রহস্য-রোমাঞ্চ সমগ্র » অলৌকিক

পাতা তৈরিঅক্টোবর ২৫, ২০২০; ১৬:৪৮
সম্পাদনাঅক্টোবর ২৫, ২০২০, ১৬:৪৯
দৃষ্টিপাত
চার নির্দিষ্ট দিনে দুপুরবেলায় হরেন এসে হাজির। জয়ন্ত শুধোলে, চিঠিতে যা যা বলেছি ঠিক সেইমতো কাজ করেছ তো? –অবিকল। –মানিক, সুন্দরবাবুকে ফোন করে জানাও, আজ সাড়ে পাঁচটার ট্রেনে আমরা যাত্রা করব। প্রায় সাড়ে সাতটার সময়ে তারা হরেনদের দেশে এসে নামল। আকাশ সেদিন নিশ্চন্দ্র। স্টেশন থেকে শহরে যাবার রাস্তায় সরকারি তেলের ...

চার

নির্দিষ্ট দিনে দুপুরবেলায় হরেন এসে হাজির।

জয়ন্ত শুধোলে, চিঠিতে যা যা বলেছি ঠিক সেইমতো কাজ করেছ তো?

–অবিকল।

–মানিক, সুন্দরবাবুকে ফোন করে জানাও, আজ সাড়ে পাঁচটার ট্রেনে আমরা যাত্রা করব।

প্রায় সাড়ে সাতটার সময়ে তারা হরেনদের দেশে এসে নামল।

আকাশ সেদিন নিশ্চন্দ্র। স্টেশন থেকে শহরে যাবার রাস্তায় সরকারি তেলের আলোগুলো অনেক তফাতে-তফাতে থেকে মিটমিট করে জ্বলে যেন অন্ধকারের নিবিড়তাকেই আরও ভালো করে দেখবার চেষ্টা করছিল! নির্জন পথ! আশপাশের ঝোপঝাড়ের বাসিন্দা কেবল মুখর ঝিল্লির দল। দুখানা সাইকেল রিকশায় চড়ে তারা যাচ্ছিল। প্রথম গাড়িতে বসেছিল হরেন ও মানিক। দ্বিতীয় গাড়িতে জয়ন্ত ও সুন্দরবাবু।

সুন্দরবাবু বললেন, তুমি কি যে বুঝেছ তা তুমিই জানো, আমি তো ছাই এ ব্যাপারটার ল্যাজামুড়ো কিছুতেই ধরতে পারিনি।

জয়ন্ত বললে, ঘটনাগুলো আমিও শুনেছি, আপনিও শুনেছেন। তারপর প্রধান প্রধান সূত্রের দিকে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে ছাড়িনি। মাথা খাটালে আপনি অনেকখানিই আন্দাজ করতে পারতেন।

–মস্তক যথেষ্ট ঘর্মাক্ত করবার চেষ্টা করেছি ভায়া, কিন্তু খানিকটা ধোঁয়া (তাও গাঁজার ধোঁয়া) ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাইনি।

–মুটেরাও মস্তককে যথেষ্ট ঘর্মাক্ত করে কিন্তু তারা উপলব্ধি করে কতটুকু সুন্দরবাবু, আমি আপনাকে মস্তক ঘর্মাক্ত করতে বলছি না, মস্তিষ্ক ব্যবহার করতে বলছি।

–একটা শক্ত রকম গালাগালি দিলে বটে কিন্তু তোমার কি বিশ্বাস, আজকেই তুমি এই মামলাটার কিনারা করতে পারবে?

–হয়তো পারব, কারণ অপরাধীরা প্রায়ই নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কাজ করে বিপদে পড়ে। হয়তো পারব না, কারণ কোনও কোনও অপরাধী নিজের নির্দিষ্ট পদ্ধতি ত্যাগ করতেও পারে। কিন্তু হুশিয়ার! পথের মাঝখানে আবছায়া গোছের কি-একটা দেখা যাচ্ছে না?

হ্যাঁ, দেখা যাচ্ছে বটে! মুক্ত আকাশের স্বাভাবিক আলো দেখিয়ে দিলে, অন্ধকারের মধ্যে একটা অচঞ্চল ও নিশ্চল ও সুদীর্ঘ ছায়ামূর্তি। বাতাসে নড়ে-নড়ে উঠছে কেবল তার পরনের জামা-কাপড়গুলো।

আচম্বিতে একটা অত্যন্ত কর্কশ ও হিংস্র চিৎকার চারিদিকের নিস্তব্ধতাকে চমকে দিয়ে জেগে উঠল–এই! থামাও গাড়ি, থামাও গাড়ি! সঙ্গে-সঙ্গে রিভলভারের শব্দ।

কিন্তু তার আগেই অতি-সতর্ক জয়ন্ত ছুটন্ত গাড়ি থেকে বাঘের মতো লাফিয়ে পড়েছে। এবং গর্জন করে উঠেছে তারও হাতের রিভলভার!

গুলি গিয়ে বিদ্ধ করল মূর্তির ডান হাতখানা, তার রিভলভারটা খসে পড়ল মাটির ওপরে সশব্দে। কেবল রিভলভার নয়, আর একটাও কি মাটিতে পড়ার শব্দ হল–বোধহয় বংশদণ্ড! অস্ফুট আর্তনাদ করে মূর্তিটা ফিরে দাঁড়িয়ে পালাবার উপক্রম করলে, কিন্তু পারলে না, এক সেকেন্ড টলটলায়মান হয়েই হুড়মুড় করে লম্বমান হল একেবারে পথের উপর।

দপদপিয়ে জ্বলে উঠল চার-চারটে টর্চের বিদ্যুত্বহ্নি।

জয়ন্ত ক্ষিপ্রহস্তে ভূপতিত মূর্তিটার গা থেকে কাপড়-চোপড়গুলো টান মেরে খুলে দিলে। দেখা গেল, তার দুই পদের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে আছে দুইখানা সুদীর্ঘ যষ্টি ইংরেজিতে যাকে বলে still। এবং বাংলায় যাকে বলে রণ-পা।

জয়ন্ত বললে, দেখছি, এর মুখে রয়েছে একটা প্রকাণ্ড মুখোশকাফ্রির মুখোশ। এখন। মুখোশের তলায় আছে কার শ্রীমুখ, সেটাও দেখা যেতে পারে। আর এক টানে খসে পড়ল মুখোশও।

হরেন সবিস্ময়ে বলে উঠল, আরে, এ যে দেখছি আমাদের পাড়ার বাপে-খেদানো মায়ে তাড়ানো ছেলে রামধন মুখুয্যে। এ বয়স বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই কুপথে যায়, কুসঙ্গীদের দলে মেশে, নেশাখোর হয়, জুয়া খেলে, পাড়ার লোকদের ওপরে অত্যাচার করে। এর জন্যে সবাই এ্যস্ত, ব্যতিব্যস্ত। কিন্তু এর পেটে-পেটে যে এমন শয়তানি, এতটা তো আমাদের স্বপ্নেরও অগোচর। ছিল!

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান