রাইফেল, রোটি, আওরাত » পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পাতা তৈরিনভেম্বর ১, ২০২০; ২০:৩৬
সম্পাদনানভেম্বর ১, ২০২০, ২০:৩৬
দৃষ্টিপাত
বিছানা ছেড়ে কিছুতেই আজ উঠতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু ফিরোজ তো উঠে গেছেন। শূন্য ঘরে সুদীপ্ত একটি শপথ নিতে চাইলেন মনে মনে। এইসব যা ঘটে গেল তা ভেবে কিছুতেই মন খারাপ হতে দেওয়া হবে না। ভেবে কী লাভ! হাঁ, কাজ করতে হবে। দেশের জন্য এখন কতো কাজ করার আছে। কিন্তু ...

বিছানা ছেড়ে কিছুতেই আজ উঠতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু ফিরোজ তো উঠে গেছেন। শূন্য ঘরে সুদীপ্ত একটি শপথ নিতে চাইলেন মনে মনে। এইসব যা ঘটে গেল তা ভেবে কিছুতেই মন খারাপ হতে দেওয়া হবে না। ভেবে কী লাভ! হাঁ, কাজ করতে হবে। দেশের জন্য এখন কতো কাজ করার আছে। কিন্তু তিনি কী করবেন! তাই তো, কি যে করা যায়! জানলা দিয়ে কী সুন্দর রোদ এসে পড়েছে মেঝেয়! কতোকাল জানলা দিয়ে এমন রোদ আসেনি। তার পরিবর্তে এসেছে গুলি-গোলা আর ধোঁয়ার কুণ্ডলি। শ্বাসরুদ্ধকর সেই প্রভাতে জীবনকে তবু পরিত্যাজ্য মনে হয়নি তো। ঠিক কী যে মনে হচ্ছিল তার কোন নাম নেই। তবে তাঁর সমগ্র সত্তাকে যা আকঁড়ে ধরেছিল তার নাম আর যাই হোক নেতিবাচক কিছু নয়। কিছুতেই এ কথা একবারও তার মনে হয় নি যে, মাত্র কয়েক সেকেণ্ডের ব্যবধানে তাঁর মৃত্যু প্রতীক্ষা করছে। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও মানুষ মৃত্যুকে অবিশ্বাস করে। পঁচিশের রাতে—না তো, রাত তখন কত? প্রায় দুটার কাছাকাছি, অতএব ছাব্বিশে মার্চ তখন—এই ছাব্বিশে মার্চের রাতে ওরা যখন ঘরে ঢুকল তখন কি মনে হয়েছিল, আমি সেই সুদীপ্ত মাত্র। কয়েক সেকেণ্ড পরে আর জীবনে নেই, আছি মৃত্যুর রাজ্যে! কী আশ্চর্য। সৈনিকগুলো সামান্য মাথা হেঁট করে খাটের নিচে আর তাকালো না। তাকাতো যদি হয়ত মরে যেতাম। হয়ত মরে যেতাম—সুদীপ্ত ভাবলেন। ভাবনার মধ্যে মানুষ অলৌকিক রূপ কথার দেশেও বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু বিশ্বাসের বেলায়? পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের বাইরে অনেকে পদক্ষেপে ইচ্ছুক হবে না। আমি মরে যাচ্ছি—কথাটা মানুষ ভাবতে পারে, কিন্তু কখনো বিশ্বাস করতে পারে না। সৈনিকগুলো যখন একেবারে ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়াল। আবার ঐ কথা? না, ঐ সব আর ভাবব না। বলতে বলতেই বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন সুদীপ্ত।

সকালের চায়ের টেবিলে একজন নতুন মানুষকে দেখা গেল—হাসিম সেখ, সম্পর্কে ফিরোজের ভাগনে। বয়সে ফিরোজের চেয়ে সামান্য ছোট। ভদ্রলোকের মা হচ্ছেন গ্রাম সুবাদে ফিরোজের বোন—বাল্যকালে বাপ মারা গেছেন। ফলে তিনি লেখাপাড়া বেশিদূর চালাতে পারেন নি। আই. এ. পাস করে পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছিলেন। সেই পঁচিশের রাতে ছিলেন রাজারবাগে। পাকিস্তানিদের সাথে সেই রাতের অসম-সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। এখন সেনাবাহিনীর রোষ দৃষ্টি এড়িয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

কিন্তু এতো সকালে কেউ আসে কি ভাবে?—প্রশ্নটা মনে উদিত হতেই সুদীপ্ত ঘড়ির দিকে তাকালেন। তাই তো, নটা যে বাজে! হাঁ, তা ন’টা হতে পারে বৈ কি? ঘুম কি তাঁর এখন ভেঙ্গেছে! আটটার দিকে কারফিউ উঠে গেছে। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভদ্রলোক পথে রেরিয়েছিলেন।

‘পথে বেরিয়ে, মামা, সে কী বিপদ! মুসলিম লীগের হরমুজ মিয়ার সাথে দেখা।‘

সেই হরমুজ মিয়া, যে বর্তমানে লীগ-নেতার নির্দেশে সেনাবাহিনীকে আওয়ামী লীগের লোকদের এবং হিন্দুদের বাড়ি-ঘর ও দোকান চিনিয়ে বেড়াচ্ছে। এসব কামে সে খুব যোগ্য লোক। হাসিম সেখকেও সে চিনেছিল ঠিকই। সামনে এসে দাঁত বের করে বলেছিল–

‘আরে হাসিম সেখ মালুম হতেছে। রাজারবাগ তন আসা হল কখন?’

হাসিম সেখ কিঞ্চিৎ ঘাবড়ে গেলেই হয়েছিল আর কি। তিনি ঘাবড়ান নি। সঙ্গে সঙ্গেই উর্দু ভাষায় মুখ খিস্তি করে গাল দিয়ে উঠেছিলেন। উর্দু ভাষায় ভারি সুন্দর মুখ খিস্তি করা যায়।

‘এ শালে শুয়ার কা বাচ্চা, উল্লুকা পাঠঠে, কমবখত মরদুদ, তু হাসিম সেখ কাহ্‌তা। কিসকো। মায় আতাউল্লাহ খান হু। খোদ কানপুর সে আনেওয়ালা হ্যায় হাসিম। তেরা বাপকা মাফিক বেঈমান আওর গাদ্দার নেহি।‘

হাসিম সেখ তখন একজন বিহারীর ছদ্মবেশে ছিলেন। তার উপর এই অপরূপ উর্দু ভাষার চাবুক। হরমুজ মিয়া সোজা কুকুর বনে গিয়েছিল। বিস্তর লেজ নেড়েছিল এবং আতাউল্লাহ খানের তোয়াজ করেছিল।

চায়ের পেয়ালার সাথে হাসিম সেখের পরিবেশিত সেই হরমুজ-বৃত্তান্ত সকলেই উপভোগ করলেন। হাসিম সেখ প্রশংসা পেলেন সকলের! ভাগ্যিস তিনি উর্দুটা বলতে কইতে পারেন ভালো। এবং ভালো উপস্থিত-বুদ্ধি রাখেন।

বুদ্ধিমান হাসিম সেখ আর একটা প্রসঙ্গ তুললেন, ফিরোজকে বললেন—

‘আপনারও এখানে আর থাকা চলবে না মামা। জমাতে ইসলাম ও মুসলিম লীগের সাথে সেনাবাহিনীর শলা-পরামর্শ চলছে শুনলাম। এটাকে ওরা দ্বিতীয় ইন্দোনেশিয়া বানাতে চায়।‘

‘কি রকম?’

‘চার শ্রেণীর মানুষ ওরা দেশ থেকে নির্মূল করবে—বুদ্ধিজীবী, আওয়ামী লীগার, কমিউনিস্ট ও হিন্দু।‘

চমৎকার প্ল্যান। আওয়ামী লীগ খতম হলে অন্যান্য বামপন্থী দলগুলিকে কমিউনিস্ট, তার মানেই নাস্তিক কাফের আখ্যা দিয়েই দুদিনেই ঠাণ্ডা করে দেওয়া যাবে। বুদ্ধিজীবী সাবাড় হলে বেহুদা স্বাধীন চিন্তার বালাই দেশে থাকবে না। আর দেশকে হিন্দুশূন্য করতে পারলে তাদের সহায় সম্পত্তি পূর্ব বাংলার পেয়ারা দালাল দোস্তদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে তাদের আনুগত্যকে পাকাপোক্ত করে নেওয়া যাবে। কী মজা! এক ঢিলে মরবে কতগুলো পাখি।

কিন্তু পাখি মারা কি অতই সহজ? ফিরোজ তার চিন্তাকে একটু অন্যদিকে সরিয়ে নিলেন। অন্য কোণ থেকে গোটা ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখ না? দেশের মধ্যে বুদ্ধিজীবী আছেন কতজন? সঠিক হিসাব কারো জানা নেই। তবে দেশের শতকরা আশি ভাগ জনগোষ্ঠীই যে আওয়ামী লীগের সমর্থক সে তো নির্বাচনেই বুঝা গেছে, তার সঙ্গে এক কোটি হিন্দু ও কমিউনিস্টগণ যুক্ত হলে সংখ্যাটা কত দাঁড়ায়? ফিরোজ তাই বললেন–

‘তা হলে তো পঞ্চাশটা ইন্দোনেশিয়া করেও কুল পাবে না।‘

‘তা ছাড়াও,’—সুদীপ্ত বললেন, ‘ইন্দোনেশিয়ার মতো এখানে চারপাশে সমুদ্র তো নেই। অতএব চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে বসে বসে মারবার সুযোগ তারা পাবে কি করে?’

কথাটা বলতে বলতেই সুদীপ্ত একবার চট করে কয়েক দিন আগের একটি সন্ধ্যায় ঘুরে এলেন–বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাবের এক সন্ধ্যা। তার সহকর্মী বন্ধু আহমেদুল হক সেদিন এই ইন্দোনেশিয়া প্রসঙ্গেই কথা বলছিলেন। যে বিদেশী রাষ্ট্রের গোপন হস্তক্ষেপের ফলে ইন্দোনেশিয়াতে অমন নৃশংস কাণ্ড ঘটে গেছে বাংলাদেশেও তাদেরকে বর্তমানে অত্যন্ত সক্রিয় মনে হচ্ছে। এ নিয়েই আশঙ্কা প্রকাশ পেয়েছিলো সেদিন।

‘ওরা এতো নির্মম পশু যে, আমাদের দেশের এক কোটি লোকের জীবনের বিনিময়েও ওদের যদি কিছু উপকার হয় ওরা তাকে স্বাগত জানাতে কুণ্ঠিত হবে না।‘

কী চায় ওরা? চায় এখানে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের জন্য খানিক জায়গা। সেটা দিলে বাংলার লাভ না ক্ষতি সে বিচার করে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা আর বুদ্ধিজীবীরা। অতএব সেই রাজনীতিবিদ আর বুদ্ধিজীবীদের খতম কর।—ঠিক এই ধরণের কোন প্ল্যান পঁচিশে মার্চের পশ্চাতে থাকতেও পারে। সুদীপ্তর এখন মনে হল ঠিকই বলেছিলেন বন্ধুবর আহমেদুল হক।–

‘বামপন্থী চিন্তাধারা তো চিরদিনই ঐ সামরিক আঁতাতের বিরোধী। ওদের শেষ ভরসা ছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু শেখ সাহেবকে ওরা চিনতে ভুল করেছিল। ওদের ফাঁদে, দেখা যাচ্ছে, তিনি পা দিলেন না। অতএব আওয়ামী লীগকে খতম করার জন্য ওরা এবার দেখবেন ইয়াহিয়াকে লেলিয়ে দেবে। এবং সেই সঙ্গে উৎখাত করে ছাড়বে বামপন্থী দলগুলিকেও।

এইসব রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ সুদীপ্ত ভালো বোঝেনা না। অতএব চুপচাপ ছিলেন তিনি। কিন্তু সকলেই চুপ ছিলেন না। পক্ষে বিপক্ষে নানা কথা উঠেছিল। হক সাহেবকে সমর্থন করে যা বলা হয়েছিল তার মধ্যে যুক্তি ছিল–

‘সে সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। সে জন্য বামপন্থী দলগুলিও মনে হয় বর্তমানে শেখ সাহেবের সঙ্গে এক প্ল্যাটফর্মে আসতে চাইছেন। বিপদটা তারা টের পেয়েছেন।‘

‘কিন্তু বামপন্থীরা যে শেখ সাহেবকে বরাবর সমর্থন করে যাবেন সে আশা যেন করবেন না। বর্তমানের সঙ্কট কাটিয়ে উঠলেই দেখবেন ওরা শেখ সাহেবের পেছনে লাগবে।‘

‘এইভাবে নানা জনে নানা কথা বলেছিলেন। আলোচনা সুদীর্ঘ হয়েছিল। ক্লাব-প্রাঙ্গনে সায়ংকালের আড্ডায় এমন কতো আলোচনাই তো হয়। কোনোটা তার মনে থাকে, কোনটা থাকে না। কিন্তু ঐ কথাটা সুদীপ্তর মনে থেকে গেছে।

এখন সব দিক থেকে সুবিধা হয় এখানে জামাতে ইসলামকে ক্ষমতায় বসাতে পারলে। ওদেরও লাভ, পাকিস্তানেরও লাভ। গোটা বাঙালি জাতিকে ধর্মের আফিম দিয়ে বুদ করে রেখে ওরা সবাই ওপার থেকে বসে বসে মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে ভেঙ্গে খেতে পারবে।

এইসব কথা এখন হাসিমের কথার সঙ্গে মনে মনে মেলাচ্ছিলেন সুদীপ্ত। কিন্তু ফিরোজ ভাবছিলেন হরমুজ মিয়ার কথা। হরমুজ মিয়া তাহলে এখন এই কামে নেমেছে! হরমুজ মিয়াদের কথা ভাবতেই ফিরোজ বলে উঠলেন–

‘জানো, আমাদের প্রধান শত্রু পাকিস্তানিরা তত নয়, যত হচ্ছে এই দেশীয় দালালরা। এদেরকে আগে খতম করা দরকার। এই শালাদের জন্যই বাঁদীর বাচ্চা আইবা (আউয়ুব শব্দটা ফিরোজের মুখে আইবা হয়ে গেছে) গত দশ বছর আমাদের উপর গোলামীর জোয়াল চাপিয়ে রাখতে পেরেছে।‘

‘কী দুঃসাহস! গোটা বাঙালি জাতিকে পশ্চিম পাকিস্তানের…’

মীনাক্ষী কখন ঘরে ঢুকেছিলেন, এবং এদের কথা শুনছিলেন। পুরুষ জাতটাই কেমন যেন! এই দুঃসময়ে একটু তোমরা আল্লাহকে ডাক। তা না, কে বাঁদীর বাচ্চা, কে কী—সে সব আলোচনায় তোমাদের কী দরকার! ঐ করে কি তোমরা বিপদে পার পাবে! তিনি সুদীপ্তর কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলে উঠলেন–

‘আপনারা কেবলই ঐ ঘুরে ফিরে একই কথা আলোচনা করছেন কেন বলুন তো?’

সকলেই প্রায় সচকিত হলেন—’তাই তো! ঘুরে ফিরে ঐ একটি বিষয়কে নিয়েই আমরা সকলে যে চিটে গুড়ে পিপড়ের মতো জড়িয়ে আছি দেখি। কিন্তু একটি পিপড়ের সেখান থেকে সরে আসার ক্ষমতা কতখানি?’ সুদীপ্ত বললেন—

‘শরীরে ক্ষত থাকলে হাত যে বারে বারে সেখানেই যেতে চায় ভাবী।‘

এবং তাতে হাতের অপরাধ হয় না। কোনো অপরাধ নেই, খোলা গায়ে চলতি হাওয়ার স্পর্শ পেতে পেতে একটু যদি ঘুম আসে। কিন্তু হাওয়া বিষাক্ত হলে খোলা গায়ে থাকা বিপজ্জনক। সারা শরীর বিষে দগ্ধ হতে পারে। শহরের যা অবস্থা তাতে যে-কোন সময়ে যে-কোন বিষয় আলোচনার অপরাধে তাঁদের দগ্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বৈ কি! মীনাক্ষী ভাবী ঠিকই বলেছেন—আমাদের আলোচনা কিছুটা সংযত হওয়া উচিত।

কিন্তু কিসের সংযম। সারা দেশে এখন বাঙালি জাতিকে অমোঘ ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তনের পালা চলছে। এ কি তোমার-আমার ব্যক্তি জীবনের কোন পছন্দ অপছন্দ নিয়ে কথা! যুক্তির সিংহদ্বারে এখনি যদি আমরা যথেষ্ট সক্রিয় হতে না পারি, আমাদের ভবিষ্যৎ-অস্তিত্বের চোহারাটা তা হলে কেমন হবে? কেউ আমাদের ক্ষমা করবে?

মা ভৈ। কোন ভীতি-সঙ্কোচে আমরা যেন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে না পড়ি। আমাদের এখন মন্ত্র একটিই—আমরা নিজের কথা ভাবব না, আমাদের লক্ষ্য হবে দেশ। দেশের জন্য সংগ্রাম।

খাওয়া শেষ হলে হাসিম সেখ স্বদেশের জন্য তাঁদের সংগ্রামের কাহিনী শোনালেন। রাজারবাগ এলাকার পঁচিশ মার্চের সংগ্রাম। সাধারণ সেপাইরা সেনাবাহিনীর সাথে কী যুদ্ধে পারে? হাসিমরাও শেষ পর্যন্ত পারেন নি। কিন্তু বিনা বাধায় পাকিস্তানিরা সারা ঢাকা শহরকে লণ্ড-ভণ্ড করে দেবে এমন কলঙ্ক থেকে তারা জাতিকে রক্ষা করেছেন। এবং তাঁদেরকে রক্ষা করেছেন আশে পাশের অধিবাসীরা। আশ্রয়-আহার তো দিয়েছেনই, ছদ্মবেশ ধারণের বস্ত্র-খণ্ডটুকুও দান করেছেন। তাতে বিপদ ছিল না? যদি পাকস্তানিরা টের পেত? হাঁ, মরতে হত। কিন্তু মৃত্যুকে কেউ ভয় করছে নাকি? ছেলে যদি মৃত্যু বয়ে নিয়ে ঘরে ফেরে মা কি সেই মৃত্যু ভয়ে ছেলেকে দুয়ার থেকে ফিরিয়ে দেন?

সেই অষ্টাদশী জননী হাসিম সেখকে ফিরিয়ে দেন নি। ট্যাঙ্ক থেকে কামানের মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণে অতিষ্ঠ হয়েই তাদেরকে ভাবতে হয়েছিল–চল, সরে পড়ি। সরে পড়াই তো বুদ্ধিমানের কাজ তখন। ভয়-ভীতির কথা নয়। মরে লাভ কি? তখনই মরব যখন ওদের কাউকে মারার ক্ষমতা হাতে থাকবে। ওই শালাদের মতো কামান চালাতে শিখে তখন সামনে আসব। এবং দেখব, শালাদের যুদ্ধের কতো সখ। এখন এখানে থাকলে সেরেফ মরতে হবে। ভেবে চিন্তে ঠিক সময়েই তাঁরা পালিয়েছিলেন। কিন্তু ছদ্মবেশ দরকার তো। পুলিশের পোশাকে তো মাথা বাঁচিয়ে পালানো যাবে না। তাছাড়া ভোর হয়ে আসছে, দিনের বেলাটা কোথাও লুকিয়ে কাটাতে হয়। অতএব যে যেখানে পেয়েছিলেন আশেপাশের বাড়িতে ঢুকে পড়েছিলেন। বেশি কিছু ভাবনা-চিন্তার সময় কারো ছিল না। সামনে যেখানে সুবিধা পাও ঢুকে পড়। হাসিম একটা গলির মধ্যে একটি একতলা বাড়ির দরজায় কড়া নেড়েছিলেন খুব জোরে জোরে। কারো সাড়া নেই। অনেকক্ষণ পর সাড়া মিলল। জানলার একটি কপাট একটু ফাঁক হল। একটি রমণী কণ্ঠের প্রশ্ন শোনা গেল–

‘কে?’

‘আমি রাজারবাগ পুলিশের লোক মা, একটু আশ্রয় দেবেন?’

আশ্রয় দেওয়া মোমেনার পক্ষে ভারি শক্ত ছিল। ঘরে তিনি একা রমণী—একটি শিশু কন্যা বুকে নিয়ে পড়ে আছেন। স্বামী কাজ করেন সংবাদপত্র অফিসে। রাত দশটার দিকে ঘরে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ফেরেন নি। সেই এক দুশ্চিন্তা। তাঁর উপর এই কেয়ামত-রাত্রি। কে কোন্ উদ্দেশ্য নিয়ে আসে তা কি বলা যায়! কিন্তু লোকটি তাকে মা বলেছে।

‘পাকিস্তানিরা আমাদের মেরে ফেলবে মা। বাঁচান।‘

মোমেনা আর থাকতে পারেন নি। দোর খুলে দিয়েছিলেন। আশ্রয় পেয়েছিলেন রাজারবাগ পুলিশের হাসিম সেখ। বাড়িতে এই রমণী শুধু একা!

হাসিম সঙ্কুচিত হয়েছিলেন একা একজন যুবতী স্ত্রীলোকের বাড়িতে আর কোনো বেগানা পুরুষের স্থান হবে কি করে? না, তা হওয়া উচিত? তার স্বামী কিংবা কোনো আত্মীয় জানতে পারলে? হাসিম তাই চলে আসতে চেয়েছিলেন—

‘আপনার বোধহয় অসুবিধা হবে মা। আমি না হয় যাই।‘

‘মা ডেকেছো না। তার পরও যদি অসুবিধার কথা ভাবতে পেরে থাক তবে তোমার যাওয়াই তো উচিত বাছা।‘

তাইতো। বাড়িতে ছেলে থাকবে, তাতে মায়ের আবার সুবিধা-অসুবিধা কী? ঐ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলাই তো লজ্জার কথা। হাসিম একটু লজ্জা পেয়ে গেলেন।

মেয়েদের বয়সটাই কি সব? ভদ্রমহিলা তার চেয়ে কয়েক বছরের ছোটই হয়ত হবেন। কী স্বাচ্ছন্দে তবু মায়ের আসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিঞ্চিৎ বিস্ময়ে এবং প্রবল ভক্তিতে অভিভূত হয়েছিলেন হাসিম সেখ। হাসিম তার জীবনের কাহিনী এই নতুন মাকে শুনিয়েছিলেন। এবং তাঁকে গ্রামের বাড়িতে তাঁর জন্মদাত্রী জননীর কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। ঢাকা শহরের এই অবস্থায় কারো কি আর এখানে থাকা উচিত? তা উচিত নয়। এবং স্বামীকে ফেলে মোমেনাও নিরাপত্তা-সন্ধানে সরে যাওয়া উচিত বিবেচনা করেন নি। মোমেনা বার বার বলে দিয়েছেন–

‘তুমি বাছা The people অফিসে তোমার আব্বার খোঁজ নিয়ে আমাকে জানিয়ে যাবে। কোথায় যে গেলেন তিনি! আল্লাহ্!’

ফিরোজ শুধালেন, ‘তারপর? খোঁজ পেয়েছ সে ভদ্রলোকের।‘

‘পেয়েছি মামা! তিনি বেঁচে নেই! কিন্তু কী করে এখন সে খবর নিয়ে মায়ের কাছে যাব?’

দেখা গেল বলতে বলতে হাসিমের চোখে জল এসেছে। তিনি জামার প্রান্ত দিয়ে চোখ মুছে নিলেন। অনেকক্ষণ কোনো কথা জোগালো না কারো মুখে। হাসিমই একটু পরে বললেন—

‘আমরা যদি ঐ রাজারবাগেই হানাদারদের খতম করতে পারতাম তা হলে মাকে এই দুঃখ থেকে বাঁচাতে পারতাম।‘

তা হয়ত পারতেন। কিন্তু মা তো ঐ একটিই নয়। এবং সবার উপরে স্বদেশ-মাতা, হ্যাঁ, সবাই মিলে এ মাকে বাঁচাতে হবে। ভিক্ষা করে নয়, যুদ্ধ করে। তারপর কর্মে একনিষ্ঠ হয়ে। সেটা সব বয়সেই হওয়া যায়। কিন্তু যুদ্ধ! হায়, যুদ্ধের বয়স কি আছে! অধ্যাপক সুদীপ্ত শাহিন তাঁর বয়সের হিসেব করলেন। হাঁ, চল্লিশ পেরিয়ে গেছে। তবু তো রক্তে অস্ত্রধারণের চঞ্চলতা সুদীপ্ত অনুভব করলেন। মেঘের তমসা কেটে সূর্যের দীপ্তি পেল তাঁর চিন্তার কিশলয়গুলি। মনে হল জীবনের যদি কোন মূল্য থাকেই তবে মৃত্যুরও মূল্য আছে। তা না হলে দুটোই সমান অর্থহীন। বেঁচে থাকার জন্য মৃত্যুকে এড়াতে চাইলে সে মৃত্যু একদিন নিঃশব্দে তোমার জীবনের বিপুল ব্যর্থতাকেই শুধু ঘোষণা করতে আসবে। কিন্তু কথা কি শুধু ঐটুকুই! এতো মৃত্যুর মুখে বাঁচতে চাওয়াটাই তো একটা প্রহসন। এ প্রহসন অসহ্য। মরবার ভার অন্যকে দিয়ে নিজে নেব কেবল বেঁচে থাকার দায়িত্ব এমন ভাঁড়ামি থেকে নিজের পবিত্র আত্মাকে যেন রক্ষা করতে পারি। একটা প্রতিজ্ঞা সুদীপ্তর মধ্যে প্রার্থনার পবিত্রতা পেল।

ফিরোজ তখন শুধাচ্ছিলেন, ‘তোমরা অনুমান কতক্ষণ লড়েছিলে?’

‘হবে তিন চার ঘণ্টা। প্রথমে ওরা কয়েকজন এসেছিল সাধারণ অস্ত্র নিয়ে। আমরা তখন তাদের প্রায় সকলকে সাবাড় করে ফেলি। বাকি কয়েকজন প্রাণভয়ে পালিয়ে যায়। পরে যখন আসে ট্যাঙ্ক ও কামান নিয়ে তখনি তো শুধু হার মেনে পালাতে হল আমাদের। খালি রাইফেল হাতে ট্যাঙ্ক ও কামানের সামনে আমরা দাঁড়াই কি করে বলুন।‘

‘তা ঠিক। সেজন্য দেশবাসী ওদেরকে কাপুরুষ বলবে না। বরং চিরদিন ওদের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।‘ ফিরোজ শুধালেন–

‘এখন তুমি করবে কী? এইভাবে লুকিয়ে বাঁচবে কতকাল?’

না। এখানে তিনি লুকোতে আসেন নি। এসেছেন কিছু টাকার জন্য। শেখ সাহেব বলেছিলেন, আটাশ তারিখে মাইনে পাওয়া যাবে। কিন্তু তার তো বিপর্যয় ঘটে গেল। বিধবা মা পথ চেয়ে আছেন—ছেলে টাকা পাঠাবে।…হ নিশ্চয়ই তা সে পাঠাবে।

‘আপনার কাছে মামা, কিছু টাকার জন্য এসেছি। মায়ের হাতে সেই টাকাটা দিয়ে আমি তারপর দেখব, কোনখানে গেলে ঐ পাকিস্তানিদের সাথে যুদ্ধ করার জো পাওয়া যাবে।‘

‘এর পরেও তোমার যুদ্ধ করার সখ আছে বাবা?’

‘কেন থাকবে না? আমি ভয় পেয়েছি মনে করেন? আমাদের কত ভাই বন্ধুকে ওরা মেরে ফেলল, মা-বোনের ইজ্জত নিল–আমরা তার শোধ নেব না? খোদার কসম, আমার মায়ের কসম আমাদের রক্তের কসম, আমরা এর শোধ নেবই নেব।‘

বাহ্ ভারি সুন্দর তো। কত সরল অথচ সঠিকভাবেই এরা সমস্যাটাকে বুঝেছেন! আর তা সমাধানের জন্য মানোবল কত দৃঢ়! কিন্তু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী হলে? ইতিমধ্যেই সে ধরনের বুদ্ধিজীবীদের কিছু পরিচয় সুদীপ্ত পেয়েছেন। কী ভয়াবহ মানসিকতা।

আমাদের ভেবে দেখতে হবে, কেন এই অবস্থার সৃষ্টি হল? কোনো একটা অবস্থার সৃষ্টি হয় কেন? কে এর জন্য দায়ী?…

যতো শয়তান ঐ কমিউনিস্টরা। ওদের প্ররোচনাতে লোক সব ক্ষেপে গেল। তা না হলে ওদের সাথে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে একটা সমঝোতায় পৌঁছানো যেতো।…

শেখ সাহেব তাঁর দাবি কিছু ছেড়ে দিয়ে একটা আপোস করলে আখেরে ভালো হত। যা ভুল তিনি করেছেন।

ইত্যাদি কত মন্তব্যই তো গত দুদিনে সুদীপ্তর কানে গেছে। আর কানে আঙুল দিয়ে পালাতে ইচ্ছে করেছে। সেই পণ্ডিতস্মন্যদের পাশে এই হাসিম সেখকে এখন তো বন্ধু বলে বুকে জড়িয়ে ধরতে হয়। আমাদের ভাই-বন্ধুদের ওরা মেরেছে, মা-বোনের ইজ্জত নিয়েছে, আমরা তার শোধ নেব। হ্যাঁ, ঠিক এইটেই তো এখনকার উপযুক্ত কথা।

শেখ সাহেব কেন আপোস করলেন না?

এ প্রশ্নকে নিয়ে মনে মনে নেড়ে-চেড়ে এক ধরণের বিলাসিতাই চলে। সেরেফ বিলাসিতা। কেননা ঐ প্রশ্নের বাস্তব ভিত্তি একেবারে নড়বড়ে। প্রথমত শেখ সাহেবের সঙ্গে ইয়াহিয়ার কি আলোচনা হয়েছে কেউ তোমরা তা জান না। কেবল তোমরা ইয়াহিয়ার মুখে ঝাল খেয়ে বলছ—শেখ সাহেব একেবারে কঠিনভাবে গোঁ ধরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানকে অসম্ভব করে তুলেছিলেন।

শেখ সাহেব বড়োই অনমনীয় হয়েছিলেন? কথাটা যদি মেনে নিই তবু তো প্রশ্ন থাকে। গত তেইশ-চব্বিশ বছরে নমনীয় হয়ে থেকে বাংলাদেশের কী লাভটা হয়েছে শুনি! যথেষ্ট আপোস করা গেছে, যথেষ্ট সমঝোতার মনোভাব দেখানো হয়েছে—তার পরিবর্তে তোমরা কী পেয়েছ? পেয়েছ বিরামহীন শোষণ চালু রাখার উপযোগী একটা শাসন-কাঠামো।

শেখ সাহেব কেন আপস করলেন না?–মনে মনে এই প্রশ্ন তুলে এক ধরনের বুদ্ধিজীবী এখন তড়পাচ্ছেন। আর হাসিম সেখ কর্তব্যে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। এই ভেবে—কেন আমাদের মা-বোনের সর্বনাশ করবে ওরা? খোদার কসম, আমার মায়ের কসম, আমাদের রক্তের কসম, এর প্রতিশোধ নেব।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান