রায়নন্দিনী » রায়নন্দিনী

পাতা তৈরিঅক্টোবর ২৩, ২০২০; ২৩:৫৯
সম্পাদনাঅক্টোবর ২৪, ২০২০, ০৪:২৫
দৃষ্টিপাত

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী ‘রায় নন্দিনী’ উপন্যাসের মূল কাহিনী ইতিহাস থেকে সংগ্রহ করেছেন। এ কাহিনী হচ্ছে বার ভূইয়ার নেতা ঈসা খাঁ মসনদে আলী ও শ্রীপুরের রাজা কেদার রায়ের কন্যা স্বর্ণ-ময়ীর প্রেম ও মিলনের কাহিনী। ইতিহাসে যদিও স্বর্ণময়ীকে চাঁদ রায়ের কন্যা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তথাপি স্বর্ণময়ী যে ঐতিহাসিক চরিত্র সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। প্রকৃত প্রস্তাবে, ইতিহাস থেকে উপাদান নিলেও সৈয়দ শিরাজী আসলে রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাসই রচনা করতে চেয়েছেন। তবে একটা বিষয় স্মরণ রাখতেই হবে যে, বঙ্কিম-ভূদেব এক সময় মুসলমান নারীদেরকে ঘর থেকে বের করে হিন্দু পুরুষদের সঙ্গে প্রেমলীলায় যেভাবে মত্ত করেছেন, তারই প্রতিক্রিয়া সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী এ উপন্যাসে রচনা করেছেন।

কাহিনীর শুরুতেই লেখক একটা চমক সৃষ্টি করেছেন। স্বর্ণময়ীকে আমরা এ সময়ে দেখি পালকি যোগে সাদুল্লাপুর মাতামহের বাড়ি যেতে। পথিমধ্যে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের লোকজন কর্তৃক অপহৃত হয়। ঐ সময় ঈশা খাঁ বিশেষ কাজে মুরাদপুরের পথে। সেখানে কোন এক শিবমন্দির থেকে কোলাহল ভেসে আসে, ঈশা খাঁ শিবমন্দিরে প্রবেশ করে সেখানে আটক স্বর্ণময়ীকে উদ্ধার করে। এ ছাড়া আরও একবার বাল্যাবস্থায় কৃষ্ণদীঘিতে সাঁতরাতে গিয়ে মাঝখানে ডুবে মরে যাওয়ার উপক্রম ঘটলে দৈবক্রমে সেবারও ঈশা খাঁ স্বর্ণময়ীকে উদ্ধার করেছিল। এরকমভাবে আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে দু’বার উদ্ধার করায় ঈশা খাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতায় অভিভূত হয়ে পড়ে স্বর্ণময়ী। এখান থেকে ঈশা খাঁর প্রতি অনুরক্ত ও প্রেমাসক্ত হয়ে ওঠে স্বর্ণময়ী। এ প্রসঙ্গে লেখক বয়ান দিয়েছেন—

“ঈশা খাঁর সুন্দর কমনীয় বীরমূর্তি তাহার হৃদয়ে এমন করিয়া আসন পরিগ্রহ করিয়াছে যে, যুবতীর চিন্তা ও কল্পনা, হৃদয় ও মন ঈশা খাঁময় হইয়া পড়িয়াছে।”

এতদপেক্ষিতে উপন্যাসটির ঘটনা প্রবাহ নানা দিকে বইতে শুরু করে। প্রথমত মাতুলালয় থেকেই ভৃত্য শিবনাথ কৈবর্তের সাহায্যে ঈশা খাঁর কাছে প্রণয় সম্ভাষণপত্র পাঠায় স্বর্ণময়ী এবং ঐ পত্র পাওয়ার পর ঈশা খাঁর হৃদয় মনেও আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ঈশা খাঁর জবানীতে লেখক তাই বলেছেন।—

“অনেক দিন হতেই তোমাকে স্বর্ণময়ী মূর্তিরন্যায় ভালোবাসিতাম। আজ সে স্বর্ণময়ী মূতি জীবন্ত ও সরস প্রেমময়ী, প্রীতিময়ী, হৃদয়ময়ী, কল্যাণময়ী অমৃত প্রতিমায় পরিণত।”

এদিকে,রাজা প্রতাপাদিত্য স্বর্ণময়ীকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হও্য়ায় ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত সেনাপতি মাহতাব খাঁকে লেলিয়ে দেয় স্বর্ণময়ীকে অপহরণ করার ঘৃণ্য কাজে। মাহতাব খাঁ এতে রাজি না হওয়ায় রাজার সঙ্গে তার বাদানুবাদ ঘটে। মাহতাব খাঁ রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। এই পর্যায়ে কাহিনীর ভেতর লেখক মাহতাব খাঁ ও অরুণাবতীর উপকাহিনীর অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন। রাজা প্রতাপাদিত্যের বিগত যৌবনা স্ত্রী দুর্গাবতীর কন্যা অরুণাবতী সেনাপতি খাঁ সাহেবকে ভালোবাসতো। রাণী দুর্গাবতীর সহায়তায় কন্যা অরুণাবতী মাহতাব খাঁর হাত ধরে পালিয়ে যায় এবং এক কাননে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। সেখানে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে কলেমা পাঠ করে অরুণাবতী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়।

মূল কাহিনী এই পর্যায়ে আরও কিছু কিছু ঘটনা সংস্থান (situation) উপন্যাসে লক্ষ্য করা যায়। রাজা প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে ঈশা খাঁর মল্লযুদ্ধের ঘটনা ঘটার উপক্রম হয় এক সময়। কিন্তু মাহতাব খাঁ প্রতাপাদিত্যেকে রক্ষা করে। এমতাবস্থায় ঈশা খাঁ প্রতাপাদিত্যের প্রাণরক্ষাকারী মাহতাব খাঁর সঙ্গে অরুণাবতীর বিয়ের প্রস্থাব দেয়। ধূর্ত, কপটচারী রাজা প্রতিশ্রুতি দেয় যে রাজ্যে ফিরে গিয়ে সে এই বিয়ের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু রাজা প্রতারণার আশ্রয় নেয় এবং জানায় যে বসন্তরোগে অরুণাবতী মারা গেছে। মাহতাব খাঁ এ খবর শুনে মর্ম বেদনায় দগ্ধ হতে থাকে।

নতুন ঘটনার প্রবাহ শুরু হয় পরবর্তী পর্যায়ে।

রাজা প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে যুদ্ধের পর ঈশা খাঁ দূত মারফত স্বর্ণময়ীর সঙে তার বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। কেদার রায় প্রথম দিকে সম্মত হলেও শেষ পর্যন্ত অন্য অনেকের প্ররোচনায় প্রস্তাবটি নাকচ করে দেয়। এ দিকে, ঈশা খাঁর মা ও হিন্দু রমনী স্বর্ণময়ীকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর জন্য পুত্রের ওপর ক্ষুব্ধ হয় এবং যথেষ্ট তিরষ্কারও করে। প্রসঙ্গত তার উক্তি প্রণিধান যোগ্য : “আমি প্রতিমাপূজক কাফেরের কন্যাকে কখনো ঘরে এনে বংশ কলুষিত করবো না।”

কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘটনার মোড়লও ঘুরলো। দাক্ষিণাত্যের বিজাপুর যুদ্ধে ঈশা খাঁ মারাত্নকভাবে আহত অবস্থায় যখন শয্যাশায়ী তখন জনৈক ধর্ম গুরু শাহ-সাহেবের পরামর্শে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয় স্বর্ণময়ী। হেকিমের নির্দেশ অনুসারে স্বর্ণময়ী নিজের শরীর থেকে মাংস কেটে শল্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। স্বর্ণময়ী এ রকম সাহস ও স্বার্থত্যাগ এবং সর্বোপরি ঈশা খাঁর প্রতি অনুরাগ দেখে সবাই মুগ্ধ হয়ে পড়ে। ঈশা খাঁর মা-ও এতে বিশেষ ভাবে খুশি হয় এবং বিয়েতে শেষ পর্যন্ত সম্মতি প্রদান করে। ঈশা খাঁ সুস্থ হয়ে উঠলে স্বর্ণময়ীর সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান