ফেলুদা সমগ্র » খসড়া খাতায় ফেলুদা

পাতা তৈরিজানুয়ারি ১৭, ২০২১; ১২:৫০
সম্পাদনাজানুয়ারি ১৭, ২০২১, ১২:৫০
দৃষ্টিপাত
ভারী বিপদে পড়লাম। সন্দেশ’-এর এই বিশেষ সংখ্যায় ফেলুদাকে নিয়ে এতজনে লিখছেন যে, বিষয়ের মিল হয়ে যাবার একটা আশঙ্কা থাকে। এখন এই সমস্যাকে এড়ানো যায় কীভাবে? অগত্যা সব থেকে নিরাপদ রাস্তাটাই বেছে নিলাম—ফিরে গেলাম বাবার খসড়া খাতায়। এ-খাতা কিন্তু ওর বিখ্যাত লাল খেরোর কাপড় দিয়ে বাঁধানো ফিল্মের খাতা নয়—পার্ক স্ট্রিটের অক্সফোর্ড ...

ভারী বিপদে পড়লাম। সন্দেশ’-এর এই বিশেষ সংখ্যায় ফেলুদাকে নিয়ে এতজনে লিখছেন যে, বিষয়ের মিল হয়ে যাবার একটা আশঙ্কা থাকে। এখন এই সমস্যাকে এড়ানো যায় কীভাবে? অগত্যা সব থেকে নিরাপদ রাস্তাটাই বেছে নিলাম—ফিরে গেলাম বাবার খসড়া খাতায়। এ-খাতা কিন্তু ওর বিখ্যাত লাল খেরোর কাপড় দিয়ে বাঁধানো ফিল্মের খাতা নয়—পার্ক স্ট্রিটের অক্সফোর্ড বুক কোম্পানি থেকে কেনা হার্ড কভারের খাতা—যার উপর সোনার জল দিয়ে ছোট্ট করে লেখা: ‘নোটস’। ১৯৬১ সাল, অর্থাৎ, নতুন সন্দেশ’-এর প্রথম বছর থেকে এই খাতা কেনা শুরু হয়, এবং সেই অভ্যাস বজায় থাকে ১৯৯১ অবধি। এই তিরিশ বছরের প্রায় ৭০-৮০টা খাতা থেকে ফেলুদাকে নিয়ে যে কত অজানা তথ্য বেরিয়ে এল, তার ইয়ত্তা নেই। সেইসব কিছু তথ্যের কথাই আজ তোমাদের বলব।

১৯৬১ থেকে ১৯৬৪—এই চার বছরের কোনও খাতাতেই ফেলুদার নাম-গন্ধটি নেই। তারপর হঠাৎই, ১৯৬৫-তে, খাতার একেবারে তৃতীয় পাতায় ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ শুরু হয়ে গেছে। প্রথম পাতায় শুধু ইংরিজিতে লেখা বাবার সই ও সাল। এক নতুন চরিত্রের জন্মের আগে, একজন লেখক সাধারণত যেসব প্রাথমিক খসড়া করে থাকেন, উনি তা কিছুই করেননি। গত চার বছরে লেখা অন্যান্য গল্পের মতো সরাসরি আরম্ভ করে দিয়েছেন। ফেলুদাকে নিয়ে যে একটা জবরদস্ত, সাড়াজাগানো সিরিজ হতে পারে, সেই চিন্তা কিন্তু তখনও তার মাথায় আসেনি। ২৭ পাতার ঝরঝরে খসড়াটি শেষ করেই ধরেছেন ‘আশ্চর্য’ পত্রিকার জন্য কল্পবিজ্ঞানের গল্প ‘ময়ূরকণ্ঠী জেলি’। এ ছাড়া ওঁর প্রথম প্রকাশিত বই ‘প্রোফেসর শঙ্কু’র প্রচ্ছদের কিছু এলোমেলো নকশা এঁকেছেন।

ফেলুদা যে হিট, সেটা অবিশ্যি তার পরের বছরের খাতা দেখলেই বোঝা যায়। প্রায় এক নিশ্বাসে লিখে ফেলেছেন বারোটা কিস্তিতে ভাগ করা ‘বাদশাহী আংটি’। তবে ১৯৬৯ অবধি ফেলুদার গল্পে বা উপন্যাসে কোনও তারিখ নেই, খালি খাতার প্রথম পাতায় যথারীতি বাবার সই ও সালটা লেখা। যদিও ‘গ্যাংটকে গণ্ডগোল’ লেখার শুরুর তারিখটা উনি দিয়েছিলেন, কিন্তু কবে লেখা শেষ করলেন, সেটা দেননি। তবে ১৯৭২ সাল থেকে উনি ফেলুদার অধিকাংশ লেখাতেই দুটো তারিখই দিতে আরম্ভ করেন। এবার পরের পাতার (নীচের) ছকটা দেখে ফেলুদার কোন লেখা কবে লেখা হয়েছে, বা কত দিনে লেখা হয়েছে, সেটা জেনে নিতে পারো।

এতে দেখা যাচ্ছে দুই থেকে পাঁচ দিনে গল্প লেখা হচ্ছে, তিন থেকে নয়ে নভেলেট, আর ছয় থেকে তেত্রিশে উপন্যাস। গোড়ার দিকে বছরে একটা, কিন্তু পরে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার ফলে দুটো, এমনকী তিনটে করেও ফেলুদা লিখতে হয়েছে বাবাকে। আর এটাও ভুলে গেলে চলবে না যে, এইসব লেখার ফাঁকে ফাঁকে তিনি ফিল্মও তুলে যাচ্ছেন। তবে রেকর্ড করলেন ১৯৮৯ সালে। শুধু জুন মাসেই একটানা এগারো দিন লিখে শেষ করলেন তিন-তিনটে ফেলুদা কাহিনী—‘ডাঃ মুনসীর ডায়রি’, ‘গোলাপী মুক্তা রহস্য’ ও ‘লন্ডনে ফেলুদা’।

‘কৈলাস রহস্য’ নামে বাবা একটা ফেলুদা-উপন্যাস শুরু করেন ১৯৭২ সালের ৬ জুন। মাত্র তিন পাতা লিখে তার হঠাৎ একটা নতুন প্লট মাথায় আসে। ফলে, ‘কৈলাস…’কে ধামাচাপা দিয়ে, পরদিনই খাতাটা উলটে চালু হয়ে যায় বাক্স-রহস্য। কিন্তু তার ঠিক এক বছর বাদে, তিনি আবার সেই তিন পাতার আইডিয়াতে ফিরে আসেন। তখন অবিশ্যি নাম পালটে সেটা ‘কৈলাসে কেলেঙ্কারি’ হয়ে গেছে।

বাবা যখন খসড়া থেকে ফুলস্ক্যাপ কাগজে ফাইনাল কপি করতেন, তখনও নানারকম অদল বদল হত। যেমন ‘হত্যাপুরী’ ও ‘টিনটোরেটোর যীশু’র প্রথম খসড়ায় যথাক্রমে ‘ডুংরুর কথা’ ও ‘রুদ্রশেখরের কথা (১)’ উনি লেখেননি—সোজা দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ থেকে গল্প শুরু করেছেন। ‘কৈলাসে কেলেঙ্কারি’র কথাই ধরা যাক। প্রকাশিত অবস্থায় এই উপন্যাসের প্রথম দুটি বাক্য হল—‘জুন মাসের মাঝামাঝি। স্কুল ফাইনাল দিয়ে বসে আছি, রেজাল্ট কবে বেরোবে জানি না। কিন্তু খসড়ায় সে-উপন্যাস শুরু হচ্ছে একেবারে সিধুজ্যাঠার উক্তি দিয়ে, যা বইতে আসছে তিন নম্বর পাতার গোড়ায়—‘মানুষ খুন ত আকচার হচ্ছে; তার চেয়েও সাংঘাতিক খুন কী জান?

‘কৈলাসে কেলেঙ্কারি’র এই ১১২ পাতার খসড়াটা লিখতে বাবার ন’দিন সময় লেগেছিল। কিন্তু তার মাঝখানে যে উনি চার দিন ধরে সাইনাস রোগে ভুগেছিলেন, তারও উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে শেষ পাতায়।

এভাবেই খুঁজতে খুঁজতে ১৯৮৭ সালের একটা খাতা থেকে বেরিয়ে পড়ল ইন্দ্রজাল রহস্য। ছোটগল্প ‘গণেশ মুৎসুদ্দির পোট্রেট’ আর ফেলুদার ‘অপ্সরা থিয়েটারের মামলা’র মাঝখানে ছাব্বিশ পাতার এই সম্পূর্ণ লেখাটা দেখে তো আমি অবাক! চাপা উত্তেজনা নিয়ে এক নিমেষে লেখাটা পড়ে ফেলে নিশ্চিন্ত হলাম। না, এর সঙ্গে অন্য ফেলুদা-গল্পের কোনও মিলই নেই। অথচ, যেখানে ‘অপ্সরা থিয়েটারের মামলা’ প্রকাশিত হল, সেখানে তার ঠিক আগে লেখা ‘ইন্দ্রজাল রহস্য’ বাদ পড়ল কেন? রহস্যই বটে!

এ ছাড়াও বেরুল এন্তার অসমাপ্ত ফেলুদা-গল্পের খসড়া—যার থেকে একটা এবার শারদীয়া সন্দেশ’-এ বেরিয়েছে। বাকিগুলো যে কয়েক মাসের মধ্যেই পাবে, তা বলাই বাহুল্য।

ফেলুদার লেখার এক বাড়তি আকর্ষণ যে দেশ-ভ্রমণ, সেটা তোমরা সকলেই মানবে। ফেলুদার যাওয়া সব জায়গাতেই বাবা কোনওনা-কোনও সময় গেছেন। এর মধ্যে দার্জিলিং ওঁর অত্যন্ত প্রিয় ছিল। কাজেই, তার প্রথম মৌলিক চিত্রনাট্য ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ আর প্রথম ফেলুদার গল্পের ঘটনা যে দার্জিলিং শহরেই ঘটবে, তাতে আর আশ্চর্য কী?

দার্জিলিং ছাড়াও, প্রতি বছর পুজোর ছুটিতে আমাদের পুরী যাওয়াটা ছিল বাঁধা। যার ফল অবশ্যই ‘হত্যাপুরী’। আর বাবার ছেলেবেলায় ঘোরা লখনৌ ও কাশ্মীরের স্মৃতি থেকেই লেখা হয়েছে ‘বাদশাহী আংটি’ ও ‘ভূস্বর্গ ভয়ংকর’। ১৯৮২-তে বাবা-মা ফিলিপাইনস দ্বীপপুঞ্জের প্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে ম্যানিলা শহরে আমন্ত্রিত হন। যাবার পথে তারা একদিন হংকং-এ ছিলেন। যদিও সে-শহর বাবার আগেই দেখা, কিন্তু এবারের জাঁকজমক তার চোখ ঝলসে দিল। ফেলুদাকে তাই আর শুধু ভারতবর্ষ-নেপালে আটকে রাখা গেল না—লেখা হল ‘টিনটোরেটোর যীশু’। বিদেশের আরও দুটো জাঁদরেল শহর বাবাকে ভীষণ টানত—লন্ডন ও নিউ ইয়র্ক। লন্ডনে ফেলুদা গেল ঠিকই, কিন্তু নিউ ইয়র্কে আর তার যাওয়া হয়ে উঠল না।

‘বাবার ফিল্মের জীবনও যে ফেলুদার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তারও প্রমাণ পাওয়া যায় বার বার। সিকিমের উপর এক তথ্যচিত্র করার পরেই লেখা হয় ‘গ্যাংটকে গণ্ডগোল’। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর সময় জয়সলমীরে তোলা হাল্লা রাজার দুর্গ হয়ে ওঠে ‘সোনার কেল্লা’। সেই একই ছবিতে গুপী বাঘা যখন ‘ঝুণ্ডি!’ বলে তালি মেরে বরফের দেশে পৌঁছে যায়, তার শুটিং হয় সিমলার কাছে কুফরি অঞ্চলে। সেই সিমলা, এবং বিশেষ করে কুফরিতে ঘটে যায় তিন বছর বাদে লেখা ‘বাক্স রহস্য’র দুর্ধর্ষ ক্লাইম্যাক্স। ‘অপরাজিত’ তুলতে গিয়ে বাবা বেনারস চষে ফেলেছিলেন, আর সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে সাহায্য করে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ লিখতে। ‘হীরক রাজার দেশে’র একটা দৃশ্য নিতে আমরা সকলে নেপাল যাই। কাঠমাণ্ডু থেকে কাকুনি নামের একটা জায়গায় গিয়ে, গুপী-বাঘাকে নিয়ে তোলা হয় এবারে দেখ গর্বিত বীর…’ গানটি। তারপরেই কলকাতায় ফিরে ফেলুদার যে উপন্যাসটা বাবা লেখেন তার নাম তোমরা সকলেই জানো। এমনকী, ফেলুদার শেষ লেখা ‘রবার্টসনের রুবি’তেও বাবার ফিল্ম-জীবনের এক জায়গা ও এক ঘটনা পাওয়া যাবে। জায়গাটা হল দুবরাজপুরের মামা-ভাগনে পাহাড় (‘অভিযান’), আর ঘটনাটা হল সাঁওতাল নাচের দৃশ্য (আগন্তুক’)।

১৯৮৩ সালের ১ অক্টোবর বাবার প্রথম হার্ট-অ্যাটাক হয়, এবং সেই দিনই তিনি ভর্তি হয়ে যান বেলভিউ নার্সিং হোমে। ৭২ ঘণ্টা কড়া নজরে রাখার পর, ডাক্তাররা মোটামুটি হাঁফ ছেড়ে জানান যে, এ যাত্রার ফাঁড়াটা কেটেছে—তবে ঘরে এখনও তাকে নামানো হবে না, ইনটেনসিভ কেয়ারেই থাকবেন। সেই বেলভিউতেই, ৬ নভেম্বর বাবা শুরু করেন ‘এবার কাণ্ড কেদারনাথে’। কিন্তু মাত্র একদিন লিখে, সাত দিনের বিরতি। তারপর ১৪ থেকে একনাগাড়ে দশ দিন লিখে, নার্সিং হোমেই উপন্যাসটি শেষ করেন তিনি। আর সেই লেখার প্রথম খসড়ার যে নাম উনি দিয়েছিলেন, সেটা একমাত্র ওই অবস্থাতে ওঁর পক্ষেই দেওয়া সম্ভব—‘কেদারদা’, বদ্রিদা’ আর ফেলুদা’!1

সন্দীপ রায়

টীকা

  1. সন্দেশ ‘ফেলুদা ৩০’ বিশেষ সংখ্যা (অগ্রহায়ণ ১৪০২)
গ্রন্থাবলী
মতামত জানান