আবদুল্লাহ » বিশ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০০:৪০
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৪০
দৃষ্টিপাত
বরিহাটী জেলাস্কুলে এতদিন মুসলমান ছাত্রদের কোনো বোর্ডিং ছিল না; আবদুল্লাহ্ এখানে মাস্টার হওয়ার পর অনেক চেষ্টা-চরিত্র করিয়া একটি মুসলমান বোর্ডিং স্থাপন করিতে সক্ষম হইয়াছে এবং নিজেই তাহার সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিযুক্ত হইয়া সেইখানেই বাস করিতেছে। আবদুল কাদের বরিহাটীর জয়েন্ট আপিসে বদলি হইয়া আসা অবধি আবদুল্লাহর ওখানেই রহিয়াছে; এখনো বাসা পায় নাই; কিন্তু ...

বরিহাটী জেলাস্কুলে এতদিন মুসলমান ছাত্রদের কোনো বোর্ডিং ছিল না; আবদুল্লাহ্ এখানে মাস্টার হওয়ার পর অনেক চেষ্টা-চরিত্র করিয়া একটি মুসলমান বোর্ডিং স্থাপন করিতে সক্ষম হইয়াছে এবং নিজেই তাহার সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিযুক্ত হইয়া সেইখানেই বাস করিতেছে। আবদুল কাদের বরিহাটীর জয়েন্ট আপিসে বদলি হইয়া আসা অবধি আবদুল্লাহর ওখানেই রহিয়াছে; এখনো বাসা পায় নাই; কিন্তু স্বতন্ত্র বাসা না করিলে তো চলিবে না। বোর্ডিঙে বাহিরের লোক অধিক দিন রাখা যায় না; সুতরাং আবদুল্লাহ্ এবং আবদুল কাদের উভয়েই বাসা খুঁজিতে লাগিয়া গেল।

বরিহাটীতে মুসলমানপাড়ায় চাপরাসী ও পেয়াদা শ্রেণীর লোকদের কয়েকখানি খড়ো ঘর ছাড়া মুসলমানের আর কোনো বাড়ি ছিল না। সম্প্রতি নাদের আলী বলিয়া একজন সিভিল কোর্টের পেয়াদা নদীর ধারে একটুখানি জমি খরিদ করিয়া ছোটখাটো একটি পাকা বাড়ি তৈয়ার করিতেছিল। নাদের আবদুল্লাহর পিতার মুরীদ ছিল; সুতরাং তাহাকে বলিলে সে নিশ্চয়ই আর কাহাকেও ভাড়া দিবে না। এই মনে করিয়া আবদুল্লাহ নাদের আলীর বাড়িতে গিয়া তাহাকে বিশেষ করিয়া অনুরাধ করিল, যেন বাড়িখানি আর কাহাকেও ভাড়া দেওয়া না হয় এবং কিছু অগ্রিমও দিতে চাহিল।

নাদের আলী কহিল, –না, না হুজুর, আগাম নেব ক্যা? আপনারা ভাড়া নিবেন, তার আবার কথা? বাড়ি আপনাগোরই থাকল; শ্যাষ হতি আরো মাসখানেক লাগবে; আল্লায় করলি ত্যাখন আপনাগোরই ভাড়া দেব।

আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, –তা ভাড়া কত করে নেবে, নাদের আলী?

নাদের কহিল, –আগে শ্যাষ করেই তো নিই, হুজুর, ভাড়ার কথা পাছে।

না, না, আগে থেকেই ওটা ঠিক করে রাখা ভালো। তোমার বাড়ি প্রায় হয়েই রয়েছে; তিন কামরা আর এক বারান্দা–এই তো! তবে ভাড়া ঠিক করতে আর অসুবিধে কী?

নাদের একটুখানি হাসিয়া কহিল, –তা আপনারা যা দেবেন হুজুর, আমি তাই নেব। আপনাগোর সাতে কি আর দর-দস্তুর কত্তি পারি?

তবু তোমার কত হলে পোষাবে, মনে কর!

বাড়ি ভাড়া তো দেখতিইছেন হুজুর–বাবুরা সব বাড়ির জন্যি খাই খাই করে বেড়ায়। ড্যাড়া ড্যাড়া ভাড়া দ্যেও বাড়ি পায় না। তা আপনাগোর কাছে আর বেশি নেব না হুজুর, কুড়ি টাকা করে দেবেন।

নাদের নিতান্ত অন্যায় ভাড়া চাহে নাই বুঝিয়া আবদুল কাদের তাহাতেই রাজি হইয়া গেল। ঠিক হইল যে বাড়ি শেষ হইলে যেদিন আকামত হইবে সেইদিনই আবদুল কাদের বাড়ি দখল করিবেন।

বিদায়ের পূর্বে নাদের আবদুল্লাহকে কহিল, –হুজুর, আকামতের দিন এট্টু মৌলুদ শরীফ পড়াতি চাই, তা আপনি এট্টু দয়া কত্তি হবে…

আবদুল্লাহ কহিল, –কী করতে হবে!

আপনিই এট্টু পড়বেন–আপনাগোর মুখির পড়ায় খোদায় বরকত দেবে।

আবদুল্লাহ্ হাসিয়া কহিল, –আচ্ছা আচ্ছা, পড়া যাবে।

যাহা হউক, একটা বাসার বন্দোবস্ত হইয়া গেল মনে করিয়া আবদুল কাদের নিশ্চিন্ত হইল। কিন্তু নাদেরের বাড়িখানি শেষ হইতে এখনো এক মাসের বেশি লাগিবে। এতদিন বোর্ডিঙে থাকা উচিত হইবে না। তাই দুই জনে পরামর্শ করিয়া স্থির করিল, যতদিন বাড়ি প্রস্তুত না হয়, ততদিন আবদুল কাদের আকবর আলী সাহেবের ওখানেই থাকিবে, খাওয়াদাওয়ার স্বতন্ত্র বন্দোবস্ত করিয়া লইবে।

আকবর আলী আবদুল কাদেরকে পুনরায় সাদরে নিজে বাটীতে স্থান দিলেন; কিন্তু তাহার স্বতন্ত্র আহারের বন্দোবস্তে বিশেষ রকম আপত্তি করিতে লাগিলেন। আবদুল কাদের কিছুতেই শুনিল না; সে এখন খোদার ফজলে যথেষ্ট উপায় করিতেছে, এক্ষেত্রে নিজের একটা বন্দোবস্ত করিয়া লওয়া ভালো দেখাইবে না বলিয়া সে জেদ করিতে লাগিল। অগত্যা আকবর আলীকে সম্মত হইতে হইল। তিনি বৈঠকখানা ঘরের বারান্দায় একধারে ঘিরিয়া উপস্থিত রান্নার কাজ চালাইবার মতো একটু স্থান করিয়া দিলেন।

কিন্তু রাঁধিবার আর লোক পাওয়া গেল না। অবশেষে আবদুল কাদেরের চাপরাসী নিজেই কেবল খোরাক পাইয়া রাধিয়া দিতে রাজি হইল। কিন্তু তাহাকে বেশি রাঁধিতে হইত না। আকবর আলীর অন্দর হইতে প্রায়ই ডালটা, তরকারিটা আসিত, এবং সপ্তাহের মধ্যে অন্তত তিন সন্ধ্যা আবদুল কাদেরকে বোর্ডিঙের সুপারিন্টেন্ডেন্টের নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে যাইতে হইত।

এইরূপে প্রায় এক মাস কাটিয়া গেল। একদিন সন্ধ্যার পর বৈঠকখানায় বসিয়া আবদুল কাদের আবদুল্লাহর সহিত পরামর্শ করিতেছিল, বাড়ি প্রস্তুত হইয়া গেলে হালিমাকে আনা যাইবে কি না। তাহার মাসিক আয় গড়ে এক শত টাকারও উপর। তাহা হইতে পিতার দেনা পরিশোধ বাবদ ৬০ টাকা করিয়া দিলে তাহার ৫০ টাকা আন্দাজ থাকিবে। তাহাতে জেলার ওপর সপরিবারে খরচ চালানো যায় কি না, দুই জনে তাহারই একটা হিসাব করিতেছিল, এমন সময় নাদের আলী সেখানে উপস্থিত হইয়া আভূমি মাথা নোয়াইয়া আদাব করিয়া দাঁড়াইল।

আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, –কী নাদের আলী, খবর কী? তোমার বাড়ির আকামতের মৌলুদ পড়তে হবে কবে?

নাদের আলী মুখে একটু বিষণ্ণতার ভাব আনিয়া কহিল, –হুজুর, বড় এট্টা মুশকিলি পড়লাম, তাই এখন কী করি ভাবতিছি।

কেন, কেন, কী হয়েছে?

আমাগোর মোন্সব বাবুর এক সুমুন্দি সব্‌ডিপুটি হয়ে আইছেন; তা মোন্সব বাবু আস্যে আমারে ধরে পড়লেন; আগাম টাকা নিতি চালাম না, তাও জোর করে দশটা টাকা হাতে গুঁজে দ্যে গেলেন ও বাড়ি তানার সুমুন্দিরে দিতেই হবে। আপনাগোরে আগে কথা দিছি, সে কথা কত করে কলাম, তা তারা মোটেই শোনলেন না। কী করি এখন…

আবদুল্লাহ্ উষ্ণ হইয়া উঠিয়া কহিল, –বাঃ আমাদের কথা দিয়ে রেখেছ আজ এক মাস হল, এর ওপরেও আবার কী করবে ভাবছ? তোমার কথার ওপর নির্ভর করে আমি এদ্দিন বসে আছি, পরিবার আনবার বন্দোবস্ত কচ্ছি; আর আজ কিনা তুমি ফস্ করে আর একজনকে বাড়ি দিয়ে ফেলে? আমরা আগাম দিতে চাইলাম, তা নিলে না; আর তোমার মুন্সেফ বাবু যেই এসে টাকা দিলেন, অমনি নিয়ে ফেল্লে! ছিঃ নাদের, তোমার একটু লজ্জাও হল না আমাদের সুমুখে আসতে?

নাদের মিনতি করিয়া কহিল, –তা কী করি হুজুর, তানারা মুনিব, নাগোর কথা তো ঠেলতি পারি নে। তা আমি আপনাগোর আর এট্টা বাড়ি দেখে দেব, আপনাগোর কোনো কষ্ট হবে না…

আর কষ্ট হবে না। নাদের, তুমি তোমার নিজের বাড়ির সম্বন্ধেই যখন কথা রাখতে পাল্লে না, তখন আর তুমি পরের বাড়ি দেখে দিয়েছ! আর তো বাড়িই নেই, তা তুমি দেবে কোথে কে? হিন্দু-বাড়ি কি আর আমাদের দেবে?

কেন দেবে না হুজুর? ওই ওদিকে বাবুর একখানা বাড়ি খালি আছে, তবে তার ভাড়াডা কিছু বেশি, তিরিশ টাকা…

আবদুল কাদের কহিল, –অত টাকা আমি দেব কোত্থেকে নাদের? কুড়ি টাকার মধ্যেই চাই।

নাদের একটু ভাবিয়া কহিল, –শোশি বাবুগোর একখান বাড়ি আছে দুই কামরা, ১৫ টাকা। সে খালি হবার কথা শুনিছি। ওবোশিয়ের বাবু ছেলেন সে বাড়িতি, তিনি বদলি হয়ে গ্যালেন। সেইডেই দেখি যদি হয়।

আবদুল্লাহ্ হতাশভাবে কহিল, –তা দেখ। কিন্তু হবে বলে আমার বিশ্বাস হয় না।

তা য্যামন করে পারি আপনাগোরে এট্টা বাড়ি করে দেবই, আপনারা ভাবনা করবেন না। এইরূপ আশ্বাস দিয়া নাদের চলিয়া গেল।

একটু পরেই আকবর আলী অন্দর হইতে বাহিরে আসিলে আবদুল কাদের নাদেরের বাড়ি সম্বন্ধে সকল কথা খুলিয়া বলিল। আকবর আলী একটু চিন্তিতভাবে কহিলেন… তবেই তো! ও বাড়ি যখন হাতছাড়া হয়ে গেল, তখন যে আপনি এখানে আর বাড়ি পাবেন, এমন বোধ হয় না। কোনো হিন্দুই মুসলমানকে বাড়ি দেবে না।

আবদুল কাদের একটু প্রতিবাদের সুরে কহিল, নাদের যেমন নিশ্চিত রকম ভরসা দিয়ে গেল, তাতে বোধহয় বাড়ি পাওয়া যেতে পারে। যদি কেউই না দিত, তবে নাদের অমন জোর করে বলতে পারত না যে, সে বাড়ি করে দেবেই। যার বাড়ির কথা বল্লে সে লোকটা হয়তো মুসলমানকে দিতে আপত্তি নাও কত্তে পারে বলে নাদের জেনে থাকবে…

কার বাড়ির কথা বল্লে সে?

আবদুল্লাহ্ কহিল, –শশীবাবু, বোধহয় উকিল শশীবাবু হবেন…

আকবর আলী অবিশ্বাসের হাসি হাসিয়া কহিলেন, –ওঃ শশীকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। ওর বাড়ি যদি আপনি পান তবে আমি কী বলেছি… ।

আবদুল কাদের কহিল, –আচ্ছা দেখাই যাক না, নাদের কদ্দূর কী কত্তে পারে। আর আমার বোধহয় এখন হিন্দুতে যখন মুসলমানের বাড়ি ভাড়া নিচ্ছে, তখন ওরা মুসলমানকে বাড়ি দিতে আর আপত্তি নাও কত্তে পারে।

আকবর আলী কহিলেন, –আপনি ক্ষেপেছেন? মুসলমানের বাড়ি হিন্দুতে ভাড়া নিচ্ছে বলেই যে হিন্দুর বাড়ি মুসলমানকে দেবে, এর কোনো মানে নাই। আমি যখন নবাবশাহীতে প্রথম চাকরি পাই, তখনকার এক ঘটনা শুনুন। একজন মুসলমান রইস্ মারা গেলেন; তাদের। পারিবারিক অবস্থা ভালো ছিল না। ছেলেরা পুরোনো বাড়িটা বেচে ফেল্লে। বাড়িখানা মন্দ ছিল না। এক হিন্দু ডাক্তার সেটা কিনেছিল; সে একটু মেরামত সেরামত করে ভাড়া খাটাতে লাগল। কিছুদিন পরে একজন মুসলমান ডিপুটি নবাবশাহীতে বদলি হয়ে এলেন। তখন ও বাড়িটা খালি ছিল; তিনি এত ঝুলোঝুলি কল্লেন, ভাড়া অনেক বেশি দিতে চাইলেন, কিছুতেই সে ডাক্তার দিলে না। সাফ বলেই দিলে, মুসলমানকে দেবে না।

আবদুল কাদের কহিল, –বাঃ, বেশ তো! ওরা আমাদেরটা নেবে, আর আমাদের দরকার হলে ওদেরটা পাব না? মুসলমানের বাড়ি হিন্দুর কাছে বেচাও উচিত নয়, আর ভাড়া দেওয়াও উচিত নয়।

আবদুল্লাহ্ কহিল, ভাই রে, বেচা উচিত নয় বলছ, কিন্তু মুসলমান খদ্দের পাবে কটা? আর ভাড়া না দিয়েই বা যাবে কোথা? কজন মুসলমান চাকুরে আছে যে, সকল সময় ভাড়া পাবে? তা ছাড়া ওরাই তো যত আপিস-আদালতের হর্তাকর্তা, ওদের সঙ্গে আড়াআড়ি করে কি আমাদের চলে? এই দেখ না, নাদের বেচারা যদি মুনসেফ বাবুর সম্বন্ধীকে বাড়িটা না দিত, তবে ওর চাকরি নিয়েই পরে টানাটানি পড়ত। যেমন আমাদের সমাজের অবস্থা, তাতে এসব সয়েই থাকতে হবে। অনর্থক চটলে কোনো ফল নেই।

আবদুল কাদের হতাশভাবে কহিল, তবে কি আমি বাড়ি পাব না?

আকবর আলী কহিলেন, –সেই রকমই তো বোধ হচ্ছে। নিদেনপক্ষে এই পাড়াতে, একটু জায়গা নিয়ে ঘর বেঁধে থাকবেন, আমি যেমন আছি। আর তো কোনো উপায় দেখছি নে।

এইরূপ কথাবার্তায় রাত্রি অধিক হইয়া উঠিল দেখিয়া আবদুল্লাহ্ বিদায় লইয়া বোর্ডিঙে চলিয়া গেল। আবদুল কাদের রাত্রে শুইয়া আকবর আলী সাহেবের কথামতো বাসা-বাটী নির্মাণের কল্পনা করিতে লাগিল।

পরদিন বৈকালের দিকে নাদের আলী আবদুল কাদেরের আপিসে আসিয়া কহিল, শশীবাবু তাহার বাড়ি ভাড়া দিতে রাজি হইয়াছেন, কিন্তু ভাড়া পাঁচ টাকা বৃদ্ধি করিয়া কুড়ি টাকা চাহিয়াছেন; আবদুল কাদের বাড়ি ভাড়া পাইবার আশা ছাড়িয়া দিয়াছিল; এক্ষণে নাদেরের কথায় তাহার আবার ভরসা হইল–সে কুড়ি টাকাই দিতে রাজি হইয়া গেল।

নাদের কহিল–তবে চলেন হুজুর, শশীবাবুর সাথে একবার মোকাবিলা করে ঠিকঠাক করে আসি গে। আমি তানারে কয়ে আইছি, আজই আপনারে লয়ে যাব। তানি সঁজ বাদ যাতি কইছেন।

বেশ তো, সন্ধ্যার পরই যাব। তুমি আমাকে নিয়ে যেও। আপিসেই থাকবখন–আজ কাজ অনেক।

সন্ধ্যার পর নাদের আসিয়া আবদুল কাদেরকে শশীবাবুর বাড়িতে লইয়া গেল। শশীবাবু তাকে পরম সমাদরে ঘরের ভিতর লইয়া গিয়া একখানি চেয়ারে বসাইলেন এবং পান, তামাক প্রভৃতির ফরমাইশ করিলেন। তৎক্ষণাৎ পান আসিল, তামাক আসিলে শশীবাবু কিঞ্চিৎ সেবন করিয়া কলিকাটি নাদেরের হস্তে তুলিয়া দিয়া কহিলেন, –দেও তো মিঞা,

একটা কাগজের ঠোঙ্গা করে সবুরেজিস্ট্রার সাহেবকে তামাক খাওয়াও।

অনভ্যস্ত বলিয়া আবদুল কাদের কাগজের ঠোঙ্গায় তামাক খাইয়া জুত পাইল না। তবু ভদ্রতার খাতিরে দুই-এক টান দিল এবং কাশিতে কাশিতে কলিকাটি ফিরাইয়া দিল।

শশীবাবু উপস্থিত আর একটি ভদ্রলোকের দিকে কাটি বাড়াইয়া দিয়া কহিলেন, নাদের আলী বলছিল, আমার ওই নদীর ধারের বাড়িটা আপনি ভাড়া নিতে চান।

আবদুল কাদের কহিল, –হ্যাঁ মশায়, যদি দয়া করে দেন, তবে বড় উপকার হয়, বাড়ি পাচ্ছি নে।

তা বেশ তো; আমার বাড়ি নেবেন তাতে আর কথা কী! তবে ভাড়াটা সম্বন্ধে একটু কথা ছিল, নাদের আলী বলে নি আপনাকে?

হ্যাঁ, তা বলেছে। আপনি কুড়ি টাকা চান তো? আমি তাতেই রাজি আছি।

তা হলে আপনি আসচে মাসের পয়লা থেকেই নেবেন। এর মধ্যে আমি চুনকাম টুনকাম করিয়ে ফেলি। একটু-আধটু মেরামত কত্তে হবে। এ কটা দিন দেরি হলে আপনার কোনো অসুবিধে হবে না তো?

না, না, অসুবিধে কিছুই হবে না। আমি কটা দিন সবুর কত্তে রাজি আছি! তবে আপনি কিছু অগ্রিম নিলে আমি পাওয়া সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত থাকতে পারি।

আবদুল কাদেরের এই প্রস্তাবে শশীবাবুর প্রতিই তাহার অবিশ্বাসের ভাব প্রকাশ পাইলেও আবদুল কাদের যেন নিজেকেই তাহার নিকট বিশ্বাস প্রতিপন্ন করিবার জন্য অগ্রিম দিতে চাহিতেছে এইরূপ ভাব দেখাইয়া শশীবাবু কহিলেন, –সে কী মশায়! অগ্রিমটগ্রিম আবার কেন? আপনার মতো ভদ্রলোকের মুখের কথাই কি আমার কাছে যথেষ্ট নয়?

ইহার উপর আর কথা চলে না। কাজেই আবদুল কাদেরকে কেবল মুখের কথার উপর নির্ভর করিয়াই বিদায় লইতে হইল।

আবদুল্লাহ্ আবদুল কাদেরের প্রতীক্ষায় আকবর আলীর বৈঠকখানায় বসিয়া তাহার সহিত বসিয়া গল্প করিতেছিল। এক্ষণে তাহাকে আসিতে দেখিয়া সে কহিল, –কী হে, এত রাত্তির হল যে?

গিয়েছিলাম শশীবাবুর ওখানে…

শশীবাবুর ওখানে? কেন–বাড়ি ঠিক করতে? পেলে?

আবদুল কাদের একটু বিজয়োল্লাসের সহিত কহিল, –হ্যাঁ হ্যাঁঃ! তোমরা বল, হিন্দুর বাড়ি মুসলমানে ভাড়া পায় না। ও একটা কথার কথা! এই তো আমি ভাড়া ঠিক করে এলাম। কুড়ি টাকা করে, ও-মাসের পয়লা থেকে নেব; শশীবাবু এর মধ্যে মেরামত টেরামত করে ফেলবেন।

আকবর আলী এবং আবদুল্লাহ্ উভয়েই এই কথা শুনিয়া একটু আশ্চর্য বোধ করিলেন। আবদুল্লাহ্ কহিল, যদি বাস্তবিক দ্যায়, তো সে খুব ভালো কথা। এতেই পরস্পরের মধ্যে সদ্ভাব বাড়বে; নইলে পরস্পরের ব্যবহারে কেবল রেষারেষি, তাচ্ছিল্য, ঘৃণা, এ সব থাকলে কি আর দেশের কল্যাণ হতে পারে?

বাসা একরূপ স্থির হইয়াছে বলিয়া আবদুল কাদের নির্ভাবনায় আপিস করিতেছে, এমন সময় একদিন শশীবাবু স্বয়ং আসিয়া দেখা দিলেন। আবদুল কাদের উঠিয়া তাহাকে অভ্যর্থনা করিল এবং চেয়ার আনাইয়া বসিতে দিল। যথারীতি কুশল প্রশ্নাদির পর শশীবাবু কহিলেন, দেখুন সবুরেজিস্ট্রার সাহেব, আপনার কাছে এক বিষয়ে আমাকে বড়ই লজ্জিত হতে হচ্চে, অথচ উপায় নেই। আশা করি, কিছু মনে করবেন না…

আবদুল কাদেরের বুকটা ধড়াস করিয়া উঠিল, –বুঝি বাড়িটা ফসকাইয়া যায়! সে উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিয়া কহিল, –কেন, কেন?

শশীবাবু গভীর দুঃখব্যঞ্জক সুরে কহিতে লাগিলেন, –কী করব, মৌলবী সাহেব, বাড়িটা তো আপনাকে দেব বলেই ঠিক করেছিলাম, কিন্তু ও-দিকে এক বিষম বাগড়া পড়ে গেল…

ঔৎসুক্যে অধীর হইয়া আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, –কী রকম?

আমাদের বারের প্রেসিডেন্ট অতুল বাবু ওই পাড়াতেই থাকেন কিনা তা তিনি এবং আরো পাঁচজনে বলেছেন, ও-পাড়ায় ভদ্দরলোকের বাস, ওখানে মুসলমানকে বাড়ি দিলে সকলকারই অসুবিধে হবে, তাই ভাবছি–আবার এদিকে…।

ভদ্দরলোকের পাড়ায় মুসলমানকে থাকিতে না দেওয়ার ইঙ্গিতে আবদুল কাদের বড়ই রুষ্ট হইয়া কহিল, –তা ও-পাড়া যে ভদ্রলোকের পাড়া তা তো আপনার জানা ছিল, তবে আমার মতো অভদ্র অর্থাৎ মুসলমানকে কেন কথা দিয়েছিলেন মশায়?

না, না, মশায় কিছু মনে করবেন না আপনাকে কেন অভদ্র বলে মনে কত্তে যাব…

ভদ্রলোকের পাড়ায় যাকে থাকতে দেওয়া উচিত হয় না, সে অভদ্র নয় তো কী?

না, না, মৌলবী সাহেব, –ওটা একটা কথার কথা বৈ তো নয়–যেমন ধরুন না, বাঙালি বললে আপনারা বাঙালি হিন্দুকেই বোঝেন…

কই, তা তো বুঝি নে–আমরাও তো বাঙালি…

আমি অনেক মুসলমানকে বলতে শুনিছি, –মুসলমানেরা আজকাল ধুতি পরে বাঙালি সাজে। এর মানে কী?

এর মানে এই যে, অনেক মুসলমান ভিন্ন দেশ থেকে এসে এখানে বাস কচ্ছে কিনা তাই তারা এদেশের আসল বাসিন্দাদের বাঙালি বলে; কিন্তু তাই বলে আপনারা হিন্দু বলেই যে ভদ্র নামের একমাত্র অধিকারী, আর কেউ ভদ্রলোক নয়, এমন মনে করা কি ঠিক?

কি জানেন মৌলবী সাহেব, ওটা কথার কথায় দাঁড়িয়ে গেছে তা আপনি কিছু মনে করবেন না। আমি আপত্তি মানতাম না; আসল কথা হচ্ছে কী জানেন, ও বাড়িখানি ঠিক আমার নয় কিনা? ওটা হচ্ছে আমার এক পিসিমার–তিনি বিধবা মানুষ জানেনই তো আমাদের বিধবারা কেমন গোঁড়া। তা তিনি কিছুতেই দিতে রাজি হলেন না। বললেন ওইটুকুই তার সম্বল আছে, ওতে অনাচার হলে তার অকল্যাণ হবে। এমন কথা বললে তো আর পীড়াপীড়ি করা যায় না। এখন কী করি, এ-দিকে আপনাকেও কথা দিয়ে রেখেছি, ও-দিকে পিসিমাকেও রাজি কত্তে পাচ্ছি নে, আমি মহা মুশকিলে পড়ে গিইছি…

আবদুল কাদের বিরক্তির সহিত কহিল, –বাড়ি যখন আপনার নিজের নয়, তখন তাকে না জিজ্ঞেস করে আপনার কথা দেওয়া উচিত হয় নি…।

আমি তখন এতটা ভাবি নি মশায় তিনি যে আপত্তি কত্তে পারেন এ-কথা আমার। মনেই হয় নি। নইলে কি আর আপনাকে এমন করে হয়রান করি? তা আপনি কিছু মনে করবেন না মশায়। তবে এখন উঠি, সেলাম।

সন্ধ্যার পর আকবর আলী এবং আবদুল্লাহ্ তাহার মেঘাচ্ছন্ন মুখ দেখিয়া বুঝিলেন যে, একটা কিছু ঘটিয়াছে। আবদুল কাদের নিষ্ফল ক্রোধে ও ঘৃণায় উত্তেজিত হইয়া শশীবাবুর ব্যবহারের উল্লেখ করিয়া কহিল, –দেখুন তো, লোকটার আচরণ! এমন করে আশা দিয়ে নিরাশ কল্লে! এ কি মানুষের কাজ? আকবর আলী কহিলেন, –তা আর কী করবেন বলুন! ব্যাপারটা কী হয়েছে, তা আমি বুঝতে পেরেছি। ওর বাড়িখানার ভাড়া বাড়াবার দরকার ছিল, সুযোগ পেয়ে আপনাকে দিয়ে বাড়িয়ে নিলে। ২০ টাকা দিতে রাজি হয়েছিলেন, এই বলে সে কারুর কাছ থেকে অন্তত ১৮ টাকা তো আদায় করবেই। যখন আপনার সঙ্গে কথাবার্তা হয়, তখন হয়তো সে লোককেও সেখানে হাজির রেখেছিল; আপনার মুখ থেকেই তাকে শুনিয়ে দিয়েছে যে, ভাড়া বেশি দিতে চেয়েছেন। আমি অনেক দিন থেকে ওদের সঙ্গে মেলামেশা কচ্ছি কিনা, ওদের কলাকৌশল আমার কিছু কিছু জানা আছে। দেখে নেবেন কদিন পরে।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান