ইন্দিরা » ইন্দিরা

পাতা তৈরিজানুয়ারি ৫, ২০১৫; ০০:০০
সম্পাদনাজানুয়ারি ১৩, ২০২১, ২১:২৯
দৃষ্টিপাত
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ : ফাঁসির পর মোকদ্দমার তদারক আমরা কলিকাতায় দিনকত সুখে-স্বচ্ছন্দে রহিলাম। তার পর দেখিলাম, স্বামী একদিন একখানা চিঠি হাতে করিয়া অত্যন্ত বিষণ্ণভাবে রহিয়াছেন। জিজ্ঞাসা করিলাম, “এত বিমর্ষ কেন?” তিনি বলিলেন, “বাড়ী হইতে চিঠি আসিয়াছে। বাড়ী যাইতে হইবে।” আমি হঠাৎ বলিয়া ফেলিলাম, “আমি!” আমি দাঁড়াইয়াছিলাম—মাটিতে বসিয়া পড়িলাম। চক্ষু দিয়া দরবিগলিত ...

সপ্তদশ পরিচ্ছেদ : ফাঁসির পর মোকদ্দমার তদারক

আমরা কলিকাতায় দিনকত সুখে-স্বচ্ছন্দে রহিলাম। তার পর দেখিলাম, স্বামী একদিন একখানা চিঠি হাতে করিয়া অত্যন্ত বিষণ্ণভাবে রহিয়াছেন। জিজ্ঞাসা করিলাম, “এত বিমর্ষ কেন?”

তিনি বলিলেন, “বাড়ী হইতে চিঠি আসিয়াছে। বাড়ী যাইতে হইবে।”

আমি হঠাৎ বলিয়া ফেলিলাম, “আমি!” আমি দাঁড়াইয়াছিলাম—মাটিতে বসিয়া পড়িলাম। চক্ষু দিয়া দরবিগলিত ধারা পড়িতে লাগিল।

তিনি সস্নেহে হাত ধরিয়া আমায় তুলিয়া মুখচুম্বন করিয়া, অশ্রুজল মুছাইয়া দিলেন। বলিলেন, “সেই কথাই আমিও ভাবিতেছিলাম। তোমায় ছাড়িয়া যাইতে পারিব না।”

আমি। সেখানে আমাকে কি বলিয়া পরিচিত করিবে?—কি প্রকারে, কোথায় রাখিবে?

তিনি। তাই ভাবিতেছি। সহর নহে যে, আর একটা জায়গায় রাখিব, কেহ বড় জানিতে পারিবে না। বাপ-মার চক্ষের উপর, তোমায় কোথায় রাখিব?

আমি। না গেলেই কি নয়?

তিনি। না গেলেই নয়।

আমি। কত দিনে ফিরিবে? শীঘ্র ফের যদি, তবে আমাকে না হয়, এইখানেই রাখিয়া যাও।

তিনি। শীঘ্র ফিরিতে পারিব, এমন ভরসা নাই। কলিকাতায় আমরা কালেভদ্রে আসি।

আমি। তুমি যাও—আমি তোমার জঞ্জাল হইব না। (বিস্তর কাঁদিতে কাঁদিতে এই কথা বলিলাম) আমার কপালে যা থাকে, তাই ঘটিবে।

তিনি। কিন্তু আমি যে তোমায় না দেখিলে পাগল হইব।

আমি। দেখ, আমি ত তোমার বিবাহিতা স্ত্রী নহি—(স্বামী মহাশয় একটু নড়িয়া উঠিলেন)— তোমার উপর আমার কোন অধিকার নাই। আমাকে তুমি এ সময় বিদায়—

তিনি আমাকে আর কথা কহিতে দিলেন না। বলিলেন, “আজ আর একথায় কাজ নাই। আজ ভাবি। যা ভাবিয়া স্থির করিব, কাল বলিব।”

বৈকালে তিনি রমণ বাবুকে আসিতে লিখিলেন। লিখিলেন, “গোপনীয় কথা আছে। এখানে না আসিলে বলা হইবে না।”

রমণ বাবু আসিলেন। আমি কবাটের আড়াল হইতে শুনিতে লাগিলাম, কি কথা হয়। স্বামী বলিলেন, “আপনাদিগের সেই পাচিকাটি—যে অল্পবয়সী—তাহার নাম কি?”

র। কুমুদিনী।

উ। তাহার বাড়ী কোথায়?

র। এখন বলিতে পারি না।

উ। সধবা না বিধবা?

র। সধবা।

উ। তার স্বামী কে জানেন?

র। জানি।

উ। কে?

র। এক্ষণে বলিবার আমার অধিকার নাই।

উ। কেন, কিছু গুপ্ত রহস্য আছে নাকি?

র। আছে।

উ। আপনারা উহাকে কোথায় পাইলেন?

র। আমার স্ত্রী তাহার মাসীর কাছে উহাকে পাইয়াছেন।

উ। উহার বাড়ী কোথায়, কেন বলিতেছেন না?

র। বলিবার অধিকার নাই।

উ। স্বামীর বাড়ী কোথায়?

র। ঐ উত্তর।

উ। স্বামী জীবিত আছে?

র। আছে।

উ। ঐ স্ত্রীলোকটি এখন কোথায়?

র। আপনার এই বাড়ীতে।

স্বামী মহাশয় চমকিয়া উঠিলেন। বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কিপ্রকারে জানিলেন?”

র। আমার বলিবার অধিকার নাই। আপনার জেরা কি ফুরাইল?

উ। ফুরাইল। কিন্তু আপনি ত জিজ্ঞাসা করিলেন না যে, আমি কেন আপনাকে এসকল কথা জিজ্ঞাসা করিলাম?

র। দুই কারণে জিজ্ঞাসা করিলাম না। একটি এই যে, জিজ্ঞাসা করিলে, আপনি বলিবেন না। সত্য কিনা?

উ। সত্য। দ্বিতীয় কারণটি কি?

র। আমি জানি, যে জন্য জিজ্ঞাসা করিতেছেন।

উ। তাও জানেন? কি বলুন দেখি?

র। তা বলিব না।

উ। আচ্ছা, আপনি ত সব জানেন দেখিতেছি। বলুন দেখি, আমি যে অভিসন্ধি করিতেছি, তাহা ঘটিতে পারে কিনা?

র। খুব ঘটিতে পারে। আপনি কুমুদিনীকে জিজ্ঞাসা করিবেন।

উ। আর একটি কথা। আপনি কুমুদিনীর সম্বন্ধে যাহা জানেন, তাহা সব একটা কাগজে লিখিয়া দিয়া দস্তখত করিয়া দিতে পারেন?

র। পারি—এক সর্তে। আমি লিখিয়া পুলিন্দায় সীল করিয়া কুমুদিনীর কাছে দিয়া যাইব।

আপনি এক্ষণে তাহা পড়িতে পারিবেন না। দেশে গিয়া পড়িবেন। রাজি?

স্বামী মহাশয় অনেক ভাবিয়া বলিলেন, “রাজি। আমার অভিপ্রায়ের পোষক হইবে ত?”

র। হইবে।

অন্যান্য কথার পর রমণ বাবু উঠিয়া গেলেন। উ-বাবু আমার নিকট আসিলেন।

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “এ সব কথা হইতেছিল কেন?”

তিনি বলিলেন, “সব শুনিয়াছ না কি?”

আমি। হাঁ শুনিয়াছি। ভাবিতেছিলাম, আমি ত তোমায় খুন করিয়া, ফাঁসি গিয়াছি। ফাঁসির পর আর তদারক কেন?

তিনি। এখনকার আইনে তা হইতে পারে।

উ। যাক—এ সব বাজে কথা। উহার চরিত্র কেমন?

র। অনিন্দনীয়। আমাদের বুড়ী রাঁধুনীটাকে বড় ক্ষেপাইত। তা ছাড়া একটি দোষও নাই।

উ। স্ত্রীলোকের চরিত্রদোষের কথা জিজ্ঞাসা করিতেছি।

র। এমন উৎকৃষ্ট চরিত্র দেখা যায় না।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান