প্রোফেসর শঙ্কু সমগ্র » প্রোফেসর শঙ্কু সমগ্র

পাতা তৈরিডিসেম্বর ১৬, ২০২০; ১৫:৫৪
সম্পাদনাডিসেম্বর ১৬, ২০২০, ১৮:৫৪
দৃষ্টিপাত
প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় চরিত্র৷ ১৯৬১ সালে, বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা-রও আগে, সত্যজিৎ রায় এই চরিত্রটি সৃষ্টি করেন৷ প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু প্রোফেসর শঙ্কু নামেই সমধিক পরিচিত৷ তিনি একজন বৈজ্ঞানিক ও আবিষ্কারক৷ তাঁর বিশেষত্ব হলো, মূলত পদার্থবিজ্ঞানী হলেও বিজ্ঞানের সকল শাখায় তাঁর অবাধ গতি; তিনি ৬৯টি ভাষা ...

প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় চরিত্র৷ ১৯৬১ সালে, বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা-রও আগে, সত্যজিৎ রায় এই চরিত্রটি সৃষ্টি করেন৷ প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু প্রোফেসর শঙ্কু নামেই সমধিক পরিচিত৷ তিনি একজন বৈজ্ঞানিক ও আবিষ্কারক৷ তাঁর বিশেষত্ব হলো, মূলত পদার্থবিজ্ঞানী হলেও বিজ্ঞানের সকল শাখায় তাঁর অবাধ গতি; তিনি ৬৯টি ভাষা জানেন ও হায়ারোগ্লিফিক পড়তে পারেন; এবং বিশ্বের সকল দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ধর্ম, সামাজিক রীতিনীতি ও বিশ্বসাহিত্য বিষয়ে তাঁর সম্যক ধারণা আছে৷ প্রোফেসর শঙ্কু তীক্ষ্ণবুদ্ধি, নির্লোভ, সৎ ও স্বদেশপ্রেমিক; ভারতের সনাতন ঐতিহ্য সম্পর্কে তিনি শ্রদ্ধাবান এবং একই সঙ্গে শ্রদ্ধা করেন সমগ্র বিশ্বের প্রাচীন সাহিত্য ও শিল্পকেও৷

সত্যজিৎ রায় প্রোফেসর শঙ্কু সিরিজে মোট ৩৮টি সম্পূর্ণ ও ২টি অসম্পূর্ণ গল্প লিখেছেন৷ এই সিরিজের প্রথম গল্প ব্যোমযাত্রীর ডায়রি ১৯৬১ সালে সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়৷ এই গল্পটি হালকা চালে লেখা এবং এটি লেখার সময় লেখক প্রোফেসর শঙ্কু চরিত্রটি নিয়ে সিরিজ করার কথা ভাবেননি৷ ১৯৬৪ সালে সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত দ্বিতীয় শঙ্কু-কাহিনী প্রোফেসর শঙ্কু ও হাড় থেকে যথাযথভাবে শঙ্কু সিরিজের সূচনা হয়৷ ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত ‘প্রোফেসর শঙ্কু’ শঙ্কু সিরিজের প্রথম গল্পগ্রন্থ৷ ১৯৬৫ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে শঙ্কু সিরিজের মোট আটটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়৷ পরবর্তীকালে শঙ্কুসমগ্র গ্রন্থে এই সিরিজের সকল গল্প সঙ্কলিত হয়৷

শঙ্কু সিরিজের গল্পগুলি প্রোফেসর শঙ্কুর জবানিতে দিনলিপির আকারে লিখিত৷ গল্পগুলির পটভূমি ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ৷ প্রোফেসর শঙ্কুর নিবাস তদনীন্তন বিহারের (অধুনা ঝাড়খণ্ড) গিরিডি শহরে৷ বাড়িতে তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী নিউটন নামে ২৪ বছরের একটি পোষা বিড়াল ও তাঁর চাকর প্রহ্লাদ৷ বিশ্বের নানান দেশের বিজ্ঞানীরা তাঁর বন্ধু, তাদের মধ্যে বহুবার উল্লিখিত হয়েছে স্ক্রোল ও সণ্ডার্সের নাম৷ প্রতিবেশী অবিনাশ চট্টোপাধ্যায় ও হিতাকাঙ্ক্ষী নকুড়বাবু তাঁর কোনো কোনো অভিযানে সঙ্গী হয়েছেন৷ সমগ্র শঙ্কু সিরিজে প্রোফেসর শঙ্কুর ৭২টি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কথা জানা যায়৷ সত্যজিৎ রায় একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, প্রোফেসর শঙ্কু চরিত্রটি সৃষ্টির পিছনে প্রধান প্রেরণা ছিল তাঁর পিতা সুকুমার রায়ের গল্প হেসোরাম হুঁশিয়ারের ডায়রি৷ অন্যমতে, এই চরিত্রে সুকুমার রায়ের ‘নিধিরাম পাটকেল’ চরিত্রটির ছায়াও বর্তমান৷

প্রোফেসর শঙ্কুর জন্মতারিখ ১৬ জুন বলে উল্লিখিত হয়েছে৷ তাঁর পিতা ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু ছিলেন গিরিডির খ্যাতনামা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক৷ তিনি গরীব মানুষদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করতেন৷ মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে তিনি মারা যান৷ শঙ্কুকে তিলু বলে ডাকতেন (নকুড়বাবু এই সূত্রে শঙ্কুকে তিলুবাবু বলে সম্বোধন করতেন)৷ শঙ্কু ছিলেন অবিবাহিত৷ তাঁর অপর কোনো আত্মীয়ের নাম সিরিজে উল্লিখিত হয়নি৷ কেবল প্রোফেসর শঙ্কু ও ভূত গল্পে তাঁর অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহ বটুকেশ্বর শঙ্কুর উল্লেখ আছে৷

ছাত্র হিসেবে শঙ্কু ছিলেন অসাধারণ৷ জীবনে সর্বদাই প্রথম হতেন৷ গিরিডির স্কুল থেকে মাত্র ১২ বছর বয়সে ম্যাট্রিক পাস করেন শঙ্কু৷ এরপর ১৪ বছর বয়সে কলকাতার কলেজ থেকে আইএসসি এবং ১৬ বছর বয়সে ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রিতে ডবল অনার্সসহ বিএসসি পাস করেন৷ মাত্র ২০ বছর বয়সে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন৷

বিজ্ঞানী হিসেবেও শঙ্কুর খ্যাতি বিশ্বজোড়া৷ সুইডিশ আকাদেমি অফ সায়েন্স তাঁকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছে৷ ব্রাজিলের রাটানটান ইনষ্টিটিউট থেকে পেয়েছেন ডক্টরেট৷ পাঁচটি মহাদেশের বিজ্ঞানীরা আবিষ্কারক হিসেবে তাঁকে স্থান দিয়েছেন টমাস আলভা এডিসনের পরেই৷ স্থায়ী নিবাস গিরিডি শহরে হলেও কর্মসূত্রে যেতে হয়েছে কলকাতাসহ ভারতের নানা স্থানে৷ গেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যাণ্ড, জার্মানি, জাপান, স্পেন, মিশর, নরওয়ে, সুইডেন, তিব্বতে; অভিযান চালিয়েছেন সাহারা মরুভূমি, আফ্রিকার বনভূমি, সমুদ্রের তলদেশে, কয়েকটি অজানা দ্বীপে এমনকি মঙ্গলগ্রহেও৷

প্রোফেসর শঙ্কু তীক্ষ্ণবুদ্ধি, নির্লোভ ও সৎ৷ কিছুটা আত্মভোলা প্রকৃতির মানুষ৷ তাঁর চরিত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয় এক ঋষিসুলভ স্থৈর্য ও সংযম৷ তিনি স্বদেশপ্রেমিক; বেদ, উপনিষদ, আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা গভীর৷ আবার বিশ্বের অন্যান্য দেশের শিল্প ও সাহিত্যের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল৷ তিনি জ্যোতিষে বিশ্বাস না করলেও ভূতপ্রেত ও তন্ত্রমন্ত্রে বিশ্বাস করেন৷

প্রোফেসর শঙ্কু মোট ৭২টি আবিষ্কারের কথা জানা যায়। এই সব আবিষ্কার ও তাদের নামকরণের ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায়ের ভাষাপ্রীতি ও কৌতুকবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন, শঙ্কু আবিষ্কৃত রোবট বিধুশেখর সাধু ও চলিত বাংলায় কথা বলতে পারে; আবার তৃষ্ণানাশক বড়ির নাম ‘তৃষ্ণাশক বড়ি’। শঙ্কুর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হল বটিকা ইণ্ডিকা, এয়ারকণ্ডিশানিং পিল, লিঙ্গুয়াগ্রাফ, লুমিনিম্যাক্স, সমুনলিন, রিমেম্ব্রেন, মিরাকিউরল, রোবু ও বিধুশেখর নামক দুটি রোবট, অ্যানাইহিলিন পিস্তল, শ্যাঙ্কোপ্লেন, ফ্র্যাঙ্কেনষ্টাইন-শঙ্কু ফরমুলা ইত্যাদি।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান