রিভিউ: কোনো এক সরু অজানা গলির একপ্রান্তে একটা আস্তর-ওঠা লাল দালানে থাকেন হাসমত আলী ও তার পরিবার। হাসমত আলীর স্ত্রীর নাম সালেহা বিবি। তাদের ছেলে দুইজন, খোকন আর মাহমুদ। মাহমুদ পরিবারের বড় ছেলে। খুব কম বেতনে চাকরী করে একটি পত্রিকা অফিসে। মেয়েদের মধ্যে মরিয়ম সবার বড়, তারপরে হাসিনা এবং সবশেষে দুলু।
হাসমত আলী রিটায়ার করেছেন। পেনশনের সামান্য কিছু টাকা দিয়ে সংসার চলেনা, বড় মেয়ে মরিয়মের টিউশনির টাকা আর বড় ছেলে মাহমুদের চাকরীর সামান্য বেতন মিলিয়ে কোনোরকমে একরকম কষ্টেসৃষ্টে দিন কেটে যায়।
মাহমুদ প্রতিবাদী যুবক। অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে পারেনা, মনেপ্রাণে সততার আদর্শকে ধারণ করে। সে চেয়েছিলো একজন আদর্শ সাংবাদিক হবে, লুই ফিশার হবে। এ কারনেই কাজ নিয়েছিলো “মিলন” পত্রিকায়। কিন্তু পত্রিকা অফিসে চাকরী করে এসে সে জানতে পারলো, এখানে টিকতে হলে উপরওয়ালাদের পদলেহন করতে হয়। উপরওয়ালাদের তোষামোদি করে সংবাদ তৈরী করার জন্য সাংবাদিক হতে চায়নি সে। অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে না পেরে চাকরী ছেড়ে দেয় সে একসময়।
বড়মেয়ে মরিয়ম এক বড়লোকের বাড়িতে সেলিনা নামের এক মেয়েকে টিউশনি পড়াতো। সেলিনার বড়বোনের দেবর মনসুরের সাথে সেখানেই পরিচয় হয় মরিয়মের। বিশাল বড়লোক মনসুর। একদিন পরিবারের সম্মতিতে মরিয়মের সাথে মনসুরের বিয়েও হয়। তারপর?
আমার মত অনেকেরই হয়তো জহির রায়হানের সাথে পরিচয় হয়েছে মাধ্যমিকের বাংলা সহপাঠ বইয়ের “হাজার বছর ধরে” উপন্যাসের মাধ্যমে। জহির রায়হানের ভক্ত আমি তখন থেকেই। এরপর তাঁর অনেক বই পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। মাঝেমাঝে কিছু মানুষের জন্য বুক থেকে বিশাল দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। জহির রায়হান সেরকমই একজন মানুষ। এরকম প্রতিভাবান মানুষ কত অল্পবয়সেই না আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এরকম প্রখর মেধাসম্পন্ন চলচ্চিত্র পরিচালক “বাংলাদেশ” এর ইতিহাসে এর আগে আর এসেছিলো? তিনি অকালে মারা না গেলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো। তাঁর লেখাগুলোও পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধের মত আচ্ছন্ন করে রাখতো, রাখে হয়তোবা ভবিষ্যতেও রাখবে। জহির রায়হানের অকাল মৃত্যু এ দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি, অমোচনীয় দাগ।
এবার আসি উপন্যাসের কথায়। কিছু কিছু উপন্যাসের বিশ্লেষণ আমার মত নগন্য মানুষ করতে পারেনা, করা উচিতও না। “বরফ গলা নদী” আমার এ ক্ষুদ্রজীবনে পড়া উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা। যদি কেউ আমার পড়া সেরা উপন্যাসগুলোর তালিকা করতে বলে, তালিকার উপরের দিকেই থাকবে “বরফ গলা নদী।” উপন্যাসের শেষে এসে অনেকের চোখই যে আর্দ্র হবে, এ নিশ্চয়তা আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই দিতে পারি। এ উপন্যাসের নামকরণও সার্থক হয়েছে পুরোপুরি। মানুষের জীবন তো আসলে বরফ গলা নদীই।
জহির রায়হানের “বরফ গলা নদী” না পড়া পাঠকের জন্য অমার্জনীয়, অমোচনীয় পাপ। বাংলা সাহিত্যের এক মূল্যবান রত্ন “বরফ গলা নদী” সে আপনি স্বীকার করুন আর না ই করুন।

সূত্র: somewhereinblog | শুভ-অশুভ ব্লগ থেকে।
ডাউনলোড: Epub Or Mobi Or PDF
রচনাবলী
আপনার জন্য প্রস্তাবিত বইসমূহ