রাইফেল, রোটি, আওরাত » একাদশ পরিচ্ছেদ

পাতা তৈরিনভেম্বর ৪, ২০২০; ১৮:৫১
সম্পাদনানভেম্বর ৪, ২০২০, ১৮:৫১
দৃষ্টিপাত
শিল্পী আমনের বৃত্তান্ত সকলকে শোনালেন সুদীপ্ত। কিন্তু আশ্চর্য, কেউই তো আমনের জন্য দুঃখিত খুব বলে মনে হল না। বরং সকলেই শিউরে উঠলেন সুদীপ্তর জন্য। সুদীপ্তর সম্ভাব্য পরিণতি ভেবেই উদ্বেগ প্রকাশ করলেন সকলে। ‘উহ্ খুব একটা বাঁচা বেঁচেছ। আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছে।‘ ‘ভাগ্যিস, তিনি তোমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন। নইলে কী যে ...

শিল্পী আমনের বৃত্তান্ত সকলকে শোনালেন সুদীপ্ত। কিন্তু আশ্চর্য, কেউই তো আমনের জন্য দুঃখিত খুব বলে মনে হল না। বরং সকলেই শিউরে উঠলেন সুদীপ্তর জন্য। সুদীপ্তর সম্ভাব্য পরিণতি ভেবেই উদ্বেগ প্রকাশ করলেন সকলে।

‘উহ্ খুব একটা বাঁচা বেঁচেছ। আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছে।‘

‘ভাগ্যিস, তিনি তোমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন। নইলে কী যে হত! আল্লাহ!’

সকলের কথাই সুদীপ্ত শুনলেন। কিন্তু ভাবলেন আমনের কথা। অনেকক্ষণ করো সঙ্গে কথা না বলে আমনের কথা ভেবে সময় কাটালেন—সুদীপ্তর বন্ধু ফিরোজ একবার চেয়ার টেনে পাশে বসলেন। কিন্তু অনেকক্ষণ বসে এবং কয়েকটি কথা বলেও সুদীপ্তর মনের সাড়া পেলেন না। অবশ্যই ফিরোজের কথার উত্তরে সুদীপ্ত মূক ছিলেন না। কথার উত্তরে কথা দিয়ে গিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু সেইটেই কি সব?

‘তুমি যে কখন বেরিয়ে গেলে, একটু অপেক্ষা করলে ফিরে এসে আমিও তোমার সঙ্গে যেতাম।‘

‘না, ভেবে দেখলাম, বাজার থেকে তোমার ফিরতে কত দেরি হয়, তাই—’

সুদীপ্ত বাক্য অসমাপ্ত রাখলেন। কিছুক্ষণ নীরবতা পোহানোর পর একটা প্রসঙ্গ তুললেন ফিরোজ–

‘স্বাধীন বাংলা বেতারের কথা শুনেছ?’

‘কৈ, না তো।‘

সুদীপ্তর কী হয়েছে আজ! হাঁ, অনেক কিছুই হয়েছে। তবু স্বাধীন বাংলা বেতারের সংবাদ শুনে বলার কথা কি শুধু ঐটুকু? আর কোনো কৌতূহল প্রকাশ পাবে না। এতখানি ফিরোজ আশা করেন নি। সুদীপ্ত তাঁর বন্ধু। সে তো আজকের কথা নয়। কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্সে এক সঙ্গে পড়েছেন তাঁরা এক সঙ্গে তখন কবিতা লিখে মাসিক সওগাতে ছাপাতেন। সেই কবিতা লেখার সূত্রেই তাদের দুজনের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়েছে। কিন্তু আজ আর ফিরোজ কবিতা লেখেন না। কবিতা ছেড়ে এখন ব্যবসা ধরেছেন এবং রাজনীতি। সুদীপ্তর ধারণা ফিরোজ কবিতা ভালই লেখে, এবং নিয়মিত লেখা উচিত। কিন্তু ফিরোজের ধারণা, চল্লিশ বছর অবধি কবিতা লিখেও যখন কবি-খ্যাতি বিশেষ হয় নি, তখন আর তা হবার সম্ভাবনাও নেই। মেনে নেওয়া ভালো, কবিতার দেশ বাংলায় যতোখানি ক্ষমতা থাকলে একজনের কবিতা লেখা উচিত ততখানি ক্ষমতা আমার নেই। অতএব কবিতা লেখার চেষ্টা করে অকারণ সময় ও কাগজের অপব্যয় করে কী লাভ? কোনো লাভ নেই, তবে কবিতা পাঠের লোভটা এখনো পুরো মাত্রায় আছে। ফিরোজ নিয়মিত কবিতা পড়েন। এবং কখনো বলেন না—কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি।

ফিরোজের পৈত্রিক নিবাস ঢাকা জেলাতে হলেও বাল্য থেকে যৌবনের উন্মেষ ও তার পরেও কিছুকাল কাটিয়েছেন কলকাতায়। কলকাতার বিরহ তাঁকেও পোহাতে হয়। ঐ একটা বিষয় আছে সেটা পশ্চিম পাকিস্তানিরা বোঝে না! শিক্ষিত বাঙালির একটা বৃহৎ অংশই একদা কলকাতার সঙ্গে গাঁথা পড়েছিলেন—সেই কর্নওয়ালিসের আমল থেকে। বাঙালি কলকাতামুখি হয়েছে। কলকাতার সঙ্গে তার মেল–বন্ধন সুখের কি দুঃখের সে হিসেব মেলাতে বসা আজ হয়ত অনর্থক নাও হতে পারে, তবে সে ইচ্ছেটা সব সময় মানুষের থাকে না। ফিরোজের একবারও ইচ্ছে করে না হায়াত খান লেনের সেই বাড়িটার মধ্যে দুঃখের খণ্ড-মুহূর্তগুলিকে গেঁথে সাজাতে। কলকাতার সৌখিন আলো-হাওয়া সে বাড়িটাকে পছন্দ করে নি। তারা সারাক্ষণ সে বাড়ির দুয়োর-জানলা এড়িয়ে চলত। কিন্তু ফিরোজের মনের জগৎ একটা আছে না। যেখানেও আলো-হাওয়া বিস্তর। তাঁর মনের সেই আলো-হাওয়ারা আজো সেই হায়াত খান লেনের বাড়িটাকে ঘিরে চির অভিসারিকা। কলকাতাকে কি ভোলা। যায়? এখনো কোন তারা ভরা রাতের নির্জন ছাদে চিত হয়ে শুয়ে অতীত সম্ভোগের মধুর মুহূর্তে মনে পড়ে—কলকাতা ঝরে এক ফোঁটা মধু অসীমের শতদলে। কথাগুলোকে সুর দিয়ে গাইতে ইচ্ছে করে। এবং গান পারেন না বলে আফসোস হয়। সেই কলকাতা।

ভাষা আন্দোলনের পরের বছর ছোট ভাইকে কলকাতা পড়তে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁর এক মুসলিম লীগের আত্মীয় তখন তাতে আপত্তি তুলেছিলেন এই বলে–

‘কলকাতায় যা পড়বে তা এই ঢাকাতেও সে পড়তে পারে। যে ডিগ্রী কলকাতা দেবে তা এখন ঢাকাতেও পাওয়া যায়। অকারণে তবে কলকাতা-মুখি হও কেন?’

‘এই জন্য যে, ঢাকায় লেখা-পড়া করে একটা ডিগ্রীই শুধু পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু শিক্ষিত হওয়া যায় না। এখানে ডিগ্রীধারী অশিক্ষিত লোকে দেশ ছেয়ে যাচ্ছে দেখছ না? দেশের মধ্যে কেবল শিক্ষিত হচ্ছে সেই কটি লোক যারা বিদেশ যেতে পারছে।‘

মতটা একান্তই ফিরোজের। এবং কিছুকাল আগে পর্যন্তও ফিরোজের মধ্যে এ বিশ্বাসের কোনো ব্যত্যয় লক্ষ্য করা যায় নি। তবু সাম্প্রতিক কালে ঢাকা শহরের গায়ে কিছু কিছু আন্তর্জাতিকতার ছাপ পড়তে শুরু করলে তার সেই বিশ্বাসও একটু একটু করে ফিকে হয়ে আসছে। তা হলেও এখনো তার মনে কলকাতার স্মৃতি কেমন একটা সুখানুভূতির উজ্জীবন ঘটায়!

বাঙালির এই অনুভূতিটাকে ওরা চেনে না। চট করে ভুল বোঝে। ফজলুল হককেও ভুল বুঝেছিল ওরা। পশ্চিম পাকিস্তানিদের পক্ষে ওটাই স্বাভাবিক। ফিরোজ ভাবেন! অন্যের মনকে বুঝতে গেলে নিজেরও একটা মন লাগে না? ধর, যাদের মন নেই সেই পশুদের কথা। পশুদের শ্রেষ্ঠ সম্বলই হচ্ছে নখর। আর প্রবৃত্তি দুটি—ক্ষুধা ও রিরংসা। কথাগুলি ইদানিং গভীর করে চেপে ধরেছে ফিরোজকে। দেশের দুই অংশ—পূর্ব ও পশ্চিম। মধ্যে হাজার হাজার মাইলের। ব্যবধানটা কি কেবলি ভৌগোলিক? পশ্চিম বঙ্গের সঙ্গে আমাদের নৈকট্য কেবলি ভৌগোলিক তো নয়। তবু পশ্চিম বাংলা বিদেশ। এবং চোখে দেখা সত্য। মনের সত্য হতে গেলে যে উপাদান লাগে তার উপস্থিতি কই ঠাহর করা তো যায় না। চিন্তাটা দীর্ঘদিন ফিরোজের হৃদয় মথিত করেছে। পরে এক সময় তাকে উদ্বুদ্ধ করেছে বাস্তব কর্তব্যবোধে। অন্যায় অবিচারকে পিটিয়ে দূর করার কর্তব্যে নামতে হয়েছে অগত্যা।

ফিরোজ সেইদিন ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন সঙ্গত কারণেই। মানুষ কি শালা রাষ্ট্র নামক যন্ত্রটার কাঁচামাল? মনে মনে মুখ খিস্তি করে কাকে গাল দিয়েছিলেন তিনি জানেন না। তবে খুবই বিষণ্ণ ও অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েছিলেন। রাষ্ট্রের ভূমিকা হবে বিশ্বস্ত ভৃত্যের, কিছুটা বন্ধুরও। কিন্তু প্রভুর ভূমিকা কিছুতেই নয়। এমন কি সে প্রভু খুব ভালো হলেও না।

কিন্তু একটি ব্যতিক্রম আছে। ফিরোজের এক বন্ধু রসিকতাচ্ছলে তর্ক তুলেছিলেন, আয়ুব খান নিজেকে প্রভু নয়, বন্ধুবলে জাহির করেছিলেন। অতএব তোমার…

বন্ধুকে বক্তব্য শেষ করতে না দিয়ে ফিরোজ বলে উঠেছিলেন—

‘এইটে হচ্ছে চোরের লক্ষণ। ঠাকুর ঘরে কে? কলা খাইনি। তোমাদের আয়ুবের অবস্থা হয়েছিল তাই।‘

সেইদিন এমনি রাজনৈতিক বিতর্কে অনেকক্ষণ অতিবাহিত করেছিলেন ফিরোজ। সেই প্রথম, কিন্তু শেষ নয়। বরং তিনি তারপর থেকে আরো বেশি করে রাজনীতি সচেতন হয়েছেন। চিরদিন এমনটা অবশ্যই ছিলেন না। কবিতা গান আর বাংলার আকাশ ও প্রকৃতি—এই ছিল তাঁর বাঁচার অবলম্বন। ধানমণ্ডির ছোট বাড়িটা পৈতৃক। এবং ঐ বাড়িটাই। সরকারী চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ঐ বাড়িটাই তার আব্বা করতে পেরেছিলেন ছেলে-মেয়েদের জন্য। তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এবং ফিরোজের একমাত্র ভাইটি পাকিস্তান সরকারের বিদেশী দূতাবাসে চাকরি নিয়ে বর্তমানে নাইজেরিয়াতে অবস্থান করেন। অতএব এই পৈতৃক বাড়িটা বর্তমানে একা ফিরোজের দখলে। মা তো আগেই গেছেন, আব্বা গেছেন বছর দুই হল। বন্ধ্যা স্ত্রী এবং সরকারী প্রচার দপ্তরে একটি ছোট চাকরি নিয়ে বেশ ছিলেন এতোকাল। সুখের সংসার।

সুখের সংসার বৈ কি! আর কি চাই জীবনে। হাঁ, আরো চাই। বই চাই। ভালো কবিতার বই। বিদেশী কবিতার বইয়ে ষোল আনা সুখ হয় না। কবিতার স্বাদ মাতৃভাষাতেই সম্ভব—একান্তভাবে ফিরোজের কথা এটি। হয়তো আরো অনেকের কথা। কিন্তু ফিরোজ বলেন—

‘বিদেশের কবিতা মাত্রই আমাকে অনুবাদে বুঝতে হয়। কিন্তু কবিতার অনুবাদ হয় না।‘

সুদীপ্ত এ যুক্তি অগ্রাহ্য করতে পারেন নি। তিনি ইংরেজির অধ্যাপক হলেও ইংরেজি কবিতা সব সময় বুঝেছেন মনে মনে মাতৃভাষায় অনুবাদ করে। ভাগ্যিস বাংলা তার মাতৃভাষা। তাই অন্য ভাষায় কবিতা তবু কিছুটা বুঝা যায়। কিন্তু তার মাতৃভাষা পাঞ্জাবি হলে? নিশ্চয়ই কোন পাঞ্জাবি কখনো শেলি কীটস কিংবা রবীন্দ্রনাথের কবিতা বোঝে না। তা বুঝলে কি এমন করে মানুষ মেরে বেড়াতে পারে। আমেরিকানরা করেনি মাই-লাই কাণ্ড? কিংবা, বৃটিশরা জালিয়ানওয়ালাবাগ? না, কথা তা নয়। যাদের মাতৃভাষা দুর্বল তারা তাদের চেয়ে উন্নত ভাষার কবিতা মোটামুটি বুঝবে না। কিন্তু এও ঠিক যে, একটা একটা জাতির সব মানুষই কবিতা রসিক হয় না। তাই উন্নত জাতির মধ্যেও বর্বর থাকে। এবং সেই বর্বরতার বিরুদ্ধে আপত্তি সভ্য জাতি হলে সে নিজেই তোলে। মাই-লাই-এর বিরুদ্ধে প্রথম কথা বলেছেন একজন আমেরিকানই। ওয়ারেন হেষ্টিংসের অপকীর্তির সমালোচনা বৃটিশরাই করেছিল। পাঞ্জাবিরা হলে করত না। মানে, করতে ইচ্ছে করত না এমন নয়। তা করতে হলে যে মন লাগে সেইটেই তাদের নেই। অনেকেরই মন থাকে না। হাঁ, থাকে শুধু ক্ষুধা ও রিরংসা।

এহেন পাঞ্জাবিদের কবলে বাঙালি জাতি?—জিজ্ঞাসা তীব্র হয়েছিল ফিরোজের মনে। এবং রাজনীতির ইচ্ছে জেগেছিল। আর্টের চর্চা ভালো। কিন্তু ভালোটাই কি সব সময় সংসারে চলে? অনেক ভেবে এক সময় তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং ব্যবসা শুরু করেছিলেন এবং রাজনীতি। ভদ্রলোক খুব একটা ঝুঁকি নিয়েছিলেন সন্দেহ নেই। তবু জিতেছিলেন। সে ইতিহাস অনেক গভীর, এবং কিছুটা অপকীর্তিরও। বেশ কিছু অপকীর্তি শিখেছিলেন ফিরোজ। তা নইলে টাকা হয় না। টাকা না হলে অধমদের সঙ্গে রাজনীতি চলে না! তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন। না বুঝে তো উপায় ছিল না। কি নিয়ে বাঁচবেন! দেশ নিজের না হলে কোনো মতেই বাঁচা যায় না।

‘দেশটাকে আগে নিজের কর, তারপর হবে শিল্পসাহিত্যের চর্চা।‘

দেশ নিজের নয়? না। কথাটা বন্ধু ঠিক বুঝেননি। ফিরোজ তাঁকে বোঝালেন—

‘পাঞ্জাবিদের পঞ্চনদের স্বার্থে কাশ্মীর দরকার। অতএব ভারতের সাথে বিবোধ কর। সে বিরোধে পূর্ব বাংলা উচ্ছন্নে যায় যাক। দেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতা বাঙালির হাতে থাকলে এমন অপূর্ব যুক্তিমালার সৃষ্টিই হত না।‘

‘তোমার সাথে তর্ক নেই,’ বন্ধু বললেন—কথা হচ্ছে, সব কাজ সকলে পারে কি না।

‘সাহিত্যিক সব পারে।‘

ইচ্ছে করলেই পারে। গ্যেটে ও রবীন্দ্রনাথ কত কাজ পেরেছিলেন সে হিসেব রাখ? বন্ধুকে বুঝিয়েছিলেন ফিরোজ। তিনজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। সাহিত্যিকের নাম উল্লেখ করে ফিরোজ দেখিয়ে দিয়েছিলেন—যুদ্ধ বা রাজনীতি কোনটাতেই সাহিত্যিকের রুচি ও পারদর্শিতা কারো চেয়ে কম হতে পারে না। তা ছাড়া যদি বল, ঐ সবে নামলে সাহিত্য-শিল্পের চর্চায় বিঘ্ন ঘটবে, আমি সেই অবস্থাটা মেনে নিতে রাজি আছি।

‘সুকুমার চিত্তবৃত্তির হানি ঘটবে? আমার মতো ক্ষুদে সাহিত্যিকের সুকুমার চিত্তবৃত্তির সমূলে ধংস হয়ে গেলেও জাতির কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু আমি যদি দুশমনের উপর একটা গুলি ছুঁড়তে পারি তাতে দেশের অনেক লাভ।‘

‘তুমি গুলিও ছুঁড়বে নাকি!’

‘তেমন দিন এলে ছুঁড়তে হবে বৈ কি।‘

কিন্তু তেমন দিন যতদিন না আসছে ততদিন করবেন কী? রাজনীতি ও ব্যবসা। রাজনীতিতে নামবেন কদিন থেকেই কথাটা নিয়ে মনে মনে নাড়াচাড়া করছিলেন। এমন সময়ই চিঠিটা এল। কোন প্রচণ্ড চিঠি নয়। কিন্তু ফিরোজর ক্ষোভটা প্রচণ্ডই হয়েছিল। ব্যাপরাটা ঘটেছিল একখানা বই নিয়ে।

কবি সত্যব্রত সেন ফিরোজর বন্ধু। পঞ্চাশের দশকে কবিতা লিখে কলকাতায় খ্যাতি লাভ করেছিলেন। এবং এ কালের প্রথা অনুসারে উঠতি ছোকরাদের কাছে ষাটের দশকে এসে সম্পূর্ণ সেকেলে প্রমাণিত হয়েছেন। তবু ভয়ে ভয়ে দ্বিতীয় কাব্য গ্রন্থ বের করে বন্ধু ফিরোজকে এক কপি উপহার পাঠিয়েছেন! কলকাতার কবি ঢাকার বন্ধুকে বই পাঠাবে—এটা নিঃসন্দেহে পাকিস্তানকে বানচাল করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র। নাকি অন্য কিছু ভেবেছিল পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ। দেড় পৃষ্ঠা ব্যাপি টাইপ করা একখানা চিঠি এসেছিল। পাকিস্তানি কাস্টমস্ বিভাগ থেকে লেখা চিঠিতে ফিরোজের কাছে জানতে চাওয়া হয়ছে–কোন অধিকার বলে মহীউদ্দিন ফিরোজ ভারত রাষ্ট্র থেকে বই আমদানী করেছেন? এ সম্পর্কে তাঁর কোন লাইসেন্স আছে কি না? থাকলে সেই লাইসেন্স তিনি কবে থেকে পেয়েছেন? ইত্যাদি।

বই হাতে পান নি, চিঠি হাতে চুপ করে কিছুক্ষণ বসে থাকলেন। মনে মনে হাসবেন? নাকি গাল দেবেন? এলাহাবাদ থেকে লাহোরে কেউ উর্দু বই পাঠালে কি এমন চিঠি আসত? নিঃসন্দেহে আসত না। যতো আক্রোশ বাংলা বইয়ের উপর। বিশেষ করে কলকাতার বাংলা বই। কলকাতার বাংলা বইয়ে কি ওলা ওঠার বীজ থাকে? নাকি ওগুলো সব বিছুতির পাতা? আমরা তোমাদের শরীরে ঘষে দেব বলে ভয় করে? সেরেফ ওটা হারামীপানা। হারামী রাসকেলরা বাঙালিদের সকলকে খোট্টা বানাতে চায়। মনে মনে সারাদিন গাল দিয়েও গায়ের জ্বালা যেন জুড়োতে চায় না। কিন্তু সব জ্বালাই তবু জুড়োয়। বিছের কামড়ও এক সময় ঠাণ্ডা হয়ে আসে। ফিরোজও এক সময় ঠাণ্ডা হলেন। এবং তখনি চিন্তাটা সচ্ছ হল। রাজনীতি ক্ষেত্রে বাঙালির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত না হলে এই অন্যায়ের অবসান হবে না। সেইদিন থেকেই ফিরোজ সক্রিয় রাজনীতিতে নেমেছেন। নামার চিন্তাটা অবশ্য করেছিলেন কয়েক বছর আগে থেকেই।

গত নির্বাচনে ফিরোজ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ এবার বাঙালি শোষণের অবসান দেখাতে চায়। ভালো মানুষ দেখলেই অমানুষদের জিব লক লক করে ওঠে। এবার ওঠাচ্ছি। পাকিস্তানের দু’অংশের মধ্যে হাজার মাইলেরও বেশি ব্যবধান—অতএব দু অংশকেই হতে হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কোন অংশকেই অন্য অংশের উপর নির্ভরশীল করা চলবে না।

কিন্তু একটা ভালো মানুষের যুক্তি। এ যুক্তি মানতে হলে তো ভালো মানুষ হতে হবে। কিন্তু ভালো মানুষ কি ইচ্ছে করলেই হওয়া যায়? রক্তের মধ্যে তার বীজ থাকতে হবে না! এই গোড়ার কথাতেই ভুল করেছিল আওয়ামী লীগ। কি আশ্চর্য। শিশুর মতো তোমরা বিশ্বাস করলে আলাপ আলোচনার দ্বার খুলে রাখলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

‘কচু হবে। এহিয়া তোমাদের কলা দেখাবে।‘

ইয়াহিয়ার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলোচনা চলাকালেই মন্তব্য করেছিলেন ফিরোজ। বঙ্গবন্ধু শেখ সাহেব একজন খাঁটি বাঙালি। তাই সরল। এবং সরলভাবেই প্রতারিত হচ্ছেন। ফিরোজ মনে করেন। কিন্তু সকলে এ কথা মনে করেন না। তাঁদের মতে—

‘নিজের বেকুবীর জন্য নিজেই প্রতারিত হবেন ইয়াহিয়া। এবং ধ্বংস করবেন সারা পাকিস্তানকে।‘

সারা পাকিস্তানের মানুষকে কি পরিমাণ প্রতারণা তিনি দিয়েছেন একদিন ইতিহাস সে কথা বলবে। পঁচিশে মার্চের বিকেল পর্যন্ত কথাবার্তা কোন্ পর্যায়ে ছিল? বাইরের লোক সে কথা জানে না। ইয়াহিয়ার ইচ্ছাতেই সে কথা জানাতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু আওয়ামী লীগের অন্দর মহলের লোক হয়ে ফিরোজ তো সব জানেন। তার জানা ছিল, ঐদিন সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া ভাষণ দেবেন। কিন্তু তার পরিবর্তে লেলিয়ে দিলেন সেনাবাহিনী।

ইয়াহিয়ার ভাষণে অবশ্যই আশাপ্রদ কিছু থাকবে না, ফিরোজ জানতেন। এবং জানতেন, কিছুকাল একটা রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে দেশকে হাবুডুবু খেতেই হবে। কিন্তু সেই সময়টা? এবং তারপর? সেই সময় আমাদের কর্তব্য কি হবে? এবং তারপরেই বা দেশের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

পরের কথা পরে ভাবা যাবে, আপাতত চল ইয়াহিয়া কি বলেন শোনা যাক। বন্ধুর কথায় রাজী হয়েছিলেন ফিরোজ। এবং সেই সন্ধ্যায় সকলে তাস নিয়ে বসেছিলেন—সামনে রেডিও। কিন্তু রেডিও বলে না কেন যে, আজ রাত—টার সময় প্রেসিডেন্ট দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন! সকলেই যখন প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণের জন্যে উদগ্রীব তখনি এল খবরটা। খবর পাওয়া গেল–

‘ইয়াহিয়া সেনাবাহিনীকে শহর দখলের আদেশ দিয়েছেন।‘

আওয়ামী লীগের একজন স্বেচ্ছাসেবক খবরটা এনেছিল। শুনেই হাতের তাস খসে পড়ল ফিরোজের। এই প্রথম খুব ভালো তাস পেয়েছিলেন। টেক্কা—সাহেব-বিবিসহ ডায়মণ্ডের সাতখানা, এ ছাড়া বিভিন্ন রঙের আরো দুই টেক্কা এক সাহেব ও তিন বিবি। এমন চমৎকার তাস সচরাচর হয় না। ভারি উৎফুল্ল হয়েছিলেন ফিরোজ। কিন্তু পরমুহূর্তেই সব উৎসাহ আনন্দ নিভে গিয়েছিল। সেনাবাহিনীকে শহর দখলের আদেশ দেওয়া হয়েছে?

‘দখলের আদেশ? কেন? শহর কি তা হলে বেদখলে ছিল এতকাল? শত্রু কবলিত শহরে ইয়াহিয়া তাহলে এলেন কি করে? আর সেখানে একদিন দুদিন নয়, প্রায় দুসপ্তাহ তিনি কাটালেন বহাল তবিয়তে। কি করে সম্ভব হল শুনি?’

ঐটাই বাঙালিদের দোষ। চট করে যুক্তির কোটরে ঢুকে প্রশ্ন তুলে ধরতে চায়। কিন্তু ঐ সব প্রশ্ন-ট্রশ্ন চলবে না।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান