শরৎ পত্রাবলী » অমল হোমকে লিখিত

পাতা তৈরিফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৬; ০০:০২
সম্পাদনাঅক্টোবর ২২, ২০২০, ২১:৪৪
দৃষ্টিপাত
সামতাবেড়, পানিত্রাস, হাবড়া ২৮শে পৌষ, ১৩৩৮ [জানুয়ারী, ১৯৩২] পরম কল্যাণীয়েষু, অমল, ফিরে এসে অবধি ভাবছি তোমাকে লিখব, কিন্তু শরীরে দেয়নি। আমি চিরকাল ঘুম-কাতুরে মানুষ, কিন্তু কি যে হয়েছে জানিনে,—আমার ঘুম যেন কোথায় পালিয়েছে। শরীরে এমন অস্বস্তি কখনো বোধ করিনি। পায়ের একটা পুরোনো ব্যাথাও যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। সত্যি অমল, ...

সামতাবেড়, পানিত্রাস, হাবড়া

২৮শে পৌষ, ১৩৩৮ [জানুয়ারী, ১৯৩২]

পরম কল্যাণীয়েষু,

অমল, ফিরে এসে অবধি ভাবছি তোমাকে লিখব, কিন্তু শরীরে দেয়নি। আমি চিরকাল ঘুম-কাতুরে মানুষ, কিন্তু কি যে হয়েছে জানিনে,—আমার ঘুম যেন কোথায় পালিয়েছে। শরীরে এমন অস্বস্তি কখনো বোধ করিনি। পায়ের একটা পুরোনো ব্যাথাও যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।

সত্যি অমল, আমি যে কতখানি খুশী হয়ে এসেছি, সে তোমরা (না তুমি ?) টাউন হলে সভাপতির আসনে আমাকে টেনে বসালে1 আমার গলায় মালা দিলে বলে নয়,—আমার লেখা মানপত্র কবির হাতে দিলে বলেও নয়—যেভাবে এই বিরাট ব্যাপারটি সম্পন্ন হ’ল, এ অনুষ্ঠানটিকে যে নিষ্ঠায়, শ্রমে ও শ্রদ্ধায় সার্থক ক’রে তুললে,—তাতেই আমার আনন্দ, অকপট আনন্দ। কবির সম্বন্ধে আমি এখানে ওখানে কখনো কখনো মন্দ কথা বলেছি, রাগের মাথায়—এ যেমন সত্যি- এও তেমনি সত্যি যে, আমার চাইতে তাঁর বড় ভক্ত আর কেউ নেই,—আমার চাইতে তাকে কেউ বেশী মানেনি গুরু বলে,—আমার চাইতে কউ বেশী মক্‌সো করেনি তাঁর লেখা। তাঁর কবিতার কথা বলতে পারবো না, কিন্তু আমার চাইতে বেশীবার কেউ পড়েনি তার উপন্যাস,—তার চোখের বালি, তাঁর গোরা, তাঁর গল্পগুচ্ছ। আজকের দিনে যে এত লোকে আমার লেখা প’ড়ে ভাল বলে, সে তারি জন্য। এ সত্য, পরম সত্য আমি জানি। আর কেউ বললে কি না-বললে, মানলে, কি না-মানলে, তাতে কিছু এসে যায় না। তাই আমি আমার সমস্ত অন্তর দিয়ে যোগ দিয়েছি এই জয়ন্তীতে, না দিয়ে পারিনি। মস্ত বড় কাজ করেছ তুমি। প্রাণ ভরে তোমাকে আশীৰ্ব্বাদ করি।

শুনেছি তুমি এই জয়ন্তী ক’রে কলকাতায় বাড়ি তুলছ, গাড়ি হাকাচ্ছ! তোমার আমার বন্ধুরাই এ কথা পরম উৎসাহে প্রচার করেছেন। জয়ন্তীর গোড়ায় এসে গুনেছি, স্বয়ং কবি তোমাকে খাড়া করেছেন, তাঁর শিখণ্ডী মাত্ৰ তুমি—পেছনে থেকে তিনিই তোমাকে সব করাচ্ছেন। এ যে বাংলাদেশ অমল। ‘সোনার বাংলা!’ তবু বলতে হবে—’আমি তোমায় ভালবাসি!’

মনে কোন ক্ষোভ রেখো না—যে যা বলে বলুক। আমি জানি তোমার বাড়ি হয়নি, গাড়িও হয়নি—যে গাড়ি চড়ে বেড়াও সে বুঝি কর্পোরেশনের। বাস্, ঐ পৰ্য্যন্ত। তা না হোক—তোমার ভাল হবে। দেশের মুখ রেখেছ তুমি। তোমাকে সমস্ত অন্তর থেকে আবার আশীৰ্ব্বাদ জানাই!

তোমার—শরৎদা

টীকা

  1. রবীন্দ্র-জয়ন্তীতে রবীন্দ্র-সাহিত্য আলোচনা-সভায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সভাপতি ছিলেন।
গ্রন্থাবলী
মতামত জানান