রহস্য-রোমাঞ্চ সমগ্র » অমৃত-দ্বীপ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ২৫, ২০২০; ১৬:৪১
সম্পাদনাঅক্টোবর ২৫, ২০২০, ১৬:৪৩
দৃষ্টিপাত
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ : দ্বীপের নিরুদ্দেশ যাত্রা সেই ভয়ানক অর্ধচন্দ্র ব্যুহ এমনভাবে তিন দিক আগলে এগিয়ে আসছে যে, মুক্তিলাভের কোনও পথই আর ভোলা রইল না। ব্যুহ যারা গঠন করেছে তাদের দিকে তাকালেও বুক করতে থাকে ছাঁৎ-ছাঁৎ! তারা মানুষ, না অমানুষ? তারা যখন মাটির ওপরে পদ সঞ্চালন করে অগ্রসর হচ্ছে তখন তাদের ...

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ : দ্বীপের নিরুদ্দেশ যাত্রা

সেই ভয়ানক অর্ধচন্দ্র ব্যুহ এমনভাবে তিন দিক আগলে এগিয়ে আসছে যে, মুক্তিলাভের কোনও পথই আর ভোলা রইল না।

ব্যুহ যারা গঠন করেছে তাদের দিকে তাকালেও বুক করতে থাকে ছাঁৎ-ছাঁৎ! তারা মানুষ, না অমানুষ? তারা যখন মাটির ওপরে পদ সঞ্চালন করে অগ্রসর হচ্ছে তখন তাদের জ্যান্ত মানুষ বলেই না মেনে উপায় নেই, কিন্তু দেখলে মনে হয়, যেন দলে-দলে কবরের মড়া হঠাৎ কোনও মোহিনী মন্ত্রে পদচালনা করবার শক্তি অর্জন করেছে! এবং এবারেও সবাই লক্ষ করলে যে, কেবল দুই পা ছাড়া তাদের প্রত্যেকেরই অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিক যেন মৃত্যু আড়ষ্ট হয়ে আছে!

অর্ধচন্দ্র-ব্যুহের দুই প্রান্ত বিমলদের পেছনকার প্রাচীরের দুই দিকে সংলগ্ন হল, মাঝে থাকল একটুখানি মাত্র ফাঁক, যেখানে অবাক ও অভিভূত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল তারা তিনজনে।

এদের উদ্দেশ্য কি? এরা তাদের বন্দি করতে, না বধ করতে চায়? ওদের মুখ দেখে কিছু বোঝা অসম্ভব, কারণ মড়ার মুখের মতন কোনও মুখই কোনও ভাব প্রকাশ করছে না– কেবল তাদের অপলক চোখে চোখে জ্বলছে যেন নিষ্কম্প অগ্নিশিখা, যা দেখলে হয় হৃৎকম্প।

কুমার মরিয়ার মতন চিৎকার করে বললে, কপালে যা আছে বুঝতেই পারছি, আমি কিন্তু পোকার মতন ওদের পায়ের তলায় পড়ে প্রাণ দিতে রাজি নই–যতক্ষণ শক্তি আছে বিমল, বন্দুক ছোড়ো, বন্দুক ছোড়!

সঙ্গে-সঙ্গে শত-শত কণ্ঠে আবার জাগল অট্টহাস্যর-পর-অট্টহাস্যের উচ্ছ্বাস!

সঙ্গে-সঙ্গে প্রাচীরের ওপার থেকেও ভীষণ হুঙ্কার করে সাড়া দিতে লাগল সেই শিকার বঞ্চিত হতাশ দানব জন্তুটা!

সেই সমান-ভয়াবহ হাস্য ও গর্জনের প্রচণ্ডতায় চতুর্দিক হয়ে উঠল যেন বিষাক্ত!

ও-দানবটা যেন চাঁচাচ্ছে পেটের জ্বালায় অস্থির হয়ে, কিন্তু এই মূর্তিমান প্রেতগুলো এত হাসে কেন?

বিমল বললে, জাহাজের সঙ্গে-সঙ্গে সমুদ্রে যে মূর্তিটা ভেসে আসছিল, তাকেও দেখতে ঠিক এদেরই মতো। সে-ও হয়তো এই দলেই আছে।

কুমার তখন তার বন্দুক তুলেছিল। কিন্তু হঠাৎ কি ভেবে বন্দুক নামিয়ে বললে, বিমল, বিমল, একটা কথা মনে হচ্ছে!

কি কথা?

লাউ-ৎজুর মূর্তিটা আমার সঙ্গেই আছে। জান তো, তাও সাধুরা বলে সে মূর্তি মন্ত্রপূত আর তাকে সঙ্গে না আনলে এ-দ্বীপে আসা যায় না?

বিমল কতকটা আশ্বস্ত স্বরে বললে, ঠিক বলেছ কুমার, এতক্ষণ ওকথা আমি ভুলেই গিয়েছিলুম! ওই মূর্তির লোভেই কলকাতায় মানুষের-পর-মানুষ খুন হয়েছে। তার এত মহিমা কীসের, এইবারে হয়তো বুঝতে পারা যাবে! বার করো তো একবার মূর্তিটাকে, দেখি সেটা দেখে এই ভূতগুলো কি করে?

কুমার তাড়াতাড়ি ব্যাগের ভেতর থেকে জেডপাথরে গড়া, রামছাগলে চড়া সাধক লাউ-জুর সেই অর্ধর্তপ্ত অর্ধ-শীতল মূর্তিটা বার করে ফেললে এবং ডানহাতে করে এমনভাবে তাকে মাথার ওপরে তুলে ধরলে যে, সকলেই তাকে স্পষ্ট দেখতে পেলে।

ফল হল কল্পনাতীত!

মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেল অট্টহাস্য এবং আচম্বিতে যেন কোন অদৃশ্য বৈদ্যুতিক শক্তির ধাক্কা খেয়ে সেই শত-শত আড়ষ্টমূর্তি অত্যন্ত তাড়াতাড়ি পিছিয়ে যেতে-যেতে ছত্রভঙ্গ হয়ে নানাদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল!

জয়ন্ত, বিমল ও কুমার–তিনজনেই অত্যন্ত বিস্মিতের মতো একবার এ-ওর মুখের দিকে এবং একবার সেই পশ্চাৎপদ বীভৎস মূর্তিগুলোর দিকে ফিরে-ফিরে তাকাতে লাগল বারংবার!

অবশেষে হাঁপ ছেড়ে জয়ন্ত বললে, এতটুকু মূর্তির এত বড় গুণ, একথা যে বিশ্বাস করতেও প্রবৃত্তি হচ্ছে না!

বিমল বললে, এতক্ষণে বোঝা গেল, এই দ্বীপে ওই পবিত্র মুর্তিই হবে আমাদের রক্ষাকবচের মতো। ওকে সঙ্গে করে এখন আমরা যেখানে খুশি যেতে পারি।

জয়ন্ত বললে, না বিমলবাবু, না! এই সৃষ্টিছাড়া দ্বীপ আমাদের মতন মানুষের জন্যে তৈরি হয়নি। এখানে পদে-পদে যত সব অস্বাভাবিক বিপদ আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে, এরপর হয়তো লাউ-জুর মুর্তিও আর আমাদের বাঁচাতে পারবে না। আমি চাই নদীর ধারে যেতে, যেখানে বাঁধা আছে আমাদের নৌকা!

কুমার বললে, আপাতত আমিও জয়ন্তবাবুর কথায় সায় দি। আবার যদি এখানে আসি, দলে ভারী হয়েই আসব। কিন্তু নদী কোন দিকে?

বিমল বললে, নিশ্চয়ই পশ্চিম দিকে! ওই দ্যাখো, চাঁদের আলো নিবে আসছে, পূর্বের আকাশ ফরসা হচ্ছে!

যেন সমুজ্জ্বল স্বপ্নের মতো স্নিগ্ধতার মধ্যে দেখা গেল, প্রান্তরের মাঝে-মাঝে দাঁড়িয়ে আছে তালজাতীয় তরুকুঞ্জ ও ছোট-ছোট বন। এতক্ষণ যারা এসে এখানে বিভীষিকা সৃষ্টি করছিল সেই অপার্থিব মূর্তিগুলো এখন অদৃশ্য হয়েছে চোখের আড়ালে, কোথায়!

বিমল সব দিকে চোখ বুলিয়ে বললে, আর বোধ হয় ওরা আমাদের ভয় দেখাতে আসবে না! চলল কুমার, আমরা ওই বনের দিকে যাই। খুব সম্ভব, ওই বনের পরেই পাব নদী।

তারা বন লক্ষ করে অগ্রসর হল এবং চলতে-চলতে বারবার শুনতে লাগল, সেই অজানা অতিকায় জানোয়ারটা তখনও আকাশ কাঁপিয়ে দারুণ ক্রোধে চিৎকার করছে ক্রমাগত!

প্রায় সিকি মাইল পথ চলবার পর বনের কাছে এসে তারা শুনতে পেলে, গাছে গাছে জেগে উঠে ভোরের পাখিরা গাইছে নতুন উষার প্রথম জয়গীতি। আঁধার তখন নিঃশেষে পালিয়ে গেছে কোথায় কোন দুঃস্বপ্নলোকের অন্তঃপুরে।

দানবের চিৎকারও থেমে গেল। হয়তো সেও ফিরে গেল হতাশ হয়ে তার পাতালপুরে। হয়তো রাত্রির জীব সে, সূর্যালোক তার চোখের বালি।

বাতাসও এতক্ষণ ছিল যেন শ্বাসরোধ করে, এখন ফিরে এল নিয়ে তার স্নিগ্ধ স্পর্শ, বনে-বনে সবুজ গাছের পাতায়-পাতায় জাগল নির্ভীক আনন্দের বিচিত্র শিহরন!

জয়ন্ত বললে, এই তো আমার চির-পরিচিত প্রিয় পৃথিবী! জানি এর আলো-ছায়ার মিলন-লীলাকে, এর শব্দ-গন্ধ-স্পর্শের মাধুর্যকে, এর ফুল ফোঁটানো শ্যামলতাকে, আমি বাঁচতে চাই এদেরই মাঝখানে! কালকের মতো যুক্তিহীন আজগুবি রাত আর আমার জীবনে কখনও যেন না আসে! এ-রাতের কাহিনি কারুর কাছে মুখ ফুটে বললেও সে আমাকে পাগল বলে মনে করবে!

ঠিক সেই সময়ে কী এক অভাবনীয় ভাবে সকলের মন অভিভূত হয়ে গেল।

প্রথমটা সবিস্ময়ে কারণ বোঝবার চেষ্টা করেও কেউ কিছুই বুঝতে পারলে না।

তার পরেই কুমার বললে, একি বিমল, একি! ভূমিকম্প, হচ্ছে নাকি?

চারিদিকে একবার চেয়ে বিমল বললে, এ তো ঠিক ভূমিকম্পের মতন মনে হচ্ছে না কুমার! মনে হচ্ছে, আমরা আছি টলমলে জলে নৌকার ওপরে! একি আশ্চর্য!

জয়ন্ত বললে, দেখুন দেখুন, ওইদিকে তাকিয়ে দেখুন! যে মাঠ দিয়ে আমরা এসেছি, সেখানে হঠাৎ এক নদীর সৃষ্টি হয়েছে! আঁঃ এও কি সম্ভব?

বিপরীত দিকে তাকিয়ে কুমার বললে, ওদিকেও যে ওই ব্যাপার! আমরা যে জমির ওপরে দাঁড়িয়ে আছি তার দুই দিকেই নদীর আবির্ভাব হয়েছে!

দুই হাতে চোখ কচলে চমৎকৃত কণ্ঠে বিমল বললে, এ তো দৃষ্টি বিভ্রম নয়! কুমার, আমাদের সামনের দিকেও খানিক তফাতে চেয়ে দেখ। ওখানেও জল! পেছনদিকে বন ভেদ করে চোখ চলছে না, খুব সম্ভব ওদিকেও আছে জল! কারণ এটা বেশ বুঝতে পারছি যে, আমরা আছি এখন দ্বীপের মতন একটা জমির ওপরে, আর এই দ্বীপটা ভেসে যাচ্ছে ঠিক নৌকোর মতোই! না, এইবারে আমি হার মানলুম! দ্বীপ হল নৌকো! না এটাকে বলব ভাসন্ত। দ্বীপ?

সত্য! জলের ওপারে প্রান্তরের বনজঙ্গল দেখতে-দেখতে পেছনে সরে যাচ্ছে–যেমন সরে যেতে দেখা যায় রেলগাড়ির ভেতরে বা নৌকো-জাহাজের ওপরে গিয়ে বসলে! গঙা সাঁতার কাটছে জলে!

বিমল অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, জয়ন্তবাবু আপনি হ্যাঁমার্টনের ইউনিভার্সাল হিস্ট্রি অফ দি ওয়ার্ল্ড পড়েছেন?

রেখে দিন মশাই, হিস্ট্রি-ফিস্ট্রি! আমার মাথা এমন বোঁ-বোঁ করে ঘুরছে! নিজেকে আর জয়ন্ত বলেই মনে হচ্ছে না!

শুনুন। ওই হিস্ট্রির ষষ্ঠ খণ্ডে ৩৫২২ পৃষ্ঠায় একখানি ছবি দেখবেন। চার-পাঁচ শ বছর আগে চিনদেশে সিং-রাজবংশের সময়ে একজন চিনা পটুয়া অমৃত-দ্বীপের যে চিত্র এঁকেছিলেন, ওখানি হচ্ছে তারই প্রতিলিপি। তাতে দেখা যায়, জনকয় তাও-ধর্মাবলম্বী লোক একটি ভাসন্ত দ্বীপে বসে পানভোজন আমোদ-আহ্বাদ করছে, আর একটি মেয়ে হাল ধরে দ্বীপটিকে করছে নির্দিষ্ট পথে চালনা!

আরে মশাই, কবি আর চিত্রকররা উদ্ভট কল্পনায় যা দেখে, তাই কি আমাদেরও বিশ্বাস। করতে হবে?

জয়ন্তবাবু, সময়-বিশেষে কল্পনাও যে হয় সত্যের মতো, আর সত্যও হয় কল্পনায় মতো, আজ স্বচক্ষেও তা দেখে আপনি তাকে স্বীকার করবেন না।

পাগলের কাছে সবই সত্য হতে পারে। আমাদের সকলেরই মাথা হঠাৎ বিগড়ে গেছে।

না জয়ন্তবাবু, শিশুরও কাছে সবই সত্য হতে পারে। এই লক্ষ-কোটি বৎসরের অতি বৃদ্ধ পৃথিবীর কোলে ক্ষুদ্র মানুষ হচ্ছে শিশুর চেয়ে শিশু। সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরেও যে অসাধারণ প্রাকৃতিক নিয়ম থাকতে পারে, ভালো করে তা জানতে পারবার আগেই ক্ষণজীবী মানুষের মৃত্যু হয়। আজ লোহা জলে ভাসে, ধাতু আকাশে ওড়ে, বন্দি বিদ্যুৎ গোলামি করে, শূন্য দিয়ে সাত সাগর পেরিয়ে বেতারে মানুষের চেহারা আর কণ্ঠস্বর ছোটাছুটি করে, ছবি জ্যান্ত হয়ে কথা কয়, রসায়নাগারে নূতন জীবের সৃষ্টি হয়, কিছুকাল আগেও এসব ছিল সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে, আজগুবি কল্পনার মতো। তবু আমরা কতটুকুই বা দেখতে কি জানতে পেরেছি? পৃথিবীতে যা-কিছু আমরা দেখিনি-শুনিনি তাহাই অসম্ভব না হতেও পারে!

আপনার বক্তৃতাটি যে খুবই শিক্ষাপ্রদ, তা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু আপাতত বক্তৃতা শোনবার আগ্রহ আমার নেই। এখন আমরা কি করব সেইটেই ভাবা উচিত, এ-দ্বীপ আমাদের নিয়ে জলপথে হয়তো নিরুদ্দেশ যাত্রা করতে চায়, এখন আমাদের কি করা উচিত?

কুমার বললে, আমাদের উচিত, জলে ঝাঁপ দেওয়া।

জয়ন্ত বললে, কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে যদি তরল জল আবার কঠিন মৃত্তিকায় পরিণত হয়, তাহলেও আমি আর অবাক হব না!

বিমল বললে, কিংবা জলের ভেতরে আবার দেখা দিতে পারে দলে-দলে জ্যান্ত মড়া!

কুমার শিউরে উঠে ব্যাগটা টিপেটুপে অনুভব করে দেখলে, লাউ-জুর মূর্তিটা যথাস্থানে আছে কি না!

তারপর এগিয়ে ধারে গিয়ে তারা দেখলে, দ্বীপ তখন ছুটে চলেছে রীতিমতো বেগে এবং তটের তলায় উচ্ছল স্রোত ডাকছে কলকল করে! নদীর আকার তখন চওড়া হয়ে উঠেছে এবং খণ্ডদ্বীপের দুই দিকে দুই তীর সরে গেছে অনেক দূরে।

জয়ন্ত আবার বললে, এখন উপায় কি বিমলবাবু, কী আমরা করব?

বিমল বললে, এখানে জল-স্থল দুই-ই বিপদজনক। বাকি আছে শূন্যপথ, কিন্তু আমাদের ডানা নেই!

কুমার বললে, নদীর সঙ্গে আমরা যাচ্ছি সমুদ্রের দিকে। হয়তো অমৃত-দ্বীপের বাসিন্দারা আমাদের মতো অনাহুত অতিথিদের বাহির-সমুদ্রে তাড়িয়ে দিতে চায়।

জয়ন্ত আশান্বিত হয়ে বললে, তাহলে তো সেটা হবে আমাদের পক্ষে শাপে বর! নদীর মুখেই আছে আমাদের জাহাজ!

বিমল বললে, কিন্তু জাহাজ শুদ্ধ লোক আমাদের এই অতুলনীয় দ্বীপ-নৌকা দেখে কি মনে করবে, সেটা ভেবে এখন থেকেই আমার হাসি পাচ্ছে!

কিন্তু বিমলের মুখে হাসির আভাস ফোটবার আগেই হাসি ফুটল আর এক নতুন কণ্ঠে। দস্তুরমত কৌতুক-হাসি!

সকলে চমকে পেছন ফিরে অবাক হয়ে দেখলে, একটু তফাতে বনের সামনে গাছতলায় বসে আছে আবার এক অমানুষিক মুর্তি! কিন্তু এবারে তার মুখ আর ভাবহীন নয়, কৌতুক হাস্যে সমুজ্জ্বল।

জয়ন্ত বললে, এ-মূর্তি আবার কোথা থেকে এল?

বিমল বললে, যেখান থেকেই আসুক, এর চোখে-মুখে বিভীষিকার চিহ্ন নেই, এ হয়তো আমাদের ভয় দেখাতে আসেনি।

মূর্তি পরিষ্কার ইংরেজি ভাষায় বললে, কে তোমরা? পরেছ ইংরেজি পোশাক, কিন্তু দেখছি তোমরা ইংরেজ নও!

বিমল দুই পা এগিয়ে বললে, তুমি যেমন চিনা হয়েও ইংরেজি বলছ, আমরাও তেমনি ইংরেজি পোশাক পরেও জাতে ভারতীয়!

–ঋষি বুদ্ধদেবের দেশ থেকে তোমরা প্রভু লাউ-জুর দেশে এসেছ কেন? তোমরা কি জানো না, এ-দেশ হচ্ছে পৃথিবীর স্বর্গ, এখানে বাস করে আমার মতন অমরেরা জলে স্থলে-শূন্যে যাদের অবাধ গতি? এখানে নশ্বর মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ!

বিমল হেসে বললে, অমর হওয়ার জন্যে আমার মনে একটুও লোভ নেই!

মূর্তি উপেক্ষার হাসি হেসে বললে, মুখ! আমাদের দেহের মর্যাদা তোমরা বুঝবে না! দেহ তো একটা তুচ্ছ খোলস মাত্র, মানুষ বলতে আসলে বোঝায় মানুষের মনকে। আমাদের দেহ নামে মাত্র আছে, কিন্তু আমরা করি কেবল মনের সাধনা, আমাদের আড়ষ্ট দেহে কর্মশীল কেবল আমাদের মন। কিন্তু থাক ওসব কথা। কে তোমরা? কেন এখানে এসেছ? সিয়েন হতে?

না। তোমাদের দেখবার পর আর অমর হওয়ার সাধ নেই। আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি।

বেড়াতে! এটা নশ্বর মানুষের বেড়াবার জায়গা নয়! জানো, তোমাদের মতো আরও কত কৌতূহলী এখানে বেড়াতে এসে মারা পড়েছে আমাদের হাতে?

সেটা তোমাদের অভ্যর্থনার পদ্ধতি দেখেই বুঝতে পেরেছি। কেবল আমাদের মারতে পারোনি, কারণ, সে শক্তি তোমাদের নেই!

মূর্খ! তোমাদের বধ করতে পারি এই মুহূর্তেই! কেবল প্রভু লাউ-জুর পবিত্র মূর্তি তোমাদের সঙ্গে আছে বলেই এখনও তোমরা বেঁচে আছ। ও-মূর্তি কোথায় পেলে?

সে খবর তোমাকে দেব না।

তোমরা কি তাও-ধর্মে দীক্ষা নিয়েছ?

না। আমরা হিন্দু। তবে সাধক বলে লাউ-জুকে আমরা শ্রদ্ধা করি।

কেবল মুখের শ্রদ্ধা ব্যর্থ, তোমাদের মন অপবিত্র। প্রভু লাউ-জুর মূর্তির মহিমায় তোমাদের প্রাণরক্ষা হল বটে, কিন্তু এখানে আর তোমাদের ঠাঁই নেই। শীঘ্র চলে যাও এখান থেকে!

খুব লম্বা হুকুম তো দিলে, এই জ্যান্ত মড়ার মুল্লুক থেকে চলেও তো যেতে চাই, কিন্তু যাই কেমন করে?

কেন?

আগে ছিলুম মাঠে। তারপর মাঠ হল জলে-ঘেরা দ্বীপ। তারপর দ্বীপ হল আশ্চর্য এক নৌকো। খুব মজার ম্যাজিক দেখিয়ে আরব্য উপন্যাসকেও তো লজ্জা দিলে বাবা, এখন দয়া করে দ্বীপনৌকোকে আবার স্থলের সঙ্গে জুড়ে দাও দেখি, আমরাও ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাই।

তোমার সুবুদ্ধি দেখে খুশি হলুম। দ্বীপের পূর্বদিকে চেয়ে দ্যাখো।

সকলে বিপুল বিস্ময়ে ফিরে দেখলে, ইতিমধ্যে কখন যে দ্বীপের পূর্ব-প্রান্ত আবার মাঠের সঙ্গে জুড়ে এক হয়ে গেছে তারা কেউ জানতেও পারেনি! স্থির মাটি, পায়ের তলায় আর টলমল করছে না।

এতক্ষণ পরে বিমল শ্রদ্ধাপূর্ণস্বরে বললে, তোমাকে শতশত ধন্যবাদ!

এখান থেকে সোজা পশ্চিম দিকে গেলেই দেখবে, নদীর ধারে তোমাদের নৌকো বাঁধা আছে। যাও!

পরমুহূর্তেই আর-এক অদ্ভুত দৃশ্য! সেই উপবিষ্ট মূর্তি আচম্বিতে বিনা অবলম্বনেই শূন্যে ঊধ্বদিকে উঠল এবং তারপর ধনুক থেকে ছোঁড়া তিরের মতন বেগে বনের ওপর দিয়ে কোথায় চোখের আড়ালে মিলিয়ে গেল!

কুমার হতভম্ভের মতন বললে, এ কি দেখলুম বিমল, এ কি দেখলুম!

বিমল বললে, আমি কিন্তু এই শেষ ম্যাজিকটা দেখে আশ্চর্য বলে মনে করছি না!

জয়ন্ত বললে, বিমলবাবু, তাহলে আপনার কাছে আশ্চর্য বলে কোনও কিছুই নেই!

জয়ন্তবাবু, আপনি কি সেই অদ্ভুত ইংরেজের কথা শোনেননি টলষ্টয়, থ্যাকারের সঙ্গে আরও অনেক বিশ্ববিখ্যাত লোক স্বচক্ষে দেখে যার বর্ণনা করে গেছেন? তিনি সাধকও নন, যাদুকরও নন, আমাদেরই মতন সাধারণ মানুষ। কিন্তু তার দেহ শুন্যে উঠে এক জানলা দিয়ে। শূন্যপথেই আবার ঘরের ভেতরে ফিরে আসত!

দোহাই মশাই, দোহাই! আর নতুন-নতুন দৃষ্টান্ত দিয়ে অসম্ভবের স্বাভাবিক ব্যাখ্যা করবেন! আপনাদের অ্যাডভেঞ্চার আমার ধারণার বাইরে। এখানকার মাটিতে আর পাঁচ মিনিট দাঁড়ালেও আমার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে! মাঠ আবার দ্বীপ হওয়ার আগেই ছুটে চলুন নৌকোর খোঁজে।

সকলে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হল। পূর্বাকাশের রংমহলে প্রবেশ করেছে তখন নবীন সূর্য। নদীর জল যেন গলানো সোনার ধারা। নৌকো যথাস্থানেই বাঁধা আছে।

অমৃত-দ্বীপের আরও কত রহস্য অমৃত-দ্বীপের ভেতরেই রেখে তারা খুলে দিলে নৌকার বাঁধন।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান