ফেলুদা সমগ্র » অসমাপ্ত ফেলুদা

পাতা তৈরিডিসেম্বর ৩, ২০২০; ০০:৪০
সম্পাদনাডিসেম্বর ১৪, ২০২০, ২০:৪৭
দৃষ্টিপাত
সত্যজিৎ রায় একটা কাহিনী শুরু করে অসমাপ্ত রেখেই অন্য কাহিনী শুরু করতেন। আবার অনেক গল্পের পরিবর্তনও করতেন। তেমনি কিছু কাহিনীর খসড়া যা পরিত্যক্ত হয়েছিল অথবা তিনি লিখে শেষ করেননি—সে সব কাহিনী নিয়েই অসমাপ্ত ফেলুদা। ...

তোতা রহস্য1

(প্রথম খসড়া)

‘তোমার নাম ফেলুদা?’

একটা ছোট্ট ছেলে ফেলুদার পিছনে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা করেছে। ঘটনাটা ঘটছে পার্ক আর রাসেল স্ট্রিটের খেলনার দোকান হবি সেন্টারে। শুধু খেলনার দোকান বললে ভুল হবে, কারণ এখানে খেলনা ছাড়াও আরেকটা জিনিস পাওয়া যায় সেটা হল অ্যাকুরিয়ামের মাছ। ব্রেজিলের রাক্ষুসে মাছ পিরানহার দুটো বাচ্চা ওখানে এসেছে খবর পেয়েই দুজনে এসে হাজির হয়েছি।

ওই খুদে মাছের ধারালো দাঁত দেখে আমাদের চোখ চড়কগাছ, এমন সময় পিছন থেকে প্রশ্নটা এল।

ছেলেটি ঘাড় উঁচু করে ফেলুদার দিকে দেখছে একদৃষ্ট্রে। একটি ভদ্রলোক হাসি হাসি মুখ করে আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, ‘আমার ছেলে আপনার পরম ভক্ত। বলতে পারেন আপনি ওর একজন হিরো।‘

ফেলুদা কিছু বলার আগেই ছেলেটি এক নিশ্বাসে বলে গেল—‘আমাদের বাড়িতে একটি টিয়া উড়ে এসেছিল কাল বিকেলে, সেটাকে পঞ্চু ধরে ফেলেছে, আর আমরা একটা খাঁচা কিনেছি, আর সেই খাঁচাতে টিয়াটাকে রেখে দিয়েছি, আর সেটা খুব মজার কথা বলে।

‘তাই বুঝি?’ ফেলুদা ছেলেটির দিকে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করল। ‘কী বলে বলো তো?’

‘খালি খালি ত্রিনয়ন বলে একজনকে ডাকে।‘

‘বাঃ—এতো খুব মজার ব্যাপার!’ ফেলুদা বলল, ‘ত্রিনয়ন নিশ্চয়ই ওকে খেতে দিত।‘

‘তুমি দেখবে টিয়াটা?’ বেশ বুঝতে পারছিলাম যে ফেলুদা যদি একবার হ্যাঁ বলে তো ছেলেটি একেবারে হাতে স্বর্গ পাবে।

ছেলের বাবা আরও এগিয়ে এসে বললেন, ‘ফেলুদা ব্যস্ত মানুষ কত কাজ থাকে ওঁর, ওঁর পক্ষে কি যেখানে সেখানে যাওয়া সম্ভব?’

ফেলুদা বলল, বেশ তো, একদিন যাব এখন। তোমার টিয়া তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না। অবিশ্যি কার টিয়া দেখতে যাচ্ছি সেটা আমার জানা দরকার।‘

ভদ্রলোক এবার পকেট থেকে একটা কার্ড বার করে ফেলুদাকে দিয়ে বললেন, ‘আমার নাম জয়ন্ত বোস। ইনি হচ্ছেন শ্রীমান রজত। আপনি একদিন এলে আমরা খুবই খুশি হব। রজত ছাড়াও আমাদের বাড়িতে আপনার আরও দুটি ভক্ত আছেন—রজতের মা এবং বাবা।‘

ফেলুদা কথা দিল যে একটা রবিবার সকালে রজতদের বাড়িতে গিয়ে তার টিয়া পাখি দেখে আসবে।

পরদিন সকালে ফেলুদার ডাকে ঘুম ভাঙল বৈঠকখানা থেকে ডাকছে ফেলুদা। ও সক্কলের আগে উঠে যোগব্যায়াম সেরে, সক্কলের আগে খবরের কাগজ পড়ে।

আমি তড়াক করে উঠে ওর কাছে গিয়ে দেখি ও খবরের কাগজ হাতে নিয়ে বসে আছে। পাশে ইংরিজিটা ভাঁজ করে রাখা, হাতে বাংলা কাগজ। আমায় দেখেই ‘এইটে পড়ে দেখ তোপসে’ বলে কাগজটা আমার হাতে দিয়ে একটা জায়গায় আঙুল দেখিয়ে দিল। দেখি দ্বিতীয় পাতায় কর্মখালি-টালির মধ্যে ব্যক্তিগত বলে যে বিজ্ঞাপনগুলো থাকে, এটা তারই একটা। তাতে লেখা রয়েছে—

‘গত ১৯শে অক্টোবর আমার একটি পোষা চন্দনা খাঁচা থেকে পালিয়ে যায়। আমার অতি প্রিয় এ পাখিটা সন্ধান দিতে পারলে উপযুক্ত পুরস্কার দেব। ধূর্জটিপ্রসাদ মল্লিক, ২২ নং হরিশ মুখার্জি রোড কলকাতা ৭০০ ০২০।

ফেলুদা বলল, ‘যন্দুর মনে পড়ছে, এই ধূর্জটি মল্লিক হলেন একজন বিরাট ধনী বাবসায়ী। কালীচরণ মল্লিক অ্যান্ড সান্‌স-এর কাপড়ের দোকান ছিল বড়বাজারে। ধূর্জটি সম্ভবত ওই অ্যান্ড সানস-এর একজন। তা ইনি হঠাৎ একটা পাখির শোকে এতটা মরিয়া উঠেছেন কেন সেইটেই হচ্ছে কথা!

আমি বললাম, ‘তা হলে তো জয়ন্তবাবুদের পাখিটা ফেরত দিয়ে দিতে হবে।‘

‘সেই রকমই তো মনে হচ্ছে। শ্রীমান রজত খবরটা শুনে খুব খুশি হবে বলে মনে হয় না। দেখি…’

ফেলুদা উঠে গিয়ে ফোন তুলে জয়ন্তবাবুর নম্বর ডায়াল করল। টেলিফোনে যা কথা হল মোটামুটি এই—

টীকা

  1. তোতা রহস্য (প্রথম ও দ্বিতীয় খসড়া) প্রথম প্রকাশিত হয় ১৪০৩ সালের শারদীয়া সন্দেশে। এই অসমাপ্ত কাহিনীটি পরে ‘ফেলুদা একাদশ’ গ্রন্থে সঙ্কলিত হয়। প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ডিসেম্বর ২০০৪ সালে, প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। অলঙ্করণ করেছেন অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়।
গ্রন্থাবলী
মতামত জানান