রহস্য-রোমাঞ্চ সমগ্র » এ-যুগের সবচেয়ে বড় ডাকাত

পাতা তৈরিঅক্টোবর ২৬, ২০২০; ১৩:৪৯
সম্পাদনাঅক্টোবর ২৬, ২০২০, ১৩:৪৯
দৃষ্টিপাত
এক আজ পর্যন্ত অনেক ডাকাত ও খুনির গল্প শোনা গেছে, কিন্তু, ফরাসি-ডাকাত বোনোটের ভয়ংকর দলের কাছে সেসব গল্প হচ্ছে খুব ঠান্ডা গল্প! ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে ডিসেম্বরের সকালবেলায় ঝরঝর করে বৃষ্টি ঝরছে। প্যারিসের এক বড় ব্যাঙ্ক সবে দরজা খুলেছে। কেবি ও পিম্যান নামে ব্যাঙ্কের দুই কর্মচারী কয়েক লক্ষ টাকা নিয়ে এখনি ...

এক

আজ পর্যন্ত অনেক ডাকাত ও খুনির গল্প শোনা গেছে, কিন্তু, ফরাসি-ডাকাত বোনোটের ভয়ংকর দলের কাছে সেসব গল্প হচ্ছে খুব ঠান্ডা গল্প!

১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে ডিসেম্বরের সকালবেলায় ঝরঝর করে বৃষ্টি ঝরছে।

প্যারিসের এক বড় ব্যাঙ্ক সবে দরজা খুলেছে। কেবি ও পিম্যান নামে ব্যাঙ্কের দুই কর্মচারী কয়েক লক্ষ টাকা নিয়ে এখনি আসবে, কর্তৃপক্ষ তাদেরই জন্য অপেক্ষা করছেন।

ব্যাঙ্কের কাছেই রাস্তার ওপরে একখানা মোটরগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে তার জানলা-দরজা বন্ধ, কিন্তু মেশিন বন্ধ নয়।

কেবি ও পীম্যানকে দেখা গেল,–তারা গল্প করতে করতে ব্যাঙ্কের দিকে এগিয়ে আসছে।

তারা ব্যাঙ্কের দরজার কাছে এল। হঠাৎ বন্ধ মোটরগাড়ির দরজা খুলে দুজন লোক রাস্তার উপরে লাফিয়ে পড়ল–তাদের হাতে রিভলভার।

তাদের রিভলভার গর্জন করলে–কেবি মাটির উপরে লুটিয়ে পড়ল। একজন লোক তার হাতের টাকার ব্যাগ নিয়ে টানাটানি করতে লাগল, কিন্তু কেবি আহত হয়েও ব্যাগ ছাড়তে রাজি নয় দেখে সে আবার রিভলভার ছুঁড়ে তাকে একেবারে কাবু করে ফেলে। তারপর সে ব্যাগ নিয়ে এক লাফে মোটরের উপর চড়ে বসল।

রাস্তা তখন লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে। অনেক লোক মোটরের দিকে ছুটে এল, এবং সঙ্গে সঙ্গে মোটরের ভিতর থেকে দুদিকে দুখানা হাত বেরিয়ে পড়ল–প্রত্যেক হাতেই এক-একটা রিভলভার অগ্নি উদগার করছে। জনতার বীরত্ব উপে গেল–যে যেদিকে পারলে পালিয়ে প্রাণ বাঁচালে। একখানা লরি পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে। কিন্তু পারলে না–মোটরখানা। তিরের মতন বেগে তাকে এড়িয়ে চোখের আড়ালে চলে গেল।

পুলিশের টনক নড়ল। তাদের চরেরা চারিদিকে খোঁজ নিয়ে এসে খবর দিলে, মোটরের মধ্যে ছিল বোনোট নামে একজন লোক ও তার সঙ্গীরা। মোটরখানাও একটা নদীর ধারে পাওয়া গেল–সেখানা চুরি করা মোটর।

কিন্তু বোনোটকে পুলিশ কিছুতেই আর ধরতে পারে না! সে ভারি চালাক–আজ এ বাসা, কাল ও-বাসা করে বেড়াতে লাগল, কোথাও দু-একদিনের বেশি থাকে না। পুলিশ যখনি খোঁজ পেয়ে তাকে ধরতে যায়, তখনই গিয়ে দেখে বোনোট আগেই তাদের ফাঁকি দিয়ে সরে পড়েছে!

এইভাবে এগারো বার সে পুলিশের চোখে ধুলো দিলে।

থিয়েইস নামক স্থানে দুজন ধনী লোক বাস করত–স্বামী ও স্ত্রী। এক রাত্রে কারা তাদের খুন করে অনেক টাকা নিয়ে পালিয়ে গেল। পুলিশ সন্ধান নিয়ে জানলে, এ হচ্ছে, বোনোটের দলের কাজ।

একদিন একজন পুলিশের লোক হঠাৎ দেখতে পেলে, চমৎকার একখানা মোটর চালিয়ে বোনোট রাজপথ দিয়ে যাচ্ছে। সে একলাফে মোটরের পাদানির উপর উঠে পড়ল–কিন্তু বোনোটের গুলি খেয়ে পরমুহূর্তেই তাকে ইহলোক থেকে বিদায় নিতে হল। সে-মোটরখানাকেও পরে শহরের একজায়গায় ভাঙাচোরা অবস্থায় পাওয়া গেল এবং সেখানাও চুরি করা মোটর।

মাসখানেক পরে কাউন্ট রৌগেট তাঁর মোটরে চড়ে বেড়াতে বেরিয়েছেন, আচম্বিতে তিনজন বন্দুকধারী লোক এসে গাড়ি থামিয়ে বললে, গাড়িখানা এখনি আমাদের ছেড়ে দিতে হবে।

ড্রাইভার ইতস্তত করলে সঙ্গে-সঙ্গে বন্দুকের গুলিতে তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেল। কাউন্ট গাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়লেন, কিন্তু তিনিও গুলি খেয়ে যত জোরে পারেন পা চালিয়ে দিলেন।

বন্দুকধারীরা হচ্ছে, বনোট ও তার দুইজন সঙ্গী। কাউন্টের গাড়িতে আরও কয়েকজন দলের লোককে তুলে নিয়ে তারা আর-এক ব্যাঙ্কের দরজার এসে দাঁড়াল। তারপর দরজার দুইজন লোককে পাহারা দেওয়ার জন্যে রেখে তিনজন সঙ্গী নিয়ে বোনোট বুক ফুলিয়ে ব্যাঙ্কের ভিতরে প্রবেশ করলে।

তারপর তারা দু-চোখা গুলি চালাতে লাগল। ব্যাঙ্কের তিনজন লোককে হত ও আহত করে ভাণ্ডার লুটে টাকা নিয়ে ডাকাতের দল আবার সরে পড়ল।

এবারে পুলিশ অনেকটা সাবধান হয়েই ছিল। মোটরে ও মোটরবাইকে চড়ে দলে-দলে পুলিশ, ডাকাতদের পিছনে-পিছনে ছুটল।

কিন্তু তাদের কাছে যায় কার সাধ্য! গাড়ির ভিতর থেকে রাশি-রাশি গুলি ছুটে আসছে! একটা স্টেশনের কাছে এসে ডাকাতরা মোটর থেকে নেমে ট্রেনে চড়ে বসল। পুলিশের লোকেরা পরের স্টেশনে গিয়ে তাদের যথোচিত অভ্যর্থনা করবার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু তার আগেই পথের একটা বাঁকের মুখে এসে ট্রেন যখন তার গতি কমিয়ে দিলে, বোনোট নিজে লোকজন নিয়ে গাড়ি থেকে অদৃশ্য হল।

প্যারিসে সমস্ত লোক খেপে উঠে বলতে লাগল–পুলিশ কোনও কাজের নয়, তাদের অকর্মণ্যতায় আমরা এইবারে ধনেপ্রাণে মারা পড়ব।

পুলিশের বড়কর্তা প্রমাদ গুণে নিজেই কোমর বেঁধে কার্যক্ষেত্রে নামলেন। এমন ভয়ানক সাহসী ডাকাতের কথা তিনি কখনও শোনেননি। ইচ্ছা করলে এরা অনায়াসেই বিদেশে গিয়ে পুলিশকে কলা দেখাতে পারে, কিন্তু তা না করে পুলিশের চোখের সামনেই শহরে বসে এরা যা খুশি তাই করছে। পুলিশের বড়সাহেব বোনোটকে আবিষ্কার করবার জন্যে একশো কুড়িজন ডিটেকটিভ নিযুক্ত করলেন!

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান