শরৎ পত্রাবলী » রাধারাণী দেবীকে লিখিত

পাতা তৈরিফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৬; ০০:০৩
সম্পাদনাঅক্টোবর ২২, ২০২০, ২১:৩৯
দৃষ্টিপাত
সামতাবেড়, পানিত্রাস পোস্ট জেলা হাবড়া পরম কল্যাণীয়াষু, রাধু, তোমার বইখানি পাবার পর থেকে প্রায়ই ভাবতাম, কবিতা নিয়ে কথা কইবার অধিকার ভগবান যদিবা নাই দিয়ে থাকেন, অন্ততঃ বইখানি পেয়েছি এবং আগাগোড়া পড়েছি এ খবরটাও তো দিতে পারি। তাই কেন না দিই? এমনি ভাবি আর দিন যায়। অবশেষে শিলঙ থেকে এলো চিঠি—এলো ...

সামতাবেড়, পানিত্রাস পোস্ট

জেলা হাবড়া

পরম কল্যাণীয়াষু,

রাধু, তোমার বইখানি1 পাবার পর থেকে প্রায়ই ভাবতাম, কবিতা নিয়ে কথা কইবার অধিকার ভগবান যদিবা নাই দিয়ে থাকেন, অন্ততঃ বইখানি পেয়েছি এবং আগাগোড়া পড়েছি এ খবরটাও তো দিতে পারি। তাই কেন না দিই? এমনি ভাবি আর দিন যায়। অবশেষে শিলঙ2 থেকে এলো চিঠি—এলো নিমন্ত্রণ। মনে মনে লজ্জার অবধি রইল না—স্থির হ’ল এবার আর দেরি নয়—জবাব একটা দেবই দেব। কিন্তু আবার ভাবি, আর দিন যায়—এমনি করে ভাবতে ভাবতে আজ দুপুর রাত্রে আরাম-কেদারা ছেড়ে অকস্মাং উঠে বসেছি এবং কাগজ কলম খুঁজে বার করে নিয়ে নিদারুণ প্রতিজ্ঞা করেচি ওপরে যাবার আগে এ চিঠি শেষ কোরবই কোরব। কাল সকালেই যেন ডাকে দিতে পারি।

কিন্তু জানোই ত ভাই বিনয় নয়, সত্যিই কবিতার আমি কিছুই জানিনে। তাই কবিতা যে কেউ লেখে তার পানেই আমি অবাক হয়ে চেয়ে থাকি। নিজে না পারি দু’ছত্র মেলাতে, না পারি ভাল ভাল কথা খুঁজে বার করতে। একবার বহু চেষ্টার ‘হায়’-এর সঙ্গে ‘জলাশয়’ মিলিয়ে কবিতা লিখেছিলাম, কিন্তু অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বললেন, ও হয়নি।

হয়নি ত বটেই, কিন্তু হয় যে কি কোরে সেও ত বুদ্ধির অতীত, সুতরাং আমার মত সুধী ব্যক্তি যত্ন করে এ বই যদি পড়েও থাকেন তাতে তোমাদের মত কবিদের আনন্দ দূরে থাক্ সান্ত্বনাটাই বা কি?

বুড়ি3 ছেলেবেলায় কবিতা লিখত, মন্দ নয়, সে এটা বোঝে; তাকে যদি পাঠাতে বোধ করিবা—এমনতর অযোগ্যের হাতে তুলে দেওয়ার আক্ষেপ থেকে রক্ষা পেতে।

একটা ঘটনা মনে পড়ে। জলধর দাদার4 ‘অভাগী’ বেরিয়েচে; আমাদের বাড়ির ইনি5 পড়েন আর কাঁদেন। চোখমুখ ফুলে উঠলো, আমাকে কাছে পেয়ে ধিক্কার দিয়ে বললেন, কি যে ছাইপাশ তুমি লেখ, এমনি একখানিও যদি লিখতে পারতে।

পারিনে তা মেনে জিজ্ঞাসা করলেম, ব্যাপারটা কি ওতে?

বললেন ব্যাপার! এই দ্যোখো সতীত্বের তেজ!

দেখা গেল—অভাগী তখন কাশীতে। সেখানে দারোগা, কনস্টেবল, বাড়িওয়ালা, পাণ্ডা, সন্ন্যাসী, সবাই একে একে ব্যর্থ চেষ্টা করে হার মেনেচে। অভাগী অলৌকিক উপায়ে উদ্ধার পেয়ে গেছে—কেউ তার কিছুই করতে পারেনি।

কেউ যে কিছুই করতে পারবে না সে আমিও জানতাম, তর্কে হারবার ভয়ে বোললাম, বই তো এখনো শেয় হয়নি, এরই মধ্যে অমন নিশ্চিন্ত হোয়ো না। এখনো কালীর বাবা বিশ্বনাথ স্বয়ং বাকি। তিনি চেষ্টা করলে ঠেকানো শক্ত।

তখনকার মতো মান থাকলো বটে, কিন্তু পড়া সাঙ্গ হবার পরে যে তা আর থাকবে না এও জানতাম! থাকেও নি। সে যাক, আমার মুখ থেকে ‘লীলাকমলে’র আলোচনা তোমার কাছেও হয়ত ঐ রকমই ঠেকবে। তাছাড়া বাইরে থেকে যে একটু শিখবো তারই কি জো আছে? কেউ বললেন, এমন বই আর হয়নি। এর ভাষা ভাব ছন্দ ছাপা ছবি—অতুলনীয়। নবশক্তি কাগজে আর এক বিশেষজ্ঞ– কে এক লীলাময়6 লিখলেন, এমন বিশ্ৰী বই আর হয় নি। এর সব খারাপ। এমন কি যতীনের7 ছবিটা পৰ্য্যন্ত তার কলঙ্ক। এবং তিনি হলে এর নাম রাখতেন ‘সূৰ্য্যমুখী’। একটাও ছবি দিতেন না এবং বালির কাগজে ছেপে প্রকাশ করতেন।

এমনি সব সমালোচনার নমুনা! আমার নিজের কিন্তু সত্যিই খুব ভালো লেগেছে। প্রথম যেদিন তোমার বই এলো, বইয়ের মোড়ক খুলতেই মনে হয়েছিল যেন কোন শিক্ষিত, ভদ্র বড়লোকের ঘরে নিমন্ত্রণে এসেছি। ভিতরে ভোজের ব্যবস্থাটি যে খাসা ও পরিপাটি হবে এ কথা মন যেন আপনিই আন্দাজ করে নিলে। তাই বটে। যেমন ভাষা তেমনি বাঁধুনি, তেমনি প্রকাশভঙ্গী। নিখুঁত বললেও অত্যুক্তি হয় না।

তবু একটা কথা যেন মাঝে মাঝে ছুঁচের মত বেঁধে সে এই যে, ভাবুকতায় এই কাব্যগ্রন্থখানির এত শোভা এত বর্ণচ্ছটা শব্দবিদ্যাসের এমন মাধুর্ধ্য—কিন্তু কোথাও তাদের বুনিয়াদ প্রত্যক্ষ অনুভূতির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। হৃদয়ের সম্পর্কে এদের নিত্যতা নেই। ভাল ত তুমি কখনো কাউকে সত্যি বাসোনি রাধু! তুমি বলবে—সবাই কি সত্যিই ভালবেসেছে, আর তারপরে কবিতা লিখেছে বড়দা? আমি তার জবাবে বোলবো—যদি না ভালবেসে থাকে সে তার দুভাগ্য। তার হৃদয়ের ব্যাকুলত বা কামনাকে দোষী করা যায় না। শুধু দুঃখ করে এইটুকুই বলা যায়, বেচাৱা সংসারে বঞ্চিত হয়েছে, মানুষ পায়নি,—সে ওর দোষ নয়—ভাগ্য। কিন্তু তোমার ত তা নয়। সেই লীলাময় লোকটা একটা কথা সত্যিই বলেছে যে, রাধারাণীর যোগ্য মানুষ দুনিয়ায় নেই, মানুষের প্রতি তার অত্যন্ত বিতৃষ্ণ। তাই ‘জীবনদেবতা’কে উংসর্গ।

কিন্তু, ও জিনিসটি কি ভাই? সত্যিই কি কিছু?…

গ্রন্থের প্রথম কবিতাটি কঠিন তিরস্কারের মত শুধু নির্দিষ্টকেই নয় পাঠককেও আঘাত করে। সমস্ত বইয়ের উপর যেন মুখ ভার করে তাকিয়ে আছে মনে হয়। তাই হয়ত লীলাময়ের বোধ হয়েছে এ গ্রন্থে আনন্দ নেই, আছে শুধু অভিযোগ।

তুমি ভাবো এ জীবনে তোমার মানুষকে ভালবাসা দুর্নীতি, পাপ। তোমাকেও যে কেউ ভালবাসবে সেও গর্হিত—অপরাধ! কেউ যদি তোমাকে বলে—বড়দা তোমাকে মনে মনে ভয়ানক ভালবাসে—শুনলে তুমি রাগে ক্ষেপে যাবে। বলবে —কি, এত বড় স্পৰ্দ্ধা। কারণ, মনে মনে তুমি প্রতিজ্ঞা ক’রে বসে আছ—এ দুনিয়ায় কাউকে নয়! এ সম্বন্ধে মনটা তোমার একটা নিশ্চয়তায় পৌঁছে একেবারে কঠিন হয়ে গেছে। এইখানেই মস্ত তফাৎ। আর এই তফাৎটার অতিশয়োক্তিই আকারে মাঝে মাঝে ধরা দেয় তোমার কবিতায়।

রাধু, একটা কথা মনে পড়ল, যৌবনে এককালে ফরাসী সাহিত্যের সখ ছিল। আজ প্রাচীন কালে তার কিছুই মনে নেই, সমস্তই ভুলে গেছি, শুধু দুটো ছত্ৰ মনে পড়ে—

Ah! I’afireaux esclavaga

Qui detre a soi.

ভাবটা এই যে, একান্ত স্বাধীনতার মত এত বড় দাসত্ত্ব আর নেই। যাক এ সব কথা। আমার চেয়ে তুমি ঢের বেশী বুদ্ধি ধরো আমি মনে করি। বইখানিতে না দেখার দোষে অনেকগুলি বানান ভুল হ’য়ে গেছে। শব্দের মাথায় বড় বেশি নিরর্থক কমার চিহ্ন পড়েছে—যথা বধু’র নূতনে’র মাধবী’র এই সব। কবিরা নিরঙ্কুশ বটে, কিন্তু এই দোষগুলো না করাই ভাল, যেমন ‘আলোক অমিয় ক্ষরা’। আলোক শব্দটা তো স্ত্রীলিঙ্গ নয়। রবিবাবুর কবিতায় প্রায় কোথাও এসব ভুল পাওয়া না। … … …তবুও এসব অতি তুচ্ছ কথা বোন। আজ ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে তোমাকে মস্ত বড় দেখতে পাচ্চি। আমার এ দেখায় ভুল হয়নি জেনো।

তুমি আমায় শিলঙেও নিমন্ত্ৰণ করেছ বটে, কিন্তু বাই কি কোরে। আমার ত সাহিত্যচর্চা একপ্রকার বন্ধই হয়েছে, কিন্তু আর একটা কাজ জুটেছে যে। দেশের এই অতি হাঙ্গামার সময়ে পালাই কি বলে? হাবড়া জেলার আমি আবার কংগ্রেসের President; কিছুই কৱিনে তবু থাকতে তো হয়। অথচ যাবার লোভও প্রবল। সাহিত্যচর্চ্চার অভ্যাসটা আমার প্রায় ছেড়েই গেছে। তোমাদের মত সাহিত্যিকের কাছে এলে আবার যদি তার কিছু অংশ ফিরে পাই তো অনেক লাভ। আমার মতো কুঁড়ে মানুষ সংসারে জার দ্বিতীয় নেই। একান্ত বাধ্য না হলে কখনও কোন কাজই আমি করতে পারিনে। তবুও এতগুলো বই লিখেছিলাম কি করে? সেই ইতিহাসটাই বলি।

আমার একজন ‘গায়েন’8 ছিলেন। এর পরিচয় জানতে চেয়ো না। শুধু এইটুকু জেনে রাখ, তার মত কড়া তাগাদাদার পৃথিবীতে বিরল। এবং তিনিই ছিলেন আমার লেখার সব চেয়ে কঠোর সমালোচক। তাঁর তীক্ষ্ণ তিরস্কারে না ছিল আমার আলস্যের অবকাশ, না ছিল লেখার মধ্যে গোঁজমিলের সাহায্যে ফাঁকি দেবার সুযোগ। এলো-মেলো একটা ছত্রও তার কখনো দৃষ্টি এড়াতো না। কিন্তু, এখন তিনি সব ছেড়ে ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম নিয়েই ব্যস্ত। গীতা-উপনিষদ ছাড়া কিছুই আর তার চোখে পড়ে না। কখনো খোঁজও করেন না এবং আমিও বকুনি ও তাড়া খাওয়া থেকে এজন্মের মত নিস্তার পেয়ে বেঁচে গেছি। মাঝে মাঝে বাইরের ধাক্কায় প্রকৃতিগত জড়তা যদি ক্ষণকালের জন্য চঞ্চল হয়ে ওঠে, তখনি আবার মনে হয়—ঢের ত লিখেচি—আর কেন? এ জীবনের ছুটিটা যদি এইদিক থেকে এমনি করেই দেখা দিলে তখন মিয়াদের বাকী দু-চারটে বছর ভোগ করেই নিই না কেন? কি বল রাধু? এই কি ঠিক নয়? অথচ লেখবাৱ কত বড় বৃহৎ অংশই না অলিখিত রয়ে গেল। পরলোকে বাণীর দেবতা যদি এই ক্রটির জন্য কৈফিয়ৎ তলব করেন তো তখন আর একজনকে দেখিয়ে দিতে পারবো এই আমার সান্ত্বনা।

কিন্তু, আর না। রাত অনেক হ’ল; তোমারও অনেক সময় নষ্ট করে দিলাম। এদিকে টের পাচ্চি যে ঘুম চোখে যা লিখে গেলাম তার হয়ত অসঙ্গতির সীমা নেই। অথচ এ চিঠি ফিরে পড়বারও সাহস নেই—আশঙ্কা আছে তা হলে বোধ করিবা ছিড়ে ফেলে দেবো; আর হয়ত পাঠানোই হবে না। তাই খামের ভেতর বন্ধ করে দিচ্চি। যদি অন্যায় কোথাও কিছু লিখে ফেলে থাকি বড়দা বলে ক্ষমা কোরো। ইতি—২০শে বৈশাখ, ১৩৩৭।

তোমার বড়দা

টীকা

  1. ‘লীলাকমল’ কবিতা পুস্তক
  2. এই সময় রাধারাণী দেবী শিলঙ-এ ছিলেন
  3. নিরুপমা দেবী
  4. জলধর সেন।
  5. শরৎচন্দ্রের স্ত্রী হিরন্ময়ী দেবী
  6. লীলাময় ছদ্মনামে অন্নদাশঙ্কর রায়
  7. শিল্পী যতীন্দ্রকুমার সেন
  8. জনৈক মহিলা সাহিত্যিক
গ্রন্থাবলী
মতামত জানান