কৃষ্ণা কুন্তী কৌন্তেয়
লেখক: নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ী
বিষয়: গবেষণা, প্রবন্ধ, মহাভারত

কথামুখ: যা ভেবেছিলাম, তা করা গেল না। আসলে শব্দের মধ্যে সাংঘাতিক শক্তি লুকোনো থাকে। তার মধ্যে যদি আবার সেই শব্দ ব্যবহার করেন ঋষিকল্প মহাকবি তা হলে শব্দ এমনই এক অপরিবর্তনীয় মাত্রা বহন করে যে, আমাদের মতো সাধারণ জনের বিপদ ঘটে সেখানেই। কবি-ঋষি ‘কর্ণ-কুন্তী সংবাদ’ রচনা করে এমনই এক মধুরতা বর্ষণ করেছেন আমার শ্রুতিপুটে যে, এই গ্রন্থের অন্তর্গত চরিত্রগুলির অন্বয়ে প্রথমে কুন্তীকে রেখে তারপরেই কর্ণের অবস্থান ঘটাব ভেবেছিলাম। কিন্তু তা করা গেল না। করা গেল না এই কারণে যে, কর্ণকুন্তীর জ্যেষ্ঠ পুত্র হওয়া সত্ত্বেও কর্ণ তাঁর অন্যান্য ভাইদের বিপরীত কোটিতে অবস্থান করছিলেন বলে তাঁর স্বভাব-চরিত্র, সংস্কার এবং ভাবনা এতটাই অন্যরকম যে, তাঁকে অন্য তিন কুন্তীপুত্রের অগ্রভাগে রাখতে পারিনি। 
অথচ কর্ণের মধ্যে সেই সম্ভাবনা ছিল। তিনি প্রথম কৌন্তেয় হতে পারতেন, তিনি পাঁচ পাণ্ডব-ভাইয়ের জ্যেষ্ঠতম হতে পারতেন, সব চেয়ে বড় কথা, তিনি দ্ৰৌপদীর প্রথমতম স্বামীও হতে পারতেন। সর্বস্তরে এই ‘হতে-পারতেন’ মানুষটা যেহেতু কখনই যা হবার ছিল তা হননি, তাই তাঁকে সবার শেষে রাখলাম বীরোচিত একাকিত্বের মর্যাদায়। 
গ্রন্থনামের মধ্যে আমি কোথাও পাণ্ডব কথাটা রাখব বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু এও ভেবে দেখলাম—পঞ্চ পাণ্ডবের জীবনের মধ্যে এই রাজনাম অথবা বংশ নাম বহন করা ছাড়া পাণ্ডুর আর কোনও তাৎপর্য নেই। বরঞ্চ কুন্তীর প্রভাব এখানে অনেক বেশি। তা ছাড়া গ্রন্থনামের মধ্যে পাণ্ডব কথাটা থাকলে আমরা কোনওভাবেই এখানে কর্ণের প্রবেশ ঘটাতে পারতাম? অথচ কৰ্ণ বড় বেশি কৌন্তেয়। কুন্তী মনে মনে তাঁকে চিরকাল কৌন্তেয় বলেই মনে করেছেন। কর্ণও সারা জীবন ধরে সেই নেতি নেতি জননীর জন্য হা-হুতাশ করে নেতিবাচক ভাবেই কৌন্তেয়। 
আরও একটা কথা এখানে আগেই বলে নেওয়া ভাল। অতি শৈশবে জননীর দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে নিঃসীম হতাশার মধ্যে জীবন কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত কৰ্ণ যেভাবে মৃত্যু-বরণ করেছেন, তাতে এই অসাধারণ বীরের জন্য আমাদের হৃদয়ে গভীর সমবেদনা আছে। কর্ণের জীবনের বিভিন্ন কঠিন মুহুর্তগুলি মহাভারতের কবি এমনই সকরুণভাবে বর্ণনা করেছেন যে, আমাদের এই হাহাকার জাগ্রত হওয়া অতি স্বাভাবিক। কিন্তু পরবর্তীকালের সংস্কৃত নাট্যকারেরা তথা মধ্যযুগীয় কাশীরাম দাশ এবং আমাদের মধ্যেও অন্য অনেকে কর্ণের প্রতি সমাজের বঞ্চনাটাকেই মাথায় বেশি রেখেছেন বলে করুণ রসটাকেই বড় করে ফেলেছেন। 
করুণ-রসটা যে এখানে বড়, সে ব্যাপারে আমারও কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার বক্তব্য—সেই করুণার ধারাটি শুধু কর্ণের জীবনে নয়, এই ধারার উৎসটি খুঁজতে হবে তাঁর জননী কুন্তীর জীবন থেকে। অন্যদিকে মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে কর্ণের জীবনে যে সব বিকারগুলি ঘটেছিল, সেগুলি যেহেতু মহাভারতের কবি অত্যন্ত লোকসম্মতভাবে প্রকাশ করেছেন, তাই সেগুলিকেও আমি না দেখিয়ে পারিনি। তাতে কর্ণের সম্বন্ধে পাঠকের মনে যে চিরাচরিত মহান ধারণা আছে, তাতে কিছু আঘাতও লাগতে পারে হয়তো। কিন্তু মহাভারতের কবির সামগ্রিক দৃষ্টির কথা মনে রেখে সহৃদয় পাঠক সে আঘাত সইতেও পারবেন হয়তো। 
মহাভারতের চরিত্র বিশ্লেষণ বড় কঠিন কাজ। একেকটি চরিত্র একেকটি হীরক-খণ্ডের মতো। বিশেষত কর্ণের। বিশেষত কুন্তীর। বিশেষত যুধিষ্ঠিরের। এই হীরক-চরিত্রের কাঠিন্য ভেদ করা আমার সাধ্য ছিল না। আমার পূর্বজন্ম সাধক-মনীষীরা তাঁদের চেতনা-বজ্ৰাঘাতে এই সব কঠিন চরিত্রের অন্তর ভেদ করেছেন। আমি সেই ছিদ্রপথে সুতোর মতো প্রবেশ করেছি মাত্ৰ—মণৌ বজ্ৰ-সমুৎকীৰ্ণে সূত্রস্যেবাস্তু মে গতিঃ। 
কুন্তী কিংবা কৰ্ণচরিত্রের জটিলতা বাদ দিলেও যুধিষ্ঠিরের চরিত্র বোঝা মোটেই সহজ নয়। সাধারণ জনের মধ্যেই শুধু নয়, অনেক পরিপক্ক মানুষের মধ্যেও যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন দেখি—যুধিষ্ঠিরকে তাঁরা ক্লীব, মেরুদণ্ডহীন, ঘটনার স্রোতে গা-ভাসানো এক নমনীয় ধার্মিক বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। আমি হলফ করে বলতে পারি—এঁরা মহাভারতের অন্তৰ্গত যুধিষ্ঠিরের চরিত্র কিছু বোঝেন না। যুধিষ্ঠিরকে বুঝতে হলে সেকালের সমাজকে বুঝতে হবে, ভারতবর্ষের দর্শনকে বুঝতে হবে, বুঝতে হবে নীতি যুক্তি ধর্ম, বুঝতে হবে—আবিল সংসারের মধ্যে থেকেও মানব-নীতির পূর্ণতায় পৌঁছনোর চেষ্টাকে। সেই চেষ্টার নামই যুধিষ্ঠির।
পার্থ-তৃতীয় অর্জুনকে আমরা মহাভারতের নায়ক বলে মনে করি এবং তিনিই পঞ্চপাণ্ডব-প্রিয়া দ্রৌপদীরও প্রিয়তম নায়ক। তাঁকে আমরা তাই দ্ৰৌপদীর অব্যবহিত পূর্বে রেখেছি। অবশ্য কৌন্তেয়দের অনুক্ৰমেও তাঁর ওই জায়গাতেই থাকবার কথা।
মহাভারতের সব চেয়ে খাপছাড়া চরিত্র হলেন ভীম। ভীম এমনই একজন মানুষ, যিনি মা, ভাই এবং তাঁর এক-পঞ্চমাংশের স্ত্রীটিকে পাগলের মতো ভালবাসেন। ভাইদের অনুক্ৰমেও তিনি মাঝখানে আছেন এবং আমাদের অনুক্ৰমেও তিনি মহাভারতের ছয় চরিত্রের মাঝখানে বসে তাঁর শক্তি এবং ভালবাসা একসঙ্গে বিকিরণ করছেন সবার ওপরে। 
আমরা আরম্ভ করেছি কুন্তীকে দিয়েই। কারণ তিনি চার পুত্রের গর্ভধারিণী জননী। গৰ্ভধারিণীকে আগে জানলে তাঁর পুত্রগুলিকেও বুঝতে সুবিধে হবে, বিশেষত কর্ণকে। জননীর পরিত্যক্ত বলে কর্ণের ওপরে, আমাদের যে মায়া আছে, সে মায়া থাকতে হবে কুন্তীর ওপরেও, কারণ ব্যক্তিগত জীবনে তিনিও কম দুঃখী নন, কম অভাগী নন। কর্ণ যদি সৰ্বকালীন পাঠকের করুণার আধার হন, তবে কুন্তীকেও সেই করুণ-রসের মাহাত্ম্যেই দেখতে হবে। সে জন্যও হয়তো দুই করুণ চরিত্রকে আমরা প্রথমে এবং শেষে রেখেছি। যাতে জননী এবং পুত্র দুই মেরুতে থাকা সত্ত্বেও তাঁদের অন্তৰ্গত চরিত্রের করুণ-রসটির সাজাত্য থাকে। 
মহাভারতে স্ত্রী-চরিত্রগুলির মধ্যে যে দীপ্তি আছে, সেই দীপ্তিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল আমার কাছে কুন্তী এবং তাঁর পরেই দ্ৰৌপদী। পঞ্চস্বামীগর্বিতা দ্ৰৌপদীর জীবন বিভিন্ন মানবিক বৈচিত্র্যে বিশাল। তাঁর মতো আধুনিক এবং বিদগ্ধা রমণীর কল্পনা মহাভারতের কবি কীভাবে করেছিলেন তা ভাবতে গেলে শুধু অবাক হওয়া ছাড়া অন্য কোনও গতি থাকে না। কিন্তু দ্ৰৌপদীর এই বিশাল চরিত্রের চেয়েও আমার কাছে কুন্তীর চরিত্র আরও অনেক বেশি বর্ণময়, বৈচিত্র্যময়। একটি স্ত্রীলোকের জীবনে যে সব অনাকাঙিক্ষত জটিলতা থাকতে পারে, সেগুলি থাকা সত্ত্বেও নিজেকে একটি স্থির লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে ব্যক্তিত্ব লাগে, যে রুচি লাগে এবং যে আত্মসচেতনতা লাগে—সেই ব্যক্তিত্ব, রুচি এবং মর্যাদার প্রতিরূপ হলেন কুন্তী। মহাভারতে কুন্তীর চরিত্র তাই দ্ৰৌপদীর চেয়েও বেশি মানবিক, অন্তত আমার কাছে তাই। 
ভূমিকা শেষ করার আগে আমার ইচ্ছাকৃত ত্রুটিগুলি সম্বন্ধে আগে মার্জনা চেয়ে নিই। উল্লেখ্য, এই গ্রন্থের অন্তর্গত প্রত্যেকটি চরিত্র পুজোসংখ্যা ‘বৰ্তমানে’ এক এক বছরে বেরিয়েছে। বিভিন্ন বছরে লিখবার সময়ে প্রত্যেকটি চরিত্রকে যেহেতু যথাসম্ভব সম্পূর্ণ রূপ দিতে হয়েছে, স্বাভাবিক কারণেই এখানে একত্রে সেই চরিত্রগুলি সংকলিত হওয়ায় কোনও কোনও জায়গায় পুনরুক্তি-দোষ ঘটে থাকবে। পুনরুক্তি না করেও যে প্রত্যেকটি চরিত্রের একক রূপ দেওয়া যেত না, তা নয়। কিন্তু তাতে প্ৰত্যেক চরিত্র মহাভারতের কবির হাতে আস্তে আস্তে কীভাবে বিবর্তিত হচ্ছে, তা দেখানো যেত না। সেই বিবর্তনের ধারাটি ব্যাহত হত। আমার পুনরুক্তি-দোষের সমর্থনে এর থেকে বেশি সাফাই আমি গাইব না, কারণ সুধীজন, এই গ্রন্থ পড়বার সময়েই আমার পুনরুক্তিগুলি উদারচিত্তে সমর্থন করবেন বলে আমি মনে করছি।
এই গ্ৰন্থ-প্রকাশে সহায়তা করার জন্য আনন্দ পাবলিশার্স-এর শ্ৰীদ্বিজেন্দ্রনাথ বসুকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাই। এই গ্রন্থ প্রকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে আমি কিছু সাহায্য পেয়েছি সংস্কৃত কলেজের কর্মী শ্ৰী অলোককুমার বিশ্বাস এবং আমার প্রিয় ছাত্র শ্ৰীপঙ্কজ দত্তর কাছে। এরা আমার আশীর্বাদের পাত্র। এই গ্ৰন্থ রচনার উৎসাহের সঙ্গে অজস্র গ্রন্থের সাহায্য দিয়ে আমায় ঋণী করেছেন আমার স্ত্রী শ্ৰীমতী সুষমা। আমার পুত্র অনির্বাণের প্রেরণাও এখানে কম নয়। গ্ৰন্থরচনার ক্ষেত্রে আরও যাঁরা উৎসাহ দিয়েছেন, তাঁদের সবার নাম করা এখানে সম্ভব নয়। তাঁদের সবার জন্য শুভেচ্ছা রইল। যিনি এই গ্রন্থের প্রচ্ছদ এঁকেছেন, তাঁকে আমি আমার অন্যতম বন্ধু বলেই মনে করি। এই প্ৰসন্ন প্রচ্ছদ সেই বন্ধুত্বেরই ফল। এই গ্রন্থের ‘সুসজ্জিত পত্রগুলি’ সম্পূর্ণ পড়ে যথাসম্ভব সংশোধন করে দিয়েছেন আমার বন্ধু এবং অধ্যাপক শ্ৰীপ্রবালকুমার সেন। আমার জন্য তিনি অনেক কিছুই করেন বলে কোনও কৃতজ্ঞতাই তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়। এর পরে আমার কাম্য রইল শুধু সহৃদয় পাঠকের প্রশ্ৰয়।

ডাউনলোড: ইপাব, মুবি, পিডিএফ
আপনার জন্য প্রস্তাবিত বইসমূহ