জননী » প্রথম পরিচ্ছেদ

পাতা তৈরিজানুয়ারি ১১, ২০২১; ১৩:১১
সম্পাদনাজানুয়ারি ১১, ২০২১, ১৩:১১
দৃষ্টিপাত
প্রহর সন্ধ্যা উত্তীর্ণ। উঠানের উপরে রান্নাঘর। উপরে কোনো খড়ের ছাউনি নাই। কয়েকটি বাঁশের খুঁটি ও কঞ্চির ছায়ারেখা আগুনের ঝলকে মাঝে মাঝে চোখে পড়ে। আরো একটি রান্নাঘর আছে উঠানের দক্ষিণে। গ্রীষ্মের দিনে কুঁড়েঘরের ভিতর রান্নার কাজ কষ্টকর। আজহার খাঁ তাই দরিয়াবিবির জন্য উঠানের উপর চালহীন রান্নাঘর তৈরি করিয়াছিল। কয়েকদিন আগেকার ঝড়ে ...

প্রহর সন্ধ্যা উত্তীর্ণ।

উঠানের উপরে রান্নাঘর। উপরে কোনো খড়ের ছাউনি নাই। কয়েকটি বাঁশের খুঁটি ও কঞ্চির ছায়ারেখা আগুনের ঝলকে মাঝে মাঝে চোখে পড়ে। আরো একটি রান্নাঘর আছে উঠানের দক্ষিণে। গ্রীষ্মের দিনে কুঁড়েঘরের ভিতর রান্নার কাজ কষ্টকর। আজহার খাঁ তাই দরিয়াবিবির জন্য উঠানের উপর চালহীন রান্নাঘর তৈরি করিয়াছিল। কয়েকদিন আগেকার ঝড়ে তালপাতা উড়িয়া গিয়াছে। শুধু চালার ফ্রেমটি এখন অবশিষ্ট।

দরিয়াবিবি চুলায় জ্বাল দিতেছিল। হাঁড়ির ভিতর চিড়চিড় শব্দ ওঠে। দমকা বাতাসে আগুনের হলকা বাহির হইয়া আসে। দরিয়াবিবির মুখ দেখা যায়। কপালের চারিপাশ ঘামিয়া উঠিয়াছে।

আমজাদ মার পাশে বসিয়া রান্না দেখিতেছিল। অন্যদিকে খড় কুঁচকাইতেছিল আজহার খাঁ।

আমজাদ।

কি আব্বা?

এক আঁটি খড় বঁটির মুখে রাখিয়া আজহার একবার কপালের ঘাম মুছিবার চেষ্টা করিল।

অনেক দূর খুঁজেছি, আব্বা। ভারি বজ্জাত। গাইও তেমনি। বাছুর হারায়।

কঞ্চির ঝুড়ির ভিতর আজহার কুঁচানো খড় রাখিতেছিল। প্রায় পূর্ণ ঝুড়িটি দমকা বাতাসে হঠাৎ আড় হইয়া গেল। কুঁচো খড় হাওয়ায় উড়িতে থাকে। আজহার বঁটি ছাড়িয়া বলে, আমু, ধর বাবা ধর।

আমজাদের কচি মুঠি নাগাল পায় না। দরিয়াবিবি স্বামীর সাহায্যে অগ্রসর হয়। তার বয়স তিরিশের কাছাকাছি। দোহারা বাঁধন শরীরের। গোলগাল মুখটি গাম্ভীর্যে টইটুম্বুর।

আমজাদ কুঁচো খড়ের পিছনে এদিক-ওদিক দৌঁড়ায়।

ঐ দ্যাখো আব্বা, উড়ে যাচ্ছে।

খড়কুটো বাতাসের বেগে উপরে উঠতে থাকে।

দরিয়াবিবি ভারী শ্রান্ত হইয়া বলে, কী ছিরি তোমার কাজের।

দরিয়াবিবি স্বামীর দিকে তাকায়।

আজহার শান্তকণ্ঠে জবাব দিল, আচমকা হয়ে গেল। আর কোনোদিন এমনটা হয়েছে?

বাতাসে দরিয়াবিবির চুল এলোমেলো, হঠাৎ একমুঠো খড় হাতে সে ডাকে, আমু, এদিকে আয় তো বাবা, আমার চোখ কী পড়েছে দ্যাখ।

দরিয়াবিবি ততক্ষণ বসিয়া পড়িয়াছে। আমজাদ মার কাছে ছুটিয়া যায়।

এই খড়গুলো ঝুড়ির ভিতর রেখে আয়।

আমজাদ এক মিনিটে মার আদেশ পালন করিল।

ভারি করকর করছে চোখটা।

দরিয়াবিবি কাপড়ের খুঁটে মুখের ভাপ দিতে থাকে।

ভালো হল, মা?

দাঁড়া বাবা, খামাখা বকাসনি।

আমজাদ ফালি লুঙি পরিয়াছিল। মার দেখাদেখি সে-ও লুঙির খোঁট মুখের ভিতর ঢুকায়।

তরকারিটা বুঝি পুড়ে গেল!

দরিয়াবিবি এবার লাফ দিয়া চুলার কাছে পৌঁছাইল।

আমু, একটু পানি দে, বাবা।

আমজাদের সাহায্য চাওয়া বাতুলতা।

দরিয়াবিবি দৌড়িয়া ঘরের দিকে ছোটে। কলস তো সেখানেই।

এক মালসা পানি হাঁড়ির মধ্যে ঢালিতে ঢালিতে বলে, বাপবেটায় এক হুজুগ নিয়ে এলো। চোখটা এখনও করকর করছে।

আজহার একটি খড়ের বিড়ার উপর বসিয়াছিল। হাতে নারকেলি হুকা।

দরিয়াবিবি, চুলোতে আগুন পড়েছে?

চুলোর মুখে বসিয়া দরিয়াবিবি এলোচুল বিন্যস্ত করিতেছিল।

আগুন পড়বে না? কত সিঁদরে কাঠ জ্বালাচ্ছি।

আজহার দরিয়াবিবির দিকে তাকায়। তার ফরসা রং মুখে এখনও শ্রান্তির ছায়া আঁকা। স্বামীর উৎসাহ নিভিয়া আসে। কল্‌কেটা আজহার খাঁমোখা মাটির উপর ঘুরাইতে থাকে।

তুমি জানো, পাতার আগুন। এতে আবার ভালো আগুন পড়ে? কাঠ-পোড়ানো। নসিবে লিখেছে আল্লা?

ঐ আগুন-ই দাও।

তা দিচ্ছি। পাতা ঝেটোনোরও হাঙ্গামা কত। ও-পাড়ার সাকেরের মা বলে, আমাদের গাছের পাতা আর ঝেটিয়ো না, খায়ের বৌ। (পরে ঈষৎ থামিয়া) খড় সব বেচে দিলে?

আজহার ভারি তামাক খায়। তার নেশা চটার উপক্রম, আর ধৈর্য থাকে না, নিজেই কলকে হাতে দরিয়াবিবির সম্মুখে দাঁড়াইল।

খড় না বেচলে, খাজনা দেওয়া হল কোথা থেকে?

বেশ, ভালোই করেছ। থাকলে গরু-বাছুর খেয়ে বাঁচত। পোয়ালটা পুড়ানো চলত। যা জ্বালানির কষ্ট।

স্বামীর দিকে চাহিয়া দরিয়াবিবি ঘোমটা টানে। এতক্ষণ খেয়াল ছিল না। নিঃশব্দেই সে আজহারের হাত হইতে কলকে গ্রহণ করিল।

বাবা আমু, একটা খাপরা নিয়ে এসো।

আজহার জিজ্ঞাসা করে, খাপরা কী হবে?

ভারি মোলায়েম কণ্ঠ এবার দরিয়াবিবির। –বাতাসে ফিকি ছুটলে আর রক্ষে আছে! আগুন লেগে যাবে।

সাবধানে কলকের মুখে আগুন দেয়ার পর দরিয়াবিবি খারাটা উপরে চাপ দিয়া বসাইল।

যা দমকা বাতাস, গাছের পাতাপুতি আর ওসুল হবে না। চুলোর হাঙ্গামা পোয়াতেই অস্থির।

ফুড়ুক-ফুড়ুক শব্দ হয়। চক্ষু বুজিয়া আজহার হুঁকা টানে।

দরিয়া-বৌ, পুকুরপাড়ে কটা গাছ আছে, কাটালে হয় না? কয়েক মাসের জ্বালানোর জন্যে আর ভাবতে হয় না।

না, ওসব কাটলে, তারপর? কোনো কাজকর্ম নেই আর? ছেলেদের বিয়েশাদি নেই?

আমজাদ মার পাশে বসিয়াছিল। সে বলে, কার বিয়ে হবে, মা?

আমার। বলিয়া দরিয়াবিবি মৃদু হাসে। গম্ভীর মুখাবয়বে বিদ্যুতের ঝিলিক খেলিয়া যায়।

পরে সে আজহারের দিকে চাহিয়া বলে, ছেলেটা কোনো কথা বলতে দেবে না। ঘরকন্নার কথার সময় কিছু ভালো লাগে না।

তোর আব্বার বিয়ে হবে, আমু।

আজহার নিঃশব্দে তামাক খায়। কয়েক বিঘা জমি। সে আজ নিজেই হাল করিয়াছে। দরিয়াবিবির কথা তার কাছে পৌঁছায় না। তন্দ্রায় নেশা জমিতেছিল তার তামাকের ধোঁয়ায়।

সুপ্তোত্থিতের মতো সে বলে, কার বিয়ে দিচ্ছ?

তোমার, আমার, গোটা গাঁয়ের।

দরিয়াবিবি হাসে। আজহার তার মুখের দিকে একবার তাকাইল মাত্র। আবার গুড়ুক টানার শব্দ হয় উঠানে। আজহার খাঁ স্বভাবতই নিরীহ। দৈনন্দিনতার সংগ্রাম ছাড়া আর কিছু তাকে সহজে স্পর্শ করে না।

দরিয়াবিবি পার্শ্বে উপবিষ্ট পুত্রকে বলে, তোর বাবাকে ডাক্। জেগে আছে তো?

বাবাজি!

আজহার জবাব দেয়, কী আমু?

দরিয়াবিবি স্বামীকে অনুরোধ করে, এখনি রান্না শেষ হবে। আমুর সাথে গল্প করো।

মা!

কি রে!

দ্যাখ না গোয়ালঘরে, বাছুরটা এসেছে তো!

ভারি মনে করি দিলি, বাপধন! ওগো বাছুরটা দেখো না।

আজহার খাঁ বাছুরের জন্য কোনো সন্দেহ প্রকাশ করে না।

দেখো, কাল সকালে ঠিক আসবে।

আমজাদ দরিয়াবিবিকে চুপিচুপি বলে, এখন গোয়ালে দেখে আসতে বলো না।

এখন যাও না একবার গোয়ালডাঙায়।

থাক আজ।

শাদা বাছুর। আমজাদের ভারি প্রিয়। মার কাছে ফরিয়াদের আর অন্য কোনো কারণ নাই।

মা, বাছুরটাকে যদি শেয়ালে ধরে।

অতবড় বাছুর আবার শেয়ালে ছুঁতে পারে? আজহার খাঁ আবার সন্দেহ প্রকাশ করে।

আজকালের শেয়াল।

আজকালের শেয়াল তো একবার যাও না। কৃত্রিম রাগান্বিত হয় দরিয়াবিবি।

আমু, বাছুর খুঁজতে তুমি কতদূর গিয়েছিলে?

মাঠের দিকে গিয়ে কত ডাকলুম। কবরস্থানের কাছে–

দরিয়াবিবি একটি হাঁড়ি নামাইয়া রান্নাঘরের দিকে গেল। উঠানের পশ্চিমদিকে দুখানি খড়োঘর। ছিটেবেড়ার তৈরি। শোয়া-বসা চলে দুই ঘরে। পাশে রান্নাঘর।

হাঁড়িকুড়ি তৈজসপত্র এইখানে থাকে।

রান্নাঘরে হাঁড়ি রাখিয়া দরিয়াবিবি ফিরিয়া আসিল।

তুই গিয়েছিলি পুরানো কবরস্থানের দিকে?

শহীদি কবরগাহের নাম পুরাতন কবরস্থান। হাল-আমলের অন্য গোরস্থান আছে।

বারবার মানা করব, আমার কথা তো শুনবি নে।

আমার ভয় লাগেনি তো, মা।

নেই লাগুক। দাঁড়া, একটু বড়পীরের পানি-পড়া আনি। দরিয়াবিবি একটি বোতল ও মাটির পেয়ালা সঙ্গে আনল।

আজহার খাঁ অন্ধকারে ঝিমাইতেছিল। শরীর খুব ভালো নয় তার। এতক্ষণ সে মাতাপুত্রের গতিবিধির দিকে লক্ষ্য রাখে নাই।

কী আনলে, দরিয়া-বৌ।

বড়পীরের পানি-পড়া, একটু ছেলেটাকে খাওয়াব।

আজহার খাঁ তীরবেগে ছুটিয়া আসিল তাহাদের নিকট।

কর কী, দরিয়া-বৌ। এসব কি?

কেন কী হয়েছে?

এসব কী! পানি-পড়া খাওয়াচ্ছ? ওহাবীর ঘরে এসব বেদাৎ। লোকে কী বলবে?

দরিয়াবিবি বাজখাঁই গলায় বলে, বসো। তোমার বেদাৎ (শাস্ত্রনিষিদ্ধ) তোমার কাছে থাক।

ভালো কথা নয়, দরিয়া-বৌ।

আজহার শান্তস্বরেই জবাব দিল।

এসব নিয়ে কেন গোলমাল বাধাও? ছেলেদের রোগ-দেড়ী আছে। আমি খাচ্ছি নাকি?

দরিয়াবিবির হাতের কামাই নাই। পেয়ালার পানিতে এতক্ষণ আমজাদের কণ্ঠ ভিজিয়া গেল।

আজহার খাঁ সাধারণত বেশি কথা বলে না। সে গুম হইয়া খানিকক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল।

দরিয়াবিবির উপর কোনো কথা চলে না।

আজহার আবার হুঁকা হাতে নিজের জায়গায় ফিরিয়া গেল।

দরিয়াবিবি অনুভব করে, স্বামী রাগান্বিত। পরিবেশ আবার স্বাভাবিক করা দরকার। আমজাদকে বলে, তোর আব্বার কাছে গিয়ে একটু গল্প কর। চুলোর আঁচটা দেখি।

আমজাদ ইতস্তত করে।

গুড়ুক টানার আওয়াজ হইতেছিল। আজহার খাঁ নিস্তব্ধ। আমজাদ পিতার নিকট গিয়া ধূলার উপর বসিল।

আজহার খাঁ এইবার কথা বলে, ধুলোয় বসলি আমু? আয়, আমার কোলে বস।

দরিয়াবিবি চুলোর নিকট হইতে জবাব দেয় : আমিও যাব নাকি?

এসো না, আম্মা।

আজহার খাঁ পুত্রকে কোলে বসাইয়া গুড়ুক টানে।

থাক বাবা, আমার গিয়ে দরকার নেই।

আজহার খাঁ দেখিতে পাইল, দরিয়াবিবি তরকারি নুন চাখিবার জন্য হাতের তালু পাতিয়াছে। মুখে পুঞ্জ হাসি রেখায়িত।

চুলার আগুন নিভিয়া আসিতেছে। রান্না প্রায় শেষ। দরিয়াবিবির মুখ আর চোখে পড়ে না। কানে তার হাসি ভাসিয়া আসে।

সারাদিন খেটেপুটে চুপচাপ সবাই। দুঃখ তত চিরকাল। ছেলেটাকে নিয়ে একটু গল্প করো না।

আজহার খাঁ মাঝে মাঝে অতীতের বংশ-কাহিনীর কথকতায় মত্ত হয়। সব দিন নয়। আজ সে কোনো জবাবই দিল না। নিঃশব্দে তামাক সেবন করিতেছিল, তার কোনো ব্যতিক্রম দেখা গেল না।

সারা উঠানময় নিস্তব্ধতা। পুত্র পিতার কোলে আসীন। মা হাঁড়ি লইয়া ব্যস্ত।

চুলা প্রায় নিভিয়া গিয়াছিল। সামান্য কাজ বাকি আছে। দরিয়াবিবি আবার একরাশ পাতা আনিয়া চুলার মুখে জড়ো করিল।

অশত্থের কাঁচা পাতা সহজে ধরে না। ধোঁয়ায় উঠান ভরিয়া গেল। বাঁশের চোঙা দিয়া দরিয়াবিবি ফুঁ দিতে থাকে। একটু পরে চুলা জ্বলিতে লাগিল। পাছে আবার নিভিয়া যায়, নিঃশঙ্ক হওয়ার জন্য দরিয়াবিবি আরো পাতাপুতি খুঁজিয়া দিল। দাউদাউ শিখা আবার উঠানের চারিদিকে তার আলো ছড়ায়।

প্রাঙ্গণের উপর একটা অতর্কিত ছায়া পড়িল। ছায়ার কায়া দেখা গেল কয়েক মুহূর্ত পর। একটা তিন বছরের উলঙ্গ মেয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতেছে। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। চোখে পিঁচুটিভরা। সে ভালোরূপে চোখ মেলিতে পারিতেছে না। অভ্যাসের সাহায্যে চেনা উঠানের খবরদারি করিতে বাহির হইয়াছে যেন।

তার উপর প্রথম দৃষ্টি পড়িল আজহার খাঁর।

আয় মা, আয়। এতক্ষণ কোথায় ছিলি?

সকলের নজর পড়ে মেয়েটির উপর।

আমজাদ চিৎকার করে : ঐ ভূত-বুড়ি এসেছে।

দরিয়াবিবি পিছন ফিরিয়া হাসিয়া উঠিল : বুড়ি, এতক্ষণে ঘুম ভাঙল?

আজহার খাঁ ডাকে, নঈমা এদিকে আয়।

দরিয়াবিবির ছোটমেয়ে নঈমা। সন্ধ্যার সময় কাজের ঝামেলা থাকে। বড় বিরক্ত করে তখন সে। কান্না জুড়িয়া দেয় রীতিমতো। আজ বিকালে তাকে ঘুম পাড়াইয়াছিল দরিয়াবিবি নিজে।

নঈমা আজহার খাঁর নিকট গেল না। সোজাসুজি মার নিকট আসিয়া দাঁড়াইল।

একটু দাঁড়া, মা।

দরিয়াবিবি একটি হাঁড়ি চুলার উপর হইতে নামাইয়া নঈমাকে কোলে বসাইল, আঁচলের খুঁট দিয়া চোখের পিঁচুটি মুছাইয়া দিল।

কোনো কথা বলে না নঈমা। হাই উঠে তার ঘুম যেন গা-মতো হয় নাই।

কি রে, আরো ঘুমোবি, মা?

নঈমা কথা বলে না। মার বুকে মুখ গুঁজিয়া সে আরাম পায়।

আর একটু সবুর কর, মা! তারপর তোর আব্বাকে ভাত দেব, তোর আমু-ভাই খাবে, তুই খাবি।

ভাতের কথায় নঈমা উশখুশ করে মার কোলে।

এশার নামাজ তবে পড়ে এসো। আর দেরি করে লাভ নেই, নঈমার চোখে এখনও নিদ রয়েছে।

আজহার খাঁকে লক্ষ্য করিয়া দরিয়াবিবির উচ্চারণ।

স্বামী জবাব দিল, এদিকে আমুরও ঘুম পেয়েছে। আমার কোলে শুয়ে বেশ নাক ডাকাচ্ছে।

বিড়ার উপর বসিয়া আমু ঢুলিতে থাকে। দুই চোখ ভরিয়া গোটা রাজ্যের ঘুম আসিয়াছে।

দরিয়াবিবি এক বা পানি আনিয়া দিল।

এক কাজ করো না, ওজু করতে একটু ডানধারে সরে যাও। কতগুলো ছাঁচি কদুর বীজ পুঁতেছিলাম, কড়ে আঙুলটাক গাছ বেরিয়েছে। পানি তো রোজ দিই। আজ একটু ওজুর পানি পড়ুক। আর হুজুরের কদম-ধোওয়া পানি।

আজহার খাঁ কোনো কথা না বলিয়া উঠানের দক্ষিণদিকে ওজু করিতে বসিল। দরিয়াবিবির এত হাসি তার ভালো লাগে না।

রান্না শেষ। চুলার ভিতর পাতার আগুন। দরিয়াবিবি একটা হাঁড়ি চুলার মুখে বসাইয়া দিল, পাছে বাতাস ঢোকে। রাত্রির মতো দরিয়াবিবির কাজ চুকিয়াছে।

আর এক লোটা পানি আনিল সে। আমু খেয়ারে ঢুলিতেছিল। তার মুখে পানির ছিটা দিয়া দরিয়াবিবি বলিল, একটু হুঁশ কর বাবা, আর দেরি নেই। আজ তো একটু পড়তেও বসলি নে।

নঈমা তখনও খুঁতখুঁত করিতেছে।

একটু সবুর কর মা। ঘাট থেকে মুখে-হাতে পানি দিয়ে আসি।

আজহার খাঁর নামাজ-পড়া শেষ হইয়াছিল। নামাজের ছেঁড়া পাটি গুটাইতে লাগিল সে।

অন্ধকারে নামাজ-পড়া ভালো দেখায় না। দরিয়াবিবি আগেই একটি টিনের ডিপা জ্বালিয়াছিল চুলার নিকট। নামাজের পাটির দুর্দশা আলোয় স্পষ্ট দেখা যায়।

দরিয়াবিবি বলে, নূতন নামাজের পাটি আর কেনা হল না? সব কাজেই খোদাকে ফাঁকি।

হলো কই! মেলায় গেলাম। একটা পাটি দেড় টাকা চায়।

দরিয়াবিবির তর্ক শেষ হইয়া যায়। তবু সহজে সে দমে না।

ছেঁড়া পাটি। সেজদায় যাওয়ার সময় মাথায় ধুলো লাগুক। কপাল ক্ষওয়া দেখলে লোকে বলবে, খুব পরহেজগার (ধার্মিক)!

পাটি গুটানো শেষ করিয়া আজহার খাঁ মুখ খোলে, আল্লাকে ফাঁকি দেওয়ার জন্যে আজহার খাঁ নামাজ পড়ে না। আমার পর-দাদা আলী আসজাদ খাঁর নাম সবাই জানে। সেই বংশের ছেলে আমি।

পর-দাদা লেখাপড়া-জানা মৌলবী মানুষ। আমার আর লেখাপড়ার দরকার আছে? দরিয়াবিবি টিপ্পনী কাটিল।

আজহার খাঁ বংশের খোঁটা সহ্য করিতে পারে না। নিরীহ ভালো মানুষটি থাকে না তখন আজহার খাঁ। আপাতত চুপ করিয়া গেল সে।

তুমিও তো ঐ পাটিতে নামাজ পড়ো! তোমারও পরহেজগার হওয়ার শখ আছে।

তা আছে বৈকি! তোমাদের পায়ের তলায় আমাদের বেহেশত। তুমি যদি ঐ পাটি ব্যবহার কর, আমার জন্য বুঝি তা খুব দোষের ব্যাপার?

আজহার খাঁ এই মুহূর্তের জন্য অন্তত উষ্মা প্রকাশ করে। আর কোনো জিনিস চেয়ো না। পাটি একটা, যত দামই হোক কিনে আনব।

অত রাগের কাজ নেই। নামাজের পাটিতে কপাল ক্ষয়ে গেল, একটা পাটি কেনার আওকাত (সঙ্গতি) আল্লা দিল কৈ?

আজহার খাঁ চুপ করিয়া থাকে। দরিয়াবিবির কথা তাহার বুকের ভিতর তোলপাড় তুলে। এমন নাফরমান (অবাধ্য) বান্দা সাজিতেছে সে দিন-দিন। তৌবাস্তাগুফের পড়িল আজহার খাঁ তিনবার। তারপর গুম হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল।

ছেলেদের দিকে দেখো, আমি ঘাট থেকে আসি।

দরিয়াবিবি চলিয়া গেল। সারাদিনের পর অবকাশ মিলিয়াছে। চৈত্রের বাতাস বহিতেছিল ঝিরিঝিরি। বস্তার নিচে আগাছা-জঙ্গলে নামহীন কুসুম ফুটিয়াছে কোথাও।

খুব তাড়াতাড়ি দরিয়াবিবি পুকুরঘাট হইতে ফিরিয়া আসিল।

আজহার ছেলেদের লইয়া উঠানে বসিয়াছিল। জিজ্ঞাসা করে সে, এত তাড়াতাড়ি এলে?

দরিয়াবিবির অবয়বে ব্যস্ততার ছাপ।

বকরিটার বাচ্চা হবে বোধ হয়। ভারি ভ্যাবাচ্ছে, রাত বেশি হয় নি। ঘরে এনে–

না, না দেরী আছে।

আশঙ্কিত দরিয়াবিবি বলে, না, থেকে-থেকে ভারি ভ্যাবাচ্ছে। রাত্রে যদি বাচ্চা হয়, যা দুঁদে বাছুর রয়েছে, লাথিয়ে মেরে ফেলবে কচি বাচ্চা।

বাড়ি-সংলগ্ন ছোট উদ্বাস্তু। তারপর পুকুর আর পুকুরঘাট। পশ্চিম-উত্তর কোণে গোয়ালঘর। গরু-বাছুর-ছাগল একই জায়গায় রাখা হয়। পাড়ের দুপাশে বুনো ঘাস। সাপের আড্ডা। আজহার খাঁর তাই কাজের কোনো চাড় ছিল না।

দরিয়াবিবি বাক্যালাপ না করিয়া রান্নাঘরে প্রবেশ করিল। ব্যঞ্জনাদি পেয়ালায় পরিবেশনের সময় সে উৎকর্ণ হইয়া রহিল। ছাগলের ডাক ঘন ঘন শোনা যাইতেছে।

এবার ছেলেদের নিয়ে এসো।

ডাক দিল দরিয়াবিবি। কণ্ঠস্বরে ক্রোধ চাপা রহিয়াছে।

নঈমা নিজের হাতে খায় না। দরিয়াবিবি সকলের খাবার দেওয়ার পর তাকে কোলে তুলিয়া লইল। তার ঘুম যেন সম্পূর্ণ ভাঙে নাই। মার আঙুলের অন্ন সে নিঃশব্দে খাইতে লাগিল।

দরিয়াবিবির কান সদাসর্বদা খাড়া রহিয়াছে। ছাগলের চিৎকার মুহূর্তে শোনা যায়। অভাব-ছোঁওয়া সংসারে এই মূক পশুরাই তাহাদের সম্বল। গত বছর গোয়ালঘরে ছাগলের বাচ্চা হইয়াছিল। দুটিই গরুর গুঁতোয় মরিয়া যায়। তার পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে। সেই ছানা দুটি থাকিলে এই বছর চড়া দামে বিক্রি হইত! ব্যাপারীরা সেদিনও খোঁজ লইয়াছিল।

খাওয়াদাওয়া চুকিয়া গেলেও দরিয়াবিবির অবসর অত সহজে আসে না। আকাশে মেঘ জমিয়াছে। ভোররাত্রে যদি বৃষ্টি নামে! উঠানের পশ্চিমকোণে ঘুঁটে মেলা আছে। আজ ভিজিয়া গেলে কাল আর চুলা জ্বলিবে না! গাছের ঝরাপাতা লইয়া পাড়ায় মেয়েদের কোন্দল বাঁধে। দরিয়াবিবি ঝোড়ায় খুঁটেগুলি তুলিবার জন্য ছুটিয়া গেল। হাত-পা ধুইয়া আসিয়াছিল, আবার ঘুঁটে ছুঁইতে হইল। দরিয়াবিবি সহজে পরিশ্রান্ত হয় না। তবু আজ খারাপ লাগে তার।

আমজাদ মা’র কাছে শোয় না। তার আসর অন্য ঘরে। আজহার খাঁর দূর-সম্পর্কীয় এক বুড়ি খালা আছে। আসেকজান। সে চোখে ভালো দেখে না, শ্রবণ-শক্তিহীন। তার আর কোনো আশ্রয় নাই। এখানেই কোনোরূপে মাথা খুঁজিয়া থাকে। ঈদ, মোহররম ও অন্যান্য পর্বের সময় গ্রামের অবস্থাপন্ন মুসলমানেরা খয়রাত করে, জাকাত দেয়– তারই আয়ে কোনো রকমে দিন চলে। সন্ধ্যার পূর্বেই সে ঘরে ঢুকে, আর বাহির হয় না। খাওয়ারও কোনো হাঙ্গামা নাই তার। আমজাদ তার পাশে ঘুপটি মারিয়া শুইয়া থাকে।

বড় পাতলা ঘুম আসেকজানের। দৃষ্টিশক্তি অল্প বলিয়া আমজাদের খবরদারি সে করিতে পারে না। দরিয়াবিবি তাই অনেক রাত্রে উঠিয়া গিয়া দেখিয়া আসে। কামরার সংলগ্ন ছিটেবেড়ার ঘর। মাঝখানে একটি বাঁশের চোরা-টাঁটি আছে। যাতায়াতের কোনো অসুবিধা নাই। আমজাদের শোয়া খারাপ। গড়াইতে গড়াইতে হয়ত ধুলোর উপর শুইয়া থাকে। ডিপা হাতে আজও দরিয়াবিবি আমজাদকে দেখিতে আসিল। না, সুবোধের মতো সে ঘুমাইতেছে।

পা-তালির শব্দে আসেকজানের ঘুম ভাঙিয়া গিয়াছিল।

কে, আজহার?

না, আমি দরিয়া, খালা।

এত রাত্রে কেন, বৌ!

এমনি এলাম।

সারাদিন কাজ। যা, ঘুমো গে, বাছা।

আচ্ছা, যাই।

আসেকজান আবার সাড়া দেয় : বৌ, এলে যখন একটু পানি দাও না, মা। বুড়ো মানুষ আঁধারে হাতড়ে মরব।

আসলে আসেকজানের খুব কষ্ট হয় না অন্ধকারে। দুই ঘরে ডিপা জ্বালানোর কেরোসিন ব্যয় এই সংসারের পক্ষে দুঃসাধ্য। আসেকজান পীড়াপীড়ি করে না। সব তার অভ্যাসের কাছে পোষ মানিয়েছে। আঁধারে আঁধারে সে পুকুরঘাট পর্যন্ত যাইতে পারে।

দরিয়াবিবি কলসের পানি ঢালিয়া দিল।

বৌমা, কাল একটু ও-পাড়া যাব। কেউ যদি একটা কাপড় দেয়। সেই আর বছর ঈদে কখন মোসলেম মুনশী একখানা দিয়েছিল। আল্লা তার ভালো করুক।

দরিয়াবিবি মাঝে মাঝে ভারি কঠিন হয় বুড়ির উপর। এত রাত্রে আর গল্পের সময় নাই। দরিয়াবিবির অন্তর্ধানে আবার ঘরটি অন্ধকারে ভরিয়া উঠিল। শব্দের ভারসাম্য রাখিতে পারে না আসেকজান, নিজে বধির বলিয়া সে চেচাঁইয়া বলিতে থাকে, মড়ার দিনকাল কী হল? একটা একটাকা পাঁচসিকের কাপড়ও লোকের সত্যেয় ওঠে না। আখেরি জামানা! দজ্জাল আসতে আর দেরি নেই। চৌদ্দ সিদির (শতাব্দী) আমল, কিতাবের কথা কি আর ঝুট হবে?

অনেকক্ষণ পরে আসেকজান বুঝিতে পারে, ঘরে কেহ নাই। তখন নিজেই স্তব্ধ হইয়া যায়। শাদা চুলের উকুন বাছিতে বাছিতে আসেকজান দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে।

অখ্যাত পল্লীর নিভৃতে মানুষের আহাজারি-বুকে নৈশ বাতাস একটানা বহিয়া যায়।

দরিয়াবিবির আশঙ্কা অমূলক নয়। নিশুতি রাত্রে আবার ছাগলের অবিশ্রান্ত চিৎকার শোনা গেল।

দরিয়াবিবির পক্ষে বিছানায় পড়িয়া থাকা মুশকিল। যদি সত্যই ছাগলটির বাচ্চা হয়। সে একা সামাল দিতে অপারগ। স্বামীকে জাগাইতে হইল।

ঐ শোনো। ছাগলটা আকুলিবিকুলি করছে।

আজহার খাঁ উঠিয়া পড়িল।

না, গিয়ে দেখাই যাক। ডিপাটা জ্বালো।

দরিয়াবিবি স্বামীর আদেশ পালন করিল।

টাঁটি খুলিয়া আজহার খাঁ দেখিল, আকাশে দ্রুত মেঘ জমিতেছে। দমকা বাতাস হু হু শব্দে বহিতেছে।

দরিয়া-বৌ, ডিপা নিয়ে যেতে পারবে? খুব বাতাস।

ঘরে কোণায় একটি ধুচনি ছিল। ডিপাটি তার মধ্যে রাখিয়া স্ত্রী জবাব দিল : চলো, আমি বাতাস কাটিয়ে যেতে পারব।

পুকুরের পাড়ের পথ তত সুবিধার নয়। দুপাশে ঘন জঙ্গল। সাবধানে পা ফেলিতে হয়। ধুচনির ভিতর ভিজা আলো তাই স্পষ্টভাবে চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে না। ছাগলের চিৎকার আর যেন থামা জানে না।

জোর ঝড় উঠিতে পারে যে-কোনো মুহূর্তে। পুকুরপাড়ের গাছপালা ভাঙিয়া পড়িতেছে। নিশুতি বনভূমির প্রেতাত্মা খলখল হাস্যে উন্মাদ নৃত্য-তাণ্ডবে মাতিয়াছে যেন। চারিদিকে গোঙানির শব্দ ওঠে।

দরিয়াবিবি ভয় পায় না। ডিপা হাতে সাবধানে পা ফেলে সে।

না, এবার থেকে গোল ঘর সরিয়ে আনব ভিটের কাছে।

আজহার খাঁ বলিল। কথার খেই সে আবার নিজেই অনুসরণ করে : জায়গা পাব কার? তবু রায়েদের ভালোমানুষি যে, পুকুরপাড়ে গোল করতে দিয়েছে।

দরিয়াবিবি ডিপা সামলাইতে ব্যস্ত। কোনো কথা তার কানে যায় না। পাড়ের উপর শেয়াকুলের ঝোপ আড় হইয়া পড়িয়াছিল। আজহার ভাঙা পিঠুলির ডাল দিয়া কোনোরূপে পথ পরিষ্কার করিল। অতি সন্তর্পণে পা-ফেলা ছাড়া উপায় থাকে না। কাঁটাকুটিতে পথ বোঝাই হইয়া গিয়াছে।

আরো দমকা বাতাস আসে। গাছপালাগুলি যেন মাথার উপর ভাঙিয়া পড়ে আর কী।

এইখানে পথ বেশ পরিষ্কার। দরিয়াবিবি দ্রুত পা চালায়।

গোয়ালঘরের সম্মুখে আসিয়া তারা হাঁপ ছাড়ে। ছাগমাতার চিৎকারও আর শোনা যায় না।

গোয়ালের টাঁটি খোলা-মাত্র একটা শাদা বাছুর সম্মুখের তালবন হইতে ছুটিয়া আসিল।

হতভাগা, কোথা ছিলি সাঁজবেলা?

আজহারের গা ঘেঁষিয়া বাছুরটি লেজ দোলায়। মানুষের ভর্ৎসনা বোধহয় আদরের পূর্বলক্ষণ। দরিয়াবিবি বাছুরের গলায় দড়ি পরাইয়া দিতে লাগিল। নচেৎ সব দুধ শেষ করিয়া ফেলিবে।

প্রথমে গরুর কুঠরি ছাগলের কুঠরি একঘরে। ওই দিকটা আরো অন্ধকার। গোয়ালের চালে ঝড় খুব কম লাগে। চারিদিকেই প্রায় ঘন চারা তালগাছের সারি। বাতাস এই দুর্গ সহজে ভেদ করিতে পারে না।

দরিয়াবিবি ডিপা লইয়া ছাগলের কুঠরিতে ঢুকিল। আনন্দে তাহার দুই চোখ উজ্জ্বল হইয়া উঠে। অসহায় ছাগমাতা দণ্ডায়মান। সম্মুখে দুইটি কালো ছাগশিশু। পশুমাতা গা লেহন করিতেছে শিশু দুইটির।

এখনও ফুল পড়ে নাই। দরিয়াবিবি তাই বলিল, এক কাজ করা যাক, ফুলটা আমি ফেলে দিই, না হলে বাচ্চাগুলোর কী দশা হবে যদি ফুল খেয়ে বসে থাকে? দুধ কিনে বাচ্চা বাঁচানোর পয়সা আছে আমাদের?

দরিয়াবিবি আর বিলম্ব করে না। ধাত্রীর কাজ সে নীরবেই সম্পন্ন করিল।

চলো, আরো ঝড় উঠতে পারে। তুমি ধাড়িটাকে কোলে নাও। আমি বাচ্চা দুটো আর ডিপা নিই।

আজহার ইতস্তত করিতেছিল। সদ্যপ্রসূত ছাগীর সংস্পর্শ তার ভালো লাগে না।

অত বাবুয়ানি যদি করতে চাও করো। ছেলেদের মানুষ করবে, না নিজের মতো গরুর লেজ-মলা শেখাবে?

যাক না রাত্রের মতো। খালি বাচ্চা দুটো নিয়ে যাই।

দরিয়াবিবির কণ্ঠস্বর ঝংকৃত হয় : নাও তুমি বাচ্চা দুটো, আমি ধাড়িটা কোলে নিচ্ছি।

দরিয়াবিবির অবয়বের বাঁধন ভালো। ছাগলটিকে সে সহজেই বহন করিতে সমর্থ হইবে। আনন্দে তার কর্মব্যস্ততা আরো বাড়িয়া যায়।

কয়েক কাঠা জমি অগ্রসর হওয়ার পর মুশকিল বাধিল ডিপা লইয়া। আজহার খাঁর বুকে ছাগশিশু দুইটি। ডিপা আবার ধুচনির ভিতর সাবধানে না রাখিলে চলে না। একটু হাত কাঁপিলে বাতাসে নিভিয়া যাইবে।

ভয়ানক রাগিয়া উঠিল দরিয়াবিবি। শেয়ালকুলের ঝোপ পার হওয়ার পর দমকা বাতাসে ডিপা নিভিয়া গেল।

ঐ কাজ তোমাকে দিয়ে হয়! বাচ্চা দুটো আমাকে দিতে কী হয়েছিল?

আজহার খাঁ আর জবাব দেয় না। অন্ধকারে কোনো রকমে দুইজন অগ্রসর হয়।

কালো মেঘের পঙ্গপাল হুড়ুম-দুড়ুম গ্রামের উপর ভাঙিয়া পড়িতেছে। বৃষ্টি নামিলে দুরবস্থার আর অন্ত থাকিবে না।

অন্ধকারে দরিয়াবিবি বারবার আল্লাহর নাম করে। নঈমা একা ঘরে শুইয়া রহিয়াছে। পচা ছিটেবেড়ার ঘর। দরিয়াবিবির সমস্ত রাগ আজহার খাঁর উপর। চোখে তার জল আসে। এমন অবোধ মানুষকে লইয়া তার সংসার!

দরিয়া-বৌ, আর বেশি দেরি নেই।

বিদ্যুতের আলোকে পথ দেখা গেল। পুকুরপাড় শেষ হইয়াছে।

এইবার নামিল ঝমঝম বৃষ্টি। চেনা সরল পথ। আজহার খাঁ দৌড় দিল। ভারী ছাগ দরিয়াবিবির কোলে, সে ঝড়-বৃষ্টি মাধায় সন্তর্পণে চলিতে লাগিল।

উঠানে আসিয়া দরিয়াবিবি দেখিল, টাঁটি বাতাসে খুলিয়া গিয়াছে। ইন্তার পাতাপুতি ঢুকিতেছে ঘরে। নঈমা অন্ধকারে হাউমাউ জুড়িয়াছে। আসেকজান চেঁচাইতেছে। তার কথার কোনো হদিশ নাই।

ছাগলটিকে মাটির উপর রাখিয়া দরিয়াবিবি ধূলার উপর উপবেশন করিল। জায়গার বাছবিচার নাই তার। বড় শ্রান্ত সে।

আজহার খাঁ ডিপা জ্বালাইয়া মাদুরের উপর বসিয়া পড়িয়াছিল। তেলচিটা দাগ-লাগা বালিশের একপাশ হইতে কালো তুলা বাহির হইয়া পড়িয়াছে। শুইয়া পড়িল আজহার খাঁ।

ক্লান্ত দরিয়াবিবি করুণ দৃষ্টিতে বারবার স্বামীর মুখ অবলোকন করিতে লাগিল।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান