রাইফেল, রোটি, আওরাত » দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ৩০, ২০২০; ২১:৪৬
সম্পাদনাঅক্টোবর ৩০, ২০২০, ২১:৪৬
দৃষ্টিপাত
পাক মুল্লুকে তরক্কির জন্য সুদীপ্তকে নাম লুকোতে হয়েছিল। এবং সেই রাতে বাঁচার জন্য লুকোতে হয়েছিল খাটের নীচে। কখনো খুব একজন সাহসী বলে সুনাম ছিল না সুদীপ্তর। তা হলেও জীবনে কখনো খাটের নিচে শুয়েছেন এমন কোন দ্বিতীয় উদাহরণ সুদীপ্তর জীবনে নেই। ভয়ের রাত কখনো কি তাঁর জীবনে আসে নি? সেই পঞ্চাশের ...

পাক মুল্লুকে তরক্কির জন্য সুদীপ্তকে নাম লুকোতে হয়েছিল। এবং সেই রাতে বাঁচার জন্য লুকোতে হয়েছিল খাটের নীচে। কখনো খুব একজন সাহসী বলে সুনাম ছিল না সুদীপ্তর। তা হলেও জীবনে কখনো খাটের নিচে শুয়েছেন এমন কোন দ্বিতীয় উদাহরণ সুদীপ্তর জীবনে নেই। ভয়ের রাত কখনো কি তাঁর জীবনে আসে নি? সেই পঞ্চাশের দাঙ্গায়? না। সেদিন তাঁদের পাড়া আক্রান্ত হলে কোন অন্ধকার কোণে লুকোবার কথা মনে হয়নি তো। বরং মনে পড়েছিল বন্ধুদের কথা। সেদিন তাই বন্ধু-গৃহের আশ্রয় প্রত্যাশায় পথে বেরিয়েছিলেন তাঁরা। এবং আশ্রয় পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার? এবারও সুদীপ্ত সেই কালো রাতে কোন বন্ধুর মুখ মনে করতে চেষ্টা করেছিলেন। কোন বন্ধুর উজ্জ্বল প্রীতি সেই রাতের ভয়ের মুখ ফ্যাকাশে করে দেবে—এমন একটা আশাকে লালন করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু কোনো আশা সেই রাতের ত্রিসীমানা ঘেঁসতে সাহস করে নি। কেউ আশা করেনি যে, ছাব্বিশে মার্চের সূর্যোদয় দেখবার জন্য এই রাতটুকু সে বেঁচে থাকবে। তবু অনেকে বেঁচে ছিল। এবং অনেকেই যে বেঁচে আছেন সেটা সুদীপ্তর কাছে পরম বিস্ময় বলে মনে হয়েছিল। অনেকে যারা মরেছিলেন তাঁরা যেন খুব স্বাভাবিক একটি কর্ম করেছেন। অতএব সকলেই তাঁদের সম্পর্কে একটা অদ্ভুত অসাড়তা অনুভব করেছিলেন। কিন্তু জীবিতদের নিয়ে বিস্ময়ের অন্ত ছিল না।

‘আপনি বেঁচে আছেন!’

‘ভাই আল্লাহ্ বাঁচিয়েছেন। আপনি?’

‘আমাদের বিল্ডিংয়ে পাঁচজন গেছেন। আমি যে কী করে বাঁচলাম আল্লাহ জানে।‘

সুদীপ্তর এখনো মনে হয়, কি করে তিনি যে বেঁচে আছেন তা তিনি জানেন না। আল্লাহ জানেন। তবে হাঁ, যাঁরা মরে গেছেন, তাঁরা ঠিকই গেছেন, ওটা কোনো সংবাদ নয়।

সংবাদ হয় কোন্‌টা? স্বাভাবিক ঘটনাধারার মধ্যে যেটা খাপ খায় না, যা হয় কিছুটা অস্বাভাবিক কিংবা সাধারণের গণ্ডিকে যা অতিক্রম করে তাকেই মানুষ গ্রহণ করে একটা সংবাদ বলে। কিন্তু সেই পঁচিশের রাত থেকে মৃত্যুটা কি কোনো সংবাদ? মৃত্যু এখন তো অতি সাধারণ অতি স্বাভাবিক আটপৌরে একটি ঘটনা মাত্র। অমন যে অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব বা অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মারা গেলেন, নিষ্ঠুরভাবে নিহত হলেন, অন্য সময় হলে তা খবরের কাগজের কতো বড়ো একটা খবর হত ভাবুন দেখি!

সুদীপ্ত পাশ ফিরে একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হতে চেষ্টা করলেন। চেষ্টা ব্যর্থ হল। একে একে কয়েকটি মুখ এসে দাঁড়াল সুদীপ্তর সামনে—তাঁর শিক্ষক এবং পরে সহকর্মী অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, তেইশ নম্বর বিল্ডিংয়ে তার নিকটতম প্রতিবেশী ড. ফজলুর রহমান, বন্ধু প্রতিম ড. মুকতাদির। ড. মুক্তাদিরের সংঙ্গে পরিচয় খুব দীর্ঘ দিনের নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাবে আড্ডা দিতে গিয়ে পরিচয়। ভারি সুন্দর একটি মন ছিল ভদ্রলোকের। এমন মানুষকেও মারে! কিন্তু কাকে মারাটাই বা ঠিক হয়েছে। ঐ ভাবে নৃশংস সৈনিকের হাতে পরম শত্রুর মৃত্যুও তো মানুষ কামনা করে না। ছী-ছি তারা কি মানুষ যারা ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেবকেও গুলি করে মারে।

সেই মহিলাকে ফিরোজ নাকি দেখেছেন কাল। ফিরোজ গিয়েছিলেন মেডিক্যাল কলেজে। তার দলের এক ভদ্রলোককে পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন। এবং সেই সঙ্গে দেখতে। কিন্তু বেশি কিছু দেখা হয়নি কাল। মেডিক্যাল কলেজ থেকে গিয়েছিলেন গুলিস্তান পর্যন্ত, অতঃপর ঐ পথেই ফিরে এসেছেন। পথের দুপাশে বহু মৃতদেহ তখনও ছিল। এবং সেই সকল মৃতদেহের পাশ মাড়িয়ে চলেছে জীবিতদের মিছিল। কোনমতে কপালের গুণে যারা বেঁচে গেছে সেই সকল জীবিত হতভাগ্যের দল। সেই জীবিতদের মধ্যেই একজন ছিল সেই শিশুটি। বয়স হবে বছর খানেক। তার কাহিনী কাউকে বলা যায়! সুদীপ্তর কাছে বলতে গিয়ে ফিরোজ তো কেঁদেই ফেলেছিলেন। একটা বড়ো গাছের বিশাল গুড়ি পড়েছিল রাস্তার পাশে—সম্ভবতঃ ব্যারিকেড সৃষ্টির জন্যই ওটার আমদানি হয়ে থাকবে। সেই গুড়ির আড়ালে হয়ত লুকিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন ভীত-সন্ত্রস্ত অসহায় রমণী। হয়ত ঘরে আগুন জ্বললে পথের বুকে নিরাপত্তা সন্ধান করেছিলেন। বাঁচাতে চেয়েছিলেন বুকের শিশুকে। ফিরোজ দেখলেন, মৃত জননীর স্তন চুষে তখনও বাঁচতে চাইছে সেই অবোধ অলৌকিকভাবে বেঁচে-থাকা শিশু। এ ঘটনা ফিরতি পথের। যাবার পথে দেখেছিলেন সে মহিলাকে। কোলের একমাত্র শিশুকে বুকে চেপে পাশে একটা সুটকেশ এক হাতে ধরে রিক্সায় যাচ্ছিলেন এক ভদ্রমহিলা। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেবের বিধবা পুত্রবধূ। চিরকুমার ড. দেবের পালিত পুত্রের স্ত্রী। কলি যুগের দেবতা দেখতে চাও? ড. দেবকে দেখ। একজন প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হিসাবে কত উপার্জন ছিল তার? যা ছিল তার এক দশমাংশও বোধ হয় নিজের জন্য তাঁর খরচ হত না। বাকিটা? বাকি টাকা ব্যয় হত দান-ধ্যানে, এবং পালিত পুত্রদের পেছনে। বহু দরিদ্র সন্তানকে তিনি পালন করেছেন—তারা কেবলি যে হিন্দুই এমন নয়, হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদটা কি আর এযুগে মানবার বিষয়? বিনয়দা, সুতপাদি, সুকান্ত কিংবা মন্দিরাকে কখনো কি বিশেষভাবে কোনো ধর্মের লোক বলে সুদীপ্তর মনে হয়েছে? ড. দেব বিশেষ কোনো ধর্মের লোক ছিলেন না। বোধ হয়, সব ধর্মেরই লোক ছিলেন তিনি। মনে প্রাণে যিনি দার্শনিক, তিনি বিশেষ একটা ধর্ম বিশ্বাসের দ্বারা আবদ্ধ হবেন—এটা হয় কখনো?

‘কী হে, ঘুম ভেঙ্গেছে?’

ফিরোজের সাড়া পাওয়া গেল। পাশের ঘরে সন্তানাদিসহ মহিলারা ছিলেন এবং এ ঘরে ছিলেন তারা দুই বন্ধু। ইচ্ছে ছিল, অনেক রাত অবধি দুই বন্ধুতে গল্প করবেন। কিন্তু গল্প জমে নি। গল্পের মেজাজ সুদীপ্তরও ছিল না। এবং সারা দিনের ক্লান্তিতে ফিরোজ অতি শীঘ্রই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। জাগলেন এখন। এবং জেগে উঠতেই কণ্ঠস্বর পাওয়া গেল তাঁর। সুদীপ্ত ইতিবাচক সাড়া দিয়ে পরে শুধালেন—

‘আচ্ছা, কাল তুমি যে ড. দেবের পুত্রবধূর কথা বলছিলে তুমি কি তাকে আগে থেকে চিনতে?’

‘না। আমি চিনতাম না। আমার গাড়িতে যে ভদ্রলোক ছিলেন, তিনিই চিনিয়ে দিলেন। তার এক বন্ধুর নাকি বোন। স্বামীর নাম মোহাম্মদ আলি কিংবা ঠিক ঐ ধরনের কিছু একটা হবে। শুনেছিলাম, এখন মনে আসছে না।‘

অর্থাৎ মুসলমান। ড. দেবের মুসলমান পুত্রকে তার সঙ্গে এক সারিতে দাড় করিয়ে হত্যা করেছে পাকিস্তানি সৈন্যেরা। দুটি লাশ পাশাপাশি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। আর দেখা গেছে মধুবাবুর লাশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রিয় মধুদা। সুদীপ্তও ছাত্র জীবনের কথা স্মরণ করলে সেখানে মধুদার একটি উজ্জ্বল স্মৃতিকে বুকের মধ্যে লালিত দেখতে পান। জীবনের কতো আনন্দের, কতো বিষন্নতার, কতো বিতর্কের স্মৃতি ঐ মধুদার ক্যান্টিন! সেই প্রিয় মধুদা। মধুদা, তোমাকে ওরা মারলে! কিন্তু কেন? পঁচিশের রাতে সুদীপ্তর বুকের মধ্যে লুকিয়েও যেন বেলা যথেষ্ট ভয় পাচ্ছিল। তখনি সেই কন্যার কণ্ঠে একটি প্রশ্ন। শুনেছিলেন সুদীপ্ত, মর্মভেদী প্রশ্ন—আব্বা, ওরা আমাদের মারবে কেন? কন্যা-কণ্ঠের সেই প্রশ্নই আবার যেন সুদীপ্ত শুনতে পেলেন মধুদার কথা মনে হতেই—ওরা মধুদাকে মারবে কেন? হ্যাঁ রে অবোধ কন্যা, উত্তর একটাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ওরা ধ্বংস করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকদের যা কিছু প্রিয় সবি ওরা শেষ করে দেবে। অন্ততঃ শেষ করতে চায়। মারতে চায়, ধ্বংস করতে চায়।

কেন করবে না শুনি! স্বাধীন চিন্তার নামে যতো সব ডেঁপোমি। ছেলে পড়াচ্ছ পড়াও। আমরা কি ভাবে শাসন করি, না করি তা নিয়ে তোমাদের ফাদারের কি? আমরা কোন্ দিক দিয়ে উড়োজাহাজ চালাই, কোন ঘাঁটি থেকে তেল নেই, সে আমরা বুঝব। সাহেবদের বৃটিশ ডেপুটি হাই কমিশনে গিয়ে ধন্না দেওয়া হল—মালদ্বীপ থেকে আমরা বিমানের জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারব না। কী আবদার! বলি, দেশের ভালো মন্দ চিন্তাটা কি তোমাদের? না, আমাদের? কি বললে? দেশের ভাল-মন্দ তোমরাও বুঝতে চাও?

ঐ রোগেই তো মরেছে বাঙালি। বাবা, দেশের ভালো-মন্দ পশ্চিমা জওয়ানদের হাতে ছেড়ে দাও। আর নিজেরা ঘাস-বিচালি খেয়ে ঘুমাও, দেশের উন্নতির জন্য খুব করে চা-পাট উৎপাদন কর, কিংবা ভদ্রলোক হলে দেশের সংহতি রক্ষার জন্য কাজ করে বা থিসীস লিখে তমঘা নাও। এ সব পছন্দ না হলে? তোমাদেরকে ওরা মারবে। মারাটা তখন হবে জায়েজ।

এই সহজ কথাটি পঁচিশে মার্চ পর্যন্ত অনেকেই জানতেন না।

মধুদা জানতেন না যে, ছাত্রদের প্রিয় হওয়া অপরাধের। শুধুই মধুদা কেন, পৃথিবীর কোন মানুষেরই তা জানার কথা নয়। মধুদার ঋণ আমরা কী করে শোধ করব! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই শুধু মধুদার কাছে ঋণী? আক্ষরিক অর্থে তাই! বহু ছাত্রই তার ক্যান্টিনের ঋণ শোধ করতে পারে নি। কেউ কেউ তার মধ্যে ইচ্ছে করেও বটে। সব ছাত্ৰই কি ভাল থাকে। কিন্তু মধুদা সব ছাত্রকেই ভাল জানতেন। ছাত্রদের তিনি কি দৃষ্টিতে দেখতেন?

তোমরা দেশকে বাঁচাবে, আর আমি তোমাদের বাঁচাব না?

হাঁ তা বাঁচাতেই তো হবে। ছেলেরা তাকে মধুদা বলে না! দাদা তো ছোট ভাইদের ভালোবাসবেই। ছোট ভাইদের ছোট-খাটো অপরাধ কি ধরলে চলে?

না যদি চলে তা হলে তুমিই অপরাধী।

অতএব মধুদাকে মারতে হবে। আর ড. দেবকে? তিনি পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাসী নন। অতএব তাকেও মারতে হবে বৈ কি!

ড. দেব যে পাকিস্তান বিরোধী ছিলেন এমন কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের মুখেই শুনেছেন। তিনি হচ্ছেন প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী ড. আব্দুল খালেক। ড. খালেককে অবশ্য একটু চেনা কঠিন, কিন্তু মি. মালেকের ভাই বললে সকলেই তাকে চিনবে। স্ত্রীর অর্থে বিলেত গিয়েছিলেন। সেখানে থেকে পি-এইচ. ডি. হয়ে এসে একটা হলের প্রভোষ্ট হয়েছেন, বেনামীতে দু’খানা দোকান চালাচ্ছেন নিউ মার্কেটে, এবং সমাজ সেবার মানসে সদস্য হয়েছেন রোটারি ক্লাবের। সুদীপ্তর সঙ্গে জানাশোনা মোটামুটি হলেও সকলের সঙ্গে তিনি বড়ো একটা মেশেন না। তাই তার নাম যত পরিচিত, তিনি নিজে তত পরিচিত নন। কিন্তু মিঃ মালেক এদিক থেকে একজন প্রথিতযশা ব্যক্তি। পাস করেছেন পলিটিক্স নিয়ে। কিন্তু পলিটিক্স করেন না। ও সম্পর্কে পড়াশুনাও করেন না। লেখেন কবিতা। নিয়মিত ক্লাবে আসেন। এদিক থেকে তিনি ছোট ভাই খালেকের ঠিক বিপরীত। এবং প্রচুর আড্ডা জমাতে পারেন। আর বিস্তর মিথ্যা বলা ভদ্রলোকের অভ্যাস। ক্লাবে কোন দিন মালেকের পাশে বসলে সুদীপ্ত সেদিন সহস্র গ্যালন মিথ্যার ধারাজলে স্নান করে ঘরে ফেরেন। মিছে কথা ভদ্রলোক বলতেও পারেন ভারি সুন্দর করে এবং প্রায় ক্ষেত্রেই সে মিছে কথা নিরীহ গোছের হয় না। অন্যের প্রচণ্ড ক্ষতি হতে পারে এমন মিছে কথাও তিনি অবলীলাক্রমে বলে যেতে পারেন। চিন্তার সূত্র ছিড়ে দিয়ে ফিরোজের কণ্ঠস্বর এল—

‘আমার কি মনে হয় জান, এই যে কাণ্ডটা এহিয়া করল, এক হিসাবে এতে আমাদের লাভই হবে।‘

‘তা কিন্তু আমি তো দেখছি, তোমার লোকসান। আমরা পাঁচজন এসে চেপেছি তোমার ঘাড়ে। একি সোজা কথা।‘

‘মোটেই সোজা কথা নয়। ঘাড় ব্যথা হয়ে গেছে। তবে মনে রেখো, এহিয়ার ঘাড়ে যে বোঝা এবার আমরা চাপাব তাতে ঐ সব ব্যথা-বেদনা কিছু নয়, ঘাড়টাই ভেঙ্গে যাবে।‘

‘ঐ কাজটা করো না ভাই, অনেকে এতিম হয়ে যাবে।‘

‘তুমি দালালদের কথা ভাবছ তো। না, তাদেরকে এতিম করে দুঃখ আর দেব না। এতিম হওয়ার আগেই তাদেরকে খতম করে দেব।‘

মালেক-খালেক ভ্রাতৃদ্বয়ও এই দালালদের পর্যায়ে পড়ে। বিশেষ করে মালেক সাহেব এ ব্যাপারে তুলনাহীন। বয়সেও বেশ প্রবীণ। কিন্তু ছেলে-মানুষীতে এখনও অদ্বিতীয়। ঐটুকুই আকৃষ্ট করে সুদীপ্তদের।

এই ভ্রাতৃদ্বয়ের কথা মনে করেই সুদীপ্ত এখানে বললেন,

‘কয়েক জন দালালের কথা মনে এলে আমার কি ইচ্ছে করে জান!’

‘কী? দেশত্যাগ ইচ্ছে করে? না প্রাণ ত্যাগ’

‘আমার ইচ্ছে করে অন্ততঃ এক ঘন্টার জন্য ইয়াহিয়ার একটি বর্বর সৈনিক হয়ে যাই।‘

‘এই তো ভুল করলে অধ্যাপক। এহিয়ার বর্বর সৈনিকরা কখনো দালাল মারতে পারে না। তারা ভালো মানুষ মারে।‘

তাই তো। কথা তো ফিরোজ ঠিকই বলেছে। পশু কি কখনো পশু মারে? পশুর ধর্ম মানুষ মারা। মানুষ মারে পশুকে। হাঁ, তা হলে তাকে একটি মানুষই হতে হবে। শক্ত সমর্থ মানুষ। কিন্তু পঁচিশের রাতে কি ওরা কেবলি ভাল মানুষ মেরেছে। প্রায় তাই-ই। কেবল ভুল করে দু একটা সেম সাইড হয়ে গেছে।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান