web analytics

রম্যরচনা > চতুরঙ্গ

রম্য লেখনীতে মুজতবা আলীর জুড়ি নেই, এই বিষয়ে সকলেই বিদিত। সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘চতুরঙ্গ’ বইটির আওতা ব্যাপক এবং নানাবিধ হলেও ৪৩টি অধ্যায়ের বেশিরভাগটিতেই স্থাপত্য শিল্প থেকে শুরু করে সঙ্গীত, চলচ্চিত্রসহ অন্যান্য কলার রস আস্বাদনের নানা দিক বর্ণনা করা হয়েছে। বইটি বিভিন্ন শিল্প উপভোগে আগ্রহী পাঠকের ‘এলিমেন্টারি কোর্স’ হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, বইটির মূল বিষয়গুলি ভাব গাম্ভীর্যপূর্ণ হলেও নানা দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ১৫টি ভাষায় পারদর্শী লেখকের সুলেখনীর কারণে খুটিনাটি গুলো পাঠকের কখনো একঘেয়ে মনে হবে না বরং ঐ সব বিষয়ে লেখকের নিজের অভিজ্ঞতা ও মতামতের অন্তর্ভূক্তি অধ্যায়গুলোকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের হাসি ঠাট্টা নিয়ে বইয়ের প্রথম অধ্যায় রবিপুরাণ। লেখকের মতে রবীন্দ্রনাথের জীবনের লাইটার সাইড গুলোই তার এ প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়। নসরুদ্দিন খোজার ওপর লিখিত লেখকের একটি পরিচিত রচনা এই বইয়ের অন্তর্ভূক্ত। কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং ওমর খৈয়ামের উপর তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে একটি অধ্যায়ে। কবিদ্বয়ের মধ্যে নানাবিষয়ে পার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু একটি দিক দিয়ে তাদের মধ্যে মিল পাওয়া যায়। তারা দুজনেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন তাদের সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে। কবি নজরুল বিরোধিতা করেছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ শোষকদের অনাচারের আর ওমর খৈয়াম রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তখনকার ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধে। ‘ত্রিমূর্তি (চাচা কাহিনী)’, ‘গাঁজা’ সৈয়দ মুজতবা আলীর ট্রেডমার্ক রম্যগল্প। পাঠক তার হাসি আটকিয়ে রাখতে পারবেন না এগুলো পড়লে। ‘মামদোর পুনর্জন্ম’ নামক একটি অধ্যায়ে লেখক বলেছেন— পূর্ব বাংলাই বাংলা ভাষার চরিত্র আর বৈশিষ্ট্য টিকিয়ে রাখবে। অতীতে এই ভাষার ওপর দিয়ে অনেক ঝড় ঝঞ্চা গিয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনের সময় কেউ না কেউ উঠে দাঁড়িয়েছে এবং ভাষাকে রক্ষা করেছে প্রয়োজনে তা বুকের রক্ত দিয়ে হলেও। এই প্রবন্ধের নামকরণ সম্পর্কে লেখক বলেছেন— “মামদোরই’ যখন কোন অস্তিত্ব নেই তখন তার পুনর্জন্ম হবে কি প্রকারে? পুর্ববাংলার লেখকদের স্কন্ধে আরবী ফার্সি শব্দের ‘মামদো’ ভর করবে আর তারা বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে আরবী ফার্সিতে অর্থাৎ, ‘যাবনী মেশালে’ কিচির মিচির করতে থাকবে, বিজাতীয় সাহিত্য সৃষ্টি করবে যার মাথা মুণ্ডু পশ্চিম বাংলার লোক বুঝতে পারবে না সে ভয় ‘স্বপ্ন, মায়া, মতিভ্রম’।”
এছাড়াও ‘দিল্লী স্থাপত্য’ নামক অধ্যায়ে স্থাপত্য শিল্প, তার কম্পোজিশন, ভারতের উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ‘ফরাসি বাংলা’, ‘ইভান সের্গেভিচ তুগেনফ’ ও অন্যান্য প্রবন্ধ থেকে বিদেশি শিল্পের ওপর লেখকের পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যায়। Abstract বা Modern Art নিয়ে মজাদার আলোচনা করা হয়েছে একটি অধ্যায়ে। সুইডেন এর একটি exhibition এর ঘটনা যেখানে কর্তৃপক্ষ শিল্পীর তুলি পোছার কাগজটিকে অমূল্য কোন Abstract চিত্র ভেবে শো’তে লটকিয়ে দিয়েছে। লেখকের প্রশ্ন শিল্প কি তাহলে শুধু সৃজনশীলতা নয় দুর্ঘটনার মাধ্যমেও প্রকাশ পেতে পারে?
হিন্দি ফিল্মের বিষয়ে কিন্তু মুজতবা আলীর মন্তব্যটি বাঁধিয়ে রাখার মত! — “আমি এ জীবনে তিনখানা হিন্দি ছবিও দেখিনি এবং অন্য কোন পাপ করিনি বলে এই পূণ্যের জোরেই স্বর্গে যাবো বলে আশা রাখি। তবে বলা যায় না, সেখানে হয়তো হিন্দী ছবি-ই দেখতে হবে। যদি প্রশ্ন শোধান, সে কি করে হয়? — তুমি হিন্দী ফিলিম বর্জন করার পূণ্যে স্বর্গে গেলে, সেখানে আবার তোমাকে ঐ ‘মাল’ই দেখতে হবে কেন? তবে উত্তরে নিবেদন, কামিনীকাঞ্চনসুরা বর্জন করার জন্য আপনি যখন স্বর্গে যাবেন তখন কি ইন্দ্রসভায় ঐ গুলোরই ছড়াছড়ি দেখতে পাবেন না?”
একটি দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সবচাইতে অকাজের অংশটি সম্ভবত এর সেন্সর বোর্ড। লেখকের এ বিষয়ক একটি মন্তব্য তুলে দেয়া প্রাসঙ্গিক মনে করছি। “সেনসর বোর্ড ফোর্ড ও তখন শিশু, এখনকার মত জ্যাঠা হয়ে উঠেনি, কাজেই হরেক রুচির ফিল্ম তখন এদেশে অক্লেশে আসত এবং আমরা সেগুলো গোগ্রাসে গিলতুম, তার ফলে আমাদের চরিত্র সর্বনাশ হয়েছে সে কথা কেউ কখনো বলেনি এবং আজ যে সেন্সর বোর্ডের এত কড়াকড়ি, তার ফলে এ যুগের চ্যাংড়া চিংড়িরা যীশুখেস্ট কিংবা রামকেষ্ট হয়ে গিয়েছে এ মস্করাও কেউ করেনি!”
সব মিলিয়ে বলা যায় সুখপাঠ্য একটি বই যা যা আপনাকে অবসরে বিনোদনের পাশাপাশি তথ্য এবং বেচে থাকার উৎসাহের খোরাক যোগাবে। চতুরঙ্গের মতই এ বইয়ের আওতা ও নানা দিকে বিস্তৃত। কাজেই নামকরণ ও স্বার্থক তা বলাই বাহুল্য।
Read online or Download this book

© ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

এই বইটির স্বত্বাধিকার লেখক বা লেখক নির্ধারিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের, অর্থাৎ বইটি পাবলিক ডোমেইনের আওতাভূক্ত নয়৷ কেননা, যে সকল বইয়ের উৎস দেশ ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে, লেখকের মৃত্যুর ষাট বছর পর স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত অথবা বেনামে বা ছদ্মনামে ও মরণোত্তর প্রকাশিত রচনা বা গ্রন্থসমূহ প্রথম প্রকাশের ষাট বছর পর পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়৷ অর্থাৎ, ১ জানুয়ারি, 2019 সাল হতে 1959 সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে। এবং 1959 সালের পরে প্রকাশিত বা মৃত লেখকের বইসমূহ পাবলিক ডোমেইনের আওতাভূক্ত হবে না৷

আইনি সতর্কতা

প্রকাশক এবং স্বত্বাধিকারীর লিখিত অনুমতি ছাড়া এই বইয়ের কোনও অংশেরই কোনওরূপ পুনরুৎপাদন বা প্রতিলিপি করা যাবে না, কোন যান্ত্রিক উপায়ের (গ্রাফিক, ইলেকট্রনিক বা অন্য কোনও মাধ্যম, যেমন ফটোকপি, টেপ বা পুনরুদ্ধারের সুযোগ সম্বলিত তথ্য-সঞ্চয় করে রাখার কোনও পদ্ধতি) মাধ্যমে প্রতিলিপি করা যাবে না বা কোন ডিস্ক, টেপ, পারফোরেটেড মিডিয়া বা কোনও তথ্য সংরক্ষণের যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পুনরুৎপাদন করা যাবে না। এই শর্ত লঙ্ঘিত হলে উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।

Leave a Reply

WhatsApp chat