ফেলুদা সমগ্র » গোলাপী মুক্তা রহস্য

পাতা তৈরিডিসেম্বর ৩, ২০২০; ০০:৩৬
সম্পাদনাডিসেম্বর ১৬, ২০২০, ১৫:১৫
দৃষ্টিপাত
২৩ জুন থেকে ২৬ জুন, ১৯৮৯—চার দিনে রচিত হলো গোলাপী মুক্তার মালা। প্রথম প্রকাশিত হয় শারদীয়া দেশ, ১৩৯৬-এ। ‘ফেলুদা প্লাস ফেলুদা’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয় ২ মে ১৯৯২-এ। ‘ফেলুদা একাদশ’ গ্রন্থে সঙ্কলিত হয় ডিসেম্বর ২০০০-এ। প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। ...

সোনাহাটিতে দেখবার কী আছে মশাই? লালমোহনবাবু প্রশ্ন করলেন।

বাংলায় ভ্রমণ-এ যা বলছে, তাতে একটা পুরনো শিবমন্দির থাকা উচিত, আর একটা বড় দিঘি থাকা উচিত। নাম বোধহয় মঙ্গলদিঘি। ওখানকার এককালের জমিদার চৌধুরীদের কীর্তি। সোনাহাটি বিশ বছর আগে অবধি ছিল একটা গাঁ। এখন ইস্কুল, হাসপাতাল, হোটেল সবই হয়েছে।

লালমোহনবাবু ঘড়ি দেখলেন। এটা সম্প্রতি কেনা একটা কোয়ার্টজ ঘড়ি। বললেন, সাংঘাতিক অ্যাকিউরেট টাইম রাখে।

আর দশ মিনিট, ঘড়ি দেখে বললেন ভদ্রলোক। আমরা তিনজন এবং আরেকটি ভদ্রলোক-নাম নবজীবন হালদার-সোনাহাটি যাচ্ছি। ওখানকার রিক্রিয়েশন ক্লাব থেকে নেমন্তন্ন পেয়ে। ওরা ফেলুদা আর নবজীবনবাবুকে সংবর্ধনা দেবে ওদের বাৎসরিক অনুষ্ঠানে। নবজীবনবাবু ইতিহাসের নামকরা অধ্যাপক, বই-টইও আছে দু-তিনটে। আমরা থাকব। দুদিন, ওখানকার সবচেয়ে নামকরা বড়লোক পঞ্চানন মল্লিকের গেস্ট হয়ে; মল্লিক হলেন ব্রিক্রিয়েশন ক্লাবের প্রেসিডোন্ট। তাঁর নাকি নানারকম পুরনো জিনিসের সংগ্ৰহ আছে।

আপনি যে এই নেমন্তন্ন অ্যাক্সেপ্ট করবেন। সেটা কিন্তু আমি ভাবিনি, ফেলুদাকে উদ্দেশ করে বললেন জটায়ু।

ফেলুদা বলল, আর কিছু না-দুদিনের জন্য যদি কলকাতার বিষাক্ত বায়ু থেকে রেহাই পাওয়া যায় তো মন্দ কী? তা ছাড়া ওখানে আমার এক কলেজের সহপাঠী আছে, নাম সোমেশ্বর সাহা। ওকালতি করে।

আমাদের ট্রেন মোটামুটি ঠিক সময়ই সোনাহাটি পৌঁছে গেল। আমরা নামতেই একটা দল আমাদের দিকে এগিয়ে এল-তাদের মধ্যে দুজনের হাতে ফুলের মালা। একজন ফেলুদার গলায় মালা পরিয়ে নমস্কার করে বলল, আমি ক্লাবের সেক্রেটারি-নরেশ সেন। আমিই আপনাকে চিঠিটা লিখেছিলাম।

নবজীবনবাবুকেও মালা পরানো হয়েছিল। এবার একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক—সিস্কের পাঞ্জাবিতে সোনার বোতাম-এগিয়ে এলেন; নরেশ সেন বলল, ইনিই হচ্ছেন আমাদের ক্লাবের প্রেসিডোন্ট পঞ্চানন মল্লিক।

মল্লিকমশাইয়ের মুখে স্বাগতম হাসি। বললেন, আপনারা যে আমাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছেন সেটা আমাদের পক্ষে গৌরবের বিষয়। আমার বাড়িতে আপনাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আশাকরি কোনও অসুবিধা হবে না। বড় শহরের সব ফ্যাসিলিটিজ তো এখানে পাবেন না।

ও নিয়ে আপনি কোনও চিন্তা করবেন না, কলাল ফেলুদা।

আপনিও তো শুনিচি খ্যাতিমান ব্যক্তি, লালমোহনবাবুর দিকে ফিরে বললেন ভদ্ৰলোক।

আমি লিখি-টিখি আর কী, বিনয়ী হাসি হেসে বললেন জটায়ু।

মল্লিকমশাইয়ের নীল অ্যাম্বাসাডর স্টেশনের বাইরেই অপেক্ষা করছিল, আমরা পাঁচজন তাতে উঠে পড়লাম-আমি আর জটায়ু সামনে।

আপনার সংগ্রহের কথা শুনেছি, গাড়ি রওনা হবার পর বলল ফেলুদা। বোধহয় কাগজেও দেখেছি।

হ্যাঁ-ওটা আমার অনেকদিনের শখ। অনেক রকম জিনিস আছে আমার কাছে। হালদারমশাইও ইন্টারেস্ট পাবেন, কারণ বেশ কিছু জিনিসের সঙ্গে ইতিহাস জড়িয়ে আছে। আমার লেটেস্ট সংগ্ৰহ হল মহর্ষির জুতো।

মহৰ্ষির জুতো? সেটা কী ব্যাপার? ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন লালমোহনবাবু।

সে ঘটনা জানেন না? হালদারমশাই নিশ্চয়ই জানেন।

কী ব্যাপার?

মহর্ষি দেবেন্দ্ৰনাথ। তখন যুবা বয়স, খুব শৌখিন লোক। ঐশ্বর্যে ডুবে আছেন। একবার এক জায়গা থেকে নেমন্তন্ন এল, সেখানে কলকাতার সব রুইস আদমিরা যাবেন। মহর্ষি গেলেন। কলকাতার বিখ্যাত বাবুমশাইরা মাথা থেকে পা পর্যন্ত মহামূল্য পোশাক আর অলঙ্কারে ঢেকে এসেছেন। কাশ্মীরি দোরোখা আর জামিয়ার শালে চতুর্দিক ঝলমল করছে। তারই মধ্যে দেখা গেল দেবেন্দ্ৰনাথ এলেন, পরনে সাদা চোগা, সাদা চাপকন, তার উপরে নকশাহীন সাদা শাল জড়ানো। সকলে তো অবাক। এ কী ব্যাপার? মহর্ষির এই দৈন্যদশা কেন? তারপর সকলের চোখ গেল মহর্ষির পায়ের দিকে। এক জোড়া সাদা নাগরা, তাতে দুটি বিশাল বিশাল হিরে ঝলমল করছে।

সেই জুতো আপনি পেয়েছেন? অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন লালমোহনবাবু।

একটি। একটি পেয়েছি। –হিরে সমেত। দেখাব আপনাদের।

পঞ্চাননবাবুর বাগানে ঘেরা বিশাল দোতলা বাড়ি দেখলেই বোঝা যায় তিনি বড়লোক। গাড়িবারান্দার তলায় গিয়ে গাড়ি থামল। আমরা সবাই নামলাম। সদর দরজায় দুজন বেয়ারা আর একজন দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে, মল্লিকমশাই একজন বেয়ারাকে বললেন, বৈকুণ্ঠ, যাও এদের ঘর দেখিয়ে দাও। আর এখন তো সোয়া বারোটা; একটার মধ্যে যাতে খাবার ব্যবস্থা হয় সেটা দেখো।

আমরা শ্বেতপাথরের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে লাগলাম। মল্লিকমশাই বললেন, আপনাদের ঘটনা তো সেই সন্ধ্যায় ) ও সময়টা কিন্তু বেশ ঠাণ্ডা; আশাকরি গরম কাপড় আছে সঙ্গে।

পৌষ মাসে গ্রামাঞ্চলে ঠাণ্ডা হবে সেটা আমরা জানতাম, বলল ফেলুদা। একটা প্যাসেজের দুদিকে তিনটে ঘর আমাদের জন্য রাখা হয়েছে। হালদারমশাই তাঁর ঘরে চলে গেলেন, আমরা তিনজন গিয়ে ঢুকলাম ফেলুদার আর আমার ঘরে। চিনেমাটির টুকরো দিয়ে ঢাকা মেঝে, যাকে ইংরিজিতে বলে Crazy China। এককালে টানা-পাখার ব্যবস্থা ছিল সেটা দেয়ালের উপর দিকে ফুটা দেখলেই বোঝা যায়।

এঁর টাকা হচ্ছে তামার খনির টাকা, বলল ফেলুদা। আমার এক মক্কেল একে ভাল করেই চেনেন।

আবহাওয়াটা যে কলকাতার তুলনায় নির্মল সেটা এর মধ্যেই বোঝা যাচ্ছে, বললেন লালমোহনবাবু।

আমিও সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম। তা ছাড়া কানটাও আরাম পাচ্ছে। ট্রাফিক বলে কোনও ব্যাপার নেই; এখনও পর্যন্ত একটাও হর্ন শুনিনি।

একজন বেয়ারা একটা থালায় তিন গেলাস সরবত দিয়ে গেল। সেই সরবত খেতে না। খেতেই খবর এল যে নীচে খাবার ঘরে পাত পড়েছে।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান