শরৎ পত্রাবলী » উপেন্দ্রনাথকে লিখিত

পাতা তৈরিফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৬; ০০:০৮
সম্পাদনাঅক্টোবর ২৭, ২০২০, ০১:১১
দৃষ্টিপাত
10. 1. 13D. A. G’s Office. Rn. প্রিয় উপীন,—তোমার পত্র পেয়ে দুর্ভাবনা গেল। দু’দিন পূর্ব্বে ফণীন্দ্রের পত্র ও চরিত্রহীন পেয়েছি। তোমাদের ওপরে বেশি দিন রাগ করে থাকা সম্ভব নয়, তাই এখন আর রাগ নেই, কিন্তু কিছু দিন পূৰ্ব্বে সত্যই অনেকটা রাগ ও দুঃখ হয়েছিল। আমি কেবলি আশ্চৰ্য্য হয়ে ভাবতাম এরা ...

10. 1. 13
D. A. G’s Office. Rn.

প্রিয় উপীন1,—তোমার পত্র পেয়ে দুর্ভাবনা গেল। দু’দিন পূর্ব্বে ফণীন্দ্রের পত্র ও চরিত্রহীন পেয়েছি। তোমাদের ওপরে বেশি দিন রাগ করে থাকা সম্ভব নয়, তাই এখন আর রাগ নেই, কিন্তু কিছু দিন পূৰ্ব্বে সত্যই অনেকটা রাগ ও দুঃখ হয়েছিল। আমি কেবলি আশ্চৰ্য্য হয়ে ভাবতাম এরা করে কি? একখানা চিঠিও যখন দেয় না, তখন নিশ্চয়ই এদের মতিগতি বদলে গেছে। তোমাকে একটা কথা বলে রাখি উপীন, আমার এই একটা ভারী বদ স্বভাব আছে যে একটুতেই মনে করি লোকে যা করে তা ইচ্ছে করেই করে। ইচ্ছা না করেও যে কেউ কেউ অভ্যাসের দোষে আর এক রকম করে, আমার নিজের সম্বন্ধে সে কথা মনে থাকে না। Sensitive বলে একটা কথা যে আছে আমার সেটা অপৰ্যাপ্ত রকম বেশি। সুরেনকে আজ হপ্তা দুই একখানা চিঠি দিয়েছিলাম আজ পর্য্যন্ত তার জবাব পেলাম না। এরা কেনই বা লেখে কেনই বা লেখা বন্ধ করে। তুমি ‘কাশীনাথ’ সমাজপতিকে দিয়ে ভাল কর নি। ওটা ‘বোঝা’র জুড়ি, ছেলেবেলার হাত-পাকানর গল্প। ছাপান ত দূরের কথা, লোককে দেখানও উচিত নয়। আমার সম্পূর্ণ অনিচ্ছা যেন না ছাপা হয়। আর আমার নামটা মাটি কোরো না, একা ‘বোঝা’ই যথেষ্ট হয়েছে।

আমি যমুনার প্রতি স্নেহহীন নই। সাধ্যমত সাহায্য করব, তবে ছোটো গল্প লিখতে আর ইচ্ছে হয় না—এটা তোমরা পাঁচ জনেই কর। প্রবন্ধ লিখব—এবং পাঠাবও। চরিত্রহীন কবে সম্পূর্ণ হবে বলতে পারি না। প্রায় অর্দ্ধেকটা হয়েছে মাত্র। হলেও যে সমাজপতির কাছেই পাঠিয়ে দেব তাও বলা ঠিক হয় না। এক তুমি যদি কলিকাতায় থাকিতে, তোমার কাছে পাঠাতাম। ইতিমধ্যে তুমি সমাজপতিকে লিখে দিয়ো ‘কাশীনাথ’ যেন প্রকাশ না করে। যদি করে ত আমি লজ্জায় বাঁচব না। তুমি দু’একটা গল্প লিখতে বলেচ এবং পাঠাতেও লিখেচ, যদি লিখিই কাকে পাঠাব? তোমাকে না ফণিকে?… গিরীন তখন ছোটো ছিল, যখন আমি সংসারের বাইরে চলে আসি। এত বৎসরের পরে আমাকে বোধ করি তার মনেও নেই। উপীন, আর একটা কথা বলি তোমাকে—এক দিন তার একখানা বই কিনতে চাই—তুমি নিষেধ করে বলো যে শুনলে সে দুঃখ করবে। আজ পৰ্য্যন্ত আমি সেই কথা মনে করেই কিনি নি। একখানা স্পষ্ট করে চেয়েও ছিলাম—অথচ, সে পাঠালে না। ছেলেবেলায় তার অনেক চেষ্টা সংশোধন করে দিয়েচি—আমি লিখতাম বলেই তারাও লিখতে সুরু করে। ও বাড়ীর মধ্যে আমিই বোধ করি প্রথমে ওদিকে নজর দিই। তার পরে ওরা চাঁচল থেকে হাতে লিখে মাসিক পত্ৰ বার করত। আজ সে আমাকে একখানা পড়তেও দিলে না! সে হয়ত মনে করে, আমার মত নির্ব্বোধ মূর্খ লোকে তার লেখা বুঝতেও পারে না। যাক্, এজন্য দুঃখ করা নিষ্ফল। সংসারের গতিই বোধ করি এই। আমার শরীর আজকাল ভাল। আমাশা সেরেচে। আজকাল পড়াটা প্রায় বন্ধ করেছি। আমার অসমাপ্ত মহাশ্বেতা (oil painting) আবার সমাপ্ত হবার দিকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। তোমার সেই বড় উপন্যাস লেখার মতলব এখনো আছে ত? যদি না থাকে ত ভারী খারাপ। ওকালতিও করা চাই এটাকেও ছাড়া চাই না।

আমার কলিকাতা যাওয়া—(এদেশ ছেড়ে) বোধ করি হয়ে উঠবে না। শরীরও টিকবে না বুঝচি কিন্তু না টিকাও বরং ভাল, কিন্তু ওখানে যাওয়া ঠিক নয় এই রকমই মনে হচ্ছে। আমার ফাউনটেন পেন্ তোমার হাতে অক্ষয় হোক—ও কলমটা অনেক জিনিসই লিখেচে—খাটিয়ে নিলে আরও লিখবে।

আজ এই পর্য্যন্ত। যদি ‘চন্দ্রনাথ’ পাঠান সম্ভব হয় এবং সুরেনের যদি অমত না থাকে, তা হলে যা সাধ্য সংশোধন করে ফণিকে পাঠাব। চিঠির জবাব দিয়ো।—শরৎ

টীকা

  1. উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়
গ্রন্থাবলী
মতামত জানান