ফেলুদা সমগ্র » গোরস্থানে সাবধান

পাতা তৈরিডিসেম্বর ৩, ২০২০; ০০:১৮
সম্পাদনাডিসেম্বর ১৫, ২০২০, ১৩:৫৬
দৃষ্টিপাত
‘সাবধান গোরস্থান’ উপন্যাসটি রচিত হয় চার দিনে; সাতাশ আগস্ট থেকে পয়লা সেপ্টেম্বর ১৯৭৭-এ। পরে ‘গোরস্থানে সাবধান’ শিরোনামে শারদীয়া দেশে প্রকাশিত হয় ১৩৮৪-এ। আনন্দ পাবলিশার্স থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় মে ১৯৭৯-এ। প্রচ্ছদ ও অলঙ্ককরণ সত্যজিৎ রায়। আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত ‘কলকাতায় ফেলুদা’ গ্রন্থে সঙ্কলিত হয় জানুয়ারি ১৯৮৮-এ। ...

রহস্য-রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক জটায়ু ওরফে লালমোহন গাঙ্গুলীর লেখা গল্প থেকে বম্বের ফিল্ম পরিচালক পুলক ঘোষালের তৈরি ছবি কলকাতার প্যারাডাইজ সিনেমায় জুবিলি করার ঠিক তিন দিন পরে বিকেল বেলা উৎকট সারেগামা হর্ন বাজিয়ে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড মার্ক ঢুঁ অ্যাম্বাসডর গাড়ি আমাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। আমরা জানতাম যে লালমোহনবাবু একটা গাড়ি কেনার তাল করছেন, কিন্তু ঘটনাটা যে এত চট করে ঘটে যাবে সেটা ভাবিনি। অবিশ্যি শুধু যে গাড়িই কেনা হয়েছে তা নয়; তার সঙ্গে একটি ড্রাইভারও রাখা হয়েছে, কারণ লালমোহনবাবু গাড়ি চালাতে জানেন না। এমনকী শেখার ইচ্ছেটাও নেই। একথাটা তিনি এতবার আমাদের বলেছেন যে, শেষটায় এক’দিন ফেলুদাকে বাধ্য হয়ে জিজ্ঞেস করতে হল, কেন মশাই, শিখবেন না কেন? তাতে লালমোহনবাবু বললেন যে, বছর পাঁচেক আগে নাকি এক বন্ধুর গাড়িতে শিখতে আরম্ভ করেছিলেন। দুদিন শিখে থার্ড দিনে একটা চমৎকার গল্পের প্লট মাথায় নিয়ে ফাস্ট গিয়ার থেকে সেকেন্ড গিয়ারে যেতে গাড়িটা এমন হ্যাঁচকা মারলে যে প্লটের খেই বেমালুম হাওয়া।সে-আপশোস আমার আজও যায়নি মশাই।

সাদা শার্ট আর খাকি প্যান্ট-পরা ড্রাইভার নেমে এসে দরজা খুলে দিতে লালমোহনবাবু একটা ছোট্ট লাফ দিয়ে রাস্তায় নামতে গিয়ে ধুতির কোঁচায় পা আটকে খানিকটা বেসামাল হলেও তাঁর মুখ থেকে হাসিটা গেল না! ফেলুদা কিন্তু গভীর। তিনজনে ঘরে এসে বসার পর সে মুখ খুলল।

আপনার ওই বিটকেল হৰ্নটা পালটিয়ে সাধারণ, সভ্য হর্ন না-লাগানো পৰ্যন্ত রজনী সেন রোডে ও-গাড়ির প্রবেশ নিষেধ।

জটায়ু জিভা কাটলেন। আমি জানতুম ব্যাপারটা একটু রিস্কি হয়ে যাচ্ছে। যখন ডিমনষ্ট্রেট করলে না?—তখন লোভ সামলাতে পারলুম না।–জাপানি, জানেন তো?

কান-ফ্যাটানি হাড়-জ্বালানি, বলল ফেলুদা। আপনার উপর হিন্দি ফিল্মের প্রভাব এতটা ঝটিতি পড়বে সেটা ভাবতে পারিনি। আর রংটাও ইকুয়্যালি পীড়াদায়ক। মাদ্রাজি ফিল্ম-মার্কা।

লমোহনবাবু কাতরভাবে হাত জোড় করলেন।দোহাই মিস্টার মিত্তির! হর্ন আমি কালই চেঞ্জ করছি, কিন্তু রংটা রাখতে দিন। গ্রিনটা বড় সুদিং।

ফেলুদা হাল ছেড়ে দিয়ে চায়ের অর্ডার দিতে যাচ্ছিল, লালমোহনবাবু বাধা দিয়ে বললেন, ওটা এখন বাদ দিন, আগে চলুন। একবারটি চক্কর মেরে আসি। আপনাকে আর তপেশীবাবুকে না-চড়ানো অবধি আমার ঠিক স্যাটিস ফ্যাকশন হচ্ছে না। বলুন কোথায় যাবেন।

ফেলুদা আপত্তি করল না। একটু ভেবে বলল, তোপ্‌সেকে একবার চার্নকের সমাধিটা দেখিয়ে আনব ভাবছিলাম।

চার্নক? জব চার্নক?

না।

তবে? চার্নক আরও আছে নাকি?

আরও নিশ্চয়ই আছে, তবে কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা চার্নক একজনই।

তাই তো— মানে…

তার নাম জব নয়, জোব। জব হল কাজ, চাকরি; আর জোব হল নাম। যে ভুলটা আর পাঁচজনে করে সেটা আপনি করবেন কেন?

এখানে বলে রাখি ফেলুদার লেটেস্ট নেশা হল পুরনো কলকাতা। ফ্যান্সি লেনে একটা খুনের তদন্ত করতে গিয়ে ও যখন জানল যে ফ্যান্সি হচ্ছে আসলে ফাঁসি, আর ওই অঞ্চলেই দুশো বচ্ছর আগে নন্দকুমারের ফাঁসি হয়েছিল, তখন থেকেই নেশাটা ধরে। গত তিন মাসে ও এই নিয়ে যে কত বই পড়েছে, ম্যাপ দেখেছে, ছবি দেখেছে তার ইয়ত্তা নেই। অবিশ্যি এই সুযোগে আমারও অনেক কিছু জানা হয়ে যাচ্ছে, আর তার বেশির ভাগটা হয়েছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে দুটো দুপুর কাটিয়ে।

ফেলুদা বলে দিল্লি-আগ্রার তুলনায় কলকাতা খোকা-শহর হলেও এটাকে উড়িয়ে দেওয়া মোটেই ঠিক নয়। এখানে তাজমহল নেই, কুতুবমিনার নেই, যোধপুর-জয়সলমীরের মতো কেল্লা নেই, বিশ্বনাথের গলি নেই—এ সবই ঠিক-কিন্তু ভেবে দ্যাখ তোপ্‌সে—একটা সাহেব মশা মাছি সাপ ব্যাঙ বন-বাদাড়ে ভরা মাঠের এক প্রান্তে গঙ্গার ধারে বসে ভাবল এখানে সে কুঠির পত্তন করবে, আর দেখতে দেখতে বন-বাদাড় সাফ হয়ে গিয়ে সেখানে দালান উঠল, রাস্তা হল, রাস্তার ধারে লাইন করে গ্যাসের বাতি বসল, সেই রাস্তায় ঘোড়া ছুটল, পালকি ছুটল, আর একশো বছর যেতে না যেতে গড়ে উঠল এমন একটা শহর যার নাম হয়ে গেল সিটি অফ প্যালেসেজ। এখন সে শহরের কী ছিরি হয়েছে সেটা কথা নয়; আমি বলছি। ইতিহাসের কথা। শহরের রাস্তার নাম পালটে এরা সেই ইতিহাস মুছে ফেলতে চাইছে—কিন্তু সেটা কি উচিত? বা সেটা কি সম্ভব? অবিশ্যি সাহেবরা তাদের সুবিধের জন্যই এত সব করেছিল, কিন্তু যদি না করত, তা হলে ফেলুমিত্তির এখন কী করত ভেবে দ্যাখ! ছবিটা একবার কল্পনা করে দ্যাখ— তোর ফেলুদা—প্রদোষচন্দ্ৰ মিত্র, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর—ঘাড় গুঁজে কলম পিশছে কোনও জমিদারি সেরেস্তায়, যেখানে ফিংগার প্রিন্ট বললে বুঝবে টিপসই।

বিবিডি বাগা—যার নাম ছিল ডালহৌসি স্কোয়ার—যে ডালহৌসি আমাদের দেশে লাটসাহেব হয়ে এসে গপগপ রাজ্য গিলেছে, আর সেই সঙ্গে প্রথম রেলগাড়ি আর প্রথম টেলিগ্রাফ চালু করেছে—সেই বিবিডি বাগে দুশো বছরের পুরনো সেন্ট জনস চার্চের কম্পাউন্ডে কলকাতার প্রথম ইটের বাড়ি জোব চার্নকের সমাধি দেখে লালমোহনবাবু যদিও বললেন খ্রিলিং, আমার কিন্তু মনে হল সেটা আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর সেই সঙ্গে একটা গুরু-গভীর গর্জনের জন্য। সমাধির গায়ে একটা মাৰ্বেলের ফলকের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ভদ্রলোক বললেন, এ তো দেখছি জোবও নয় মশাই-জোবাসা ব্যাপার কী বলুন তো?।

জোবুস হল জোবের ল্যাটিন সংস্করণ, বলল ফেলুদা। পুরো লেখাটাই ল্যাটিনে সেটা বুঝতে পারছেন না?

ল্যাটিন-ফ্যাটিন জানি না মশাই; ইংরেজি নয় এটা বুঝতেই পারছি। নামের উপর ডি-ও—এম লেখা কেন?

ডি-ও—এম হচ্ছে ডমিনুস অমনিউম ম্যাজিস্টের। অর্থাৎ ঈশ্বর সকলের কর্তা। আর তার নীচে যে কথাগুলো রয়েছে তার একটার প্রতি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করি। Marmore! মৰ্মর-সৌধ জানেন তো? সেই মর্মর আর এই মারমোরে একই জিনিস-মার্বল। আর আরও মজা হচ্ছে এই যে, মর্মর কথাটা সংস্কৃত নয়, ফারসি। অথচ সৌধ হল সংস্কৃত। এইভাবে সংস্কৃত-ফারসি সংস্কৃত-আরবি আমরা দিব্যি জোড়া লাগিয়ে চালিয়ে দিই। যেমন, শলাপরামর্শ। শল্যা হল সলাহ–অর্থাৎ পরামর্শ, ফারসি কথা: পরামর্শ সংস্কৃত। বা কাগজপত্র-কাগজ আরবি, পত্র সংস্কৃত। তারপর আবার—

ফেলুদার লেকচার শেষ হল না, কারণ কথা নেই বার্তা নেই উঠল এমন এক ধুলোর ঝড় (জটায়ু বললেন প্রলয়ঙ্কর) যেমন আমি আর কোনওদিন দেখিনি। আমরা পড়ি-কি-মারি করে লালমোহনবাবুর সবুজ অ্যামবাসডরে গিয়ে উঠলাম, আর ড্রাইভার হরিপদবাবু গাড়ি ছুটিয়ে দিলেন এসপ্ল্যানেডের দিকে। এই প্রথম দেখলাম ধুলোর জন্য অকাটার—থুড়ি—শহিদ মিনারটা আর দেখা যাচ্ছে না। হাওয়ার তেজ কত বুঝতে পারছি না। কারণ গাড়ির কাচ তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে এটা দেখলাম যে, চানাচুরওয়ালারা যে সরু লম্বা বেতের মোড়ার মতো স্ট্যান্ডের উপর তাদের জিনিসপত্র রাখে, তারই একটা গড়ের মাঠের দিক থেকে শূন্য দিয়ে পাক খেতে খেতে উড়ে এসে আমাদের ঠিক সামনে একটা চলন্ত ডবল ডেকারের দোতলায় আছড়ে পড়ে পরীক্ষণেই আবার ছাড়া পেয়ে কার্জন পার্কের দিকে উড়ে গেল।

পার্ক স্ট্রিটের কাছাকাছি এসে দেখি ট্রাম বন্ধ, কারণ একটা দেবদারু গাছ ভেঙে লাইনের উপর পড়েছে, ফেলুদার ইচ্ছে ছিল আমাদের পার্ক স্ট্রিটের পুরনো গোরস্থানটা দেখিয়ে নিয়ে যাবে, কিন্তু সেটা আর এই ঝড়ের জন্য হল না! যদি যেতাম, তা হলে হয়তো একটা ঘটনা চোখের সামনে দেখতে পেতাম।–যেটার বিষয় পরদিন সকালে কাগজে বেরোল। চব্বিবশে জুনের এই প্রলয়ঙ্কর ঝড়ে (উইন্ড ভেলসিটি ওয়ান হান্ড্রেড অ্যান্ড ফটিফাইভ কিলোমিটার্স পার আওয়ার) সাউথ পার্ক স্ট্রিট গোরস্থানে একটা গাছ ভেঙে পড়ে নরেন্দ্ৰনাথ বিশ্বাস নামে এক গ্রৌঢ় ভদ্রলোককে গুরুতরভাবে জখম করে। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অবিশ্যি তিনি সন্ধ্যাবেলা এই আদ্যিকালের গোরস্থানে কী করছিলেন সে খবর কাগজে লেখেনি।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান