চরিত্রহীন » চরিত্রহীন

রচনাবলী
পাতা তৈরিজানুয়ারি ২৩, ২০১৬; ০০:০০
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৮, ২০২০, ০১:২৯
দৃষ্টিপাত
বিষয়াবলী ,
১৩২০ বঙ্গাব্দের কার্তিক থেকে চৈত্র ও ১৩২১ বঙ্গাব্দে ‘যমুনা’ পত্রিকায় আংশিকভাবে প্রকাশিত হয়। পরে সম্পূর্ণ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১১ নবেম্বর, ১৯১৭ (কার্তিক, ১৩২৪ বঙ্গাব্দ) সালে। প্রকাশ করেন রায় এম. সি. সরকার বাহাদুর অ্যাণ্ড সন্‌স।
১৩৪৪ বঙ্গাব্দে (১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) মুদ্রিত পঞ্চম সংস্করণে গ্রন্থকার এই পুস্তকের জন্য একটি ভূমিকা লিখে দেন। তা এখানে উদ্বৃত হল:
চরিত্রহীনের গোড়ার অর্দ্ধেকটা লিখেছিলাম অল্প বয়সে। তারপর ওটা ছিল পড়ে। শেষ করার কথা মনেও ছিল না, প্রয়োজনও হয়নি। প্রয়োজন হলো বহুকাল পরে। শেষ করতে গিয়ে দেখতে পেলাম বাল্যরচনার আতিশয্য ঢুকেচে ওর নানা স্থানে, নানা আকারে। অথচ সংস্কারের সময় ছিল না—ঐ ভাবেই ওটা রয়ে গেল। বর্ত্তমান সংস্করণে গল্পের পরিবর্ত্তন না করে সেইগুলি যথাসাধ্য সংশোধন করে দিলাম।
গ্রন্থকার
১৭/৭/৩৭
প্রথম চরিত্রহীনের প্রথম পাণ্ডুলিপি সবটাই আগুনে পুড়ে যায়। রেঙ্গুন থেকে ২২. ৩. ১৯১২ তারিখে শরৎচন্দ্র প্রমথনাথ ভট্টচার্যকে লেখেন “… …আগুনে পুড়িয়াছে আমার সমস্তই। লাইব্রেরীর এবং চরিত্রহীন উপন্যাসের manuscript … …। আবার শুরু করিব। এখন উৎসাহ পাই না। ‘চরিত্রহীন” ৫০০ পাতায় প্রায় শেষ হইয়াছিল—সবই গেল।”
‘চরিত্রহীন’ গ্রন্থাকারে প্রকাশের পূর্বে শরৎচন্দ্র উপন্যাসটি নতুন করে লিখেছিলেন। গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় প্রকাশককে অসুবিধায় পড়তে হয়। ‘যমুনা’য় যখন চরিত্রহীন প্রকাশ শুরু হয় তখন শরৎচন্দ্র যমুনার সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। ধারাবাহিকভাবে আর কোথাও প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশক সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি না পেয়ে মুদ্রণ শুরু করায় প্রকাশককে অসুবিধায় পড়তে হয়। প্রকাশকের পক্ষ থেকে শ্রীসুধীরচন্দ্র সরকার শরৎচন্দ্রকে তাহার অসুবিধার কথা জানালে শরৎচন্দ্র ১৯১৫ ডিসেম্বর মাসে রেঙ্গুন থেকে এক চিঠিতে তাকে জানান : “কাল রাত্রে তোমার পত্র পাইলাম। বিলম্ব যে হইতেছে এবং তাহাতে যে ক্ষতি হইতেছে সে কি জানি না? তার প্রায় অধিকাংশই নূতন করিয়া লিখিতে হইতেছে। যদি দু-একমাস দেরি হয় বরং সে ভাল, কিন্তু পাছে এমন করিয়া শুরু করিয়া খারাপ হইয়া শেষ হয়, সেই আমার ভয়।…”
১৩২৪ বঙ্গাব্দে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার পর চরিত্রহীন আশাতীত সংখ্যায় বিক্রয় হয়। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র গ্রন্থে আছে : “এম. সি. সরকার থেকে যখন ‘চরিত্রহীন’ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হ’ল তখন সেই সাড়ে তিন টাকা দামের গ্রন্থ প্রথম দিনেই সাড়ে চারশত খণ্ড বিক্রী হয়ে যায়।“
’যমুনা’ এবং ‘ভারতবর্ষ’ এই দুটি পত্রিকায় ‘চরিত্রহীন’ প্রকাশ নিয়ে নানান দিক থেকে চাপ আসতে থাকে। যমুনা সম্পাদক ফণীন্দ্রনাথ পাল চরিত্রহীন প্রকাশের জন্য উন্মুখ ছিলেন। শরৎচন্দ্রের বন্ধু প্রমথনাথ ছিলেন ভারতবর্ষের সঙ্গে।
ফণীন্দ্রনাথ পালকে লেখা রেঙ্গুন থেকে ১০. ৫, ১৯১৩ তারিখের চিঠি : “…চরিত্রহীন যাতে যমুনায় বার হয় তাই আমার আন্তরিক ইচ্ছা এবং ঈশ্বরের ইচ্ছায় তাই হবে। নিশ্চিন্ত হোন। তবে শুনিতেছি, ওটাতে ‘মেসের ঝি’ থাকাতে রুচি নিয়ে হয়ত একটু খিটমিট বাধিবে। তা বাধুক। লোকে যতই কেন নিন্দ করুক না, যারা যত নিন্দা করিবে তারা তত বেশী পড়িবে। ওটা ভাল হোক মন্দ হোক একবার পড়িতে আরম্ভ করিলে পড়িতেই হইবে। যারা বোঝে না, যারা art-এর ধার ধারে না তারা হয়ত নিন্দা করিবে। কিন্তু, নিন্দা করিলেও কাজ হবে। তবে ওটা Psychology এবং analysis সম্বন্ধে যে খুব ভাল তাতে সন্দেহই নেই। এবং এটা একটা সম্পূর্ণ Scientific Ethical Novel! এখন টের পাওয়া যাচ্ছে না।“
ফণীন্দ্রবাবুকে চৈত্র ১৩১৯ লেখা চিঠি :
“চরিত্রহীন জ্যৈষ্ঠ থেকে শুরু করুন।
আমি চরিত্রহীনের জন্য অনেক চিঠিপত্র পাইতেছি। কেহ টাকার লোভ, কেহ সম্মানের লোভ, কেহ বা দুই-ই, কেহ-বা বন্ধুত্বের অনুরোধও করিতেছেন। আমি কিছুই চাহি না—আপনাকে বলিয়াছি আপনার মঙ্গল যাতে হয় করিব—তাহা করিবই। আমি কথা বদলাই না।“
প্রমথনাথকে লেখা জ্যৈষ্ঠ ১৩২০-র চিঠি থেকে জানা যায়:
“ফণীকে আমি স্নেহ করি সত্য, কিন্তু তাই বলে যে তোমার অসন্মান ক’রে কিংবা তোমাকে উপেক্ষা ক’রে, তা সে ফণী কেন, কাহারো জন্যই সেটা আমি পারিব না। সেই জন্যই চরিত্রহীন পাঠাই। যদিও এই পাঠানো লইয়া অনেক কথা হইয়া গিয়াছে এবং হইবে তাহা জানিয়াও আমি পাঠাইয়াছি। যা হোক তোমাদের যেমন ওটা পছন্দ হয় নাই তখন আমাকে ফেরৎ পাঠাইয়ো। বিজ্ঞাপন যেমন দেওয়া হইয়াছে সেই মত ‘যমুনা’তেই ছাপা হইবে। তুমি বলিয়াছ একেবারে পুস্তকাকারে ছাপাইলে ভাল হয়। সত্য, কিন্তু এতটা অগ্রসর হইয়া পড়িয়াছে, যদি নিজের স্বার্থের জন্য ফণীকে না দিই সে বড়ই দেখিতে মন্দ এবং লজ্জাকর হইবে।“
হেমেন্দ্রকুমার রায় লিখেছেন : “…তখন দ্বিজেন্দ্রলালের সম্পাদকতায় মহাসমারোহে “ভারতবর্ষ” প্রকাশের উদ্যোগপৰ্ব্ব চলছে। দ্বিজেন্দ্রলাল শরৎচন্দ্রকে “ভারতবর্ষের” লেখকরূপে পাবার জন্য আগ্রহবান হন। দ্বিজেন্দ্রলালের পৃষ্ঠপোষকতায় তখন একটি সোখীন নাট্য সম্প্রদায় চলছিল এবং সেখানকার সভ্য স্বৰ্গীয় প্রমথনাথ ভট্টচার্য্য ছিলেন শরৎচন্দ্রের পরিচিত ব্যক্তি। তিনি শরৎচন্দ্রকে দ্বিজেন্দ্রলালের আগ্রহের কথা জানালেন এবং তার ফলে লাভ করলেন শরৎচন্দ্রের “চরিত্রহীন” উপন্যাসের প্রথম অংশের পাণ্ডুলিপি। সকলেই জানেন, চরিত্রহীন কোনকালেই রুচিবাগীশদের মানসিক খাদ্যে পরিণত হতে পারে না। রুচিবাগীশ বলতে যা বোঝায় দ্বিজেন্দ্রলাল তা ছিলেন না বটে, কিন্তু তার কিছু আগেই তিনি করেছিলেন “কাব্যে দুর্নীতির” বিরুদ্ধে বিষম যুদ্ধ ঘোষণা। কাজেই তার নূতন কাগজে তিনি “চরিত্রহীন” প্রকাশ করতে ভরসা পেলেন না। “চরিত্রহীন” বাতিল হয়ে ফিরে আসে এবং পরে “যমুনায়” বেরুতে আরম্ভ করে। এই প্রত্যাখ্যানের জন্যে শরৎচন্দ্ৰ মনে যে আঘাত পেয়েছিলেন, সেটা তখনকার অনেক সাহিত্যিক বন্ধুর কাছে প্রকাশ না ক’রে পারেন নি। কিন্তু সেজন্যে আত্মশক্তির উপরে তার নিজের ধারণা ক্ষুন্ন হয় নি কিছুমাত্র। “যমুনাতে” যখন “চরিত্রহীন” প্রকাশিত হতে থাকে তখনও একশ্রেণীর লোক তার বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন উপস্থিত করে। কিন্তু শরৎচন্দ্র ছিলেন অটল।“
২৪, ৫, ১৯১৩ প্রমথনাথকে লেখা চিঠিতে শরৎচন্দ্র বলেছেন :
“…আর একটা কথা চরিত্রহীন সম্বন্ধে। আমার সুরেন মামা লিখিয়াছেন— হরিদাসবাবুও তাহাকে জানাইয়াছেন ওটা এতই immoral যে কোন কাগজেই বাহির হইতে পারে না, বোধ হয় তাই হইবে—কারণ তোমরা আমার শত্রু নয়, যে মিথ্যা দোষারোপ করিবে। আমিও সেই কথা স্পষ্ট করিয়া এবং তোমার সমস্ত argument ফণীকে খুলিয়া লিখিয়াছিলাম, তৎসত্ত্বেও সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে যমুনাতে ওটা বাহির করিতেই হইবে। তাহার বিশ্বাস আমি এমন কিছু লিখিতে পারি না যাহা immoral, সেই জন্য বাধ্য হইয়া তোমার অনুরোধ ভাই রক্ষা করিতে বোধ হয় পারিলাম না। কারণ advertise করা হইয়াছে আর ফিরান যায় না। আমার নিজের নামের জন্য আমি এতটুকুও মনে ভাবি না। লোকের যা ইচ্ছা আমার সম্বন্ধে মনে করুক, কিন্তু সে যখন বিশ্বাস করে, চরিত্রহীনের দ্বারাই তাহার কাগজের শ্ৰীবৃদ্ধি হইবে, এবং immoral হোক, moral হোক লোকে খুব আগ্রহের সহিত পাঠ করিবে— তখন সে যাহা ভাল বোঝে করুক…”
১. ৪, ১৯১৩ প্রমথনাথ ভট্টাচার্ধকে শরৎচন্দ্র লেখেন :
“…’চরিত্রহীন’ তোমাকে পড়তে দিতে পারি কিন্তু মুদ্রিত করবার জন্য নয়। এটা চরিত্রহীনের লেখা চরিত্রহীন—তোমাদের সুরুচির দলের মধ্যে গিয়ে বড়ই বিব্রত হয়ে পড়বে—তাছাড়া অত্যন্ত অশোভন দেখাবে। আমার সম্বন্ধে (অবশ্য আমার recent লেখা প্রভৃতি আলোচনার পরে) যদি ভাল opinion হয় এবং সে প্রায় কিছুই নয়। অ্যানালিসিস psychological-এই ইচ্ছা নিয়েই লিখি। সেটা পুড়ে যায় তার পরে দুটো মিলিয়ে একরকম করে লিখেছি।“
১৭. ৪, ১৯১৩ প্রমথনাথ ভট্টাচার্যকে শরৎচন্দ্র লেখেন :
“…যাই হোক তোমাকে অন্ততঃ পড়িবার জন্যও চরিত্রহীনের যতটা লিখিয়াছিলাম—(আর অনেকদিন লিখি নাই) পাঠাইব মনে করিয়াছি। আগামী মেলে অর্থাৎ এই সপ্তাহের মধ্যেই পাইবে। কিন্তু, আর কোনরূপ বলিতে পারিবে না। পড়িয়া ফিরাইয়া দিবে। তাহার প্রথম কারণ, এ লেখার ধরণ তোমাদের কিছুতেই ভাল লাগিবে না। Appreciate করিবে কি না সে বিষয়ে আমার গভীর সন্দেহ। তাই এটা ছাপিয়ো না। সমাজপতি মহাশয় অত্যন্ত আগ্রহের সহিত ইহা চাহিয়া পাঠাইয়াছেন—কেননা তাহার সত্যই ভাল লাগিয়াছে। —তুমি যদি সত্যই মনে কর এটা তোমাদের কাগজে ছাপার উপযুক্ত তাহলে হয়ত ছাপিতে মত দিতেও পারি, না হলে তুমি যে কেবল আমার মঙ্গলের দিকে চোখ রাখিয়া যাতে আমারটাই ছাপা হয় এই চেষ্টা করিবে তাহা কিছুতেই হইতে পরিবে না নিরপেক্ষ সত্য— এইটাই আমি সাহিত্যে চাই। এর মধ্যে খাতির চাই না। তা ছাড়া তোমাদের দ্বিজুদা (দ্বিজেন্দ্রলাল রায়) মত করিবেন না বলা যায় না। যদি আংশিক পরিবর্তন কেহ প্রয়োজন বিবেচনা করেন তাহা কিছুতেই হইতে পারিবে না, উহার একটা লাইনও বাদ দিতে দিব না। তবে, একটা কথা বলি—শুধু নাম দেখিয়া আর গোড়াটা দেখিয়া চরিত্রহীন মনে করিও না। আমি একজন Ethics-এর student. Ethics বুঝি এবং কাহারও চেয়ে কম বুঝি বলিয়া মনে করি না। যাহা হোক পড়িয়া ফিরাইয়া দিও এবং তোমার নির্ভীক মতামত বলিও—তোমার মতামতের দাম আছে। কিন্তু মত দিবার সময় আমার যে গভীর উদ্দেশ্য আছে সেটাও মনে করিও। ওটা বটতলার বই নয়।…যদি ছাপাবার উপযুক্ত মনে হয় তাহা হইলে বলিও আমি শেষটা লিখিয়া দিব। শেষটা আমিই জানি—আমি যা তা যেমন কলমের মুখে আসে লিখি না, গোড়া থেকে উদ্দেশ্য ক’রে লিখি তাহা ঘটনাচক্রে বদলাইয়া যায় না।“
জ্যৈষ্ঠ ১৩২০ প্রমথনাথকে শরৎচন্দ্র লেখেন :
“—আমি জানিতাম, ওটা তোমাদের পছন্দ হবে না এবং সে কথা পূৰ্ব্বপত্রে লিখিয়াও ছিলাম। তবে, এ সম্বন্ধে আমার এই একটু বলবার আছে, যে লোক জানিয়া শুনিয়া ‘মেসের ঝি’কে আরম্ভেই টানিয়া অনিবার সাহস করে, সে জানিয়া শুনিয়াই করে। তোমরা ওকে, ওর শেষটা না জানিয়াই অর্থাৎ সাবিত্রীকে মেসের ঝি বলিয়াই দেখিয়াছ। প্রমথ, হীরাকে কাঁচ বলিয়া ভুল করিলে ভাই! অনেক বিশেষজ্ঞও বইটা পড়িয়া মুগ্ধ হইয়াছিল। ইহার উপসংহার জানিতে চাহিয়াছ। এ একটা Scientific psych, and Ethical Novel : আর কেউ এ রকম করিয়া বাঙলায় লিখিয়াছে বলিয়া জানি না। এইতেই ভয় পেলে ভাই? কাউণ্ট টলস্টয়ের ‘রেসারেকশন’ পড়েছ কি? His Best Book একটা সাধারণ বেশ্যাকে লইয়া। তবে, আমাদের দেশে এখনো অতটা art বুঝিবার হয় নাই সে কথা সত্য। যা হৌক, ওটা যখন হইল না তখন এ লইয়া আলোচনা বৃথা। এবং আমারও তেমন মত ছিল না। তোমাদের ওটা নূতন কাগজ, ওতে এতটা সাহসের পরিচয় না দেওয়াই সংগত। তবে, আমারও আর অন্য উপায় নাই। আমি উলঙ্গ বলিয়া art কে ঘৃণা করিতে পারিব না, তবে যাতে এটা in strictest sense moral হয় তাই উপসংহার করিব। —”
১৪, ৯, ১৯১৩ ফণীন্দ্রনাথ পালকে শরৎচন্দ্র লেখেন :
চরিত্রহীন মাত্র ১৪/১৫ চ্যাপ্টার লেখা আছে; বাকীটা অন্যান্য খাতায় বা ছেড়া কাগজে লেখা আছে, কপি করিতে হইবে। ইহার শেষ কয়েক চ্যাপ্টার যথার্থই grand করিব। লোকে প্রথমটা যা ইচ্ছা বলুক, কিন্তু শেষে তাহাদের মত পরিবর্তিত হইবেই। আমি মিথ্যা বড়াই করা ভালবাসি না এবং নিজের ঠিক ওজন না বুঝিয়াও কথা বলি না, তাই বলিতেছি, শেষটা সত্যই ভালো হইবে বলিয়াই মনে করি। আর moral হৌক immoral হৌক, লোকে যেন বলে, “হ্যাঁ একটা লেখা বটে।” আর এতে আপনার বদনামের ভয় কি? বদনাম হয় ত আমার! তাছাড়া কে বলিতেছে আমি গীতার টীকা করিতেছি? “চরিত্রহীন” এর নাম! — তখন পাঠককে ত পূৰ্ব্বাহ্নেই আভাস দিয়াছি—এটা সুনীতি সঞ্চারিণী সভার জন্যও নয়, স্কুল পাঠ্যও নয়। টলস্টয়ের ‘রেসারেক্‌শন’ তাহারা একবার যদি পড়ে তাহা হইলে চরিত্রহীন সম্বন্ধে কিছুই বলিবার থাকিবে না। তাছাড়া ভাল বই, যাহা art হিসাবে, psychology হিসাবে বড় বই, তাহাতে দুশ্চরিত্রের অবতারণা থাকিবেই থাকিবে। কৃষ্ণকান্তের উইলে নাই?”
১৮১৩ মে মাসে শরৎচন্দ্র প্রমথনাথকে লেখেন :
“আমার “চরিত্রহীন” তোমাদের বদনামের গুণে সাংঘাতিক ক্ষতিগ্রস্ত হইতে বসিয়াছে, অর্থাৎ কাল ফণী telegraph করিয়াছে “Charitrahin creating alarming situation,” আমি জিজ্ঞাসা করি কি আছে ওতে? একজন ভদ্রঘরের মেয়ে যে-কোন কারণেই হৌক, বাসায় ঝি-বৃত্তি করিতেছে —(character unquestionable নয়) আর একজন ভদ্র যুবা তারই প্রেমে পড়িতেছে—অথচ শেষ পৰ্য্যন্ত এমন কোথাও প্রশ্রয় পাইতেছে না। অথচ রবিবাবুর ‘চোখের বালি’ ভদ্রঘরের বিধবা নিজের ঘরের মধ্যে এমন কি আত্মীয়-কুটুম্বের মধ্যে নষ্ট হইতেছে— কেহ কথাটি বলে নাই। (কৃষ্ণকাস্তের উইলে রোহিণীকে মনে পড়ে?) …আর আমার ‘চরিত্রহীন’ যত অপরাধে অপরাধী? যারা ইংরেজ, ফ্রেঞ্চ কিংবা জার্মান নভেল পড়িয়াছে তাহারা অবশ্য বুঝিবে ইহা সত্যই immoral কিনা। যাই হৌক, আমি এখনও স্বীকার করি না যে ‘চরিত্রহীনে’ একবর্ণও immorality আছে। কুরুচি থাকিতে পারে, কিন্তু যা পাঁচজন বলিতেছে তা নাই। তবুও নাম দিয়াছি ‘চরিত্রহীন’, এর মধ্যে ‘কুলকুণ্ডলিনী’ জমাইয়া তুলিব অবশ্য এ আশা করিতেই পারি না। যাহার ইচ্ছা হয় পড়িবে, যাহার নামটা দেখিয়া ভয় হইবে, সে পড়িবে না।”
গ্রন্থাবলী
মতামত জানান