আবদুল্লাহ » আবদুল্লাহ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৬, ২০২০; ১৯:০৬
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৬, ২০২০, ১৯:০৬
দৃষ্টিপাত

‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসটি নিয়ে লেখা শুরু করার পূর্বে এর স্রষ্টা কাজী ইমদাদুল হককে নিয়ে একটু লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬) ছিলেন একাধারে লেখক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও সর্বোপরি একজন চিন্তাবিদ। সমাজের বিভিন্ন দিক তিনি তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখতেন। পেশাগত কারণে সমাজিক সমস্যাগুলো তিনি কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন এবং সেগুলো তাঁর লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য লেখাটি হল- তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘আবদুল্লাহ’।

১৯১৮ সালের কোনো এক সময়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় ইমদাদুল হকের মানসপটে এই উপন্যাসের ছককাটা শুরু হয়। সে বছরই মুসলিম ভারত পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে উপন্যাসটি প্রকাশিত হতে শুরু হয়। প্রায় দেড় বছর কাল সময় ধরে মুসলিম ভারত পত্রিকায় এই উপন্যাসটির ৩০টি পরিচ্ছেদ প্রকাশিত হয়। এরপর আকস্মিকভাবে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপন্যাসটিও অসমাপ্ত থেকে যায়। তাছাড়া কাজী ইমদাদুল হক তখন কঠিন রোগাক্রান্ত। তিনি উপন্যাসটির খসড়া পরিকল্পনা লিখে রেখেছিলেন কিন্তু অসুস্থতার কারণে সম্পন্ন করতে পারেননি। ১৯২৬ সালে লেখক মৃত্যুবরণ করলে তাঁর সেই খসড়া অবলম্বনে তাঁর বন্ধু কাজী আনারুল কাদির আবদুল্লাহর অবশিষ্ট এগারো পরিচ্ছেদ সম্পন্ন করেন।

এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাঙালি মুসলমান সমাজে যেসব কুসংস্কার, গোঁড়ামি ও অজ্ঞতা মহামারী আকার ধারণ করেছিল, কাজী ইমদাদুল হক উপন্যাসটিতে তারই সুনিপুণ চিত্রায়ন করেছেন। উপন্যাসটির মূল চরিত্র আবদুল্লাহর মধ্য দিয়ে একজন প্রতিবাদী যুবকের অবয়ব ফুটিয়ে তুলেছেন, যে কিনা পীর বংশের ছেলে হয়েও কুসংস্কারমুক্ত ছিল। সে বুঝতে পেরেছিল কেবল মাদ্রাসা শিক্ষায় মুসলমানদের দুরবস্থা মিটবে না। যুগের প্রয়োজন অনুসারে মুসলমানদেরকে ইংরেজি শিক্ষায় পারদর্শী হতে হবে।

হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদে আবদুল্লাহ বিশ্বাসী নয়। সে যখন এক স্কুল থেকে বদলি হয়ে অন্য স্কুলে যাচ্ছিলো, তখন তার ছাত্রদের বিদায়কালে বলেছিল- “আর্শীবাদ করি, তোমরা মানুষ হও, প্রকৃত মানুষ হও- যে মানুষ হলে পরস্পর পরস্পরকে ঘৃণা করতে ভুলে যায়, হিন্দু মুসলমানকে মুসলমান হিন্দুকে আপনার জন বলে মনে করে।” এ উক্তি থেকে বুঝা যায়, তৎকালীন সাম্প্রদায়িক সমাজে আবদুল্লাহর মত উদারমনা মানুষ কতটা প্রয়োজন ছিল।

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে নারীদের কঠিন পর্দাপ্রথা মেনে চলতে হতো। তাদেরকে ডাক্তার দেখানো হতো না। উপন্যাসটিতে দেখা যায়, আবদুল্লাহর বোন হালিমার নিউমোনিয়া হলেও শ্বশুরবাড়ি থেকে ডাক্তার দেখাতে চায় না। আবদুল্লাহ ও তার ভগ্নীপতি আবদুল কাদের রীতিমত জোর করে হালিমাকে ডাক্তার দেখায়। হালিমাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাড়ির বাইরে নেয়ার সময়ও বাঁধা আসে। রেল-স্টিমারে চড়লে পর্দার ব্যাঘাত ঘটবে যে! যাই হোক, আবদুল্লাহ ও আবদুল কাদেরের প্রচেষ্টায় হালিমা সুস্থ হয়।

আবদুল্লাহর শ্বশুর সৈয়দ সাহেব একজন ধর্মান্ধ ব্যক্তি। বংশ গরিমার নামে ব্যয়বহুল অর্থহীন আচার অনুষ্ঠান এবং উঁচু-নিচু ভেদাভেদ করাই ছিল তার কাজ। এজন্য মক্তবে পড়তে আসা প্রতিবেশীদের গরিব ছেলেমেয়দেরকে উচ্চ তালিম দিতে হুজুরকে মানা করেন তিনি। আবার, উপন্যাসের এক পর্যায়ে তিনি নিচু বংশজাত ইমামের পেছনে নামায পড়তে অস্বীকৃতি জানান। ধর্মান্ধ একজন ব্যক্তি যখন সাম্যের ধর্ম ইসলামে উঁচু-নিচু ভেদাভেদ করেন, তখন তাকে ভণ্ড ছাড়া আর কী বা বলা যায়!

সৈয়দ সাহেবের ঠিক বিপরীত চরিত্র দেখতে পাওয়া যায় মীর সাহেবের মাঝে। সৈয়দ সাহেব রক্ষণশীলতা এবং মীর সাহেব প্রগতিমুখিতার প্রতীক। সৈয়দ সাহেবের বংশাভিমান এবং ধর্মের নামে অধর্মের বিপরীতে মীর সাহেবের বাস্তববুদ্ধি, মানবিক বোধ ও সংস্কারপন্থা উপন্যাসটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

উপন্যাসটির অসামঞ্জস্যতা নিয়ে একটু বলি। আগেই জানিয়েছি, উপন্যাসটির অবশিষ্ট ১১টি পরিচ্ছেদ কাজী ইমদাদুল হকের মৃত্যুর পর খসড়া অবলম্বনে তাঁর বন্ধু কাজী আনারুল কাদির সম্পন্ন করেন। এর ফলে উপন্যাসটির ধারাবাহিকতা কিছুটা হলেও বিঘ্নিত হয়েছে। হঠাৎ করেই যেন তাড়াহুড়ো করে উপন্যাসটি শেষ করে হয়েছে। কাজী ইমদাদুল হক যদি পুরো উপন্যাসটি শেষ করে যেতে পারতেন, তাহলে হয়তো ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাস হিসেবে আরও সম্পূর্ণ হয়ে উঠতো।

সবশেষে বলা যায়, ‘আবদুল্লাহ’ কাজী ইমদাদুল হকের এক অনবদ্য কীর্তি। তাঁর এ উপন্যাসটি বাঙালি মুসলমান সমাজের স্বরূপ তুলে ধরেছে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আবদুল্লাহ’র প্রশংসা করে বলেছিলেন, “‘আবদুল্লাহ’ বইখানি পড়ে আমি খুশি হয়েছি- বিশেষ কারণ, এই বই থেকে মুসলমানদের ঘরের কথা জানা গেল।” সমাজ সচেতন ও মুক্তমনা পাঠকদের জন্য এটি একটি অবশ্যপাঠ্য উপন্যাস।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান