আবদুল্লাহ » বাইশ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০০:৪৪
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৪৪
দৃষ্টিপাত
প্রায় চারি বৎসর পরে হালিমা শ্বশুরবাড়ি আসিয়াছে। এবার সৈয়দ সাহেব নিজে উদ্যোগ করিয়া পীরগঞ্জে গিয়া তাহাকে লইয়া আসিয়াছেন। বরিহাটী হইতে দলিল লেখাপড়া করিয়া ফিরিয়া আসিয়াই তিনি মসজিদের কাজ আরম্ভ করিয়া দিয়াছিলেন; কিন্তু ভালো লোক অভাবে কাজ বড়ই ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতেছিল। তাই মসজিদটা শেষ করিয়া তুলিতে আট-নয় মাস লাগিয়া গেল। ...

প্রায় চারি বৎসর পরে হালিমা শ্বশুরবাড়ি আসিয়াছে। এবার সৈয়দ সাহেব নিজে উদ্যোগ করিয়া পীরগঞ্জে গিয়া তাহাকে লইয়া আসিয়াছেন। বরিহাটী হইতে দলিল লেখাপড়া করিয়া ফিরিয়া আসিয়াই তিনি মসজিদের কাজ আরম্ভ করিয়া দিয়াছিলেন; কিন্তু ভালো লোক অভাবে কাজ বড়ই ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতেছিল। তাই মসজিদটা শেষ করিয়া তুলিতে আট-নয় মাস লাগিয়া গেল। মসজিদ শেষ হইয়াছে; সৈয়দ সাহেব যেখানে যত আত্মীয়স্বজন আছে, কেবল এক মীর সাহেব ছাড়া সকলকেই, কোথাও আবদুল মালেককে পাঠাইয়া, কোথাও নিজে গিয়া, দাওয়াদ করিয়াছেন, রমজান মাসের ১ তারিখেই আকামত হইবে; খুব একটা ধুমধামের আয়োজন হইতেছে। সে সময়ে পূজার ছুটিও হইবে এবং আবদুল কাদেরকেও বাড়ি আনা হইবে। তখন মৌলুদ শরীফ, খাওয়াদাওয়া, ফকির খাওয়ানো, এইসব করিতে হইবে।

বেহান কিন্তু প্রথমে হালিমাকে ছাড়িতে চাহেন নাই, –আজ প্রায় চারি বৎসর সে তাহার কাছে আছে, এখন হঠাৎ চলিয়া গেলে তিনি একলা কেমন করিয়া থাকিবেন, ইত্যাদি। কিন্তু সৈয়দ সাহেব কোনো কথাই শুনিলেন না; এমনকি বেহানকে সুদ্ধ লইয়া যাইবার জন্য জেদ করিতে লাগিলেন। উভয় তরফের তর্কাতর্কির ফল এই দাঁড়াইল যে, হালিমা এক্ষণে একবালপুরে যাউক, পূজার ছুটির তো আর বেশি দেরি নাই, আবদুল্লাহ্ বাড়ি আসিলে তাহার মাতা সৈয়দ সাহেবের মসজিদ আকামতের নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে যাইবেন। কিন্তু ফিরিবার সময় ছেলে, বউ, মেয়ে, জামাই, সব লইয়া আসিবেন।

পূজার ছুটি আসিল; আবদুল্লাহ্ও বাড়ি আসিল। কয়েক দিন পরে আবদুল কাদের একবালপুরে আসিলে পীরগঞ্জে লোক পাঠানো হইল। আবদুল্লাহ্ মাতাকে লইয়া শ্বশুরবাড়ি আসিল।

ধুমধাম খুবই হইল। এবার আত্মীয়স্বজন কেহ কোথাও বাকি নাই। শরীফাবাদ, মজিলপুর, রসুলপুর, নূরপুর প্রভৃতি গ্রাম হইতে প্রায় সকলেই মায় সওয়ারী তশরীফ আনিয়াছেন। এমনকি, আবদুল খালেকও এবার সপরিবারে নিমন্ত্রিত হইয়াছেন।

পহেলা রমজান বাদ-মগরেব (সান্ধ্য নামাযের পর) মসজিদে মৌলুদ শরীফ শুরু হইল। ঝাড়-ফানুসে মসজিদের অন্দর ও বারান্দা আলোকময় এবং শোভাময় হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু লোক আর ধরিতেছে না–মসজিদ নিতান্ত ছোট নহে, ঢের লোক ধরিতে পারে; কিন্তু যিনি আসিতেছেন, তিনিই মসজিদে প্রবেশ করিয়াই দরজার কাছে বসিয়া পড়িতেছেন, কেহই মিম্বারের কাছে ঘেঁষিয়া বসিবার বেআদবিটুকু স্বীকার করিতে চাহিতেছেন না। সুতরাং আদব রক্ষা করিতে গিয়া জায়গার টানাটানি পড়িয়া গেল। অধিকাংশ লোককে বারান্দাতেই বসিতে হইল।

ক্রমেই যখন বারান্দা ভরিয়া গেল, তখনো গ্রামের নিমন্ত্রিতদের আসিতে বাকি। তাঁহারাও একে একে আসিতে আরম্ভ করিলেন। এখন বসিতে দেওয়া যায় কোথায়? আবদুল মালেক তাড়াতাড়ি আসিয়া হুকুম করিলেন, –ওরে, বাইরে একটা বড় শতরঞ্জি পেতে দে।

আবদুল্লাহ্ নিকটেই ছিল, সে জিজ্ঞাসা করিল, –বাইরে কেন?

আবদুল মালেক কহিলেন, –তবে এঁরা বসবেন কোথায়? ভিতরে তো ধরগে’ তোমার আর জায়গা নেই।

কেন থাকবে না? মসজিদের মধ্যে তো সব খালি পড়ে আছে!

তা সেখানে তো কেউ বসছে না, এখন ধরগে’ তোমার করি কী?

আচ্ছা, আমি দেখছি, দাঁড়ান–বাইরে বসানো কি ভালো দেখাবে? এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ অতি কষ্টে বারান্দার ভিড় ঠেলিয়া মসজিদের মাঝখানের দরজাটির কাছে আসিয়া উপস্থিত হইল এবং যাহারা দরজা ঘেঁষিয়া ঠাসাঠাসি করিয়া বসিয়াছিলেন, তাহাদিগকে কহিতে লাগিল, –আপনারা একটু এগিয়ে বসুন, জনাব!

সকলেই ঘাড় ফিরাইয়া তাহার দিকে একবার চাহিল, কিন্তু কেহই নড়িয়া বসিল না।

আবদুল্লাহ্ আবার কহিল, –ঢের জায়গা রয়েছে সুমুখে, আপনারা একটু এগিয়ে না বসলে যে অনেক লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

এই কথায় দুই-এক জন একটু নড়িয়া কেহ আধ হাত, কেহ-বা বড়জোর মুটুম হাত পরিমাণ অগ্রসর হইয়া বসিলেন। অনেক বলিয়া-কহিয়াও আবদুল্লাহ্ ইহাদিগকে আর নড়াইতে পারিল না দেখিয়া বাহিরে ফিরিয়া আসিল এবং যাহারা দাঁড়াইয়া ছিলেন, তাহাদিগকেই ভিতরে বসাইবার জন্য ডাকিয়া আনিল।

কিন্তু তাহারাও দরজা পর্যন্ত আসিয়া থমকিয়া গেলেন! কী ভয়ে যে কেহ ভিতরের খোলা ময়দানের মতো খালি জায়গায় গিয়া বসিতে চাহিতেছেন না তাহা আবদুল্লাহ্ ভাবিয়া পাইল না। অবশেষে বিরক্ত হইয়া সে বারান্দার ভিড়ের মধ্য হইতে ছোট ছোট ছেলেগুলাকে টানিয়া তুলিয়া ভিতরে ঠেলিয়া দিতে লাগিল। সে বেচারারাও ভিড়ের চাপ হইতে নিষ্কৃতি পাইয়া বাঁচিল, এদিকে বারান্দার নবাগতদিগেরও কিঞ্চিৎ স্থান হইয়া গেল।

মৌলুদ পাঠ শুরু হইয়া গেল। মৌলুদ-খান সাহেব কলিকাতার আমদানি, সঙ্গে দুই জন চেলা। তাহার গলা যেমন দরাজ, তেমনি মিষ্ট; তিনি প্রথমেই কোরান মজিদ হইতে একটি সুরা এমন মধুর কেরাতের সহিত আবৃত্তি করিয়া গেলেন যে, সকলে শুনিয়া মোহিত হইয়া গেল। তারপর উর্দু কেতাব খুলিয়া সম্মুখস্থ বালিশের উপর রাখিয়া চক্ষু বন্ধ করিলেন এবং উর্দু গদ্যে ও গজলে, কখনো-বা দুই-একটা ফারসি বয়েতে নানা সুরে কখনো-বা একা, কখনো চেলাদ্বয়ের সহিত একত্রে, রওআয়েতের পর রওআয়েত আবৃত্তি করিয়া যাইতে লাগিলেন। প্রথমেই পবিত্র মৌলুদ শরীফ শ্রবণের অশেষবিধ গুণের বর্ণনা করা হইল–কেমন করিয়া বোন্দাদবাসিনী এক ইহুদি রমণী একবার স্বপ্নে স্বয়ং হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়াসাল্লামকে প্রতিবেশী মুসলমান বণিকের গৃহে শুভাগমন করিতে দেখিয়াছিল এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়াছিল যে, যে বাটীতে মৌলুদ শরীফ পাঠ করা হয় হযরত স্বয়ং এইরূপে সদা-সর্বদা সেই বাটীতে অদৃশ্যভাবে যাতায়াত করিয়া থাকেন–আবুলাহাবের বাঁদী তাহার প্রভুর নিকট হযরতের জন্ম-সংবাদ আনিয়া কিরূপ আনন্দ প্রকাশ করিয়াছিল এবং সেইদিন সোমবার ছিল বলিয়া মৃত্যুর পর কাফের থাকাবশত দোজখে গিয়াও কিরূপে প্রতি সোমবারে আজাব (নরক-যন্ত্রণা) হইতে রেহাই পাইয়া আসিতেছে–যে-ঘরে মৌলুদ শরীফ পাঠ করা হয় সেখানে কিরূপে ফেরেশতাগণের শুভাগমন হইয়া থাকে এবং তথায় কিরূপ অপূর্ব স্বর্গীয় আলোক প্রদীপ্ত হইয়া থাকে, পবিত্র হাদিস শরীফে তাহার কী কী প্রমাণ দেওয়া আছে–এসকল যথাযথরূপে বিবৃত হইল।

তাহার পর এই বিশ্বজগতের সৃষ্টির পূর্বের কথা আসিল। তখন কেবল আল্লাহতালার পবিত্র নূর এবং সেই নূর হইতে তাহারই ইচ্ছায় সৃষ্ট আমাদের নবী-করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হেস্ সালামের পবিত্র নূর ভিন্ন আর কিছুই বিদ্যমান ছিল না। এই পবিত্র মোহাম্মদী নূর তখন এক পবিত্র স্থানে বহু আবরণের মধ্যে রক্ষিত ছিল–পরে উহা ওই সকল আবরণ হইতে বহির্গত হইয়া নিশ্বাস লইলে, সেই পবিত্র নিশ্বাস হইতে ফেরেশতাগণ, পয়গম্বরগণ এবং বিশ্বাসীগণের আত্মাসমূহ সৃষ্টি হইল। ইহার পর ওই নূর দশ ভাগে বিভক্ত হইল এবং দশম ভাগ হইতে উৎপন্ন বস্তুর দৈর্ঘ্য চারি সহস্র বৎসরের ন্যায় হইল, প্রস্থও তাহার অনুরূপ হইল। আল্লাহ্ যখন ওই বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন, তখন উহা কাপিতে কাঁপিতে অর্ধেক জল ও অর্ধেক অগ্নিতে রূপান্তরিত হইয়া গেল। ওই জল সমুদ্রে পরিণত হইল এবং সমুদ্রের তরঙ্গের ঘাত-প্রতিঘাতে বায়ুমণ্ডলের উৎপত্তি হইয়া এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শূন্যস্থান পূর্ণ করিয়া দিল। তাহার পর সেই অগ্নির উত্তাপে সমুদ্রে ফেন ও বাষ্প এই দুইটি পদার্থ উৎপন্ন হইল; ফেন হইতে জন্মিল মৃত্তিকা এবং বাষ্প হইতে হইল আকাশ। মৃত্তিকা তখন টলমল করিতেছিল, সুতরাং তাহাকে স্থির করিবার জন্য ফেনের মধ্যে যেগুলি অত্যন্ত বৃহদাকার এবং শুভ্রবর্ণ ছিল, সেগুলিকে পর্বতরূপ পেরেকে পরিণত করিয়া মৃত্তিকায় ঠুকিয়া দেওয়া হইল। আবার পর্বতগুলির মধ্যে বিদ্যুৎ প্রবেশ করিয়া খনির সৃষ্টি করিয়া দিল।

পরে যখন আল্লাহতালা মানুষ সৃষ্টি করিলেন, তখন ওই মোহাম্মদী নূর কিরূপে হযরত আদম আলায়হেস্ সালামের পৃষ্ঠে অর্পিত হইয়াছিল, এবং অর্পণকালে তিনি পশ্চাদ্দিকে কিরূপ সুমধুর ধ্বনি শুনিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়া গিয়াছিলেন; কিরূপে হযরত আদমের বংশাবলির মধ্যে পর পর কাহার কাহার পৃষ্ঠে নূর প্রকাশিত হইতে হইতে অবশেষে কোরেশ বংশের বনি হাশেম শাখার আবদুল্লাহর মুখমণ্ডলে আসিয়া প্রকাশিত হইয়াছিল এবং তাহাই দেখিতে পাইয়া কিরূপে এক বুদ্ধিমতী ইহুদি সুন্দরী শেষ নবীর গর্ভধারিণী হইবার লোভে আবদুল্লাহর মনোহরণ করিয়া তাহার সহিত বিবাহিতা হইবার লোভে বৃথা চেষ্টা করিয়াছিল; যখন আমেনা খাতুনের সহিত আবদুল্লাহর বিবাহ হয়, তখন কিরূপে মক্কাবাসিনী দুই শত রূপসী যুবতী রশক ও হাসা-সে মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছিল; যে-রাত্রে আমেনা বিবির গর্ভসঞ্চার হয়, সে-রাত্রে কিরূপে হযরত জিব্রীল বেহেশত হইতে সবুজ রঙের পতাকা আনিয়া কাবার উপর স্থাপন করিয়াছিলেন, কিরূপে শয়তানের আকুল ক্রন্দনে আরবের উপত্যকাগুলি প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছিল, কিরূপে পৃথিবীর যেখানে যত দেব-দেবীর মূর্তি ছিল, সমস্তই মস্তক অবনত করিয়াছিল, কিরূপে পৃথিবীর জীবজন্তুসমূহ বাকশক্তি পাইয়া হযরতের শুভাগমন বিষয়ের আন্দোলন জুড়িয়া দিয়াছিল–এ সকল ব্যাপার পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিবৃত হইতে লাগিল।

অবশেষে যখন আমেনা বিবির প্রসবকাল নিকটবর্তী হইল, তখন তিনি দেখিলেন যে, সূতিকাগৃহ জ্যোতির্ময়ী রমণীবৃন্দের দ্বারা আলোকিত হইয়া উঠিয়াছে। জিজ্ঞাসা করিতেই তাঁহারা কহিলেন যে, তাহারা বেহেশতের হুর, খোদাতালা কর্তৃক আমেনা বিবির সেবা শুশ্রূষার জন্য প্রেরিতা হইয়াছেন। এমন সময় একটা বিকট শব্দ হইল–আমেনা চকিতা ও ভীতা হইয়া উঠিলেন, কিন্তু তৎক্ষণাৎ এক প্রকাণ্ড শ্বেতকায় পক্ষী আসিয়া আমেনার বক্ষঃস্থলে ডানা ঘষিয়া দিল, অমনি তাহার ভয় দূর হইয়া গেল; কিন্তু ভয়ের পরিবর্তে ভয়ানক পিপাসা বোধ হইতে লাগিল। হঠাৎ কোথা হইতে এক যুবক আসিয়া পড়িলেন এবং এমন এক পেয়ালা শরবত তাহার সম্মুখে ধরিলেন, যাহা দুধ অপেক্ষাও শুভ্র এবং মধু অপেক্ষাও মিষ্ট ছিল। আমেনা তাহাই পান করিয়া সুস্থ হইলেন– যথাসময়ে হযরত ভূমিষ্ঠ হইলেন।

এইখানে মৌলুদ-খান সাহেবের ইঙ্গিতমতো মজলিসের সকলেই উঠিয়া দাঁড়াইয়া। তাহার সহিত সুর মিলাইবার বৃথা চেষ্টা করিয়া উচ্চৈঃস্বরে এয়া নবীসালাম আলায়-কা ইত্যাদি সালাম পড়িতে লাগিলেন। মৌলুদ-খান এক এক চরণ একা একা সুর করিয়া পাঠ করেন, আর চরণশেষে সকলে একযোগে এয়া নবী ইত্যাদি কোরাস ধরিয়া সুরে-বেসুরে চিৎকার করিতে থাকেন। ক্রমে সালাম পাঠ শেষ হইলে আবার সকলে বসিয়া পড়িলেন।

মৌলুদ-খান এক্ষণে কিছুক্ষণ দরুদ শরীফ পড়িলেন, এবং অনেকেই গুনগুন স্বরে তাহার সঙ্গে যোগ দিলেন। পরে হযরত রসুলে-মকবুল আহমদ মোজুতবা মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হেস সালামের শুভ জন্মগ্রহণ মুহূর্তে পৃথিবীর কোথায় কোথায় কী কী অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়াছিল, তাহার বর্ণনা আরম্ভ হইল। হযরত মুসা আলায়হেস্ সালাম্ তাহার শিষ্যবর্গকে (ইহুদিগণকে) বলিয়া গিয়াছিলেন যে, আকাশের বিশেষ একটি নক্ষত্র স্থানচ্যুত হইলে দুনিয়াতে কোনো নবীর আবির্ভাব হইবে। তদবধি ইহুদিগণ পুরুষপরম্পরায় সেই নক্ষত্রটি লক্ষ্য করিয়া আসিতেছিল, অদ্য সহসা উহা খসিয়া পড়িল! শাম-প্রদেশস্থ। একটি অতিথিশালার কূপ কয়েক বৎসর একেবারে শুকাইয়া গিয়াছিল, অদ্য হঠাৎ তাহা জলপূর্ণ হইয়া উঠিল! পারস্য দেশের সওয়া নামক প্রায় দশ ক্রোশব্যাপী হ্রদবিশেষ হঠাৎ শুকাইয়া গেল, এবং সাওয়া নামক মরুভূমিটি এক জলপূর্ণ বিশাল হ্রদে পরিণত হইল, পারসিক অগ্নি-উপাসকদিগের অগ্নিকুণ্ড সহস্র সহস্র বৎসর ধরিয়া অবাধে জ্বলিয়া আজ হঠাৎ নিভিয়া গেল এবং পারস্যরাজ নওশেরোআনের প্রাসাদচূড়া চূর্ণ হইয়া ভূপতিত হইল। এবং পরিশেষে কাবা মন্দিরের প্রতিমাগুলির মুখ থুবড়িয়া পড়িয়া গেল!

এইরূপ বহু অলৌকিক ঘটনার বর্ণনার পর মৌলুদ-খান সাহেব এক দীর্ঘ মোনাজাত (প্রার্থনা) করিয়া মৌলুদ শরীফ সাঙ্গ করিলেন। সমস্তই উর্দু ভাষাতে কথিত ও গীত হইল; অধিকাংশ লোকই তাহার এক বর্ণও বুঝিল না; কিন্তু তাহাতে পুণ্যসঞ্চয়ের কোনো বাধা হইল না।

যাহা হউক, মৌলুদশেষে যথারীতি মিষ্টান্ন বিতরণের পর সকলে উঠিয়া পড়িলেন। প্রতিবেশী সাধারণ লোকেরা ঘরে ফিরিয়া গেল। দুই-চারি জন আত্মীয় রাত্রের আহারের জন্য নিমন্ত্রিত হইয়াছিলেন, তাহারা রহিয়া গেলেন। সাধারণের নিমন্ত্রণ পরদিন রাত্রে।

এইরূপে বিপুল সমারোহের সহিত নূতন মসজিদের আকামত পর্ব শেষ হইল। কয়দিন ধরিয়া বাটীর প্রভু-ভৃত্য সকলেরই ক্রমাগত খাঁটিয়া প্রাণান্ত হইতে হইয়াছে। কিন্তু অন্দরমহলে যাহা কিছু খাটুনি তিনটি প্রাণীর উপর দিয়া গিয়াছে। হালিমা তো বধূ, তাহাকে খাটিতেই হইবে, কিন্তু রাবিয়া ও তাহার বোন যে খাটুনিটা খাঁটিয়াছিল, যেরূপে বাঁদীর মতো শ্রমে ও ভগ্নীর মতো যত্নে সমাগতা বিবিগণের সেবা করিতেছিল তাহাতে, সেই বিবিগণের মধ্যে যাহারা উহাদিগকে চিনিতেন না তাহারা উহাদের আভিজাত্য সম্বন্ধে সন্দিহান হইয়া এক দস্তরখানে বসিতে ইতস্তত করিতেছিলেন। এমন সময় মজিলপুরের এক বিবি, কয়েকজনকে একটু অন্তরালে লইয়া গিয়া রাবিয়াদের পরিচয় দিয়া কহিলেন, রাবিয়ার পিতামহ দ্বিতীয়বার যে বিবাহ করিয়াছিলেন, সে বিবি একটু নীচু ঘরের মেয়ে রাবিয়ার পিতা তাহারই গর্ভে জন্মিয়াছিলেন। এই কথা শুনিয়া শরীফাবাদের এক বিবি কহিলেন, হুঁ, সে আমি চালচলন দেখে আগেই ঠাউরেছিলাম! এবং সৈয়দ সাহেবের বড় বিবিকে গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, –বেয়ান সাহেব, রাবিয়ারা কি আমাদের সঙ্গে এক দস্তরখানে বসবে?

বড় বিবি কহিলেন, না, না, ওরা কেন বসবে? ওরা খাদিমী করবেখন।

শরীফাবাদের বিবি কহিলেন—না, না, সেটা ভালো দেখাবে না। ওদের আলাদা ঘরে বসালেই হবে।

শরীফাবাদের বেয়ান আবদুল মালেকের শ্বশুর হাজী সাহেবের বিবি; এবং হাজী সাহেব হইলেন এ অঞ্চলের মধ্যে একেবারে অতি আদি শরীফ ঘর; সুতরাং তাহার কথা রাখিতেই হইল।

কিন্তু হালিমা এ কথা শুনিয়া একেবারে মর্মাহত হইল। সে তাহার শাশুড়িকে গিয়া কহিল, –তবে আমিও বসব না, আম্মা; ভাবী সাহেবাদের সঙ্গে খাবখন।

শাশুড়ি বিরক্ত হইয়া কহিলেন, –বাঃ সে কী কথা! তুমি হলে মেজবউ, বড়বউ বসবে, আর তুমি বসবে না? এরা সব কী মনে করবেন?

আর ওঁরাই বা কী মনে করবেন? আজ সারাটা দিন ওঁরা খেটে হয়রান হয়েছেন, আর তাদের না নিয়ে খাওয়া কি ভালো হবে? ওঁদের মনে যে দুঃখ দেওয়া হবে তা হলে।

শাশুড়ি কহিলেন, তা দুঃখ হলে কী করব বাপু! যে যেমন, তার তেমনভাবেই চলতে হবে তো? শরীফাবাদের বিবিদের সঙ্গে বসবার যুগ্যি ওরা নয়!

এদিকে দস্তরখান পড়িয়া গিয়াছে। বাঁদীরা শাশুড়ি-বধূকে ডাকিতে আসিয়া কহিল, বিবিরা সব বসে গেছেন!

চল বউ, আর দেরি কোরো না। বলিয়া তিনি হালিমার হাত ধরিয়া লইয়া চলিলেন। দুয়ারের কাছে আসিয়া সালেহাকে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া কহিলেন, রাবিয়াদের জন্যে ও-ঘরে দস্তরখান দিতে বলেছি, দিল কি না দেখে এস।

সকলে বসিয়া গিয়াছেন, বাঁদীরা সিলিপূচি (হাত ধোয়াইবার পাত্র) লইয়া একে একে হাত ধোয়াইতেছে, এমন সময় সালেহা আসিয়া মাতাকে কহিল, –তারা তো নেই! বেলার কাছে শুনলাম, এক্ষুনি তারা পাছ-দুয়ারে পালকি ডাকিয়ে চলে গিয়েছেন বলিয়া মাতার পার্শ্বে বসিয়া পড়িল।

হালিমা কাছেই ছিল, শুনিয়া তাহার মনটা বড় খারাপ হইয়া গেল। বড় বিবি মৃদুস্বরে কহিলেন, ও, গোসা করে বিবিরা চলে গিয়েছেন!

বিবিরা খাইতে বসিলেন। কেহ-বা নখে করিয়া একআধটা দানা অতি আস্তে আস্তে মুখে তুলিয়া দিতে লাগিলেন, কেহ-বা এক লোকমা মুখে দিলেন তো আর এক লোকমা কবে দিবেন তাহার ঠিকানা করা অসম্ভব হইয়া উঠিল। প্রায় এক ঘণ্টা, সকলে দস্তরখানে বসিয়া রহিলেন; কিন্তু সকলের রেকাবিতেই রাশীকৃত গোশত ও পোলাও রহিয়া গেল। শরীফ ঘরের দস্তুর অনুসারে কেহ কেহ বাটী হইতে আহার করিয়াই আসিয়াছিলেন, তাহারা কেবল সম্মান রক্ষার জন্য একবার দস্তরখানে বসিয়াছিলেন মাত্র। যাহাদিগের সত্যই পেটে ক্ষুধা ছিল, তাহারাও পার্শ্ববর্তিনীর স্থূপীকৃত রেকাবির লজ্জায় নিজের স্থূপ অধিক ক্ষয় করিতে পারিলেন না।

যাহা হউক, কোনোক্রমে আহার-পর্ব খতম হইল। বাঁদীরা সিলিচি ও বদনা লইয়া একে একে বিবিদের হাত ধোয়াইতে আরম্ভ করিল। সে হাত ধোয়ানোও এক বিষম ব্যাপার! বাঁদী বেচারিদের ঝুঁকিয়া থাকিতে থাকিতে কোমরে ব্যথা ধরিয়া যায়, তথাপি বিবি একবার এক কোষ পানি হাতে লইয়া আবার যে দ্বিতীয় কোষ এ-জীবনে লইবেন, বেচারারা এরূপ ভরসা করিতে সাহস পায় না!

হাত ধোওয়া ব্যাপার চলিতেছে, এমন সময় রাবিয়া ও মালেকাকে বারান্দার উপর উঠিতে দেখিয়া একটি অল্পবয়স্কা অদূরদর্শিনী বিবি বলিয়া উঠিলেন, –এই যে, বাঃ! এতক্ষণ কোথায় ছিলেন আপনারা? আমরা তো খেয়ে উঠলাম!

রাবিয়া বেশ একটু পরিষ্কার গলায় কহিল, –আমাকে ভাই তাড়াতাড়ি একটু বাড়িতে যেতে হল–একটা মস্ত কাজ ভুলে এসেছিলাম–না গেলে হয়তো বড় ক্ষতি হয়ে যেত…

কী এমন কাজ ছিল যে খাবার সময় তাড়াতাড়ি কাউকে না বলে চলে গেলেন?

খানকয়েক নোট বালিশের নিচে রেখেছিলাম, তখন তাড়াতাড়ি আসার সময় তা তুলে রাখতে মনে হয় নি। হঠাৎ মনে পড়ে গেল… তা থাক, আপনাদের খাওয়া হয়ে গেছে বেশ হয়েছে, আমরা তো ঘরেরই মেয়ে-বউ, আমরা খেয়ে নেবখন।

হালিমা সাড়া পাইয়া তাড়াতাড়ি কোনোমতে হাত ধুইয়া ছুটিয়া আসিল–তাহার মনে হইতেছিল, বুঝি রাবিয়ার বড়ই অভিমান ও দুঃখ হইয়াছে। কিন্তু তাহার হাসিমুখ দেখিয়া হালিমার মনের ভার অনেকটা লঘু হইয়া গেল। রাবিয়া তাহাকে দেখিয়াই বলিয়া উঠিল, বাঃ, বেশ তো! আমাদের ফেলে নিজেরা খেয়ে এলে। এখন চল, আমাদের খাওয়াবে বসে।

ইহারা চলিয়া গেলে বিবিদের মধ্যে একটা সমালোচনার গুঞ্জন উথিত হইল। কেহ কহিলেন, –যাক, বাঁচা গিয়েছে। আবার কেহ-বা কহিলেন, –হলে কী হয়? মেয়েটা খুব চালাক বটে! সবদিক বজায় রেখে গেল।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান