রকমারী বঙ্কিম » রকমারী বঙ্কিম

পাতা তৈরিজানুয়ারি ২৮, ২০১৫; ১৩:০০
সম্পাদনাজানুয়ারি ২৪, ২০২১, ১৬:০৯
দৃষ্টিপাত
দ্বিতীয়াঙ্ক SCENE I সুবাদার-রাজা রাজা। আমার কি অপরাধ? কি জন্য দিল্লীশ্বর আমার উপর পীড়ন করিতে উদ্যত? সুবা। আপনি মুসলমানের দ্বেষক। বাদশাহ মুসলমানের ধর্ম্মরক্ষক। সুতরাং বাদশাহ- রাজা। আমি কিসের মুসলমানের দ্বেষক? আমার রাজ্যে হিন্দু মুসলমান তুল্য- সুবা। প্রতাপনগরে একটি মসজীদ নাই-মুসলমানে নমাজ করিতে পায় না। রাজা। আমি মসজীদ প্রস্তুত করিয়া দিব। ...

দ্বিতীয়াঙ্ক

SCENE I

সুবাদার-রাজা

রাজা। আমার কি অপরাধ? কি জন্য দিল্লীশ্বর আমার উপর পীড়ন করিতে উদ্যত?

সুবা। আপনি মুসলমানের দ্বেষক। বাদশাহ মুসলমানের ধর্ম্মরক্ষক। সুতরাং বাদশাহ-

রাজা। আমি কিসের মুসলমানের দ্বেষক? আমার রাজ্যে হিন্দু মুসলমান তুল্য-

সুবা। প্রতাপনগরে একটি মসজীদ নাই-মুসলমানে নমাজ করিতে পায় না।

রাজা। আমি মসজীদ প্রস্তুত করিয়া দিব।

সুবা। প্রতাপনগরে একটি কাজি নাই-মুসলমানের বিচার কি হিন্দুর কাছে হয়?

রাজা। আমি কাজি নিযুক্ত করিব।

সুবা। মহারাজ-আপনি যদি বাদশাহের এরূপ বশ্যতাপন্ন হন, তবে বাদশাহ কেন আপনাকে রাজ্যচ্যুত করিবেন? কিন্তু আসল কথা এখনও বাকি আছে- প্রতাপনগরে মুসলমানে জবাই করিতে পায় না-তার কি হইবে?

রাজা। গোরু ভিন্ন অন্য জবাইয়ে আপত্তি করিব না।

সুবা। কিন্তু গোরুই আসল কথা।

রাজা। হিন্দু হইয়া গোহত্যা করিতে দিব কি প্রকারে?

সুবা। তবে হিন্দুয়ানি ত্যাগ করুন।

রাজা। ধর্ম্মত্যাগ করিব? ইহকাল পরকাল খোয়াইব? এ কথাও কানে শুনিতে হইল।

সুবা। ইহকাল নষ্ট হইবে না। আপনি ইসলামের ধর্ম্ম গ্রহণ করিলে বরং ইহকালে সুখী হইবেন। রাজ্য বজায় থাকিবে এবং আরও বাড়াইয়া দিব। আর পরকালও যাইবে না। ইসলামই সত্য ধর্ম্ম-দেখুন কত বড় বড় হিন্দু এখন মুসলমান হইতেছে। তাহারা কি না বুঝিয়া ধর্ম্মত্যাগ করিতেছে? বরং আপনার যদি সন্দেহ থাকে, তবে আমি ভাল ভাল মোল্লামুফ্‌তি আপনার কাছে পাঠাইয়া দিতেছি। তাহাদের সঙ্গে বিচার করুন-বিচারে যদি ইসলাম সত্য ধর্ম্ম বলিয়া বোধ হয়, তবে গ্রহণ করিবেন ত?

রাজা। ইচ্ছা হয় মোল্লা মুফ্‌তি পাঠাইবেন। কিন্তু কিছু ফলোদয় সম্ভাবনা নাই। সম্প্রতি আমি যাহা নিবেদন করিলাম, অনুগ্রহ করিয়া বাদশাহের নিকট জানাইবেন। গোহত্যা ভিন্ন আর সকলেই আমি সম্মত-বার্ষিক কর দিতেও সম্মত। আজ আমি বিদায় হইব-যে হুকুম হয় অনুগ্রহ করিয়া জানাইবেন।

সুবা। কোথা যাইবেন?

রাজা। অনেক দিন আসিয়াছি, স্বদেশে যাইব।

সুবা। সে কি? আপনার শুভাগমনের সম্বাদ আমি দিল্লীতে এত্তেলা করিয়াছি। সেখান হইতে খেলওয়াত আসিবে-তাহা না গ্রহণ করিয়া কি যাওয়া হয়।

রাজা। বড় অনুগৃহীত হইতেছি কিন্তু আমার অবর্ত্তমানে রাজ্য বিশৃঙ্খল হইতেছে।

সুবা। নাচার-আপনাকে অবশ্য অপেক্ষা করিতে হইতেছে। আপনার ফৌজ সকল বিদায় দিন।

রাজা। সে কি আমাকে কয়েদ রাখিতে চাহেন?

সুবা। ও সব কথা কেন? তবে দিনকত আপনাকে এখানে থাকিতে হইবে। দিল্লীর হুকুম না আসিলে ছেড়ে দিতে পারিব না।

রাজা। (স্বগত) হায়! কলাবতী তুমি যা বলিয়াছিলে তাহাই হইল। (সুবাদারকে) যাহা হুকুম হয় তাহাই তামিল করিব।

সুবা। তছলীম।

[সুবাদার নিষ্ক্রান্ত]

রাজা। কয়েদই ত হইলাম। প্রমথ-প্রমথ

(প্রমথের প্রবেশ)

আমার আজকাল ফিরিয়া যাওয়া হইতেছে না, তুমি প্রতাপনগরে এই সম্বাদ লইয়া যাও।

প্রমথ। যাইব কি প্রকারে? সকল পথে পাহারা-আমাদের কয়েদ করিয়াছে।

রাজা। আমার শিপাহী সব কোথা?

প্রমথ। নবাবের লোকে তাহাদের হাতিয়ার কাড়িয়া লইয়াছে-তাহাদিগকে প্রতাপনগরে ফিরিয়া যাইবার হুকুম হইয়াছে।

রাজা। ভাল, তাহারাই গিয়া সম্বাদ দিবে।

প্রমথ। দিলেই বা কি হইবে।

SCENE II

কলাবতী-নিশা

কলা। আজ একুশ দিন হইল মহারাজ ঢাকায় গিয়াছেন, আজও কই কোন সম্বাদ ত পাইলাম না।

নিশা। হাঁ রাণীমা, রাজরাণীতেও কি এমনি কর্র্যে দিন গণে?

কলা। কই আমি দিন গণিলাম?

নিশা। কাঁদ কেন মা, আমি ত এমন কিছু বলি নাই।

কলা। নিশা, তুই একবার শহরের ভিতর একটা শিয়ানা লোক পাঠাইতে পারিস্-অবশ্য কেহ কোন সম্বাদ শুনিয়াছে, কেন না ঢাকায় ঢের লোক যায় আসে। আমি এত লোক পাঠাইলাম, কেহ ত ফিরিল না। বোধ হয়, মন্দ সম্বাদই আসিয়াছে-লোকে সাহস করিয়া আমার সাক্ষাতে বলিতে পারিতেছে না।

নিশা। আপনাকে ব্যস্ত দেখিয়া আমি আপনার বুদ্ধিতেই শহরে অনুসন্ধান করিতে লোক পাঠাইয়া দিলাম-কিন্তু-

কলা। কিন্তু কি?

নিশা। লোকে বলে যে মহারাজকে সুবাদার আটক করেছে-অমন কর কেন মা! এই জন্য ত বলি নাই। একটু শোও আমি বাতাস করি। উড়ো কথায় বিশ্বাস কি?

(কলার শয়ন)

কলা। বিশ্বাস সম্পূর্ণ। আমি আগেই বলিয়াছিলাম যে গেলে তাঁকে আটক করিবে। নিশি! এখন আমার দশা কি হইবে! (রোদন)

নিশা। কাঁদিলে কি হবে মা। আমাদের সকলেরই ত এক দশা হইবে। আমরাও নিরাশ্রয় হইলাম-এখন মুসলমানের হাতে জাতি মান প্রাণ সব যাবে।

কলা। কি বলিলি সবার এক দশা? তোদের যে রাজা মাত্র-আমার যে স্বামী। তুই কি জানিস স্বামী কি ধন!

নিশা। তা বটে। রাজ্য যায় তবু প্রাণটা থাকিলে আমরা বজায় থাকিব। ভাল মা, এক কাজ কর না কেন? রাজার কাছে কেন লোক পাঠাও না যে সুবাদারকে রাজ্য ছাড়িয়া দিয়া আসুন-আমরা না হয় তাঁকে গহনা পত্র বিক্রয় করিয়া খাওয়াইব। কাঁদ কেন মা এ কথায়?

কলা। তুই কেন আমায় অপমান করিস্? কি! আমার স্বামীকে আমি রাজ্যত্যাগ করিয়া প্রাণ বাঁচাইতে বলিব! নিশা-তোদের ভয় হইয়া থাকে তোরা চলিয়া যা-আমার স্বামী রাজা-তিনি রাজার কাজ করিবেন।-কিসের গোল ঐ?

[নেপথ্যে বহু লোক “জয় মা কলাবতীর জয়”]

আজিকার দিনে কে বলে কলাবতীর জয়?

(দিবার প্রবেশ)

দিবা। মহারাণী! নগরের সকল প্রজা আসিয়া রাজবাড়ী ঘেরিল।

কলা। কি হয়েছে?

দিবা। সকলে বলিতেছে ঢাকার সুবাদার রাজাকে কয়েদ করিয়াছে।

কলা। তার পর প্রজারা কি বলে। [নেপথ্যে “মহারাণী কলাবতীর জয়”] ওরা কি চায় দিবা?

দিবা। আপনি স্বকর্ণে শুনুন।

কলা। প্রজারা আমার পুত্র, আমার [নিকট] অবারিতদ্বার। প্রধানদিগকে আমার কাছে ডাকিয়া আন।

(দিবার প্রস্থান। কতিপয় নগরবাসীর সহিত পুনঃপ্রবেশ)

প্রজাবর্গ। জয় কলাবতীর জয়।

কলা। কি চাও বাবা তোমরা?

১ম প্রজা। মা, আমাদের রাজা কোথায়?

২য় প্রজা। মা, আমাদের রাজাকে নাকি দুষ্ট যবন কয়েদ করিয়াছে? মা, আমাদের বাহুতে কি বল নাই যে বাপের উদ্ধার করি?

-বঙ্কিম-কণিকা, পৃ,১- ২২।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান