রহস্য-রোমাঞ্চ সমগ্র » অমৃত-দ্বীপ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ২৫, ২০২০; ১৬:৪১
সম্পাদনাঅক্টোবর ২৫, ২০২০, ১৬:৪৩
দৃষ্টিপাত
পঞ্চম পরিচ্ছেদ : ড্রাগনের দুঃস্বপ্ন যে দল এগিয়ে আসছে তার ভেতরকার প্রত্যেক মূর্তিটাই যেন মানুষের মতন দেখতে কলের পুতুলের মতন। কেবল চলছে তাদের পাগুলো, কিন্তু ওপর-দেহের অংশ একেবারেই কাঠের মতো আড়ষ্ট! তাদের হাত দুলছে না, মাথাগুলোও এদিকে-ওদিকে কোনওদিকেই ফিরছে না! আশ্চর্য! দূর থেকে কেবল এইটুকুই বোঝা গেল, আর দেখা গেল ...

পঞ্চম পরিচ্ছেদ : ড্রাগনের দুঃস্বপ্ন

যে দল এগিয়ে আসছে তার ভেতরকার প্রত্যেক মূর্তিটাই যেন মানুষের মতন দেখতে কলের পুতুলের মতন। কেবল চলছে তাদের পাগুলো, কিন্তু ওপর-দেহের অংশ একেবারেই কাঠের মতো আড়ষ্ট! তাদের হাত দুলছে না, মাথাগুলোও এদিকে-ওদিকে কোনওদিকেই ফিরছে না! আশ্চর্য!

দূর থেকে কেবল এইটুকুই বোঝা গেল, আর দেখা গেল খালি শত-শত চোখে স্থির আগুনের মতন উজ্জ্বল দৃষ্টি!

কিন্তু অগ্নি-উজ্জ্বল এইসব দৃষ্টি এবং এইসব আড়ষ্ট দেহের চলন্ত পদের চেয়েও অস্বাভাবিক কেমন একটা অজানা-অজানা ভাব মূর্তিগুলোর চারিদিকে কি যেন এক ভূতুড়ে রহস্য সৃষ্টি করেছে!

কুমার শিউরে উঠে তাড়াতাড়ি নিজের বন্দুক তুললে।

বিমল বললে, বন্ধু, অকারণে নরহত্যা করে লাভ নেই।

কুমার বললে, নরহত্যা নয় বিমল, আমি প্রেতহত্যা করব। রামহরি ঠিক বলেছে, এ হচ্ছে পিশাচদের দ্বীপ, এখানে মানুষ থাকে না।

কুমার, পাগলামি কোরো না।

পাগলামি? ওরা কারা? এইমাত্র দেখে এলুম নদীর ধারে জনপ্রাণী নেই, তবু ওরা কোত্থেকে আবির্ভূত হল? ওরা মাটি খুঁড়ে গজিয়ে উঠল, না আকাশ থেকে খসে পড়ল? ওদের আর কাছে আসতে দেওয়া উচিত নয়, বন্দুক ছোড়ো বিমল, বন্দুক ছোড়ো।

বিমল ঘাড় নেড়ে বললে, কি হবে বন্দুক ছুঁড়ে? ওরা যদি একসঙ্গে আক্রমণ করে তাহলে বন্দুক ছুঁড়েও আমরা আত্মরক্ষা করতে পারব না, উলটে বন্দুকের শব্দে সজাগ হয়ে দ্বীপের সমস্ত বাসিন্দা এদিকে ছুটে আসতে পারে।

জয়ন্ত চমৎকৃত স্বরে বললে, বিমলবাবু, এ কি আশ্চর্য ব্যাপার! প্রায় পাঁচশো লোক মাটির ওপরে একসঙ্গে পা ফেলে এগিয়ে আসছে, তবু কোনওরকম পায়ের আওয়াজই শোনা যাচ্ছে না? এও কি সম্ভব? না, আমরা কি কালা হয়ে গেছি?

কুমার বললে, বিমল, বিমল! তবে কি বিনা বাধায় আমাদের আত্মসমর্পণ করতে হবে? না বন্ধু, এতে আমি রাজি নই।

বিমল বললে, না, আত্মসমর্পণ করব কেন? আমরা ছুটে ওই বনের ভেতরে গিয়ে ঢুকব।

তবে ছোটো! ওরা যে এসে পড়ল!

জয়ন্ত বললে, কিন্তু যারা গান গাইছে তারা ওই বনের ভেতরেই আছে। শেষকালে যদি আমরা দু-দিক থেকে আক্রান্ত হই?

বিমল চটপট চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললে, মূর্তিগুলো আসছে পশ্চিম দিক থেকে, আর গানের আওয়াজ আসছে পূর্বদিক থেকে। পূর্ব-দক্ষিণ কোণেও রয়েছে বন। চলুন, আমরা ওই দিকেই দৌড় দি।

পূর্ব-দক্ষিণ কোণ লক্ষ করে তিনজনেই বেগে দৌড়তে লাগল। খানিকক্ষণ পরে বন ও মাঠের সীমারেখায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ে তারা আর একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলে।

সেই বিচিত্র মুর্তি বৃহৎ দল দ্রুতবেগে তাদের অনুসরণ করেনি, তাদের গতি একটুও বাড়েনি। তারা যেমন ভাবে অগ্রসর হচ্ছিল এখনও ঠিক সেই ভাবেই এগিয়ে আসছে–যেন। তাদের কোনওই তাড়া নেই! তফাতের মধ্যে খালি এই, এখন তারা আসছে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে।

বিমল আশ্চর্য হয়ে বললে, ওরা যে আমাদের পেছনে-পেছনে আসছে সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাপার কি বলো দেখি কুমার? ওরা তো একটুও তাড়াহুড়ো করছে না, রাহু যেমন নিশ্চয়ই চাঁদকে গ্রাস করতে পারবে জেনে এগুতে থাকে ধীরে-ধীরে, ওরাও অগ্রসর হচ্ছে সেইভাবেই! যেন ওরা জানে, যত জোরেই চালাই ওদের কবল থেকে কিছুতেই আমরা পালাতে পারব না!

কুমার বললে, ওদের ধরন-ধারণ দেখলে মনে হয় যেন নিশ্চিত মৃত্যুর দল মূর্তিধারণ করে নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে!

জয়ন্ত বললে, ওরা কারা তা জানি না, কিন্তু আমাদের এখানে দাঁড়িয়ে থাকা উচিত নয়।

বিমল বললে, এখন দেখছি সঙ্গীদের জাহাজে রেখে এসে ভালো কাজ করিনি। এই রহস্যময় দ্বীপে অদৃষ্টে কি আছে জানি না, কিন্তু চলুন, আমরা বনের ভেতরে গিয়ে ঢুকি।

আর এক দৌড়ে তারা মাঠ ছেড়ে বনের ভেতরে গিয়ে পড়ল।

বন সেখানে খুব ঘন নয়, গাছগুলোর তলায়-তলায় ও ফাঁকে-ফাঁকে দেখা যাচ্ছে খানিক কালো আর খানিক আলোয় খেলা। ঝোপঝাড়ের মাঝখান দিয়েও ফুটে উঠেছে আলো কালো মাখা পথের রেখা।

এবং দূর থেকে তখনও ভেসে আসছিল সেই বিচিত্র সংগীতের তান।

কুমার বললে, এখন আমরা কোনদিকে যাব?

বিমল বললে, পূর্ব-দক্ষিণ দিকে আরও খানিক এগিয়ে তারপর আবার আমরা নদীর দিকে ফেরবার চেষ্টা করব।

বিমলের মুখের কথা শেষ হতেই সারা অরণ্য যেন চমকে উঠল কি এক পৈশাচিক হো হো অট্টহাস্যে! তাদের আশপাশ, সুমুখ পেছন থেকে ছুটল হাসির হররার পর হাসির হররা! সে বিকট হাসির স্রোত বইছে যেন পায়ের তলা দিয়ে, সে হাসি যেন ঝরে ঝরে পড়ছে শূন্যতল থেকে, সে হাসির ধাক্কায় যেন চঞ্চল হয়ে উঠল বনব্যাপী আলোর রেখা, কালোর রেখা!

বিমল, কুমার ও জয়ন্ত বিভ্রান্তের মতো চতুর্দিকে ঘুরে-ফিরে তাকাতে লাগল, কিন্তু কোনওদিকেই দেখা গেল না জনপ্রাণীকে।

জয়ন্ত বললে, কারা হাসে? কোথা থেকে হাসে? কেন হাসে?

কুমার ও বিমল কখনও পাগলের মতো এ-গাছের ও-গাছের দিকে ছুটে যায় কখনও ডাইনের কখনও বাঁয়ের ঝোপঝাড়ের ওপরে বন্দুকের কুঁদো দিয়ে বারবার আঘাত করে, কিন্তু কোথাও কেউ নেই–অথচ অট্ট-অট্ট হাসির তরঙ্গের-পর-তরঙ্গ আসছে প্রতি ঝোপের ভেতর থেকে, প্রতি গাছের আড়াল থেকে! এ অদ্ভুত হাসির জন্ম যেন সর্বত্রই।

যেমন আচম্বিতে জেগেছিল, তেমনি হঠাৎ আবার থেমে গেল হাসির হুল্লোড়! কেবল শোনা যেতে লাগল সুদূরের সংগীতলহরী।

বিমল কান পেতে শুনে বললে, জয়ন্তবাবু, এবারে কেবল গান নয়, আর একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছেন?

জয়ন্ত বললে, হুঁ। বনময় ছড়ানো শুকনো পাতার ওপরে পড়ছে যেন তালে-তালে শত শত পা! বোধহয় মাঠের বন্ধুরা বনে ঢুকছে, কিন্তু এবারে তারা আর নিঃশব্দে আসছে না।

বিমল বললে, ছোট কুমার, যত জোরে পারো ছোট। আবার জাগ্রত হল বহুকণ্ঠে সেই ভীষণ অট্টহাস্য!

কুমার বললে, কিন্তু কোন দিকে ছুটব বিমল? দূরে শত্রুদের পদশব্দ, আশেপাশে শত্রুদের পাগলা হাসির ধূম! চারিদিকে অদৃশ্য শত্ৰু, কোনদিকে যাব ভাই?

সামনের দিকে সামনের দিকে। শত্রুরা দৃশ্যমান হলেই বন্দুক ছুড়বে।

তিনজনে আবার ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়তে লাগল এবং তাদের সঙ্গে-সঙ্গেই ছুটতে লাগল যেন। সেই বেয়াড়া হাসির আওয়াজ! এইটুকুই কেবল বোঝা গেল যে, তাদের এপাশে-ওপাশে পেছনে জাগ্রত অট্টহাসি থাকলেও সামনের দিকে হাসি এখন একেবারেই নীরব। যেন সেই অপার্থিব হাসি তাদের সুমুখের পথ রোধ করতে চায় না! যেন কারা তাদের ওইদিকেই তাড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়!

প্রায় বারো-তেরো মিনিট ধরে তারা ছুটে চলল এইভাবেই এবং এরমধ্যে সেই হাসির স্রোত বন্ধ হল না একবারও।

তার পরেই থেমে গেল হাসি, শেষ হয়ে গেল বনের পথ এবং সামনেই দেখা গেল পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে খুব উঁচু একটা প্রাচীর।

কুমার হতাশভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে বললে, সামনের পথ বন্ধ! এখন আমরা কি করব?

বিমল ও জয়ন্ত উপায়হীনের মতো এদিকে-ওদিকে তাকাতে লাগল।

হঠাৎ বনের ভেতরে জাগল আবার শত-শত পায়ের আঘাতে শুকনো পাতার আর্তনাদ।

জয়ন্ত বললে, এবারে পায়ের শব্দ আসছে আমাদের দুপাশ আর পিছন থেকে। আমাদের সুমুখে রয়েছে খাড়া দেওয়াল। আর আমাদের পালাবার উপায় নেই।

বিমল ম্লান হাসি হেসে বললে, আমরা পালাচ্ছি না–রিট্রিট করছি।

জয়ন্তও হাসবার চেষ্টা করে বললে, বেশ, মানলুম এসব হচ্ছে আমাদের ট্যাকটিক্যাল মুভমেন্টস; কিন্তু এবারে আমরা কোন দিকে যাত্রা করব?

বিমল বললে, সামনের দিকে ভালো করে চেয়ে দেখুন, আমাদের সুমুখের দেওয়ালের গায়ে রয়েছে একটা ছোট দরজা! ওর পাল্লাও বন্ধ নেই।

জয়ন্ত দুই পা এগিয়ে ভালো করে দেখে বুঝলে, বিমলের কথা সত্য! তারপর বললে, দেখছি, অন্ধকারে আপনার চোখ আমাদের চেয়ে ভালো চলে। কিন্তু ওর ভেতরে ঢুকলে কি আর আমরা বেরিয়ে আসতে পারব? বেশ বোঝা যাচ্ছে, দুই পাশের আর পেছনের অদৃশ্য শত্রুরা অট্টহাস্য আর পায়ের শব্দ করে আমাদের এই দিকেই তাড়িয়ে আনতে চায়। শিকারীরা বাঘ-সিংহকে যেমনভাবে নির্দিষ্ট পথে চালনা করে ফাঁদে ফেলে, শত্রুরাও সেই কৌশল অবলম্বন করেছে।

বিমল বললে, ঠিক। তাদের উদ্দেশ্য আমিও বুঝতে পেরেছি। আর আমাদের ঢোকবার সুবিধা হবে বলে দয়া করে তারা দরজার পাল্লা-দুখানাও খুলে রেখেছে! অতএব তাদের ধন্যবাদ দিয়ে আমাদের এখন দরজার ফাঁকেই মাথা গলাতে হবে, কারণ পায়ের শব্দ আর দূরে নেই!

কুমার বললে, দরজার ওপাশে যদি নতুন বিপদ থাকে?

অকুতোভয়ে সেই বিপদকে আমরা বরণ করব–বলেই বিমল বন্দুক উদ্যত করে সর্বাগ্রে দরজার ভেতরে গিয়ে ঢুকল। তার পেছনে-পেছনে গেল কুমার ও জয়ন্ত!

ভেতরে ঢুকে তারা অবাক হয়ে দেখলে, একটা বৃক্ষহীন, তৃণহীন ছোটখাটো ময়দানের মতন জায়গা এবং তার চারিদিকেই প্রায় চারতলার সমান উঁচু প্রাচীর। হঠাৎ দেখলে মনে হয়, যেন সর্বহারা মরুভূমির খাঁ-খাঁ করা ভয়াল স্তব্ধতাকে সেখানে কেউ প্রাচীর তুলে কয়েদ করে রেখেছে!

জয়ন্ত বললে, এর মানে কি? একটা মাঠকে এমন উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে কেন?

বিমল অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, অনেকদিন আগে আমরা গিয়েছিলুম চম্পাদ্বীপে। কুমার, আজকের এই গর্জন শুনে কি সেখানকার কোনও-কোনও জীবের কথা মনে পড়ে না?

কুমার বললে, এরা কি এখানে আমাদের বন্দি করে রাখতে চায়?

যেন তার জিজ্ঞাসার উত্তরেই তাদের পিছনকার দরজার পাল্লা দু-খানা বন্ধ হয়ে গেল। সশব্দে।

বিমল দৌড়ে গিয়ে দরজা ধরে টানাটানি করে বললে, হা কুমার, অমৃত-দ্বীপে এসে। আমাদের ভাগ্যে উঠবে বোধহয় নিছক গরলই। এ দরজা এমন মজবুত যে মত্ত হস্তিও এর কিছুই করতে পারবে না! এতক্ষণ লক্ষ করে দেখিনি, কিন্তু এ হচ্ছে পুরু লোহার দরজা; আর এই পাঁচিল হচ্ছে পাথরের। এই দরজা আর পাঁচিল ভাঙতে হলে কামানের দরকার!

অকস্মাৎ চারিদিকের নিস্তব্ধতা খণ্ডখণ্ড হয়ে গেল ভয়াবহ গর্জনের-পর-গর্জনে! সে যে কি বিকট, কি বীভৎস, কি ভৈরব হুঙ্কার, ভাষায় তা প্রকাশ করা অসম্ভব। পৃথিবীর মাটি, আকাশের চাঁদ-তারা, নিশীথ-রাতের বুক সে হুঙ্কার শুনে যেন কেঁপে কেঁপে-কেঁপে উঠল! যেন বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধায় ছটফট করতে করতে বহু দিনের উপবাসী কোন অতিকায় দানব হিংস্র, বিষাক্ত চিৎকারের-পর-চিৎকার করে হঠাৎ আবার স্তব্ধ হয়ে পড়ল!

বিমল, কুমার ও জয়ন্ত খানিকক্ষণ স্তম্ভিত ও বোবার মতন দাঁড়িয়ে রইল।

সর্বপ্রথমে কথা কইলে জয়ন্ত; কম্পিতস্বরে সে বললে, এ কোন জীবের গর্জন বিমলবাবু? চল্লিশ-পঞ্চাশটা সিংহও যে একসঙ্গে এত জোরে গর্জন করতে পারে না! এ-রকম ভয়ানক গর্জন করবার শক্তি কি পৃথিবীর কোনও জীবের আছে?

কুমার বললে, মনে-মনে আমিও সেই কথাই ভাবছিলুম!

বিমল বললে, কিন্তু আন্দাজ করতে পারছ কি এ জীবটা কোত্থেকে গর্জন করছে? মনে হচ্ছে যেন সে আছে আমাদের খুব কাছেই। অথচ এই পাঁচিল ঘেরা জায়গাটার মধ্যে চাঁদের আলোর কোনও জীবের ছায়া পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না!

জয়ন্ত বললে, কিন্তু পূর্বদিকে খানিক দূরে তাকিয়ে দেখুন। ওখানে চাঁদের আলোর জলের মতন কি চকচক করছে না?

বিমল খানিকক্ষণ সেই দিকে তাকিয়ে থেকে বললে, হ্যাঁ জয়ন্তবাবু, ওখানে একটা জলাশয়ের মতন কিছু আছে বলেই মনে হচ্ছে!

কুমার বললে, একটু এগিয়ে দেখব নাকি?

বিমল খপ করে কুমারের হাত চেপে ধরে বললে, খবরদার কুমার, ওদিকে যাওয়ার নামও কোরও না।

কেন বিমল, ওদিকে তো কেউ নেই?

হ্যাঁ, চোখে কারুকে দেখা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু আগে এখানকার ব্যাপারটা তলিয়ে বুঝে দ্যাখো। প্রথমে ধরো, রীতিমতো মাঠের মতন এমন একটা জায়গা অকারণে কেউ এত উঁচু পাথরের পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রাখে না। এখানটা ঘিরে রাখবার কারণ কি? দ্বিতীয়ত, পাঁচিলের ওই দরজা পুরু লোহা দিয়ে তৈরি কেন? এই ফর্দা জায়গায় এমনকী বিভীষিকা আছে যাকে এখানে ধরে রাখবার জন্যে অমন মজবুত দরজার দরকার হয়? তৃতীয়ত, পাঁচিল-ঘেরা এতখানি জায়গার ভেতরে দ্রষ্টব্য আর কিছুই নেই–না গাছপালা, না ঘরবাড়ি, না জীবনের চিহ্ন! আছে। কেবল একটা জলাশয়! কেন ওখানে জলাশয় খখাড়া রয়েছে, ওর ভেতরে কি আছে? আমাদের খুব কাছে এখনি যে দানব-জানোয়ারটা বিষম গর্জন করলে, কে বলতে পারে সে ওই জলাশয়ে বাস করে কিনা? হয়তো সে উভচর–জলে-স্থলে তার অবাধ গতি! ওদিকে যাওয়া নিরাপদ নয় কুমার, ওদিকে যাওয়া নিরাপদ নয়।

জয়ন্ত শিউরে উঠে বললে, তবে কি ওই দানবের খোরাক হওয়ার জন্যেই আমাদের তাড়িয়ে এইখানে নিয়ে আসা হয়েছে?

আমার তো তাই বিশ্বাস।

কুমার বললে, ওই বিভীষিকা যদি স্থলচর হয়, তাহলে আমরা তো এখানে থেকেও বাঁচতে পারব না! সে তো আমাদের দেখতে পেলেই আক্রমণ করবে! তখন কি হবে?

তখন ভরসা আমাদের এই তিনটে অটোমেটিক বন্দুক! কিন্তু এই বন্দুক তিনটে যে নিশ্চয়ই আমাদের প্রাণরক্ষা করতে পারবে একথা জোর করে বলা যায় না! চম্পাদ্বীপে আমরা এমন সব জীবও স্বচক্ষে দেখেছি যাদের কাছে বন্দুকও হচ্ছে তুচ্ছ অস্ত্র।

জয়ন্ত কিছু না বলে প্রাচীরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর প্রাচীরের গায়ে হাত বুলিয়ে বললে, দেখছি পাঁচিলের গা তেলা নয়, রীতিমতো এবড়ো-খেবড়ো। ভালো লক্ষণ।

বিমল বললে, পাঁচিলের গা অসমতল হলে আমাদের কি সুবিধা হবে জয়ন্তবাবু?

জয়ন্ত সে-কথার জবাব না দিয়ে বললে, বিমলবাবু, যদি একগাছা হাত-চল্লিশ-পঞ্চাশ লম্বা দড়ি পেতুম, তাহলে আমাদের আর কোনওই ভাবনা ছিল না।

বিমল বিস্মিত স্বরে বললে, দড়ি? দড়ি নিয়ে কি করবেন? দড়ি তো আমার কাছেই আছে! জয়ন্তবাবু, আমি আর কুমার হচ্ছি পয়লা নম্বরের ভবঘুরে, পথে পা বাড়ালেই সবকিছুর জন্যেই প্রস্তুত হয়ে থাকি। আমাদের দুজনের পাশে ঝুলছে এই যে দুটো ব্যাগ, এর মধ্যে আছে দস্তুরমতো সংসারের এক-একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। আমার ব্যাগে আছে ষাট হাত ম্যানিলা দড়ি। জানেন তো, দেখতে সরু হলেও ম্যানিলা দড়ি দিয়ে সিংহকেও বেঁধে রাখা যায়?

জয়ন্ত বললে, উত্তম। আর চাই একটা হাতুড়ি আর একগাছা হুক।

ও দুটি জিনিস আছে কুমারের ব্যাগে।

চমৎকার! তাহলে আমার সঙ্গে আসুন। আমি চাই চার পাঁচিলের একটা কোণ বেছে নিতে, সেখানে গেলে হাত বাড়িয়ে পাব দু-দিকের দেওয়াল।

জয়ন্ত পায়ে-পায়ে এগুলো। কিছুই বুঝতে না পেরে বিমল ও কুমারও চলল তার পেছনে পেছনে।

প্রাচীরের পূর্ব-উত্তর কোণে গিয়ে দাঁড়িয়ে জয়ন্ত বললে, এইবারে দড়ি আর হুক আর হাতুড়ি নিয়ে আমি উঠব পাঁচিলের ওপরে। তারপর টঙে গিয়ে দুখানা পাথরের জোড়ের মুখে হুক বসিয়ে তার সঙ্গে দড়ি বেঁধে নীচে ঝুলিয়ে দেব। তারপর আপনারা দুজনেও একে একে দড়ি ধরে ওপরে গিয়ে উঠবেন। তারপর সেই দড়ি বেয়েই পাঁচিলের ওপারে পৃথিবীর মাটিতে অবতীর্ণ হতে বেশিক্ষণ লাগবে না।

বিমল খিলখিল করে হেসে উঠে বললে, বাঃ, সবই তো জলের মতন বেশ বোঝা গেল! কিন্তু জয়ন্তবাবু, প্রথমেই বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? অর্থাৎ পাঁচিলের টঙে গিয়ে চড়বে কে? আপনি, না আমি, না কুমার? দুঃখের বিষয় আমরা কেউই টিকটিকির মূর্তিধারণ করতে পারি না!

জয়ন্ত বললে, বিমলবাবু, আমি ঠাট্টা বা আকাশকুসুম চয়ন করছি না। কিছুকাল আগে নিউইয়র্ক টাইমসে আমি কারাগার থেকে পলায়নের এক আশ্চর্য খবর পড়েছিলুম। কাল্পনিক নয়, সম্পূর্ণ সত্যকাহিনি। আমেরিকার এক নামজাদা খুনে ডাকাতকে সেখানকার সবচেয়ে সুরক্ষিত জেলখানায় বন্দি করে রাখা হয়। সে-জেল ভেঙে কোনও বন্দি কখনও পালাতে পারেনি, তার চারিদিকে ছিল অত্যন্ত উঁচু পাঁচিল। কিন্তু ওই ডাকাতটা এক অদ্ভুত উপায়ে সেই পাঁচিলও পার হয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। উপায়টা যে কি, মুখে বললে আপনারা তা অসম্ভব বলে মনে করবেন–আর খবরটা প্রথমে পড়ে আমিও অসম্ভব বলেই ভেবেছিলুম। কিন্তু কিছুদিন ধরে অভ্যাস করবার পর আমিও দেখলুম, উপায়টা দুঃসাধ্য হলেও অসাধ্য নয়। তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে এ উপায়টা চিরদিনই অসম্ভব হয়ে থাকবে বটে, কারণ এ উপায় যে অবলম্বন করবে তার পক্ষে দরকার কেবল হাত-পায়ের কৌশল নয়–অসাধারণ দেহের শক্তিও।

বিমল কৌতূহলে প্রদীপ্ত হয়ে বললে, জয়ন্তবাবু, শিগগির বলুন, সে উপায়টা কি?

জয়ন্ত বললে, উপায়টা এমন ধারণাতীত যে মুখে বললে আপনারা বিশ্বাস করবেন না। তার চেয়ে এই দেখুন, আপনাদের চোখের সমুখে আমি নিজেই সেই উপায়টা অবলম্বন করছিবলেই সে দুই দিকের প্রাচীর যেখানে মিলেছে সেই কোণে গিয়ে দাঁড়াল।

তারপর বিমল ও কুমার যে অবাক করা ব্যাপারটা দেখলে কোনওদিনই সেটা তারা সম্ভবপর বলে মনে করেনি! জয়ন্ত কোণে গিয়ে দুই দিকের প্রাচীরে দুই হাত ও দুই পা রেখে কেবল হাত ও পায়ের ওপরে প্রবল চাপ দিয়ে ওপরদিকে উঠে যেতে লাগল, প্রায় অনায়াসেই! বিপুল বিস্ময়ে নির্বাক ও রুদ্ধশ্বাস হয়ে তারা বিস্ফারিত চোখে ওপর-পানে তাকিয়ে রইল।

জয়ন্ত যখন প্রাচীরের ওপর পর্যন্ত পৌঁছল, বিমল উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তারিফ করে বললে, সাধু জয়ন্তবাবু, সাধু! আপনি আজ সত্য করে তুললেন ধারণাতীত স্বপ্নকে!

ঠিক সেই সময়েই জাগল আবার চারিদিক কাঁপয়ে ও ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত করে কোন অজ্ঞাত দানবের বিভীষণ হুহুঙ্কার। সে যেন সমস্ত জীবজগতের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিবাদ–সে যেন বিরাট বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা!

জয়ন্ত তখন প্রাচীরের ওপরে উঠে বসে হাঁপ নিচ্ছে, কিন্তু এমন ভয়ানক সেই চিৎকার যে, চমকে উঠে সে আর একটু হলেই টলে নীচে পড়ে যাচ্ছিল, তাড়াতাড়ি দুই হাতে প্রাচীর চেপে ধরে সরোবরের দিকে সভয়ে তাকিয়ে দেখলে।…হা, বিমলের অনুমানই ঠিক। একটু আগে যারা আজগুবি হাসি হাসছিল তারা দেখা দেয়নি বটে, কিন্তু এখন যে হুঙ্কারের-পর-হুঁঙ্কার ছাড়ছে সে আর অদৃশ্য হয়ে নেই!

চাঁদ তখন পশ্চিম আকাশে। এবং পশ্চিম দিকের উঁচু প্রাচীরের কালো ছায়া এসে পড়ে সরোবরের আধাআধি অংশ করে তুলেছে অন্ধকারময়। এবং সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ে অন্ধকারেরই একটা জীবন্ত অংশের মতো কী যে সে কিম্ভুতকিমাকার বিপুল মূর্তির খানিকটা আত্মপ্রকাশ করেছে, দূর হতে স্পষ্ট করে তা বোঝা গেল না। কিন্তু তার প্রকাণ্ড দেহটা সরোবরের জ্যোৎস্না-উজ্জ্বল অংশের ওপরে ক্রমেই আরও প্রকাণ্ড হয়ে উঠতে লাগল! তবে কি সে তাদের দেখতে পেয়েছে? সে কি এগিয়ে আসছে জল ছেড়ে ডাঙায় ওঠবার জন্যে?

জয়ন্ত অত্যন্ত ব্যস্তভাবে প্রাচীরের পাথরের ফাঁকে হুক বসিয়ে ঠকঠক হাতুড়ির ঘা মারতে লাগল।

নীচে থেকে বিমল অধীর স্বরে চিৎকার করে বললে, ও আমাদের দেখতে পেয়েছে– ও আমাদের দেখতে পেয়েছে! জয়ন্তবাবু, দড়ি–দড়ি!

কুমার ফিরে সচকিত চোখে দেখলে, প্রায় আশি ফুট লম্বা ও পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ ফুট উঁচু একটা বিরাট কালি কালো দেহ মূর্তিমান দুঃস্বপ্নের মতো সরোবরের তীরে বসে সশব্দে প্রচণ্ড গা-ঝাড়া দিচ্ছে!

ওপর থেকে ঝপাং করে একগাছা দড়ি নীচে এসে পড়ল।

কুমার এস্ত স্বরে বললে, লাউ-জুর ভক্তরা কি একেই ড্রাগন বলে ডাকে?

বিমল দড়ি চেপে ধরে বলল, চুলোয় যাক নাউজুর ভক্তরা! এখন নিজের প্রাণ বাঁচাও। তাড়াতাড়ি আমার সঙ্গেই দড়ি ধরে ওপরে উঠে এসো।

—– —-

তারা একে-একে প্রাচীরের ওপারে মাটির ওপরে গিয়ে নেমে আড়ষ্টভাবে শুনলে, ওধার থেকে ঘনঘন জাগছে মহাব্রুদ্ধ দানবের হতাশ হুহুঙ্কার! সে নিশ্চয়ই চারিদিকে মুখের গ্রাস খুঁজে বেড়াচ্ছে, কেন না তার বিপুল দেহের বিষম দাপাদাপির চোটে প্রাচীরের এ-পাশের মাটিও কেঁপে উঠছে থরথর করে।

কুমার শ্রান্তের মতন কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললে, উঃ, দানবটা আর এক মিনিট আগে আমাদের দেখতে পেলে আর আমরা বাঁচতুম না!

বিমল গম্ভীর স্বরে বললে, এখনও আমাদের বাঁচবার সম্ভাবনা নেই কুমার! ডাইনে বাঁয়ে সামনের দিকে চেয়ে দ্যাখো!

সর্বনাশ! আবার সেই অপার্থিব দৃশ্য! তারা দাঁড়িয়ে আছে প্রান্তরের মতন একটা স্থানে এবং সেই প্রান্তরের যেদিকে তাকানো যায় সেই দিকেই চোখে পড়ে, কলে-চলা পুতুলের মতন দলে-দলে মানুষ-মূর্তি অর্ধচন্দ্রাকারে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে! নীরব, নিঃশব্দ, নিষ্ঠুর সব মূর্তি।

পেছনে প্রাচীর এবং সামনে ও দুই পাশে রয়েছে এই অমানুষিক মানুষের দল। এবারে আর পালাবার কোনও পথই খোলা নেই।

জয়ন্ত অবসন্নের মতো বসে পড়ে বললে, আর কোনও চেষ্টা করা বৃথা।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান