জননী » উপক্রমণিকা

পাতা তৈরিজানুয়ারি ১০, ২০২১; ১৭:২১
সম্পাদনাজানুয়ারি ১০, ২০২১, ১৭:২১
দৃষ্টিপাত
আলী আজহার খাঁ মহেশডাঙার মামুলি চাষী। গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড এখানেই সরলরেখায় গ্রাম-গ্রামান্তরের দিকে চলিয়া গিয়াছে। ট্রাঙ্ক রোডের পাশেই সরু গ্রামের পথ। কয়েক মিনিট হাঁটিলেই প্রথমে পড়ে আলী আজহার খাঁর বস্তি। সম্মুখে একটি বড় দহলিজ। বাম পাশে ছোট ডোবা। পূর্বধারে প্রতিবেশীদের খড়োঘর। কয়েকখানা কলাগাছের নীলাভ পাতা চালের ভিতর উঁকি মারিতেছে। উঠানে ...

আলী আজহার খাঁ মহেশডাঙার মামুলি চাষী।

গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড এখানেই সরলরেখায় গ্রাম-গ্রামান্তরের দিকে চলিয়া গিয়াছে। ট্রাঙ্ক রোডের পাশেই সরু গ্রামের পথ। কয়েক মিনিট হাঁটিলেই প্রথমে পড়ে আলী আজহার খাঁর বস্তি। সম্মুখে একটি বড় দহলিজ। বাম পাশে ছোট ডোবা। পূর্বধারে প্রতিবেশীদের খড়োঘর। কয়েকখানা কলাগাছের নীলাভ পাতা চালের ভিতর উঁকি মারিতেছে। উঠানে কেহ বোধহয় কলাগাছ রোপণ করিয়াছিল। আসন্ন বৈকালে এই অঞ্চল ভয়াবহ ঠেকে। জনবিরল গ্রাম। অরণ্যানীর ছায়াভাস আগাছার জঙ্গলে সর্বক্ষণ কালো দাগ আঁকিয়া রাখে। বর্ষাকালে পথঘাট দুর্গম। ঝড়ে পাতাপুতি, হেলানো বাঁশবনের কঞ্চি আর কাদায় রাস্তা চলা বিপজ্জনক। বেতবনের ঝোপ-নিষ্ক্রান্ত বিষাক্ত সাপ দিনেও আশেপাশে বিচরণ করে।

আলী আজহার খাঁকেও এই পথে হাঁটিতে হয়। লাঙল কাঁধে হালের বলদ দুটিকে ভর্ৎসনার আহ্বান দিতে দিতে বহুদিন দেখা গিয়াছে সে আনমনে পথ হাঁটিতেছে।

আজ এই খাঁ-পরিবারের কোনো ছেলেকে দেখিয়া বুঝা মুশকিল, একশ বছর আগে তাহাদের পূর্বপুরুষেরা বাঙালি ছিলেন না। আলী আজহার খাঁর চেহারা পাট্টা জোয়ানের। রঙ ফর্সা। শুধু এই অবয়বে অন্যান্য প্রতিবেশীদের কাছে সে বৈশিষ্ট্য-পৃথক। নচেৎ কিষাণ-পল্লীর ভিতর তার অন্য কোনো মাহাত্ম্য-গুণ নাই, যার জন্য শতজনের মধ্যে সে প্রথমে কাহারো দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে।

আলী আজহার খাঁ জানে, তার পূর্বপুরুষেরা এই গাঁয়ের বাসিন্দা ছিলেন না।

দহলিজের ডোবার পাশ দিয়ে আর একটা সরু সড়ক কিছুদূর সোজাসুজি পশ্চিমে জঙ্গলাকীর্ণ ভিটার মধ্যে আত্মবিলোপ সাধন করিয়াছে। ভিটার তিনদিকে ঘন ফণীমনসার কাঁটার ঝোঁপ। আর একপাশে বেউড় বাঁশ আর বেত এবং অন্যান্য আগাছার রাজত্ব। ভিটার আশেপাশেও বহু খণ্ড আর চুর্ণ ইট পড়িয়া রহিয়াছে। অতীতে এখানে ইমারত ছিল তার প্রমাণ ইট ছাড়া আরো বহু উপাদান আছে, গ্রামের জনপ্রবাদ-ইতিহাসকে নানা রঙে যা সঞ্জীবিত রাখে। দুপুরে সাপের ভয়ে এইদিকে কেউ আসে না। খাঁ-পরিবারের লোকেরা অবশ্য ভয় করে না। জ্বালানির জন্য এই ভিটার ঝোঁপঝাড় শুধু তাহারাই সাহস করিয়া কাটে। ইহা আর কাহারো সহ্য হয় না। কোনো-না-কোনো বিপদ জড়াইয়া আসে এই রাজ্যের জ্বালানির সঙ্গে। মহেশডাঙার শেখেরা একবার একটি চারা অশত্থগাছ তুলিয়া তাহাদের উঠানে রোপণ করিয়াছিল। চার বছর পর সেই বাড়ির মুরুব্বি নাকি বজ্রাঘাতে উঠানেই মারা যায়। আরো বহু দুর্ঘটনার জন্য খাঁ-পরিবার এই রাজ্যচ্যুতির আশঙ্কা হইতে সম্পূর্ণ নিরাপদ। ভিটার চাতালের গাছপালা তাহারাই ভোগ করে।

ভিটা সংলগ্ন একটি বড় পুষ্করিণী ছিল। বর্তমানে মজা পুকুর মাত্র। পাড়ে কাঁটাবন দুর্ভেদ্য। কয়েক বছর আগেও পদ্মপাতায় পুকুরের সামান্য পানিও দেখা যাইত না। বর্তমানে জীবনের দ্বিতীয় নামও অন্তর্হিত হইয়াছে। খাঁর পুকুরে পীরের কুমির ছিল। সেই প্রবাদ এখনও মুখে মুখে ফেরে।

আলী আজহার খাঁর নাম পিতৃ-প্রদত্ত। নামের মাহাত্ম্য তারা বোঝে। আজহার খাঁর পিতা আলী আসগর খাঁ সামান্য লেখাপড়া জানিতেন। তবে পারসিতে তাঁর দখলের যথেষ্ট সুনাম ছিল এই অঞ্চলে। আজহার খাঁ পিতার এই মহিমা-গুণ কিছুই পায় নাই। তার পিতামহ আলী আমজাদ খাঁ নাকি আরো পারদর্শী পণ্ডিত ছিলেন। সওয়া-শ বছর আগে তাঁর প্রপিতামহ মজহার খাঁ এই গ্রামে অকস্মাৎ নাজেল হইয়াছিলেন। এই বংশের তিনিই আদি-পিতা। শান্-শওকত দব্‌দবা তাঁর আমলেই ছিল। তারপর স্ব-পরিবারের অধঃপতনের যুগ। ইমারতের আকাশ হইতে আলী মজহার খাঁর বংশধরেরা আজ খড়োঘরের মাটিতে নামিয়াছে। শিক্ষা-সংস্কৃতি সব নিরুদ্দিষ্ট। মাটির কাছাকাছি আসিয়া আলী আজহার খাঁও অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিগত ইতিহাসের স্বপ্ন তার কাছে ধূসর মরীচিৎকার মতো মাঝে মাঝে জীবন-সংগ্রামের নিরাশাক্লিষ্ট ক্ষুব্ধ মুহূর্তে ভাসিয়া আসে বৈকি!

আলী আজহার খাঁর রক্তে পূর্বপুরুষদের যাযাবর নেশা আছে যেন। আবাদের পর আর কোনো কাজ থাকে না। ফসলের অনিশ্চয়তা নীড়ে কোনো মোহ জাগায় না। আজহার তাই রাজমিস্ত্রির কাজও শিখিয়াছিল। তখন সে দূরে ভিন গাঁয়ের দিকে কন্নিক আর সূতা হাতে চলিয়া যায়। এমনি আজহার খাঁ নিরীহ। প্রতিবেশীদের কাছে সে সাধু ও সজ্জন নামে খ্যাত। আলী মজহার খাঁর পঞ্চম অধঃস্তন পুরুষের একটি যুবক নির্জীবতার জন্য নিরীহ এমন অপবাদ দেড়শ বছর আগে কেহ মুখে উচ্চারণেও সাহস করিত না। কর্মময় জীবনের ক্ষেত্রে, সাংসারিকতার নাগপাশ, দাসত্বের বেড়ি, পলিমাটির অদৃশ্য যোজনাশক্তি, কোথায় কিরূপ এখানে কাজ করিয়াছে, কেহ তার ইতিহাস জানে না।

আলী মজহার খাঁর রক্তেও কি এমন ধরা-দেওয়া নির্জীবতার ধারা ছিল?

অতীতের সঙ্গীত-তরঙ্গ কলধ্বনি তুলে। সব সেখানে একাকার হইয়া যায়। বিরাট সমুদ্র-স্তনিত পৃথিবী, স্থাবর-জঙ্গমের গতিশীল যাত্রাধ্বনি, শত-মন্বন্তরের পদক্ষেপ, মানুষ আর মানবীর কীর্তিত মিছিল, কালের প্রান্তর-মর্মর। তবুও ভবিষ্যৎ দিক্‌চক্রবালের মতো মানুষের নয়নপটের সম্মুখে আঁকা। তাইত এই পথ চলা– যে-পথের বার্তা অতীত বর্তমান, অতীত আর ভবিষ্যৎ, ত্রিকালের সমাহারে অপূর্ব সমারোহ-ধ্বনি ভাঙা-গড়ার খঞ্জনিতে বাজায়।

আলী আজহার খাঁর সাতবছর বয়সের পুত্র আলী আমজাদ খাঁও হারানো বাছুর খুঁজিতে আসিয়া স্তিমিত বৈকালে তারই হানা-রেশ পাঁজরের গলিতটে বারবার যেন শুনিতে পায়।

গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। এই রাজপথ। শেরশার বিজয় বাহিনীর যাত্রাপথ। পাঠান সম্রাট আর নবাবদের ঐশ্বর্য-দ্রষ্টা ধূলি সড়ক। সন্ধ্যার অন্ধকারে ক্রমশ আত্মগোপন করিতেছে। পত্রপুষ্পের আবরণে দিনের আলো বাধাপ্রাপ্ত। অন্ধকার অবোধ বালকের মুখেও ছায়া ফেলে। দূরে মলিন আকাশ আর দেখা যায় না। শীতের হিমাচ্ছিন্ন রাত্রির আবাহনী শিরীষের ডালে বাজিয়ে থাকে।

এই রাজপথ বাহিয়া সওয়া-শ বছর আগে আলী মজহার খাঁ পনেরো জন সহচর, আরো কয়েকটা ঘোড়া লইয়া মহেশডাঙার অন্ধকারে আত্মগোপন করিয়াছিলেন। চারিদিকে গাছপালার অরণ্য। ইংরেজ শাসকদের অস্ত্র-বর্ম-সজ্জিত কোনো প্রহরী অন্তত কিছুদিন তাহাদের সন্ধান পাইবে না। বিরাট কর্তব্যের অনুশাসন চতুর্দিকে, মজহার খাঁ বগ্‌ডোর শ্লথ করিয়াছিলেন ঘোড়ার। কয়েকদিন কাটিয়া গিয়াছে অশ্বপৃষ্ঠে। শুষ্ক রুটি ও ছোট মশকের পানি মাত্র আহার। বিহারের কাছে কোম্পানির একদল সিপাহী তাহাদের পশ্চাৎ অনুসরণ করিয়াছিল। মজহার খাঁ ভীরু নন। পাঠানের সন্তান বুজ্‌দিল হয় না কোনোদিন। অনেক সময় আত্মগোপন নিজেকে বিরাটরূপে বিকাশেরই প্রাথমিক উপায় মাত্র। মজহার খাঁ তাই সেদিন পনেরো জন অনুচরসহ বহু জনপদ ও দুর্গম পথে পাড়ি দিয়াছিলেন। বাংলা মুলুকে হয়ত বহুদিন কাটাইতে হইবে। বাংলার মুসলমানের সঙ্গে তাঁর অনেক বুঝাপড়া আছে।

অন্ধকার রাত্রি, শীতের হিম-হাওয়া পথে পথে বাজিয়া যায়। ঘোড়াগুলিকে ঘাস খাইতে দিয়া মজহার খাঁ ও তাঁর সঙ্গীরা রুটি সেঁকিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। প্রতি কার্যে অসম্ভব রকম ক্ষিপ্রতা। আহার সমাপনান্তে মজহার খাঁ একবার ঘোড়র উপর উঠিয়াছিলেন, আবার অবতরণ করিয়াছিলেন তখনই।

মজহার খাঁ বলিয়াছিলেন, “ভাইয়ো, ঠৈরকে, মাই আতা।“ হাঁটু অবধি নাতিদীর্ঘ পাজামা পরিধানে, কোমরে তলোয়ার, বাম বাজুর দিকে গাদা-বন্দুক। মজহার খাঁ মহেশডাঙার অন্ধকারে একাকী ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছিলেন।

সঙ্গী দু-একজন অনুগমন করিতে চাহিল, তিনি বাধা দিলেন। “আসহাব, মাই খোদ্ জানে-ওয়ালা।“

মহেশডাঙার এইসব অঞ্চল তখন জনবিরল। মুসলমান পরিবার নিতান্ত নগণ্য। আলী মজহার খাঁকে অনিশ্চয়তা বোধ হয়, সেদিন দৈব কিছু সাহায্য করিয়াছিল নচেৎ আকস্মিকভাবে তিনি আরিফউদ্দীন মুনশীর বাড়িতে প্রথমে পৌঁছিয়াছিলেন কিরূপে?

গ্রামে পশ্চিম-দেশীয় ব্যক্তি মাঝে মাঝে আসে। অগাধ রাত্রে মুনশী আরিফউদ্দিন দহলিজে আসিয়া বিস্মিত হইলেন। জনবিরল অঞ্চলে দস্যুর প্রাদুর্ভাব স্বাভাবিক। মুনশী সাহেব নবাব দপ্তরে বহুদিন কাজ করিয়াছেন। পারসি জবানেই মজহার খাঁর পরিচয় গ্রহণ শুরু হইয়াছিল। এক প্রহরের মধ্যে দুই বিদেশী মুসলমানে অন্তরঙ্গতা আরম্ভ হইয়াছিল। একজন যুবক আর একজন বৃদ্ধ। মুনশী সাহেবের যুবক-পুত্র শরিফউদ্দিন পিতার নিকট উপস্থিত হইলেন।

রাত্রির মধ্যে আয়োজন চলিতেছে। কিসের আয়োজন?

মুনশী সাহেব বলিলেন, মেরা এহি এক ল্যাড়াকা। ওয়াস্তে দীন-কে। খোদাকে রাহ্ পর।

বহুৎ আচ্ছা, আব্বাজান।

মজহার খাঁ আরিফ সাহেবকে পিতার মর্যাদা দিয়াছিলেন। তিনি পারসি জবানে বলিয়াছিলেন, দেশের সূর্য আজ অস্তমিত। কুফর ইংরেজ আমাদের শাসক। মুসলমান আজ ভিঙ-মাঙা। আমাদের ঈমান, আমাদের খোদার বেইজ্জতির শুরু হইয়াছে মাত্র। আজ তাই চাই আপনার মতো পিতা-ওয়ালেদ। কওমের সেবায় যিনি একমাত্র নয়নের মণিও উৎপাটিত করিয়া দিতে পারেন!

মহজার একটি ঘোড়া লইয়া আবার ফিরিয়া আসিয়াছিলেন। গভীর শীতার্ত তমিস্রাময়ী রাত্রি।

মুনশী সাহেব, শরিফউদ্দীন আর মজহার খাঁ আল্লার আকাশের নিচে দণ্ডায়মান। শরীফউদ্দীন মজহার খাঁ প্রদত্ত হাঁটু-ঢাকা পাজামা আর পিরহান পরিয়াছিলেন। পিতার চোখের দিকে বিদায়-দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া তিনি বলিয়াছিলেন, “আব্বাজান, এজাজাত (আদেশ) দিন।“

“যাও বেটা, কওম-কে রাহ্ পর।“

দুই অশ্বারোহী অন্ধকারে মিশিয়া গিয়াছিল। মুনশী আরিফউদ্দীন চাহিয়াছিলেন গভীর তিমির স্পৃষ্ট পথ আর বনানীর দিকে।

অশ্বখুরধ্বনি দূরে দূরে মিলাইতে লাগিল। মুনশী সাহেবের কর্ণে ভাসিয়া আসিল বজ্রকণ্ঠের আওয়াজ:

ওয়াস্তে দিন-কে লড়না পায়ে তম্‌য়ে বেলাদ

শরয়্‌মে কঁহতে হেঁ ইসকো জঙ্গে জেহাদ।1

এদেশে তখন ইংরেজের প্রতাপ ও আক্রমণ নানাদিকে প্রচণ্ডতর হইতেছে। তারই প্রতিক্রিয়ায় সুদূর কাবুল হইতে বাংলার গ্রাম-অভ্যন্তরে ওহাবী-আন্দোলন ছড়াইয়া পড়িতেছিল। সেই সময়কার কাহিনী। ওহাবী নেতারা বাংলার গ্রামে প্রভাবশালী মুসলমানদের সাহায্যে বিভিন্ন স্থানে কেন্দ্র স্থাপন করিতেছিল। মুনশী আরিফউদ্দীন এই বিষয়ে গোপনে সাহায্যরত ছিলেন।

কয়েকদিন পর গভীর রাত্রে আবার তাঁহার ঘুম ভাঙিয়াছিল। শরিফউদ্দীনের সঙ্গে আরো বহু বাঙালি ওহাবী দহলিজে উপস্থিত। এইখানে সংবাদ পাওয়া গেল, কোম্পানি তাঁহাদের গতিবিধির গন্ধ পাইয়াছে। মজহার খাঁ জানিতেন, ক্যাপ্টেন হ্যারিংটন একটি ক্ষুদ্র বাহিনী লইয়া অঞ্চলে বাহির হইয়াছে।

রাত্রির অন্ধকারে অশ্বারোহী পদাতিক প্রায় চল্লিশজন মজহার খাঁর নেতৃত্বে আবার চলিয়া গেল।

সেইদিন মহেশডাঙার তিন মাইল উত্তরে হ্যারিংটনের সেনাবাহিনীর সহিত মজহার খাঁর সাক্ষাৎ ঘটিল।

গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড এখানে সংকীর্ণ। দুপাশে খাদ আর জঙ্গল। অশ্বখুরধ্বনি শোনামাত্র আলী মজহার খাঁ সঙ্কেত দিয়াছিলেন। ঘোড়া হইতে অবতরণের পর তাহারা সকলেই খাদ পার হইয়া জঙ্গলে আত্মগোপন করিল। ফাঁকা বন্ধুকের আওয়াজ শোনা গেল।

মজহার খাঁ কোনো আক্রমণ এখন পছন্দ করেন না। সঙ্গীদের তিনি বলিয়াছিলেন, ছোটখাটো দল পাইলে তাহারা আক্রমণ করিবে; কেবল একযোগে ভারতের একপ্রান্ত হইতে অপরপ্রান্তে তাহারা আক্রমণ শুরু করিবে। তৎপূর্বে নয়। এখন আক্রমণ অযথা শক্তিক্ষয়।

চল্লিশজন ওহাবী-সৈন্য ঝোপের ভিতর আত্মগোপন করিয়া রহিল। ঘোড়াগুলি শিক্ষিত। সব চুপচাপ শায়িত। এই ঝোপেঝাড়ে মশকের দংশনে অতিষ্ঠ হইলেও সকলে নিস্তব্ধ। আরো অশ্বখুরধ্বনি শোনা গেল।

মজহার খাঁ অস্পষ্ট কণ্ঠে শরিফউদ্দীনকে বলিতেছিলেন, পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন একালায় ওহাবী প্রেরিত হইয়াছে। সেখানে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া গিয়াছে। তাহারা ফিরিয়া আসিলে তখন আক্রমণমূলক পন্থা আরম্ভ করা সমীচীন হইবে। এইজন্য কতগুলি ভালো ঘোড়া-সওয়ার কাসেদ বা দূত প্রয়োজন। দলের মধ্যে যাঁরা আরবি-পারসি জানেন তাঁহাদেরই এই ভার দিতে হইবে। নচেৎ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা মুশকিল।

আলী মজহার খাঁ আবার উৎকর্ণ হইলেন। খুরধ্বনি যেন আরো নিকটবর্তী। আবার মজহার খাঁ বলিলেন, দলে দলে কাল হইতেই শরিফউদ্দীন যেন উর্দু-পারসির শিক্ষকতা আরম্ভ করেন। বাঙালি ওহাবী-বন্ধুরা উর্দু বা পারসি জানে না। আলাপ-আলোচনায় বড় অসুবিধা ঘটে। আর ভাষার জন্য মৈত্রীর বন্ধনও ঠিকমতো গড়িয়া ওঠে না।

অশ্বখুরধ্বনি নিকটবর্তী হইল। ফিকে জোছনা উঠিয়াছে। মাত্র বারোজন গোরা সিপাহী। সম্মুখে একজন সামরিক সজ্জায় সুশোভিত ইংরেজ। বোধ হয়, ক্যাপ্টেন হ্যারিংটন। আলী মজহার খাঁর শ্যেনচক্ষু এড়াইয়া কিছুই যায় নাই।

মাত্র বারো জন। প্রত্যেকের নিকট বন্দুক আছে। মজহার খাঁ শরিফউদ্দীনকে বলিলেন, আজ এই সুযোগ তাহাদের গ্রহণ করিতে হইবে। তাহাদের বন্দুক হাল-আমলের নয়, সংখ্যায় কম। এই কয়েকজনকে পরাস্ত করা খুব সহজ। সেইজন্য প্রথম কর্তব্য, শরিফউদ্দীন অন্য কোনো পথে মহেশডাঙা পৌঁছিতে পারে কিনা।

শরিফউদ্দীন সম্মতিসূচক সায় দিয়াছিলেন।

মজহার খাঁ বলিলেন, আর একটি পন্থা দরকার। দলের কয়েকজন ইহাদের অনুসরণ করিবে। একদল পূর্ব হইতে মহেশডাঙার এক মাইল দক্ষিণে গাছ কাটিয়া গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড় অবরোধ করিয়া রাখিবে। কেহ যেন কোনোরূপ পালাইয়া না যায়। একটি প্রাণী জীবিত থাকিলেও তাহাদের উদ্দেশ্য বিফল হইবে। পূর্বে এরূপ আক্রমণ খুব বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

শরিফউদ্দীনের সঙ্গে একদল সুশিক্ষিত বন্দুকধারী ঘোড়সওয়ার খাদ পার হইয়া গ্রামের মেঠো পথ ধরিয়াছিল। মজহার খাঁ মাত্র তিনজন বিশ্বস্ত অনুচরসহ ক্যাপ্টেন হ্যারিংটনের অনুসরণ করিতে লাগিলেন।

শরিফউদ্দীনকে তিনি আক্রমণের পূর্বে একটি বংশীনিনাদের সঙ্কেত করিতে বলিয়াছিলেন।

আলী মজহার খাঁ খুব ধীরে ধীরে সতর্কতার সহিত ঘোড়া পরিচালনা করিতেছেন। বিন্দুমাত্র ধুরধ্বনি দূরে ছড়াইয়া পড়ে।

অনুচরবর্গ প্রত্যেকে সুদক্ষ ঘোড়সওয়ার। তারাও আজ আরো সাবধানী।

সেই গভীর রাত্রে মুনশী আরিফউদ্দীন পুত্রকে কয়েকজন লোক ও কুঠার সংগ্রহ করিয়া দিয়া ইমারতের ছাদে গিয়া দাঁড়াইলেন। তিনিও আজ অস্তমিত। বৃদ্ধ। দেশের সৌভাগ্য-সূর্য অস্তমিত হইয়াছে। এই বেইজ্জতি তার সম্মুখে অসহনীয় ব্যাপার। তিনিও আজ নওজওয়ানের পশ্চাতে দাঁড়াইয়াছেন। শরীর সামর্থ্যহীন। নচেৎ তিনিও আজ জেহাদের মল্লভূমে গিয়া দাঁড়াইতেন।

আরো দুই প্রহর পরে মহেশডাঙার সন্নিকট গ্রান্ড-ট্রাঙ্ক রোড়ের সড়কের উপর শোন গেল বন্দুকের দুম্‌দুম্‌ আওয়াজ। নিশীথিনীর পঞ্জর ভেদ করিয়া অস্ত্রের আওয়াজ, আহতের গোঙানি দূরে ভাসিয়া যাইতেছিল। আল্লা-হু-আকবর ধ্বনি শুন্যে ফরিয়াদের মতো বিলীন হইয়া গেল।

মজহার খাঁ ভুল করিয়াছিলেন। শত্রুর অল্পসংখ্যা দেখিয়া তিনি প্রতারিত হইয়াছিলেন। মহেশডাঙার আশেপাশে বহু গোরা সিপাহী মোতায়েন ছিল, তিনি জানিতেন না। সেদিন প্রবল শত্রুর আক্রমণের মুখে কাহারো তিষ্ঠানো সম্ভব ছিল না। যুদ্ধে ওহাবীরা কেহই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেন নাই।

বন্দুকের আওয়াজ বহুবার মুনশী আরিফউদ্দীনের কানে গিয়াছিল। তিনি শুধু নিশিগ্রস্ত বজ্রাহত ব্যক্তির মতো দাঁড়াইয়াছিলেন। তখনই সংবাদ আসিবে—হয়তো কোনো অমোঘ সংবাদ আসিবে—বৃদ্ধ বয়সে যা তাঁর সহশীলতার আয়ত্তের সম্পূর্ণ বাহিরে।

দুই ঘণ্টার মধ্যে আবার বনভূমি নিস্তব্ধ হইয়া গেল। ক্যাপ্টেন হ্যারিংটন লণ্ঠনের আলোয় চারদিক পরীক্ষা করিতে লাগিল। হিন্দুস্থানি রণনীতি তার কলাকৌশলের কাছে পর্যুদস্ত! এই বিজয়গর্বে প্রায় চারিশত গোরা সিপাহী পরিবৃত্ত হইয়া হ্যারিংটন বলিল, জখমীদের এখানে ফাঁসি দেওয়া হউক। First lesson fot the blackies. Examplary punishment. কালো চামড়াদের জন্য শিক্ষার বন্দোবস্ত করিয়া ক্যাপ্টেন চলিয়া গেল।

পরদিন গ্রামবাসীরা আসিয়া দেখিল, পঁচিশ জন ওহাবী শহীদ হইয়াছেন। পনেরো জন গাছে ফাঁসি লটকানো অবস্থায় ঝুলিতেছে।

সকলের আগে এই পথে আসিয়াছিলেন মুনশী আরিফউদ্দীন। সড়কের মুখে পড়িয়াছিল তাঁর পুত্র। মুখের উপর দিয়া গুলি চলিয়া গিয়াছে। আজ তাঁর পুত্র বলিয়া কেহ শনাক্ত করিতে পারিবে না। তিনি শুধু চেনেন ওই হাত, ওই মুখ। শরিফউদ্দীনের মাতা পনেরো বছর আগে এন্তেকাল করিয়াছিলেন। নিজ হাতে এই নয়নের মণি তিনি লালন করিয়াছিলেন। বুকের উপর কালো দাগেই শরিফউদ্দীনকে চেনা যায়। বৃদ্ধ কোনো আহাজারী করেন নাই। শুধু ভাবিয়াছিলেন সালেমার কথা। সালেমা তাঁর কন্যা। ষোড়শী, যুবতী, অবিবাহিতা। সে কিরূপে ভ্রাতার এই সংবাদ গ্রহণ করিবে।

সকালে গ্রামবাসীদের সাহায্যে ফাঁসি লটকানো শহীদদের নিচে নামানো হইল। ইহারা সকলেই সামান্য আঘাত পাইয়াছিল মাত্র। কাহারো পায়ে বুলেটের দাগ। কাহারো হাতে। জীবনের সমস্ত আশাই হইাদের ছিল। সামান্য চিকিৎসায় ফিরিয়া পাওয়া যাইত। ক্যাপ্টেন হ্যারিংটনের শিক্ষাব্যবস্থার এই প্রণালীর কথা মুনশী আরিফউদ্দীন জানিতেন না।

একই কবরে পনেরো জন শহীদকে দাফন করা হইল। সালেমা ইহার বিন্দুবিসর্গ জানিল না। আরিফউদ্দীন সাহেব কন্যাকে বলিয়াছিলেন, শরুফ কাবুরে চলিয়া গিয়াছে। সেইদিন রাত্রে তিনি আবার গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড পার হইয়া শহীদদের কবরগাহে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। অশ্রু তখন কোনো বাধা মানে নাই। মূর্ছিত হইয়া অনেকক্ষণ পড়িয়াছিলেন তিনি এই কবরগাহে। চেতনা পাইয়া আবার ঘরে ফিরিয়া আসিয়াছিলেন।

আরো চারদিন পর আসিলেন মজহার খাঁ। তেমনই গভীর রাত্রি।

“আব্বাজান”, ডাক দিয়াছিলেন মজহার খাঁ।

মুনশী আরিফউদ্দীন দহলিজের দুয়ারে পা দেওয়ামাত্র মজহার খাঁ তার পা জড়াইয়া কাঁদিয়াছিলেন, “আব্বাজান, মাফি মাংতে হেঁই। আব্বাজান—।“

পাঠান-যুবকের চোখেও সেই রাত্রি অশ্রুর বন্যা প্রবাহিত হইয়াছিল।

সিপাহী দল গ্রাম তোলপাড় করিয়া গিয়াছে। এই গাঁয়ের কোনো লোক এই আন্দোলনে যোগ দেয় নাই। মুনশী সাহেবের পুত্র কেবল নিরুদ্দেশ হইয়াছেন, কোথায়, কেহ জানে না।

আর দহলিজে নয়। মুনশী সাহেব আলী খাঁকে একদম লইয়া গেলেন অন্দরমহলে। যে-কোনো সময় সিপাহী আসিতে পারে। মুনশী সাহেবের অশ্রুপ্লাবিত নেত্র। ধরা-কণ্ঠে মজহার খাঁ বলিয়াছিলেন, “আব্বা মাঁই আপক্যা ল্যাড়কা।“

বৃদ্ধ সেদিন চুম্বনে চুম্বন আচ্ছন্ন করিয়াছিলেন এই পাঠান-যুবকের মুখ। শরিফউদ্দীনকেই যেন চুম্বন করিতেছিলেন তিনি।

মজহার খাঁ এইখানে বহুদিন আত্মগোপন করিয়া রহিলেন।

আরিফউদ্দীন সাহেব দুমাস পরে তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, “বেটা, খুনকা পেয়াস আওর নেহি।“

“মেরা আস্‌হাব, কওমকে ভাইয়ুঁকা খুনকা। বদ্‌লা মেরা ভাই শরিফউদ্দীন—“

“নেহি, বেটা। আওর খুন্‌কা পেয়াস নেহি।“

আর রক্ততৃষ্ণা নয়? রক্তের পিপাসা কি মিটিয়া গিয়াছে?

ছয় মাস পরে গভীর রাত্রে সালেমার বিবাহ হইয়া গিয়াছিল। নওশা আলী মজহার খাঁ। কাজী স্বয়ং আরিফউদ্দীন সাহেব। প্রতিবেশীরা বহুদিন পরে এই বিবাহের সংবাদ পাইয়াছিল।

আলী মজহার খাঁর বুক ভরিয়াছিল দিগন্তের তৃষ্ণা। কুফর শাসক-পীড়িত হিন্দুস্থানের মজলুম ভাই আর বোনের মুখ ছিল তাঁহার চলাপথের দীপালোক। একটি হৃদয়ের আহ্বানে কি সেই তৃষ্ণা মিটিয়া গেল? একটি নারীর কাঁকনের কনকন ধ্বনির স্রোতে কি জিন্দানের সহস্য কোটি জিঞ্জিরের আওয়াজ স্তব্ধ করিয়া দিল?

নীড়ের বন্ধন স্বীকার করলেও আলী মজহার খাঁর দিগন্তের পিপাসা কোনোদিন নিবৃত্ত হয় নাই। সে অন্য কাহিনী। ইংরেজ সিপাহীর সঙ্গে আবার তাঁহার মোকাবিলা ঘটে। শহীদি কবরগাহেই তাঁর শেষ সমাধি খোদিত হইয়াছিল।

আলী মজহার খাঁর অধঃস্তন পঞ্চম পুরুষ আলী আমজাদ খাঁ বাছুর খুঁজিতে আসিয়া শহীদি কবরগাহের সম্মুখে হঠাৎ দাঁড়াইল। আনমনা সে এই পথে চলিয়া আসিয়াছে।

চারিদিকে আগাছা আর খেজুরের জঙ্গল। আলী মজহার খাঁ এইখানে শুইয়া আছেন। তারই পূর্বপুরুষ। রক্তে ছিল যাঁর সিংহের বিক্রম, বুলেটের আঘাতে তাঁর শহীদ রুহ্‌, এইখানে বিশ্রাম লাভ করিতেছে। আলী আমজাদ খাঁ তা জানে না। আলী মজহার খাঁর রুহ কোনোদিন মাগফেরাত প্রার্থী নয়। গিধড় অধঃস্তন বংশধরদের ধিক্কার ও অভিশাপ দেওয়ার জন্য অন্তত তাঁর মাগফেরাতের কোনো প্রয়োজন হইবে না।

টীকা

  1. ওহাবী যোদ্ধাদের সঙ্গীত: ধর্মের জন্য এই সংগ্রাম-দেশ শাসনের জন্য নয়। ধর্মগ্রন্থে ইহাই জেহাদ নামে কীর্তিত।
গ্রন্থাবলী
মতামত জানান