রহস্য-রোমাঞ্চ সমগ্র » অমৃত-দ্বীপ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ২৫, ২০২০; ১৬:৪১
সম্পাদনাঅক্টোবর ২৫, ২০২০, ১৬:৪৩
দৃষ্টিপাত
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : সুন্দরবাবুর সাগর-স্নান চোখে দূরবিন লাগিয়ে জয়ন্ত যা দেখলে তা ভয়াবহই বটে! বোম্বেটেদের জাহাজেরও অনেক পেছনে–বহু দুরে, আকাশ ও সমুদ্রের চেহারা একেবারে বদলে গেছে! নীচে বিপুল মাথা নাড়া দিয়ে উঠেছে প্রচণ্ড, উন্মত্ত, বৃহৎ তরঙ্গের-পর-তরঙ্গ বলা চলে তাদের পর্বত-প্রমাণ! তারা লাফিয়ে ওপরে উঠছে, আঁপিয়ে নীচে পড়ছে, আবার উঠছে, আবার ...

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : সুন্দরবাবুর সাগর-স্নান

চোখে দূরবিন লাগিয়ে জয়ন্ত যা দেখলে তা ভয়াবহই বটে!

বোম্বেটেদের জাহাজেরও অনেক পেছনে–বহু দুরে, আকাশ ও সমুদ্রের চেহারা একেবারে বদলে গেছে! নীচে বিপুল মাথা নাড়া দিয়ে উঠেছে প্রচণ্ড, উন্মত্ত, বৃহৎ তরঙ্গের-পর-তরঙ্গ বলা চলে তাদের পর্বত-প্রমাণ! তারা লাফিয়ে ওপরে উঠছে, আঁপিয়ে নীচে পড়ছে, আবার উঠছে, আবার নামছে এবং ঘুরপাক খেতে-খেতে ফেনায়-ফেনায় সেখানকার নীলিমাকে যেন খণ্ড-খণ্ড করে দিয়ে এগিয়ে আসছে উল্কার মতন তীব্রগতিতে! ওপরে আকাশের রং হয়ে গেছে কালো মেঘে-মেঘে ঘোরা-রাত্রির মতোই অন্ধকার! বেশ বোঝা যায়, জেগে উঠেছে সেখানে সর্বধ্বংসী আকস্মিক ঝঞ্জাবায়ু–যার মস্তকান্দোলনে দিকে দিকে ঠিকরে পড়ছে বাঁধন-হারা নিকষ কালো মেঘের জটা এবং ঘনঘন পদাঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে উথলে উঠছে তরঙ্গাকুল মহাসমুদ্র!

ফিরে দাঁড়িয়ে অভিভূত স্বরে জয়ন্ত বললে, টাইফুন?

কুমার খালি চোখেই সেদিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা আন্দাজ করে নিয়ে বললে, হ্যাঁ, আমরা যাকে বলি ঘূর্ণাবর্ত।

মানিক বললে, কিন্তু আমাদের এখানে তো একটুও বাতাস নেই, অসহ্য উত্তাপে গা যেন পুড়ে যাচ্ছে।

কুমার বললে, ওসব টাইফুনের পূর্ব-লক্ষণ। এ-অঞ্চলে টাইফুন জাগবার সম্ভাবনা ওই লক্ষণ থেকেই জানা যায়।

জয়ন্ত বললে, কুমারবাবু, সমুদ্রযাত্রা আমার এই প্রথম, এর আগে টাইফুন কখনও দেখিনি। কিন্তু শুনেছি চিনা-সমুদ্রে টাইফুনের পাল্লায় পড়ে ফি-বৎসরেই অনেক জাহাজ অতলে তলিয়ে যায়।

সেইজন্যেই তো ওকে আমরা বোম্বেটেদেরও চেয়ে ভয়ানক বলে মনে করছি। বোম্বেটেদের সঙ্গে লড়া যায়, কিন্তু টাইফুনের সঙ্গে যুদ্ধ করা অসম্ভব। এখন আমাদের একমাত্র আশা ওই দ্বীপ। যদি টাইফুনের আগে ওখানে গিয়ে পৌঁছতে পারি! হয়তো পারবও, কারণ, আমরা দ্বীপের খুব কাছে এসে পড়েছি। এই দেখুন, আমাদের জাহাজের গতি আরও বেড়ে উঠেছে!

এতক্ষণ সুন্দরবাবু ছিলেন ভয়ে হতভম্বের মতো। এইবারে মুখ খুলে তিনি বলে উঠলেন, হুম! দুর্গে দুর্গতিনাশিনী!

জয়ন্ত বললে, কিন্তু বোম্বেটেদের জাহাজ এখনও দূরে রয়েছে, সে কি টাইফুনকে ফাঁকি দিতে পারবে?

কুমার বললে, ওদের নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার দরকার নেই।

মানিক বললে, কি আশ্চর্য দৃশ্য! সমুদ্রের আর সব দিক শান্ত, কেবল একদিকেই জেগেছে। নটরাজের প্রলয়-নাচন!

কুমার বললে, সাধারণ সাইক্লোনে-র মতো টাইফুন বহু দূর ব্যেপে ছোটে না, ওইটেই তার বিশেষত্ব। কিন্তু ছোট হলেও তার জোর ঢের বেশি–যেটুকু জায়গা জুড়ে আসে, তার ভেতরে পড়লে আর রক্ষে নেই!

দূর থেকে মেগাফোনে বিমলের উচ্চ কণ্ঠস্বর জাগল–কুমার, সবাইকে নিয়ে তুমি ডাঙায় নামবার জন্যে প্রস্তুত হও। কেবল নিতান্ত দরকারি জিনিসগুলো গুছিয়ে নাও।

সবাই কেবিনের দিকে ছুটল। তারপর তাড়াতাড়ি কতকগুলো ব্যাগ ভরতি করে আবার তারা যখন ডেকের ওপরে এসে দাঁড়াল, দ্বীপ তখন একেবারে তাদের সামনে!

মানিক বিস্মিত কণ্ঠে বললে, সমুদ্র যে এখানে প্রকাণ্ড এক নদীর মতো হয়ে দ্বীপের ভেতরে ঢুকে গিয়েছে! এ যে এক স্বাভাবিক বন্দর!

জয়ন্ত বললে, হ্যাঁ, আমাদের জাহাজও এই বন্দরে ঢুকছে।

সুন্দরবাবু উৎফুল্ল স্বরে বললেন, জয় মা কালী! আমরা বন্দরে আশ্রয় পেয়েছি!

মানিক বলল, হ্যাঁ, আরও ভালো করে মা কালীকে ডাকুন সুন্দরবাবু! কারণ তিনি হচ্ছেন যুদ্ধের দেবী, আর বোম্বেটেরাও এই বন্দরে আসছে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতেই।

সুন্দরবাবু দুই হাত জোড় করে মা কালীর উদ্দেশ্যে চক্ষু মুদে তিনবার প্রণাম করে বললেন, মানিক, এসময়ে আর ভয় দেখিও না, মা-জগদম্বাকে একবার প্রাণ ভরে ডাকতে দাও।

কুমার ফিরে দেখলে শত্রুরা দ্বীপ লক্ষ করে প্রাণপণে জাহাজ চালিয়েছে এবং দুরে তার দিকে বেগে তাড়া করে আসছে সাগর-তরঙ্গ তোলপাড় করে মূর্তিমান মহাকালের মতো সুভীষণ ঘূর্ণাবর্ত!

দ্বীপের ভেতরে ঢুকে সমুদ্রের জল আবার মোড় ফিরে গেছে, কাজেই জাহাজও সঙ্গে সঙ্গে মোড় ফিরলে। তখন দ্বীপের বনজঙ্গল ঠিক যবনিকার মতোই বাহির-সমুদ্র, ঘূর্ণাবর্ত ও বোম্বেটে-জাহাজের সমস্ত দৃশ্য একেবারে ঢেকে দিলে।

এমনসময়ে বিমল দৌড়ে সকলের কাছে এসে বললে, জয়ন্তবাবু, কাপ্তেন বললেন এখানকার জল গভীর নয়, জাহাজ আর চলবে না। নাবিকেরা নৌকোগুলো নামাচ্ছে, আমাদেরও জাহাজ থেকে নামতে হবে।

সুন্দরবাবু বললেন, কেন?

বোম্বেটেরাও এখানে আসছে, তারা আমাদের চেয়ে দলে ঢের ভারী। আমরা ডাঙায় না নামলে তাদের আক্রমণ ঠেকাতে পারব না।

সুন্দরবাবু আবার মুষড়ে পড়ে বললেন, তাহলে যুদ্ধ আমাদের করতেই হবে?

নিশ্চয়! টাইফুন আর বোম্বেটে–আমাদের এখন যুদ্ধ করতে হবে দুই শত্রুর সঙ্গে! ওই দেখুন, সেলর-রা এরই মধ্যে লাইফবোট ভাসিয়ে ফেলেছে! ওই শুনুন, মেগাফোনে কাপ্তেন-সায়েবের গলা! তিনি আমাদের নৌকোয় তাড়াতাড়ি নামতে বলছেন–নইলে ঝোড়ো ঢেউ এখানেও এসে পড়তে পারে! চলুন, আর দেরি নয়। রামহরি, তুমি বাঘাকে সামলাও!

লাইফবোট যেখানে থামল, সেখানে জলের ধার থেকেই একটি ছোট্ট পাহাড় প্রায় একশো ফুট উঁচু হয়ে উঠেছে।

বিমল বললে, এইখানেই বন্দুক নিয়ে আমরা সবাই পাথরের আড়ালে অপেক্ষা করব। বোম্বেটেরা আমাদের বন্দুক এড়িয়ে নিতান্তই যদি ডাঙায় এসে নামে, তাহলে অবস্থা বুঝে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। আপাতত এই পাহাড়টাই হবে আমাদের দুর্গ। কি বলো কুমার, কি বলেন জয়ন্তবাবু?

জয়ন্ত বললে, সাধুপ্রস্তাব। কিন্তু বিমলবাবু, একটা গোলমাল শুনতে পাচ্ছেন?

হুঁ, ঝোড়ো বাতাসের গোঁ-গোঁ হু-হু, সমুদ্রের হুঙ্কার!

কুমার বললে, কেবল তাই নয়দূর থেকে যেন অনেক মানুষের কোলাহলও ভেসে আসছে!

রামহরি বললে, এতক্ষণ চারিদিক গুমোট করে ছিল, এখন জোর হাওয়ায় এখানকার গাছপালাগুলো নুয়ে-নুয়ে পড়ছে! ঝড় বোধহয় এল!

মানিক বললে, ঝড় এল, কিন্তু বোম্বেটে-জাহাজ কোথায়?

সুন্দরবাবু বললেন, হুম!

বাঘা বললে, ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ!

বিমল বললে, তবে কি বোম্বেটেগুলো ঝড়ের খপ্পরেই পড়ল? দাঁড়াও, দেখে আসি—বলেই সে তাড়াতাড়ি পাহাড়ের ওপরে উঠতে লাগল।

রামহরি উদ্বিগ্ন স্বরে বললে, ওপরে উঠো না খোকাবাবু, ওপরে উঠো না! বেশি ঝড় এলে উড়ে যাবে!

কিন্তু বিমল মানা মানলে না। পাহাড়ের প্রায় মাঝবরাবর উঠেই দাঁড়িয়ে পড়ে একদিকে তাকিয়ে সে চমৎকৃত স্বরে বললে, আশ্চর্য, আশ্চর্য! কুমার, কুমার, শিগগির দেখে যাও।

বিপুল কৌতূহলে সবাই দ্রুতপদে ওপরে উঠতে লাগল–একমাত্র সুন্দরবাবু ছাড়া। তার বিপুল উঁড়ি উর্ধমার্গের উপযোগী নয়।

বাস্তবিকই সে এক আশ্চর্য দৃশ্য! যে বিষম টাইফুনের ভয়ে তারা সবাই এখানে এসে। আশ্রয় নিয়েছে, সে-ভয়ঙ্কর দ্বীপের দিকে না এসে যেন পাশ কাটিয়েই প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে চলেছে অন্য দিকে হু-হু করে! দ্বীপের দিকে এসেছে খানিকটা উদ্দাম হাওয়ার ঝটকা মাত্র, কিন্তু টাইফুন নিজে যেখান দিয়ে যাচ্ছে সেখানকার শূন্যে দুলছে নিরন্ধ্র অন্ধকার নীচে কেবল। অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে রুদ্র সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গদলের হিন্দোলা! আর ভেসে-ভেসে আসছে প্রমত্ত ঘূর্ণাবর্তের বিকট চিৎকার, গম্ভীর জল কল্লোল, বহু মানবকণ্ঠের আর্তনাদ!

কুমার অভিভূত স্বরে বললে, এমন বিচিত্র ঝড় আর কখনও দেখিনি! কিন্তু বোম্বেটেদের জাহাজাখানা কোথায় গেল?

বিমল বললে, ওখানকার অন্ধকার ভেদ করে কিছুই দেখবার উপায় নেই! তবে মানুষের গোলমাল শুনে বোধ হচ্ছে, ঝড়ের সঙ্গে-সঙ্গে সে-ও কোথায় ছুটে চলেছে, হয়তো সমুদ্র এখনি তাকে গিলে ফেলবে!

রামহরি সানন্দে বললে, জয় বাবা পবনদেব! আজ তুমিই আমাদের সহায়!

খানিকক্ষণ পরেই চারিদিক আবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শূন্যে নেই অন্ধ মেঘের কালিমা, সমুদ্রে নেই বিভীষণের তাণ্ডবলীলা। একটু আগে কিছুই যেন হয়নি, এমনিভাবেই মুখর নীলসাগর আবার বোবা নীলাকাশের কাছে আদিম যুগের জীবহীনা ধরিত্রীর পুরাতন গল্প-বলা শুরু করলে।

সূর্য সাগর-স্নানে নেমে অদৃশ্য হল, কিন্তু আকাশ আর পৃথিবীতে এখনও আলো যেন ধরছে না! দূর থেকে আঁকে-ঝকে সামুদ্রিক পাখি ফিরে আসছে দ্বীপের দিকে।

পাহাড়ের ওপরে বসে সবাই বিশ্রাম করছিল। সেখান থেকে দ্বীপটিকে দেখাচ্ছে চমৎকার পরিস্থানের মতো। নানা জাতের গাছেরা সেখানে সংগীতময় সবুজ উৎসবে মেতে আছে এবং তাদের মধ্যে বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে পাম-জাতীয় গাছেরাই।

কোথাও পাহাড়ের আনন্দাশ্রুধারার মতো ঝরে পড়ছে ঠিক যেন একটি খেলাঘরের ঝরনা। রূপালি ফিতার মতো তার শীর্ণ ধারা সকৌতুকে পাথরে-পাথরে নাচতে নাচতে নেমে এসেছে নীচেকার সুন্দরশ্যাম জমির ওপরে–যেখানে শ্যামলতাকে সচিত্র করে তুলেছে রং-বেরঙের পুঞ্জ পুঞ্জ ফুলের দল। খানিক পরেই রাত হবে, তারার সভায় উঁদ হাসবে, আর নতুন জ্যোৎস্নার ঝলমলে আলো মেঘে স্বপ্নবালারা আসবে যেন সেই ফুলের ঘাস-গালিচার ওপরে বসে ঝরনার কলগান শুনতে!

বিমল এইসব দেখতে-দেখতে একটি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললে, শহর আর সভ্যতা ছেড়ে পৃথিবীর যেখানেই যাই সেখানেই দেখি, রেখায়-রেখায় লেখা আছে সৌন্দর্যের কবিতা। শহরে বসে হাজার টাকা খরচ করে যতই ড্রয়িং রুম সাজাও, কখনওই জাগবে না সেখানে রূপের এমন ঐশ্বর্য, লাবণ্যের এত ছন্দ! শহরে বসে আমরা যা করি তা হচ্ছে আসল সৌন্দর্যের ক্যারিকেচার মাত্র, কাগজের ফুলের মতোই অসার! তাই তো আমি যখন-তখন কুৎসিত শহর আর কপট সভ্যতাকে পেছনে ফেলে ছুটে যেতে চাই সৌন্দর্যময় অজানা বিজনতার ভেতরে। রামহরি জানে, আমরা দুরন্ত ডানপিটে, খুঁজি খালি অ্যাডভেঞ্চার। কিন্তু তুমি জানো কুমার, এ কথা সত্য নয়! চোখের সামনে রয়েছে এই যে অপরূপের নাট্যশালা, আমাদের কল্পনা কি এখানে অভিনয় করতে ভালোবাসে না? আমরা কি কেবল ঘুষোঘুষি করতে আর বন্দুক ছুঁড়তেই জানি, কবিতা পড়তে পারি না?

কুমার বললে, আমার কি মনে হচ্ছে জানো বিমল? ওই ফুলের বনে, ওই ঝরনার ধারে একখানি পাতার কুঁড়েঘর গড়ে সত্যিকার কবিতার জীবনযাপন করি! চারিদিকে বনের গান, পাখির তান, বাতাসের ঝঙ্কার, মৌমাছির গুঞ্জন, ফুলের সঙ্গে প্রজাপতির রঙের খেলা, দিনে মাঠে-মাঠে রোদের কাঁচা সোনা, রাতে গাছে-গাছে চাঁদনির ঝিলিমিলি, আর এরই মধ্য থেকে সর্বক্ষণ শোনা যায় অনন্ত সমুদ্রের মুখে মহাকাব্যের আবৃত্তি! কলকাতার পায়রার খোপে। আর আমার ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছে না।

জয়ন্ত বললে, পৃথিবীকে আমার যখন বড় ভালো লাগে তখন আমি চাই বাঁশি বাজাতে! কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এখন আমার সঙ্গে আছে বাঁশির বদলে বন্দুক। বন্দুকের নল থেকে তো। গান বেরোয় না, বেরোয় কেবল বিষম ধমক।

মানিক বললে, কেন জয়ন্ত, খুশি হলেই তো তুমি আর একটি জিনিস ব্যবহার করো! নস্যির ডিবেটাও কি তুমি সঙ্গে আননি?

জয়ন্ত বললে, হ্যাঁ, মানিক, নস্যির ডিবেটা আমার পকেটেই আছে। কিন্তু কবিতা কোনওদিন ডিবের ভেতরে নস্যির সঙ্গে বাস করে না। আজ আমাদের সামনে দেখছি যে। মূর্তিমান সংগীতকে, তার নাচের ছন্দ জাগতে পারে কেবল আমার বাঁশির মধ্যেই।

সুন্দরবাবু ধীরে-ধীরে অনেক কষ্টে দোদুল্যমান ভূঁড়ির বিদ্রোহিতাকে আমলে না এনেই পাহাড়ের ওপরে উঠে এসেছিলেন। কিন্তু বন্ধুদের কবিত্ব-চর্চা, আর তিনি বরদাস্ত করতে পারলেন না, বিরক্ত স্বরে বললেন, হুম! পাহাড় থেকে ঝরনা ঝরছে, বাতাসের ধাক্কা খেয়ে গাছগুলো নড়ে-চড়ে শব্দ করছে, কতগুলো পাখি চাঁ-া করে চাঁচাচ্ছে, আর মাঠে ঘাস গজাচ্ছে, এসব নিয়ে এত বড়-বড় কথার কিছু মানে হয় না। চল হে রামহরি, আমরা সরে পড়ি।

জয়ন্ত হাসতে-হাসতে বললে, কিন্তু যাবেন কোথায়? জাহাজে?

না। গরমে ছুটোছুটি করে শরীরটা কেমন এলিয়ে পড়েছে। এখানকার পাহাড়ের তলায় সমুদ্রের ঠান্ডা জলে বেশি ঢেউ নেই দেখছি। একটু সমুদ্র-স্নান করবার ইচ্ছে হয়েছে। রামহরি, কি বলো?

রামহরি বললে, বেশ তো, চলুন না! আমিও একবার চান করে নিই-গে। আয় রে বাঘা!

কিন্তু তোমার বাঘাকে আগে-আগে যেতে বলো রামহরি, নইলে ও আবার হয়তো আমার পা শুঁকতে আসবে!

রামহরি বললে, বাঘা, সাবধান! আবার যেন আমাদের সুন্দরবাবুর সঙ্গে গায়ে পড়ে ভাব করতে যেও না! যাও, এগিয়ে যাও।

বাঘার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল না যে, সুন্দরবাবুর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাবার জন্যে তার মনে আর কিছুমাত্র বাসনা আছে। কিন্তু সে রামহরির কথা বুঝে ল্যাজ উঁচু করে আগের দিকে দিলে লম্বা এক দৌড়।

রামহরির সঙ্গে সুন্দরবাবু যখন পাহাড় থেকে নেমে জলের ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন আকাশের আলো তার উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলছে ধীরে-ধীরে।

রামহরি বললে, শিগগির দুটো ডুব দিয়ে নিন, আলো থাকতে থাকতেই আমাদের আবার জাহাজে গিয়ে উঠতে হবে।

কিছু ভয় নেই রামহরি, আজ পূর্ণিমা। আজ অন্ধকার জব্দ!

ওই শুনুন, কু দিয়ে জাহাজ আমাদের ডাকছে। ওই দেখুন, পাহাড়ের ওপর থেকে ওঁরা সবাই নেমে আসছেন!

সুন্দরবাবু জলের ভেতরে ঝাঁপিয়ে পড়ে একটি সুদীর্ঘ আঃ উচ্চারণ করলেন। তারপর বললেন, বাঃ, তোমাদের বাঘা দেখছি যে দিব্যি সাঁতার কাটছে! আমিও একটু সাঁতার দিয়ে নি। কি চমৎকার ঠান্ডা জল! দেহ যেন জুড়িয়ে গেল!

জল কেবল ঠান্ডা নয়, নীলিমা-মাখানো সুন্দর, স্বচ্ছ। তলাকার প্রত্যেক বালুকণাটি পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে–এখানকার জলের মধ্যে কোনওই অজানা রহস্য নেই। কাজেই সুন্দরবাবু মনের সুখে নির্ভয়ে সাঁতার কাটতে লাগলেন।

দূর থেকে মানিক চিৎকার করে বললে, উঠে আসুন সুন্দরবাবু, অত আর সাঁতার কাটতে হবে না। এখানকার সমুদ্রে হাঙর আছে!

সুন্দরবাবু আঁতকে উঠে বললেন, হুম, কি বললে? হাঙর? তাই তো হে, একথা তো এতক্ষণ মনে হয়নি! বাব্বাঃ! দরকার নেই আমার সাঁতার কেটে! তিনি তীরের দিকে ফিরলেন এবং সঙ্গে-সঙ্গেই অনুভব করলেন জলের ভিতর থেকে প্রাণপণে কে তার কোমর জড়িয়ে ধরলে!

ওরে বাবা রে, হুম-হুম! হাঙর, হাঙর! জয়ন্ত, মানিক, রামহরি! আমাকে হাঙরে ধরেছে হু-হু-হুঁ-হুঁ-হুম!

রামহরি একটু তফাতে ছিল। কিন্তু সেইখান থেকেই সে স্তম্ভিত চোখে বেশ দেখতে পেল যে, সুন্দরবাবুর দেহের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে রয়েছে, সুদীর্ঘ একটা ছায়ামূর্তি!

সুন্দরবাবু পরিত্রাহি চিৎকার করে বললেন, বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও! হাঙর নয়, এ যে একটা মানুষ! এ যে মড়া! ওরে বাবা, এ যে ভূত! এ যে আমাকে জলের ভেতরে টানছে–ও জয়ন্ত, ও মানিক!

বিমল, কুমার, জয়ন্ত ও মানিক তিরের মতো পাহাড় থেকে নেমে এল। ভূতের নামে রামহরি একবার শিউরে উঠল বটে, কিন্তু তখনি সে দুর্বলতা সামলে নিয়ে বেগে সাঁতার কেটে সুন্দরবাবুর দিকে অগ্রসর হল। কিন্তু সর্বাগ্রে সুন্দরবাবুর কাছে গিয়ে পড়ল বাঘা– তার দুই চক্ষু জ্বলছে তখন তীব্র উত্তেজনায়!

আর পারছি না, একটা জ্যান্ত মড়া আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বাঁচাও!

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান