্রাহ্মণের চুল, চিবুক, পা, দাড়ি, ঘাড় এবং অণ্ডকোষে হাত দেয় তাহলে নির্বিচারে তাঁর দুটি হাতই কেটে দেওয়া হবে। ভগবানের নির্দেশ বলে কথা!

    এখানেই শেষ নয়। চমকে যাওয়ার মতো নির্দেশ। আরও পড়ুন–

    (১) সবর্ণা স্ত্রী বিবাহ না করে শূদ্রা নারীকে প্রথমে বিবাহ করে নিজ শয্যায় গ্রহণ করলে ব্রাহ্মণ অধধাগতি (নরক) প্রাপ্ত হন; আবার সেই স্ত্রীতে সন্তানোৎপাদন করলে তিনি ব্রাহ্মণত্ব থেকে ভ্রষ্ট হয়ে পড়েন। অর্থাৎ সমান। জাতীয় নারী বিবাহ না করে দৈবাৎ শূদ্রা বিবাহ করলেও তাতে সন্তান উৎপাদন করা ব্রাহ্মণের উচিত নয়।

    “শূদ্রাং শয়নমারোপ্য ব্রাহ্মণে যাত্যধোগতিম্।

    জনয়িত্বা সুতং তস্যাং ব্রাহ্মণ্যাদেব হীয়তে॥” (৩/১৭)

    (২) কোনও দ্বিজাতি-নারী (অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ত্রিয় ও বৈশ্য নারী স্বামীর দ্বারা রক্ষিত হোক বা না-ই হোক, কোনও শূদ্র যদি তার সাথে মৈথুন ক্রিয়ার দ্বারা উপগত হয়, তাহলে অরক্ষিতা নারীর সাথে সঙ্গমের শাস্তিস্বরূপ তার সর্বস্ব হরণ এবং লিঙ্গচ্ছেদনরূপ দণ্ড হবে, আর যদি স্বামীর দ্বারা রক্ষিতা নারীর সাথে সম্ভোগ করে তাহলে ওই শূদ্রের সর্বস্বহরণ এবং মারণদণ্ড হবে।

    “শূদ্রো গুপ্তমগুপ্তং বা দ্বৈজাতং বর্ণমাবস।

    অগুপ্তমঙ্গসর্বস্বৈগুপ্তং সর্বেণ হীয়তে॥” (৮/৩৭৪)

    (৩) ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই দ্বিজাতিরা যদি মোহবশত (ধনলাভজনিত অবিবেকবশতই হোক অথবা কামপ্রেরিত হয়েই হোক) হীনজাতীয় স্ত্রী বিবাহ করেন, তাহলে তাদের সেই স্ত্রীতে সমুৎপন্ন পুত্রপৌত্রাদির সঙ্গে নিজ নিজ বংশ শীঘ্রই শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হয়।

    “হীনজাতিস্ত্রিয়ং মোহাদুঘহন্তো দ্বিজাতয়ঃ।

    কুলান্যেব নয়ন্ত্যাশু সসন্তানানি শূদ্ৰতাম্॥” (৩/১৫)

    (৪) শূদ্রা স্ত্রী বিবাহ করলেই ব্রাহ্মণাদি পতিত হন– এটি অত্রি এবং উতথ্যতনয় গৌতম মুনির মত। শৌনকের মতে, শূদ্রা নারীকে বিবাহ করে তাতে সন্তানোৎপাদন করলে ব্রাহ্মণাদি পতিত হয়। ভৃগু বলেন, শূদ্রা স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানের সন্তান হলে ব্রাহ্মণাদি দ্বিজাতি পতিত হয়। (মেধাতিথি ও গোবিন্দরাজের মতে, কেবলমাত্র ব্রাহ্মণের শূদ্রা স্ত্রীর ক্ষেত্রেই এই পাতিত্য বুঝতে হবে। কুল্লুক ভট্টের মতে, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য- এই তিনজাতির শুদ্রা স্ত্রী সম্বন্ধেই এই পাতিত্য হবে)।

    “শূদ্রাবেদী পতত্যত্রেরুতথ্যতনয়স্য চ।

    শৌনকস্য সুলতাৎপত্তা তদপত্যতয়া ভূগোঃ॥” (৩/১৬)।

    (৫) সবর্ণা স্ত্রী বিবাহ না করে শূদ্রা নারীকে প্রথমে বিবাহ করে নিজ শয্যায় গ্রহণ করলে ব্রাহ্মণ অধধাগতি (নরক) প্রাপ্ত হন; আবার সেই স্ত্রীতে সন্তানোৎপাদন করলে তিনি ব্রাহ্মণত্ব থেকে ভ্রষ্ট হয়ে পড়েন অতএব সমানজাতীয় নারী বিবাহ না করে দৈবাৎ শূদ্রা বিবাহ করলেও তাতে সন্তান উৎপাদন করা ব্রাহ্মণের উচিত নয়]।

    “শূদ্রাং শয়নমারোপ্য ব্রাহ্মণণা যাত্যধোগতিম্।

    জনয়িত্বা সুতং তস্যাং ব্রাহ্মণ্যাদেব হীয়তে॥” (৩/১৭)

    (৬) শূদ্রা ভার্য্যা গ্রহণের পর যদি ব্রাহ্মণের দৈবকর্ম (যেমন– দর্শপূর্ণমাস যজ্ঞ প্রভৃতি এবং দেবতার উদ্দেশ্যে যে ব্রাহ্মণভোজনাদি হয়, তা), পিত্রকর্ম (পিতৃপুরুষের প্রতি করণীয় কর্ম, যথা, শ্রাদ্ধ, উদক-তর্পণ প্রভৃতি) এবং আতিথেয় কর্ম (যেমন– অতিথির পরিচর্যা, অতিথিকে ভোজন দান প্রভৃতি) প্রভৃতিতে শূদ্রা ভার্যার প্রাধান্য থাকে অর্থাৎ ঐ কর্মগুলি যদি শূদ্রা স্ত্রীকর্তৃক বিশেষরূপে সম্পন্ন হয়, তাহলে সেই দ্রব্য পিতৃপুরুষগণ এবং দেবতাগণ ভক্ষণ করেন না এবং সেই গৃহস্থ ঐ সব দেবকর্মাদির ফলে স্বর্গেও যান না (অর্থাৎ সেই সব কর্মানুষ্ঠান নিষ্ফল হয়)।

    “দৈবপিত্যাতিথেয়ানি তৎপ্রধানানি যস্য তু।

    নান্তি পিতৃদেবাস্তং ন চ স্বর্গং স গচ্ছতি॥” (৩/১৮)

    (৭) কোনো হীনজাতীয় পুরুষ যদি কোনও উচ্চবর্ণের কন্যাকে তার ইচ্ছা অনুসারেও সম্ভোগ করতে থাকে, তাহলে সেই পুরুষের বধদণ্ড হবে। কিন্তু নিজের সমানজাতীয় কন্যার সাথে ঐরকম করলে সে ঐ কন্যার পিতাকে শুল্ক দেবে, যদি তার পিতা ঐ শুল্ক নিতে ইচ্ছুক হয়।

    “উত্তমাং সেবমানস্তু জঘন্যো বধমহতি।

    শুল্কং দদ্যাৎ সেবমানঃ সমামিচ্ছেৎ পিতা যদি॥” (৮/৩৬৩)।

    (৮) কোনও দ্বিজাতি-নারী স্বামীর দ্বারা রতি হোক বা না-ই হোক, কোনও শূদ্র যদি তার সাথে মৈথুন ক্রিয়ার দ্বারা উপগত হয়, তাহলে অরক্ষিতা নারীর সাথে সঙ্গমের শাস্তিস্বরূপ তার সর্বস্ব হরণ এবং লিঙ্গচ্ছেদনরূপ দণ্ড হবে; আর যদি স্বামীর দ্বারা অরক্ষিতা নারীর সাথে সম্ভোগ করে তাহলে ঐ শূদ্রের সর্বস্বহরণ এবং মারণদণ্ড হবে।

    “শূদ্রো গুপ্তমগুপ্তং বা দ্বৈজাতং বর্ণমাবস।

    অগুপ্তমঙ্গসর্বস্বৈগুপ্তং সর্বেণ হীয়তে॥” (৮/৩৭৪)।

    (৯) শূদ্র পুরুষ থেকে প্রতিলোমক্রমে জাত অর্থাৎ শূদ্র পুরুষের ঔরসে বৈশ্যা স্ত্রীতে জাত আয়োগব, ক্ষত্রিয়া স্ত্রীতে জাত ক্ষত্তা এবং ব্রাহ্মণী স্ত্রীতে জাত চণ্ডাল–এই তিন জাতি পুত্ৰকাজ করার অযোগ্য। এই জন্য এরা অপসদ অর্থাৎ নরাধম বলে পরিগণিত হয়। এদের মধ্যে চণ্ডাল হলো অস্পৃশ্য।

    “আয়োগবশ্চ ক্ষত্তা চ চাণ্ডালশ্চাধমো নৃণাম্‌।

    প্রাতিলোম্যেন জায়ন্তে শূদ্রাদপসদাস্ত্রয়ঃ॥” (১০/১৬)

    (১০) চণ্ডাল, শ্বপচ প্রভৃতি জাতির বাসস্থান হবে গ্রামের বাইরে। এইসব জাতিকে ‘অপপাত্র করে দিতে হয়; কুকুর এবং গাধা হবে তাদের ধনস্বরূপ।

    “চণ্ডালশ্বপচানাং তু বহির্গামাৎ প্রতিশ্রয়ঃ।

    অপপাত্রাশ্চ কর্তব্যা ধনমেষাং শ্বগর্দভম্॥” (১০/৫১)

    বলা হয়েছে, নারীর কোনো জাত নেই। ব্রাহ্মণ-ঘরে জন্মালেও সে ব্রাহ্মণ নয়। নারীর উপনয়ন নেই, তাই উপবীতও নেই। নারী কখনোই দ্বিজ নয়। নারীর পৌরহিত্যের অধিকার নেই। নেই কেবল নারী ও শূদ্রদের। যা আছে সব ব্রাহ্মণদের। যে দেশের নাগরিকের বৃহৎ অংশ (নারী এবং শূদ্র) বঞ্চিত, অবহেলিত, অধিকারহীন, ঘৃণিত, ধিকৃত, অশিক্ষিত থাকে –সে দেশ কখনোই অগ্রবর্তী হতে পারে না। হয়ওনি। মনু চেয়েছেন অগ্রবর্তী হোক কতিপয় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় তথা রাজা এবং বৈশ্যদের (যদিও বৈশ্যদের জন্য তেমন কোনো নিদান নেই। কারণ বৈশ্যরা নিজগুণেই প্রতিষ্ঠিত)।

    মনুসংহিতার ছত্রে ছত্রে এঁদেরই সমৃদ্ধর কথা ভেবেছেন। মনুর এই মনুসংহিতার অনুশাসনই পরবর্তীতে হিন্দু বা হিন্দুত্ববাদ রূপে প্রকাশিত হয়েছে। হিন্দুধর্মের জাতপাত এর একটা বড়ো সমস্যা। এই সমস্যা এখনও গর্বের সঙ্গে হিন্দুরা অনুসরণ করে থাকে। আধুনিক এবং স্বাধীন ভারতবর্ষে রাষ্ট্রীয় আইন বা সংবিধান থাকলেও বহুকাল ধরে বিনা প্রতিবাদে চালু থাকায় রাষ্ট্রের আইনের চেয়ে ‘মনুর বিধান অনেক বেশি শক্ত ও দৃঢ়মূল হয়ে আছে। স্বাধীন ভারতের সংবিধান প্রণেতা ড. বি আম্বেদকরও খুব বেশি মনুবাদকে নড়াতে পারেননি। হরিজনদের উপরে উঠিয়ে প্রয়াসে তাদের সংরক্ষণ করা ছাড়া বিশেষ কিছু করেছেন বলে জানা নেই। সেই সংরক্ষণও এমনভাবে প্রয়োগ হয়, যেখানে হরিজনেরা যেই তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই আছে, এগিয়ে আছে এগিয়ে থাকারাই। মনুর এই ধরনের মানসিক বৈশিষ্ট্য মনুষ্যচিত, ভগবানোচিত নয়। মানুষই ভোগলিপ্সায় এইসব বিভাজন, বৈষম্য, নিষ্ঠুরতা নির্মাণ করে থাকবে, দেবতা বা ভগবান নয়। দেবতা বা ভগবান পরম করুণাময়, ক্ষতিকর হতে পারে না। অতএব মনু ভগবান নয়, মানুষ– দোষেগুণে তমোগুণসম্পন্ন মানুষ, মাননীয় শাসকমাত্র।

    ড. আম্বেদকর ভারতের গরিব ‘মহর’ পরিবারে (তখন অস্পৃশ্য জাতি হিসাবে গণ্য হত) জন্মগ্রহণ করেন। সেই কারণেই হয়তো তফসিলি জাতি এবং উপজাতিদের সংরক্ষণ করেছিলেন। উনি হয়তো চেয়েছিলেন আরও পরিবর্তন, কিন্তু ভারতবর্ষের অস্পৃশ্য (Untouchables or Untouchables community) প্রথার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেলেন। তিনি বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরিত হন এবং হাজারো শত (Hundreds of Thousands) অস্পৃশ্যদের থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম (Theravada Buddhism) স্ফুলিঙ্গের মতো রূপান্তরিত করে সম্মানিত হয়েছিলেন।

    ১৯২৭ সালে আম্বেদকর অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি গণ-আন্দোলন শুরু করেন এবং সুপেয় জলের উৎসদানে সংগ্রাম চালিয়ে যান (উল্লেখ্য, সে সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরে নিন্মবর্ণের প্রবেশের অধিকার ছিল না)। মহদে সত্যগ্রহ নামের অস্পৃশ্যদের (অন্ত্যজ জাতির) জন্য সংগ্রাম করে সুপেয় জল পানের অধিকার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তাঁকে ১৯২৫ সালে বোম্বে প্রেসিডেন্সি কমিটিতে নিয়োগ করা হয়েছিল, যাতে করে তিনি সমস্ত ইউরোপীয় সিমন কমিশনের সঙ্গে কাজ করতে পারেন। সমগ্র ভারতজুড়ে স্ফুলিঙ্গের আকারে ব্যাপক আন্দোলন ছড়িয়ে পরে এবং যখন এই তালিকাটি অধিকাংশ ভারতীয় কর্তৃক ত্যাগ করা হয়েছিল, আম্বেদকর নিজে ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক সুপারিশের জন্য একটি পৃথক সুপারিশ নামা লিখিত দেন।

    অপরদিকে আম্বেদকর অস্পৃশ্যদের পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর কথা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধি অস্পৃশ্যদের জন্য গঠিত পৃথক নির্বাচকমন্ডলীর প্রচণ্ডভাবে বিরোধিতা করেন, যদিও তিনি অন্য সকল সংখ্যালঘুদের যেমন মুসলমানদের ও শিখদের পৃথক নির্বাচকমন্ডলী (Separate Electorate) বিনা দ্বিধায় মেনে নেন এই বলে যে, তিনি অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ের গঠনকৃত নির্বাচকমন্ডলী হিন্দুসমাজকে ভবিষ্যতে বিভক্ত এবং উচ্চশ্রেণীর ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ১৯৩২ সালে যখন ব্রিটিশরা আম্বেদকরের সাথে একমত হন এবং পৃথক নির্বাচকমন্ডলীদের ঘোষণা করেন, তখন মহাত্মা গান্ধী পূনের এরোদা কেন্দ্রীয় কারাগারে (Yerwada central jail) শুধুমাত্র অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের পৃথক নির্বাচকমন্ডলীর প্রতি উপবাস শুরু করেন। গান্ধীর এই উপবাস (fast) ভারতজুড়ে বেসামরিকদের মাঝে প্রবল বিক্ষোভের উদ্দীপনা জোগায় এবং ধর্মীয় গোঁড়াবাদী নেতারা (Orthodox Politicians), কংগ্রেস নেতারা কর্মীদের মধ্যে মদনমোহন মালোভি ও পালঙ্কর বালো ও তাঁর সমর্থকরা আম্বেদকরের সঙ্গে এরাভাদে (Yeravada) যৌথ বৈঠক করেন। গান্ধিবাদীদের প্রবল চাপের মুখে (Massive coercion) 422 sypoginta sfocate (Communal reprisal) ও অস্পৃশ্য সম্প্রদায়কে নির্মূলীকরণের আশঙ্কায় আম্বেদকর পৃথক নির্বাচকমন্ডলী বাতিল করতে সম্মত হন। এই চুক্তির পরে গান্ধি উপবাস পরিত্যাগ করেন, ইতিহাসে এটি “পুনে চুক্তি” নামে পরিচিত। চুক্তির ফলশ্রুতিতে আম্বেদকর পৃথক নির্বাচকমন্ডলী গঠনের দাবি ছেড়ে দেন যা আম্বেদকর গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের আগে ব্রিটিশ সাম্প্রদায়িক কর্তৃক শর্তসাপেক্ষে মঞ্জুর করে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হন। একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন অস্পৃশ্যদের জন্য সংরক্ষিত হয়। এই চুক্তিতে যাকে বলা হয় অস্পৃশ্য সম্প্রদায় (Depressed Class)। আম্বেদকর হিন্দুবাদকে কর্কশ ভাষায় সমালোচনা করেন তাঁর “দ্য আটাচেব্যলস : এ থিসিস অন দ্য অরিজিনস অব আটাচেব্যলিটি” রচনায়–The Hindu Civilisation…. is a diabolical contrivance to suppress and enslave humanity. Its proper name would be infamy. What else can be said of a civilisation which has produced a mass of people…. who are treated as an entity beyond human intercourse and whose mere touch is enough to cause pollution? (হিন্দু সভ্যতা… হচ্ছে মানবতাকে দমন এবং পরাভূত করতে একটি পৈশাচিক কৌশল। এর প্রকৃত নাম হবে সামাজিক কুখ্যাতি। কাকে সভ্যতা বলে ডাকা যায়, যার একগাদা মানুষ…., যাদের সত্ত্বা মানব সম্পর্কের নিচে গণ্য হয় ও শুধু যাদের ছোঁয়া দূষণের জন্য যথেষ্ট?)।

    ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন-শোষণে নিপীড়িত নিম্নশ্রেণির মানুষের সামনে ভীমরাও রামজি আম্বেদকর আলোর মশাল নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন। জাতপাত থেকে দলিত সম্প্রদায়কে চিরতরে মুক্তি দিতে তিনি বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। নৃতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে আম্বেদকর আবিষ্কার করেন মহরেরা আসলে প্রাচীন ভারতীয় বৌদ্ধ। আম্বেদকর তাঁর সারাজীবনে বৌদ্ধ ধর্ম অধ্যয়ন করেন, ১৯৫০ এর সময়ে তিনি এই ধর্মে তাঁর সম্পূর্ণ মনোযোগ দেন এবং শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ করেন (তারপর শিলং) বৌদ্ধ পণ্ডিতদের ও ভিক্ষুদের একটি সম্মেলনে যোগ দিতে। যখন তিনি পুনের কাছাকাছি একটি নতুন বৌদ্ধমন্দির অর্পণ করেন, তখন আম্বেদকর ঘোষণা দেন যে, তিনি বৌদ্ধধর্মের উপর একটি বই লিখেছেন, যত শীঘ্রই তিনি বইটি শেষ করবেন, তিনি সাদামাটাভাবে এই ধর্মে গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ যন্ত্রণার দীর্ঘ ৫৯ বছর বাবাসাহেব হিন্দুধর্মে যাপন করলেও, বাকি শেষ ৬ বছর তিনি বৌদ্ধধর্মেই ছিলেন। আম্বেদকর তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী সভিতা আম্বেদকর (বিবাহ পূর্ব নামঃ সাদা কবির), তাঁর স্বামীর সঙ্গে তিনিও বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং ২০০২ সালে বৌদ্ধাবলম্বী হিসাবেই মারা যান।

    বর্তমানে মনুস্মৃতি প্রথম থেকেই এরূপ ছিল না। আদি সংহিতায় এক লক্ষ শ্লোক ছিল, কিন্তু এখন মাত্র ২৬৯৪ টা শ্লোক পাওয়া যায়। প্রথম অধ্যায়ের ৫৮ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে, ব্রহ্মা এই শাস্ত্র প্রস্তুত করে মনুকে শিখিয়েছিলেন। মনু, মরীচি প্রভৃতি মুনিগণকে শিখিয়েছিলেন। প্রথম অধ্যায়ের ৫৯ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে, ভৃগু এই শাস্ত্র মুনিগণকে শোনাবেন। এর থেকে বোঝা যায়, অন্তত তিনটি স্তরের মধ্য দিয়ে এই গ্রন্থ বর্তমান আকার ধারণ করেছে। এই গ্রন্থের রচনাকাল নির্ণয় করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। পণ্ডিতপ্রবরগণ কেউ কেউ বলেন, আনুমানিক ২০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তীকালে রচিত হয়েছে। স্যর উইলিয়াম জোনসের মতে খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতক, শ্লেগেলের মতে খ্রিস্টপূর্ব দশম শতক, এলফিনস্টোনের মতে খ্রিস্টপূর্ব নবম শতক, বুহলারের মতে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে মনুসংহিতা রচিত হয়েছিল। অদ্যাপি মনুর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তাঁর স্মৃতির দোহাই দিয়ে পণ্ডিত সমাজ পদে পদেই দেওয়া হয়। স্মৃতিনিবন্ধগুলোতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মনুর বচনের বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। মনুর প্রভাব ভারতের চতুঃসীমাতেই আবদ্ধ নয়– ব্রহ্মদেশ বা মায়ানমার, সিংহল বা শ্রীলঙ্কা, পারস্য বা ইরান, চিন, জাপান এবং সুদূর প্রাচ্যের কিছু দেশে তাঁর প্রভাব ব্যাপক এবং সুগভীর। মায়ানমারের কিছু আইনের গ্রন্থে মনুর ঋণ স্পষ্টই স্বীকৃত হয়েছে। শ্রীলঙ্কার ‘চুলবংশ’ নামক গ্রন্থে মনুর রাজধর্মের উল্লেখ বারবার করা হয়েছে। চিনে প্রাপ্ত একটি পুথিতে মনুর আইনকানুনের উল্লেখ পাওয়া যায়। জাপানে উপনিবেশ স্থাপনকারী কিছু আর্য সেই দেশে মনুর ধর্মশাস্ত্র প্রবর্তিত করেছিলেন বলে মনে হয়। প্রাচীন পারস্য ইরানের দেবগোষ্ঠীর মধ্যে আছেন বৈবস্বত মনু।

    বলা হয় হিন্দুদের প্রধান ধর্ম গ্রন্থ বেদ। মনুসংহিতাও হিন্দু পৌরাণিক গ্রন্থ। এই গ্রন্থকে হিন্দু আইনের ভিত্তিস্বরূপ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। হিন্দুধর্মের অবশ্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ, আচার-আচরণ, ধর্মীয় ও সামাজিক ক্রিয়াকলাপের বিধিবিধান সম্পর্কে এই গ্রন্থে আলাপ করা হয়েছে। মনু কর্তৃক সংকলিত বলে এর নাম মনুসংহিতা। কথিত আছে, এই গ্রন্থটি প্রথম স্বায়ম্ভুব মনু রচনা করেছিলেন। বেদ হিন্দুদের আদি গ্রন্থ এবং এই গ্রন্থের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেই ‘মনুসংহিতা’ বা ‘মনুস্মৃতি’ রচিত হয়েছে একথা বলা যায়। অতএব হিন্দুধর্ম মূলত মনুসংহিতা-নির্ভর। হিন্দু এবং হিন্দুবাদের আগাপাছতলাই মনু এবং মনুসংহিতা। মনুকে যদি আদি মানব বলা হয়, তাহলে হিন্দুদের কাছে ইনি প্রাতঃস্মরণীয় হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি কোনো এক অজানা কারণে। মনুকে আদি মানব বলা হলেও নিশ্চয় অন্য ধর্মের মানে পৃথিবীর অন্য মানুষদের তিনি আদি নন, তিনি শুধু হিন্দুমানবদেরই আদি মানব, তাই নয় কি?

    মনুস্মৃতি ও মহাভারত গ্রন্থদুটিতে কতকগুলি শ্লোকের হুবহু মিল পাওয়া যায়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিমার্জন হলেও একইরকম। বস্তুত মনুর গ্রন্থ আমাদের কাছে আদিরূপে পৌঁছোয়নি। বর্তমান মহাভারত বহুদিন যাবৎ বিবর্তনেরই রূপ। সুতরাং মহাভারতের কাছে মনুসংহিতা ঋণী, নাকি মনুসংহিতার কাছে মহাভারত ঋণী– তা বলা প্রায় অসম্ভব। এই দুই গ্রন্থে এমন কিছু শ্লোক আছে যেগুলিতে শব্দগত সাদৃশ্য না-থাকলেও ভাবগত সাদৃশ্য বিদ্যমান।

    ‘মনুসংহিতা’-য় কী কী আছে? ২৬৯৪ টি শ্লোকে সন্নিবেশিত গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলো হল– (ক) পৃথিবীর উৎপত্তি (খ) বিভিন্ন সংস্কারের নিয়ম (গ) ব্রতচারণ (ঘ) বিবাহের নিয়মাবলি (ঙ) অপরাধের শাস্ত্রীয় বিধি (চ) শ্রাদ্ধবিধি (ছ) খাদ্যাখাদ্য বিধি (জ) বিভিন্ন বর্ণের কর্তব্য (ঝ) বর্ণাশ্রম বিধি (ঞ) স্ত্রী পুরুষের পারস্পরিক ধর্ম (ট) সম্পত্তি বন্টনের বিধি (ঠ) সংকর বর্ণের বিবরণ

    (ড) জাতিধর্ম (ঢ) কুলধর্ম (ণ) ব্রাহ্মণের অধিকার ও করণীয় এবং (ত) রাজা প্রজার পারস্পরিক কর্তব্য ইত্যাদি।

    হিন্দুদের ধর্মভিত্তিক আইন ও সামাজিক রীতি নীতি পরিচালিত হয় আরেকটি গ্রন্থ ‘মনুসংহিতা’ বা ‘মনুস্মৃতি’র উপর ভিত্তি করে। বেদের নির্যাস নিয়েই আরোপিত এই ধর্মটির প্রচারিত সংবিধান হয়ে উঠল মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতা। এর মাধ্যমে যে সমাজ-কাঠামোর নির্মাণ যজ্ঞ চলতে থাকল তার ভিত্তি এক আজব চতুর্বর্ণ প্রথা। যেখানে আদিনিবাসী অনার্যরা হয়ে যায় নিম্নবর্ণের শূদ্র, যারা কেবলই উচ্চতর অন্য তিন বর্ণ ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্যের অনুগত সেবাদাস। কোনো সমাজ-সংগঠনে বা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান যজ্ঞে অংশগ্রহণের অধিকার শূদ্রদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়। আর যারা এই ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে প্রতিবাদী-বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চাইল, এদেরকেই সুকৌশলে করা হল অচ্ছুৎ, দস্যু, অসুর, দৈত্য, সমাজচ্যুত বা অস্পৃশ্য সম্প্রদায়। পৃথিবীতে যতগুলো কথিত ধর্মগ্রন্থ আছে তার মধ্যে মনে হয় অন্যতম বর্বর, নীতিহীন, শঠতা আর অমানবিক প্রতারণায় পরিপূর্ণ গ্রন্থটির নাম হচ্ছে ‘মনুস্মৃতি’ বা ‘মনুসংহিতা’।

    এ পর্যন্ত পাঠ করে যাঁরা ভাবছেন মনু খুবই নৃশংস ধরনের আইনপ্রণেতা ছিলেন, তাঁদের বলব ভুল ভাবছেন। ১২ টি অধ্যায়ের ২৬৯৪ টি শ্লোক জুড়ে মনু কেবলই নৃশংসতার পরিচয় লিপিবদ্ধ করেননি, অসংখ্য উদার এবং কল্যাণকর মানসিকতার বিধানও সংযোজন করেছেন। দুর্ভাগ্য এই যে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালকগণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেইসব কল্যাণকর বিধানগুলির পথ মাড়াননি এবং অত্যন্ত সচেতনভাবেই এড়িয়ে গেছেন। প্রচুর উদাহরণ দেওয়া যায়, তাতে প্রবন্ধটির কলেবর বৃদ্ধি হোক আমি তা চাই না। দুটি উদাহরণই উল্লেখ করব–

    (১) “যদি কোনো ব্যাক্তির স্ত্রী অথবা সন্তান না থাকে তাহলে তার সম্পত্তি তার ভাই-বোনদের মাঝে সমান ভাগে ভাগ করে দেবে। যদি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা তার ভাই-বোনদের মাঝে প্রাপ্য অংশ প্রদান করতে অস্বীকৃত জানায় তাহলে আইন অনুযায়ী সে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য” (৯/২১২)।

    (২) “নারীর সুরক্ষা বিধান নিশ্চিত করার জন্য মনু আরও কঠোরতর শাস্তি বিধানের পরামর্শ দিয়েছেন তাদের উপর যারা নারীর সম্পত্তি হনন করার চেষ্টা করবে, এমনকি সে তার নিকট-আত্মীয় হলেও তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে” (৯/২১৩) অথচ নারীকে বহুকাল সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে, আজ তক। নানা কৌশলে নারীকে পিতামাতার সম্পত্তি থেকে দূরে রাখা হয়েছে। নারীর সম্পত্তির অধিকার বিষয়ে আইন আছে বটে, কিন্তু ওই পর্যন্তই। হাজার হাজার বছর ধরে মনুর বিধান যেমন মনুসংহিতায় বন্দি হয়েছিল, আধুনিক আইনও ওইভাবেই প্রায়-অপ্রাসঙ্গিক হয়ে আছে। দাবি করলে পাওয়া যায় বটে, না দাবি করলে কিছুই নেই।

    পরিশেষে বলব– ব্রাহ্মণ্যবাদের আকর গ্রন্থ শ্রুতি বা ‘বেদ’-এর নির্যাসকে ধারণ করে যেসব স্মৃতি বা শাস্ত্রগ্রন্থ রচিত হয়েছে বলে কথিত, তার শীর্ষে অবস্থান করছে মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতা। তাই মনুসংহিতা ও ব্রাহ্মণ্যবাদকে আলাদা করে দেখার উপায় নেই। সাধারণত ব্রাহ্মণ্যবাদীরা নিজেদেরকে হিন্দু বলে পরিচয় দেয়। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ছাড়া কেউই হিন্দু নয়। ব্রাহ্মণ্যবাদে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অদম্য চেষ্টা করে যাচ্ছে একশ্রেণির মূলনিবাসী। হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলগুলিকে অক্সিজেন জোগাচ্ছে। কারণ মুসলিম-বিদ্বেষ। মুসলিমদের ভারত থেকে উৎখাত করাই এঁদের মূল স্বপ্ন। ওরা এটা বুঝতে পারছে না, সত্যিই যদি ভারত থেকে মুসলিমরা উৎখাত হয়ে যায়, তখন ওদেরও উৎখাত শুরু হয়ে যাবে। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের মতাদর্শে শূদ্র ও মুসলিম সমান ঘৃণ্য।

    ভারতীয় দর্শনের ছয়টি আদি মতবাদ ছাড়াও চার্বাকের অবিমিশ্র নিরীশ্বরবাদ, আচার্য রামানুজের দ্বৈতবাদ, আচার্য শংকরের সর্বেশ্বরবাদ, রাজা রামমোহন রায়ের একেশ্বরবাদ এবং বহুদেবত্ববাদও হিন্দুধর্মের অন্তর্ভুক্ত। এভাবে হিন্দুধর্ম হল কতকগুলো পরস্পরবিরোধী ধর্মীয় মতবাদ ও দর্শনের সমষ্টি। হিন্দুবাদ হচ্ছে কঠোর বর্ণাশ্রমভিত্তিক একটি সমাজব্যবস্থা, যাতে মানুষের মর্যাদা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সুবিচারের কোনো স্বীকৃতি নেই। যেখানে শুধু ব্রাহ্মণ্যবাদীরাই থাকবে। অন্য কেউ নয়। হিন্দুবাদের প্রাচীন ভাবধারার প্রভাব এখনও সুদূরপ্রসারী। সমাজের বহিরঙ্গে দৃশ্যমান হিন্দুদের তথাকথিত উদারনৈতিকতা তাঁদের সমাজের সত্যিকার পরিচয় নয়। এই উদারনৈতিকতার অন্তরালে লুকিয়ে আছে আর্যসমাজের সত্যিকার রূপ। অর্থাৎ যোগফল মনুসংহিতা মানেই ব্রাহ্মণ্যবাদ, ব্রাহ্মণ্যবাদ মানেই মনুসংহিতা, মনুসংহিতা মানে হিন্দুবাদ।

  • ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং ভারতীয় সমাজ

    ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং ভারতীয় সমাজ

    অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book-name]

    ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং ভারতীয় সমাজ

    ব্রাহ্মণ কে বা কারা? ব্রাহ্মণ কেন? ব্রাহ্মণ্যবাদই-বা কী– এরকম হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল আমাকে। সোস্যাল মিডিয়াগুলিতে সারাদিন ব্রাহ্মণ্যবাদের পোস্ট দিচ্ছে বর্ণবাদে ক্ষিপ্ত মানুষ। তাঁদের কাছে ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ সমার্থক। সেই মুহূর্তে আমি উত্তর দিতে পারিনি– এতগুলি প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া সম্ভবও ছিল না সেদিন। কিন্তু উত্তর তো খুঁজতে হবে। অতএব গাঁইতি-শাবল নিয়ে ইতিহাস খননের অভিযানে হাঁটতে হবে। আমরা সাধারণত দুটি ক্ষেত্রে ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দটির অস্তিত্ব জানতে পারি। একটি বেদের অংশ ব্রাহ্মণ (যা ব্রাহ্মণ সাহিত্য হিসাবে পরিচিত), অন্যটি বর্ণাশ্রমের প্রথম সারির বর্ণ ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণ হল হিন্দু শ্রুতি শাস্ত্রের অন্তর্গত গ্রন্থরাজি। এগুলি বেদের ভাষ্য। ব্রাহ্মণ গ্রন্থাবলির মূল উপজীব্য যজ্ঞের সঠিক অনুষ্ঠানপদ্ধতি। প্রত্যেকটি বেদের নিজস্ব ব্রাহ্মণ রয়েছে। যোড়শ মহাজনপদের সমসাময়িককালে মোট কতগুলি ব্রাহ্মণ প্রচলিত ছিল তা জানা যায় না। মোট ১৯টি পূর্ণাকার ব্রাহ্মণ অদ্যাবধি বিদ্যমান: এগুলির মধ্যে দুটি ঋগবেদ, ছয়টি যজুর্বেদ, দশটি সামবেদ ও একটি অথর্ববেদের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়াও কয়েকটি সংরক্ষিত খণ্ডগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণগুলির আকার বিভিন্ন প্রকারের। শতপথ ব্রাহ্মণ ‘সেক্রেড বুকস অফ দি ইস্ট’ গ্রন্থের পাঁচ খণ্ড জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে; আবার বংশ ব্রাহ্মণের দৈর্ঘ্য মাত্র এক পৃষ্ঠা। বেদোত্তর যুগের হিন্দু দর্শন, প্রাক বেদান্ত সাহিত্য, আইন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যামিতি, ব্যাকরণ (পাণিনি), কর্মযোগ, চতুরাশ্রম প্রথা ইত্যাদির বিকাশে ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির ভূমিকা অনস্বীকার্য। কোনো কোনো ব্রাহ্মণের অংশগুলি আরণ্যক বা উপনিষদের মর্যাদাপ্রাপ্ত। ব্রাহ্মণের ভাষা বৈদিক সংস্কৃত থেকে পৃথক। এই ভাষা সংহিতা (বেদের মন্ত্রভাগ) অংশের ভাষার তুলনায় নবীন, তবে এর অধিকাংশই সূত্র সাহিত্যের ভাষার তুলনায় প্রবীন। ব্রাহ্মণগুলি লৌহযুগ অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব নবম, অষ্টম ও সপ্তম শতাব্দীতে রচিত। কয়েকটি নবীন ব্রাহ্মণ (যেমন শতপথ ব্রাহ্মণ) সূত্র সাহিত্যের সমসাময়িক, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে রচিত। ঐতিহাসিকভাবে ব্রাহ্মণ গ্রন্থাবলির রচনাকাল পরবর্তী বৈদিক যুগের উপজাতীয় রাজ্যগুলির ষোড়শ মহাজনপদ রূপে উত্তরণের কাল। বৈদিক মন্ত্রের নানাপ্রকারের ব্যাখ্যাসহ বেদের যে অংশে যাগযজ্ঞাদির বিবরণ পাওয়া যায় তাকেই ব্রাহ্মণ সাহিত্য বলে। অন্যভাবে বললে মন্ত্র-ব্রাহ্মণাত্মক বেদের অংশ হল ব্রাহ্মণ (অন্যটি সংহিতা)।

    ব্রাহ্মণ শব্দটি ‘ব্ৰহ্মণ’ শব্দ থেকে উৎপন্ন। যার অর্থ গূঢ়শক্তিসম্পন্ন শব্দ। বলবর্ধক এবং আরোগ্যকর মন্ত্রগুলি যাঁরা উচ্চারণ করতেন তাঁদের ব্রহ্ম বলা হত। ব্রহ্ম-উক্তির যোগফল হল ব্রাহ্মণ সাহিত্য। অর্থাৎ পুরোহিত ব্রাহ্মণদের যজ্ঞ সংক্রান্ত বিভিন্ন উক্তি যেখানে লিপিবদ্ধ আছে তার নাম ব্রাহ্মণ। কারোর মতে বেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলেই এই গ্রন্থ ব্রাহ্মণ সাহিত্য। এবার চতুর্বেদের ব্রাহ্মণগুলি জেনে নিতে পারি–

    (১) ঋকবেদের ঐতরেয় এবং কৌষিকী (বা সাংখ্যায়ন) ব্রাহ্মণ,

    (২) সামবেদের পঞ্চবিংশ, ষড়বিংশ, সামবিধান, আর্যেয়, দৈবত, ছান্দোগ্য, সংহিতোপনিষৎ, বংশ, শাট্যায়ন, জৈমিনীয় বা তলবকার ব্রাহ্মণ,

    (৩) কৃষ্ণযজুর্বেদে তৈতিরীয় এবং শুক্লযজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণ,

    (৪) অথর্ববেদের গোপথ ব্রাহ্মণ।

    পণ্ডিত আপস্তম্ব বেদের ব্রাহ্মণভাগের বিস্তৃত বিবরণ দিয়ে বলেছেন প্রধানত ছয়টি বিষয় ব্রাহ্মণে আলোচনা করা হয়েছে–

    (১) বিধি : বিশেষ বিশেষ যজ্ঞকর্ম অনুষ্ঠানের জন্য যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাকে বিধি বলে।

    (২) অর্থবাদ : বেদমন্ত্রের অর্থ এবং বিবিধ ক্রিয়াকাণ্ড সম্পর্কে ব্রাহ্মণগুলিতে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে দর্শনগত, ব্যাকরণগত এবং ভাষা সংক্রান্ত আলোচনা হয়েছে।

    (৩) নিন্দা ও বিরোধী মতের সমালোচনা তার খণ্ডন ও পরিহারকে বলে নিন্দা।

    (৪) প্রশংসা : ব্রাহ্মণগুলিতে কোনো কোনো ক্রিয়ার অনুমোদনের জন্য সেগুলির স্তুতি বা প্রশংসা করা হয়েছে।

    (৫) পুরাকল্প : অতি প্রাচীনকালে যেসব যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়েছে বা দেবতাগণের (?) অনুষ্ঠিত যাগযজ্ঞাদির যেসব কাহিনি ব্রাহ্মণগুলিতে উল্লিখিত হয়েছে সেইসব বৃত্তান্ত পুরাকল্পের মধ্যে পড়ে।

    (৬) পরকৃতি : যজ্ঞকর্মে অভিজ্ঞ খ্যাতনামা পুরোহিতগণের কীর্তি, বিখ্যাত রাজাদের যাগযজ্ঞ, দান, দক্ষিণা প্রভৃতি বিবরণই প্রকৃতি।

    ব্রাহ্মণ সাহিত্যে বৈশিষ্টগুলি লক্ষ্যণীয়। দেখা যাক–

    (১) ঋগবেদের ব্রাহ্মণে হোতা, যজুর্বেদের ব্রাহ্মণে অধ্বর্য, সামবেদের ব্রাহ্মণে উদগাতার করণীয় বিষয়ের উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

    (২) ব্রাহ্মণ সাহিত্যের অধিকাংশ গদ্যে লেখা।

    (৩) ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলিতে বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা প্রসঙ্গে আখ্যায়িকার অবতারণা করা হয়েছে। কিছু কিছু বৈদিক ভাষা ব্যাখ্যা এবং বিশেষ বিশেষ বৈদিক শব্দের ব্যুৎপত্তি পাওয়া যায়।

    (৪) ব্রাহ্মণের অর্থবাদ বাক্যের মধ্যে পরবর্তীকালে দর্শন, ব্যাকরণ ও ভাষাতত্ত্বের বীজ নিহিত ছিল।

    (৫) প্রতিটি ব্রাহ্মণে বিভিন্ন যজ্ঞের খুঁটিনাটি বর্ণনার সঙ্গে যজ্ঞকর্মে পুরোহিতের প্রাধান্যই বর্ণিত।

    এখন প্রশ্ন ব্রাহ্মণ সাহিত্যে প্রয়োজনীয়তা বা উপযোগিতা কি কিছু আছে? প্রয়োজনীয়তা বা উপযোগিতা আছে কি না সেটা আপনারাই বিচার করুন। আমি শুধু উল্লেখ করব–

    (১) যদি সমাজচিত্রটা দেখি, তাহলে দেখব বৈদিক ভারতের জাতিভেদ, ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণের মধ্যে শক্তির দ্বন্দ্ব, প্রত্যেক বর্ণের জীবিকা, শিক্ষা, স্ত্রীশিক্ষা, বিবাহসংস্কার, কৃষিবাণিজ্য, খাদ্য প্রভৃতি বর্ণিত আছে।

    (২) ঐতিহাসিক মূল্যের দিকটা যদি দেখি, তাহলে দেখব ভারতের পরবর্তীকালের ধর্ম ও দার্শনিক তত্ত্বের ইতিহাসে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের মূল্য অপরিসীম।

    (৩) আখ্যানভাগের দিকটা যদি বলি, তা অবশ্য যারপরনাই রোমাঞ্চকর এবং বহুমাত্রিক। যেমন –(ক) শতপথ ব্রাহ্মণের পুরূরবা-উর্বশীর কাহিনি (১১.৫.১), (খ) মনুমৎস্যকথা (১.৮.১), (গ) ঐতরেয় ব্রাহ্মণে শুনঃশেপ আখ্যান (৭/১৩ ১৮)।

    (৪) নীতিবোধ শিক্ষাও পাওয়া যায়। যেমন –(ক) শতপথ ব্রাহ্মণের নীতিবোধে বিশেষত যৌন সম্পর্কিত নীতির আভাস পাই। সেখানে এক ব্যক্তির স্ত্রীর পক্ষে অপর ব্যক্তির সহবাস পাপজনক বিবেচিত হত। (খ) আমরা হরিশ্চন্দ্রপুর রোহিতের উদ্দেশ্যে ইন্দ্রের মুখে শুনি চরিষ্ণু মানবজীবনের এগিয়ে চলার মন্ত্র– “চরৈবেতি” অর্থাৎ “চল চল”।

    (৫) ব্রাহ্মণ সাহিত্য বহুমুখী সভ্যতা ও কৃষ্টির আকর বলে পরিগণিত হয়েছে। এতে আমরা পাই নৃত্যবাদ্যাদি, ললিতকলা, রাজনীতি, যুদ্ধবিদ্যা, স্থাপত্যবিদ্যা, ব্যাকরণ, ভাষাতত্ত্ব, অপরাধশাস্ত্র, নৌবিদ্যা, পশুপক্ষী ও ভেষজবিজ্ঞান প্রভৃতি।

    (৬) তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে ইন্দ্র-ভরদ্বাজের কাহিনিতে (৩/১০) ব্রহ্মচর্যের মহিমা কীর্তন বর্ণিত হয়েছে।

    আর্যরা ভারতের মানুষকে চারটি জাতিকে ভাগ করেছে। শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে– প্রকৃতির তিনটি গুণ ও কর্ম অনুসারে আমি মানবসমাজকে চারটি বর্ণবিভাগ সৃষ্টি করেছি। আমি এই প্রথার স্রষ্টা হলেও আমাকে অকর্তা এবং অব্যয় বলে জানবে।

    “চাতুবর্ণং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।

    তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম॥”

    ভাগবদগীতার সিদ্ধান্ত অনুসারে বর্ণবিন্যাস জন্মসূত্রে নয়, বরং গুণ অনুসারে নির্ণীত হয়। উপরের শ্লোক অনুসারে বর্ণবিভাগ যে জন্মানুসারে নয়, বরং কর্মানুসারে তা শতভাগ নিশ্চিত। তাই একই গোত্রের কর্ম ও গুণ অনুসারে চারটি বর্ণ থাকতে দেখা যায়। কেউ যদি শাস্ত্র অধ্যায়ন তথা বুদ্ধিভিত্তিক কাজে পারদর্শী হন এবং সেভাবে জীবিকা অর্জন করে তবে সে ব্রাহ্মণ। পরিচালনায় দক্ষ হলে ক্ষত্রিয়। ব্যাবসা-বাণিজ্যে জীবিকা নির্বাহ করলে সে বৈশ্য এবং সকল পেশার লোক পেশার লোকদের সেবাকারীর কোনো বৃত্তি হলে সে শূদ্র বলে গণ্য হবে।

    ব্রাহ্মণ কে? মনুসংহিতায় বলা হয়েছে–

    “লোকানান্তু বিবৃদ্ধ্যর্থং মুখবাহ্রুপাদতঃ।

    ব্রাহ্মণং ক্ষত্রিয়ং বৈশ্যং শূদ্রঞ্চ নিরবর্তয়ৎ॥”

    অর্থাৎ লোকবৃদ্ধির জন্য (স্রষ্টা) মুখ, বাহু, ঊরু ও পদ থেকে যথাক্রমে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ এবং শূদ্র সৃষ্টি করলেন।

    ঋগ্বেদ বলছে–

    “ব্রাহ্মণোহস্য মুখমাসীদ বাহু রাজন্য কৃতঃ।

    উরু তদস্য যদ্বৈশ্যঃ পদভ্যাং শুদ্ৰো অজায়ত॥”

    অর্থাৎ ব্রাহ্মণেরা মানবসমাজের মুখ স্বরূপ, ক্ষত্রিয় বাহু স্বরূপ, বৈশ্য উরু স্বরূপ এবং শূদ্র পাদ স্বরূপ।

    শাস্ত্র অনুসারে ব্রাহ্মণদের কয়েকটা ভাগ পাওয়া যায়। যেমন– (১) সারস্বত ব্রাহ্মণ (২) পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ (৩) পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ (৪) বৈদ্যব্রাহ্মণ (৫) চক্রবর্তী (পদবী) ব্রাহ্মণ (৬) রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ এবং (৭) বারেন্দ্রীয় কুলীন ব্রাহ্মণ।

    (১) সারস্বত ব্রাহ্মণ : সারস্বত ব্রাহ্মণরাই মূল বৈদিক শ্রেণি। এঁরা শাকদ্বীপ (ইউরোপ) থেকে এসে ঋগ্বেদে উল্লেখিত সরস্বতী নদী বিধৌত অঞ্চল গান্ধার (আফগানিস্তান), আর্য (ইরান), পাকিস্তান অঞলে বসে বেদ দৃষ্ট হন। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে এই অঞ্চল গ্রিক রাজ্যের অধিনে যায় এবং ব্যাকট্রিয়া রাজধানী হয়। তাঁরা আস্তে আস্তে জম্বুদ্বীপ (বর্তমান ভারত) আসেন এবং বেদ প্রচার চালিয়ে যান। দ্বিতীয় শতাব্দীতে একজন সারস্বত ব্রাহ্মণ বিন্ধ্যাচল থেকে দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত রাজা হন, যা ‘বাকাটক রাজবংশ হিসাবে পরিচিত। এঁরাই সর্বপ্রথম পদবি হিসাবে ‘সেন’ ব্যবহার শুরু করেন। পুরাণে এঁদের ‘মূর্ধাভিষিক্ত ব্রাহ্মণ’ বা ‘ব্ৰহ্মক্ষত্রিয়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এঁরা বৈদিক জাতির ‘মূর্ধা’ বা মস্তকে অভিষিক্ত এবং মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, ব্রহ্মার মস্তকের সর্বোচ্চ স্থান থেকে এঁদের জন্ম হয়েছে। এই বংশের দ্বিতীয় রুদ্রসেনের সঙ্গে গুপ্ত রাজবংশের প্রভাবতী গুপ্তের বিবাহ হয় এবং দুই রাজবংশের মিত্রতা হয়। ফলে সারস্বত ব্রাহ্মণরা পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে বেদ প্রচারের সুযোগ পান এবং সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েন। এই সময়কে বৈদিকধর্ম ও সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের স্বর্ণযুগ হিসেবে ধরা হয়। কৌলিন্য ও বর্ণ সমীকরণের অধিকার শুধুমাত্র সারস্বত ব্রাহ্মণদের ছিল। এঁরা বিভিন্ন অঞ্চলের নাম অনুযায়ী ব্রাহ্মণ সমাজের নামকরণ করেছিলেন। দাক্ষিণাত্য শাসনের সুবাদে সবচেয়ে বেশি সারস্বত ব্রাহ্মণ দাক্ষিণাত্য ও বিন্ধ্যপর্বত অঞ্চলে বসবাস করে। পাল শাসনকালের সময় গৌড় এবং কামরূপের নিকটাধীন একটি অঞ্চলে এঁরা বাস করত বলে ষষ্ট শতাব্দীর ভাস্করবর্মার তাম্রশাসনে ব্রাহ্মণ জমিদানে এঁদের নাম দেখা যায়। পরবর্তীতে বরেন্দ্রসেন একটি ক্ষুদ্র রাজ্য গড়ে তোলেন, যা ‘বরেন্দ্রভূমি’ হিসাবে পরিচিত। এটি পাল সাম্রাজ্যের সময় সামন্ত রাজ্য হিসাবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে এই রাজ্যের সারস্বত ব্রাহ্মণ বীরসেনের ঔরসে এবং গৌড় সারস্বত ব্রাহ্মণ কন্যা সোমটা দেবীর গর্ভজাত বংশধরেরা পাল সাম্রাজ্য অধিকার করে এবং আসমুদ্রহিমাচল সেন সাম্রাজ্যের সূচনা করে। বৌদ্ধ প্রধান। বাংলায় হিন্দু প্রাধান্য সৃষ্টি করে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্রাহ্মণ ডেকে আনেন। বিভিন্ন অঞ্চলে বৈদিকধর্ম প্রচারের জন্য দূত প্রেরণ করে। বেদানুসারে বর্ণ ও কৌলিন্য সমীকরণ করে। তিন যুগ বা ৩৬ বছর পরপর এই সমীকরণ হত এবং কর্মানুযায়ী বর্ণ ও কৌলিন্য নির্ধারণ হত। এই সমীকরণের কারণে সারস্বত সমাজে সম্প্রদায়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। আধুনিক হিসাব অনুযায়ী ৪৬০ প্রকারের সারস্বত শ্রেণি আছে।

    (২) পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ : পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণরা হল ভারতের হিন্দুধর্মের দুটি বৃহত্তর ব্রাহ্মণগোষ্ঠীর একটি। পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ ছাড়া দ্বিতীয় প্রকার গোষ্ঠীটি পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ নামে পরিচিত। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে কলহণের কাশ্মীরের ইতিহাস বিষয়ে রচিত ‘রাজতরঙ্গিনী’ গ্রন্থে বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণভাগে অবস্থিত পাঁচটি পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করা রয়েছে। এগুলি হল– (১) কর্ণাটক (কন্নড়ভাষী সহ তৎসংলগ্নভাষী ব্রাহ্মণ), (২) তৈলঙ্গ (তেলুগু ব্রাহ্মণ), (৩) দ্রাবিড় (তামিলনাড়ু ও কেরালা অঞ্চলের ব্রাহ্মণ), (৪) মহারাষ্ট্রক (মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ) এবং (৫) গুর্জর (গুজরাট ও রাজস্থানের দক্ষিণাঞ্চলের ব্রাহ্মণ)

    মারাঠা সাম্রাজ্যের সময়কালে দক্ষিণাত্যের মারাঠাদের অঞ্চলে আমলাতান্ত্রিক জমি জরিপ ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। নথি অনুসারে ব্রাহ্মণদের মধ্যে পাঁচ প্রকার পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণের উল্লেখ রয়েছে। সেগুলি হল –(১) অন্ধ্র পূর্ব ব্রাহ্মণ, (২) অন্ধ্র-পশ্চিম ব্রাহ্মণ, (৩) কর্ণাটক ব্রাহ্মণ, (৪) দ্রাবিড় ব্রাহ্মণ এবং (৫) দেশাষ্ট ব্রাহ্মণ।

    আমলাতান্ত্রিক সম্প্রদায়ভিত্তিক নথি ‘কৈফিয়ৎ’ অনুসারে গুর্জর ব্রাহ্মণরা পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণদের অন্তর্গত। নথিটিতে এই পঞ্চদ্রাবিড়দের ১৬ টি উপবিভাগে ভাগ করা হয়েছে, সেগুলি হল– (১) কোঙ্কণাষ্ট, (২) কহাড়ে, (৩) বড়কারি, (৪) মধ্যদিন, (৫) বনাস, (৬) কর্ণাটক, (৭) ষষ্টিক, (৮) নন্দবংশিক, (৯) তৈলঙ্গ, (১০) শ্রীবৈষ্ণব, (১১) শখিকন্থ, (১২) কীবন্ত, (১৩) সিহাবসৈ, (১৪) নুরচের, (১৫) সেনবী/সেনই/সেন এবং (১৬) গোবলকোণ্ডে।

    (৩) পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ : পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণরা হল ভারতের হিন্দুধর্মের দুটি বৃহত্তর ব্রাহ্মণগোষ্ঠীর একটি। পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ ছাড়া দ্বিতীয় প্রকার গোষ্ঠীটি ‘পঞ্চদ্রাবিড় ব্রাহ্মণ’ নামে পরিচিত। আগেই আলোচনা করেছি। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে কলহণের কাশ্মীরের ইতিহাস বিষয়ে রচিত ‘রাজতরঙ্গিনী’ গ্রন্থে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তরভাগে অবস্থিত পাঁচটি পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করা রয়েছে। স্কন্দপুরাণেও এই গোষ্ঠীবিভাগগুলির বিন্যাস রয়েছে। এগুলি হল– (১) সারস্বত ব্রাহ্মণ, (২) গৌড় ব্রাহ্মণ, (৩) কান্যকুজ ব্রাহ্মণ, (৪) মৈথিল ব্রাহ্মণ এবং (৫) উকল ব্রাহ্মণ।

    স্কন্দপুরাণের একটি অংশ হিসাবে বিবেচিত সহ্যাদ্রিখণ্ডেও উপরোক্ত শ্রেণিবিন্যাসেরই উল্লেখ আছে। মারাঠা সাম্রাজ্যের সময়কালে দক্ষিণাত্যের মারাঠাদের অঞ্চলে আমলাতান্ত্রিক জমি জরিপ ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। নথি অনুসারে ব্রাহ্মণদের মধ্যে পাঁচ প্রকার পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণের উল্লেখ আছে। সেগুলি হল –(১) কান্যকুজ ব্রাহ্মণ, (২) কামরূপী ব্রাহ্মণ, (৩) উৎকল ব্রাহ্মণ, (৪) মৈথিল ব্রাহ্মণ এবং (৫) গুর্জর ব্রাহ্মণ। আমলাতান্ত্রিক সম্প্রদায়ভিত্তিক নথি ‘কৈফিয়ৎ’ অনুসারে পঞ্চগৌড় ব্রাহ্মণরা সাধারণত স্মার্ত, বৈষ্ণব কিংবা ভাগবতের অনুসারী হয়ে থাকেন।

    (৪) বৈদ্য ব্রাহ্মণ : বৈদিক সময়ে বঙ্গ-বিহার ও নেপালের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল বিদেহ রাজ্য, বিদেহ রাজ্যের ব্রাহ্মণরা বৈদহ ব্রাহ্মণ বা বৈদ্য ব্রাহ্মণ হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁরা বৈদিক যজ্ঞাদি এবং বৈদিক চিকিৎসাশাস্ত্র চর্চা করতেন। বৈদ্য অর্থ বেদজ্ঞ হলেও কালক্রমে এটি চিকিৎসক বোঝাতে বেশি ব্যবহৃত হয়। আধ্যাত্মিক ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্র ‘আয়ুর্বেদ অনুশীলনকারী সম্প্রদায় বৈদ্য ব্রাহ্মণ হিসাবে পরিচিত। এঁদেরকে ‘ত্রিজ’ বলেও অভিহিত করা হত। বিদেহ রাজ্যে ‘ত্রিজভূক্তি’ নামে একটি অঞ্চল ছিল, যা এখনও বিদ্যমান নেপালের ত্রিরাই নামক জায়গায়। বাংলাতেই সবচেয়ে বেশি বৈদ্য ব্রাহ্মণ দেখা যায়। সেন, গুপ্ত, সেনশর্মা, সেনগুপ্ত ইত্যাদি পদবির সম্প্রদায় বৈদ্য ব্রাহ্মণ বলে পরিচিত। যদিও সেনরা রাজশাসনে যুক্ত হলে ‘ব্ৰহ্ম-ক্ষত্রিয়’ বা ‘রাজন্য-ব্রাহ্মণ বলে আত্মপ্রকাশ করে।

    প্রবীণ অনুশীলনকারী বা শিক্ষকদের সম্মানের চিহ্ন হিসাবে ‘বৈদ্যরাজ’ বলা হত। কিছু অনুশীলনকারী যাঁদের গ্রন্থগুলির সম্পূর্ণ জ্ঞান ছিল এবং অনুশীলনে দক্ষ ছিলেন তাঁরা প্রাণাচার্য’ নামে পরিচিত ছিলেন। ভারতের কিছু রাজপরিবারের ব্যক্তিগত বৈদ্য ছিল এবং তাঁদের রাজবৈদ্য (রাজার চিকিৎসক)। হিসাবে উল্লেখ করা হত। প্রচলিত একটি মতে দেবাসুরের সমুদ্র মন্থনকালে ধন্বন্তরীর জন্ম হয় এবং বৈদ্যরা তাঁর উত্তরপুরুষ। অন্য মতে ধন্বন্তরীর জন্ম হয়

    জনৈক মুনির বৈদিক মন্ত্র জপের মাধ্যমে খড়ের গাদা থেকে, তাই তিনি বৈদ্য নামে পরিচিত হন। যেহেতু তাঁর পিতা ছিল না এবং তিনি এক পালিকা মায়ের আদর-যত্নে বড়ো হন, সেহেতু তাঁকে বলা হয় ‘অম্বষ্ঠ’। বৈদ্য ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একটি মতও প্রচলিত আছে যে, অম্বষ্ঠ নামে সিন্ধুনদের তীরে একটি অঞ্চল ছিল। সেখান থেকে বৈদ্যদের একটি দল দক্ষিণ ভারতে এবং অপর দলটি বাংলায় আসেন।

    (৫) চক্রবর্তী (পদবি) ব্রাহ্মণ : বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণদের কোনো পদবি ছিল না। ব্রাহ্মণরা সবসময়ই সদাচারী, সত্যান্বেষী এবং সৎ ছিলেন। ব্রাহ্মণদের পুজো অর্চনা, বেদপাঠ ও যোগসাধনা ছিল প্রধান কর্ম। তা ছাড়া ব্রাহ্মণরা শিক্ষানুরাগী ছিলেন। প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে শিক্ষার গুরু দ্বায়িত অর্পিত ছিল ব্রাহ্মণদের উপর, তাই টোলের শিক্ষকতা ছিল তাঁদের অন্যতম পেশা। ব্রাহ্মণরা নিজেদের সংকল্পার্থে নিজিদের পদবি ‘দেবশর্মা ব্যবহার করতেন। কালক্রমে পুণ্ড্র শাসন ব্যবস্থায় ব্রাহ্মণদের ‘আচার্য’ বা ‘শাস্ত্রী’ উপাধি প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে ‘দেবশর্মা’ পদবিটি হারাতে বসে। পাল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ধর্মপালের শাসনকালে বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রাহ্মণদের মধ্যে অনেকেই রাজকার্যে যোগদান করেন। তাই ব্রাহ্মণদের সম্রাট হিসাবে ‘চক্রবর্তী’ পদবির উদ্ভব হয়। চক্রবর্তী শব্দটি সংস্কৃত ভাষা থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। চক্রবর্তী শব্দের অর্থ সম্রাট। চক্রবর্তীর ভাবার্থ হচ্ছে রাজ্যাধিপতি, অর্থাৎ রাজার রাজা। সহজভাবে বলতে গেলে চক্র অর্থ হচ্ছে ‘চাকা’ এবং বর্তী অর্থ হচ্ছে ‘সুশাসন’ চালিয়ে যাওয়া।

    (৬) রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ : চোলরাজা দেবেন্দ্রবর্মনের ছয় শতকের শিলালিপিতে উত্তর রাঢ় সম্পর্কে প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। রাঢ়ের এ অংশটিকে রাজেন্দ্র চোলের এগারো শতকের তিরুমুলাই শিলালিপিতে সুস্পষ্টরূপে একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক এলাকা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভোজবর্মনের বেলাভ তাম্রলিপিতে উত্তর রাঢ়ের সিদ্ধলা গ্রামকে ভট্টভবদেবের জন্মস্থান হিসাবে নির্দেশ করা হয়েছে। সিদ্ধলাকে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বীরভূম জেলার সিদ্ধলা গ্রামের সঙ্গে এবং নৈহাটি লিপিতে উল্লিখিত বল্লহিহ গ্রামকে বর্ধমান জেলার উত্তর প্রান্তের বালুটিয়ার সঙ্গে শনাক্ত করা হয়েছে। শাণ্ডিল্য গোত্রীয় বন্ধ্যঘাটি গ্রামবাসী, কাশ্যপ গোত্রীয় চট্টগ্রামবাসী, ভরদ্বাজ গোত্রীয় মুখুটিগ্রামী, সাবর্ণী গোত্রীয় গাঙ্গুলি ও কুন্দলাল গ্রামী এবং বাৎস্য গোত্রীয়, ঘোষাল, কাঞ্জিলাল এবং পুতিতুণ্ড– এই আট গ্রামীরা রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ।

    (৭) বারেন্দ্রীয় কুলীন ব্রাহ্মণ : বরেন্দ্রভূমির নামকরণের পিছনে একাধিক পৌরাণিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। বর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে আশীর্বাদ এবং ‘ইন্দ্র’ শব্দের অর্থ দেবতাদের রাজা। অর্থাৎ ইন্দ্রের বর বা ইন্দ্রের আশীর্বাদ থেকে যে রাজার জন্ম। ‘অদ্ভুৎসাগর’ গ্রন্থে রাজা বরেন্দ্রসেনে এর উল্লেখ আছে, ইন্দ্রের বরে যাঁর জন্ম (পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে) এবং তাঁর রাজ্যটি বরেন্দ্র নামে পরিচিত ছিল। বরেন্দ্রসেন পালরাজা গোপালের সমসাময়িক ছিলেন। সমস্ত বাংলা বৌদ্ধ অধ্যুষিত ছিল, কিন্তু এই রাজ্যটি হিন্দু অধ্যুষিত ছিল। সামন্ত রাজারা একজন রাজাকে মহারাজা হিসাবে নির্বাচন করতে সভা করেন। পরাক্রমশালী রাজা বরেন্দ্রসেন যোগ্য হলেও হিন্দু হওয়ায় বৌদ্ধ সামন্তরাজারা তাঁকে নির্বাচন না করে গোপালকে মহারাজা নির্বাচন করেন। কিন্তু সেনরাজারা নিজেদের শক্তি ক্রমাগত বৃদ্ধি করে পাল সাম্রাজ্যকে নিজেদের হিন্দু সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। বৌদ্ধদের পুনরায় হিন্দু সংস্কারে ফিরিয়ে এনে বর্ণ-কৌলিন্য সংস্কার করেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্রাহ্মণ ডেকে আনে। এই কাহিনির অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে, বরেন্দ্রভূমি ইন্দ্রের পক্ষ থেকে আশীর্বাদস্বরূপ। কৌলিন্য বিচারে সেনরাজারা কুলশ্রেষ্ঠ রাজন্য-ব্রাহ্মণ ছিলেন। রামায়ণ ও মহাভারত গ্রন্থদ্বয়ে বরেন্দ্রভূমিকে ‘পুণ্ড্র’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। পুণ্ড্র অঞ্চলে বসবাসকারী ব্রাহ্মণ লাহিড়ী, সান্যাল, সরখেল, মৈত্র ও ভাদুড়ী পদবি ব্যবহার করেন।

    প্রথম যে ব্রাহ্মণগোষ্ঠী বাংলায় ঘাঁটি গেড়েছিল, তাঁরা খ্রিস্টীয় পঞ্চম/ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারত থেকে এসেছিল। মধ্যদেশ থেকে ব্রাহ্মণদের এই আগমন ধারা অব্যাহত ছিল। অষ্টম শতাব্দী থেকে ব্রাহ্মণ অভিবাসীদের সংখ্যা বাড়তে থাকল। ব্রাহ্মণরা উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে এসেছিল। এমনকি গুজরাটের লাত অঞ্চলের মতো দূরের দেশ থেকেও আসত। সেসময় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পালরাজারা বাংলা শাসন করতেন। এইসব ব্রাহ্মণরা এসে পালরাজাদের শাসনবিভাগের উচ্চবিভাগে নিযুক্ত হত। এইসব ব্রাহ্মণরা বহিরাগত ছিলেন বলেই হয়তো তাঁরা বেশি মান্যতা পেত। এইসব ব্রাহ্মণদের যাবতীয় বিবরণ আমরা কুলজি গ্রন্থগুলি থেকে পেতে পারি। এখানেই আছে বাংলার ব্রাহ্মণদের বংশবৃত্তান্ত। যেমন– ধ্রুবানন্দ মিশ্রের ‘মহাবংশাবলী’, নুলো পঞ্চাননের ‘গোষ্ঠীকথা’, বাচস্পতি মিশ্রের ‘কুলরাম’, ধনঞ্জয়ের ‘কুলপ্রদীপ’, হরি মিশ্র ও এড় মিশ্রের ‘কারিকা’, সর্বানন্দ মিশ্রের ‘কুলতত্ত্বার্ণব’, বরেন্দ্র কুলপঞ্জিকা ইত্যাদি। তবে কুলজি গ্রন্থগুলির লেখকরা যেসব বর্ণনা করেছেন, তা প্রায়ই পরস্পরবিরোধী ও অসংগতিতে পূর্ণ। আদিশূরের কাহিনি ছাড়া কোনো তথ্যের সঙ্গে কোনো তথ্য মেলে না। তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন আদিশূরের কাহিনির কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। সমসাময়িক কোনো পুথিপত্র ও লেখমালাতেও আদিশূর নামে কোনো রাজার উল্লেখ পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিক নৃপেন্দ্রকুমার দত্ত বলেছেন, আদিশূরের কাহিনি কল্পিত ও বিভিন্ন টুকরো টুকরো অংশ জোড়াতালি দিয়ে পরে রচিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন, এই কাহিনির ঐতিহাসিকতা নিয়ে এতটাই সন্দেহের অবকাশ আছে যে, এটাকে বাংলার সামাজিক ইতিহাসের উপাদান হিসাবে একেবারেই গ্রহণ করা যায় না।

    কুণাল চক্রবর্তী তাঁর ‘বহিরাগত’ প্রবন্ধে লিখেছেন– “মধ্যযুগ পর্যন্ত বাংলায় ব্রাহ্মণদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কয়েকটি তথ্য অনস্বীকার্যভাবে উঠে আসে। প্রথম, বাংলায় ব্রাহ্মণরা বহিরাগত। দ্বিতীয়, এদের অধিকাংশেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা যথেষ্ট ছিল না। তৃতীয়, এদের অভ্যন্তরীণ বিভিন্নতা এতই ব্যাপক ও প্রকট ছিল যে এদের ব্রাহ্মণ– এই একটিমাত্র অভিধায় চিহ্নিত করাই কঠিন ছিল। তবু ব্রাহ্মণরা বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয়-সামাজিক জীবনে দীর্ঘদিন তাঁদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিলেন। তা কী করে সম্ভব হয়েছিল, সেই ইতিহাস অনুসন্ধানের সময় এসেছে।”

    যাই হোক, ব্রাহ্মণ হল হিন্দু বর্ণচতুষ্টয়ের প্রথম এবং উচ্চতম বর্ণ। হিন্দুধর্মানুসারে এই বর্ণজাত ব্যক্তিগণই সমাজে শিক্ষক, আধ্যাত্মিক গুরু, শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত এবং বিধানকর্তার ভূমিকা পালন করার অধিকারপ্রাপ্ত। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি মনে করেন, “সেই চরম সম্মানের জায়গাটা তাঁদের নির্ভুল বেদমন্ত্র উচ্চারণের মাহাত্ম্য থেকেও আসেনি, যাগযজ্ঞের আড়ম্বরে একটা মহান গভীরতা তৈরি করে সমাজকে ম্যাজিক দেখিয়েও এই সম্মান আসেনি। এই সম্মান এবং এই ব্রাহ্মণ্য ভারতবর্ষের সর্বোত্তম শিক্ষালাভের মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল এবং সেই শিক্ষাও এসেছে ত্যাগ-বৈরাগ্য-তপস্যার চরম অনুশীলন থেকে।” শাস্ত্রানুসারে ব্রাহ্মণকুলজাত ব্যক্তিগণ বিপ্র (অর্থাৎ জ্ঞানী) এবং দ্বিজ (অর্থাৎ দু-বার জাত) হিসাবেও অভিহিত হয়ে থাকেন। ব্রাহ্মণ শব্দটা এসেছে ব্ৰহ্ম থেকে,এক অর্থে, যার রয়েছে ব্রহ্মজ্ঞান সেই ব্রাহ্মণ। বর্ণপ্রথা পাকাঁপোক্ত হয়ে সনাতন ধর্মে চেপে বসার আগে মন্ত্র রচনা করে ব্রাহ্মণ হতে পারতেন যে কেউ। এমনকি জন্মসুত্রে ব্রাহ্মণরা উপাসনার দায়িত্ব ছেড়ে বেছে নিতে পারত অন্য যে-কোনো পেশাও। মহাভারতের বশিস্ট তীর্থ, অর্ধকীল তীর্থ, বিশ্বামিত্র নামক তীর্থস্থানে গেলে ব্রাহ্মণ হতে পারে যে কেউ। পুরাণ মতেও ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্ত হলেই কেবল ব্রাহ্মণত্ব অর্জিত হয়। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে নববই সংখ্যক পুরুষসূক্তের বর্ণনা অনুসারে ব্রাহ্মণের জন্য পুরুষের (স্রষ্টার) মুখ থেকে। মহাভারতের শান্তিপর্বে উল্লিখিত হয়েছে যে, ব্রহ্মা প্রথমে সমগ্র জগৎ ব্রাহ্মণময় করেছিলেন, পরে কর্মানুসারে সকলে নানা বর্ণত্ব প্রাপ্ত হয়; কেউ হয় ব্রাহ্মণ, কেউ ক্ষত্রিয়, কেউ বৈশ্য এবং কেউ বা শূদ্র। মহাভারতে আরও বলা হয়েছে। যে, যিনি সদাচারী ও সর্বভূতে মিত্রভাবাপন্ন, যিনি কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ ত্যাগ করেছেন, যিনি সন্তোষকারী, সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয় ও শাস্ত্রজ্ঞ, তিনিই ব্রাহ্মণ; অর্থাৎ গুণ ও কর্মানুসারে ব্রাহ্মণাদি চতুর্বর্ণের সৃষ্টি, জন্মানুসারে নয়। পরবর্তীকালে অবশ্য জন্মসূত্রে বর্ণ নির্ধারণ-ব্যবস্থা প্রচলিত হয়। ব্রাহ্মণদের মধ্যে নানা শ্রেণিভেদ আছে। অনেকের মতে এই শ্রেণির সংখ্যা ২০০০। এক সারস্বত ব্রাহ্মণদের মধ্যেই ৪৬৯টি শাখা আছে। শ্রেণি অনুযায়ী ব্রাহ্মণদের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হয়। বাংলায় আচার্য বা গণক এবং শাকদীপি ব্রাহ্মণেরা পতিত বলে গণ্য হয়। নিম্নবর্ণের পৌরোহিত্য করে বলে বর্ণ ব্রাহ্মণরাও পতিত। তেমনি অগ্রদানী, ভাট ও পিরালি ব্রাহ্মণরাও সমাজে হীনরূপে দেখা হয়। বাংলার বাইরে মন্দিরের পূজারী হওয়ার জন্য তামিল ও কর্ণাট ব্রাহ্মণরা সমাজে অপাঙক্তেয়। নাম্বুদ্ৰী ব্রাহ্মণরা সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। নৃতাত্ত্বিক বিচারে বাংলার ব্রাহ্মণদের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের ব্রাহ্মণদের মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। সবচেয়ে বড়ো অমিল বাংলার ব্রাহ্মণরা আমিষাশী, বাংলার বাইরের ব্রাহ্মণরা নিরামিষাশী। বাংলার ব্রাহ্মণরা খুব কম সংখ্যকই আর্য বংশোদ্ভূত। তাঁরা চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতকে বাংলায় আসেন এবং তাঁদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি করে। তবে পাল আমলে বৌদ্ধধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া এবং যাগ-যজ্ঞ ভুলে যাওয়ার ফলে তাঁদের পতিত ও শাস্ত্র অনুযায়ী শূদ্রে পরিণত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। মধ্যযুগীয় সমাজে ব্রাহ্মণরা সকল বর্ণ বা সম্প্রদায়ের মানুষের হাতে জল গ্রহণ করত না। তবে তিলি, তাঁতি, মালাকার প্রভৃতি মাত্র নয়টি সম্প্রদায়ের হাত থেকে জলগ্রহণের রীতি চালু ছিল। ধর্মশাস্ত্রে ব্রাহ্মণদের অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে–

    (১) ব্রাহ্মণ গুরু এবং সকলের কাছে শ্রদ্ধেয় ও প্রণম্য।

    (২) তারা অপর জাতির কর্তব্য নির্ধারণ করবে।

    (৩) রাজা সকলের প্রভু কিন্তু ব্রাহ্মণের প্রভু নয়।

    (৪) বেত্রাঘাত, বন্ধন, অর্থদণ্ড, নির্বাসন, বাকদণ্ড এবং পরিত্যাগ– এই ছয় প্রকারের সাজা ব্রাহ্মণকে দেওয়া যাবে না।

    (৫) শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণরা করমুক্ত।

    (৬) তাঁদের ঘরে গুপ্তধন পাওয়া গেলেও রাজা তার সবটাই গ্রহণ করতে পারবে না।

    (৭) আগে যাওয়ার জন্য তাকে পথ ছেড়ে দিতে হবে।

    (৮) অন্য বর্ণের তুলনায় ব্রাহ্মণরা লঘুদণ্ড পাবে।

    (৯) তাকে সাক্ষ্য দিতে ডাকা যাবে না।

    (১০) তারা মৃতাশৌচ পালন করবে দশদিন।

    (১১) তারা সুদ গ্রহণ করতে পারবে না।

    (১২) আপদকালে তারা বৈশ্যদের বৃত্তি গ্রহণ করতে পারবে, প্রভৃতি।

    পূজার্চনাসহ হিন্দুদের যে-কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করা ব্রাহ্মণদের একটি সাধারণ পেশা। তবে বর্তমানে শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যাবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, চাকরি ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তাঁরা অন্যদের চেয়ে অগ্রগণ্য। যদিও ব্রাহ্মণদের যজমানি করা ছাড়া অন্য পেশা গ্রহণ করার অধিকার শাস্ত্র দেয়নি।

    সাধারণত বঙ্গীয় ব্রাহ্মণগণ সুশিক্ষিত পণ্ডিত হয়ে থাকেন এবং কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব বঙ্গীয় ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেছেন। কলহণ বিরচিত ‘রাজতরঙ্গিণী’-র শ্লোকানুসারে ব্রাহ্মণগণ মূলত পঞ্চ-গৌড় এবং পঞ্চ-দ্রাবিড়, এই দুই ভাগে বিভক্ত। কলহন কর্তৃক রচিত শ্লোকটি উল্লেখ করা হল–

    “কর্ণাটকাশ্চ তৈলঙ্গা দ্রাবিড়া মহারাষ্ট্রকাঃ, গুর্জরাশ্চেতি পঞ্চৈব দ্রাবিড়া বিন্ধ্যদক্ষিণে।
    সারস্বতাঃ কান্যকুজা গৌড়া উৎকলামৈথিলাঃ, পঞ্চগৌড়া ইতি খ্যাতা বিনেস্যাত্তরবাসিনঃ॥”

    ব্রাহ্মণের মর্যাদাই-বা কতটা– এ ব্যাপারে ‘মনুসংহিতা’-য় মনু পরিষ্কারভাবে বলেছেন —

    (১) “ভূতানাং প্রাণিনঃ শ্রেষ্ঠাঃ প্রাণিনাং বুদ্ধিজীবিনঃ।

    বুদ্ধিমৎসু নরাঃ শ্রেষ্ঠা নরেষু ব্রাহ্মণাঃ স্মৃতাঃ॥”(১/৯৬)

    অর্থাৎ, সৃষ্ট (স্থাবর জঙ্গমাদির মধ্যে) প্রাণী শ্রেষ্ঠ, প্রাণীদের মধ্যে বুদ্ধিজীবীরা শ্রেষ্ঠ, বুদ্ধিমানদের মধ্যে মানুষ এবং মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ বলে কথিত।

    (২) “উৎপত্তিরেব বিপ্রস্য মূর্তিধর্মস্য শাশ্বতী।

    স হি ধর্মার্থমুৎপন্নো ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে॥”(১/৯৮)

    অর্থাৎ, ব্রাহ্মণের দেহই ধর্মের সনাতন মূর্তি। তিনি ধর্মের জন্য জাত এবং মোক্ষলাভের যোগ্য পাত্র।

    (৩) “ব্রাহ্মণো জায়মানো হি পৃথিব্যামধিজায়তে।

    ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং ধর্মকোষস্য গুপ্তয়ে॥”(১/৯৯)

    অর্থাৎ, জাতমাত্রেই ব্রাহ্মণ পৃথিবীতে সকল লোক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হন এবং সকল সৃষ্ট পদার্থের ধর্মসমূহ রক্ষার জন্য প্রভু হন।

    (৪) “সর্বং স্বং ব্রাহ্মণেসেদ্যং যৎকিঞ্চিৎজ্জগতীগতম।

    শ্রৈষ্ঠ্যেনাভিজনেনেদং সর্বং বৈ ব্রাহ্মণোহহতি॥” (১/১০০)

    অর্থাৎ, পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সেই সব ব্রাহ্মণের সম্পত্তি। শ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্য হেতু ব্রাহ্মণ এই সবই পাওয়ার যোগ্য।

    (৫) “স্বমেব ব্রাহ্মণ্যে ভুঙতে স্বং বস্তে স্বং দদাতি চ।

    আনৃশংস্যাদব্রাহ্মণস্য ভুঞ্জতে হীতরে জনাঃ॥”(১/১০১)

    অর্থাৎ, ব্রাহ্মণ নিজের অন্নই ভক্ষণ করেন, নিজের বস্ত্র পরিধান করেন এবং নিজের দ্রব্য দান করেন। অন্য লোকেরা যা ভোগ করে, তা ব্রাহ্মণের দয়া হেতু

    সেনযুগে ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। এই পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয় বৌদ্ধদের বিলীন করে এবং বৌদ্ধদের অনুসরণ ও অনুকরণ করে। কথিত হয় যে, কর্ণাট থেকে পঞ্চ ব্রাহ্মণ এনে সেন রাজারা যজ্ঞক্রিয়া সম্পন্ন করেন। লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় ‘পঞ্চরত্ন’ নামে পরিচিত পঞ্চ ব্রাহ্মণ সংস্কৃত কবি ছিলেন। সেযুগের কবি-শাস্ত্রকারদের অধিকাংশই ছিলেন ব্রাহ্মণ; রাজপদোপজীবী ব্রাহ্মণ কর্মচারীর সংখ্যাও কম ছিল না। এ সময় সমাজে ব্রাহ্মণদের আধিপত্য বিস্তৃত হয়। স্মৃতিশাস্ত্রের বিধি অনুযায়ী ব্রাহ্মণরা সমাজের বিধান দিতে থাকে। বল্লালসেন রাজ্যে কৌলীন্য প্রথা প্রচলন করেন। ব্রাহ্মণদের মধ্যে বন্দ্য (বন্দ্যোপাধ্যায়), চট্ট (চট্টোপাধ্যায়), মুখটী (মুখোপাধ্যায়), ঘোষাল, পুততুণ্ড, গাঙ্গুলী (গঙ্গোপাধ্যায়), কাঞ্জীলাল ও কুন্দলাল হচ্ছে মুখ্য কুলীন। আর রাঢ়ী, গুড়, মহিন্ত, কুলভী, চৌতখণ্ডী, পিপ্পলাই, গড়গড়ি, ঘণ্টাশ্বরী, কেশরকোণা, দিমসাই, পরিহল, হাড়, পিতমুণ্ডী ও দীর্ঘতি গৌণ কুলীন হিসেবে পরিগণিত। কিংবদন্তি অনুযায়ী বল্লালসেনের আমলে কুলীন বলে স্বীকৃত হয় লাহিড়ী, বাগচী, মৈত্র, সান্যাল ও ভাদুড়ী এই পাঁচটি গোত্র।

    বৌদ্ধমতে, ব্রাহ্মণ বলতে অনাসক্ত, রজঃমুক্ত, লোভ-দ্বেষ-মোহবিহীন এবং ব্রতপরায়ণ, শীলবান, বীতৃষ্ণ, সংযত ও অন্তিম দেহদারী ব্যক্তি ব্রাহ্মণ বলে কথিত হন। যিনি গৃহস্থ ও অনাগারিক উভয়ের প্রতি অসংশ্লিষ্ট, অল্পে ও আলয়বিহীন তিনিই ব্রাহ্মণ। বুদ্ধের জন্মের পূর্বে ভারতে ব্রাহ্মণেরা তাঁদের নিজ মাহাত্ম প্রচারছলে জাতি অভিমান প্রকাশ করত মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ। কিন্তু বুদ্ধের সঙ্গে তেবিজ্জের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, কেবল ত্রিবেদ জ্ঞাত হলে প্রকৃত ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করা যায় না। ব্রাহ্মণত্ব লাভ করার জন্য অসমার্থক তর্ক ও বেদ, মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ভাবনা করা দরকার। যাঁরা এরূপ ভাবনার অধিকারী হয়ে অনাসক্ত নিষ্কলুষ, রজঃমুক্ত, লোভ-দ্বেষ-মোহবিহীন হয় এবং যিনি পাপ পঙ্কিল দুরতিক্রম্য মোহপূর্ণ সংসারাবর্ত মুক্ত হয়েছেন তিনিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ। হিন্দুদের বিশ্বাস জাতি দ্বারাই প্রকৃত ব্রাহ্মণ অধিকারী হয় অর্থাৎ প্রকৃত ব্রাহ্মণ হতে হলে ব্রাহ্মণ জাতিতে জন্ম কিংম্বা ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত হতে হবে। কিন্তু বুদ্ধ মতে, ব্রাহ্মণ জাতিতে জন্ম কিংবা ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত হয়ে পাপ মল ত্যাগ না করলে তাঁকে প্রকৃত ব্রাহ্মণ বলা যাবে না। তাঁকে কেবল ব্রাহ্মণ বলে সম্বোধন করা যায়। বংশগৌরব অথবা উচ্চ বংশে জন্ম লাভ করেও শীল গুণে বিভূষিত না-হলে কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারে না। বহুলোক নীচু কুলে জন্মগ্রহণ করেও শীলাচার সম্পন্ন হয়ে পরিশ্রমের দ্বারাই সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে স্বর্গে গমন করতে পারে। তাই বুদ্ধ বলেছেন, জন্মের দ্বারা কেউ চণ্ডাল বা ব্রাহ্মণ হয় না, কর্মের দ্বারাই চণ্ডাল বা ব্রাহ্মণ হয়। যিনি বন্ধনমুক্ত কৃতঃকৃত্য অনাশ্রব, কামচিন্তা বিরহিত তিনিই তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ নামের যোগ্য। ব্রাহ্মণ ধ্যানী, একক বিচরণশীল, বস্তুকাম ও ক্লেশকাম পরিহার করে চলেন। যিনি সর্ব সংযোজন ছিন্ন করে ভয়মুক্ত, অনাসক্ত, শৃংখলামুক্ত তিনিই তৃষ্ণাক্ষয়ী ব্রাহ্মণ। ক্রোধপূর্ণ, জটধারী, অজিনচর্ম পরিহিত ব্যক্তি ব্রাহ্মণের যোগ্য হতে পারে না। ক্রোধবিহীন, ব্রতপরায়ণ, শীলবান, সংযমী ও অন্তিম দেহদারী ব্যক্তি তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ বলে যোগ্য হন। যিনি গৃহস্থ ও অনাগরিক উভয়ের প্রতি অসংশ্লিষ্ট অল্পেচ্ছু ও আলয় বিহীন তিনিই তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ। যিনি ছোট-বড় সর্বপ্রকার অদত্ত গ্রহনে বিরত, যাহার কোন প্রকার তৃষ্ণা বিদ্যমান নাই যিনি সংশয়মুক্ত ও নির্বাণ প্রাপ্ত তিনিই ব্রাহ্মণ। তৎকালীন সময়ে ব্রাহ্মণেরা অভিমান বা অহংকার করে নিজের গৌরব করে বলত তারাই মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে জাতি অভিমান ব্রাহ্মণের কাজ নয়। কারণ জাতি হিসেবে মানুষ সঙ্গে মানুষের কোনো পার্থক্য নেই। তৎকালিন মানব জাতির মধ্যে ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শুদ্রের পদচিহৃ একই ধরনের। প্রাণীদের মধ্যে স্ত্রী, পুরুষ, বর্ণ, শারীরিক গঠন, লোম, চঞ্চু, প্রভৃতি পার্থক্য আছে। কিন্তু মানুষ মানুষে তেমন পার্থক্য দেখা যায় না। বুদ্ধ মতে, যে-কোন ব্যক্তি সকর্ম করলে ব্রাহ্মণের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেন। সম্ভব ও কৃচ্ছসাধনের দ্বারা যে-কোনও লোক ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করতে পারেন। বনের প্রাণীরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। ঠিক তেমনি প্রকৃত শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ ধ্যানপরায়ণ হলে শোভা পায় এবং অনাসক্ত, নিষ্কলুষ, রজঃযুক্ত লোভ দ্বেষ-মোহবিহীন হয়। অবশ্য ২০০২ সালের ৫ অক্টোবর দিল্লির সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত ঐতিহাসিক রায়টির কথাটি স্মর্তব্য। কেরালার আলাঙ্গাদ গ্রামের শিবমন্দিরে জন্মের ভিত্তিতে অব্রাহ্মন এক ব্যক্তিকে পুরোহিত করা নিয়ে স্থানীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের করা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি এস রাজেন্দ্র ও ডুরাই স্বামীর বেঞ্চ রায় দেয় যে যে-কোনও মন্দিরে যে-কোনও বর্ণ বা গোত্রের মানুষ পুজারী হতে পারবেন। কোর্ট আরও আদেশ দেয় যে “শাস্ত্রীয় আচার অনুষ্ঠানে অনভিজ্ঞ এবং শাস্ত্রজ্ঞানহীন অযোগ্য জন্মসুত্রে কোনো ব্রাহ্মণ বেদপাঠ করতে বা মন্দিরের পুজারী হতে পারবে না। সেখানে বলা হয় যে, “বেদপাঠ,শাস্ত্রজ্ঞান যে-কোনো সাধারণ হিন্দুর থাকলেই সে পুরোহিত বা ব্রাহ্মণ হতে পারবেন। ভারতের সকল হিন্দু ধর্ম প্রতিষ্ঠান ও মন্দিরের ক্ষেত্রে এই আদেশ প্রযোজ্য হবে।” পবিত্র বেদ অনুযায়ী যে-কোনো কেউ-ই যদি শাস্ত্রপাঠের মাধ্যমে জ্ঞানী হতে পারে, তবে সে যজ্ঞ করতে সক্ষম। পবিত্র বেদের বর্ণাশ্রম কর্ম ও গুণভিত্তিক, জন্মভিত্তিক নয়। আর সেটাই আইন করে প্রতিষ্ঠিত করল দিল্লির সুপ্রিম কোর্ট। আর এই রায়ের মাধ্যমে পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্যবাদ ও মূর্খদের বর্ণপ্রথার দর্প চূর্ণ হল, বিজয় লাভ করল পৃথিবীর কোটি কোটি তথাকথিত দলিত, পদাহত, শূদ্র সনাতন ধর্মালম্বী মহৎ প্রাণগণ।

    শাস্ত্র বলছে ব্রাহ্মণ-ঘরে জন্মালেই কেউ ব্রাহ্মণ হয়ে যায় না, যেমন মুসলমান ঘরে জন্মালেই কেউ মুসলমান হয় না। বিশেষ নিয়মের মধ্যে দিয়ে যেমন মুসলমান হতে হয়, তেমনই ব্রাহ্মণ হয়ে ওঠার জন্য বেশ কিছু নিয়ম করার বিধান দিয়েছে শাস্ত্র। বল্লালচরিত্র ধৃত পূর্ব খণ্ডের ১৩ অধ্যায়ে বলা হয়েছে–

    “জন্মনা জায়তে শূদ্রঃ সংস্কারাদ্বিজ উচ্যতে।

    বেদ পাঠী ভবেদ্বিপ্রঃ ব্রহ্ম জানাতি ব্রাহ্মণঃ॥”

    অর্থাৎ, জন্মমাত্রেই সবাই শূদ্র। সংস্কারে দ্বিজ পদবাচ্য হয়। বেদ পাঠেই বিপ্র হন এবং ব্রহ্মকে জানলেই ব্রাহ্মণ পদবাচ্য।

    ধর্মশাস্ত্রে বর্ণিত দশ প্রকার সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। যার একটি হল চূড়াকর্ম। চূড়াকর্ম বা চূড়াকরণ শ্রুতির বিধান অনুসারে ধর্মলাভের জন্য দ্বিজাতিগণের (ব্রাহ্মণ) উচিত এবং আবশ্যিক কর্ম। “চূড়া’ মানে শিখা বা টিকি। মনুর মতে শিশুর চূড়াকরণ বা প্রথম কেশচ্ছেদন/মস্তকমুণ্ডনের অনুষ্ঠান দুই সময়ে করা যায়। শিশুর এক বছর বয়সে বা তিন বছর বয়সে, এ বিষয়ে কোনো কঠোর বিধান নেই। কিন্তু “কুমারা বিশিখা ইব” এই বেদবচন অনুসারে চূড়াকরণ অবশ্য কর্তব্য। এই সংস্কারে শিখা বা টিকি রেখে মাথার অবশিষ্ট চুল কেটে ফেলা হয়, একে চৌলকর্মও বলে। এরপরের সংস্কারটি হল উপনয়ন, একেই পৈতে বা পইতা গ্রহণের অনুষ্ঠান বলে। ‘উপ’ মানে নিকটে বা কাছে এবং ‘নয়ন’ মানে নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ বেদ শিক্ষার জন্য বালককে আচার্যের কাছে নিয়ে যাওয়ার অনুষ্ঠান। এটি হল দ্বিজাতির অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রারম্ভিক সংস্কার, এতে উপবীত বা যজ্ঞসূত্র ধারণ করতে হয়। বিধান অনুসারে ব্রাহ্মণদের আট বছর বয়সে, ক্ষত্রিয়দের এগারো বছর বয়সে এবং বৈশ্যদের দ্বাদশ বছর বয়সে উপনয়ন কর্তব্য। অবশ্য উপনয়নের ঊর্ধ্বসীমা ব্রাহ্মণের ষোলো বছর, ক্ষত্রিয়ের বাইশ বছর এবং বৈশ্যের চব্বিশ বছর নিদান আছে। শূদ্রের উপবীত ধারণের কোনো অধিকার নেই। ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদের উপবীত ধারণের অধিকার দেওয়া হলেও আসলে উপবীত ধারণের অধিকারটা ব্রাহ্মণগণই আত্মসাৎ করে নিয়েছিল। কারণ ব্রাহ্মণ ছাড়া আর কারোরই পূজা-পার্বণ করার অধিকার ছিল না, যাঁরা পূজা পার্বণ করার অধিকার কায়েম করলেন, তাঁদেরই পৈতে ধারণের প্রয়োজন হয়ে পড়ল, কারণ পূজা-পার্বণে পৈতার ভূমিকা সংযোজন করা হল। শাস্ত্রে আরও বলা হল ষোলো বছরে ব্রাহ্মণদের, বাইশ বছরে ক্ষত্রিয়দের এবং চব্বিশ বছরে যদি উপনয়ন সংস্কার না-হলে তাঁরা ব্রাত্য পরিগণিত হবে। ব্রাত্যরা আচার অনুষ্ঠানে কোনো অধিকার থাকে না। তাঁদের সঙ্গে ব্রাহ্মণদের অধ্যয়ন সংক্রান্ত এবং বৈবাহিক কোনো সম্পর্ক স্থাপন করা যায় না। তবে হ্যাঁ, যথাবিধি প্রায়শ্চিত্ত করলে তবেই সমাজে তারা স্থান পায়। এইসব কথা অথর্ববেদের পঞ্চদশ কাণ্ডে বলা হয়েছে। আর-একটি সংস্কার হল কেশান্ত সংস্কার। ব্রাহ্মণাদি বর্ণের মধ্যে প্রচলিত এই প্রাচীন সংস্কারে উপনয়নের শেষ ঊর্ধ্বসীমায় চুল কাটা ও দাড়ি কামানোর অনুষ্ঠানই কেশান্ত সংস্কার। এই অনুষ্ঠানে গোরু দান করা হয় বলে আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্রে (১/১৮) একে গোদান বলা হয়েছে।

    উপরে যে সংস্কারগুলি আলোচনা করা হল সেগুলি ব্রাহ্মণগণের অবশ্য কর্তব্য। এবার আমরা দেখে নেব ব্রাহ্মণগণের কর্ম-বিভাজনের কারণে শ্রেণি-বিভাজন।

    (১) আচার্য : মনুর মতে যে ব্রাহ্মণ শিষ্যের উপনয়ন করিয়ে তাকে কল্প। (যজ্ঞবিদ্যা) ও রহস্য (উপনিষদ) সহ বেদ অধ্যয়ন করান তাকে আচার্য বলা হয় (যেমন –ভট্টাচার্য = ভট্ট + আচার্য)। কল্প ও রহস্যবিদ্যা না জানলে বেদাধ্যয়ন সম্পূর্ণ হবে না। তবে আগে শিষ্যকে উপনয়নের সময় সাবিত্রীমন্ত্র তার কানে কানে পড়বেন। ফলে সেই শিষ্যের দ্বিজাতিত্ব প্রাপ্তি ঘটবে। তখন সে বেদাধ্যয়ন করার অধিকার পাবেন। প্রায় সমস্ত স্মৃতিশাস্ত্রে এই কথা উল্লেখ আছে।

    (২) উপাধ্যায় : মনুর মতে যে ব্রাহ্মণ জীবিকার জন্য বেদের অংশমাত্র বা বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করান তিনিই উপাধ্যায় (বন্দ্যোপাধ্যায় = বন্দ্য + উপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায় = মুখ + উপাধ্যায় ইত্যাদি)। সমগ্র বেদ নয়, বেদের অংশ যেমন– সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ প্রভৃতির যে-কোনো একটি। আর বেদাঙ্গ যেমন –শিক্ষা, নিরুক্ত, ব্যাকরণ, ছন্দ ও জ্যোতিষ, কল্প প্রভৃতি। উপাধ্যায়ও শিক্ষক, তবে আচার্যের থেকে কিছু পার্থক্য আছে। উপাধ্যায় অর্থের বিনিময়ে বেদের অংশ বা বেদাঙ্গ পড়ান। কিন্তু আচার্য কোনোরকম দক্ষিণা গ্রহণ করবেন না। তাই উপাধ্যায় অপেক্ষা আচার্য মান্যতর।

    (৩) গুরু : মনুর মতে যে ব্রাহ্মণ শাস্ত্রের বিধান অনুসারে গর্ভাধান প্রভৃতি কর্ম সম্পাদন করেন এবং অন্নের দ্বারা প্রতিপালন করেন সেই ব্রাহ্মণ গুরু হিসাবে পরিগণিত হন। এখানে ‘নিষেক’ শব্দের দ্বারা দশবিধ সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, দশটি সংস্কারের মধ্যে গর্ভাধান অন্যতম। ভবিষ্যতের বা হবু পিতাই তাঁর পত্নীর জন্য এই সংস্কার সম্পাদন করেন। পিতাই অন্নের দ্বারা সন্তানদের প্রতিপালন করেন, ফলে পিতাই প্রকৃতপক্ষে গুরু।

    (৪) ঋত্বিক : কোনো ব্যক্তি যাঁকে যজ্ঞের জন্য বরণ করে নেওয়ার তিনি ওই ব্যক্তির জন্য অগ্ন্যাধান, অর্থাৎ যজ্ঞকালে মন্ত্রসহকারে অগ্নি উৎপাদন ও স্থাপন, পাকযজ্ঞ এবং অগ্নিষ্টোম প্রভৃতি যজ্ঞ সম্পাদন করেন তাঁকে বলে। আচার্য প্রভৃতির মতো ঋত্বিকও যে সম্মানীয় তা দেখানোর জন্যই এই পদ। বৈদিক যজ্ঞে ঋত্বিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। মনুসংহিতায় দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৪৩ সংখ্যক শ্লোকে যে ঋত্বিকদের কথা বলা হয়েছে তিনি শুধু বৈদিক নন, স্মার্ত বা লৌকিক ক্রিয়াকর্ম সম্পাদন করেন। গায়ত্রী মন্ত্র : যিনি যেই মুহূর্তে ব্রাহ্মণে উন্নীত হলেন, সেই মুহূর্ত থেকে তিনি প্রণব বা ওংকার এবং গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণের অধিকার অর্জন করলেন। উপনয়ন প্রাপ্ত ব্রহ্মচারীর কর্তব্য বিষয়ে উপদেশ দিতে গিয়ে মনু প্রণব বা ওংকার কথাটি ৭৬ সংখ্যক শ্লোকে বলেছেন, বেদপাঠের আগে ও পরে বেদপাঠার্থী শিষ্য প্রণব বা ওংকার উচ্চারণ করলে মনের একাগ্রতা, পবিত্রতা আছে। ওংকারহীন পাঠ কোনো কাজে আসে না। প্রণব বা ওংকারে আছে তিনটি অক্ষর। — ‘অ’, ‘উ’, ‘ম’– তিনটি অক্ষর মিলে উচ্চারণ হয় “ওঁ”– উচ্চারণ করলে ‘অউম’ হয়। গায়ত্রী মন্ত্রের তিনটি প্রয়োজনীয় বিভাগ আছে, সেগুলি হল –(ক) প্রণব বা ওংকার, (খ) ব্যাহতি এবং (গ) সাবিত্রী ঋক্‌। ব্যাহৃতি শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল– উক্তি, কথন, উচ্চারণ, বি-আ-হৃ + ক্তি = ব্যাহৃতি। ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ –এগুলি গায়ত্রী মন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত সাবিত্রী বচন, এগুলিকে ব্যাহৃতি বলে। অনেকে ব্যাহৃতি মানে শব্দ (word) বা স্থান বলেছেন। তিনটি ব্যাহৃতি-র মধ্যে ‘ভুঃ’ হল পৃথিবীলোক, অগ্নিদেবতা, ঋগ্বেদ ও প্রাণবায়ুস্বরূপ। ’ভুবঃ’ হল অন্তরিক্ষলোক, বায়ুদেবতা, সাম ও অপানস্বরূপ। স্বঃ হল দ্যুলোক, আদিত্যদেবতা, যজুঃ ও ব্যানবায়ুস্বরূপ। যেহেতু বেদ অধ্যয়নের আগে প্রণব, ভূঃ, ভুবঃ স্বঃ ব্যাহৃতি ও সাবিত্রী বা গায়ত্রী মন্ত্রপাঠ করতে হয়, সেহেতু এগুলিকে বেদের মুখ বা প্রবেশদ্বার বলা হয়েছে। ঋকের দেবতা সবিতা, কিন্তু মন্ত্রটি গায়ত্রী ছন্দে গ্রথিত। তাই সাধারণভাবে একে গায়ত্রী মন্ত্র বলা হয়। সাবিত্রী শব্দের দ্বারা গায়ত্রীকেই বোঝায়। সাবিত্রী হল ত্রিপাদযুক্ত গায়ত্রী মন্ত্র ব্রহ্মা ঋক্, সাম, যজুঃ– এই তিনটি বেদ থেকে গায়ত্রীর তিনটি পাদ –(ক) তৎসবিতুর্বরেণ্যং, (খ) ভর্গো দেবস্য ধীমহি, (গ) ধিয়ো যো নঃ প্রচোদ্দয়াৎ। অর্থাৎ প্রকাশমান (দেব) সবিতার সেই বরেণ্য তেজঃ (ভগ) আমরা ধ্যান করি, যিনি আমাদের বুদ্ধিসমূহকে প্রেরণ করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয় ওংকার (অ = ব্রহ্মা, উ = বিষ্ণু, ম = মহেশ্বর) এবং গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ করার অধিকার অব্রাহ্মণদের নেই, এ অধিকার শুধুমাত্র ব্রাহ্মণগণের। অবশ্য শাস্ত্রানুযায়ী বর্তমানে ‘ব্রাহ্মণ’ বলে যদি কোনো অস্তিত্ব থাকে! বেদ পাঠ তো দূরের কথা– ঋক্, সাম, যজুঃ বা সাম বেদ বেশিরভাগ ব্রাহ্মণগণ চোখেই দেখেননি। আর ব্রহ্মজ্ঞান? দেড় টাকা দিয়ে উপবীত বা পইতে পরে নিলেই ব্রহ্মজ্ঞান হয়ে যায় না। শাস্ত্রকার রঘুনন্দন বলেছেন– “বিপ্রাঃশূদ্র সমাচারাঃ ভবিষ্যন্তি কলিযুগে”। অর্থাৎ, “ভবিষ্যতে কলিযুগে বিপ্র এবং শূদর সবাই সমান আচার সম্পন্ন হবে”। তবে ‘ওঁ’ শব্দের পরিবর্তে অব্রাহ্মণগণকে সহজ মন্ত্র ‘নমঃ’ শব্দ উচ্চারণ করার ঢালাও অধিকার দেওয়া হয়েছে।

    ভারতে কোন্ ব্রাহ্মণ কোথায় থাকতেন সেটা একবার দেখে নেব। মনুসংহিতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে ধর্মানুষ্ঠানের পক্ষে উপযুক্ত দেশরূপে ব্রহ্মাবর্তের কথা বলা হয়েছে–

    (১) সরস্বতী এবং দৃষদ্বতী –এই দুটি দেবনির্মিত পবিত্র নদীর মধ্যবর্তী প্রদেশ ব্ৰহ্মাবর্ত বলে পরিচিত ছিল। এই স্থান ধর্মানুষ্ঠানের পক্ষে উপযুক্ত স্থান বলে কথিত। ব্ৰহ্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণগণ অধিক সংখ্যায় এই স্থানে বাস করতেন। এই ব্ৰহ্মাবর্তের ব্রাহ্মণাদি বর্ণের আচার-আচরণই মনু সদাচার বলেছেন।

    (২) মনু কুরুক্ষেত্র, মৎস্য, পঞ্চাল ও শূরসেন– এই চারটি প্রদেশকে ব্রহ্মর্ষিদেশ বলা হয়েছে। উৎকর্ষের বিচারে ব্রহ্মাবর্তের পরেই ব্রহ্মর্ষিদেশ। ব্রহ্মর্ষিদেশের ব্রাহ্মণগণ পণ্ডিত, শাস্ত্রজ্ঞ, ধার্মিক এবং শ্রুতি ও স্মৃতি প্রতিপাদিত কর্মসমূহের অনুষ্ঠানে দক্ষ। তাই এঁদের কাছ থেকে অন্যান্য দেশের লোকেরা যথার্থ আচার-আচরণ শিক্ষা করবে।

    (৩) মনু বলেন যে দেশে কৃষ্ণসার মৃগ স্বভাবত বাস করে অর্থাৎ যেখানে এইরকম মৃগ জোর করে অন্য জায়গা থেকে আনা হয় না বা এখানে কেউ কারোকে হিংসা করে না বলে কৃষ্ণসার মৃগ স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়, সেই দেশকে যজ্ঞীয় দেশ বলে। এবার দেখব উত্তরীয়, মেখলা, উপবীত, দণ্ড, ভিক্ষা প্রার্থনা ব্রাহ্মণ সহ বর্ণভেদে (শূদ্র ব্যতীত) কার কেমন (বিভাজন) হওয়া আবশ্যক।

    উত্তরীয় : ব্রহ্মচারীর উত্তরীয় বা ঊধ্বসন হবে– ব্রাহ্মণদের কৃষ্ণমৃগের, ক্ষত্রিয়দের রুরু হরিণের এবং বৈশ্যদের ছাগের চামড়ায় তৈরি হবে। তেমনই অধোবসন হবে যথাক্রমে শণ, রেশম এবং পশমের তৈরি বস্ত্র পরিধান করবে।

    মেখলা : ব্রাহ্মণ ব্রহ্মচারীর মেখলা (কোমরবদ্ধ) হবে মুথা ঘাসের তৈরি, ত্রিগুণিত, সমান ও চিক্কণ। ক্ষত্রিয় ব্রহ্মচারীর মেখলা হবে তৈরি এবং ধনুকের গুণের মতো। বৈশ্য ব্রহ্মচারীর মেখলা হবে শণসূত্রে নির্মিত এবং ত্রিগুণিত (তিনটি সমান মোটা সুতোয় প্রস্তুত)।

    উপবীত : ব্রহ্মচারীর উপবীত (পইতা) বাম কার্ধের উপর থেকে ডানদিকে ঝোলানো থাকবে এবং তিনটি সুতোর গোছায় তিন গোছা সুতোয় তৈরি হবে। অবশ্য ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যের ক্ষেত্রে সুতোর উপাদান হবে যথাক্রমে কাঁপাস, শণ ও পশম। অপরদিকে শরীরের যাজ্ঞাপবীতের অবস্থান অনুসারে ব্রাহ্মণদের তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে।

    (১) ব্রাহ্মণের উপবীত বাম কাঁধের উপর থেকে ডান হাতের নীচে পর্যন্ত ঝোলানো থাকলে তাঁকে উপবীতি বলে। কখন? দৈব কার্য ও যাজ্ঞ্যজ্ঞাদির সময় ব্যবহার হয়।

    (২) ডান কাঁধ থেকে বাম হাতের নীচ পর্যন্ত উপবীত থাকলে প্রাচীনাবীতী বলে। কখন? পিতৃকার্যে বা শ্রাদ্ধাদিতে ব্যবহার হয়।

    (৩) উপবীত গলায় হারের মতো লম্বমান থাকলে নিবীতী বলে। কখন? মনুষ্য কার্যের বা প্রাত্যহিক কাজের সময় ব্যবহার হয়।

    দণ্ড : উপনয়নের পর ব্রহ্মচারীকে দণ্ড ধারণ করতে হয়। ব্রাহ্মণের দণ্ড হবে তার চুল পর্যন্ত লম্বা এবং বেল বা পলাশ কাঠের তৈরি। ক্ষত্রিয়ের দণ্ড হবে তার কপাল পর্যন্ত লম্বা এবং বট বা খয়ের কাঠের তৈরি। বৈশ্য ব্রহ্মচারীর দণ্ড হবে তার নাক পর্যন্ত লম্বা এবং পীলু বা ডুমুর কাঠের তৈরি। দণ্ডগুলি হবে সরল, অক্ষত, সুদর্শন, বল্কলযুক্ত এবং অগ্নিতে অদগ্ধ।

    ভিক্ষা প্রার্থনা : উপনয়নের পর ব্রহ্মচারী দণ্ডধারণ ও অগ্নি প্রদক্ষিণ করে প্রথমে সে মা, বোন কিংবা মাসি অথবা এঁদের অভাবে যে তাকে অবজ্ঞা বা প্রত্যাখ্যান করবেন না এমন ব্যক্তির কাছে ভিক্ষা প্রার্থনা করবে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য ব্রহ্মচারী যথাক্রমে প্রর্থনা বাক্যে প্রথমে, মধ্যে ও অন্তে “ভবৎ” শব্দ গঠিত সম্বোধন পদ ব্যবহার করে ভিক্ষা প্রার্থনা করবে। হিন্দুসমাজে চতুর্বর্ণের সম্মান কাদের কোথায় দেখে নেব ছোট্টো করে। ধন, বন্ধু, বয়স, কর্ম ও বিদ্যা –এই পাঁচটি হল মান্যস্থান।

    “বিত্তং বন্ধুয়ঃ কর্ম বিদ্যা ভবতি পঞ্চমী।

    এতানি মান্যস্থানানি গরীয়ো য যদুত্তরম”॥ (মনুসংহিতা ২/১৩৬)

    এই পাঁচটির মধ্যে আগেরটির চেয়ে পরেরটি বেশি সম্মানযুক্ত। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য– এই তিন বর্ণের অন্তর্গত কোনো ব্যক্তির মধ্যে যদি ধন প্রভৃতি পাঁচটির আধিক্য ও উৎকর্ষ থাকে, তবে তিনি সকলের সম্মানের যোগ্য হবেন। কিন্তু শূদ্রের ক্ষেত্রে নব্বই বছরের বেশি বয়স হলে তিনিও সম্মানের যোগ্য হবেন। ব্রাহ্মণ বিদ্যার জন্য, ক্ষত্রিয় বীরত্বের জন্য, বৈশ্য ধনসম্পদের জন্য এবং শূদ্র বয়সে বড় হলেই শ্রেষ্ঠ হবেন। বুঝুন! শূদ্রের শুধু বয়সেই সম্মান, তাও আবার নব্বইয়ের অধিক হতে হবে। অর্থাৎ ধন, বন্ধু, কর্ম এবং বিদ্যার কোনো অধিকার নেই, অর্জন করলেও স্বীকৃতি নেই। মনুসংহিতায় মনুবাবু বলছেন, শূদ্রকে শিষ্য করবে না এবং শূদ্রের শিষ্য হবে না(মনুসংহিতা– ৩/১৫৬)। সে কারণেই দ্রোণ কর্তৃক নিষাদপুত্র একলব্যকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ হারিয়ে তুণ্ড হয়ে যেতে হয়, সে কারণেই রামচন্দ্র কর্তৃক শূদ্র শম্বুককে অকারণে (তপস্যা করার অপরাধে!) মৃত্যুবরণ করতে হয়। এ ঘটনা অস্বাভাবিক নয়, কেন-না এটা মনুসংহিতার মনুর নির্দেশ–

    “নাবি স্পষ্ট মধীয়ীত ন শূদ্র জন সন্নিধ্য।

    ন নিশান্তে পরিশ্রান্তো ব্রাহ্মাধীত্য পুনঃ স্বপেৎ”।

    অবশ্য এক শ্রেণির ব্রাহ্মণগণ মিথ্যা একটা প্রচার চালালেন। ভাবটা এমন যেন তাঁরা কত উদার! কী বললেন? বললেন– শূদ্র যদি ব্রাহ্মণের বা ক্ষত্রিয়ের মতো কাজে পারদর্শী হয় তবে তাকে ব্রাহ্মণত্বে বা ক্ষত্রিয়ত্বে উন্নীত করা যাবে। কার্যে তার কোনো প্রমাণ আছে নাকি? বিশ্বামিত্রের কথা বলবেন বুঝি? প্রথমত বিশ্বামিত্র শূদ্রপুত্র নয়, ক্ষত্রিয়। দ্বিতীয়ত ক্ষত্রিয়রাজ বিশ্বামিত্রকে ক্ষমতায় রুখতে না-পারার কারণে ব্রাহ্মণগণ বাধ্য হয়েই ব্রাহ্মণ বলে মেনে নিয়েছিলেন। যে ব্রাহ্মণগণ মনুসংহিতা রচনা করে–

    “সহাসনমভিপ্রেক্ষ্ণরুকৃষ্টস্যাপকৃষ্টজঃ।

    কট্যাং কৃতাঙ্কো নিৰ্বাস্যঃ স্কিচং বাস্যাব কৰ্তয়েৎ”

    অর্থাৎ ব্রাহ্মণেতর অধম জাতি যদি ব্রাহ্মণের সঙ্গে একাসনে উপবেশন করে তবে রাজা ওই তার কটিদেশে গরম লোহার দাগ দিয়ে দেশ থেকে বিতাড়িত করবেন অথবা যেন না মরে এমনভাবে তার পাছা কেটে দেবে।

    বলেন সেই ব্রাহ্মণগণ মঙ্গলদায়ক আর কী করতে পারে! অব্রাহ্মণ শিক্ষকতা করলেও সে অব্রাহ্মণই থাকে, তাকে কেউ ব্রাহ্মণ বলে অতিরিক্ত সম্মান করে না। কারণ ‘মনুস্মৃতি’ নিদান দিয়ে দিয়েছেন —

    (১) ১০ বছরের ব্রাহ্মণ এবং ১০০ বছরের এক ক্ষত্রিয়ের সম্পর্ক যদি পিতা-পুত্র হয়, তাহলে এদের মধ্যে ব্রাহ্মণ হচ্ছে পিতা।

    (২) একজন ব্রাহ্মণের গৃহে কোনো ক্ষত্রিয়, বৈশ্য অথবা শূদ্রকে অতিথি বলা যাবে না। একজন ব্রাহ্মণের গৃহে শুধু ব্রাহ্মণেরই অতিথি হওয়ার অধিকার আছে।

    (৩) একজন ব্রাহ্মণ নিশ্চিন্ত মনে একজন শূদ্রের জিনিস নিয়ে নিতে পারে, কারণ শূদ্রের নিজের বলে কিছুই নেই।

    মনুসংহিতায় শ্রীমান মনু বলছেন, কারা কাদের পিতা ব্রাহ্মণ হলেও কে ব্রাহ্মণ নয়। যিনি জাতিতে ব্রাহ্মণ হয়েও আচার-আচরণে ব্রাহ্মণ নন, তাঁরা ব্রাহ্মণব্রুব হিসাবে পরিগণিত হবেন। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য বর্ণের কোনো বালকের উপনয়নের বয়সের ঊর্ধ্বসীমা যথাক্রমে ষোলো, বাইশ এবং চব্বিশ বছর অতিক্রম করে গেলেও যদি তার উপনয়ন সংস্কার অনুষ্ঠিত না-হয় সে ব্রাত্য হিসাবে চিহ্নিত হয়। এই ব্রাত্যদের কোনো ব্রাহ্মণের সঙ্গে যাজন, অধ্যাপনা প্রভৃতি বেদসম্বন্ধ ছিল না এবং সংশ্লিষ্ট বর্ণের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কও নিষিদ্ধ ছিল। অবশ্য শাস্ত্র বলছে মূর্খ ব্রাহ্মণগণ শূদ্রের অধম। অতএব সাধু সাবধান! মূর্খ ব্রাহ্মণগণ দূর হোঠো। নারায়ণ-শিলা স্পর্শ করবেন না।

    তাহলে এই যে এত এত ব্রাহ্মণ সৃষ্টি হল কিংবা সৃষ্টি করা হল ভারতে, তাতে কার কী কাজে লাগল, তারাই-বা কী করল সমাজে, কী রাখল সমাজে? মনুসংহিতা’-য় মনু ব্রাহ্মণদের জন্য বললেন —

    “অধ্যাপনমধ্যয়নং যজনং যাজনং তথা।

    দানং প্রতিগ্ৰহঞ্চৈব ব্রাহ্মণানামকল্পয়ৎ”। (১/৮৮)।

    অর্থাৎ, ব্রাহ্মণদের জন্য সৃষ্টি করলেন অধ্যাপনা, অধ্যয়ন, যজন, যাজন, দান, প্রতিগ্রহ।

    ব্রাহ্মণগণের আশ্চর্যজনক এবং অদ্বিতীয় আবিষ্কার ঈশ্বর বা দেবতা বা ভগবান। এটাই ব্রাহ্মণগণের একমাত্র পুঁজি বা মূলধন। এবং ঈশ্বরকে সামনে রেখে স্বর্গ নরক, পাপ-পূণ্য, আত্মা, ইহকাল-পরকাল, জন্মান্তর, কর্মফল ইত্যাদি মানুষের জীবন-মরণের সঙ্গে সংযোজন করে দিলেন। সাধারণ মানুষের মনে কোনো অদৃশ্য শক্তির ধারণাটা ছিলই, সেই সভ্যতার ঊষাকাল থেকে। কীভাবে এই ধারণা জন্মালো? বিধ্বংসী ঝড়, অনর্গল ভারী বর্ষণ, কড়কড়িয়ে মরণ বজ্রপাত, মুহুর্মুহু বিদ্যুতের ঝলকানি, নিথর মৃত-শরীর, দাবানল, প্লাবনই মানুষের মনে দানা বেঁধেছে কোনো অদৃশ্য শক্তির। প্রাকৃতজনের দেবদেবীদের উৎপত্তিস্থল ভীতি। তাই মনসা, চণ্ডী, শিব, ষষ্ঠি ইত্যাদি দেবদেবীদের জন্ম। তুর্কি আক্রমণের পরবর্তী সময়ে উন্নাসিক ব্রাহ্মণরা নীচু শ্রেণির মানুষদের সঙ্গে মেলবন্ধনের প্রয়োজন উপলব্ধি করেন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। তাই বৈদিক দেবদেবীদের সঙ্গে লৌকিক দেবদেবীদের একটা মনগড়া যোগ কল্পনা করে সংস্কৃত ছেড়ে লৌকিক ভাষায় মন্ত্র রচনায় মনোনিবেশ করেন।

    দক্ষিণ রায়, বনদেবী, মারাংবুরু, ভাদু, টুসু, ইতু, মনসা, ওলাউঠা, শীতলা প্রভৃতি লৌকিক দেবতাগণও পেলাম কালে কালে, বিভিন্ন সময়ে। বেদের যুগে অগ্নি, বরুণ, ইন্দ্রও লৌকিক দেবতা। এমনকি বেদের যুগের আগেও পশুপতি (যা পরে ব্রাহ্মণগণ আত্মসাৎ করে শিব তথা মহেশ্বরে রূপান্তরিত করে নেয়) লৌকিক দেবতা। লক্ষ করুন এই দেবতারা ব্রাহ্মণদের সৃষ্ট দেবদেবী নয়, সাধারণের আত্মীয়। সংস্কৃত মন্ত্র নেই, ব্রাহ্মণ-পুরোহিত নেই। এই দেবতারা শান্ত, নরম, সন্তানসম, আদরের। ব্রাহ্মণদের দেবতারা ক্ষতিকর, হিংস্র, ত্রাস সৃষ্টিকারী, অসহিসষ্ণু, কামুক, কামার্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ, ছিদ্র অন্বেষক– দুষ্টের দমন শিষ্টের পালনের নামে খুনোখুনি করে। এরা নরকের ভয় দেখায়, স্বর্গের লোভ দেখায়।

    এ ছাড়া মানুষ যা যা করতে অক্ষম, ঈশ্বরের মধ্যে সেই গুণগুলিই আরোপিত হয়েছে। এর থেকেই স্পষ্ট যে মানুষের দুর্বলতা এবং অসহায়তাই ঈশ্বরের আঁতুরঘর। লক্ষ করুন, এইসব প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি সবই উপরের শূন্য থেকে মানে আকাশ থেকেই পতন হয়। অর্থাৎ এইসব অঘটনের ধারণা হল স্রষ্টা আকাশেই থাকেন এবং অবশ্যই নিরাকার। সে কথা লিপিবদ্ধ হল হিন্দুদের প্রধান এবং একমাত্র ধর্মগ্রন্থ বেদে। বেদে আমরা ঈশ্বরের নিরাকার রূপই পাই। একমেবাদ্বিতীয়। ঈশ্বর এক বেদে বর্ণিত বেশিরভাগ দেবতাকল্পই প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেবতা (অগ্নি আগুনের দেবতা, বরুণ বৃষ্টির দেবতা, ইন্দ্ৰ বজ্রের দেবতা ইত্যাদি। ) এবং এরা বেদের যুগে কেউ কেউ পুজো পেলেও পুরাণোত্তর যুগে ব্রাত্য হয়েছে। সে কথায় পরে আসছি। আগে দেখে নেব বেদে বর্ণিত দেবতা কারা।

    শতপথ ব্রাহ্মণ (১৪.৫)-এ যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি শাকল্যকে বলছেন– দেব ৩৩টি যা পরমেশ্বরের মহিমার প্রকাশক। ৮ বসু, ১১ রুদ্র, ১২ আদিত্য, ইন্দ্র, প্রজাপতি। শতপথ ব্রাহ্মণ, মনুসংহিতা ও বৃহদারণ্যক উপনিষদে এর বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া আছে– বিদগ্ধ শাকল্য যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞেস করলেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব (শক্তি) কয়টি? যাজ্ঞবল্ক্য বললেন ৩৩টি। তখন শাকল্য আবার বললেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব কয়টি? তখন তিনি আবার বললেন ৬টি। শাকল্য আবার বললেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব কয়টি? তখন যাজ্ঞবল্ক্য উত্তর দিলেন ৩টি। আবার শাকল্য জিজ্ঞেস করায় তিনি উত্তর দিলেন দুইটি। তখন শাকল্য আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব কয়টি? তখন যাজ্ঞবল্ক্য বললেন দেড়টি। শাকল্য আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য দেব কয়টি? তখন তিনি বললেন একটি! তখন শাকল্য জিজ্ঞেস করলেন, এই ৩৩টি দেব কী? যাজ্ঞবল্ক্য বললেন ৮ বসু যা হল অগ্নি, পৃথিবী, বায়ু, অন্তরিক্ষ, আদিত্য, দ্যৌ, চন্দ্র, নক্ষত্র, ১১ রুদ্র যা হল প্রাণ (নিঃশ্বাস), অপান (প্রশ্বাস), ব্যন, সমান, উদাম, নাগ, কুৰ্ম্ম, কৃকল, দেবদত্ত, ধনঞ্জয় এবং জীবাত্মা, ১২ আদিত্য হল ১২ মাস, ইন্দ্র, প্রজাপতি অর্থাৎ মোট ৩৩টি। ইন্দ্র হল বিদ্যুৎ আর প্রজাপতি হল যজ্ঞ (যে কোনো শুভ কর্ম )। তখন শাকল্য আবার জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে ৬টা দেব কী কী? তখন তিনি। উত্তর দেন– অগ্নি, পৃথিবী, বায়ু, অন্তরিক্ষ, আদিত্য, দ্যুঃ। তখন তিনি বললেন, তাহলে ৩টি দেব কী? তখন যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, তিনলোক (ভ, দ্যু, অন্তরিক্ষ)। তারপর শাকল্য আবার বললেন, সেই দুইটি দেব কী কী,? খাদ্য এবং প্রাণ– উত্তর দিলেন যাজ্ঞবল্ক্য। তখন আবার শাকল্য জিজ্ঞেস করলেন, সেই দেড়টি কী? তখন যাজ্ঞবল্ক্য উত্তর দিলেন যিনি প্রবাহিত হন। তখন শাকল্য বললেন সেই এক এবং অদ্বিতীয় যিনি প্রবাহিত হন তাঁকে আপনি কীভাবে দেড় বললেন? তখন যাজ্ঞবল্ক্য বললেন যখন তা প্রবাহিত হয় তখনই সবকিছু উৎপন্ন হতে শুরু করে। তাহলে কে সেই এক? প্রাণ! হ্যাঁ প্রাণ (পরমাত্মা) সেই এক এবং অদ্বিতীয় দেব যাকে সবাই তৎ বলে জানে।”

    অসাধারণ এই শৈল্পিক ও গভীর দার্শনিক কথোপকথন ব্যখ্যা করছে সেই এক এবং অদ্বিতীয় পরব্রহ্ম থেকে সবকিছু উৎপন্ন হতে শুরু করে। একে একে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য, ভু, দ্যু এবং অন্তরীক্ষলোক, বিদ্যুৎশক্তি সবকিছুই তার থেকে তৈরি হয় যাদেরকে ৩৩টি ভাগে ভাগ করা হয় এবং এদেরকে বলা হয় দেব অর্থাৎ শক্তি। আর দিন শেষে শক্তি একটাই যা থেকে সকল কিছু আপাতশক্তিপ্রাপ্ত হয়। আর এই শক্তিই এক এবং অদ্বিতীয় পরমাত্মা।

    কী বুঝলেন? আপনি যাই-ই বুঝুন, অবশেষে ব্রাহ্মণগণ বুঝলেন বেদের দেবতাদের খাঁটিয়ে ধান্ধাপানি করা এক্কেবারেই অসম্ভব। অতএব বিকল্প পথের খোঁজে ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক রচিত হল ১৮টি মহাপুরাণ, ১৮টি উপপুরাণ এবং অবশ্যই মনুসংহিতা। এই গ্রন্থগুলির মূল উপজীব্য বিষয় ক্ষত্রিয়-ইতিহাস সংরক্ষণ, ব্রাহ্মণগণের চরম আধিপত্য বিস্তার এবং অবশ্যই রগরগে আদিরসাত্মক ভরপুর কাহিনি (ঈশ্বরিক নয়, মানবিক বৈশিষ্ট্যের সবকটি দোষগুণই প্রকট হয়েছে কাহিনির পরতে পরতে। মানবজাতির সবরকম অবদমিত ইচ্ছা পুরাণগুলিতে লিপিবদ্ধ হয়েছে)। সেই থেকেই ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়ের গাঁটছড়া। অর্থাৎ রাজনীতি আর ধর্মের সহবাস আদিকাল থেকেই। একে অপরের পরিপূরক। একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ধর্ম ছাড়া রাজনীতি অচল, রাজনীতি ছাড়া ধর্ম অচল। পতাকার রং যাই-ই হোক, ধর্মই তাঁদের তুরুপের তাস।

    বেদ এবং উপনিষদে একেশ্বরবাদ বর্ণিত হলেও পুরাণে যেন দেবতাদের মিছিল চলতে লাগল। কাড়ি কাড়ি দেবতা। দেবতার দেবতা এবং তার দেবতার তস্য দেবতা। গৌণ দেবতা এবং মুখ্য দেবতা। প্রধান দেবতা এবং অপ্রধান দেবতা। দেবতারা কী ভয়ানক এবং একই সাথে কত করুণাময় সেটা বোঝাতে আমদানি করা হল দৈত্য, দানব, রাক্ষস-খোক্ষস, অসুরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অবশ্য সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে ত্রিমূর্তিবাদ, অর্থাৎ ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর। ক্রমশ হিন্দুধর্ম হয়ে উঠল পুরাণভিত্তিক ধর্ম। সারা ভারতে হিন্দুগণের পূজার্চনা, ব্রত, নিয়ম সবকিছুই পুরাণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেল। বৈদিক অগ্নি, বরুণ, ইন্দ্র দেবতার পরিবর্তে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ইত্যাদি ঈশ্বরগণ প্রতিষ্ঠা পেল। চিন্ময়ী উপাসনা মৃন্ময়ী মূর্তিতে চলার জন্য পুরাণেই ব্যবস্থা হল। হিন্দুধর্মে প্রবেশ ঘটল বহুত্ববাদিতার স্বরূপ পৌত্তলিকতার। এই পৌত্তলিকতা এবং পুরাণ কাহিনিগুলিকে আশ্রয় করে কায়েম হল ব্রাহ্মণ্যবাদ। দেবতাদের মূর্তি কল্পনা করে পুজো করতে থাকল বুদ্ধের মৃত্যুর পর। কারণ বুদ্ধের মৃত্যুর তাঁর শিষ্যরাই প্রথম মূর্তি কল্পনা করে। সেটাই ব্রাহ্মণ্যবাদীরা অনুকরণ ও অনুসরণ করে অস্তিত্বের বিপন্নতা থেকে।

    ব্রাহ্মণগণের দ্বিতীয় মহার্ঘ আবিষ্কার হল সংস্কৃত ভাষা। এই সেই ভাষা যা দেবভাষা তথা দেবনাগরী বলে তকমা পেল। অর্থাৎ এ ভাষায় দেবতারা কথা বলেন– দেবতারা কথা বলেন, তাই ব্রাহ্মণগণ সেই ভাষায় কথা বলেন। অতএব দেবতাগণই ব্রাহ্মণ; ব্রাহ্মণগণই ঈশ্বর। ৩৬টি পুরাণ, একটি মনুসংহিতা এবং বেদ-পুরাণ-রামায়ণ-মহাভারত অনুসরণে শত-সহস্র সাহিত্য লিখিত হল সংস্কৃত ভাষায়। এমন ভাষা, যা নিজেরাই লিখলেন, নিজেরাই পড়লেন, নিজেরাই বুঝলেন। ব্রাহ্মণগণের তৃতীয় আবিষ্কার আত্মা, স্বর্গ-নরক, পাপ-পুণ্য, জন্মান্তর, কর্মফলের ধারণা ইত্যাদি।

    ব্রাহ্মণগণের চতুর্থ আবিষ্কার অভিসম্পাত এবং আশীর্বাদ।

    একদা ব্রাহ্মণগণের মুখ হইতে কী অগ্নি নিঃসৃত হইত? এমন কথা অবশ্য অনেককে বুক ফুলিয়ে বলতে শুনেছি– “আগে ব্রাহ্মণদের মুখ দিয়ে আগুন বেরুত”। কী মনে হয় পাঠকবন্ধু? উঁহু, ব্রাহ্মণদের মুখ দিয়ে আগুন কোনোদিন নিঃসৃত হত না, এগুলি ব্রাহ্মণদের ভয়-সঞ্চারের কৌশল– গল্পকথা। মুখ দিয়ে যা বেরত, তা হল অভিসম্পাত। কথায় কথায় অভিশাপ আর ক্রোধ বর্ষণ হত। এই অগ্নিরূপ অভিসম্পাতই ব্রাহ্মণের প্রতি ভীতির কারণ। পুরাণগুলিতে পরতে পরতে ব্রাহ্মণগণ কখন অভিশাপ দেন এবং কী অভিশাপ দেন এবং অভিশাপের ফলে কী পরিণতি হয় সেই কাহিনিই বর্ণিত হয়েছে। দুর্বাশার অভিশাপে দুষ্যন্তের স্ত্রী শকুন্তলাকে ভুলে যাওয়া, ভরতমুনির অভিশাপে অপ্সরা উর্বশীর পৃথিবীতে পতন, এমনকি সব অসুর-দৈত্যরাই অভিশাপের পরিণাম ভোগ এবং অবশেষে মুক্তি– ইত্যাদি হাজারো সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী কাহিনি। শুধু পুরাণই নয়, প্রাচীনকালে সংস্কৃত সাহিত্যগুলিতে ব্রাহ্মণের রোষে কী পরিণাম হতে পারে তার বর্ণনা পাওয়া যায়। মহাকবি কালিদাস বিরচিত ‘রঘুবংশম্’-এ দেখছি পূজ্য ব্যক্তিদের (পড়ুন ব্রাহ্মণদের) কোনোভাবেই অসম্মান করা উচিত নয়। পূজনীয় ব্যক্তির পূজার্চনায় বিঘ্ন ঘটলে শ্ৰেয়লাভের নানা বিঘ্ন এসে উপস্থিত হয়। প্রাচীন ভারতে রাজাদের মধ্যে নিমি, নহুষ প্রমুখ প্রবল পরাক্রান্ত রাজা হওয়া সত্ত্বেও পূজনীয় ব্রাহ্মণদের অপমান করার জন্য তাঁরা বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। বাচ্চা ব্রাহ্মণ পূজনীয়, বৃদ্ধ ব্রাহ্মণও পূজনীয়। পুরাণগুলি পাঠ করলেই স্পষ্ট হয়। ব্রাহ্মণগণ মোটেই ষড়রিপুমুক্ত ছিলেন না; কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য –সবই বিদ্যমান ছিল। অত্যন্ত অন্যায়ভাবে অযাচিত মায় আগ বাড়িয়ে ব্রাহ্মণ বাল্মীকি অভিসম্পাত করলেন শিকারি নিষাদকে (ব্যাধ)। প্রণয়মিলনে মত্ত এক ক্রৌঞ্চমিথুনের পুরুষটিকে তীরবিদ্ধ করে জনৈক ব্যাধ হত্যা করে। পুরুষ সঙ্গীর মৃত্যুশোকে নারী ক্রৌঞ্চীর করুণ বিলাপ আকাশ-বাতাস মুখরিত হল। এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বাল্মীকির মনে হল শিকারি নিষাদ অত্যন্ত গর্হিত এবং নিষ্ঠুর কাজ করেছে। তখন তাঁর মুখ থেকে স্বভাবসিদ্ধ আচরণে শাপবাণী তীব্র গরলের মতো নির্গত হল —

    “মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।

    যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিত”।

    অর্থাৎ, ক্রৌঞ্চযুগলের থেকে প্রেমবিবশ একটি পাখিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে সে যে পাপকর্ম করেছে তার ফলে সেই ব্যাধ চিরকালের জন্য কলঙ্কিত হয়ে থাকবে। কোনোদিন সুখৈশ্বর্য, গৌরব, প্রতিপত্তি কোনোরকম প্রতিষ্ঠা সে পাবে না, অর্থাৎ সে নির্বংশ থাকবে।

    ওঃ, ভাবা যায় না। ‘রামায়ণম্‌’ নামক একটি মহাকাব্য শুরুই হল অভিসম্পাত দিয়ে। এই সেই রামায়ণম্‌, যা পবিত্র– যেখানে এক উচ্চজাতি তথা ব্রাহ্মণ দ্বারা অভিসম্পাত বর্ষিত হল এক অন্ত্যজ ব্যাধের জীবনে। এটিই বোধহয় সর্বকালের বিখ্যাত অভিসম্পাত।

    মজার ব্যাপার হল পুরাণ-রামায়ণ-মহাভারতের ক্ষত্রিয়গণ কেউ যৌনক্ষম, কেউ বা জন্মদানে অক্ষম। অক্ষম পুরুষে ছড়াছড়ি। বীর্যহীন পুরুষের কাহিনি। অথচ ব্রাহ্মণগণ দেখুন কেমন বীর্য বিতরণে সক্রিয়! ব্রাহ্মণগণ ঘোষণা দিলেন “পুত্রার্থে ভার্যা”। বললেন অপুত্রক রাজার মুখ দেখা অশুভ। রাজাগণও সন্তান নয়, পুত্রলাভের জন্য অস্থির। বিচিত্রবীর্য, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু, দশরথ, দিলীপ প্রমুখ। অসংখ্য ক্ষত্রিয় রাজাগণ অপুত্রক ছিলেন। ব্রাহ্মণদের শয্যাসুখেই তাঁরা পুত্রবান হলেন। কীভাবে? সবার কথা এখানে আলোচনা করার পরিসর নেই। কালিদাস বিরচিত মহাকাব্য ‘রঘুবংশ’ থেকে অমিত পরাক্রমশালী বীর রাজা দিলীপের অপুত্রক থেকে পুত্রবান হওয়ার পুরাণকথা শুনব।

    সন্তানলাভের উপায় অন্বেষণের জন্য চড়ে এক সন্ধ্যায় সমবেত হয়ে ব্রহ্মার মানসপুত্র গুরু বশিষ্ঠ এবং গুরুপত্নী অরুন্ধতীর চরণ বন্দনা করেন। এরপর পরস্পর কুশল বিনিময়ের পর রাজা দিলীপ আসল কথাটি বলে ফেললেন। বললেন, রাজ্ঞী সুদক্ষিণার গর্ভে পুত্র না-হওয়ায় অনন্ত রত্নপ্রসবিনী বিশাল পৃথিবীও তাঁকে সুখদান করছে না। তাঁর পিতৃপুরুষগণ পিণ্ডলোপের আশঙ্কায় ভুগছেন। তাই কুলগুরু বশিষ্ঠ যেন তাঁর পিতৃঋণ মোচনের জন্য সন্তানলাভের ব্যবস্থা করে দেন। ব্রাহ্মণ শিরোমণি বশিষ্ঠ প্রত্যুত্তরে বললেন, সেবার দ্বারা নন্দিনীকে (স্বর্গের কামধেনু, বশিষ্ঠের হোমধেনু) প্রসন্ন করলে দিলীপের পুত্রলাভের যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা দূর হবে। কেমন সেই সেবা? অভ্যাস দ্বারা যেভাবে বিদ্যাকে আয়ত্ত করতে হয়, সেইভাবে ফলমূলাদি (বন্যবৃত্তি অবলম্বনের দ্বারা) আহার করে ব্রহ্মচর্য পালনের দ্বারা এবং সর্বদা অনুগমনের মধ্য দিয়ে নন্দিনীকে প্রসন্ন করতে হবে। অর্থাৎ নন্দিনী প্রস্থান করলে রাজাও প্রস্থান করবে, সে অবস্থান করলে রাজাও অবস্থান করবেন। নন্দিনী জলপান করলে রাজাও জলপান করবেন। তপোবনের সীমান্ত পর্যন্ত নন্দিনীকে করতে হবে। যেই কথা সেই কাজ। নন্দিনী চরতে চরতে এমনভাবে প্রতিদিনই সীমান্ত অতিক্রম করে এবং রাজাও বশিষ্ঠের কুঠির ত্যাগ করে বহুদূর চলে আসে। সেইসময় এই অবকাশে সুদক্ষিণার সঙ্গে বশিষ্ঠের সম্ভোগ-সুখ বিনিময় হতে থাকে দীর্ঘদিন ধরে। অবশেষে পুত্রলাভের আশীর্বাদ। সুদক্ষিণা গর্ভবতী হলেন। বাকিটা অনুমেয়।

    পুরাণে উল্লেখ্য ছিল ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য সব বর্ণের মানুষ শংকর, তাঁরাই শুধু আদি অবিমিশ্র রক্তধারার আর্য এবং সেই কারণেই তারা শ্রেষ্ঠতম। তৈত্তিরীয় সংহিতায় বলা হয়েছিল রাজাদের পুরোহিতদের সহায়তা অবশ্য প্রয়োজনীয়, এমন কি রাজার পক্ষে সঠিক পথে চলার নিমিত্ত পুরোহিতদের প্রয়োজন। পুরোহিত ক্ষত্রিয়ের আত্মা, কারণ পুরোহিত ব্যতীত রাজার অন্ন দেবতারা গ্রহণ করে না কিনা! অর্থাৎ, ক্ষত্রিয়রা শাসক সম্প্রদায় হলেও ব্রাহ্মণদের আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রেখেই রাজ্যশাসন করতে থাকবে। শরভঙ্গ, সুতীক্ষ্ণ, অগস্ত্যভ্রাতা ইধ্ববাহ, অগস্ত্য নামক ব্রাহ্মণদের প্ররোচনায় ঐন্দ্রধনু, খ, অক্ষয় বাণ, তূর্ণী দ্বারা ক্ষত্রিয় ভগবান (?) শ্ৰীমান রামচন্দ্র দণ্ডকারণ্যে প্রায় চোদ্দো হাজার অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষদের (যাঁদেরকে রামায়ণে রাক্ষস-খোক্ষস বলে চিহ্নিত করা হয়েছে) নির্বিচারে হত্যা করেছিলেন। “রক্ষসাং নিহতান্যাসন্ সহস্রাণি চতুর্দশ” (রামায়ণ–বালকাণ্ড–প্রথম সর্গ, ৪৯তম শ্লোক)। প্রাচীনকালে রাজারা সজ্ঞানেই ব্রাহ্মণদের কখনও ঘাটতে যাননি, কারণ শাস্ত্র সম্পর্কে অজ্ঞ মানুষের কাছে ব্রাহ্মণরা ঈশ্বর এবং ধর্মের নামে নিজেদের চূড়ান্ত শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন তার অনেক আগে থেকেই। তাই রাজারা ব্রাহ্মণদের হোশামোদ করেই প্রজাদের শাসন-শোষণ নিরবচ্ছিন্নভাবে করতে চাইতেন। ঠিক এই সময়েই ব্রাহ্মণরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের কীর্তন-গাঁথা রচনায় মনোযোগ দেন। তাতেও যখন কাজ হচ্ছিল না তখন তাঁরা কর্মফল, পুনর্জন্ম, আত্মা-পরমাত্মা, জন্মান্তরবাদ ইত্যাদি তত্ত্ব রচনাতে মনোনিবেশ করেন। পার্থিব ব্রাহ্মণ হত্যাকে ‘ব্রহ্মহত্যা পাপ’ নামে স্বর্গীয় পাপের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে আরও কঠোর করা হল ব্রাহ্মণদের অস্পৃশ্যবাদী প্রকল্পের চূড়ান্ত।

    ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত হিন্দুধর্মটি আসলে ব্রাহ্মণ্যধর্মের শোরুম। বেদ বা বৈদিক আশ্রিত নয়, পুরাণ বা পৌরণিক আশ্রিত। অনেক বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণদের মতবাদই ব্রাহ্মণ্যবাদ কায়েম হয়ে গেল। এ এমন এক মতবাদ, যা মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ শূদ্রদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করল। শুধু শূদ্রদের নয়, ক্ষত্রিয়-বৈশ্যদেরও কবজা করে ফেলেছিল ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়গণ। ক্ষত্রিয়দের অস্ত্রশিক্ষাও তাঁরা নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিলেন জটিল কৌশলে। পরশুরাম, দ্রোণাচার্য প্রমুখ ব্রাহ্মণগণ ক্ষত্রিয়দের অস্ত্রগুরু হিসাবে খুবই প্রসিদ্ধ হয়েছেন। এমনকি রাজকার্য পরিচালনাতেও ক্ষত্রিয়দের অভিভাবক এই ব্রাহ্মণই। বৃহস্পতি, শুক্রাচার্য, বশিষ্ঠ প্রমুখ ক্ষত্রিয়দের গুরু ছিলেন। আর তাই বশিষ্ঠের নির্দেশেই ক্ষত্রিয় রামচন্দ্র শূদ্র-তপস্বী শম্বুককে নিজের হাতে হত্যা করেছিলেন। ক্ষত্রিয়গণ বহুবার চেষ্টা করেছিলেন ব্রাহ্মণ্য প্রভাব থেকে মুক্ত হতে। পারেনি। যতবারই চেষ্টা করেছে ততবারই ব্রাহ্মণগণ নির্মমভাবে শাস্তিবিধান করেছেন। ব্রাহ্মণ পরশুরামের কথা মনে পড়ছে? ইনি পৃথিবীকে একুশবার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন। মানে ক্ষত্রিয়দের ধরে কচুকাটা করেছিলেন।

    অপরদিকে ক্ষত্রিয়-সন্তান বুদ্ধদেবের আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত জনসাধারণের উপর ব্রাহ্মণ-সম্প্রদায়ের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল অপ্রতিরোধ্য। ধর্মচিন্তাকে সুসংঘবদ্ধ করতে সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণি নিজেদের আধিপত্য অব্যাহত রাখতে তৈরি করেছিলেন উপাসনালয় এবং এর কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নিয়োগ করতে হয়েছিল উপাসক বা পুরোহিত সম্প্রদায়। প্রাচীন ভারতে উপাসকদের মনোনীত করতে হত। ক্রমশ এই উপাসক বা পুরোহিতদের শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এই সুবাদে তাঁরা হস্তগত করে ফেলেন উপাসনা পদ্ধতি প্রণয়নের অধিকারও। যাঁদের কাজ ছিল বিশ্বাসীদের জন্য বিশেষ বিশেষ প্রথার জন্ম দিয়ে ঈশ্বর এবং তার কল্পিত অনুচরদের তুষ্টি বিধানের পাশাপাশি নিজেদের তুষ্টি এবং পুষ্টিসাধন। উপাসনার নেতৃত্ব দিতে উপাসক বা পুরোহিতরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করেছিলেন সেটি হচ্ছে দৈবশক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দুর্বোধ্য সংস্কৃত ভাষায় ভাষ্যরচনা সৃষ্টি, যাকে বলা হয় ‘মন্ত্র’। প্রথমদিকে বৈদিক ধর্মগুরুরা ছিলেন মন্ত্র রচয়িতা। এরপর মূলত ব্রাহ্মণ এবং শাস্ত্রকাররা সনাতন ধর্মের সাংগঠনিক রূপ দেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালীরা শাসক সম্প্রদায়ের ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে আঁতাত করে চতুর্বর্ণ প্রথার জন্ম দেন। এই বর্ণপ্রথার বর্ণপ্রধান হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন ব্রাহ্মণগণ এবং স্বাভাবিকভাবেই উপাসনার জন্য মন্ত্র-স্তোত্র-স্তব রচনা করার ক্ষমতা অধিকার করেন। সম্ভবত ব্রাহ্মণরাই একমাত্র পূজারী শ্রেণি যাঁরা জন্ম সুত্রে এই অধিকার পান (যদিও এ ব্যাপারটি অশাস্ত্রীয়)। অবশ্য শুরুর দিকে ব্রাহ্মণরা উত্তরাধিকার সূত্রে পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করতে পারতেন না। এজন্য বিশেষ গুণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হত। বর্ণপ্রথা পাকাপাকিভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে সনাতন ধর্ম চেপে বসার আগে মন্ত্র রচনা করে ব্রাহ্মণ হতে পারতেন যে কেউ। এমনকি জন্মসুত্রে ব্রাহ্মণরা উপাসনার দায়িত্ব ছেড়ে বেছে নিতে পারত অন্য যে-কোনো পেশাও।

    সমাজের সুবিধাবাদী মন্ত্র-রচয়িতা ব্রাহ্মণরা খুব সহজেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন ধর্মীয় কাজ মায় ঈশ্বরের উপাসনা কর্মটি একাধারে আধ্যাত্মিক এবং পার্থিব প্রাধান্য বিস্তারে একটি শক্তিশালী নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে এবং এই চিন্তাসুত্রে ক্রমশ শাসক এবং মন্ত্র-রচয়িতা সম্প্রদায় নিজ নিজ স্বার্থের তাগিদে তৈরি করতে থাকে উপাসনা প্রকল্প। মগধীয় যুগ এবং মৌর্য যুগ– এসময়ই ব্রাহ্মণরা নিজেদের শ্রেষ্ঠতর দাবি করে শাস্ত্র রচনা শুরু করেন। এরপর আবিষ্কার করা হল বারো মাসে তেরো পার্বণ। জন্ম থেকে মৃত্যু– কোথায় নেই তাঁরা, এঁটুলি পোকার মতো আষ্টেপৃষ্টে রইলেন! আবিষ্কার করা হল কোটি কোটি দেব-দেবতার কোটি কোটি পুজো-পার্বণ– সারা বছর, প্রতিদিন এবং প্রতি মুহূর্তের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। মানুষকে স্বর্গে পৌঁছে দেওয়ার এইরকম বিশাল এবং সফল ইণ্ডাস্ট্রি পৃথিবীতে আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই।

    ব্রাহ্মণগণ সবচেয়ে বেশি লাভবান হতেন শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে। প্রচুর সম্পদ সংগ্রহ হত। কেমন ছিল সেই সেকালের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান? তার আগে জেনে নিই হিন্দুদের আদি বা মূল ধর্মগ্রন্থ বেদ হিন্দুদের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান নিয়ে কী নির্দেশ দিয়েছেন প্রাঙ্গণ। বৈদিক সংস্কারে মৃতের শেষকৃত্য সমাপনে যে মন্ত্রাদি ব্যবহৃত হয় তা পৌরাণিক নিয়ম অর্থাৎ হিন্দুদের বর্তমানে প্রচলিত নিয়ম বা মন্ত্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৈদিক নিয়মে মৃতের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে দুই থেকে তিনদিন লাগে। মানুষ মারা গেলে তাকে দাহ করার নাম “অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া। অন্ত্যা’ অর্থে অন্তিম, চরম বা সর্বশেষ এবং ইষ্টি’ অর্থে যজ্ঞ, শুভকর্ম বা সংস্কারকে বোঝায়। বৈদিক পণ্ডিত শ্রীমদ্ দয়ানন্দ সরস্বতী তাঁর রচিত “সংস্কার বিধি”-তে বলেছেন, “এখানে ‘ইষ্টি’ বলিতে যজ্ঞ বা শুভকর্ম বোঝয় বলিয়া অন্ত্যেষ্টি কর্মে পুণ্যই হইয়া থাকে। ইহাতে পাপ বা অশৌচ হইলে ইহার নাম ‘ইষ্টি’ হইত না। ‘অন্ত্যেষ্টি’ শব্দ স্বয়ং ঘোষণা করিতেছে যে, মৃতদেহ দাহ করাই পুণ্যের কাজ”। বড়োজোর, স্বামী দয়ানন্দ বলেছেন, শব দাহান্তে যে গৃহে মৃত্যু হয়েছে সেই গৃহ মার্জন, লেপন ও প্রক্ষালন করে বিশুদ্ধ করে নেওয়া যেতে পারে। এমনকি স্বস্তি বাচন ও শান্তি প্রকরণাদি মন্ত্র দ্বারা ঈশ্বরের উপাসনা করা যেতে পারে। কিন্তু পুরাণগুলির (বিশেষ করে গরুড়পুরাণ) ছত্রে ছত্রে যজমানদের নিঙড়ে কামানোর ফরমান। সবৎস্য গোরু দান, ভূমিদান, স্বর্ণদান, ষোড়শদান (১৬টি দ্রব্য –ভূমি বা ভূমিমূল্য, আসন, শয্যা, অন্ন, বস্ত্র, গোরু, জল, প্রদীপ, তাম্বুল, ছত্র বা ছাতা, গন্ধ, মাল্য বা মালা, ফল, পাদুকা, সোনা, রুপো। এগুলি দান করলে মৃত ব্যক্তি ৯৬০ হাজার বছর স্বর্গে সুখে কাল কাটাতে পারবে। মৃতের আত্মীয়গণ যত ভালো ভালো দ্রব্যাদি ব্রাহ্মণকে দান করতে পারেন তত ভালো ভালো দ্রব্যাদি মৃত ব্যক্তি স্বর্গে পাবেন। ), মৃতের পছন্দের জিনিসপত্র, ব্রাহ্মণভোজন ইত্যাদি কঠোর বিধান। সামর্থ্য থাক-বা-থাক, প্রয়োজনে ভিক্ষা করে এসবের আয়োজন করতে হবে। এইসব ব্রাহ্মণগণ মৃত আত্মীয়ের স্বর্গে পাঠানোর বাহানায় সমগ্র হিন্দুজাতিকে ভিখিরি করে ছেড়েছে। তবে বহুদিন হল ওইসব নিয়মের অনেক কাটছাঁট হয়ে গেছে। মৃত আত্মীয়ের বুকে ‘গীতা’ রাখলেই তিনি স্বর্গে চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার গীতাপাঠও করান। যদিও যাঁর উদ্দেশে পাঠ করা হচ্ছে তিনি কিছুই শুনতে পান না। কারণ তিনি মৃত, জড়বস্তু মাত্র।

    কিন্তু ব্রাহ্মণগণ বুঝেছিলেন এই বেদ অনুসরণ করলে ব্যাপক কোনো ফায়দা হবে না। অথচ মৃতের পরিবারের কাছ থেকে ব্যাপক ফায়দার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যু একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। কোন্ পরিবার -চায় তাঁর মৃত সদস্য স্বর্গসুখ পাক? অতএব মৃত সদস্যের স্বর্গের সমস্ত রকম সুখ দেওয়ার সবরকম ব্যবস্থার বিধি সৃষ্টি করতে হবে। অতঃপর ব্রাহ্মণগণ পুরাণের মতো গ্রন্থগুলি রচনার কাজে হাত দিলেন। রচিত হল ১৮টি প্রধান পুরাণ এবং ১৮টি উপপুরাণ নামক আকর গ্রন্থ। এই পুরাণগুলির পাতায় পাতায় বর্ণিত ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ বিষয়ক ভয়ংকর সব বক্তৃতা এবং স্ববিরোধী নিয়ম-বিধি-বিধান। এই পুরাণগুলিই হল ব্রাহ্মণ্যবাদের রক্ষাকবচ। ব্রাহ্মণ্যবাদের আলোচনায় পরে আসছি। এখন ফিরে যাই শ্রাদ্ধের প্রসঙ্গে। নিয়ম করলেন শোকার্ত পরিবারের কাছ থেকে কীভাবে কতটা চুষে খাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে চার্বাক সম্প্রদায়ের বাণী মনে পড়ছে– বেদ ভণ্ড, ধূর্ত, ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের রচনা। জীবিকা অর্জনের স্বার্থে তাঁরা স্বর্গ, নরক, পাপ, পুণ্য, ঈশ্বর, কর্মবাদ, কর্মফল, জন্মান্তরবাদ, আত্মা ইত্যাদি মিথ্যা অলৌকিক ধারণা প্রচার করে সাধারণ অসহায় মানুষদের যাগযজ্ঞ বাধ্য করে।

    নিয়ামক– হ্যাঁ, সেই নিয়ামকের মিশনে পৌঁছে যেতে ব্রাহ্মণরা কুলশ্রেষ্ঠের মর্যাদাটি দখল করে নেয়। তাঁরা রচনা করতে থাকে দুর্বোধ্য সব মন্ত্রাদি, বেছে নেন সংস্কৃত ভাষার মতো দুর্বোধ্য এবং অপ্রচলিত কৃত্রিম ভাষা। যে ভাষা ওরা ছাড়া কেউ বুঝত না, বোঝার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। সমাজের মাঝে প্রধান হয়ে উঠার জন্য এটিই ছিল অমোঘ হাতিয়ার। মন্ত্রের ঐন্দ্রজালিক মোহ দিয়ে তাঁরা ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। মন্ত্রকে ঈশ্বরের বাণী বলে প্রচার করতে থাকেন এবং সমাজের প্রায় সবার সমর্থনে আসন গেঁড়ে বসেন সমাজের শিখরে। সেখান থেকে যাতে কোনোভাবেই প্রত্যাবর্তন না-করতে হয় সেইজন্য দ্বিতীয় কুলশ্রেষ্ঠ ক্ষত্রিয় বা রাজা-শাসকদের সঙ্গে বজায় কূটনীতিক সদ্ভাব অব্যাহত রাখা হত। পুরাণে উল্লেখ্য ছিল ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য সব বর্ণের মানুষ শংকর, তারাই শুধু আদি অবিমিশ্র রক্তধারার আর্য এবং সেই কারণেই তাঁরা শ্রেষ্ঠতম। তৈত্তিরীয় সংহিতায় বলা হয়েছে, রাজাদের পুরোহিতদের সহায়তা অবশ্য প্রয়োজনীয়, এমনকি রাজার পক্ষে সঠিক পথে চলার জন্য পুরোহিতদের প্রয়োজন। পুরোহিত ক্ষত্রিয়ের আত্মা (রাজার আত্মা) কারণ পুরোহিতবিহীন রাজার অন্ন (দেবতাদের সন্তুষ্টির জন্য তুলে দেওয়া প্রাসাদ) দেবতারা গ্রহণ করে না। সে সময়ে ব্রাহ্মণগণ ক্ষত্রিয়দের পিঠ চাপড়াতেন, ক্ষত্রিয়ের সপক্ষে কাব্য-মহাকাব্য লিখতেন –অন্যদিকে ক্ষত্রিয়গণ ব্রাহ্মণদের পিঠ চাপড়াতেন, প্রশংসা করতেন, উপাধি দিতেন, অর্ধেক রাজ্য দিতেন ইত্যাদি– এভাবেই ধীরে ধীরে আম-আদমিদের অভিশাপ-আশীর্বাদের ভয়-ভরসা প্রদর্শন করে গড়ে তোলা হয়েছিল সনাতন ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ, যা আরও অনেক পরে হিন্দুধর্ম হিসাবে প্রকাশিত হয়। অপরদিকে ক্ষত্রিয়রা শাসক সম্প্রদায় হলেও ব্রাহ্মণদের আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রেখেই রাজ্যশাসন করবে –এই হল অদৃষ্ট, নিয়তি।

    ব্রাহ্মণকে হত্যা করা যায় না, হাজার গর্হিত অন্যায় কাজ করলেও নয়– পার্থিব ব্রাহ্মণ হত্যাকে ‘ব্রহ্মহত্যা পাপ’ নামে স্বর্গীয় পাপের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে আরও কঠোর করা হল ব্রাহ্মণদের অস্পৃশ্যবাদী প্রকল্পের চূড়ান্ত। চাউর করে দেওয়া হল ব্রাহ্মণ হত্যা করলে বেহ্মদত্যি হয়। বলা হল ৬৪ লক্ষ যোনি ভেদ করে ব্রাহ্মণের জন্ম হয়। ইতিহাসবিদ এবং পর্যটক মেগাস্থিনিসের বিবরণ থেকে জানা যায়, মৌর্যযুগে ধর্ম এবং ধর্মীয় কাজে ব্রাহ্মণদের প্রাধান্য ছিল। অপ্রতিরোধ্য। রাজ-দরবার এবং আইন-আদালত সর্বত্র প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কারণে এবং সব শ্রেণির কাছ থেকে দানদাক্ষিণ্য পেয়ে এক বিশাল বিত্তশালী শ্রেণীতে পরিণত হয় ব্রাহ্মণগণ। অনেকে আবার সরাসরি রাজকর্মও নির্বাহ করতেন। একসময় মগধ এবং মৌর্য রাজ্যগুলিতে রক্ষণশীল ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তুলনামূলক ভাবে অরক্ষণশীল ব্রাহ্মণদের চিন্তাগত দ্বন্দ্ব দেখা যায়।

    বৌদ্ধধর্ম মতে ব্রাহ্মণের বেশ কিছু ব্যাখ্যা এবং সংজ্ঞা পাওয়া যায়। আসুন, আমরা একটু অনুধাবন করার চেষ্টা করি। কিছুই ফেলা যায় না।

    প্রকৃত ব্রাহ্মণ : বুদ্ধের জম্মের পূর্বে ভারতে ব্রাহ্মণেরা তাদের নিজ মাহাত্ম্য প্রচারছলে জাতি অভিমান প্রকাশ করত মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ। কিন্তু বুদ্ধের সঙ্গে তেবিজ্জের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, কেবল ত্রিবেদ জ্ঞাত হলে প্রকৃত ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করা যায় না। ব্রাহ্মণত্ব লাভ করার জন্য অসমার্থক তর্ক ও বেদ, মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ভাবনা করা প্রয়োজন। যাঁরা এরূপ ভাবনার অধিকারী হয়ে অনাসক্ত নিষ্কলুষ, রজঃমুক্ত, লোভ-দ্বেষ-মোহবিহীন হয় এবং যিনি পাপ পঙ্কিল দূরতিক্রম্য মোহপূর্ণ সংসারাবর্ত মুক্ত হয়েছেন তিনিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ।

    জাতি দ্বারাই প্রকৃত ব্রাহ্মণ : হিন্দুদের বিশ্বাস জাতি দ্বারাই প্রকৃত ব্রাহ্মণ অধিকারী হয়। অর্থাৎ, প্রকৃত ব্রাহ্মণ হতে হলে ব্রাহ্মণ জাতিতে জন্ম কিংবা ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত হতে হবে। কিন্তু বুদ্ধ মতে, ব্রাহ্মণ জাতিতে জন্ম কিংবা ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত হয়ে পাপ মলত্যাগ করতে না করলে তাঁকে প্রকৃত ব্রাহ্মণ বলা যাবে না। তাঁকে কেবল ব্রাহ্মণ বলে সম্বোধন করা যায়। বংশগৌরব অথবা উচ্চবংশে জন্ম লাভ করেও শীল গুণে বিভূষিত না-হলে কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারে না। বহুলোক নীচু কুলে জন্মগ্রহণ করেও শীলাচার সম্পন্ন হয়ে পরিশ্রমের দ্বারাই সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে স্বর্গে গমন করতে পারে। তাই বুদ্ধ বলেছেন, জন্মের দ্বারা কেউ চণ্ডাল বা ব্রাহ্মণ হয় না, কর্মের দ্বারাই চণ্ডাল বা ব্রাহ্মণ হয়।

    প্রকৃত ব্রাহ্মণ তৃষ্ণামুক্ত : যিনি বন্ধনমুক্ত, অনাশ্রব, কামচিন্তা বিরহিত তিনিই তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ নামের যোগ্য। ব্রাহ্মণ ধ্যানী, একক বিচরণশীল, বস্তুকাম ও ক্লেশকাম পরিহার করে চলেন। যিনি সর্ব সংযোজন ছিন্ন করে ভয়মুক্ত, অনাসক্ত, শৃংখলামুক্ত তিনিই তৃষ্ণাক্ষয়ী ব্রাহ্মণ। ক্রোধপূর্ণ, জটাধারী, অজিনচর্ম পরিহিত ব্যক্তি ব্রাহ্মণের যোগ্য হতে পারে না। ক্রোধবিহীন, ব্রতপরায়ণ, শীলবান, সংযমী ও অন্তিম দেহদারী ব্যক্তি তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ বলে যোগ্য হন। যিনি গৃহস্থ ও অনাগরিক উভয়ের প্রতি অসংশ্লিষ্ট অল্পেচ্ছ ও আলয়বিহীন তিনিই তৃষ্ণামুক্ত ব্রাহ্মণ। যিনি ছোটো-বড়ো সর্বপ্রকার অদত্ত গ্রহণে বিরত, যার কোনো প্রকার তৃষ্ণা বিদ্যমান নেই যিনি সংশয়মুক্ত ও নির্বাণ প্রাপ্ত তিনিই ব্রাহ্মণ।

    জাত্যাভিমানী প্রকৃত ব্রাহ্মণ : তৎকালীন সময়ে ব্রাহ্মণেরা অভিমান বা অহংকার করে নিজের গৌরব করে বলত তারাই মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে জাতি অভিমান ব্রাহ্মণের কাজ নয়। কারণ জাতি হিসাবে মানুষ মানুষের কোনো পার্থক্য নেই। তঙ্কালীন মানবজাতির মধ্যে ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শুদ্রের পদচিহৃ একই ধরনের। কিন্তু হাতি, ঘোড়া, বাঘ প্রভৃতি প্রাণীদের মতো মানুষ মানুষের মতো পার্থক্য দেখা যায় না। প্রাণীদের মধ্যে স্ত্রী, পুরুষ, বর্ণ, শারীরিক গঠন, লোম, চঞ্চু, প্রভৃতি পার্থক্য আছে। কিন্তু মানুষ মানুষে তেমন পার্থক্য দেখা যায় না। বুদ্ধ মতে, যে-কোনো ব্যক্তি সৎকর্ম করলে ব্রাহ্মণের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেন। সভাব ও কৃচ্ছসাধনের দ্বারা যে-কোনো লোক ব্রাহ্মণ অর্জন করতে পারেন।

    ধ্যানীপরায়ণ প্রকৃত ব্রাহ্মণ : পণ্ডিতগণ বলেছেন, বনের প্রাণীরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। ঠিক তেমনি প্রকৃত শ্ৰমণ বা ব্রাহ্মণ ধ্যানপরায়ণ হলে শোভা পায় এবং অনাসক্ত, নিষ্কলুষ, রজযুক্ত লোভ-দ্বেষ-মোহবিহীন হয়। দিনেরবেলায় সুর্য আলো দিয়ে দিনের শোভা বৃদ্ধি করে, রাতের বেলায় চন্দ্র প্রদীপ্ত হয়ে রাতের শোভা রক্ষা করে এবং সৈন্য, সামন্ত, অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত হলে রাজার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। সেরূপ প্রকৃত শ্ৰমণ বা ব্রাহ্মণ ধ্যানপারয়ণ হলে শোভিতক হয়। বুদ্ধ নিজের জ্ঞানের প্রতিভায় দিন-রাত্রি প্রদীপ্ত হন। শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ পাপ পুণ্য ধ্যানরত হয়ে প্রকৃত প্রব্রজিত নামে অভিহিত হন।

    পুরাণ মতেও ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্ত হলেই কেবল ব্রাহ্মণত্ব অর্জিত হয়। তারপরও সনাতন ধর্ম যুগ যুগ ধরে চতুর্বর্ণভেদ টিকে ছিল প্রায় হাজার বছর ব্যাপী। তবে ব্রাহ্মণদের ধর্মীয় চাতুরি কার্যকারিতা হারাতে থাকে উনিশ শতকের শেষের দিকে। ব্রাহ্মণ্যবাদ থেকে উদ্ভূত কয়েকটি কদাচার-কুৎসিত সংস্কারের পর থেকেই এই অবরোহণের শুরু। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সহ প্রমুখ প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বের সংস্কার আন্দোলনে ব্রাহ্মণরা ক্ষমতা হারাতে শুরু করেন। এই শতকে নেওয়া দেবদাসী প্রথার আইনানুগ অবসান, সতীদাহ প্রথা নিবারণ, বিধবা-বিবাহের প্রচলন, কৌলীন্য প্রথার বিলোপ, ব্রাহ্মধর্ম প্রবর্তন এবং ছুৎমার্গের বাড়াবাড়ি অনেকটা কমে আসা থেকে ব্রাহ্মণদের খর্বতা শুরু হয়েছিল। কেন ব্রাহ্মণদের এরকম খর্ব শুরু হয়েছিল? কেন ব্রাহ্মণদের সম্মান নষ্ট হতে শুরু করল? কবে থেকে?

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ব্রাহ্মণ’ প্রবন্ধে লিখছেন, “ব্রাহ্মণও যখন আপন কর্তব্য পরিত্যাগ করিয়াছে, তখন কেবল গায়ের জোরে পরলোকের ভয় দেখাইয়া সমাজের উচ্চতম আসনে আপনাকে রক্ষা করিতে পারে না। কোনো সম্মান বিনামূল্যের নহে। যথেচ্ছ কাজ করিয়া সম্মান রাখা যায় না।”

    অপরদিকে প্রাজ্ঞ পণ্ডিত নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী একটি প্রবন্ধে বলেছেন– “ত্যাগ বৈরাগ্য-কৃচ্ছতা নেই, ঋজুতা নেই, তপস্যা নেই, অথচ অর্থগুঘ্নতা আছে, আত্মম্ভরিতা আছে, মাতব্বরি আছে, ভয় দেখানো আছে, এমন ব্রাহ্মণ্য সামাজিক মানুষের সম্মান লাভ করতে পারে না। …..প্রথাগত ব্রাহ্মণ্যের বিরুদ্ধে, জন্মব্রাহ্মণ্যের বিরুদ্ধে অথবা ব্রাহ্মণ্য-প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থোপার্জন করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং গুপ্ত সমালোচনা কিন্তু অনেকদিনই আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল এবং সেটা ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের মধ্যেই হয়েছিল। শুধুমাত্র শুষ্ক আচার দেখিয়ে, গুরুর গৌরব দেখিয়ে, পিতার গৌরব দেখিয়ে অধস্তন বর্ণকে অপমান করার একটা আদত ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের মধ্যে এমনভাবে নিহিত হয়ে গিয়েছিল যে, গৌরবযুক্ত পিতামাতার পুত্র-কন্যারা এবং অনুপযুক্ত শিষ্যরাও সমাজভুক্ত অধর বর্ণকে কথায় কথায় অপমান করে বসত। একদা ক্ষত্রিয়ের ক্ষাত্রবৃত্তি যেমন ব্রাহ্মণকে আশ্রয় করে উজ্জীবিত থাকতেন, ঠিক তেমনিই ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণ্যও ক্ষত্রিয়ের দয়া-দাক্ষিণ্য-উপঢৌকন-উপাধি প্রাপ্তের উপরই নির্ভর ছিল। ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় দুই বর্ণই পরস্পরের পরিপূরক– সংসৃষ্টং ব্ৰহ্মণা ক্ষত্রং ক্ষত্রেণ ব্ৰহ্ম সংহিতম। অবশ্য কালের নিয়মে একদিন কার্তবীর্য বললেন, ব্রাহ্মণরা ক্ষত্রিয়দের আশ্রয় করে আছেন, এটা ঠিক। কিন্তু কোনোভাবেই ক্ষত্রিয়রা ব্রাহ্মণদের আশ্রয় করে নেই– “ব্রাহ্মণাঃ সংশ্ৰিতাঃ ক্ষত্রং নক্ষত্রং ব্রাহ্মণাশ্রিতম”।

    অথচ ভাবুন ব্রাহ্মণদের ধর্মীয় রাজনীতি থেকে উদ্ভূত প্রভাব প্রবল বাধাগ্রস্ত হয়েছিল সপ্তম থেকে নবম শতকের মধ্যে। এ পর্বে ‘ভক্তিবাদ আন্দোলন গড়ে উঠে গোটা ভারতবর্ষে। ভক্তিবাদীরা প্রত্যাখ্যান করেন ব্রাহ্মণদের বর্ণবাদী শ্রেষ্ঠতের ধারণা। এতে ধ্বনিত হয় সামাজিক প্রতিবাদের সুর। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা ব্রাহ্মণ্য রাজনীতির সঙ্গে শেষপর্যন্ত টিকতে না-পারলেও “ভক্তিবাদ’ আন্দোলনই সনাতন ভক্তদের মনে জন্ম দেয় বর্ণবাদ এবং বর্ণশ্রেষ্ঠতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার।

    বললে অত্যুক্তি হবে না যে, ভারতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্মের আগ্রাসনে আক্রমণে-অত্যাচারে বারবার বিপন্ন-বিপর্যস্ত হয়েছে সনাতন ধর্ম তথা ব্রাহ্মণ্যধর্ম তথা হিন্দুধর্ম। ব্রাহ্মণগণ বিপন্নতা থেকে মুক্তি পেতে ধর্মীয় অনুশাসনগুলিকে আরও কঠোর থেকে কঠোরতম করতে গিয়ে হিন্দুধর্মের সর্বনাশ করেছে। ব্রাহ্মণগণের অমানবিক বিধানে জর্জরিত হয়ে তথাকথিত নীচুতলার মানুষগুলো দলে দলে কেউ মুসলমান, কেউ খ্রিস্টান, কেউ বৌদ্ধ হয়ে গেছে। কখনো শুনিনি অন্য কোনো ধর্মের মানুষ হিন্দুধর্মকে ভালোবেসে হিন্দু ধর্মাচরণ করছে। খানখান হয়েছে ব্রাহ্মণ্যবাদ কঠোরতার কারণেই। বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো। পরবর্তীকালে কেরলিয়ান ব্রাহ্মণ শঙ্করাচার্য (আদি) নরমে-গরমে একবার চেষ্টা করেছিলেন এবং সফল হলেন ভারতে ব্রাহ্মণ্যশাসন কায়েম করতে। এ ছাড়া বিভেদনীতির মাধ্যমে ক্ষত্রিয়শক্তিকে দুর্বল করে তোলেন। ফলে অতি সহজেই মুসলমান শক্তি ভারতে দ্রুত প্রসার লাভ করে। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বৌদ্ধধর্মকে প্রায় শেষ করে দিতে সক্ষম হলেও অষ্টাদশ শতাব্দী নাগাদ ব্রাহ্মণদের চক্রান্তে এবং সহায়তায় মুসলমান শক্তিকে পরাভূত করতে ভারতে ব্রিটিশ শাসন কায়েম হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই বেনিয়া-নেতা গান্ধিজিকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ভারতের শাসনক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে প্রয়াসী হন। সেই বিষয়টি ব্রিটিশপুঙ্গবগণ আন্দাজ করতে পেরে তার সদব্যবহার করেছিল। দ্বিজাতিতত্ত্বের আঁতুরঘর এখান থেকেই। মোদ্দা কথা, ব্রাহ্মণ্যবাদের জাঁতাকলে পড়ে হিন্দুধর্ম আজ বিপন্ন, বিপর্যস্ত, ছিন্নভিন্ন। প্রাচীন যুগ থেকেই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। জন্ম নিয়েছে বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্মের মতো ধর্মবাদ। ব্রাহ্মণ্যবাদের অস্পৃশ্যতা এবং প্রাণীহত্যাকে হাতিয়ার করে ব্রাহ্মণ্যবাদকে নিকেশ করতে উঠেছিল বৌদ্ধধর্ম। বিশেষ করে ভারতবর্ষের অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষরা ব্রাহ্মণ্যবাদের অনুশাসনের নামে অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পেতে দলে দলে বৌদ্ধধর্মে চলে আসতে থাকলেন। ভীত-সন্ত্রস্ত ব্রাহ্মণবাদের পুরোধারা কখনো বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে অস্ত্র শানালেন, কখনো-বা কৌশল অবলম্বন করে বৌদ্ধদের ভারত থেকেই প্রায় উৎখাত করে দিলেন। এই বৌদ্ধদের ঠাণ্ডা করতে ডাণ্ডা হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন কেরলের ব্রাহ্মণ শংকরাচার্য এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গো-শাগরেদরা। বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণ্য-সন্ত্রাস চালিয়েও বৌদ্ধদের যখন দমানো গেল না তখন কৌশলে ঘোষণা করে দেওয়া হল বৌদ্ধধর্মও যা, হিন্দুধর্মও তাই এমন একটা অবস্থা তৈরি করে নিল। কারণ ভগবান বুদ্ধদেব বিষ্ণুর দশমাবতারের এক অবতার (যথাক্রমে মৎস্যাবতার, কূর্মাবতার, বরাহ অবতার, নৃসিংহ অবতার, বামনাবতার, পরশুরাম, শ্রীরাম, কৃষ্ণাবতার, বুদ্ধদেব, কল্কি)। এরপর বেশ কিছুকাল ভালোই কাটছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের অনুশাসন। শুরু হয়ে গেল সুদূর আরব থেকে মুসলিমদের ভারতে আগমন এবং আগ্রাসন। একে একে হিন্দু রাজাদের পরাস্ত এবং সিংহাসনচ্যুত করে মুসলিম শাসন শুরু হয়ে যায়। তারপর ৭০০ বছর ব্রাহ্মণ্যবাদ কোণঠাসা। চরম অবক্ষয় দৃশ্যমান হয়। ব্রাহ্মণ্যবাদকে অস্বীকার করা শুরু হল গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে। অন্ত্যজ শ্রেণি তো বটে, উচ্চবর্ণের অনেক মানুষও ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হতে থাকল। আবার অস্তিত্বের বিপন্নতা। আরবি-ফারসি ভাষা শিখতে বাধ্য হল সবাই। ভারতবর্ষে মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তেই থাকল। দ্বিতীয় প্রধান ধর্মীয় শক্তি হয়ে উঠল। এরই মধ্যে ভারতবর্ষে পোর্তুগিজ, ফরাসি, ব্রিটিশদের বণিকরূপে আবির্ভূত হয়ে অবশেষে হাতে উঠে এল শাসকের দণ্ড। শুরু হয়ে গেল নতুন অধ্যায়– ব্রিটিশশাসন। সেইসঙ্গে খ্রিস্টধর্মের আবির্ভাব– মিশনারিদের প্রভাবে আবার ধর্মান্তরকরণ। তবে খ্রিস্টধর্ম নয়, ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে রইল ইসলাম ধর্ম। অতএব খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে পীড়িত বাড়িয়ে মুসলিম বিরোধিতায় পরোক্ষে-প্রত্যক্ষে ব্রিটিশদের ইন্ধন জোগানো। দ্বিজাতিতত্ত্ব খাঁড়া করে টুকরো টুকরো হয়ে গেল আমাদের সাধের স্বাধীন ভারত, ধর্মের ভিত্তিতে। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদ আর উঠে দাঁড়াতে পারল না। শত বিভক্ত হয়েই রইল। এই ব্রাহ্মণবাদকে উৎখাত না-করলে হিন্দুধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে না। হিন্দুত্ববাদীরা শূদ্র, দলিত, অন্ত্যজদের হিন্দুভুক্তি করে না, যারা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীকে বাইরে রেখে কখনো কোনো ধর্ম শক্তিশালী হতে পারে? একদা যে দেশ বৌদ্ধদের ছিল, সেই দেশ ব্রাহ্মণ্যবাদীরা কজা করে নিলেও একছত্র হতে পারল না। ভারতের সকল মতবাদকে এক ছাতার তলায় আনতে পারল না, যেটা আরবে হজরত মোহম্মদ সফলতার সঙ্গে পেরেছিল।

    ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে যে বদনামগুলি সর্বজনবিদিত, সেগুলি কি অনর্থক?– (১) লাখ টাকার ব্রাহ্মণ ভিখারি। (২) খাদ্য-লোভী ব্রাহ্মণ। এ কথাগুলি ব্রাহ্মণদের কতটা সম্মান প্রদর্শন করে! যজমানদের বাড়িতে গিয়ে ব্রাহ্মণদের হামলা হামলি করাই লাখ টাকার ভিখারি প্রতিপন্ন হল। কিছু সুবিধাবাদী ধান্ধাবাজ ব্রাহ্মণ রাজানুগত্য পেয়ে রসেঘিয়ে থাকলেও অধিকাংশ ব্রাহ্মণদের হাল মোটেই ভালো ছিল না। কারণ শাস্ত্রানুযায়ী ব্রাহ্মণগণ যজন-যাজন, অধ্যয়ন-অধ্যাপনা নিয়ে থাকবে, পরের চাকরি করবে না, কৃষিকার্য করবে না এবং রাজবাড়ি বা ধনীদের গৃহে-দপ্তরে খিদমদগারির মাধ্যমে অর্থোপার্জন করবে না। ব্রাহ্মণ হয়ে অন্য উপায়ে টাকাপয়সা করলে সমাজ নিন্দা করে। সবচেয়ে ঘৃণা করা হত রাজবাড়ির অর্থপুষ্ট ব্রাহ্মণকে। তা সত্ত্বেও ব্রাহ্মণগণও অন্য পেশায় নিযুক্ত না হয়ে নিজেদের রক্ষা করতে পারল না। পেট বড়ো বালাই। বামনাইগিরির নিকুচি করেছে! অবশেষে মরা পোড়ানোর (ডোমের চাকরি!) চাকরি হলেও আবেদনপত্র প্রেরণ। রিক্সা চালানো, মোট বওয়া, জুতো পালিশ করা –এরকম সব কাজেই ব্রাহ্মণদের উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে।

    ব্রাহ্মণদের খাওয়াতে পারলে যজমানরা যেমন খুশি হন, তেমনি ব্রাহ্মণগণও যারপরনাই খুশি হন। সঙ্গে সন্তুষ্টজনক দক্ষিণা তো আছেই। তাই আজও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য এবং অবজ্ঞা-ভরে হলেও কোনো অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণভোজন করানোর রীতি চালু আছে। কেননা —

    “মুখ না থাকায় প্রেতাত্মা ব্রাহ্মণের মুখে করে যে ভোজন।

    ব্রাহ্মণ ভোজন না করালে প্রেতাত্মা করে যে রোদন॥

    মনুসংহিতার ১/৯৫ নং শ্লোকে যে বিধান আছে, তা দেখব —

    “যস্যাস্যেন সদাশ্নতিহব্যানি ত্রিদিবৌকনঃ।

    কব্যানি চৈব পিতরঃ কিস্তুতমধিকং ততঃ”।

    অর্থাৎ, বাস্তবিক স্বর্গবাসী দেবগণও যাঁর মুখে হবনীয় দ্রব্য সামগ্রী সবসময় ভোজন করে থাকেন, শ্রাদ্ধাদিতে প্রদত্ত অন্নাদি পিতৃগণ যাঁর মুখে গ্রহণ করেন,সেই ব্রাহ্মণ অপেক্ষা অধিকতর শ্রেষ্ঠ এই পৃথিবীতে আর কেই-বা আছেন। তাই “তুষ্যন্তি ভোজনৈর্বিপ্রা ময়ূরাঃ ঘনগর্জিতৈঃ” এবং অবশ্যই “নৃত্যন্তি ভোজনৈর্বিপ্রা”।

    শাস্ত্রমতে কর্মের ভিত্তিতে চার বর্ণে ভাগ করা হয়েছে। ব্রহ্ম সম্পর্কে জ্ঞান। অর্জনকারীরাই ব্রাহ্মণ। এখনকার সব পুরোহিতকে কে ব্রাহ্মণ বলছেন! আর বললেও কোন্ যুক্তিতে বলছেন? সব ব্রাহ্মণ কিন্তু পুরোহিত নয়। পুরোহিত এবং ব্রাহ্মণ আলাদা ব্যাপার। তবে আপনি যদি কোনো পুরোহিতকে জিজ্ঞাসা করেন তবে দেখবেন তাঁরা নিজেদের ব্রাহ্মণ বলে পরিচয় দেন। আর তাঁরা তাঁদের বর্ণের পরিচয় এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে, কারও হাতের অন্নগ্রহণকে পাপ বলে মনে করেন। যা হাস্যকর একটি ব্যাপার! একজন জ্ঞানী ব্যক্তির কাছ থেকে কেউই এই ধরনের ব্যবহার আশা করে না। আগেই বলেছি, জন্মগতভাবে তো কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারে না। এটা শুধুমাত্র একটা পদ বলতে পারেন। যেমন শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এরকম! যোগ্যতার ভিত্তিতে! রামায়ণ, মহাভারত গ্রন্থগুলিতে লক্ষ করলেই আমরা তা জানতে পারব। ব্রাহ্মণ হল ব্ৰহ্ম সম্পকে জ্ঞান অর্জনকারী। আমি যতটুকু জানি, কোনো নির্দিষ্ট দু-একটি গ্রন্থ পড়ে ব্ৰহ্ম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। যাঁরা একটি ধর্মের শাস্ত্রীয় গ্রন্থের নাম বলতে অক্ষম, তাঁদের ব্রাহ্মণ বলার যুক্তি কোথায় আমি বুঝি না!

    হলায়ুধ, যিনি লক্ষ্মণসেনের সমসাময়িক এবং তাঁর যুগের প্রধান স্মৃতিকার ছিলেন। তাঁর ব্রাহ্মণসর্বস্ব গ্রন্থরচনার সমর্থনে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, রাঢ় ও বরেন্দ্র ব্রাহ্মণরা বেদ পাঠ করে না। ফলে তাঁরা বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠানের নিয়মাবলির সঙ্গে পরিচিত নয়। তাতে কী হয়েছে? ব্রাহ্মণ্যবাদ জাঁকিয়ে বসেছে এখানেও।

    ব্রাহ্মণ্যবাদ মুক্ত একটা সমাজ চাই। পৌরহিত্যই ভারতের সর্বনাশের মূল। পুরোহিতগিরি পেশাকে নির্মূল করতে না-পারলে তোক ঠকাবার ব্যাবসা বন্ধ হবে না। সমাজ থেকে পুরোহিতগিরি বর্জন করতে হবে। পুরোহিতদের প্রত্যাখ্যান করেই বিয়ে, অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধাদি অনুষ্ঠান করা শুরু করতে হবে। সংস্কৃত ভাষার মোহ ত্যাগ করে বাংলায় প্রার্থনা করুন। ঈশ্বর অবশ্যই শুনবেন এবং মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। ডঃ আম্বেদকরের বক্তব্য যথার্থ –“ধূর্ত ব্রাহ্মণরা শাস্ত্র রচনা করে হিন্দুদেরকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে একেবারে বোকা বানিয়ে ফেলেছে।” অতএব পুরোহিত বর্জন।

    এ প্রবন্ধ ব্রাহ্মণ-বিদ্বেষকে প্রশ্রয় দেয় না এবং অবশ্যই ব্রাহ্মণ্যবাদের তীব্র বিরোধিতা করছি। যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিগণ প্রচলিত শ্রাদ্ধ না করে শুধু শ্রদ্ধাই জানান, বাকি সব বর্জন করুন। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর বাণী ও রচনার দশম খণ্ডে লিখলেন, “মৃত্যুর পর মানুষ স্বর্গে যায় এটা কল্পনামাত্র। সজ্জন ব্যক্তি মৃত্যুর পর স্বর্গে গিয়া অনন্ত সুখময় জীবনযাপন করে– এই ধারণা স্বপ্নমাত্র। স্বর্গ ও নরক এসব আদিম ধারণা।” ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকলে আপনার মাতৃভাষায় নিজেরাই তার কাছে প্রার্থনা জানানো যায়। হিন্দুধর্মকে রক্ষা করতে চাইলে অবিলম্বে ব্রাহ্মণ্যবাদের নিষ্পত্তি করতে হবে। স্বামী বিবেকানন্দের নাম ভাঙিয়ে যাঁরা নানা কিছু করেন, তাঁরা সোচ্চারে বলুন এবং অক্ষরে অক্ষরে পালন করুন। কী বলবেন? পড়ন, স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর “জাতি, সংস্কৃতি ও সমাজ” গ্রন্থে যা বলেছেন– “পৌরহিত্যই ভারতের সর্বনাশের মূল। যেখানেই পুরোহিততন্ত্রের আবির্ভাব, সেখানেই ধর্মের গ্লানি। …এসো মানুষ হও। প্রথমে দুষ্টু পুরুতগুলোকে দূর করে দাও। কারণ এই মস্তিষ্কহীন লোকগুলো কখনও শুধরোবে না। …আগে তাঁদের নির্মূল করো।”

  • সরস্বতী : বাস্তবে এবং অবাস্তবে

    সরস্বতী : বাস্তবে এবং অবাস্তবে

    অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book-name]

    সরস্বতী : বাস্তবে এবং অবাস্তবে

    ভৌগোলিক দিক থেকে নিশ্চিতভাবেই বলা যাবে কি সরস্বতী নদী শতদ্রু ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ছিল? অনুমান করা যায় যে বৈদিক সরস্বতী (আঞ্চলিক নাম সরসুতী) হরিয়ানার থানেশ্বর অঞ্চলে প্রবাহিত। ঋগ্বেদে (অষ্টম মণ্ডল, ৩৬.৬ সূক্ত) বলা হয়েছে সপ্তথি সরস্বতী নদীগুলির মাতা (সিন্ধুমাতা) একসঙ্গে দুগ্ধ ও স্রোতস্বিনীদের নিয়ে বিপুল গর্জনে তীব্র স্রোতে প্রভূত জলধারায় স্ফীত হয়ে প্রবাহিত।

    ঋগ্বেদে দুই ধরনের সরস্বতীর উল্লেখ আছে। একটি ত্রিলোক্য ব্যাপিনী সূর্যাগ্নি, অন্যটি নদী। সরস্ ধাতু তদুত্তরে অস্থর্থে বতু এবং স্ত্রী লিঙ্গে ঈ প্রত্যয় যোগে নিষ্পন্ন হয়েছে সরস্বতী– এ মত স্বামী নির্মলানন্দের। আলোকময়ী বলে সর্বশুক্লা। শংকরনাথ ভট্টাচার্যের মতে, সরস + বতী = সরস্বতী। অর্থ জ্যোতিময়ী। ঋগ্বেদে এবং যর্জুবেদে অনেক জায়গায় ইড়া, ভারতী, সরস্বতাঁকে একসঙ্গে দেখা যায়। বেদের মন্ত্রগুলো পর্যালোচনায় প্রতীতী জন্মে যে, সরস্বতী মূলত সূর্যাগ্নি। দেবীভাগবতে সরস্বতী জ্যোতিরূপা। ভৃগুপনিষদে জ্যোতির্ময়ী সরস্বতী ও জলময়ী সরস্বতীর সমীকরণ করা হয়েছে। এই উপনিষদে জলে জ্যোতি প্রতিষ্ঠিত, জ্যোতিতে জল প্রতিষ্ঠিত। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী সারদামঙ্গল কাব্যে জ্যোতির্ময়ী সরস্বতীর আবির্ভাব বর্ণনা করেছেন। রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকি যখন ক্রৌঞ্চ হননের শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন, সে সময় জ্যোতির্ময়ী সরস্বতী তার ললাটে বিদ্যুৎ রেখার মতো প্রকাশিত হয়েছিলেন।

    পুরাণগুলো একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই পেয়ে যাবেন ঋগ্বেদে ইন্দ্রের সঙ্গে সরস্বতীর সম্পর্ক যেমন ঘনিষ্ঠ ছিল, তেমনি ঘনিষ্ঠ মরুদ ও অশ্বিনীদ্বয়ের সঙ্গেও ছিল। সরস্বতী কখনো ইন্দ্রের পত্নী, আবার কখনো শত্রু, কখনো-বা ইন্দ্রের চিকিৎসক। শুক্ল যজুর্বেদে তিনি চিকিৎসক রূপে রুদ্র অশ্বিনীদ্বয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। সরস্বতীর রোগ নিরাময় শক্তির কথা পরবর্তী সময়েও জনশ্রুতিতে ছিল। ‘কথাসরিৎসাগর’ গ্রন্থে রচয়িতা সোমদেব (একাদশ শতক) জানিয়েছেন, পাটলিপুত্রের নারীরা রুগ্ন ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য সরস্বতীর ওষুধ ব্যবহার করতেন।

    নিরুক্তকার যাস্কের মতে, সরস্বতী শব্দের অর্থ যাতে জল আছে। সৃ ধাতু নিস্পন্ন করে সর শব্দের অর্থ জল। অর্থাৎ যাতে জল আছে তাই সরস্বতী। নদী সরস্বতী আর্যভূমির অন্যতম নদীরূপে ঋগ্বেদে বহুবার কীতি ও স্তোত হয়েছে। ঋগ্বেদে সরস্বতী সিন্দু ও তার পাঁচটি উপনদী নিয়ে সপ্তসিন্ধুর বারংবার উল্লেখ আর্যভূমিতে এদের অপরিসীম গুরুত্ব প্রমাণ করে। ‘অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী’ –অর্থাৎ নদী হিসাবে সরস্বতীকে দেখা হয়েছে। সম্ভবত সরস্বতী নদীর তীরেই বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির উদ্ভব। তাই হয়ত শিক্ষার সঙ্গে সরস্বতীর অচ্ছেদ্য বন্ধন এবং এর জন্যই পৌরাণিক যুগে সরস্বতী বিদ্যার দেবী হয়ে উঠেছেন। সরস্বতীর আর-এক নাম ভারতী। তিনি ‘ব্রাহ্মণ’-এ বাক্ নামে পরিচিতা। দেবী সরস্বতীর সঙ্গে নদী সরস্বতীর এই একাত্মতা সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত থাকলেও সরস্বতাঁকে ব্রহ্মার মানসকন্যা হিসাবে কল্পনা করা হয়।

    ষোড়শ ঋকে সরস্বতী মাতৃগণের, নদীগণের ও দেবগণের শ্রেষ্ঠা বলে বর্ণিত হয়েছেন। ইনি ব্রহ্মাবতের একতর সীমা এবং কুরুক্ষেত্রে অন্তরিত হয়ে প্রয়াগে গঙ্গা-যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। তাই পরবর্তী বৈদিক যুগে নদীদেবতা হিসাবে মাহাত্ম্য হারিয়ে সরস্বতী সাহিত্য, শিল্প ও সঙ্গীতকলার দেবী হিসাবে পরিচিত হন।

    স্কন্দপুরাণে সরস্বতীর উৎস হলেন বিষ্ণু এবং সরস্বতীর অবস্থান হল বিষ্ণুর জিহ্বাতে। নারদপুরাণে বলা হয়েছে, চরম অবস্থায় রাধা এবং কৃষ্ণ একই দেহে বিরাজ করেন এবং তাঁদের মধ্যে কোনো ভেদ নেই। এই অবস্থায় রাধা থেকে পাঁচটি রূপ আবির্ভূত হয়। তাঁরা হলেন– লক্ষ্মী, দুর্গা, সাবিত্রী, সরস্বতী এবং রাধার নিজেরই আর-একটি রূপ। কারও কারও মতে শক্তির রূপভেদ পাঁচটি নয় আটটি। যেমন –শ্রীদেবী, ভূদেবী, প্রীতি, কৃতি, শান্তি, তান্তি এবং পুন্তি।

    বামনপুরাণে বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠের কোন্দলের ঘটনা উল্লেখ আছে। বশিষ্ঠ তাঁর আশ্রমে একটি প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গ এবং সরস্বতীর একটি বিরাট মূর্তির পুজো করতেন। বশিষ্ঠের ওখানে এভাবে পুজো করা বিশ্বামিত্রের মনে ক্রোধ উৎপন্ন হওয়ায় তিনি নদী সরস্বতাঁকে বলেন বশিষ্ঠকে ধরে তাঁর কাছে নিয়ে আসতে। যাতে উপযুক্ত সাজাটা তিনি বসে বসেই দিতে পারেন। সরস্বতী বিশ্বামিত্রের ক্ষমতা জানতেন। তাই তিনি বিশ্বামিত্রের কাছে বশিষ্ঠকে নিয়ে যেই হাজির হলেন অমনি বিশ্বামিত্র তাঁকে (বশিষ্ঠকে) হত্যার জন্য একটা অস্ত্র আনতে গেলেন। ইত্যবসরে সরস্বতী, যিনি ছিলেন নদী, তিনি নিজের জলধারার মাঝে বশিষ্ঠকে লুকিয়ে রাখলেন। বিশ্বামিত্র রেগে গিয়ে অভিশাপ দিলেন সরস্বতাঁকে– সরস্বতী এবার রক্তনদী হবেন। আর যত অসুর রাক্ষস আছে, তাঁদের পান করে স্ফুর্তি করবে। সেটাই ফলে গেল! শেষে একদল সাধুর প্রার্থনায় সৃষ্টি হল প্রয়াগে গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর সঙ্গম –আর যত দুরাত্মা সেখানে স্নান করল এবং সবাই পবিত্ৰাত্মা হয়ে গেল।

    হিন্দু পুরাণে বলা হয়েছে, ব্রহ্মা তাঁর কন্যার সঙ্গে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হন। এহেন বিষয়ে কলকাতার জাদুঘরের একটি প্রস্তর মূর্তি থেকে তার যথেষ্ট প্রমাণ মেলে। এই মূর্তিটি ব্রহ্মার বামজানুর উপর সরস্বতী বসে আছেন, তাঁর এক হাতে ব্রহ্মার স্কন্ধবেষ্টিত। সরস্বতীর সঙ্গে ব্রহ্মার এই সম্বন্ধের সন্ধান ঋগ্বেদেও পাওয়া যায়। এখানে ব্রহ্মার সঙ্গে বাকদেবীর একটি ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ সূচিত হয়েছে। বাই যে সরস্বতী তা নিয়ে তো কোনো দ্বিমত নেই। ব্রাহ্মণ যুগে এই সম্বন্ধ আরও ঘনিষ্ঠতর। এখানে দেখা যাচ্ছে “প্রজাপতি ব্রহ্মা পুনরায় নিজেকে আপ্যায়িত করিলেন, বাক্ তাঁহার দিকে ফিরিয়া আসিলেন। তিনি বাককে আত্মবশ করিলেন। এখানে তিনি বাক্য দ্বারা আপ্যায়িত হইলেন, বলবান হইলেন।” এইভাবেই বোধহয় আমরা সরস্বতাঁকে ব্রহ্মার অঙ্কশায়িনী তথা স্ত্রী হিসাবে পাই। বেদের উষাকেও পরবর্তীতে সরস্বতী রূপে পাই। তাই উষার মতো সরস্বতীও শুভ্র এবং জ্ঞানের প্রতীক। সেই কারণে সরস্বতী একদিকে সূর্যের কন্যা ও অন্যদিকে স্ত্রী।

    মহাভারতের শল্যপর্বে উল্লেখ আছে যে, দধীচি একবার এক অপ্সরাকে অবলোকন করে উত্তেজিত হয়ে বীর্যস্খলন করে ফেলেন। সেই বীর্য সরস্বতী নদীতে পতিত হয়, আর সেটা অতি যত্নে ধারণ করে সরস্বতী এক শিশুর জন্ম দেন। মহাভারতের আদিপর্বেও শান্তনু যিনি গঙ্গাকে বিবাহ করেছিলেন, তার এক পূর্বপুরুষ সরস্বতীর পুত্র ছিলেন বলে বলা হয়েছে –এক্ষেত্রে ছিলেন এক মুনি।

    সরস্বতীর বাহন হাঁস ছাড়াও মেষ আর বরাহকে পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক এন এস ভট্টসারি একটি লেখায় বলেছেন, “একসময় ইন্দ্রের শরীরের শক্তি চলে যাওয়ার ফলে তিনি মেষ আকৃতি গ্রহণ করেন। সেসময় ইন্দ্রের চিকিৎসার দায়িত্ব ছিল স্বর্গের অশ্বিনীদ্বয়ের উপর এবং সেবা-শুশ্রূষার ভার ছিল সরস্বতীর হাতে। সংগীত ও নৃত্যপ্রেমী ইন্দ্র সরস্বতীর গানবাজনা ও সেবায় সুস্থ হওয়ার পর তাকে মেষটি দান করেন। সেই থেকেই সরস্বতীর সঙ্গী এই মেষ। তাহলে কি সরস্বতী স্বর্গের সেবাদাসীও! সরস্বতীর বাহন বরাহ (শুয়োর), কারণ তিনি নাকি বিষ্ণুরও স্ত্রী ছিলেন। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ রচিত ‘সরস্বতী’ গ্রন্থটিতে এ তথ্য পাওয়া যায়। শ্রীকৃষ্ণকেও স্বামী হিসাবে কামনা করেছিলেন তিনি —

    “ইয়েষ কৃষ্ণং কামেন কামুকী কামরূপিনী”

    “ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ’-এ শ্রীকৃষ্ণ-সরস্বতীর কেচ্ছাকাহিনি যথাযথভাবেই বর্ণিত আছে। ডঃ শ্যামল চক্রবর্তী ‘নারী’ প্রবন্ধে বলেছেন, সরস্বতী গণেশেরও স্ত্রী। মহারাষ্ট্রের কোনো কোনো পূজারী মনে করেন, গণেশের পত্নী সরস্বতী কিংবা সারদা। হয়তো সরস্বতী এবং গণেশ দুজনই বিদ্যা ও সংগীতের অধিষ্ঠাতা দেবতা বলেই এই পতি-পত্নীর কল্পভিত্তি। আর-এক তথ্য অনুসারে জানা যাচ্ছে, দুর্গার কন্যা এই সরস্বতী দুর্গার কুমারী সত্তা। আবার বাঙালিরা মনে করেন গণেশ ও সরস্বতী ভাইবোন, দুর্গার সন্তান। অথচ চিরকুমারী (!) সরস্বতাঁকে স্বর্গের দেবতারা কখনও স্ত্রী, কখনও সেবাদাসী, কখনও গণিকা, আবার কখনও অসুরদের রূপে ভুলিয়ে কাত করাবার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।

    পণ্ডিতদের মতে সরস্বতী হলেন সৃজন শক্তি। অর্থাৎ ‘Essence of the self’। আপন সত্তার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক গুণাবলি। তাঁর চারটি হাত। এক হাতে গোলাপ, এক হাতে বই –এ দুটি হল পিছনের হাত। সামনের দু-হাতে তিনি বীণা বাজাচ্ছেন। তাঁর পরিধানে সাদা বস্ত্র, যা শুদ্ধ জ্ঞানের প্রতীক। বীণাবাদন জাগতিক কর্ম আর পদ্মধারণ আধ্যাত্মিক জগতের প্রতীক বলা হয়েছে। পদ্ম পরম সত্তার প্রতীক। এর দ্বারা মনোযোগ, ধ্যানসমাধি এবং পরম সত্তার সঙ্গে একাত্মতা বোঝায়। তাঁর কাছ একটি ময়ুর থাকলেও বাহন রাজহাঁস। ময়ুরের মেজাজ আবহাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলায়। তাই তিনি পছন্দ করেননি। অপরদিকে রাজহাঁস অসার-সার একসঙ্গে মেশানো দ্রব্য থেকে অসার দ্রব্য নিখুঁতভাবে ত্যাগ করে সারদ্রব্য গ্রহণ করে বলে বাহন হিসাবে বেশি পছন্দ।

    হিন্দুদের দেবী হওয়া সত্ত্বেও বৌদ্ধ ও জৈনদের কাছেও পুজো পেয়েছেন সরস্বতী। গান্ধারের পাওয়া বীণাবাদিনী সরস্বতীর মূর্তি থেকে বা সারনাথে সংরক্ষিত মূর্তিতে এর প্রমাণ মেলে। পাথরের একটি ছোটো মূর্তি আছে তাতে সরস্বতী বীণা বাজাচ্ছেন, এর সঙ্গে হিন্দুদের সরস্বতীর কোনো পার্থক্য নেই। মথুরায় জৈনদের প্রাচীন কীর্তির আবিষ্কৃত নিদর্শনে সরস্বতীর যে মূর্তি পাওয়া গেছে সেখানে দেবী জানু উঁচু করে একটি চৌকো পীঠের উপর বসে আছেন, এক হাতে বই। শ্বেতাম্বরদের মধ্যে সরস্বতী পুজোর অনুমোদিত ছিল। জৈনদের ২৪ জন শাসনদেবীর মধ্যে সরস্বতী একজন এবং ১৬ জন বিদ্যাদেবীর মধ্যে অন্যতম হলেন সরস্বতী। শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর জৈন সম্প্রদায় উভয়েই সরস্বতাঁকে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে গৃহীত একজন প্রধান দেবীরূপে স্থান হয়ে গেল।

    শ্রীপঞ্চমীর ‘শ্রী’ অর্থে লক্ষীকে বোঝায়। অর্থাৎ এই তিথি লক্ষ্মীর। তাই শ্রীপঞ্চমীর পুজো ধনের বা শস্যের বা তাঁর অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মীরও পুজো। এই কারণে দেখা যায় কৃষিজীবী মানুষের কৃষি উৎপাদনের উপাদানগুলি এই পুজোয় অন্তর্ভুক্ত। তাই সরস্বতী পুজোর অন্যতম উপাচার পঞ্চশস্য (ধান, যব, সাদা সর্ষে, মুগ ও মাসকলাই) এবং পঞ্চপল্লব (কাঁঠাল, আম, অশন্থ, বট ও বকুল)। অনেকে মনে করেন সরস্বতী নামে দেবী কৃষিকর্মের সহায়ক এবং উৎপাদক ব্যবস্থার সঙ্গেই বেশি যুক্ত। অমরসিংহের সময় পর্যন্ত প্রাচীন কোনো কোশগ্রন্থে ‘শ্রী’ শব্দের অর্থ সরস্বতী না থাকলেও মধ্যযুগের আচার্য রেদিনীবর হেমচন্দ্র প্রমুখের অভিধানে সরস্বতী আর-একটি নাম হিসাবে ‘শ্রী”-র সন্ধান পাওয়া যায়।

    সরস্বতী আলোচনা প্রসঙ্গে লক্ষ্মীর প্রসঙ্গও এসে যায়। কারণ আমরা লক্ষ্মী ও সরস্বতীর দ্বন্দ্বের কাহিনি আমরা শুনেছি। দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে, লক্ষ্মী কৃষ্ণের জিহ্বাগ্র থেকে উৎপন্ন হয়েছেন। ব্রহ্মা প্রথম তাঁকে পুজো করেন। পরে জগতে তাঁর পুজো প্রতিষ্ঠিত হয়। দেবীপুরাণে বলা হয়েছে, একবার সত্যযুগের শুরুতে ভগবান বিষ্ণু ক্ষীর সাগরে যোগনিদ্রায় শায়িত ছিলেন। সেইসময় লক্ষ্মী তাঁর পদসেবা করছিলেন। সেইসময় হঠাৎ বৈকুণ্ঠলোকে সরস্বতী চলে আসেন। বিষ্ণুর পদসেবায় নিয়োজিত লক্ষ্মীকে দেখে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন সরস্বতী এবং লক্ষ্মীকে বৈকুণ্ঠ ছেড়ে চলে যেতে বললেন। তাঁর ক্রুব্ধ হওয়ার একমাত্র কারণ হল তিনি তখন ভেবেছিলেন বিষ্ণুই হয়তো তাঁর স্বামী। লক্ষ্মী অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন সরস্বতাঁকে। কিন্তু সরস্বতী কিছুতেই বুঝতে চাননি যে, বিষ্ণুই লক্ষ্মীর স্বামী। লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মধ্যে এ নিয়ে তুমুল দ্বন্দ্বের উৎপত্তি হল। লক্ষ্মী ও সরস্বতীর তুমুল দ্বন্দ্ব দেখে গঙ্গা তাঁদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে উদ্যোগী হন। গঙ্গা স্বাভাবিকভাবে লক্ষ্মীর পক্ষ নিলেন এবং সরস্বতীর বিপক্ষে দাঁড়ালেন। গঙ্গা সরস্বতাঁকে যারপরনাই বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, বিষ্ণুই একমাত্র লক্ষ্মীর স্বামী। এ ঘটনা কি এটাই প্রমাণ করে যে, সরস্বতী বিষ্ণুকে নিজের স্বামী করছিলেন? সরাসরি সদার্থক উত্তর পাওয়া না গেলেও বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। যাই হোক, সরস্বতী কি গঙ্গার এই বিচার মেনে নিলেন? না, মানেননি। তিনি লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিলেন, বললেন– “লক্ষ্মী মর্ত্যলোকে মানবী হয়ে জন্মাবেন, অসুরের স্ত্রী হয়ে দুঃখ সহ্য করবেন এবং অবশেষে বৃক্ষতে রূপান্তরিত হবেন।” সরস্বতী লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিতেই গঙ্গাও সরস্বতাঁকে অভিশাপ দিলেন– সরস্বতী নদীরূপে পৃথিবীতে প্রবাহিত হবে। সরস্বতীও গঙ্গাকে পাল্টা অভিশাপ দিলেন –গঙ্গাও পৃথিবীতে নদীরূপে প্রবাহিত হবেন।

    এক বিষ্ণুকে ঘিরে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গঙ্গা তিনজনেই একে অপরকে অভিশাপ দিলেন। এই পুরাণ-কাহিনি থেকে হিন্দুরা বিশ্বাস করে –সরস্বতীর অভিশাপে লক্ষ্মী তুলসীগাছ হয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছেন, গঙ্গার অভিশাপে সরস্বতী পৃথিবীর বুকে নদীরূপে প্রবাহিত হচ্ছেন এবং গঙ্গাও সরস্বতীর অভিশাপে পৃথিবীর বুকে নদীরূপে প্রবাহিত হচ্ছেন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে বলেন– সরস্বতী, গঙ্গা ও লক্ষ্মীর মধ্যে যে, দ্বন্দ্ব-বিবাদ হয়েছে, তা নিছকই দেবলীলা। আবার অনেকেই বলেন, এসব নিছকই মনোরঞ্জক গালগপ্পো, রূপকথা।

    মহাভারতের এক জায়গায় উল্লেখ আছে, নগরে প্রবেশের আগে যুধিষ্ঠির তাঁকে প্রীতি ও সাদর সম্ভাষণ জানাতে গণিকাদের লোক মারফত প্রেরণ করেন। প্রাচীন ভারতে গণিকারাই ছিলেন নারীদের মধ্যে একমাত্র শিক্ষিত শ্রেণি। এঁদের চৌষট্টি কলায় পারদর্শিনী হতেই হয়। শুধু তাই নয়, অলংকার, ছন্দ ও কাব্য সম্পর্কেও তাঁদের বিশেষ জ্ঞান ছিল। সেই কারণেই তাঁরা রাজদরবারে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে আমন্ত্রণ পেতেন। যে সময় সাধারণ নারীরা পড়াশোনা করতেন, সে সময় গণিকারাই কেবল কেবলমাত্র বিদ্যা, সঙ্গীত ও অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞানী ছিলেন। আর এইসব জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রীদেবী হিসাবে ছিলেন সরস্বতী। ধনী নাগরিক ও গণিকাদের দ্বারা পূজিত হতেন, সে বিষয়ে উল্লেখ আছে বাৎসায়নের কামসূত্র গ্রন্থে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে প্রাচীন যুগে ধনী নাগরিক ও গণিকাদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। বিদ্যা আজও গরিবদের জন্য নয়।

    তবে গণিকাদের লক্ষ্মীপুজো থেকে বঞ্চিত করা হলেও সরস্বতী পুজো করতে পারেন। সরস্বতী কেন? সরস্বতীর অধিষ্ঠান কী তবে গণিকালয়ে? তা না-হলে লক্ষ্মী নয় কেন? গণিকাদের তো লক্ষ্মী বা ধনসম্পদের প্রয়োজন। দক্ষিণ ভারতে যে ময়ূরবাহন সরস্বতীর মূর্তি পাওয়া গেছে সেটা কৌমারীর সঙ্গে অনেকটা মিলজুল হয়। কৌমারী কার্তিকের পত্নী। তাই বোধহয় গণিকাদের দেবতা কার্তিকের পাশাপাশি সরস্বতীর পুজোও গণিকালয়ে হয়ে থাকে। যুগে যুগে ইতিহাসবিদরা জানিয়েছেন উপাসনালয় থেকে গণিকালয়– সর্বত্র পুজো পায় সরস্বতী। সরস্বতী তাঁর কৌমার্য হারিয়েছে বহু পুরুষের বাহুডোরে। নেপালে চতুর্দশ শতকের পাওয়া শিলালিপিতে লেখা আছে– “সারদা তুমি মাতৃরূপী, তুমি কামমূর্তি”। তাই কি স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের উচ্চারণ করতে হয়– “ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে”। তিব্বতে এমন অনেক সরস্বতী পাওয়া গেছে যাঁর উর্ধ্বাঙ্গে কোনো বসনই ছিল না। তাই হয়তো মকবুল ফিদা হোসেনের সরস্বতীর পরনে আব্রু নেই! সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক, গণেশ– এরা কেউ কারোর ভাই-বোন নয়, এটা বাঙালিদের মনগড়া রূপকল্প। ভিত্তি নেই, সমর্থনও নেই।

    আমরা বাঙালিরা সাধারণত সরস্বতীর যে মূর্তি কল্পনা করি, তা হল তিনি চতুর্ভুজা, শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা, শ্বেত পদ্মাসনা, শ্বেত হংস। এছাড়াও আমরা সরস্বতীর আরও দুটি রূপ পাচ্ছি– (১) মহা সরস্বতী ও (২) মহাবিদ্যা নীল সরস্বতী।

    মহা সরস্বতী : দেবীমাহাত্ম অনুসারে ইনি মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতীর মিলিত রূপ। ইনি অষ্টভুজা, শ্বেত পদ্মাসনা, বীণাবাদনরত। তাঁর হাতে ঘণ্টা, ত্রিশূল, লাঙলের ফলা, শাঁখ, মুষল, চাকতি, ধনুক ও শর। শারদ পূর্ণিমার চন্দ্রের মতো তাঁর দীপ্তি। গৌরীর শরীর থেকে তাঁর জন্ম এবং তিনি শুম্ভ ইত্যাদি অসুরদের বধকারিণী। শুম্ভ ও নিশুম্ভ অসুরদ্বয়কে বধ করার সময় দেবী দুর্গার শরীর থেকে কৌশিকী দেবীর উৎপত্তি হয়েছিল।

    মহাবিদ্যা নীল সরস্বতী : ইনি মহাবিদ্যা তারার আর-এক রূপ। তন্ত্রসারে তাঁর ধ্যানমন্ত্র পাওয়া যায়। কথিত আছে –বিদ্যাবতীর কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বনের মধ্যে এক জলাশয়ে কালিদাস যখন প্রাণ বিসর্জন দিতে যান, তখন নীল সরস্বতী আবির্ভূত হয়ে তাঁকে আত্মহত্যা থেকে নিরস্ত্র করেন। এরপর কালিদাসের প্রর্থনায় তুষ্ট হয়ে তিনি কালিদাসের জিহ্বার অগ্রভাগে সদা বিরাজ করতে থাকেন। এর ফলে কালিদাস মূর্খ থেকে মহাপণ্ডিত হয়ে একের পর এক মহাকাব্য লিখে ফেলেন।

    আদি পুরাণ বলছে, সরস্বতী ব্রহ্মার মুখজাত। মুখজাত– এর অর্থ জ্ঞান। মুখনিঃসৃত কথাই তো বেদ। ফলে ব্রহ্মার মুখজাত সৃষ্টি সরস্বতী জ্ঞানেরই। আবার শিবপুরাণ তো অন্য কথা বলছে। কী বলছে? বলছে– ব্রহ্মা কাম পরবশ হয়ে সরস্বতীর পিছনে পিছনে গিয়েছিলেন, ছেলেদের বাধায় ব্রহ্মা দেহত্যাগ করেছিলেন। এখানেই আছে ব্রহ্মার এই কুপ্রস্তাবে সরস্বতী ব্রহ্মাকে অভিশাপ দেন, ফলে তার একটি মাথা খসে পড়ে। সেই থেকে ব্রহ্মা চতুরানন। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণেও সরস্বতী বিষ্ণুর মুখজাত, কিন্তু ব্রহ্মার স্ত্রী। বিষ্ণু ব্রহ্মাকে গোলকে পাঠাচ্ছেন। প্রকৃতির অংশরূপী ভারতাঁকে সেখানে মানে গোলকে দেখতে পাবেন এবং তাঁকে দেখার পর তাঁর সঙ্গে যৌনমিলনে ব্যস্ত হবেন। এও আছে ব্রহ্মা ভারতীর সঙ্গে রতিক্রিয়া করেছেন স্থানে স্থানে নির্জনে নির্জনে। যিনি ভারতী, তিনিই সরস্বতী।

    ‘মৎসপুরাণ’ অনুসারে পরমাত্মার মুখনিঃসৃত শক্তিগুলির মধ্যে সরস্বতী সর্বশ্রেষ্ঠা। তিনি রূপে দেবীর ন্যায় পরমা সুন্দরী। মহাশ্বেতা (সর্বশুক্ল বা যার সর্বাঙ্গ শ্বেতবর্ণের) ও বীণাবাদিনী। কিন্তু জন্ম নেওয়ার পর তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়ে ‘সৃষ্টিকর্তা’ ব্রহ্মা সরস্বতীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। ব্রহ্মার কুদৃষ্টি থেকে বাঁচতে অগোচরে চলে যেতে থাকে সরে সরে। যেদিকেই তিনি সরছেন সেদিকেই ব্রহ্মার মাথা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। সরস্বতাঁকে নজরের বাইরে যেতে দিচ্ছেন না রূপে মুগ্ধ ব্ৰহ্মা। এইভাবেই তৈরি হয়ে যায় পাঁচটি মাথা। এই রূপেই আমরা ব্রহ্মার মূর্তি পাই। অবশেষে সরস্বতী রাজহংসীর রূপ ধরে বনে পালিয়ে যান। ব্ৰহ্মাও রাজহংসীরূপী সরস্বতীর পিছু নেন এবং সেখানে জোর করে সরস্বতাঁকে ভোগ করেন।

    স্কন্দপুরাণে আমরা অন্য এক কাহিনি পাই। সেখানে ব্রহ্মা তাঁর কন্যা সরস্বতীর প্রতি দুর্ব্যবহার করলে শিব তাঁকে শরবিদ্ধ করে হত্যা করেন। তখন ব্রহ্মার স্ত্রী গায়ত্রী কন্যা সরস্বতাঁকে সঙ্গে নিয়ে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনার জন্য গন্ধমাদন পর্বতে তপস্যা শুরু করে দেন। সেই থেকে শিবের নির্দেশে গায়ত্রী ও সরস্বতীর তপস্যাস্থলে দুটি প্রসিদ্ধ তীর্থ সৃষ্টি হয়। পৃথিবীতে সকল দেবতার তীর্থক্ষেত্র আছে, কেবল ‘সৃষ্টিকর্তা’ ব্রহ্মার নেই। একথা ভেবে ব্রহ্মা পৃথিবীতে নিজের তীর্থ স্থাপনে উদ্যোগী হলেন। তিনি একটি সর্বরত্নময়ী শিলা পৃথিবীতে নিক্ষেপ করলেন। সেটি চমৎকারপুরে এসে পড়ল। ব্রহ্মার সেখানেই নিজের তীর্থ স্থাপন। করবেন বলে ভাবলেন। ব্রহ্মার নির্দেশে সরস্বতী পাতাল থেকে উঠে এলেন। তখন ব্রহ্মা তাঁকে বললেন –“তুমি এখানে আমার কাছে সবসময় থাকো। আমি তোমার জলে ত্রিসন্ধ্যা তপণ করব।” সরস্বতী ভীত হয়ে বললেন– “আমি লোকের স্পর্শ ভয় পাই বলে সবসময় পাতালে থাক। কিন্তু আপনার আদেশ আমি অমান্যও করতে পারি না। আপনি সবদিক বিচার করে একটা ব্যবস্থা করুন।” তখন ব্রহ্মা সরস্বতীর অবস্থানের জন্য হ্রদ খনন করলেন। সরস্বতী সেই হ্রদে অবস্থান করতে লাগলেন। ব্রহ্মা ভয়ংকর সাপেদের সেই হ্রদে ও সরস্বতীর রক্ষক হিসাবে রাখলেন।

    শুধু বৈদিক যুগে নয় পরবর্তীকালে মহাভারত, পুরাণ, কাব্যে পূতসলিলা সরস্বতীর মহিমা বর্ণিত হয়েছে। সরস্বতী নদীর উৎপত্তিস্থল ছিল হিমালয়ের সিমুর পর্বতে, এখান থেকে পাঞ্জাবের আম্বালা জেলার আদবদ্রী নামক স্থানে সমভূমিতে অবতরণ করেছিল। যে প্রসবণ থেকে এই নদীর উৎপত্তি তা ছিল প্লক্ষাবৃক্ষের কাছে, তাই একে বলা হতো প্লহ্মাবতরণ। এতি হিন্দুদের তীর্থস্থান। ঋগ্বেদের যুগে গঙ্গা যমুনা ছিল অপ্রধান নদী, পক্ষান্তরে সরস্বতী নদী ছিল সর্বপ্রধান ও সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয়। এর তীরে ছিল প্রসিদ্ধ তীর্থভূমি। সরস্বতী ও দৃষদ্বতীর মধ্যস্থান দেবনির্মিত স্থান হিসেবে বিবেচ্য হত। ব্রাহ্মণ ও মহাভারতে উল্লেখিত সারস্বত যজ্ঞ এই নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হত। মহাভারত রচনা হওয়ার আগেই রাজপুতনার মরূভূমিতে সরস্বতী নদী অদৃশ্য হয়ে গেলেও কয়েকটি স্রোতধারা অবশিষ্ট ছিল। এই স্রোতধারা হল চমসেসাদ্ভেদ, শিবোদ্ভেদ ও নাগোদ্ভেদ। রাজস্থানের মরূভূমির বালির মধ্যে চলুর গ্রামের নিকটে সরস্বতী অদৃশ্য হয়ে ভবানীপুরে দৃশ্য হয়। আবার বলিচ্ছপুর নামকস্থানে অদৃশ্য হয়ে বরখের নামক স্থানে দৃশ্য হয়। তান্ডমহাব্রাহ্মণে সরস্বতী নদীর উৎপত্তিস্থল হিসাবে প্লপ্রস্রবণ ও বিনাশস্থল হিসেবে বিনশনের নামোল্লেখ আছে। ভারতের বর্তমান উদয়পুর, মেওয়াড় ও রাজপুতনার পশ্চিমপ্রান্তে মরু অঞ্চলে সিরসা অতিক্রম করে ভূটানের মরূভূমিতে সরস্বতীর বিলোপ স্থানই বিনশন। লাট্যায়ণের শ্রৌতসূত্র মতে, “সরস্বতী নামক নদী পশ্চিম মুখে প্রবাহিত, তার প্রথম ও শেষভাগ সকলের প্রত্যক্ষ গোচর, মধ্যভাগ ভূমিতে নিমগ্ন হয়ে প্রবাহিত, সে অংশ কেউ দেখতে পায় না, তাকেই বিনশন বলা হয়”। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের মতে, বৈদিক সরস্বতীর লুপ্তাবশেষ আজও কচ্ছ ও দ্বারকার কাছে সমুদ্রের খাড়িতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। সরস্বতী নদীর বিনাশ ঘটেছিল অবশ্যই বৈদিক যুগের শেষভাগে। আচার্য যোগেশচন্দ্র রায়ের মতে, খ্রিস্টের দেড় হাজার বছরেরও আগে। মহাভারতে আছে যে নিষাদদের চোখের আড়ালে থাকার জন্য বিনাশণ নামক স্থানে মরুভূমিতে অদৃশ্য হয়েছে। নদীর স্থানীয় নামই এই ঐতিহ্য বহন করছে। অনেকেই বলেন, সিন্ধুনদই সরস্বতী। সরস্বতী ও সিন্ধু দুটি শব্দের অর্থই নদী।

    সরস্বতী পুজো হিন্দু বিদ্যা ও সঙ্গীতের দেবী সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠেয় একটি অন্যতম প্রধান হিন্দু উৎসব। পুরোহিত দর্পণ (শাস্ত্রীয় বিধান?) অনুসারে মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পুজো আয়োজিত হয়। তিথিটি শ্রীপঞ্চমী বা বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত। উত্তর ভারত, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, নেপাল ও বাংলাদেশে সরস্বতী পুজো উপলক্ষ্যে বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়। শ্রীপঞ্চমীর দিন অতি প্রত্যূষে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাত্রছাত্রীদের গৃহ ও সর্বজনীন পূজামণ্ডপে দেবী সরস্বতীর পুজো করা হয়। ধর্মপ্রাণ হিন্দু পরিবারে এই দিন শিশুদের হাতেখড়ি, ব্রাহ্মণভোজন ও পিতৃতর্পণের প্রথাও প্রচলিত। পূজার দিন সন্ধ্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সর্বজনীন পুজোমণ্ডপগুলিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আয়োজিত হয়। পুজোর পরের দিনটি শীতলষষ্ঠী নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে কোনো কোনো হিন্দু পরিবারে সরস্বতী পুজোর পরদিন অরন্ধন পালনের প্রথা রয়েছে।

    নদী সরস্বতী বৈদিক সাহিত্য থেকে পুরোপুরি বাগ দেবী হয়ে দাঁড়ান ব্রাহ্মণ গ্রন্থে। সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও সরস্বতী পুজো বর্তমান রূপটি আধুনিক কালে প্রচলিত হয়েছে। তবে প্রাচীনকালে তান্ত্রিক সাধকেরা সরস্বতী-সদৃশ দেবী বাগেশ্বরীর পুজো করতেন বলে জানা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির উপর তালপাতার তাড়ি ও দোয়াতকলম রেখে পুজো করার প্রথা ছিল। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে ছাত্রেরা বাড়িতে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, শ্লেট, দোয়াত ও কলমে সরস্বতী পুজো করত। ইংরেজি স্লেচ্ছ ভাষা হওয়ায় সরস্বতী পুজোর দিন ইংরেজি বইয়ের পুজো নিষিদ্ধ ছিল। গ্রামাঞ্চলে এই প্রথা বিংশ শতাব্দীতেও প্রচলিত ছিল। শহরে ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই সরস্বতীর প্রতিমা নির্মাণ করে পুজো করতেন। বর্ধমান মহারাজার পূজায় বিশেষ সমারোহের আয়োজন করা হয়। দূর দুরান্ত থেকে মানুষ এই পুজোর বিসর্জন দেখতে আসত। পুজো উপলক্ষে দুই ঘণ্টা আতসবাজিও পোড়ানো হত। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পুজোর প্রচলন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে সরস্বতী দেবী হলেও মেয়েরা অঞ্জলি দিতে পারত না। কিছু পণ্ডিতের মতে সমাজপতিরা ভয় পেতেন হয়তো এই সুযোগে ধর্মের নামে মেয়েরা দাবি করে বসেন লেখাপড়ার স্বাধীনতা!

    শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পুজো সম্পন্ন করা যায়। সরস্বতীর পুজো সাধারণ পুজোর নিয়মানুসারেই হয়। তবে এই পুজোয় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। যেমন অভ্র-আবীর, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ। পুজোর জন্য বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুলও প্রয়োজন হয়। লোকাঁচার অনুসারে, ছাত্রছাত্রীরা পুজোর পূর্বে কুল ভক্ষণ করেন না পুজোর দিন কিছু লেখাও নিষিদ্ধ। যথাবিহিত পুজোর পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার (দোয়াত-কলম), পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পুজো করার প্রথা প্রচলিত আছে। পুজোর শেষে পুস্পাঞ্জলি দেওয়ার প্রথাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের দল বেঁধে অঞ্জলি দিয়ে থাকে।

    কেউ কেউ বলেন, মর্ত্যধামে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে প্রথম বারের মতো শ্রীশ্রী সরস্বতী দেবী পুজোর প্রচলন করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর শৈশব কাল থেকেই সরস্বতী পুজো প্রচলন করে সমগ্র পৃথিবীর শিক্ষার্থীদের সরস্বতী পুজোর গুরুত্ববহ বিদ্যার্জন ও বিদ্যালয়সমূহে সরস্বতী পুজোর প্রচলন করে গেছেন, যা এখনও পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত রয়েছে। সরস্বতী পুজো স্বৰ্গমর্তে, উভয়লোকে দেবতা, গন্ধর্ব, কিন্নর, ঋষি, মহর্ষি, রাজা-প্রজা সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে করে আসছে। সরস্বতী পুজোর অঞ্জলি দেওয়ার সময় পলাশ ফুলের ব্যবহার ভগবান শ্রীকৃষ্ণই প্রচলন করেন। বলে অনেকে মনে করেন। শ্রীকৃষ্ণের বয়স তখন ৭ বছর।

    পুস্পাঞ্জলী মন্ত্রঃ

    ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।

    বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে॥

    নমঃভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ॥

    বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত-বিদ্যা-স্থানেভ্য এব চ॥

    এস স-চন্দন পুষ্পবিল্ব পত্রাঞ্জলি সরস্বতৈ নমঃ॥

    প্রণাম মন্ত্রঃ

    নমো সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।

    বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী বিদ্যাংদেহি নমোহস্তুতে॥

    জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।

    বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে॥

    সরস্বতীর স্তবঃ

    শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেত পুষ্পোপশোভিতা।

    শ্বেতাম্ভরধরা নিত্যা শ্বেতাগন্ধানুলেপনা॥

    শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চ্চিতা।

    শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারবভূষিতা

    বন্দিতা সিদ্ধগন্ধর্বৈৰ্চিতা দেবদানবৈঃ।

    পূজিতা মুনিভি: সৰ্ব্বৈঋষিভিঃ স্কয়তে সদা॥

    স্তোত্রেণানেন তাং দেবীং জগদ্ধাত্রীং সরস্বতীম্।

    যে স্মরতি ত্রিসন্ধ্যায়ং সৰ্বাং বিদ্যাং লভন্তি তে॥

    নদী সরস্বতীর মহিমা ভারতবাসীর মনে এত রেখাপাত করেছিল যে, পরবর্তীকালে গঙ্গা সরস্বতীর স্থান দখল করলেও তাঁরা তাঁকে ভুলতে পারেনি। প্রয়োগে অন্তঃসলিলারূপে গুপ্তভাবে গঙ্গা-যমুনার সঙ্গে সরস্বতীর সঙ্গম, পশ্চিমবঙ্গে হুগলি জেলার ত্রিবেণীতে গঙ্গার স্রোত ধারা থেকে সরস্বতীর মুক্তি হিন্দুদের প্রিয় ও পবিত্র বিশ্বাস। সরস্বতী নিয়ে নানা ব্যাখ্যা নানা বিশ্লেষণ প্রচলিত আছে। তাই সঠিক সিদ্ধান্তে যাওয়ার চেষ্টা করা বৃথা, তবে অসম্ভব নয়। অতএব আমরা দেখলাম নদীরূপে, ব্রহ্মার কন্যারূপে, বিষ্ণুর জিহ্বায় অবস্থানকারী রূপে ইত্যাদি নানাভাবে আদি কাহিনিগুলিতে বারবার সরস্বতী এসে হাজির হয়েছেন। সরস্বতী শব্দের যা অর্থ তা নদীর সঙ্গে মিল খায় না। যদিও সেইকালে নদীর অপরিসীম গুরুত্ব ছিল। পরবর্তীকালে তাঁকে বাগদেবী হিসাব পুজো করা শুরু হয়। এইখানে আমরা বিগ ব্যাং থিয়োরির কথাটা একবার মনে করতে পারি, যা শব্দ থেকে ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি কথাটার সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি করে। এবার আমরা যদি সহজ করে ভাবি তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে একটা পরমসত্তা ছিল, একটা শব্দ নির্গত হল আর ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি হল। সরস্বতী যদি সেই শব্দ হয় তবে সারা সৃষ্টির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রয়েছে।

    এতক্ষণ যাঁরা সরস্বতীর বিচিত্র কাহিনি পাঠ করলেন, তাঁদের বলি এইসব সরস্বতী একজন কেউ নন। ভিন্ন ভিন্ন সরস্বতী। একই নামে একাধিক সরস্বতীর একত্র রূপ। যেহেতু প্রাচীনকালে কারোর পদবি ছিল না বা পদবির উৎপত্তি হয়নি, তাই কারোকেই পৃথক করা যায় না। সবাইকেই একই সত্তা বলে মনে হয়।

    লেখক মনোবর বলছেন–“সমস্ত জ্ঞান, যা শব্দ বা বাক্য দ্বারা ধারণা করা যায় তার এক চিন্ময়ী মূর্তি হিসাবে দেবী সরস্বতীর পুজো করা হয় এইটা হচ্ছে মোদ্দা কথা। সমস্ত প্রকার শক্তিকেই দেবীরূপে কল্পনা বা ব্যাখ্যা করা হয়েছে তাই সরস্বতী হলেন বিদ্যাশক্তির অধিষ্ঠাত্রী। ব্যস! এবার আর কোনো সমস্যা নেই। এই প্রবল শক্তি, যা জগতের বিকাশের অন্যতম ভিত্তি তার পুজো পাওয়া মানে ওই বিদ্যার বিকাশের পথ সুগম হওয়া সেটা আমাদের জন্য আনন্দদায়ক হওয়ার কোন কারণ নেই। যা আমরা গুরুত্বপুর্ণ ভাবি তাকে শ্রদ্ধাভক্তি করায় দ্বিধার কোন কারণ তো নেই। এখানে আমরা বা আমাদের বলতে শুধুমাত্র হিন্দুদের কথা বলা হয়েছে বুঝতে হবে। কারণ মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান, ইহুদি ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের দেবী সরস্বতী নেই। তাঁরা কেউই সরস্বতীর বরে বিদ্যালাভ করে বিদ্বান হননি। তাঁরা সরস্বতীর বর বা আশীর্বাদ না পেলেও বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, গবেষক, দার্শনিক হওয়া তাঁদের আটকায়নি। আইনস্টাইন, নিউটন, কোপারনিকাস, প্লেটো, ডেকার্ত, পিট সিগার, ইবনে বতুতা, হিউয়েন সাঙ, আলেকজান্ডার ফ্লেমিং, রুজভেল্ট, সামসুর রহমান, হুমায়ুন আজাদ, আবদুল্লাহ আবু সয়ীদ, হুমায়ুন আহমেদ, মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, সৈয়দ মুজতবা সিরাজ, আল্লামা ইকবাল, জসিমউদ্দিন, কার্ল মার্ক্স, লেনিন, স্তালিন হয়ে উঠতে কারোরই সরস্বতীর প্রয়োজন হয়নি।

    উপসংহারে একটা বলতে চাই, সরস্বতী মূলত হিন্দুদের দেবী। বিশেষ করে বাঙালি বিদ্যার্থীদের কাছে একমাত্র উপাস্য। খ্রিস্টান, মুসলমান, শিখ এবং অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীদের দেবী নয়। তবে স্কুল-কলেজে সরস্বতী পুজোর আয়োজন। করা শুধু অশোভনীয়ই নয়, অন্যায়। ভারতবর্ষ কোনো হিন্দু রাষ্ট্র নয়, এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ভারতবর্ষের কোনায় কোনায় স্কুল-কলেজগুলিতে শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছাত্রছাত্রীরাই পাঠ নেন না, পাঠ নেয় সব ধর্মের ছাত্রছাত্রীরা। অন্য ধর্মের ছাত্রছাত্রীদের ভিন্ন ধর্মের সরস্বতী বন্দনা চাপিয়ে দেওয়া অসাংবিধানিক। যদি জোর করে সরস্বতী-বন্দনা চাপিয়ে হয়, তবে তা হবে সাংবিধানিক অধিকার হরণের সামিল। সরকারি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় পুজোর কোনো নিয়ম নেই, তবু বিদ্যার দেবী হিসাবে সরস্বতী স্কুল, পাঠশালা কিংবা কলেজে পুজো পেয়ে থাকে। হিন্দু ধ্বজাধারী কোনো স্কুল কলেজে পুজো-পার্বণ হতেই পারে, তাই বলে সর্বসাধারণের স্কুল-কলেজগুলিতে এই পুজো কতটা প্রাসঙ্গিক, প্রশ্ন উঠতে পারে। ভেবে দেখতে বলি সবাইকে।

  • গোহত্যা, গোমাংস ও গোমাতার ইতিবৃত্ত

    গোহত্যা, গোমাংস ও গোমাতার ইতিবৃত্ত

    অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book-name]

    গোহত্যা, গোমাংস ও গোমাতার ইতিবৃত্ত

    সম্প্রতি স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা সমগ্র পড়ে আমি চমকে গেলাম। গ্রন্থের একটি অংশে স্বয়ং বিবেকানন্দ বলেছেন, একদা হিন্দুগণ গো-মাংস ভক্ষণ করত। পৈতে, উপনয়ন অনুষ্ঠানে বৃষ বা ষাঁড় বলি দেওয়ার প্রথাই করে একদা গোমংস খেত। যদিও এখন আর এ অনুষ্ঠানে এসব বলি-টলি না-হলেও প্রতিকী হিসাবে জালি লাউ/কুমড়ো চারটে কাঠি পুঁতে দাঁড় করিয়ে রাখা অনুষ্ঠানে। এটা সম্ভবত মনুর যুগেই গো-সম্পদ রক্ষার তাগিদেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংস্কৃত ভাষায় ‘গোঘ্ন’ বলে একটা শব্দ পাই। এই শব্দটির অর্থ গোহত্যাকারী। আবার অতিথির একটি প্রতিশব্দ। অর্থাৎ প্রাচীন ভারতে অতিথি। কেউ গৃহে এলে তাঁকে গোহত্যা করে আপ্যায়ন করা হত।

    ঋগ্বেদের যুগে আর্যদের কাছে গোরু ছিল খুব মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদ। বিত্তবানদের ‘গোমত’ এবং গোষ্ঠীপতিদের ‘গোপ’ বা ‘গোপতি’ নামে ডাকা হত। গোরু নিয়ে আর্যদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ হত। সেই সংঘর্ষকে বলা হত ‘গভিষ্টি’, ‘গব্যু’ বা ‘গবেষণ’ নাম দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন পৌরাণিক উপাখ্যানগুলিতে গোরুর দেবত্ব ও তার সঙ্গে অনেক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে। মহেঞ্জোদারোর সিলে ভীমকায় ষাঁড় বা বৃষের চিত্র আমরা পেয়েছি।

    অথর্ব বেদের দশম কাণ্ডে অবধনীয় গোরুর গৌরবকথা আছে। এটা থেকেই প্রমাণ হয় যে, প্রাচীন ভারতে গোরু অবধ্য মানা হত। গোরুকে শুধু ‘অগ্ন’ বা ‘অগ্ন’ বলা হত তা নয়, বেদে আরও অনেক গৌরবজনক নামে ডাকা হয়েছে। ঋগ্বেদে ‘অগ্ন’ ও ‘অম্লা’ কথাগুলি চারবার উল্লেখ আছে। অথর্ব বেদে স্ত্রীলিঙ্গে ও পুংলিঙ্গে আরও ৪০ বার উল্লেখ আছে। গৌ, উস্র, ধেনু, সুদুগ্ধা, বৃষ ইত্যাদি গোরুর মোট ২১টি সমার্থক শব্দ পাওয়া যায়। বিভিন্ন শব্দরূপ ও সমার্থক মিলিয়ে ঋগ্বেদে গোরু প্রায় ৭০০ বার উল্লেখিত হয়েছে।

    বৈদিক যুগের পশুপালন ও কৃষিভিত্তিক সমাজের কেন্দ্রে গোরুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গোরুই ছিল মুদ্রা। গোরুর বিনিময়ে কেনাকাটা হত। গোরুই ছিল অর্থনীতি। ঋগ্বেদে আছে, “পণি’ বলে একদল মানুষ ইন্দ্রের গোরু চুরি করেছিল। তাতে ইন্দ্ৰ ক্ষেপে গিয়ে সরমা নামে এক কুকুরকে পাঠিয়ে পণিদের ধমক দেন –“গোরু ফেরত দাও। না-হলে ইন্দ্র এসে তোমাদের মজা দেখিয়ে দেবে।” এটা থেকে বোঝা যায় ইন্দ্রের মতো মহাশক্তিধরও গোরু ছাড়া শক্তিহীন।

    বৈদিক যুগের ভারতীয়রা গোরুকে শুধুমাত্র পশু হিসাবেই দেখতেন তা নয়। তৎকালীন যুগে সমাজ, অর্থনীতি ও ধর্মে গোরুর একটা বিরাট স্থান ছিল। গোরুই ছিল সম্পদশালীর মাপকাঠি। তাই গোরুকে বৈদিক সাহিত্যে অনেক গৌরবজনক বিশেষণে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের পঞ্চম সূক্তে অগ্নিকে বলা হয়েছে– ‘বৃষভশ্চ ধেনুঃ’, অর্থাৎ তিনি বৃষ ও গাভী দুই-ই। নবম মণ্ডলের ৭২ সূক্তে সোমকে বলা হচ্ছে ‘প্রিয়ঃ পতিগৰ্বাৎ’, অর্থাৎ গাভীর স্বামীস্বরূপ (Lord of Cows)। অন্যত্র সূর্যকে বলা হয়েছে এক উজ্জ্বল। বর্ণধারী বৃষ বা ষাঁড়, ইন্দ্রকে সুদুগ্ধা ধেনুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। গোদুগ্ধকে তুলনা করা হয়েছে উজ্জ্বল রশ্মির সঙ্গে। গোরুকে অভিহিত করা হয়েছে রুদ্রের মাতা, বসুগণের দুহিতা ও আদিত্যের ভগ্নী বলে। আহ্লাদ করে ডাকা হয়েছে ‘অদিতি’, ‘ঋত’, বাক’ এরকম বিভিন্ন নামে। বৃহস্পতিকে বলা হয়েছে ‘গোপতি’, মরুৎকে বলা হয়েছে ‘গোবন্ধু’।

    প্রাচীন ভারতে যে গোরু অবধ্য ছিল সে বিষয়ে প্রথম ও অকাট্য প্রমাণ হল ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলে ১৬৪ সূক্তের ৪০ ঋকে গোরুকে ‘অগ্ন’ অর্থাৎ ‘অবধনীয়’ বলা হয়েছে। আবার ৪৩ নম্বর ঋকে বৃষ মাংস ভক্ষণের কথা আছে। পঞ্চম মণ্ডলের ২৯ সূক্তের ৮ নম্বর ঋকে মহিষের মাংস ভক্ষণের কথা আছে। অথর্ব বেদের দ্বাদশ কাণ্ডের চতুর্থ ও পঞ্চম সূক্তে গোবধের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় লেখা এবং কেউ গোবধ করলে সে ‘মৃত্যু পাশেমু বধ্যতাম’ হবে। এছাড়াও ওই সূক্তেরই ২২ ঋকে গোরুকে আবার ‘অঘ্না’ বলা হয়েছে।

    ঋগ্বেদে দুই ধরনের তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। একটি ধরন হল গোরুকে ‘অঘ্নেয়’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। ঋগ্বেদে ‘অঘ্নেয়’ কথাটির অর্থ হল যাকে হত্যা করা অনুচিত। কাঠহিন্দুরা এটা থেকেই যে যুক্তিটা খুঁজে পায়, সেটা হল গোহত্যা সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা। বলা হয় গোমাংস ভক্ষণ করা তো দূরের কথা, গোহত্যাও করা যেত না। না, ‘অগ্নেয়’ কথাটি সারসত্য হয়ে যায়নি। বৈদিক যুগেও নয়। শতপথ ব্রাহ্মণে (তৃতীয়–১:২: ২১) দুটি জায়গায় প্রাণী উৎসর্গ ও গোমাংস ভক্ষণ সম্পর্কে বলা হয়েছে– “অর্ধ্বেয়ু তখন তাঁকে গৃহাভ্যন্তরে নিয়ে এলো। তাঁকে বলা হল সে যেন গাভী ও ষাঁড়ের মাংস না খায়। কারণ গাভী ও ষাঁড় পৃথিবীতে অনেক উপকার করে। দেবতারা বললেন –গাভী ও ষাঁড় জগতের অনেক উপকার করে, তাই গাভী ও ষাঁড় যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করে। এজন্য সে গাভী ও ষাঁড়ের মাংস খেতে ইচ্ছুক।” ঋগ্বেদে বলা হয়েছে আর্যরা খাদ্য হিসাবে গোহত্যা করত এবং গোমাংসকে উত্তম খাদ্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে ৮৫ : ১৪ শ্লোকে ইন্দ্র বলছেন–“তাঁরা ১৫/২০ টি গোরুর মাংস রান্না করেছে। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ৭২ : ৬ শ্লোকে তরবারি বা কুঠার দ্বারা গোহত্যার উল্লেখ আছে। অপস্তম্ভ ধর্মসূত্রের ১৪, ১৫ ও ২৯ শ্লোকে বলা হয়েছে –“গাভী এবং ষাঁড় হচ্ছে পবিত্র। সুতরাং তাদের মাংস অবশ্য ভক্ষ্য।”

    আপস্তম্ভ ধর্মশাস্ত্রের একটি পরিচ্ছেদে কোন্ কোন্ খাদ্যদ্রব্য ভক্ষণ করা উচিত বা অনুচিত, তার তালিকা আছে। ওই সূত্রটিতে উল্লেখ আছে এক ক্ষুরবিশিষ্ট উট, শূকর, শরভ ও গায়ল নামের এক ধরনের পশু খাওয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু তার পরের ঋষি বলেছেন গোরু ও ষাঁড়ের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ নয়। আপস্তম্ভ ঋষি ওই অধ্যায়েই পেঁয়াজ, রসুন, মাশরুম এবং মুরগি ভক্ষণে নিষেধ করেছেন।

    সংস্কৃতে একটা প্রাচীন শব্দ হল ‘গো-সঙ্খ্য’। এই শব্দটার অর্থ হল ‘গো পরীক্ষক’। কেন গোরু পরীক্ষার প্রয়োজন হত? কারণ যে গোরু বা ষাঁড় বা বলদ কর্তন করা হবে, তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা। অর্থাৎ সব গোরু চোখ বুঝে ভক্ষণ করা যেত না। নিরোগ শরীর হতে হবে। ডাঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদের প্রণীত ‘Beef in Ancient’ ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘জাতি গঠনে বাধা’ গ্রন্থে বৌদ্ধযুগের আগে হিন্দুরা যে প্রচুর গোমাংস ভক্ষণ করত, তার উল্লেখ আছে। এসব গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বৌদ্ধযুগের আগে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ মোটেই নিষিদ্ধ ছিল না। মধু ও গোমাংস না খাওয়ালে তখনকার সময়ে অতিথি আপ্যায়নই অপূর্ণ থেকে যেত। সেই কারণেই অতিথির আর-এক নাম ‘গোঘ্ন’। রামপ্রসাদের গুরু কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ তাঁর ‘বৃহৎ তন্ত্রসার’ গ্রন্থে অষ্টবিধ মহামাংসের মধ্যে গোমাংসের উল্লেখ প্রথমেই আছে।

    বৈদিক যুগে বিভিন্ন যজ্ঞে দেবতাদের উদ্দেশ্যে যে পশুবলি উৎসর্গ করা হত, সেখানে অন্যান্য পশুদের সঙ্গে গোরুর কথাও উল্লেখ আছে অনেকবার। ঋগ্বেদে দশম মণ্ডলের ১৬৯ সূক্তটির দেবতাই হচ্ছেন ‘গাবঃ’। কিন্তু সেখানেও এক জায়গায় বলা হয়েছে যে, গোরুরা দেবতাদের যজ্ঞের জন্য নিজেদের শরীর সমর্পণ করে থাকে। দশম মণ্ডলেরই ৮৬ সূক্তে ইন্দ্র বড়াই করে ইন্দ্রাণীকে বলছেন–“আমি পনেরো বা বিশ বৃষের মাংস খেতে পারি।” অষ্টম মণ্ডলের ৪১ সূক্তে ঋগ্বেদের আর-এক মুখ্য দেবতা অগ্নিকে ঘিয়ের সঙ্গে যেসব মাংস আহুতি দেওয়া হত, তার মধ্যে অশ্ব, ঋষভ (বলদ), উক্ষ (ষাঁড়), মেষ এবং ভশা। এই ভশা শব্দটি যে গোরু সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ না-থাকলেও এটি কোন্ ধরনের গোরু তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। অনেক পণ্ডিতদের মতে ভশা হল বন্ধ্যা বা দুগ্ধবতী নয় এমন গোরু।

    যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় সংহিতাতে অশ্বমেধ যজ্ঞের শেষে যেসব প্রাণী উৎসর্গ করার কথা উল্লেখ আছে, তার মধ্যে গোরুও আছে। যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণে রাজসূয় ও বাজপেয় যজ্ঞের ‘গোসভ’ নামে যে অংশটি আছে, তাতেও একই কথা লেখা। আরও অন্যান্য যজ্ঞগুলিতেও (অগ্নিষ্টোম যজ্ঞ, দর্শপূর্ণমাস যজ্ঞ, চতুর্মাস্য যজ্ঞ, সৌত্ৰামণি যজ্ঞ) ‘পশুবন্ধ’ অংশে গোরু বা বৃষ উৎসর্গের উল্লেখ পাই। কোনো সন্দেহ নেই যে, বিভিন্ন যজ্ঞে অন্য পশুর সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া, গোরু, বলদ এবং ষাঁড়ের বলি দেওয়া হত।

    বৈদিক যুগে শুধুমাত্র যে যজ্ঞের উপলক্ষ্যে গোমাংস ও অন্যান্য পশুমাংস খাওয়া হত তা নয়। ‘গবাময়ন’ নামে একটি সামাজিক অনুষ্ঠান ছিল, যে অনুষ্ঠানের শেষে বন্ধ্যা গোরু মিত্রবরুণ ও অন্যান্য দেবতাকে উৎসর্গ করা হত। সে যুগে মধুপর্কের প্রচলন ছিল। বাড়ি অতিথিরা এলে তাঁদের অর্ঘ বা মধুপর্ক খেতে দেওয়ার নিয়ম ছিল। প্রাচীনকালে মধুপর্কে দই-মধুর সঙ্গে গোমাংস দেওয়া হত। আপস্তম্ব, সাখ্যায়ণ, গোভিল, খাদির, পারস্কার, হিরণ্যকেশী প্রমুখ ঋষিদের রচনা গৃহ্যসূত্রে মধুপর্কে গোমাংসের কথা স্পষ্ট উল্লেখ আছে। শ্রাদ্ধে পিতৃপুরুষকে তৃপ্ত করতে যে গোমাংস দেওয়া হত তারও উল্লেখ আছে। এ বিষয়ে আরও জানতে ‘ভারতরত্ন’ পণ্ডিত পাণ্ডুরঙ্গ কাণের ‘History of Dharmasastra’ পড়ে দেখতে পারেন।

    ঐতরেয় ব্রাহ্মণের সপ্তম অধ্যায়ে বলি দেওয়া পশুটি যজ্ঞের পুরোহিতদের মধ্যে কে, কীভাবে, কোন্ ভাগটা পাবে তারও উল্লেখ আছে। তৈত্তিরীয় সংহিতাতে বলির পশুর শরীর কেমনভাবে কাটা হবে তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। অথর্ব বেদের গোপথ ব্রাহ্মণে ‘সমিতার’ অর্থাৎ যিনি পশু বলি দেন, তিনি কীভাবে ছত্রিশ ভাগে পশুটি কাটবেন সেই হিসাবও দেওয়া হয়েছে। যজ্ঞে যে পশু বলি বা উৎসর্গ করা হত, তা খাদ্য হিসাবেও ব্যবহার করা হত। যজ্ঞের পশু যে খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা হত, সে কথা শতপথ ব্রাহ্মণের তৃতীয় ও পঞ্চম উল্লেখ আছে– “পশ্বে বৈ অনুম” এবং “অন্নম বৈ পশ্বঃ”। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণের তৃতীয় অধ্যায়ের একটি শ্লোকে স্পষ্টভাবে লেখা আছে –“অথো অন্নং বৈ গৌঃ”। অতএব গোমাংস খাদ্যই। শতপথ ব্রাহ্মণের তৃতীয় কাণ্ডে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন যে, তিনি গোমাংস খেতে ভালোবাসেন, যদি তা অংসল (নরম) হয়। যজ্ঞের মাংস যে খাওয়া হত এবং গোমাংস খাদ্যবিশেষ ছিল এ বিষয়ে কোনো প্রশ্নচিহ্ন থাকছে না। বৃহদারণ্যক উপনিষদে উল্লেখ আছে– কেউ যদি জ্ঞানী, সর্ববেদবিদ্ ও দীর্ঘ পরমায়ুযুক্ত সন্তান চায়, তাহলে সেই দম্পতি ঘি দিয়ে বৃষমাংস বেঁধে খেতে হবে। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে ‘পঞ্চশারদীয় সেবা’ নামে একটি ভোজন অনুষ্ঠানের কথা জানা যায়, সেই ভোজনানুষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য হল –১৭টি পাঁচ বছরের নিচে গোবৎস কেটে রান্না করে অতিথিদের পরিবেশন করা। ঋগ্বেদ সংহিতাতেও ‘বিবাহসূক্ত’-এ কন্যার বিবাহ উপলক্ষ্যে সমাগত অতিথি-অভ্যাগতদের গোমাংস পরিবেশনের জন্য একাধিক গোরু বলি দেওয়ার বিধান আছে। (১০ : ৮৫ : ১৩)

    ধর্মশাস্ত্র ছাড়াও প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যেও গোমাংস ভক্ষণের কথা জানতে পারি। সাহিত্য সমাজের দর্পণ, ইতিহাসও। বাল্মীকির রামায়ণে উল্লিখিত রামচন্দ্রের খাদ্যতালিকায় ছিল তিন প্রকার মদ (আসব) ছিল– (১) গৌড়ী : এটা গুড় থেকে তৈরি হত। (২) পৌষ্টি : পিঠে পচিয়ে তৈরি হত। (৩) মাধ্বী : মধু থেকে তৈরি হত। এই মদের সঙ্গে থাকত শূলপক্ক গোবৎসের মাংস। ভবভূতির ‘উত্তররামচরিত’ নাটকের চতুর্থ অঙ্কে বাল্মীকির দুই শিষ্যের মধ্যে একটি কথোপকথন এখানে উল্লেখ করা যাক। বশিষ্ঠ ঋষি বাল্মীকির আশ্রমে এসেছেন। ফলে বাল্মীকির এক শিষ্য অন্য এক শিষ্যকে জিজ্ঞাসা করছেন –“এই দাড়িওয়ালা বুড়োটা কে রে, বাঘ নাকি? উনি এসেই মেটে রঙের বেচারা বাছুরটিকে খেয়ে ফেললেন।” অন্য শিষ্য সতীর্থকে শাস্ত্র মনে করিয়ে দিয়ে বললেন –“সমাংস মধুপর্ক দিয়ে অতিথি সৎকার করতে হয়, এটা ধর্মশাস্ত্রে লেখা আছে।” বরাহমিহিরের ‘ভরতসংহিতা’-য় বিভিন্ন পশুর মাংসের পাশাপাশি গোমাংসের কথাও উল্লেখ আছে। মহাভারতের বনপর্বে আছে রাজা রন্তিদেবের হেঁশেলে রোজ ২০০০ গোরু রান্না করা হত। মহাকবি কালিদাসের মেঘদূত কাব্যের পূর্বমেঘ পর্বে ৪৬ নম্বর শ্লোকে যক্ষ মেঘকে বলছে –“গো-নিধনের রক্তে যিনি নদী বইয়েছিলেন, সেই রন্তিদেবকে তোমার যাত্রাপথে যোগ্য সম্মান দিও।” প্রাচীন তামিল সাহিত্যে প্রায় ২০০০ বছর পুরোনো সঙ্গম সাহিত্য ‘অকানানুরু’ গ্রন্থের ২৪৯ ও ২৬৫ পদদুটিতে একদল দস্যুর মোটাসোটা বাছুরের মাংস খাওয়ার বিবরণ আছে।

    ডঃ আম্বেদকর তাঁর ‘why Did The Brahmins Give Up Beef-Eating’ গ্রন্থে বেদ-স্মৃতি-পুরাণ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন– তৎকালে ব্রাহ্মণরা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে গোমাংস ভক্ষণ করত। সেইজন্য ব্রাহ্মণদের বলা হত ‘গোঘ্ন’। গোয় মানে গোহত্যাকারী। কশাইকে গোমাংসের অংশ বঞ্চিত করার জন্য ব্রাহ্মণরা নিজেরাই নিজ হাতে গোরু কাটত। মহভারতের অনুশাসন পর্বের ৮৮ অধ্যায়ে শ্রাদ্ধাদি কাজে অতিথিদের গোমাংস ভক্ষণ করালে পূর্বপুরুষ এক বছর পেতে পারে। এই উপদেশ যুধিষ্ঠিরকে দিচ্ছেন পিতামহ ভীষ্ম। বিরাট রাজার গোশালায় অজস্র গোহত্যা করা হত, তার উল্লেখ আছে। আগেই বলেছি রামায়ণের রাম গোমাংসের সঙ্গে মদ্যপান করতে পছন্দ করতেন। বনবাসকালে রাম তাঁর মায়ের কাছে আক্ষেপ করে বলছেন, সে চোদ্দো বছর গোমাংস ভক্ষণ করতে পারবেন না, সোমরস পান করতে পারবেন না এবং স্বর্ণ পালঙ্কে শয়ন করতে পারবেন না। পৌরাণিক যুগে গোমাংস ভক্ষণের প্রত্যক্ষ এবং বিস্তারিত প্রমাণ রামায়ণের তুলনায় মহাভারতে অনেক বেশি। বলা হয়েছে –(১) “বশিষ্ঠ মুনি মদ্য ও গোমাংস প্রভৃতি দিয়া বিশ্বামিত্রকে তাঁহার সেনাগণের সহিত ভোজন করাইয়াছিলেন।” হুইলার প্রমুখ সাহেবরা রামায়ণের যুগে যে গোমাংস ভক্ষণের ব্যবস্থা ছিল, সেকথা উল্লেখ করতে দ্বিধা করেননি। (২) “ভরদ্বাজ মুনি ভরতকে গোমাংসাদি দিয়া পরিতুষ্ট সহকারে ভোজন করাইয়াছিলে এবং তৎকালে বিশ্বামিত্রের যজ্ঞে ব্রাহ্মণেরা দশ সহস্র গোভক্ষণ করিয়াছিলেন।” বেদব্যাস বিরচিত মহাভারতের শান্তিপর্বে (১২ : ২৬৬) ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে যে রাজা বিচষ্য গো-মেধ যজ্ঞে একদিকে অসংখ্য গোরুর আর্তনাদ এবং ছিন্ন দেহ, আর অন্যদিকে ব্রাহ্মণদের নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করে অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন।

    মহর্ষি পাণিনি কী বললেন, দেখা যাক–“অতিথি আগমন করলে তাঁহার জন্য গো-হত্যা করবে।” কৃষ্ণ যজুর্বেদের মৈত্ৰায়ণীয় শাখার অন্তর্ভুক্ত মানবগৃহ্যসূত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “বাড়িতে অতিথি এলে তাকে আপ্যায়ন করতে গোরুর মাংস দিতে হবে এবং গৃহস্থের কর্তব্য হচ্ছে অতিথির সঙ্গে আরও চারজন ব্রাহ্মণকে গোমাংস ভোজনে আমন্ত্রণ জানানো।” (পৃ: ২৮) মহাত্মা গান্ধী 261694, “I know there are scholars who tell us that cow sacrifice is mentioned in the Vedas. … read a sentence in our Sanskrit text-book to the effect that Brahmins of old (period) used to eat beef.” ( M.K.Gandhi, Hindu Dharma, New Delhi, 1991, p. 120). অর্থাৎ, “আমি জানি (কিছু সংখ্যক পণ্ডিত আমাদের বলেছেন) বেদে গো-উৎসর্গ করার কথা উল্লেখ আছে। আমি আমাদের সংস্কৃত বইয়ে এরূপ বাক্য পড়েছি যে,পূর্বে ব্রাহ্মণরা গো-মাংস ভক্ষণ করতেন।” (হিন্দুধর্ম, এম.কে. গান্ধী, নিউ দিল্লি, ১৯৯১,পৃ. ১২০)।

    একবার দেখা যাক ‘বৃহদারণ্যকোপনিষদ’ কী বলছে। বলছে –“কোনো ব্যক্তি যদি এমন পুত্র লাভে ইচ্ছুক হন, যে পুত্র হবে প্রসিদ্ধ পণ্ডিত, সভাসমিতিতে আদৃত, যার বক্তব্য শ্ৰতিসুখকর, যে সর্ববেদে পারদর্শী এবং দীর্ঘায়ু, তবে তিনি যেন বাছুর অথবা বড়ো বৃষের মাংসের সঙ্গে ঘি দিয়ে ভাত রান্না করে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে আহার করেন” (বৃহদারণ্যকোপনিষদ ৬/8/১৮)। বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রে গো-মাংস ভক্ষণের সমর্থন পাওয়া যায়। বশিষ্ঠস্মৃতি’-তে বলা হয়েছে– ব্রাহ্মণ, রাজা, অভ্যাগতদের জন্য বড়ো ষাঁড় কিংবা বড়ো পাঁঠার মাংস রান্না করে আতিথেয়তা করা বিধেয় (বশিষ্ঠস্মৃতি ৪/৮)। মনু অবশ্য কোনো কোনো প্রাণীর মাংস খেতে বারণ করেছেন। বলার বিষয় হল, তার মধ্যে গোরু পড়ে না। কারণ, যেসব প্রাণী এক খুর বিশিষ্ট তাদের মাংস খাওয়া বিশেষ বিধান ছাড়া বারণ (মনুস্মৃতি ৫/১২)। এই শ্রেণিতে গোরু পড়ে না। অন্যদিকে, যেসব প্রাণীর শুধু এক পাটি দাঁত আছে তাদের মাংস খাওয়া যেতে পারে (মনুস্মৃতি ৫/১৮)। এখানেই শেষ নয়, মনুস্মৃতি বলছে– অতিথিদের খেতে দেওয়ার জন্য, পোষ্যদের প্রতিপালনের জন্য, অথবা ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য প্রয়োজনে যে-কোনো মাংস বিধিসম্মত (মনুস্মৃতি ৫/২২)। চাণক্য বা কৌটিল্য কী বলেছেন তাঁর ‘অর্থশাস্ত্র’-এ, সেটি জানবেন না? জানুন– (১) গোপালকেরা মাংসের জন্য ছাপ দেওয়া গোরুর মাংস কাঁচা অথবা শুকিয়ে বিক্রি করতে পারে (অর্থশাস্ত্র ২/২৯/১২৯)। (২) মাংসের জন্য ছাপ মারা গোরু ছাড়া অন্য কোনো শ্রেণীর গোরু হত্যা নিষিদ্ধ (অর্থশাস্ত্র ২/২৬/১২২)। (৩) রাজ্যের গবাদি পশুর তত্ত্বাবধায়কের পদে একজন সরকারি কর্মচারী থাকবেন। তিনি গোরুদের ছাপ দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করবেন। যেমন– দুগ্ধবতী গাভী, হালটানা বা গাড়িটানা বলদ, প্রজননের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত ষাঁড় এবং মাংসের জোগানের জন্য অন্যান্য গোরুসমূহ (অর্থশাস্ত্র ২/২৯/১২৯)। গৃহ্যসূত্রগুলির সুরও প্রায় এক। বৈদিক সাহিত্যের অন্তর্গত গৃহ্যসূত্রগুলিতে গোরু বলি এবং গোমাংস। ভক্ষণের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে। অধিকাংশ গৃহ্যসূত্রে ব্রাহ্মণ, আচার্য, জামাই বা জামাতা, রাজা, স্নাতক, গৃহস্থের প্রিয় অতিথি, অথবা যে-কোনো অতিথির জন্য মধুপর্ক অনুষ্ঠানের বিধান আছে। আর সেইসব অনুষ্ঠানে গোমাংস পরিবেশন করাই ছিল সাধারণ বিধান ও রীতি। বিভিন্ন পুরাণেও গোরুর মাংস ভক্ষণ এবং বিশেষ করে ব্রাহ্মণদের পরিবেশন করার স্পষ্ট নির্দেশ এবং প্রশংসা আছে। বিষ্ণুপুরাণে গোরু, শূকর, গন্ডার, ছাগ, ভেড়া প্রভৃতি বিভিন্ন পশুর মাংস খাইয়ে ব্রাহ্মণদের হবিষ্য করার বিধান দিয়ে সেই সঙ্গে কোনো মাংস ব্রাহ্মণদের ভক্ষণ করালে পিতৃপুরুষেরা কতদিন পরিতৃপ্ত থাকবেন তার একটা পরিসংখ্যানের উল্লেখ আছে। বিষ্ণুপুরাণ বলছে, ব্রাহ্মণদের গোমাংস খাইয়ে হবিষ্য করালে পিতৃগণ ১১ মাস পর্যন্ত তৃপ্ত থাকেন। আর এ স্থায়িত্বকালই সবচেয়ে দীর্ঘ (বিষ্ণুপুরাণ ৩/১৬)। গোরুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ আয়ুর্বেদাচার্য চরক এবং সুশ্রুত। চরক বলছেন– গোমাংস বাত, নাক ফোলা, জ্বর, শুকনো কাশি, অত্যাগ্নি (অতিরিক্ত ক্ষুধা বা গরম), কৃশতা প্রভৃতি অসুখের প্রতিকারে বিশেষ উপকারী (চরকসংহিতা ১/২৭/৭৯)। সুশ্রুতও একই সুরে বলেছেন– গোমাংস পবিত্র এবং ঠান্ডা। হাঁপানি, সর্দিকাশি, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, অতি ক্ষুধা এবং বায়ু বিভ্রাটের নিরাময় করে (সুশ্রুতসংহিতা ১/৪৬/৪৭)। এত গেল অতীতে, অর্থাৎ প্রাচীন ভারতে হিন্দুগণের গোমাংস ভক্ষণ প্রসঙ্গে তথ্যসূত্র সংবলিত আলোচনা।

    এত কিছু আলোচনার পর হিন্দুরা গোমাংস ভক্ষণ করত কি না সে প্রশ্ন অবান্তর। হ্যাঁ, ঠিক। একটা ছোট্ট অংশের হিন্দু আজও গোমাংস ভক্ষণ করলেও বড় অংশের হিন্দুরা বহুকাল গোমাংস ভক্ষণ করে না। সে ব্যাপারে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু কোনোকালেই হিন্দুরা গোমাংস ভক্ষণ করত না, একথা বলা মানে ইতিহাসকে অস্বীকার করার সামিল। বিশেষ করে ব্রাহ্মণরা যখন বলেন তাঁরা কখনোই গোমাংস ভক্ষণ করতেন না, সেটাকে মিথ্যাচার অথবা অজ্ঞানতা বলে। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থগুলি কিন্তু গোমাংস ভক্ষণের পক্ষেই সাক্ষ্য দিচ্ছে।

    ইসলাম ধর্মে শুয়োয়ের মাংস ভক্ষণে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মতো হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে গোমাংস ভক্ষণের বিরুদ্ধে ফতোয়া না থাকলেও হিন্দুরা কেন গোমাংস ভক্ষণের অভ্যাস ত্যাগ করল? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আমাদের জানতে হবে হিন্দুদের বিভিন্ন শ্রেণির খাদ্যাভ্যাস তাঁদের গোষ্ঠী অনুসারে স্থিরীকৃত করা হয়েছিল। হিন্দুদের গোষ্ঠীবিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসও বদলে গেল। একটি গোষ্ঠী হল শিবভক্ত শৈব, অন্যটি হল বিষ্ণুভক্ত বৈষ্ণব। একটি মাংসাহারী আমিষভোজী এবং অন্যটি শাকাহারী নিরামিষভোজী। আর-একটু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার করলে মাংসাহারীদের দুটি উপবিভাগে ভাগ করা যায়– (১) যাঁরা মাংস খায় বটে, কিন্তু গোমাংস ভক্ষণ করে না। (২) যাঁরা গোমাংসসহ সব মাংসই ভক্ষণ করে। অনুরূপভাবে হিন্দুসমাজকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন –(১) ব্রাহ্মণ, (২) অ-ব্রাহ্মণ এবং (৩) অস্পৃশ্য।

    ব্রাহ্মণদের মধ্যে একটা শ্রেণি আছে যাঁরা নিরামিষভোজী। কারণ ভারতের ব্রাহ্মণরা দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। যেমন– পঞ্চ দ্রাবিড় ও পঞ্চ গৌড়। পঞ্চ দ্রাবিড়েরা নিরামিষভোজী। পঞ্চ গৌড়রা আমিষভোজী। অব্রাহ্মণরা মাংসভোজী হলেও গোমাংস ভক্ষণ করে না। তবে তথাকথিত অস্পৃশ্যরা গোমাংস সহ সব ধরনের মাংস ভক্ষণ করে।

    যাঁরা মাংসভোজী তাঁরা কেন গোমাংস ছাড়লেন? সেইসব বিধিনিষেধের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় বৌদ্ধ-সম্রাট অশোকের বিধানে। বোঝাই যায় হিন্দুধর্মের উপর বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। অশোকের বিধান স্তম্ভের গাত্রে ও পর্বতগাত্রে ঘোষিত নির্দেশ পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে –“এইসব নির্দেশ মহামান্য রাজার আদেশে লিখিত হয়েছে। রাজধানীর মধ্যে কেউ কোনো প্রাণীকে বলি দিতে পারবে না, বা কোনো পবিত্র ভোজ দিতে পারবে না। কারণ মহামান্য রাজার নিকট ওসব আপত্তিকর।” যদিও কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে মহামান্য রাজা এমন ভোজকে আপত্তিকর বলে মনে করেন না, সেটারও উল্লেখ আছে– “পূর্বে মহামান্য রাজার রসুই ঘরে হাজার হাজার প্রাণী রান্নার জন্য হত্যা করা হত। কিন্তু যখন এই পবিত্র নির্দেশ ঘোষিত হয়েছিল তখন বলা হয়েছিল তখন বলা হয়েছিল সারাদিনে কেবলমাত্র তিনটি প্রাণী খাদ্যের উদ্দেশে হত্যা করা যেতে পারে। যেমন –দুটি ময়ুর ও একটি হরিণ, অবশ্য যদি প্রয়োজন হয়। এখন থেকে এই তিনটি প্রাণীও হত্যা করা যাবে না।” সম্রাট অশোক বিশেষ করে যেসব প্রাণীদের হত্যা ও ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছিলেন, তার একটা তালিকা পাওয়া যায়। যেমন –টিয়া পাখি, হরবোলা পাখি, হাড়গিলা পাখি, পাতিহাঁস, মণ্ডিমুখ, গেলটাস, বাদুড়, বড়ো পিঁপড়ে, মেয়ে কচ্ছপ, অস্থিহীন মাছ, বেদবেয়াক, গঙ্গাপুপুটক, শঙ্কর মাছ, নদী কচ্ছপ, সজারু, কাঠবিড়ালি, বড়ো শিংওয়ালা হরিণ, ষাঁড়, বানর, গণ্ডার, ঘুঘু, পায়রা, সব প্রজাতির চতুষ্পদ প্রাণী, ভেড়ী, গাভী ইত্যাদি।

    এছাড়া অশোকের বিধানে আছে– মোরগকে খাসি করা যাবে না। জীবন্ত প্রাণীসহ ভূষি পোড়ানো চলবে না। জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে প্রাণী হত্যা করা যাবে না। কোনো প্রাণীকে দিয়ে কোনো প্রাণীকে হত্যা করা যাবে না। তিষ্যা মাসের পূর্ণিমা, প্রথম পক্ষের চতুর্দশ ও পঞ্চদশ দিবসে, দ্বিতীয় পক্ষের প্রথম দিনে মাছ ধরা বা বিক্রয় করা যাবে না। এইসব দিনে অন্য প্রাণীও হত্যা করা যাবে না। পক্ষের অষ্টম, চতুর্দশ ও পঞ্চদশ দিবসে এবং তিষ্য ও পুনর্বাসা দিবসে এবং উৎসবের দিনে ষাঁড়, পাঁঠা বা শূকরের মুষ্ক ছেদন করা যাবে না। তিষ্যা, পুনর্বাসা, পূর্ণিমার দিনে কোনো ঘোড়া এবং ষাঁড়কে গরম লৌহ বা জ্বলন্ত কাষ্ঠখণ্ড দ্বারা দাগানো যাবে না।

    মনু কিন্তু গোমাংস করতে নিষেধ করেননি। বরং ভক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি কোনো কোনো অনুষ্ঠানে গোমাংস ভক্ষণ বাধ্যতামূলক করেছেন। মনুসংহিতার পঞ্চম অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকে বলেছেন —

    “শ্বাবিধং শল্যকং গোধাং খঙ্গকূর্মশশাংস্তথা।
    ভক্ষ্যান্ পঞ্চনখেহুরনুষ্ঠাংশ্চৈকতোদতঃ।।”

    অর্থাৎ সজারু, গোসাপ, কচ্ছপ ও খরগোশ প্রভৃতি পঞ্চ নখবিশিষ্ট প্রাণীগুলি খাওয়া যায়। উষ্ট্র ব্যতীত এক পাটি দন্তবিশিষ্ট গৃহপালিত প্রাণীর মাংস ভোজন করা যেতে পারে। গোরু, মোষ এরা সকলেই এক পাটি দন্তবিশিষ্ট।

    বাবাসাহেব বলেন– “এই যে গোমাংস ভক্ষণ বন্ধ হল এবং গো-পুজো শুরু হল, এটা অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট অব্রাহ্মণদের দ্বারা উৎকৃষ্ট ব্রাহ্মণকে অনুকরণ ছাড়া আর কিছু নয়। … অব্রাহ্মণদের জীবনে একটা বিপ্লব ঘটে গেল। গোমাংস ত্যাগ করা একটা বিপ্লব বইকি। যদি অব্রাহ্মণরা একটা বিপ্লব করত, তবে ব্রাহ্মণরা দুটি বিপ্লব করত। একটি বিপ্লব হল গোমাংস ত্যাগ, দ্বিতীয়টি হল মাংস ত্যাগ করে একেবার নিরামিষাশী হয়ে যাওয়া।” এটা কী যে সে বিপ্লব! অথচ এই– “ব্রাহ্মণরা ছিল সবচেয়ে বড়ো গোমাংস ভক্ষণকারী। অব্রাহ্মণরা গোমাংস ভক্ষণ করলেও তাঁরা সব দিন গোমাংস পেত না। গোরু ছিল মূল্যবান সম্পদ এবং হত্যার জন্য গোরু পাওয়া অব্রাহ্মণদের পক্ষে সবসময় সম্ভব হত না। এটি তাঁদের পক্ষে তখনই সম্ভব হত যখন কোনো ধর্মীয় ধর্মীয় বিশেষ অনুষ্ঠানে দেবদেবীর তুষ্টি সাধনার্থে তাঁরা গোরু উৎসর্গ করতে বাধ্য হত। কিন্তু ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে এটা ছিল অন্যরকম। তাঁরা ছিলেন পুরোহিত। সে সময় এত বেশি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হত যে, এমন কোনো দিন থাকত না যেদিন কোনো গোরু উৎসর্গের অনুষ্ঠান হত না। ব্রাহ্মণদের পক্ষে প্রতিদিনই গোমাংস লাভের দিন। তাই ব্রাহ্মণরা ছিল সবচেয়ে অধিক গোমাংসভোজী। ব্রাহ্মণদের যজ্ঞ ছিল নিরীহ প্রাণীহত্যার একটা বাহানা। আসলে যজ্ঞ ব্রাহ্মণদের গোমাংসের ক্ষুধা মেটানোর একটা ধর্মীয় কলাকৌশল মাত্র।” খুব নিষ্ঠুরভাবে হোতর নির্দেশে গোরু হত্যা করতেন যজ্ঞের নামে। সেই নিষ্ঠুর হত্যার বর্ণনা ‘আত্রেয়ী ব্রাহ্মণ’ পাঠ করলেই পেয়ে যাবেন। আত্রেয়ী ব্রাহ্মণের বর্ণনায় ব্রাহ্মণরা কেবল গোমাংস ভক্ষণ করতেন তা নয়, তাঁরা নিজেরাই হত্যা করতেন।

    বৌদ্ধ-সম্রাট অশোকের নিযেধাজ্ঞাকে ব্রাহ্মণরা মেনে নিয়েছিল, একথা মোটেই মেনে নেওয়া যায় না। দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে এটা আশাই করা যায় না যে বৌদ্ধধর্মের কোনো এক রাজার আদেশ ব্রাহ্মণ শিরোমণিরা মাথা নীচু করে মেনে নেবেন। তবে মনুর কয়েকটা নির্দেশে ব্রাহ্মণরা গোমাংস খাওয়া থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল কি না, সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে।

    পঞ্চম অধ্যায়ের ৪৬ নম্বর শ্লোকে মনু বলছেন– “যিনি প্রাণীদের বন্ধন ও বধের দ্বারা ক্লেশ দিতে চান না, তিনি সকলের হিতকামী, তিনি অনন্ত সুখ ভোগ করেন।” ৪৭ নম্বর শ্লোকে বলছেন–“যিনি কাউকে হত্যা করেন না, তিনি যা কিছু ধ্যান করেন বা যা কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠান করেন এবং যে বিষয়ে মনঃসংযোগ করেন, তাতেই সিদ্ধিলাভ করেন।” ৪৮ নম্বর শ্লোকে বলেছেন –“প্ৰাণীহত্যা না করে মাংস পাওয়া যায় না। প্রাণীহত্যা স্বর্গলাভের কারণ হতে পারে না। সুতরাং মাংসাহার ত্যাগ করো।” ৪৯ নম্বর শ্লোকে বলেছেন –“মাংসের উৎস প্রাণীবধ ও বন্ধন যন্ত্রণার কথা বিবেচনা করলে সকল প্রকার মাংস ভক্ষণ থেকে নিবৃত্ত থাকতে হয়।”

    মনুর এইসব কথাগুলো নির্দেশ বলা যায় না, বরং উপদেশ বলা যায়। উপদেশ মানা না-মানা ঐচ্ছিক, বাধ্যতামূলক নয়। কারণ মনুর পরের শ্লোকগুলো অনুধাবন করুন। একই অধ্যায়ের ২৮ নম্বর শ্লোকে বলছেন–“পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে সবই প্রজাপতি জীবের অন্নস্বরূপ সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং স্থাবর-জঙ্গম সবই জীবের খাদ্য।” ২৯ নম্বর শ্লোকে আরও পরিষ্কার করে বলেছেন– “স্থাবর-জঙ্গম সবই জঙ্গমদের খাদ্য। দন্তহীন প্রাণী দন্তবান প্রাণীদের খাদ্য। হস্তহীন প্রাণীরা হস্তবান প্রাণীদের খাদ্য এবং ভীরু প্রাণীরা বলবান প্রাণীদের খাদ্য।” ৩০ নম্বর শ্লোকে বলছেন– “ভক্ষ্য জীবকে প্রত্যহ ভক্ষণ করলে ভোক্তার কোনো পাপ হয় না। কারণ ঈশ্বর কোনো কোনো প্রাণীকে ভোজ্য এবং কোনো কোনো প্রাণীকে ভোক্তা করে সৃষ্টি করেছেন।”

    যজ্ঞে পশু উৎসর্গ করে তা ভক্ষণ করার সমর্থন রয়েছে মনুর। পঞ্চম অধ্যায়ের ৩১ নম্বর শ্লোকে বলছেন– “যজ্ঞের প্রসাদস্বরূপ যে মাংস, তা বৈধ। আর

    প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে যে মাংস ভক্ষণ করে তাঁকে রাক্ষসাচার বলা যায়।” ৩৯ নম্বর শ্লোকে– “যজ্ঞের নিমিত্ত ব্রহ্মা পশুদের সৃষ্টি করেছেন। সমগ্র বিশ্বের কল্যাণের জন্য যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সুতরাং যজ্ঞে পশুবধকে হত্যা বলা চলে না। বা কাজে কোনো পাপ হয় না।” ৪২ নম্বর শ্লোকে –“বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ কর্তৃক মধুপর্ক বা যজ্ঞ প্রভৃতি কার্যে যেসব প্রাণী বধ করা হয় তাতে নিজের এবং প্রাণীর উভয়েরই কল্যাণ সাধিত হয়।”

    এখানেই শেষ নয়, মনু বলেছেন “যজ্ঞ প্রভৃতি পবিত্র অনুষ্ঠানে যে ব্যক্তি মাংস ভক্ষণ করে না, সে পরবর্তী ২১ বার পশুরূপে জন্মগ্রহণ করবে” (৫ : ৩৫)। অতএব মনু তাঁর মনুসংহিতার কোথাও মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করেছেন এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছেন, এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে না।

    মনুসংহিতার একাদশ অধ্যায়ের ৫৫ নম্বর শ্লোকে যে মহাপাপগুলির কথা উল্লেখ করেছেন, গোহত্যা নেই। তিনি বলছেন–“ব্রাহ্মণ হত্যা, সুরাপান, ব্রাহ্মণের স্বর্ণহরণ, গুরুপত্নী গমন এবং এইসব পাপে পাপীদের সংসর্গ হল মহাপাপ।” ৬০ নম্বর শ্লোকে গোহত্যা নিন্দাজনক বলা হলেও জঘন্য অপরাধ নয়। বলছেন– “গোহত্যা, অযাজ্য যাজন, পরস্ত্রীগমন, আত্মবিক্রয়, গুরু-পিতা-মাত-পুত্র ত্যাগ, বেদ অধ্যায়ন না করা এবং অগ্নিত্যাগ –এগুলি লঘুপাপ।”

    তাহলে ব্রাহ্মণ তথা হিন্দুদের গোমাংস ভক্ষণ না করার কোনো সমর্থনই ধর্মীয় শাস্ত্রগুলিতে মিলছে না। মনুসংহিতার মতো মহাধর্মশাস্ত্রও নিযেধ করেনি। তাহলে? বাবাসাহেব বলছেন– “দুটি ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। গোরুকে দেবতারূপে গণ্য করার অন্যতম কারণ হল ‘অদ্বৈত দর্শন’। এই দর্শনে বলা হয়েছে যে, সমস্ত বিশ্বই পরমাত্মার প্রকাশ। ফলে সমস্ত প্রাণীর মধ্যেই তাঁর অস্তিত্ব বিদ্যমান। এই মতবাদ গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথমত, এটার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। যে বেদান্তসূত্র সমস্ত প্রাণীকে এক বলে বর্ণনা করেছে, তা কিন্তু যজ্ঞের বলি হিসাবে প্রাণী হত্যা বন্ধ করতে বলেনি। দ্বিতীয়ত, যদি এই পরিবর্তন অদ্বৈত দর্শনকে উপলব্ধি করে হত, তাহলে কেবলমাত্র গোরুর ক্ষেত্রে নয়, তা সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই কার্যকর হত। অন্য একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, যা প্রথমটির চেয়ে অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। এটা হল আত্মার দেহান্তরের দর্শন। এই দর্শনটা ঘটনার সঙ্গে তেমন মেলে না। বৃহদারণ্যক উপনিষদ আত্মার দেহান্তর গ্রহণের দর্শনের প্রবক্তা। এতে বলা হয়েছে যে, যদি কেউ জ্ঞানীপুত্র লাভ করতে ইচ্ছুক হয়, তবে সে ষাঁড়ের মাংস চাল ও ঘি সহযোগে রান্না করবে। এই মতবাদটা যা উপনিষদে প্রচার করা হয়েছে তা ৪০০ বছর ধরে অর্থাৎ মনুস্মৃতি কার্যকরী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ব্রাহ্মণ সমাজে কোনোই প্রভাব ফেলতে পারেনি।”

    স্বামী বিবেকানন্দ এই গোহত্যা বা গোমাংস ভক্ষণ বন্ধের অর্থনৈতিক কারণের দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। তাঁর মতে, “কালক্রমে দেখা গেল যে আমরা যেহেতু কৃষিজীবী জাতি, অতএব সবচেয়ে ভালো ষাঁড়গুলিকে মেরে ফেলা জাতিকে হত্যা করারই সমার্থক। সুতরাং, এই সব প্রথা বন্ধ করা হল এবং গো-হত্যার বিরুদ্ধে একটি মত গড়ে উঠল”। এই আর্থিক কারণের সঙ্গে সঙ্গে সম্ভবত কিছ সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কারণও যুক্ত হয়েছিল। কারণ– (১) ভারত ইতিহাসে প্রাচীন যুগের শেষ ভাগ থেকে মধ্যযুগের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ-দেশে বৌদ্ধধর্ম এবং অনেক ক্ষেত্রেই জৈনধর্ম ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। বৌদ্ধধর্মে এবং জৈনধর্মে সবরকম প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ এবং সর্বজীবে অহিংসাকে শ্রেষ্ঠ নীতি বলে গণ্য করা হত। এই বিষয়টি হিন্দুগণের কাছে চ্যালেঞজ হিসাবে উপস্থাপিত হল, উদয় হল সমূহ হিন্দুদের অস্তিত্বের সংকট। অতঃপর এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে গিয়ে হিন্দুসমাজকে অনেক ক্ষেত্রেই অনেক কিছুর সঙ্গেই আপস করতে হয়েছিল। আর্থিক কারণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই সাংস্কৃতিক কারণও সম্ভবত গো-হত্যা এবং গো-মাংস ভক্ষণের উপর নিষেধাজ্ঞায় শক্তি সঞ্চারিত হয়েছিল। এভাবেই গো-হত্যা এবং গো-মাংস ভক্ষণ বন্ধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলি ক্রমে ক্রমে দানা বেঁধে মিথ্যা ধর্মীয়তার আধারে ঢাকা পড়ে গেল। কালে কালে গোরু হল গো-মাতা, তেত্রিশ কোটি দেবতার অধিষ্ঠান এবং মলমূত্র হল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পবিত্র উপকরণ। বেড়ে গেল গোরুর গুরুত্ব। মহাভারত রচনার শেষ পর্যায়ে গোরুর একটা অর্থনৈতিক পুনর্মূল্যায়ন আরম্ভ হয়েছিল। আনুমানিক খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে মহাভারতে সংযোজিত অনুশাসন পর্বে সমকালীন অর্থব্যবস্থায় গোরুর। বিশেষ গুরুত্বের নিরিখে খাদ্যদ্রব্য হিসাবে তার মূল্যের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ধন বা ক্যাপিটাল হিসাবে অধিকতর মূল্যের স্বীকৃতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ সময়ে গোরুর বিশেষ অর্থনৈতিক উপযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ধন হিসাবে এর গুরুত্ব ক্রমে ক্রমে স্বীকৃতি লাভ করেছিল। এহেন আর্থিক প্রয়োজনকে স্বীকার করে নিয়ে ধর্মীয় তত্ত্বের আধারে উপস্থাপন করা হল। কারণ স্বর্গ-নরকের লোভ বা ভয় না দেখালে গোরুর মতো সহজলভ্য এবং পুষ্টিকর খাদ্যের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না।

    বাবা সাহেব স্পষ্টভাবে বলেছেন –“আমার মনে হয় এটা একটা কৌশল, যার দ্বারা ব্রাহ্মণরা গোমাংস ত্যাগ করে একেবারে নিরামিষাশী হয়ে গেল এবং গোরুর পুজো করতে আরম্ভ করল। গোরুকে পুজোর আসল রহস্য হল, ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্যে গোমাংস খাওয়া তো দূরের কথা, গোরুকে পুজো করতে আরম্ভ করল। বৌদ্ধ মতবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদের লড়াই ভারতের ইতিহাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। … ভারতে ৪০০ বছর ধরে এই দুটি মতবাদের মধ্যে প্রাধান্য লাভের যে লড়াইটা চলছিল তা সমাজ, ধর্ম, রাজনীতির উপর যথেষ্ট পরিবর্তন এনেছে। … বৌদ্ধ মতবাদ একসময় ভারতের বেশিরভাগ মানুষের ধর্ম ছিল। এটা শত শত বছর ধরে জনগণের ধর্ম হিসাবে ভারতে প্রচলিত ছিল। এটা ব্রাহ্মণ্যধর্মকে এমনভাবে আক্রমণ করেছে, যা পূর্বে কখনো ঘটেনি। ব্রাহ্মণ্যধর্ম তখন ব্যাপকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছিল এবং তাকে আত্মরক্ষার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে লড়তে হচ্ছিল। বৌদ্ধধর্মের দ্রুত প্রসারের ফলে ব্রাহ্মণ্যধর্ম কী রাজসভায় কী জনসাধারণের কাছে সর্বত্র মর্যাদাচ্যুত হয়ে পড়েছিল। পরাজয়ের তীব্র যন্ত্রণা তাঁরা প্রতিমুহূর্তে অনুভব করছিল। কীভাবে তাঁদের শক্তি ও মর্যাদা ফিরে পেতে পারে তার জন্য বিভিন্ন প্রকারের পথ খুঁজতে লাগল।”

    সেই পথ কেমন? বাবাসাহেব বলছেন–“বুদ্ধের মৃত্যুর পর তাঁর অনুগামীরা তাঁর মূর্তিস্থাপন ও স্তূপ তৈরি করতে আরম্ভ করে। ব্রাহ্মণরাও তাঁদের অনুসরণ করতে শুরু করল। তাঁরা মন্দির তৈরি করতে শুরু করল এবং তার মধ্যে শিব, বিষ্ণু, রাম ও কৃষ্ণের মূর্তি স্থাপন করতে থাকল। এইভাবে তাঁরা বৌদ্ধমূর্তির ভক্তদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকে। পূর্বে হিন্দুদের কোনো মন্দির বা দেবদেবীর মূর্তি ছিল না। বৌদ্ধদের অনুকরণে ব্রাহ্মণরা এগুলি শুরু করল। বৌদ্ধরা ব্রাহ্মণ্যধর্মের যজ্ঞ এবং গোহত্যা পরিত্যাগ করেছিল। কারণ গোরু ছিল জনগণের জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রাণী। জনসাধারণ ব্রাহ্মণদের প্রবলভাবে ঘৃণা করতে থাকে। … বৌদ্ধধর্মের প্লাবন থেকে আত্মরক্ষার জন্য ব্রাহ্মণদের যজ্ঞ এবং গোহত্যা দুটি রীতিকেই সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করল। .. ব্রাহ্মণদের গোমাংস খাওয়া বন্ধ করার অন্যতম উদ্দেশ্য হল, বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ সমাজে যেরূপ সম্মান লাভ করেছিল সেটা যাতে পেতে পারে।”

    বর্তমানে সময় বদলেছে। ব্রাহ্মণরা যেমন বদলে গেছে, তৎসহ হিন্দুরা বদলেছে। এখনকার ব্রাহ্মণরা গোমাংস ভক্ষণ না করলেও মোটেই নিরামিষাশী নয়। এক-আধজন না খেলেও অনেক ব্রাহ্মণ কচ্ছপ, মুরগি, খাসি সবই ভক্ষণ করে। কিছু ব্রাহ্মণ অবশ্য লুকিয়ে হলেও গোমাংস ভক্ষণ করে থাকেন। ২০১৫ সালে প্রকাশ্যে ধর্মতলার কার্জন পার্কে আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্যকে তো আমরা সবাই দেখেছি গোমাংস ভক্ষণ করতে। সেদিন গোমাংস ভক্ষণ করেছিলেন প্রখ্যাত কবি সুবোধ সরকারও। এছাড়াও বেশকিছু বুদ্ধিজীবীও এদিন গোমাংস ভক্ষণ করেছিলেন। বর্তমান ভারতে যদি নিখাত নিরামিষাশী গোষ্ঠী বুঝতে হয়, সেটা হল বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব। এঁরা গোমাংস তো অনেক দূরের কথা, ভক্ষণের উদ্দশ্যে কোনো প্রাণীই তাঁরা হত্যা করে না। এমনকি অন্যের হত্যা করা প্রাণীও তাঁরা ভক্ষণ করেন না।

    অতীতে, অর্থাৎ প্রাচীন ভারতে ব্রাহ্মণ তথা হিন্দুগণেরা গো-মাংস ভক্ষণ করত একথা তো তথ্যপ্রমাণ দিয়ে জানানো গেল। ভারতের কেরল, পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও উত্তর-পূর্ব ভারতে কয়েকটি রাজ্য বাদ দিয়ে বাইশটি রাজ্যে গো-হত্যা বেআইনি। তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ একটি (গোরুর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ বিল-২০০৩) বিল উপস্থিত করার চেষ্টা করেছিলেন। বিলটির উদ্দেশ্য ছিল গোহত্যা ও গোমাংসের রপ্তানি নিষিদ্ধ করা, গোমাংস বিক্রি করা, গোরুকে আঘাত করা জামিন অযোগ্য অপরাধ। ব্যাঙ্গালোর ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টের প্রাক্তন ফ্যাকাল্টি সদস্য অধ্যাপক এন এস রামস্বামী একটি প্রবন্ধে লিখেছেন, গোরুর দুঃখে জর্জরিত হয়ে যদি গোহত্যা বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়, তবে ওই প্রাণীটির দুর্দশা আরও বাড়বে। তা ছাড়া যতক্ষণ সেটি কোনো সম্প্রদায়ের খাদ্য ততক্ষণ নিষিদ্ধ করে দেওয়াটা অমানবিক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা যায়। সেক্ষেত্রে ধর্মীয় সংকট (?) ছাড়া অন্য কোনো কারণ তো দেখি না, তাই না? গোরু তো আর বিরল প্রজাতি নয়! গোহত্যা বন্ধ হলেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে গোরুর চালান হতে থাকবে।

    এখনও পর্যন্ত ভারতে পৌরসভা অনুমোদিত ৩০০০ শ্লটার হাউস আছে। তা সত্ত্বেও মাংস খাওয়ার উপযুক্ত এমন ২ কোটি পশু বেআইনিভাবে হত্যা করা হয় দেশ জুড়ে। গবেষক রামস্বামী বলেছেন, পূজ্যপাদ ও প্রয়োজনীয় বলদগুলি আমাদের দেশে পাঁচনের আঘাত হজম করে ৫০ কোটি বার। দেবতাকে এভাবে কোনো ভক্ত মারতে পারে! হিন্দুভক্তগণ বলতে পারেন গোরু যদি মাতাই হয় তাহলে প্রয়োজন ফুরালে বাড়িতে না রেখে রাস্তায় ছেড়ে দেন কেন? কেন মুসলিম বা দলিতদের কাছে বিক্রি করে দেন যখন সে আর দুধ দিতে পারে না?

    আপনি জানেন কি ১৯৮০ সালে মাংসের জন্য গোরু ও মোষ মারা হয়ে ছিল ১ কোটি ৫৬ লক্ষ, এই ভারতে। ২০০০ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ৪৩ লক্ষ। আদতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও গবাদি পশুর বাজারের শতকরা ৮০ ভাগই হল গোমাংস। ইন্ডিয়ান ভেটেরেনারি কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী ভারতে মাত্র ৬০ ভাগ গবাদি পশুকে খাওয়ানোর মতো সংগতি আছে। বাকিরা নির্মমভাবে পরিত্যক্ত হয়। তাদের ভবিষ্যৎ অনাহারে মৃত্যু, পথ দুর্ঘটনায় অথবা বিষাক্ত খাবার অথবা খিদের তাড়নায় অখাদ্য খেয়ে মৃত্যু হয়। ধর্মীয় বিধানে এমন কিছু যজ্ঞ আছে যা করতে হলে পঞ্চগব্য খেয়ে পবিত্র হতে হবে। পঞ্চগব্য কী? পঞ্চগব্য হল গোরুজাত পাঁচটি দ্রব্য– দই, দুধ, ঘি, গোবর এবং গো-মূত্র। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বলেন, গো-মূত্রের ভিতর নাকি গঙ্গা বসত করে। তার মানে গো-মূত্র সেবন করলেই গঙ্গাপ্রাপ্তি সুনিশ্চিত!

    ভারতে প্রায় ৫০ কোটি গবাদি পশু আছে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি, মোষের সংখ্যা ২ কোটি– সারা পৃথিবীর অর্ধেক। পৃথিবীর সাড়ে আট কোটি গোরু, বাচ্চা বলদ, ষাঁড়। বলদের মধ্যে ভারতে আছে শতকরা ১৫ ভাগ।

    একটি সাক্ষাৎকারে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী ডি ডি লাপাং বলেছেন, “মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ডে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই গোরুর মাংস খেয়ে থাকে, উত্তর-পূর্ব ভারতের মাথাপিছু আয় এমনিতেই কম। এখানকার মানুষের পক্ষে বিকল্প খাদ্য হিসাবে মুরগি কেনা সম্ভব নয়।” প্রসঙ্গত বলি, মণিপুরের অধিবাসীদের বক্তব্য হল, গোরুর মাংস যে শুধু সস্তা তাই নয়, এখানকার ঠান্ডা আবহাওয়ায় বেশ মানানসই।

    কেরল রাজ্য দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোমাংস ভোজন করে। ২০০৩ সালের একটা হিসাবে দেখতে পাচ্ছি, সেই বছরে ২ লক্ষ ৪৯ হাজার টন গোমাংস একমাত্র কেরলেই বিক্রি হয়েছে। সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানই নাকি ১৩০ টন গোমাংস বিক্রি করেছে। কেরলে গোমাংসের চাহিদা এত বেশি যে প্রতি বছর প্রতিবেশী রাজ্যগুলি থেকে ৫ লক্ষ গোরু আমদানি হয়। কেরল আবার গোহত্যা বেআইনি এমন রাজ্যগুলিতে গোমাংস রপ্তানি করে। তাই অনেকেই মনে করেন, গোহত্যা বন্ধ হলে কেরলের মানুষ ও পশু দুটোরই স্বাস্থ্য বিপন্ন হবে। কারণ গোমাংস হল সবচেয়ে সস্তা মাংস। কেরলের মাংস বিক্রির শতকরা ৪০ ভাগই হল গোমাংস। হিন্দু, মুসলিম, সন্ত, খ্রিস্টানরা গোমাংস খেয়ে থাকেন। দক্ষিণ ভারতে তপসিল জাতি এবং তপসিল উপজাতির বেশিরভাগ মানুষই গো-মাংস খেয়ে থাকেন।

    পশ্চিমবাংলার করিডর দিয়ে সারা ভারত থেকে লক্ষ লক্ষ গোরু বাংলাদেশে প্রতিবছর পাচার হয়। বাংলাদেশের মানুষ সেই গোরুগুলির মাংস তো খানই, উপরন্তু বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বিদেশি মুদ্রা আয় করেন।

    মুসলিমরা যখন ভারতবর্ষ আক্রমণ করে দিল্লিতে ঘাঁটি গেড়ে বসল, তখন শুধু শাসনযন্ত্র করায়ত্ত করেই ক্ষান্ত হল না; বিজিত দেশে নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের প্রভাব স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। গ্রামের পর গ্রাম আক্রমণ করে মন্দির ভেঙে মসজিদ বানিয়ে, পুরুষদের হত্যা করে নারীদের বন্দি করে ধর্মান্তর করে জবরদস্তি বিবাহ করে বংশবিস্তারে মনোযোগী হয়েছিল কোনো কোনো শাসক। সেই সময়ে আমাদের ব্রাহ্মণকুল ধর্মীয় ‘পবিত্রতা রক্ষার নামে, নিজেদের জ্ঞান জাহির করার তাগিদে, নিদান হাঁকতে শুরু করলেন, যে বা যারা গোমাংস ভক্ষণ করেছেন (জবরদস্তি করে খাওয়ানো হলেও), বা এমনকি পেঁয়াজ বা রসুনের গন্ধ শুঁকেছেন; তাঁরা সবাই স্বধর্মচ্যুত হয়েছেন! ব্রাহ্মণকুলের অজ্ঞতার কারণে আক্রমণকারী মুসলিম শাসকদের হাত শক্ত হল; নিমেষে গ্রামকে গ্রাম হিন্দুসম্প্রদায় মুসলিমে পরিণত হয়েছিল। আজ ভারতবর্ষ সহ পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে যে বিপুল সংখ্যক মুসলমান আছেন তাঁদের প্রায় অনেকেই শিকড় হিন্দু! নানা সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় কারণে রূপান্তরিত।

    তবে অতি প্রাচীনকালে অর্থাৎ অতীতে সনাতনধর্মীরা যে গোমাংস ভক্ষণ করত তা নয়, বর্তমানেও হিন্দুদের মধ্যে গোমাংস ভক্ষণের রীতি আছে। বিশ্বের একমাত্র হিন্দুরাষ্ট্র নেপালে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর গাধীমাই মন্দিরে পশুবলি দেওয়া হয় এবং ভক্ষণ করা হয়। এই উৎসবে লাখো লাখো গোরু, মহিষ, শূকর, ছাগল, মুরগি, পায়রা এবং এমনকি ইঁদুর প্রাণী বলি দেওয়া হয়। মহিষই বেশি পছন্দ। সত্যি কথা বলতে এইরকম নৃশংস বলি পৃথিবীতে আর কোথাও হয় বলে আমার জানা নেই। বলি না বলে হত্যালীলা বলা যায়। দাঁড়িয়ে থাকা প্রাণীগুলিকে অতর্কিতে গলায় কোপ বসিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়। একপ্রকার কচুকাটা যাকে বলে। ২০০৯ সালে প্রায় ২,৫০,০০০ পশু হত্যা করা হয়। ভারত থেকেও প্রচুর গবাদি পশু চলে যায় নেপালে গাধীমাইয়ের সেবার জন্য। এ ঘটনায় সারা বিশ্ব প্রতিবাদে মুখর হচ্ছে। জনমত গঠন করা হচ্ছে। নেপালে বলি বন্ধ হবে কি না জানি না, তবে ভারত থেকে পশু রপ্তানি বন্ধ হবে আশা করি।

    বর্তমান ভারত গোহত্যা, গোমাংস নিয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছে। গোমাংস ঘরে রাখার কারণে মুসলিমদের হত্যা করা হচ্ছে। এটা কি গোরুর প্রতি প্রেম? নাকি রাজনীতির উদ্দেশ্যে মুসলিম বিদ্বেষ? আমরা সবাই জানি গোরু ও মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে রাজনীতি করে আরএসএস তথা বিজেপি নামে একটি রাজনৈতিক দল। আমাদের দেশে অহিংস বেচারা একটি প্রাণীকে নিয়ে সহিংস রাজনীতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ২০১৫ সালে গোরক্ষার নামে আখলাক খানকে গণপিটুনি দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। স্বাধীন ভারতের এক জন নাগরিক আখলাক খাসি খাবেন, না গোরু খাবেন তার বিচার সমাজ বা রাজনৈতিক নেতারা করতে পারেন না। যদি সেই অজুহাতে কোনো নাগরিককে হত্যা করা হয়, তা হলে আমাদের সমাজ অসভ্য এবং বর্বর আখ্যা পাবে।

    প্রথমটি আর্যাবর্তে, মানে গো-বলয়ে সাম্প্রদায়িক অসম্প্রীতির মাথাচাড়া দেওয়া নিয়ে। আশঙ্কাটা খুবই তাড়াতাড়ি সত্য হয়ে যায়। লোকজন খামাখা খুন হয়। টেনশন বেড়ে যায়। মানুষ মানুষকে সন্দেহ করতে শুরু করে। ঘৃণাও। বহু বছরের চেনা এলাকা থেকে ঠাঁইনাড়া হয় বহু সাধারণ মানুষ। এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার সাপটা সবসময় কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে। দ্বিতীয় আশঙ্কাটা ছিল অর্থনীতিকে ঘিরে। বিজেপির ক্ষমতায়নের ফলে রাজ্যে রাজ্যে গোহত্যা যেভাবে নিষিদ্ধ হতে থাকে এবং সেই সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার ঝাঁপটা শুরু হয়, তাতে আশঙ্কা হচ্ছিল, এই অশান্তির ফলে ভারতের গোমাংস রপ্তানি না মার খায়। পৃথিবীতে ভারত থেকে গোমাংস (‘বিফ’ বললেও অধিকাংশই অবশ্য মহিষ বা বলদের মাংস) ও গোপণ্য রপ্তানি হয় বছরে ৩৩ হাজার কোটি টাকার। ভারতের পরেই স্থান ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়ার। দ্বিতীয় আশঙ্কাটাও যদি সত্যি হয়ে ওঠে, তাহলে ব্রাজিল-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পোয়াবারো চিনেরও। এ দুই আশঙ্কা চূড়ান্ত সত্যি হলে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা হয়তো আনন্দে দু-হাত তুলে নাচবে, কিন্তু ভারতের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল একটা দেশের পক্ষে সেটা মোটেই ভালো বিজ্ঞাপন হবে না। বিজেপি দিল্লি ও অন্যান্য রাজ্য দখলের পর থেকে গো-হত্যা বন্ধে ও গো-সংরক্ষণের নামে যা চলেছে, তাতে রপ্তানির এই বিপুল বাণিজ্য ইতিমধ্যে ভয় পেতে শুরু করেছে। দেশে মোট ২৪টি মিট প্রসেসিং কারখানা রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ১৩টি ১০০ শতাংশ রপ্তানি করে থাকে। এগুলোর অধিকাংশই উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও পাঞ্জাবে। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের দৌরাত্মে এই কারখানাগুলোতে সরবরাহ কমতে শুরু করেছে। ফলে কমছে মাংস রপ্তানি। মাংস রপ্তানি কমার পাশাপাশি মার খেতে শুরু করেছে। চামড়াশিল্প। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দৈনন্দিন জীবিকার প্রশ্নও। গোরু মারা গেলে যাঁরা তার চামড়া ছাড়ানোর কাজ করেন অথবা গোমাংস বিক্রির সঙ্গে জড়িত, মার খেতে শুরু করেছেন তাঁরাও। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে শুরু করেছেন সাধারণ চাষিও। যে গোরু আর কাজে লাগছে না, সেগুলো রাখতে হচ্ছে, খাওয়াতে হচ্ছে। এদের বিক্রি করে আগে চাষিদের কিছুটা অর্থ সাশ্রয় হত। একটা হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এর ফলে দেশে অকর্মণ্য ও ছেড়ে দেওয়া গোরুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫৫ লাখ।

    গোরু, মহিষ, ভেড়া বা ছাগলের চামড়া ছাড়ান যাঁরা, যাঁদের অনেকেই চামড়াশিল্পের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের সংখ্যা কমবেশি ৮ লাখ। এই শ্রেণির মানুষ সাধারণত মুসলমান ও দলিত হিন্দু। বংশপরম্পরায় তাঁরা এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তিন দশক ধরে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের যিনি খুব কাছ থেকে দেখছেন, তিনি দিল্লি সায়েন্স ফোরামের ডি রঘুনন্দন। তাঁর কথায়, এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা সমাজের একেবারে দরিদ্র শ্রেণির। ক্রমবর্ধমান ভয়, হুমকি ও জবরদস্তির ফলে এঁরা যে শুধু রোজগার হারাচ্ছেন তা নয়, গরিব মানুষদের সস্তার প্রোটিন (গোমাংস) থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এই মানুষজনের সংখ্যা কত? একটি সরকারি হিসাবও ওই সংবাদপত্রে দাখিল করা হয়েছে। ভারতের প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ দরিদ্র মানুষ শুধু গোরু-মহিষের মাংস থেকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংগ্রহ করেন। এঁদের সবাই কিন্তু মুসলমান নন। হিন্দু আছেন, খ্রিস্টান আছেন, উপজাতি আছেন, বৌদ্ধ আছেন, আছেন সব মতাবলম্বীরাই। মিল তাঁদের এক ক্ষেত্রেই, সবাই অতি দরিদ্র। গোরু নিয়ে বিতর্ক এঁদেরই পেটে কষিয়ে লাথি মেরেছে সবচেয়ে বেশি। গোরু-বিতর্কের জের ভারতকে শেষ পর্যন্ত যেখানে দাঁড় করাবে, সেটা যে দেশের পক্ষে মোটেই ভালো নয়।

    হিন্দুত্ববাদের শিরোমণি সাভারকার বলেছিলেন– “গোরু হিন্দু জাতির প্রতীক হওয়া উচিত নয়। গোরু কিন্তু হিন্দু জাতির দুগ্ধ প্রতীক। কোনো উপায়েই এটিকে হিন্দুত্বের প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করা উচিত নয়। হিন্দুত্বের প্রতীক গোরু নয়, নৃসিংহ (নৃসিংহের উল্লেখ, ভগবান বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার হিসাবে বিবেচিত)। গোরুকে ঐশী হিসাবে বিবেচনা করে এবং তাঁর উপাসনা করার সময় গোটা হিন্দু জাতি গোরুর মতো সহজবশ্যে পরিণত হয়েছিল। গোটা জাতি যেন ঘাস খাওয়া শুরু করে। আমরা যদি এখন কোনো প্রাণীর আদলে আমাদের জাতিকে খুঁজে পেতে চাই, তবে সেই প্রাণীটিকে সিংহ হতে দিন। আমাদের এখন নরসিংহ পুজো করা দরকার এবং গোরুর খুর হিন্দুত্বের চিহ্ন নয়।” নৃসিংহ অবতারের হিংস্র ভয়াল মৃর্তি সাভারকার প্রতিটি হিন্দুর মনে গেঁথে দিতে চেয়েছিলেন যারা প্রতিপক্ষের পেট চিরে রক্তপান করবে। গৌতম বুদ্ধের অহিংসার শক্তি উপলব্ধির ক্ষমতা সাভারকারের ছিল না। নেহাতই জান্তব ও মাংসল হিংস্র দর্শনের প্রতীক করে তোলেন বিষ্ণুর নৃসিংহ রূপকে। যদিও তাঁর অনুগামীরা নৃসিংহের বদলে গোরুতেই আটকে থাকেন, কেন-না তুলে ধরার পক্ষে সিংহের চাইতে গোরুই আদর্শ।

    হায় হিন্দু! গোরু যতদিন দুধ দেয় ততদিনই মা। দুধ দেওয়া বন্ধ করলেই গোরু খেদাও। মাতার মাংস পরিণতির নিমিত্ত মুসলিমদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বলদেরও যতদিন গতর ততদিনই কদর। ষাঁড় না-হলে বংশবৃদ্ধির ক্রিয়া জারি রাখবে কে? তাই ষাঁড় দু-একটা রেখে বাকিটা ধর্মের নামে উৎসর্গ করা হয়। ওরা হাটেবাজারে তোলা তুলে খায় আর বেগরবাই করলে পিটানি খায়। তোমাদের সীমাহীন গোভক্তি দেখে চমকিত হই!

    সহায়ক গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকা :

    (১) The Sanctity of the Cow in Hinduism– W Normal Brown, The Economic Weekly, Feb 1964, Madras

    (২) The Myth of the Holy Cow– D N Jha, Verso, London

    (৩) Science and Society in Ancient India– Debiprasad Chattopadhyay

    (৪) Concept of Cow in the Rigveda– Doris Meth Srinivasan

    (৫) Why did the Brahmins give up Beef-Eating– BR Ambedkar

    (৬) মহাকাব্য ও মৌলবাদ –জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়

    (৭) ফ্রন্টলাইন (২০০৩)

    (৮) আউটলুক (২০০৩)

    (৯) সাহারা টাইমস (২০০৩)

    (১০) গোরু ও ত্রিশূল– শ্যামল চক্রবর্তী

  • জ্যোতিষ : না শাস্ত্র, না বিজ্ঞান

    জ্যোতিষ : না শাস্ত্র, না বিজ্ঞান

    অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book-name]

    জ্যোতিষ : না শাস্ত্র, না বিজ্ঞান

    প্ল্যাটফর্মে ধাতুর আংটি বিক্রেতা অক্লান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে আংটিটি আঙুলে ঢোকানোর। শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হলেন। ব্যর্থ হবেন নাই-বা কেন! আঙুলগুলিতে তো আর আংটি ঢোকানোর জায়গাই নেই। দশ আঙুলে কুড়িটা রত্নখোচিত আংটির উপর ওই আড়াই প্যাঁচের তামার আংটি কোথায় ঢুকবে? পোখরাজ, গোমেদ, পান্না, চুনি, প্রবাল– কী নেই সেই দশ আঙুলে! ডাবল ডাবলও আছে। ‘রহিস আদমি’ পেয়ে জ্যোতিষীরা ওর দশ আঙুলে বিশটা আংটি ভজিয়ে দিয়েছে। ওই বিশটা আংটিতেও যে কাজ হয়নি, তা ওই আড়াই প্যাঁচের তামার আংটি পরার ব্যাকুলতাতেই আন্দাজ করা যায়।

    আর-একটা ঘটনা বলি : বছর কুড়ি আগে আকাশবাণীর ‘বিজ্ঞানরসিকের দরবারে’ শিরোনামে অনুষ্ঠান হত। কোনো একদিনের অনুষ্ঠানে কলকাতার স্বনামখ্যাত পাঁচজন জ্যোতিষীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট কোষ্ঠী বিচারের জন্য। পাঁচ জ্যোতিষীই জানতেন এই কাজটি করতে শুধুমাত্র তাঁকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যদিও ট্যবলেট বিক্রেতা এক স্বনামধন্য লাল জ্যোতিষী ছাড়া বাকি চারজন জ্যোতিষী আকাশবাণীতে গিয়েছিলেন নিজেকে যথার্থ ‘ভবিষ্যৎদ্রষ্টা’ প্রমাণ করতে। চারজন জ্যোতিষীকে চারটি ভিন্ন ঘরে বসতে দেওয়া হয়েছিল একই ব্যক্তির কোষ্ঠী দিয়ে। নির্দিষ্ট সময়ে চারজন জ্যোতিষীর কাছ থেকে একই ব্যক্তির চারটি কোষ্ঠী জমা নেওয়ার পর দেখা গেল চার ধরনের বিচার। কারোর সঙ্গে কারোর মিল নেই। এখানেই শেষ নয় বিস্ময়ের। সেই কোষ্ঠীর জাতক ছিলেন একজন মৃত শিশুর। সেই মৃত শিশুর কোষ্ঠী দেখে জ্যোতিষীরা বলেছিলেন যে জাতকের কবে বিয়ে হবে, কবে চাকরি হবে, কবে ফাড়াইত্যাদি ইত্যাদি হাস্যকর কথাবার্তা।

    ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে যে কজন জ্যোতিষীর কাছে সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করেছিল–নির্বাচনে জিতে কোন্ দল আসছে? সব জ্যোতিষী একবাক্যে বলেছিল –বিজেপিই বিপুল আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসছে। জ্যোতিষীদের মিথ্যা প্রমাণ করিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস আসন নিয়ে ক্ষমতায় তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতা চলে এলো। বিশ্বজুড়ে করোনা ‘অতিমারি’-র কোনো পূর্বাভাস একজন জ্যোতিষীও দিতে পারেনি।

    এরকম ঘটনার ঝুড়ি ঝুড়ি উল্লেখ করা যায়। তাতে লাভ কিছু নেই। মানুষ যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে, জ্যোতিষ এবং জ্যোতিষী যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে। আমরা বরং দেখার চেষ্টা করি জ্যোতিষ আসলে কী? জ্যোতিষ কি শাস্ত্র? নাকি বিজ্ঞান? প্রচুর বিতর্ক, প্রচুর লেখালেখি হয়েছে এ বিষয়ে। তবুও আমি আমার মতো চেষ্টা করি। বোঝার এবং বোঝাবার।

    ‘জ্যোতির্বিদ্যা’(Astronomy) আর ‘জ্যোতিষবিদ্যা’(Astrology) কি একই বিষয়? না, একই বিষয় নয় তো! যদিও উচ্চারণের দিক থেকে দুটি শব্দ খুবই কাছাকাছি। অর্থ কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত। জ্যোতিষবিদ্যা যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরা জ্যোতিষী এবং জ্যোতির্বিদ্যা যাঁরা চর্চা করেন তাঁরা জ্যোতির্বিদ। জ্যোতিষী হলেন কিরো, ভৃগু, পরাশর, অমুক সম্রাট, তমুক সমুদ্ররা। এঁরা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা! অপরদিকে জ্যোতির্বিদ হলেন উইলিয়ম হার্শেল, ভেইনু বাপ্প, মেঘনাদ সাহা, জয়ন্ত বিষ্ণু নার্লিকার, আর্যভট্ট, গ্যালিলিও, কোপারনিকাস প্রমুখ। এঁরা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা নন। জ্যোতির্বিদ্যার বিষয় সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ছায়াপুঞ্জ, উল্কা, ধূমকেতু। জ্যোতিষবিদ্যার বিদ্যার বিষয় হাত-পা-মুখ-কপাল গুনে ব্যক্তির ভূত-ভবিষ্যত বলে দেওয়া। জ্যোতির্বিদ্যায় সূর্যের চারপাশে পৃথিবী সহ অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহরা ঘুরপাক খায়। জ্যোতিষবিদ্যায় পৃথিবীর চারপাশে সূর্য সহ অন্যান্য গ্রহরা ঘুরপাক খায়। পৃথিবী নামে কোনো গ্রহের অস্তিত্ব নেই। জ্যোতির্বিদ্যায় উপগ্রহ আছে, জ্যোতিষবিদ্যায় কোনো উপগ্রহ নেই। জ্যোতির্বিদ্যায় রাহু ও কেতুর কোনো অস্তিত্ব নেই, জ্যোতিষবিদ্যায় রাহু ও কেতুর অস্তিত্ব প্রবল। মানুষের জীবন উলটপালট করে দেওয়ার বিপুল ক্ষমতা রাখে! জ্যোতির্বিদ্যার গ্রহ বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন, প্লুটো ইত্যাদি। জ্যোতির্বিদ্যার গ্রহরা বালি-পাথর-গ্যাসীয় মহাজাগতিক নিথর বস্তু বিশেষ। জ্যোতিষবিদ্যার গ্রহ সূর্য বা রবি, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, রাহু এবং কেতু। জ্যোতিষবিদ্যার গ্রহরা সবাই দেবতা, তাঁদের কোপে মানুষের ‘সব্বোনাশ’ হয়। জ্যোতিষবিদ্যায় গ্রহরত্ন, গ্রহমূল, অষ্টধাতুর ব্যবহার আছে। জ্যোতির্বিদ্যায় এসবের কোনো ব্যবহারই নেই। জ্যোতিষবিদ্যায় মামলা-মোকদ্দমা জিতিয়ে দেওয়া, বিয়ে হওয়া, পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেওয়া, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার দাবি করে। জ্যোতির্বিদ্যায় এসবের কোনো চর্চা নেই। জ্যোতির্বিদ্যায় পদার্থবিদ্যা, গণিত, দূরবীক্ষণ যন্ত্র প্রয়োজন হয়। জ্যোতিষবিদ্যায় কোনো বিদ্যাই লাগে না– লাগে ব্যক্তির দুর্বলতা খুঁজে বের করার ক্ষমতা, কৌশল-চাতুরতা, সম্মোহনী আর রত্ন-মাদুলি-কবচ গছানোর ক্ষমতা। গ্রহ-নক্ষত্র দেখতে দূরবীক্ষণ যন্ত্র লাগে না, দূরবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়াই বহুদূরে থাকা ভবিষ্যত আর অতীত দেখাই জ্যোতিষীদের কর্মকাণ্ড।

    ভারতে বৈদিক যুগের মাঝামাঝি মায় ব্রাহ্মণ সাহিত্যাদি রচনার যুগ থেকেই জ্যোতির্বিদ্যায় বিশেষ অগ্রগতি হয়েছিল। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ রামশরণ শর্মা বলেন– প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে জ্যোতিষীর ভবিষ্যবিচারের কোনো ইঙ্গিত নেই। হস্তরেখা বিচারের প্রাচীনতম আলোেচনা গরুড়পুরাণে পাওয়া যায়। এ বিষয়ে প্রথম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের ‘বৃহৎসংহিতা’, যে গ্রন্থটির রচয়িতা বরাহমিহির। বরাহমিহির ছিলেন শক জাতিভুক্ত। সেসময় আফগানিস্তান, পাঞ্জাব, সিন্ধু ও রাজপুতানার নিয়ে গঠিত এক বিরাট এলাকা জুড়ে শকস্তান নামের এক রাজ্য ছিল। শকরা ছিল মূলত পূর্ব ইরান থেকে আগত একটি গোত্রগোষ্ঠী।

    অন্য এক কাহিনিতে জানা যাচ্ছে তাঁর বাবার নাম আদিত্যদাস, আদিত্যদাস মানে এখানে সূর্যের দাস। বরাহমিহির ৪৯৯ খ্রিস্টাব্দে উজ্জয়নীর নিকটবর্তী গ্রাম কাপ্তিঠে ব্রাহ্মণদের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন সূর্য দেবতার উপাসক এবং তিনিই বরাহমিহির জ্যোতিষ শিক্ষা দিয়েছিলেন। তবে বরাহমিহির একাধারে জ্যোতির্বিদ এবং জ্যোতিষী। কুসুমপুরা (পাটনা) সফরে যুবক বরাহমিহির জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং গণিতবিদ আর্যভট্টের সাথে দেখা করলেন। তিনি তাকে এতটাই অনুপ্রাণিত করেছিল যে তিনি জ্যোতিষশাস্ত্র এবং জ্যোতির্বিদ্যাকে আজীবন অনুসরণ হিসাবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

    বিক্রমাদিত্যের এই রত্ন ‘বরাহ’ উপাধি পেলেন। কীভাবে পেলেন তার একটা গল্প প্রচলন আছে। রাজকীয় জ্যোতিষ মিহিরের ভবিষ্যদ্বাণী শুনে রাজা বিক্রমাদিত্য অশান্ত ছিলেন। তিনি সুসজ্জিত এবং জনাকীর্ণ আদালতের চারপাশে তাঁকিয়ে বললেন, “এটা কি সত্য হতে পারে?” কোনো উত্তর ছিল না। রাজকীয় জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণীতে শব্দের বাইরে সবাই হতবাক হয়ে যাওয়ায় নীরবতা ছিল। নীরবতা ভঙ্গ করে এবং নিজেই দুঃখের সঙ্গে রাজকীয় জ্যোতিষ এই ভবিষ্যদ্বাণীটির সত্যতা নিশ্চিত করেছিলেন, “গ্রহগুলির অবস্থানটি ১৮ বছর বয়সে রাজপুত্রের মৃত্যুর পূর্বাভাস দেয়।” যদিও রাজা তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। কিন্তু রানি নিজেকে আটকে রাখতে পারেনি এবং বলে ওঠেন– “প্রভু আপনাকে এই ভবিষ্যদ্বাণীটি মিথ্যা প্রমাণিত করতে হবে।” যদিও রাজা তাঁর জ্যোতিষী মিহিরের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখেছিলেন, তবে তিনি পুত্রকে রক্ষা এবং বাঁচাতে প্রতিটি সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন। কিন্তু পূর্বাভাসের দিন, একটি শুয়োর রাজপুত্রকে হত্যা করেছিল। সম্রাটের কাছে এই সংবাদ পৌঁছোলে তিনি মিহিরাকে তাঁর দরবারে ডেকে বললেন, “আমি পরাজিত, তুমি জিতেছিলে, তুমি জিতেছ।” জ্যোতিষী রাজার মতোই দুঃখিত ছিলেন এবং তিনি উত্তর দিলেন– “আমার প্রভু। আমি জিতিনি। এটি জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতিষবিজ্ঞানের জয়!” রাজা বললেন –“এটি যাই হোক না কেন, আমার শ্রদ্ধেয় জ্যোতিষী। এটি আমাকে নিশ্চিত করেছে যে, আপনার বিজ্ঞান সত্য ছাড়া কিছুই নয়। এবং এই বিষয়ে আপনার দক্ষতার জন্য, এখন আমি আপনাকে মাগধ রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার, বরাহর প্রতীক (শুয়োর) দেব। সুতরাং সেই সময় থেকেই মিহির বরাহমিহির নামে পরিচিতি লাভ করে।

    অন্য আর-এক কাহিনি থেকে জানা যায় খনার স্বামী মিহির। সেই মিহিরের বাবা বরাহ। খনা জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী বিদূষী নারী। কথিত আছে, বিক্রমপুরের রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজসভার প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহ তাঁর পুত্রের জন্ম গোষ্ঠী গণনা করে পুত্রের আয়ু এক বছর দেখতে পেয়ে শিশুপুত্র মিহিরকে একটি পাত্র করে সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দেন। পাত্রটি ভাসতে ভাসতে সিংহল দ্বীপে পৌঁছেলে সিংহলরাজ শিশুটিকে লালনপালন করেন এবং খনার সঙ্গে বিয়ে দেন। খনা, বরাহ ও মিহির সকলেই একাধারে জ্যোতির্বিদ ও জ্যোতিষবিদ ছিলেন। একদিন শ্বশুর বরাহ ও স্বামী মিহির আকাশের তারা গণনায় সমস্যায় পড়লে খনা সমস্যার সমাধান বের করে দেন। খনার দেওয়া পূর্বাভাসে রাজ্যের কৃষিজীবীরা উপকৃত হতেন বলে রাজা বিক্রমাদিত্য খনাকে দশম রত্ন হিসাবে নিযুক্ত করেন। এতে বরাহ ও মিহির প্রচণ্ড ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়েন। রাজসভায় প্রতিপত্তি হারানোর ভয়ে প্রতিহিংসায় বরাহের আদেশে মিহির খনার জিভ কেটে দেয়, যাতে খনা কোনোদিন ভবিষ্যদ্বাণী তথা পূর্বাভাস দিতে না না পারে। জিভ কাটার ফলে কিছুকাল পরে খনার অকালমৃত্যু হয়। পরে বরাহ ও মিহিরের নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হতে থাকে– বরাহমিহির।

    ব্রাহ্মণ্য যুগে জ্যোতর্বিদ্যাকে একটি স্বতন্ত্র বিদ্যা হিসাবে গণ্য করত। ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে জ্যোতিষকে বলা হয়েছে ‘নক্ষত্রবিদ্যা’ এবং জ্যোতির্বিদকে ‘নক্ষত্র দর্শক’ বলা হয়েছে। আর্যভট্টই প্রথম ভারতীয় জ্যোতির্বিদ, যিনি পৃথিবীর আহ্নিক গতির কথা বলেন। গ্রিকদের অনেক আগে থেকেই ব্যাবিলনীয়, মিশরীয় এবং ভারতীয়রা ২০০০ বছর ধরে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় আত্মনিয়োগ করে এসেছে। সেই জ্ঞান চর্চা অর্থাৎ জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের পরিপূর্ণ সদব্যবহার গ্রিক বিজ্ঞানীরা করেছেন। গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কখনোই জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় ধর্ম এবং ফলিত জ্যোতিষের প্রতি বেশি গুরুত্ব আরোপ করেনি।

    ভারতের যেমন বরাহ ও মিহিররা একাধারে জ্যোতির্বিদ ও জ্যোতিষবিদ ছিলেন, প্রাশ্চাত্যের কিরো কিন্তু আগ মার্কা জ্যোতিষবিদ। জ্যোতিষবিদ হিসাবেই তাঁর বিশ্বজোড়া খ্যাতি। বলতে গেলে এই কিরোই বিশ্বজুড়ে জ্যোতিষ ব্যাবসার জন্ম দিয়েছে। কিরো, বেনহ্যাম, সেন্ট জারমেইন, নোয়েন জ্যাকুইন এঁরা সকলেই পাশ্চাত্যের জ্যোতিষবিদ। তবে জানা যায়, কিরো ভারত ও মিশর থেকে জ্যোতিষশাস্ত্রের বিরাট জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। কিরোকে একটু জানার চেষ্টা করা যাক। কিরোর প্রকৃত নাম কাউন্ট-লুই হ্যামন। কিরোকে নিয়ে এক কৌতূহলোদ্দীপক গল্প চালু আছে। গল্পটি এরকম –কিরো যখন আমেরিকায় পা দিলেন, তখন তাঁকে যাচাই করার জন্য একটি বিখ্যাত আমেরিকান সংবাদপত্র তাঁর সামনে চারটি হাতের ছাপ রাখা হয় এবং বলা হয়– এই চারটি হাতের ছাপ দেখে তাঁদের সম্পর্কে সঠিক বলে দিতে পারলে আমেরিকায় তাঁর বিরাট খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। আর বলতে না পারলে তাঁকে পরের জাহাজে ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে হবে। কিরো সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। এরপর একে একে চারটি হাতের ছাপ পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রথম তিনজনের পেশা, জীবনের উন্নতি অবনতি সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে বললেন। চতুর্থ হাতের ছাপ দেখে বললেন– “ইনি একজন চিকিৎসক, কিন্তু বিরাট ক্রিমিনাল। তাঁর অপরাধের জন্য ধরা পড়ে জেলে যাবেন। কিন্তু তাঁর ফাঁসির হুকুম হলেও শেষপর্যন্ত ফাঁসি হবে না। জেলখানাতেই তাঁর মৃত্যু হবে।” শেষপর্যন্ত সেই ক্রিমিনাল চিকিৎসকের কী হয়েছিল, তা অবশ্য জানা যায়নি। দ্বিতীয় একটি ঘটনা প্রচলিত আছে। সেই ঘটনাটি এরকম –একবার এক বিখ্যাত নারী গোয়েন্দা মাতাহারির হাত দেখে কিরো বললেন –“তুমি অবিলম্বে এই পেশা ত্যাগ করো। তা না-হলে তোমার মৃত্যু অনিবার্য।” মাতাহারি বলেন– “তোমার কথা আমি মেনে নিতে প্রস্তুত কিরো। কিন্তু এইভাবে মৃত্যুবরণ করা ছাড়া আমার কাছে দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই।” একথা সবাই জানেনে গোয়েন্দা, পুলিশ, সেনা সর্বদাই ঝুঁকির চাকরি, যাঁরা প্রাণ বাজি রেখে প্রতিপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। অনেকেরই মৃত্যু হয়। ঝড়ে কাক মরলে গুণিনের নাম তো ফাটবেই। চাইলে যে কেউ এমন গুণিন হতে পারেন।

    আরিস্টটল মনে করতেন –“বিশ্ব দুটি ভাগে বিভাজিত। (১) পার্থিব, যেখানে পাপে পরিপূর্ণ এবং (২) গাগনিক বা স্বর্গীয়, যেখানে সবই নিখুঁত ও অপরিবর্তনীয়। বিশ্বের কেন্দ্রে আছে অনড় পৃথিবী, আর তাকে কেন্দ্র করে পূর্ব থেকে পশ্চিম ঘুরে চলেছে ৫৬টি গোলক, যেখানে আছে গাগনিক বস্তুগুলি। সবচেয়ে নীচের গোলকে আছে চাঁদ, এই চাঁদই পাপী পৃথিবী এবং পবিত্র স্বর্গীয় অঞ্চলের সীমারেখাকে নির্দেশ করছে।” অ্যারিস্টটলের এই ধারণাই চার্চের মতবাদ হিসাবে প্রচারিত হত। সাধারণ মানুষও এটাই জেনেছিল। এই মতবাদের বিরুদ্ধাচরণ করা মানে ধর্মদ্রোহিতার সমতুল। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ টলেমি চিন্তাবিদ দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ধারণার উপর ভিত্তি করে ভূকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের এক সম্পূর্ণ ছবি সামনে আনেন। তিনি বলেন –অনড় পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সাতটি নিখুঁত গোলক (যথাক্রমে চাঁদ, বুধ, শুক্র, সূর্য, মঙ্গল, বৃহস্পতি এবং শনি) সুসম বৃত্তাকারে আবর্তিত হচ্ছে এবং অষ্টম গোলকে নক্ষত্রের অবস্থান করছে। বহু পরে জ্যোতির্বিজ্ঞানী কোপারনিকাস ১৫৪৩ সালে এক গ্রন্থে বললেন –“পৃথিবী নয়, বিশ্বের কেন্দ্রে আছে সূর্য। সূর্যকে কেন্দ্র করে সমস্ত গ্রহগুলো বৃত্তাকার পথে ঘুরছে।” ইতালির চিন্তাবিদ জিওনার্দো ব্রুনো কোপারনিকাসের এই সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বকে ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় প্রচার করতে থাকলেন। এটা প্রচার করার অপরাধে ব্রুনো অপরাধী সাব্যস্ত হলেন। দীর্ঘ সাত বছর ধরে বিচার চলল এবং বিচারে মৃত্যুদণ্ড আদেশ হল। প্রকাশ্যে জনসমক্ষে ব্রুনোকে দাউদাউ আগুনে পুড়িয়ে মারা হল। সাল ১৬০০। মারা গেলেন জ্যোতির্বিদ, কিন্তু সত্য আজও বেঁচে আছে। সৌরতত্ত্ব আজও সত্যে অটুট। সাল ১৬০৯, জার্মানির জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও বললেন– “কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বটি সঠিক।”

    সভ্যতার উষাকাল থেকে বহুকাল পর্যন্ত জ্যোতিষবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিদ্যার মধ্যে কোনো ফারাক ছিল না। বিষ্ণুপুরাণে চতুর্দশ বিদ্যার কথা বলা হয়েছে– চার বেদ, ছয় বেদাঙ্গ, মীমাংসা, ন্যায়, ধর্মশাস্ত্র এবং পুরাণ। ছয় বেদাঙ্গের মধ্যে জ্যোতিষ অন্যতম। পাণিনীয় শিক্ষায় জ্যোতিষকে বেদপুরুষের দুই চক্ষুরূপে কল্পনা করা হয়েছে –“জ্যোতিষাময়নং চক্ষঃ”। শাস্ত্রজ্ঞরা বলেন –“যে শাস্ত্রের মাধ্যমে আমরা জ্যোতিষ্কসমূহের পরিভ্রমণকাল, তাদের স্বরূপ, সঞ্চার, অবস্থান এবং তৎসম্বন্ধীয় যাবতীয় ঘটনাবলি মানুষের জীবনে তাদের প্রভাব বৈজ্ঞানিকভাবে জানতে পারি তাই জ্যোতিষ।” বোঝাই যাচ্ছে এ জ্যোতিষের প্রবক্তা ব্রাহ্মণ্যবাদ। মানুষের ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দেওয়ার অছিলায় ‘ভগবান সাজার শ্রেষ্ঠ উপায়। বিস্ময়াভূত মানুষদের কাছে জ্যোতিষের আসন ভগবান শ্রদ্ধার। তাই জ্যোতিষচর্চায় পোপ-পাদরি-ব্রাহ্মণদের একচেটিয়া অধিকার।

    ভারতে জ্যোতিষচর্চার সূত্রপাত ঋগবেগের কাল থেকে। ক্রান্তদর্শী ঋষিগণ চন্দ্র সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান বৈচিত্র্য ও তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক খুঁজতে চেয়েছেন। বৈদিক ধর্মকর্ম, যাগযজ্ঞের জন্য কাল নির্ধারণে জ্যোতিষের জ্ঞান থাকা একান্ত অপরিহার্য ছিল। ফলে সূর্য-চন্দ্রের গতি, উত্তরায়ণ-দক্ষিণায়ন বিভাগ, সূর্যগ্রহণ-চন্দ্রগ্রহণ নির্ণয়, মাস-পক্ষ-দিন-তিথি নির্ণয়, পূর্ণিমা-অমাবস্যা, ঋতুবিভাগ প্রভৃতি নির্ণয়ে জ্যোতির্বিদ্যায় জ্ঞান থাকা আবশ্যিক। জ্যোতিষবিদ্যায় হাত-পা-মুখ দেখে ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দেওয়া নয়।

    জ্যোতিষবিদ্যাকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয় –(১) গণিত জ্যোতিষ এবং (২) ফলিত জ্যোতিষ। গণিত জ্যোতিষে জ্যোতিষ্ক পরিবারের অন্তর্গত বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রের স্থান, তাদের গতি ও কার্যকলাপ এবং সে বিষয়ে গাণিতিক সূত্রাবলি অর্থাৎ পাটিগণিত, বীজগণিত, পরিমিতি প্রভৃতি আলোচিত হয়েছে। এই শাখার প্রাচীন এবং অন্যতম মনীষীগণ হলেন প্রথম আর্যভট্ট, বরাহমিহির (গ্রন্থ : পঞ্চসিদ্ধান্তিকা), ব্রহ্মগুপ্ত (গ্রন্থ : ব্ৰহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত), ভাস্করাচার্য (গ্রন্থ : সিদ্ধান্তচূড়ামণি) প্রমুখ। অপরদিকে ফলিত জ্যোতিষ হল গ্রহ-নক্ষত্রাদির জ্যোতিষ্ক পদার্থগুলির আবর্তন ও অবস্থান ভেদে মানবজীবনে তথা পৃথিবীর উপর তাদের অনুসন্ধান এবং তার জন্য শুভাশুভ ফল গণনা। ফলিত জ্যোতিষীর প্রাচীন মনীষীগণ হলেন বিষ্ণুগুপ্ত, জীবশর্মা, দেবস্বামী, যবনাচার্য, সত্যাচার্য, সিদ্ধসেন, পৃথু প্রমুখ। ফলিত জ্যোতিষীর গ্রন্থগুলি হল– বৃহৎবিবাহপটল, পল্লববিবাহপটল, বৃহজ্জাতক, লঘুজাতক, বৃহৎসংহিতা ইত্যাদি। বৃহৎবিবাহপটল, পল্লববিবাহপটল গ্রন্থদুটিতে জ্যোতিষবিদ্যা অনুসারে বিবাহের শুভাশুভ কাল বর্ণিত হয়েছে। ফলিত জ্যোতিষকে বরাহমিহির তিনটি শাখায় ভাগ করেছেন। যেমন–

    (১) তন্ত্র : জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিত। গ্রহগতির আলোচনা গণিতাংশে আছে।

    (২) হোরা বা জাতক : কোষ্ঠী সম্পর্কিত বিভাগ। অহোরাত্র’ শব্দের আদি ও অন্ত্যাক্ষর বাদ দিয়ে ‘হোরা’ শব্দ উদ্ভূত হয়েছে। মানুষের ভাগ্য ও কর্মফল, গ্রহের প্রভাব প্রভৃতি আলোচনা হয়েছে।

    (৩) সংহিতা : সাধারণ জ্যোতিষ বিষয়ক আলোচনা। যেমন –‘বৃহৎসংহিতা’।

    বৃহৎসংহিতা বিষয়বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এক উল্লেখযোগ্য ফলিত জ্যোতিষগ্রন্থ। এই গ্রন্থের আলোচ্য বিষয়গুলি কি তা দেখা যাক–

    (১) রবি প্রভৃতি অষ্টগ্রহের এবং সপ্তর্ষি, ধূমকেতু প্রভৃতির রাশির স্থানান্তর হেতু শুভ ও অশুভ ফল।

    (২) নতুন গ্রহের আগমনে তার প্রভাব, বর্ষফল, বৃষ্টিপাত, উল্কাপাত ও পরিবেশের প্রভাব।

    (৩) বিভিন্ন রত্ন পরীক্ষার বিধান, স্ত্রী ও পুরুষের লক্ষণ, বৈবাহিক নক্ষত্র ও লগ্ন বিষয়ক আলোচনা।

    (৪) পূর্তকর্ম, স্থাপত্য, জাতকশাস্ত্র, অঙ্গবিদ্যা, রাজব্যবহার, বাস্তুবিদ্যা, ভূবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা প্রভৃতি।

    (৫) বিভিন্ন গ্রহ বক্র হলে তার খারাপ ফল কেমন হতে পারে তার বিস্তৃত আলোচনা।

    (৬) গর্গ, পরাশর, কশ্যপ, ভৃগু, বশিষ্ঠ, বৃহস্পতি, মনু প্রমুখ মনীষীদের নাম ও তাঁদের মতামত আছে। পঞ্জিকাগুলি আসলে সেই জ্যোতিষবিদ্যার ফল।

    অতএব জ্যোতিষশাস্ত্র বলতে যা বোঝায় একজন ব্যক্তির বা জাতকের জন্মপত্রিকা অনুশীলনসাপেক্ষে তাঁর চরিত্র ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটা আপাত ধারণা তৈরি করা এবং এই কাজে জাতকের জন্ম সময়ের চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ নক্ষত্রদের অবস্থান পর্যালোচনা করা। জ্যোতিষবিদ্যার এই সাম্প্রতিক সংস্করণ প্রকৃতপক্ষে সুমেরীয় যুগের অপরিণত জ্যোতিষবিদ্যারই ক্রমবিকাশ। জন্মপত্রিকা থেকে একজন ব্যক্তি বা জাতকের ভাগ্য আগাম বলে দেওয়ার ভাবনা জ্যোতিষীয় পদ্ধতি দৃশ্যমান কোনো ঘটনার উপর তৈরি হয়নি, এর উদ্ভব হয়েছিল জন্মকালে গ্রহ-নক্ষত্রদের সঙ্গে জাতকের তৈরি হওয়া এক অদৃশ্য বন্ধনের অলীক কল্পনা থেকে। বস্তুত জ্যোতিষশাস্ত্র গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সভ্যতার ধর্মীয় ভাবনাকে ভিত্তি করে। প্রাচীন মিশর এবং মেসোপটেমিয়ায়

    প্রতিটি গ্রহ-নক্ষত্রকে কোনো-না-কোনো ঈশ্বর বা অতিমানবের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। তাঁরা মনে করতেন, ঐশ্বরিক শক্তিসম্পন্ন এইসব বস্তু সত্ত্বা পার্থিব জীবনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, তাই বুঝি পৃথিবীর প্রাণীজগত এক অদৃশ্য বন্ধনে মহাজাগতিক গ্রহ-নক্ষত্রদের সঙ্গে আবদ্ধ। অবশ্য এখানে প্রাণীজগত বলতে মানুষের জগত বুঝতে হবে। কেননা মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীদের ভাগ্য-গ্রহ-প্রতিকার নিয়ে বিন্দুমাত্রও মাথাব্যথা নেই।

    অপরদিকে জ্যোতির্বিজ্ঞান হল মহাবিশ্ব, মহাবিশ্বের প্রশ্নোত্তর। মহাবিশ্বের অধিকাংশই ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং শূন্যস্থান। তাপমাত্রা–২৭৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এর মধ্যে অনেক দূরে দূরে ভেসে আছে গ্যালাক্সি (Galaxy)। চক্রাকার, ডিম্বাকৃতি, এরকম নানা আকৃতির জ্বলন্ত তারা, গ্যসের পুঞ্জ এবং ধুলোর মেঘের সমন্বয়ে গঠিত তারাজগত। এক একটি তারাজগতে ১০০ কোটি থেকে ৫০ হাজার কোটিরও বেশি তারা আছে। আছে ছায়াপথ, এই ছায়াপথে আছে প্রায় ১০ হাজার কোটি তারা। এই ছায়াপথ, অ্যান্ড্রোমিডা, কোলস্যাক, অশ্বমুণ্ড, বৃহৎ ও ক্ষুদ্র মাজেনিক ক্লাউড ইত্যাদি প্রায় ২৪ টি তারাজগত মিলে তৈরি করেছে একটি মহাতারাজগত। এরকম হাজার হাজার মহারাজগত মহাশূন্যের বিপুল নিকষ কালো অন্ধকারে পুঞ্জে পুঞ্জে অবস্থান করছে। তারাজগতের বিশাল বস্তুপুঞ্জগুলো তাদের নিজ নিজ কেন্দ্রের প্রচণ্ড অভিকর্ষ বলে সারাক্ষণ পাক খেয়েই চলেছে। যে বস্তু তারাজগতের কেন্দ্রের কাছাকাছি তার গতি দ্রুত এবং যে বস্তু প্রান্তবর্তী তার গতি মন্থর। সূর্য তার গ্রহমণ্ডলী নিয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রের চারিদিকে প্রতি সেকেন্ডে ২৫০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে। যাই হোক, এবার আমরা দেখে নিতে পারি জ্যোতিষবিদ্যার জ্যোতিষীবাবুদের গ্রহ আর জ্যোতির্বিদ্যার গ্রহদের চেহারা কেমন। প্রথমেই আসি সূর্যের প্রসঙ্গে। যেটি জ্যোতিষবিদ্যার নক্ষত্র বলা হয় না, বলা হয় গ্রহ।

    সূর্য (Sun): সূর্য একটি জি-ধরণের প্রধান ধারার তারা যার ভর সৌরজগতের মোট ভরের শতকরা ৯৯.৮৬৩২ ভাগ। এর গঠন প্রায় নিখুঁত গোলকের মতো, কিন্তু উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দিকে কমলালেবুর মতো একটু চাপা। এই কমলাকৃতির পরিমাণ প্রতি ৯০ লক্ষ ভাগে এক ভাগ। অর্থাৎ সূর্যের মেরু অঞ্চলীয় ব্যস বিষুবীয় ব্যাসের চেয়ে মাত্র ১০ কিলোমিটার কম। যেহেতু সূর্য প্লাজমা তথা আয়নিত গ্যাস দিয়ে গঠিত, সেহেতু এটি বিষুবীয় অঞ্চলে মেরু অঞ্চলের চেয়ে বেশি বেগে ঘোরে। এই পরিবর্তনশীল বেগকে বলা হয় ব্যাবকলনীয় বেগ। এ ধরনের বেগের কারণ, সূর্যের মধ্যকার পরিচলন এবং কেন্দ্রের চেয়ে পৃষ্ঠের দিকে তাপমাত্রার ঢাল বেশি বাঁকা হওয়ায় ভরের স্থানান্তর। ভূকক্ষের উত্তর মেরু থেকে দেখলে সূর্যের যে বামাবর্তী কৌণিক ভরবেগ পর্যবেক্ষণ করা যায় তার কিছু অংশ এই ভর স্থানান্তরের কারণে পুনর্বণ্টিত হয়। অর্থাৎ এক স্থানের ভরবেগ কমে গিয়ে অন্য স্থানে বেড়ে যায়। এই প্রকৃত ঘূর্ণন বেগের মান হচ্ছে বিষুবীয় অঞ্চলে ২৫.৫ দিন এবং মেরু অঞ্চলে ৩৩.৫ দিন। তবে পৃথিবীর সাপেক্ষে সূর্যের অবস্থান প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে থাকায় আমরা এই আবর্তন বেগের মান পাই ২৮ পার্থিব দিন। দেখা যাচ্ছে, সূর্যের নিজ কক্ষের চারদিকে আবর্তন বেগ খুবই কম, এই ঘূর্ণন বেগ থেকে যে কেন্দ্রাতিগ বলের সৃষ্টি হয় তা সূর্যের পৃষ্ঠ অভিকর্ষের তুলনায় ১৮০ লক্ষ ভাগের এক ভাগ। গ্রহগুলির জোয়ার বলও এ তুলনায় এত নগণ্য যে তারা সূর্যের আকার-আকৃতির কোনো পরিবর্তন করতে পারে না।

    সূর্য একটি পপুলেশন-১ তারা, অর্থাৎ এতে ভারী মৌলিক পদার্থের পরিমাণ বেশি। তারাটির উৎপত্তির পিছনে খুব সম্ভবত আশপাশের এক বা একাধিক অতিনব তারা বিস্ফোরণের ভূমিকা আছে। উল্লেখ্য অতিনব তারা বিস্ফোরণ বিশাল গ্যাসীয় মেঘকে সংকুচিত করার মাধ্যমে নতুন তারা সৃষ্টির সূচনা ঘটাতে পারে। সৌরজগতে সাধারণ পপুলেশন-২ তারার (যাদের মধ্যে ভারী পদার্থ কম থাকে) চেয়ে বেশি ভারী মৌল দেখা যায়। যেমন, ইউরেনিয়াম এবং স্বর্ণ। এই ভারী মৌলগুলো সম্ভবত অতিনবতারা বিস্ফোরণের সময় তাপহারী বিক্রিয়ার মাধ্যমে, অথবা কোনো বৃহৎ দ্বিতীয় প্রজন্ম তারার অভ্যন্তরে নিউট্রন শোষণ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হয়েছিল। পার্থিব গ্রহগুলোর মত সূর্যের কোন নির্দিষ্ট পৃষ্ঠসীমা নেই এবং এর গ্যাসের ঘনত্ব ব্যসার্ধ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সূচকীয় হারে হ্রাস পায়। তথাপি এর প্রায় সুনির্দিষ্ট একটি অভ্যন্তরীন গঠন রয়েছে যা নীচে বর্ণনা করা হবে। সূর্যের ব্যাসার্ধ নির্ণয় করা হয় কেন্দ্র থেকে আলোকমণ্ডলের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত। আলোকমণ্ডল সূর্যের এমন একটি অঞ্চল যার বাইরে গ্যাস এত পাতলা হয়ে যায় যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিকিরণ নিঃসরণ করতে পারে না। এজন্যই দৃশ্যমান আলোয় আমরা সাধারণত সূর্যের আলোকমণ্ডলই দেখি। সূর্যের অভ্যন্তরভাগ সরাসরি দেখা যায় না, সূর্য তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণের প্রতি অনচ্ছ। কিন্তু সৌরকম্পনবিদ্যার মাধ্যমে অভ্যন্তরভাগ সম্পর্কে ধারণা লাভ সম্ভব, ঠিক ভূকম্পনবিদ্যার মতো। ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট তরঙ্গের মাধ্যমে যেমন পৃথিবীর অভ্যন্তরীন গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, ঠিক তেমনই সূর্যের অভ্যন্তরভাগ দিয়ে চলমান অবশাব্দিক চাপ তরঙ্গের মাধ্যমে সূর্যের অভ্যন্তরীন গঠনও জানা সম্ভব। এছাড়া কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমেও সূর্যের অদেখা ভুবন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়।

    সূর্যের কেন্দ্র থেকে শুরু করে মোট ব্যাসার্ধের শতকরা ২০-২৫ ভাগ পর্যন্ত যে অঞ্চলটি আছে তার নাম কোর বা কেন্দ্রভাগ। এই অঞ্চলের ঘনত্ব ১৫০ গ্রাম/ঘনসেন্টিমিটার (জলের ঘনত্বের ১৫০ গুণ) এবং তাপমাত্রা প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ কেলভিন। অথচ সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা মাত্র ৫৮০০ ডিগ্রি কেলভিন। সোহো মহাকাশ মিশন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, সূর্যের কেন্দ্রভাগে ঘূর্ণন বেগ বিকিরণ অঞ্চলের অন্যান্য স্থানের তুলনায় বেশি। এই অঞ্চলে প্রোটন প্রোটন শিকলের মাধ্যমে হাইড্রোজেন সংযোজনের (ফিউশন) মাধ্যমে হিলিয়াম তৈরি হয়। এটিই সূর্যের শক্তির প্রধান উৎস। সূর্যে উৎপাদিত মোট হিলিয়ামের শতকরা মাত্র ২ ভাগ সিএনও চক্র থেকে আসে। কেন্দ্রভাগে সূর্যের মোট শক্তির প্রায় পুরোটাই উৎপাদিত হয়। ব্যাসার্ধের ২৪%–এর মধ্যে ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে সূর্যের মোট শক্তির শতকরা ৯৯ ভাগ উৎপাদিত হয়, ৩০% এর পর আর কোনো ফিউশন বিক্রিয়া দেখাই যায় না। সুতরাং সূর্যের বাকি অংশ কেন্দ্রভাগের শক্তি দিয়েই চলে, কেন্দ্রভাগ থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় শক্তি বাইরের স্তরগুলির দিকে প্রবাহিত হয়। অনেকগুলি স্তর ভেদ করে অবশেষে এই শক্তি আলোকমণ্ডলে পৌঁছোয়, এরপর পদার্থ কণার গতিশক্তি বা সূর্যালোক হিসাবে মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতি সেকেন্ডে ৯.২×১০^৩৭ টি প্রোটন-প্রোটন শিকল বিক্রিয়া ঘটে। প্রতিটি বিক্রিয়ায় যেহেতু ৪টি হাইড্রোজেন মিলে একটি হিলিয়াম তৈরি হয় সেহেতু বলা যায়, প্রতি সেকেন্ডে সূর্য ৩.৭x১০^৩৮ টি প্রোটনকে (প্রায় ৬.২×১০^১১ কিলোগ্রাম) আলফা কণা তথা হিলিয়াম কেন্দ্রিনে রূপান্তরিত করে। সূর্যে মোট মুক্ত প্রোটনের সংখ্যা প্রায় ৮.৯x১০^৫৬ টি। হাইড্রোজেনের সংযোজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে সংযোজিত ভরের শতকরা ০.৭ ভাগ শক্তিতে পরিণত হয়। হিসাব করলে দেখা যায় ভরশক্তি রূপান্তরের মাধ্যমে সূর্যে প্রতি সেকেন্ডে ৪২ লক্ষ মেট্রিক টন শক্তি বিমুক্ত হয়। ভর ধ্বংস হয় না, বরং এই ভরশক্তিতে রূপান্তরিত হয়, যা বিকিরণ হিসাবে মহাশূন্য ছড়িয়ে পড়ে। আইনস্টাইনের ভরশক্তি সমতুল্যতা দিয়ে এটি ব্যাখ্যা করা যায়। তবে কেন্দ্রেভাগের সব স্থানে একই হারে বিক্রিয়াটি ঘটে না। কেন্দ্র থেকে দূরত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এটি পরিবর্তিত হয়। তাত্ত্বিক মডেল থেকে দেখা যায় সূর্যের কেন্দ্রে শক্তি উৎপাদনের পরিমাণ প্রতি ঘন মিটারে ২৭৬.৫ ওয়াট। পরিমাণটি কিন্তু মোটেই বেশি নয়। এই সংখ্যা পারমাণবিক বোমার বদলে আমাদেরকে সরীসৃপদের বিপাক ক্রিয়া ব্যবহৃত শক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। সূর্যের প্রতি একক আয়তনে উৎপাদিত সর্বোচ্চ শক্তিকে খাদ্যশস্যের বর্ধনে ব্যবহৃত সারের ব্যয়িত শক্তির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সূর্য থেকে যে আমরা এত শক্তি পাই তার কারণ এই নয় যে, এই গ্যাসপিণ্ডের প্রতি একক আয়তনে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদিত হয়, বরং এইজন্যে যে সূর্যের আয়তন অনেক বেশি। একক আয়তনে শক্তির পরিমাণ অনেক কম হলেও সমগ্র আয়তনে সংখ্যাটি অনেক বড়ো হয়ে যায়।

    কেন্দ্রভাগের সংযোজন বিক্রিয়া একটি আত্মসংশোধনযোগ্য সাম্যাবস্থায় আছে। বিক্রিয়ার হার যদি একটু বেড়ে যায় তাহলে কেন্দ্রভাগ উত্তপ্ত হয়ে সম্প্রসারিত হতে শুরু করে, এতে গ্যাসের ঘনত্ব কমে যায়, বিক্রিয়া হারও কমে যায়। আবার বিক্রিয়ার হার স্বাভাবিকের চেয়ে কমে গেলে কেন্দ্রভাগ সামান্য সংকুচিত হয়ে গ্যাসের ঘনত্ব বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে বিক্রিয়ার হার আবার বেড়ে যায়। এভাবেই সাম্যাবস্থা রক্ষিত হয়। বিক্রিয়া যেসব উচ্চ শক্তির গামা রশ্মি উৎপন্ন হয় তারা বিকিরিত হওয়ার মাত্র কয়েক মিলিমিটারের মধ্যেই সৌর প্লাজমা দ্বারা আবার শোষিত হয়, এরপর সামান্য নিম্ন শক্তিতে আবার বিকিরিত হয়। এভাবে বিকিরিণ-শোষণের খেলা চলতেই থাকে। এজন্যই সূর্যের কেন্দ্র থেকে পৃষ্ঠে শক্তি পৌঁছোতে অনেক সময় লাগে। কেন্দ্র থেকে পৃষ্ঠে ফোটনের আসতে প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৭০,০০০ বছর লাগে বলে অনুমান করা হচ্ছে। পৃষ্ঠমুখী যাত্রার পথে ফোটন পরিচলন অঞ্চল পার হয়ে শেষে আলোকমণ্ডলে পৌঁছোয়, এই স্তর পেরোলেই অবারিত মহাশূন্য, যাতে দৃশ্যমান আলো হিসাবে ফোটনগুলি ছড়িয়ে পড়ে। কেন্দ্রে উৎপাদিত প্রতিটি রশ্মি সূর্য থেকে পালানোর পূর্বে কয়েক মিলিয়ন দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ফোটনে রূপান্তরিত হয়। সংযোজন বিক্রিয়া গামা রশ্মির পাশাপাশি নিউট্রিনোও উৎপন্ন হয়, কিন্তু গামা রশ্মির মতো তারা পদার্থের সঙ্গে এত মিথস্ক্রিয়া করে না, আসলে মিথস্ক্রিয়া করে না বললেই চলে। সুতরাং উৎপাদিত নিউট্রিনোর প্রায় সবগুলিই তৎক্ষণাৎ সূর্য থেকে পালাতে সক্ষম হয়। অনেক বছর ধরে সূর্য থেকে যে পরিমাণ নিউট্রিনো পাওয়ার কথা তার চেয়ে প্রায় ৩ গুণ কম পাওয়া যাচ্ছিল। এই সমস্যার নাম দেয়া হয়েছিল সৌর নিউট্রিনো সমস্যা। কিন্তু ২০০১ সালে নিউট্রিনো স্পন্দন আবিষ্কৃত হওয়ার পর এর সমাধান হয়েছে। আসলে সূর্য থেকে অনেক নিউট্রিনো আসে, কিন্তু পৃথিবীতে দুরবিনের মাধ্যমে আমরা মাত্র ৩ ভাগের ২ ভাগ নিউট্রিনো সনাক্ত করতে পারি, কারণ পৃথিবীতে আসতে আসতে নিউট্রিনোগুলো স্বাদ পাল্টায়।

    সূর্যের বয়স বের করার কোনো সরাসরি উপায় না-থাকলেও পরোক্ষভাবে তা করা হয়েছে। যেমন পৃথিবীতে প্রাপ্ত সবচেয়ে প্রাচীন প্রস্তর ও উল্কাপিণ্ডের বয়স হচ্ছে ৪৬০ কোটি বৎসর। ধারণা করা হয়, সমগ্র সৌরজগতের সৃষ্টি একই সময়ে। সেক্ষেত্রে সূর্যেরও বয়স হয় একই। সূর্যের ভরের শতকরা ৭৪ ভাগই হাইড্রোজেন, বাকি অংশের মধ্যে ২৫% হিলিয়াম। এছাড়াও আছে উচ্চ ভরসম্পন্ন কিছু বিরল মৌলিক পদার্থ। সূর্যের নাক্ষত্রিক শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে এর শ্রেণি হচ্ছে জি২ভি (G2v)। “জি২’ দ্বারা বোঝায় এর পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা ৫,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি K দ্বারা বোঝায় এর বর্ণ সাদা, অবশ্য পৃথিবীর পরিবেশে বিচ্ছুরণের কারণে এর বর্ণ হলুদ দেখায়। এর বর্ণালি রেখা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় তাতে আয়নিত ও নিষ্ক্রীয় উভয় ধরনের ধাতুর বর্ণালি রয়েছে, এছাড়াও রয়েছে খুব দূর্বল হাইড্রোজেন রেখা। V-বর্ণটি দ্বারা বোঝায়, অন্যান্য অধিকাংশ তারার মতোই সূর্য একটি প্রধান ধারার তারা। অর্থাৎ সূর্য তার প্রয়োজনীয় শক্তি হাইড্রোজেন কেন্দ্রীনকে কেন্দ্রীন সংযোজন প্রক্রিয়ায় হিলিয়াম কেন্দ্রীনে পরিণত করার মাধ্যমে উৎপাদন করে। এছাড়া প্রধান ধারার তারায় hydrostatic balance লক্ষ করা যায়, তথা এরা সম্প্রসারিত বা সংকুচিত হয় না। আমাদের ছায়াপথে ১০০ মিলিয়নেরও বেশি G2 শ্রেণির তারা রয়েছে। সূর্যের সমগ্র আকারের লগারিদমভিত্তিক বিন্যাসের কারণে এই ছায়াপথের ৮৫% তারার চেয়ে এর উজ্জ্বলতা বেশি। অবশ্য আমাদের আকাশগঙ্গার অনেকগুলি তারাই লাল বামন পর্যায়ে রয়েছে। সূর্যের অবস্থান আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে ২৫,০০০– ২৮,০০০ আলোক বর্ষ, আর এই দূরত্বে থেকেই এটি অবিরত ছায়াপথের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে। একবার কেন্দ্রের চারদিক দিয়ে সমগ্র পথ ঘুরে আসতে সূর্যের সময় লাগে ২২৫– ২৫০ মিলিয়ন বছর। এর কক্ষপথীয় দ্রুতি ২১৭ কিমি/সে; এ থেকে দেখা যায় সূর্য ১,৪০০ বছরে এক আলোক বর্ষ দূরত্ব এবং ৮ দিনে এক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক একক (AU) দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। সূর্য একটি তৃতীয় প্রজন্মের তারা, কাছাকাছি কোনো একটি অতি নব তারা থেকে উদ্ভূত অভিঘাত তরঙ্গ এর উৎপত্তিতে একটি চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করেছিল। পুরো সৌরজগতে স্বর্ণ বা ইউরেনিয়ামের মতো ভারী মৌলসমূহের প্রাচুর্য লক্ষ করে চালিকাশক্তি হিসাবে এই ঘটনাটি প্রস্তাব করা হয়েছে। খুব সম্ভবত একটি অতি নব তারার বিবর্তনের সময় ক্রিয়াশীল endergonic কেন্দ্রীন বিক্রিয়া অথবা দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি বৃহৎ তারার অভ্যন্তরে নিউট্রন শোষণের ফলে উদ্ভূত ট্রান্স্যুটেশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে এই মৌলসমূহ সৃষ্টি হয়েছে। এই সূর্যকে বশে রাখার জন্য জ্যোতিষীরা চুনি (রত্ন Ruby) বা তামা/সোনা (ধাতু) বা স্টার রুবি (উপরত্ন) বা বিল্বমূল (মূল) বা মাতঙ্গী (কবচ) বা ১ মুখী/১০ মুখী রুদ্রাক্ষ) ধারণ করার নিদান দিয়ে থাকেন।

    চন্দ্র বা চাঁদ (Moon) : চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ এবং সৌর জগতের পঞ্চম বৃহত্তম উপগ্রহ, কোনোভাবেই গ্রহ নয়। পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে চাঁদের কেন্দ্রের গড় দূরত্ব হচ্ছে ৩৮৪,৩৯৯ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর ব্যাসের প্রায় ৩০ গুণ। চাঁদের ব্যাস ৩,৪৭৪.২০৬ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর ব্যাসের এক-চতুর্থাংশের চেয়ে সামান্য বেশি। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, চাঁদের আরতন পৃথিবীর আয়তনের ৫০ ভাগের ১ ভাগ। এর পৃষ্ঠে অভিকর্ষ বল পৃথিবী পৃষ্ঠে অভিকর্ষ বলের এক-ষষ্ঠাংশ। অর্থাৎ, পৃথিবী পৃষ্ঠে কারও ওজন যদি ১২০ পাউন্ড হয় তাহলে চাঁদের পৃষ্ঠে তার ওজন হবে মাত্র ২০ পাউন্ড। বেরিকেন্দ্র নামে পরিচিত একটি সাধারণ অক্ষের সাপেক্ষে পৃথিবী এবং চন্দ্রের ঘূর্ণনের ফলে যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং কেন্দ্রবিমুখী বল সৃষ্টি হয় তা পৃথিবীতে জোয়ারভাটা সৃষ্টির জন্য অনেকাংশে দায়ী। জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির জন্য যে পরিমাণ শক্তি শোষিত হয় তার কারণে বেরিকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে পৃথিবী-চাঁদের যে কক্ষপথ রয়েছে তাতে বিভব শক্তি কমে যায়। এর কারণে এই দুইটি জ্যোতিষ্কের মধ্যে দূরত্ব প্রতি বছর ৩.৮ সেন্টিমিটার করে বেড়ে যায়। যতদিন-না পৃথিবীতে জোয়ারভাটার উপর চাঁদের প্রভাব সম্পূরণ প্রশমিত হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত চাঁদ দূরে সরে যেতেই থাকবে এবং যেদিন প্রশমনটি ঘটবে সেদিনই চাঁদের কক্ষপথ স্থিরতা পাবে। চাঁদই একমাত্র জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু যাতে মানুষ ভ্রমণ করেছে এবং যার পৃষ্ঠতলে মানুষ অবতরণ করেছে। চাঁদের আবর্তনের পর্যায়কাল এবং তার কক্ষপথের পর্যায়কাল একই হওয়ায় আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের একই পৃষ্ঠ সবসময় দেখতে পাই। চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে ২৭ দিন, ৭ ঘন্টা, ৪৩ মিনিট এবং ১১ সেকেন্ড সময় নেয়, কিন্তু সমসাময়িক আবর্তনের ফলে পৃথিবীর পর্যবেক্ষকরা প্রায় ২৯.৫ দিন হিসাবে গণনা করে। একটি ঘণ্টা আবর্তনের পর্যায়কাল অর্ধেক ডিগ্রি দূরত্ব অতিক্রম করে। চাঁদ পৃথিবীকে যে অক্ষরেখায় পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে আবর্তন করছে, সে অক্ষরেখায় চাঁদ একদিন বা ২৪ ঘন্টায় ১৩° কোণ অতিক্রম করে। সুতরাং পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ চাঁদের সময় লাগে ২৭ দিন, ৭ ঘণ্টা, ৪৩ মিনিট এবং ১১ সেকেন্ড। এই জন্য আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের একই পৃষ্ঠ দেখে থাকি। পৃথিবী থেকে আমরা চাঁদের শতকরা প্রায় ৫৯ ভাগ দেখতে পেয়ে থাকি। চাঁদ আকাশের সবসময় একটি অঞ্চল থাকে তাকে জোডিয়াক বলে। যা ক্রান্তিবৃত্তের প্রায় ৮ ডিগ্রি নীচে এবং গ্রহণরেখা উপরে অবস্থান করে। চাঁদ প্রতি ২ সপ্তাহে একে অতিক্রম করে। পৃথিবী-চন্দ্র সমাহারের অবিরত পরিবর্তন হচ্ছে। চাঁদের আকর্ষণে চাঁদের দিকে অবস্থিত সমুদ্রের জল তার নীচের মাটি অপেক্ষা বেশি জোরে আকৃষ্ট হয়। এ কারণে চাঁদের দিকে অবস্থিত জল বেশি ফুলে উঠে। আবার পৃথিবীর যে অংশে অবস্থিত জল চাঁদের বিপরীত দিকে থাকে, সেদিকের সমুদ্রের নীচের মাটি তার উপরের জল অপেক্ষা চাঁদ কর্তৃক অধিক জোরে আকৃষ্ট হয়। কারণ এই মাটি জল অপেক্ষা চাঁদের বেশি নিকটবর্তী। ফলে সেখানকার জল মাটি থেকে দূরে সরে যায়, অর্থাৎ ছাপিয়ে উঠে। এক্ষেত্রে ফুলে উঠার কাহিনিটিই ঘটে। পৃথিবী যে সময়ের মধ্যে নিজ অক্ষের চারদিকে একবার আবর্তন করে (একদিনে) সে সময়ের মধ্যে পৃথিবীর যে-কোনো অংশ একবার চাঁদের দিকে থাকে এবং একবার চাঁদের বিপরীত দিকে থাকে। এ কারণে পৃথিবীর যে-কোনো স্থানে দুইবার জোয়ার এবং দুইবার ভাটা হয়। তবে জোয়ারভাটার জন্য সূর্যের আকর্ষণও অনেকাংশে দায়ী। তবে অনেক দূরে থাকায় সূর্যের আকর্ষণ চাঁদের আকর্ষণের থেকে কম কার্যকর। সূর্য এবং চাঁদ যখন সমসূত্রে পৃথিবীর একই দিকে বা বিপরীত দিকে অবস্থান করে তখন উভয়ের আকর্ষণে সর্বাপেক্ষা উঁচু জোয়ার হয়, জোয়ারের জল বেশি ছাপিয়ে পড়ে। এই চন্দ্রকে বশে রাখার জন্য মুক্তো (রত্ন Pearl) বা মুন স্টোন (উপরত্ন) বা রূপো (ধাতু) বা ক্ষীরিকা (মূল) বা কমলা (কবচ) বা ২ মুখী (রুদ্রাক্ষ) জ্যোতিষীরা ধারণ করার নিদান দিয়ে থাকেন।

    মঙ্গল (Mars): সৌরজগতের চতুর্থতম গ্রহ হচ্ছে মঙ্গল। মঙ্গল সৌরজগতের শেষ পার্থিব গ্রহ। অর্থাৎ এরও পৃথিবীর মত ভূত্বক আছে। এর অতি ক্ষীণ বায়ুমণ্ডল রয়েছে, এর ভূত্বকে আছে চাঁদের মতো অসংখ্য খাদ, আর পৃথিবীর মতো আগ্নেয়গিরি, মরুভূমি এবং মেরুদেশীয় বরফ। সৌরজগতের সর্ববৃহৎ পাহাড় এই গ্রহে অবস্থিত। এর নাম অলিম্পাস মন্‌স। সর্ববৃহৎ গভীর গিরিখাতটিও এই গ্রহে যার নাম ভ্যালিস মেরিনারিস। মঙ্গলের ঘূর্ণন কাল এবং ঋতু পরিবর্তনও অনেকটা পৃথিবীর মতো। মঙ্গলের ব্যাসার্ধ পৃথিবীর অর্ধেক এবং ভর পৃথিবীর এক দশমাংশ। এর ঘনত্ব পৃথিবী থেকে কম এবং ভূপৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল পৃথিবীর শুষ্ক ভূমির মোট ক্ষেত্রফল থেকে সামান্য কম। মঙ্গল বুধ গ্রহ থেকে বড় হলেও বুধের ঘনত্ব মঙ্গল থেকে বেশি। এর ফলে বুধের পৃষ্ঠতলের অভিকর্ষীয় শক্তি তুলনামূলকভাবে বেশি। মঙ্গল দেখতে অনেকটা লাল রঙের কমলার মতো। এর কারণ মঙ্গলের পৃষ্ঠতলে প্রচুর পরিমাণে আয়রন (৩) অক্সাইডের উপস্থিতি। এই যৌগটিকে সাধারণভাবে রাস্ট বলা হয়। মঙ্গলের পৃষ্ঠ মূলত ব্যাসল্ট দ্বারা গঠিত। মঙ্গলের কিছু কিছু অংশে ব্যাসল্টের চেয়ে সিলিকা জাতীয় পদার্থ বেশি রয়েছে। এই অঞ্চলটি অনেকটা পৃথিবীর অ্যান্ডেসাইট (এক ধরণের আগ্নেয়শিলা) জাতীয় পাথরের মতো। পৃষ্ঠের অনেকটা অংশ সূক্ষ্ণ আয়রন (৩) অক্সাইড যৌগ দ্বারা আবৃত। ধূলিকণা নামে পরিচিত এই যৌগটি অনেকটা ট্যালকম পাউডারের মতো। মঙ্গলের কোনো অভ্যন্তরীণ চৌম্বক ক্ষেত্র নেই। কিন্তু কিছু পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে এর ভূত্বকের কিছু অংশ চুম্বকায়িত হয়ে আছে। চুম্বকীয়ভাবে susceptible খনিজ পদার্থের কারণে সৃষ্ট এই চৌম্বকত্বকে প্যালিওম্যাগনেটিজম বলা হয়। এই প্যালিওম্যাগনেটিজমের ধরন অনেকটা পৃথিবীর মহাসাগরীয় গৰ্ভতলে প্রাপ্ত অলটারনেটিং ব্যান্ডের মতো। গ্রহটির কেন্দ্রীয় অংশটির (core) ব্যাসার্ধ প্রায় ১,৪৮০ কিলোমিটার। এই কেন্দ্রভাগ মূলত লোহা দিয়ে গঠিত, অবশ্য লোহার সঙ্গে ১৫ থেকে ১৭% সালফার রয়েছে বলে জানা যায়। এ হিসাবে মঙ্গলের কেন্দ্রভাগ আয়রন সালফাইড দ্বারা গঠিত, যা অনেকাংশে তরল। এই পদার্থগুলোর ঘনত্ব পৃথিবীর কেন্দ্রে অবস্থিত পদার্থের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। কেন্দ্রের চারদিক ঘিরে সিলিকেট দ্বারা গঠিত একটি ম্যান্টল আছে, যা গ্রহটির অনেকগুলি শিলাসরণ এবং আগ্নেয় প্রকৃতির কাঠামো তৈরিতে মূল ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বর্তমানে ম্যান্টলটি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। মঙ্গলের ভূত্বকের গড় পুরুত্ব ৫০ কিলোমিটার। তবে এই পুরুত্ব সর্বোচ্চ ১২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে দেখা যায়। অন্যদিকে পৃথিবীর ভূত্বকের পুরুত্ব গড়ে ৪০ কিলোমিটার। পৃথিবী এবং মঙ্গল এই গ্রহ দুটির আকৃতির অনুপাত বিবেচনায় আনলে পৃথিবীর ভূত্বক মঙ্গলের ভূত্বক থেকে মাত্র তিনগুণ পুরু। মঙ্গলকে বশে রাখার জন্য জ্যোতিষীরা লাল প্রবাল (রত্ন Coral) বা তামা (ধাতু) বা অনন্ত (মূল) বগলা (কবচ) বা ৩ মুখী (রুদ্রাক্ষ) ধারণ করার নিদান দিয়ে থাকেন।

    বুধ (Mercury): বুধ সৌরজগতের প্রথম এবং ক্ষুদ্রতম গ্রহ। এটি সূর্যের সর্বাপেক্ষা নিকটতম গ্রহ। এর কোনো উপগ্রহ নেই। এটি সূর্যকে প্রতি ৮৮ দিনে একবার প্রদক্ষিণ করে। এর উজ্জ্বলতার আপাত মান–২.০ থেকে ৫.৫ পর্যন্ত হয়ে থাকে। কিন্তু একে পৃথিবী থেকে সহজে দেখা যায় না। কারণ সুর্যের সঙ্গে এর বৃহত্তম কৌণিক পার্থক্য হচ্ছে মাত্র ২৮.৩ ডিগ্রি। কেবল সকাল ও সন্ধ্যার ক্ষীণ আলোয় একে দেখা যায়। গ্রহটি সম্বন্ধে তুলনামূলক অনেক কম তথ্য জানা গেছে। ভৌত বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে বুধ অনেকটা চাঁদের মতো। কারণ এই গ্রহেও রয়েছে প্রচুর খাদ। গ্রহটির কোনো স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডল নেই, নেই কোনো প্রাকৃতিক উপগ্রহ। এর একটি সুবৃহৎ লৌহকেন্দ্র আছে। এই কেন্দ্র কর্তৃক উৎপাদিত চৌম্বক ক্ষেত্র পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের তুলনায় ০.১ শতাংশের বেশি শক্তিশালী। বুধের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা ৯০ থেকে ৭০০ কেলভিনের মধ্যে থাকে। সবচেয়ে উত্তপ্ত স্থান হচ্ছে অর্ধসৌর বিন্দু এবং শীতলতম স্থান হল এর মেরুর নিকটে অবস্থিত খাদসমূহের নিম্ন বিন্দু। বুধ চারটি পার্থিব গ্রহের একটি অর্থাৎ এরও পৃথিবীর মতো কঠিন পৃষ্ঠভূমি আছে। চারটি পার্থিব গ্রহের মধ্যে এর আকার সবচেয়ে ছোটো; বিষুবীয় অঞ্চলে এর ব্যাস ৪৮৭৯ কিলোমিটার। বুধের গাঠনিক উপাদানসমূহের মধ্যে ৭০ শতাংশ ধাতব এবং বাকি ৩০ শতাংশ সিলিকেট জাতীয়। এর ঘনত্ব সৌরজাগতিক বস্তসমূহের ঘনত্বের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ৫.৪৩ গ্রাম/সেমি; পৃথিবী থেকে সামান্য কম। মহাকর্ষীয় সংকোচনের প্রভাব সম্পূর্ণ উদ্ধার করতে পারলে বুধের গাঠনিক উপাদানসমূহের ঘনত্ব আরও বেশি হত। বুধের অভ্যন্তরীণ গঠন বোঝার ক্ষেত্রে এর ঘনত্ব ভাল ভূমিকা রাখতে পারে। পৃথিবীর উচ্চ ঘনত্বের মূল কারণ হচ্ছে মহাকর্ষীয় সংকোচন যার পরিমাণ কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি। বুধ অনেক ছোটো এবং এর কেন্দ্র পৃথিবীর মতো অতটা দৃঢ় ও সংকুচিত নয়। তাহলে বুধের এত উচ্চ ঘনত্বের মূল কারণ হতে পারে, এর কেন্দ্র অনেক বড়ো এবং লৌহসমৃদ্ধ। আধুনিককালে ভূতত্ত্ববিদরা আবিষ্কার করেছেন যে বুধের সমগ্র আয়তনের ৪২ শতাংশই হল এর কেন্দ্র। যেখানে পৃথিবীর কেন্দ্র মাত্র ১৭ শতাংশ কেন্দ্রের চারপাশে ৬০০ কিমি অঞ্চল জুড়ে রয়েছে ম্যানটেল। ধারণা মতে বুধের ভূত্বকের পুরুত্ব ১০০ থেকে ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে। এর পৃষ্ঠতলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এতে প্রচুর সরু ridge রয়েছে যার কয়েকটি প্রায় কয়েকশো কিলোমিটার পর্যন্ত প্রলম্বিত। আমাদের সৌর জগতের অন্যান্য বৃহৎ গ্রহগুলোর যে কোনটির তুলনায় বুধে লৌহের পরিমাণ বেশী। বুধ গ্রহের পৃষ্ঠতলের গড় তাপমাত্রা হচ্ছে ৪৫২ কেলভিন (৩৫৩.৯° ফারেনহাইট, ১৭৮.৯° সেলসিয়াস)। তবে এই মান স্থানভেদে ৯০ কেলভিন থেকে ৭০০ কেলভিনের মধ্যে উঠানামা করে। দেখা যাচ্ছে বুধ পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৬১০ কেলভিন পর্যন্ত উঠানামা করে যেখানে পৃথিবীতে পৃষ্ঠের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৮০ কে পর্যন্ত উঠানামা করতে পারে। এর মূল কারণ বুধের কোন বায়ুমণ্ডল নেই। পৃথিবীর তুলনায় বুধ পৃষ্ঠে সূর্য রশ্মির তীব্রতা ৬.৫ গুণ বেশী। তবে এই সমানুপাতিক সম্পর্কের মধ্যে একটি সৌর ধ্রুবক রয়েছে যার মান ৯.১৩ কিলোওয়াট/বর্গমি.। যদিও বুধ দীর্ঘ ১৭৬ দিনে একবার নিজ অক্ষে আবর্তন করে তথাপি এর একটি অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী এবং আপাতভাবে আঞ্চলিক চৌম্বক ক্ষেত্র আছে। এটি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের ০.১ শতাংশ। বুধের চৌম্বক ক্ষেত্রের উৎপত্তির কারণ পৃথিবীর মতো হতে পারে। বুধ গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র এর চারপাশের সকল সৌরবায়ুকে বিক্ষিপ্ত করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী। প্রকৃতপক্ষে এই চৌম্বক ক্ষেত্র গ্রহটির চারপাশে চুম্বক গোলক নামক একটি আস্তরণের সৃষ্টি করেছে, সৌরবায়ু যাকে অতিক্রম করতে পারে না। চাঁদের সঙ্গে বুধের মূল পার্থক্য এখানেই। চাঁদের চৌম্বক ক্ষেত্র বেশ দুর্বল হওয়ায় কোনো চুম্বক গোলক নেই, যার ফলে সৌরবায়ু চন্দ্রপৃষ্ঠে চলে আসে অতি সহজেই। এহেন বুধকে বশে রাখার জন্য পান্না (রত্ন Emerald) বা ওনেক্স (উপরত্ন) বা রূপো (ধাতু) বা বৃহদ্বারক (মূল) বা ত্রিপুরেশ্বরী (কবচ) বা ৪ মুখী (রুদ্রাক্ষ) জ্যোতিষীরা নিদান দিয়ে থাকেন।

    বৃহস্পতি (Jupiter) : বৃহস্পতি গ্রহ সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে পঞ্চম এবং আকার আয়তনের দিক দিয়ে সৌরজগতের বৃহত্তম। বৃহস্পতি ব্যতিত সৌরজগতের বাকি সবগুলি গ্রহের ভরকে একত্র করলেও বৃহস্পতির ভর তা থেকে আড়াই গুণ বেশি হবে। বৃহস্পতিসহ আরও তিনটি গ্রহ অর্থাৎ শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুনকে একসঙ্গে ‘গ্যাসদানব’ বলা হয়। পৃথিবী থেকে দেখলে বৃহস্পতির আপাত মান পাওয়া যায় ২.৮। এটি পৃথিবীর আকাশে দৃশ্যমান তৃতীয় উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। কেবল চাঁদ এবং শুক্র গ্রহের উজ্জ্বলতা এর থেকে বেশি। অবশ্য কক্ষপথের কিছু বিন্দুতে মঙ্গল গ্রহের উজ্জ্বলতা বৃহস্পতির চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। সুপ্রাচীনকাল থেকেই গ্রহটি জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও জ্যোতিষীদের কাছে পরিচিত ছিল। বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রচুর পৌরাণিক কাহিনী। এবং ধর্মীয় বিশ্বাসও আবর্তিত হয়েছে বৃহস্পতিকে কেন্দ্র করে। রোমানরা গ্রহটির নাম রেখেছিল পৌরাণিক চরিত্র জুপিটারের নামে। জুপিটার রোমান পুরাণের প্রধান দেবতা। এই নামটি প্রাক-ইন্দো-ইউরোপীয় ভোকেটিভ কাঠামো থেকে এসেছে যার অর্থ ছিল আকাশের পিতা। গ্রহটিকে ঘিরে এবটি দুর্বল গ্রহীয় বলয় এবং শক্তিশালী ম্যাগনেটোস্ফিয়ার রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে কমপক্ষে ৬৩টি উপগ্রহ যাদের মধ্যে চারটি উপগ্রহ বৃহৎ আকৃতির। এই চারটিকে গ্যালিলীয় উপগ্রহ বলা হয়। বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের উৰ্দ্ধাংশের গাঠনিক উপাদানের মধ্যে পরমাণু সংখ্যার দিক দিয়ে ৯৩ শতাংশ হাইড্রোজেন ও ৭ শতাংশ হিলিয়াম আছে। আর গ্যাস অণুসমূহের ভগ্নাংশের দিক দিয়ে ৮৬ শতাংশ হাইড্রোজেন এবং ১৩ শতাংশ হিলিয়াম। হিলিয়াম পরমাণুর ভর যেহেতু হাইড্রোজেন পরমাণুর ভরের চারগুণ সেহেতু বিভিন্ন পরমাণুর ভরের অনুপাত বিবেচনায় আনা হলে শতকরা পরিমাণটি পরিবর্তিত হয়। সে হিসাবে বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের গাঠনিক উপাদানের অনুপাতটি দাঁড়ায় ৭৫ শতাংশ হাইড্রোজেন, ২৪ শতাংশ হিলিয়াম এবং বাকি ১ শতাংশ অন্যান্য মৌল। অন্যদিকে অভ্যন্তরভাগ খানিকটা ঘন। এ অংশে রয়েছে ৭১ শতাংশ হাইড্রোজেন, ২৪ শতাংশ হিলিয়াম এবং ৫ শতাংশ অন্যান্য মৌল। বৃহস্পতির ৬৩টি নামকরণকৃত উপগ্রহ রয়েছে– (১) মেটিস (২) অ্যাডরাস্টে (৩) অ্যামালথে (৪) থিব (৫) আয়ো (৬) ইউরোপা (৭) গ্যানিমেড (৮) ক্যালিস্টো (৯) থেমিস্টো (১০) লেডা (১১) হিমালিয়া (১২) লিসিথে (১৩) এলারা (১৪) এস/২০০০ জে ১১ (১৫) কার্পো (১৬) এস/২০০৩ জে ১২ (১৭) ইউপপারি (১৮) এস/২০০৩ জে ৩ (১৯) এস/২০০৩ জে ১৮ (২০) থেলজিনো (২১) ইউয়ান্থে (২২) হেলিকে (২৩) ওর্থোসাই (২৪) লোকাস্টে (২৫) এস/২০০৩ জে ১৬ (২৬) প্র্যাক্সিডাইক (২৭) হার্পালাইক (২৮) মিরিনেমে (২৯) হারমিপ্পে (৩০)। থাইয়োনি (৩১) আনাকে (৩২) হার্সে (৩৩) অ্যাল্টনে (৩৪) কেল (৩৫) টাইগেটে (৩৬) এস/২০০৩ জে ১৯ (৩৭) চালডেনে (৩৮) এস/২০০৩ জে ১৫ (৩৯) এস/২০০৩ জে ১০ (৪০) এস/২০০৩ জে ২৩ (৪১) এরিনোম (৪২) এওয়েডে (৪৩) ক্যালিচোরে (৪৪) ক্যালাইক (৪৫) কারমে বা কার্মে (৪৬) ক্যালিরহ (৪৭) ইউরিডোম (৪৮) প্যাসিথি (৪৯) কোর (৫০) সাইলিন (৫১) ইউকেল্যাড (৫২) এস/২০০৩ জে ১৪ (৫৩) প্যাসিফাই (৫৪) হেজেমোনি (৫৫) আর্কে (৫৬) আইসোনো (৫৭) এস/২০০৩ জে ৯ (৫৮) এস/২০০৩ জে ৫ (৫৯) সিনোপে (৬০) স্পোন্ডে (৬১) অটোনো (৬২) মেগাক্লাইট (৬৩) এস/২০০৩ জে ২। বৃহস্পতিকে বশে রাখার জন্য পীত পোখরাজ (রত্ন Topaj বা Sapphire) বা ইয়োলো টোপাজ (উপরত্ন) সোনা (ধাতু) বা ব্ৰহ্মষষ্ঠী (মূল) বা তারা (কবজ) ৫ মুখী (রুদ্রাক্ষ) জ্যোতিষীরা নিদান দিয়ে থাকেন।

    শুক্র (Venus) : শুক্র গ্রহ সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে সৌরজগতের দ্বিতীয়। এই পার্থিব গ্রহটিকে অনেক সময় পৃথিবীর ‘জমজ বোন গ্ৰহ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়, কারণ পৃথিবী এবং শুক্রের মধ্যে গাঠনিক উপাদান এবং আচার আচরণে বড়ো রকমের মিল আছে। বাংলায় সকালের আকাশে একে ‘শুকতারা এবং সন্ধ্যার আকাশে একে ‘সন্ধ্যাতারা’ বলে ডাকা হয়ে থাকে। শক্রের কোনো উপগ্রহ শুক্রগ্রহে বিশাল পাহাড়, সমতলভূমি ও অনেক আগ্নেয়গিরি আছে। গ্রহটির অন্তঃসংযোগের সময় শুক্র অন্য যে-কোনো গ্রহের তুলনায় পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসে, তখন এ থেকে পৃথিবীর দূরত্ব হয় চাঁদ থেকে পৃথিবীর গড় দূরত্বের প্রায় ১০০ গুণ। ১৮০০ সালের পর থেকে শুক্র গ্রহ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে পৌঁছেছিল ১৮৫০ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে। কখন তাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল ০.২৬৪১৩৮৫৪ জ্যোতির্বিজ্ঞান একক = ৩৯,৫৪১,৮২৭ কিলোমিটার। ২১০১ সালের ডিসেম্বর ১৬ তারিখের পূর্ব পর্যন্ত এটিই হবে শুক্র থেকে পৃথিবীর সর্বনিম্ন দূরত্ব। উক্ত তারিখে গ্রহদ্বয়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব দাঁড়াবে ০.২৬৪৩১৭৩৬ জ্যোতির্বিজ্ঞান একক = ৩৯,৫৪১,৫৭৮ কিলোমিটার। শুক্রকে বশে রাখার জন্য হিরা (রত্ন Daimond) বা হোয়াইট জারকন (উপরত্ন) রূপো (ধাতু) বা রামবাসক (মূল) বা ভুবনেশ্বরী (কবচ) ৬ মুখী/১৩ মুখী (রুদ্রাক্ষ) জ্যোতিষীরা নিদান দিয়ে থাকেন।

    শনি (Saturn) : শনি সৌরজগতের ষষ্ঠতম গ্রহ। এটি সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রহ। সূর্যের দিক থেকে এর অবস্থান ষষ্ঠ। হিন্দু পৌরাণিক দেবতা শনির নামানুসারে এই গ্রহের নামকরণ করা হয়েছে। রোমান দেবতা Saturn নামানুসারে ইংরেজি নামটি গ্রহণ করা হয়েছে। নিরক্ষীয় এলাকায় এর ব্যাস ১২০৮০ কিলোমিটার। সূর্য থেকে এর গড় দূরত্ব ১৪৭,২০,০০,০০০ কিলোমিটার। মেরু অঞ্চলের ব্যাস ১০৯০০০। এর ঘনত্ব জলের ০.৬৮ গুণ। সূর্যপ্রদক্ষিণকাল ২৯.৪৬ পার্থিব বৎসর। এটি নিজ অক্ষের উপর একবার আবর্তিত হতে সময় নেয় ১০ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট ২৪ সেকেন্ড। এই গ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে পাথুরে উপকরণ। মধ্য ও উপরিভাগের অধিকাংশই হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম দিয়ে তৈরি। এর সঙ্গে আছে জল, মিথেন এবং অ্যামোনিয়া। আর এই গ্রহকে ঘিরে রয়েছে বিস্তৃত বলয়। শনির উপরিভাগের ৭০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত মেঘরাশির উপর থেকে এই বলয়ের শুরু এবং তা প্রায় ৭৪০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বলয়রাশির ভিতর বিভিন্ন পরিমাপের ফাঁকা জায়গা আছে। এই ফাঁকা স্থানের বিচারে এর বলয়গুলিকে কয়েকটি নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ভাগগুলি হলো- ডি, সি, বি, এ, এফ, জি, ই। এর সবচেয়ে বড় ফাঁকা স্থানের নাম ক্যাসিনি বিভাজন, এর বিস্তৃতির পরিমাণ প্রায় ১২০,৬০০ কিলোমিটার। পক্ষান্তরে এ এবং বি বলয়ের মধ্যকার দূরত্ব প্রায় ৪৮০০ কিলোমিটার। বলয়টি এতটাই বিশাল যে, এর ভেতর একশ কোটি পৃথিবী ভরে রাখার মতো জায়গা আছে। বলয়টির মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বরফ, ধুলাবালি ইত্যাদি ধরা পড়ে। মূলত শনি গ্রহের রয়েছে ১৫০ টিরও বেশি উপগ্রহ, কিন্তু এর মধ্যে নাম দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫৩ টি উপগ্রহের এবং আকার বিবেচনায় ১৮টি উপগ্রহকে মূল উপগ্রহ ধরা হয়। (১) প্যান, (২) ড্যাফনিস, (৩) অ্যাটলাস, (৪) প্রমিথিউস, (৫) প্যান্ডোরা বা প্যানডোরা, (৬) এপিমেথিউস, (৭) জ্যানাস, (৮) এগিয়ন, (৯) মাইমাস, (১০) মেথোনে, (১১) এন্থে, (১২) প্যালেন, (১৩) এনসেলাডাস, (১৪) টেথিস, (১৫) টেলেস্টো, (১৬) ক্যালিপ্সো, (১৭) ডাইয়োনে, (১৮) হেলেন, (১৯) পলিডিউসেস, (২০) রিয়া, (২১) টাইটান, (২২) হাইপেরিয়ন, (২৩) আইয়াপেটাস, (২৪) কিভিউক, (২৫) ইজিরাক, (২৬) ফোবে, (২৭) পালিয়াক, (২৮) স্কাথি, (২৯) অ্যালবাইয়োরিক্স, (৩০) এস/২০০৭ এস ২, (৩১) বেভিওন, (৩২) এরিয়াপাস, (৩৩) স্কল, (৩৪) সিয়ারনাক, (৩৫) তাকেক, (৩৬) এস/২০০৪ এস ১৩, (৩৭) গ্রেয়িপ, (৩৮) হাইরোক্কিন, (৩৯) জারুনসাক্সা, (৪০) তারভোস, (৪১) মানডিলফারি, (৪২) এস/২০০৬ এস ১, (৪৩) এস/২০০৪ এস ১৭, (৪৪) বার্গেলমির, (৪৫) নার্ভি, (৪৬) এস/২০০৪ এস ১২, (৪৭) ফারবাউটি, (৪৮) গ্রাই, (৪৯) এজির, (৫০) এস/২০০৭ এস ৩, (৫১) বেস্টলা, (৫২) এস/২০০৪ এস ৭, (৫৩) এস/২০০৬ এস ৩, (৫৪) ফেনরির, (৫৫) সুরতুর, (৫৬) কারি, (৫৭) ইমির, (৫৮) লোগে, (৫৯) ফোনজোট। সাধারণ মানুষ শনিগ্রহকে খুব ভয় করে। ভয় করার কারণ পুরাণে ভয়ংকর ভয়ংকর সব শনিকে ঘিরে কাহিনি। শনিকে বশে রাখার জন্য নীলা (রত্ন Blue Supphire) বা এমিথিস্ট (উপরত্ন) বা রূপো (ধাতু) বা শ্বেতবেড়েলা (মূল) বা দক্ষিণাকালী (কবচ) বা ৭ মুখী/১৫ মুখী (রুদ্রাক্ষ) জ্যোতিষীরা নিদান দিয়ে থাকেন।

    রাহু (Rahu or Dragon’s head) ও কেতু (Ketu or Dragon’s tail) : জ্যোতিষীরা অবশ্য ‘রাহুর দশা’ ‘কেতুর দশা’ এসব বলে বটে! তাতেই মানুষ থরহরি কম্প! যদিও এখনও পর্যন্ত জ্যোতির্বিদরা রাহু ও কেতুর কোনো অস্তিত্বের কথা বলেননি। তবে এই রাহু-কেতু ব্যাপারটা কী? আমরা জানি যেমন পৃথিবীর কক্ষতলকে বলা হয় পৃথিবীর কক্ষতল, তেমনই চাঁদের কক্ষপথের তলকে বলা হয় চাঁদের কক্ষতল। এই দুই কক্ষতল পরস্পরের সঙ্গে ৫ ডিগ্রি কোণ করে আছে। যার কারণে চাঁদের কক্ষপথ পৃথিবীর কক্ষতলকে দুটি বিন্দুতে ছেদ করে। এই বিন্দু দুটিকে বলে রাহু ও কেতু, জ্যোতিষীরা একে গ্রহ হিসাবে কল্পনা করেন কেন কে জানে! হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিতে রাহু জনৈক দানববিশেষ। বলা হয়েছে দানব বিচিত্তির ঔরসে ও সিংহিকার গর্ভে এঁর জন্ম হয়। উল্লেখ্য, সমুদ্রমন্থন শেষে উত্থিত অমৃত অসুরদের বঞ্চিত করে দেবতারা পান করেছিল। ইনি কৌশলে গোপনে অমৃতপান করতে থাকলে চন্দ্র ও সূর্য এঁকে চিনতে পেরে অন্যান্য দেবতাদের জানান। এই সময় বিষ্ণু সুদর্শন চক্রের রাহুর মাথা কেটে দেন। কিছুটা অমৃত পান করায় এই দানব ছিন্নমস্তক হয়ে অমরত্ব লাভ করেন। এঁর মস্তকভাগ ‘রাহু’ (Head) ও দেহভাগ ‘কেতু’ (Tail) নামে পরিচিত। সেই থেকে রাহু এবং চন্দ্র ও সূর্যের সঙ্গে চিরশত্রুতা শুরু হয়। এরপর থেকে সুযোগ পেলেই রাহু চন্দ্র ও সূর্যকে গ্রাস করার জন্য অগ্রসর হয়। কিছুটা গ্রাস করতে সক্ষম হলেও তার কর্তিত দেহ থেকে চাঁদ বা সূর্য বেরিয়ে আসে। রাহুর এই গ্রাসকালীন সময়ে গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। অর্থাৎ রাহু যখন সূর্যকে গ্রাস করে তখন সূর্যগ্রহণ হয়। অন্যদিকে রাহু যখন চন্দ্রকে গ্রাস করে তখন চন্দ্রগ্রহণ হয়। জ্যোতিষীরা এই মতই বিশ্বাস করেন এবং বিশ্বাস করান। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন সৌরজগতে সূর্যকে ঘিরে উপবৃত্তাকার পথে আবর্তিত হচ্ছে পৃথিবী, আবার পৃথিবীকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে চন্দ্র। চন্দ্র এবং পৃথিবীর এই আবর্তন চলার সময় কখনো-কখনো পৃথিবী, চন্দ্র ও সূর্যের মাঝখানে একই সরল রেখায় অবস্থান নেয়। এই সময় পৃথিবীর মানুষেরা চন্দ্রের আলো দেখতে পায় না। অর্থাৎ, পৃথিবীর ছায়ায় চাঁদ ঢাকা পড়ে যায়। পৃথিবী চাঁদের চেয়ে বড়ো হওয়ায় পৃথিবীর ছায়া চন্দ্রপৃষ্ঠকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে। এই কারণে চন্দ্রগ্রহণের সময় পৃথিবীর কোনো কোনো অংশে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ দেখা যায়। যেখানে সূর্যগ্রহণ পৃথিবীর খুব অল্প জায়গা থেকেই দেখা যায়, সেখানে চন্দ্রগ্রহণ পৃথিবীর সর্বত্র থেকেই দেখা যায়। রাহু গোমেদ (রত্ন Gomed) বা গোয়া গোমেদ (উপরত্ন) বা রূপো (ধাতু) বা শ্বেতচন্দন (মূল) বা ছিন্নমস্তা (কবচ) বা ৮ মুখী/১৫ মুখী (রুদ্রাক্ষ) এবং কেতুকে বৈদুর্যমণি (Cats eye) বা সিসা/রূপো (ধাতু) বা অশ্বগন্ধা (মূল) বা ধূমাবতী (কবচ) বা ৯ মুখী/১৬ মুখী রুদ্রাক্ষ) বশে রাখার জন্য জ্যোতিষীরা নিদান দিয়ে থাকেন।

    জ্যোতিষীগণ মনে করেন এইসব গ্রহদের রশ্মিও আছে। তবে এই রশ্মি নাকি দেখা যায় না। দেখা যায় না, কিন্তু আছে –আধ্যাত্মিক বা Spiritual রশ্মি বলে কথা! দেখা যায় না বটে, কিন্তু জ্যোতিষীরা সেই রশ্মি আবার গুণেও ফেলেছেন। যেমন– রবির ২০টি রশ্মি, মেষের ৮টি, মঙ্গলের ১০টি, বুধের ১০টি, বৃহস্পতির ১২টি, শুক্রের ১৪টি, শনির ১৬টি ইত্যাদি। এমন রশ্মির কথা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন না। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন আলফা, বিটা, গামা, কসমিক ইত্যাদি মহাজাগতিক রশ্মির কথা। আরও আছে জ্যোতিষীদের ব্যাপার স্যাপার। যেমন গ্রহদের স্বক্ষেত্র বা বাসস্থান বা জন্মভূমিও আছে। যেমন ধরুন–(১) সূর্য বা রবির স্বক্ষেত্ৰ কলিঙ্গ (বর্তমানে ওডিশা), (২) চন্দ্রের যবন দেশ (গ্রিস?), (৩) মঙ্গলের অবন্তী, (৪) বুধের মগধ (পাটনা ও গয়া), (৫) বৃহস্পতির সিন্ধুদেশে, (৬) শুক্রের ভোজকটকে, (৭) শনির সৌরাষ্ট্রে (বর্তমানে গুজরাট), (৮) রাহুর অম্বর অথবা সিংহল (বর্তমানে শ্রীলঙ্কা) এবং (৯) কেতুর (না, জন্মভূমির খোঁজ পাওয়া যায়নি)। মহাকাশের বেশির ভাগ গ্রহদের জন্মস্থান ভারতেই? মহাকাশের বাকি অংশে শূন্য কেন?

    জ্যোতিষীয় ব্যাবসার ক্ষেত্রে মূল যে চারটি বিষয় জ্যোতিষীরা মাথায় রাখেন, সেগুলি হল– (১) গ্রহ, (২) নক্ষত্র, (৩) গণ (৪) রাশি এবং (৫) লগ্ন। একটু দেখে নেওয়ার চেষ্টা করব এগুলি কী বস্তু। জ্যোতিষীদের জন্য খুবই প্রয়োজন জন্মরাশি, জন্মলগ্ন, জন্মনক্ষত্র। এতেই জাকতের আমৃত্যু হালহকিকৎ বলে দেওয়া সম্ভব– এটা জ্যোতিষীদের দাবি এবং মানুষের প্রশ্নহীন বিশ্বাস। জন্মরাশি, জন্মলগ্ন, জন্মনক্ষত্র –এগুলি কী? নবজাতকের জন্মক্ষণে চন্দ্র যে রাশিতে থাকে তাকে জন্মরাশি বলে। নবজাতকের জন্মক্ষণে পূর্ব আকাশে যে রাশি দেখা যায় তাকে জন্মলগ্ন বলে। নবজাতকের জন্মক্ষণে চন্দ্রের সবচেয়ে কাছাকাছি উজ্জ্বলতম নক্ষত্রকে জন্মনক্ষত্র বলে।

    আগেই উল্লেখ করেছি জ্যোতিষীদের গ্রহের কথা। রবি, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র। শনি, রাহুও গ্রহ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আবার ইউরেনাস, নেপচুন, প্লুটো মায় পৃথিবী গ্রহ নয়। রইল এখন নক্ষত্র– যে বারটি রাশির কথা আগে বলা হয়েছে, সেগুলি বেষ্টন করে ২৭ টি নক্ষত্র রয়েছে। ৩৬০ ডিগ্রিতে যদি ২৭ টি নক্ষত্র থাকে তবে এক-একটি নক্ষত্রের ব্যপ্তি ১৩ ডিগ্রি ২০ মিনিট করে অর্থাৎ মেষরাশির শুরু থেকে ১৩ ডিগ্রি ২০ মিনিট অন্তর পর পর একটি করে নক্ষত্র রয়েছে। ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে নক্ষত্র হল চন্দ্রপথের ২৭টি ভাগের প্রতিটির নাম। নক্ষত্রগুলির নাম ও সংখ্যা হল– (১) অশ্বিনী, (২) ভরণী, (৩) কৃত্তিকা, (৪) রোহিণী, (৫) মৃগশিরা, (৬) আদ্রা, (৭) পুনর্বসু, (৮) পুষ্যা, (৯) অশ্লেষা, (১০) মঘা, (১১) পূর্বফাল্গুনী, (১২) উত্তরফাল্গুনী, (১৩) হস্তা, (১৪) চিত্রা, (১৫) স্বাতী, (১৬) বিশাখা, (১৭) অনুরাধা, (১৮) জ্যেষ্ঠা, (১৯) মূলা, (২০) পূর্বাষাঢ়া, (২১) উত্তরাষাঢ়া, (২২) শ্ৰবণা, (২৩) ধনিষ্ঠা, (২৪) শতভিষা, (২৫) পূৰ্ব্বভাদ্রপদ, (২৬) উত্তরভাদ্রপদ এবং (২৭) রেবতী। এই ২৭টি নক্ষত্রের প্রত্যেকটির একটি করে অধিপতি গ্রহ আছে। এই গ্রহগুলির ক্রম হল– কেতু, শুক্র, রবি, চন্দ্র, মঙ্গল, রাহু, বৃহস্পতি, শনি ও বুধ। অর্থাৎ অশ্বিনীর অধিপতি গ্রহ কেতু, ভরণী নক্ষত্রের অধিপতি গ্রহ শুক্র, কৃত্তিকার অধিপতি গ্রহ রবি ইত্যাদি।

    বিয়ের ব্যাপারে একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়। পাত্র বা পাত্রীর কী গণ। বস্তুত এই গণ তিন রকমের হয়– (১) দেবগণ, (২) নরগণ, (৩) দেবারিগণ বা রাক্ষসগণ। কী গণ সেটা নির্ভর করবে পাত্র বা পাত্রীর কোষ্ঠীতে চন্দ্র কোন্ নক্ষত্রে আছে তার উপরে। চন্দ্র যে যে নক্ষত্রে থাকলে ঐ তিন গণ হয় সেটা নীচে দেওয়া হল–

    (১) দেবগণ : অশ্বিনী, মৃগশিরা, পুনর্বসু, পুষ্যা, হস্তা, স্বাতী, অনুরাধা, শ্রবণা ও রেবতী।

    (২) নরগণ : ভরণী, রোহিণী, আদ্রা, পূর্বফাল্গুনী, উত্তরফাল্গুনী, পূৰ্বাষাঢ়া, উত্তরাষাঢ়া, পূর্বভাদ্রপদ ও উত্তরভাদ্রপদ।

    (৩) রাক্ষসগণ : কৃত্তিকা, অশ্লেষা, মঘা, চিত্রা, বিশাখা, জ্যেষ্ঠা, মূলা, ধনিষ্ঠা ও শতভিষা।

    সূর্যের গতিপথকে যেমন ১২ ভাগে ভাগ করে প্রতি ভাগের নাম রাখা হয়েছে রাশি, তেমনই চন্দ্রপথকে ২৭ ভাগে ভাগ করে প্রতি ভাগের নাম রাখা হয়েছে। নক্ষত্র। বিভিন্ন দেশে এই চন্দ্রনিবাসসমূহের নাম বিভিন্ন। যেমন গ্রিসে এই ধরনের কোনো চন্দ্রনিবাসের কল্পনাও করা হয়নি। সাধারণত দেখা যায় ২.২৫ নক্ষত্রে এক রাশি হয়। আগেই বলা হয়েছে যে ১২টি রাশি ২৪ ঘণ্টায় ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে আসছে। অর্থাৎ একটি রাশি সরে গিয়ে পরের রশিটি উদয় হতে সময় লাগে ২ ঘণ্টা। এই রাশিগুলি মেষ থেকে শুরু হয় এবং এক-একটি রাশির ব্যাপ্তি ৩০ ডিগ্রি করে। সাধারণত পূর্ব ভারতে যে পদ্ধতি অনুসরণ করে এই রাশিগুলিকে সাজানো হয় মেষ থেকে শুরু করে বামাবর্তে (anti clockwise) পরপর এগিয়ে যেতে হবে। রাশিগুলি হল– মেষ (Aries), বৃষ (Taurus), মিথুন (Gemini), কর্কট (Cancer), সিংহ (Leo), কন্যা (Virgo), তুলা (Libra), বৃশ্চিক (Scorpio), ধনু (Sagittarius), মকর (Capricorn), কুম্ভ (Aquarius) ও মীন (Pisces)। এই রাশিগুলির প্রত্যেকটির একটি করে অধিপতি গ্রহ বা lord আছে। যেমন– মেষ ও বৃশ্চিকের অধিপতি মঙ্গল, বৃষ। ও তুলার অধিপতি শুক্র, মিথুন ও কন্যার অধিপতি বুধ, কর্কটের অধিপতি চন্দ্র, সিংহের অধিপতি রবি, ধনু ও মীনের অধিপতি বৃহস্পতি এবং মকর ও কুম্ভের অধিপতি শনি। যেটা দাঁড়াল তা হল মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনি– এদের প্রত্যেকটির দুটি রাশির উপর আধিপত্য আছে। কিন্তু চন্দ্র ও রবি কেবল একটি করে রাশিরই অধিপতি। রাহু ও কেতু কোনো রাশির অধিপতি নয়। তবে তাদের বলাবল নির্ণয়ের জন্য কয়েকটি রাশিকে তাদের স্বক্ষেত্র, মূলত্রিকোণ ও তুঙ্গস্থান হিসাবে ধরা হয়। আকৃতি ও গুণ অনুযায়ী রাশিগুলিকে অগ্নি, পৃথ্বী, বায়ু, জল এই চারভাগে ভাগ করা হয়। আবার চর, স্থির ও দ্যাত্মক এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়। মেষ থেকে শুরু করে রাশিগুলিকে অগ্নি, পৃথ্বী, বায়ু, জল অথবা চর, স্থির, দ্যাত্মক হিসাবে পর পর ভাগ করে যেতে হবে। অর্থাৎ মেষ, সিংহ, ধনু হল অগ্নি রাশি (Fiery Signs); বৃষ, কন্যা, মকর পৃথ্বী রাশি (Earthly Signs); মিথুন, তুলা, কুম্ভ বায়ু রাশি (Airy Signs) এবং কর্কট, বৃশ্চিক ও মীন জল রাশি (Watery Signs)। অন্য রকম বিভাগে, মেষ, কর্কট, তুলা, মকর চর রাশি (Movable Signs); বৃষ, সিংহ, বৃশ্চিক, কুম্ভ স্থির রাশি (Fixed Signs) এবং মিথুন, কন্যা, ধনু ও মীন দ্যাত্মক রাশি (Common Signs)। ফলাফল বিচারে জ্যোতিষীরা রাশিগুলির এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে অনেক সময় কাজে লাগায়। রাশিগুলির অন্য একটি শ্রেণিবিভাগ হল পুরুষ রাশি (Masculine Signs) ও স্ত্রী রাশি (Feminine Signs)। বিজোড় সংখ্যার যে রাশিগুলি অর্থাৎ মেষ, মিথুন, সিংহ, তুলা, ধনু, কুম্ভ– এই ছয়টি পুরুষ রাশি এবং বৃষ, কর্কট, কন্যা, বৃশ্চিক, মকর ও মীন– এই ছয়টি স্ত্রী রাশি। জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী একজন জাতকের রাশি নির্নয় করা হয় তার জন্মমূহুর্তে সূর্য যে রাশিতে অবস্থান করে। তাদের মতে এই রাশি অনুযায়ী নাকি মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হয়। তাহলে ভুলটা কোথায়! দৈনিক-সাপ্তাহিক পত্রিকায় রাশিফল বিভাগে প্রথম যে রাশিটি আমরা দেখি সেটি হল মেষ রাশি (২১ মার্চ থেকে ২০ এপ্রিল সময়ে জন্মগ্রহণকারীরা এই রাশির জাতক)। বর্তমান শতকে তথা এই সময়ে সূর্য মেষ রাশিতে নয়, মীন রাশিতে অবস্থান করে। এই গোলমাল অবশ্যই অন্য রাশির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই গোলমালের মূল কারণ হল পৃথিবীর ‘অয়নচলন’। বিষুববৃত্ত ও ক্রান্তিবৃত্ত ২৩.৫ ডিগ্রি কোণে পৃথক এবং এই বৃত্ত দুটি পরস্পরকে দুটি বিন্দুতে ছেদ করে। এই বিন্দু দুটিকে বলা হয় মহাবিষুব এবং জলবিষুব বিন্দু। আরও সহজ করে যদি বলি, তা হল ‘খ’ গোলকে এই দুটি বিন্দু হচ্ছে বছরে দু-দিন বিষুববৃত্তের উপর সূর্যের অবস্থান। এই দুই দিন হল ২১ মার্চ (দিন ও রাত্রি সমান) এবং ২৩ সেপ্টেম্বর। মহাবিষুব বিন্দুকে ক্রান্তিবৃত্তের শূন্য ডিগ্রি বিন্দু বা প্রারম্ভ বিন্দু ধরা হয়। এই কারণেই ২০০০ বছর আগে ২১ মার্চ এই মহাবিষুব বিন্দু হতে পরবর্তী ৩০ ডিগ্রি পর্যন্ত সূর্য মেষ রাশিতে অবস্থান করত বলেই মেষ রাশিকে রাশিচক্রের প্রথম রাশি ধরা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল প্রতিবছর এই বিষুব বিন্দুদ্বয় তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে। প্রতি ৭২ বছরে এই বিন্দু দুটির ১ ডিগ্রি করে অগ্রগমন ঘটে এবং বর্তমান অবস্থায় ফিরে আসতে তাদের লাগবে ঠিক ২৬ হাজার বছর। বিষুব বিন্দুদ্বয়ের এই চলনকেই বলে ‘অয়নচলন’ কেন এমনটি ঘটে? এর কারণ হল পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের স্বল্প গতির ঘূর্ণন। পৃথিবী যেমন নিজ অক্ষে ঘুরে চলছে, তেমনই এর ঘূর্ণন অক্ষটিও নিজ অবস্থান থেকে নিয়মমতোই সরে যাচ্ছে। এই ঘূর্ণন অক্ষটি প্রতি ২৬ হাজার বছরে একবার পূর্ণ ঘূর্ণন সম্পন্ন করে। পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের এই সরণের ফলে ক্রান্তিবৃত্তেরও সরণ ঘটছে এবং এর ফলেই বিষুব বিন্দুদ্বয়ের “অয়নচলন ঘটছে। ঘূর্ণন অক্ষের সরণের ফলে কিছু চমকপ্রদ ঘটনাও ঘটে। যেমন উত্তর আকাশে বর্তমানে যে স্থানে ধ্রুবতারা। দেখি ১৩ হাজার বছর পর সেখানে বীণা মণ্ডলের অভিজিৎ নক্ষত্রটিকে দেখা যাবে এবং এরও ১৩ হাজার বছর পর সেখানে পুনরায় ধ্রুবতারাকে দেখা যাবে। তাহলে এখন প্রশ্ন হল অয়নচলনের সঙ্গে রাশিচক্রের রাশির অবস্থান পরিবর্তনের সম্পর্কটা কী? আজ থেকে ২০০০ বছর আগের কোনো একসময় রাশিচক্র তৈরি হয় তখন সূর্য ২১ মার্চ তারিখে সূর্য মেষ রাশিতে প্রবেশ করত, যা টলেমির ‘টেট্রাবিবলস’ থেকে জানা যায়। টলেমে তাঁর ‘টেট্রাবিবলস’-এ। বলেছেন “সূর্য তখন ২১ মার্চ তারিখে মেষ রাশিতে প্রবেশ করে এবং ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করত। কিন্তু আজ ২০০০ বছর পর মহাবিষুব বিন্দুর প্রায় ২৭ ডিগ্রি সরণের ফলে সূর্য এখন ২১ মার্চ মীন রাশিতে (নক্ষত্রমণ্ডল) প্রবেশ করে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করে এবং ১৪ এপ্রিলে গিয়ে সূর্য মেষ রাশিতে প্রবেশ করে। রাশিচক্রের অন্যান্য রাশির ক্ষেত্রে একই অবস্থা এবং রাশিগুলিতে সূর্যের অবস্থানের সময় কালেরও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। যেমন সূর্য কন্যা রাশিতে অবস্থান করে ৪৪ দিন, আবার বৃশ্চিক রাশিতে অবস্থান করে মাত্র ৭ দিন। জ্যোতিষ মতে জন্মমুহূর্তে সূর্যের অবস্থানই মানুষের রাশি নির্ণয় করে। এই শাস্ত্র (?) মতে ১ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী হবে সিংহ রাশির, তবে বর্তমানে এইদিন সূর্য অবস্থান করে কর্কট রাশিতে। জ্যোতিষের সব্বোনাশ এখান থেকেই, অর্থাৎ একই ব্যক্তি একই সঙ্গে আলাদা-আলাদাভাবে দু-ধরনের ভাগ্যর অধিকারী হবেন। এমনকি কারও জন্ম যদি ২৯ নভেম্বর থেকে ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে হয়, তাহলে তার জন্য বর্তমানে রাশিচক্রের কোনো রাশিই বরাদ্দ নেই। কারণ এইসময় সূর্য সর্পধারী নক্ষত্রমণ্ডলে (ophiucus) অবস্থান করে। তাই কারও সঙ্গে যদি পত্রিকার রাশিফল বা কোনো জ্যোতিষীর ভবিষৎবাণী কাকতালীয় ভাবে মিলেও যায়, তাহলে তৃপ্তির পাওয়ার কিছু নেই, কারণ আপনি নিজেকে যে রাশির জানেন আদতে আপনি মোটেও সেই রাশির নন।

    জ্যোতিষীদের ভাগ্যগননার আর-একটি বড় উপাদান হল গ্রহ ও তাদের অবস্থান। জ্যোতিষ মতে গ্রহ-নক্ষত্রদের সময় ভেদে অবস্থানের উপরেই নাকি অর্থপ্রাপ্তি, ব্যাবসার লাভ-ক্ষতি, মামলা-মোকদ্দমায় হারা-জেতা, সংসারে শান্তি ফিরিয়ে আনা, স্বামীর পরস্ত্রীতে অনাসক্ত হওয়া, বিদেশ গমন, দুরারোগ্য অসুখ নিরাময়, প্রেমে জয়ী হওয়া, না-হওয়া বিয়ে হওয়া, পরীক্ষায় পাশ/ফেল ছাড়াও ইহ জাগতিক সকল কর্মই নির্ভর করে। তাহলে এখন খালি চোখে তাদের দাবিগুলির আসড়তাটা স্পষ্ট হয়। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত গ্রহের সংখ্যা হাজারেরও উপরে। আর সেখানে জ্যোতিষীদের গণনায় আছে শুধুমাত্র প্রাচীন পৃথিবীর আবিষ্কৃত সেই ৫টি গ্রহ। আর ইউরেনাস ও নেপচুনকে তাদের এই গণনায় খুঁজে পাওয়া না গেলেও রাহু কেতু নামে দুটি কাল্পনিক গ্রহকে তাদের গণনায় পাওয়া যায়, সে তো আগেই বলেছি। মহাবিশ্বের এত গ্রহের মাঝে জ্যোতিষীরা গ্রহ স্বল্পতায় পরে সূর্যকে একটি গ্রহ হিসেবেই বিবেচনা করে! বাস্তবিক অর্থে গ্রহনক্ষত্রগুলির কোনো শক্তি বা বলের এমন কোনো প্রভাবই নেই, যা মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর পৃথিবীর উপর যদি কোনো বলের প্রভাব থেকে থাকে, তা হল মহাকর্ষীয় বল। তবে গ্রহনক্ষত্রগুলি পৃথিবী থেকে এত দূরে যে তারা পৃথিবীর উপর মহাকর্ষীয় বা অভিকর্ষজনিত যে বল বা শক্তি প্রয়োগ করে তার পরিমাণ অতি নগণ্য। তাই কারও জন্মমুহূর্তে গ্রহনক্ষত্রের আকর্ষণ বলের ক্রিয়া জন্মগ্রহণকারীর ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনটি ভাবার কোনো যুক্তি নেই। প্রাচীনকালে মানুষ আকাশের বিভিন্ন অংশের এলোমেলো নক্ষত্রগুলির মাঝে তাদের ঘটমান জীবনের পরিচিত বিষয়ের সঙ্গে সাদৃশ্য খোঁজ করত বলেই কোনো নক্ষত্রমণ্ডলকে মেষের মতো আবার কোনো নক্ষত্রমণ্ডলকে কন্যা ইত্যাদি রূপে কল্পনা করেছিল। তাই বর্তমান সময়ে নক্ষত্রমণ্ডলগুলির নাম ও কল্পিত চিত্রগুলি তাদের মতোই রয়ে গিয়েছে। অবশ্য অন্য কিছু খুঁজেও পেতে পারি।

    বাকি রইল লগ্ন। প্রতিটি লগ্নের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে জ্যোতিষের বইগুলিতে অনেক বিস্তৃত ভাবে লেখা আছে। কোষ্ঠী বিচারের ক্ষেত্রে জ্যোতিষীরা লগ্ননির্ণয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। জ্যোতিষীদের মতে বারোটি পরপর পূর্ব দিগন্তে উদিত হয় এবং ক্রমাগত পশ্চিমগামী হয়ে অবশেষে পশ্চিম দিগন্তে অস্ত যায়। আসলে পৃথিবীর আবর্তনের জন্যই এরকম মনে হয়। যেহেতু পৃথিবী ২৪ ঘণ্টায় একবার আবর্তন সম্পূর্ণ করে। সেই কারণেই পূর্বদিকে এক-একটি রাশির স্থায়িত্বকাল ২ ঘণ্টা। সকাল ৬ টায় পূর্বদিকে যদি মেষ রাশি উদয় হয় তবে সেটি ৮ টা পর্যন্ত থাকবে, ৮ টা থেকে ১০ টা পর্যন্ত পূর্বদিকে থাকবে বৃষরাশি, ১০ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত পূর্বদিকে থাকবে মিথুন রাশি– এইভাবে দুই ঘণ্টা অন্তর একটি করে রাশি মিলবে, মোট ১২ রাশি। জ্যোতিষ মতে, বৈশাখ মাস থেকে শুরু করে চৈত্রমাস পর্যন্ত সূর্যোদয় মেষ থেকে শুরু করে মীন রাশিতে হবে। যেটি দাঁড়াল– বৈশাখ মাসে সূর্যোদয়ের সময় পূর্বদিকে থাকবে মেষ রাশি, জ্যৈষ্ঠ মাসে সূর্যোদয়ের সময় পূর্বদিকে বৃষ রাশি থাকবে ইত্যাদি। জাতকের জন্মের সময় যে রাশিটি থাকে, সেটিই হল জাতকের লগ্ন, জন্মলগ্ন। তবে এগুলি যে সবার ক্ষেত্রে নির্ভুল ভাবে মিলবে এমন কোনো কথা নয়। গ্রহের বল ও অবস্থান অনুযায়ী বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হতে পারে বলে জ্যোতিষীরা বলে থাকেন। তাই মিলতেও পারে, আবার নাও মিলতে পারে। কারণ কোনো জাতকের চেহারা বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য শুধু লগ্ন কোন রাশিতে তার উপর নির্ভর করে না। বিভিন্ন গ্রহের বল ও অবস্থানের উপর সেটা অনেকাংশেই নির্ভরশীল বলে জ্যোতিষীরা মনে করেন। বস্তুত এই নক্ষত্র, রাশি, মাসই হল জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বিষয়-আশয়। আর জ্যোতিষীরা এইসব গ্রহনক্ষত্র দিয়ে ছলনার কাজে লাগান, প্রতারণার কাজে লাগান, বুজরুকির কাজে লাগান। মানুষজনদের মাথা মোড়াতে সুবিধা হয়। বোঝাতে চায় –দেখো, আমরা কেমন বিজ্ঞানের উপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যদ্রষ্টা। প্রতারণার অভিযোগে চিটফান্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হলে জ্যোতিষীদের গ্রেফতার করা হবে না কেন?

    জ্যোতিষীবাবুদের গ্রহ, নক্ষত্র, রাশি, লগ্নের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

    (১) ১৮ ডিগ্রির এক টুকরো আকাশে যদি ১২ টি রাশি থাকে, তাহলে ৩৬০ ডিগ্রি আকাশে ডিগ্রির আকাশে কত লক্ষ রাশি থাকতে পারে ভাবুন। তবে তো খুব ভয়ানক ব্যাপার, এত লক্ষ লক্ষ রাশির প্রভাব হিসাবে উচিত নয়? জ্যোতিষীবাবুরা কী বলেন এ ব্যাপারে? নিরুত্তর থাকেন।

    (২) জন্মকালে চন্দ্র যে রাশিতে থাকে সেটিই জাতকের রাশি বলা হয়। শুধু চন্দ্র কেন, সৌরজগতে তো আরও অসংখ্য গ্রহ আছে উপগ্রহ আছে –সেগুলি বিচার্য নয় কেন? জ্যোতিষীবাবুরা কী বলেন এ ব্যাপারে? নিরুত্তর থাকেন।

    (৩) জাতকের জন্মসময় কোনটি? এটা বড় গোলমেলে ব্যাপার! কেউ মনে মনে করেন মাতৃজঠরে জ্বণের প্রথম দিন, কেউ মনে করেন মাতৃজঠরে থাকাকালীন যেদিন শরীরে প্রাণসঞ্চার হয়, কেউ মনে করেন যেদিন শিশু মাতৃগর্ভ ত্যাগ বেরিয়ে আসে, আবার কেউ মনে করেন শিশুর নাড়ি কাটার সময়, কেউ আবার এত ঝামেলায় না-গিয়ে চিকিৎসকের দেওয়া সার্টিফিকেটের জন্মসময় গ্রাহ্য করে –এক্ষেত্রে আবার সংশয়, চিকিৎসক বা চিকিৎসা-কর্মীরা যে সময় নথিভুক্ত করেছেন সেটা কতটা অথেনটিক! যাই হোক, জ্যোতিষীবাবুরা কোন জন্মসময় বিচার করে জাতকের কোষ্ঠী বিশ্লেষণ করবেন? ভিন্ন ভিন্ন। সময়কে জন্মসময় ধরলে ভিন্ন কোষ্ঠী বিচার হবে না? হবেই তো। রাশির অবস্থান পালটালে নির্ণয়ও পালটাতে বাধ্য। এক্ষেত্রে অবশ্য জ্যোতিষীবাবুরা বলেন, লগ্ন পরিবর্তনের সন্ধিকাল ব্যতীত লগ্ন-মধ্যবর্তী সময়ে গ্রহ-নক্ষত্রের সন্নিবেশের এমন কিছু তারতম্য হয় না, ফলে রাশি পালটে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ও মা, সে কি কথা! যদি জমজ সন্তান হয়? তাদের কোষ্ঠীবিচার তো একই হবে। মানে তারা একই সময়ে পটি করতে যাবে, একই শিক্ষকের কাছে পড়বে, একইরকম বিদ্বান হবেন, একই ক্লাসে পড়া শেষ করবে, একই জায়গায় একই চাকরি করবে, একই মেয়ে বা ছেলেকে বিয়ে করবে, একই দিনে একই সময়ে একই কারণে মরবে –তাই-ই হবে, জ্যোতিষ বিজ্ঞান হলে। হয় কী? অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় জন্মানোর পরপরই একটি সন্তান মারা যায়। তাহলে একই লগ্ন, একই গ্রহস্থান, একই রাশিচক্র হওয়া সত্ত্বেও দুইজন জাতকের আয়ুষ্কাল দুই রকমের হবে কেন? তাহলে কী পৃথিবীর সকল জমজ জাতকই লগ্ন পরিবর্তনের সন্ধিকালে জন্ম নেয়? জ্যোতিষীবাবুরা কী বলেন এ ব্যাপারে? অবশ্যই নিরুত্তর থাকেন।

    (৪) পুব আকাশে রাশি উদয় হয়–এই বিষয়টি এক্কেবারেই আপেক্ষিক। বস্তুত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্থানীয় সূর্যোদয়কাল বিভিন্ন হওয়ার ফলে পুবদিকে উদিত রাশিটি ভিন্ন হবে। ফলে একই সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জন্মানো জাতকের লগ্ন বিভিন্ন রকমই হবে, কোষ্ঠীও হবে বিভিন্ন। অতএব একই সময়ে জন্মানো সত্ত্বেও আলাদা আলাদা জাতকের আলাদা লগ্নফল এবং কোষ্ঠীচক্র হবে না, তাই তো? জ্যোতিষীবাবুরা কী বলেন এ ব্যাপারে? নিরুত্তর থাকেন।

    (৫) জ্যোতিষীদের যে শাস্ত্র, তা ভূকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বকে মেনে চলে। অর্থাৎ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য সহ সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্ররা ঘুরপাক খাচ্ছে। এ তত্ত্ব তো অচল তত্ত্ব, আস্তাকুড়ে তার ঠিকানা। এই ধরনের তত্ত্ব কে. সি. পালের মতো বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতে পারেন, যারা ভাঙা রেকর্ডের মতো এখনও চলেছেন ‘সূর্য পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে’। এই তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে থাকলে জ্যোতিষকে বিজ্ঞান বলতে অসুবিধা আছে। ভুল হবে রাশি-গ্রহের অবস্থান। সঠিক হবে না রাশিচক্র, কোষ্ঠী-ঠিকুজি। এ তত্ত্ব সঠিক হলে গ্রহ-উপগ্রহগুলিতে মহাকাশযান কিংবা কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানো সম্ভব হত না। ওই তত্ত্ব ভুল, তাই জ্যোতিষ ভুল। জ্যোতিষীবাবুরা কী বলেন এ ব্যাপারে? নিরুত্তর থাকেন।

    (৬) কোষ্ঠী দেখে জ্যোতিষীবাবুরা যোটক বিচার করে। অর্থাৎ পাত্রপাত্রীদের রাজযোটক হলে দাম্পত্যজীবন বড়োই সুখময় হয়!!! যোটক বিচার কাকে বলে? এককথায় –“বিবাহের পূর্বে পাত্র এবং পাত্রীর পরস্পরের জন্মরাশ্যাদি থেকে যে শুভাশুভ বিচার করা হয়, তাকে রাজযোটক বলে”। এই বিচার আট প্রকার, অর্থাৎ আট প্রকারের কূট। কূট’ কথাটির অর্থ জটিল। জ্যোতিষীবাবুরা প্রবল কূট বলে দু-হাতেই আট প্রকারের কূট’ সামাল দিতে পারেন। এই কূটগুলি হল– বর্ণকূট, বশ্যকূট, তারাকূট, যোনিকূট, গ্ৰহমৈত্রীকূট, গণমৈত্রীকূট, রাশিকূট এবং ত্রিনাড়িকূট। এদের আবার ‘গুণ’ আছে। বর্ণকূট’ থেকে ‘ত্রিনাড়িকূট’ পর্যন্ত গুণ হবে ১,২,৩ ইত্যাদি। মোট নম্বর ৩৬-এর মধ্যে ১৮ নম্বর পেতেই হবে, আর তা না-হলে ডাহা ফেল। যদি ৩০-এর উপর নম্বর হয় তাহলে লেটার মার্কস হবে। একটু ‘যোনিকূট’ নিয়ে বিশ্লেষণ করা যাক –যোনি চোদ্দ প্রকার। দুটি করে নক্ষত্র নিয়ে এক-একটি যোনি। অভিজিৎ নক্ষত্রকে ধরে নক্ষত্রের সংখ্যা ২৮। অবশ্য সবকটি যোনিই ইতর-যোনি, অর্থাৎ ঘোড়াযযানি, মোষযযানি, বাঘযোনি, সিংহযোনি, হাতিযোনি, কুকুরযোনি, বেড়ালযোনি, ইঁদুরযোনি, বানরযোনি ইত্যাদি। না, মানুষের জন্য মনুষ্যযোনি নেই। তামাম মনুষ্যকুল ইতর-যোনির অংশ। ছাগল, কুমির, হাঙ্গর, গোরিলা, গোসাপ, শিম্পাঞ্জি, টিকটিকিদের কি যোনি নেই!

    আমার বিয়ের সময় আমার শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিস পাত্রের কোষ্ঠী দেখাতে হবে। বড়ই বিপদে পড়ে গেল আমার অভিভাবক। কারণ আমার কোনো কোষ্ঠী-ঠিকুজি ছিল না। অতএব জ্যোতিষে শরণাপন্ন। জ্যোতিষীকে বলে আমার একটা ‘রাজযোটক’-এ মিল হয়েছে এমন একটা কিছু করিয়ে আনা হল। কেল্লা ফতে, বিয়ে পাক্কা। আদতে আমার রাশি, লগ্ন, কোষ্ঠী কিছুই নেই– তার আবার রাজযোটক! আমার ১২ বছরের সংসার দিব্য চলছে। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বড়ো মেয়ের বিয়ে ছিল রাজযোটক। ভাটপাড়ার জনৈক জ্যোতিষী মেয়ে আর হবু জামাইয়ের কোষ্ঠীবিচার করে সেটাই বলেছিলেন। রাজযোটকের বিয়ে, তা সত্ত্বেও বিয়ের দুই বছরের মধ্যেই বঙ্কিমচন্দ্রের বড়ো মেয়ে বিধবা হয়ে যান। এরকম হাজার হাজার দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা যায়, যেখানে রাজযোটক হওয়া সত্ত্বেও বিয়ে অকালে নষ্ট হয়ে গেছে। জ্যোতিষীবাবুরা কী বলেন এ ব্যাপারে? নিরুত্তর থাকেন।

    (৭) একদা, মানে দেড়শো বছর আগে পর্যন্ত জ্যোতিষীবাবুরা বলবান সপ্তমপতি কেন্দ্রে কোণে থাকলে বাল্যবিবাহের নিদান দিতেন। তাই ওই সময় প্রায় সকল মেয়েদেরই বলবান সপ্তমপতি কেন্দ্রে কোণে থাকার ফলে বাল্যবিবাহ হত। ১৯৯৯ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ১৯৯৯’ চালু হওয়ার পর থেকে বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়ে গেল। বলবান সপ্তমপতি গেল কোথায়? কেন্দ্রের কোণে আর থাকেন না? গেছে। ভুল। জ্যোতিষীবাবুরা কী বলেন এ ব্যাপারে? নিরুত্তর থাকবেন।

    “পৃথিবীর ১০জন সেরা মনীষীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের দেখা সবচেয়ে অপদার্থ জিনিসটিকে নিয়ে আসতে বলুন। দেখবেন, সবাই একজন করে জ্যোতিষীকে ধরে এনেছেন।” –বলেছেন গটিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতজ্ঞ ডেভিড হিলবার্ট। না-হলে কয়েকশো কোটি বছর সৃষ্ট গ্রহ-নক্ষত্রকে দিয়ে মানুষের ভাগ্য নির্ণয় করে! মানুষের সৃষ্টি তো কয়েকশো কোটি বছর নয়!!! বর্তমানে সূর্যের বয়স প্রায় ৫০০ কোটি বছর। চন্দ্র বা চাঁদের বয়স পৃথিবীর বয়সের প্রায় সমান, যা প্রায় ৪.৬ কোটি বছর। পৃথিবীতে প্রাপ্ত উল্কার বয়স ৪.৩ কোটি থেকে ৫ কোটি। মহাবিশ্বে এরকম ব্রহ্মাণ্ডের সংখ্যা কম নয়। এখনও পর্যন্ত ১০০টি ব্রহ্মাণ্ডের সন্ধান পাওয়া গেছে। আমাদের ব্রহ্মাণ্ড ছাড়া খালি চোখে আর মাত্র ৩টি ব্রহ্মাণ্ড দেখা সম্ভব। এই ৩টির মধ্যে ২টি দক্ষিণ গোলার্ধে, আর-একটি মাত্র উত্তর গোলার্ধে। ২০ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত শেষের ব্রহ্মাণ্ডটির নাম দেওয়া হয়েছে অ্যানড্রোমিডা (Andromeda)। একটি ব্ৰহ্মাণ্ড থেকে আর-একটি ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যবর্তী অংশের নাম ‘আন্তব্রহ্মাণ্ড মহাকাশ’। এই শতাধিক ব্ৰহ্মাণ্ড ও আন্তর্বহ্মাণ্ড মহাকাশ নিয়েই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। নানা পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, ব্রহ্মাণ্ড জোটবদ্ধ অবস্থায় আছে। প্রতিটি ব্ৰহ্মাণ্ড জোট অপর প্রতিটি জোট থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে। দূরত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেগও বৃদ্ধি পায়। ব্রহ্মাণ্ডের এহেন অস্থির গ্রহ-নক্ষত্র নিয়েই জ্যোতিষীবাবুদের কারবার। জ্যোতিষীবাবুরা এখানেই থেমে থাকেননি –তাঁরা রাজা-উজির, জীবজন্তু, জীবজন্তু, পশুপাখি, বৃক্ষলতা, পাহাড়-পর্বত– এমনকি ভারতের ভাগ্য, পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যও বলে দেওয়ার সাহস রাখে –আবার দিল্লির সিংহাসনে কে বসবেন, পশ্চিমবঙ্গের মসনদের কে উপবেশন করবেন তাও বলে থাকেন –অনেকটা সাপ মরবে লাঠি ভাঙবে না কায়দায়– যদিও এ যাবৎকাল পর্যন্ত সবই ভুলভাল বলেছেন। জ্যোতিষীবাবুরা জানেন লাগলে রাতারাতি বিখ্যাত, না-লাগলে কেউ ফাঁসি তো দূরের কথা, কেউ কৈফিয়তই নেবে না।

    জ্যোতিষীর জ্যোতিষী সেরা জ্যোতিষী হলেন বি. ভি. রমন। ইনি ‘অ্যাস্ট্রোলজিক্যাল ম্যাগাজিন’ নামে পত্রিকাও করেন। এহেন জ্যোতিষীর কয়েকটি ঐতিহাসিক ভাগ্যনির্ণয় এখানে উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। ১৯৭৯ সালে অ্যাস্ট্রোলজিক্যাল ম্যাগাজিনে লিখলেন, “জনতা দল সরকারের উপর এখন বৃহস্পতির কোনো ক্রোধ নেই। ফলে জনতা সরকার এবারের মতো টিকে যাবে।” দেশের রাজনীতির খবর যাঁরা রাখেন তাঁরাই জানেন জনতা সরকারের কী হাল হয়েছিল। ১৯৮০ সালে লেখা হল, “তিন গ্রহের যা অবস্থান দেখছি তাতে দিল্লিতে পাকাঁপোক্ত সরকার হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।” সেবার ইন্দিরা গান্ধি নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জিতলেন। তাঁর দল ব্যাপক ফল করল। সরকার হল পাকাঁপোক্তই। রাজনীতির এলেম না-থাকলে এরকম ভুলভাল ভবিষ্যৎ বাণীই হয়। ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকারের ভবিষ্যৎ কী যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে বিনা জ্যোতিষ গণনায় বলে দেওয়া যায়– “২০১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলই দ্বিতীয়বার সরকার গড়বে, কোনো অঘটন ছাড়াই। আসন সংখ্যা গতবারের থেকে বাড়ার সম্ভাবনা।” এটা বলার জন্য জ্যোতিষবিদ্যা-গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান জানার প্রয়োজন নেই। এমনকি এও বলা যায় –“আগামী লোকসভা নির্বাচনে দিল্লির মসনদে বিজেপি সরকারের দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করার সম্ভাবনা, যদি কোনো অঘটন না ঘটে।” বলা যায়– “আগামী বছর অতি বর্ষণের সম্ভাবনা। মুম্বাই, কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলমগ্ন হতে পারে। আগামী বছর বেশ কিছু নক্ষত্রপতনের যোগ আছে” ইত্যাদি। ফললে নিশ্চয় আমার পসার বাড়বে, না ফললে কে মনে রাখবে! মানুষের ক্ষেত্রেও প্রায় ৮০% মিলিয়ে দেওয়া সম্ভব বিনা জ্যোতিষবিদ্যায়। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা আছে। যে ভবিষ্যদ্বাণীটি আমি উল্লেখ করলাম, সেটিতে তথাকথিত কোনো অ্যাস্ট্রোলজিক্যাল ক্যালকুলেশন নেই, আছে পলিটিক্যাল ক্যালকুলেশন। এইভাবে অনেক কিছুরই ক্যালকুলেশন করে বলা সম্ভব হতে পারে। তার জন্য জ্যোতিষ, জ্যোতিষবিদ্যা, জ্যোতিষ-গণনার প্রয়োজন পড়বে না। তবে মিলতে পারে, নাও মিলতে পারে। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু বলেছিলেন–”যেটা মেলে সেটাই বিশ্বাস করি। আর যেটা মেলে না সেগুলি ভুলে যাই।” এ প্রসঙ্গে আরও একটু বলতে পারি। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথের জন্য তাঁর বাড়িতে একটা কোষ্ঠী করা হয়েছিল। সেই কোষ্ঠীতে বলা হয়েছিল– মঙ্গলের যা অবস্থান, তাতে সত্যেন্দ্রনাথের পড়াশোনা হবে না। কোষ্ঠীকে উড়িয়ে দিয়ে হিন্দু স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক তাঁকে ১০০-র মধ্যে ১১০ দিয়েছিলেন। এই মহাবিশ্বের মৌলকণা তাঁর নামেই ‘বোসন’ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। পরের ঘটনা তো ইতিহাস, সবাই জানেন। সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যয় বলেছেন– “জ্যোতিষশাস্ত্রের গণনার উপর কিছুমাত্র বিশ্বাস করিবে না। আমি উহার অনেক পরীক্ষা করিয়া এক্ষণে ইহাতে বিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়াছি।” একদা জ্যোতিষী বিশ্বাসী বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সংগ্রহের সমস্ত জ্যোতিষ বিষয়ক বইপত্র আগুনে পুড়িয়ে দেন।

    জ্যোতিষীবাবুদের ভবিষ্যত বাণী যে বহুবার মিথ্যা হয়েছে তার ঝুড়ি ঝুড়ি প্রমাণ আছে। মানুষ সেসব ভুলে যাবে কেন?! জ্যোতিষীবাবুরা অনেক সময় অনেক প্রমাণ-ট্রমাণ দিয়ে আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে আসলেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। যে যত যুক্তি দিক, আর না-দিক– সত্যি কিন্তু পৃথিবী একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। সেটা জ্যোতিষীবাবুরা বাণী না-ছাড়লেও হবে। এখন এমন দশটি ভবিষ্যৎ বাণীর কথা বলব যেগুলি বিশ্বজুড়ে আতঙ্কিত এবং আলোড়িত হয়েছে, অথচ মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়েছে।

    (১) অপ্রামাণ্য রচনা (The Apocrypha), এই ভবিষ্যৎ বাণীটি করা হয়েছিল ১০০০ সালে। ইঞ্জিল শরিফের কয়েকটা লাইনের উৎস ধরে সবার মধ্যে আতঙ্ক ভাইরাল হয়ে যায় যে, ঈসার মৃত্যুর পর এক প্রজন্ম পরে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। কী ছিল ইঞ্জিল শরিফের সেই লাইনটি?– “Christ would be back in generation and that the genetation shall not pass.” opette, “জিশু আবার ফিরে আসবেন আগামী প্রজন্মে। এবং সেই প্রজন্ম পরিত্রাণ পাবে না“। তৎকালীন সময়ে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী চার্চ থেকে অর্থের বিনিময়ে মানুষেরা নিজেদের জন্য স্বর্গে জমি কিনে রাখতে পারতেন এবং মানুষজন সংশ্লিষ্ট চার্চে অর্থ প্রদান পাপ থেকে মুক্তি পেলেন বলে বিশ্বাস করতেন। যেহেতু সেসময় পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এমন ভবিষ্যৎ বাণী করা হয়েছে, সেইহেতু অনেকেই নিজেদের সর্বস্ব সম্পদ বিক্রিবাটা করে চার্চে অনুদান দিয়ে পাপমুক্তির হিড়িক পড়ে গেল। সেই সুযোগে এক লপ্তে চার্চগুলিতে কোটি কোটি টাকা রোজগার হয়েছিল, বলাই বাহুল্য। যেহেতু সেসময়ে ঘড়ি বা ক্যালেন্ডার সহজলভ্য ছিল না, তাই সাধারণ মানুষ ধ্বংসের দিন হিসাবের জন্য মহান চার্চের উপরই নির্ভর করত। তখনকার দিনে পোপ/পাদরিদের বাণী বা ঘোষণাই ছিল শেষ কথা। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পৃথিবী ধ্বংসের ভবিষ্যৎ বাণী। শুনিয়ে প্রচুর অর্থ কামিয়ে নয়েছিল বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। এখন ২০২১ সাল, পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ধ্বংস যে হয়নি সেটা নিশ্চয় বোঝানোর জন্য প্রমাণ চাইবেন না!

    (২) “The Watchtower Society” এক ধরনের অদ্ভুত সোসাইটি। এরা অনেকবার পৃথিবী ধ্বংসের তারিখ নির্ধারণ করছে। বারবার মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, তবুও নিয়ম করে ভবিষ্যৎ বাণী আওড়াতে কখনো কার্পণ্য করেনি। আর এমন প্ররোচনাকারী সোসাইটিকে মানুষ বিশ্বাস করে এবং মানুষের এই অটুট বিশ্বাসের জন্য সোসাইটিটি আজও টিকে আছে। ১৮৭৪ সাল, ১৯৪১ সালে পৃথিবী ধ্বংসের ঘোষণা দিয়েছিলেন, নির্দিষ্ট দিন-তারিখ উল্লেখ করেই। আর বারবার সেই ভবিষ্যৎ বাণী ভণ্ডুল হয়েছে। অবশ্য এখন আর দিন-তারিখ নির্দিষ্ট করে ঘোষণা দেন না, একটু সুর পালটে শুধু “পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে”– এটুকু বলে ছেড়ে দেন। এখন ২০২১ সাল, পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ধ্বংস যে হয়নি সেটা নিশ্চয় বোঝানোর জন্য প্রমাণ চাইবেন না!

    (৩) “Heavens Gate’ বা স্বর্গের দরজা বলে পরিচিত এটি এমন একটি সংস্থা, যাঁরা মনে করত পৃথিবীটা সম্পূর্ণ ভিন গ্রহের বাসিন্দা বা এলিয়েন দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। এমন কি সরকারের বেশির ভাগ মনুষই নাকি এলিয়েন! তারা মনে করেছিলেন, ১৯৯৭ সালে এক উল্কাকে অনুসরণ করে এলিয়েনরা পৃথিবীতে আসবে এবং পৃথিবীর সমস্ত মানুষদের ক্রীতদাসে পরিণত করবে। এই দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে একমাত্র উপায় হল আত্মহত্যা করা। এইসব ধারণা বিশ্বাস করে শতাধিক মানুষ আত্মহত্যা করেছিল সে সময়ে। না, ১৯৯৭ সালে পৃথিবীতে একজন এলিয়েন এসেও একজন মানুষকেও দাস করতে পারেনি। এখন ২০২১ সাল, পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ধ্বংস যে হয়নি সেটা নিশ্চয় বোঝানোর জন্য প্রমাণ চাইবেন না!

    (৪) নস্ত্রাদামুস ছিলেন একজন বিখ্যাত গণক, যিনি তাঁর জীবনে অনেক ভবিষ্যৎ বাণী লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি অনেক বড়ো বড়ো ঘটনার ভবিষ্যৎ বাণী আগেই করে দিতেন অনেকে বিশ্বাস করেন। এনার লিপিবদ্ধ হেঁয়ালি পাঠ করে জ্ঞানীরা (?) মর্মোদ্ধার করেছিলেন, ১৯৯৯ সালে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এখন ২০২১ সাল, পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ধ্বংস যে হয়নি সেটা নিশ্চয় বোঝানোর জন্য প্রমাণ চাইবেন না! নস্ত্রাদামুসের তথাকথিত ভবিষ্যৎ বাণী মুখ থুবড়ে পড়ে।

    (৫) ওয়াই টু কে (Y2K) মনে পড়ছে? সালটা তখন ২০০০। ২০০০ সালে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে এই আশঙ্কা এবং আতঙ্ক নিয়েই জন্ম হল Y2K ধারণা। কোন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা এই ভবিষ্যৎ বাণীর ঘোষক ছিলেন মনে পড়ছে না। যেটা মনে পড়ছে সেটা হল তৎকালীন সময়ে কম্পিউটারে ৯৯ সালের পরে পরের সাল, অর্থাৎ ২০০০ সাল উল্লেখ করা ছিল ০০ দিয়ে। অনেকে ধরে নেন ২০০০ সালে পৃথিবীর সব কম্পিউটার আপনা-আপনি অচল হয়ে যাবে। সযত্নে গচ্ছিত রাখা নিউক্লিয়ার বোমাগুলি এই বিগরে যাওয়া কম্পিউটারের জন্য নিক্ষেপিত হতে থাকবে। এই আতঙ্ক এতটাই ছিল যে, সাধারণ মানুষ তো বটেই, খোদ আমেরিকা সরকার খাদ্য মজুতকরণ, অস্তর মজুত, বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নিউক্লিয়ার বোমা দুর্ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার সরঞ্জাম মজুত, পর্যাপ্ত অর্থ জমিয়ে ফেলা যাতে পরবর্তীতে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করা যায় ইত্যাদি। এত শ্রম সবই পণ্ড হল। ২০০০ সাল অতিক্রান্ত হয়ে এখন ২০২১ সাল, পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ধ্বংস যে হয়নি সেটা নিশ্চয় বোঝানোর জন্য প্রমাণ চাইবেন না!

    (৬) ২০১৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরে ধ্বংস হবে পৃথিবী। এমনটাই দাবি ছিল কন্সপিরাসি তাত্ত্বিকদের। তারা দাবি করছেন, তিন মাসের মধ্যেই ধ্বংস হতে চলেছে মানব সভ্যতা। ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ হয়ত আমাদের শেষ দিন। বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে পৃথিবী ধ্বংসের নতুন তথ্য। তাঁদের দাবি, ২০১৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর মহাকাশে পৃথিবীর সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারে একটি বড়ো গ্রহাণুর। আর এই আঘাতেই শুরু হবে প্রলয়। ধ্বংস হবে পৃথিবীর সাজানো বাগান। পৃথিবী ধ্বংসের এই খবর নাকি আছে পৃথিবীর শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহের কাছেও ছিল। এই বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য সেইসব দেশের বেশকিছু ক্ষমতাবান ব্যক্তি ঘর গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। এ বিষয়ে ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রী লরেন্ত ফ্যাবিয়াস জানান, একটি বড়ো গ্রহাণু পৃথিবীকে আঘাত হানতে পারে। এর ধ্বংসযজ্ঞ হবে কল্পনাতীত। তবে এটি পৃথিবীতে আঘাত হানার আগেই এটিকে ভেঙে ছোটো ছোটো টুকরো করে ফেলার চেষ্টা করা হবে, যেন ক্ষতির পরিমাণ কমানো যায়। তিনি আরও জানান, এই গ্রহাণুটি আটলান্টিক মহাসাগরে আঘাত হানতে পারে। তবে এই তথ্য সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দিয়েছিলেন নাসা। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন– “তাদের কাছে। পৃথিবীর সঙ্গে কোনো গ্রহাণু বা ধূমকেতুর সংঘর্ষ হওয়ার কোন খবর নেই। এমনকী আগামী একশো বছরেও এইরকম কিছু ঘটবে না।” এখন ২০২১ সাল, পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ধ্বংস যে হয়নি সেটা নিশ্চয় বোঝানোর জন্য প্রমাণ চাইবেন না!

    (৭) এই তো সেদিনের কথা, ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর– এ পর্যন্ত পৃথিবীর ধ্বংসের শেষতম দিন ঘোষণা হল। দামামা বেজে উঠল সমগ্র পৃথিবী জুড়ে। ফেসবুকের কল্যানে এমন একজন মানুষ ছিল না যে জানেন না। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এ সংবাদ ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেল। সেকি তুলকালাম কাণ্ড!!! এ নিয়ে আবার অনেকে কোরান শরিফের সঙ্গে সংখ্যার গুণ/ভাগ করে কত কিছুই-না বানিয়েও ফেলেছিল। এ নিয়ে “২০১২ এবং ইসলাম তথা ইসলাম তথা ১৪৩৩ আরো কিছু অজানা তথ্য” শিরোনামের লেখায় বিস্তর আলোচনাও হল। সব দোষ কিন্তু ওই মায়ানদের। তাদের ক্যালেন্ডার ২০১২ পর্যন্তই ছিল, অর্থাৎ ২০১২ সালের পরে আর কোনো সাল নেই। ২০১২ সালে পৃথিবী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেই বলেই পরের সালগুলি নেই। অবশ্য মায়ানদের এই ভবিষ্যৎ বাণী নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিলই। অতএব এদের ভবিষ্যৎ বাণীও মিথ্যা প্রমাণিত হল।

    (৮) ২০১৫ সাল। কেয়ামতের ঘড়িতে (ডুমসডে ক্লক) পৃথিবী ধ্বংস হতে আর মাত্র তিন মিনিট বাকি রয়েছে –এমনই খবর ছড়িয়ে পড়ল সারা পৃথিবীতে। ওই ঘড়ির কাঁটা তিন মিনিট পার হয়ে মধ্যরাতে, অর্থাৎ ১২টায় পৌঁছোলে মহাপ্রলয়ের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন হবে এ পৃথিবী! একই অবস্থানে রয়েছে কেয়ামতের ঘড়ির কাঁটাটি। সময়টা খুব কম, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এ সময়ের মধ্যে পৃথিবীকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না-নিলে, ঘড়ির কাঁটা পেছনে ফিরিয়ে

    আনা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছিল বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানে দুটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের দুই বছর পর ১৯৪৭ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সাইন্টিস্ট’ ‘কেয়ামতের ঘড়িটি তৈরি করে। বুলেটিনের পরিচালক পর্ষদ এর দেখভাল করে। এ ঘড়িতে মধ্যরাত হতে যত সময় বাকি, সেটা দিয়ে পরমাণু অস্ত্র, পরিবেশ ও প্রযুক্তিগত হুমকির তীব্রতা বিবেচনা করা হয়। মধ্যরাত হওয়ার অর্থ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া। পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারে ঐশ্বরিক কোনো প্রভাব এখানে বিবেচনা করা হয় না। ঘড়িটির নিয়ন্ত্রণকারীরা জানিয়েছিলেন, ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাতের দিকে এগিয়ে আসছে, যা মানবজাতির ধ্বংসকে নির্দেশ করে। এটা সত্যিই মানুষের কবর রচনার মতো সংবাদ। বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সাইন্টিস্ট’-এর গবেষক লরন্সে ক্রায়াস বলেছিলেন, “আমরা যদি আমাদের পন্থা পরিবর্তন না করি, তাহলে আমরা মনে করি, মানবজাতি মারাত্মক বিপদের মধ্যে রয়েছে।” ওয়াশিংটন থেকে তিনি ঘোষণা দেন, কার্যকরী পদক্ষেপ এসব হুমকি কমাতে পারে। কিন্তু আমরা যদি সেগুলোকে (হুমকিগুলোকে) স্বীকৃতি দিই, তাহলে সত্যিই আমাদের সেগুলোর মুখোমুখি হতে হবে অচিরেই। ’ ‘বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সাইন্টিস্ট’-এর ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ঘড়িটি স্থাপনের সময় মহাপ্রলয়ের সাত মিনিট বাকি ছিল। কিন্তু পরে পরমাণু ও মানুষের তৈরি হুমকি মোকাবিলায় বিশ্ব জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ায় এর অবস্থান পিছনে চলে আসে বেশ কয়েকবার। কিন্তু বিশ্বে পরমাণুশক্তির ব্যবহার ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় ‘কেয়ামতের ঘড়ির কাঁটা ফের সামনের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে। ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে, ২০১০ সাল পর্যন্ত ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাতে পৌঁছাতে বাকি ছিল মাত্র পাঁচ মিনিট। কিন্তু ওই বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ পরমাণু অস্ত্র ধ্বংসের ব্যাপারে অঙ্গীকার ব্যক্ত করায় ঘড়ির কাঁটা এক মিনিট পিছিয়ে চলে আসে। তবে পারমাণবিক অস্ত্রাগার ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করতে না-পারায় ২০১২ সালে ফের আগের অবস্থায় ফিরে আসে এটি। ২০১৫ সালে জলবায়ু পরিবর্তন ও যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকীকরণের ফলে ঘড়ির কাঁটা চলে আসে ১১টা ৫৭ মিনিটে। এখনও পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে।

    (৯) ২১ মে ২০১১ সাল। পৃথিবীর আজই শেষ দিন। কারণ আজই পৃথিবী ধ্বংস হতে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক বাইবেলের উদ্ধৃতি দিয়ে এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তাদের মতে ২০১১ সালের ২১ মে সন্ধ্যা ৬টায় পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। নিউইয়র্কজুড়ে ধর্মযাজক ও ধর্ম প্রচারকরা টি-শার্ট পরে ও ব্যানার-ফেস্টুন, বাইবেল, পোস্টার নিয়ে সমাবেশ করে সবাইকে সতর্ক করছেন। সমাবেশে অংশ নেওয়া ধর্ম প্রচারক ম্যানি বলেন, ‘বাইবেলের বুক অব রেভুলেশন’ অনুসারে ২১ মে সারা বিশ্ব প্রলয়ংকরী এক ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি বলেন, বিশ্বের সব স্থানে একই সময়ে ভূমিকম্পটি আঘাত হানবে কি না সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই। কারণ, পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে সময়ের তারতম্য রয়েছে। তবে তা একই সময়ে সংঘটিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওদিকে বাইবেলের নানা সংখ্যাতাত্ত্বিক বিষয় বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করার পর হারল্ড ক্যাম্পিং (৮৯) পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারে এ ভবিষ্যদ্বাণীটি করেছেন। তিনি এর আগেও ১৯৯৪ সালে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তবে সেবার তার গণনা ভুল হয়েছিল বলে ক্ষমা চেয়েছিলেন তিনি। হারল্ডের অনুসারীরা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পৃথিবী ধ্বংসের প্রচারণা চালাচ্ছেন। আর এ ঘটনায় বিশ্বাসীদের দলে যোগ দিয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। এদিকে পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ক্যাম্পিং শেষ দিনটি তার উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার বাড়িতে স্ত্রীর সঙ্গে কাটানোর পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার খবর দেখতে আমি টেলিভিশনে চোখ রাখব সেদিন। হারল্ড ক্যাম্পিং ভবিষ্যদ্বাণীর পিছনে কিছু যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। যার মধ্যে আছে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণও। খ্রিস্ট ধর্মানুসারীদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে একটি খণ্ড জেনেসিসে উল্লেখ রয়েছে, খ্রিস্টপূর্ব ৪৯৯০ অব্দে নূহের সময়কালে পৃথিবীতে একটি মহাপ্লাবন সংঘটিত হয়েছিল। ঈশ্বর সে সময় নূহকে বলেছিলেন, ৭ দিনে তিনি পৃথিবী ধ্বংস করবেন। এদিকে বাইবেলের অপর একটি খণ্ড ২ পিটার ৩:৮ এ বলা হয়েছে, পৃথিবীর এক হাজার বছর ঈশ্বরের এক দিনের সমান। ক্যাম্পিং এ যুক্তি দেখিয়ে বলেন, মহাপ্লাবনের সময় থেকে এ পর্যন্ত ৭ হাজার বছর পার হয়ে গেছে। আর ঈশ্বর ৭ দিনে পৃথিবী ধ্বংসের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে হিসাবে ১ হাজার বছর ঈশ্বরের ১ দিনের সমান হলে ৭ হাজার বছর নিশ্চয়ই ৭ দিনের সমান হবে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৯৯০ অব্দের সঙ্গে ২০১১ খ্রিস্টাব্দ যোগ করলে দাঁড়ায় ৭ হাজার বছর। আরও এক জটিল গণনার হিসাবে হারল্ড ক্যাম্পিং আজই অর্থাৎ ২১ মে ২০১১ সালকেই পৃথিবী ধ্বংসের দিন বলে চিহ্নিত করেন। তবে বহু খ্রিস্টান ধর্মযাজক ও অনুসারীকে তার এ গণনাকে অমূলক বলে দাবি করেছিলেন। এখন ২০২১ সাল, পৃথিবী যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ধ্বংস যে। হয়নি সেটা নিশ্চয় বোঝানোর জন্য প্রমাণ চাইবেন না!

    (১০) সুদূরের জন্য একটি ভবিষ্যৎ বাণী উচ্চারিত হয়ে আছে। এতদিন আমি অবশ্যই বেঁচে থাকব না, যাঁরা ভবিষ্যৎ বাণী শোনাচ্ছেন তাঁরাও বেঁচে থাকবেন না। ৩৭৯৭ সাল। ধ্বংস হবে পৃথিবী! অন্য গ্রহে বাসা বাঁধবে মানুষ। এই ভবিষ্যদ্বাণীটি অবশ্য জনৈক ‘বাবা ভাঙা’-র। তাঁকে নাকি বলা হয় ‘এ যুগের নস্ত্রাদামুস’। ২০ বছর আগে তিনি মারা গিয়েছেন। কিন্তু আইএস-এর উত্থান বা টুইন টাওয়ারের হামলার কথা নাকি তিনি বলে গিয়েছিলেন। বাবা ভাঙা যা বলে গিয়েছেন, তার মধ্যে থেকেই তুলে ধরা হল কয়েকটি। মিলিয়ে নিন।

    (১) বারাক হুসেন ওবামাই হবেন আমেরিকার শেষ প্রেসিডেন্ট।

    (২) ২০১৬ সালেই ইউরোপ শেষ হয়ে যাবে। রাসায়নিক অস্ত্রে ইউরোপকে শেষ করে দেবে সন্ত্রাসীরা।

    (৩) ইউরোপ ছেয়ে ফেলবে মুসলিম জঙ্গিরা। আর এই সন্ত্রাসের সূত্রপাত হবে সিরিয়ায়।

    (৪) ২০১৮ সালের মধ্যে সুপারপাওয়ার হিসাবে উত্থান হবে চিনের। পর্যন্ত হবে আমেরিকা।

    (৫) ২০২৫ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে ক্ষুধা দূর হবে।

    (৬) শুক্র গ্রহে বাসা বাঁধবে মানুষ।

    (৭) ২০৪৫ সালের মধ্যে মেরু অঞ্চলের আইসক্যাপ গলে যাবে।

    (৮) ২০৭৬ সালে কমিউনিজম ফিরবে পুরোদস্তুর।

    (৯) ২১৩০ সালের মধ্যে জলের তলায় বসবাস শুরু করবে মানুষ।

    (১০) ৩৭৯৭ সালে ধ্বংস হবে পৃথিবী। ততদিনে অবশ্য অন্য গ্রহে থাকতে শুরু করবে মানুষ। সত্য/মিথ্যার সাক্ষী থাকুন আপনি। সময় তো আছেই।

    হাত দেখা বা হস্তরেখা বিচার সম্ভবত জ্যোতিষীবাবুদের মধ্যে সবচেয়ে জয়প্রিয়তম ব্যবস্থা। জাতকরাও কেউ হাত দেখতে জানে জানতে পারলে তার দিকে নিজের হাত বাড়িয়ে দিতে এক সেকেন্ডও দেরি করেন না। অবশ্য এই ‘হস্তরেখা বিচার’ পদ্ধতির পুষ্টিলাভ খুব বেশিদিনের কথা নয়। পঞচদশ শতকে হস্তরেখা বিদ্যার উপর কিছু পরিমাণ বিক্ষিপ্তভাবে লেখালেখি হলেও মূলগতভাবে এই বিদ্যার রমরমা শুরু ঊনবিংশ শতাব্দীতে। মহাভারতের যুগেও অনুমান করেই ভবিষ্যৎ বাণী করা হত। শকুন্তলাকে দুর্বাসাও ভবিষ্যৎ বাণী দিয়েছিল, যা অভিশাপ বলেই বিদিত। দুর্বাসা জানতেন রাজা দুষ্যন্ত জন্ম-পরিচয়হীন শকুন্তলাকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করবে না। করার কথাও নয়। কারণ একজন বনবাসীকে কিছুতেই রাজপরিবারে জায়গা দিতে পারে না। সামাজিক অবস্থান তো ভিন্ন মেরুতে।

    যাই হোক, হাত দেখার মহিমাই অপরিসীম। বন্ধুমহলে বেশ কদর পাওয়া যায়। অফিসের বসকেও খুব সহজে কবজা করা যায় হাত দেখে পজিটিভ বাণী শুনিয়ে। বিনা মূলধনে বিনা পরিশ্রমে টু-পাইস কামানোর সুযোগ হাতছাড়া করা যায়! কী আছে হাতে? কী দেখা হয় হাতে? হাতে কী অতীত-বর্তমান ভবিষ্যৎ লেখা থাকে? জ্যোতিষীবাবুরা তো সেটাই বলে, হাতে লেখা থাকে! শুধু হাতেই নয়– কপাল, হাতের কবজি, শরীরের তিল, পায়ের রেখা সবেতেই নাকি অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ লেখা থাকে। গতকাল এবং আগামীকাল, ভূত এবং ভবিষ্যৎ– যত গণ্ডগোল তো এখান থেকেই, আদিকাল থেকেই। ‘ভূত’ শব্দটি বস্তুত দুটি অর্থে ব্যবহৃত হলেও ব্যঞ্জনা প্রায় কাছাকাছিই। একটি অর্থ। ‘অতীত’, অন্যটি হল ‘প্রেত-প্রতিনী’, ‘প্রেত-প্রতিনী’ তো যিনি অতীত বা মৃত হয়েছেন তার অশরীরী। আমরা ভূত জেনে অবাক হই, বর্তমান জেনে খুশি হই এবং ভবিষ্যৎ জেনে আতঙ্কিত হতে ভালোবাসি। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে না হলেও অতীত আমাদের মনে থাকে অনেকটাই, আমরা তাই জন্য স্মৃতিচারণ করতে পারি। আমার অতীত জানতে আমি জ্যোতিষবাবুর কাছে যাব কেন! জ্যোতিষীবাবুরা মানুষের সেই অতীতই বলে থাকেন, সেগুলি সকলের জন্য খুবই কমন (Common)। আপনার মনে হয় উনি আপনার ‘অতীত’ বলতে পারলেন। আপনি ভয়ে সিঁটিয়ে থাকলেন, এই বুঝি অতীতে করা আপনার অপকর্মগুলিও বলে ফেলল! তবুও বারাবার জ্যোতিষীর কাছে যাই, গিয়ে একবার ঝালিয়ে নিই। আপনার মতে না মিললে সেই জ্যোতিষী খারাপ, অন্য ‘বিখ্যাত’ জ্যোতিষীর শরণাপন্ন হবেন নিশ্চয়। আর মতে মিললে তো ভগবান– আপনি সব উজার করে দিতে রাজি হয়ে যান। বস্তুত সব জ্যোতিষীর মধ্যে ওই ‘মেলানোর’ পারদর্শিতা বা অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা থাকে না।

    কীভাবে? বলব। আমি তো আমার কথা বলব, যুক্তিবাদীদের কথা বলব, বিজ্ঞানের কথা বলব। তার আগে জ্যোতিষীবাবুদের বক্তব্য শুনব না কি করে হবে?

    জ্যোতিষীবাবুরা বলেন– “জ্যোতিষ একটি ঐশ্বরিক ব্যাপার। আসলে এটা কোন মত পোষণ করা বা বিশ্বাসের ব্যাপার নয়। জ্যোতিষে এমন কিছু বিষয় আছে, যা চট করে দেখলে একেবারেই মন-গড়া, বা বানানো মনে হয়। অথচ সেগুলিই বাস্তবে খুব ভালো মতো কাজ করে বা ফল দেয়। যেমন, রাশিচক্রের বিন্যাসের (Arrangement) ব্যাপারটি বলা যেতে পারে। জ্যোতিষে ৯টি গ্রহ বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে আসল গ্রহ ৫টি– বুধ, শুক্র, মঙ্গল, শনি, এবং বৃহস্পতি। সূর্য ও চাঁদকেও ‘গ্রহ’ নামে ডাকা হয়। এছাড়া রাহু ও কেতু নামে দুটো অবস্থানগত বিন্দুকেও (Positional Points) গ্রহ ধরে মোট ৯টি ‘গ্রহ’ পাওয়া যায়। এদেরকে ‘নবগ্রহ’ বলা হয়। এই নবগ্রহের মধ্যে সূর্য ও চাঁদের অবশ্যই একটা আলাদা অবস্থান বা গুরুত্ব আছে। কেননা সূর্য আসলে গ্রহ নয়, বরং নক্ষত্র। সব গ্রহগুলির চেয়ে বহুগুণ বড়ো হওয়াতে এর একটা আলাদা প্রভাব আছে। সৌরজগতের সব গ্রহগুলি সূর্যকে কেন্দ্র করেই ঘুরছে। তাছাড়া পৃথিবীতে দিন-রাত, ঋতু পরিবর্তন ইত্যাদিতে সূর্যের এমন প্রভাব আছে, যা অন্য কারও নেই। আবার চাঁদ গ্রহদের থেকে ছোটো হলেও, পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে হওয়ার জন্য এর আলাদা এক রকম প্রভাব আছে, যা জোয়ারভাটা, মানুষের শরীরের বাত, আরও বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে। সুতরাং সূর্য ও চাঁদের এমন একটা অবস্থান বা প্রভাব আছে, যা বুধ, শুক্র, শনি ইত্যাদির নেই। রাশিচক্রে ১২টি রাশির প্রত্যেকটি রাশি কোন না-কোন গ্রহের মালিকানাধীন। আপনার যে রাশিই হোক না-কেন, তার একটি মালিক বা অধিপতি (owner) আছে বলে রাশিচক্রের বইয়ে বা পত্রিকাতে পাবেন। রাহু কেতু অবস্থানগত বিন্দু, তাদের আসলে কোনো দৃশ্যমান কাঠামো (Physical Structure) নেই। তাই তারা সেভাবে কোনো রাশির মালিক নয়। বাকি ৭টা গ্রহ এই ১২টি রাশির মালিক। আবার, রাহু-কেতু বাদে এই ৭টা গ্রহ, সপ্তাহের ৭টা দিনেরও মালিক। এবং সেই সেই দিনে সেই সেই গ্রহের প্রভাব, বাস্তব জীবনে খুব পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। ১২টি রাশিকে কীভাবে ৭টি গ্রহের মধ্যে ভাগ করা যায়? প্রত্যেক গ্রহ ২টি করে রাশি পেলে রাশি দরকার ১৪টি, আবার ১টি করে হলে ৭টি গ্রহের ৭টি রাশি পাওয়ার পর আরও ৫টি থেকে যায়। তাহলে? জ্যোতিষে বিষয়টির সুরাহা করা হল এভাবে– সূর্য ও চাঁদ যেহেতু ৭টি গ্রহের মধ্যে একটু আলাদা (Special), এদেরকে ১২টি রাশি থেকে ১টি করে রাশি দেওয়া হোক (মোট ২টি)। আর বাকি থাকল ১০টা, এই ১০টা রাশি বাকি ৫টি গ্রহের মধ্যে ২টি করে ভাগ করে দেওয়া হোক। তাহলে সূর্য ও চাঁদ = ১ + ১ = ২, আর বাকি ৫টি গ্রহ ২টি করে = ৫ x ২ = ১০, মোট ২ + ১০ = ১২, মিলে গেল। বিষয়টি খুব সাধারণ, মনে হয় কোন একটা ঘরোয়া আলোচনায় ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে। কিন্তু এটাই বাস্তব জীবনে খেটে যায়। কেননা এটাই জ্যোতিষের ভিত্তি, আর সব হিসাব-নিকাশ এর উপর ভিত্তি করেই করা হয়। তাই এটা ঠিক না-হলে, কোনো কিছুই মিলত না। এখন, রাশির বিন্যাস (Positioning/Arrangement) কীভাবে করা হবে? এটাও এমন একটা ব্যাপার, দেখলে মনে হবে কারও বানানো বা কল্পনাপ্রসূত, কিন্তু এটাই বাস্তবে খেটে যায়। কীভাবে দৃশ্যমান ভৌত শরীর (physical body) -থাকায় রাহু-কেতুকে রাশির মালিকানা না-দেওয়া, এরপর বাকি ৭টি গ্রহের মধ্যে সূর্য ও চাঁদকে আলাদা বিবেচনা করে ১টি করে রাশি দিয়ে এরপর দু-পাশে একই গ্রহের ১টি করে রাশি বসিয়ে বসিয়ে সম্পূর্ণ রাশিচক্রটি (Zodiac) সাজানো বা বিন্যাস করা (Arrange) একেবারেই মানুষ বা অন্য কারও বানানো মনে হয়, যা খুব সাধারণ বিবেচনা নিয়ে (Casually) করা হয়েছে। এতে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, ইত্যাদির মতো কোনো জটিলতা নেই। তাই দেখে যদিও মনগড়া মনে হয়, এই জিনিসটাই বাস্তবে মিলে যায়, বা খেটে যায়। এটা অবশ্যই একটা ঐশ্বরিকত্ব।” আধুনিক তত্ত্বের সঙ্গে জ্যোতিষের তত্ত্বকে মেলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। ইনি বাংলাদেশে বসবাসকারী বহু প্রচারিত এক জ্যোতিষীবাবু। এনার একটি ওয়েব সাইটও আছে বটে, জ্যোতিষের সমর্থনে প্রবন্ধ-ট্রবন্ধও লেখেন লেখকের নাম-পরিচয় ছাড়াই।

    ভারত তথা হিন্দুধর্মের মানুষদের মধ্যেই জ্যোতিষচর্চা খুব বেশি প্রচলন। বস্তুত ব্রাহ্মণ তথা মুনিঋষিরাই ভবিষ্যৎ বলার কাজটা করতেন। ভারতে জ্যোতিষচর্চা মূলত ব্রাহ্মণ্যবাদের হাত ধরেই এসেছে। একটু নজর রাখলেই জানতে পারবেন জোতিষীদের একটা বড়ো অংশই ব্রাহ্মণসম্প্রদায়ের। একমাত্র ভারতেই ঘরে ঘরে জ্যোতিষী পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গে তো জ্যোতিষ-ব্যাবসা কুটিরশিল্প পর্যায়ে চলে গেছে। যিনি হাত-পা দেখেন তিনিও জ্যোতিষী, যিনি হাত-পা দেখান তিনিও জ্যোতিষী। খ্রিস্টানদের মধ্যেও এ বিদ্যা চর্চা অল্পবিস্তর আছে। তবে মুসলিমদের মধ্যে ধর্মীয়ভাবে জ্যোতিষচর্চা নিষিদ্ধ। নক্ষত্র ও গ্রহ সংক্রান্ত গণনা অর্থাৎ জ্যোতিষচর্চাকে পূর্ববর্তী মুসলিম পণ্ডিতেরা সামগ্রিকভাবে ‘তানজিম’ বলে অভিহিত করেন। সমগ্র বিশ্ব যেহেতু জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর প্রভাবে প্রভাবিত, তাই ভবিষ্যতে ঘটবে এমন সব ঘটনাসমূহ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে প্রকাশ করা সম্ভব। এটা বিশ্বাস করা সর্বসম্মতিক্রমে বড়ো ধরনের কুফরি এবং ইব্রাহিম এর জাতির শিরকের মতো শিরক। “যে ব্যক্তি কোনো গণক তথা ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে গেল, অতঃপর তাকে (ভাগ্য সম্পর্কে) কিছু জিজ্ঞেস করল অমনি ৪০ দিন পর্যন্ত তার সালাত কবুল হবে না।” (সহিহ মুসলিম ২২৩, মুসনাদ আহমাদ ৪/৬৭)। গণক বা জ্যেতিষীদের কথা বিশ্বাস করা আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করার নামান্তর জাদুবিদ্যা শিক্ষা করা, শিক্ষা দেওয়া কুফরি গোনাহ বা পাপ। যে সাতটি জিনিস মানুষকে ধ্বংস করে তার মধ্যে একটি হচ্ছে জাদু। আল্লাহ বলেন, “যে বিষয়ে তোমার নিশ্চিত কোনো জ্ঞান নেই, তার পিছনে ধাবিত হোয়য়া না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।” (বনি ইসরাঈল ৩৬)। আল্লাহ আরও বলেন –“জাদুকর যেখানেই থাকুক সফল হবে না।” (ত্বহা ৬৯)। পক্ষান্তরে কেউ সত্যায়ন না করে, তাদের নিকট অভিজ্ঞতা লাভের জন্য বা পরখ করার জন্য গেলে এটা কুফরের পর্যায়ভূক্ত নয়, কিন্তু ৪০ দিন পর্যন্ত তার নামাজ ও ইবাদ কবুল হবে না। এ সম্পর্কে রাসুলাল্লাহ বলেছেন– “যারা গণক কিংবা এই জাতীয় লোকের নিকট গিয়ে কোনো কিছু জানতে চাইবে, ৪০ দিন পর্যন্ত তাদের নামাজ কবুল হবে না।” (মুসলিম শরিফ) জ্যোতিষীর কাছে যাওয়া, হাত দেখানো তাঁর কথা বিশ্বাস করা একেবারে নাজায়েজ।

    ইসলাম মতে, গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবে বৃষ্টি হওয়ার কথা বিশ্বাস করা যেমন কুফরি, তেমনি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রাশিফলের আশ্রয় নেওয়াও কুফরি। যে ব্যক্তি রাশিফলের উপর গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবের কথা বিশ্বাস করবে, সে সরাসরি মুশরিক হয়ে যাবে। পত্র-পত্রিকা ও বইপত্রে রাশিফলের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে সেগুলি পাঠ করা শিরক। তবে বিশ্বাস না-করে কেবল মানসিক সান্ত্বনা অর্জনের জন্য পড়লে তাতে শিরক হবে না বটে, কিন্তু সে গোনাহগার হবে। কেন-না শিরকি কোনো কিছু পাঠ করে সান্ত্বনা লাভ করা বৈধ নয়। তা ছাড়া শয়তান কর্তৃক তার মনে উক্ত বিশ্বাস জন্মিয়ে দিতে কতক্ষণ? তখন এ পড়াই তার শিরকের মাধ্যম হয়ে দাঁড়াবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন– “গণকের নিকটে কোনো ব্যক্তি গমন করে যদি তাকে কিছু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তাহলে ৪০ দিন ও ৪০ রাত পর্যন্ত তাঁর সলাত কবুল হবে না।” (সহিহ মুসলিম)। “যদি কেউ গণকের বা জ্যোতিষীর নিকট গমন করে তাঁর কথায় বিশ্বাস করল, তাহলে সে মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ বিষয়কে অবিশ্বাস করল।” (সুনান আবু দাউদ)। হাদিসগুলিতে দৈব জ্ঞানের দাবিদার, গণক, জাদুকর ও তদনুরূপ লোকদের কাছে আসতে এবং তাদেরকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করতে ও তাদের বক্তব্য সত্য বলে বিশ্বাস করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ ব্যাপারে ভয় প্রদর্শন ও করা হয়েছে। সুতরাং শাসকবর্গ ও মানুষকে সৎ কাজের আদেশদানের এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ –যাদের হাতে ক্ষমতা ও শক্তি রয়েছে, তাদের প্রত্যেকেরই উচিত গণক, দৈব জ্ঞানের দাবিদার ও অনুরূপ পেশাজীবীদের কাছে আসতে লোকদের নিষেধ করা, হাটে-বাজারে ও অন্যত্র যেকোনো ধরনের দৈবজ্ঞান আদানপ্রদান নিষিদ্ধ করা, দৈবজ্ঞ ও তাদের কাছে যারা আসে সবার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। তাদের কথা কোনো কোনো ব্যাপারে সত্য বলে প্রমাণিত হওয়ার ফলে এবং এক শ্রেণির লোক তাদের কাছে বেশি আনাগোনা করার ফলে তাদের দ্বারা কারও প্রতারিত হওয়া ঠিক নয়। কারণ ওই শ্রেণির লোকেরা মূলত মূর্খ। তাই তাদের দ্বারা প্রতারিত হওয়া অনুচিত। কেননা এতে গুরুতর পাপ, মহাবিপদ ও খারাপ পরিণতি থাকায় এবং যারা এসব কাজে লিপ্ত তারা মিথ্যাবাদী ও দুষ্ট প্রকৃতির লোক হওয়ায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে আসতে, প্রশ্ন করতে এবং তাদেরকে সত্যবাদী হিসাবে প্রতিপন্ন করতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে আলোচ্য হাদিসগুলিতে এও প্রমাণিত হয় যে, গণক ও জাদুকররা কাফির। কেননা তারা অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার দাবি করছে, যা কি না কুফুরি। তদুপরি তারা আল্লাহকে ছেড়ে জিনের সেবা ও ইবাদাঁতের মাধ্যমেই তাদের উদ্দেশ্য সাধন করছে। অথচ এ কাজও কুফুরি এবং আল্লাহর সঙ্গে শরিক করারই নামান্তর। যে ব্যক্তি তাদের অদৃশ্য জ্ঞানের দাবিকে সত্য প্রতিপন্ন করে সে ও তাদেরই অনুরূপ। আর যেসব ব্যক্তি এ বিষয়গুলি এমন লোকদের কাছ থেকে গ্রহণ করে, যারা তা পরস্পর আদানপ্রদান করে থাকে, সে সব ব্যক্তির সঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো সম্পর্ক নেই। এসব লোক যাকে চিকিৎসা বলে ধারণা করে থাকে, তাকে মেনে নেওয়া ও গ্রহণ করা কোনো মুসলিমের জন্য জায়েজ নেই। যেমন বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ কিংবা জলে ইস্পাত চুবানো ইত্যাদি আরও অনেক কুসংস্কার যা তারা করে থাকে, তার কোনোটাই জায়েজ নয়। কেননা তা দৈবকর্ম চর্চা ও মানুষকে বিভ্রান্ত করারই নামান্তর। এসব ব্যাপারগুলোকে যারা মেনে নেয়, তারা মূলত এ লোকদেরকে তাদের বাতিল ও কুফুরি কাজে সহযোগিতা করল। অনুরূপভাবে কোনো মুসলিম ব্যক্তির জন্য জ্যোতিষী ও দৈবজ্ঞানের দাবিদারদের কাছে গিয়ে একথা জিজ্ঞেস করা জায়েজ নেই যে, তার ছেলে কিংবা তার কোন আত্মীয় কাকে বিয়ে করবে? কিংবা স্বামী-স্ত্রী ও তাদের উভয়ের পরিবারে ভালবাসা ও মিল-মহব্বত হবে নাকি শত্রুতা ও দূরত্বের সৃষ্টি হবে ইত্যাদি। কেন-না এসব সে গায়েবি ও অদৃশ্য জ্ঞানেরই অন্তর্গত যা শুধু মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। সকল মুসলিম মনীষীদের সর্বসম্মত মতানুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ বৈধ। আর যে কোনো মুসলিম ব্যক্তিরই অধিকার রয়েছে যে, সে অভ্যন্তরীণ রোগের ডাক্তার কিংবা শৈল চিকিৎসক অথবা মানসিক রোগের ডাক্তার কিংবা অনুরূপ যে কারও কাছে যেতে পারে, যাতে তিনি তার রোগব্যাধি চিহ্নিত করে চিকিৎসাশাস্ত্রে তার জ্ঞান অনুযায়ী শরিয়ত কর্তৃক অনুমোদিত পথ্য দ্বারা তার চিকিৎসা করেন। কেননা এটা সাধারণ বৈধ পন্থাগুলিরই অবলম্বনেরই অন্তর্গত। উপরন্তু এ ধরনের পন্থাবলম্বন আল্লাহর উপর নির্ভরতার পরিপন্থী নয়। কারণ আল্লাহ রোগ দিয়েছেন এবং সে রোগ নিরাময়ের ঔষধও বাতলে দিয়েছেন। যার জানার সে তা জেনেছে এবং যে জানেনি, এ পথ্য তার অজ্ঞাতই থেকে গেছে। অবশ্য আল্লাহ বান্দার উপর হারাম করেছেন এমন কোনো বস্তুকে তার রোগ নিরাময়ের উপায় নির্ধারণ করেননি। সুতরাং অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সেই সব গণক, জ্যোতিষী ও দৈবজ্ঞদের কাছে যাওয়া বৈধ নয়, যারা দাবি করে যে, তাদের কাছে অসুস্থ ব্যক্তির রোগ চিহ্নিত করার গায়েবি জ্ঞান আছে। অনুরূপ অসুস্থ ব্যক্তির জন্যও এসব গণক ও দৈবজ্ঞদের দেওয়া তথ্য ও সংবাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা বৈধ নয়। কেননা তারা গায়েবি বিষয়ে অনুমানের উপর ভিত্তি করেই এসব বলে থাকে কিংবা তারা তাদের ঈপ্সিত বিষয়ে সাহায্য নেওয়ার জন্য জিনদের হাজির করে থাকে। তার মানে এই নয় যে মুসলিমরা জ্যোতিষচর্চা করেন না। জ্যোতিষীদের চেম্বারে মুসলিম জাতকরাও গ্রহশান্তির জন্য আসেন। রত্ন ধারণও করেন। মুসলিম দেশে হয় কি না আমার জানা নেই। তবে ভারতে এক-আধজন মুসলিম জ্যোতিষী পাওয়া যায়। পিরবাবাদের আমি ভবিষ্যৎ বাণী শোনাতে দেখেছি। ধর্ম ধর্মের জায়গায় আছে, ব্যাবসা ব্যাবসার জায়গায়।

    জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চায় মুসলমানদের বেশ সুনাম অদ্যাবধি কাল থেকেই আছে। পেশাগত জীবনযাপনের তাগিদে এবং স্থল ও জলপথে বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তাদের প্রয়োজন হত আকাশের গ্রহ-তারকাদের অবস্থান জানার। মুসলমানদের বিজ্ঞানে অগ্রসরতা এবং সপ্তম শতক হতে পনেরো শতক পর্যন্ত যে সকল মুসলমান বিদূষী জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখায় প্রভূত অবদান রেখেছেন তারা আর যে বিষয়ই নিয়েই পড়ে থাকুন না-কেন, তারা সবাই কিছু-কিছু অবদান রেখেছেন এই জ্যোতিষশাস্ত্র বিজ্ঞানে। তারা গবেষণা করে গেছেন আর লিখেছেন একের পর এক বই।

    আত্মবিশ্বাসহীন মানুষ আত্মনিবেদন করতে শেখে। আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে গর্ব অনুভব করে, দুঃখ-যন্ত্রণা-বঞ্চনাকে ভুলে থাকতে শেখে। এরা লড়াই জানে না, লড়াই দেখলে ভীত হয়। এমতাবস্থায় অদৃষ্ট বা নিয়তির শরণাপন্ন হয়। জেগে ওঠে জ্যোতিষ এবং জ্যোতিষীবাবুরা। হাত বড়িয়ে দেয়– একপক্ষে

    জ্যোতিষীবাবুর হাত, অপরপক্ষে জাতকের হাত। কী আছে হাতে? রেখা? রেখায় কী আছে? আছে স্বল্প রেখাযুক্ত পরিষ্কার হাত এবং বহু সূক্ষ্ম রেখাযুক্ত হাত। লালচে হাত, গোলাপি হাত, সাদাটে হাত, হলদেটে হাত। আছে চওড়া তালু, বেঁটে ও মোটা আঙুল, কুশ্রী নখ। আছে চৌকো হাত, চৌকো হাতে লম্বা আঙুল, দার্শনিক হাত, শিল্পী হাত, আধ্যাত্মিক হাত। আছে নমনীয় বুড়ো আঙুল, অনমনীয় বুড়ো আঙুল। খুব লম্বা নখ, খুব লম্বা ও সরু নখ, খুব লম্বা নীলচে অথবা মলিন বর্ণের চোখ, ছোটো নীলচে নখ, ছোটো গোলাকার নখ, ছোটো অথচ নখের তলার দিকটা চ্যাপটা, ছোটো অথচ নখের তলার দিকে সাদা। চাঁদ, শরীরের ভিতর গভীরভাবে চেপে বসা চ্যাপটা নখ, নখে সাদা দাগ ইত্যাদি।

    এমন কোনো মানুষ নেই যাঁর হাতে ভাঁজ বা কোঁচকানো দাগ বা রেখা নেই। কারোর ঘন দাগ, কারোর-বা অনেকটা ফাঁকা ফাঁকা। এইসব দাগগুলি আবার বিভিন্ন নামে পরিচয় আছে। যেমন–আয়ুরেখা, হৃদয়রেখা, ভাগ্যরেখা, রবিরেখা, বিবাহরেখা ইত্যাদি। এছাড়া হাতের উঁচুনীচু অংশগুলিতে আছে গ্রহস্থল– মানে কোথায় রবি অবস্থান করছে, কোথায় মঙ্গল অবস্থান করছে, কোথায় রাহু অবস্থান করছে ইত্যাদি। হাতের রং দেখেও জ্যোতিষবাবুরা ভাগ্যগণনা করে থাকেন। আছে তারা চিহ্ন, ক্রশ চিহ্ন, চতুষ্কোণ, যব বা দ্বীপ চিহ্ন, বৃত্ত বা চক্র চিহ্ন, ত্রিশূল, জাল চিহ্ন ইত্যাদি– এইসব চিহ্নগুলিও অনেক ভবিষ্যৎবার্তা দেয় বলে জ্যোতিষবাবুরা নিদান দেন।

    মানুষের হাতের তালুতে থাকা যেসব ছাই-ছাতার উপর জ্যোতিষবাবুরা ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন বলে দাবি করেন সেগুলি আসলে কী? মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা হাতের তালু মুঠো করতে পারে। হাতের তালু মুঠো করতে পারার কারণ তালুর এই ভাঁজগুলি। এই ভাঁজগুলি (গভীর রেখা ও সূক্ষ্ম রেখা) প্রাথমিকভাবে মানুষের মাতৃগর্ভে থাকাকালীনই তৈরি হয়। শিশু মায়ের গর্ভে যখন থাকে তখন তার হাত মুষ্ঠিবদ্ধ অবস্থায় থাকে। ভ্রূণ অবস্থায় শিশুর চামড়া ও মাংসপেশি সাত/আট সপ্তাহ নাগাদ তৈরি হয়। এই অবস্থায় মাংসপেশিতে জলের পরিমাণ যথেষ্ট বেশি থাকে। এরপর আস্তে আস্তে যতই মাংসপেশিগুলিতে জলের পরিমাণ কমতে থাকে ততই সংকোচনের ফলে মাংসপেশির উপর টান হয়ে এঁটে থাকা চামড়া ক্রমশ শিথিল হতে থাকে এবং কুঁচকে যেতে থাকে। ফলে হাতের তালুর চামড়ার বিভিন্ন জায়গায় ভাঁজ পড়ে যায়। শিশুর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিশুর মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে এই কোঁচকানো চামড়াই দাগ হিসাবে দেখি। এ দাগ ব্যক্তির মৃত্যু পরও থাকে। পেশিতন্তুর সংকোচনে। তৈরি হয় সূক্ষ্মরেখা এবং দুটি পেশি-অংশের সংযোগস্থলে সৃষ্টি হয় গভীর রেখা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতের তালুতে চামড়ার নীচের মাংসপেশির সংকোচন প্রসারণের উপর নির্ভর করে হাতের তালুতে ছোটো ছোটো রেখা তৈরি হয়। মানুষের শরীরের যে অংশ সবচেয়ে বেশি ফোল্ড হয় এবং নড়াচড়া হয়, তা হল হাতের তালু, সে কারণে হাতের তালুতেই এত ভাঁজ সৃষ্টি হয়। যদি হাতের তালুর মতো পায়ের তালুও ভাঁজ করার প্রয়োজন হত, তাহলে পায়েও এরকম দাগ আমরা পেতাম। মানুষ ছাড়াও গেরিলা, বাঁদর, শিম্পাঞ্জী গোত্রীয় প্রাণীদের হাতের তালুতে ভাঁজ লক্ষ করা যায়। তবে মানুষের তালুর মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ নয়। এই রেখা মানুষের কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে না, করতে পারে না। নানা কারণে মানুষের হাতের কবজি বা আঙুল কেটে বাদ হয়ে যায়, কিংবা দুর্ঘটনায় দুটো হাতই বাদ চলে যায়– এই যে যাদের হাত বা কবজি বা আঙুল কেটে বাদ হয়ে যায়, তাদের ভূত-ভবিষ্যৎ কোথায় লেখা থাকে ভেবে দেখব না আমরা! যেমন ধরুন, কোনো ব্যক্তির বুড়ো আঙুলটা যদি না থাকে, তবে তো তার আয়ুরেখাও নেই– আয়ুরেখা নেই মানে, মৃত্যুও নেই। তাই হয় নাকি! জ্যোতিষবিদ্যার সবচেয়ে বেশি প্রচলিত হচ্ছে কিনোর বই। কিয়োর বই আমিও পড়েছি। তবে কলকাতায় ভৃগু প্রণীত জ্যোতিষ শিক্ষার বইও পাওয়া যায়। এই ভৃগু একাধারে জ্যোতিষজ্ঞ, যৌনবিষয়ক লেখক, গোয়েন্দা গল্পকার। এই কিতাব পড়েও অনেকে জ্যোতিষী ফলায় গ্রামেগঞ্জে। যাই হোক, কিরোর বই আপনিও পড়ে দেখতে পারেন। হাতের রেখা কীরকম হলে সেই হাতের মালিক কেমন ভাগ্যের অধিকারী হবেন, সেগুলিই উল্লেখ করা আছে। কিন্তু কার্যকারণ নেই। কোনো সংগতি তথ্য নেই। আশাও করবেন না। কোনো কেনর উত্তর নেই। কারণ হস্তরেখাবিদদের সেই দায় আছে বলে তাঁরা মনে করেন না। বরং বেশি লাফালাফি করলে মাসলম্যানদের দিয়ে কিমা করে দিতে পারে আপনাকে।

    জ্যোতিষীদের আর-একটি ভাগ্যগণনার পদ্ধতি হল সংখ্যাতত্ত্ব বা নিউমেরোলজি। অনেকে সংখ্যা-জ্যোতিষ বা অংক জ্যোতিষও বলে। তা অংকটা কী? অবশ্য বলার চেষ্টা করব। সংখ্যাতাত্ত্বিক বা জ্যোতিষ মতে, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি মূহূর্তেই মানুষ নিজেকে, নিজের পরিমণ্ডলকে, সময়কে এককথায় সবকিছুকে একমাত্র সংখ্যা দ্বারাই পরিচিত করে। আর তা করে প্রায় অসচেতন থেকেই। যেমন– ব্যক্তি বা বস্তুর নাম, স্থানের নাম, বিষয়ের নাম বা দিন, তারিখ, সময় ইত্যাদি যা কিছুই বলি না-কেন সব কিছুর মাঝেই লুকিয়ে আছে সংখ্যা। সংখ্যার সেই আধিভৌতিক দিক নিয়েই আলোচনা করে সংখ্যাতত্ত্ববিদ্যা। জগতের সকল কর্মকাণ্ডই সংখ্যা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সংখ্যার যে। একটি আধিভৌতিক (Mistrious) ভূমিকা জীবনে ও জগতে আছে। সংখ্যার এই অতিন্দ্রীয় প্রভাবই আধুনিক সংখ্যাতত্ত্ববিদ্যার (Modern Numerology) আলোচ্য বিষয়।

    জ্যোতিষ মতে, সংখ্যাতত্ত্ববিদ্যা বস্তুত জ্যোতিষবিদ্যার চেয়েও প্রাচীন। জগতের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থসমূহে এর উল্লেখ আছে বলে দাবি করেন। বেদ, বাইবেল প্রভৃতিতে যেমন এর উল্লেখ দেখা যায়, তেমনি পবিত্র কোরান শরিফের সুরাগুলিতেও নাকি সংখ্যায়িত লিখন পদ্ধতি দেখতে পাওয়া যায়। তাবিজ-কবজ লেখকগণ প্রায়শ সংখ্যায়ন পদ্ধতিতে লিখে থাকেন। সংখ্যাতত্ত্বের আবিষ্কার মানুষকে জ্যোতিষবিদ্যা (Astrology) এবং জ্যোতির্বিদ্যার (Astronomy) প্রতি আকৃষ্ট করেছে। গ্রিক দার্শনিক পিথাগোরাসকে (খ্রিস্টপূর্ব ৫৮২-৬০৭) আধুনিক সংখ্যাতত্ত্বের জনক বলা হয়ে থাকে। অবশ্য তারও বহু পূর্বে ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যাবিলনীয় সভ্যতার যুগেও এই বিদ্যার অনুশীলন হত বলে প্রমান পাওয়া গেছে। জ্যোতিষবিদরা মনে করেন, পিথাগোরাসের অনুসারী ফিলোলাস, নিকোমাকাস ছাড়াও হেরোডোটাস, সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল প্রমুখ গ্রিক পণ্ডিতগণ, এমনকি আইনস্টাইন সহ অন্যান্য খ্যাতিমান পণ্ডিতগণ এই বিদ্যার অনুশীলন করেছেন। সংখ্যাতত্ত্বের সঙ্গে ফলিত জ্যোতিষের (Applied Astrology) সম্পর্ক অতি নিবিড়। ফলিত জ্যোতিষে ১২টি রাশি আছে এবং ৯টি গ্রহ তাদের অধিপতি (Ruling Planet)। অঙ্কের জগতে মৌলিক সংখ্যা ৯টি (১ থেকে ৯)। শূন্য কোনো সংখ্যা নয়, তবে সংখ্যার পাশে বসে তার মান বৃদ্ধি করে মাত্র। তা পৃথিবী (Univers) এর প্রতীক। গাণিতিক অঙ্ক যত বড়ই হোক তার পারস্পরিক যোগফল মৌলিক একক সংখ্যায় রূপান্তর করা যায়। আর এই মৌলিক রূপান্তরই হচ্ছে সংখ্যাতত্ত্বের প্রতিপাদ্য বিষয়। যেমন ৯৮৭৬ সংখ্যাটি পরস্পর যোগ করলে হয় ৯ + ৮ + ৭ + ৬ = ৩০। আবার ৩০ কে পরস্পর যোগ করলে হয় ৩ + ০ = ৩। অর্থাৎ যতক্ষণ-না একক সংখ্যায় আসবে ততক্ষণ পরস্পরকে যোগ করতে হবে। এক সময় তা ১ থেকে ৯ এর মধ্যে আসবেই। আর এই ১ থেকে ৯ সংখ্যা হল ৯টি প্রধান গ্রহের আধিভৌতিক বা অতিন্দ্রীয় প্রতিভূ যার প্রভাব মানব জীবনে অপরিসীম।

    সংখ্যাতাত্ত্বিকগণ (Numerologist) প্রতিটি ব্যক্তি, বস্তু বা নামকে ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুসারে সংখ্যায়িত করে মূল্যায়ন করেছে। কিন্তু অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো সংখ্যাতত্ত্বভিত্তিক গণনা পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে ANIRBAN BANDYOPADHYAY নামে। প্রশ্ন দেখা দিতে পারে পৃথিবীতে এত ভাষা থাকতে ইংরেজি ভাষাকে বেছে নেওয়া হল কেন? এ প্রশ্নের উত্তর সংখ্যাতাত্ত্বিকগণই দিয়েছেন, বলছেন– প্রাচীনকালের বিভিন্ন প্রতীকই মূলত কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন প্রাচীন ভাষায় সংখ্যাতত্ত্ব বর্ণিত হলেও আধুনিক সংখ্যাতত্ত্ববিদ্যা ইংরেজিকে বেছে নিয়েছেন এর আন্তর্জাতিক আবেদনের কথা বিবেচনা করেই। কেননা এটি একটি আন্তর্জাতিক ভাষা এবং পৃথিবীর সকল গোলার্ধে এই ভাষা কমবেশি চর্চা হয়। অপরদিকে অন্যান্য প্রধান ভাষাগুলির আ-কার, ই-কার প্রভৃতি অথবা অক্ষর সংখ্যার প্রাচুর্যে বর্ণমালা অত্যন্ত জটিল। তাই ইংরেজিকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া পৃথিবীর আলাদা আলাদা ভাষায় আলাদা আলাদা সংখ্যাতাত্ত্বিক ভাগ্যবিচার ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যাবে। কারণ সর্বশেষ যোগফল সংখ্যা একেক রকম হবে। সে ব্যাপারটা হবে বড়োই বিভ্রান্তকর।

    তাহলে আসুন জেনে নেওয়া যাক আমাদের প্রত্যেকের সংখ্যাগুলি। সংখ্যা দুই প্রকারে নির্ণয় করা যায়– একটি জন্মসংখ্যা, অপরটি নামসংখ্যা। সঠিক জন্মতারিখ জানা থাকলেই শুধু জন্মসংখ্যায় নির্ণয়, নতুবা নামসংখ্যাই ধরতে হবে। জন্মসংখ্যার মতো নামসংখ্যা অতটা ভূমিকা রাখতে পারে না বলে জন্মসংখ্যার গুরুত্বই বেশি। আবার জন্মসংখ্যাও দুই প্রকারের, একটি জন্মদিনের সংখ্যা, অপরটি জন্মতারিখের সংখ্যা। আমরা জানি একক সংখ্যা হল ১ থেকে ৯। শূন্য কোনো সংখ্যা নয়। বাকি সংখ্যাগুলি এই ১ থেকে ৯ এরই পুনরাবৃত্তি শুধু বা যৌগিক সংখ্যা। অতএব পুনরাবৃত্তির সংখ্যাগুলিকে পরস্পর যোগ করে একক সংখ্যায় আনতে হবে যতক্ষণ-না একক সংখ্যায় আসে। যেমন, ২৪ জানুয়ারি ২০১৬ এর জন্মতারিখের সংখ্যা ৭ হল যেভাবে। ২ + ৪ + ১ (জানুয়ারি মাসের সংখ্যা) + ২ + ০ + ১ + ৬ = পরস্পর যোগ করে হয় ১৬। যেহেতু ১৬ কোনো একক সংখ্যা নয়, তাই এটিকেও পরস্পর যোগ করতে হবে। যেমন, ১ + ৭ = ৮। আর জন্মদিনের সংখ্যা ৬ হল ২ আর ৪ এর যোগফল (২ + ৪ = ৬)। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মাসকে ১ থেকে ১২

    ধরতে হবে। অর্থাৎ যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ১, ১০, ১৯ ও ২৮ তারিখে, তাদের ১ হল জন্মদিনের সংখ্যা। যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ২, ১১, ২০ ও ২৯ তারিখে, তাদের ২ হল জন্মদিনের সংখ্যা। যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ৩, ১২, ২১ ও ৩০ তারিখে, তাদের ৩ হল জন্মদিনের সংখ্যা। যাদের জন্ম যে কোনো মাসের ৪, ১৩, ২২ ও ৩১ তারিখে, তাদের ৪ হল জন্মদিনের সংখ্যা। যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ৫, ১৪ ও ২৩ তারিখে, তাদের জন্মদিনের সংখ্যা ৫। যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ৬, ১৫ ও ২৪ তারিখে, তাদের জন্মদিনের সংখ্যা ৬। যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ৭, ১৬ ও ২৫ তারিখে, তাদের জন্মদিনের সংখ্যা ৭। যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ৮, ১৭ ও ২৬ তারিখে, তাদের জন্মদিনের সংখ্যা ৮। যাদের জন্ম যে-কোনো মাসের ৯, ১৮ ও ২৭ তারিখে তাদের জন্মদিনের সংখ্যা ৯।

    নামসংখ্যা নির্ণয়ের সূত্র হল– ইংরেজি বর্ণমালার ২৬টি বর্ণ আছে। এই ২৬টি বর্ণকে ১ থেকে ৯ সংখ্যায় আনতে হবে এইভাবে–

    A, I, J, Q, Y এর মান হল ১

    B, K, R এর মান হল ২

    C, G, L, S এর মান হল ৩

    D, M, T এর মান হল ৪

    E, H, N, x এর মান হল ৫

    U, V, W এর মান হল ৬

    ০, z এর মান হল ৭

    F, P এর মান হল ৮। এই হল ২৬টি বর্ণের মান।

    এবার নির্ণয় করি কারও নাম। ধরুন ANIRBAN নাম হলে তার নামসংখ্যা কত? A ১ + N ৫ + ১ + R 2 + B ২ + A ১ + N ৫ = ১৭ অর্থাৎ ১ + ৭ = ৮ এবং B ২ + A ১ + N ৫ + D ৪ + Y ১ + ০ ৭ + P ৮ + A ১ + D ৪ + H ৫+ Y ১ + A ১ + Y ১= ৪২। অর্থাৎ ৪ + ২ = ৬। পূর্ণ নামের সংখ্যা ৮ + ৬ = ১৪ অর্থাৎ ১ + ৪ = ৫। তাহলে দেখা যাচ্ছে ৮ ও ৫ দুটি সংখ্যাই এক্ষেত্রে প্রভাব রাখছে। এভাবেই সমস্ত নামের সংখ্যা নির্ণয় করা হয়।

    সংখ্যা তো হল। কিন্তু সংখ্যা দিয়ে কী হবে? সংখ্যা দিয়ে ভাগ্যগণনা কীভাবে হবে? সব উল্লেখ করব না। কলেবর বৃদ্ধি না-করে দু-চারটে উল্লেখ করছি। যে জাতকের নাম সংখ্যাতত্ত্ব বিচারে ১ হয়, তাহলে তাকে ধীরস্থির ও গম্ভীর মনে হলেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে জানে, কর্মে সক্রিয়, তেজি, নির্ভীক, পরাক্রমশালী, আত্মবিশ্বাসী, অহংকারী, চতুর, বাস্তববাদী এবং উচ্চাকাঙ্খী। উচ্চাকাঙ্খ বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকে। সহজে হার স্বীকার করে না। মনোবল প্রচুর বলে ভয় পেয়ে পিছু হটে না। প্রবল বিপর্যয়ের মধ্যেও ধীরস্থিরভাবে কুটিল বুদ্ধির দ্বারা এগিয়ে যেতে পারে। অন্যকে বোকা বানাতে পারে। নিজের অবস্থান দৃঢ় করার জন্য যা করা দরকার করতে পারে। চেহারায় আকর্ষণীয় শক্তি থাকায় সহজেই অন্যেরা আকৃষ্ট হয়। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বলে সবসময় নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। কথাবার্তায় শাণিতভাব প্রকাশ পায়। নিজের ঢোল নিজে পেটায়। চাটুকাররা মন জয় করতে পারে। কোন্ কাজ কখন করতে হবে তা বোঝে। সব বিষয়ে সূক্ষ্ম দৃষ্টি রাখে। একরোখা স্বভাবের জন্য নিজের পছন্দমত না-হলে কারও কথা শুনে না। সব বিষয়ে সবার উপর কর্তৃত্ব করতে চায়। কারও অধীনে থাকা পছন্দ নয়। যে-কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। হঠাৎ রেগে যাওয়ার প্রবণতা আছে। সাংগঠনিক দক্ষতা থাকায় অন্যকে পরিচালনা করা, নেতৃত্ব দেওয়া এবং বড় বড়ড়া পরিকল্পনা ও চিন্তাধারার জন্য জনমনে

    প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে। সম্মান এবং উচ্চপদও পেতে পারে। আবার নিজেই সব ভালো বুঝে এই খামখেয়ালির জন্য অনেক সময় মাশুলও দিতে হতে পারে। গ্রহ অশুভ কালে বড়ো ধরনের পতনও ঘটতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী কাজে মন না দিয়ে যে-কোনো মুহূর্তে কাজে উৎসাহী। উদারতা, মানবতা, বিচক্ষণতা, ন্যায়পরায়ণতা, ধর্মভীরুতা এবং প্রতিভা যেমন আছে– তেমনি ক্রুরতা, নিষ্ঠুরতাও অসম্ভব নয়। ভ্রমণে সদা উৎসুক বলে বন, জঙ্গল, শহর ও বিদেশ ভালোবাসে। সন্তানদের প্রতি স্নেহপ্রবণ। ভাবপ্রবণতা থাকলেও বাস্তবতার বাইরে যায় না। প্রেমের ব্যাপারে কোনো চিন্তা না-করেই হৃদয় দিতে পারে। আবার সামান্য আঘাতে ভালবাসার মানুষটিকে চিরতরে ত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনা। কারো ক্ষেত্রে একাধিক প্রেমে জড়িয়ে পড়াও অসম্ভব নয়।

    আবার কোনো জাতকের নাম সংখ্যাতত্ত্ব বিচারে ২ হয়, তাহলে আবেগপ্রবণ, অনুভূতিশীল, কোমল হৃদয়, কল্পনাপ্রিয়, ভদ্র, নম্র, লাজুক, বৈচিত্র্যপ্রিয় ও শিল্পীমনা। তারা ভাবপ্রকাশে কুণ্ঠিত এবং তাদের মন ও চিন্তা দ্বি-ধারায় প্রবাহিত হয়। তাদের মনের স্থিরতা নেই বলে ভাবধারায় দ্রুত পরিবর্তন আসে। তাদের আত্মসম্মান জ্ঞান প্রচণ্ড। তাই আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে তারা কোনো কিছু করতে পারে না। তারা সামাজিক রীতি-নীতির প্রতি আকৃষ্ট। জীবন ও ঘর-সংসার তাদের কাছে প্রিয়। তারা আত্মত্যাগী বলে প্রিয়জনদের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে জানে। তাদের জীবনের ট্র্যাজেডি হল তবুও মানুষ তাদের ভুল বুঝতে পারে! তারা সহজেই ভুল স্বীকার করতে পারে। তারা খুব অল্পতেই কষ্ট পায় এবং খুব সহজেই ভেঙে পড়ে। অন্যের বক্তব্য শোনার জন্য আগ্রহী।

    কোনো জাতকের নাম সংখ্যাতত্ত্ব বিচারে ৩ হয়, তাহলে এটি বৃহস্পতির প্রতীক। চাকরি, ব্যাবসা বা ধর্মীয় বিষয়ে তারা কর্মদক্ষতা প্রমাণ করতে পারে। তারা ধীর স্থির, নিয়মানুবর্তী, বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন ও ধার্মিক। সবার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করে। তাদের জীবনে উত্থান-পতনজনিত জীবননাট্যের ক্লাইমেক্স খুব কমই দেখা যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে লোভনীয় নেতা হওয়ার সুযোগ এলেও অনেকে অনাগ্রহ প্রকাশ করে থাকে। তাদের মধ্যে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একটা আধ্যাত্মিক চেতনা বৃদ্ধি পায়। এরা বিশিষ্ট সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, ধর্ম প্রচারক, শিক্ষক ও কর্মক্ষেত্রে বড়ো কর্তা হতে পারেন। কর্মক্ষেত্রে দ্রুত পদোন্নতির দৌড়ে তারাই এগিয়ে থাকেন। তাদের উচ্চাকাঙ্খা তীব্র, বুদ্ধি তীক্ষ্ণ এবং তারা পরিশ্রমী বলেই সাফল্য ধরতে তাদের দেড়ি হয়না। অনেক সময় টুকরো কথা দিয়ে তারা ঠাট্টা করতে পারে। অনেক সময় অনেক ক্ষেত্রে বেশি। কথা বলার জন্য সব কথার মধ্যে সামঞ্জস্য নাও থাকতে পারে। কেউ কেউ আবার অন্তঃমুখীও হতে পারে। তাদের যারা শত্রু হয় তারা সবাই প্রায় বুদ্ধিমান শত্রু। অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার বোঝা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে ইত্যাদি।

    সংখ্যাতত্ত্ব শুধু মানবজীবনেই নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা ক্ষেত্রেই সংখ্যার প্রভাব আছে বলে জ্যোতিষবাবুরা দাবি করেন। মনে করুন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। বিশ্ব বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখে যুক্তরাষ্ট্রের উপর হামলার এক মর্মান্তিক দৃশ্য। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, অর্থাৎ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার টুইন টাওয়ারটি তাসের ঘরের মতো মাটিতে মিশে গেল। গোটা বিশ্ব কেঁপে উঠল। তারপর থেকে বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সামাজ্যবাদীদের সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা হল। আর আমরা দেখতে পাই এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে এক সর্বগ্রাসী দানবের সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে। সবাই যখন নাচছে, তখন জ্যোতিষীবাবুরাই-বা বসে থাকবেন কেন! তাঁরা নেচে উঠলেন, নেমে পড়লেন কোমর বেঁধে। ঘোলা জলে মাছ ধরার ফন্দি সম্বল করে। বললেন– রাষ্ট্রপতি George W. Bush–এর মোট অক্ষর সংখ্যা হল ১১টি। ১১ সংখ্যাটি হল দারুণ অশুভ সংখ্যা। সমস্ত কিছুর মূলেই আছে এই ১১।

    এক নজরে তাহলে সেটাই দেখি :

    (১) হামলার তারিখ ১১ সেপ্টেম্বর,

    (২) হামলার তারিখ ৯/১১, অর্থাৎ ৯ + ১ + ১ = ১১,

    (৩) ১১ সেপ্টেম্বর হল বছরের ২৫৪ তম দিন = ২ + ৫ + ৪ = ১১,

    (৪) ১১ সেপ্টেম্বেরের পরে বছর শেষ হতে আর ১১১ দিন বাকি ছিল,

    (৫) টুইন টাওয়ার পাশাপাশি দাঁড়ানো, যা দেখতে ১১,

    (৬) প্রথম বিমান যেটি আঘাত হানে, সেটি ১১ নম্বর ফ্লাইট,

    (৭) American Airlines মানে AA, অর্থাৎ A হচ্ছে ইংরেজি বর্ণমালার প্রথম অক্ষর, মানে American Airlines = AA = ১১,

    (৮) নিউইয়র্ক স্টেট হচ্ছে ইউনিয়নে যুক্ত হওয়া ১১ নাম্বার স্টেট,

    (৯) New York City, এখানেও ১১টি অক্ষর,

    (১০) Afghanistan, এখানেও ১১ টি অক্ষর,

    (১১) The Pentagon, এখানেও ১১ টি অক্ষর,

    (১২) ফ্লাইট ১১– ৯২ অন বোর্ড –৯ + ২ = ১১,

    (১৩) ফ্লাইট ৭৭– ৬৫ অন বোর্ড– ৭৭ = ১১ x ৭– ৬ + ৫ = ১১,

    (১৪) Air Force One = ১১ অক্ষর,

    (১৫) Saudi Arabia = ১১ অক্ষর,

    (১৬) ww terrorism = ১১ অক্ষর,

    (১৭) ইউ এস স্টেট সেক্রেটারি Colin Powell = ১১ অক্ষর,

    (১৮) ১১ নভেম্বর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের Remembrance day, আবার নভেম্বর হল ১১তম মাস,

    (১৯) বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় আঘাত হানা বিমানের পাইলট ছিল Mohamed Atta, Mohamed Atta = ১১ অক্ষর।

    উল্লিখিত আলোচনা থেকে আমরা কোন্ সিদ্ধান্তে আসতে পারি দেখা যাক– সিদ্ধান্ত : ১১ একটি অলৌকিক সংখ্যা, তাই ১১ সেপ্টম্বরের ঘটনাটি একটি অলৌকিক ঘটনা। বাইবেল ও বিভিন্ন প্রাচীন মিথে শয়তানের চিহ্নের সঙ্গে ১১ সংখ্যার একটা যোগ পাওয়া যায়। নিউ টেস্টামেন্টে শয়তানের চিহ্ন ৬৬৬, যা ১১ দ্বারা বিভাজ্য। ধর্মকথা শব্দটি ইংরেজি বর্ণমালা বা রোমানে লিখি, তবে দেখা যায় ‘dharmakatha’, গুনে দেখুন ১১টি অক্ষর।

    ১১ তে মিল পেলেন অনেক, ১১ তে অমিলও পাবেন অনেক। টুইন টাওয়ারের দুর্ঘটনায় এমন অসংখ্য বিষয়-পূর্বাপর পাওয়া যাবে যার সঙ্গে ১১ সংখ্যার বা অক্ষরের কোনো সম্পর্ক নেই। দেখুন–

    (১) হামলার বছর ২০০১ = ২ + ০ + ০ + ১ = ৩– ১১ নয়।

    (২) এরোপ্লেনগুলি আঘাত হানে সকাল ৯টার দিকে– ১১ টার দিকে নয়।

    (৩) ৪টি বিমান হামলা করেছে– ১১ নয়।

    (৪) এরোপ্লেনে লোকের সংখ্যা ২৬৬ = ২ + ৬ + ৬ = ১৪– ১১ নয়।

    (৫) একটি এরোপ্লেনের নম্বর ৭৬৭ = ৭ + ৬ + ৭ = ২০– ১১ নয়।

    (৬) আরেকটি এরোপ্লেনের নম্বর ৭৫৭ = ৭ + ৫ + ৭ = ১৯– ১১ নয়।

    (৭) ৭৫৭ নম্বর এরোপ্লেনের ফুয়েল ক্যাপাসিটি ২০,০০০ গ্যালন– ১১ হাজার

    গ্যালন নয়।

    (৮) ৭৫৭ নম্বর এরোপ্লেনের ডানার দৈর্ঘ্য ১২৪ ফুট = ১ + ২ + ৪ = ৭– ১১

    নয়।

    (৯) ৭৫৭ নম্বর এরোপ্লেনের ডানার দৈর্ঘ্য ১৫৬ ফুট = ১ + ৫ + ৬ = ১২– ১১

    নয়।

    (১০) একটি টাওয়ারের উচ্চতা ১৩৬২ ফুট = ১ + ৩ + ৬ + ২ = ১২– ১১

    নয়।

    (১১) অন্যটির উচ্চতা ১৩৬৮ = ১ + ৩ + ৬ + ৮ = ১৮– ১১ নয়।

    (১২) অন্য ফ্লাইটগুলি UA ৯৩ = ৯ + ৩ = ১২– ১১ নয়।

    (১৩) UA ১৭৫ = ১ + ৭ + ৫ = ১৩– ১১ নয়।

    (১৪) ফ্লাইট ১১ এর প্যাসেঞ্জার ছিল ৮১ জন = ৮ + ১ = ৯– ১১ নয়।

    (১৫) Boston = ৬টি অক্ষর– ১১ নয়।

    (১৬) Massachusetts = ১৩টি অক্ষর– ১১ নয়।

    (১৭) Pennsylvania = ১২টি অক্ষর– ১১ নয়।

    (১৮) Washington D.C. = ১২টি অক্ষর– ১১ নয়।

    (১৯) Los Angeles = ১০ অক্ষর– ১১ নয়।

    (২০) হাইজ্যাকারদের সংখ্যা ১৯ = ১ + ৯ = ১০– ১১ নয়।

    (২১) Tony Balair = ১০ অক্ষর– ১১ নয়।

    একই ঘটনাকে অন্য সংখ্যা দিয়েও প্রমাণ করা যাবে আরেকটি অলৌকিক সংখ্যা দিয়ে। ২ সংখ্যা দিয়েও কিছু ঘটনা মেলানো যাচ্ছে। দেখুন–

    (১) হামলার তারিখ ১১/৯ = ১১– ৯ = ২,

    (২) হামলার তারিখ ১১ সেপ্টেম্বর = ১ + ১ = ২,

    (৩) ১১ সেপ্টেম্বর হচ্ছে বছরের ২৫৪ তম দিন =

    ২ + ৫ + ৪ = ১১ = ১ + ১ = ২,

    (৪) বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা => ২ টি টাওয়ার,

    (৫) World Trade Center কে আঘাত হেনেছে ২ টি বিমান,

    (৬) প্রতি বিমানে ২ টি ডানা আছে,

    (৭) প্রথম আঘাতকারী বিমানের ফ্লাইট নাম্বার ১১ = ১ + ১ = ২,

    (৮) New York = ২টি শব্দ,

    (৯) The Pentagon = ২ টি শব্দ।

    অনেকে ১৯ সংখ্যাটিকে খুব গুরুত্ব দেন। অথচ অনেক কিছুই আছে যা ১৯ সংখ্যার সঙ্গে খাপ খায় না। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরানের সংখ্যা দেখা যেতে পারে। যেমন দেখুন–

    (১) কোরানে পারা ৩০, যা ১৯ দিয়ে বিভাজ্য নয়।

    (২) কোরানে রুকু ৫৫৮ টি, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।

    (৩) সিজদাহ ১৫টি, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।

    (৪) মাক্কি সুরা ৮৬, মাদানি সুরা ২৬টি, কোনোটিই ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।

    (৫) নোকতা ১,০৫,৬৮৪টি, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।

    (৬) ‘আল্লাহ’ শব্দটি সংখ্যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য ধরে নিলেও (আসলে নয়)– রসুল, মোহাম্মদ সা, জিব্রাইল, মানুষ প্রভৃতি অসংখ্য শব্দ আছে যার সংখ্যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।

    (৭) বিসমিল্লায় ১৯টি অক্ষর থাকলেও কলেমা তাইয়েবা (“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ..”), কলেমা শাহাদাত, আউজুবিল্লাহ., এমন অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বাক্যের অক্ষর ১৯টি নয়।

    (৮) সুরা ৯৬ এর অক্ষর সংখ্যা ৩০৪টি, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য হলেও সুরা ১, ২, ….., এমনকি ১১০ বা অন্য সুরাগুলি অক্ষর সংখ্যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।

    (৯) ১১০ নম্বর সুরায় শব্দের সংখ্যা ১৯টি, বাকি সুরাগুলির শব্দসংখ্যা ১৯ নয়।

    ৪ সংখ্যা দিয়েও অলৌকিক তত্ত্ব দেওয়া যেতে পারে। দেখুন–

    (১) আল্লাহ শব্দটিতে অক্ষর ৪টি।

    (২) ৪ নম্বর সুরায় আয়াত ১৭৬ = ৪ x ৪৪ = ১৭৬।

    (৩) সুরা এখলাসের আয়াত সংখ্যা ৪।

    (৪) সুরা এখলাসের প্রথম আয়াত যেখানে আল্লাহর একত্ব সম্বন্ধে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে (কুলহু আল্লাহু আহাদ), প্রথম আয়াতটিতে শব্দ সংখ্যা ৪টি।

    (৫) সুরা এখলাস ১১২ নম্বর সুরা, যা ৪ দ্বারা বিভাজ্য =

    ১১২/৪ = ২৮ = ২ + ৮ = ১০ = ১ + ০ = ১ অর্থাৎ আল্লাহ এক।

    (৬) কোরানে আয়াত সংখ্যা ৬২৩৬, যা ৪ দ্বারা বিভাজ্য।

    (৭) আসমানি কিতাবের সংখ্যা ৪টি।

    (৮) আসমানি কিতাব নাজিলকৃত রসুল ৪ জন।

    (৯) প্রধান ফেরেশতা ৪ জন। অতএব প্রমাণিত হল যে কোরান অলৌকিক এবং এই ৪ সংখ্যাটি একটি অলৌকিক সংখ্যা। প্রকৃতিতেও এরকম ‘অলৌকিক’ সংখ্যার উদাহরণ হাজার হাজার পাওয়া যাবে।

    নিউমেরোলজিস্টরা ১ থেকে ৯ পর্যন্ত প্রতিটি সংখ্যার জন্য আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এই বৈশিষ্ট্য উল্লেখের ব্যাপারে নিউমেরোলজিস্টদের মতামতও ভিন্ন, স্ববিরোধিতায় ভরপুর। এ ব্যাপারে অবশ্য নিউমেরোলজিস্টদের কোনো ব্যাখ্যা নেই। নিউমেরোলজি বিজ্ঞানের কোনো শর্তকেই তোয়াক্কা করে না। সংখ্যা কীভাবে মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে নিউমেরোলজিস্টরা বলেন –“প্রত্যেকটি সংখ্যার একটি করে তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ আছে। সেই তরঙ্গই মানুষের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে”। মনে রাখতে হবে, তড়িৎ ও চুম্বকত্ব পদার্থের দুটি মৌলিক ধর্ম, এটি পদার্থের বিশেষ অবস্থায় প্রকাশ পায়। কিন্তু সংখ্যা কোনো পদার্থ নয়, এটি একটি গাণিতিক ধারণা। অতএব সংখ্যায় তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ থাকার ব্যাপারটা হল একটি লোক ঠকানো উদ্ভট কল্পনা। আমি একজন কমুনিস্ট তথা বামপন্থী

    প্রাবন্ধিককে চিনতাম, যার পিতৃদত্ত নাম ছিল জ্যোতির্ময় ঘোষ– তিনি নিউমেরোলজিস্টের পরামর্শে নাম বদলে করলেন জ্যোতি ঘোষ। তিনি পেশায় ফিজিক্সের অধ্যাপক ছিলেন। নামের বানান থেকেই যদি ভাগ্য নির্ধারিত হয়। তাহলে যে ব্যক্তিরা একাধিক নামেই বিখ্যাত, তাদের ক্ষেত্রে কোন নামটি সঠিক বলে ধরবেন? দেখুন– মানিক, সত্যজিৎ রায়; রীনা, অপর্ণা সেন; রমা, সুচিত্রা সেন; মোহর, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়; বুম্বা, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়; সুভাষচন্দ্র বসু, নেতাজি, নেতাজি সুভাষ; গান্ধিজি, বাপুজি, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি; মার্ক টোয়েন, স্যামুয়েল ল্যাংহর্ন ক্লিমেন্স; এপিজে আবদুল কালাম, আবুল ফকির জয়নুলাবউদ্দিন আবদুল কালাম; পিভি নরসিংহ রাও, পামুলাপ্রতি ভেঙ্কটনরসিমহা রাও; পিটি উষা, পিলাভুল্লাকান্দি থেক্কেপরম্বিল উষা; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ টেগোর ইত্যাদি। নিউমেরোলজিস্টরা যদি এদের ভাগ্যগণনা করতে নামে তাহলে তো ন্যাজে আর গোবরে হয়ে যাবেন। নাম ভিন্ন, সংখ্যাও ভিন্ন– অতএব ভাগ্যবিচারও ভিন্ন হবে। তাহলে হলটা কী! আর-একটা মোক্ষম উদাহরণ দিয়ে সংখ্যাতত্ত্বের আলোচনা শেষ করব। আডলফ হিটলার, এই ব্যক্তিকে চেনেন না এমন কোনো শিক্ষিত ব্যক্তি আছেন বলে মনে হয় না। সেই বিশ্বাস হিটলার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহানায়ক হিটলার– জন্মেছিলেন ১৮৮৯ সালে ২০ এপ্রিল। হিটলারের জন্মসংখ্যা হল ২ + ০ + ০ + ৪ + ১ + ৮ + ৮ + ৯ = ৩২ = ৩ + ২ = ৫। নিউমেরোলজিস্টদের বিচারে ৫ জন্মসংখ্যা ব্যক্তিরা দয়া ও ন্যায়নিষ্ঠায় ভরপুর হয়ে থাকেন। ইতিহাস কাঁদবে, না হাসবে?

    জ্যোতিষীবাবুরা মানুষের ভাগ্য বলে দেওয়ার জন্য আরও একটি পথ খুঁজে পেয়েছেন। সেই পদ্ধতিটি হল ‘তিল’। আমি আগে কখনো শুনিনি যে মানুষের শরীরে যে তিল দেখতে পাওয়া যায়, সেই তিল দেখে নাকি ভাগ্য বলে দেওয়া যায়। বছর পঁচিশ আগে হাবড়ায় এক জ্যোতিষালয়ে বিশাল গণ্ডগোল এবং জ্যোতিষবাবুকে উত্তমমধ্যম কেলানো। জ্যোতিষীবাবু তাঁর খরিদ্দার এক তরুণীর ডান স্তনে তিল আছে বলে দাবি করেন। তরুণীটি যতই বলে তাঁর ডান স্তনে কোনো তিল নেই, জ্যোতিষবাবু ততই বলতে থাকেন তাঁর ডান স্তনে তিল আছে, থাকতেই হবে। লক্ষণ তাই-ই বলছে। তিনি আরও একবার স্তন খুলে যাচাই করতে বলে। তরুণীটি মেজাজ ঠিক রাখতে না-পারে জ্যোতিষীবাবুর ফর্সা টুকটুকে গালে সপাটে চড় কষিয়ে লাল করে দেয়। চেম্বারে নারীঘটিত গন্ধ পেয়ে বাইরে লোকজনও চলে আসে এবং জ্যোতিষীবাবুর চেম্বার তুলে দেয়। এরপর থেকে তিলের উপর আমারও বেশ আগ্রহ জন্মালো। কারণ আমার শরীরেও যে গোটা কয়েক তিল আছে! বইপত্রও কিছু ঘাঁটাঘাঁটি করতে হল। যত্তসব!

    প্রাচীন সমুদ্র শাস্ত্রে তিল দেখে ভাগ্য নির্ধারণের পদ্ধতি বর্ণনা করা আছে। মানুষের দেহে তিলের উপস্থিতি নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলে থাকেন।

    তিল দেখে ভাগ্য নির্ধারণের প্রথা প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। এখনও অনেকে এ প্রথাতে বিশ্বাসী। শরীরের বিভিন্ন অংশে তিলের উপস্থিতি, রং, আকৃতি প্রভৃতি দেখে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা করা। বলা হয়– পুরুষের শরীরে ডান দিকে এবং নারীদের শরীরে বাঁ দিকে তিল থাকা শুভ। আবার কোনো ব্যক্তির শরীরে ১২টির বেশি তিল হওয়া শুভ বলে মনে করা হয় না। ১২টার কম তিল হওয়া শুভ ফলদায়ক। দেশের একেক অংশে তিল একেক অর্থ বহন করে।

    ভ্রূ : যাদের ভ্রুতে তিল থাকে তারা প্রায়ই ভ্রমণ করেন। ডান ভ্রুতে তিল থাকলে ব্যক্তির দাম্পত্য জীবন সুখী হয়। আবার বাঁ ভ্রুর তিল দুঃখী দাম্পত্য জীবনের সঙ্কেত দেয়।

    মাথা : মাথার মাঝখানে তিল থাকলে তা নির্মল ভালোবাসার প্রতীক। ডান দিকে তিল থাকা কোনো বিষয়ে নৈপুণ্য বোঝায়। আবার যাদের মাথার বাঁ দিকে

    তিল আছে তারা অর্থের অপচয় করেন। মাথার ডান দিকের তিল ধন ও বুদ্ধির চিহ্ন। বাঁ দিকের তিল নিরাশাপূর্ণ জীবনের সূচক।

    চোখের মণি : ডান চোখের মণিতে তিল থাকলে ব্যক্তি উচ্চ বিচারধারা পোষণ করেন। বাঁ দিকের মণিতে যাদের তিল থাকে তাদের বিচারধারা ভালো নয়। যাদের চোখের মণিতে তিল থাকে তারা সাধারণত ভাবুক প্রকৃতির হন।

    চোখের পাতা : চোখের পাতায় তিল থাকলে ব্যক্তি সংবেদনশীল হন। তবে যাদের ডান পাতায় তিল থাকে তারা বাঁ পাতায় তিলযুক্ত লোকের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল।

    কান : কানে তিল থাকা ব্যক্তি দীর্ঘায়ু হন।

    মুখ : স্ত্রী বা পুরুষের মুখমণ্ডলের আশপাশের তিল তাদের সুখী ও ভদ্র হওয়ার সঙ্কেত দেয়। মুখে তিল থাকলে ব্যক্তি ভাগ্যে ধনী হন। তার জীবনসঙ্গী খুব সুখী হন।

    নাক : নাকে তিল থাকলে ব্যক্তি প্রতিভাসম্পন্ন হন এবং সুখী থাকেন। যে নারীর নাকে তিল রয়েছে তারা সৌভাগ্যবতী হন।

    ঠোঁট : যাদের ঠোঁটে তিল রয়েছে তাদের হৃদয় ভালোবাসায় ভরপুর। তবে তিল ঠোঁটের নিচে থাকলে সে ব্যক্তির জীবনে দারিদ্র্য বিরাজ করে।

    গাল : গালে লাল তিল থাকা শুভ। বাঁ গালে কালো তিল থাকলে, ব্যক্তি নির্ধন হয়। কিন্তু ডান গালে কালো তিল থাকলে তা ব্যক্তিকে ধনী করে।

    থুতনিঃ যে স্ত্রীর থুতনিতে তিল থাকে তিনি সহজে মেলামেশা করতে পারেন না। এরা একটু রুক্ষ স্বভাবের হন।

    কাঁধ : ডান কাঁধে তিল থাকলে সে ব্যক্তি দৃঢ়চেতা। আবার যাদের বাঁ কাঁধে তিল থাকে তারা অল্পেই রেগে যান।

    হাত : যার হাতে তিল থাকে তারা চালাক-চতুর হন। ডান হাতে তিল থাকলে ব্যক্তি শক্তিশালী হন। আবার ডান হাতের পেছনে তিল থাকলে তারা ধনী হয়ে থাকেন। বাঁ হাতে তিল থাকলে সে ব্যক্তি অনেক বেশি টাকা খরচ করতে পছন্দ করেন। আবার বাঁ হাতের পেছনের দিকে তিল থাকলে সে ব্যক্তি কৃপণ স্বভাবের হন।

    বাহু : যে ব্যক্তির ডান বাহুতে তিল থাকে তারা প্রতিষ্ঠিত ও বুদ্ধিমান। বাঁ বাহুতে তিল থাকলে ব্যক্তি ঝগড়াটে স্বভাবের হন। তার মাথায়ও খারাপ চিন্তাভাবনা থাকে।

    আঙুল : যাদের আঙুলের তর্জনীতে তিল থাকে তারা বিদ্বান, ধনী এবং গুণী হয়ে থাকেন। তবে তারা সব সময় শত্রুদের কারণে সমস্যায় থাকেন। বৃদ্ধাঙ্গুলে তিল থাকলে ব্যক্তি কর্মঠ, সদ্ব্যবহার এবং ন্যায়প্রিয় হন। মধ্যমায় তিল থাকলে ব্যক্তি সুখী হন। তার জীবন কাটে শান্তিতে। যে ব্যক্তির কনিষ্ঠায় তিল রয়েছে তারা ধনী হলেও জীবনে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে হয়। অনামিকায় তিল থাকলে ব্যক্তি জ্ঞানী, যশস্বী, ধনী ও পরাক্রমী হন।

    গলা : গলার সামনের দিকে তিল থাকলে ব্যক্তির বাড়িতে বন্ধু-বান্ধবের আনাগোনা লেগে থাকে। গলার পিছনে তিল থাকলে সে ব্যক্তি কর্মঠ হন। কোমর : যে ব্যক্তির কোমরে তিল থাকে, তার জীবনে সমস্যার আনাগোনা লেগেই থাকে।

    বুক : ডান দিকের বুকে তিল থাকা শুভ। এমন স্ত্রী খুব ভালো হয়। পুরুষ ভাগ্যশালী হয়। বাঁ দিকের বুকে তিল থাকলে স্ত্রীপক্ষের তরফে অসহযোগিতার সম্ভাবনা থাকে। বুকের মাঝখানের তিল সুখী জীবনের সঙ্কেত দেয়।

    পা : যে জাতকের পায়ে তিল রয়েছে তারা অনেক ভ্রমণ করেন।

    পেট : যে ব্যক্তির পেটে তিল আছে তারা খুব খাদ্যরসিক হয়। মিষ্টি তাদের অত্যন্ত প্রিয়। তবে তারা অন্যকে খাওয়াতে খুব একটা পছন্দ করে না।

    হাঁটু : ডান হাঁটুতে তিল থাকলে গৃহস্থজীবন সুখী হয়। বাঁ হাঁটুতে তিল থাকলে দাম্পত্য জীবন দুঃখময় হয়।

    উঃ, ভাবা যায় না। জ্যোতষীবাবুদের কী সৃজনশীলতা! তিলকে তাল করা জ্যোতিষীবাবুদের তিল প্রসঙ্গে কী বলছেন চিকিৎসা বিজ্ঞান? তিল কখনোই মানুষের ভাগ্য নির্ণায়ক ও নিয়ন্ত্রক নয়। মানুষের শরীরের তিল আদতে আপাতনিরীহ স্কিন ডিজিজ। তিল আমরা সবাই কম বেশি ফ্রিকেলস শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। যার বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে তিল বা ক্ষুদ্র চিহ্ন। এটি এমন ধরনের দাগ যার বর্ণ বাদামি, আকারে ২ থেকে ৪ মিলিমিটারের মত গোলাকার, ত্বকের সমান স্তরে অবস্থান করে এবং মূলত ত্বকের কোনো ক্ষতিসাধন করে না। তবুও সবাই এর থেকে পরিত্রাণ চেয়ে থাকেন। যদিও এটা কোনো রোগ বা শারীরিক সমস্যা নয়, এটি অনেকের কাছেই বিব্রতকর। ফর্সা ত্বকে এ দাগ বেশি পরিলক্ষিত হয়। এটা অনেকটাই বংশগত, পরিবারের কারও এ সমস্যা থেকে থাকলে আপনার হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ফ্রিকেলস সূর্য রশ্মিতে আরও বেশি প্রকট আকার ধারণ করে তাই সান এক্সপোজড জায়গাগুলিতে বেশি হতে দেখা যায়। এছাড়া সারা শরীরেই ফ্রিকেলস হতে পারে। বাজারে অনেক ব্র্যান্ডের ফ্রিকেলস আউট ক্রিম পাওয়া যায়, যার সবই কম-বেশি ব্লিচিং উপাদান দিয়ে তৈরি। আর ব্লিচিং পদার্থ আমাদের স্পর্শকাতর ত্বকের জন্য হুমকি স্বরূপ।

    তিল বা ফ্রিকেলস সাধারণত দুই ধরনের হয়–

    (১) এফিলাইডস এরা সমতল এবং লালচে বাদামি রঙের হয়ে থাকে। মূলত গ্রীষ্মকালে দেখা দেয় এবং শীত এলেই চলে যায়। এই রকমের ফ্রিকেলস বংশগত হতে পারে।

    (২) লেনটিজাইন্স লেনটিজাইন্স সম্ভবত ছোটো ছোটো ট্যানের দাগের মতো বাদামি বা কালো রঙের হতে দেখা যায়। এ ধরনের তিল এফিলাইডস থেকেও গাঢ় রঙের হয়। আর শীতকালে চলেও যায় না। সারা বছর ব্যাপী এটি আপনার সুন্দর ত্বকে রাজত্ব করে বেড়ায়। এটিও অনেকটা বংশগত সমস্যা।

    ফ্রিকেলস প্রধানত কালো বা বাদামি দাগ যা মুখের ত্বকেই বেশি হয়ে থাকে, বিশেষ করে নাকের দুই পাশের জায়গাগুলিতে। ফর্সা বা ফ্যাকাসে ত্বক এতে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। রোদের আলোতে ফ্রিকেলস আরও স্পষ্ট ও তীব্রভাবে পরিলক্ষিত হয়। এর আসল কারণ জেনিটিকাল। কারও পরিবারে বাবা-মা দুই জনের তিল থাকলে তার হওয়ার সম্ভবনা ৮০ %। আর যে-কোনো একজনের থাকলেও এ মাত্রা ৬০ থেকে ৬৫ %। রোদ ফ্রিকেলসের প্রধান শত্রু। অতিরিক্ত সূর্য রশ্মিতে ঘোরাঘুরির ফলেও হতে পারে। অনেকে আছেন গাড়িতে চলাফেরা করেও ফ্রিকেলস কবলিত হন এবং ভাবেন গাড়িতে থাকার কারণে তাঁর ত্বক হয়তো সূর্যরশ্মির দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। এটা ভুল ধারণা। গাড়ির কাঁচ ভেদ করে খুব সহজেই সূর্যরশ্মি পৌঁছে যেতে পারে আপনার ত্বকে এবং তৈরি করতে পারে ফ্রিকেলস।

    এই তিল বা ফ্রিকেলস শরীর থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া সম্ভব, প্রয়োজন হলে। মুখের অতিরিক্ত তিল দূর করার কতকগুলি উপায় —

    (১) প্রতিদিন টক দই ব্যবহার করুন। এটি ধুয়ে ফেলবেন না, ময়েশ্চারাইজারের মতো করে লাগান এবং রেখে দিন ত্বকে।

    (২) লেবুর রসে যদি আপনার এলার্জি না থাকে তবে নিয়মিত লেবুর রস লাগান। দিনে যতবার ইচ্ছা ব্যবহার করুন। দ্রুত ফল পাবেন।

    (৩) মৌসুমি ফল ও সবজি দিয়ে ফেসপ্যাক বানিয়ে ব্যবহার করুন। এতে থাকতে পারে আলু, শশা, গাজর, লাউ, বাঁধাকপি, এপ্রিকট, স্ট্রবেরি, টমেটো ইত্যাদি।

    (৪) দুধ দিয়ে মুখ ধুতে পারেন।

    (৫) মধু সামান্য গরম করে আক্রান্ত স্থানে লাগালেও উপকার পাবেন।

    (৬) পার্সলি রসের সঙ্গে লেবুর রস, কমলার রস এবং গাজরের রস মিশিয়ে নিন সমান পরিমাণে। এটি ব্যবহার করতে পারেন আপনার রেগুলার ক্রিম ব্যবহার করার ঠিক আগে। এতে ফ্রিকেলস দেখা যাবে না।

    (৭) চিনি ও লেবুর রসের স্ক্রাব ভালো কাজে দেয়।

    (৮) কাঁচা হলুদের রস ও তিলের গুঁড়ো একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। জল দিয়ে পেস্টের মতো তৈরি করে আক্রান্ত জায়গায় লাগান।

    (৯) নিয়মিত তরমুজের রস ব্যবহারে ফ্রিকেলসের দাগ হালকা হয় অনেকটাই।

    অতিরিক্ত তৈলাক্ত থাকা, বয়সের প্রভাব, রোদে পোড়া, ড্রাগ নেওয়া, হরমোনের প্রভাব বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে মুখের ত্বকে কালো বা ফ্যাকাশে অগণিত তিল দেখা যায়। এর কোনোটি সামান্য উঁচু হয়, আবার কোনোটি চামড়ার উপর অযাচিত তিলের রং ধরে। এই স্কিন পিগমেন্টেশন তৈলাক্ত ত্বকের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। লোমকূপের ফাঁকে ফাঁকে তেল জমে থেকে একসময় সমস্যাটি হতে পারে। এই সমস্যা সমাধানে নিজেই নিতে পারেন। আরও কয়েকটি কার্যকরী ব্যবস্থার মাধ্যমে। শিখে নেওয়া যাক, প্রাকৃতিকভাবে স্কিন পিগমেন্টেশন সারিয়ে তোলার সহজ উপায়।

    (১) টমেটো মাস্ক; এক চামচ পাকা টমেটোর রসের সঙ্গে এক চামচ ভেজানো ওটস ও আধা চামচ টকদই ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এবার মিশ্রণটি আক্রান্ত স্থানে ভালোভাবে লাগিয়ে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর কুসুম গরম জলে মুখ ধুয়ে হালকা মশ্চারাইজার লাগিয়ে নিন। টমেটোর রস পিগমেন্টেশনের বিরুদ্ধে খুব দ্রুত কাজ করে থাকে। তাই সপ্তাহে কমপক্ষে ৪ দিন নিয়মিত ব্যাবহার করলে দ্রুত পিগমেন্টেশন দূর হবে।

    (২) হলুদের মাস্ক : রোদে পোড়ার জন্য যে তৈরি পিগমেন্টেশন সারাতে হলুদ গুড়ো অনেক উপকারী। এক টেবিল চামচ হলুদ গুড়োর সঙ্গে এক টেবিল চামচ লেবুর রস দিয়ে পেস্ট তৈরি করে নিন। এবার ঘুমানোর আগে আক্রান্ত স্থানে লাগিয়ে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করে কুসুম গরম জলে মুখ ধুয়ে নিন। এই প্যাকটি দিনেও ব্যাবহার করা যাবে। কিন্তু এটা লাগিয়ে কখনো রোদে মুখ শুকানো যাবে না, এতে করে স্কিন কালো হয়ে যেতে পারে।

    (৩) এলোভেরা জেল : শুধু এলোভেরা জেল সম্পূর্ণ মুখে ৩০ মিনিট অথবা সারারাত লাগিয়ে রাখুন। এরপর সকালে ঘুম থেকে উঠে অথবা লাগানোর ৩০ মিনিট পর কুসুম গরম জলে মুখ ধুয়ে নিন। যে-কোনো ধরনের পিগমেন্টেশনের জন্য এলোভেরা জেল খুবই উপকারী। সবচেয়ে ভালো ফলাফল পাওয়ার জন্য এটি প্রতিদিন রাতে ব্যাবহার করতে পারেন।

    (৪) কমলার মাস্ক : স্কিন পিগমেন্টেশন থেকে মুক্তি পেতে আরেকটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি হচ্ছে কমলার রস। এক্ষেত্রে ১ চামচ কমলার রসের সঙ্গে ১ টেবিল চামচ লেবুর রস ও আধা চামচ গোলাপ জল মিশিয়ে আক্রান্ত স্থানে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য লাগিয়ে রাখুন। ফ্রেশ কমলার রশ না-পাওয়া গেলে কমলার শুকনো খোসা গুড়ো করেও এই ফেসপ্যাকটি তৈরি করা যায়। এটা সপ্তাহে দুই থেকে তিন বার করলে অনেক উপকার পাওয়া যাবে।

    তিল বিশ্বাসীরা এবার নিশ্চয় খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন! ভাবছেন তিল ভ্যানিশ করে দিলে কী হবে ভাগ্যের ভবিষ্যৎ? আপনি ভাগ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেই পারেন, কিন্তু আমি ভাবব গবেষকদের নিদান। ব্রিটেনের প্রায় তিন হাজার জনের উপর সমীক্ষা চালিয়ে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ব্রিটিশ জার্নাল অব ডার্মাটোলজিতে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হচ্ছে, তিল বা আঁচিলের যে-কোনো অস্বাভাবিকতাই ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। গবেষকদের মতে, শরীরে তিল বা আঁচিলের সংখ্যা থেকে ত্বকের ক্যান্সারের বিষয়ে ধারণা করা যায়। কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষকেরা প্রায় আট বছর ধরে নারীদের ওপর গবেষণা চালিয়েছেন এবং সেসব নারীদের ত্বকের ধরন, তিল ও আঁচিলের সংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জোগাড় করেন। এর পাশাপাশি ত্বকের বিশেষ এক ধরনের ক্যানসার যেটিকে মেলানোমা বলা হয় ওই মেলানোমায় আক্রান্ত চারপোজন নারী ও পুরুষের ওপর গবেষণা চালান গবেষক দল। গবেষণা ফলাফলে দেখা যায়, যেসব নারীর ডান হাতে সাতটির বেশি তিল বা আঁচিল রয়েছে, তাদের ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি। আর যাদের ডান হাতে ১১টির বেশি তিল বা আঁচিল আছে এবং সারা শরীরে একশোটির বেশি তিল বা আঁচিল আছে, তাদের মেলানোমার ঝুঁকি অনেক বেশি। গবেষকদের মতে, শরীরে কোনো তিল বা আঁচিল দেখে অস্বাভাবিক মনে হলে বা ব্যথা হলে অবশ্যই তাড়াতাড়ি কোনো ত্বকের ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। প্রয়োজনে সতর্ক ব্যবস্থা নিতে হবে।

    বর্তমানে জ্যোতিষবাবুরা জ্যোতিষকে শাস্ত্র বলে চালাতে চায়, অনেকে আবার একটু দুঃসাহসিক হয়ে বিজ্ঞানও বলে থাকেন। বেদে জ্যোতিষশাস্ত্রের কথা নেই। বৈদিক যুগে জ্যোতিষ বলতে বোঝাত দিন, বছর, ঋতু ইত্যাদির গণিতসিদ্ধ বিচার পদ্ধতি। সেখানে আছে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের সঙ্গে বৃষ্টি ও কৃষি সম্বন্ধীয় বিষয়। এই গ্রহ-নক্ষত্রদের সঙ্গে মানুষের ভাগ্য যুক্ত করা হয়নি। এই জ্যোতিষে ভবিষ্যকথন নেই, ভাগ্যকথা নেই, গ্রহ-নক্ষত্রের অহেতুক রাগরোষের কথা নেই। শুভাশুভ বিচার মুখ্য নয়। সংখ্যার রহস্যে আরোপ নেই। এই জ্যোতির্বিজ্ঞান গ্রিস যাযাবরদের হাত ধরে জ্যোতিষ হয়ে গেল। বস্তুত ভারতে গ্রিক শাসনের অবসানের পর রেখে গেছে মূর্তিপুজোর ধারণা, গণিত এবং অবশ্যই জ্যোতিষ। গ্রিকদের এই জ্যোতিষের মধ্যেই যেমন জ্যোতির্বিদ্যা ছিল, ছিল ঋতুকাল নির্ণয়। তেমনই গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি মানুষের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণের আজগুবি বকওয়াস। এই বকওয়াসের জনক ছিলেন ব্যাবিলনের রাজারা, যাঁরা একইসঙ্গে পুরোহিত। তৎকালীন সমাজে ধর্মযাজকরাই শাসক হতেন। সম্ভবত ইরানের আয়াতোল্লা খোমেইনিই ছিলেন সর্বশেষ ধর্মীয় শাসক। যাই হোক, ব্যাবিলন থেকে গ্রিস, গ্রিস থেকে ভারতে সংক্রামিত হল জ্যোতিষ ভণ্ডামি। আলেকজান্ডারের আগমনের পর থেকে ষষ্ঠ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ সময়কাল ফলিত-জ্যোতিষ’, অর্থাৎ মানুষের ভাগ্য গণনার বকওয়াস পদ্ধতি ভারতে টিমটিম করত– যত দিন যাচ্ছে, মানুষের চাহিদা বাড়ছে, না-পেয়ে হতাশ হচ্ছে ততই জ্যোতিষীবাবুদের রমরমা বাড়ছে। গলিতে গলিতে এখন জ্যোতিষী গড়াচ্ছে। হোর্ডিংয়ে ছড়াছড়ি। কত জ্যোতিষবাবু সরকারি চাকরিও করছেন, তৎসহ অতিরিক্ত রোজগার করছেন হাত দেখে, পাথর বেচে। অফিসের কলিগদের কাছেও পাথর বেচছেন। অথচ তৎকালীন সময়ে এইসব গ্রিক যাযাবর সম্প্রদায়ের মানুষরা ব্রাত্য বা পতিত বলে বিবেচিত হত (‘বৃহৎসংহিতা’ পড়ুন)। বৈদিক যুগে যে ভাগ্য বিচার ছিল ব্রাত্য, সেই ব্রাত্য সমাজের উঁচুস্তরে উঠে এসেছে এক শ্রেণির অন্ধ মানুষদের জন্য।

    ভারতীয় জ্যোতিষীদের কাছে বরাহমিহিরই ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের জনক। তিনিই ভারতীয় ফলিত-জ্যোতিষের, অর্থাৎ গ্রহ-নক্ষত্রের সঙ্গে ভাগ্যযুক্ত তত্ত্ব আদলটি সৃষ্টি করেন। কোন্ গ্রহদোষ কাটাতে কোন্ রত্ন ধারণ করতে হবে সেটাও বরাহমিহিরের মস্তিষ্কপ্রসূত। বরাহমিহিরের সময়কালে ফলিত জ্যোতিষকে ‘যবনশাস্ত্র বলা হত। আর্যরা এদেরকে ঘৃণা করতেন। গ্রিক যাযাবরেরাই মানুষের ভূত-ভবিষ্যৎ বলে রোজগার করত, পেট চালাত। বস্তুত সমাজে ভাগ্য-গণকদের কোনো মর্যাদা ছিল না। ম্লেচ্ছ’ বলে অবজ্ঞা করা হত। অবশ্য ভাগ্য-গণকদের হয়ে বরাহমিহিরই এগিয়ে এলেন। বরাহমিহির বুঝলেন মানুষের ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিলে মানুষ খুব খুশি হয়। মানুষকে খুশি করলে রোজগারও মন্দ হয় না। অতএব বরাহমিহিরই ভাগ্য-গণকদের জাতে তুলতে উঠেপড়ে লাগলেন। কিছু বইপত্রও লিখে ফেললেন। মনে রাখতে হবে, এই বরাহমিহিরই আর্যভট্টের আহ্নিক গতি তত্ত্ব মানতেন না। আর্যভট্টের সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ তত্ত্বও বিশ্বাস করতেন না। আমরাও কি আর্যভট্টের সিদ্ধান্ত বা তত্ত্ব মানলাম! যদি মানতাম তাহলে আর্যভট্টের চাইতে বরাহমিহির কিংবদন্তি হতে পারত না। ভারতে আজ আর্যভট্ট চরম উপেক্ষিত, অপরদিকে বরাহমিহিরের পুজো হচ্ছে। বরাহমিহিরের মতো ব্রহ্মগুপ্তও আর্যভট্টকে মানতেন না। ব্রহ্মগুপ্ত আর্যভট্টের গ্রহণতত্ত্বকে না-মেনে রাহু-কেতুর গল্পকেই বিশ্বাস করতেন। ভাবা যায়, ইনিই নাকি ষষ্ঠ শতকে ভারতীয় বিজ্ঞান চর্চায় বিশিষ্ট ব্যক্তি!

    বিজ্ঞানের কিছু প্রাচীন শাখার মতো জ্যোতির্বিজ্ঞানও একটি সময় পর্যন্ত জ্যোতিষশাস্ত্রের মতো অপ-বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। ভেবে দেখুন তো, কেমিস্ট্রি মানে রসায়ন ছিল অ্যালকেমি বিদ্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কারণ প্রাচীনকালে পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতা ও গাণিতিক হিসাব পদ্ধতি অনুন্নত থাকার ফলে সে সময় ব্যক্তি বিশ্বাসের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ তালগোল পাকিয়ে এ ধরনের অপ-বিজ্ঞানের জন্ম নেয়। যাই হোক, সেই সময়কার মানুষজন রাতের আকাশ দেখে বুঝতে পেরেছিল যে, বছরের বিভিন্ন সময়ে কিছু নিদিষ্ট নক্ষত্রমণ্ডলের আবির্ভাব ঘটে। এসব পর্যবেক্ষণ তাদেরকে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সম্পর্কে বেশ আগে থেকেই পূর্বাভাস দিতে পারত। যেমন মিশরের প্রাণ নিলনদের বন্যা বছরের একটি নিদিষ্ট সময়ে হত এবং বন্যায় ভেসে আসা পলিতে উর্বর জমিতে ভালো চাষ হত। একটি নিদিষ্ট নক্ষত্রমণ্ডলে সূর্যের অবস্থানই তাদের বন্যার আগমনের কথা জানান দিত। এইভাবে ক্রমেই তারা চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্রের নিয়মবদ্ধ চলাচল আবিষ্কার করেছিল এবং আকাশে চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্রের অবস্থান ধীরে ধীরে তাদের ধর্মীয়, সামাজিক রীতিনীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। আকাশে চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্রের নিয়মবদ্ধ চলাচল আবিষ্কার হওয়ার ফলে বর্ষপঞ্জি তৈরি হয়। কোথাও তৈরি হয় সৌর বর্ষপঞ্জি, আবার কোথাও চন্দ্র বর্ষপঞ্জি। সুমেরীয়রা ও ব্যাবিলনীয়ানরাই প্রথম বছরকে ১২ টি মাসে ভাগ করে। জ্ঞাত তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন মাসে বিভিন্ন নক্ষত্র মণ্ডলের উপস্থিতি দেখে ব্যাবিলনীয়ানরাই ৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সর্বপ্রথম রাশিচক্র প্রণয়ন করে। পরে তা মহাবীর আলেকজান্ডারের হাত ধরে মিশর, গ্রিসে, ভারতে আসে। এছাড়া ব্যাবিলনীয়ানরা ৭৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দেই তখনকার আবিষ্কৃত পাঁচটি গ্রহের সুশৃঙ্খল ও ধারাবাহিক তালিকা প্রণয়ন করেন। এর প্রায় ৯০০ বছর পর এই তালিকা ব্যবহার করে টলেমি গণিত সহযোগে ভূকেন্দ্রিক মানে পৃথিবী কেন্দ্রিক বিশ্ব মডেলের ধারণা দেন। কোপার্নিকাসের পূর্ব পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই মডেলের ব্যাপক প্রভাব ছিল। আর এটিই এখন জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রামাণ্য মডেল। এই টলেমিতেই জ্যোতির্বিজ্ঞান আর জ্যোতিষশাস্ত্র মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। একদিকে তার ‘আলমেজেস্ট’ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক অনন্য গ্রন্থ, অপরদিকে তাঁর ‘টেট্রাবিবলস’ জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসাবে ব্যবহৃত হয়, বলতে গেলে এটি জ্যোতিষীদের কাছে বাইবেলের মতো। অর্থাৎ, সে সময় একই ব্যক্তি একসঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চা করত। আর সে। সময়ের রাজা বাদশাহদের জ্যোতির্বিজ্ঞানের বদলে জ্যোতিষশাস্ত্রে পৃষ্ঠপোষকতা এর অন্যতম একটি কারণ। তবে জ্যোতিষশাস্ত্র থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান আলাদা বা স্বতন্ত্র হতে শুরু করল ষোড়শ শতকে কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক সৌর মডেলের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে। এর ফলে টলেমির ভূকেন্দ্রিক মডেল বাতিল হয়ে যায়। তবে মোটা দাগে বলতে গেলে কেপলারের (১৫৭১-১৬৩০) পর থেকেই এই দুটি বিষয় পৃথকভাবে চর্চা হতে শুরু করে। কেপলারের সকল কাজ জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর হলেও তাঁর মাঝে জ্যোতিষশাস্ত্রের ভালো রকমের চর্চা লক্ষ করা যায়। পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক হিসাব পদ্ধতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কোপার্নিকাস, টাইকো, কেপলার, গ্যালিলিওদের হাত ধরে ধারাবাহিক ক্রমবিকাশের মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞান তাঁর আজকের অবস্থানে এসেছে। অপরপক্ষে ধীরে ধীরে রাজতন্ত্র বিলোপ এবং জ্যোতিষীদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় উপস্থিতি, কদর হ্রাস পেতে থাকলে এই শাস্ত্রটির ব্যাপক ভাবে সামাজিকীকরণ ঘটে।

    কাকে বলবেন! ভূত তো সরষের মধ্যেই ঢুকে বসে আছে। আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে তাবড় তাবড় শিক্ষিতজন বিজ্ঞানীরা পর্যন্ত জ্যোতিষ বিশ্বাস করে, এরাও কোনো যুক্তি-ব্যাখ্যা-কার্য-কারণের ধার ধারে না। এ যেন আর্ক লাইটের নীচে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজের গায়ে কালি ঢেলে দেওয়া। সেই কারণে এরাও দিন-ক্ষণ-তিথি-নক্ষত্র বিচার করেই বিয়ে-শ্রাদ্ধ-অন্নপ্রাশন গৃহপ্রবেশ করে থাকেন। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীও দিন-ক্ষণ মেনেই প্রধানমন্ত্রীর সিংহাসনে বসেন। চলচ্চিত্রের পরিচালক- অভিনেতাও দিন-ক্ষণ দেখেই শুভ মহরৎ করেন। এমনকি সেই মুভি যদি জ্যোতিষ ও জ্যোতিষীদের বিরুদ্ধেও হয়, সেটাও দিন-ক্ষণ দেখেই হবে। দিন-ক্ষণ-তিথি-নক্ষত্রের কথাই যখন উঠল, তাহলে বাঙালিদের একমাত্র প্রিয় গ্রন্থ ‘পঞ্জিকা’ নিয়ে আলোকপাত করা যাক। এমন একটি বাঙালি হিন্দুঘর পাওয়া যাবে না, যাঁর ঘরে ‘পঞ্জিকা নেই। অবশ্য শুধু বাঙালি-হিন্দু নয়, ভারতের অন্যান্য প্রদেশেও ‘শুভদিন’ দেখার প্রথা আছে।

    বর্ষপঞ্জি বা পঞ্জিকাকে বাদ দিয়ে ধর্মপ্রাণা ভিতু মানুষদের এক দণ্ডও চলে না। জ্যোতিষবাবুদের মতে ‘পঞ্জিকা বছরের প্রতিদিনের তারিখ, তিথি, শুভাশুভ ক্ষণ, লগ্ন, যোগ, রাশিফল, বিভিন্ন পর্বদিন ইত্যাদি সংবলিত গ্রন্থ। একে পঞ্জি বা পাঁজিও বলা হয়। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে একে বলা হয়েছে ‘পঞ্চাঙ্গ। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও এটি এই নামে পরিচিত। এর কারণ এতে বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ ও করণ প্রধানত এই পাঁচটি অঙ্গ থাকে। বাংলায় অবশ্য এটি ‘পঞ্জিকা’ নামেই সুপরিচিত। সভ্যতা বিকাশের শুরু থেকেই সমাজসচেতন ব্যক্তিদের চিন্তা-চেতনায় কালবিভাগের ধারণাটি আসে। প্রয়োজনের তাগিদে তখন বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন উপায়ে বছর, মাস, দিন ও তারিখ গণনার কৌশল আবিষ্কৃত হয়। কালক্রমে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের পাশাপাশি পূজা-পার্বণের সময় নিরূপণও পঞ্জিকা প্রণয়নের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কালনিরূপণে বিভিন্ন দেশে ভিন্নরকম পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। বৈদিক যুগের ঋষিরা বিভিন্ন ঋতুতে নানারকম পূজা-পার্বণ করতেন। সেই কারণে তাঁরা বিশেষ ঋতুবিভাগের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেন। এসব উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তাঁরা ঋতুভিত্তিক বছর হিসাব করে বছরকে উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন এই দু-ভাগে ভাগ করতেন। সূর্য উত্তরদিকে আগমন করা থেকে উত্তরায়ণ এবং দক্ষিণদিকে যাত্রা করা থেকে দক্ষিণায়ন গণনীয় হত। প্রাচীন মনীষিগণ বছরকে বারো ভাগে বিভক্ত করেন। যেমন– তপঃ, তপস্যা, মধু, মাধব, শুক্র, শুচি, নভস্, নভস্য, ইষ, ঊর্জ, সহস্ ও সহস্য। তপঃ থেকে শুচি পর্যন্ত উত্তরায়ণ এবং নভস্ থেকে সহস্য পর্যন্ত দক্ষিণায়ন। অনুমান করা হয় যে, এরূপ সময়বিভাগ যর্জুবেদের কালে (১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) প্রচলিত ছিল। তিথির প্রচলন হয় অনেক পরে। শুধু সেই সময়কালে পূর্ণিমা, অমাবস্যা ও অষ্টকা ব্যবহৃত হত। কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে গণনা করে ২৭টি বা ২৮টি নক্ষত্রে ভূচক্রকে বিভক্ত করা হত। এটাই এতদঞ্চলের পঞ্জিকা গণনার আদিরূপ। বৈদিক সাহিত্যে ফাল্গুনী পূর্ণিমার উল্লেখ পাওয়া যায়। এতে অনুমিত হয় যে, তখন চান্দ্রমাস গণনার প্রচলন ছিল, যা পূর্ণিমান্ত মাস নামে পরিচিত।

    ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি পঞ্জিকায় বছর আরম্ভ হত উত্তরায়ণ দিবস থেকে এবং তাতে ১২টি চান্দ্রমাস ব্যবহৃত হত। এই পঞ্জিকায় ৩০টি তিথি এবং ২৭টি নক্ষত্র গণনার নিয়ম ছিল। তখন প্রতি পাঁচ বছরে একটি যুগ গণনা করা। হত এবং এক যুগ পরপর এই পঞ্জিকা গণনার পদ্ধতি আবর্তিত হত। ওই সময় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তিথ্যন্ত প্রভৃতি কাল গণনার পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি। মাত্র মধ্যমমানে প্রতিদিন এক তিথি এক নক্ষত্র এই হিসেবে তিথ্যাদি নির্ণয় করা হত এবং মাঝে মাঝে এক-একটি তিথি হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হত। পঞ্চবর্ষাত্মক যুগ ব্যতীত কোনো অব্দ গণনার প্রথা তখনও প্রবর্তিত হয়নি। দেড় হাজার বছর ধরে কালগণনা ও পূজা-পার্বণের সময় নিরূপণের কাজে এরূপ বেদাঙ্গজ্যোতিষ পঞ্জিকা খুবই সমাদৃত ছিল। গবেষকরা খ্রিস্টীয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতকে তাঁরা সূক্ষ্ম গণনার কৌশল আয়ত্ত করেন। এসব বিষয়ে যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তাঁরা হলেন আর্যভট্ট, বরাহমিহির, ব্ৰহ্মগুপ্ত প্রমুখ। তাঁরা পঞ্জিকার গণনাকে জ্যোতির্বিদ্যার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তিথ্যাদির সূক্ষ্ম কালগণনার সূত্রাদি দ্বারা দৈনিক গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান, লগ্ন, ক্ষণ, তিথি প্রভৃতির পূর্তিকাল পঞ্জিকার মধ্যে পরিবেশনের ব্যবস্থা করেন। এতে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সহজেই পঞ্জিকা থেকে পাওয়া যেত। এক্ষেত্রে সূর্যসিদ্ধান্ত জ্যোতির্বিদ্যার একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও মূল্যবান গ্রন্থ। পরে সূর্যসিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পঞ্জিকার সবকিছু গণনা করা হত। পঞ্জিকার মধ্যে তখন স্থান পেত বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ ও করণযুক্ত প্রতিদিনের পঞ্চাঙ্গ এবং তা তালপাতায় লিপিবদ্ধ করে গণকঠাকুর বা ব্রাহ্মণরা বছরের প্রারম্ভে গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে মানুষদেরকে অবহিত করতেন বা জনগণের সুবিধার্থে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এর অনুলিপি সংরক্ষণ করতেন। এসবের ভিত্তিতে পূজা-পার্বণাদি বা ধর্মকৃত্য সাধনের কালও নির্ণয় করা হত।

    সিদ্ধান্ত জ্যোতিষশাস্ত্রের উদ্ভবের আগে পঞ্জিকায় দৈনন্দিন গ্রহাবস্থান লেখা হত না। ক্রমে ক্রমে পঞ্চাঙ্গের সঙ্গে গ্রহসঞ্চারকালও পঞ্জিকায় লিপিবদ্ধ হতে থাকে। বিগত ১০০ বছরের অধিককাল যাবৎ বাংলা পঞ্জিকা মুদ্রিত হচ্ছে। পঞ্জিকায় এখন ফলিত জ্যোতিষের অনেক কিছু অর্থাৎ গ্রহ-নক্ষত্রের দৈনিক অবস্থানসমূহও পাওয়া যাচ্ছে। এখনকার পঞ্জিকায় ফলিত জ্যোতিষও বিশেষ স্থান দখল করেছে। জনগণের চাহিদার দিকে দৃষ্টি রেখে এখন পঞ্জিকায় বর্ষফল, মাসফল, রাষ্ট্রফল, দৈনিক রাশিফল প্রভৃতি মুদ্রিত হচ্ছে।

    প্রাচীনের মধ্যে স্মার্ত রঘুনন্দন সম্পাদিত নবদ্বীপ পঞ্জিকার নাম পাওয়া যায়। রঘুনন্দনের পরে এর গণনার দায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে রামরুদ্র বিদ্যানিধি (রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ে) এবং বিশ্বম্ভর জ্যোতিষার্ণব। কিছুদিন পরে এর গণনাকার্য বন্ধ হয়ে যায়। ইংরেজ আমলে কৃষ্ণনগরের জনৈক সমাহর্তার প্রচেষ্টায় বিশ্বম্ভর পুনরায় পঞ্জিকা প্রকাশের কার্যক্রম আরম্ভ করেন। এটি তখন পুথির আকারে লিখিত হত। ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে পঞ্জিকাটি মুদ্রিতাকারে প্রকাশিত হতে থাকে। তখন এটিই ছিল প্রথম মুদ্রিত পঞ্জিকা। পরবর্তীকালে ১২৯৭ বঙ্গাব্দ (১৮৯০) থেকে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা প্রকাশিত হতে থাকে। অনুরূপ পঞ্জিকা বোম্বাই ও পুনা থেকেও প্রকাশিত হয়। পঞ্জিকার সর্বশেষ সংস্কার করা হয় ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকারের তত্ত্বাবধানে। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার সভাপতিত্বে একটি পঞ্চাঙ্গ শোধন সমিতি (ক্যালেন্ডার রিফর্ম কমিটি) গঠন করে প্রচলিত পঞ্জিকাগুলির গণনাপদ্ধতির নিরীক্ষা ও প্রয়োজনবোধে সংস্কারের জন্য সুপারিশ করা হয়। এই সমিতির পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পঞ্জিকা প্রকাশনার দায়িত্ব গ্রহণ করা হয়। সে মতে ভারতে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে পঞ্জিকা প্রকাশিত হতে থাকে। বর্তমানে তা ১২টি ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে। বাংলা পঞ্জিকায় বাংলা, ইংরেজি ও হিজরি সনের তারিখ, মাস ও বছরের উল্লেখ থাকে। বাংলা বর্ষপঞ্জি গণনার সনাতন নিয়মে কোন্ বছরের কোন্ মাস কত দিনে হবে তা আগে থেকে নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। তা ছাড়া উক্ত গণনাপদ্ধতিতে কোনো মাস ২৯ দিনে আবার কোনো মাস ৩২ দিনে হয়ে থাকে। এ বিষয়টিকে জীবনের সর্বত্র বাংলা সন ব্যবহারের প্রধান অন্তরায় হিসাবে বিবেচনা করে ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে মোহম্মদ শহিদুল্লাহর সভাপতিত্বে একটি সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত সংস্কার কমিটির প্রস্তাব অনুসারে বছরের প্রথম ৫ মাস ৩১ দিনের এবং পরবর্তী ৭ মাস ৩০ দিনের করা হয়। ১৯৮৮ সাল থেকে সরকারিভাবে খ্রিস্টীয় সনের পাশাপাশি বাংলা সন লেখার রীতি চালু হয় এবং তখন থেকে শহিদুল্লাহ কমিটির প্রস্তাবিত গণনাপদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে বাংলা বর্ষপঞ্জির সম্পৃক্তির বিষয়টি মনে রেখে এবং প্রস্তাবিত গণনাপদ্ধতিকে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ও গ্রেগরীয় বর্ষগণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে একই বছর বাংলা একাডেমিতে একটি শক্তিশালী বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। পঞ্জিকাকে আরও উন্নত ও ত্রুটিমুক্ত করার জন্য ১৯৯৫ সালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রেরণায় একটি ‘টাস্ক ফোর্স’ গঠন করা হয়। পঞ্জিকা সংস্কারের জন্য তাদের সুপারিশ ছিল এরকম– (১) সাধারণভাবে বাংলা বর্ষপঞ্জি বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতিমাস ৩১ দিনে এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত প্রতিমাস ৩০ দিনে গণনা করা হবে।

    (২) গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির অধিবর্ষে যে বাংলা বছরের ফাল্গুন মাস পড়বে, সেই বাংলা বছরকে অধিবর্ষরূপে গণ্য করা হবে এবং সেই বছরের ফাল্গুন মাস ৩১ দিনে গণনা করা হবে।

    (৩) ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে এটি কার্যকর হবে এবং তারিখ পরিবর্তনের সময় হবে আন্তর্জাতিক রীতি অনুসারে রাত ১২টায়। জনকল্যাণে গৃহীত এ পদক্ষেপ সর্বত্র প্রশংসিত হয়।

    পঞ্জিকার ক্ষেত্রে চাঁদের তিথি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয়। পূর্ণ চান্দ্রমাসের স্থায়িত্ব ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা, ৪৩ মিনিট ১২ সেকেন্ড বা ২৯.৫ দিন। চাঁদ ৩৬০ ডিগ্রি অতিক্রম করে ২৯.৫ দিনে, তা হলে এক দিনে অতিক্রম করে ৩৬০ + ২৯.৫ = ১২.২০ ডিগ্রি, অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় অতিক্রম করে ১২.২০ ডিগ্রি। তার মানে এক দিনের চাঁদ পশ্চিম দিগন্তের ১২.২০ ডিগ্রি ওপরে ওঠে। আবার চাঁদ যখন অস্ত যায় তখন ১ ডিগ্রি অতিক্রম করতে সময় লাগে ৪ মিনিট, তা হলে ১২.২০ ডিগ্রি অতিক্রম করতে লাগে ১২.২০ x ৪ = ৪৮.৮০ মিনিট এবং সর্বোচ্চ ৫০.৫২ মিনিট বা ৫১ মিনিট। অর্থাৎ প্রথম দিনের চাঁদ ৫১ মিনিটের বেশি পশ্চিম আকাশে থাকতে পারে না।

    এই হল পঞ্জিকা। বস্তুত তিথি ও দিনের অংশকে বিভিন্ন করণ এবং যোগ নাম দিয়ে, তাদের শুভ অথবা অশুভ হিসাবে নির্ণয় করা সম্পূর্ণভাবে কল্পনাবিলাস, অবৈজ্ঞানিক জ্যোতিষগিরি! একটু আলোচনা করা যাক। মূলগতভাবে ভারতে দুই প্রকারের পঞ্জিকা দেখা যায়। একটি দৃকসিদ্ধ, অপরটি অদৃকসিদ্ধ। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রীয় পঞ্চাঙ্গ ইত্যাদি হল দৃকসিদ্ধান্ত। অন্যটি গুপ্তপ্রেস, পি এম বাগচি ইত্যাদি পঞ্জিকাগুলি অদৃকসিদ্ধ (বাংলাদেশের হিন্দু বাঙালিরা ‘লোকনাথ ডাইরেক্টরি পঞ্জিকা’ এবং মুসলিম বাঙালিরা মোহাম্মদী পকেট পঞ্জিকা অনুসরণ করেন)। দূরবীন দিয়ে দেখা জ্যোতিষ্কদের অবস্থানের সঙ্গে গণিতের অবস্থানের সমন্বয় সাধনের নিরন্তর প্রক্রিয়ার ফলে অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এফিমেরিসে অবস্থানগত নির্ভুল তথ্যাদি পাওয়া যায়। দৃকসিদ্ধ পঞ্জিকা জ্যোতিষ্কদের অবস্থান সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এফিমেরিস থেকে সংগ্রহ করা হয়। প্রতিনিয়ত সব তথ্য আপডেট হয়ে থাকে। অপরদিকে, আনুমানিক ৪০০

    খ্রিস্টাব্দে রচিত ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ গ্রন্থের উপর ভিত্তি করেই অদৃকসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার প্রণেতাদের যত দৌড়াদৌড়ি। সূর্যসিদ্ধান্ত যে সময় রচিত হয়েছিল তখনও পর্যন্ত দূরবীন আবিষ্কার হয়নি। খালি চোখে জ্যোতিষ্কদের কতটুকু দেখা যায়! বস্তুত অদৃকসিদ্ধ পঞ্জিকার প্রণেতারা সূর্যসিদ্ধান্ত অনুসারে যে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান। গণনা করেন তা প্রকৃত অবস্থানের সঙ্গে এক্কেবার মেলে না। কারণ বিশাল মহাকাশে গ্রহদের নির্ভুল অবস্থান জানার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের ‘অয়নচলন’ সূর্যসিদ্ধান্ত গ্রন্থে নেই। অদৃকসিদ্ধান্ত অনুসারে সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণ নির্ণয় করলে সব গুবলেট হয়ে যাবে। তাই এঁরা সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণ নির্ণয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারেই করে থাকেন। এসব ক্ষেত্রে অদৃকসিদ্ধান্তের প্রণেতাদের একমাত্র অবলম্বন ‘বাণবৃদ্ধিরসক্ষয়’। বাণবৃদ্ধিরসক্ষয়’ সূত্র অনুসারে তিথি বৃদ্ধি ৬৫ দণ্ডের বেশি এবং তিথি হ্রাস ৫৪ দণ্ডের কম হবে না, জ্যোতির্বিজ্ঞান এ সংজ্ঞা মেনে চলে না।

    আমাদের পঞ্জিকায় যেন দেবতার বাণী। পঞ্জিকা ছাড়া এক পা-ও চলতে পারে না। কতটুকু মানেন? ঠিক যতটুকু ব্যক্তিগতভাবে কোনো অসুবিধা হয় না ততটুকুই। সামান্যতম অসুবিধা থাকলে নিকুচি করেছে পঞ্জিকার! অতএব নৈব নৈব চ। পঞ্জিকা বলছে –রবিবারের পঞ্চম, সোমবারের দ্বিতীয়, মঙ্গলবারের ষষ্ঠ, বুধবারের তৃতীয়, বৃহস্পতিবারের সপ্তম, শুক্রবারের চতুর্থ, শনিবারের যামাৰ্দ্ধ এগুলিকে বলে কালবেলা। কালবেলা মানে, এ সময় যাত্রা করলে মৃত্যু হয়, বিবাহ দিলে কন্যার মৃত্যু হয়, মাথা ন্যাড়া করলেও মৃত্যু অনিবার্য। কে আছেন? কোন্ নিকম্ম মেনে চলেন এসব নিষেধাজ্ঞা? ভাবুন তো, বলছে আপনি যদি এমন কোনো বারে সেই বারের অধিপতির দিকে পিছন ফিরে যাত্রা শুরু করে, তাহলে তার মৃত্যু ঠেকায় কে! কে ঠেকায় জানি না। তবে আমি নিজে বহুবার এ ধরনের যাত্রা করেছি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বহাল তবিয়তেই আছি। দিকশূলের বিধান শুনবেন নাকি? শুনুন– রবিবার ও শুক্রবারে পশ্চিমদিক, মঙ্গলবার ও বুধবারে উত্তরে, সোমবার ও শনিবারে পূর্বে এবং বৃহস্পতিবারে দক্ষিণে যাত্রা করলে ভয়ানক বিপদ। যাত্রা নাস্তি’ বলছে যে! বিবাহ প্রকরণে বলছে– দিনের বেলা বিয়ে করা চলবে না। দিনের বেলায় বিয়ে করলে কন্যা পুত্রকন্যাবিবর্জিত হন, বিরহানলদগ্ধা ও স্বামীঘাতিনী হয়, উচ্চবর্ণের কোনো মেয়েকে যদি নিম্নবর্ণের ছেলে বিয়ে করে তাহলে নির্ঘাত মৃত্যু। আমি প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে দেখেছি রাত্রিবেলা অভ্যাগত অতিথিদের জন্য নিরাপদ নয় বলে দিনেরবেলাতেই বিয়ে সহ সমস্ত মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। অন্যান্য ধর্মেও বিয়ে অনুষ্ঠান দিনেরবেলাতেই হয়। এ নিয়ম এ বিধান যদি বুজরুকি না-হয়, তাহলে তো গ্রাম-গঞ্জ-অন্য ধর্মের সমাজ তো বিধবায় ভরে যেত, পুত্রকন্যাহীনা কন্যায় ভরে যত সেসব অঞ্চল। এখানেই শেষ নয়, পঞ্জিকা বলছে– “সুখপ্রসবমন্ত্র অশথপত্রে লিখিয়া প্রসূতির কেশের সহিত বাধিয়া দিলে প্রসবে কষ্ট হয়না।” হয়েছে নাকি এমন কোনো মিষ্টিমধুর অভিজ্ঞতা, কোনো অভিজ্ঞতা? এমন ঘটনা কি ঘটেছে কারোর, কখন আপনার সন্তান যন্ত্রণাহীন ভূমিষ্ঠ হয়ে গেছে আপনি বুঝতেই পারেননি?

    সাহা পঞ্জিকা কমিটির প্রস্তাব অনুসারে ভারত সরকার বাংলা দৃকসিদ্ধ পঞ্জিকা ‘রাষ্ট্রীয় পঞ্চাঙ্গ’ রচিত হয়। রাষ্ট্রীয় পঞ্চাঙ্গতেও সংযোজিত হয়েছে পৈতে, অন্নপ্রাশন, বিয়ের দিনক্ষণ, গণ-দশা, শুভাশুভ বিচার। দৃকসিদ্ধ পঞ্জিকা ‘বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত’-এ পাওয়া যাবে শুভদিনের নির্ঘণ্ট, তর্পণবিধি, নিত্যপূজাবিধি, জ্যোতিষ বচনার্থ, শবদাহ ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত বর্ষফল, রাষ্ট্রগত বর্ষফল, স্তব-কবচ প্রকরণ, ব্রত প্রকরণ ইত্যাদি। ভাষাচার্য সুকুমার সেন পঞ্জিকা বা পাঁজি প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন –প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের পাঁজির মূল পার্থক্য হল, আমাদের পাঁজি ধর্মকর্ম করার জন্য। ওদের পাঁজি জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা করে। পাওয়া যায় কবে জোয়ারভাটা হবে, কোনদিন চাঁদের আলো পাওয়া যাবে, কোনদিন চাঁদের আলো পাওয়া যাবে না ইত্যাদি। অপরদিকে আমাদের পাঁজি জ্যোতিষবিজ্ঞানের চর্চা করে। তার সঙ্গে শ্রাদ্ধ-শান্তি জাতীয় পারফরমেন্স মিলেছে। তাই বলি আমাদের পাঁজিটা বুজরুকি।

    আমি কালিদাস নামে এক জ্যোতিষবাবুকে জানতাম তিনি হাত-পা দেখতেন না, তিনি কেবলই রাশি রাশি কোষ্ঠী তৈরি করতেন। বেশিরভাগ হাত-পা দেখা জ্যোতিষবাবুরা কোষ্ঠী তৈরি করেন না। ওটা করা নাকি খুবই হ্যাপা! তাই অন্য কোনো অভিজ্ঞ জ্যোতিষবাবুকে দিয়ে অল্প কিছু অর্থের বিনিময়ে করিয়ে নেন। কোষ্ঠীর বিজ্ঞান-অপবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনার আগে জ্যোতিষবাবুরা কী বলছেন সেটা দেখে নিই।

    কোষ্ঠী হল জন্মপত্রিকা। এতে নবজাতকের জন্মসময়ে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ও সঞ্চরণ অনুযায়ী তার সমগ্র জীবনের শুভাশুভ নির্ণয় করা হয়। খ্রিস্টপূর্বকালে ভারতবর্ষে কোষ্ঠী গণনার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের পরে শাকদ্বীপ (পারস্য-কান্দাহার-সাইথিয়া-কাশ্মীরের উত্তরের দেশ) থেকে আগত জনগোষ্ঠী এ দেশে কোষ্ঠী গণনা পদ্ধতি প্রবর্তন করে বলে মনে করা হয়। খ্রিস্টীয় ছয় শতকের ভারতীয় জ্যোতিষী বরাহমিহিরের গ্রন্থে কোষ্ঠীপদ্ধতির প্রথম পরিচয় পাওয়া যায়। তাই অনুমান করা হয়, এর দু-তিনশ বছর পূর্বে ভারতবর্ষে কোষ্ঠী গণনা শুরু হয়। কোষ্ঠী গণনা পাশ্চাত্যের অনেক দেশেও প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত আছে। কোষ্ঠী গণনার ক্ষেত্রে রাশি, গ্রহ ও লগ্ন তিনটি প্রধান বিষয়। মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীন– এই বারোটি রাশি এবং রবি, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, রাহু ও কেতু– এই নয়টি গ্রহকে একটি চক্র বা ছকে বারোটি প্রকোষ্ঠে এ রাশিগুলি দেখানো হয়। পরে পঞ্জিকা অনুযায়ী জাতকের জন্মকালে গ্রহগুলির রাশিভিত্তিক অবস্থান নির্ণয়পূর্বক উক্ত চক্র বা ছকে রাশি অনুযায়ী গ্রহগুলির নামের আদ্যক্ষর লেখা হয়। এরপর লগ্ন নির্ণয় করে লগ্নবোধক রাশিটিকে ‘লং’ শব্দ দ্বারা নির্দেশ করলেই জন্মপত্রিকা তৈরি হয়ে যায়।

    কোষ্ঠী গণনার এই চক্র বা ছকের অঙ্কনপদ্ধতি সর্বত্র একরকম নয়। ভারতবর্ষেই তিন রকম এবং পাশ্চাত্যে অন্যরকম। দক্ষিণ ভারত ব্যতীত অন্য সব স্থানের চক্রের গতি বামাবর্তী। বঙ্গদেশ ও দক্ষিণ ভারতের রাশিচক্র স্থির– মেষ রাশি থাকে সর্বদা শীর্ষদেশে এবং লগ্ন পরিবর্তনশীল। কিন্তু উত্তর ভারত ও পাশ্চাত্যে রাশিচক্র স্থির নয়, যে-কোনো স্থানে রাশি অবস্থান করতে পারে, তবে লগ্ন সর্বদাই একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে। উত্তর ভারতের ছকে লগ্ন থাকে শীর্ষদেশে এবং পাশ্চাত্যে থাকে বাম পাশে। প্রতিটি রাশির নির্দিষ্ট অধিপতি গ্রহ থাকে, যেমন মকর ও কুম্ভ রাশির অধিপতি শনি, মীন ও ধনু রাশির বৃহস্পতি, মেষ ও বৃশ্চিক রাশির মঙ্গল, বৃষ ও তুলা রাশির শুক্র, মিথুন ও কন্যা রাশির বুধ, কর্কট রাশির চন্দ্র এবং সিংহ রাশির রবি। লগ্ন হল সূর্য কর্তৃক মেষাদি রাশি সংক্রমণের মুহূর্ত, অর্থাৎ সূর্য যখন যে রাশিতে অবস্থান করে তখন লগ্নও হয় সে রাশির নামানুসারে। যেমন সূর্যের মেষ রাশিতে অবস্থানকালে যদি কারও জন্ম হয় তাহলে তার লগ্ন হবে মেষলগ্ন। লগ্নের মেয়াদ হল দুই ঘণ্টা, অর্থাৎ দুই ঘণ্টা পরপর লগ্ন পরিবর্তিত হয়। কোষ্ঠী তৈরির সময় এ রাশি, গ্রহ ও লগ্ন নির্ণয়ে কোনোরূপ ভুল হলে জাতকের ভবিষ্যৎ গণনাও ভুল হবে। কোষ্ঠী অনুযায়ী কারও ভবিষ্যৎ গণনার সময় তার জীবনের বিভিন্ন ঘটনা বারোটি ভাগে ভাগ করা হয়, যার নাম ‘ভাব’। বারোটি ভাব হচ্ছে তনু (শরীর), ধন, সহজ (সহোদর), বন্ধু (এবং মাতা), পুত্র (এবং বিদ্যা), রিপু (এবং রোগ), জায়া (বা স্বামী), নিধন (মৃত্যু), ধর্ম (এবং ভাগ্য), কর্ম (এবং পিতা), আয় ও ব্যয়। যে রাশিতে লগ্ন অবস্থিত সেখান থেকে তনুর বিচার শুরু হয়, তারপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ভাব গণনা করা হয়। কোষ্ঠীবিচারের এসব মূল সূত্র প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সর্বত্রই প্রায় একরকম। তবে ভারতীয় জ্যোতিষে একটি বিশেষ বিষয় হল দশা গণনা পদ্ধতি। জাতকের ভবিষ্যৎ জীবনে কখন কী ঘটবে তা এ পদ্ধতিতে নির্ণয় করা হয়। জাতকের জন্মনক্ষত্র অনুযায়ী দশা নির্ণীত হয়। দশা গণনার ৪২ রকম পদ্ধতি থাকলেও অষ্টোত্তরী ও বিংশোত্তরী পদ্ধতি দুটিই বেশি ব্যবহৃত হয়। অতীতে সম্ভ্রান্ত পরিবারে নবজাতকের কোষ্ঠী তৈরি একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল। কোষ্ঠী তার জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষত বিবাহের ক্ষেত্রে গুরুত্ব সহকারে বিচার করা হত। পাত্রপাত্রী উভয়ের কোষ্ঠী বিচার করে কোনো বিষয়ে কোনো অশুভযোগ দেখা না-গেলে তবেই তাদের মধ্যে বিবাহ অনুষ্ঠিত হত। বর্তমানে কোষ্ঠী তৈরির তেমন প্রচলন না-থাকলেও জন্মানোর ও জন্মক্ষণ অনুযায়ী রাশি নির্ণয় করে হস্তরেখাবিদগণ মানুষের ভাগ্যগণনা করে থাকেন এবং হস্তরেখাবিদ্যা এখন একটি প্রায়োগিক বিদ্যা হিসেবে সমাজে প্রচলিত। (কৃতজ্ঞতা : দুলাল ভৌমিক)

    জটিলতা এবং অনিশ্চয়তায় ভরা আমাদের জীবন। জীবন ছোটোই হোক কিংবা বড়ো –অনেক চড়াই-উৎড়াই পথ বেয়ে চলতে হয় সকলকে। অনেক ঘটনার স্রষ্টা আমরা নিজেরা হলেও, সব ঘটনাই আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তবে আপনি আমগাছ পুঁতলে কখনোই সেই গাছে আম না-ফললেও জাম ফলতে পারে না। ফলাতেও পারবেন না। যেমনভাবে জীবন গড়বেন ফল পাবেন। তেমনই। খুব বেশি অন্যথা হয় না, যদি ফাঁকি না-থাকে। কোষ্ঠীতে যাই-ই লেখা থাক, সব বদলে যাবে আপনার অধ্যবসায়ে। কত বদলে যায় এরকম! কোষ্ঠীতে লেখা অনেক কিছুই মেলে না। আমরা মেলানোর ভান করি। ছল করি। যা মেলে তাতে মানুষের কিছু যায় আসে না। কোষ্ঠীতে হয়তো আছে ২৩ বছর বয়সে জাতক/জাতিকা মাথার কোনো সমস্যা হতে পারে। দেখা গেল ২৩ বছর বয়সে জাতকের পিতৃবিয়োগ হওয়ার দরুন মস্তক মুণ্ডন করতে হল। কোষ্ঠী পিতৃবিয়োগের সংবাদ আগাম না-জানাতে পারলেও মাথার মুণ্ডন অবস্থাকে ‘মাথার সমস্যা’ বলে মিলিয়ে দেওয়া যাবে।

    সিন্ধুলিপি এখনও পড়তে পারিনি ঠিকই, কিন্তু মানুষের বিধিলিপি পড়ে ফেলতে জ্যোতিষবাবুরা খুবই পটু। আপনার মৃত্যু পর্যন্ত জ্যোতিষবাবুরা দেখতে পান কোষ্ঠী-কোডে। চ্যানেলে চ্যানেলে কী আওয়াজ তাঁদের! সব ভেক ধরে বসে আছে ছক হাতে ছকবাজিতে। কোষ্ঠী যে সম্পূর্ণ ভাঁওতা তা আমি প্রবন্ধের শুরুতেই আকাশবাণীর ঘটনাতেই (দুর্ঘটনাই বলতে পারেন) জানিয়েছি।

    শুধু হাত-পা দেখলেই কি জ্যোতিষবাবুদের পেট মানবে! শুধু হাত দেখে বেড়ানো মানে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো বোঝায়। তাই হাত দেখে জাতককে খুশি করার জন্য যতই ভালো ভালো কথা বলি-না কেন, মন্দ কথা তো বলতেই হবে। আপনাকে ভয় পাইয়ে দিতে না-পারলে আমার রোজগার আসবে কোত্থেকে! পাথর বেচতে না-পারলে ফায়দা কীসের? আপনি ভিখারি হবেন, আমার অট্টালিকা। সেটা অবশ্য আপনার আর্থিক অবস্থা কেমন সেটা আঁচ করে নেওয়া হবে। তারপর রবি, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শুক্র, রাহু, কেতু– যেকোনো একটার অবস্থা খুব খারাপ এবং খারাপ থাকার জন্য আপনার ভয়ংকর হতে পারে। যদি পাথরের ব্যবস্থা নেন– তবে আপনি মামলা মোকদ্দমায় জিতে যাবে, আপনার বা আপনার ছেলের বা মেয়ের চাকরি হয়ে যাবে, স্বামী বা স্ত্রী পরকীয়া ছেড়ে ঘরে ফিরে আসবে ইত্যাদি। ঘরের সোনা বিক্রি করেই হোক বা জমি জমি বিক্রি করেই হোক, পাথর যে আপনাকে ধারণ করতেই হবে। জ্যোতিষবাবু বলেছেন! কত রকম ভয় দেখিয়ে যে জ্যোতিষবাবুরা পাথর বেচেন, তা বলে শেষ করা যাবে না। সত্যিই পাথর পারে এসব করে দিতে? পাথর কী?

    রত্নের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরদিনের। সুপ্রাচীন কাল হতে রত্ন-পাথর ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মানুষ বিশেষ ভাবে মূল্য দিয়েছে রত্নকে আজও দিচ্ছে। পান্না, হীরা, মুক্তা, পোখরাজ, ওপ্যাল, গোমেদ ইত্যাদি রত্ন-পাথরগুলোর বেশীর ভাগই খনিজ পদার্থ। যুগ যুগ ধরে প্রচন্ড চাপ ও তাপে ভূগর্ভে সৃষ্টি হয়ে থাকে রত্ন-পাথর। সে কারণেই প্রাকৃতিক বা খাঁটি রত্নগুলো দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান। অনেক সাধারণ মানুয়ের ক্রয়ক্ষমতা ও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আসল রত্নের মূল্য প্রচুর। রাজা-বাদশারাই সেগুলি ব্যবহার করতে পারে। যেমন কোহ-ই-নুর বা কোহিনুর হিরে। একরকম বহু মূল্যবান রত্ন মণিমাণিক্য দিয়ে রাজা-বাদশা রানিদের মুকুট, কোমরবন্ধ, বাজুবন্ধে খোচিত করে বারফাট্টাই দেখাত। কোন্ রাজা কত শৌখিন কত তাঁর রত্নভাণ্ডার আছে তা দেখানোর আয়োজন চলত পোশাকে-মুকুটে। কোহিনুর হিরে ছিল শাহজাহানের অহংকার, এখন ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথের অহংকার।

    সেই মহামূল্যবান রত্নের মর্যাদা এখন গ্রহশান্তির জন্য তলানিতে এসে ঠেকেছে। এখন ঠগ-প্রতারক জ্যোতিষীবাবুদের রুজিরোজগারের পথ দেখাচ্ছে। রত্ন (Gems) এখন পাথরে (Stone) এসে জলের দামে বিকোচ্ছে। মামলা মোকদ্দমা জিতিয়ে দিচ্ছে, সন্তানের চাকরি পাইয়ে দিচ্ছে, মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে, অশান্ত সংসারে শান্তি ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। মুরগি, থুড়ি রোগীদের মহামূল্যের রত্ন ব্যবহার করতে বললে তো সব অজ্ঞান হয়ে যাবে। তাই ভুখা থেকে চোখা –সকলেই যাতে পাথর কিনে ব্যবহার করতে পারে তার ব্যবস্থা হল। আধুনিক প্রযুক্তি আজ এগিয়ে এসেছে রত্নকে সুলভ করার কাজে। যাতে জ্যোতিষবাবুরা খেয়েপড়ে বেঁচে থাকে। কৃত্রিম উপায়ে রত্ন-পাথর তৈরি করতেও সক্ষম হয়েছে মানুষ। ফলে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে কৃত্রিম রত্ন, যেগুলি সৌন্দর্যে প্রাকৃতিক রত্নের মতোই। কৃত্রিম রত্ন তৈরি হওয়ার ফলে রত্ন পাথর চলে এসেছে সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার নাগালের ভিতর এবং পাওয়া যাচ্ছে দেশে দেশে। কৃত্রিম রত্ন তৈরির প্রচেষ্টাটি প্রচীনকালেও ছিল। প্রাচীন মিশরীয় এবং রোমানদের তৈরি বিভিন্ন রকম নমুনা জাদুঘরে দেখা যায়। তবে সেগুলি গুণগত মানে ও রূপে অক্ষম। কৃত্রিমভাবে তৈরি রত্ন-পাথরকে কয়েকটি সম্পূর্ণ আলাদা দলে বিভক্ত কর যায়। যেমন —

    (১) ইমিটেশন অর্থাৎ নকল রত্ন।

    (২) সিনথেটিক অর্থাৎ সংশ্লেষিত রত্ন এবং

    (৩) কৃত্রিম ভাবে তৈরি ডাবলেট রত্ন।

    (i) ইমিটেশন বা নকল রত্ন প্রাকৃতিক রত্নের অনুকরণেই করা হয়। চোখে দেখার মিলটুকু ছাড়া আর কোনো অর্থেই এরা প্রাকৃতিক বা আসল রত্নের মতো সাধারণত হয় না। এতে একই রকম দেখতে অন্য জিনিসকে সুকৌশলে রত্নের মতো করে তোেলা হয়। কিছুটা আসলের মতোই এই রত্ন প্রচুর তৈরি করে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। এদিক থেকে এদের উপযোগিতা আছে বৈকি। ইমিটেশন বা নকল রত্নের অধিকাংশ তৈরি হয় বিশেষ ধরনের কাঁচ থেকে। এ কাঁচ যেন খুব বিশুদ্ধ হয়, ক্ষুদ্র বাবলস বা বুদবুদ ইত্যাদি থেকে মুক্ত হয়, সে ব্যাপারে বিশেষ যত্ন নেওয়া হয় প্রাকৃতিক বা খাঁটি রত্নের মতো অনুরূপ রং দেওয়ার জন্য গলিত অবস্থায় এ কাঁচের সঙ্গে বিভিন্ন রকম ধাতব অক্সাইড মেশানো হয়। যেমন নীলের জন্য– কোবালট অক্সাইড, সবুজের জন্য– কুৎপ্রিক অক্সাইড, বেগুনির জন্য– ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইড ইত্যাদি। কাঁচকে বিভিন্ন তলে ঘষে কাটা প্রাকৃতিক রত্নের রূপ ও ঔজ্জ্বল্য দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সব কাটা তলের নিম্ন পৃষ্ঠগুলিতে অনেক সময় আয়নার মতো প্রতিফলকের ব্যবস্থা করা হয় যাতে প্রাকৃতিক বা আসল রত্নের দীপ্তিও খানিকটা আসে। এ ধরনের নকল রত্নকে অবশ্য প্রাকৃতিক রত্ন থেকে আলাদা করা মোটেই কোনো কঠিন কাজ নয়। এরা কম শক্ত বলে অনায়াসে এদের গায়ে আঁচড় কাটা যায়। খনিজ বা প্রাকৃতিক রত্নের তুলনায় এদেরকে স্পর্শে উষ্ণ অনুভূত হয়। আলোর প্রতিসরণাঙ্কের ক্ষেত্রেও এদের সঙ্গে প্রাকৃতিক রত্নের অনেক তফাত। তা ছাড়া এক্সরে ছবি নিলেই বোঝা যায় যে নকল রত্নের সত্যিকার কোনো কেলাসিত রূপ নেই।

    (ii) অপরদিকে সংশ্লেষিত রত্ন সব অর্থেই প্রাকৃতিক রত্নের অনুরূপ। প্রকৃতিতে ধীরে ধীরে তৈরি না-হয়ে এটি বিভিন্ন উপাদানের সংশ্লেষণে যন্ত্রপাতির মাধ্যমে তৈরি হয়, এই অর্থেই শুধু এটি কৃত্রিম। বস্তুগত দিক থেকে, যেমন রাসায়নিক গঠন, কেলাসন, আলোকগুণ এবং অন্যান্য সব ভৌত গুণে এরা প্রাকৃতিক রত্নের সঙ্গে অভিন্ন। সংশ্লেষিত রত্ন তৈরি অনেক বেশি ব্যয়সাপেক্ষ, তাই শুধু দামি রত্নগুলির ক্ষেত্রেই এটি করা হয়। আজকাল সংশ্লেষিত হিরে, চুনি, নীলা, পান্না সবই পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লেষিত হিরের একটি সুবিধা হল একে ইচ্ছামতো রঙিন করা সম্ভব নানা রকম বিজাতীয় পদার্থের স্বল্প অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে। প্রথমদিকে কৃত্রিম হিরের আকার এত ছোটো হত যে তা রত্ন-পাথর হিসাবে ব্যবহারের উপযুক্ত ছিল না। কিন্তু সত্তরের দশক থেকে আকারে ও সৌন্দর্যে রত্ন হওয়ার উপযুক্ত হিরে সংশ্লেষিত হচ্ছে, এদের উৎপাদন ব্যয়ও ধীরে ধীরে কমে আসছে। চুনি ও নীলা আসলে একই রত্ন-পাথর, শুধু এদের রংটুকু ছাড়া অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের প্রবাহের মাধ্যমে সৃষ্ট তীব্র উত্তাপে অ্যালুমিনিয়াম অক্সাসাইডের গুঁড়োকে গলিয়ে এবং পরে তাকে কেলাসিত হতে দিয়ে চুনি ও নীলা সংশ্লেষিত করা হয়। তৈরির সময় সঙ্গে পরিমাণমতো ক্রোমিয়াম অক্সাইড মেশালে তা চুনির লাল রং হয়। আবার এর বদলে টিটানিয়াম অক্সাইড দেওয়া হলে সৃষ্টি হয় নীল রঙের নীলা। ১৯৩০ সালে প্রথম পান্না তৈরি সম্ভব হয়।

    (iii) কৃত্রিম ডাবলেট রত্নগুলি হল এতে উপরে সত্যিকার রত্নের পাতলা করে কাটা একটু আবরণ থাকলেও তাকে জুড়ে দেওয়া হয় নকল অথবা নিকৃষ্ট রত্নের ব অংশের সঙ্গে। ডাবলেট রত্ন তৈরি করার কৌশলটিও কিন্তু বেশ লক্ষণীয়। এতে উপরের পাতলা দামি রত্নের অংশ নীচের নকল অংশের সঙ্গে উপযুক্ত আঠা দিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়। হিরের ডাবলেটের ক্ষেত্রে পাতলা আসল হিরে, জারকন অথবা রক ক্রিস্টালের মতো অপেক্ষাকৃত সস্তা। কিন্তু অনুরূপ কেলাসের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। অন্যান্য দিক থেকে একইরকম দেখতে হলেও চুনি, নীলা বা পান্নার ডাবলেটের জন্য সাধারণত উপরে এলমেডাইন নামক স্বচ্ছ কেলাসের পাতলা আবরণ এবং নীচে সঠিক রঙের কাঁচ ব্যবহৃত হয়।

    কৃত্রিম রত্ন আধুনিক প্রযুক্তির একটি চমৎকার সুকৌশল। ইমেটেশন বা নকল রত্ন ও কৃত্রিম ভাবে তৈরি ডাবলেট রত্ন-পাথরগুলি বিচার-বিশ্লেষণের অনুপযুক্ত।

    যদিও আসল রত্ন আপনি কোনোদিন দেখতে পাবেন না দু-একটা ছাড়া (কারণ সেগুলি পাথর নয়), তবুও সুযোগ পেলে রত্ন-পাথর আসল কি নকল কীভাবে বুঝবেন সেটা জেনে নেওয়া যেতেই পারে। বাজারে নানারকম রত্ন-পাথর পাওয়া যায়। চোখ ধাঁধিয়ে যায় তাদের রং আর উজ্জল বর্ণচ্ছটার আভা দেখলে। জ্যোতিষবাবু কিংবা জুয়েলারি থেকে যে রত্ন-পাথরটি কিনছেন হাজার হাজার টাকা গাঁটগচ্ছা দিয়ে, সেসব রত্ন-পাথরের ভিড়ে কী করে চেনা যাবে কোনটা আসল। রত্ন-পাথর আসল কি নকল বোঝার জন্য অভিজ্ঞ চোখ প্রয়োজন। প্রথমত, রত্ন-পাথরের আকৃতি, রং, স্বচ্ছতা ও এর ভিতর সুক্ষ যেসব অবাঞ্চিত পদার্থ থাকে, তার বিন্যাস দেখে প্রাথমিক ধারণা তৈরি করতে হবে। এ ব্যাপারে সঠিক ধারণা পাওয়ার জন্য অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্য নিতে হবে। তবে রত্ন পাথর যাচাই করার সব চেয়ে ভাল উপায় হল রত্ন-পাথরের প্রতিসরণাংক (Refractive Index)যাচাই করা। রত্ন-পাথরের প্রতিসরণাংক জানা থাকলে তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে রত্ন-পাথরের সঠিক পরিচয় পাওয়া সম্ভব। কারণ কোনো বিশেষ রত্ন-পাথরের প্রতিসরণাঙ্ক নির্দিষ্ট, এর হেরফের বিশেষ দেখা যায় না। যেমন হিরের প্রতিসরণাংক ২.৪১৭। এ ছাড়া বিচ্ছুরণ (Dispersion) ধর্ম যাচাই করেও রত্ন-পাথর আসল কিংবা নকল তা যাচাই করা সম্ভব। তাছাড়া রত্ন-পাথরের কাঠিন্যতা (hardness), আপেক্ষিক গুরুত্ব (Specific gravity) ইত্যাদি ধর্ম যাচাই করে সহজেই নকল ও আসল রত্ন-পাথর চেনা যায়।

    আসল রত্ন রাসায়নিক বিশ্লেষণ করলে —

    (১) চুনি বা Ruby : লাল রঙের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম কোরান্ডাম (Corundum), অ্যালুমিনিয়াম এবং অক্সিজেনই হল এর মূল উপাদান।

    (২) নীলা বা Blue Sapphire : নীল বা হলুদ রঙের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নামও কোরান্ডাম (Corundum), অ্যালুমিনিয়াম এবং অক্সিজেনই হল এর মূল উপাদান।

    (৩) পান্না বা Emerald : সবুজ বা স্বচ্ছ রঙের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম বেরিল (Beryl)। বেরিলিয়াম, সিলিকন, অক্সিজেন এবং অ্যালুমিনিয়াম হল মূল উপাদান।

    (৪) বৈদুর্যমণি বা Cats Eye : হলুদ বা সবুজ বা খয়েরি রঙের রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম ক্রাইসোবেরিল (Chrysoberyl)। বেরিলিয়াম, অক্সিজেন, অ্যালুমিনিয়াম এই রত্নটির মূল উপাদান।

    (৫) গোমেদ বা Garnet : লাল বা বাদামি বা কমলা রঙের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম গারনেট (Garnet) লোহা, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন এবং অক্সিজেনই মূল উপাদান।

    (৬) চন্দ্রকান্ত বা Moon Stone : ধূসর রঙের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম ফেলসপার (Feldspar) পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন এবং অক্সিজেন এই রত্নটির মূল উপাদান।

    (৭) সূর্যকান্তমণি বা Sun Stone; স্বচ্ছ এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম কোয়ার্টজ (Quartz) মূল উপাদান সিলিকন, অক্সিজেন।

    (৮) সন্ধ্যামণি বা Amethyst : স্বচ্ছ এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম কোয়ার্টজ (Quartz) মূল উপাদান সিলিকন, অক্সিজেন।

    (৯) পোখরাজ বা Sapphire : স্বচ্ছ বা হালকা হলুদ বা হালকা নীল রঙের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম টোপাজ (Topaz) মূল উপাদান অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন, অক্সিজেন, হাইড্রোজেন এবং ফ্লোরিন।

    (১০) নীলকান্তমণি বা Tarquous : অস্বচ্ছ নীল বা নীলাভ সবুজ রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম টারকোয়েস (Tarquous)। কপার, ফসফরাস, অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, ফ্লোরিন হল মূল উপাদান।

    (১১) বৈক্ৰান্তমণি বা Zircon : অস্বচ্ছ এই রত্নের বৈজ্ঞানিক নাম জারকন। (Zircon) মূল উপাদান জার্কনিয়াম, সিলিকন ও অক্সিজেন।

    (১২) মুক্তা বা Pearl : এটি খনিজ পদার্থ নয়, প্রাণীজ পদার্থ। স্বাভাবিক মুক্তা ঝিনুকের মাংসল শরীরের ভিতর পাওয়া যায়। সাদা রঙের এই জৈব রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম Organic Gems। মূল উপাদান হল ক্যালসিয়াম, কার্বন ও অক্সিজেন।

    (১৩) প্রবাল বা Corel : এটি খনিজ পদার্থ নয়, প্রাণীজ পদার্থ। এক ধরনের ক্ষুদ্র জীবের মৃতদেহ। শুধুমাত্র সমুদ্রের নীচেই পাওয়া যায়। গাঢ় রক্তবর্ণ বা হলুদাভ রক্তবর্ণ, গেরুয়া সাদা রঙের রত্নটির বৈজ্ঞানিক নামও Organic Gems। মূল উপাদান হল ক্যালসিয়াম, কার্বন ও অক্সিজেন।

    রত্নগুলি কীরকম ভাটের জিনিস দেখুন :

    (১) চুনি এবং নীলার মূল উপাদান একই। অথচ গ্রহ আলাদা। অথচ গ্রহরোষও আলাদা। অথচ রবি খারাপ হলে চুনি দেওয়া হয় এবং শনি খারাপ হলে নীলা ধারণ করতে বলা হয়। মানে আমার হার্টের সমস্যা হলে যে ওষুধ নেব, আমাশয় হলেও সেই একই কন্টেন্টের ভিন্ন নামেরওষুধ নেব?

    (২) সূর্যকান্তমণি এবং সন্ধ্যামণি রত্নের উপাদান একই। গ্রহ আলাদা। গ্রহরোষও আলাদা। রবি খারাপ হলে সূর্যকান্তমণি এবং শনি খারাপ হলে সন্ধ্যামণি। চুনি ও নীলার উপাদান এবং সূর্যকান্তমণি ও সন্ধ্যামণির উপাদান একেবারেই এক নয়। তাহলে ভিন্ন উপাদানে একই গ্রহের মাথা ঠান্ডা হয় কী করে? জ্যোতিষবাবুরা উত্তর দিতে পারেন না। কোনো জ্যোতিষীবাবু উপর চালাকি করতে গিয়ে বা ওভার স্মার্ট ন্যাজে-গোবরে হয়ে যান।

    রত্ন আসল হোক কিংবা নকল হোক– জ্যোতিষবাবুরা সেগুলি ব্যবহার করার নিদান দেন গ্রহশান্তির জন্য। এই রত্নগুলি কীভাবে ক্রোধী গ্রহদের মাথা ঠান্ডা রাখার দায়িত্ব নেয়! জ্যোতিষবাবুরা কী বলেন সেটা আগে জেনে নিই– “মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গ পরমাণুর সমন্বয়ে সৃষ্ট। সৌরমণ্ডলের গ্রহগুলিও পরমাণুর সমষ্টি। আর বিভিন্নপ্রকার রত্নগুলি এমন সব পদার্থের সমন্বয়ে সৃষ্ট যার উপস্থিতি মানবদেহেও বিদ্যমান। বিভিন্ন প্রকার রত্ন সরাসরি মানবদেহের ত্বককে স্পর্শ করে শরীরের উপর ইলেকটো ম্যাগনেটিক (Electro Magnetic) প্রভাব বিস্তার করে, মানবদেহের বিদ্যমান যে-কোনো পদার্থের অসামঞ্জস্যপূর্ণ উপস্থিতির সামঞ্জস্য রক্ষা করে বিভিন্নপ্রকার রত্ন বিভিন্ন গ্রহের রশ্মি অতিমাত্রায় আকর্ষণ বা বিকর্ষণ করতে পারে। তাই রত্ন ধারণ করে স্নায়ুর উপর বিশেষ বিশেষ গ্রহের রশ্মি যোগ বা বিয়োগ করে শক্তিশালী করা সম্ভব। ফলে স্নায়ুগুলি শক্তিশালী হবে ও নতুন চিন্তা চেতনায় জীবন প্রবাহের ক্ষেত্রে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নেবে। আলোকরশ্মি, বায়ুমণ্ডল ভেদ করে পৃথিরীর ভূভাগের উপর পতিত হয়। গ্রহদের যেমন নিজস্ব তেজ বিকিরণের ক্ষমতা আছে, প্রতিটি রত্মেরও তেমনই পৃথক পৃথক তেজ আহরণের ক্ষমতা আছে। সূর্য এবং গ্রহমণ্ডল থেকে বেরিয়ে আসা এই আলোকরশ্মিই আমাদের উপর নানাভাবে কাজ করে। ভুগর্ভে বা সমুদ্রগর্ভে যে সকল রত্ন-পাথর সৃষ্টি হয় তাহাও ওই সৌররশ্মিরই রাসায়নিক ক্রিয়ার ফল। মানবদেহের উপর কসমিক রশ্মির (Cosmic Ray) প্রভাব বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত। সূর্যের আন্ট্রাভায়োলেট রশ্মি (Ultra-Violet Ray) ও অপরাপর রং বিভিন্ন প্রকার রত্ম-পাথর এবং এর অভ্যন্তরীণ প্রচ্ছন্ন শক্তির উপর পরোক্ষ ও প্রত্যেক্ষভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে মানবদেহে সংক্রামিত বিভিন্ন প্রকার ব্যাধির প্রতিকার করতে পারে। উল্লেখ্য, রত্নগুলিতেও বিভিন্ন রং বিদ্যমান। প্রাচীন জ্যোতিষবিগদগণ হাতের বিভিন্ন স্থানে বিবিধ গ্রহের অবস্থান ধরে সে স্থানগুলিকে বিবিধ রঙের Reflection উল্লেখ করেছেন। আর বিভিন্ন প্রকার রত্ন-পাথরের রং যে ভিন্ন ভিন্ন তার সঙ্গে গ্রহ ও নক্ষত্রের রঙর সাদৃশ্যও তাঁরা এভাবে পেয়েছেন। সুতরাং জ্যোতিষে রত্নের ব্যবহার অভ্রান্ত নয় বলেই মনে হয়। তবে রত্ন-পাথরের যথাযথ প্রয়োগ কৌশল। সম্পর্কে খুব অল্প সংখ্যক মানুষ অবহিত। একথা মনে রাখতে হবে যে, ভুল ঔষধ সেবনের কারণে বা প্রয়োজন ব্যতিত ঔষধ ব্যবহারে যেমন জীবননাশ বা ক্ষতি হতে পারে, তেমনই প্রয়োজন ছাড়া রত্ন ব্যবহার বা যথার্থ রত্নের ভুল ব্যবহারের কারণেও মারাত্বক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাও প্রচুর। তাই রত্ন-পাথর ব্যবহারে বিশেষজ্ঞ বা অভিজ্ঞ জ্যোতিষের পরামর্শ একান্ত কর্তব্য। ভুললে চলবে না যে অণুর সমম্বয়েই রত্নের উৎপত্তি আর দ্রব্য গুণ অনস্বীকার্য।”

    এই হল জ্যোতিষবাবুদের রত্ন-পাথরের সপক্ষে বিবৃতি। পশু বা মানুষের রক্ত গায়ে মাখলে মানুষের শরীরের রক্তাল্পতা কমে যায়? যদি কেউ বলেন –হ্যাঁ, যায়। মাফ করবেন, তবে তার মানসিক সুস্থতা নিয়ে সন্দেহ জাগছে। তাহলে কি আপনি আয়রন ট্যাবলেট বা কুলেখাড়া শাকের রস না-খেয়ে পাথর বা ধাতু বা শিকড় ধারণ করবেন? তাই কি করেন? মানবদেহে অল্প বা নির্দিষ্ট পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের মৌলিক দ্রব্যের বা ধাতুর উপস্থিতি আছে, শরীরে তার প্রভাবও আছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে সেইসব ধাতুর সঠিক ভারসাম্য রাখতে পরোক্ষভাবে প্রয়োগ করা হয়। সরাসরি লোহা চিবিয়ে চিবিয়ে খেলে বা শরীরে টন টন লোহা বাঁধলেও রক্তাল্পতা সারবে না।

    তবে রত্নগুলির সৌন্দর্য অস্বীকার করা যায় না। রত্ন দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ সাজিয়ে নিতে কার না ভালো লাগে। সে তো অন্য কথা। পাঁচ রতি ছয় রতি নয়, শয়ে শয়ে রতি রত্ন দিয়ে শরীর সাজিয়ে ফেলুন না। কে বারণ করেছে? কিন্তু গ্রহশান্তির নামে নীলা-পোখরাজ মানুষকে পরিয়ে দেবেন মাথায় বাড়ি দিয়ে, সেটি হবে না। ভয় দেখিয়ে, রত্ন কিনতে বাধ্য করানো মানুষের জন্য আমরা লড়াই করব। মানুষের শরীরে রত্ন-পাথরের কোনো ভূমিকা নেই। রত্ন পাথরের কোনো ক্ষমতা নেই। ভালো কিছু করার ক্ষমতাও নেই, খারাপ কিছু করারও ক্ষমতা নেই। দুষ্ট প্রভাব বলতে যেমন কিছু নেই, তেমনি দুষ্ট প্রভাব হটানোরও কোনো ক্ষমতা রত্ন-পাথরের। রত্ন-পাথর আমাদের কোনো অবস্থা থেকেই বিচ্যুত ঘটাতে পারে না। রত্ন-পাথর মানুষের শরীরে কোনো বিক্রিয়া করে না। সারা শরীরে যেখানেই আপনি রত্ন-পাথর বাঁধুন-না কেন, একটাই কাজ করবে– সৌন্দর্য বৃদ্ধি। বেশ বিজ্ঞের মতো জ্যোতিষবাবুরা চরম আত্মবিশ্বাসের উপর ভর দিয়ে বলে থাকেন –রত্ন-পাথর বিভিন্ন ক্ষতিকারক রশ্মি শোষণ করে মানুষের শরীরকে রক্ষা করে। সেকি, কীসের রশ্মি? সেই রশ্মি আমাদের কী ক্ষতি করে? মামলা-মোকদ্দমায় হারিয়ে দেয়? আমার মেয়ের পরীক্ষায় পাস আটকে দেয়? আমার ছেলের চাকরি হতে বাধা দেয়, আমার পরকীয়ায় কাঠি দেয়? আমার জীবনের জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিলাম কোনোরকম রত্ন-পাথর ছাড়াই। আমার পুরো জীবনটাই কুসুমাস্তীর্ণ। কণ্টক এলে দু-হাতে উপড়ে ফেলে দিয়েছি। যে ক্ষতিকারক রশ্মির কথা জ্যোতিষবাবুরা বলে থাকেন সেগুলি কী ওই গ্রহগুলি আসে? নাকি অন্য কোথা থেকে? গ্রহদের নামে যখন রত্ন-পাথর দেওয়া হয়, তাহলে ধরে নিতেই রশ্মি গ্রহগুলি থেকেই আসে। নানারকম মহাজাগতিক রশ্মি আছে বইকি। সেগুলি সত্যিই ক্ষতিকর। সেইসব ক্ষতিকর কোনোভাবেই পৃথিবীতে আসতে পারে না। বাস্তবে মহাজাগতিক রশ্মি হল এক ধরনের তড়িৎকণার অদৃশ্য বিকিরণ। শব্দ বা বিদ্যুতের মতোই অদৃশ্য এই বিকিরিত তড়িৎকণা বর্ণহীন। মহাকাশ থেকে নেমে আসা এই মহাজাগতিক রশ্মির অনেকটাই পৃথিবীতে পৌঁছোবার আগে বাধা পায় পৃথিবীকে ঘিরে রাখা চৌম্বক ক্ষেত্রে। এরপর যেটুকু মহাজাগতিক রশ্মি এসে পড়ে আমাদের পৃথিবীতে তা ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া পৃথিবীর ওজোনস্তর পেরিয়ে সরাসরি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা অসম্ভব। এক-আধটু রশ্মি যে পৃথিবীতে আসে না, তা নয়। সেই রশ্মি রত্ন-পাথর কেন– পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত এমন কিছু আবিষ্কার হয়নি, যা দিয়ে ওইসব রশ্মি আটকে মামলা-মোকদমা ইত্যাদি জিতিয়ে দেওয়া যায়। অনেক জ্যোতিষবাবু বলেন– বিভিন্ন রত্ন-পাথরের মধ্য দিয়ে সূর্যরশ্মি প্রতিসৃত হয়ে শরীরে প্রবেশ করে গ্রহশান্তির কাজ করে। তাই নাকি? প্রতিসৃত হয়ে শরীরে প্রবেশ করে? প্রবাল বা পলা, মুক্তা, সূর্যকান্তমণি ইত্যাদি রত্নগুলি তো অস্বচ্ছ। অস্বচ্ছ বস্তুর মধ্য দিয়ে রশ্মি প্রতিসৃত কোনো সম্ভাবনা নেই। কোনো কোনো জ্যোতিষবাবুদের (জেম থেরাপিস্ট!!!) মতে– মানবদেহের নানা রোগের কারণ নাকি রং রামধনুর সাতটি রং নাকি মানবদেহে বিদ্যমান সাতটি স্নায়ুচক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। মানবদেহের সমস্ত অসুখবিসুখের নিয়ন্ত্রক নাকি ওই রং। কোন্ রঙের অভাবে কোন অসুখ হবে সেটা তাদের জানা। যেমন হলুদ রঙের অভাবে অর্শ, নীল রঙের অভাবে মৃগী হয়। এই রংগুলি শরীরে গুঁজে দিতে পারলে রোগমুক্তি। কীভাবে খুঁজবে? কেন? লাল রঙের জন্য চুনি পরিয়ে দেওয়া হবে, নীল রঙের জন্য নীলা বা নীলকান্তমণি বা পোখরাজ, খয়েরি বা সবুজ রঙের জন্য বৈদুর্যমণি বা পান্না, কমলা বা বাদামি রঙের জন্য গোমেদ ইত্যাদি। নাঃ, বিজ্ঞানে এসব ধান্দাবাজির কোনো জায়গা নেই।

    জ্যোতিষ বিষয়ক বইগুলিতে দেখলাম কেতু খারাপ হলে ক্ষয়রোগ ও শুচিবাই আনে। কেতুর সঙ্গে শনিও যদি খারাপ হয় তবে অর্শ, ক্যান্সার ইত্যাদি হতে পারে। তা বৈদুর্যমণি রত্ন বা ক্যাটস আই ধারণ করালে ক্যান্সার ইত্যাদি সেরে যাবে? নীলা ধারণ করলেও ক্যান্সার সেরে যাবে। হিরে বা পীত পোখরাজ ধারণ করলে ডায়াবেটিস থেকে মুক্তি হবে। পীত পোখরাজ ধারণ করে বৃহস্পতিকে খুশি করতে পারলেই বন্ধ্যা নারীও গর্ভবতী হবে। নেতা-মন্ত্রীও হওয়া যায়। এরকম কঠিন কঠিন রোগ সারাতে পারে রোগীরা। তাহলে আর দরকার কী চিকিৎসা আর চিকিৎসকের?

    জুয়েলারির মালিক, রত্ন-পাথরের ভেন্ডার-বিক্রেতা, উৎপাদনকারী, খননকারী, উত্তোলনকারীদের একমাত্র ভরসা এই জ্যোতিষবাবুরা। জ্যোতিষবাবুরাই একমাত্র সক্ষম নিন্মবিত্ত মধ্যবিত্ত সাধারণদের রত্ন-পাথর বিক্রি করা। রত্ন-পাথর বিক্রির বাজার তৈরি করে দিয়েছেন এই জ্যোতিষবাবুরাই। নাহলে একচেটিয়াভাবে ধনীরাই শুধুমাত্র রত্ন ব্যবহার করত। ব্যাবসা কী জমত? গ্রহরত্ন বা অন্য কোনো যদি মানুষের ভাগ্যকে বদলে দিতে পারে, তবে তো বলতে হবে মানুষের ভাগ্য এক্কেবারেই পূর্বনির্ধারিত নয়। প্রচেষ্টা এবং পরিবেশই মানুষের ভাগ্যের নির্ণায়ক।

    গ্রহশান্তির জন্য জ্যোতিষবাবুরা রত্ন-পাথর ছাড়াও গাছের মূল বা শিকড় ও ধাতু বা মেটাল ব্যবহারের নিদান দেন। নাকের বদলে নরুন আর কী! কী আছে শিকড়-বাকড়ে? শরীরে শিকড়-বাকড় বাঁধলে দুষ্ট গ্রহরা পালিয়ে যায়? শিকড় বাকড়ের দোকানে লোকজন দেখি ভিড় করে থাকে, বিশেষ করে শনি মঙ্গলবারে। মূল-বিক্রেতারা মূল-ক্রেতাদের একটা কার্যকরী আপ্তবাক্য শুনিয়ে থাকে, তা হল– গাছ কথা বলে। গাছ তো কথা বলেই। কিন্তু জ্যোতিষবাবু, গাছকে কথা বলানোর ক্ষমতা আপনাদের নেই। মানে গাছদের কথা বলিয়ে গ্রহদের খেদাতে পারবেন না। ওটা চিকিৎসকদের কাজ, চিকিৎসকরাই পারেন। চিকিৎসকরাই পারেন চিকিৎসা পদ্ধতিতে। দেখুন কীভাবে পারে– জ্যোতিষবাবুদের মতে সূর্য বা রবি গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে বিল্বমূল অর্থাৎ বেলের শিকড় হাতে-গলায় বাঁধতে হবে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য বলছেন

    (১) বেলের শিকড়ের ছাল ৩/৪ গ্রাম মাত্রায় গরম জলে ৪/৫ ঘণ্টা ভিজিয়ে ছেকে তার সঙ্গে একটু বার্লি বা খইয়ের মণ্ড ও অল্প চিনি মিশিয়ে খাওয়ালে শিশুদের বমি ও অতিসার বন্ধ হয়ে যায়।

    (২) বেলের মূলের ছালচূর্ণ ৬ থেকে ১২ মাত্রায় দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে হৃদ্দৌর্বল্য দূর হয়। এছাড়া অনিদ্রা ও ঔদাসীন্যভাবও কেটে যায়।

    (৩) বিল্বমূলের ছাল ১২ থেকে ১৪ গ্রেনের সঙ্গে ৬ গ্রেন জিরে বেটে গাওয়া ঘিয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে ধাতুতারল্যে বা শুক্রতারল্যে উপকার পাওয়া যায়। জ্যোতিষবাবুরা বলেন রবির প্রকোপে হৃদরোগ, শিরঃপীড়া হয়। আয়ুর্বেদশাস্ত্র এ অসুখগুলি সারবে বলেনি যে। তাহলে বিল্বমূল ব্যবহার করবেন কেন? ভেবেছেন?

    জ্যোতিষবাবুদের মতে চন্দ্র বা চাঁদ গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে ক্ষীরিকা বা ক্ষীরা বা শশার মূল হাতে-গলায় বাঁধতে হবে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য বলছেন–

    (১) সৌন্দর্য পিপাসু নারী-পুরুষেরা শশা ত্বকের যত্নে ব্যবহার করতে পারেন।

    (২) পরিপাকতন্ত্র সুস্থ রাখতে এবং শরীরের অতিরিক্ত মেদ ঝরাতে শশার বিকল্প নেই।

    (৩) জলশূন্যতা দূর করে সারাদিন কাজের ব্যস্ততার কারণে পর্যাপ্ত জল পান করা হয় না অনেকেরই। এই জল ঘাটতি দূর করতে শশার তুলনা হয় না। শোয় ৯০ ভাগ জল থাকায় শরীরের প্রয়োজনীয় জলের অভাব দূর করে শরীর সুস্থ রাখে।

    (৪) শশা আমাদের শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। বাইরে রোদে ঘুরা ফেরা করার কারণে সূর্যের তাপে শরীরের চামড়ায় যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তা থেকে শশা আমাদেরকে অনেকটাই স্বস্তি দিতে পারে। এজন্য শশা চাক চাক করে কেটে শরীরের রোদে পোড়া অংশে লাগালে উপকার পাওয়া যায়।

    (৫) শশার ভিতরের জলীয় অংশ শরীরের অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য শরীর থেকে বের করে দিতে সক্ষম। নিয়মিত শশা খেলে কিডনিতে পাথর হওয়া থেকে মুক্ত থাকা যায়।

    (৬) সুস্থ থাকার জন্য আমাদের শরীরে প্রতিদিন যে পরিমাণ ভিটামিন দরকার হয় তার অধিকাংশের অভাব পূরণ করে থাকে শশা। ভিটামিন এ, বি ও সি– যেগুলি শরীরে শক্তি উৎপাদন ও শরীরের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখে, তার অধিকাংশই পূরণ করে থাকে শশা।

    (৭) শোয় রয়েছে উচ্চ মাত্রায় পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও সলিকন। তাই শরীরে এসবের অভাবজনিত সমস্যার মূল সমাধান হলো শশা।

    (৮) শোয় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে জল এবং অত্যন্ত কম পরিমাণে ক্যালরি। তাই আমার যারা শরীরের ওজন কমানোর ব্যাপারে সচেতন তাদের জন্য শশা বা ক্ষীরিকার একটি প্রধান উপাদান।

    আয়ুর্বেদশাস্ত্র তন্নতন্ন করে তালাশ করেও শিকড় বা মূলের সন্ধান পেলাম না। জ্যোতিষবাবুরা বলেন চন্দ্রের প্রকোপে অতি আবেগপ্রবণতা, মানসিক অসুস্থতা, বাত, শ্লেষ্ম হয়। আয়ুর্বেদশাস্ত্র এ অসুখগুলি সারবে বলেনি যে। তাহলে ক্ষীরিকা মূল ব্যবহার করবেন কেন? ভেবেছেন?

    জ্যোতিষবাবুদের মতে মঙ্গল গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে অনন্তমূল হাতে-গলায় বাঁধতে হবে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য বলছেন–

    (১) ৩ গ্রাম আন্দাজ অনন্তমূল জলে বেটে দুধের সঙ্গে জ্বাল দিয়ে সেই দুধ দই পেতে পরের দিন সকালে খেতে হবে। অর্শে ভালো কাজ করে।

    (২) অনন্তমূল ৩ গ্রাম আন্দাজ জলে বেটে অল্প সৈন্ধব লবণ মিশিয়ে সরবতের মতো দু-বেলা খেলে একজিমা ও হাঁপানি সেরে যায়।

    (৩) ৩ গ্রাম আন্দাজ অনন্তমূল বেটে সকালে ও বিকালে দুধ বা জল সহ খেলে অনিয়মিত ঋতুস্রাবে উপকার হয়।

    (৪) অনন্তমূল বেটে অল্প ঘি মিশিয়ে গায়ে মেখে কিছুক্ষণ বাদে স্নান করে নিলে গায়ের দুর্গন্ধ দূর হয়।

    (৫) অনন্তমূলের কাথ সেবনে স্তনে দুধ বাড়ে।

    (৬) গোরুর দুধে অনন্তমূল বেটে খাওয়ালে পাথুরি রোগে যন্ত্রণার উপশম হয়। জ্যোতিষবাবুরা বলেন মঙ্গল প্রকোপে অর্শ, রক্তপাত, ফোঁড়া, হাম, বসন্ত হয়।

    আয়ুর্বেদশাস্ত্র কিছু কিছু অসুখ সারবে বললেও সেগুলি নির্দিষ্টভাবে তৈরি করে সেবন করতে হবে, বাঁধতে বলেনি। তাহলে অনন্তমূল ব্যবহার করবেন কেন? ভেবেছেন?

    জ্যোতিষবাবুদের মতে রাহু গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে শ্বেতচন্দন মূল হাতে-গলায় বাঁধতে হবে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য বলছেন–

    (১) যাদের ঋতুস্রাবে দুর্গন্ধ, পুঁজ বা মজ্জাবৎ স্রাব হতে থাকে, সেক্ষেত্রে চন্দন ঘষা অথবা ওই কাঠের গুঁড়ো গরম জলে ভিজিয়ে রেখে হেঁকে নিয়ে দুধে মিশিয়ে খেতে হবে।

    (২) ঘামাচি নিশ্চিহ্ন করতে শ্বেতচন্দন ঘষার সঙ্গে হলুদবাটা ও অল্প একটু কর্পূর মিশিয়ে অথবা চন্দন ও দারুহরিদ্রা একসঙ্গে ঘষে মাখতে হবে।

    (৩) হিঞ্চে শাকের রসে শ্বেতচন্দন ঘষা মিশিয়ে খেতে দিলে গুটি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ে এবং ভয়াবহতার উপশম হয়।

    জ্যোতিষবাবুদের মতে কেতু গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে অশ্বগন্ধা মূল হাতে-গলায় বাঁধতে হবে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য বলছেন–

    (১) শ্বেতী রোগে অশ্বগন্ধার মূল চূর্ণ করে দেড় বা দুই গ্রাম মাত্রায় সকালে ও বিকালে দু-বেলা দুধসহ খেতে হবে।

    (২) অশ্বগন্ধার মূল চূর্ণ এক বা দেড় গ্রাম মাত্রায় নিয়ে গাওয়া ঘি এক চা-চামচ ও মধু আধ চা-চামচ মিশিয়ে সকালের একবার এবং বিকালে দিকে একবার একটু একটু করে চেটে খেলে ক্রনিক বঙ্কাইটিস সারে।

    জ্যোতিষবাবুদের মতে বুধ গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে বৃহদ্বারক বা বিদ্যাধারক মূল, বৃহস্পতি গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে ব্ৰহ্মষষ্ঠী মূল এবং শুক্র গ্রহের কোপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে রামবাসক মূল হাতে-গলায় বাঁধতে হবে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য রচিত ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’ গ্রন্থে এই গাছটি সম্বন্ধে কিছু পাইনি। যা পাওয়া গেছে তাতে কোথাও বলা নেই মূলগুলি হাতে-পায়ে শনি/মঙ্গলবার বাঁধতে হবে। তা ছাড়া এই বিশেষ নিয়মে কিছু অসুখ-বিসুখ সারে বইকি, গ্রহ তুষ্ট হয় বলে কোথাও কিছু উল্লেখ নেই। নিমের ডাল বা শিকড় হাতে-পায়ে বাঁধলে যদি কারর তেতো স্বাদ অনুভূত হয় তাহলে মানবো শ্বেতচন্দনের মূল হাতে-পায়ে বাঁধলে রাহু তুষ্ট হবে।

    জ্যোতিষবাবুরা ধাতু বা মেটাল ব্যবহার করতে বলেন। এইসব ধাতু ফুটপাথে বিক্রি হয়, জ্যোতিষবাবুদের কাছে থাকে না। এইসব ধাতুবিক্রেতারাও আবার অল্পবিস্তর জ্যোতিষী হাতফাতও দেখেন। রবির জন্য তামা বা সোনা ব্যবহার, চন্দ্রের জন্য রূপো, মঙ্গলের জন্য রূপো ইত্যাদি। মানবদেহে বিভিন্ন পরিমাণে ধাতুর উপস্থিতি আছে। ধাতুর কম/বেশি উপস্থিতিতে নানা ধরনের অসুখ-বিসুখ হয়। আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথ, অ্যালাপ্যাথিতে ওষুধ প্রস্তুতিতে ধাতুর প্রয়োগ হয়, ধাতুর ভারসাম্য রক্ষা হয়। মানুষ এবং অন্যন্য প্রাণীরা তাদের আহার্য ফল-মূল সবজি-মাছ-মাংস-ডিম খাওয়র মাধ্যমে তার শরীরের ধাতুর চাহিদা মেটায়। ফল-মূল-সবজি-মাছ-মাংস-ডিমে নির্দিষ্ট পরিমাণে লোহা, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, জিংক সালফেট, দস্তা, সোনা, রূপা থাকে। এইসব ধাতুর অভাবে বা ধাতুর প্রাবল্যে মানুষের নানাবিধ অসুখবিসুখ হয়। সরাসরি কোনো ধাতু খাওয়া যায় না। তাই ওষুধ তৈরি করতে সেইসব ধাতুর প্রবেশ ঘটাতে হয়। ওষুধের স্ট্রিপ বা প্যাকেটে Composition পড়ে দেখুন। আয়ুর্বেদে স্বর্ণভস্ম, রৌপ্যভস্ম প্রয়োগ করা হয় নিশ্চয়। তাই বলে তামা-লোহা-সোনা-রূপা হাতে-পায়ে বাঁধলে অসুখবিসুখ সেরে যাবে? গ্রহরা সব পালিয়ে যাবে? তা কোনোদিন হয়? তাহলে দিল্লিতে উনুন জ্বালিয়ে কলকাতায় বসে ভাত রান্না করা যায় বিশ্বাস করতে হবে!

    ভেবেছিলাম ধাতুর কথা লেখার পর উপসংহারে চলে যাব। হঠাৎই আমার এক বন্ধু রুদ্রাক্ষের কথা মনে করিয়ে দিলেন। রুদ্রাক্ষও নাকি গ্রহশান্তিতে করিৎকর্মা। দেখা যাক– আয়ুর্বেদের সংহিতাগ্রন্থে রুদ্রাক্ষ নামের কোনো বস্তুর ব্যবহার, এমনকি নামোল্লেখ পর্যন্ত পাওয়া যায় না। তবে অন্য নামে এটি ব্যবহৃত হয়েছে কি না সেটা আজও আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। রাজনিঘণ্ট’ নামে এক বৈদ্যক দ্রব্যাভিধানে এই গাছটির গুণাগুণের বর্ণনা দেওয়া আছে– এটি উষ্ণগুণসম্পন্ন; বাত, কৃমি, শিরোরোগ, ভূতগ্রহ, বিষনাশক এবং রুচিৎকারক। অসুখবিসুখের ব্যাপারে পরে আসছি। তার আগে দেখে নিই রুদ্রাক্ষের মাহাত্ম্য কতটা? একমুখী থেকে শুরু করে আটত্রিশমুখী পর্যন্ত রুদ্রাক্ষের সন্ধানও পাওয়া যায়। সহজলভ্য নয় বলে চোদ্দোমুখী থেকে একুশমুখী রুদ্রাক্ষের মূল্যও বেশি। গৌরীশঙ্কর, ত্ৰিযুতি– রুদ্রাক্ষ জগতে অত্যন্ত সুবিদিত হলেও সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। “গৌরীশঙ্কর রুদ্রাক্ষ” দেখলে মনে হয় দুটি রুদ্রাক্ষ বীজ একসঙ্গে জোড়া দেওয়া হয়েছে– যাকে শিব ও পার্বতীর প্রতীক বলে মনে করা হয়। যাঁরা বৌদ্ধ অনুসারী তাঁদের মধ্যে কলাবতীর শক্ত বীজের সঙ্গে রুদ্রাক্ষের দানা মিশিয়ে সংকর মালা তৈরি করতে দেখা যায়। রুদ্রাক্ষের মধ্যে সবচেয়ে দুর্লভ বোধ হয় সুশ্রী এবং গোলাকার একমুখী রুদ্রাক্ষ, যা আজকাল অতিশয় দুর্লভ। শোনা যায়, টাটা কোম্পানি ৭০ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি একমুখী রুদ্রাক্ষ বংশপরম্পরায় রক্ষা করে আসছে।

    জ্যোতিষবাবুদের ব্যাবসায়িক প্রবণতার কারণে প্রচার হয়েছে, রুদ্রাক্ষ যে-কোনো ধর্মের এবং যে-কোনো বয়সের নারী-পুরুষই ধারণ করতে পারে। গলায়, বাজুতে এবং কবজিতে। প্রচার হয়েছে গাছের তলায় পড়ে থাকা রুদ্রাক্ষ ব্যবহার্য নয়, গাছ থেকে চয়ন করতে হবে তবেই কাজে দেবে। রুদ্রাক্ষের লাল কালো হলুদ ধূসর নানা রং এবং এর সঙ্গে গ্রহ নক্ষত্রের প্রভাব, পাপস্খলন, দাম্পত্য জীবনে সুখ, ব্যাবসায়িক সাফল্য ইত্যাদি বিষয়গুলিকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে, যার পরিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পর্কে আমরা অজ্ঞাত।

    অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়া রুদ্রাক্ষ ও ভদ্রাক্ষ নির্ণয় করা কঠিন ব্যপার। বাজারে নকল রুদ্রাক্ষ প্রায় ৯৮ শতাংশ। ২ শতাংশ খাঁটি রুদ্রাক্ষ ব্যবহার উপযোগী, তাও অনেক মূল্য। বিশেষ প্রক্রিয়ায় কাঠের গুড়ার সঙ্গে লোহা, সিসা, গ্যালিলিথ নামক রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রণ করে রুদ্রাক্ষ তৈরি করা হয়, যার বড়ো বাজার হচ্ছে নেপাল, বোম্বে ও বাঙ্গালোরে সহ গোটা বিশ্বে। যেহেতু নেপালে রুদ্রাক্ষ বৃক্ষ জন্মে, তাই বিদেশিরা মনে করে থাকেন নেপালেই খাঁটি রুদ্রাক্ষ পাওয়া যায়। নেপালে ব্যবসায়ীরা ৩/৪ হাজার টাকায় খাঁটি রুদ্রাক্ষের একটি পিসও সরবরাহ করতে পারেন না অপরদিকে ৮/৯ টাকায় নকল পেয়ে যাবেন। আগে নকল জিনিস চেনার চেষ্টা করতে হবে, কারণ নকল না চিনলে নকল সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে আসল চেনা যায় না। খাঁটি রুদ্রাক্ষের দানাতে ৫০.০৩১% কার্বন, ০.৯৫% নাইট্রোজেন, ১৭.৮৯% হাইড্রোজেন এবং ৩০.৫৩% অক্সিজেন বিদ্যমান। ভালো বা আসল রুদ্রাক্ষ চেনার উপায় বা লক্ষণ– যে রুদ্রাক্ষ সবদিকে সমান, কোথাও বিকৃত, বাঁকা, উঁচু-নীচু বা ভাঙ্গা-চোরা নেই সেই রুদ্রাক্ষ সব থেকে ভালো। এর কিনারাগুলি বেশ স্পষ্ট থাকবে আর গায়ের কাঁটা কাঁটা দাগগুলি বাইরে বেরিয়ে থাকে। যে রুদ্রাক্ষ জলে ডুবে যায়, দুটো তামার টুকরোর মধ্যে রাখলে ঘুরতে থাকে উজ্জল ও ভারী হয় এমন রুদ্রাক্ষ সবচেয়ে ভাল। একে সর্বোত্তম বলে মানা হয়। এই রুদ্রাক্ষ সবচেয়ে বেশি উপকারী। হিসাবে বলা যায়। কবিরাজি মতানুসারে যে ব্যক্তি রুদ্রাক্ষ সঠিক নক্ষত্র, তিথি, সময় অনুযায়ী ধারণ করেন তার কোনো রোগ হতে পারে না। সেকি, পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষ যদি সকলেই রূদ্রাক্ষ ধারণ করে বসে থাকে তবে তো সব চিকিৎসকদের চিকিৎসা ছেড়ে আকাশের তারা গুণতে হবে! বিশ্বাসীদের ধারণা– রুদ্রাক্ষের ক্ষমতা, ধারণ করার নিয়ম, পুজো মন্ত্র যা সঠিকভাবে অনুসরণ করলে মানুষের জীবনে শান্তি আসবেই। বাপ রে, এদের তো ধরে দশ-পাঁচটা নোবেল দিয়ে দেওয়া দরকার।

    জ্যোতিষবাবুরা বলেন যেমন মুখ, তেমন ফল। এটাই মানুষের বিশ্বাস। যেমন ধরুন–

    (১) সপ্তমুখী রুদ্রাক্ষ: এই শ্রেণির রুদ্রাক্ষের নাম ‘অনন্ত মাতৃকা’। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে সামাজিক প্রতিষ্ঠা, অর্থ মান, যশ ও প্রতিপত্তি লাভের পথ সুগম হয়ে থাকে। রাশিচক্রে রাহুগ্রহ রবি ও চন্দ্র যুক্ত হয়ে লগ্নে দ্বিতীয়ে, চতুর্থে, পঞ্চমে, ষষ্ঠে, সপ্তম, অষ্টমে, নবম, দশমে এবং দ্বাদশে অবস্থান করলে বা কোনোভাবে অশুভ হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ উজ্জীবন করতে হয়। ১০৮ বার মন্ত্র জপ করে উক্ত রুদ্রাক্ষ কণ্ঠে ধারণ করলে রাহু গ্রহের সমস্ত কুফল বিনষ্ট হয় অনেকের বিশ্বাস।

    (২) অষ্টমুখী রুদ্রাক্ষ: এই রুদ্রাক্ষের দুটি নাম ‘বিনায়ক’ ও ‘বটুকভৈরব’। শনিগ্রহ ও রাহুর অশুভ প্রভাব খর্ব করে। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে হঠাৎ আঘাত পাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। দুষ্কৃতকারীদের হাতে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। রাশিচক্রে শনি ও রাহু অশুভ থাকলে উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি সংস্কারপূর্বক পুরুষের ডান বাহুতে এবং স্ত্রীলোকের বাম বাহুতে ধারণীয়। এ রূপে বিনায়ক মন্ত্র পাঠ করে বা বটুক ভৈরব মন্ত্র এ মন্ত্রে বটুক ভৈরবের পুজো করে এবং পরে জপ করে ও পরে বীজমন্ত্র জপ করে উক্ত রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে সমস্ত অশুভ প্রভাব দূরীভূত হয়।

    (৩) নবমুখী রুদ্রাক্ষ: এই রুদ্রাক্ষের অন্য নাম ‘মহাকাল ভৈরব’। ধারণে জীবনে উন্নতির সূচনা যায়, সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জয়লাভ করা হয়। দুর্ঘটনা ও হঠাৎ মৃত্যুর হাত থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। ধারণের পূর্বে মন্ত্র উচ্চারণ করে এ রুদ্রাক্ষের উজ্জীবন বা প্রাণসঞ্চার করে নিতে হয়। মন্ত্র পাঠের পর উচ্চারণ করতে হয়। বুদ্ধিবৃত্তিজনিত কাজকর্মের ক্ষেত্রে নানাভাবে প্রচুর সুফল দান করে এ রুদ্রাক্ষ। রাশিচক্রে বৃহস্পতি গ্রহ মকরে নীচস্থ, মকরস্থানে অবস্থান করলে, বা মারকস্থ হলে এবং ষষ্ঠ, অষ্টম, দ্বাদশ স্থানে অবস্থান করলে কিংবা কোনোভাবে অশুভ হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উপরোক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধ সংস্কার পূর্বক ধারণের পর মন্ত্র জপ করে ‘বৃহস্পতয়ে’ এ বীজমন্ত্র জপের পর পুরুষের দক্ষিণ বাহুতে এবং স্ত্রীলোকের বামবাহুতে ধারণ করলে সকল অশুভ বিনাশ হয়।

    (৪) দশমুখী রুদ্রাক্ষ: এ শ্রেণির রুদ্রাক্ষ দুর্লভ। এর অন্য নাম ‘মহাবিষ্ণু’। মর্যাদা, প্রতিষ্ঠা, সুনাম, খ্যাতি, সম্মান, পার্থিব সমৃদ্ধি, কর্মদক্ষতা এবং ব্যাবসায়িক সাফল্য অর্জনে সহায়ক এ রুদ্রাক্ষ। প্রেতাদি কর্তৃক অনিষ্টকর প্রভাব থেকেও মুক্ত হওয়া যায়। রাশিচক্রে বুধ গ্রহ নীচস্থ শযুক্ত ও শত্রুক্ষেত্রগত, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ, অষ্টম ও দ্বাদশ স্থানে অবস্থান করলে বা কোনোভাবে পীড়িত হলে উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক সংস্কার করে ধারণ করতে হয়। মন্ত্র পাঠ ও জপ করে জপের পর উক্ত রুদ্রাক্ষ কণ্ঠে ধারণ করলে সমস্ত অশুভ দূরীভূত হয়।

    ৫) একাদশমুখী রুদ্রাক্ষ: এটি একটি বিশেষ জাতের রুদ্রাক্ষ। এর অন্য নাম ‘মহামৃত্যুঞ্জয়’। মেয়েদের নানা অসুখের ক্ষেত্রে একান্তভাবেই সুফল প্রদানকারী, আত্মবিশ্বাসের অভাব ঘটলে, আত্মহনন চিন্তা এসে মনকে ও মেজাজ খিটখিটে স্বভাবের হয়ে উঠলে এ রুদ্রাক্ষ ধারণে তার উপশম হয়। মন্ত্র উচ্চারণযোগে রুদ্রাক্ষ উজ্জীবিত করে ধারণ করা প্রয়োজন। রাশিচক্রে শুক্র ও মঙ্গল অশুভ থাকলে মন্ত্রে যথাবিধি সংস্কার করে মন্ত্র জপ করে ডান হাতে ধারণ করলে সমস্ত অশুভ প্রভাব নাশ হয়।

    (৬) দ্বাদশমুখী রুদ্রাক্ষ: এর অন্য নাম ‘অর্ক’ বা ‘আদিত্য’। এ রুদ্রাক্ষ রবি ও রাহুর অশুভ প্রভাবকে প্রশমিত করে। রবি যখন মকরে বা কুম্ভরাশিতে অবস্থিত হয়ে অশুভদশা প্রাপ্ত হয় তখন এ রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে সকল কুফল নষ্ট হয়। ব্যাবসায়িক মন্দা বা অসাফল্য নিবারণ করতে মন্ত্র সহযোগে এ রুদ্রাক্ষকে উজ্জীবন করে ধারণ করতে হয়। মন্ত্র উচ্চারণ করে ১০৮ বার জপের পর রুদ্রাক্ষটি কণ্ঠে ধারণ করলে সমস্ত অশুভ বিনষ্ট হয়।

    (৭) এয়োদশমুখী রুদ্রাক্ষ: এর অপর নাম কাম। এর ধারণে সর্বভাবেই কামনীয় বিষয়ের প্রাপ্তিযোগ ঘটে। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিপূরণ হয়। চিন্তামণি মন্ত্র সহযোগে এ রুদ্রাক্ষ উজ্জীবন করতে হবে। অতঃপর মন্ত্র ১০৮ বার বীজমন্ত্র জপ করে ডান হাতে ধারণ করলে সমস্ত পাপ দূর হয় ও সকল মনোরথ সিদ্ধি হয়। এর ধারণে চন্দ্র ও শুক্রের অশুভ প্রভাব নাশ হয়ে থাকে।

    (৮) চতুর্দশমুখী রুদ্রাক্ষ: এই রুদ্রাক্ষ ‘শ্রীকণ্ঠ’ নামে পরিচিত। এই রুদ্রাক্ষ ইন্দ্রিয় সংযমে সাহায্য করে। পঞ্চমুখ হনুমানমন্ত্র সহযোগে একে উজ্জীবিত করতে হয়। মন্ত্র পাঠ করে বীজমন্ত্র জপ করে ধারণ করলে শুক্রগ্রহের সমস্ত অশুভ বিনষ্ট হয়। মন্ত্র ১০৮ বার জপ করে ধারণ করলে বৃহস্পতি ও রবির সমস্ত অশুভ প্রভাব নষ্ট হয়ে থাকে।

    রুদ্রাক্ষ মৃগীরোগীদের জন্যেও উৎকৃষ্ট। সংক্রামক রোগ, বিশেষত বসন্তরোগ প্রতিষেধক বলে বহু মানুষ শরীরে ধারণ করে। রাজস্থানের বৈদ্য সম্প্রদায় এই রোগে রুদ্রাক্ষ ঘষে গায়ে লাগাতে দিয়ে থাকেন। শ্লেষ্মর আধিক্যে যেসব রোগ বিসুখ সৃষ্টি হয়, কোনো কোনো প্রদেশে এটি ঘষে খাওয়ানো হয়। যক্ষারোগের প্রথমাবস্থায় তুলসীমঞ্জরীর সঙ্গে রুদ্রাক্ষ ঘষে খাওয়ালে চমৎকার ফল দেয় শুনেছি। এছাড়া রোগীর নাড়ী ক্ষীণ হয়ে আসতে থাকলে হৃদযন্ত্র সক্রিয় রাখতে গ্রামবাংলার প্রাচীন বৈদ্যকুলের ‘কোরামিন’ ছিল, রুদ্রাক্ষ ঘষা ও মধু দিয়ে মকরধ্বজ খাওয়ানো হত। ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্রকে যাঁরা প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন তাঁদেরই উত্তরসূরি আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য এ বিষয়ে বলেন– আয়ুর্বেদের মূল সিদ্ধান্ত হল, প্রতি দ্রব্যের মধ্যে চারটি জিনিসের অস্তিত্ব বর্তমান। যেমন– রস, বীর্য, বিপাক ও প্রভাব। প্রথমোক্ত তিনটির প্রত্যক্ষতা প্রমাণ করা যায়, শেষোক্ত ‘প্রভাব’-টি কিন্তু দ্রব্যগুণাদির সম্পর্কশূন্য নয়। কারণ প্রতিটি দ্রব্যের প্রভাবের ক্ষেত্রটিও বিশেষ গুণান্বিত। অর্থাৎ শ্লেম্মানাশক দ্রব্যের প্রভাব কখনো বাত-পিত্তকে প্রকুপিত করে হয় না, বিরোধীও হয় না।

    এতক্ষণ নিশ্চয় আপনি হাজারো সংশয় নিয়ে ভাবছিলেন– জ্যোতিষ যদি অযৌক্তিকই হবে তবে এত মানুষ যে এতকাল ধরে জ্যোতিষ এবং জ্যোতিষীদের পিছনে ছুটছে, কেন? আপনার উত্তর নিশ্চয় এরকম –তারা জ্যোতিষের অভ্রান্ততার প্রমাণ পেয়েছেন বলেই-না জ্যোতিষীদের কাছে যাচ্ছে। শুধু আপনি নন, জ্যোতিষীবাবুদের যুক্তিও এরকমই হয়। এর বেশি কুলায় না যে! বড়ো রকমের ফাঁপড়ে পড়ে গেলে মাসলম্যান তো আছেই। মাসলম্যান অবশ্য সবার নেই। যাঁদের নেই ন্যাজে-গোবরে হন, অথবা ত্যাদোর পাবলিকের ধোলাই খান। আর যাঁদের মাসলম্যান আছে তাঁরা হলেন জ্যোতিষজগতের রাঘববোয়াল। সাংবাদিকদের ক্যামেরার ‘দেখে নেব’ বলে হুমকি দিতে ছাড়েন না। ট্যাবলেট-জ্যোতিষীর এহেন হুমকি নিশ্চয় অনেকেই নিশ্চয় দূরদর্শনে দেখেছেন।

    ১৯৯৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। কাঁকুড়গাছির শ্রমিক কল্যাণ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত তথাকথিত প্রাচ্য-পাশ্চাত্য জ্যোতিষ সম্মেলনে “ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি”-র সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। উদ্দেশ্য : উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে খোলামেলা চ্যালেঞ্জের আবেদন। আবেদন : ‘ভবিষ্যদ্বক্তা’ জ্যোতিষীরা পাঁচজন বিখ্যাত ব্যক্তির মৃত্যুদিন আগাম গণনা করে বলে দিন। আর সেই গণনার ফলগুলি আলাদা আলাদাভাবে খামবন্দি করে একটি নিরপেক্ষ জায়গায় সংরক্ষণ করে রাখা হবে। ওই পাঁচজন ব্যক্তির মধ্যে যে দিন যিনি মারা যাবেন সেসময় সেই ব্যক্তির নামাঙ্কিত খামটি খুলে দেখা হবে জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণী মিলেছে কি না। এই পদ্ধতিতে যদি কমপক্ষে চারজনের ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যায়, তাহলে “ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি” জ্যোতিষীদের হাতে চ্যালেঞ্জের টাকা (ভারতীয় রূপিতে ৫০,০০০ টাকা) তুলে দেবে এবং সমিতির পক্ষ থেকে জ্যোতিষবিরোধী সমস্ত আন্দোলন বন্ধ করে দেবে।

    জ্যোতিষ-বিশ্বাসীরা কী ভাবছেন? জ্যোতিষীবাবুরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন? না, জ্যোতিষীবাবুরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেননি। উলটে সম্মেলনের কক্ষটির সমস্ত বন্ধ করে দেওয়া হল, যাতে যুক্তিবাদী সমিতির সদস্যরা ঘরের বাইরে বেরোতে না পারে। এরপর জনাকয়েক মাসলম্যান এসে প্রচণ্ড প্রহার করল। বাধা দিতে গিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিক, দ্য টেলিগ্রাফের সাংবাদিকরাও লাঞ্ছনা ও নিগ্রহের শিকার হন। এ ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্থানীয় এক যুবকও প্রহৃত হন। এক্কেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটেছিল সেদিন। জ্যোতিষীদের ফাঁদে ফেলতে চাইলে জ্যোতিষবাবুরা এভাবেই উত্তর ফেরত দিয়ে থাকে। পরীক্ষা প্রার্থনীয়।

    পদার্থ বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা তাঁর এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন। একটি হল– “গণয়তি গণনে গণকশ্চন্দ্ৰেন সমাগমং বিশাখায়া। বিবিধ-ভুজঙ্গ-ক্রীড়াসক্তাং গৃহিণীংন জানাতি।।”– গণক আকাশে বিশাখা নক্ষত্রে চন্দ্রের সমাগম গণনা করছে। (ওদিকে) নানান উপপতির সঙ্গে ক্রীড়ায় আসক্ত (নিজের) গৃহিণীকে (অর্থাৎ তার খবর) সে জানে না। অপরটি হল– “গণিকা গণকৌ সমান ধর্মে নিজপঞ্চাঙ্গ-নিদৰ্শকাবুভৌ। /জনমানস মোহকারিনৌ তৌ বিধিনা বিত্তহরৌ বিনির্মিতৌ।।” গণিকা আর গণক– দুয়েরই এক ধর্ম। দুজনেই নিজের পঞ্চাঙ্গ দেখায়। দুজনেই লোকের মনকে মোহগ্রস্ত করে। বিধাতা এই বিত্তহরণকারীদের তৈরি করেছেন। পঞ্চাঙ্গ হল দুটি হাত, দুটি পা ও মাথা (গণিকা পক্ষে)। বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ, করণ– এই পাঁচ (গণক পক্ষে)। গণক লোকের সত্য মিথ্যা ঠিকুজি তৈরি করার পর যদি ফলে যায় তাহলে নিজের কেরামতি জাহির করে। না ফললে সেটাকে বলে লগ্নদ্রষ্টার ভুল। না মিললে বলে –“জ্যোতিষীরা ভুল করেন, তাঁদের গণনা ভুলও হতে পারে অনেক সময়। নামী ডাক্তারদেরও তো ভুল হয়। অঙ্কের ভালো শিক্ষকরাও অঙ্ক ভুল করে। বানান সংশোধকরাও (Proof Reader) বানান ভুল করেন। প্যাথোলজিস্টরা ভুল রিপোর্ট দেয়। বিশ্বের এক নম্বর ইঞ্জিনিয়ারদের তৈরি ব্রিজও ভেঙে পড়ে। তার মানে কি সেই বিদ্যা বা শাস্ত্রগুলি মিথ্যা? তা ছাড়া জ্যোতিষ গণনা-পদ্ধতি ভুল না ঠিক সেটা একমাত্র জ্যোতিষীরাই বলতে পারবেন, আপনি নন।” ভণ্ড গণকরা এভাবেই মানুষকে ঠকিয়ে তাদের টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়।

    আপাতদৃষ্টিতে জ্যোতিষীবাবুদের যুক্তিগুলি সঠিক মনে হতেই পারে। কিন্তু জ্যোতিষবাবুদের ভুলের সঙ্গে অন্য ভুলগুলির কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। ডাক্তার অথবা শিক্ষকদের ভুলটা বিমূর্ত নয়, সম্পূর্ণটাই চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণিত। জ্যোতিষবাবুদের ভুলটি বিমূর্ত, প্রমাণ করা যায় না। ভুলটা প্রমাণ করা গেলেও ঠিকটা প্রমাণ করা যায় না। যেমন ধরুন আপনার বর্তমান বয়স ৩০। আপনাকে বলা হল ৪০ বছর বয়সে গিয়ে আপনার বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, এমনকি মৃত্যু হওয়ারও আশঙ্কা আছে। আপনি আর আপনার পরিবার খুব ভয় পেয়ে গেলেন এবং মুক্তির উপায় জানতে চাইলেন। জ্যোতিষবাবু আপনাকে পাঁচ রতির একটা নীলা ব্যবহার করতে বললেন। ৪০ বছর বয়সে গিয়ে আপনার কোনো দুর্ঘটনা ঘটল না, মৃত্যুও হল না। কিংবা ওই সময় আপনি এমনভাবে হোঁচট খেয়ে পড়লেন যে আপনার সামনের দুটো দাঁত ভেঙে গেল। জ্যোতিষীবাবু বলবেন– সঠিক ভবিষ্যদ্বাণীই উনি করেছিলেন ও বিধানও সঠিক দিয়েছিলেন। পাথর কথা বলে। সেদিন পাথরটি ব্যবহার না করলে মৃত্যু ঠেকানো যেত না। আপনার ৪০ বছর বয়সে দুর্ঘটনা বা মৃত্যু হত কি না, সেটা আর প্রমাণ করা গেল না। কিন্তু যদি উলটোটা হত, অর্থাৎ ৩৫ বছর বয়সে আপনি কোনো দুরারোগ্য অসুখে মারা গেলেন। তখন কি আপনার পরিবার ভুল বলার জন্য জ্যোতিষবাবুর বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেবেন? এরকম ঘটনা আকছার ঘটে থাকে। কিন্তু আমাদের চরম উদাসিনতার জন্য জ্যোতিষবাবুদের এই বুজরুকির ব্যাবসা চালিয়ে যেতে একেবারেই বেগ পেতে হয় ন। জ্যোতিষবাবুরা যখন ভবিষ্যদ্বাণী করেন এবং ভাগ্য বদলানোর কথা বলেন, তা এমনই অস্পষ্ট ও অর্থহীন যে তার ঠিক-ভুল বিচারের কোনো মানেই হয় না। বিজ্ঞানের তত্ত্বকে নির্দিষ্টভাবে ভুল প্রমাণ করা যায়, তাই ভুল বলে প্রমাণিত না-হলে সেটি ‘ঠিক’-এর মর্যাদা পায়। জ্যোতিষবাবুদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই, কাজেই ‘ঠিক’-এর মর্যাদাও প্রাপ্য নয়।

    অদ্বৈত আশ্রম থেকে প্রকাশিত “কমপ্লিট ওয়ার্কস অফ স্বামী বিবেকানন্দ, বার্থ সেন্টিনারি এডিশন”- এর অষ্টম খণ্ডে “ম্যান দি মেকার অফ হিজ ডেস্টিনি” 91567 791 oncs– I have seen some astrologers who predicted wonderful things; but I have no reason to believe they predicted them only from the stars, or anything of the sort. In many cases it is simply mind-reading some times wonderful predictions are made, but in many cases it is arrant trash. অর্থাৎ, “আমি কোনো কোনো জ্যোতিষীকে দারুণ দারুণ ভবিষ্যদ্বাণী করতে দেখেছি; কিন্তু একথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, তারা শুধুমাত্র নক্ষত্র বা ওই জাতীয় জিনিস থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করে। অনেকক্ষেত্রেই এ হচ্ছে নিছক মনের কথা আঁচ করার ব্যাপার। কখনো-কখনো চমৎকার ভবিষ্যদ্বাণী হয়, কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই সেগুলি পুরোপুরি ভূষিমাল।”

    যৌবনের প্রারম্ভে আমিও বইপত্র কিনে জ্যোতিষগিরি শুরু করেছিলাম। বইপত্র পড়ে দেখলাম এ বিদ্যা কোনো কাজে আসবে না। শুধু টার্মসগুলি আয়ত্ব করে নিলাম। প্রত্যেক পেশারই একটা নির্দিষ্ট স্টাইল থাকে, এক্ষেত্রেও সেটা আয়ত্ব করলাম। কথায় বলে ভেক না থাকলে ভিখ মেলে না। ভেকও বদলে ফেললাম। মুখে মুখে প্রচার চালাতে লাগলাম, যাকে বলে বিজ্ঞাপন করা। প্রথম প্রথম বিনাপয়সাতেই ভবিষ্যদ্বাণী করে দিতাম। লিখিতভাবেই ভবিষ্যদ্বাণী করতাম। বেশ পসার হল। পারিশ্রমিক নিতে শুরু করলাম। আমি ঠিক বলতে পারি সেটা সবাই বলতে থাকল। পূর্ণ উদ্যোমে কাজে লেগে পড়ার আগে বিবেকের ডাকে থমকে গেলাম। লোক ঠকানোর এ কাজ করাটা কি ঠিক! আমি তো জানি এসব বলায় কোনো ভিত্তি নেই। পুরোটাই ‘মন পড়া’ ব্যাপার। ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে রোগীকে পড়ে ফেলা। ব্যস, কেল্লা ফতে। আপনিও পারবেন মানুষের অতীত ও ভবিষ্যৎ বলে দিতে। কোনো জ্যোতিষবিদ্যার পাঠ নিয়ে সাগর-সম্রাট হওয়ার প্রয়োজন নেই। কৌশলটুকু আয়ত্ব করলেই হবে। কীভাবে?

    আমি যেভাবে কিছুদিন জ্যোতিষগিরিতে পসার জমিয়ে জমিয়ে ছিলাম, সেটা তো আপনাদের শেয়ার করবই, এর সঙ্গে যুক্তিবাদী প্রবীর ঘোষেরও কিছু মূল্যবান টিপস দেব। তার আগে বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ : এটি একটি মানুষকে প্রতারণা, অর্থাৎ প্রতারক হওয়ার টিপস। প্রতারক হতে চাইলে নিজের দায়িত্বেই হবেন। এই টিপস সচেতন ও যুক্তিনির্ভর ব্যক্তিদের স্বার্থেই নিবেদিত হচ্ছে।

    টিপস–১; আমি মনে করি জ্যোতিষ ব্যাবসায় শিখরে উঠতে চাইলে জ্ঞানী অবশ্যই হতে হবে। জ্যোতিষ ব্যাবসা অজ্ঞানী বা মূর্খদের জন্য নয়। মনে রাখতে হবে আপনার জ্ঞানবুদ্ধি দিয়েই আপনার প্রতি জাতক-জাতিকাকে আকৃষ্ট করতে হবে। “বিদ্বান সর্বত্র পূজতে”, জ্ঞানেই নারীপুরুষনির্বিশেষে মুগ্ধ হয়। ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞানের কিছু শাখায় জ্ঞান থাকলে উত্তম। ইংরেজি ভাষাটাকে ভালোভাবে আয়ত্ত করা প্রয়োজন। মানুষ ইংরেজি ভাষাকে সমীহ করে। জানতে হবে সংস্কৃত ভাষাও। আমাদের সমাজে এ ভাষাও সমীহ আদায় করে নেয়। জাতক বা জাতিকার সঙ্গে কথা বলার সময় ঠিকঠাক সংস্কৃত বাক্য বা শ্লোক গুঁজে দিতে পারলে কেল্লা ফতে। আপনি দোষেগুণে মানুষ থেকে ঈশ্বর বা ক্রান্তিদর্শীতে উন্নীত হবেন খুব সহজেই।

    টিপস– ২ : ফোর টোয়েন্টিগিরি (ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণার দায়ে শাস্তির বিধান) করে এভাবে বাকিজীবন চালিয়ে যেতে পারবেন, এরকম মানসিক জোর ও আত্মবিশ্বাস চাই।

    টিপস –৩: দূরদর্শী, নির্লজ্জ, দুঃসাহসী, তুখোড় বুদ্ধি, ধূর্ত এবং বিচক্ষণ হতে

    হবে।

    টিপস– ৪: সাগর, সম্রাট ইত্যাদি সার্টিফিকেট নিয়ে নিন কোনো জ্যোতিষ সংস্থা থেকে। সার্টিফিকেট দেনেওয়ালে সংস্থা ভুড়ি ভুড়ি আছে। নগদ রেস্তো খরচ করে কিনে নিন ডিগ্রি, পদক, পি এইচডি ইত্যাদি।

    টিপস– ৫: স্পেশালিস্ট হিসাবে নিজেকে প্রচার করুন। বিদ্যার জন্য সরস্বতী কবচ, বিয়ের জন্য প্রজাপতি কবচ, ব্যাবসার উন্নতির জন্য বিশ্বকর্মা কবচ ইত্যাদির ব্যবস্থাও রাখুন।

    টিপস– ৬: ৫০০ বছরের কিংবা ২০০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পারিবারিক জ্যোতিষী বলে বিজ্ঞাপন দিন।

    টিপস –৭: আপনার নামের সঙ্গে শাস্ত্রী, আচার্য, আনন্দ জুড়তে ভুলবেন না।

    টিপস –৮ : আপনার নামে ওজন না থাকলে পালটে ফেলুন।

    টিপস– ৯ : আপনার নামের শেষে প্রথম বন্ধনীর ভিতর ‘তন্ত্রসিদ্ধ’, ‘অলৌকিক মাতা’, ‘কামাখ্যাসিদ্ধ’, ‘বাকসিদ্ধ’ ইত্যাদি প্রচারে রাখবেন।

    টিপস– ১০: ভালো কপি রাইটারদের একটা জুতসই বিজ্ঞাপন তৈরি করান।

    টিপস– ১১ : কোনো চ্যানেলের সঙ্গে যুক্ত থাকুন। এমন প্রচুর জ্যোতিষের চ্যানেল আছে। স্লট কিনুন। চ্যানেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বললে তারাই আপনাকে বলে দেবে কী করতে হবে, কীভাবে করতে হবে, কত দিতে হবে ইত্যাদি।

    টিপস –১২ : ভেক বদলান। কথায় বলে ভেক না-হলে ভিখ মেলে না।

    টিপস– ১৩ : বাড়িতে বড়ো করে পূজো দিন। বাড়িতে মন্দির থাকলে ভালো। আপনি যে দেবতাকে জড়িয়ে জ্যোতিষ ব্যাবসা চালাবেন সেই দেবতার পুজো করবেন বছরের নির্দিষ্ট সময়ে। খুব ভালো কাজ দেয় কালীপুজো করলে। টিভিতে সম্প্রচারের ব্যবস্থা করুন আপনার পুজো।

    টিপস– ১৪: বিপদের হাত থেকে বাঁচতে স্থানীয় থানা এবং ক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।

    টিপস –১৫ : আপনার ব্যাবসা রমরমিয়ে চললে দু-একটি মাসলম্যান পুষবেন। দুঃসময়ে কাজে দেবে।

    টিপস –১৬ : বাজারে প্রচুর জ্যোতিষবিদ্যার বই পাওয়া যায়। কিনে জ্যোতিষী ভাষা বা টার্মগুলি রপ্ত করুন। প্রতিটি পেশার নিজস্ব ভাষা আছে, জ্যোতিষেও আছে।

    টিপস –১৭ : আবহাওয়া তথা রাজনীতিতে ভবিষ্যদ্বাণী করতে হলে সে বিষয়ে এলেম না থাকলে বিষয়টি এড়িয়ে যওয়াই শ্রেয়। যেমন আগামী লোকসভায় কোন দল সরকার গড়বে? পশ্চিমবঙ্গে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন? ভবিষ্যতে ভারতবর্ষ হিন্দু রাষ্ট্র হবে কি না? ইত্যাদি।

    টিপস –১৮ : অবশ্যই পাথর বেচুন। পাথরই আপনাকে ধনী করবে। “বিফলে মূল্য ফেরত’ বলে দিন। পাবলিক এটা খুব খায়। ঘাবড়াবেন না, মূল্য ফেরত দিতে হয় না। কেউ দাবিও করে না। যদি কেউ মূল্য ফেরত নিতেও আসে, সেটা বুদ্ধি খরচ নিজের নিয়ন্ত্রণে আনুন। সবাই পারে, আপনিও পারবেন।

    টিপস– ১৯ : আপনি যদি আপনার বা অন্য মন্দিরে বসতে পারেন, তাহলে হাত দেখার জন্য কোনো পয়সা নেবেন না। পাশে প্রণামীর বাক্স দেখিয়ে দেবেন। বলবেন– মায়ের পুজোর জন্য আপনার সাধ্য অনুযায়ী দিলেই হবে।

    টিপস– ২০ : বিখ্যাত মানুষদের হাত দেখার সুযোগ পেলে অনুমতি সাপেক্ষে ফোটো তুলে রাখতে ভুলবেন না। ওটা বিজ্ঞাপনে দারুন কাজে দেবে।

    টিপস– ২১ : মানুষের কিছু কমন জিজ্ঞাস্য বা জানাবার কৌতূল থাকে, সেগুলিই সে জানতে আগ্রহী। একজন অবিবাহিত মেয়ে এবং একজন অবিবাহিত ছেলে জিজ্ঞাস্য ভিন্ন, একজন বিবাহিত মহিলা এবং একজন বিবাহিত পুরুষের জিজ্ঞাস্য আলাদা। একজন অবিবাহিতের প্রেম বিষয়ক, চাকরি বিষয়ক, বিয়ে বিষয়ক প্রশ্ন থাকে। অপরদিকে একজন বিবাহিতের স্বামী/স্ত্রী বিষয়ক, সন্তান বিষয়ক ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর জানে আগ্রহী। প্রশ্ন যেমনই হোক, উত্তর দিতে হবে বিচক্ষণতার সঙ্গে। হবেই এমন কথা কখনোই বলবেন না, ‘সম্ভাবনা’ উল্লেখ করে বলুন। ‘সম্ভাবনা’ শব্দটির মানে হতেও পারে, হতে পারে।

    টিপস– ২২ : ভয় দেখাতে ভুলবেন না। না-হলে পাথর/কবচ বেচতে পারবেন না। পাথর/কবচই আপনার ভবিষ্যৎ যে!

    টিপস– ২৩ : সব বয়সের মেয়েদের ‘মা’ বলে সম্বোধন করে কথা বলুন।

    অবশ্যই সকলকে ‘তুই’ সম্বোধন করাটা রপ্ত করে নেবেন।

    টিপস– ২৪ : মানুষ নিজের সম্বন্ধে ভালো ভালো কথা শুনতে ভালোবাসে। প্রথম দর্শনেই সেই ভালো ভালো কথাগুলি বলুন। যেমন –আপনি খুব দয়ালু, আপনি খুব উদার, আপনি মানুষকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেন কিন্তু আপনি তেমন ভালোবাসা পান না ইত্যাদি। খুব বেশি বেশি পজিটিভ কথা বলুন। দু একটা নেগেটিভ কথা বলবেন পেটের জন্য।

    টিপস– ২৫ : আপনার ‘মুরগি’-কে যে মোক্ষম বাণীগুলি শোনাতেই হবে। ৯৯%ভাগ মিলে যাবে, আপনি অব্যর্থ হয়ে যাবেন। দুটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে– (১) মানুষ নিজের সম্বন্ধে যে কথাগুলি শুনতে ভালোবাসে এবং (২) প্রতিটি মানুষ সে যে স্তরেই অবস্থান করুক না-কেন কিছু বিষয় আছে যেগুলি সকলের সঙ্গেই মিলে যাবে। যেমন এই পয়েন্টগুলো বলুন– আপনি স্পষ্টবক্তা, দৃঢ়চেতা। আপনি অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী। স্পষ্টবাদিতার জন্য আপনি অপ্রিয় হন, কিন্তু আপনি আপনার জ্ঞানতৃষ্ণার জন্য অনেকের কাছে শ্রদ্ধাভাজনও হন। সংসারের জন্য আপনি অনেক করেন, কর্মক্ষেত্রেও আপনি অনেক করেন– কিন্তু আপনার মূল্যায়ন কেউ করতে পারে না। জীবনে যত বিপদেই পড়েছেন শেষপর্যন্ত আপনি উদ্ধার পেয়েছেন আপনার কনফিডেন্সের জন্য। আপনি খুব তাড়াতাড়ি মানুষের সঙ্গে মিশতে পারেন। আপনি মানুষকে খুব বিশ্বাস করেন, বিশ্বাস করে কখনো-কখনো ঠকেনও, তবু বিশ্বাস হারান না। আপনি রেগে গেলে সাংঘাতিক হয়ে ওঠেন, কিন্তু রেগে গেলেও আপনার বুদ্ধিভ্রম হয় না। আপনি সাধারণভাবে জীবনযাপন করতে চাইলেও বাঁকা পথ ধরতেও বাধ্য হন। সুশ্রী-সুন্দরী জাতিকা হলে বলুন– আপনার কাছে অনেক পুরুষই প্রেম নিবেদন করতে চায়। আপনি পাত্তা দেন না। আপনার গুণমুগ্ধ পুরুষের সংখ্যা বেশ ভালো। পুরুষরা অবলীলায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, সান্নিধ্য প্রত্যাশা করে। আপনি চাইলেই যে-কোনো পুরুষকেই দখলে নিতে পারেন, কিন্তু আপনি খুবই ক্যালকুলেটেড। বিভ্রান্ত হন না। ইত্যাদি– দেখবেন আপনার ‘মুরগি’ কী খুশি। আসলে সাধারণত মানুষ তোষামোদে খুব খুশি হয়। নিজের সম্বন্ধে ভালো ভালো কথা শুনতে কার-না ভালো লাগে! মানুষ স্বীকৃতি চায়। আবিষ্কার চায়। নিজেকে জানতে চায়। পিঠ চাপড়ানো মানুষের মন্দ লাগে না।

    এবার মিলতেও পারে, না-ও মিলতে পারে এমন কিছু বলুন। তবে মেলার সম্ভাবনা বেশি। বলুন –মাঝেমধ্যেই আপনাকে একাকীত্বে পেয়ে বসে। আপনার প্রচুর ভালো বন্ধু আছে, শত্রুও আছে ঘাপটি মেরে। সন্মান আপনি পেয়েছেন, কিন্তু যতটুকু আপনার প্রাপ্য ততটুকু আপনি পান না। গোপন প্রণয় আপনার অজ্ঞাতসারে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে। পেট ও অম্বল নিয়ে মাঝে মাঝে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইত্যাদি। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করলে জ্যোতিষী হিসাবে সফল হবেনই।

    টিপস– ২৬; কোনো বিবাহিত এসে আপনার কাছে এসে জানতে চাইত পারেন– তার বিয়ে হবে কি না, হলে কবে হবে? কোনো সরকারি চাকুরে এসে আপনার কে এসে জানতে চাইতে পারে তার চাকরি হব কি না, হলে কবে হবে? এমন ফাঁপড়ে পড়লে ধূর্ততার সঙ্গে উত্তর দিতে হবে। না-হলে কেলানি একটাও মাটিতে পড়বে না। অবশ্য তাবড় তাবড় জ্যোতিষীবাবুরা এ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারেন না।

    টিপস– ২৭: সবশেষে সবাইকে একথা বলতে ভুলবেন না– “আপনার হাতখানি খুব সুন্দর। এমন অপূর্ব হাত খুব একটা পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও কোটিতে গুটি। যাকে তাকে এ হাত দেখাবেন না। নষ্ট করে দেবে।”

    দেশের রোজকার দৈনিক পত্রিকাগুলোয় দিনের অনেক গুরুত্বপুর্ণ খবর বাদ গেলেও “আপনার দিনটি কেমন যাবে” বা “আপনার রাশিফল” বিভাগটি কখনো বাদ যায় না। আবার কিছু কিছু টিভি চ্যানেলে সকালের বিশেষ আয়োজন থাকে এই রাশিফল নিয়ে। অথচ এমন অনেক পত্রিকা রয়েছে যাদের বিজ্ঞান নিয়ে সাপ্তাহিক আয়োজনটুকুও নেই। বরঞ্চ বিজ্ঞাপন কম আসে বলে কোনো কোনো পত্রিকা সেই সাপ্তাহিক আয়োজনটুকুও বাদ দিয়ে দেয়। কিন্তু এই বিশেষ বিভাগ চালু রাখতে তাদের কোনো সমস্যা নেই। কারণ একটাই এদেশে তো এই কু-খাদ্যের ভোক্তার অভাব নেই। হয়তো কেউ কেউ বলতে পারেন তাদের কাছে বিষয়টি নিছক বিনোদনের। হ্যাঁ, সেটা হতেই পারে। কিন্তু বিষয়টি যদি শুধু বিনোদনের জায়গায় থাকত তাহলে কি জ্যোতিষীদের চেম্বার, পাথরের দোকান বড়ো বড়ো শপিং মলে কি দেখা যেত? রাস্তার মোড়ে মোড়ে পত্রিকার দোকানগুলিতে কি দেখা যেত মাসিক, বাৎসরিক ভাগ্যলিপির পঞ্জিকা? আর টিভি চ্যানেলগুলিতেই-বা কি দেখা যেত এদের রমরমা বিজ্ঞাপন? না, মোটেই দেখা যেত না।

    কোনো কোনো জ্যোতিষীবাবু জ্যোতিষকে বিজ্ঞান বলে প্রমাণ করতে চায়, কোনো কোনো জ্যোতিষবাবু আবার শাস্ত্র বলে প্রমাণ করতে চায়, কাউকে আবার শাস্ত্রও বলতে শুনেছি বিজ্ঞানও বলতে শুনেছি। যাঁরা বিজ্ঞানের তর্কে পর্যদস্ত হয়, তাঁরা বলেন জ্যোতিষকে শাস্ত্র বলে মেনে নিতে অসুবিধা কোথায় আপনাদের! যেন শাস্ত্র হলেই অব্যর্থ, দৈব কিছু! বিজ্ঞানের প্রথম শর্ত হল ‘স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন’। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার পর। সেইসব পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের ফলাফল। সুনির্দিষ্টভাবে নথিভুক্ত ও প্রকাশ করা হয়। যে কেউ তা যাচাই করে দেখে নিতে পারে। বিজ্ঞানে দ্ব্যর্থকতার কোনো জায়গা নেই। পটাশিয়াম সায়ানাইড শরীরে প্রবেশ করালে মৃত্যু অবধারিত। যে এটি করবেন তারই এ ঘটনা ঘটবে। অন্যথা হবে না। এটাই বিজ্ঞান, ফল সবসময় সকলের জন্য একই হবে। নিমপাতা চিবালে তেতো লাগবে সকলের, কারোর মিষ্টি লাগবে না –এটাই বিজ্ঞান। বারবার একই ফল পাওয়ার নামই বিজ্ঞান। যুক্তির কাছে অন্ধবিশ্বাস বা ব্যক্তিবিশ্বাসের কোনো জায়গা নেই, মূল্যও নেই। যুক্তি সিদ্ধান্তে পৌঁছায় পরীক্ষার পথ ধরে, পর্যবেক্ষণের পথ অতিক্রম করতে করতে।

    জ্যোতির্বিদা বাস্তবিকই জ্যোতির্বিজ্ঞান হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রের মধ্যে অবিরাম গতিতে বিশ্লেষিত হয়ে চলল পার্থক্যের ব্যাপকতা। বহু পরীক্ষানিরীক্ষা এবং নিয়ত গবেষণার মধ্য দিয়ে জ্যোতির্বিদ্যা প্রতিষ্ঠা পেল বিজ্ঞানের অলিন্দে। তৎসহ জ্যোতিষশাস্ত্র অবিজ্ঞান হিসাবে ডাস্টবিনে পরিত্যক্ত হল।

    ভারতে দারিদ্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ৪০%, অতি নিম্নবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের সংখ্যাও ৪০%। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানুষ বাকি শতংশের মধ্যে পড়ে। ৫% উচ্চবিত্ত ধরলে ১৫% মধ্যবিত্ত –এরা বেশ সচ্ছল প্রজাতির। দেখা যায় মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরাই মূলত জ্যোতিষের সমর্থক। বহু বছর আগে ‘ফলিত জ্যোতিষ’ শিরোনামে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী লিখেছেন –“কোনও একটা ঘটনার খবর পাইলে সেই খবরটা কি না এবং ঘটনাটা প্রকৃত কি না তাহা ……জানিবার অধিকার বিজ্ঞানবিদদের প্রচুর পরিমাণে আছে। এই অনুসন্ধান। কার্যই বোধ করি তাঁর প্রধান কার্য। প্রকৃত তথ্য নির্ণয়ের জন্য তাঁহাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। … তিনি অতি সহজে অত্যন্ত ভদ্র ও সুশীল ব্যক্তিকেও বলিয়া বসেন, তোমর কথায় আমি বিশ্বাস করিলাম না। … নিজের উপরেও তাঁর বিশ্বাস অল্প। … কোথায় কোন্ ইন্দ্রিয় তাঁহাকে প্রতারিত করিয়া ফেলিবে …… এই ভয়ে তিনি সর্বদা আকুল। …..ফলিত জ্যোতিষে যাঁহারা অবিশ্বাসী তাঁহাদিগের সংশয়ের মূল এই। তাঁহারা যতটুকু প্রমাণ চান ততটুকু পান না। তাহার বদলে বিস্তর কুযুক্তি পান। …. একটা ঘটনার সহিত মিলিলেই দুন্দুভি বাজাইব। আর সহস্র ঘটনার যাহা না মিলিবে তাহা চাপিয়ে যাইব, অথবা গণকঠাকুরের অজ্ঞতার দোহাই দিয়া উড়াইয়া দিব এরূপ ব্যাবসাও প্রশংসনীয় নহে। …একটা সোজা কথা বলি। ফলিত জ্যোতিষকে যাঁহারা বিজ্ঞানবিদ্যার পদে উন্নীত দেখিতে চাহেন তাঁহারা এইরূপ করুন। প্রথমে তাঁহাদের প্রতিপাদ্য নিয়মটা খুলিয়া বলুন। মানুষের জন্মকালে গ্রহনক্ষত্রের স্থিতি দেখিয়া কোন্ নিয়মে গণনা হইতেছে তাহা স্পষ্ট ভাষায় বলিতে হইবে। … ধরি মাছ না ছুঁই পানি হইলেও চলিবে না। তাহার পর হাজার খানেক শিশুর জন্মকাল ঘড়ি ধরিয়া দেখিয়া প্রকাশ করিতে হইবে; এবং পূর্বের প্রদত্ত নিয়ম অনুসারে গণনা করিয়া তাহার ফলাফল স্পষ্ট ভষায় নির্দেশ করিতে হইবে। ….. পূর্বে প্রচলিত ফলাফলের সহিত প্রত্যক্ষ ফলাফল মিলিয়া গেলেই ঘোর অবিশ্বাসীও ফলিত জ্যোতিষে বিশ্বাসে বাধ্য হইবে। হাজারখানা কোষ্ঠীর মধ্যে যদি নয়শো মিলিয়া যায় তবে মনে করিতে হইবে যে ফলিত জ্যোতিষে অবশ্য কিছু আছে। যদি পঞ্চাশখানা মার মেলে তবে মনে করিতে হইবে, তেমন কিছু নাই। হাজরের বলে যদি লক্ষটা মিলাইতে পারো, আরও ভালো। সহস্র পরীক্ষাগারে ও মানমন্দিরে বৈজ্ঞানিকেরা যে রীতিতে ফলাফল গণনা ও প্রকাশ করিতেছেন সেই রীতি আশ্রয় করিতে হইবে। কেবল নেপোলিয়নের ও বিদ্যাসাগরের কোষ্ঠী বাহির করিলে অবিশ্বাসীর বিশ্বাস জন্মিবে না। চন্দ্রের আকর্ষণে জোয়ার হয়, তবে রামকান্তের জজিয়তি কেন হইবে না, এরূপ যুক্তিও চলিবে না।”

    জ্যোতিষী নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের অভিমত : “জ্যোতিষে বিশ্বাস সাধারণত দুর্বল মনের লক্ষণ। সুতরাং মনে এরকম দুর্বলতা এলেই আমাদের উচিত সুচিকিৎসক দেখিয়ে ভালোভাবে ওষুধ খাওয়া, ভালো পথ্য খাওয়া। আর বিশ্রাম করা।” বলেছেন –“In many cases it is simply mind-reading some times wonderful predictions are made, but in many cases it is arrant trash.”

    এহেন বিষয়কেই ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে রেখে যুবকযুবতীদের স্বনির্ভরতার সন্ধান দিতে আগ্রহী হয়ে পড়েছে। এরপর কি ডাইনি বিদ্যা, ভূত প্রেত-জিন চর্চা, ডাকিনী চর্চা, ওঝা-গুণিন বিদ্যা, কালাজাদু, ঝাড়ফুঁক বিদ্যা, তেল-পড়া, জল-পড়া, বাটি চালান, ক্ষুর চালান, বশীকরণ বিদ্যাও সিলেবাসে আনবেন? অবাক হব না। কারণ আদি যুগ থেকে রাষ্ট্রই এইসব বিষয়ের পৃষ্ঠপোষক। রাষ্ট্রকে নির্বিঘ্নে থাকতে হলে নিয়তী বা অদৃষ্টবাদকে প্রতিপালন করতে হবে। তাই পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই অবিশ্বাসী বা নাস্তিকদের সুরক্ষা দেয় না, আস্তিকদের মদত জোগান। নাস্তিকরা এইসব অবৈজ্ঞানিক বিষয়গুলোর সমালোচনা করলে সবক শেখাতে চান। বলেন– অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কথা নাস্তিকদের বলা উচিত হয়নি। আস্তিকরা নাস্তিকদের উপর হামলা করলে রাষ্ট্র প্রায় নির্লিপ্ত থাকে। এবার ইউজিসির কথা একটু উল্লেখ করা যাক ইউজিসি (University Grant Commission) বলছেন–জ্যোতিষ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে তিন বছরের স্নাতক পাঠক্রম এবং দুই বছরের স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণাভিত্তিক পাঠক্রম চালু করবেন। আর এই জ্যোতিষচর্চায় নতুন নামকরণ করা হবে জ্যোতির্বিজ্ঞান। অ্যা, হাসবেন না কাঁদবেন! আরও শুনুন –উৎসাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে দেওয়া হবে এককালীন ১৪ লক্ষ টাকা। দেওয়া হবে জ্যোতিষবিদ্যার উপযুক্ত সরঞ্জাম কেনার জন্য। ইউজিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী সেইসব জ্যোতিষ বিভাগে একজন অধ্যাপক, দুইজন লেকচারার, একজন লাইব্রেরিয়ান এবং একজন কম্পিউটার চালক থাকবেন। এর ফলে যদি দেশে কুড়িটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই পাঠক্রম চালু করা হয় তাহলে এই পাঁচজনের জন্য বাৎসরিক খরচ হবে ১ কোটি টাকা। বুজরুকি জারি রাখার জন্য এত অর্থের অপচয়! এ সংবাদ শুনে ভারতের অগ্রগণ্য পদার্থবিদ ও ইউজিসির প্রাক্তন চেয়ারম্যান অধ্যাপক যশপাল ক্ষোভ করে বললেন–”এ খবর শুনে আমি মর্মাহত। এ এক নিদারুণ লজ্জা, এক কলঙ্ক। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি ইউজিসির সভ্যদের মতোই আজ এদেশে মশা মাছির মতো অজ্ঞানদের অভাব নেই।” বেঙ্গালুরু রামন রিসার্চ সেন্টারের বৈজ্ঞানিকগণও একসুরে বললেন– “পশ্চাদে এগিয়ে চলার এ এক বিরাট পদক্ষেপ। এরপরে ভারতের বৈজ্ঞানিক গবেষণার আর কোনো মূল্যই রইল না।” ইন্ডিয়ান ডেমোক্র্যাটিক টিচার্স ফ্রন্টের বক্তব্য– “এই প্রস্তাব অবান্তর, হাস্যকর এবং ভয়ংকরও।”

    আত্মপক্ষসমর্থনে ইউজিসি কী বলছেন বিজ্ঞপ্তি জারি করে, একটু দেখে নেব–

    (১) বৈদিক জ্যোতিষবিদ্যা শুধু আমাদের জ্ঞানার্জনের শাস্ত্র নয়, বরং এটি এমন এক বিদ্যা যা আমাদেরকে সুশৃঙ্খলভাবে চলার পথ দেখায়। জ্যোতিষবিদ্যা আমাদের জানায় জীবনে ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে প্রতিনিয়ত কেমন করে ঘটনাগুলি ঘটে চলেছে।

    (২) বিভিন্ন সময়ে যে ঘটনাগুলি ঘটে তা আমাদের জীবনের উপর কীভাবে প্রভাব ফেলে এ বিষয়ে আমাদের অবহিত করে। সাহায্য করে প্রতিকূল অবস্থাকে অনুকূলে আনতে।

    (৩) এটি এমন এক বৈদিক শাস্ত্র যার থেকে আমরা জানতে পারি কীভাবে কখন আমাদের জীবন হতাশা, দুঃখ, অস্থিরতা আসে। যা আমরা আমরা বুঝতে পারি না সে সম্বন্ধে অবহিত করা।

    (৪) বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতিষচর্চা শুধু মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি ঘটাবে তা নয়– বৈদিক গণিত, বাস্তুশাস্ত্র, কৃষিবিজ্ঞান, মহাকাশবিজ্ঞান ইত্যাদি সম্পর্কেও একটা পরিপূর্ণ ধারণা দেবে।

    (৫) এই মূল্যবান পাঠক্রম থেকে একদিকে যেমন শিক্ষক ও ছাত্র উপকৃত হবেন– অপরদিকে চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ সহ সকল পেশার মানুষজন সুফল লাভ করবে ইত্যাদি। রামা রামো!!

    বাকি রইল এবার বশীকরণবিদ্যার পাঠক্রম, তাবিজ-কবচবিদ্যার পাঠক্রম, ঝাঁড়ফুকবিদ্যার পাঠক্রম, জল-পড়া আর তেল-পড়াবিদ্যার পাঠক্রম, ধর্ষণ-খুনের পাঠক্রম ইত্যাদি। গেরুয়া-সংস্কৃতি নিশ্চয় সেই স্বপ্ন পূর্ণ করবে। নিষ্পাপ প্রতারকরাই রাষ্ট্র চালাবেন, এবার থেকে প্রতারকরাই রাষ্ট্রের নাগরিকরা কী করবেন কী করবেন না ঠিক করে দেবেন? প্রতারকরা ফলাও করে বিজ্ঞাপন দেবেন, বলবেন –“আসুন, সাক্ষাৎ ধর্ষণ-খুন করলেও অকাট্য সাক্ষ্যসবুত থাকলেও মামলায় জিতিয়ে দেব। পরস্ত্রীতে আসক্ত? বিছানায় আনতে পারছেন না কিছুতেই? পাঁচ মিনিটে অব্যর্থ বশীকরণের মাধ্যমে স্বর্গসুখ অনুভব করুন। আপনার সন্তানকে সৌরভ গাঙ্গুলি কিংবা শচীন তেণ্ডুলকর কিংবা কল্পনা চাওলা কিংবা সানিয়া মির্জা কিংবা সানি লিওনে বানাতে চান? খাঁটি গ্রহরত্ন ব্যবহার করে অব্যর্থ ফল পান।”

    এ পোড়া দেশে আইন আছে প্রচুর। কিন্তু আইন রক্ষা করার কেউ নেই। আইন প্রয়োগ করার কেউ নেই। প্রতারক জ্যোতিষীদের বিরুদ্ধে কি মামলা করা যায় এমন আইন আছে? বুজরুকির বিরুদ্ধে কি ভারতে কোনো আইন নেই? গোখলে বলেছিলেন– “what Bengal thinks today, India think tomorrow.” বেঙ্গল, মানে পশ্চিমবঙ্গ কি এইসব অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে? দিল্লি হাইকোর্টের এক বেঞ্চ দিল্লি সরকারকে নোটিস পাঠিয়ে নির্দেশ দিয়েছেন– অলৌকিক ক্ষমতা বলে অসুখ বা কোনো সমস্যার সমাধানের প্রলোভন দেখালে তান্ত্রিক, জ্যোতিষী, বিজ্ঞাপনদাতা ও বিজ্ঞাপন, প্রকাশক ও প্রচার মাধ্যমের বিরুদ্ধে যেন ‘ড্রাগস অ্যান্ড ম্যাজিক রেমেডিজ (অবজেকশনাবল অ্যাডভার্টাইজমেন্ট) অ্যাক্ট, ১৯৫৪’ অনুসারে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করা হবে। (দৈনিক বর্তমান ১ মে, ২০০৩) এই নোটিস জারি করা হয় ২৮ নভেম্বর ২০০১ সালে। বলা হয়েছে –ম্যাজিক বা অলৌকিক ক্ষমতাবলে অসুখ সারানো বা মানসিক কোনো সম্যা সমাধানের প্রলোভন দেখানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এসবের বিজ্ঞাপন দেওয়াও বেআইনি। এই আইন চালু আছে ১৯৫৪ সাল থেকেই। এই আইন প্রথমবার ভাঙলে ছয় মাসের জেল ও ১০০০ টাকা জরিমানা হতে পারে। পরবর্তী অপরাধের জন্য এক বছর কারাদণ্ড হতে পারে। এই আইনের ঠ্যালায় যেসব স্বনামধন্য জ্যোতিষীরা দিল্লিতে জ্যোতিষগিরি করতে যেতেন তাঁদের ক্ষমতা হল খতম। দিল্লির তল্পিতল্পা গুটিয়ে জ্যোতিষীবাবুরা কলকাতায় পিছটান দিলেন। যাবে কোথায়! আইনের হাত অনেক লম্বা। ১৯৯৭ সালের ১৮ জানুয়ারি, The Indian Express’ পত্রিকায় যে খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল তা দেখে তাবড় তাবড় জ্যোতিষী এবং জ্যোতিষবিশ্বাসীদের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গিয়েছিল, তা হল –“Gang of six impostors arrested”। এরা হলেন পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত ছয় জ্যোতিষী। অপরাধ অবশ্যই ‘দ্য ড্রাগস অ্যান্ড ম্যাজিক রিমেডিস (অবজেকশনাল অ্যাডভার্টাইজমেন্ট) অ্যাক্ট, ১৯৫৪ আইনের ৪, ৫, ও ৭ ধারা ভঙ্গ। তবু আজও জ্যোতিষচর্চা আর জ্যোতিষবাবুদের লোক ঠকানোর ব্যাবসা বহাল তবিয়তে চলছে। পাশাপাশি চলছে এই বুজরুকি ব্যাবসার অবলুপ্তির আন্দোলন। নিষিদ্ধ হোক প্রতারণা, জ্যোতিষ ব্যবসা। কঠোর থেকে কঠোরতর হোক আইন।

    আমার এই লেখা পড়ে কোনো জ্যোতিষবাবু যদি বলেন জ্যোতিষ শাস্ত্র জ্যোতিষ বিজ্ঞান জ্যোতিষ চাঁদ-সূর্যের মতো সত্য, তবে তাঁদের জন্য আমার কাছে সুখবর আছে। রেইকি গ্রান্ডমাস্টার, ফেং শুই ক্ষমতার দাবিদার, জ্যোতিষ ও অলৌকিক ক্ষমতার দাবিদারদের জন্য ২০ লক্ষ ভারতীয় টাকার চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করেছেন যুক্তিবাদী প্রবীর ঘোষ। এই চ্যালেঞ্জ ওনার মৃত্যু পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, যতদিন প্রথম অলৌকিক ক্ষমতাবানের সাক্ষাৎ না হবে। অংশগ্রহণকারীরা কীভাবে তাঁদের সত্যতা প্রমাণ করবেন, তার বিস্তারিত প্রবীরবাবুর কাছেই পাবেন। প্রবীরবাবু আপনার জন্য আপনার অলৌকিক ক্ষমতা দর্শন করার জন্য অপেক্ষা করে আছেন। যোগাযোগের ঠিকানা : প্রবীর ঘোষ, ৭২/৮ দেবীনিবাস রোড, কলকাতা –৭০০০৭৪।

    কৃতজ্ঞতা সূত্র : (১) রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী– ফলিত জ্যোতিষ (২) বিজ্ঞান বার্তা প্রকাশনী– জ্যোতিষের জালিয়াতি (৩) অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়– জ্যোতিষ কি আদৌ বিজ্ঞান? (৪) রত্নজিজ্ঞাসা– পীযূস দাস (৫) অর্জুন রায়– জ্যোতিষ সম্পর্কে কয়েকটি অপ্রিয় প্রশ্ন (৬) ডাঃ পার্থসারথী গুপ্ত– বিজ্ঞানের আলোয় জ্যোতিষ (৭) গৌরীপ্রসাদ ঘোষ– মহাবিশ্বে মহাকাশে (৮) নন্দলাল মাইতি– ইতিহাসে জ্যোতিষ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান (৯) অরূপরতন ভট্টাচার্য– প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান (১০) প্রবীর ঘোষ –জ্যোতিষীর কফিনে শেষ পেরেক (১১) প্রবীর ঘোষ –অলৌকিক নয়, লৌকিক (তৃতীয় খণ্ড)।

  • লিঙ্গপুরাণ

    লিঙ্গপুরাণ

    অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book-name]

    প্রথম প্রকাশ : মাঘ, ১৪২৪

    উৎসর্গ

    প্রাণপ্রিয় কবি দেবযানী দত্তকে

    সূচিমুখ

    কথামুখ

    গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়া নয়। গতানুগতিকতায় প্রথাবদ্ধ হয়ে বন্দি না-হয়ে উল্টো সুরে উল্টো পথে যা ভাবি তাই লিখি। পূর্বপুরুষের শিখিয়ে দেওয়া তোতাপাখির বুলি আওড়ানোতে আমি স্বভাবসিদ্ধ নই। ভিন্ন ভাবনায়, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথানির্মাণে আমার অক্ষরমালার চরৈবেতি। প্রচলিত বিশ্বাস ও ধারণাকে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করেছি গভীর নিবিড়তায়। উচিত-অনৌচিতের জ্ঞানবর্ষণ নয়, নিজের জীবন এবং যাপনেও এই বদলের রূপরেখা অনুসরণের চেষ্টা করি।

    জ্যোতিষীগিরি একটা লাভজনক ব্যবসা। পাড়ায় পাড়ায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে জ্যোতিষীদের রমরমা ব্যবসা আমরা সবাই দেখেছি। জেনেছি তাঁরা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, মানুষের হাত-পা-কপাল দেখে ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে। যদিও জ্যোতিষীদের কোনো বক্তব্য কোনোদিন কখনোই সত্য প্রমাণিত হয়নি, তা সত্ত্বেও জ্যোতিষীদের প্রতি মানুষের অগাধ ভক্তি। এইসব ভণ্ড জ্যোতিষীদের খপ্পরে মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। তবু জ্যোতিষীরা যেন দেবদূত, অন্তর্যামী। অথচ এই জ্যোতিষীরা অন্তরালে এক একটা পাক্কা শয়তান, যমদূত। যে যত বড়ো জ্যোতিষী, সে তত বড়ো মিথ্যা, তার চেয়ে বড়ো ভণ্ড, প্রতারক। এঁরা নাকি কেউ কেউ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। জ্যোতিষীকে কেউ বলেন শাস্ত্র, কেউ বলেন বিজ্ঞান। আসলে জ্যোতিষজ্ঞান না শাস্ত্র, না বিজ্ঞান। পাথর ধারণ করলে ভাগ্য বদলে যায় না। জ্যোতিষবিদ্যা ও জ্যোতিষীদের পর্দাফাঁস করা হয়েছে ‘জ্যোতিষ : না শাস্ত্র, না বিজ্ঞান’ প্রবন্ধে।

    ছাগল, ভেড়া, মুরগি, শুয়োরের মাংসের মতো গোরুর মাংসও খেয়ে থাকে। আসলে মানুষ খায় না এমন একটি প্রাণী এ পৃথিবীতে নেই। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে মানুষের খাদ্যাভ্যাস হয়। তবুও মাংস খাওয়াকে কেন্দ্র ঘৃণা, হত্যা ইত্যাদি। যত গণ্ডগোল গোরুকে ঘিরে। গোমাংস কি শুধু মুসলিমরাই খায়? ‘গোহত্যা, গোমাংস ও গোমাতার ইতিবৃত্ত’ প্রবন্ধে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করা হয়েছে গোমাংসের ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান। ‘সরস্বতী : বাস্তবে এবং অবাস্তবে’ প্রবন্ধে হিন্দুদের পরমপূজ্য দেবী সরস্বতীর উৎস ও বিবর্তন নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হিন্দুসমাজ ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। ভারতীয় সমাজ কীভাবে ব্রাহ্মণদের কজায় চলে এলো? এই ব্রাহ্মণ্যবাদ হিন্দুসমাজে কতটা ক্ষতি করেছে? ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং ভারতীয় সমাজ’ প্রবন্ধে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে।

    ‘মনু, মনুসংহিতা এবং হিন্দুত্ববাদের ভারতবর্ষ’ প্রবন্ধের শিরোনামই বলে দিচ্ছে ভারতবর্ষের হিন্দুত্ববাদে মনুসংহিতার প্রভাব কতখানি। বাবা সাহেব মনুসংহিতা পুড়িয়ে দিয়েছিল। কী এমন আছে মনুসংহিতায়? মনু কে? মনুর বিধান কীভাবে হিন্দুসমাজে কীভাবে বর্ণবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষের শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছে এই প্রবন্ধে সেটাই উপজীব্য।

    লিঙ্গপুরাণ প্রবন্ধে ‘লিঙ্গ’ শব্দটি থাকলেও কোনো যৌনতা নেই। তবে সমগ্র আলোচনাই হয়েছে লিঙ্গ নিয়ে। এসেছে শিবলিঙ্গ বিষয়ও। আলোচনা হয়েছে জাপানের পেনিস ফেস্টিভাল থেকে অমরনাথের প্রাকৃতিক বরফের লিঙ্গ নিয়ে। রহস্য উদ্মাটনের চেষ্টা করা হয়েছে।

    প্রসঙ্গত কয়েকটি জরুরি কথা বলে রাখা প্রয়োজন– প্রথমত, লিঙ্গপুরাণ কখনোই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গ্রন্থ নয়। অনেকেই বইয়ের নাম দেখে ভাবেন, বইটিতে অ্যাডাল্ট কনটেন্ট আছে। ১৮ অনুৰ্ধদের জন্য অপাঠ্য। ভুল ভেবে ভুল করবেন না। ইতোমধ্যে অনেকগুলি সাইট আমার চোখে পড়েছে, যেখানে আমার ‘লিঙ্গপুরাণ’ নামে বইটি অ্যাডাল্ট ক্যাটাগরিতে রেখেছেন। তাঁদের অনুরোধ করছি ক্যাটাগরি বদলে ফেলুন। বইটি অবশ্যই প্রাপ্তমনস্কদের জন্য, কখনোই প্রাপ্তবয়স্কদের নয়। সকল বয়সের পাঠকরা বইটা পড়তে পারেন। দ্বিতীয়ত, যারা এই বইটি পিডিএফ করে বিভিন্ন সাইটে রেখেছেন, তাঁরা কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করেছেন। আমি কারোকে পিডিএফ করার অনুমতি দিইনি। যত বেআইনি পিডিএফ আছে সব সাইট থেকে সরিয়ে ফেলুন। তৃতীয়ত, বিভিন্ন সাইটে ‘লিঙ্গপুরাণ’ নামে যে পিডিএফ আপনারা ডাউনলোড করে পড়ছেন, তাঁদের বলি ওই বইটার সঙ্গে এই বইটার অনেক অমিল। প্রচ্ছদ একই থাকলেও বিষয় এক নেই। বেশ কিছু নতুন প্রবন্ধ যেমন সংযোজন করা হয়েছে, কিছু প্রবন্ধ বাতিলও করা হয়েছে। আগের যে প্রবন্ধগুলি বর্তমান বইতে আছে সেগুলিতেও প্রচুর সংযোজন, সংশোধন, বর্জন, পরিমার্জন করা হয়েছে। বলা যায় সম্পূর্ণ নতুন রূপে এই বইটি আপনাদের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ এই বইয়ের আসল স্বাদ নিতে হলে পাইরেটেড পিডিএফ নয়, ই-বুক পড়ন।

    কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাবগম্ভীর বিষয় হলেও যতটা সম্ভব প্রাঞ্জল ভাষায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই সংকলনে যেসব প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে তা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। বিদগ্ধ ও অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের দাবিতে পাঠকদের কাছে সেগুলি দুই মলাটে করে বন্দি পৌঁছে দিতে পারলাম। এই গ্রন্থটির বিষয়বৈচিত্র্য নিশ্চয় পাঠকদের মন জয় করতে পারবে।

    অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

  • অষ্টম কল্প : ভূতের বাড়ী

    অষ্টম কল্প : ভূতের বাড়ী

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    অষ্টম কল্প : ভূতের বাড়ী

    একখানা দোতালা বাড়ীর একটি ঘরে আমি শয়ন কোরে আছি; বড় বড় জানালার ফাঁক দিয়ে প্রখর সূর্য-কিরণ সেই ঘরের ভিতর প্রবেশ কোচ্ছে; রৌদ্র আমার গাত্র স্পর্শ কোচ্ছে; রৌদ্রের প্রখরতা দর্শনে অনুভব, বেলা দ্বিতীয় প্রহর। কোথায় এসেছি, যে রাত্রে নবীনকালীর হস্তে ফলের সরবত পান কোরেছিলেম, সেই রাত্রের পরদিনের সূর্য আমার গাত্রে উত্তাপ দিচ্ছিলেন কি না, অবধারণ কোত্তে অক্ষম হোলেম। শুয়ে আছি, ঘরের চতুর্দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছি, অপরিচিত গৃহ সেটাও বেশ বুঝতে পাচ্ছি, কিন্তু কোথায়?

    শয্যার উপর একবার আমি উঠে বোসলেম; বোসে থাকতে পাল্লেম না, ভোঁ ভোঁ কোরে মাথা ঘুরতে লাগলো; মাথা অত্যন্ত ভারী, চক্ষেও ঝাপসা দেখতে লাগলেম। আবার শয়ন কোল্লেম, কত যে কি ভাবনা তখন আমার মানসক্ষেত্রে তোলাপাড়া কোত্তে লাগলো, নিরূপণ করা দুঃসাধ্য। প্রায় আধ ঘণ্টা এইরকম। একখানা পাখা ঘুরিয়ে বাতাস খেতে খেতে একজন ভুড়িওয়ালা লোক সেই ঘরে প্রবেশ কোল্লে। আমি শয়ে ছিলেম, নিদ্রা আসছিল না, দিনমানে কখনই আমার চক্ষে নিদ্রা আসে না, নেত্র উন্মীলিত ছিল, তাই দেখে লোকটি বিকৃতস্বরে আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “কি হে নবাবপুত্র! জেগে আছ? ছি! ছি! ছি! এই বয়সে অত নেশাও করে? দু দিন দু রাত্রি একেবারেই বেহুঁস, বে-একতার! উঠ, স্নান কর, কিছু, আহার কর, শরীর তাজা হবে, উঠতে পারবে কি, না এই বিছানার উপর হড় হড় কোরে জল ঢেলে দিতে হবে? বুঝচো কেমন? নেশাটা ছুটেছে তো? দেখ দেখি চেষ্টা কোরে, উঠতে পারবে কি না?”

    আমি অত্যন্ত লজ্জা পেলেম। লজ্জা পাওয়া অকারণ, মনে মনে বিরক্ত হোলেম। আধ ঘণ্টা পূর্বে আর একবার উঠে বোসেছিলেম, মাথা অত্যন্ত ভারী, শরীর অত্যন্ত দুর্বল, বোসে থাকতে পারি নাই, সেই ভাবটা স্মরণ হলো; কি করি, অতিশয় কষ্ট থাকলেও ধীরে ধীরে উঠে বোসলেম। লোক বোল্লে “এই ঠিক, নেশা তবে ছুটেছে; এসো, আমার সঙ্গে বাহিরে এসো।”

    কষ্টে আমি দাঁড়ালেম, বিছানা থেকে নামলেম; কষ্টে সেই লোকের অনুগামী হোলেম। চোলে যেতে টোলে পড়ি, লোক আমার সে ভাবটা দেখতে পেলে না, দরজার দিকে মুখ কোরে আগে আগে চোলেছিল, আমি পশ্চাতে ছিলেম, বারান্দায় এলেম। ভাঙা ভাঙা রেল দেওয়া সুদীর্ঘ বারান্দা। এক-ধারে একখানা চৌকী পাতা ছিল, সেই চৌকীর উপরে আমি বোসে পোড়লেম। একজন চাকর আমার মাথায় প্রায় একপোয়া তেল ঢেলে দিয়ে কলসী কলসী জল ঢাল্লে, বোসে বোসেই আমি স্নান কোল্লেম। শরীর একটু সুস্থ বোধ হলো। তারা দয়া কোরে আমারে একখানি কাপড় দিলে, আমি কাপড় ছাড়লেম। আমার সম্মুখে এক গেলাস সরবত; দেখেই আমি মনে মনে কেঁপে উঠলেম, এক সরবতে এত হুলুস্থূল, আবার সরবত! খাই কি না খাই, মনে মনে তর্ক; কিন্তু অত্যন্ত পিপাসা হয়েছিল, এক চুমুক সরবত আমি পান কোল্লেম। সেই ভুড়িওয়ালা লোকটা আবার আমারে সঙ্গে কোরে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল; সেই শয্যার উপরে আবার আমি বোসলেম। লোকটা তখন আমারে বোল্লে, “আমরা ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণী এখানে অন্নপাক করে, আহার কর, তাহার পর আবার নিদ্রা যেয়ো; শরীর সেরে যাবে; সব অসুখ ভাল হবে।”

    সে কথায় কান না দিয়ে সহসা আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “কোথায় আমি এসেছি?”

    আমার মুখপানে চেয়ে ব্রাহ্মণ বোল্লেন, “ঐ জন্যই তোমার এই দশা! হিতকথা বোল্লে তাতে তুমি কান দাও না, তোমার কান হিতকথা ভালবাসে না, সেই কারণেই তুমি কষ্ট পাও। একরত্তি ছেলে, আজিও ফুল ছাড়ে নাই, মুখে এখনো দুধের গন্ধ ঘুচে নাই, এই বয়সেই নেশা ধোরেছ! তিনদিন নেশায় বিভোর হয়ে অজ্ঞান ছিলে, সবে মাত্র চৈতন্য হয়েছে: ভালর জন্য আমি বোল্লেম, আহার কর; কথাটা তোমারে ভাল লাগলো না; কথার উপর কথা দিয়ে তুমি জিজ্ঞাসা কোল্লে, কোথায় এসেছ? সে কথায় এখন তোমার কি দরকার? আহার কর, সুস্থ হও, নিদ্রা যাও, তার পর যে যে কথা জিজ্ঞাসা কোত্তে ইচ্ছা হয়, জিজ্ঞাসা কোরো। তা নয়, এত অবাধ্য কেন তুমি?”

    তিরস্কার সহ্য কোরে তৎক্ষণাৎ আমি বোল্লেম, “আহারে আমার ইচ্ছা নাই। কোথায় আমি এসেছি, সেই তত্ত্বটি অগ্রে আমি জানবো। আমার ভাগ্য বড় মন্দ, ভাগ্যদোষে লোকের কাছে আমি নিন্দাভাজন হই। যে সব কথা আপনি আমারে বোলছেন, তার বিন্দু-বিসর্গও আমি বুঝতে পাচ্ছি না। নেশা করা, অজ্ঞান থাকা, অবাধ্য হওয়া, এ সব কথার অর্থ কি? আচ্ছা মহাশয়, সব কথা না বলুন আমার একটি কথার উত্তর দিন। যেখানে এখন আমি আছি, এ স্থানটি কি ঢাকাজেলার এলাকা?”

    ভুঁড়ি নাচিয়ে হাস্য কোল্লে ব্রাহ্মণ বোল্লেন, “রোগে ধোরেছে, রোগে ধোরেছে! রোগ বড় শক্ত! নেশা এখনো ছাড়ে নাই! নেশায় লোকে পাগল হয়; তাতে আবার কচি বাঁশে ঘুণ ধরা; মাথাটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। হায়, হায়! পাগল রে পাগল! বলে কি না ঢাকাজেলা! কোথায় তোদের ঢাকাজেলা?”

    বিষাদে দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ কোরে পুনরায় আমি বোল্লেম, “তবে কি এটা ঢাকাজেলার এলাকা নয়? কোথায় তবে আমি এসেছি? আমার অজ্ঞাতে কারা আমারে এখানে এনে ফেলেছে?”

    ব্রাহ্মণের ক্রোধ উপস্থিত। চক্ষু পাকল কোরে ঘাড় বাঁকিয়ে ব্রাহ্মণ বোলে উঠলেন, “অধঃপাতে এসেছিস! কারা এনেছে, কোথায় এনেছে, কিসের এলাকা, এ সব নিকাস আমার কাছে নাই। বেহুঁস দেখেছিলেম, দয়া হয়েছিল, যত্ন কোরে রেখে দিয়েছিলেম। কপালে সুখ না থাকলে জোর কোরে কি সুখী করা যায়?”

    আলাৎ-পালাৎ কত কথাই ব্রাহ্মণের মুখে বর্ষিত হলো, শুনে শুনে আমি যেন হতজ্ঞান হোলেম। সকল কথা আমার কানেও গেল না। অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে শেষবারে তাঁরে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আপনি আমারে বোলতে চান কি? কোথা থেকে কোথা আমি এসেছি, সেইটি আমি জানতে চাই, আর কোন বেশী কথা আমি জানতে চাই না, অনুগ্রহ কোরে সেইটি আপনি বলনে। বার বার আপনি আমার আহারের জন্য অনুরোধ কোচ্চেন, কলির মানুষের অন্নগত প্রাণ, অন্নাহার ব্যতিরেকে প্রাণধারণ করা যায় না, তাহা আমি জানি, কিন্তু ক্ষুধা নাই, রুচি নাই, প্রবৃত্তি নাই। কত স্থানে কত বিপদে আমি পতিত হয়েছি, তা যদি আপনি শুনেন, আমার প্রতি আপনার দয়া হবে। ঢাকাতে আমার আত্মীয়বন্ধু আছেন, আমার অদর্শনে তাঁরা ভাবিত হয়েছেন, আমারো দুর্ভাবনা অনেক। একখানি চিঠি লিখে সেখানকার একটি ডেপুটি বাবুকে আমার এই দুর্দশার কথা জানাব, এই আমার আকিঞ্চন, সেইজন্যই বারবার আমি আপনাকে মিনতি কোরে বোলছি, আপনি আমার প্রতি একটু সদয় হোন, কোথায় আমি এসেছি, দয়া কোরে কেবল সেইটি আমাকে বলুন।”

    বিরক্তবদনে ব্রাহ্মণ তখন বোল্লেন, “কুমিল্লার এলাকা, ত্রিপুরাজেলা, রুদ্রাক্ষ গ্রাম। তুমি কিঞ্চিৎ আহার কর, তার পর অপরাপর কথা জানতে পারবে। একটা কথা কি জানো, এখান থেকে এখন তুমি কোথাও যেতে পাবে না, কিছুদিন এই বাড়ীতেই থাকতে হবে, যে যে কাজ আমরা বোলবো, সেই সব কাজ তোমাকে কোত্তে হবে; মুটে-মজুরের কাজ নয়, আমাদের সেরেস্তায় লেখা-পড়ার কাজেই তোমাকে নিযুক্ত রাখা আমাদের ইচ্ছা, লেখা-পড়া তুমি জানো?”

    সংক্ষেপে তাঁর কথাগুলির উত্তর দিয়ে বিষাদে আমি একটি নিশ্বাস ফেল্লেম। ব্রাহ্মণ একজন বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর দ্বারা আমার জন্য কিঞ্চিৎ খাদ্যসামগ্রী আনিয়ে দিলেন। নামমাত্র আহার কোরে এক গেলাস জল খেয়ে আমি পিপাসা-শান্তি কোল্লেম। আমারে শয়ন কোত্তে বোলে ব্রাহ্মণ তখন সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন; আমাকে স্বাধীনতা দিয়ে গেলেন না, দ্বারের বাহিরে চাবী বন্ধ কোরে গেলেন। বেলা আড়াই প্রহর অতীত হয়েছিল, আমি একটু শয়ন কোল্লেম; নিদ্রার জন্য শয়ন কোল্লেম না, ক্লান্তি দূর করা প্রয়োজন ছিল, সেই কারণেই শয়ন। যখন আমি বোসে থাকি, যখন দাঁড়িয়ে থাকি, যখন কোন কাজকর্মে অন্যমনস্ক থাকি, চিন্তা তখন আমার উপর বেশী শক্তি প্রকাশ কোত্তে পারে না; শয়ন কোল্লেই প্রবল পরাক্রম প্রকাশ করে। বিনা সংগ্রহে চিন্তার উপকরণ আমার বিস্তর। অমরকুমারীর রূপখানি মনের মধ্যে আনয়ন কোরে আনুসঙ্গিক কত ভাবনা যে আমি ভাবলেম, অক্ষরে অক্ষরে লিখে জানানো যায় না। অমরকুমারী আমার জন্য কত ভাবছেন, মণিভূষণ কতই উৎকণ্ঠিত হয়েছেন, অন্যান্য স্থানে যাঁরা যাঁরা আমার হিতৈষী বন্ধু আমার সমাচার না পেয়ে তাঁরা কত উদ্বিগ্ন আছেন, সেই সকল ভাবনা তখন আমার মনে একত্র। ভাবনার কথা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ব্যক্ত কোরে পাঠকমহাশয়কে বিরক্ত করা কিম্বা ভাবনাযুক্ত করা আমার এখনকার কার্য নয়, গোটাকতক নূতন কথা বলি।

    ত্রিপুরা জেলার কুমিল্লার এলাকা রুদ্রাক্ষ গ্রাম; ব্রাহ্মণের বাড়ী; যে ব্রাহ্মণ আমারে তিক্তমধুরমিশ্র সম্ভাষণে প্রপীড়িত করবার অথবা পরিতুষ্ট রাখবার চেষ্টা কোল্লেন, তাঁর কথা শুনে, কার্য দেখে আর ক্ষমতার পরিচয় পেয়ে, অনুমানে আমি বুঝলেম, তিনিই সেই বাড়ীর কর্তা—নামটি তখনো পাওয়া যায় নাই, কিন্তু পাঠকের মনে একটু ধারণা জন্মাবার উদ্দেশে ব্রাহ্মণটির রূপ বর্ণনা করা আবশ্যক।

    ব্রাহ্মণের রূপবর্ণনে আমি অভিলাষী। সংক্ষেপে কেবল এইমাত্র বোলেছি, ভুড়িওয়ালা ব্রাহ্মণ। যারা যারা স্থূলাঙ্গ, সর্ব অবয়ব যাদের বিলক্ষণ স্থূল প্রায়ই তাদের ভুড়ি হয়, সে সকল অঙ্গে ভুড়িও মানায়; কিন্তু এ ব্রাহ্মণ স্থূলাঙ্গ নয়;—হাত দু-খানা সরু সরু পা দু-খানা সরু সরু, বুকখানাও সরু গলাটিও সরু, অঙ্গের সম্ভাবিত সমস্ত মাংস কেবল উদরেই আশ্রয় কোরেছে; ভুড়ি প্রকাণ্ড। উদরীরোগগ্রস্ত লোকের চেহারা যেমন হয়, মুখে যেমন পাণ্ডুবর্ণ দেখায়, এ ব্রাহ্মণের চেহারাও সেই প্রকার। গঠন দীর্ঘাকার, বর্ণ পিঙ্গল, চক্ষু বড় বড়, নাসিকা খর্ব, কপাল প্রশস্ত, মস্তক প্রায় কেশশূন্য, মধ্যস্থলে প্রায় এক হাত লম্বা এক টিকি, পৃষ্ঠদেশের অর্ধেক দূর পর্যন্ত লম্বিত; পরিধান একখানি সরু ফিনফিনে মলমলের ধুতি; ভুঁড়ি আচ্ছাদনেই সে ধুতির অর্ধাংশ অপেক্ষা অধিক পর্যবসিত, অপর অংশে নিম্নাঙ্গের জানু পর্যন্ত আচ্ছাদিত। মূর্তিদর্শনে সহসা ভয়ের আবির্ভাব হয়; ঘৃণা বলা গেল না,—ব্রাহ্মণের চেহারা দেখে ঘৃণা কোত্তে নাই; বস্তুতঃ ঘৃণা যেন আপনা হোতেই অগ্রে অগ্রে এসে উপস্থিত হয়।

    এই অনুমানে আমার যদি ভুল না থাকে, তবে এই ব্রাহ্মণ এই বাড়ীর কর্তা। বাড়ীখানা কেমন, বাড়ীখানা কত বড়, তখনো পর্যন্ত তা আমি জানতে পারি নাই; কিন্তু যে ঘরে আমি আছি, সে ঘরের আয়তন আর সাজসরঞ্জামের পারিপাট্য দেখে মনে হয় বৃহৎ বাড়ী, ব্রাহ্মণ একজন বড়মানুষ।

    বেলা যখন প্রায় অবসান, সেই সময় দ্বারের চাবী খুলে সেই ব্রাহ্মণ গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেন, সঙ্গে একটি লোক। প্রবেশ কোরেই গম্ভীরস্বরে ব্রাহ্মণ আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি গো! ঐ দেখ, কথায় কথায় আমি তোমার নামটা ভুলে ভুলে যাই; কি নাম?—হাঁ, হরিদাস। কি গো হরিদাস! ঘুম ভেঙেছে?”

    আমি উঠে বোসলেম; ব্রাহ্মণের প্রশ্নের উত্তর দিলেম, “ঘুম আমার আসে না; ঘুমের সঙ্গে আমার যে সম্বন্ধ ছিল, চিন্তা-পিশাচী সে সম্বন্ধটি যেন বিচ্ছিন্ন কোরে দিয়েছে: প্রকৃতির উপরেও যেন চিন্তা আপনার পরাক্রম প্রকাশ কোরেছে!”

    সাপের মত বারকতক ফোঁস ফোঁস কোরে ব্রাহ্মণ বোল্লেন, “তাই তো! প্রকৃতির দোষ, চিন্তার দোষ, তোমার দোষ নাই! তাই তো বটে! তিন দিন তিন রাত বেহুঁস—বেহুঁসে ঘুমিয়েছ, তবে আর নিদ্রাকে দোষ না দিয়ে তুমি আর কি কোত্তে পার? আচ্ছা, আমার কাছে তুমি একটা প্রতিজ্ঞা কোত্তে পার? জন্মে আর কখনো কোন নেশার জিনিস তুমি ছোঁবে না, যারা নেশা করে, তাদের কাছে যাবে না, এই প্রতিজ্ঞা কোত্তে যদি রাজী হও, তা হোলে নিদ্রাকে উপরোধ কোরে আমি তোমার বশীভূত রাখতে পারবো।”

    আমার অন্তরে অত্যন্ত আঘাত লাগলো। ম্লান বদনে ব্রাহ্মণকে আমি বোল্লেম, “বারম্বার কেন আপনি একটা মিথ্যাকথা নিয়ে আমারে ঐরূপ তিরস্কার কোচ্ছেন? নেশা কারে বলে, নেশার জিনিস কি প্রকার, জন্মেও কখন তা আমি জানি না। যারা আমারে অজ্ঞান অবস্থায় এখানে এনে ফেলে রেখে গিয়েছে, তারা আপনাকে কি একটা মিথ্যাকথা শুনিয়ে দিয়েছে, ধ্রুব-বিশ্বাসে তাই আপনি মনে কোরে রেখেছেন, তাই মনে কোরেই বার বার আপনি আমারে অপরাধী কোচ্ছেন। আমি গরীব। জন্মাবধি আমি ফকিরের মতন পর্যটক, দোষের কাছে জন্মাবধি আমি অপরিচিত; পরের মুখে রচা কথা শুনে আপনি আমারে দোষী করেন, শুনে শুনে আমার প্রাণে বড় ব্যথা লাগে!”

    কেমন এক প্রকার হাস্য কোরে ব্রাহ্মণ তৎক্ষণাৎ আবার সক্রোধে বোলে উঠলেন, “কি কথা বোলছো তুমি? পরের কথা আমি শুনেছি? কাদের কথা আমি শুনেছি? বেহুঁস হয়ে পথে তুমি পোড়ে ছিলে, কুড়িয়ে এনে যত্ন কোরে নিজ বাড়ীতে আমি তোমায় আশ্রয় দিয়েছি, তারই বুঝি এই ফল? পরের কথা আমি শুনেছি, কে তোমাকে এমন কথা বোলে?”

    আমি আর সে সময় বেশী শিষ্টাচার দেখাতে পাল্লেম না, তৎক্ষণাৎ উত্তর কোল্লেম, “কেহ কিছু বলে নাই, নিজেই আমি বুঝতে পাচ্ছি, পরের কথা আপনি শুনেছেন। তা না শুনলে আমার নাম আপনি কেমন কোরে জানলেন? আমি তো আপনার কাছে আমার নাম বলি নাই। অবশ্যই আপনি পরের কথা শুনেছেন। যা যা শুনেছেন, আমি বুঝতে পাচ্ছি, আমার নামটি ছাড়া সমস্তই মিথ্যা!”

    ব্রাহ্মণ এইবার অপ্রতিভ হোলেন; অল্পক্ষণ নিরুত্তর থেকে, তেজটা একটু কোমিয়ে এনে, একটু নম্রস্বরে বোল্লেন, “তাই তো! তোমার মাথাটা এখনো গরম আছে! এসো, এই লোকটির সঙ্গে বাহিরের বাতাসে একট বেড়িয়ে এসো; ঠাণ্ডা হবে। আর কোথাও যেয়ো না, এখান থেকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা কোল্লে ভারী বিপদে পোড়বে।”

    প্রথমের কথাকটি আমি শুনলেম, শেষের কথায় কান দিলেম না; বাহিরের বাতাসে বেড়াবার একান্ত ইচ্ছা হয়েছিল, আবশ্যকও হয়েছিল, ব্রাহ্মণের সমভিব্যাহারী লোকটির সঙ্গে উপর থেকে নেমে বাড়ী থেকে আমি বেরুলেম।

    যদিও শেষ বেলা, তথাপি তখনো আকাশে সূর্য ছিলেন। বাড়ীখানি আমি ভাল কোরে দেখলেম। প্রকাণ্ড বাড়ী। পূর্বে-পশ্চিমে লম্বা বৃহৎ বারান্দা; অর্ধেকটা ভগ্নদশাপ্রাপ্ত, অর্ধেকটা বে-মেরামতে মলিন। বারান্দার সম্মুখে বাগান ছিল, ফুলবাগান: চারিদিকে ছোট ছোট থাম দিয়ে ঘেরা ছিল; অনেকগুলি থাম কেবল ইষ্টকসার হয়ে আছে, ফুলগাছগালিও আধমরা। কিসের শোকে গাছেরা যেন কাঁদছে, এই রকম বোধ হলো। একদিকে দেখলেম, মস্ত একটা ঢিবি। যে লোকটি আমার সঙ্গে এসেছিল, তার নাম রামদাস। তারে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “ঐ ঢিবিতে কি হয়?”

    রামদাস উত্তর কোলে, “বাবুদের বাড়ীতে পূর্বে রাস হোতো, এখনো হয়, ঘটা হয় না; ঐখানে দিব্য একটি পাকা রাসমঞ্চ ছিল, ১২৫৯ সালের ঝড়ে সেটি সমভূমি হয়ে যায়; কেবল ঐ ঢিবিমাত্র অবশিষ্ট থাকে; এখনো তাই আছে; অবস্থা সিকস্ত; বাবুরা আর সেই রাসমঞ্চ খাড়া কোরে তুলতে পারেন নাই। তদবধি রাসের সময় ঐ ঢিবির উপর গোটাকতক বাঁশ খাড়া কোরে চাঁদোয়া টাঙিয়ে ঠাকুর বসানো হয়।”

    আমি রামদাসের মুখের দিকে চেয়ে থাকলেম; কিন্তু আকার-প্রকারে বুঝতে পেরেছিলেম, রামদাস সে বাড়ীর একজন সামান্য চাকর মাত্র; মূলতত্ত্বে তার সঙ্গে অধিক কথা কওয়া আমি তখন অনাবশ্যক ভাবলেম। রাসমঞ্চের পরিচয় দিয়ে রামদাস আরো বোল্লে, “বাহিরে তো এই দশা দেখছো, ভিতরদিকে আরো দুর্দশা। অন্দরমহল একেবারে নাই, সমভূম; পূজাবাড়ীর দালানের তিনদিকে বারান্দা দেখেছ, পশ্চিমের বারান্দার পশ্চাদ্দিকে যতগুলি ঘর আছে, ফাটা চটা নোণাধরা, সেই সকল ঘরে এখন অন্দরমহল হয়েছে, দক্ষিণের আর পূর্বের বারান্দায় দিবারাত্রি চিক ফেলা থাকে।”

    ও সব কথায় আমার তত প্রয়োজন ছিল না, কেবল শুনলেম এই মাত্র, বাবুদের এখন দূরবস্থা, সেইটি বুঝে রাখলেম। গল্প কোত্তে কোত্তে রামদাস আমারে সম্মুখদিকে খানিক দূর এগিয়ে নিয়ে গেল। চারিদিক আমি নিরীক্ষণ কোল্লেম। রামদাসের মুখে শুনলেম, অনেক দূর পর্যন্ত বাবুদের ভদ্রাসনের সীমা। বাবুদের দূরবস্থা ঘোটেছে, কিন্তু বিশ্বজননী প্রকৃতির যেরূপ মধুর ভাব, সে ভাবের কিছুই ব্যত্যয় ঘটে নাই; অপরাহ্নের সংশীতল সমীরণ সেবন কোরে অনেক পরিমাণে আমি শীতল হোলেম। বুকের ভিতর যে আগুনে জ্বোলছিল, তার কিছু উপশম হলো না, কিন্তু বাহিরে অনেকটা ঠাণ্ডা বোধ কোল্লেম।

    সূর্যদেব অস্তগত। বেড়াতে বেড়াতে আমরা বাড়ীর দিকে ফিরলেম। যাবার সময় দেখি নাই,

    আসবার সময় দেখলেম, বাহিরের বারান্দার যে অর্ধাংশ ভেঙে গিয়েছে, সেই অংশের শেষভাগের সর্ব পশ্চিম সীমায় একটি ভগ্নগৃহ বিদ্যমান; বাঁশের সিঁড়ির সাহায্য ভিন্ন সে গৃহে প্রবেশ করবার উপায় নাই। একবার পশ্চিমাকাশে, একবার সেই ভগ্নগৃহের দিকে দৃষ্টিদান কোরে, রামদাস তাড়াতাড়ি বোলে উঠলো, “চলো চলো, চলো, শীঘ্র চলো। অন্ধকার হয়ে এলো! এ জায়গায় অন্ধকারে বড় ভয় আছে!”

    কথা বোলতে বোলতে,—পশ্চাতে হাত ফিরিয়ে হাতছানি দিয়ে আমারে ডাকতে ডাকতে রামদাস একদৌড়ে দেউড়ীর ভিতর ঢুকে পোড়লো; পূর্বাপর কিছুই চিন্তা না কোরে আমিও দ্রুতপদে তার অনুগামী হোলেম। বাবুর বাড়ীর দেউড়ী তখনো ছিল, কিন্তু দেউড়ীগুলি যারা শোভিত করে, তারা কেহ উপস্থিত ছিল না। দেউড়ী পার হয়ে রামদাসের সঙ্গে আমি উপরে গিয়ে উঠলেম। অল্পকথায় আমি বুঝে নিলেম, রামদাসটি লোক সরল, কিন্তু অত্যন্ত ভীরু।

    দিনমানে যেখানে ছিলেম। সেইখানে প্রবেশ কোরে দেখলেম, ঘরের একধারে একটি প্রদীপ জ্বোলছে, যে বিছানায় আমি শয়ন কোরেছিলেম, সেই বিছানার উপর দুটি যুবা চুপ কোরে বোসে আছে; যে বৃদ্ধা স্ত্রীলোকটি আমার খাবার সামগ্রী দিয়ে গিয়েছিল, একধারে দেয়াল ঠেস দিয়ে সে স্ত্রীলোকটিও দাঁড়িয়ে আছে। আমারে দেখেই সেই স্ত্রীলোক একটু হাসতে হাসতে বোল্লে, “ওগো হরিদাস, এই দুটি বাবু তোমায় দেখতে এসেছেন। কর্তাবাবুর ছেলে।”

    কর্তাবাবুর ছেলেদের মুখপানে আমি চাইলেম, তাঁরাও খানিকক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন। আমার মুখে দেখা শেষ হয়ে গেলে ভাই দুটি পরস্পর চক্ষু ঠারাঠারি কোরে মৃদু মৃদু হাস্য কোল্লেন, বিছানার উপর এক চাপড় মেরে একটি বাবু আমারে তাঁদের কাছে বসবার ইঙ্গিত কোল্লেন; ঠিক নিকটে না বোসে একটু দূরে গিয়ে আমি বোসলেম।

    বাবুর ছেলে। ক্ষমতা না থাকলেও কর্তাবাবুর রূপ আমি বর্ণনা কোরেছি, বৃহৎ এক ভূঁড়ি থাকলেও কর্তাবাবু একটি কাহিল মানুষ, সোজাকথায় রোগা মানুষ; এই দুটি বাবুও রোগা রোগা;— আর সেই প্রাচীনা স্ত্রীলোক, নিশ্চয়ই পরিচারিকা, সেই পরিচারিকাটিও রোগা; যে রামদাসটি আমার সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিল, সেই রামদাসটিও খুব রোগা; বাড়িতে যতগুলিকে আমি দেখলেম, সকলগুলিই রোগা রোগা। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার!

    আশ্চর্য ভেবে একদিকে আমি চেয়ে আছি, বাবু দুটির মধ্যে একটি বাবু সেই সময় আমারে সম্বোধন কোরে বোল্লেন, “তোমাকে দেখে আমরা বড় তুষ্ট হোলেম। শুনেছিলেম, তুমি একটা দোষ কোরেছ, তোমার মুখ দেখে সে কথায় আমার বিশ্বাস হোচ্ছে না। দেখ হরিদাস, তুমি খুব সাবধানে থেকো; লোকের মুখে শুনতে পাই, এখানে কিছু ভয় আছে। রাত্রিকালে যদি কিছু ভয়ের লক্ষণ বুঝতে পার,— ঘরের ভিতর নয়, বাহিরে যদি কোন প্রকার শব্দ শুনতে পাও, বিছানা থেকে উঠো না, দরজা খুলে দেখো না, কোন প্রকার তত্ত্ব জানবার চেষ্টা কোরো না, ভয়টা আপনা আপনি দূর হয়ে যাবে। বুঝলে কি না?”

    আর একটি বাবু বোল্লেন, “ভয়ের কথা বোলে দাদা তোমাকে সাবধান কোচ্ছেন, আমি কিন্তু আর একটি কথা বোলতে চাই। শুনলেম, কিছুই তুমি আহার কোচ্ছো না। কেন উপবাস কর? ব্রাহ্মণের বাড়ীতে আহার করায় কোন দোষ নাই। আহার কোরো,—অনাহারে শরীর শীর্ণ হোলে দাদার কথায় ভয়টা আরো তোমাকে জোড়িয়ে জোড়িয়ে ধোরবে। আহার কোরো।”—এই পর্যন্ত বোলে সেই প্রাচীনা স্ত্রীলোকের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ কোরে ছোটবাবুটি আরো বোল্লেন, “এই ইনি আমাদের পাচিকা, কুলীনব্রাহ্মণের কন্যা, রাত্রিকালে ইনি তোমার জন্য অন্ন-ব্যঞ্জন এনে দিবেন, আহার কোরো; কল্য আমরা শুনবো; কল্য আবার এক সময় আমরা দুজনে এসে তোমার সঙ্গে ভাল কোরে আলাপ কোরবো।”

    বাবু দুটি উঠে দাঁড়ালেন, আমি তাঁদের উভয়কে দুই হাত তুলে প্রণাম কোল্লেম; তাঁরা চেলে গেলেন; প্রাচীনা ব্রাহ্মণীও তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে গেলেন। অল্পক্ষণ আমি একাকী থাকলেম। একটু পরেই সেই রামদাস।

    চুপি চুপি ঘরের ভিতর এসে রামদাস আমার বিছানার কাছে ছোট একখানা চৌকীর উপর বোসলো; নানা রকম গল্প জুড়ে দিলো। এ কথা সে কথা পাঁচ কথার পর ঘন ঘন নিশ্বাস নিল, পরে রামদাস একটু কৌতুকস্বরে বোল্লে, “রাম নামের চেয়ে আর নাম নাই; এই নামে ভয় যায়, রাম রাম বোলে শয়ন কোরো, কোন ভয় থাকবে না। এ বাড়ীতে ভূতের ভয় আছে শুনেছি, বড়বাবুও বোলে গেলেন; ভয় আছে সত্য, কিন্তু ‘রাম’ নাম শুনে ভূতেরা ছুটে পালায়।”

    যখনই রামদাস বোলছে, তৎক্ষণাৎ তা আমি বুঝতে পাল্লেম, মনে মনে হানা কোরে আমি বোল্লেম, “রাম নামের অভাব কি? তোমার নাম রামদাস, আমার নাম হরিদাস, দুজনেই আমরা রামচন্দ্রের সেবক; তোমারো ভয় নাই, আমারো ভয় নাই। আচ্ছা রামদাস! এ বাড়ীর কর্তাবাবুর নাম কি? যে দুটি বাবু এসেছিলেন, সে দুটি বাবুর নাম কি?”

    রামদাস উত্তর কোল্লে, “কর্তার নাম জয়শঙ্করবাবু, বড়বাবুর নাম প্রাণগতিবাবু, ছোটবাবুর নাম মিহিরচাঁদ। উপাধি চৌধুরী।”

    রামদাসের সঙ্গে আমি অনেক রকম গল্প কোল্লেম, তার মুখেও অনেক রকম গল্প শুনলেম। রাত্রি প্রায় দেড় প্রহর পর্যন্ত কেবল রামদাসটি আমার দোসর। দেড় প্রহরের পর রামদাস উঠে গেল। সেই প্রাচীনা স্ত্রীলোকটি আমার জন্য অন্ন-ব্যঞ্জন প্রস্তুত কোরে সেই ঘরেই এনে উপস্থিত কোল্লেন। আগে আমি তাঁরে পরিচারিকা মনে কোরেছিলেম, শেষে জানলেম, তাদৃশী পরিচারিকা নন, বাবুদের পাচিকা। তিনি একাকিনী এলেন না, জল, আসন আর লবণাদি হাতে কোরে একটি পরিচারিকা তাঁর সঙ্গে এলো। আমার আহারাদির আয়োজন কোরে দিয়ে পাচিকাঠাকুরাণী একখানি চৌকীর উপর বোসে থাকলেন, কপাটের ধারে পরিচারিকা দাঁড়িয়ে থাকলো।

    পরিচারিকার বয়স অল্প; বড় জোর পঁচিশ ছাব্বিশ বৎসর, বর্ণ অগৌর নয়, কিন্তু গায়ে ঠাঁই ঠাঁই বসন্তের দাগ, মুখেও বসন্তের দাগ; মাথায় চলু অল্প, মুখখানি কিন্তু দেহের সঙ্গে মানানসই, চক্ষু দুটি ভাসা ভাসা। গায়ে অলঙ্কার ছিল না, পরিধান একখানা লালপেড়ে শাড়ী। দেখতে নিতান্ত মন্দ নয়; কিন্তু রোগা। আমি মনে কোল্লেম, এ বাড়ীর বাতাসের কোন রকম দোষ আছে; যারা এ বাড়ীতে থাকে, যারা এ বাড়ীতে জন্মে, তারাই রোগা হয়।

    আমার আহার-সামগ্রী প্রস্তুত। যদিও ব্রাহ্মণের বাড়ী, তথাপি সর্ব-প্রথমে বাড়ীর কর্তা আমার সঙ্গে যে রকম কর্কশ ব্যবহার কোরেছিলেন, আমায় যে সকল কটু বাক্য বোলেছিলেন, সে সব মনে কোরে সে বাড়ীতে অন্নগ্রহণ কোত্তেও আমার প্রবৃত্তি ছিল না। কর্তার ছেলে দুটির শিষ্টাচার দর্শনে আর সেই প্রাচীনা ব্রাহ্মণ-কন্যার স্নেহ-যত্ন দর্শনে আমার সে ভাবের পরিবর্তন হয়েছিল। রাত্রে আমি আহার কোল্লেম।

    যতক্ষণ আমি আহার কোল্লেম, সেই পরিচারিকা ততক্ষণ সেই কপাটের কাছে দাঁড়িয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকলো; চাউনি কি প্রকার, আড়ে আড়ে চেয়ে চেয়ে এক একবার তাও আমি দেখলেম। আহার যখন প্রায় শেষ হয়ে এলো, সেই সময় পাচিকাঠাকুরাণী সেই পরিচারিকাকে সম্বোধন কোরে বোল্লেন, “রূপসি! যা দুধ-সন্দেশ নিয়ে আয়!”

    পরিচারিকার নাম রূপসী। পাচিকার আদেশে রূপসী একবার অন্দরের দিকে গেল; বোলে রেখেছি, বারান্দার পাশেই অন্দর, শীঘ্রই দুধ-সন্দেশ নিয়ে ফিরে এলো। আহার সমাপন কোরে বাহিরদিকের বারান্দায় আমি আচমন কোল্লেম। আহারান্তে তাম্বুল চর্বণ অথবা তাম্রকুট সেবন আমার অভ্যাস হয় নাই, সুতরাং সেই দুই দায় থেকে রূপসী অনিচ্ছায় অব্যাহতি পেলে। সাবধানে আমারে শয়ন কোত্তে বোলে পাচিকাঠাকুরাণী চোলে গেলেন, কিঞ্চিৎ ইতস্ততঃ কোরে, কপাটে চাবী লাগিয়ে রূপসীও চোলে গেল, যাবার সময় বোলে গেল, “প্রদীপে অনেক তেল থাকলো, ইচ্ছা হয়, জেলে রেখো, ইচ্ছা হয় নিবিয়ে দিও।”

    ঘরে মানুষ থাকলো, দরজায় চাবী পোড়লো, এটাই বা কেমন? এখানেও কি আমি কয়েদী? গতিক ভাল নয়! সেই যে গোড়ায় রক্তদন্তের চক্র, এখনো সর্বত্র সেই চক্রের জের চোলে আসছে; রক্তদন্তের লোকেরা নিশ্চয়ই সেই চক্র ঘুরাচ্ছে! যাই হোক, দক্ষিণদিক খোলা, বাহিরদিকের দক্ষিণের বারান্দা উদার মুক্ত, বাতাসের অভাবে দম আটকে মারা যাব না, মনে তখন এইটুকু শান্তি।

    আমি শয়ন কোল্লেম। ঘরে ঘড়ী ছিল না, অভ্যাসের অনুমানে অবধারণ কোল্লেম, রাত্রি দুই প্রহর। গুরুমহাশয়ের পাঠশালায় যত দিন ছিলেম, তত দিন কি রকম হতো, ঠিক মনে হয় না, কিন্তু পাঠশালা থেকে দূরীভূত হবার পর অবধি শয়নমাত্রই নিদ্রা আসে না, অনেকক্ষণ জেগে থাকতে হয়; জেগেই আছি। যে সকল ভাবনা নিত্য আসে, সে সকল ভাবনা তো আছেই, তার উপর নূতন জায়গায় নূতন ভাবনা। বেহুঁস হবার কথা, নেশা করবার কথা, কিছুদিন এই বাড়ীতে বাস করবার কথা আমার মনের ভিতর আসছে; ত্রিপুরাজেলার এলাকামধ্যে এসে পোড়েছি, সে কথাও ভাবছি; অমরকুমারী ঢাকায়, মোকদ্দমা বহরমপুরে, সে সব কথা মনে কোরে অন্তরে অন্তরে উদ্বেগ বাড়ছে; অন্যমনস্ক হবার চেষ্টা কোচ্ছি, পাচ্ছি না। এই নূতন বিপদের মূল সেই কুলকলঙ্কিনী নবীনকালী। ঘনিষ্ঠতা কোরে, আত্মীয়তা কোরে, নবীনকালী আমারে বোলেছিল, সে আমার পালাবার সহায় হবে, সে নিজেও আমার সঙ্গে পালিয়ে আসবে। বোলেছিল, তার কথায় আমি প্রত্যয় কোরেছিলেম; সেই প্রত্যয়ের ফল এই! হায়, হায়! কেন আমি তার কথায় বিশ্বাস কোরেছিলেম? কেন আমি তার হাতে কাল-সরবৎ পিয়েছিলেম? নিশ্চয় সে সরবতে মাদকদ্রব্য মিশানো ছিল! দুষ্টলোকের পরামর্শে নিশ্চয়ই নবীনকালী সে সরবতের সঙ্গে ভাং-ধুতুরা অথবা আর কোন উৎকট বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল, তাতেই আমি অজ্ঞান হয়ে পোড়েছিলেম! অজ্ঞান অবস্থায় এক একবার যেন আমার মনে হয়েছিল, আমি যেন কিসের উপর দুলছি, হেলে দুলে যেন গোড়িয়ে গোড়িয়ে পোড়ছি; এক একবার ঝনঝনে ঘর্ঘরশব্দ আমার কানের ভিতর প্রবেশ কোরেছিল, এখনো সেই ভাবটা একটু একটু মনে পোড়ছে। লোকেরা হয় তো নৌকায় তুলে, গাড়ীতে তুলে কুমিল্লা এলাকায় আমাকে এনে ফেলেছে! নৌকার গতি আর গাড়ীর গতি এখনো যেন আমি অনুভব কোচ্ছি! এ অনর্থের মূল সেই নবীনকালী। পাপিনী, বিশ্বাসঘাতিনী নবীনকালী আমার সঙ্গে বিলক্ষণ চাতুরী খেলেছে! ব্যভিচারপাপে যে সকল স্ত্রীলোক রত হয়, অধিকন্তু পরিবারস্থ নিজসম্পর্কীয় পুরুষের সঙ্গে যারা কুলের বাহির হয়, তাদের মায়া এই প্রকার। যে সকল কুলকন্যা এইরূপে অপথে পদার্পণ করে, তাদের বিশ্বাস করা আর কালসাপ গলায় কখন করা এক সমান!

    শুয়ে শুয়ে এই সকল আমি ভাবছি, হঠাৎ ছাদের উপর ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর শব্দ। দুম দুম, গুম গুম, দুপ দাপ, ধূপ ধাপ, হুপ হাপ, এই প্রকার বিকট বিকট শব্দ! একবার বোধ হলো, ঠিক যেন আমার মাথার উপর, একটু পরে আবার বোধ হলো যেন আমার শয়নঘরের বারান্দায়, একটু পরে আবার বোধ হলো যেন খানিকটা তফাতে! একবার এখানে, একবার ওখানে, একবার ছাদের উপর, একবার বারান্দায়, নানা স্থানে নানাপ্রকার শব্দ! এক একবার বোধ হোতে লাগলো যেন সূতিকাগারে শিশুর ক্রন্দন, এক একবার বোধ হলো যেন কোন বন্যজন্তুর সক্রোধ অস্ফূট গর্জন, একবার শুনলেম যেন দুই তিনজন মনুষ্যের বেতালা নৃত্যের সঙ্গে অট্ট অট্ট হাস্য!

    কি ব্যাপার! এই গভীর রজনীতে বাড়ীর ভিতর এ সব কি হয়! যারা আমার প্রাণান্ত করবার চেষ্টায় ফেরে, তারাই কি রাত্রিকালে বাড়ীর কিছু ভিতর প্রবেশ কোরে এই রকমে আমারে ভয় দেখাচ্ছে? এই স্থির কোত্তে পাল্লেম না। উপর্যুপরি কেবল সেইরূপ শব্দ, সেইরূপে গর্জন আর সেইরূপ উচ্চ উচ্চ হাস্য শ্রবণ কোত্তে লাগলেম! ভূতে যার বিশ্বাস আছে, তারা অবশ্যই ভয় পেতো, ভূত আমি বিশ্বাস করি না, সুতরাং ভূতের ভয় আমার এলো না, কিন্তু অন্য এক প্রকার সন্দেহ আমার মনোমধ্যে সম্পদিত হয়ে কোন এক প্রকার অজ্ঞাত কারণে আমার চিত্তকে অত্যন্ত বিচলিত কোরে তুল্লে।

    ওঃ! এই জন্যই বটে! এই জন্যই রামদাস আমারে সাবধান থাকতে বোলেছিল, এই জন্যই কর্তার বড়ছেলেটি আমারে সাবধান কোরে গিয়েছিলেন, এই জন্যই আমার আহারের পর পাচিকাঠাকুরাণী বার বার আমারে সতর্ক কোরে গিয়েছেন; তাঁরা বোধ হয় নিত্য রাত্রে ঐরূপ শব্দ শুনতে পান, শুনে শুনে তাঁরা বোধ হয় ভূত মনে কোরে ভয় পান। অনেক দিনের পুরাতন বাড়ীতে পরিবার বেশী না থাকলে ভূতেরা এসে বাসা করে, অনেক জায়গায় অনেকের মুখে এরূপ কথা শুনা যায়; কেহ কেহ তালগাছের মত ভূত দেখেন, শাদা কাপড় পরা, কালো কালো কোপনী পরা, লাল কাপড়ের জাঙ্গিয়াপরা, বিকটাকার ভূত অনেক লোকের চক্ষে পড়ে, কালো কালো ভূতেরা অনেক লোকের ঘাড়ে চাপে, যুবতী স্ত্রীলোকের প্রেমে পড়ে, এমন কথাও শুনা যায়, আমার মনে কিন্তু সে রকম ভাব কিছুই এলো না, ভূতের ভয়ে আমি অভিভূত হোলেম না। ব্যাপার কি, যদি কিছু জানা যায়, জানবার অভিপ্রায়ে দক্ষিণদিকের একটা দরজা খুলে বারান্দায় আমি বেরুলেম। নীচে দিব্য পরিষ্কার, আকাশ দিব্য পরিষ্কার, দিব্য জ্যোৎস্না, সকল দিকে চেয়ে দেখলেম, কোথাও কিছু নাই, ছাদের দিকে চাইলেম, কিছুই দেখা গেল না; ভগ্ন বারান্দার পশ্চিম প্রান্তে যে একটা ভগ্নাগৃহ রামদাস আমারে দেখিয়েছিল, সেই গৃহের দিকেও চাইলেম, সেখানেও কিছু নাই; মনে মনে হাস্য কোরে গৃহমধ্যে পুনঃপ্রবেশ কোল্লেম; দরজাটা বন্ধ কোরে দিলেম; প্রদীপটা তখনো জ্বোলছিল, নির্বাণ কোরে দিয়ে পুনর্বার আমি শয়ন কোল্লেম। পুনর্বার সেইরূপ শব্দ। যতক্ষণ আমি বারান্দায় ছিলেম, ততক্ষণ থেমেছিল, পুনর্বার সেইরূপ নৃত্য, সেইরূপ হঙ্কার, সেইরূপ হাস্য। কি এ? ভূত যদি হয়, তবে তো ভূতেরা বিলক্ষণ চালাক, বিলক্ষণ হুঁশিয়ার! সজাগ মানুষ দেখে সাবধান হয়! ভূত যদি হয়, এ রকম ভূত ভাল!

    ভূতের কথা আর আমি ভাবলেম না। নাচে নাচুক, মাতে মাতুক, হাসে হাসুক, আমার তাতে কি? ভূতের ভাবনা দূরে রেখে আমি নয়ন মুদিত কোল্লেম; রাত্রিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল, নয়ন মুদে থাকতে থাকতে নিদ্রা এলো, গাঢ়নিদ্রায় আমি অভিভূত হোলেম। প্রভাতে দরজার চাবী খুলে একজন সেই ঘরের মধ্যে প্রবেশ কোল্লে; সেই শব্দে আমার নিদ্রাভঙ্গ হলো; চেয়ে দেখি, সম্মুখে সেই রূপসী।

    বারান্দার খড়খড়ী খোলা ছিল, ঘরের ভিতর রৌদ্র এসেছিল, রূপসীকে জিজ্ঞাসা কোরে জানলেম, বেলা প্রায় ছয়দণ্ড। কি আমি বলি, শুনবার অভিলাষে রূপসী আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলো, কিছুই আমি বোল্লেম না; রাত্রে যে সকল আশ্চর্য আশ্চর্য শব্দ আমি শ্রবণ কোরেছিলেম, সে সব শব্দের কথা আমার মনের ভিতরেই চাপা থাকলো। ঘরের আবর্জনা পরিষ্কার কোরে, ঘরে ঝাড়ু দিয়ে, রূপসী নিঃশব্দে তখনকার মত বাহির হয়ে গেল। তার পর স্নান, আহার, বিশ্রাম; অপরাহ্ণ সমাগত।

    রামদাসকে সঙ্গে কোরে প্রাণগতিবাবু প্রবেশ কোল্লেন। তখনো আমি শয়ন কোরে ছিলেম, বাবুকে দেখে উঠে বোসলেম। শয্যার এক পার্শ্বে উপবেশন কোরে সহাস্যবদনে বড়বাবু আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি হরিদাস! গত রাত্রে কেমন ছিলে? কোন রকম ভয় পাও নাই তো?”

    প্রশ্ন শুনে আমি ভাবলেম, ভয় পাওয়াটা এ বাড়ীর একটা দৈনিক কার্যের মধ্যেই গণ্য হয়ে পোড়েছে। বাড়ীতে যাঁরা আছেন, তাঁরা হয় তো সকলেই ভয় পান কিম্বা হয় তো অভ্যাস হয়ে গিয়েছে, ততটা আর গ্রাহ্য করেন না; নতুন লোক এলেই ভয়ের কথাটা ভয়ের কাণ্ডটা নূতন হয়ে জেগে উঠে। কাজ কি আমার সে সব কথায়? বিনা সঙ্কোচে সপ্রতিভ হয়েই আমি উত্তর কোল্লেন, “বেশ ছিলেম, কিছুই ভয় পাই নাই, ভয় পেতে হয়, তেমন কোন লক্ষণও আমি জানতে পারি নাই।”

    বড়বাবুর উভয় নেত্র বিস্ফারিত। নিষ্পলকে আমার নিষ্পলক নয়ন নিরীক্ষণ কোরে ক্ষণকাল তিনি নির্বাক থাকলেন, তার পর একটু গুঞ্জনস্বরে বোল্লেন, “ছেলেমানুষের ঘুম বেশী। তা বেশ! রাত্রিকালে জেগে থাকলেই অনেক রকম ভয় আসে, চক্ষের কাছে যেন কত রকম বিভীষিকা দেখা যায়। অচেতনে ঘুমালে আর কোন উৎপাত থাকে না। তা বেশ! এখন একটু বেড়াতে যাবে?”

    অছিলা একটু পেলেই হয়। বেড়াতে যাওয়ায় আমার বড় আমোদ। নানা দিকে নানা বস্তু দর্শন কোরে মন একটু প্রফল্ল থাকে, চিন্তা-ভাণ্ডারের দ্বার খানিকক্ষণ অবরুদ্ধ থাকে, খানিকক্ষণ বেশ অন্যমনস্ক থাকা যায়। বড়বাবুর প্রশ্নে তৎক্ষণাৎ আমি উত্তর দিলেম, “যাব। নূতন জায়গায় এসেছি দেখে শূনে রাখা ভাল। বিশেষতঃ কর্তার মুখে শুনেছি, কিছুদিন আমারে এখানে থাকতে হবে, সেরেস্তায় লেখাপড়া কোত্তে হবে, স্থানটা ভালরূপে জেনে রাখা দরকার। কল্য বৈকালে রামদাস অল্প অল্প দেখিয়ে এনেছে। রামদাসটি বেশ লোক। আজিও কি রামদাস আমার সঙ্গে যাবে?”

    বড়বাবু বোল্লেন, “হাঁ, রামদাসও যাবে, আমিও যাব। চল; এসো।”

    তৎক্ষণাৎ প্রস্তুত হয়ে ঘর থেকে আমি বেরুলেম। দক্ষিণের জানালা দরজা বন্ধ হলো, ঘরের প্রবেশ-দ্বারে রামদাস চাবী দিল, আমরা বেড়াতে চোল্লেম। আমি আর বড়বাবু পাশাপাশি,— সারি সারি, পশ্চাতে রামদাস।

    রুদ্রাক্ষ গ্রাম। যে বাড়ীতে আমারে থাকতে হয়েছে, গ্রামের উত্তর প্রান্তে সেই বাড়ী। বাড়ী থেকে বেরিয়ে আমরা পশ্চিমের রাস্তা ধোল্লেম। পল্লীগ্রামের রাস্তা, সর্বত্রই প্রায় সঙ্কীর্ণ, ঠাঁই ঠাঁই কিছু প্রশস্ত; ধারে ধারে দূরে দূরে এক একখানা সামান্য রকমের বাড়ী, দূরে নিকটে ক্ষুদ্র বৃহৎ বৃক্ষ মালা। শ্রেণীবদ্ধ বৃক্ষ, এমন কথা আমি বোলছি না, কোথাও একটি, কোথাও দুটী পাঁচটী, কোথাও বা আট-দশটী, স্থানে স্থানে এই রকমে নানাজাতি বৃক্ষ দণ্ডায়মান, মধ্যে মধ্যে এক একখানি বাগান। এইখানে আমি একটা আশ্চর্য দেখলেম। সকল গাছে পাতা নাই; যে সব গাছে পাতা আছে, সে সব গাছ যেন একটু একটু ঝলসানো ঝলসানো; পাতাগুলিও ছোট ছোট। পাতার বর্ণও অন্য প্রকার; নিখাত হরিৎবর্ণের বৃক্ষপত্র অতি অল্পই দেখা গেল। আর এক আশ্চর্য, কোন বৃক্ষশাখায় একটিও পাখী দেখলেম না।

    গল্প কোত্তে কোত্তে আমরা চোলেছিলেম, প্রকৃতির ঐরূপ বিপর্যয় দর্শনে বড়বাবুকে আমি সেই বিপর্যয়ের হেতু জিজ্ঞাসা কোল্লেম। বড়বাবু বোল্লেন, “দ্বাদশ মাসের মধ্যে এই অঞ্চলে পাঁচবার অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল, অনেক লোকের ঘর-বাড়ী ভস্ম হয়ে গিয়েছে, অনেক বড় বড় বৃক্ষ সমূলে দগ্ধ হয়েছে, অগ্নিক্ষেত্রের নিকট বৃক্ষ একটিও সতেজ নাই; যে সকল বৃক্ষ দূরে ছিল, সেইগুলিই বেঁচে আছে, এগুলিও দূরে থাকাতে রক্ষা পেয়েছে, কিন্তু ভীষণ অনলের উত্তাপে শাখাপত্রাদির অবস্থা ঐ রকম। এ অঞ্চলে তৃণগৃহ অনেক ছিল, অগ্নিকাণ্ডে প্রায় সমস্তই ভস্মীভূত; পুনর্নির্মাণে যারা অসমর্থ ছিল, তারা পালিয়ে গিয়েছে, কাজেই গ্রামবাসীর সংখ্যা কম হয়ে পোড়েছে।”

    পশ্চাতে ছিল রামদাস। বড়বাবুর অপেক্ষা রামদাসের বয়স অনেক বেশী : রামদাস তাঁদের বাড়ীর অনেক দিনের চাকর, রামদাস বড়বাবুর জন্ম দর্শন কোরেছে; বড়বাবুর কথা সমাপ্ত হবামাত্র রামদাস আমাদের সম্মুখে এগিয়ে এসে হস্ত বিস্তার কোরে বোলে উঠলো, “সে কথাটা বুঝি বোল্‌বে না? ঘর পুড়ে গিয়েছে, গাছ পুড়ে গিয়েছে, মানুষেরা পালিয়ে গিয়েছে, এই কথা বোল্লেই বুঝি সব বলা হলো? আসল কথাটা চেপে রাখ কেন? ভয় করে বুঝি বোলতে?” বড়বাবুকে ঠেস দিয়ে দিয়ে ঐ কথাগুলি বোলে আমার দিকে চেয়ে রামদাস বোলতে লাগলো, “না গো হরিদাস, সে রকম আগুন লাগা নয়; লোকেরা সব লোকের ঘরে ঘরে আগুন দিয়ে দিয়ে বেড়াতো। কাজ পাবার মৎলবে এক এক জায়গায় গুপ্তভাবে ঘরামী লোকেরা যেমন লোকের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে যায়, এ গাঁয়ের কাণ্ডটা সে রকম নয়;—রাম! রাম! রাম!—এ গ্রামে মাসকতক অত্যন্ত ভূতের ভয় হয়েছিল, সন্ধ্যার পর ভূতের ভয়ে কেহই ঘরের বাহির হোতে পাত্তো না; না বেরুলে নয়, এমন কোন প্রয়োজন উপস্থিত হোলে পাঁচ সাতজন একত্র হয়ে মশাল জ্বেলে জ্বেলে রাস্তায় বেরুতো। কেন জানো? ভূতেরা আগুন দেখলে ভয় পায়, আলো দেখলে পালিয়ে যায়, সেই জন্য। সেই রকম হোতে হোতে গ্রামের জনকতক ডানপিটে লোক একটা দল বেঁধে পরামর্শ কোল্লে, আগুন দেখে যদি ভূত পালায়, তবে গ্রামে আগুন দিয়ে ভূত তাড়াবার ব্যবস্থা করা যাক। সেই ব্যবস্থায় বার বার অগ্নিকাণ্ডে লোকের ঘর-বাড়ী গেল, গাছপালা গেল, ভূত কিন্তু পালালো না।”

    কিঞ্চিৎ বক্রদৃষ্টিতে চেয়ে একটু উচ্চকণ্ঠে বড়বাবু বোল্লেন, “ও কি কর রামদাস বালকের কাছে ও সব পরিচয় কেন? রেতের বেলা ভয় পাবে। কত জায়গায় কত গ্রামে কতবার আগুন লাগে, ও রকমে হেতুর নির্ণয় কোরে কেহ কাহাকেও বুঝায় না, বুঝাতে হয়ও না।”

    রামদাস চুপ্‌ কোরে থাকলো। আমি মনে মনে হাস্য কোল্লেম। বালক রেতের বেলা ভয় পাবে! ভূতের নামে ভয় পায়, এ বালক নয়, প্রাণগতিবাবু সেটি জানেন না, সেই জন্যই রামদাসকে সাবধান কোরে দিলেন। একরকম ইতিহাস আমি শুনলেম, মুখ বুজে চাপ কোরে থাকাও ভাল দেখায় না, বড়বাবুকেই আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আগুন লেগেছিল, অনেক লোকের ক্ষতি হয়ে গিয়েছে, হোতেই পারে, হয়েই থাকে, গাছে একটীও পাখী বসে না কেন? পাখীরাও কি ভূতের ভয়ে পালিয়ে গিয়েছে?”

    বড়বাবু উত্তর করবার পূর্বে আমার নূতন প্রশ্নে রামদাস উত্তর কোল্লে, “ভূতের ভয়ে পাখী পালায় না, ভূতের ভয়ে পালায় নাই; বৎসরের মধ্যে বার বার আগুন লাগতে লাগলো, পাখীদের বাসাগুলি সব পুড়ে গেল, ছানাগুলিও মারা গেল, বাসাতে যে সকল ডিম ছিল, সেগুলি সব দগ্ধ হলো, কাজে কাজে আগুনের ভয়ে পাখীরা সব উড়ে পালালো; আগুনের ভয়,— ভূতের ভয়ে নয়। আমি তো মনে করি, অনেক মানুষের চেয়ে অনেক পশু-পক্ষীর বুদ্ধি বেশী। পশু-পক্ষীরা মুখে কথা কোয়ে কিছু প্রকাশ কোত্তে পারে না, কিন্তু মনে মনে ভালমন্দ সমস্তই বুঝতে পারে; পেটে পেটে বুদ্ধি।”

    আমরা বেড়াচ্ছি, রুদ্রাক্ষগ্রামের পশ্চিমসীমা যেখানে শেষ, সেইখানে একটা নদী, আমরা সেই নদী-কূলে উপস্থিত হোলেম। আর অগ্রসর হওয়া গেল না, নদীতীরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চারিদিকের শোভা আমরা দর্শন কোত্তে লাগলেম। খানিকক্ষণ আপন মনে কি আলোচনা কোরে একটা ম্লানবদনে রামদাস আমাকে বোল্লে, “পাড়াগাঁয়ে গরীবের বাস অধিক; গরীবলোকেরা পাতার ঘরে, খড়ের ঘরে বাস করে; এ গ্রামেও তাই ছিল, দেখে এসেছো খানকতক কুড়ে ঘর নূতন হয়েছে, আগেকার পোড়া-ঘর পোড়ে আছে, বড়ই দুর্দশা। আমাদের গাঁয়ে পাকাবাড়ী বড়ই কম; আমাদের বাবুদের ঐ একখানি আর গ্রামের পূর্বদিকে তিন ঘর তন্তুবায়ের তিনখানি, এই মাত্র। পাকাবাড়ীতে আগুনের ভয় বড় একটা থাকে না, বাবু লোকের উপর ভূতের উপদ্রবও বেশী হয় না, যত কোপ গরীবদের উপর!”

    রামদাসের শেষ কথাগুলির উপর টীকা করবার কোন প্রয়োজন হলো না, আমি চুপ কোরে থাকলেম। রামদাসের মুখখানি একটু ভারী হলো, ভাবে বুঝা গেল অভিমান। যারা বেশী কথা কয়, তারা মনে করে, আমাদের কথায় সকল লোকের আমোদ হবে সকলে আমাদের বাকশক্তির প্রশংসা কোরবে, অবশ্যই কেহ না কেহ মনোযোগ দিয়ে শুনে শুনে বড় বড় কথার উত্তর দিবে। রামদাস এখানে কোন উত্তর পেলে না, তাতেই তার অভিমান হলো। রামদাস হঠাৎ পাকাবাড়ীর কথা কেন তুলেছিল, আমি সেটা কতক কতক বুঝতে পেরেছিলেম; ভূতেরা পাকাবাড়ীতে বাসা করে কি না, রামদাস হয় তো সেই কথাই বোলতো; উত্তর পেলো না বোলেই ভূমিকাতেই ইতিহাসটা সাঙ্গ কোরে দিলে; সাঙ্গ কোত্তেই বাধ্য হলো। সেইজন্যই অভিমান, তার তখনকার মুখের ভাব দেখে আমি সেইরূপ অনুমান কোল্লেম।

    নদীর জল তলে রক্তবর্ণ সূর্যমণ্ডলের ছায়া। সূর্যদেবের অস্তাচলে গমনের সময় সন্নিহিত। প্রাণগতিবাবু আকাশের দিকে একবার চেয়ে আমার মুখের দিকে ফিরে প্রসন্নবদনে বোল্লেন, “দেখ হরিদাস, তুমি আমাদের কাছে নূতন, তথাপি তোমার চক্ষু দেখে আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি বেশ বুদ্ধিমান। ভূতের প্রসঙ্গে যে সব কথা আমরা বলাবলি কোল্লেম, তত হোক না হোক, সব কথায় মনে এক প্রকার ভয় আসে; পৃথিবীর সকল দেশেই ভূতের অস্তিত্বে আশ্চর্য আশ্চর্য গল্প শুনা যায়; বিশ্বাসের সঙ্গে যারা গল্প করে, তারা অবশ্যই ভয় পায়। দিনমানে ততটা ভয় না আসুক, রাত্রিকালে নিশ্চয়ই ভয় হয়; আর এখানে আমাদের বিলম্ব করবার প্রয়োজন নাই; সন্ধ্যা আগতপ্রায়।”

    সন্ধ্যার পূর্বেই আমরা বাড়ীতে ফিরে গেলেম। নূতন জায়গায় প্রথম প্রথম যেমন হয়ে থাকে, সেই রকমে সে রাত্রিও আমি যাপন কোল্লেম, সে রাত্রেও পূর্বে রাত্রের ন্যায় নানা প্রকার উৎকট শব্দ আমার শ্রুতিগোচর হলো; ভ্রক্ষেপ না কোরে নির্ভয়ে আমি শয়ন কোরে থাকলেম। নিদ্রার অগ্রে সে রাত্রে আমি একটা নূতন কথা ভাবছিলেম। গ্রামের পশ্চিমদিকে অগ্নিকাণ্ডের নিদর্শন। প্রাণগতিবাবু অন্য কোন দিকে না গিয়ে সেই দিকে আমারে নিয়ে গিয়েছিলেন কেন? অগ্নিকাণ্ডের হেতু জানবার ইচ্ছা হোলে আমারে তিনি ভূতের উৎপাতের কথা শুনাবেন, শূনে আমি ভয় পাব, এই কি তাঁর মতলব? পূর্বদিনের সতর্কতার উপদেশ, রামদাসের মুখে, পাচিকার মুখে আর তাঁর নিজমুখে সাবধানতার বার্তা, আজ আবার স্পষ্ট স্পষ্ট ভয়-প্রদর্শন-ভূমিকা। এ প্রকার ভূমিকার কারণ কি? আমারে ভূতের ভয় দেখিয়ে কার কি অভীষ্ট সিদ্ধ হবে? যারা আমারে আমার অজ্ঞাতে এ বাড়ীতে রেখে গিয়েছে, তারাই কি ঐরূপে উপদেশক? তাই যদি হয়, তবে ভূতের কথা কেন? ভয়ের হেতু অনেক রকম আছে, অনেক কারণেই লোক ভয় পায়, ভূতের ভয় দেখিয়ে ছলনা করবার উদ্দেশ্য কি? কিছুই মীমাংসা আনতে পাল্লেম না। নিদ্রা এলো, ঘুমালেম, সব ভয়—সব তর্ক ভুলে গেলেম।

    উপর্যুপরি পাঁচ রাত্রি আমি ঐ প্রকার শব্দ শ্রবণ কোল্লেম, একবারও আমার ভয় হলো না; কেবল একটা সন্দেহ বাড়লো মাত্র। যা যা আমি শুনি, কাহারও কাছে প্রকাশ করি না, কেহ জিজ্ঞাসা কোল্লেও সে সব কথা বলি না। বড়বাবু পাচিকা ও রামদাস আমার নির্ভীকতা অনুভব কোরে বিস্ময়াপন্ন। কর্তাবাবু সেই একদিন ভিন্ন আর কোন দিন আমারে দেখা দেন নাই, ছোটবাবুও সেই একবার ভিন্ন আর আমার কাছে আসেন না। বড়বাবু, রামদাস, পাচিকা আর রূপসী, এই চারিজনের সঙ্গেই আমার দেখাসাক্ষাৎ কথাবার্তা চলে। রূপসী দিবারাত্রির মধ্যে পাঁচ সাতবার আমার ঘরে আসে, কাজ-কর্ম করে, কথা কবার প্রয়োজন না থাকলেও সামান্য একটা অছিলা ধোরে নানা রকম কথা কয়, হাস্যের কারণ না থাকলেও মুখ মুচকে মুচকে হাসে, আমি যখন অন্যদিকে চেয়ে থাকি, রূপসী তখন একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে থাকে, ঘর থেকে যখন বেরিয়ে যায়, আমি তখন তার বিলক্ষণ কটাক্ষ-ভঙ্গী দর্শন করি; মনে সন্দেহ আসে।

    এইভাবে দশদিন আমি সেই বাড়ীতে থাকলেম। সকল রকমেই সেই দশদিন সমভাব। কর্তা আমারে বোলেছিলেন লেখা-পড়ার কাজ-কর্মে নিযুক্ত থাকতে হবে। কথা আমার মনে ছিল, কাজে কিন্তু কিছুই না; কাগজ-কলমের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ মাত্র নাই। আমি তবে কি করি?—উত্থান করি, ভোজন করি, ভ্রমণ করি, শয়ন করি, চিন্তা করি, মাঝে মাঝে আজগুবী আজগুবী গল্পগুজব শ্রবণ করি, এই পর্যন্ত আমার কর্ম। দশদিন দশ রাত্রি ঠিক একভাবে কেটে গেল। থাকতে থাকতে বাবুদের পরিবারবর্গের পরিচয় পেলেম।

    পুরুষের মধ্যে কর্তা স্বয়ং আর দুটি পুত্র; স্ত্রীলোকের মধ্যে গৃহিণী, বড়বধু, ছোটবধু, আর কর্তাবাবুর এক শ্যালকের একটি স্ত্রী; চাকরের মধ্যে রামদাস, চাকরাণীর মধ্যে রূপসী; এইগুলি ছাড়া সেই বৃদ্ধা পাচিকা-ঠাকুরাণী। বড়বাবুর বয়ঃক্রম পঞ্চবিংশতি বর্ষ, ছোটবাবুর বয়ঃক্রম ত্রয়োবিংশতি বর্ষ; বড়-বৌমার বয়স বাইশ বৎসর, ছোট-বৌমার বয়স ঊনিশ বৎসর। কর্তার যে শ্যালক-পত্নীটি বাড়ীতে আছেন, তিনি বিধবা, বয়স অনুমান তেইশ চব্বিশ বৎসর; দেখতে দিব্য সুশ্রী, বর্ণ গৌর, সে গৌরবর্ণের উপর রক্তবর্ণ আভা; কর্তা সেটিকে রাঙা-বৌ বোলে আদর করেন, গৃহিণীও বলেন, রাঙা-বৌ। সেই রাঙা-বৌটি ছেলেবাবুদের মামী হন; রামদাস আর রূপসী সেই সম্পর্কে রাঙা-বৌকে রাঙা-মামী বোলে সম্মান দেয়।

    বাবুদের একটি ভগ্নী আছে, তার নাম শুকতারা। সেই ভগ্নীটি সর্ব-কনিষ্ঠা। সেটা প্রায় বারমাস শ্বশুরালয়ে থাকে, মাঝে মাঝে এক একবার আসে, সপ্তাহের মধ্যেই আবার চলে যায়। পূর্বে বলেছি, এ বাড়ীর ভিতরমহল বাহিরমহল প্রায় এক, কেবল একটি বারান্দা মাত্র ব্যবধান; তথাপি আমি প্রথম প্রথম কেবল বাহির-মহলেই থাকতেম, নারী মহলে প্রবেশের অনুমতি পেতেম না, বেশীদিন থাকতে থাকতে আমার রীতি চরিত্র দেখে, কর্তা আমারে অন্দরে গিয়ে আহার করবার অনুমতি দিলেন। সেই কর্তা; যিনি আমারে নেশাখোর ভেবে অগ্রাহ্য কোরেছিলেম, ঠাট্টা-বিদ্রূপ ঝেড়েছিলেন, একমাস পূর্ণ হোতে না হোতেই সেই কর্তা আমার প্রতি সুপ্রসন্ন।

    ভিতরমহলে আমি প্রবেশ করি, গৃহিণীকে আমি মা বোলে ডাকি, বৌ দুটী আমারে দেখে ঘোমটা দেন, রাঙা-মামী ঘোমটা দেন না। দুই বেলা আহারের সময় বাড়ীর ভিতর আমি যাই, অন্য কোন প্রয়োজন উপস্থিত হোলেও অন্দরে আমার ডাক পড়ে; অবাধ গতিবিধি; কিন্তু রাত্রিকালে শয়নটা আমার বাহিরেই হয়। বাহিরে শয়ন করি বটে, কিন্তু রাত্রিকালে সমস্ত কলরব নিবৃত্তি হোলে ভিতরমহলের উচ্চ উচ্চ কথাবার্তা আমার শ্রবণগোচর হয়। আমার শয়ন-ঘরের ঠিক পাশেই অন্দর; বারান্দার দরজা পার হয়ে অন্দরের পথের বামদিকে যে ঘরটী, রাত্রিকালে সেই ঘরে রাঙা-মামী শয়ন করেন, সেই ঘরের পশ্চিমের দুটি ঘরে বড়বাবু আর ছোটবাবু। সেই তিনটি ঘর উত্তরদ্বারী, পূর্ব-পশ্চিমে দীর্ঘ। অপর ধারে ঐরূপ তিনটি ঘর দক্ষিণ-দ্বারী; একটিতে কর্তা-গৃহিণী থাকেন, একটিতে পাচিকা আর রূপসী, তৃতীয়টী ভাঁড়ার ঘর। রন্ধনগৃহ নিম্নতলে। অন্দরের চিত্র এইরূপ। বাহির-দিকেও উত্তর বারান্দার দক্ষিণাংশে সারি সারি তিনটি ঘর। একটি ঘরে আমি থাকি, তার পাশে পূর্বদিকের একটা ঘরে রামদাস শয়ন করে, তৃতীয় ঘরটী খালি থাকে। পূর্বে পূর্বে বাড়ীতে যখন পূজা-পার্বণ হতো, সেই সময় লণ্ঠনদেয়ালগিরি অনেক ছিল, অনেক এখন নষ্ট হয়ে গিয়েছে, অবশিষ্ট গোটাকতক এখন সেই খালি ঘরে রক্ষিত হয়েছে।

    প্রতি রজনীতে আমি ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর শব্দ শুনি, কোথা থেকে শব্দ আসে, কারা সেই সকল শব্দ করে, কিছুই আমি ঠিক কোত্তে পারি না; দিনের বেলা আমি কাহাকে কিছু জিজ্ঞাসাও করি না। সেই ভাবে প্রায় একমাস গেল। আমার মন ক্রমশ‍ই চঞ্চল। যাঁরা আমারে ভালবাসেন, আমি যাঁদের ভালবাসি, তাঁরা কে কেমন আছেন, মামলা-মোকদ্দমার সংবাদ কি কিছুই জানতে পাচ্ছি না। একদিন বেলা এক প্রহরের পূর্বে আপন ঘরের একটি গবাক্ষে বোসে গালে হাত দিয়ে আমি ভাবছি, এত দিনের পর কর্তা হঠাৎ সেইখানে এলেন। ভাবনায় অন্যমনস্ক ছিলেম, চক্ষু ও অন্যদিকে ছিল, নিঃশব্দে টিপি টিপি প্রবেশ কোরে আচম্বিতে কর্তা আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি হরিদাস, এত গভীর কিসের চিন্তা? কিসের ধ্যানে নিমগ্ন আছ?”

    চমকে উঠে থাড়িমাড়ি খেয়ে আমি নেমে দাঁড়ালেম। একটু পূর্বে যে একটি কল্পনা, আমার অন্তরে খেলা কোচ্ছিল, কোন কথা মনে আনবার অগ্রেই সেই কল্পনাটি কর্তাকে জানিয়ে বিনম্রবচনে নিবেদন কোল্লেম, “আপনার নিকটে আমার একটি প্রার্থনা। নিরাশ্রয় অবস্থায় যাঁরা আমারে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাঁদের জন্য সর্বদা আমার প্রাণ কেমন করে; ডাকযোগে চিঠি লিখে তাঁদের শুভসমাচার আনাই, এই আমার ইচ্ছা। আপনি অনুগ্রহ কোরে অনুমতি দান করুন।”

    গম্ভীর বদনে কি একটা চিন্তা কোরে কর্তামহাশয় আমারে বোল্লেন, “যা লিখতে চাও, লিখতে পার, কিন্তু শিরোনামগুলি আমি দেখে দেখে দিব।” —আমি বোল্লেম, “আজ্ঞে, কেবল শিরোনামা কেন, পত্রে যা যা আমি লিখবো, সমস্তই আপনি দেখে দিবেন।”

    আমার বিছানার উপর কর্তা বোসলেন; একটু দূরে বোসে মনের উল্লাসে আর কিছু আমি বলবার উপক্রম কোচ্ছিলেন, সেই অবসরে এক রকম বিমর্ষস্বরে কর্তা আবার বোল্লেন, “না না, তা তুমি পার না। চিঠি যদি তুমি লিখতে চাও, তাতে কেবল এই কথা লিখতে পার যে, তুমি বেঁচে আছ, সুখে আছ, পীড়া হয় নাই, এই রকম খোলসা খোলসা কথা। কোথায় আছ, কি বৃত্তান্ত, সে সব কথা লিখতে পাবে না। আরও একটি কথা বোলে রাখি। চিঠিগুলি লেখা হোলে আমার হাতে দিও, আমি সেইগুলি কলিকাতা যাত্রী বিশ্বাসীলোকের হাতে দিয়ে রওনা কোরে দিব, তাঁরা সেগুলি কলিকাতার ডাক ঘরে অর্পণ কোরবেন। ত্রিপুরা, ঢাকা অথবা পূর্বাঞ্চলের কোন ডাকঘরের নাম নিদর্শন কোন চিঠিতেই থাকতে পারবে না। বুঝতে পেরেছ আমার কথা?”

    বিষণ্ণ বদনে আমি উত্তর কোল্লেম, “বুঝতে পাল্লেম সব, যাঁদের আমি লিখবো, তাঁরা সে সকল পত্র পাবেন, সে কথাও সত্য, কিন্তু যে জন্য আমার প্রাণ আকুল, সে পক্ষে কোন উপকার হবে না;  ঠিকানা লেখা না থাকলে পত্রের প্রত্যুত্তর আমি প্রাপ্ত হব না।”

    “তা আমি কি কোরবো?”— কিঞ্চিৎ উচ্চস্বরে কর্তা বোলে উঠলেন, “তা আমি কি কোরবো? এই জেলায় আমার বাড়ীতে তুমি আছ, সে কথা প্রকাশ হোলে দলে দলে লোক এসে আমাকে উস্তম-খুস্তম কোরবে, অনেক লোক তোমার তল্লাস কোরতে আসবে, সেটা আমি ইচ্ছা করি না। সাবধান, আমার অজ্ঞাতে ক্ষুদ্র একখানি চিঠিও এখানকার ডাকঘরে তুমি দিও না। যদি দাও, তোমার নিজেরই মন্দ হবে; স্মরণ রেখো।”

    এই সব কথা বোলে, কটমটচক্ষে আমার দিকে চাইতে চাইতে কর্তাবাবু ত্বরিতপদে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। কি কোত্তেই বা এসেছিলেন, কি কোরেই বা চোলে গেলেন, কিছুই আমি বুঝলেম না, অবাক হয়ে একটি ধারে আমি বোসে থাকলেম।

    কর্তাও বেরিয়ে গেলেন, তৎক্ষণাৎ রামদাস এসে উপস্থিত। আমি মনে কোল্লেম, রামদাস বুঝি এবার কর্তারই প্রেরিত; কিন্তু তা নয়।

    রামদাস এসেই যেন একটু চমকিতস্বরে আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “গত রাত্রিতে তুমি কি কাজ কোরেছিলে? তোমার ঘরের দক্ষিণের বারান্দায় সব শব্দ হয়েছিল?”

    প্রশ্নের ভাব আমি বুঝতে পাল্লেম না। নিত্য রাত্রে ভয়ানক ভয়ানক শব্দ হয়, বাড়ীর লোকেরা সকলেই তা জানে, রামদাসও জানে, না জানলে ভয় পেয়ো না বোলে আমারে সাবধান কোরবে কেন? জানে সব, আমার বারান্দায় শব্দ হওয়াটা মিথ্যা কথা; নিদ্রা আমার অল্পক্ষণ; অন্য দিকে শব্দ হয়, হাস্য হয়, নৃত্য হয়, সব আমার কানে আসে, আমার সম্মুখের বারান্দার কোন রাত্রে কোন শব্দ হয় না; জানালা-খড়খড়ী খোলা থাকে, শব্দ শোনা মাত্র নয়, শব্দের নায়কেরাও আমার নয়ন-পথবর্তী হোতে পাত্তো। বারান্দায় কিছুই হয় নাই। রামদাস তবে এমন কথা বলে কেন? কোন রকম ধাম্পা না কি?

    রাত্রে যে যে কাণ্ড হয়, একদিনও কাহারো কাছে আমি সে সকল গল্প করি না। সেই দিন রামদাসের কথায় কৌতূহলী হয়ে আমি বোল্লেম, “দেখ রামদাস, যে সব কথা তোমরা বোলেছিলে, সে সব কথা সত্য, অনেক রকম শব্দ আমি শুনতে পাই; কিসের শব্দ, কারা শব্দ করে, কিছু‍ই আমি বুঝতে পারি না, জান কি তুমি শব্দগুলো কিসের?”

    বেলা এক প্রহর, তথাপি রামদাসের চক্ষে যেন ভয়ের লক্ষণ দেখা গেল। চকিতনেত্রে চারিদিকে চেয়ে, রাম রাম মন্ত্রে আত্মসার কোরে রামদাস চুপি চুপি বোলে, “রামনাম কর! রামনাম কর! এখানা ভূতের বাড়ী! বাড়ীতে পরিবার অনেক ছিল, যমের দৌরাত্ম্যে প্রায় সকলেই শ্মশানশায়ী হয়েছে, যে কয়জন বেঁচে আছে, চক্ষেই দেখতে পাচ্ছো। বাড়ীখানাও কত বড়, আছেই বা কতটুকু, তাও তুমি দেখছো। পাড়ার লোকেরা বলে, থানা বাড়ী! সকলে তো ভেতরের খবর রাখে না, যার মনে যা উদয় হয়, সেই কথাই সেই বলে। এ বাড়ীতে আজ কাল ভূতের অধিকার! তুমি নূতন এসেছো, ভয় পাবে বোলে সব কথা আমি তোমাকে বলি না। ভূত সব দেখা যায়! ভয়ানক ভয়ানক ভূত! গণনাতে অনেক! ইদানীং উপদ্রবটা কিছু বেড়েছে, এত দিনের পর কর্তা ভয় পেয়েছেন; ভূতেরা দুদিন তিন দিন কর্তার ঘরে দুধ-সন্দেশ চুরি কোরে খেয়েছে। বাক্সের টাকা সিঁড়িতে ছড়াছড়ি যাওয়া আরম্ভ হয়েছে, বাক্সে চাবি দেওয়া থাকে, টাকা উড়ে যায়, টাকার বাটিতে চাঁপাফুল, কোন দিন বা দু একটা রসগোল্লা পাওয়া যায়।”

    এই পর্যন্ত শ্রবণ কোরে হঠাৎ আমি বোল্লেম, “তবে তো সে সকল ভূতের বেশ ধর্মজ্ঞান আছে! টাকা চুরী করে না, ছড়িয়ে দিয়ে যায়, খাবার জিনিস রেখে যায়, ফল রেখে যায়. আমার যেন মনে হয়, সে সব ভূত ঘরের ভূত! তাদের শরীরে মায়া দয়া বেশী। আচ্ছা রামদাস, ভূত যদি দেখা যায়, তবে কেন প্রতীকার করা যায় না?”

    একটু শিউরে উঠে মস্তক সঞ্চালন কোরে রামদাস বোল্লে, “এই রে! ছেলেমানুষ কি না, ভূতের প্রতীকার কোত্তে চায়! ভূতের প্রতীকার কি রকম হরিদাস? আদালতে মোকদ্দমা করা? ঢাল-তলোয়ার নিয়ে তাড়া করা? লাঠি-সোঁটা নিয়ে সদরদরজা আটক করা? তা নয় হরিদাস, তা নয়! মোকদ্দমা-মামলাতে কিম্বা যুদ্ধ-সজ্জাতে ভূত দমন করা যায় না, যাতে দমন করা যায়, কর্তা সেই উদযোগে আছেন; কর্তা-গিন্নী দুজনেই এই মাসের মধ্যে গয়াধামে যাবেন, গদাধরের পাদপদ্মে পিণ্ডদান কোল্লেই একদিনে সমস্ত ভূত উদ্ধার হয়ে যাবে, বাড়ীতে আর কোন প্রকার উপদ্রব থাকবে না।”

    সব কথায় বেশী মনোযোগ না রেখে, সত্যই যেন বেশী বিশ্বাস কোরেছি, সেই ভাব জানিয়ে গম্ভীরবদনে আমি বোল্লেম, “আচ্ছা রামদাস, সত্য কি ভূত তুমি স্বচক্ষে দেখেছ?”

    রামদাস উত্তর কোল্লে, “চক্ষে না দেখে কোন কথা বলা আমার অভ্যাস নয়। অনেকবার দেখেছি। কিন্তু একটা কথা কি জান, ছোটলোক ভূত আর ভদ্রলোক ভূত এক রকম হয় না; ছোটলোক ভূতেরা সম্মুখে পোড়লেই ঘাড় ভাঙে, ভদ্রলোক ভূতেরা সে রকম করে না, কেবল দূর থেকে ভয় দেখায়। তাদের আরো একটা গুণ আছে। ঘরের মধ্যে বেশী লোক থাকলে তারা দেখা দেয় না, বাইরে বাইরে শব্দ কোরেই পালিয়ে যায়, রাত্রিকালে একঘরে যদি একজন থাকে, তা হোলেই দেখা দেয়। দেখবে তুমি? আজ অনেক রাত পর্যন্ত তুমি জেগে থেকো; রাত্রি দুই প্রহরের পূর্বে ভূত আসে না, রাত্রি যখন ঝাঁ ঝাঁ করে, পশু-পক্ষী কীট-পতঙ্গ সব যখন নিস্তব্ধ থাকে, সকলে যখন নিদ্রা যায়, সেই সময় ভূতের আমদানী! আজ তুমি জেগে থেকো, ভয় পেয়ো না কিন্তু, ভয় পেলেই তারা বিকটমমূর্তি দেখায়। চুপটি কোরে ঠাণ্ডা হয়ে চেয়ে থেকো, ভূতগুলির লাফানী ঝাঁপানী দেখতে পাবে। তারা আমাদের পোষা ভূত!”

    ক্রমশঃ বেলা হোতে লাগলো, রামদাস উঠে গেল, দিবা-কর্তব্য সমাপ্ত কোরে আমি কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম কোল্লেম। বিশ্রামকালে রামদাসের কথা স্মরণ কোরে আমার হাসি পেলে, কিন্তু হাসতে পাল্লেম না। চিঠি লেখা হবে না, অমরকুমারীর সংবাদ লওয়া হবে না। কর্তা বোলে গেলেন, পূর্বেদেশের কোন ডাকঘরে আমার চিঠি অর্পণ করা হবে না। আমি যদি চিঠি লিখি, সাদা কথায় লিখে কর্তার হাতে দিব, এখান থেকে কলিকাতায় যারা যায়, সেই সকল চিঠি কর্তা তাদের হাতে দিবেন, কলিকাতার ডাকঘরে দস্তুরমত মোহর হয়ে সেই সব চিঠি বিলি হবে। কর্তার ইচ্ছা এই প্রকার। ভূতের কৌতুক মনে কোত্তে কোত্তে কর্তার ঐ সব কথা আগেই মনে এলো, হাসতে পাল্লেম না।

    তাৎপর্য কি? যেখানে আমি আছি, সেখানকার ডাকঘরে চিঠি দেওয়া হবে না, যে স্থানে আমি আছি, আমার বন্ধুগণকে সে ঠিকানা জানতে দেওয়া হবে না, তাৎপর্য কি? বা আমি ভেবেছিলেম, ঠিক তাই! যে সকল লোক এখানে আমারে রেখে গিয়েছে, নিশ্চয়ই তারা রক্তদন্তের দলের লোক;  রক্তদন্তের চক্র বহুদূর-বিস্তৃত! চিরদিন আমারে গোপন কোরে রাখা সেই চক্রের লোকের মতলব। দেখি দেখি, কপালে কি আছে! ভগবান কাহারো প্রতি নির্দয় থাকেন না, লোকের অবশ্যই চিরদিন সমান থাকে না, আমার এই দুরবস্থা যে চিরদিন সমান থাকবে, এমন কি পাপ আমি কোরেছি? প্রাণে যদি না মরি, বৈরিহস্তে যদি আমার প্রাণ না যায়, তা হোলে একদিন না একদিন অবশ্যই আমার অবস্থার পরিবর্তন হবে, অবশ্যই সুদিন উদয় হবে, ভগবান অবশ্যই মুখ তুলে চাইবেন, সেই সময় অবশ্যই জানতে পারবো, এই ভয়ানক যুক্তি-তর্কের গোড়া কোথায়?

    বেলা শেষ হয়ে এলো। আমি একাকী সেই ঘরটিতে বোসে আছি, রূপসী এসে আমারে ডেকে গেল; বোলে গেল, রাঙামামী ডাকছেন।

    রাঙামামী আমারে কেন ডাকেন? রাঙামামী আমারে দেখে লজ্জা করেন না, কোন কিছু, আবশ্যক হোলে আমারেই এনে দিতে বলেন, এই পর্যন্তই আমি জানি। দাসী দিয়ে তিনি আমারে ডেকে পাঠাবেন, এটা আমার জানা ছিল না। কি করি, চাকুরী সম্পর্ক না হোলেও এদের বাড়ীতে আমি আছি, আমার উপর কর্তার প্রভুত্ব চলে, ভাবতে গেলে এক রকম আমি চাকর। যেতে হলো।

    ভিতরমহলে আমি প্রবেশ কোল্লেম। এইখানে আমারে একটু অনধিকারচর্চা কোত্তে স্বাধীনতা নিতে হলো। পূর্বে বোলে রেখেছি, রাঙামামী বিধবা, রাঙামামী পরমা সুন্দরী। এই দিন আমি যে ভাবে তাঁরে দেখলেম, তাতে আমার এক মহা সন্দেহ দাঁড়ালো। অলঙ্কার-বস্ত্রে সুশোভিতা, অলক্তকরা-গরঞ্জিতা, মণি-মণ্ডিত-কবরী-বিভূষিতা সেই রাঙামামী একটি নির্জন গৃহে একাকিনী। তাঁর দুটি চক্ষে জলধারা। এই সুন্দরীর রূপ বর্ণনা করা আমার অনধিকারচর্চা। বিধবা যদি বিধবার মত ব্রহ্মচারিণীরূপে অধিষ্ঠিতা থাকতেন, তা হোলে সে দিকে চেয়ে দেখতে মানুষের মন পুলকিত হতো, দুষ্টের নয়ন ঝলসে যেতো। এ মূর্তি সে মূর্তি নয়, গৌরবর্ণের উপর গোলাপী আভা, অধরোষ্ঠে গোলাপী আভা, কপোল, গালে গোলাপী আভা, বিশাল নয়নে বক্রদৃষ্টি। বক্ষঃস্থলে নীলবর্ণ কাঁচালী, সেই কাঁচুলীর অর্ধাংশ নীলবসনে ঢাকা। সম্মুখে গিয়ে আমি নত-নয়নে নত-বদনে দাঁড়ালেম। মৃদু হেসে মামী বোল্লেন, “বোসো হরিদাস, তুমি অমন ভয় পাচ্ছো কেন? তুমি না কি ভূতের ভয় পেয়েছ?”

    আমি বোসলেম না, ভূতের ভয়ের কথাতেও কোন উত্তর দিলেম না। রাঙা-মামী আবার বোল্লেন, “রামদাস আমারে বোলে গেল, তুমি ভূতের ভয়ে কাতর আছ। ছি। ভূতকে কি ভয় করে? আমি তো মেয়েমানুষ, অন্য অনেক রকম ভয় আমার আছে, কিন্তু ভূতের ভয় আমি রাখি না। বাড়ীতে এক রকম শব্দ হয়। এত বড় বাড়ীখানা, কত লোক এ বাড়ীতে থাকতো, এখন গুটিকতক অস্থি-চর্মসার ক্ষুদ্র প্রাণী খেলা কোরে বেড়ায়, সমস্ত বাড়ীখানা ফাঁকা; তাতে কোরেই রেতের বেলা বাতাসের শব্দকেও যেন বড় বড় কামানের শব্দ মনে হয়। তাতে তুমি ভয় পেয়ো না : কোথায় কি শব্দ হোচ্ছে, জানবার জন্য বিছানা থেকে উঠো না, উঁকি মেরে দেখো না, হাঁকাহাঁকি কোরে গোলমাল কোরো না! দেখ ভাই—–(শ্রীবিষ্ণু!) দেখ হরিদাস, তোমার উপর আমি বড় সুখী আছি। আজ তুমি আমার একটি উপকার কর।”

    “উপকার কর!”—এই কথাটি শুনে, আমি তখন মুখে উচু কোরে রাঙা-মামীর মুখখানি ভাল কোরে দর্শন কোল্লেম। একটু পূর্বে চোখে জল দেখেছিলেম, সে জল কোথায় উড়ে গিয়েছে, চন্দ্রমুখ হাসি হাসি। চন্দ্ৰমুখ বোল্লেম, কিছু অশিষ্টতা প্রকাশ পেলে, কিন্তু কবিরা ভগবতীর বদনকেও চন্দ্রবদন বোলে বর্ণনা করেন। আমি কবি নই, কিন্তু সুন্দরী কামিনীর সুন্দর বদনকেও চন্দ্রবদন বলাতে দোষ হোতে পারে না, এইরূপ আমার ধারণা। উত্তমরূপে তাঁর মুখখানি নিরীক্ষণ কোরে, ধীরে ধীরে আমি বোল্লেম, “উপকার? – আমার দ্বারা আপনার কি উপকার হোতে পারে?”

    রাঙামামী উঠে দাঁড়ালেন; ঘরের পূর্বপ্রান্তে ক্ষুদ্র একটী তোরঙ্গ ছিল, সেইটী খুলে কি একটী পদার্থ হাতে কোরে নিয়ে আমার কাছে ফিরে এলেন। অন্য কোন প্রকার ভূমিকা না কোরেই সেই পদার্থটী আমার হাতে দিয়ে আমার পিঠ চাপড়ে চাপড়ে তিনি বোল্লেন, “তুমি বেশ ছোকরা, খুব বুদ্ধিমান, এই জিনিসটি নিয়ে গিয়ে অমুক জায়গায় অমুক ঠিকানায় অমুক বাড়ীর সেজোবাবুর হাতে দিয়ে এসো। বুঝতে পেরেছো ঠিকানাটি? সে দিন তোমরা যে রাস্তা ধোরে নদীর ধারে বেড়াতে গিয়েছিলে, যে দিকে আগুন লেগেছিলো, সেই দিকে—সেই বড় একটা আম গাছ,—সেই দিকে বাঁ-হাতী একখানা ছোটবাড়ী। বুঝতে পেরেছো? সেই বাড়ীর সেজোবাবুকে ডেকে চুপি চুপি এই মোড়কটী তাঁর হাতে দিয়ে এসো। এ মোড়কে ওষুধ আছে। সঙ্গোপনে দিও কেহ যেন দেখেনা কোন লোকের কাছে কোন কথা প্রকাশ কোরো না, আমাদের রামদাসকেও কিছু, বোলো না।”

    মোড়কটী আমার হাতে থাকলো, ফিরিয়ে দিতে পাল্লেম না, ‘এ কাজ আমার নয়’ এ কথা বোলে মুখের উপর স্পষ্ট জবাব দিতে পাল্লেম না, কাজে কাজে মুষ্টিবদ্ধ কোরে মোড়কটী ঢেকে রেখে আমি বেরিয়ে এলেম। আপনার ঘরে এনে মোড়কখানি আমি ভাল কোরে দেখলেম। বর্তুলাকার এক খণ্ড কাগজ। উপরে কিছু লেখা ছিল না ওজনেও ভারী নয়, ভিতরে কোন প্রকার ওষুধ কিম্বা বস্তু থাকলে ভারী হতো, তা নয় তবে কি? মোড়ক করা, ধারে ধারে আঠা দিয়ে জোড়া ভাব কিছু বুঝতে পাল্লেম না; এনেছি, মৌনসঙ্কেতে দৌত্যকর্ম স্বীকার কোরেছি দিয়ে আসতে হবে, তাও স্থির কোল্লেম কিন্তু মনে কেমন খটকা লাগলো।

    মনে কোরেছিলেম, রাত্রে ভূত দেখার কথা আছে, রাত জাগতে হবে, আজ আর বেড়াতে যাব না, কিন্তু রাঙামামীর দৌত্য কার্য্যে সে সঙ্কল্প অটল রাখতে পাল্লেম না, সন্ধ্যার পূর্বে কাপড় ছেড়ে সম্মুখ-রাস্তায় বাহির হোলেম। কেহই আমারে তখন দেখতে পেলে না। নদীর তীরে রাস্তাটা আমার জানা হয়েছিল, সরাসর সেই রাস্তায় গিয়ে সেই আম্রবৃক্ষের তলে আমি দাঁড়ালেম। হস্তে সেই বর্তুলাকার পত্রিকা। কি বোল্লেম?—পত্রিকা?—কে আমারে এমন কথা বলালে?— দেবতারা? —সত্যই তবে এখানি এক গুপ্তপত্রিকা। একজন সেজোবাবুর হাতে এই গুপ্তপত্রিকা অর্পণ কোত্তে হবে। বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি, নিকটে একখানি বাড়ীও দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু ডাকি কি বোলে? বাড়ীর ভিতর প্রবেশ কোত্তেও ভরসা হোচ্ছে না; বাইরে দাঁড়িয়ে “সেজোবাবু সেজোবাবু” বোলে ডাকা, সেটাও ঠিক নয়। আমি নূতনলোক, ততটা স্বাধীনতা লওয়া আমার পক্ষে দোষের কথা। করা যায় কি? সূর্যদেব অস্তাচলে যাচ্ছেন আকাশের অনেকদূর পর্যন্ত রক্তবর্ণ হয়েছে, কুলায়বাসী পাখীরাও সব উড়ে উড়ে পালাচ্ছে, সন্ধ্যার বাতাসে নদীর জলে তরঙ্গ খেলছে, এমন সময় সেই বাড়ী থেকে একটী স্ত্রীলোক বেরুলো; এক কোলে একটা জলের কলসী, এক কোলে একটা ছেলে।

    যেখানে আমি দাঁড়িয়ে ছিলেম, স্ত্রীলোকটা সেইখান দিয়ে চোলে যায়, অগ্রবর্তী হয়ে আমি তারে জিজ্ঞাসা কোল্লেম “তুমি কি এই বাড়ীতেই থাকো?”

    একটু চমকিতভাবে চমকিতস্বরে স্ত্রীলোক আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “কেন গা? কে গা তুমি? কোথা থেকে এসেছো?”

    এইবার আমি উত্তর কোল্লেম, “অনেক দূর থেকে এসেছি, দিনকতক এই গ্রামেই আছি, এখানে আমার একটু দরকার আছে।”

    স্ত্রীলোক বোল্লে, “কার কাছে দরকার? কি দরকার?” —আমি উত্তর কোল্লেম, “যে বাড়ী থেকে তুমি আসছো, ঐ বাড়ীর সেজোবাবুর কাছে আমার দরকার।” স্ত্রীলোক আপন মনে বোলতে লাগলো, “আমাদের সেজোবাবুর কাছে কত লোকের যে কতরকম দরকার, তা আর বলবার নয়। রাতদিন দরকার;—রাতদিন দরকার! দরকার আর ফুরায় না!” আপন মনে ঐ সব কথা বোলে, আমার মুখের দিকে চেয়ে, সে স্ত্রীলোক একটু যেন রুক্ষস্বরে বোল্লে, “সন্ধ্যা হয়, এখন আবার তোমার কি দরকার?”

    আমি বোল্লেম, “একবার সাক্ষাৎ করা দরকার। যদি তুমি একবার তাঁরে খবর দিতে পার, আমার বড় উপকার হয়।”

    বিড় বিড় কোরে আপনা আপনি কত কি বোকতে বোকতে সেই রুক্ষভাষিণী স্ত্রীলোক কি যেন ভেবে চিন্তে বিরক্ত হয়ে বোল্লে, “আচ্ছা, দাঁড়াও, আমি জল নিয়ে আসি, অন্ধকার হয়ে এলো, এ সব জায়গায়— আচ্ছা, এইখানে তুমি একটু দাঁড়াও, ফিরে এসে তাঁরে আমি জানাবো, কি তিনি বলেন, আমার মুখেই শুনতে পাবে।”

    আমি বুঝতে পাল্লেম, সেই স্ত্রীলোক সেই বাড়ীর চাকরাণী। বয়স কম, বাড়ীর মেয়ে হোলে আমার কাছে দাঁড়িয়ে অত কথা কইতো না। যাই হোক, কাজ নিয়ে আমার কথা, চাকরাণী কি রাজরাণী, তাতে আমার কোন প্রয়োজন ছিল না। আমি সোরে গিয়ে সেই বৃক্ষতলে দাঁড়ালেম। স্ত্রীলোকটী নদীর ঘাটে জল আনতে গেল। যখন সে ফিরে এলো, তখন আর আমার দিকে চাইলে না; হন্ হন্ কোরে বাড়ীর দিকেই চোল্লো। গাছতলা থেকে একটু উচ্চকণ্ঠে ডেকে ডেকে আমি তারে মনে কোরে দিলেম, “ভুলো না, আমি দাঁড়িয়ে থাকলেম।”

    স্ত্রীলোক উত্তর দিল না, চোলে গেল, বাড়ীর ভিতর প্রবেশ কোল্লে। সূৰ্য দেব অস্তে গেলেন। আমার ভয় হতে লাগলো। ভূতের ভয় নয়, কত লোকের কুচক্রের শীকার আমি, নূতন জায়গায় নিৰ্জন পথে একাকী, যদি আবার রাহুচক্রে পড়ি, সেই ভয়।

    দাঁড়িয়ে আছি, প্রায় অর্ধদণ্ড পরে একটী বাবু সেই বাড়ী থেকে বেরিয়ে এলেন। এসেই তফাৎ থেকে তিনি জিজ্ঞাসা কোত্তে লাগলেন, “কে গা? কে আমার তত্ত্ব কোচ্ছে?”—প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে তিনি এগিয়ে আসতে লাগলেন, আমি সেই সময় তাঁর সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালেম। সূর্যদেব চোলে গিয়েছিলেন, অন্ধকার হয় নাই, বাবুটি আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন, আমিও তাঁর মুখের দিকে চাইলেম। বেশ বাবুটী। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, চোখ-দুটী বড় বড়, ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া বাবরী চুল, মাঝখানে সিঁতিকাটা। চুলের কেয়ারীতে কলিকাতার ধরণ অনেকটা জানা যায়। বোধ হলো এ বাবুটীর কলিকাতায় গতিবিধি আছে। কি জাতি, কি বৃত্তান্ত, জানা ছিল না, আমি নমস্কার কোল্লেম না; ধীরস্বরে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, আপনি কি এই বাড়ীর সেজোবাবু?

    একটু চিন্তা কোরে বাবুটী উত্তর কোল্লেন, “হাঁ, আমি তাই। কেন তুমি ও কথা জিজ্ঞাসা কর? কে তুমি?” রাঙামামীর দত্ত-মোড়কটী বাহির কোরে দেখিয়ে আমি বোল্লেম, “একটি ওষুধের মোড়ক আছে, আপনার হাতে দিবার আদেশ।”

    “ওষুধের মোড়ক? আমার জন্য? তোমার তো ভুল হয় নাই?”

    বাবার মুখের ঐ প্রকার কাটা কাটা প্রশ্ন শুনে আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞে না, ভুল হয় নাই। যিনি আমার হাতে দিয়েছেন, তিনি আমারে সব ঠিকানার কথা বোলে দিয়েছেন, আমি ঠিক এসেছি। যিনি দিয়েছেন, তিনি একটী স্ত্রীলোক।

    বাবু তখন পূর্বস্মৃতির প্রসন্নতা লাভ কোরে প্রফলবদনে বোল্লে, “ও— হো হো! বটে, বটে। একটী স্ত্রীলোক আমাকে একটী ঔষধ দিবেন স্বীকার কোরেছিলেন, মনে পোড়েছে!” সেজোবাবু, দক্ষিণ হস্ত বিস্তার কোল্লেন, আমি সেই মোড়কটী তাঁর হস্তে অর্পণ কোল্লেম।

    আর আমার সেখানে অপেক্ষা করা উচিত ছিল কি না, ভাবছিলেম, আমার মুখের দিকে চেয়ে বাবু বোল্লেন, “যিনি তোমার হাতে এই ঔষধের মোড়ক দিয়েছেন, ফিরে গিয়ে তাঁরে তুমি কিছু বোলো না। মোড়কটী যখন তিনি তোমারে দেন, তখন কেহ দেখেছিল, এমন তোমার মনে হয়?”

    কথা হলো দুটী, একটী নিবারণ, আর একটী প্রশ্ন। দুটী কথার উত্তরেই একটি “না” দিয়ে আমি বিদায় হোলেম; বাবু, আর আমারে কোন কথাই বোলেন না।

    সন্ধ্যার পর বাড়ীতে আমি ফিরে এলেম। সন্ধ্যার পূর্বে আমি কোথায় ছিলেম, কেহই আমারে সে কথা জিজ্ঞাসা কোল্লে না; বোধ হয়, কেহই সে সময় আমার তত্ত্ব করে নাই; বড় একটা কৈফিয়তের দায় থেকে নিষ্কৃতি পেলেম। সন্ধ্যার পর নিত্য যেমন হয়ে থাকে, সেই রকমে সময় কাটলো, আহারের সময় রাঙামামী একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আমার চক্ষের দিকে চাইলেন, আমিও সেই রকমে চেয়ে ঈষৎ মস্তকসঞ্চালনে সঙ্কেতে সঙ্কেতে তদুত্তর দিলেম। রাঙামামী বুঝলেন, দৌত্যকার্যে আমি কৃতকার্য।

    আহারান্তে বাহিরের ঘরে আমি প্রবেশ কোল্লেম। রামদাস সেইখানে ছিল। অন্যদিন সে সময় কেহ থাকে না, রামদাস সে দিন কেন ছিল, একটু একটু আমি বুঝতে পাল্লেম। ভূত দেখাবার কথা। রামদাস আমার কাছে উপস্থিত থেকে ভুতের খেলা দেখাবে, তাই যেন আমার মনে হলো। রামদাস বোসে ছিল, আমারে দেখে উঠে দাঁড়ালো; চুপি চুপি বোলে, “ভূত যদি দেখতে পাও, গোলমাল কোরো না, কাহাকেও ডেকো না, চুপ্ কোরে শুয়ে থোকো, ভূতেরা তোমাকে কিছুই বোলবে না; যদি গোলমাল কর, হাঙ্গাম বেধে যাবে। শয়ন কর। দুই প্রহরের পূর্বে নিদ্রা যেয়ো না, আমার কথাগুলি মনে রেখো।”

    বেশীদিন আমি আছি, তথাপি রাত্রে আমার শয়নঘরে চাবী পড়ে। আমারে সদুপদেশ দান কোরে, দ্বারে চাবী দিয়ে রামদাস চোলে গেল। আমি শয়ন কোল্লেম। ঘরে আলো থাকলো, দক্ষিণ-বারান্দার দ্বার-গবাক্ষ অনাবৃত।

    রাত্রিকালে রূপসী আসে, যাবার সময় রূপসীই দ্বারে চাবী দিয়ে যায়, এ রাত্রে রামদাস; বোধ হয় উপদেবতার অধিবাস। নিত্য রজনীতেই আমি দুই প্রহর পর্যন্ত জাগি, এক একদিন বেশীও জাগি; সে রজনীতে সে অভ্যাসের ব্যতিক্রম হলো না; জেগেই থাকলেম। একটা কিছু নূতন উপলক্ষ্য পেলে রাত্রিজাগরণের কিছু সুবিধা হয়। নাচতামাসা, খোসগল্প, তাসপাশা নিশা- জাগরণের নির্দোষ সহায়। সে সব সহায় আমার ছিল না; চিন্তা আমার সখী, চিন্তার সঙ্গেই আমার খেলা।

    চিন্তা এলো, রাঙামামী ঔষধ জানেন; একটী গোলাকার মোড়কে ঔষধ পূর্ণ কোরে একটী বাবুর কাছে তিনি পাঠালেন। মোড়কে কেবল কাগজ ছিল, পরীক্ষা কোরে তা আমি জানতে পেরেছি। কাগজ যদি ঔষধ হয়, তবে সে ঔষধ ঠিক্। কাগজে শিরোনাম ছিল না, পত্রিকা বোলে অবধারণ করা সুসাধ্য নয়। একজন পরপুরুষের কাছে একটি কুলবধূর পত্রিকা-প্রেরণ, কথাও কিছু ভাল নয়; তবে কেন তিনি পাঠালেন? পাছে কাহারো মনে এই সন্দেহের উদয় হয়, সেই সন্দেহভঞ্জনের উদ্দেশে নাম দেওয়া হয়েছে ঔষধ। উত্তম ঔষধ। বাস্তবিক কাণ্ডখানা কি, জানতে পারা গেল না। ভবিষ্যতে কোন সূত্রে যদি কিছু জানা যায় ঔষধের পরাক্রমে সেজোবাবু যদি রোগমুক্ত হন, পাঠকমহাশয় জানতে পারবেন।

    রাত্রি দুই প্রহর অতীত। আমার নিদ্রা নাই। ভূতের সঙ্গেও সাক্ষাৎ নাই। রামদাস যে কথা বোলেছিল, সে কথা আমার মনে মনে জাগছিল, আমিও জাগছিলেম, কথাও জাগছিল, কিন্তু কিছুই না; নিত্য রাত্রে শব্দ হয়, সে রাত্রে শব্দ পর্যন্ত স্তব্ধ। আমার শিয়রের কাছে একটা খড়খড়ী, সে খড়খড়ীর পাখীগুলি আমি খুলে রেখেছিলেম। রাত্রি যখন প্রায় তৃতীয় প্রহর, সেই সময় আমার ঘরের ভিতর কেমন একরকম আলো এলো; ভাগ ভাগ করা আলো জ্যোৎস্নারজনী মনে কোল্লেম, চাঁদের আলো, কিন্তু তাও না, বারান্দার দিকে দ্বার গবাক্ষ সমস্তই উন্মুক্ত, খড়খড়ীর পাখীর ফাঁক দিয়ে বিছানায় যদি চাঁদের আলো আসে, অপরাপর দ্বার-পথ দিয়ে ঘরের ভিতর আলো আসাও সম্ভব। সে রকম কিছু দেখা গেল না, কেবল বিছানার উপর ভাগ ভাগ করা আলো। রংমশালের আলোর বর্ণ যেরূপ, সে আলোর সেইরূপ বর্ণ, এলো আর গেল; বিদ্যুতে আলো যেমন আসে আর যায়, ঠিক সেই প্রকার। এ তবে কি? এ তবে কি? এই বুঝি তবে ভূত? বিছানার উপর আমি উঠে বোসলেম, আমি অনেকক্ষণ বারান্দার দিকে চেয়ে থাকলেম, প্রকৃতি যেমন নিস্তব্ধ, ঠিক সেই ভাব, কৌমুদীর যেমন খেলা, ঠিক সেই ভাব। একবার যে আলো আমি দেখলেম, সে আলো আর এলো না, ঘরের ভিতর তো এলোই না, বাহিরেও জ্যোৎস্নার কোলে সেরূপ মিশ্রবর্ণের আলো দেখা গেল না। কোন লোক হয় তো আমার চক্ষে চমক লাগাবার জন্য রংমশাল জেলে আমার মাথার দিকে বারান্দা দিয়ে চোলে গিয়েছিল, আর ফিরে এলো না, তাই আমি মনে কোল্লেম; বৃথা বৃথা সমস্ত রজনী-জাগরণ; প্রায় ঊষাকালে নিদ্রা এসেছিল, প্রভাতেই নিদ্রাভঙ্গ। প্রভাতেই গৃহমধ্যে রামদাসের প্রবেশ। রামদাসের অধরে মৃদু মৃদ হাস্য।

    শয্যার উপর উপবিষ্ট হয়ে রামদাসকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “এত প্রত্যূষেই তুমি শয্যা ত্যাগ কর?” রামদাসের উত্তর,— “নিত্য আমার এরপ অভ্যাস নয়, তুমি যদি কোন প্রকার বিভীষিকা দর্শন কোরে থাক, তোমার মন যদি চঞ্চল হয়ে থাকে, তাই মনে কোরে সারারাত আমি ঘুমাই নাই; কেমন আছ, শীঘ্র শীঘ্র দেখতে এসেছি। কোন রকম বিভীষিকা কি তুমি দর্শন কোরেছ?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “প্রায় শেষ রাত্রে একটা রংমশালের আলো; আর কিছই নয়। রংমশালের আলোকে বিভীষিকা বলা—”

    ঐটুকু শুনেই রামদাস বোলে উঠলো, “আলো দেখেই বুঝি তবে তুমি চক্ষু বুজে শুয়ে ছিলে আলোর পশ্চাতে পশ্চাতে কি এসেছিল, সেটা দেখতে বুঝি তোমার ভরসা হয় নাই? ঐ রকম হয়। আগে একটা ঐ রকম আলো আসে, তার পশ্চাতে পশ্চাতে— রাম!—রাম!—রাম!—প্রভুরা দেখা দেন! তুমি তাঁদের দেখ নাই, ভালই হয়েছে; ছেলেমানুষ তুমি, একাকী এই ঘরের ভিতর সে সব মূর্তি দেখলে দাঁতকপাটি লেগে মূর্ছা যেতে।”

    হাস্য কোরে আমি বোল্লেম, “মূর্ছা গেলেই তোমাদের কর্তাটি এসে নেশা কোরে বেহুঁস হয়েছে বোলে ভূমিকা জুড়ে দিতেন! জান তো সে কথা? একটা তুচ্ছকথা নিয়ে তিনি আমারে এককালে পশুর অধম কোরে দিয়েছিলেন!”

    “না— না— না” মস্তকের সহিত বারকতক হস্তসঞ্চালন কোরে রামদাস বোলে উঠলো “না— না— না,— অমন কথা বোলো না! কর্তা আমাদের আশুতোষ! কটুবাক্য তাঁর মুখে নাই, সকলকেই তিনি ভালবাসেন, সকল লোকেই তাঁর নাম গায়, তাঁকে তুমি দোষের ভাগী কোরো না। যারা এসেছিল, তারা সেই কথা বোলে গিয়েছে, তুমিও অজ্ঞান ছিলে, কাজে কাজেই—”

    রাত্রিজাগরণের কষ্ট বিস্মৃত হয়ে রামদাসের দুখানি হাত ধোরে উত্তেজিতস্বরে আমি বোল্লেম, “কি বোল্লে, কি বোল্লে? যারা এসেছিল? কারা তারা রামদাস? যারা আমারে এখানে এনে রেখে গিয়েছে, তাদেরই কথা তুমি বোলছো, বেশ আমি বুঝতে পেরেছি। রামদাস! তারা কি রকম লোক? তাদের চেহারা কি রকম?”

    অসাবধানে রামদাসের মুখ থেকে ঐ সত্যকথাটি বেরিয়ে পোড়েছিল, প্রভু যেটি অস্বীকার করেন, ভৃত্য সেইটি প্রকাশ কোরবে, কথা ভাল নয়, অপ্রস্তুত হয়ে রামদাস বোল্লে, “তারা— তারা— অন্ধকার— চেহারা—”

    রামদাসের মনের ভাব আমি বুঝতে পাল্লেম, লোকটা অপ্রতিভ হয়ে গেল, বেশ দেখলেম। কর্তাও একদিন ঐরকম অপ্রতিভ হয়েছিলেন, সে কথাও আমার মনে হলো, আমি থেমে গেলেম। প্রসঙ্গটা ছেড়ে দিয়ে রামদাসকে আমি বোল্লেম, “তুমি আমার কাছে ঐ কথা প্রকাশ কোচ্ছিলে, কাহারও কাছে এ কথা আমি বোলবো না; উপদেবতা দর্শন কোরে আমি মুর্ছিত হব, এমন কখন তুমি ভেবো না। কোন রাত্রে যদি কিছু তুমি দেখতে পাও, আমারে ডেকে নিয়ে দেখিয়ে দিও, আমি গুলী কোরবো।”

    “ও বাবা! কি বুকের পাটা! উপদেবতাকে গুলী করে!” আত্মগত বাক্যে সাতঙ্কে এই কথা বোলতে বোলতে রামদাস অতি দ্রুত সেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি ভাবলেম, ভালই হলো। নবীনকালী বিষফলের সরবত খাইয়ে আমারে অজ্ঞান কোরেছিল, তার মালিকেরা সেই অবস্থায় আমারে কুমিল্লার এলাকায় ফেলে দিয়ে গিয়েছিল, প্রথমাবধি সেটা আমি বুঝে আসছি; এ বাড়ীর কর্তা অস্বীকার কোরেছিলেন, নিজের উক্তিতেই একদিন ধরা পোড়েছিলেন, রামদাসও সত্যকথা বোলতে বোলতে সামলে গেল। নবীনকালীর নায়কেরাই আমার এই দুর্দশার কারণ, তাতে আর অণুমাত্র সন্দেহ থাকছে না; কিন্তু এখানে তারা ক-জন এসেছিল, জানবার উপায় নাই; এখন নাই, কিন্তু সব তত্ত্ব যখন প্রকাশ হবে, তখন আর কোন তত্ত্বই গুপ্ত থাকবে না।

    এইগুলি আমার নির্জন ভাবনা। রাঙামামীর ঔষধ-প্রেরণের ভাবনা অপেক্ষাও এই ভাবনাই আমার চিত্তচাঞ্চল্যের পক্ষে অধিক প্রবল।

    আর তিনটি দিবারাত্রি সমভাবে আমি কাটালেম। বাবু জয়শঙ্কর চৌধুরী সপরিবারে গয়াধামে যাত্রা কোল্লেন। সপরিবার অর্থে তিনি আর তাঁর সহধর্মিণী। ভূতের উপদ্রবে সংসারে অমঙ্গল হয়, সংসারের লোকেরাই অকাল-মরণে ভূতত্ব-প্রাপ্ত, গ্রামবাসী লোকেরাও মারীভয়ে গতানু হয়ে ভূতত্ব-প্রাপ্ত, গ্রামস্থ সমস্ত লোকের এই বিশ্বাস। গ্রামের কর্তা জয়শঙ্করবাবু। তিনি সস্ত্রীক গয়াতীর্থে গদাধরের পাদপদ্মে পিণ্ডদান কোল্লে সমস্ত ভূত উদ্ধার হয়ে যাবে, এটিও সে গ্রামের সর্ববাদিসম্মত।

    কর্তাবাবু গয়ায় গেলেন। বড়বাবু ছোটবাবু প্রায় সর্বক্ষণ আমার কাছে বোসে গল্প করেন, আমার পূর্ববৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করেন, আমার দুঃখে দুঃখ প্রকাশ করেন, আমি তবু তাঁদের কাছে জীবনের বেশী কথা ভাঙি না। রামদাস যখনি আসে, তখনি ভূতের কথা কয়। দশদিন পরে ভূতের দফা গয়া হয়ে যাবে, পিণ্ড পেলেই ভূতেরা সব পালাবে, এই কথাই রামদাস বার বার আমারে শোনায়। রূপসী, পাচিকা, রাঙামামী এই তিন জনেও বড় বড় ভূতের গল্প করে।

    দশদিন পরে ভূত থাকবে না, রামদাসের এই কথা। এ দশদিন মানে, অনেক দিন। তখন বাষ্পশকট ছিল না। ত্রিপুরাজেলা থেকে গয়াধামে যাত্রা, অধিক লোকের নামে পিণ্ডদান, কতক দিন তথায় অবস্থান, তৎপরে প্রত্যাগমন, অনেক দিনের কার্য।

    দিন দিন এ বাড়াতে ভূতের উৎপাত বেশী হোতে লাগলো। “আমি কিছুই দেখতে পাই না, কেবল শুনতে পাই। আহা! ভূতগুলির লীলা-খেলা চিরকালের মত ফুরিয়ে যাবে, এই দুঃখে আমার বড় কষ্ট হয়।

    পাঠকমহাশয় বোধ হয় ধৈর্যহারা হোচ্ছেন; একাদিক্রমে বহুক্ষণ এক বিষয়ের নানা কথা শুনে শুনে বোধ হয় বিরক্তিও জন্মাচ্ছে। নিজে আমি যে বিষয়টা মিথ্যা বোলে বুঝতে পাচ্ছি, সে বিষয়ে এত আড়ম্বর কি কারণে, এটাও বোধ হয়, অনেকের মনে উদয় হোচ্ছে। আমার নিবেদন, আর কিয়ৎক্ষণ ধৈর্য ধারণ করুন; উদ্দেশ্য অবশ্যই আছে; সেই উদ্দেশ্যটি প্রকাশ হোলে বিফল বর্ণনা বোলে বোধ হবে না।

    কর্তা গয়াধামে। দুই তিন দিন অতীত। রাত্রিকালে নিত্য যেমন আমি শয়ন কোরে থাকি, সেই রকমে শয়ন কোরে আছি, ঘরের দরজায় দস্তূরমত চাবী বন্ধ আছে, গৃহদীপ নির্বাপিত, দক্ষিণদিকের দ্বার-গবাক্ষ অনাবৃত। রাত্রি কত, ঠিক জানতে পারি নাই; স্মরণ হোচ্ছে, কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমী কিম্বা অষ্টমী, তখনো অন্ধকার, একটু পরেই চন্দ্রোদয় হবে, এইরূপ আমি মনে কোচ্ছি। ছাদের উপর নিত্য যেরূপ শব্দ হয়, নৃত্য হয়, হাস্য হয়, এ রাত্রে তখনো পর্যন্ত সেরূপ কোন লক্ষণ জানা গেল না।

    আমার নিদ্রা নাই। উপাধানের উপর মুখে রেখে, শিয়রের খড়খড়ীপথে আমি চেয়ে আছি, বোধ হলো যেন, ফর্শা কাপড়পরা দুই মূর্তি সাঁ কোরে বারান্দা দিয়ে ছুটে গেল। মনের খেয়ালের সঙ্গে নয়নের ভ্রম হয়; আমার বোধ হয় তাই। লোকের মুখে শুনেছিলেম ভূত, মনে মনে ভাবছিলেম ভূত, রাত্রিও অন্ধকার ছিল, কোথাও কিছু নাই, যুগলমূর্তি ছুটে গেল, মনের কল্পনায় সে হয় তো আমার দৃষ্টিভ্রম। যারা ছটে গেল, আর তারা ফিরে এলো না; দৃষ্টির ভ্রমটাই যেন ঠিক দাঁড়ালো। যুগল হস্তে যুগল নয়ন মার্জন কোল্লেম। যে অন্ধকার, সেই অন্ধকার;— ঘরে বাহিরে সমান অন্ধকার। চন্দ্রমা তখনো অদৃশ্য।

    বারান্দাতে ঘন ঘন গম গম শব্দ। ইতিপূর্বে যে দুই মূর্তি দেখেছিলেম,— দেখেছিলেম বোলে জ্ঞান হয়েছিল, সে রকম মূর্তি কিছু দেখা গেল না, কেবল শব্দ। একবার শুনলেম, দুই তিন কণ্ঠমিলিত অস্ফূট হাস্য; বারান্দার দ্বার উন্মুক্ত ছিল, মনে কোল্লে উঠে দেখতে পাত্তেম, কেহ কোথাও আছে কি না,— যারা আমারে সাবধান করে, তারা বলে, “শব্দ শুনে উঠো না, তত্ত্ব জানবার চেষ্টা কোরো না।” সেই কথা মনে কোরে বিছানা থেকে আমি উঠলেম না, শব্দও থামলো না, ঠিক আমার মাথার কাছে শব্দ; এক একবার একটু দূরে যায়, আবার সেইখানে ফিরে আসে; শব্দেরই চলাচল, পদার্থ দৃষ্ট হয় না। ঠিক আমি চেয়ে আছি, দৃষ্টির ভ্রম হোচ্ছে না মনে ভয়ও আসছে না, তত্ত্ব জানবার ইচ্ছাও হোচ্ছে না।

    প্রায় এক ঘণ্টা এই ভাব। আকাশে চন্দ্রোদয়। চন্দ্রালোকে বাহিরের পদার্থগুলি আমার নয়নগোচর হোতে লাগলো, শব্দগুলাও শ্রবণগোচর হোতে লাগলো, সংশয়ে বিস্ময়ে আমি জড়ীভূত।

    কট্ কট্ কোরে চাবী খোলার শব্দ হলো। একজন লোক গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লে। এই কি ভূত? চাবী খুলে ভূত আসবে কেন? ভূতেরা অগ্নি স্পর্শ করে না, লৌহ স্পর্শ করে না, এরূপ প্রবাদ। চাবী খুলে ভূত আসা অসম্ভব। তবে কি?—কে প্রবেশ কোল্লে? চাঁদের আলো ঘরের ভিতর আসে নাই, প্রবেশকারী ধীরে ধীরে আমার শয্যাপাশে এসে নিকটে একটু হেঁট হয়ে, চুপি চাপি বোল্লে, “জেগে আছ?”

    চক্ষু আমার গবাক্ষের দিকে ছিল, প্রশ্ন শুনে চোমকে উঠে পাশের দিকে চেয়ে দেখলেম, একটি মনুষ্য। স্বর শুনেও বুঝেছিলেন, অল্প অল্প চেহারা দেখেও বুঝলেম রামদাস। বিছানার উপর আমি উঠে বোসলেম; ডেকে ডেকে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “এত রাত্রে এখানে তুমি কি চাও রামদাস?”

    রামদাস চাপি ছাপি বোল্লে, “তোমাকেই চাই। উঠ। যে সব কথা তোমাকে আমরা বলি, তাতে তুমি বিশ্বাস কর না, শব্দ হয় শুনতে পাও, অলৌকিক শব্দ মনে কর; সত্য বটে অলৌকিক, কিন্তু কিছু বিশেষ আছে। উঠে এসো; দেখবে এসো।”

    বিছানা থেকে আমি নামলেন। রামদাস বোলে, “চলো।” মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় দ্বারের দিকে দুই তিন পদ আমি অগ্রসর হোলেম। রামদাস বোল্লে, “ওদিকে নয়।” রামদাসের দিকে মুখ ফিরিয়ে আমি দাঁড়ালেম। দক্ষিণের বারান্দার দিকে অগ্রসর হোতে হোতে পূর্ববৎ চুপি চুপি রামদাস বোল্লে, “সঙ্গে এসো— নিঃশব্দে, কথা কোয়ো না।”

    নিঃশব্দে রামদাসের সঙ্গে সঙ্গে আমি বারান্দায় উপস্থিত হোলেম। পশ্চিমদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ কোরে আমার কাণের কাছে রামদাস চুপি চুপি বোল্লে, “ঐ দেখ!”

    স্বরকম্পনে আমি বুঝতে পাল্লেম, আতঙ্ক-মিশ্রিত কণ্ঠস্বর। রামদাস যেন কোন প্রকার ভয় পেয়ে সেই ভয়ের বস্তু আমাকে দেখাবার জন্য সমুৎসুক; আমারে বোল্পে, “ঐ দেখ!” নিজে কিন্তু পশ্চিমদিকে চাইলে না, পূর্বদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকলো।

    চন্দ্রদেব তখন আমাদের মশালচির কাজ কোল্লেন। পশ্চিমদিকে আমি চাইলেম। পাঠকমহাশয়ের স্মরণ আছে, সম্মুখ-বারান্দার অর্ধাংশ ভগ্ন, সেই ভগ্নাংশের সর্বশেষে একটা ভগ্নগৃহ, সেই গৃহের সম্মুখভাগে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড গোটাকতক মুণ্ড, এত প্রকাণ্ড যে, এতেদ্দেশে ঢাকাই জালার যেরূপ প্রসিদ্ধি, সেই প্রসিদ্ধির অনুগত জালার আকারে ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর মুণ্ড। দুর্গার পদতলের পশুরাজ সিংহের যে প্রকার বর্ণ, মুণ্ডগুলোর বর্ণ সেই প্রকার। নাসিকাও সিংহনাসা সদৃশ। সুন্দরবন অঞ্চলে বনদেবতার পূজায় কালুরায় দক্ষিণরায় নামে বুনোরা যেরূপ বিগ্রহ গঠন করে, সেই সকল বিগ্রহের চক্ষের ন্যায় ভয়ানক ভয়ানক বড় বড় চক্ষু। বন্যবরাহের মূলদন্ত যে প্রকার, সেই সকল মুণ্ডের দন্তপাতি তদ্রূপ বৃহৎ বৃহৎ। সিংহের জটার ন্যায় পিঙ্গলবর্ণ কেশর বৃহৎ বৃহৎ কর্ণের উভয় পার্শ্বে বিলম্বিত। দূর থেকে দর্শন কোল্লে বাস্তবিক অন্তরে দারণ ভয়ের সঞ্চার হয়। মুণ্ডগুলো সারি সারি সংস্থাপিত।

    সেই সকল বিকট মুণ্ড আমি দর্শন কোল্লেম, মনে কোল্লেম, তামাসাস্থলে যারা সং দেখায় তারাই হয় তো অবোধ মানুষকে ভয় দেখাবার জন্য ঐ সব মুণ্ড ঐ ভাবে সাজিয়ে রেখেছে। আমি মনে কোল্লেম ঐ রকম, রামদাস কিন্তু ঘন ঘন কাঁপতে লাগলো, কাঁপতে কাঁপতে বোলে, “আর নয়, আর নয়, আর এখানে থাকা নয়, আমাদের দেখতে পেলেই লাফ দিয়ে ঘাড়ে পোড়ে—”

    রামাদাস ছুটে পালায়, আমি তার একখানা হাত ধোরে ফেল্লেম; অভয় দিয়ে বোল্লেম, “যা তুমি মনে কোচ্ছো, যা তোমরা মনে কর, বাস্তবিক তা নয়। তুমি এত ভয় পাচ্ছো কেন? আমি নিশ্চয় বুঝতে পাচ্ছি, দুষ্টমানুষের ঐ সব খেলা। কোন প্রকার মতলবে দুষ্টেরা ঐ রকম বিভীষিকা দেখায়, সেই চেষ্টাতেই তাদের অভীষ্ট সিদ্ধ হয়। তুমি দাঁড়াও, আমি আরও একটু ভাল কোরে দেখি।”

    আমার হাত ছাড়াবার জন্য ধস্তাধস্তি কোত্তে কোত্তে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে রামদাস বোল্লে, “রাম! রাম! রাম! কুলক্ষণ! বড় কুলক্ষণ! আজকের জন্যই আমি ছিলেম! ভূতের হাতে প্রাণ গেল! তুমি আমাকে ছেড়ে দাও।”

    আমার অপেক্ষা রামদাসের বয়স অনেক বেশী, আমার অপেক্ষা রামদাস কিন্তু দুর্বল; টানাটানি কোরেও রামদাস আমার হাত ছাড়াতে পাল্লে না। পুনর্বার হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বোলতে লাগলো, “তুমি ছেলেমান, কখন ওসব দেখ নাই, সেই জন্যই তোমার অত সাহস! বড় কুলক্ষণ! অমাবস্যার রাত্রে মেঘাড়ম্বর থাকলে, ঐ সব ভয়ানক-মূর্তি দেখা দেয়। জ্যোৎস্না-রাত্রে কখনো আমরা দেখি নাই, না জানি, কপালে আজ কি আছে! তুমি আমাকে ছেড়ে দাও! তুমিও এখান থেকে পালাও! কপালে—”

    আরো জোরে রামদাসের হস্ত ধারণ কোরে আমি তখন বোল্লেম, “কপালে কি আছে, তা আমি বুঝতে পাচ্ছি। তোমার কপালে কি আমার কপালে কিংবা ঐ সকল মুণ্ডর কপালে, কার কপালে কি ঘটে, তাই আজ আমি দেখবো, তোমার বন্দুক আছে?”

    চোমকে উঠে, শঙ্কিতনয়নে আমার মুখপানে চেয়ে রামদাস বোলে উঠলো, “বন্দুক? বন্দুক নিয়ে তুমি কি কোরবে?”—মৃদুস্বরে আমি বোল্লেম, “থাকে যদি, একটি আমারে তুমি এনে দাও। গুলী, বারুদ, সরঞ্জাম, সব যেন ঠিক থাকে। বন্দুক দিয়ে উপদেবতার পূজা কোত্তে হয়; সে পূজা তোমরা জান না, সেই জন্যই ভয় পাও; দেবতারাও সেই জন্য ভয় দেখান। আছে তোমার বন্দুক?”

    অল্পক্ষণ কি চিন্তা কোরে রামদাস বোল্লে, “আমার নাই, তুমি আসবার আগে এই বাড়ীতে দরোয়ান ছিল, সেই দারোয়ানের এক জোড়া গুলীভরা বন্দুক আমার ঘরে আছে; পূজা কোল্লে যদি ভাল হয়, একটা আমি এনে দিতে পারি।”

    “শীঘ্র এনে দাও। পূজা কোল্লে অবশ্যই ভাল হবে। এত ভাল হবে যে, সমস্ত উপদেবতা মুক্তিলাভ কোরে এই রাত্রেই স্বর্গধামে চোলে যাবে! এ কথা যদি আগে তুমি আমারে বোলতে কিম্বা আগে যদি ঐ সকল মূর্তি আমারে তুমি দেখাতে পাত্তে, তা হোলে আর কর্তাকে গয়ায় যেতে হোতো না; ঘরে বোসেই আমি নূতন প্রকার পিণ্ডদান কোরে দেবতাগুলিকে উদ্ধার কোরে দিতেম। দেখ না, এই রাত্রে তাই হবে। দাও তুমি, বন্দুক একটা আমাকে এনে দাও। কর্তা ফিরে আসতে না আসতে ভূতগুলি সব উদ্ধার হয়ে যাবে। দাও তুমি, দারোয়ানের সেই বন্দুক একটি আমাকে এনে দাও।”

    এই সব কথা বোলে রামদাসের হাতখানা আমি ছেড়ে দিলেম। আমার শয়নঘরের ভিতর দিয়ে ছুটে গিয়ে, রামদাস অবিলম্বে একটি দুনলি বন্দুক এনে আমার হাতে দিলে; দিয়েই আমার সন্দিগ্ধস্বরে বোল্লে, “পূজা হবে, ফুল-চন্দন দরকার হবে না?”

    অন্তরে হাস্য কোরে আমি উত্তর দিলেম, “মন্ত্র পাঠ কোল্লেই বন্দুকর গর্ভস্থ উপকরণগুলি ফুল চন্দনের আকার ধারণ করে। পূজা দর্শন কোরে তোমরা এককালে মোহিত হয়ে যাবে।” পূর্বে রামদাসের যতটা কম্প ছিল, আমার পূজার ফলশ্রুতি শ্রবণ কোরে আর তার ততটা কম্প থাকলো না। তারে একটু পশ্চাতে সোরিয়ে রেখে, বন্দুক হস্তে আমি সম্মুখে দাঁড়ালেম। আমার দৃষ্টি সেই সকল মুণ্ডর দিকে। লক্ষ্য একটা প্রকাণ্ড মুণ্ড। বন্দুকটি ভাল কোরে বাগিয়ে ধোরে অতি সাবধানে আমি আওয়াজ কোল্লেম। অব্যবহিত পরেই সেই দিক থেকে ঘেউ ঘেউ ভেউ ভেউ রব সমুত্থিত হলো, একটা মুণ্ড সেইখানে পোড়ে থাকলো, ছড়িভঙ্গ হয়ে সমস্ত মুণ্ড অদৃশ্য! বারুদের ধোঁয়ায় সে দিকটা আচ্ছন্ন।

    রামদাসের মুখে আর বাক্য নাই। বাড়ীর ভিতর থেকে বড়বাবু ছোটবাবু সেই সময় তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন; স্ত্রীলোকেরাও অন্যদিক থেকে উঁকি মেরে আতঙ্ক প্রকাশ কোত্তে লাগলেন : “কি হলো, কি হলো” বোলতে বোলতে রাঙামামীও ছাদের উপর থেকে চীৎকার কোত্তে থাকলেন।

    আমি বুঝতে পাল্লেম, যা হবার তাই হলো; রামদাসকে বোল্লেম, “যে দিকে তোমাদের উপদেবতারা মায়া বিস্তার কোচ্ছিলেন, সেই দিকে আমারে তুমি একবার নিয়ে চল।” রামদাস নিরুত্তর। বাবুরা আমারে বার বার নিষেধ কোল্লেন, সে দিকে যাবার পথ নাই, এই কথা বোলে, আমারে নিরস্ত করবার চেষ্টা পেলেন। তাঁদের নিষেধ আমি শুনলেম না। একনলে আওয়াজ হয়েছিল, দ্বিতীয় নল তখন পরিপূর্ণ; বন্দুকটি উপর দিকে তুলে, উপরদিকে চেয়ে তাঁদের সকলকে আমি বোল্লেম, “ভগবান রক্ষাকর্তা, উপদেবতার উপরে সর্বময় দেবতার সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব। উপদেবতাগুলি কোথায় গেল, একবার আমি দেখে আসি।”

    যে দিকে সেই সব মণ্ডু ছিল, সেই দিকে অনবরত কুক্করমণ্ডলীর বিভীষণ চীৎকার। বড়বাবু বোল্লেন, “কর্ম” তুমি ভাল কর নাই, উপদেবতার মায়া! মায়াবী দেবতারা কুক্কুরের মত কলরব কোরে আমাদের সংসারকে দেখাচ্ছেন! অবিশ্রান্ত ঘেউ ঘেউ রব। একে উপদেবতা, তাহার উপর তুমি তাঁদের ক্রোধ উৎপাদনের হেতু হয়েছ! আমাদের আর রক্ষা নাই! ওদিকে তুমি যেয়ো না। একান্তই যদি যাবার ইচ্ছা হয়, রাত্রি প্রভাত হোক, প্রভাতে যা ইচ্ছা, তাই তুমি কোরো।”

    রামদাস এই সময় বাবুদের কাছে আমার নামে নালিশ কোল্লে। আমি তার কাছে বন্দুক চেয়ে নিয়েছি, ভূতের মস্তকে আঘাত কোরেছি, ভূতগুলিকে রাগিয়ে দিয়েছি, এই তিন অভিযোগ। বড়বাবু আমারে বিস্তর ভর্ৎসনা কোল্লেন। কিছুতেই আমি সঙ্কল্প ত্যাগ কোল্লেম না। আমাদের পরস্পর কথা কাটাকাটি হোচ্ছে, সেই সময় নীচের সিঁড়ি দিয়ে গম গম শব্দে একটি নতূন বাবুলোক সেই বারান্দায় এসে উপস্থিত হোলেন। বাহিরের লোক। সদর দরজা যেন খোলা ছিল, বাহির থেকেই যেন তিনি এলেন, এইরূপ সকলে বিবেচনা কোল্লে। আমাদেরও তাই ভাবতে হলো। বাবুটিকে আমি দেখলেম। সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল দৃষ্টিগোচর হলো না। মাথায় এক পাগড়ী। পাগড়ীর উপর দিয়ে কণ্ঠদেশ পর্যন্ত লম্বা একখানা সবুজ রুমালের পটি বাঁধা। কর্ণ, কপাল, ললাট, সমস্তই ঢাকা; কেবল নাকটি আর চক্ষুদুটি জাগছিল। চিনতে পারা অসম্ভব; কিন্তু চক্ষুঃ দর্শন কোরে আমি এক রকম অনুমান কোল্লেম। আমি কথা কোইলেম না। যিনি এলেন, তিনিও কোন কথা বোল্লেন না। আমার সঙ্কল্প উপদেবতার উপনিবেশনান্তর দর্শন করা। আমার নির্বন্ধতাতিশয্য দর্শন কোরে কেহই আর তখন বাধা দিলেন না, আমি তখন সঙ্গী পেলেম রামদাসকে আর ছোটবাবুকে। উপরেই বারান্দা, উপরেই সেই ভগ্নগৃহ; মধ্যস্থল সংযোগশূন্য। উপর দিয়ে সেই ভগ্নগৃহে গমন করবার উপায় ছিল না। তিনজনে আমরা উপর থেকে নেমে এলেম। রামদাস পূর্বে আমারে বোলেছিল, কোন প্রয়োজন উপস্থিত হোলে, বাঁশের সিঁড়ির সাহায্যে সেই ভগ্নগৃহে আরোহণ কোত্তে হয়। নির্দিষ্ট স্থলে আমরা উপস্থিত হোলেম। ফুট জ্যোৎস্না, বেশ দেখা গেল, দীর্ঘ একটা বাঁশের সিঁড়ি সেই স্থানে আড়ে আড়ে সংরক্ষিত আছে। রামদাস বোল্লে, “এই সিঁড়ি; এরূপ সিঁড়িতে উঠা নামা তোমার অভ্যাস আছে?” আমি উত্তর কোল্লেম, “অভ্যাসের কথা কেন বল : — আবশ্যক হোলে অনভ্যাসকেও অভ্যাসের মধ্যে গণনা কোরে নিতে হয়।”

    ছোটবাবুর আদেশে রামদাস সেই সিঁড়িখানা খাড়া কোরে তুল্লে। আমরা উঠতে আরম্ভ কোল্লেম। অগ্রে ছোটবাবু, মধ্যে আমি, পশ্চাতে রামাদাস। আমার বাম হস্তে বন্দুক; দক্ষিণহস্তে সিঁড়ির বাঁশ ধোরে ধোরে ধীরে ধীরে আমি আরোহণ কোল্লেম। উপর্যুপরি ঘেউ ঘেউ রব। বিরামের অবসরে এক একবার শুনা গেল, কেঁউ, কেঁউ, কেঁউ, কেঁউ!

    কুকুর নিশ্চয়। মানুষ ভূতের বদলে কুকুর ভূত, এটাও একটি আশ্চর্য ব্যাপার বটে। কোনটা আশ্চর্য, কোনটা আশ্চর্য নয় অগ্রে আমি স্থির কোত্তে পাল্লেম না। নিত্য রজনীতে ছাদের উপর যে রকম শব্দ হয়, কুকুরে সে রকম শব্দ কোত্তে পারে না। হাস্য, নৃত্য, হুহুঁঙ্কার, লম্ফনের গুপ গাপ শব্দ, সে সব কাণ্ড কুকুরের নয়। মানুষভূত আর কুকুরভূত দুই দল যদি থাকে, পরীক্ষা করা যাবে।

    আমরা আরোহণ কোল্লেম। ঘেউ ঘেউ রব কোত্তে কোত্তে সেই সকল প্রকাণ্ড মুণ্ড ছুটে ছুটে বেড়াতে লাগলো। চতুষ্পদ জন্তুর যে রকম গতি, মুণ্ডেরও সেইরূপে গতি; মণ্ডের ভিতর কুকুর আছে, বেশ বুঝতে পারা গেল। আর আমার বন্দুকের আওয়াজ করবার আবশ্যক হলো না। রাগী কুকুরেরা সম্মুখের মানুষকে দংশন করে, যে সকল কুকুর আমাদের সম্মুখে, তাদের মুখে মোটা মোটা আবরণ ছিল, সেই সকল আবরণ নরমুণ্ড অথবা সিংহমুণ্ড সদৃশ, সে আবরণ ভেদ কোরে মানুষকে দংশন করা সেই সকল কুকুরের পক্ষে দুঃসাধ্য ছিল। দুঃসাধ্য না বোলে অসাধ্য বলাই ঠিক। সুতরাং কুক্কুরদংশনের আতঙ্ক আমাদের থাকলো না, সে অংশে আমরা নিঃশঙ্ক।

    যে দিকে কেঁউ কেঁউ রব হোচ্ছিল, বন্দুক হতে দ্রুতগতি সেই দিকে আমি অগ্রসর হোলেম; দেখলেম, একটা কুক্কর রক্তাক্ত-কলেবরে ভূমিশায়ী। তার মুখের আবরণমুণ্ড আমার বন্দুকের গুলীতে বিদীর্ণ। সেই কৃত্রিম মুণ্ডটা ভেদ কোরে কুক্কুরের কণ্ঠদেশে গুলী লেগেছে, অনবরত রক্তধারা প্রবাহিত হোচ্ছে, মৃত্যু আসন্ন। থেকে থেকে এক একবার মৃত্যুযন্ত্রণায় কেঁউ কেঁউ রব।

    দেখে আমার বড় দয়া হলো, কষ্টও হলো। ছোটবাবুকে ডেকে সেই কষ্টকর দৃশ্য আমি দেখালেম। তেমন কৰ্ম্ম কখন আমি করি নাই, বিনা দোষে নিরীহ প্রাণীর প্রাণ বিনাশ করা আমার আন্তরিক ইচ্ছার সম্পূর্ণ বিরোধী। ছোটবাবুকে বোল্লেম, একপ্রকার কুহকে পোড়ে এই কার্য আমাকে কোত্তে হয়েছে। সকলেই বলে ভূত; শব্দ শুনেও মনে হয়, কোন প্রকার ভৌতিক কার্য। আজ রাত্রে সেই মুণ্ডগুলো দর্শন কোরে তথ্য জানবার নিমিত্ত আমার আগ্রহ জন্মেছিল, তাতেই বিনা দোষে এই অবলা জন্তুটি আমি বিনাশ কোরেছি। এখন আপনি সন্ধান করুন, এ কার্য কার? কোন ব্যক্তি এইসকল কুকুরের মুখে ভয়ানক ভয়ানক কাষ্ঠের মুখোস সংযুক্ত কোরে ঐ ভাবে সাজিয়ে রেখেছে। বনের কুকুর নয়, পোষা কুকুর, সন্দেহ নাই। কুকুরকে যেমন যেমন শিক্ষা দেওয়া যায়, কুকুরেরা তাই শিক্ষা করে। কুকুরেরা প্রতিপালকের একান্ত বশীভূত হয়। আপনি সন্ধান করুন, কোন ধূর্ত মায়াবী লোক এই সকল কুকুরের প্রতিপালক।”

    ছোটবাবু তখন আমার কথায় মনোযোগ দিলেন না: রামদাসকে বোল্লেন, “সব বুজরুকী বুঝতে পারা যাচ্ছে। এক এক কোরে এই কুকুরগুলিকে তুমি নামিয়ে নিয়ে চল। কার কি মতলব, এই সকল কুকুর কার কাছে ছুটে যায়, সেই ক্রিয়া দেখলে অভিসন্ধি নিরূপণ করা যাবে।”

    রামদাস তৎক্ষণাৎ আজ্ঞাপালন কোল্লে। কুকুরগুলি বেশ শান্ত, বিশেষতঃ পোষা কুকুর, রামদাসের কোলে বেশ স্থির হয়ে থাকলো। রামদাস একে একে সকলগুলিকেই নামিয়ে নিয়ে গেল। যে কুকুরটিকে আমি অগ্রে গুলী কোরেছিলেম, সেটি বাঁচলো না। বাকীগুলি আমার শয়নঘরের বারান্দায় প্রেরিত হলো। কুকুরের মুখোসগুলো সেই ভগ্নগৃহে পোড়ে থাকলো। কাঠের মুখোস; সাদা রং মাখিয়ে ভীষণ আকারে চিত্র করা। লোকে দেখলেই রাত্রিকালে ভূতের মুখ বোলে ভয় পাবে, কোন লোকের পরামর্শে চিত্রকরের সেইরূপ নৈপূণ্যের পরিচয়।

    রামদাসের কার্য সমাপ্ত হবার পর আমরা উভয়ে সেই বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলেম; আমি আর ছোটবাবু।

    যে ঘরে আমি শয়ন করি, সেই ঘরের ভিতরে বাহিরে অনেকগুলি লোক। ভিতরের দিকের বারান্দায় স্ত্রীলোক : ঘরের ভিতর আর বাহিরের বারান্দায় পরুষ। সকলে সেই বাড়ীর লোক নয়, প্রতিবাসী লোকেরাও অনেকে সেই শেষরাত্রে সেইখানে এসে জমা হয়েছেন। আমরা গিয়ে সেইখানে ছোট-খাটো সমারোহ দেখলেম। এ সকল লোক খবর পেয়েছিল কিরূপে? বাড়ীতে তাদৃশ গোলমাল হয় নাই, কেহ চীৎকার করে নাই, কেহ কাহাকেও ডাকে নাই, কেহ কাহাকেও খবর দিতে যায় নাই, তবে কিরূপে এ স্থানে এত লোক একত্রিত হলো? এ প্রশ্নের উত্তর আমি স্বয়ং। ভূতের মুণ্ড লক্ষ্য কোরে আমি গুলী কোরেছিলেম, বন্দুকের আওয়াজ অনেকদূর গিয়েছিল, লোক জমায়েতের কারণ সেই আওয়াজ।

    বাড়ী যখন গুলজার ছিল, বাড়ীর অধিকারীরা যখন শ্রীমন্ত ছিলেন, তখন এই বাড়ীর নাম ছিল, “বাবুদের বাড়ী।” এখন ভগ্নাবস্থা, সকলদিকেই ভগ্নদশা, তথাপি নাম আছে, বাবুদের বাড়ী। যতদিন সেই জায়গায় দুই একখানা ইষ্টক, দুই একখানা কাষ্ঠ বিদ্যমান থাকবে, ততদিন নাম থাকবে, বাবুদের বাড়ী। এ দেশের সর্বত্র ঐ রকম হয়েই থাকে। অত রাত্রে বাবুদের বাড়ীতে বন্দুকের আওয়াজ হয়েছে, হয় তো কি একটা নূতন কাণ্ড উপস্থিত, তাই মনে কোরে প্রতিবাসী লোকেরা সেইখানে জড় হয়েছেন। অনেকেই শুনেছিলেন, বাবুদের বাড়ীতে এখন ভূতেরা বাসা কোরেছে; বাবুদের বাড়ীর নাম এখন ভূতের বাড়ী। আমি যে ভূত শীকার করবার মতলবে বন্দুক ছুড়েছিলেম, সেটা কেহ ভাবেন নাই; এখানে জমা হয়ে সকলেই শুনলেন, সাফ কথা। সকলেই বিস্ময়াপন্ন।

    কুকুরগুলিকে নামিয়ে এনে রামদাস নীচের একটি ঘরে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিল। আমার ইঙ্গিতে ছোটবাবুর আদেশে, সেই সময় সেইগুলিকে উপরে আনা হলো। পোষাকুকুর, ক্রীড়া-কৌতুকে সুশিক্ষিত। কার দ্বারা সুশিক্ষিত, সেইটি পরীক্ষা করবার জন্য সর্বাগ্রে আমার অভিলাষ। আমার অভিলাষে কাজ হয় না। চুপি চুপি বড়বাবুকে আমি মনের কথা জানালেম; ছোটবাবুও শুনলেন। যতগুলি পুরুষমানুষ সেখানে ছিল, সারিবন্দী কোরে সকলকে দক্ষিণ বারান্দায় দাঁড় কোরিয়ে দেওয়া হলো। উপদেশমতো রামদাস সেই সময় কুকুরগুলির শিকল ছেড়ে ছিল।

    পশুপ্রভৃতির আশ্চর্য ক্রীড়া। কুকুর সাতটি। যতগুলি লোক সেইখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সাতটি কুকুর ক্রমে ক্রমে সকলের সমীপবর্তী হয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আঘ্রাণ কোল্লে; একে একে সকলের মুখের দিকে চাইলে, শেষকালে একটি লোকের নিকটে গিয়ে, অঙ্গবস্থাদির আঘ্রাণ লয়ে, আহ্লাদে লাঙ্গুল সঞ্চালনপূর্বক অস্ফুট আনন্দধ্বনি কোত্তে কোত্তে সেই লোকটির কন্ধে, বক্ষে, হস্তে ঝাঁপ দিয়ে দিয়ে উঠতে লাগলো। এই রঙ্গ দর্শন কোরে দর্শক লোকেরা স্তম্ভিতভাবে পরস্পর মুখ-চাহাচাহি কোত্তে লাগলো।

    যে লোকটির সঙ্গে কুক্কুরদলের ক্রীড়া, সেই লোকটি অতিদ্রুত উপর থেকে নেমে এসে দক্ষিণদিকে দৌড়িল; দেখতে দেখতে অদেখা হয়ে গেল। ঝন ঝন শব্দে শিকলি বাজিয়ে বাজিয়ে কুকুরেরাও খানিকদূরে সেই লোকের সঙ্গে ছুটেছিল, চার পাঁচজন সঙ্গীসহ রামদাস ধাবিত হয়ে কুকুরগুলিকে ফিরিয়ে আনলে। কুকুরেরা তখন প্রভু-বিরহে অস্থির হয়ে বন্ধনশৃঙ্খল টানাটানি কোত্তে লাগলো : লাফিয়ে লাফিয়ে ঘেউ ঘেউ রব কোত্তে লাগলো : অল্পক্ষণের মধ্যেই আটক পোড়ে গেল। উপস্থিত লোকেরা অল্প অল্প ইতিহাস শ্রবণ কোরে বিস্ময় প্রকাশ কোল্লেন। কুকুরের মুখে ভূতের মুখোস ছিল, সকলের কাছে সেটা আমি প্রকাশ কোল্লেম না; কিন্তু কুকুরগুলির রঙ্গ দেখে সকলেই হাস্য কোল্লেন। হাস্যের কোন হেতু আছে, আমি কিন্তু তেমন কিছু বিবেচনা কোল্লেম না; আমি কেবল ভাবতে লাগলেম, যে লোকটা ছুটে পালালো, সে লোকটা কে? ইতাগ্রে মুখে মাথায় রুমাল বাঁধা যে একটি লোক দর্শন দিয়েছিল, সেই লোক।

    কে সেই লোক, চিনে লওয়া আমার পক্ষে অসাধ্য। বড়লোকেরা যে সকল কুকুর পোষেন, সেই সকল কুকুরের সেবার নিমিত্ত এক এক চাকর নিযুক্ত থাকে; সেই সকল চাকরের উপাধি “ডুবিয়া”। অর্ধবদনাবৃত যে লোকের গাত্রে কুকুরগুলির খেলা, সে লোকের অবয়ব— সে লোকের পরিচ্ছদ ডুবিয়ার মত নয় : ডুবিয়ারা নীচজাতিসম্ভূত : অধিকাংশই মেথর। এখানকার কুকুরেরা যে লোকটিকে প্রভু বোলে চিনেছিল, সে লোকের আকার-প্রকার ভদ্রসন্তানের তুল্য; মেথর বলা যায় না। বস্তুত কুকুরগুলি সেই লোকের বহুদিনের পালিত, শিক্ষিত, বশীভূত, সে পক্ষে আমার কোন সংশয় থাকলো না।

    ঊষাকাল উপস্থিত। ঊষাবায়ু প্রবাহিত, ঊষা-বিহঙ্গের সঙ্গীতে চতুর্দিক কূজনিত। ক্রমশঃ পূর্বদিক পরিষ্কার। বাহিরের লোকেরা রঙ্গ দর্শনে পরিতৃপ্ত হয়ে স্ব স্ব গৃহে ফিরে গেলেন, বাড়ীর স্ত্রীলোকেরা অন্দরে প্রবেশ কোল্লেন, বাবুরা আমারে নিয়ে জেঁকে বোসলেন। নিকটে থাকলো রামদাস।

    কর্তা-গৃহিণী বাড়ীতে নাই। ছেলেবাবুরাই কর্তা। তাঁদের মতানুসারেই আমারে চোলতে হবে। যে যে কথা তাঁরা আমারে জিজ্ঞাসা করেন, সে সব কথার জবাব দিতে হবে, যে যে কার্য তাঁরা আমারে আদেশ করেন, আদেশ পালন কোরে সেই সকল কার্য আমারে নির্বাহ কোত্তে হবে; সেই সকল কার্য নির্বাহে আমি বাধ্য। উপস্থিত ক্ষেত্রে সম্ভবমত সকল কথার উত্তর আমি দিলেম।

    এখন অবধি রাত্রিকালে আর ভূতের উপদ্রব হয় কি না, অগ্রে দেখা হোক, তার পর অপরাপর বিষয়ের নিগূঢ় তত্ত্ব অবধারণ করা যাবে।

    প্রভাতে নিত্যকর্মে সকলেই ব্যাপৃত। মধ্যাহ্নে রামদাসকে নিৰ্জনে পেয়ে সকৌতুকে আমি বোল্লেম, “এই তো রামদাস! এই তো তোমাদের ভূতের বাড়ী! ভূতগুলি তো এখন বাঁধা পোড়ে গেল, কর্তা এখন গয়াধামে কোন ভূতের জন্য পিণ্ডদান করবেন, তা কিছু তুমি অননুমান কোত্তে পার?”

    কিয়ৎক্ষণ ইতস্তত কোরে রামদাস বোল্লে, “কে জানে বাপু ভূতের কথা; ভূতেরাই বোলতে পারে, পিণ্ডির কথা পাড়ালোকেরাই বোলতে পারে; যারা ভূতের পিণ্ড দেয়, তারাই তার মর্ম জানে;  আমি গরীবলোক, সামান্য মানুষ ও সব কথা আমাকে তুমি কিছু জিজ্ঞাসা কোরো না।”

    নিষেধ পেলেম, তথাপি আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আচ্ছা রামদাস, ও সব তো তুমি জান না, ও সব কথা তো তুমি বোলতে পারবে না; আচ্ছা, কিন্তু ছাদের উপর না হয়, হাসি হয়, আরো কত রকম শব্দ হয়, সে সব তো নূতন ভূতের কাণ্ড। যে সকল ভূত এখন ধরা গেল, সে সকল ভূত মানুষের মত নৃত্য, হাস্য, হুহঙ্কার কোত্তে পারে না, এটা নিশ্চয়। তবে সে কি, তা কি তুমি জানো?”

    রামদাস উত্তর কোল্লে, “সবরে মেওয়া ফলে। দুদিন সবুর কর, দেখা যাক, কোন দিকে আর কোন রকম ভৌতিক ক্রিয়া— ভৌতিক উৎপাত ঘটে কি না। তা যদি কিছু না ঘটে, তবেই জানা যাবে, ঐ সকল কুকুর ভূতের—”

    প্রশ্ন এড়াবার মৎলবেই রামদাস ঐ রকম বাজেকথার আড়ম্বর আনছে, সেটা আমি বুঝতে পাল্লেম। সে সব কথা শুনবার আমার ইচ্ছা ছিল না, থামিয়ে দিলেম; অন্য প্রকার প্রশ্ন কোল্লেম, “গয়ায় পিণ্ডিদানের অগ্রে এখানকার উপদ্রব যদি থামে, তা হোলে কর্তা ফিরে এসে আমারে কি বোলবেন? গয়ামাহাত্ম্য অধিক কিম্বা আমার বন্দুকের মাহাত্ম্য অধিক, এই কথা আমি তাঁরে বোলতে পারবো কি না, তুমি রামদাস, তুমি অনেক দিন এই বাড়ীতে আছ, তুমি সে বিষয়ে আমারে কিরূপ পরামর্শ দিতে পার?”

    দ্বারের দিকে চাইতে চাইতে রামদাস ধীরে ধীরে বোল্লে, “সেই কথাই তো আমি বোলছিলেম; এখন অবধি এখানকার উপদ্রব যদি থামে, তা হোলে তোমার বন্দুকের মহিমাই গয়ার মহিমার চেয়ে বড় হবে।”

    রামদাসের মীমাংসা শ্রবণ কোরে আমার মনে একটি কৌতুক জন্মে থাকলো। কর্তার প্রত্যাগমনকাল পর্যন্ত প্রতীক্ষা না কোল্লে, সে কৌতুকের পরিতৃপ্তি সাধিত হবে না, মনে মনে সেটিও আমি বুঝে রাখলেম। নিম্নতলে ঘেউ ঘেউ রবে কুকুর ডেকে উঠলো। রামদাস উঠে দাঁড়ালো; একরকম মুখভঙ্গী কোরে বোল্লে, “ক্ষুধা লেগেছে, পেটের জ্বালায় চীৎকার জুড়েছে, খাবার দিলে খায় না, ক্ষুধা সেটা মানে না, যাই একবার, কৃষ্ণের জীব, অনাহারে মারা যাবে, সংসারের অকল্যাণ হবে।”

    কুকুরের সেবার জন্য রামদাস নেমে গেল। আমি মনে কোল্লেম, কথাও ঠিক, যে লোকের পোষা কুকুর, যে লোকের হাতে আহার করে, সেই লোক সম্মুখে থাকলে আহার করে; যে লোক নিত্য আহার দেয়, তার কাছে ও লাঙ্গুল-সঞ্চালনে আমোদ কোরে আহার করে; পোষা কুকুরের ধর্মই এই। অপরিচিত লোকের হাতে ভক্ষ্য গ্রহণে একজনের পোষা কুকুরের শীঘ্র প্রবৃত্তি হয় না। থাকতে থাকতে রামদাসের যদি পোষ মানে, তা হোলেই ঠিক হবে।

    আমার মনের কথা আমার মনেই থাকলো। কোন দিকে ভ্রূক্ষেপ না কোরে অবিরামে আপন কাম বাজিয়ে সূর্যদেব আপন বিরামস্থানে চোল্লেন, নানা চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে একাকী আমি ঘরের মধ্যে বোসে থাকলেম।

    বড়বাবু দর্শন দিলেন। স্ফীতবদনে আমার মস্তক স্পর্শ কোরে বড়বাবু বোল্লেন, “ছেলেমানুষ বটে, কিন্তু তুমি খুব বাহাদুর আছ। যে কাজ তুমি কোরেছ, সে কাজ আমরা পাত্তেম না। কর্তা তোমাকে অবিশ্বাস কোত্তেন, স্বাধীনতা দিতে রাজী ছিলেন না, আজ অবধি আমি তোমাকে কর্তার চক্ষে দর্শন কোরবো না। তীর্থযাত্রার পূর্বে আমাদের দুটি ভাইকেও তিনি বিশেষ কোরে বোলে গিয়েছেন, ‘হরিদাসকে সর্বদা চক্ষে চক্ষে রেখো, একাকী কোথাও যেতে দিও না।’—মানে আমি বুঝেছিলেম, কিন্তু পিতার সে আজ্ঞা আমি পালন কোত্তে পাল্লেম না। তোমাকে আমি স্বাধীনতা দিলেম। এখন অবধি তুমি তোমার ইচ্ছামত কাজ কোত্তে পারবে? কিন্তু আমাদের অজ্ঞাতে বাড়ী ছেড়ে কোথাও যেতে পাবে না।”

    আমি মনে মনে হাস্য কোল্লেম। বড়বাবু শীঘ্র শীঘ্র উঠে গেলেন না, আমারে বেড়াতে যেতেও অনুরোধ কোল্লেন না। দিবাকার্য সমাধা কোরে দিবাকর স্বস্থানে প্রস্থান কোল্লেন। রূপসী এসে আমাদের দিকে চাইতে চাইতে ঘরে একটা বাতী জ্বেলে দিয়ে গেল। একটু পরেই ছোটবাবু সেইখানে এলেন। আকাশের মিহির আস্তাচলে বাড়ীর মিহিরটি উদয়াচলে উপস্থিত। আমরা তিনজনে নানা প্রসঙ্গে কথোপকথন কোচ্ছি, কথায় কথায় ভূতের প্রসঙ্গ এসে পোড়লো। ছোটবাবু বোল্লেন, “ইন্দ্রজাল অনেক রকম দেখা গিয়েছে, এরকম কোথাও দেখি নাই। কুকুরেরা ভূতের খেলা দেখায়, বড়ই আশ্চর্য। আমি একদিন—”

    কি কথা বলা ছোটবাবুর মনে ছিল, শেষ পর্যন্ত শ্রবণ করবার অবসর হলো না, একটি লোক সেই সময় মন্থরগতিতে সেই গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেন। পরিচ্ছদে ভদ্রলোক, দৃষ্টি কিছু কুটিল, মস্তকে লম্বা লম্বা চুল, সম্মুখভাগে কুঞ্চিত, চুলের বাবরীতে কাণ দুটি ঢাকা, মাথায় একটি মৌলবীকে তার তাজ, ডানদিকে বক্রভাবে হেলা, এত হেলানো যে, লোকটির ডানকানটি আছে কি না জানা যায় না।

    অভ্যর্থনা কোরে হাসতে হাসতে বড়বাবু বোল্লেন, “আসুন পায়রাবাবু, আসুন; অনেক দিনের পর আজ আপনার দর্শন পেলেম, সংসারের সমস্ত মঙ্গল ত?”

    পায়রাবাবু বোসলেন। বড়বাবুর প্রশ্নের উত্তরে তিনি কত রকম কথা বোল্লেন, আমি সকল কথার অর্থ বুঝলেম না। মন যদি আমার সেই দিকে থাকতো, হয় তো বুঝতে পাত্তেম, কিন্তু মন তখন আমার সে দিকে ছিল না। চক্ষের সঙ্গে মনের মিলন কোরে পায়রাবাবুর চেহারাটি তখন আমি দর্শন কোচ্ছিলেম। চক্ষে অবশ্য পলক ছিল, কিন্তু দৃষ্টি সেই দিকে অবিরাম। দেখছি, লোকটির আপাদমস্তক নিরীক্ষণ কোচ্ছি। মনে একটা নূতন ভাবের আবির্ভাব। পায়রাবাবুর মুখমণ্ডলের প্রতিই আমার নয়নের অধিক আকর্ষণ। অশ্রুপুট দর্শন কোল্লেম, নাসিকা দর্শন কোল্লেম, নেত্রপুট দর্শন কোল্লেম, কেশস্তবক দর্শন কোল্লেম। সুবক্র তাজের উপরে নেত্র স্থির। অনেকদিন পূর্বে কলিকাতার নিকটে একরাত্রে আমি বিদ্যাসুন্দর যাত্রা শ্রবণ কোরেছিলেম। গোপালে উড়ের যাত্রা। সেই যাত্রায় যে লোকটি বর্ধমানের সুন্দরের প্রতিনিধি সেজেছিল, সেই লোকটির মস্তকের তাজ ঠিক ঐ রকমে দক্ষিণে হেলা। যাত্রার সুন্দরকে আমার মনে পোড়লো। সুন্দরের কার্যের সঙ্গে পায়রাবাবুর কার্যের মিলন আছে কি না, ক্ষণকাল তাই আমি ভাবলেম।

    চেয়ে আমি পায়রাবাবুর মুখের দিকে; মনে হলো, মূর্তি যেন আমার চেনা। আর কোথাও দেখেছিলেম কি না, ঠিক স্মরণ কোত্তে পাল্লেম না, কিন্তু এই রুদ্রাক্ষগ্রামেই তাঁরে আমি দেখেছি, এইরূপে যেন অবধারণ কোল্লেম। গ্রামের কোথায় দেখা, সেটি স্মরণ কোত্তেও অধিক বিলম্ব হলো না। গতরাত্রে ভূতের উৎসবের সময় মুখে মাথায় রুমালবাঁধা যে লোকটি ভিড়ের ভিতর দর্শন দিয়েছিলেন, কুকুরেরা যাঁর গায়ে ঝাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে উঠেছিল, সেই লোক। মুখখানি তখন ঢাকা ছিল, নাকটি আর চক্ষুদুটি খোলাছিল। ঠিক চিনতে পারি নাই, একটু একটু সন্দেহ হয়েছিল। আজ এই সময় অনাবৃত মুখমণ্ডল দর্শন কোরে সেই সন্দেহভঞ্জন হয়ে গেল। সত্যই বড়বাবুর পায়রাবাবুটি সেই লোক। আমি যেমন স্থির কোল্লেম সেই লোক, বড়বাবু আর ছোটবাবু সে রকম স্থির কোত্তে পাল্লেন কি না, লক্ষণ দর্শনে তেমনটি নিশ্চয় কোত্তে আমি অক্ষম হোলেম।

    মুখ ঢাকা দেখেছিলেম, খোলামুখ দেখলেম, মনে মনে চিনতে পাল্লেম। কেবল তাও নয়, আর কোথায় দেখেছি। মনে মনেই তর্ক, মনে মনেই নিশ্চয়। নদীতীরের আম্রবৃক্ষতলে একটি সেজোবাবু আমি দেখেছিলেম। রাঙামামীর প্রেরিত দূতস্বরূপ যাঁর হস্তে আমি সেই ঔষধের মোড়ক সমর্পণ কোরেছিলেম, ইনিই সেই সেজোবাবু। সাক্ষী আমার চক্ষু, আর আমার মানসিক স্মৃতি। এই পায়রাবাবুই সেই সেজোবাবু।

    কথা কিছু ভাঙলেম না। পায়রাবাবু মধ্যে মধ্যে আমার দিকে কটাক্ষপাত কোচ্ছিলেন, কটাক্ষপাতে আমিও তাঁর সেই কটাক্ষ দর্শন কোচ্ছিলেম। বস্তুতঃ তাঁর দর্শন আর আমার দর্শনের ভাব স্বতন্ত্র। ভূতের গল্প আরম্ভ হলো। সেই সময় আমি দেখলেম, প্রবেশকালাবধি এতক্ষণ পর্যন্ত পায়রাবাবুর মুখের ভাব যে প্রকার ছিল, সে ভাবের সম্পূর্ণ পরিবর্তন। কোন প্রসঙ্গ শ্রবণের ইচ্ছা না থাকলে শ্রোতা যেমন ক্ষণে ক্ষণে অন্যমনস্ক হয়, কোন পুরাতন বৃত্তান্ত আপন কৃতকার্যের ন্যায় ভেবে নিয়ে সে যেমন ম্রিয়মাণ হয়, চাঞ্চল্যের হেতু উপস্থিত না থাকলেও সে যেমন ক্ষণে ক্ষণে চঞ্চল হয়ে অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরায় কিম্বা পলায়নের পন্থা দেখে, মিহিরচাঁদের মুখে ভূতের গল্পের ভূমিকা শুনেই পায়রাবাবুর বাহ্যভাব সেই প্রকার। ভাবটা আমি বিশেষরূপে লক্ষ্য কোল্লেম। কি আমি লক্ষ্য কোচ্ছি, পায়রাবাবু হয় তো ঠিক সেটা অনুভব কোত্তে পাল্লেন না। অল্পক্ষণ পরেই অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন; বড়বাবুর দিকে চেয়ে গদগদবচনে বোল্লেন, “রাত্রি হয়, স্থানান্তরে আমার আজ একটা কাজ আছে; এখন আমি চোল্লেম, অবকাশমতো আর একদিন এসে সকল কথা শুনবো।”

    পায়রাবাবু দরজা পর্যন্ত অগ্রসর হোলেন।

    ‘যাও কিম্বা থাকো’, বড়বাবু এই দুটি কথার একটি কথাও বোল্লেন না। বারান্দা পার হয়ে সিঁড়িতে নামছেন, সেই সময় ছোটবাবুর কানে কানে চুপি চুপি গুটিকতক কথা আমি বোল্লেম। শশব্যস্তে গাত্রোত্থান কোরে, ছোটবাবু বারান্দায় বেরিয়ে পশ্চাতে ডাকলেন;— ডেকে ডেকে বোল্লেন, “পায়রাবাবু! পায়রাবাবু! চোল্লেন আপনি? একটু দাঁড়ান; আপনার কুকুরগুলি নিয়ে যান।”

    ছোটবাবুর সঙ্গে আমিও বারান্দা পর্যন্ত গিয়েছিলেম, পশ্চাতেই দাঁড়িয়ে ছিলেম, দেখলেম, পায়রাবাবু নামতে নামতে মুখ ফিরিয়ে যেন কতই বিস্ময়ে বোলে উঠলেন, “আমার কুকুর? কে বলে এমন কথা? কোথাকার কুকুর? কার কুকুর? আমি ত— আমি—”

    উপযুক্ত অবসরে ছোটবাবুর কর্ণে আমি আর এক মন্ত্র ঝাড়লেম। পায়রাকে সম্বোধন কোরে ছোটবাবু শীঘ্র শীঘ্র বোল্লেন, “আপনি একবার উপরে আসুন, আপনার একটি কার্য বাকী আছে, দাদা আপনাকে ডাকছেন।”

    পায়রাবাবুর মুখের কথা ওষ্ঠাগ্রেই বিলীন হয়ে গিয়েছিল, ছোটবাবুর বাক্যাবসানে তিনি কিয়ৎক্ষণ সিঁড়ির উপর স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন; নেত্রদ্বয় কিয়ৎক্ষণ উপরদিকে বিকসিত হয়ে থাকলো, তার পর ধীরে ধীরে তিনি উপরে এসে উঠলেন, গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেন, ছোটবাবু তাঁর সঙ্গে থাকলেন, আমি নীচে নেমে এলেম। পাঁচ সাত মিনিট পরেই আবার আমি বাবুদের মজলীসে গিয়ে আসনগ্রহণ কোল্লেম।

    যে সময়টকু আমি গরহাজির ছিলেম, সেই সময়ের মধ্যে পায়রাবাবুর সঙ্গে বাবুদের কিরূপ কথাবার্তা হয়েছিল, তা আমি জানতে পাল্লেম না। আমি হাজির হবার পর বড়বাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “আচ্ছা, পায়রাবাবু, আপনি বোলছেন, কুকুর আপনার নয়, কিন্তু আমি শুনেছি, কুকুরপোষা আপনার ভারী সখ; কুকুর স্বভাবতই প্রভুভক্ত, সেই ভক্তির উপর আপনি আরও অধিক ভক্তিসংযোগ কোরে কুকুরগুলিকে অধিক ভক্ত—অধিক বশীভূত কোরে তুলতে পারেন, সে বিষয়ে আপনার অতুল ক্ষমতা। যে কুকুরগুলি আমার এখানে আছে, সেগুলি যদি—”

    ঝুমুর ঝুমুর শব্দে শৃঙ্খলবাদন কোত্তে কোত্তে সাতটি কুকুর সেইখানে উপস্থিত হলো। আমাদের কাহারো মুখে বাক্য থাকলো না। কুকুরেরা সানন্দ-গুঞ্জনে লম্ফে ঝম্ফে দ্রুত ধাবিত হয়ে পায়রাবাবুর গায়ে মাথায় আরোহণ কোত্তে লাগলো। সেই ক্রীড়া দর্শনে বড়বাবু ছোটবাবু উভয়ে বিস্ময়াপন্ন, আমি কিন্তু কিছুমাত্র বিস্মিত হোলেম না। গত রাত্রে বহুরূপীর মত ছদ্মবেশে এই পায়রাবাবু এইখানে উপস্থিত ছিলেন, কুকুরেরা গত রাত্রে এই মূর্তির নিকটে এইরূপ অভিনয় কোরেছিল, আমি সেটি জানতে পেরেছিলেম, সেই কারণেই আমার মনে, বিস্ময়ের উদয় হলো না। আজ রাত্রে আবার সেই প্রকার অভিনয়ে আমি নিজেই এই অভিনয়ের সূত্রধার।

    সিঁড়ির পথে ছোটবাবুর আহ্বানে পায়রাবাবু যখন দ্বিতীয়বার উপরে উঠে আসেন, সেই সময় আমি একবার নীচে গিয়েছিলেম; রামদাসকে ক্ষেত্রকর্মের পরামর্শ দিয়াছিলেম। সেই পরামর্শের ফলে কুকুরের প্রবেশ। কুকুরের অভিনয়; সতেরাং আমিই এই অভিনয়ের সূত্রধার।

    পায়রাবাবু অস্থির। লোকটির মনে স্পষ্ট আঘাত লাগে, এমন কোন বাক্য উচ্চারণ না কোরেই হাসতে হাসতে বড়বাবু বোল্লেন, “বাঃ! আপনি তো কুকুরবশের উত্তম বশীকরণ জানেন; আপনাকে দেখলেই সব কুকুর আনন্দে নৃত্য করে, গায়ে উঠে খেলা করে। আশ্চর্য ক্ষমতা আপনার। আপনি বোলছিলেন। আপনার কুকুর নাই, আপনার কুকুর নয় সে কথায় অবিশ্বাস করা যায় না, কিন্তু এই কুকুরগুলো আপনি নিয়ে যান। একবার আপনাকে দেখেই এরা পোষ মেনেছে, আপনাকে দেখেই সুখী হয়েছে; আপনার কাছে এরা ভাল থাকবে, আপনি নিয়ে যান।”

    আমতা আমতা কোরে পায়রাবাবু বোল্লেন, “আমি?— আমি?— আমি কেন? আমি কেন?— এ সব কুকুর আমি—” এইরূপ অসম্বন্ধ কথা বোলতে বোলতে হাত ছুড়ে ছুড়ে গায়ের কুকুরগুলিকে তিনি তাড়িয়ে দিবার চেষ্টা কোল্লেন, দূর দূর বোলে ধমক দিলেন, কুকুরেরা সে ধমক মানলে না, শুনলে না, গ্রাহ্যই কোল্লে না; যতই তিনি ফেলে ফেলে দেন, নূতন খেলা মনে কোরে কুকুরেরা ততই আহ্লাদে লাঙ্গুল সঞ্চালন কোরে ঝাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে বার বার তাঁর গায়ে উঠে।

    টাকা যদি মেকী হয়, সে টাকার গায়ে অনেক রকম নিশানা থাকে, মানুষের কপটতারও নিশানা অনেক। কপট বিরক্তি দেখিয়ে পায়রাবাবু সেই কুকুরগুলিকে চপেটাঘাত মুষ্ট্যাঘাত উপহার দিতে আরম্ভ কোল্লেন : মুখে বোলতে লাগলেন, “এ কি উৎপাত! কোথাকার উপসর্গ! কোথাকার কুকুর এ সব! কেন আমাকে— কেন আপনারা— কেন আমি কুকুর নিয়ে—”

    শীকারের গন্ধ পেয়ে বিড়াল যেমন চুপি চুপি ছলী পেতে আসে, সেই রকম ছলী পেতে পেতে রামদাস সেইখানে এসে উপস্থিত। দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রামদাস সেই মজলীসের বাগবিতণ্ডা শ্রবণ কোরেছিল, মধ্যবর্তী হয়ে পায়রাকে বোলতে লাগলো, “কেন মশাই অমন কর? কেন মশাই না না কর? নিয়ে যাও মশাই, নিয়ে যাও, কেন আমাদের মাথার উপর জীবহত্যা- পাপের বোঝাটা চাপিয়ে দিতে চাও? খাবার দিলে খায় না, ভেঁউ ভেঁউ কোরে কাঁদে, দু দিন থাকলে ঠায় মারা যাবে, কৃষ্ণের জীব, কে কোথায় অনাহারে বাঁচে? কেন আপনি আমাদের অতগুলো জীবহত্যার ভাগী কর। এখানে থাকলে ওরা বাঁচবে না; নিয়ে যাও।”

    কাহারো কোন কথাই পায়রাবাবু শুনলেন না; গায়ের উপর থেকে কুকুরগুলিকে ঝেড়ে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মুখ ভারী কোরে উঠে সটান চঞ্চলচরণে এককালে বাহিরের রাস্তায় উপস্থিত হয়েই ছুট! বড়বাবু, ছোটবাবু আর আমি তিনজনেই বাহিরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে পায়রাবাবুর ছুটের ঘটা দেখলেম; তিনজনেই হাস্য কোল্লেম; তিনজনেই রামদাসের প্রতি ইঙ্গিত কোরে যথাকর্তব্য আদেশ দিলেন। রামদাস তৎক্ষণাৎ সে কুকুরগুলির গলার শিকলগুলি খুলে নিয়ে সদরদরজায় বাহির কোরে দিয়ে দরজা বন্ধ কোরে দিলে। বন্ধ করবারও আবশ্যক ছিল না, দরজা খোলা থাকলেও কুকুরেরা বাড়ীর ভিতর ফিরে আসতো না। রাস্তার ধূলা আঘ্রাণ কোত্তে কোত্তে ঘোড়দৌড়ের ঘোড়ার মত ছুটে ছুটে তারা সেই পলায়িত মনিবের পথানুসরণ কোল্লে; দেখতে দেখতে অদৃশ্য হয়ে গেল। এইখানেই এ নাটকের যবনিকা-পতন।

  • ঘটনাপঞ্জী

    ঘটনাপঞ্জী

    অতুল সুর

    [book-name]

    ঘটনাপঞ্জী

    খ্রীষ্টাব্দ ঘটনা
    ১৮৯৩ স্বামী বিবেকানন্দের চিকাগো বক্তৃতা।
    ১৮৯৩ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠা।
    ১৮৯৬ কলকাতায় ভূমিকম্প।
    ১৮৯৭ বয়ার যুদ্ধ ও চাউলের দাম বৃদ্ধি।
    ১৮৯৮ প্লেগ মহামারী।
    ১৯০০ কলিকাতা ইলেকট্রিক সাপ্লাই করপোরেশন গঠিত।
    ১৯০১ মহারাণী ভিকটোরিয়ার মৃত্যু।
    ১৯০২ স্বামী বিবেকানন্দের মত্যু।
    ১৯০২ কলকাতায় ইলেকট্রিক ট্রাম প্রবর্তন।
    ১৯০৫ বঙ্গদেশ দ্বিখণ্ডিত। প্রতিক্রিয়ায় বিলাতী পণ্য বর্জন ও স্বদেশী আন্দোলন।
    ১৯০৫ অনুশীলন সমিতি গঠন।
    ১৯০৭ বেঙ্গল ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হওয়ার ফলে বহু বাঙালীর সর্বনাশ।
    ১৯০৯ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আইন কলেজ স্থাপন।
    ১৯১১ মোহনবাগান কর্তৃক I. F. A. Shield জয়।
    ১৯১১ দিল্লীর দরবার। ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লীতে স্থানান্তরিত। বঙ্গভঙ্গ নাকচ।
    ১৯১২ শহর উন্নয়নের জন্য ক্যালকাটা ইমপ্রুভমেণ্ট ট্রাস্ট গঠিত। তুলার খেলার পদাঙ্কে জয়ার প্লাবন।
    ১৯১৩ রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি।
    ১৯১৪-১৮ প্রথম মহাযুদ্ধ।
    ১৯১৬ জার্মান ডুবো জাহাজ ‘এমডেন’-এর বঙ্গোপসাগরে হানা, মাদ্রাজে বোমা বর্ষণ ও সুন্দরবনের দিকে অগ্রসর।
    ১৯১৬ স্যাডলার কমিশন।
    ১৯১৮ জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ড; প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথের নাইটহুড ত্যাগ।
    ১৯১৮ ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী।
    ১৯১৮ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা।
    ১৯১৯ কলকাতায় প্রথম বিমান অবতরণ।
    ১৯২০ কলকাতায় রিকশার প্রবর্তন।
    ১৯২১ গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলন।
    ১৯২২ চিত্তরঞ্জন দাস কর্তৃক স্বরাজ্য পার্টি গঠন।
    ১৯২২ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কার।
    ১৯২৪ আশতোষ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু।
    ১৯২৪ কলকাতায় বাস প্রবর্তন।
    ১৯২৫ চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যু।
    ১৯২৫ সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু
    ১৯২৬ কলকাতায় ক্রিকেট খেলার জন্য বিলাতের M. C. C. ক্লাবের আগমন।
    ১৯২৬ হিন্দু-মাসলমান দাঙ্গা।
    ১৯২৮ কলকাতায় বেতার প্রবর্তন।
    ১৯৩০ আইন অমান্য আন্দোলন।
    ১৯৩০ সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন।
    ১৯৩১ সিমপসন হত্যা ও বিনয়-বাদল-দীনেশের সঙ্গে রাইটার্স বিল্ডিং-এ ‘অলিন্দ যুদ্ধ’।
    ১৯৩৪ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর হন।
    ১৯৩৪ সূর্য সেনের মৃত্যু। কলকাতায় ঝিনঝিনিয়া রোগের প্রকোপ।
    ১৯৩৪ বিহার ভূমিকম্প ও কলকাতায় তার তীব্র অনভূতি।
    ১৯৩৬ অল ইণ্ডিয়া রেডিয়ো স্থাপন।
    ১৯৩৮ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু।
    ১৯৩৯-৪৫ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে।
    ১৯৪১ সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান।
    ১৯৪১ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু
    ১৯৪২ আগস্ট বিপ্লব ও মেদিনীপুরে বিকল্প সরকার গঠন।
    ১৯৪৩ নেতাজী সুভাষচন্দ্র কর্তৃক আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন।
    ১৯৪৩ কলকাতার রাজপথে হাজার হাজার দুর্ভিক্ষ ক্লিষ্ট নরনারীর মৃত্যু।
    ১৯৪৩ তেভাগা আন্দোলন।
    ১৯৪৩ কলকাতায় জাপানী বোমারুর আক্রমন।
    ১৯৪৪ রেশনিং প্রথা প্রবর্তিত।
    ১৯৪৬-৪৭ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা।
    ১৯৪৭ স্বাধীনতা লাভ ও বঙ্গদেশ দ্বিখণ্ডিত হওয়া।
    ১৯৪৭ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কর্তৃক ‘জনসঙ্ঘ’ দল গঠন।
    ১৯৪৭ শেয়ার বাজারে মূল্যপতন হেতু বহু ব্যাঙ্কের দেউলিয়া হওয়া ও বাঙালীর সর্বনাশ।
    ১৯৫১ ভারতের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সূচনা।
    ১৯৫২ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ স্থাপিত।
    ১৯৫২ এক পয়সা ট্রামভাড়া বৃদ্ধির ফলে ধুন্ধুমার কাণ্ড।
    ১৯৫২ রেশনিং প্রথার অবলপ্তি।
    ১৯৫৩ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু।
    ১৯৫৩ তেনজিং নোরগে ও এডমণ্ড হিলারি কর্তৃক এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়।
    ১৯৫৭ সোভিয়েট নেতাম্বয় বুলগেনিন ও ক্রুশ্চেভের ভারত সফর।
    ১৯৫৮ ইংলণ্ডের রাণী এলিজাবেথের ভারত সফর।
    ১৯৬২ ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যু।
    ১৯৬৪ রেশনিং প্রথার পুনঃ প্রবর্তন।
    ১৯৬৭ অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যুক্তফ্রণ্ট সরকার গঠিত।
    ১৯৬৯ বামফ্রণ্ট সরকার গঠিত।
    ১৯৬৯ চারু মজুমদারের নেতৃত্বে নকশাল আন্দোলন।
    ১৯৭১ স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধরত বাংলাদেশ থেকে ৭৫ লক্ষ শরণার্থীর ভারতে প্রবেশ।
    ১৯৭২ চারু মজুমদারের মৃত্যু।
    ১৯৭৬ কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যু।
    ১৯৭৭ জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রণ্ট সরকার।
    ১৯৭৭ কলকাতা দূরদর্শন কেন্দ্র স্থাপিত।
    ১৯৮২ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সংগীত আকাদেমি গঠিত।
    ১৯৮৪ ভূপালে গ্যাস দুর্ঘটনায় ২০০০ নিহত।
    ১৯৮৫ ‘নন্দন’ প্রতিষ্ঠা।
    ১৯৮৬ পঃ বঃ বাংলা আকাদেমি প্রতিষ্ঠা।
    ১৯৮৭ পঃ বঃ নাট্য আকাদেমি প্রতিষ্ঠা।
    ১৯৮৭ সত্যজিত রায়ের Legion D’ Honour প্রাপ্তি।
    ১৯৯২ সত্যজিত রায়ের OSCAR প্রাপ্তি।
    ১৯৯৩ দ্বিতীয় হাওড়া সেতুর উদ্বোধন
    ১৯৯৪ শতাব্দীর সমাপ্তি।
    ১৯৯৪ মিতা সেনের ‘বিশ্বসুন্দরী’ খেতাব প্রাপ্তি।

  • বাঙালীর দুর্গতি

    বাঙালীর দুর্গতি

    অতুল সুর

    [book-name]

    বাঙালীর দুর্গতি

    নানা কারণে বাঙালী আজ খুবই কাহিল অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। অথচ একশো-দুশো বছর আগে পর্যন্ত আর্থিক জীবনে বাঙালী স্বয়ম্ভর ছিল। আজ তার নিত্য আবশ্যকীয় সব জিনিসই আসে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে থেকে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ চাষবাস ও মজুরি থেকে যা সামান্য আয় করে, তার প্রায় সবটাই চলে যায় পশ্চিমবঙ্গের বাইরে। ফলে পশ্চিমবঙ্গ ক্রমশ দুর্বল ও নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। বঙ্গাব্দ চোদ্দ শতকে বাঙালীর এ দুর্গতি তুঙ্গে উঠেছে।

    নিঃস্ব বাঙালী যা-ও বা কিছু সামান্য সঞ্চয় করেছিল, তা বিগত শতাব্দীতে হারিয়েছে শতাব্দীর সূচনায় বেঙ্গল ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক দেওলিয়া হওয়ার ফলে, ১৯১২ খ্রীস্টাব্দে তুলার খেলার সর্বাত্মক জয়ার মত্ততায়, ১৯৪৭-৪৮ সালের ব্যাঙ্কিং সংকটে ও শেয়ার বাজারের হাতছানিতে। বর্তমানে সে আবার সর্বস্বান্ত হয়েছে ‘চিট’ ফাণ্ডের প্রকোপে।

    চোদ্দ শতকের বাঙালী বেশি মার খেয়েছে শেয়ার বাজারে। শেয়ার বাজার থেকে পয়সা উপায় করতে হলে আবশ্যিকভাবে প্রয়োজন মোটা পুঁজি ও ঝুঁকি নেবার অসীম ক্ষমতা। এ দুটোই বাঙালীর নেই। ফলে নিঃস্ব বাঙালী যতবার শেয়ার বাজার থেকে ফায়দা তুলতে চেয়েছে, তত- বারই আঙুল পুড়িয়ে ঘরে ফিরেছে। শেয়ার বাজারের পাণ্ডাদের কায়দা কানুনগুলোর সঙ্গে পরিচয় না থাকলে এরূপই ঘটে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বাজারের পাণ্ডাদের হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য সরকার ১৯৫৬ সাল থেকে শেয়ার বাজার নিজ নিয়ন্ত্রণে এনেছে। কিন্তু সরকার নিজেই শেয়ার বাজারের পাণ্ডাদের এসব কায়দা কানুন সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ। ফলে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনলেও কোন ফল ফলে নি। পঞ্চাশের দশকে হরিদাস মাদ্রার ও নব্বইয়ের দশকে হর্ষদ মেহটার কেলেঙ্কারী তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

    ৷৷ দুই ৷৷

    চারদিকে যা দেখছি তাতে মনটা ভারী দমে যাচ্ছে। সবচেয়ে শোচনীয় দৃশ্য যা দেখছি, তা হচ্ছে দেশের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদের আত্মপ্রকাশ। মনে হচ্ছে, বুঝিবা এবার দেশটা লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। মনে পড়ে গেল অনেকদিন আগে এক ইংরেজের বলা এক উক্তি। উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন, ভারত স্বাধীনতা পাবার যোগ্য স্তরে এখনও পৌঁছায়নি। ভারতকে যদি স্বাধীনতা দেওয়া হয়, তাহলে ইংরেজ এদেশে আসবার আগে ভারতের যে অবস্থা ছিল, ভারত আবার সে অবস্থাতেই ফিরে যাবে। ভারত ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। তখন গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের উত্তেজনায়, আমরা চার্চিলের কথায় খুব ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। চার্চিলকে আমরা অনেক কটু কথা বলেছিলাম। রুষ্ট হয়ে সেদিন আমরা চার্চিলের ওই উক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলাম।

    তারপর অনেক বছর কেটে গেছে। দেখলাম ভারতকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করেই স্বাধীনতা দেওয়া হল। সূতরাং জন্মসূত্রেই স্বাধীন ভারত বিচ্ছিন্নতাবাদের ধ্বজা কাঁধে নিয়ে তার মহাযাত্রা শুরু করেছে।

    স্বাধীনতার পর দেশে দেখলাম, দুরকম রাজ—ঠাণ্ডা রাজ, আর ডাণ্ডা রাজ। ঠাণ্ডা রাজের আমলেই দেখলাম দেশের সংহতিকে বিনষ্ট করে আবির্ভূত হতে লাগল ভাষাভিত্তিক রাজ্যসমূহ। আজ আবার ডাণ্ডা রাজের আমলেও দেখছি সেই একই প্রবণতা। দেশের সংহতি আজ নষ্ট হচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রকোপে। দেশের ঐক্য যে আজ বিপন্ন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে এতে ঘাবড়াচ্ছেন না দেশের জনগণমন-অধিনায়করা। তাঁরা বলছেন এটা বিশেষ কিছু নয়। নাচ-গানের সমারোহ করলেই দেশের সংহতি বজায় থাকবে। এরকম কথা আর একবার শুনেছিলাম, বিধান ডাক্তারের আমলে। তখন বনমহোৎসবকে তিনি রূপায়িত করতে চেয়েছিলেন সাহানা দেবীর নাচের মাধ্যমে।

    যেন মনে হচ্ছে যে দেশের সব সমস্যারই মকরধ্বজ হচ্ছে নাচগানের অনুষ্ঠান করে হৈ হৈ করা। কেবল ভয় পাই, এটা না শেষ পর্যন্ত নটরাজের প্রলয় নাচনে গিয়ে দাঁড়ায়।

    ইংরেজ আমলেই দেশের মধ্যে মোটামুটি একটা রাষ্ট্রীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইংরেজ আসবার আগে যে ভারতে রাষ্ট্রীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়নি, তা নয়। হয়েছিল, যেমন মৌর্য সম্রাট অশোকের আমলে, গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে, পাল-সম্রাট ধর্মপালের আমলে ও মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে, কিন্তু সে সবই ভেস্তে গিয়েছিল। ইংরেজ আসবার আগে ভারতের ইতিহাস তো তার সাক্ষ্য দেয়। আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধবিগ্রহ, রক্তারক্তি, সিংহাসন লাভের জন্য পিতাপুত্রে, ভাইয়ে-ভাইয়ে মারামারি, কাটাকাটি, এটাই তো ছিল ভারত ইতিহাসের গতানুগতিক ধারা। আজ আবার সেই প্রবণতাই উৎকটভাবে প্রকাশ পাচ্ছে? এর কারণ কি?

    কারণ একটাই। ভারত হল আপাত বৈষম্যের দেশ। এ বৈষম্য সর্বগ্রাসী ও নানারকম, নৃতাত্ত্বিক, সামাজিক, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক, ধর্মগত, জীবনচর্যার বৈষম্য ইত্যাদি।

    ৷৷ তিন ৷৷

    ভারতের কোন নৃতাত্ত্বিক ঐক্য নেই। মোটামুটি, পাঁচটা বিভিন্ন নরগোষ্ঠীর লোক ভারতে বাস করে, যথা প্রটো-অস্ট্রালয়েড, নর্ডিক, মেডিটেরেনিয়ান, আলপীয়-দিনারিক ও মঙ্গোলয়েড। এই পাঁচ নরগোষ্ঠীর লোক ভারতের মহামিলনক্ষেত্রে এসে মিলেছে। এই পাঁচ নরগোষ্ঠীর লোক মোটামটি ১০৩৫টা মাতৃভাষায় কথা বলে। এগুলো আর্য, দ্রাবিড় ও মণ্ডারী ভাষাভুক্ত। এদের সকলেরই মধ্যে ফোনেটিকস্, এটিমোলজি, মরফোলজি, সিনট্যাক্স ও সেমান্টিক্স-এর পার্থক্য আছে। উত্তর ভারতে প্রচলিত বর্ণমালাসমূহের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের বর্ণমালাসমূহের রূপগত বৈষম্যও লক্ষিত হয়।

    এ বৈষম্য মাত্র নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাগত নয়। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়ও। মূলগতভাবে সমাজের ন্যূনতম সংস্থা হচ্ছে পরিবার, এবং পরিবারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় বিবাহ দ্বারা। কিন্তু ভারতে যত জাতি আছে তার চেয়ে বেশি বিবাহপ্রথা প্রচলিত আছে। একের বিধির সঙ্গে অপরের মিল নেই। উত্তর ভারতে মামাতো পিসতুতো ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে হয় না।

    অথচ দক্ষিণ ভারতের অনেক জায়গায় এটাই হচ্ছে বাঞ্ছনীয় বিবাহ। সেখানে মামা-ভাগ্নীর মধ্যে বিবাহও বিধিসম্মত বিবাহ। উত্তর ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলে বধূর সিঁথিতে সিঁদুর দানই বিবাহের মূলে অনুষ্ঠান এবং এটাই সধবা রমণীর চিহ্ন, কিন্তু দক্ষিণ ভারতে সিঁদুর দান প্রথা নেই। সেখানে কণ্ঠে তালিবন্ধন’ই বিবাহের প্রধান অনুষ্ঠান, এবং এটাই সধবা স্ত্রীলোকের চিহ্ন। আবার আদিবাসীদের মধ্যেও নানারকম বিবাহ-প্রথা প্রচলিত আছে। এক্ষেত্রেও উত্তর ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের কোন সাদৃশ্য নেই। আবার উত্তর-পূর্ব সীমান্তের আদিবাসীদের মধ্যে বিধবা শাশুড়ি ও বিধবা বিমাতাকে বিবাহ করার প্রথা প্রচলিত আছে। কেরলের নায়ারদের মধ্যে প্রচলিত বিবাহ অন্যত্র দৃষ্ট হয় না। বহুপতিক বিবাহ দক্ষিণ ভারতে টোডাদের মধ্যে ও হিমালয়ের পাদদেশস্থ অঞ্চলে দৃষ্ট হয়। অন্যত্র কিন্তু তা নেই। আছে কোনও কোনও জায়গায় দেবরণ প্রথা। তাছাড়া, বিবাহে মাঙ্গলিক আচার (যাকে আমরা স্ত্রী-আচার বলি) তা ভারতের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন রকমের।

    ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের অশন-বসনের বিচিত্রতাও আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরে জনগণের জীবনযাত্রা প্রণালীর অনৈক্য। বাঙলা, আসাম ওড়িশা ও পূর্ব-উপকূলের প্রধান খাদ্য চাউল। চাউল সিদ্ধ করে খাওয়া হয়। উত্তর ভারত, পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও অন্যত্র প্রধান খাদ্য গম। গম চূর্ণ করে জল দিয়ে মেখে রুটি তৈরি করে সেঁকে খাওয়া হয়। আবার পশ্চিম উপকূলস্থ অনেক জাতির প্রধান খাদ্য বজরা ও রাগি। বাঙলা, আসাম ওড়িশা ও আরও দু এক প্রদেশের লোকরা মাছ খায়। অন্যত্র মাছ খায় না, কিন্তু মাংস খায়। প্রাচ্য প্রদেশের লোকরা সরিষার তৈল দিয়ে রন্ধন-ক্লিয়া সম্পন্ন করে। উত্তরপ্রদেশের লোকরা কিন্তু ঘি ব্যবহার করে। রন্ধনক্রিয়ায় পশ্চিম ভারতের লোকরা তিলের তেল ও দক্ষিণ ভারতের লোকরা নারিকেল তেল ব্যবহার করে। মাত্র খাদ্যের দিক দিয়ে নয়, বসন-ভূষণের দিক দিয়েও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এক বিচিত্রতা দৃষ্ট হয়। পশ্চিম বাঙলার মেয়েরা (বিধবা ছাড়া) পাড়-বিশিষ্ট শাড়ি পরত। বিহার ও উত্তর প্রদেশের মেয়েরাও তাই। তার মানে তারা সেলাইবিহীন বস্ত্র ব্যবহার করত। কিন্তু রাজস্থান ও পাঞ্জাবের মেয়েরা সেলাইবিশিষ্ট বসন পরে। রাজস্থানের মেয়েরা বর্ণাঢ্য ঘাঘরা পরে। পাঞ্জাবের মেয়েরা পাজামা ও কামিজ পরে। পশ্চিম ভারতের মেয়েরা কাছা দেয়। অন্য জায়গার মেয়েরা কাছা দেয় না। পুরষদেরও ধূতি নানা জায়গায় নানা কায়দায় পরা হয়। বাঙলায় চটি-জুতা ব্যবহারই প্রচলিত ছিল। কিন্তু উত্তর ভারতের লোকরা গোড়ালি-বিশিষ্ট জুতা পরত। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে ভারতের লোকের সামাজিক ও জীবনযাত্রা প্রণালীর কোনও একতা নেই।

    ভারতের লোকের ধর্মীয় একতাও নেই। দুর্গাপূজা, দশেরা, দেওয়ালী, হোলি প্রভৃতি উৎসবগুলিকে আমরা জাতীয় উৎসব বলি। কিন্তু এসব উৎসব পালনের সময়কাল ও মর্যাদার দিক দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈসাদৃশ্য লক্ষ্য হয়। বাঙলার শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গোৎসব। কিন্তু সংলগ্ন বিহার প্রদেশে তা নয়। সেখানে কার্তিকী ষষ্ঠীতে অনুষ্ঠিত ‘ছট’ পরবই বছরের শ্রেষ্ঠ উৎসব। উত্তর ভারতে বোধ হয় ‘হোলি’ ও পশ্চিম ভারতে ‘দেওয়ালী’ই শ্রেষ্ঠ উৎসব। এ তো গেল সমষ্টির ব্যাপার। ব্যক্তির দিক থেকেও ধর্মীয় বিভেদ অসাধারণ। কেউ বৈষ্ণব, কেউ সৌর, কেউ গাণপতা, কেউ শৈব, কেউ শাক্ত, কেউ তান্ত্রিক, কেউ আস্তিক, কেউ নাস্তিক ইত্যাদি। আবার এসব ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অসংখ্য সম্প্রদায় আছে।

    এক কথায় সব বিষয়েই ভারত এই আপাত বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতার সরে বাঁধা। সুতরাং আজ যদি ভারতে বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা প্রকাশ পায় তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

    ৷৷ চার ৷৷

    কলকাতা পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী হলে কি হবে? কলকাতায় বাঙালী আজ পরবাসী। কেননা, কলকাতায় পশ্চিমবঙ্গের মানুষের বাসস্থানেরও অভাব ঘটছে। শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যখন কিছুকাল আগে এক রাজস্থানী ভদ্রলোক দাবি করেছিলেন যে রাজস্থানের সবচেয়ে বড় শহর হচ্ছে কলকাতা। কথাটার মানে বুঝলাম যখন উনি ওর ব্যাখ্যা করলেন। বললেন, রাজস্থানেরও অনেক শহর আছে, কিন্তু সেসব শহরের কোনটাতেই এত রাজস্থানী বাস করে না, যত বাস করে কলকাতায়। যে হারে ইদানীং কলকাতায় রাজস্থানীদের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে এরকম উক্তিতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কিন্তু বাঙালীর এই শোচনীয় অবস্থার জন্য দায়ী কে? বাঙালী নিজেই। বাঙালীর উদাসীনতাই এর জন্য দায়ী। আজ এসব সমস্যার দিকে তাকাবার বাঙালীর সময় নেই! না আছে তার উদ্যম-উৎসাহ, না আছে সংগ্রামী মন। বাঙালী যে এসব গণের অধিকারী নয়, তা বলছি না। কিন্তু তার সমস্ত উদ্যম-উৎসাহ ও সংগ্রামী মন আজ চলছে বিপথে। তার উদ্যম-উৎসাহ ও সংগ্রামী মন আজ আত্মকলহে মিয়োজিত। মাত্র এক দলের সঙ্গে অপর দলের কলহ নয়। নিজ দলের মধ্যেই মতানৈক্য, দ্বন্দ্ব ও ‘সংঘর্ষ’। তাছাড়া আছে অপর দলের প্রতি আগ্রাসন, আঘাত ও অঘটন। এসব দেখে মনটা প্রায়ই খারাপ হয়ে যায়। অনেক সময়ই মনে হয় যে কলহ, মারামারি, কাটাকাটি করেই বুঝি বাঙালী জাতটা খতম হয়ে যাবে। বাঙালীর মত এক প্রতিভাশালী জাতির যে এ-রকম দুর্দশা হতে পারে, তা অকল্পনীয়। অতি প্রাচীনকাল থেকেই এ জাতটা সারা ভারতে প্রতিভাশালী জাতি বলে পরিচিত ছিল। বাঙালী জাতির এ পরিচিতিটা ছিল উত্তর ভারতের মানুষের বনামে। এর কারণ নৃতাত্ত্বিক। সেটা আমি আলোচনা করেছি আমার ‘ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়’ গ্রন্থে। সেজন্য তার পুনরাবৃত্তি আর এখানে করব না। মাত্র কিছু ঐতিহাসিক তথ্য এখানে দেব। নর্ডিক আর্যরা যখন পঞ্চনদের উপত্যকায় এসে বৈদিক সভ্যতার পত্তন করেছিল, তখন থেকেই তারা দুচক্ষে দেখতে পারত না আর্য ভাষাভাষী আলপীয় বাঙালীদের। বাঙালীদের তারা ঘৃণা করত। তারা বাঙালীদের নাম দিয়েছিল ‘বয়াংসি’। ঈর্ষার বশীভূত হয়েই তারা এটা করেছিল। ঈর্ষার কারণ, বাঙালীর শৌর্য বীর্য, শিক্ষা-দীক্ষা, উন্নত জীবনচর্যা, উচ্চতর ধর্ম ও ধর্ম স্থান। তবুও বৈদিক আর্যদের মধ্যে যারা উদারমনা ছিল, তারা গোপনে বাঙলায় আসত তীর্থ যাত্রা করতে। তবে এর জন্য তাদের শাস্তি পেতে হত প্রায়শ্চিত্ত করে। তারপর বৈদিক আর্যরা যখন সাংস্কৃতিক দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে উত্তর ভারতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করল, তখন তারা ধাক্কা খেল বাঙালী ও প্রাচ্যদেশের লোকদের কাছে। বহুদিন তাদের বিদেহ পর্যন্ত এসে অথর্ব হয়ে বসে থাকতে হয়েছিল। এই বাঙালী ও প্রাচ্য দেশের লোকদের শৌর্য বীর্যের কথা শুনেই দিগ্বিজয়ী গ্রীক বীর আলেকজাণ্ডার ফিরে গিয়েছিল বিপাশা নদীর পশ্চিম তীর থেকে। পরবর্তীকালে আর্যরা যখন দলে দলে বাঙলায় এল, তখন তাদের ভুলে যেতে হয়েছিল নিজেদের শ্রেষ্ঠ দেবতাদের (যথা ইন্দ্র, বরুণ ইত্যাদি), এবং তারা পূজো করতে আরম্ভ করেছিল বাঙলার দেবদেবীদের। তাদের নিয়েই রচিত হল পুরাণসমূহ। বৈদিক ধর্মের পরিবর্তে পৌরাণিক ধর্মেরই জয়জয়কার হল। এমন কি সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রেও এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটল। বাঙালী কাব্য-রচনায় যে নতুন রীতি উদ্ভাবন করল, তা ‘গৌড়ীয় রীতি’ নামে আখ্যাত হল। সেই রীতিতেই জয়দেব রচনা করলেন, তাঁর অমর গীতিকাব্য ‘গীতগোবিন্দ’।

    মুসলিম আমলে আরও যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটল। যেসব দেবদেবী ঝোপজঙ্গলে বা পর্বতকন্দরে অধিষ্ঠিত ছিলেন তাঁরা প্রতিষ্ঠা পেলেন হিন্দুসমাজে। বাঙালী নিজ প্রতিভা বিকশিত করল এক সমৃদ্ধশালী সাহিত্য রচনা করে—চর্যাগীতি, পদাবলী ও অনুবাদ সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য ও চৈতন্যের জীবন-চরিতে। বাঙালী সে প্রতিভা আরও বিকশিত করল নানারূপে স্মৃতিগ্রন্থ রচনায়। ভবদেব, জীমূত-বাহন, রঘুনন্দন প্রমুখেরা নতুন নতুন বিধানগ্রহ রচনা করলেন। তারপর ইংরেজ আমলে বাঙালী কর্মকার পঞ্চাননের সহায়তায় চার্লসে উইলকিনস নির্মাণ করল বাংলা হরফ। তার ফলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটল শিক্ষা ও সাহিত্য প্রসারের ক্ষেত্রে। এক নতুন শিক্ষিত সম্প্রদায়ের  সৃষ্টি হল, যারা উত্তর ভারতের স্কুল কলেজে নিযুক্ত হয়ে উত্তর ভারতকে শিক্ষিত করে তুলল। এই শিক্ষিত সমাজই নেতৃত্ব গ্রহণ করল স্বাধীনতা আন্দোলনের, যে আন্দোলনের পরিণতিতে ভারত থেকে ইংরেজের মহাপ্রস্থান ঘটল। বাঙালীর এই প্রতিভা দেখেই গোখলে উদাত্তকণ্ঠে বলেছিলেন— ‘হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস, টু ডে, ইণ্ডিয়া থিঙ্কস, টুমেরো।’

    কিন্তু আজ সেই প্রতিভাশালী বাঙালী জাতি জীবনের সকল ক্ষেত্রেই হটে যাচ্ছে। একটা প্রতিভাশালী জাতির আজ যে শোচনীয় অবনতি ঘটছে, তা সত্যিই খুব দুঃখের বিষয়। এর একমাত্র কারণ বাঙালী আজ আত্মকলহে প্রমত্ত হয়ে অগ্রগতির সুযোগ ও সুবিধা করে দিচ্ছে অপরকে। এ আত্মকলহ আজ এমন এক স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে যে পরপর পরস্পরকে গালিগালাজ দেওয়াটাই প্রতিভার একটা বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এক সময় বাঙালীর আত্মপ্রত্যয়ের অভাব ছিল না। বঙ্কিমের কথাই ধরা যাক। বঙ্কিম বলেছিলেন— সকলেরই বিশ্বাস বাঙালী চিরকাল দুর্বল, চিরকাল ভীরু, চিরকাল স্ত্রীস্বভাব, চিরকাল ঘুসি দেখিলেই পলাইয়া যায়। যে বলে চিরকাল বাঙালীর এই চরিত্র, চিরকাল দুর্বল, চিরকাল ভীরু, স্ত্রীস্বভাব, তাহার মাথায় বজ্রাঘাত হউক, তাহার কথা মিথ্যা। বাঙালী কি এখনও আত্মকলহের বলি হয়ে থাকবে? আত্মকলহ বিলোপ করে, সে আজ আত্মবিক্রম প্রকাশ করুক এটাই হোক আজকের বাঙালীর সাধনা। কবিগুরুর সঙ্গে সে বলে উঠুক— ‘উথলি যখন উঠেছে বাসনা / জগতে তখন কিসের ডর।’

    ———