ফেলুদা সমগ্র » জয় বাবা ফেলুনাথ

পাতা তৈরিডিসেম্বর ৩, ২০২০; ০০:১৪
সম্পাদনাডিসেম্বর ১৫, ২০২০, ১৩:১৯
দৃষ্টিপাত
‘কাশীধামে ফেলুদা’ লেখা শুরু হয় সাত জুন ১৯৭৫ সালে এবং শেষ হয় একুশে জুন ১৯৭৫—মাত্র একুশ দিনে লেখাটি সমাপ্ত করেন সত্যজিৎ রায়। ১৩৮২র শারদীয়া দেশে এটি ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছেন সত্যজিৎ রায়, প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স। আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত ‘ফেলুদার সপ্তকাণ্ড’-এ সঙ্কলিত হয় নভেম্বর ১৯৯৮এ। ...

রহস্য রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলী ওরফে জটায়ু প্লেট থেকে একটা চীনাবাদাম তুলে নিয়ে ডান হাতের বুড়ো আঙুল আর তার পাশের আঙুল দিয়ে সেটার উপর একটা হালকা হুঁশিয়ার চাপ দিতেই ব্ৰাউন খোলসের মধ্যে থেকে মসৃণ ফরসা বাদামটা সুডুৎ করে বেরিয়ে তাঁর বাঁ হাতের তেলোর উপর পড়ল। সেটা মুখে পুরে খোসাটা সামনের টেবিলে রাখা অ্যাশ-ট্রেতে ফেলে দিয়ে হাত ঝেড়ে ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন, দেশাশ্বমেধ ঘাটে বিজয়া দশমী দেখেছেন কখনও?

ফেলুদার সামনে দাঝার বোর্ড, তার উপরে একটা সাদা রাজা, একটা সাদা গজ আর একটা সাদা বোড়ে, আর একটা কালো রাজা আর দুটো কালো ঘোড়া। বোর্ডের পাশে গ্রেট গেমস অফ চেস বলে একটা বই খোলা; ফেলুদা তার মধ্যে থেকে একটা চ্যাম্পিয়নশিপ গেম বেছে নিয়ে তার চালগুলো বই দেখে দেখে চলিছিল। খেলার প্রায় মাঝামাঝি লালমোহনবাবু এসে পড়েন। আজকাল আর ওঁর সঙ্গে বাড়াবাড়ি রকম ভদ্রতা না করলেও চলে, তাই ফেলুদা শ্ৰীনাথকে চা আনতে বলে খেলাটা শেষ করে নিচ্ছিল, আর চালের ফাঁকে ফাঁকে লালমোহনবাবুর প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিল। এ-প্রশ্নটার জবাবেও সে বই থেকে চোখ না তুলেই বলল, উঁহু।

ওঃ-সে যা ব্যাপার না। সে এক, যাকে বলে, জমজমাট ব্যাপার। সে মশাই আপনি না। দেখলে ইয়েই করতে পারবেন না।

ফেলুদা খেলার শেষ চালটা চেলে বোর্ডের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, আপনি কি আমায় লোভ দেখাবার চেষ্টা করছেন?

তা কতকটা ঠিকই ধরেছেন, হেঃ হেঃ!

কিন্তু আপনি যে-ভাবে বর্ণনা করলেন তাতে আপনার চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য।

কেন?-লালমোহনবাবুর ভুরু দুটো নাকের উপর জুড়ে গিয়ে সেকেন্ড ব্র্যাকেট হয়ে গেল।

ফেলুদা বোর্ড ভাঁজ করে খুঁটিগুলো বাক্সে ভারতে ভরতে বলল, কারণ কোনও ঘটনা বা দৃশ্য সম্পর্কে কেবলমাত্র জমজমাট বিশেষণটা ব্যবহার করলে আসলে কিছুই বলা হল না। ওতে চোখের সামনে কোনও ছবি ফুটে ওঠে না, ফলে দশাশ্বমেধে বিজয়া-দশমীর বিশেষত্বটা কিছুই বোঝা যায় না, আর তার ফলে ফেলুমিত্তিরের মনে কোনও সাড়া জাগে না। আপনি উপন্যাস লেখেন, আপনার বর্ণনা এত দায়সারা হবে কেন?

ঠিক বলেছেন, ঠিক বলেছেন, লালমোহনবাবু জিভ কেটে ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন। আসলে প্ৰায় পচিশ বছর হয়ে গেল তো, তাই ডিটেলগুলো সব মাথার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে গেছে। তবে দশাশ্বমেধে ভাসান দেখে চােখ-কান ধাঁধিয়ে গোসূল এটা বেশ মনে আছে।

ওইতো-চোখ এবং কান। বর্ণনায় ওই দুটোর জন্য খোরাক চাই, সম্ভব হলে নাকও।

নাক –লালমোহনবাবুর ভুরু দুটো উপর দিকে উঠে এক জোড়া খিলেন হয়ে গেল।

সম্ভব হলে।..কলকাতার রাস্তাঘাটে এমনিতে কোনও যে বিশেষ গন্ধ পাওয়া যায় তা না। লেক মার্কেটের কাছে বিকেলের দিকটা বেলফুলের গন্ধ, বা নিউ মার্কেটের পশ্চিম দিকে বাট্ৰাম স্ট্রিটের কোনও বিশেষ অংশে শুটকি মাছের গন্ধ, হাসপাতালের কাছে ডিসাইনফেক্টন্টের গন্ধ, শ্মশানের কাছে মড়া পোড়ার গন্ধা—এই সবই নিশ্চয় লক্ষ করে থাকবেন। তেমনি কাশীর, বর্ণনাতেও কিছু কিছু গন্ধের উল্লেখ না করলে কি চলে? বিশ্বনাথের গলিতে ধূপ ধুনো গোবর শ্যাওলা লোকের ঘাম মেশানো গন্ধ, আবার গলি ছেড়ে বাইরে এসে বড় রাস্তা দিয়ে ঘাটের দিকে হাঁটার সময় কিছুক্ষণ প্রায় একটা নিউট্রাল গন্ধহীন অবস্থা, আবার ঘাটের সিঁড়ি যেই শুরু হল অমনি ধাপে ধাপে একটা উগ্র গন্ধ ক্ৰমে বেড়ে গিয়ে প্রায় পেটের ভাত উলটে আসার অবস্থা। সেটা যে ওই বোকাপািঠাগুলোর গা থেকে বেরোচ্ছে সেটা যে না জানে তার বুঝতে কিছুটা সময় লাগবে। তারপর ছাগলগুলোকে পিছনে ফেলে একটু এগোলেই পাবেন একটা গন্ধ যাতে জল মাটি তেল ঘি ফুল চন্দন ধূপ ধুনো সব একসঙ্গে মিশে রয়েছে।

তার মানে আপনি বেনারস গেছেন, মন্তব্য করলেন জটায়ু।

গেছি। তখন কলেজের ছাত্র। হিন্দু ইউনিভার্সিটির সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে গেসলাম।

লালমোহনবাবু পকেট হাতড়াচ্ছেন দেখে ফেলুদা বলল, আপনি যে কাগজের কাটিংটা খুঁজছেন, সেটা আপনি ঘরে ঢোকার আধ মিনিটের মধ্যে আপনার পকেট থেকে বেরিয়ে মাটিতে পড়ে এখন ওই টেলিফোনের টেবিলের পায়ায় লটকে আছে।

এঃ হে–রুমালটা বার করার সময়…

লালমোহনবাবু ওঠার আগেই আমি কাগজটা তুলে ওঁর হাতে এনে দিলাম। ফেলুদা বলল, ওটা সেই কালকের খবরটা তো? কাশীর সেই সাধুবাবার ব্যাপার?

লালমোহনবাবু ভারী ব্যস্ত হয়ে বললেন, আপনি জানেন, তবু এতক্ষণ কিছু বলেননি? কী রহস্যজনক ব্যাপার বলুন তো।

আমি লালমোহনবাবুর হাত থেকে কাটিং-টা নিয়ে দেখলাম তাতে লেখা রয়েছে–

বারাণসীর মছলি–বাবা

বারাণসীতে গত বৃহস্পতিবার এক সাধুবাবার আবির্ভাব শহরে বিশেষ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে বলে জানা গেল। অভয়চরণ চক্রবর্তী নামক বাঙালিটোলার জনৈক প্ৰবীণ বাসিন্দা কেদার ঘাটে প্রথম সাধুবাবার সাক্ষাৎ পান, এবং অচিরেই তাঁর অলৌকিক শক্তির পরিচয় পান। সাধুবাবা আপাতত শ্ৰীচক্রবর্তীর গৃহেই অবস্থান করছেন। ভক্তগণের নিকট ইনি মছলি-বাবা নামে পরিচিত। তাঁরা বলেন, বাবাজী নাকি প্রয়াগ থেকে গঙ্গাবক্ষে ভাসমান অবস্থায় বারাণসীতে এসে পৌঁছেছেন।

এ-ধরনের সাধুবাবার কথা আজকাল এত শোনা যায় যে আমার কাছে খবরটা তেমন একটা কিছু বলে মনে হল না। কিন্তু লালমোহনবাবু দেখলাম ভয়ংকরীভাবে মেতে উঠেছেন। বললেন, হয়তো সেই একেবারে তিব্বতে গঙ্গার সোর্স থেকে ভাসা শুরু করেছেন। ভাবলেও গায়ে কাঁটা দেয়।

গঙ্গার সোর্স তিব্বতে এ খবর কে দিল আপনাকে?

ও হা হে, সরি-ওটা বোধহয় ব্ৰহ্মপুত্ৰ! যাই হোক–তিব্বত না হোক হিমালয় তো! তাই বা কম কীসে?

আপনার কি তাকে দর্শন করার ইচ্ছে জেগেছে?

যেমন-তেমন সাধু হলে হত না, কিন্তু এর মধ্যে একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছেন না আপনি? মছলি-বাবা–নামটাই তো ইউনিক।

ফেলুদা তত্ত্বপোশ থেকে উঠে পড়ল। নামটা মন্দ হয়নি সেটা স্বীকার করছি। খবর পড়ে ওই একটি জিনিসই মনে দাগ কাটে, আর কিছু নয়। কাশী যদি যেতেই হয় তো মছলি-বাবার জন্য নয়। কচৌরি গলির হনুমান হালুইকরের রাবাড়ির স্বাদ এখনও মুখে লেগে রয়েছে। ও জিনিসটা তো কলকাতার বাজার থেকে উঠেই গেছে।

আর ধরুন যদি গিয়ে দেখেন যে হালুইকরকে কোনও অজ্ঞাত আততায়ী খুন করে গেছে—তার রাবডির রসে রক্তের ছিটে পড়ে রস গোলাপি হয়ে গেছে—তা হলে তো কথাই নেই। কাশীও হল, কেস ও হল, ক্যাশও হল–হাঃ হাঃ। এক ঢিলে তিন পাখি। আপনি তো বেশ কিছুদিন বসে, তাই না?

কথাটা ঠিকই। মাস তিনেক হল ফেলুদার হাতে কোনও কাজ নেই। অবিশ্যি তার একটা কারণ আছে, আর সেটা আমি এর আগেও বলেছি। ফেলুদা বলে একটা ক্রাইমের পিছনে যদি কোনও তীক্ষাবুদ্ধি ক্রিমিন্যালের কারসাজির ছাপ না থাকে, তা হলে সে-ক্রাইমের কিনারা করতে বিশেষ মাথা খাটানোর প্রয়োজন হয় না, আর মাথা না খাটাতে পারলে ফেলুদার তৃপ্তি হয় না। কাজেই কেস মামুলি বুঝতে পারলে সে বেশির ভাগ সময়ই মক্কেলকে ফিরিয়ে দেয়।

এক কথায় ফেলুদা চায় তার তীক্ষ বুদ্ধিটাকে শানিয়ে নেবার সুযোগ। সে সুযোগ গত তিন মাসের মধ্যে আসেনি। এই অবসরে অবিশ্যি ফেলুদা অজস্র বই পড়েছে, নিয়মিত যোগব্যায়াম করেছে, সিগারেট খাওয়া কমিয়েছে, দাবা খেলেছে, দুবার চুল ছটিয়েছে, দুটো বাংলা, একটা হিন্দি আর পাঁচটা বিদেশি ছবি দেখেছে, এক’দিন আমাকে সঙ্গে করে শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় থেকে বালিগঞ্জে আমাদের বাড়ি অবধি হেঁটে এসেছে এক ঘণ্টা সাতান্ন মিনিটে। এর মধ্যে একবার দাড়ি-গোঁফ রাখবে বলে সাতদিন শেভিং বন্ধ করে আট দিনের দিন আয়নায় নিজের চেহারা দেখে মত পালটিয়ে আবার পুরনো চেহারায় ফিরে গেছে।

লালমোহনবাবু বললেন, আপনার কেস নেই, আর আমার মাথায় গল্পের প্লট নেই। এই প্রথম পুজোয় আমার বই বেরোল না, জানেন তো? আগে তো এ-বই সে-বই থেকে এটা ওটা খামচে নিয়ে তার উপর কিছুটা রং চড়িয়ে যা হোক একটা কিছু খাড়া করে দিতাম; আপনার হাতে বার বার ধরা পড়ে চুরি বিদ্যে তো নো লংগার বড় বিদ্যে, তাই এখন নিজেরই মাথা খাটাতে হয়। ভাবছিলুম কলকাতার এই বদ্ধ আবহাওয়া থেকে বেরোতে পারলে বোধহয় ব্ৰেনটা কিছুটা খুলত।

যেতে পারি, তবে একটা রিস্ক আছে।

কী রিস্ক?

গিয়ে-টিয়ে শেষটায় আমিও কেস পেলাম না, আপনিও প্লট পেলেন না।

বেনারস গিয়ে লালমোহনবাবু গল্পের প্লট পেয়েছিলেন ঠিকই; তবে ফিরে আসার দুমাস পরে বড়দিনে তাঁর যে রহস্য উপন্যাসটা বেরোল, সেটার সঙ্গে টিনটিনের একটা গল্পের আশ্চর্য মিল।

ফেলুদার কিন্তু গিয়ে সত্যিই লাভ হয়েছিল। তা না হলে অবিশ্যি এ বইটাই লেখা হত না। ফেলুদার জীবনে সবচেয়ে ধুরন্ধর ও সাংঘাতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে তাকে এই বেনারসেই লড়তে হয়েছিল। ও পরে বলেছিল-এই রকম একজন লোকের জন্যই অ্যাদ্দিন অপেক্ষা করছিলাম রে তোপসে। এ সব লোকের সঙ্গে লড়ে জিততে পারলে সেটা বেশ একটা

দশাশ্বমেধ ঘাটের রাস্তার উপর পঞ্চাশ বছরের পুরনো বাঙালি হোটেল ক্যালকাটা লজ। হাটেলের ম্যানেজার নিরঞ্জন চক্রবর্তী লালমোহনবাবুর গড়পারের প্রতিবেশী পুলক চ্যাটার্জির ভায়রা ভাই। পুলকবাবু আগে থেকে আমরা আসছি বলে জানিয়ে দেওয়াতে হোটেলে জায়গা পেতে কোনও অসুবিধা হয়নি। অমৃতসর মেলে আমরা বেনারস পৌঁছলাম সকাল সাড়ে নটায়। সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে আসতে আসতে হয়ে গেল দশটা।

ম্যানেজার মশাই নিজে তখন হোটেলে নেই, কিন্তু তার জায়গায় যিনি ছিলেন তিনিই, চাকর হারকিষণের হাতে আমাদের জিনিসপত্র উপরে পাঠিয়ে খাতায় আমাদের নাম-ধাম লিখিয়ে সই করিয়ে নিলেন।

দোতলায় গিয়ে দেখি ঘরে চারটে খািট। তার একটার নীচে একটা মাঝারি সুটকেস, আর যেমন–তেমনভাবে গুটিয়ে রাখা একটা হাল্ড-অল। এ ছাড়া খাটের পাশে তাকে আর আলনায় কিছু জিনিসপত্র কাপড়-চোপড় ইত্যাদি রয়েছে। ফেলুদা সেগুলোর উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে লালমোহনবাবুর দিকে ফিরে চাপা গলায় বলল,নাসিক গৰ্জনে আপনার ঘুমের ব্যাঘাত হয় না তো?।

কেন? কই, আপনার তো নাক ডাকে না।

আমার না; আমি আমাদের রুম-মেটের কথা বলছি।

সে কী মশাই, আপনি লোকটর ওই কটা জিনিসপত্র দেখেই—

সঠিক বলে বলছি না; এটা অনুমান-মাত্র। সাধারণত মোটা লোকেরাই নাক ডাকায় বেশি, আর ইনি যে শীর্ণকায় নিন। সেটাও এর শার্ট অ্যর প্যান্টের বহর দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তার উপরে ফেনক্সের শিশি থেকে অনুমান করা যায় যে এর মাঝে মাঝে নাক বন্ধ হয়ে যায়। সেখানেও নাক ডাকার একটা সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে।

সর্বনাশ!—আরও কিছু বুঝলেন নাকি?

তাকের উপর প্রসাধনের জিনিসের মধ্যে শেভিং-এর সরঞ্জামের অভাবটা অৰ্থপূর্ণ নয় কি? অবিশ্যি যদি ইনি মাকুন্দ হয়ে থাকেন তা হলে আলাদা কথা, না হলে বলব দাড়ি-গোঁফ অবশ্যম্ভাবী।

হারকিষণের আনা চায়ের কপি হাতে নিয়ে তিনজন ঘরের উত্তর দিকের বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। যে-রাস্তার উপরে বারান্দা, সেটাই পুব দিকে চলে গেছে সোজা দশাশ্বমেধ ঘাটে। রাস্তার দুদিকে সারি সারি দোকানে হিন্দি আর ইংবিজিতে লেখা সাইনবোর্ড। ফেলুদা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, তোপসে, তোকে যদি বলা যায় কলকাতার পাট উঠিয়ে এখানে এসে ধাবিক জীবনটা কাটাতে হবে-পারবি?

একটু ভেবে বললাম, বোধহয় না।

কিন্তু এখানে এসেছিস মনে করেই মনটা নেচে উঠছে—তাই নয় কি?

সত্যিই তাই। কাশীতে সারাজীবন থাকতে ভাল লাগবে না নিশ্চয়ই, কিন্তু যখনই ভাবছি আট-দশ দিনের বেশি থাকবার দরকার নেই তখনই মন বলছে বেনারসের মতো জায়গা হয় না।

তার কারণটা কী জানিস?-ফেলুদা বলল-তুই যে নীচের দিকে তাকিয়ে শুধু একটা রাস্তা দেখছিস তা তো নয়; তুই দেখছিন্স বেনারসের রাস্তা। বেনারস : কাশী! বারাণসী!-চারটিখানি কথা নয়। পৃথিবীর প্রাচীনতম শহর, পুণ্যতীর্থ পীঠস্থান : রামায়ণ মহাভারত মুনিঋষি যোগী সাধক হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ জৈন সব মিলে এই বেনারসের একটা ভেলকি আছে যার ফলে শহরটা নোংরা হয়েও ঐতিহ্যে ঝলমল করতে থাকে। যারা এখানে বসবাস করে তারা দিন গুজরানোর চিস্তায় আর এ সব কথা ভাববার সময় পায় না, কিন্তু যারা কয়েক দিনের জন্য বেড়াতে আসে তারা এইসব ভেবেই মশগুল হয়ে থাকে।

লালমোহনবাবু এই ফাঁকে কখন জানি ভিতরে চলে গিয়েছিলেন, হঠাৎ তাঁর গলার আওয়াজ পেয়ে পিছন ফিরে দেখি তিনি সঙ্গে একজন অচেনা লোককে নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। বছর পঞ্চাশেক বয়স, মাঝারি রং, মাথার কাঁচাপাকা চুল মাঝখানে সিঁথি করে পিছন দিকে টান করে আচড়ানো। চোখা নাকের নীচে পাতলা পান-খাওয়া ঠোঁট অল্প হাসিতে ফাঁক হয়ে আছে। ভদ্রলোক ফেলুদাকে নমস্কার করে বললেন, আপনার পরিচয় পেলুম এনার কাছ থেকে। আমার হাটেলের সম্মান বাড়ল, হেঃ হেঃ।

বুঝলাম ইনিই হলেন ম্যানেজার নিরঞ্জন চক্রবর্তী।

কোনও অসুবিধা-টসুবিধা–?

না না।–দিব্যি ব্যবস্থা।

আসুন, নীচে আসুন আমার ঘরে। আপনাদের চা দিয়েছে? শুধু চা? অ্যাঃ-ছিছি।

দেয়ালে তিনটে ইংরিজি আর দুটো বাংলা ক্যালেন্ডার, আর রবীন্দ্রনাথ সুভাষ বোস বিবেকানন্দ আর শ্ৰীঅরবিন্দর ছবি টাঙানো। ম্যানেজারের ঘরে বসে আমরা আরেক কাপ চা আর হালুয়া সোহন খেলাম। এ ঘরটা বাড়ির ভিতরের দিকে, তাই সাইকেল রিকশার হর্ন ছাড়া রাস্তার আর কোনও শব্দই আসে না।

নিরঞ্জনবাবু বললেন, আমার হোটেলে গত মার্চ মাসে বিশ্বশ্ৰী গুণময় বাগচী থেকে গেচেন-ওই আপনাদের তিন নম্বর ঘরটাতেই। ওঃ—কী মাস্‌ল মশাই! আদ্দির পাঞ্জাবি পরে গোধূলিয়ার মোড়ে পান। কিনতে গেচে, আর তিন মিনিটে রাস্তায় ভিড় জমে গেচে। হাত ভাঁজ করে পান মুখে পুরচে আর তাতেই বাইসেপ ঠেলে বেরুচ্ছে।..আপনি কিন্তু যাবার আগে আমাদের অ্যালবামে দু লাইন লিখে দিয়ে যাবেন। অনেক গুণী লোকের লেখা রয়েছে ওতে। তবে মাগ্যির বাজার, বোঝেন তো—মনের মতো মেনু দিতে পারব না। আপনাদের, এই যা দুঃখ।

ফেলুদা বলল, আপনি শুধু আমার লেখা চাইছেন কেন-ইনিও কিন্তু খ্যাক্তিতে কম যান না।

লালমোহনবাবু বিনয় করার ভাব করে কী একটা বলতে গিয়েও বললেন না। নিরঞ্জনবাবু হেসে বললেন, ওঁর কথা আমার ভায়রা ভাই আগেই জানিয়েচিল। আপনার আসাটা সারপ্রাইজ কিনা, তাই বলচি আর কী।

লালমোহনবাবু কিছুক্ষণ থেকেই উসখুস করছিলেন, এবার আর থাকতে না পেরে বললেন, কাগজে দেখলুম—এখানে একটি সাধুবাবার আবির্ভাব হয়েছে?

কে, আবলুস বাবা?

কই না তো। আবলুস তো নয়। মছলি-বাবা নাম দিয়েছে যে কাগজে।

ওই হল। হিন্দিওয়ালারা মছলি বলছে। আবলুস নাম আমার দেওয়া। গিয়ে দেখলে বুঝবেন নামকরণটা কেমন হয়েছে।

সত্যিই সাঁতরে এসেছেন নাকি?

প্রশ্নগুলো লালমোহনবাবুই করছেন, ফেলুদা শ্রোতা। নিরঞ্জনবাবু বললেন, তাই তো বলচে। বলে, এখন নাকি প্ৰয়াগ থেকে আসচেন; তবে স্টার্টিং পয়েন্ট হল গিয়ে হরিদ্বার। এখেন থেকে যাবেন মুঙ্গেরু-পাটনা। তারপর এক’দিন হয়তো দেখবেন বাবুঘাটে গিয়ে নোঙর ফেলেচেন বাবাজী?

অলৌকিক ক্ষমতার ব্যাপারটা কী মশাই?

যা শুনিচি তাই বলচি। কেদার ঘাটে চিতপাত হয়ে পড়ে ছিলেন বাবাজী। ভোর রাত্তিরে অভয় চক্কোত্তি ঘাটে নেমেছেন। পয়ত্ৰিশ বছরের অভ্যোস মশাই—ঘড়ি ধরে সাড়ে চারটে—ফাস্ট ঢুঁ অ্যারাইভ—শীত গ্ৰীষ্ম বিষৰ্ণ কোনও তফাত নেই। সত্তর বছর বয়স, চোখে ছানি। পা ফেলতে গিয়ে শানের বদলে নরম নরম কী ঠেকেছে, ঝুকে দেখেন মানুষ। গায়ের চামড়া কুঁচকানো, মনে হয় অনেকক্ষণ জলে ছিল। লোকটা এপাশ ওপাশ করছিল—যেন বেইশ অবস্থা থেকে সবে জ্ঞান ফিরচে। চক্কোত্তি মশাই ঘাড় নিচু করে দেখাচেন, এমন সময় বাবাজী চোখ খুলে তাঁর দিকে চেয়ে হিন্দি টানে বাংলা ভাষায় বললেন, মা এত জল দিয়ে ঘিরে রেখেছে তোকে, তাও তার আগুনের ভয়?—ব্যস, ওই এক কথাতেই অভয় চক্কোত্তি কাত।

আমরা তিনজনে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছি দেখে নিরঞ্জনবাবু ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলেন।

কাশী আসার আগে অভয় চক্কোত্তি থাকতেন। চুচড়োয়। সেইখেনে একবার কালীপুজোয় তাঁর বাড়িতে আগুন লাগে। তাতে তাঁর স্ত্রী আর একটি চোদ্দো বছরের ছেলে মারা যায়। সেই থেকে ভদ্রলোক বিবাগী হয়ে কাশীবাসী হয়ে যান। অত্যন্ত সদাশয়, সাত্ত্বিক মানুষ। বাবাজীর এই কথায় তার মনের কী অবস্থা হবে সে তো বুঝতেই পারচেন।

সেদিন থেকেই বাবাজী অভয় চক্কোত্তির বাড়িতে?

সেদিন কী মশাই, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দীক্ষা-টীক্ষা কমপ্লিট। তারপর যা হয়। খবর রটে যায়। লোক আসতে শুরু করে। রেগুলার দর্শন। ঘাটের কাছেই অভয় চক্কোত্তির বাড়ি। ভেতরে উঠন। দাওয়ার উপর বাবাজী বসেন, উঠনে ভক্তরা। একটি একটি ভক্ত কাছে যায়, বাবাজী তাদের একটি করে মন্ত্রপূত শঙ্ক দিয়ে দেন।

শঙ্ক কী মশাই? প্রশ্ন করলেন লালমোহনবাবু।

মাছের আঁশ মশাই, মাছের আশ। লোকেরা বলছে স্বয়ং বিষ্ণু আবার মাছ হয়ে এসেছেন।

সে আঁশ কি খেতে হয় নাকি মশাই? লালমোহনবাবু এমনভাবে নাক কুঁচকেছেন যেন আঁশটে গন্ধ পাচ্ছেন।

খেতে হবে কেন? পরদিন সূর্য ওঠার ঠিক আগে—যাকে বলে ব্রাহ্মমুহূর্ত—সেই সময়ে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিলেই হল।

ওটা করে কি কেউ কোনও ফল পাচ্ছে?

আর পাঁচজনের কথা তো বলতে পারি না-আমার একটা কলিক পেনের মতো হচ্ছিল; গোপেন ডাক্তার ম্যাগফস খেতে বলেচিল। খাচ্ছিলুম। বাবাজী এলেন, দর্শন করলুম, আঁশ পেলুম—পরদিন জলে ভাসিয়ে দিলুম। এখন পেনাটা নেই বললেই চলে—তা সে হোমিওপ্যাথির গুণ না আঁশপ্যাথির গুণ তা বলতে পারি না।

কদ্দিন থাকবেন এখানে কিছু জানেন?

ইনি ডাঙায় কোনওখানেই নাকি বেশিদিন থাকেন না। তবে এর যাওয়ার দিনটা নাকি ভক্তরাই ঠিক করে দেন।

কীরকম?

সেটা আজি সন্ধেবেলা জানা যাবে। আপনাদের নিয়ে যাব। আজই নাকি জানা যাবে বাবাজীর কাশীর মেয়াদ আর ক’দিন।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান