জননী » জননী

পাতা তৈরিজানুয়ারি ১০, ২০২১; ১৫:০২
সম্পাদনাজানুয়ারি ১০, ২০২১, ১৫:০৭
দৃষ্টিপাত
জননী শওকত ওসমানের দ্বিতীয় উপন্যাস। এটি বিভাগ-পূর্ব বাংলার পটভূমিতে লেখা। বই হয়ে বের হয় অনেক পরে; সম্ভবতঃ ১৯৫৮ সালে। কাহিনী শুরু হয়েছে এভাবে: “আলী আজহার খাঁ মহেশডাঙ্গার মামুলী চাষী।“ এক কথায় লেখক সরাসরি চরিত্রটিকে পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন। আজহার খাঁ মামুলী চাষী হলেও তার বংশধররা ছিল খানদানি খাঁ পরিবার। এই ...

জননী শওকত ওসমানের দ্বিতীয় উপন্যাস। এটি বিভাগ-পূর্ব বাংলার পটভূমিতে লেখা। বই হয়ে বের হয় অনেক পরে; সম্ভবতঃ ১৯৫৮ সালে। কাহিনী শুরু হয়েছে এভাবে:

“আলী আজহার খাঁ মহেশডাঙ্গার মামুলী চাষী।“

এক কথায় লেখক সরাসরি চরিত্রটিকে পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন।

আজহার খাঁ মামুলী চাষী হলেও তার বংশধররা ছিল খানদানি খাঁ পরিবার। এই পরিবারের চতুর্থ পূর্বপুরুষ আলী মজহার খাঁ ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে উত্তর ভারত হতে এসেছিল। এই ভদ্রলোক পার্শি ভাষায় ছিল পারদর্শী।

উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়টি এই পূর্ব-পুরুষদের ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের চিত্র দিয়ে শুরু। এই সময় ওহাবি আন্দোলন চলছে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে।

লেখক লিখেছেন,

“এদেশে তখন ইংরেজের প্রতাপ ও আক্রমণ নানা দিকে প্রচণ্ডতর হইতেছে। তারই প্রতিক্রিয়ায় সুদূর কাবুল হইতে বাংলার গ্রাম-গ্রামান্তরে ওহাবী আন্দোলন ছড়াইয়া পড়িতেছিল। সেই সময়কার কাহিনী।“

এই গ্রামে ব্রিটিশ বাহিনীর ক্যাপ্টেন হ্যারিংটনের সঙ্গে মজহার খাঁর বাহিনীর যুদ্ধ হয় এবং ওহাবি যোদ্ধাগণ শাহাদাত বরণ করেন।

উপন্যাসের এই প্রথম অধ্যায়টি আজহার খাঁ বংশ ও মানসিকতা বোঝার জন্যে সাহায্য করে। কিন্তু আসল কাহিনী শুরু হয় এই উপক্রমণিকাটি পার হয়ে।

এই অধ্যায়ের শুরুতে আমরা পাচ্ছি চাষী বউ দরিয়াবিবিকে। লেখক তার রান্নাঘরের বর্ণনা দিয়ে কাহিনী এগিয়ে নিয়েছেন। এই পৃষ্ঠাতেই আমরা পাচ্ছি তার কিশোর সন্তান আমজাদকে যে মার পাশে বসে আছে। সারা কাহিনী জুড়ে যার অবস্থান এবং তার চোখে লেখক অনেক কিছুই দেখান।

জননী উপন্যাসও বাংলার ত্রিশের দশকের উপাখ্যান। এর মধ্যে আমরা হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা কীভাবে গ্রামেও সংঘটিত হয় এবং কীভাবে ধনী হিন্দু ও মুসলমান নিজেদের ব্যক্তিগত ও শ্রেণীস্বার্থ রক্ষার্থে গরীবদের মধ্যে দাঙ্গা লাগায় তা দিনের মত পরিষ্কার করেছেন লেখক।

এই উপন্যাসেও আমরা পাচ্ছি বাংলার সেই প্রান্তিক মানুষ আজহার ও দরিয়াবিবিকে। এ-ছাড়া তাদের সঙ্গে যাদের ওঠা-বসা সেই চন্দ্রকোটাল, সাকের, আমীরগণ এরা সবাই প্রান্তিক মানুষ।

জননী উপন্যাসে অনেকে বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালির ছায়া দেখতে পেয়েছেন—যেমন হরিহর-সর্বজয়ার সমান্তরাল আজহার-দরিয়া, অপুর সমান্তরাল আমজাদ, আসেকজান যেন অপুর পিসির প্রতিচ্ছবি।

এখানে একটা কথা মানতেই হবে যে বাংলার হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের জীবন ধারায় মাইক্রো স্তরে প্রচুর পার্থক্য আছে।

তা-ছাড়া ১৮৬০ সালে ভারতবর্ষে প্রথম যে আদমশুমারি হয় তাতে দেখা যায় বাংলায় মুসলমানের অনুপাত হিন্দুদের তুলনায় বেশি। তখন এটা ছিল ৪৫% ও ৫৫% যথাক্রমে হিন্দু ও মুসলিম। সুতরাং এটা স্বীকার করতেই হবে যে জননী উপন্যাসে সেই বৃহত্তর সম্প্রদায়ের জীবন-চিত্র ফুটে ওঠেছে। বাংলা সাহিত্য যে-জীবন-চিত্র থেকে বঞ্চিত ছিল।

পথের পাঁচালিতে অপু হল নায়ক, জননীতে দরিয়াবিবি প্রধান চরিত্র। পথের পাঁচালিতে হরিহর-সর্বজয়া অপুকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে। জননীতে আজহার-দরিয়া দুজনই মৃত্যুবরণ করছে। দরিয়াবিবি আত্মহত্যা করে আর কাহিনীরও সেই সঙ্গে সমাপ্তি।

জননী উপন্যাসে অনবদ্য চরিত্র হল চন্দ্র কোটাল। এই লোকটি যাত্রা দলে গান-অভিনয়-ভাঁড়ের ভূমিকায় নামত।

তার কাছে হিন্দু-মুসলমানের কোনো পার্থক্য ছিল না। ভাগ্যহত হলেও জীবনকে সব সময় হেসে খেলে গ্রহণ করে।

তাড়ি খেয়ে, গান গেয়ে জীবনকে সব সময় তুড়ি মেরে বিষাদ কাটিয়ে হাস্যরসে ভরে রাখে। মুখে অনেক পালা-গানের করি লেগেই আছে। তার মধ্যে একটি হল:

ভগবান তোমার মাথায় ঝাঁটা,

ও তোমার মাথায় ঝাঁটা।

যে চেয়েছে, তোমার দিকে

তারই চোখে লঙ্কা-বাটা।

ও ছড়িয়ে দিলে, ছড়িয়ে দিলে

মারলে তারে তিলে তিলে

ও আমার বৃথা ফসল কাটা।

ও তোমার মাথায় ঝাঁটা।

এই চন্দ্র কোটাল আজহার খাঁ-র পরিবারের একজন অকৃত্রিম শুভানুধ্যায়ী। বালক আমজাদ এই কাকাকে খুব ভালোবাসে। আজহার খাঁ রাজমিস্ত্রির কাজে ঘরের বাইরে গেলে তার বর্গার জমি রক্ষা করে এই চন্দ্র কোটাল। নানা রকম খাবার দিয়ে সাহায্য করে।

দরিয়াবিবি চরিত্রটি এক আত্ম-সম্মান বোধ সম্পন্ন মহিলার চরিত্র। হাজার দারিদ্রের মধ্যেও যে নিজকে অন্যের সাহায্যের হাত থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে চলে, কিন্তু আজহার খাঁ-র মৃত্যুর পর আজহারের দূর সম্পূর্কের ব্যবসায়ী ফুফাতভাই এর লোভ থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারে না। এবং যার ঔরসের সন্তানকে জন্মদানের পর গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে।

দরিয়াবিবির মৃত্যুর পর তার পূর্ব-স্বামীর ঘরের সন্তান মোনাদির, আমজাদ ও চন্দ্রকোটাল জীবিকার জন্যে শহরে যাবে স্থির করে। কাহিনীর শেষাংশে আমরা দেখি, ‘দরিয়াবিবির কবরের পাশে তিনটি ছায়া মূর্তি দণ্ডায়মান ইহাদের চেনা যায়। মোনাদির, আমজাদ ও কোটাল।

মোনাদির হঠাৎ ডুকরিয়া উঠিল।

কোটাল আগাইয়া আসিয়া বলিল, “চাচা বেটাছেলে, মার জন্যে কি এত কাঁদে?” … অশ্রু রুদ্ধ কণ্ঠে সে নিজেও বলিয়া ফেলিল, “দরিয়াবিবি, সেলাম… সেলাম…।“

এই দুটি উপন্যাসে পশ্চিমবঙ্গের হুগলী-হাওড়া আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহৃত হওয়ায় বর্তমান বাংলাদেশের পাঠকদের কিছু অসুবিধা হতে পারে।

উৎসর্গ

ইবনে গোলাম নবী

তাঁরাপদ ঘোষ

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান