রায়নন্দিনী » উপক্রমণিকা

পাতা তৈরিঅক্টোবর ২৪, ২০২০; ০০:০০
সম্পাদনাঅক্টোবর ২৪, ২০২০, ০৪:২৪
দৃষ্টিপাত
বাঙ্গালী লেখকগণের যত্ন এবং চেষ্টায় বাংলা ভাষা আজ ভারতের সর্বপ্রধান ভাষায় পরিণত। বাংলা ভাষায় ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান গ্রন্থ যত সামান্যই হউক, কিন্তু উপন্যাস এবং নাটক-নভেলে বাংলা ভাষা আজ ভারাক্রান্ত। আর সেই সমস্ত গ্রন্থের পত্রে-পত্রে ছত্রে-ছত্রে মুসলমানের অলীক কলঙ্ক, কুৎসা এবংবিজাতীয় বিদ্বেষ এবং ঘৃণা পরিপূর্ণ। উপন্যাসগুলি মোস্‌লেম বিদ্বেষের অনলকুণ্ড। সে অনলকুণ্ডে ...

বাঙ্গালী লেখকগণের যত্ন এবং চেষ্টায় বাংলা ভাষা আজ ভারতের সর্বপ্রধান ভাষায় পরিণত। বাংলা ভাষায় ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান গ্রন্থ যত সামান্যই হউক, কিন্তু উপন্যাস এবং নাটক-নভেলে বাংলা ভাষা আজ ভারাক্রান্ত। আর সেই সমস্ত গ্রন্থের পত্রে-পত্রে ছত্রে-ছত্রে মুসলমানের অলীক কলঙ্ক, কুৎসা এবংবিজাতীয় বিদ্বেষ এবং ঘৃণা পরিপূর্ণ। উপন্যাসগুলি মোস্‌লেম বিদ্বেষের অনলকুণ্ড। সে অনলকুণ্ডে বিরাট-কীর্তি, বিপুল-যশা, সিংহতেজা মুসলমান জাতির গোলাম হইতে সম্রাট নবাব এবং বেগম ও শাহজাদীগণ পর্যন্ত নিতান্ত নিষ্ঠুরভাবে নিক্ষিপ্ত হইয়াছে। বাঙ্গালীদিগের পূর্বপুরুষগণ অবলুণ্ঠিত মস্তকে যাঁহাদের পদধূলি শিরে ধারণা করি ধন্য হইয়াছিল, নিখিল জগৎ যে মুসলমানের পদতলে লুণ্ঠিত হইয়াছিল, যাঁহাদের চরিত্র-প্রভায়, জ্ঞান-গরিমায় এবং বীর্য-মহিমায় সমস্ত জগৎ মুগ্ধ হইয়াছিল—হায়! আজ সেই বিশ্বপূজ্য মুসলমান, বাঙ্গালী লেখকদিগের অপার কৃপায় অতি ঘৃণিত পিশাচ এবং অস্পৃশ্য কাম-কুক্কুররূপে চিত্রিত এবং বর্ণিত! হায়! যে নূরজাহান, রেজিয়া সোলতানা, জেবুন্নেছা, জাহানারা, মমতাজ মহল, দৌলতুনেন্নসা প্রভৃতি বেগম ও শাহজাদী-গণের পুণ্যপ্রতিভায় ইতিহাসের পৃষ্ঠা আলোকিত হইয়া রহিয়াছে, যাঁহাদের নামকরণেও পূণ্য সঞ্চার হয়, হায়! সেই সব বিদূষী পূতচরিত্রা সম্মানিতা মহিলা-দিগকেও যার-পর-নাই হীন চরিত্রা এবং হিন্দু-প্রেমোন্মাদিনী রূপে অঙ্কিত করা হইয়াছে। এ অত্যাচার, এ অবিচার একেবারেই অসহ্য! এ যন্ত্রণা একেবারেই মর্মন্তুদ!

ইহা ঐতিহাসিক ধ্রুবসত্য যে, মুসলমানদিগকে পৃথিবীর সকল জাতিই কন্যাদান করিয়াছিলেন এবং করিতেছেন, কিন্তু মুসলমান কখনও অমুসলমান বা কাফেরকে কন্যাদান করেন নাই। যে সমস্ত আরব, তুর্কী, ইরাণী এবং পাঠান ও মোগল ভারতবর্ষে বিজয়ী বেশে তরবারি হস্তে প্রবেশ করিয়াছিলেন, তাঁহারা প্রায়ই সপত্নীক আসিয়াছিলেন না। সুতরাং বাধ্য হইয়াই তাঁহাদিগকে হিন্দু ললনার পাণিপীড়ন করিতে হইয়াছিল। প্রথম অবস্থায় ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমানের যুদ্ধবিগ্রহ হইলেও পরে মুসলমান বিজয়ের পরে ভারতের হিন্দু-মুসলমানে গভীর শান্তি ও সদ্ভাব প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। ভারতের সর্বত্রই অল্পবিস্তর হিন্দু-মোসলেম বৈবাহিক সম্পর্ক পর্যন্ত স্থাপিত হইয়াছিল। রাজপুতেরা মুসলমানের মাতুল কুল।—ইহা আজিও প্রবাদ-বাক্যের ন্যায় প্রচলিত আছে। ফলতঃ তদানীন্তন হিন্দু রাজরাজড়ারা পর্যন্ত মুসলমানকে কন্যাদান করা অগৌরব বলিয়া আদৌ বোধ করেন নাই। বাদশাহ্‌দিগের জীবনী এবং ইতিহাস পাঠ করিলে দেখা যায় যে, হিন্দু নরপতিরা বাদশাহ্ নবাব এবং বিজয়ী বীরদিগকে স্বেচ্ছায় উপঢৌকন স্বরূপ কন্যাও প্রদান করিয়াছিলেন। আর ইহা ভারতবর্ষের অতীব প্রাচীন প্রথা।

কিন্তু আধুনিক নব্য-শিক্ষিত বাঙ্গালী লেখকেরা কল্পনায় ইহাকে জাতীয় কলঙ্ক মনে করিয়া নিদারুণ রোষাবেশে অতুল গৌরবান্বিতা পুণ্য-শ্লোকা মুসলমান মহিলাগণকে অন্তঃপুর হইতে টানিয়া বাহির করিয়া হিন্দু নায়কের প্রেমোন্মাদিনী-রূপে চিত্রিত করিতে উঠিয়া-পড়িয়া লাগিয়াছেন। কার্যতঃ যাহা কখনও ঘটে নাই, কল্পনায় তাঁহারা লেখনী পরিচালনা করিয়া সেই চিত্র অঙ্কিত করিতে একেবারে আদাজল খাইয়া লাগিয়াছেন। নীচমতি বঙ্কিমচন্দ্র এবং রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় হইতে আরম্ভ করিয়া প্রত্যেক উদ্ভট ঔপন্যাসিক লেখকই এই অতি জঘন্য চিত্র অঙ্কিত করিয়া বিশ্বপূজ্য মুসলমানদের মুণ্ডপাত এবং মর্মবিদ্ধ করিতে অসাধারণ প্রয়াস স্বীকার করিয়া আসিতেছেন। আমি এবং আরও কতিপয় মুসলমান লেখক এ সম্বন্ধে পুনঃ পুনঃ নানা পত্র-পত্রিকায় তীব্র প্রতিবাদ করিয়াছেন। কিন্তু তাহাতে কিছুমাত্র ফলোদয় হয় নাই। উত্তর-বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদের বগুড়ার অধিবেশনে আমি অতি তীব্র এবং যুক্তিসঙ্গত তুমুল আন্দোলন করিয়াছিলাম। দেশের শান্তি ও মঙ্গলের জন্য হিন্দু-মুসলমানের সখ্য ও সদ্ভাবের জন্য হিন্দু সুধীমণ্ডলের নিকট মুসলমান চরিত্রকে কুৎসিত না করিবার জন্য বিনীত অনুরোধ করিয়াছিলাম। কিন্তু হায়! আমার সে অনুরোধ বিফল হইয়াছে! বাঙ্গালার ছাপাখানা হইতে আজও শতধারে বর্ষার প্লাবনের ন্যায় রাশি রাশি হলাহলপূর্ণ নাটক-নভেল বাহির হইয়া ভীষণ অশান্তি সৃষ্টি করিতেছে। অন্যদিকে আবার কলিকাতা এবং মফঃস্বলের শত শত স্থানে যাত্রা ও থিয়েটারের এই সমস্ত অলীক কলঙ্ক-কুৎসা-পরিপূর্ণ ঘটনার অভিনয় হইয়া মুসলমান ছাত্র ও সাধারণ লোকের মনে হীনতা ও নীচতার বীজ বপন করিয়া মুসলমানের আত্মবিশ্বাস ও আত্ম-মর্যাদার মূলে এমন নিদারুণ কুঠারাঘাত করিতেছে যে, তাহাতে মুসলমানদের উন্নতি বা জাতীয় কল্যাণের আশা সুদূরপরাহত হইয়া পড়িতেছে।

বীর্যবান মহাপরাক্রান্ত শত্রুর সহস্র সহস্র তোপ-বন্দুকে লক্ষ লক্ষ মুসলমান নিহত হইলে যে ক্ষতি না হইত, দুর্বল বাঙ্গালীর ক্ষুদ্র লেখনী সঞ্চালনে তাহার অধিক ক্ষতি হইতেছে। পক্ষান্তরে বাঙ্গালী লেখকের এই কাপুরুষোচিত হীন আক্রমণে শিক্ষিত মুসলমানদের অন্তঃকরণে যে সংক্ষোভ ও ভীষণ প্রতিহিংসার আগুন প্রজ্বলিত হইতেছে, তাহার পরিণামও অতীব মারাত্মক। এ বিদ্বেষ যেরূপ দ্রুতগতিতে বর্ধিত হইতেছে, তাহার ফল উভয়ের পক্ষে নিশ্চয়ই সাঙ্ঘাতিক।

একই দেশের অধিবাসী হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাব থাকা সর্বদা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাঙ্গালী ভ্রাতারা কাল্পনিক আর্যামীর গৌরবগানে বিভোর হইয়া কাণ্ডাকাণ্ডজ্ঞানহীন অবস্থায় লেখনীয় পরিচালনায় দারুণ অসদ্ভাবের বীজ রোপণ করিতেছেন। দেশমাতৃকার কল্যাণের নিমিত্ত তাঁহাদের সাবধানতার জন্য এবং মুসলমানদের আত্মবোধ জন্মাইবার জন্যই উপন্যাসের ঘোর বিরোধী আমি, কর্তব্যের নিদারুণ তাড়নায় “রায়-নন্দিনী” রচনা করিয়াছি। ইহাতে হিন্দু ও মুসলমানের যে চিত্র অঙ্কিত করিয়াছি, তাহাই অতীতের স্বাভাবিক চিত্র। মুসলমানের চরিত্রবল, মহত্ত্ব এবং স্বজাতি-প্রেমের উন্মাদনা সকল জাতি অপেক্ষা বেশি ছিল, ইহা সকলকে স্বীকার করিতেই হইবে। নতুবা সহস্য বৎসর পর্যন্ত মুসলমান কখনও নিখিল ধরণীর একচ্ছত্র অধিপতি, ধর্মগুরু ও সভ্যতার শিক্ষক-রূপে বিরাজ করিতে পারিতেন না। আজ বিশ্ববক্ষ হইতে তাঁহার প্রতাপ ও প্রভাবের জ্যোতিঃ নিবিয়া যায় নাই।

বাঙ্গালীদিগের রচিত উপন্যাস পাঠ করিয়া যাঁহারা নিদারুণ মর্মজ্বালা ভোগ করিয়াছেন, তাঁহারা এই উপন্যাস পাঠে কথঞ্চিৎ শান্তি পাইলেও শ্রম সফল জ্ঞান করিব। পক্ষান্তরে আশা করি, বাঙ্গালী লেখকগণ তাঁহাদের মোসলেম কুৎসাপূর্ণ জঘন্য উপন্যাসগুলির পরিবর্তন করিয়া সুমতির পরিচয় দিবেন এবং ভবিষ্যতে মুসলমানের বীর্যপুষ্ট গৌরববিমণ্ডিত আদর্শ চরিত্র অঙ্কিত করিতে চেষ্টিত হইবেন। নতুবা তাঁহাদের চৈতন্য উৎপাদনের জন্য আবার ঐসলামিক তেজঃদীপ্ত অপরাজেয় বজ্রমুখ লেখনী ধারণ করিতে বাধ্য হইবে।

বাণীকুঞ্জ, সিরাজগঞ্জ
২০শে ফাল্গুন, ১৩২২
সৈয়দ শিরাজী
গ্রন্থাবলী
মতামত জানান