ফেলুদা সমগ্র » ফেলুচাঁদ

পাতা তৈরিজানুয়ারি ১৯, ২০২১; ১৪:০১
সম্পাদনাজানুয়ারি ১৯, ২০২১, ১৪:০১
দৃষ্টিপাত
ফেলুদার গল্প যারা পড়েনি, তারা ঠকেছে! ভাল জিনিস উপভোগ না করতে পারার দুঃখ আর কিছুতে নেই। মূল বাংলা ভাষায় যারা পড়তে পাবে না, তাদের জন্য অন্তত পাঁচটা ভারতীয় ভাষা এবং চারটে বিদেশি ভাষায় ফেলুদা কাহিনী অনুবাদ হয়েছে বলে জানি, এ বড় সুখের কথা! অবিশ্যি নিরক্ষর লোকেরাও দুনিয়া জুড়ে গোয়েন্দা ফেলু ...

ফেলুদার গল্প যারা পড়েনি, তারা ঠকেছে! ভাল জিনিস উপভোগ না করতে পারার দুঃখ আর কিছুতে নেই। মূল বাংলা ভাষায় যারা পড়তে পাবে না, তাদের জন্য অন্তত পাঁচটা ভারতীয় ভাষা এবং চারটে বিদেশি ভাষায় ফেলুদা কাহিনী অনুবাদ হয়েছে বলে জানি, এ বড় সুখের কথা! অবিশ্যি নিরক্ষর লোকেরাও দুনিয়া জুড়ে গোয়েন্দা ফেলু মিত্তিরকে চেনে, ড্যাবড্যাব করে সিনেমায় দেখতে পায় বলে। লেখক নিজেই ফেলুদার দুটো খাসা গল্প নিয়ে জমজমাট চলচ্চিত্র বানিয়েছেন। জানিস, ফেলুদার মগজের ক্যারামতিতে মুগ্ধ হয়ে, আড়ালে ওঁকে আমি ফেলুচাঁদ বলে ডাকি!

ফেলুদার গল্প-উপন্যাসগুলো লেখা হয়েছে তোপ্‌সের জবানিতে, যার বয়েস ১৯৬৫ সালে ছিল সাড়ে তেরো, তারপর ২৬ বছরে (ফেলুচাঁদের শেষ উপাখ্যান ‘রবার্টসনের রুবি’ লেখা হয়েছে ১৯৯১ সালে) পাঁচ বছরও বাড়েনি। ফেলুদার বয়েস বেড়েছে টেনেটুনে আট বছর! ২৭ থেকে ৩৫, এই অবধি হিসেব পাচ্ছি। মোট কথা, তোপ্‌সে তার জ্যাঠতুতো দাদা গোয়েন্দা ফেলু মিত্তিরের চিরকেলে সহকারী, বেশিরভাগ রহস্য অভিযানের সঙ্গী। আজকাল (মানে গত ৩০ বছরে) ওই বয়েসের চৌকোস বাঙালি ছেলেরা যে আটপৌরে ভাষায় কথা বলে, সেই চাঁচাছোলা বাংলাতেই তোপসে লিখেছে দুর্দান্ত সব ফেলুদা কাহিনী। কোথাও কোনও আড়ষ্টতা নেই। ন্যাকামি নেই, বোকামো নেই। গল্প জুড়ে ছবির পর ছবি ফুটে ওঠে, সিনেমায় যেমন হয়। ওঁর বাপ্‌-পিতেমোর মতো, সত্যজিৎ রায়ের সোনার কলমেও যে বেপরোয়া জাদু থাকবে, তাতে আর আশ্চর্য কী!

গোয়েন্দা ফেলুদার অ্যাডভেঞ্চারে তৃতীয় যে মানুষটা অপরিহার্য, তার নাম লালমোহন গাঙ্গুলী–‘জটায়ু’ ছদ্মনামে তিনি লোম-খাড়া রহস্য-উপন্যাস লেখেন। তার মজাদার হাবভাব আর বোকামি-ভরা সরস কথাবার্তার মধ্যেও, সোনার মতো ঝকঝকে একটা সরল মন দিব্যি প্রকাশ হয়ে পড়ে। আহা, মাটির পৃথিবীতে এমন খাটি বন্ধু ক’জনের জোটে?

গল্পের রাজ্যে সত্যি-মিথ্যে বলে কিছু নেই। যদিও মনগড়া জিনিস যতটা নিখুঁত হয়, বাস্তবে সেটা মুশকিল! তবু ফেলুচাঁদের সব বানানো গল্পই সত্যি। পুরোপুরি কাল্পনিক, এমনকী বাস্তবে মোটেও ঘটে না এমন সব বিষয়বস্তুকেও সত্যজিৎ তার উপস্থাপনার গুণে, কেমন একটা বিশ্বাসযোগ্য আর বাস্তবানুগ রূপ দিয়েছেন। অবিশ্যি দুনিয়ার সব বানানো গল্পই সত্যি। আমার গল্পেও যা-কিছু পড়েছিস, তার মধ্যে কিছু ঘটেছে, কিছু হয়তো ঘটেনি। কিন্তু ঘটতেই পারে। ঘটলেও, কিছু এসে যায় না।

ফেলুদার গল্প-উপন্যাসে যে-সব অকুস্থলে রহস্য পেকে উঠেছে, সে-সমস্ত জায়গার বর্ণনা নিখুঁত। কোথাও কোনও ইতিহাস-ভূগোল-বিজ্ঞানের এতটুকু ভুল-চুক চোখে পড়ে না। সব বয়েসের পাঠকরাই ফেলুচাঁদের পাঠশালায় শেখা যাবতীয় বিদ্যেবুদ্ধি সটাং বই থেকে তুলে, নিজের জীবনে যেমন খুশি কাজে লাগাতে পারে। বরং না-লাগালেই ঠকতে হবে। ওরে, ফেলুদার গল্পে কোথাও কোনও আলগা ভাব নেই, বাহুল্য নেই। সব ক’টা চরিত্র ন্যায্য কারণে এসেছে। ছেঁটে ফেললে কিছু যায়-আসে না— এমন একটাও দৃশ্য নেই কোথাও। বাড়তি একটা শব্দ খুঁজতে হলেও, সেই গোলমেলে কেসটা ফেলুদাকেই দিতে হবে।

ফেলুদার গল্পগুলো কাল্পনিক এবং মৌলিক। কোথাও একটুও বাড়াবাড়ি নেই। বিদেশি হেঁসেল থেকে কিছু হাতানো হয়নি। জোর করে পাঠকদের ওপর কিছু চাপিয়ে দেবার চেষ্টা নেই। মেকি জিনিস বা গোঁজামিল নেই। চালাকি নেই। পাঠকদের চমকে দেবার কোনও উদ্দেশ্য চোখে পড়ে না। এমনকী সব ঘটনাই মনে হয় স্বাভাবিক। হয়তো মাঝে-মধ্যে কিছু দৈব ঘটনা আছে, কিন্তু সেসব তো যে-কোনও লোকের জীবনে ঘটতেই পারে।

অবিশ্যি গোয়েন্দা ফেলু মিত্তির ও তার সহকারীকে মাঝে মাঝে যেন একটু অন্য জগতের লোক বলে মালুম হয়। পৌরাণিক কাহিনীর নায়কদের মতোই ফেলুচাঁদ সর্বদা স্ব-মহিমায় হাজির! তার সেই দৈব প্রশান্তি কখনওই টসকায় না, কিছুতেই হারিয়ে যেতে দেখি না। গল্পের গোড়ায় মাঝে মাঝে তিনি নিজেকেই একটা জমজমাট রহস্যের আড়ালে লুকিয়ে রাখলেও, শেষকালে অবশ্যই সাফল্যের ঝলমলে মুকুট পরে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ হয়ে ওঠেন। আবার কখনও ফেলুচাঁদের রকম-সকমের রহস্যময়তা যেন খোদ অপরাধীর চালচলনকে ছাপিয়ে যায়। সাংঘাতিক সেই প্যাঁচে পড়ে, দুষ্কৃতকারীর খোঁজ পাবার জন্য হা-পিত্যেশ উত্তেজনায় ছটফট করে সব বয়েসি পাঠক! চুল টুল খাড়া, গায়ের রক্ত হিম, দম আটকে আসে! ব্যস, চান-খাওয়া মাথায় উঠল!

এমনকী স্রেফ মৌনতা দিয়ে নিজের সন্দেহজনক আচরণের দিকে আমাদের নজর ঘুরিয়ে রেখে, অবশেষে ফেলুদা যথেষ্ট বিশ্বাসজনকভাবে ফাঁস করে দেন যাবতীয় রহস্য-জাল। তার সব তদন্তের গলিঘুচি, চড়াই-উৎরাই বা গোলকধাঁধা পেরিয়ে, ফেলুদা সবসময়েই (একমাত্র চন্দননগরের সেই জোড়া-খুনের কেসটা বাদে) পৌঁছে গেছেন সফলতার গন্তব্যে। কোনও কিছুতেই ফেলুদাকে ক্লান্ত হতে দেখি না। কোনও বাধাই ফেলুদার কাছে বড় হয়ে দেখা দেয় না। দিলেই-বা, খচমচ করে সেটা টপকাতে কতক্ষণ! মূল বাংলা ও ইংরিজিতে লেখা, কিংবা এই দুই ভাষার জানলা দিয়ে এখনকার পৃথিবীর আরও যে-সব ভাষার গোয়েন্দাদের দেখা পেয়েছি, নিশ্চিন্তে বলতে পারি—ফেলুদাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবার সাধ্যি কারও নেই!

ফেলুদার একমাত্র খুঁত হচ্ছে থেকে থেকেই সিগারেট ধরানো! সারাক্ষণ অমন চারমিনার ফুঁকতে দেখলে, মাঝে মাঝে আমি ভারী চটে যাই। অবিশ্যি আরও বিটকেল নেশা ছিল। বিলেতের সেই মস্ত গোয়েন্দা শার্লক হোমস-এর— ছ্যা-ছা, ইঞ্জেকশনের সূঁচ! ফেলুদার সঙ্গে হোমস-এর আবছা একটা মিলও দেখতে পাই। দু’জনেরই চরিত্রের মধ্যে কোনও দুর্বলতা বা অহমিকা নেই। কখনও নিজেদের জাহির করার চেষ্টা করেনি। দু’জনেরই এতটুকু দোষ চোখে পড়ে না, যা কিংবদন্তির নায়কদেরও বেমালুম পতন ডেকে আনে। লালমোহনবাবু পরম বন্ধু বলেই, নানা ব্যাপারে তাকে টিটকিরি দেন ফেলুদা, বারে বারে তার ভুল শুধরে দেন—ওটা কিছু দোষের জিনিস নয়, খুব স্বাভাবিক। ওটা খাঁটি বন্ধুত্বের টান! লালমোহনবাবুকে আড়ালে টিটকিরি দিলে বুঝতাম, ফেলুদা লোকটা কিঞ্চিৎ ইয়ে।

তবে ফেলুদার উপাখ্যানে এন্তার গুণ থাকা সত্ত্বেও, এমন কিছু অবাস্তবতা আছে—যেমন দেখা যায় গড়ে তোলা কোনও শিল্পকর্মে। বাস্তব জগৎ আর রোজকার জীবনের ঢিলে-ঢালা ভাব এবং ভুল-চুককে বেমালুম এড়ানো হয়েছে বলে, ফেলুদার গল্পে কোথাও কোথাও অবাস্তব না লেগে উপায় কী! ফেলুচাঁদ সারাক্ষণ বড় বেশি ফিটফাট, বড্ড (একেবারে শতকরা ১০০ ভাগ) সচেতন লোক! ৩৫টা গল্প-উপন্যাসে ফেলুদার গোটা গোয়েন্দা-জীবন জুড়ে, কোথাও লোকটার এক ঝিলিক বোকামিরও আঁচ খুঁজে পাই না। এক অতিমানবের মতোই তিনি চির-অপরাজেয়! এমনকী তোপসেও আমার চেনা-জানা আর-পাঁচজন ওই বয়েসের চৌকোস ছেলের চাইতে একদম আলাদা। একটু বেশি বিজ্ঞ, একটু বেশি সংযত। অমন কাঁচা বয়েসে যে চাপল্য বা উচ্ছ্বাস থাকার কথা, সেটা একটুও দেখতে পাই না কেন? এক যদি না জিবে-জল-আনা খাবারের থালা সামনে এসে পড়ে!

ফেলুচাদের গল্প-উপন্যাসে আর-একটা ব্যাপারও কেমন যেন ঠেকে! হ্যাঁ-গা, গোয়েন্দা ও তার সহকারীর আত্মীয়-পরিজনদের দেখি না কেন? এমনকী খলনায়কদের বাড়িতেও চাকর-বাকর ছাড়া কেউ নেই। ফেলুদা ও তোপসের আত্মীয়-বন্ধুরা ওঁদের চারপাশে ঘিরে থাকলে, পাঠকদের বেজায় আহ্লাদ হত এমনকী তাতে গোয়েন্দাগিরিরও সুখ-সুবিধে ঢের বেড়ে যেত। অথচ আসল মজা বা টইটম্বুর রসটা, মোটেই টসকে যাবার সুযোগ নেই। ফেলুদা না-হয় ছোটবেলায় বাপ-মা হারিয়েছে, তোপসের মা-বাবারা গেল কোথায়? দুজনেরই ঠামু-দিদু, মামা-কাকা, মাসি-পিসি কেউ নেই?

আমাদের রোজকার জীবনের চেনা-জানা মানুষদের মতো দুর্বলতা, অহংভাব আর দোষে-গুণে মেশানো একজন দারুণ মানুষকে ফেলুদা কাহিনীতে পেলে, আমরা অবিশ্যি গলে যাই। তিনি হলেন রহস্য-রোমাঞ্চ গল্প-লেখক, ফেলুদার একমাত্র বন্ধু, ওঁদের প্রায় সব তদন্তের কাজে নিত্যসঙ্গী লালমোহন গাঙ্গুলী বা জটায়ু। রহস্যের ঘটনাটা ও মগজের ব্যায়ামের ফাঁকে ফাঁকে, অনাবিল হাসি ও সরসতার আশ্চর্য সিং-দরজাটা খুলে দেয় লালমোহনবাবুর অতি সাবলীল উপস্থিতি! জটায়ু যতই বাস্তব-চরিত্র হোক-না-কেন, আমাদের চারপাশের ঝলমলে জীবনে ফেলুদা বা তোপসের চাইতেও বিরল মানুষ তিনি। লালমোহনবাবুর মতো মানুষ যত বাড়বে, পৃথিবীটা তত বেশি বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। অমন অননুকরণীয় বাচনভঙ্গি, চাঁচাছোলা মেলামেশার প্যাটার্ন, ও রকম খাঁটি বন্ধুত্ব আমাদের পানসে জীবনে নুন মিশিয়ে দেয়। মনে রাখিস, খাবার-দাবারে যেমন, তেমনি পার্থিব জীবনে বেঁচে-থাকাটাও স্রেফ আলুনি হয়ে গেলে মহা মুশকিল। ব্যাপারটা মোটেই সুখের নয়। নুনের চেষ্টা করো।

আর-একটা কথা। সরসতা মানে খেলো ঠাট্টা বা ঘেঁদো রসিকতা নয়। সরসতা গভীর জিনিস। তারি মধ্যে গোটা জীবন-দর্শন ধরা থাকে। হাসি হচ্ছে দুনিয়া দেখার একটা ঢং। রঙ্গরস করতে গেলে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয়। রোজকার জীবনের তলায় তলায় সরসতা বা হাসির যে স্রোত বইছে, পাথরটা সরিয়ে, তার মুখটা খুলে দিতে হয়। ভুলে যাস না, বাস্তব জগতে হাসির জিনিস বলে কিছু নেই। হাসি থাকে মানুষের চোখে, মনে, বুকের ভেতরে। আর কোথাও না। কী জন্যে কোন মানুষ হাসে, তাই দেখে ওই লোকটার মনের যতটা নাগাল পাওয়া যায়, আর-কোনও তদন্তে সেটা সম্ভব না। মোট কথা, তেড়েফুড়ে লাগলে আকাট মুর্খ ছেলেও মহাপণ্ডিত হতে পারে। কিন্তু সরসতা কাউকে শেখানো যায় না। সত্যজিতের মতো খাঁটি রসের ভাণ্ডটা নিয়ে জন্মাতে হয়।

ও-হ্যাঁ, বলতে ভুলে যাচ্ছিলাম, স্রেফ বেয়ারা ও মোটরগাড়ির ড্রাইভার ছাড়া, লালমোহনবাবুর জীবনেও আর-কেউ নেই কেন? ভাগ্যিস ফেলুদা ও তোপসের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক গজাল, না-হলে লালমোহনবাবুর মতো ফুর্তিবাজ মানুষের বেঁচে-থাকাটা আলুনি হয়ে যেত!1

টীকা

  1. সন্দেশ ‘ফেলুদা ৩০’ বিশেষ সংখ্যা (অগ্রহায়ণ ১৪০২)
গ্রন্থাবলী
মতামত জানান