শরৎ পত্রাবলী » প্রমথনাথকে লিখিত

পাতা তৈরিফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৬; ০০:০৫
সম্পাদনাঅক্টোবর ২৬, ২০২০, ০০:২২
দৃষ্টিপাত
D. A. G.’s Office, Rangoon 22. 8. 12 প্রমথ—তোমার পত্র পাইয়া আজই জবাব লিখিতেছি, এমন ত হয় না। যে আমার স্বভাব জানে, তাহার কাছে নিজের সম্বন্ধে এর বেশী জবাবদিহি করা বাহুল্য। অনেক সময়েই যে তুমি আমার কথা মনে করিবে, তাহা আমি জানি। কেন না যাদের মনে করার কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই, ...

D. A. G.’s Office, Rangoon

22. 8. 12

প্রমথ—তোমার পত্র পাইয়া আজই জবাব লিখিতেছি, এমন ত হয় না। যে আমার স্বভাব জানে, তাহার কাছে নিজের সম্বন্ধে এর বেশী জবাবদিহি করা বাহুল্য।

অনেক সময়েই যে তুমি আমার কথা মনে করিবে, তাহা আমি জানি। কেন না যাদের মনে করার কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই, তারাও যখন করে, তখন তুমি ত করবেই।

আমার ভাগ্যবিধাতা আমার সমস্ত শাস্তির বড় এই শাস্তিটা জন্মকালেই বোধ হয় আমার কপালে খুদিয়া দিয়াছিলেন। আজ যদি আমি বুঝিতে পারিতাম, আমার পরিচিত আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধবের সবাই আমাকে ভুলিয়া গিয়াছেন—আমি সুখী হইতাম, শান্তি পাইতাম। তা হইবার নয়। আমাকে ইহার স্মরণ করিবেন, সন্ধান জানিতে চাহিবেন, বিচার করিবেন, এবং অনবরত আমার অধোগতির দুঃখে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া আমার মর্মান্তিক দুঃখের বোঝা অক্ষয় করিয়া রাখিবে। লোকে যে আমার কাছে কি আশা করিয়াছিলেন, কি পান নাই, এবং কি হইলে যে আমাকে নিষ্কৃতি দিতে পারেন, এ যদি আমাকে কেহ বলিয়া দিতে পারিত, আমি চিরটাকাল তাহার কাছে কৃতজ্ঞ হইয়া থাকিতাম। এত কথা বলিতাম না যদি তুমি গত কথা না স্মরণ করাইয়া দিতে। আমি মরিয়া গিয়াছি—এই কথাটা যদি কোনো দিন কারো দেখা পাও—বলিয়ো।

তাই বলিয়া তুমি মনে যেন দুঃখ পাইয়ো না। তোমাকে আমি ভয় করি না। কেন না, তুমি বোধ হয় আমার বিচার করিবার গুরু ভার লইতে চাহিবে না। তাই তোমার কাছে আরো কয়টা দিন বাচিয়া থাকিলেও ক্ষতি হইবে বলিয়া মনে করি না। তুমি আমার বন্ধু এবং শুভানুধ্যায়ী। বিচারক হইয়া আমার মর্মান্তিক করিবে না এই আশাই তোমার কাছে করি।

আমার সম্বন্ধে কিছু জানিতে চাহিয়াছ—তাহা সংক্ষেপে কতকটা এইরূপ—

(১) সহরের বাহিরের একখানা ছোটো বাড়িতে মাঠের মধ্যে এবং নদীর ধারে থাকি।

(২) চাকরি করি। ৯০৲ টাকা মাহিনা পাই এবং দশ টাকা allowance পাই। একটা ছোটো দোকানও1 আছে। দিনগত পাপক্ষয়, কোনোমতে কুলাইয়া যায় এই মাত্র। সম্বল কিছুই নাই।

(3) Heart disease আছে। কোনো মুহূর্ত্তেই—

(৪) পড়িয়াছি বিস্তর। প্রায় কিছুই লিখি নাই। গত দশ বৎসর Physiology, Biology and Psychology or কতক History পড়িয়াছিI শাস্ত্রও কতক পড়িয়াছি।

(৫) আগুনে পুড়িয়াছে আমার সমস্তই।2 লাইব্রেরী এবং ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের manuscript—‘নারীর ইতিহাস’ প্রায় ৪০০/৫০০ পাতা লিখিয়াছিলাম তাও গেছে। ইচ্ছা ছিল যা হৌক একটা এ বৎসর publish করিবে। আমার দ্বারা কিছু হয় এ বোধ হইবার নয়, তাই সব পুড়িয়াছে! আবার শুরু করিব, এমন উৎসাহ পাই না। ‘চরিত্রহীন’ ৫০০ পাতায় প্রায় শেষ হইয়াছিল—সবই গেল।

তোমার ক্লাবের কথা শুনিয়া অভ্যস্ত আনন্দ পাইলাম। কিরূপ হয় মাঝে মাঝে লিখিয়া জানাইও। নিজেও কিছু করা ভাল—হুজুগের মধ্যে এ কথাটা ভোলা উচিত নয়। তোমার যে রকম স্বভাব তাহাতে তুমি এতগুলি লোকের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হইয়া পড়িবে তাহা মোটেই বিচিত্র নয়।

আমাদের আগেকার ‘সাহিতা-সভা’র একটিমাত্র সভ্য ‘নিরুপমা দেবী’ই সাহিত্যের চর্চ্চা রাখিয়াছেন—আর সকলেই ছাড়িয়াছে—এই না?

আমার আগেকার কোন লেখা আমার কাছে নাই—কোথায় আছে, আছে কি না-আছে কিছুই জানি না—জানিতে ইচ্ছাও করি না।

আর একটা সংবাদ তোমাকে দিতে বাকী আছে। বছর তিনেক আগে যখন Heart disease-এর প্রথম লক্ষণ প্রকাশ পায় তখন আমি পড়া ছাড়িয়া oil.painting শুরু করি। গত তিন বৎসরে অনেকগুলি oil painting সংগ্ৰহ হইয়াছিল—তাহাও ভস্মসাৎ হইয়াছে। শুধু আঁকিবার সরঞ্জামগুলা বাঁচিয়াছে।

এখন আমার কি করা উচিত যদি বলিয়া দাও ত তোমার কথামত দিনকতক চেষ্টা করিয়া দেখি।

(1) Novel, History, Painting.

কোনটা? কোনটা আবার শুরু করি বল ত?

তোমার স্নেহের শরৎ

টীকা

  1. শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি চায়ের দোকান ছিল
  2. বাল্যবন্ধু প্রমথনাথ ভট্টাচার্য্যের অনুরোধে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের কিয়দ্দংশ ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় প্রকাশের জন্য পাঠাইয়াছিলেন। কিন্তু চরিত্রহীনের প্রকাশ লইয়া বহু বিতর্ক হইয়াছিল। ‘সাহিত্য’ পত্রিকার সম্পাদক সুরেশচন্দ্র সমাজপতি উহা ছাপাইবার আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছিলেন, কিন্তু তিনিও শেষে পিছাইয়া যান। শেষে ফণীন্দ্রনাথ পাল সম্পাদিত ‘যমুনা’ পত্রিকায় উহা প্রকাশিত হয়। এই চরিত্রহীনের পাণ্ডুলিপি একবার আগুনে পুড়িয়া গিয়াছিল, কিন্তু শরৎচন্দ্র আবার উহা রচনা করিয়াছিলেন।
গ্রন্থাবলী
মতামত জানান