রহস্য-রোমাঞ্চ সমগ্র » অমৃত-দ্বীপ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ২৫, ২০২০; ১৬:৪১
সম্পাদনাঅক্টোবর ২৫, ২০২০, ১৬:৪৩
দৃষ্টিপাত
প্রথম পরিচ্ছেদ : শত্রুর ওপরে শত্রু জাহাজ ভেসেছে নীল জলে। এ জাহাজ একেবারেই তাদের নিজস্ব। অমৃত-দ্বীপে যাওয়ার সমস্ত জলপথটাই তাদের ম্যাপে আঁকা ছিল। সেই ম্যাপ দেখেই বোঝা যায়, কোনও বাণিজ্য-তরী বা যাত্রী-জাহাজই ও-দ্বীপে গিয়ে লাগে না, চার্টে ও-দ্বীপের কোনও উল্লেখই নেই। কাজেই বিমল ও কুমারের প্রস্তাবে একখানা গোটা জাহাজই চার্টার ...

প্রথম পরিচ্ছেদ : শত্রুর ওপরে শত্রু

জাহাজ ভেসেছে নীল জলে। এ জাহাজ একেবারেই তাদের নিজস্ব। অমৃত-দ্বীপে যাওয়ার সমস্ত জলপথটাই তাদের ম্যাপে আঁকা ছিল। সেই ম্যাপ দেখেই বোঝা যায়, কোনও বাণিজ্য-তরী বা যাত্রী-জাহাজই ও-দ্বীপে গিয়ে লাগে না, চার্টে ও-দ্বীপের কোনও উল্লেখই নেই।

কাজেই বিমল ও কুমারের প্রস্তাবে একখানা গোটা জাহাজই চার্টার বা ভাড়া করা হয়েছে। এটাও তাদের পক্ষে নতুন নয়। কারণ এইরকম একখানা গোটা জাহাজ ভাড়া করেই তারা আর একবার লিস্ট আটলান্টিস্-কে পুনরাবিষ্কার করেছিল। (নীলসায়রের অচিন পুরে নামক উপন্যাস দ্রষ্টব্য।)।

জয়ন্ত, মানিক ও সুন্দরবাবুর এ অভিযানে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না। বিমল ও কুমার একরকম জোর করেই তাদের সঙ্গে টেনে এনেছে।

কাজে কাজেই তাদের পুরাতন ভৃত্য ও দস্তুরমতো অভিভাবক রামহরিও যথেষ্ট বিরক্তি প্রকাশ করেও অন্যান্য বারের মতো এবারেও শেষপর্যন্ত সঙ্গ নিতে ছাড়েনি।

এবং এমন ক্ষেত্রে তাদের চির-অনুগত চতুষ্পদ যোদ্ধা বাঘাও যে সঙ্গে-সঙ্গে লাঙুল আস্ফালন করে আসতে ছাড়বে না, সেকথা বলাই বাহুল্য।

তাদের পুরাতন দলের মধ্যে কেবল বিনয়বাবু আর কমলকে এবারে সঙ্গীরূপে পাওয়া গেল না। বিনয়বাবু এখন ম্যালেরিয়ার তাড়নায় কুইনিন ও আদার কুচির সদ্ব্যবহারে ব্যস্ত এবং কমল দেবে এবার মেডিকেল কলেজের শেষ পরীক্ষা।

জাহাজখানির নাম লিটল ম্যাজেস্টিক। আকারে ছোট হলেও যাত্রীদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যে এর মধ্যে চমৎকার সাজানো-গোছানো লাউঞ্জ ডাইনিং সেলুন, প্রমেনেড ডেক ও পাম কোট প্রভৃতিরও অভাব ছিল না। এরকম জাহাজ চার্টার করা বহুব্যয়সাধ্য বটে, কিন্তু বিমল ও কুমার যে অত্যন্ত ধনবান একথা সকলেই জানেন। তার ওপরে জয়ন্তও বিনা পয়সার অতিথি হতে রাজি হয়নি এবং সে-ও রীতিমতো ধনী ব্যক্তি।

জাহাজ তখন টুংহাই বা পূর্বসাগর প্রায় পার হয়ে রিউ-কিউ দ্বীপপুঞ্জের কাছ দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

ওপরে, নীচে চারিদিকে ছড়িয়ে আছে কেবল অনন্ত নীলিমা কাছে চঞ্চল, দূরে প্রশান্ত।

এই নীলিমার জগতে এখন নতুন বর্ণ সৃষ্টি করছে নিম্নে শুধু শুভ্র ফেনার মালা এবং শুন্যে শুভ্র সাগর-বিহঙ্গের দল। প্রকৃতির রঙের ডালায় এখন আর কোনও রং নেই।

প্রাকৃতিক সংগীতেও এখানে নব-নব রাগিণীর ঝংকার নেই। না আছে উচ্ছ্বসিত শ্যামলতার মর্মর, না আছে গীতকারী পাখিদের সুরের খেলা, বইছে কেবল হু-হু শব্দে বাতাস এবং জাগছে কেবল আদিম সাগরের উচ্ছল কলকল মন্ত্র–এ দুই ধ্বনির সৃষ্টি পৃথিবীর প্রথম যুগে, যখন সবুজ গাছ আর গানের পাখির জন্মই হয়নি।

খোলা ‘প্রমেনেড ডেকে’-র ওপরে পায়চারি করতে করতে মানিক বলল, আমাদের সমুদ্র যাত্রা শেষ হতে আরও কত দেরি বিমলবাবু?

বিমল বললে, আর বেশি দেরি নেই। চার ভাগ পথের তিন ভাগই আমরা পার হয়ে এসেছি। ম্যাপখানা আমার মুখস্থ হয়ে গেছে। আরও কিছু দূর এগুলেই বোনি দ্বীপপুঞ্জের কাছে গিয়ে পড়ব। তাদের বাঁয়ে রেখে আমাদের অগ্রসর হতে হবে প্রায় পূর্ব-দক্ষিণ দিকে। তারপরই অমৃত-দ্বীপ।

মানিক বললে, দ্বীপটি নিশ্চয়ই বড় নয়। কারণ তাহলে নাবিকদের চার্টে তার উল্লেখ থাকত। এখানকার সমুদ্রে এমন অজানা ছোট-ছোট দ্বীপ দেখছি তো অসংখ্য। অমৃত-দ্বীপকে আপনি চিনবেন কেমন করে?

ম্যাপে অমৃত-দ্বীপের ছোট্ট একটা নকশা আছে, আপনি কি ভালো করে দেখেননি? সে দ্বীপের প্রথম বিশেষত্ব হচ্ছে, তার চারিপাশই পাহাড় দিয়ে ঘেরা পাহাড় কোথাও কোথাও দেড়-দুই হাজার ফুট উঁচু। তার দ্বিতীয় বিশেষত্ব, দ্বীপের ঠিক উত্তর-পশ্চিম কোণে পাহাড়ের ওপরে আছে ঠিক পাশাপাশি পাঁচটি শিখর। সবচেয়ে উঁচু শিখরের উচ্চতা দুই হাজার তিনশো ফুট। এরকম দ্বীপ দূর থেকে দেখলেও চেনা শক্ত হবে না। বলেই ফিরে দাঁড়িয়ে বিমল চোখে দুরবিন লাগিয়ে সমুদ্রের পশ্চিম দিকে তাকিয়ে কি দেখতে লাগল।

সুন্দরবাবু বললেন, হুম! আচ্ছা বিমলবাবু, আমরা যাচ্ছি তো পূর্বদিকে! অথচ আজ কদিন ধরেই লক্ষ করছি, আপনি যখন-তখন চোখে দূরবিন লাগিয়ে পশ্চিম দিকে কি যেন দেখবার চেষ্টা করছেন। এর মানে কী?

জয়ন্ত এতক্ষণ পরে মুখ খুলে বললে, এর মানে আমি আপনাকে বলতে পারি। বিমলবাবু দেখছেন আমাদের পেছনে কোনও শত্রুজাহাজ আসছে কি না!

এখানে আবার শত্রু আসবে কে?

কেন, কলকাতাকে যারা ড্রাগনের দুঃস্বপ্ন দেখিয়েছিল, আপনি এরই মধ্যে তাদের কথা ভুলে গেলেন নাকি?

কী যে বলো তার ঠিক নেই! সে দল তো ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে!

কেমন করে জানলেন?

পালের গোদা কুপোকাত হলে দল কি আর থাকে?

দূরবিন নামিয়ে বিমল বললে, আমার বিশ্বাস অন্য রকম। সে দলের প্রত্যেক লোকই মরিয়া, তারা সকলেই অমৃত-দ্বীপে যাওয়ার জন্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু ও-দ্বীপের ঠিকানা তারা জানে না, কারণ ম্যাপখানা আছে আমাদের হাতে। আমরা যে তাদের দেশের কাছ দিয়ে অমৃত দ্বীপে যাত্রা করেছি, নিশ্চয়ই এ-সন্ধান তারা রাখে। যারা লাউ-জুর মূর্তি আর ওই ম্যাপের লোভে সুদূর চিন থেকে বাংলাদেশে হানা দিতে পেরেছিল তারা যে আর একবার শেষচেষ্টা করে দেখবে না, একথা আমার মনে হয় না।

সুন্দরবাবু বললেন, হুম, শেষচেষ্টা মানে? আপনি কি বলতে চান, তাহলে জাহাজের সঙ্গে আমাদের জলযুদ্ধ হবে?

আশ্চর্য নয়।

সুন্দরবাবু বিস্ফারিত চক্ষে ও উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, আশ্চর্য নয় মানে? জলযুদ্ধ অমনি হলেই হল? আমাদের সেপাই কোথায়? কামান কোথায়? আমরা ঘুসি ছুঁড়ে লড়াই করব নাকি?

কুমার হেসে বললে, কামান নাই বা রইল, আমাদের সকলেরই হাতে আছে অটোমেটিক বন্দুক। আর আমাদের সেপাই হচ্ছি আমরাই।

সুন্দরবাবু অধিকতর উত্তেজিত হয়ে আরও কি বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু হঠাৎ বিকট স্বরে হুম শব্দ করে মস্ত এক লাফ মেরে পাঁচ হাত তফাতে গিয়ে পড়লেন।

মানিক বললে, কী হল সুন্দরবাবু, কী হল? আপনার হুঁড়িটা কি ফট করে ফেটে গেল?

সুন্দরবাবু ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন, যাও, যাও! দেখতে যেন পাওনি, আবার ন্যাকামি করা হচ্ছে! কুমারবাবু, আপনার ওই হতচ্ছাড়া কুকুরটাকে এবার থেকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখবেন। আমাকে দেখলেই ও-বেটা কোত্থেকে ছুটে এসে ফেঁশ করে আমার পায়ের ওপরে নিশ্বাস ফেলে কি শোকে, বলতে পারেন মশাই?

মানিক বললে, আপনার পাদপদ্মের গন্ধ বাঘার বোধহয় ভালো লাগে।

ইয়ার্কি কোরো না মানিক, তোমার ইয়ার্কি বাঘার ব্যবহারের চেয়েও অভদ্র। ওই নেড়ে কুত্তাটাকে আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারব না, চললুম আমি এখান থেকে।

সুন্দরবাবু লম্বা-লম্বা পা ফেলে অদৃশ্য হলেন, বাঘা বিলক্ষণ অপ্রতিভভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। এ-লোকটি যে তাকে দু-চোখে দেখতে পারে না, এটা সে খুবই বোঝে। তাই বাঘার কৌতূহল হয়, সুন্দরবাবুকে কাছে পেলেই সে তার পা শুঁকে দেখে। মানুষের চরিত্র পরীক্ষা করবার এর চেয়ে ভদ্র উপায় পৃথিবীর কোনও কুকুরই জানে না।

*

পরদিন প্রভাতে ব্রেকফাস্টে-র পর বিমল ও কুমার জাহাজের ডেকে উঠে গেল। জয়ন্ত লেবলাঁকের লেখা একখানা ডিটেকটিভ উপন্যাস নিয়ে লাউঞ্জে গিয়ে আরাম করে বসল, মানিকও তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলে।

সুন্দরবাবু বিরক্তি ভরে বললেন, জাহাজে উঠে পর্যন্ত দেখছি, বিমলবাবু আর কুমারবাবু অদৃশ্য শত্রুর কাল্পনিক ছায়া দেখবার জন্যে ব্যতিব্যস্ত, আর তোমরা গাঁজাখুরি ডিটেকটিভের গল্প নিয়েই বিভোর! কারুর সঙ্গে দুটো প্রাণের কথা বলবার ফাঁক নেই!

জয়ন্ত জবাব দিলে না। মানিক বললে, আচ্ছা, এই রইল আমার বই! এখন প্রকাশ করুন আপনার প্রাণের কথা।

সুন্দরবাবু নিম্নস্বরে বললেন, কথাটা কি জানো? এই অমৃত-দ্বীপ, অমর-লতা, জলে স্থলে-শূন্যে চিরজীবী মানুষের অবাধ গতি, এসব কি তুমি বিশ্বাস করো ভায়া?

আমার কথা ছেড়ে দিন। আগে বলুন, আপনার কি মত?

হুম, আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে! বিমল আর কুমারবাবুর মাথায় তোমাদেরও চেয়ে বোধহয় বেশি ছিট আছে!–বলেই সুন্দরবাবু ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ত্যাগ করলেন।

হঠাৎ অমন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কেন?

কি জানো ভায়া, প্রথমটা আমার কিঞ্চিৎ লোভ হয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে, সবই ভুয়ো! যা নয় তাই!

কীসের লোভ সুন্দরবাবু?

ওই অমর-লতার লোভ আর কি! ভেবেছিলুম দু-একটা অমৃত-ফল খেয়ে যমকে কলা দেখাব। কিন্তু এখন যতই ভেবে দেখছি ততই হতাশ হয়ে পড়ছি। আমরা ছুটেছি মরীচিৎকার। পেছনে, কেবল কাদা ঘেঁটেই ফিরে আসতে হবে।

তাহলে আপনি কেবল অমর হওয়ার লোভেই বিমলবাবুদের অতিথি হয়েছেন?

না বলি আর কেমন করে? অমর হতে কে না চায়?

অমর হওয়ার বিপদ কত জানেন?

বিপদ।

হ্যাঁ। দু-একটার কথা বলি শুনুন। ধরুন, আপনি অমর হয়েছেন। তারপর কুমারবাবুর কুকুর বাঘা হঠাৎ পাগলা হয়ে গিয়ে আপনাকে কামড়ে দিল। তখন কি হবে?

হুম, কি আবার হবে? আমি হাইড্রোফোবিয়া রোগের চিকিৎসা করাব!

চিকিৎসায় রোগ যদি না সারে, তাহলে? আপনি অমর, সুতরাং মরবেন না। কিন্তু সারাজীবন–অর্থাৎ অনন্তকাল আপনাকে ওই বিষম রোগের যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। অর্থাৎ সারাজীবন চেঁচিয়ে মরতে হবে পাগলা কুকুরের মতন ঘেউ-ঘেউ করে!

তাই তো হে, এসব কথা তো আমি ভেবে দেখিনি!

তারপর শুনুন। আপনি অমর হলেও আপনার দেহ বোধকরি অস্ত্রে অকাট্য হবে না। কেউ যদি খাঁড়া দিয়ে আপনার গলায় এক কোপ বসিয়ে দেয়, তাহলে কি মুশকিল হতে পারে ভেবে দেখেছেন কি? আপনি অমর। অতএব হয় আপনার মুণ্ড, নয় আপনার দেহ, নয়তো ও-দুটোই চিরকাল বেঁচে থাকবে। কিন্তু সেই কন্ধকাটা দেহ আর দেহহীন মুণ্ড নিয়ে আপনি অমরতার কি সুখ ভোগ করবেন?

মানিক, তুমি কি ঠাট্টা করছ?

মোটেই নয়। অমর হওয়ার আরও সব বিপদের কথা শুনতে চান?

না, শুনতে চাই না। তুমি বড্ড মন খারাপ করে দাও। অমৃত-ফল পেলেও আমি আর খেতে পারব কিনা সন্দেহ।

জয়ন্ত এতক্ষণ কেতাবের আড়ালে মুখ লুকিয়ে হাসছিল। এখন কেতাব সরিয়ে বলল, সুন্দরবাবু, অমৃত-দ্বীপের কথা হয়তো রূপকথা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু আজকের শুকনো বৈজ্ঞানিক জগতে সরস রূপকথার বড়ই অভাব হয়েছে। সেই অভাব পূরণের কৌতূহলেই আমরা বেরিয়েছি অমৃত-দ্বীপের সন্ধানে। সুতরাং অমর-লতা না পেলেও আমরা দুঃখিত হব না। অন্তত যে-কদিন পারি রূপকথার রঙিন কল্পনায় মনকে স্নিগ্ধ করে তোলবার অবকাশ তো পাব। আর ওরই মধ্যে থাকবে যেটুকু অ্যাডভেঞ্চার, সেটুকুকে মস্ত লাভ বলেই মনে করব!

এমন সময়ে একজন নাবিক এসে খবর দিল, বিমল সবাইকে এখনি ডেকের ওপরে যেতে বলেছে।

সকলে ওপরে গিয়ে দেখলে, ডেকের রেলিংয়ের ওপরে ঝুঁকে বিমল দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার চোখে দূরবিন।

জয়ন্ত জিজ্ঞাসা করলে, বিমলবাবু কি আমাদের ডেকেছেন?

বিমল ফিরে বললে, হ্যাঁ জয়ন্তবাবু! পশ্চিম দিকে তাকিয়ে দেখুন।

পশ্চিম দিকে চেয়েই জয়ন্ত দেখতে পেলে, একখানা জাহাজ তাদের দিকে বেগে এগিয়ে আসছে।

বিমল বললে, আমি খুব ভোরবেলা থেকেই ও-জাহাজখানাকে লক্ষ করছি। প্রথমটা ওর ওপরে আমার সন্দেহ হয়নি। কিন্তু তারপরে বেশ বুঝলুম, ও আসছে আমাদেরই পেছনে। জানেন তো, এখানকার সমুদ্রে চিনে-বোম্বেটেদের কীরকম উৎপাত! খুব সম্ভব, আমাদের শত্রুরা কোনও বোম্বেটে জাহাজের আশ্রয় নিয়েছে। দূরবিন দিয়ে দেখা যাচ্ছে, ও-জাহাজখানায় লোক আছে অনেক–আর অনেকেরই হাতে রয়েছে বন্দুক। আমাদের কাপ্তেন-সায়েবের সঙ্গে আমি আর কুমার পরামর্শ করেছি। কাপ্তেন বললেন, জলে ওরা আক্রমণ করলে আমাদের পক্ষে আত্মরক্ষা করা সহজ হবে না।

তাহলে উপায়?

দক্ষিণ দিকে তাকিয়ে দেখুন।

দক্ষিণ দিকে মাইল দুয়েক তফাতে রয়েছে ছোট্ট একটি তরুশ্যামল দ্বীপ।

আমরা আপাতত ওই দ্বীপের দিকেই যাচ্ছি। আশাকরি শত্রুদের জাহাজ আক্রমণ করবার আগেই আমরা ওই দ্বীপে গিয়ে নামতে পারব। তারপর পায়ের তলায় থাকে যদি মাটি, আর একটা যুতসই স্থান যদি নির্বাচন করতে পারি, তাহলে এক হাজার শত্রুকেও আমি ভয় করি না। আপনার কি মত?

জয়ন্ত বললে, বিমলবাবু, এ অভিযানের নায়ক হচ্ছেন আপনি। আমরা আপনার সহচর মাত্র। আপনার মতই আমাদের মত।

সুন্দরবাবু নীরস স্বরে বললেন, তাহলে সত্যি-সত্যিই আমাদের যুদ্ধ করতে হবে?

কুমার বললে, তা ছাড়া আর উপায় কি? বিনা যুদ্ধে ওরা আমাদের মুক্তি দেবে বলে বোধহয় না। তবে আশার কথা এই যে, আমরা ওদের আগেই ডাঙায় গিয়ে নামতে পারব।

সুন্দরবাবু বিষণ্ণভাবে বললেন, এরমধ্যে আশা করবার মতো কিছুই আমি দেখতে পাচ্ছি না। ওই চিনে বোম্বেটে-বেটারাও তো দলে-দলে ডাঙায় গিয়ে নামবে?

ভুলে যাবেন না, আমরা থাকব ডাঙায়, গাছপালা বা ঢিপিঢ়পা বা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে। আমাদের এই অটোমেটিক বন্দুকগুলোর সুমুখ দিয়েই নৌকোয় করে ওদের ডাঙার ওপরে উঠতে হবে। আমাদের এক-একটা অটোমেটিক বন্দুক প্রতি মিনিটে কতগুলি বৃষ্টি করতে পারে জানেন তো? সাতশো! আধুনিক বিজ্ঞানের অদ্ভুত মারণাস্ত্র!

সুন্দরবাবু ভয়ে-ভয়ে বললেন, কিন্তু এভাবে মানুষ খুন করে শেষটা আইনের পাকে আমাদেরও বিপদে পড়তে হবে না তো?

কুমার হেসে বললে, সুন্দরবাবু, এ জায়গা হচ্ছে অরাজক। এই বোম্বেটেদের জল-রাজ্যে একমাত্র আইন হচ্ছে–হয় মারো, নয় মরো।

সুন্দরবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, হুম্!

বিমল তখন আবার চোখে দুরবিন লাগিয়ে শত্রু-জাহাজের গতিবিধ লক্ষ করছিল। কিন্তু সে জাহাজ তখন এত কাছে এসে পড়েছে যে আর দূরবিনের দরকার হয় না। খালি চোখেই বেশ দেখা যাচ্ছে, তার ডেকের ওপরে দলে-দলে চিনেম্যান ব্যস্ত, উত্তেজিতভাবে এদিকে-ওদিকে আনাগোনা বা ছুটোছুটি করছে!

হঠাৎ বিমল দূরবিন নামিয়ে আবার ফিরে দাঁড়াল। তার মুখ বিবর্ণ, দৃষ্টি ভয়চকিত।

বিমলের মুখেচোখে ভয়ের চিহ্ন! এটা কি অসম্ভব! কুমার রীতিমতো অবাক হয়ে গেল।

জয়ন্ত বিস্মিত স্বরে বললে, কি হল বিমলবাবু, আপনার মুখচোখ অমনধারা কেন?

বিমল দূরবিনটা জয়ন্তের হাতে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বললে, শত্রু-জাহাজের পিছনে চেয়ে দেখুন, বোম্বেটেদেরও চেয়ে ভয়াবহ এক শত্রু আমাদের গ্রাস করতে আসছে! আমি এখন ব্রিজের ওপরে কাপ্তেনের কাছে চললুম, আরও তাড়াতাড়ি ওই দ্বীপে গিয়ে উঠতে না পারলে আর রক্ষা নেই!

সুন্দরবাবু আঁতকে উঠে বললেন, বোম্বেটেরও চেয়ে ভয়াবহ শত্রু? ও বাবা, বলেন কি?

হ্যাঁ, হা, সুন্দরবাবু! এমন আর-এক শত্রু আমাদের আক্রমণ করতে আসছে, যার নামে ভয়ে কঁপে সারা দুনিয়া! তার সামনে আমাদের অটোমেটিক বন্দুকও কোনও কাজে লাগবে না!

এই বলেই বিমল জাহাজের বিজে-র দিকে ছুটল দ্রুতপদে।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান