শরৎ পত্রাবলী » দিলীপকুমার রায়কে লিখিত

পাতা তৈরিফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৬; ০০:০১
সম্পাদনাঅক্টোবর ২৭, ২০২০, ০০:২১
দৃষ্টিপাত
পানিত্রাস পোষ্ট, গ্রাম সামতাবেড়,হাবড়া জেলা। ২২শে ভাদ্র ১৩৩৩ মণ্টুরাম,—তোমার বই এবং ছোট্ট চিঠিখানি পেলাম। কাল দিনে রেতে বইখানি পড়ে শেষ করলাম। চমৎকার লাগলো। তবে দু’একটা ত্রুটিও আছে। ভারতের বড় বড় গাইয়ে বাজিয়ের মধ্যে আমার নাম না দেখতে পেয়ে কিছু ক্ষুন্ন হোলাম। তবে নিশ্চয় জানি এ তোমার ইচ্ছাকৃত নয়, অনবধানতাবশতঃই হয়ে ...

পানিত্রাস পোষ্ট, গ্রাম সামতাবেড়,
হাবড়া জেলা। ২২শে ভাদ্র ১৩৩৩

মণ্টুরাম1,—তোমার বই এবং ছোট্ট চিঠিখানি পেলাম। কাল দিনে রেতে বইখানি পড়ে শেষ করলাম। চমৎকার লাগলো। তবে দু’একটা ত্রুটিও আছে। ভারতের বড় বড় গাইয়ে বাজিয়ের মধ্যে আমার নাম না দেখতে পেয়ে কিছু ক্ষুন্ন হোলাম। তবে নিশ্চয় জানি এ তোমার ইচ্ছাকৃত নয়, অনবধানতাবশতঃই হয়ে গেছে, এবং ভবিষ্যতে এ ভ্ৰম যে তুমি শুধরে দেবে তাতেও আমার লেশমাত্র সংশয় নেই। ওটা দিয়ো, ভুলো না। রায় বাহাদুর মজুমদার মশায়ের রাঙা জবা মুটো মুটো মুটোর উল্লেখ কই? ওটাও চাই। কারণ, তিনিও ক্ষুন্ন হয়েছেন বলেই আমার বিশ্বাস। এ তো গেল বইয়ের ত্রুটির কথা, একটা মতভেদের বিষয়ও আছে। তুমি পূজনীয় রবিবাবুর একটা উক্তি তুলে দিয়েছ যে “আমরা সর্ব্বসাধারণকে অশ্রদ্ধা করি বলেই তাদের চিঁড়ে-মুড়কির বরাদ্দ করি, বাইরের প্রাঙ্গণে আর সন্দেশগুলো বাঁচিয়ে রাখি” ইত্যাদি ইত্যাদি। এই কথাটা শুনতে ভালো এবং যিনি লেখেন তাঁরও মানসিক ঔদার্য্য এবং নিরপেক্ষতাও প্রকাশ পায় সত্য, কিন্তু আসলে এতবড় ভুল বাক্যও আর নেই। শিক্ষা সভ্যতা এবং কালচারের জন্য সন্দেশই চাই, চিঁড়ে-মুড়কি খাওয়াবার চেষ্টা করলে তারা পেট কামড়ানিতে সারা হয়। আর সর্ব্বসাধারণ মানেই ছোটলোক। তারা চিঁড়ে-মুড়কিতেই thrive করে। একটা concrete দৃষ্টান্ত নাও। সাধারণ মানে ছোটলোক, মা—ও ছোটলোক। এই মা—র পয়সা হওয়ায় ও তোমাদের মত দু’চার জনের প্রশ্রয় পাওয়ায় আজকাল তারা 3rd class ছেড়ে 2nd class compartmentএ উঠতে আরম্ভ করেছে। (1st classএ সাহেবের ভয়ে ওঠে না এই যা কতক রক্ষে) আচ্ছা, কোন compartmentএ জন দুই তিন মা—কে ঘণ্টা ৩/৪ ঢুকিয়ে রাখবার পরে আর সাধ্য নাই কারও যে সে ঘর ব্যবহার করে। হাতে মাটির জন্যে এক ঝুড়ি মাটি থেকে শুরু করে ছোলাসেদ্ধ, পকোড়া, থুথু, গয়ার এবং হেগে-মুতে এমন কাণ্ড করে রেখে বেরিয়ে যাবে যে সে দৃশ্য যে দেখেচে সে আর ভুলবে না। আসল কথা, অন্দরে শোবার ঘরে বসে সন্দেশ ভোজন করার যোগ্যতা আগে অর্জ্জন করা চাই। নইলে অন্দরের দোর খোলা পেয়ে একবার তারা জিঁ হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ ক’রে ঢুকে পড়লে আমরা আর বাঁচবো না। অতএব এরূপ অশ্রদ্ধেয় বাক্য আর কখনো বোলো না।

তোমার concertএ যেতে পারি নি শরীর একটু অসুস্থ ছিল বলে। আরও একটা হেতু এই যে, মেদিনীপুরে প্রতি বৎসরেই কোথাও-না-কোথাও বন্যা হবেই। হতে বাধ্য। Govt. তার কোন উপায় করে না করবে না। এ হয়েছে দেশের উপরে একটা স্থায়ী tax, এমন কোরে বছর বছর বন্যাপীড়িতের সাহায্য করার সার্থকতা কি? Govt.কে তারা একটা কথা জোর করে বলবে না, এক কোদাল মাটি কেটে রেলের রাস্তা ভেঙে যে জল বার করে দেবে তা দেবে না, পাছে সাহেবরা ধরে জেলে দেয়। তারা জানে কলকাতার ভদ্র লোকের মহাকৰ্ত্তব্য হচ্চে তাদের খাওয়া পরা দেওয়া যেহেতু তাদের ঘরে দোরে জল উঠেছে। তা ছাড়া পদ্মার চরে মো—রা কেন দল বেঁধে বাস করে জানো? শুধু এই জন্যে যে বর্ষায় তাদের ঘর দোর ভেসে গেলেই পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের টাকা দিতে হবে। শুধু out of malice এবং spite তারা গিয়ে ঐ রকম ভয়ানক যায়গায় বাস করেছে। এ ছাড়া তাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। আমি নিশ্চয় জানি এ সম্বন্ধে তোমার সঙ্গে আমার কোন প্রকার মতভেদ হবার আশঙ্কা নেই। কারণ, তুমি বুদ্ধিমান, যা সত্যি কথা তা বুঝবেই।

তুমি বিলেত যাচ্চো খবরের কাগজে দেখলাম। আশীৰ্ব্বাদ করি তোমার যাত্রা নির্ব্বিঘ্ন হোক, উদ্দেশ্য সফল হোক। আমার বয়স হয়েছে, ফিরে এসে যদি আর দেখা না হয় এই কথাটি মনে রেখো আমি চিরদিন তোমার শুভকামনা করে গেছি। আশা করি তোমার কুশল।—শ্ৰীশরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পু:—আগামী ৩১শে ভাদ্র আমার বয়স পঞ্চাশ হবে। ১লা আশ্বিন যাবো কলকাতায় তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে।

টীকা

  1. শ্রীদিলীপকুমার রায়ের উপনাম ছিল মণ্টু।
গ্রন্থাবলী
মতামত জানান