আবদুল্লাহ » তেইশ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০০:৪৬
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৪৬
দৃষ্টিপাত
মসজিদ আকামতের দিন দুই পরেই হালিমার জ্বর হইল। প্রথম দিন জ্বর তেমন বেশি হয় নাই, কিন্তু দ্বিতীয় দিনে জ্বরের বেগটা কিছু প্রবল দেখা গেল। তৃতীয় দিনও সেইভাবে কাটিল। গ্রামে এক বৃদ্ধ কবিরাজ ছিলেন; সচরাচর তিনিই এ-বাটীর চিকিৎসা করিতেন। তাঁহাকে ডাকা হইল। রোগিণী মশারির ভিতর রহিল, তাহার পার্শ্বে একটা দোহারা রঙিন ...

মসজিদ আকামতের দিন দুই পরেই হালিমার জ্বর হইল। প্রথম দিন জ্বর তেমন বেশি হয় নাই, কিন্তু দ্বিতীয় দিনে জ্বরের বেগটা কিছু প্রবল দেখা গেল। তৃতীয় দিনও সেইভাবে কাটিল।

গ্রামে এক বৃদ্ধ কবিরাজ ছিলেন; সচরাচর তিনিই এ-বাটীর চিকিৎসা করিতেন। তাঁহাকে ডাকা হইল। রোগিণী মশারির ভিতর রহিল, তাহার পার্শ্বে একটা দোহারা রঙিন কাপড়ের পরদা লটকানো হইল। পরদার ভিতরে হালিমার মাতা, শাশুড়ি এবং আরো দুই এক জন স্ত্রী-পরিজন রহিলেন। কবিরাজ আসিয়া পরদার বাহিরে বসিলেন এবং রোগিণীর অবস্থা সম্বন্ধে নানারূপ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। আবদুল কাদের এক একটি প্রশ্ন শুনিয়া পরদার ভিতর যায় এবং একটু পরে আবার বাহিরে আসিয়া উত্তরটি কবিরাজ মহাশয়কে শুনায়। এইরূপে মোটামুটি অবস্থা জানিয়া তিনি একবার রোগিণীর হাত দেখিতে চাহিলেন। আবদুল কাদের ভিতরে গিয়া পরদার এক প্রান্ত সামান্য একটু উঁচু করিয়া ধরিল এবং কবিরাজ মহাশয়কে হাত বাড়াইয়া দিতে কহিল। কবিরাজ মহাশয় পরদার ভিতর হাত। বাড়াইয়া দিলেন; আবদুল কাদের তাহার হাতের আঙুল ধরিয়া হালিমার বাম হস্তের কবজির উপর ধরিয়া রহিল; কবিরাজ তিন আঙুলে নাড়ি টিপিয়া ধরিয়া যতটা সম্ভব উহার গতি অনুভব করিতে চেষ্টা করিলেন, এবং একটু পরে পরদার ভিতর হইতে হাত টানিয়া লইলেন।

নাড়ি পরীক্ষা হইয়া গেলে সকলে উৎসুক হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কেমন দেখলেন, কবিরাজ মশায়?

কবিরাজ কহিলেন, –জ্বরটা প্রবল বটে; বাত-শ্লেষ্মর ক্ষেত্র বলে সন্দেহ হচ্ছে–তবে। ভয়ের কোনোই কারণ নেই, গোড়াতেই যখন চিকিৎসা আরম্ভ হচ্ছে, তখন ওটা কেটেই যাবে।

তাহার পর তিনি ঔষধ-পথ্যাদির ব্যবস্থা করিয়া একটি টাকা দর্শনী পাইয়া প্রস্থান করিলেন।

ঔষধ রীতিমতো চলিতে লাগিল। সঙ্গে সঙ্গে সৈয়দ সাহেবের দোয়া, তাবিজ, পানি পড়া এবং মক্কাশরীফ হইতে আনীত কোরবানি-করা উটের শুকনো গোশত ঘষা প্রভৃতিও প্রয়োগ করা হইল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। আরো দুই দিন কাটিয়া গেল, কিন্তু রোগের কোনোই উপশম দেখা গেল না।

এদিকে আবদুল কাদেরের ছুটি ফুরাইয়াছে, আগামীকল্যই তাহাকে সদরে হাজির হইতে হইবে। স্ত্রীর এই অবস্থা; এক্ষণে কী করিবে, ভাবিয়া পাইল না। কবিরাজ বলিতেছেন, ভয় নাই; কিন্তু আবদুল্লাহর মনের সন্দেহ ঘুচিতেছে না। সে কহিল, –রোগটা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে বোধ হচ্ছে!

আবদুল কাদের কহিল, –তাই তো। এখন কী করা যায়?

আমি বলি, ডাক্তার দেখানো যাক; ও কবিরাজ-টবিরাজের কর্ম নয়।

ভালো ডাক্তার বা এখানে কই?

কেন? সদর থেকে আনা যাক।

আবদুল কাদের কহিল, –ডাক্তার দেখাতে কি অব্বিা রাজি হবেন? ডাক্তারি ওষুধের তিনি নামই শুনতে পারেন না।

তা না শুনতে পাল্লে চলবে কেন? রোগটা কঠিন তাতে সন্দেহ নেই; চল, বরং তাকে বলি গিয়ে।

কিন্তু সৈয়দ সাহেব ডাক্তারের কথা শুনিয়া প্রথমটা চটিয়াই উঠিলেন এবং কহিলেন, হ্যাঁঃ! এই রমজান শরীফে শরাবটরাব খাইয়ে এখন বউটার আখেরাতের সর্বনাশ কর আর কি! কেন, কবিরাজ মশায় তো বেশ দাওয়া দিচ্ছেন…

আবদুল্লাহ কহিল, –কিন্তু তাতে তো কোনো উপকার হচ্ছে না, জ্বর ক্রমেই বেড়ে চলেছে, তাইতে সন্দেহ হচ্ছে…

না, নাঃ! তোমরা অনর্থক সন্দেহ কচ্ছ, বাবা। আর সন্দেহ কিসের? খোদা যদি হায়াত রেখে থাকেন তো এতেই রোগ সেরে যাবে। তার উপর আমি যেসব তদ্বির কচ্ছি, এতে দেখো আল্লাহ রহম দেবে নিশ্চয়। ও-সব নাচিজ আর খাইয়ে কাজ নেই।

আবদুল্লাহ্ জেদ করিয়া কহিল, –তা হুজুর তদ্বির কচ্ছেন, ভালোই হচ্ছে। কিন্তু দোয়ার সঙ্গে দাওয়া কত্তেও তো আল্লাহতালা হুকুম করেছেন…

তা দাওয়া তো চলছেই, আবার কেন!

ও কবিরাজি দাওয়াতে বড় ফল হবে বলে বোধ হয় না; আর আজকাল ওরা সকল রোগ চিনতেই পারে না–অবিশ্যি যেটা ধত্তে পারে, ওষুধের গুণে সেটাতে উপকার দেখায় বটে…

সৈয়দ সাহেব বিরক্তির সহিত কহিলেন, –আর ডাক্তার ব্যাটারা এলেই অমনি রোগ ধরে ফেলে! তা হলে আর দুনিয়ায় কেউ মরত না।

আবদুল্লাহ কহিল, –সে কথা হচ্ছে না; ডাক্তারেরা কবিরাজদের চেয়ে অনেক বেশি। রোগী নিয়ে নাড়াচাড়া করে কিনা, তাই রোগ সম্বন্ধে এদের জ্ঞান কবিরাজদের চেয়ে বেশি। জন্মে। তা ওষুধ না হয় কবিরাজ মশায়ই দেবেন, একবার একজন ডাক্তার দেখিয়ে পরামর্শ কল্লে বোধহয় মন্দ হত না।

সৈয়দ সাহেব যেন একটু নরম হইলেন। ভাবিয়া কহিলেন, ডাক্তার দেখে আর কী-ই বা এমন বেশি বুঝবে–একটুখানি নাড়ি টিপে দেখা ছাড়া তো আর কিছু হবে না, সে তো কবিরাজও দেখছে।

আবদুল্লাহ্ কহিল, –ডাক্তারেরা নাড়ির উপর বড় বেশি নির্ভর করে না, আর আর সব লক্ষণ ধরে রোগ নির্ণয় করে।

তবে অবস্থা গিয়ে বললেই তো হয়, ডাকার দরকার কী?

কী কী অবস্থায় কোন কোন বিষয়ে সে জানতে চাইবে, তা আমরা কী করে বুঝব? ডেকে আনলে সে যা যা জিজ্ঞাসা করবে সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলতে পারা যাবে…

কাকে ডাকবে, ঠিক করেছ?

ঠিক এখনো করি নি; আবদুল কাদের আজ শেষরাত্রেই রওয়ানা হচ্ছে, সে কাল সদর থেকে ভালো করে জেনেশুনে একজনকে নিয়ে আসবে।

কাছারি খুলবে যে কাল! কী করে আসবে ও?

ছুটি নেবে।–তা এক কাজ কল্লে হয়। নেওয়াজ ভাই সাহেবকে বরং সঙ্গে দিলে হয়। আবদুল কাদের যদি না-ই আসতে পারে, তো উনিই ডাক্তার নিয়ে আসবেনখন।

অনেক চিন্তার পর সৈয়দ সাহেব এই প্রস্তাবেই মত দিলেন; কিন্তু বারবার করিয়া সাবধান করিয়া দিলেন, যেন ডাক্তারি ঔষধ খাওয়ানো না হয়। বরং তেমন বেগতিক দেখিলে কলিকাতা হইতে হাকিম গোলাম নবী সাহেবকে আনা যাইবে।

পরদিন সদরে পৌঁছিয়াই আবদুল কাদের কোন ডাক্তারকে পাঠানো যাইবে সে সম্বন্ধে। আকবর আলী সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করিল। অবস্থা শুনিয়া আকবর আলী কহিলেন, — এখানকার নতুন অ্যাসিস্টান্ট সার্জন শুনিছি ডাক্তার ভালো…

কে? দেবনাথবাবু?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, –তার বাড়ি আপনাদের ওইদিকে…

পশ্চিম পাড়ায়–ভোলানাথবাবুর ছেলে। তা উনি গেলে তো ভালোই হয়।

তা যাবেন বৈকি, বেশি দূর তো নয়…

চলুন না একবার তার কাছে…

এখনই? কাছারির সময় হয়ে এল যে!

আচ্ছা কাছারি যাবার পথে?

তাই।

বেলা প্রায় এগারটার সময় হাসপাতালে গিয়া তাহারা ডাক্তার দেবনাথ সরকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিলেন এবং সকল কথা তাহাকে খুলিয়া কহিলেন। ডাক্তার বাবু একটু ভাবিয়া কহিলেন, আমার হাতে দুটো কেস রয়েছে, সন্ধের সময় দেখতে যাবার কথা…

আকবর আলী কহিলেন, –অমূল্যবাবুকে বলে গেলে হবে না? অমূল্য বাবুও একজন এল-এম, এফ, স্বাধীনভাবে প্র্যাকটিস করেন।

ডাক্তার একটু ভাবিয়া কহিলেন, –আচ্ছা দেখি, সাহেবকেও একবার বলতে হবে…

আবদুল কাদের কহিল, –কিন্তু আজই রওয়ানা হতে হবে–সন্ধের পরেই পৌঁছানো চাই–কাল সকালে অবস্থাটা দেখে দু প্রহরের মধ্যে ফিরতে পারবেন।

ডাক্তারবাবু কহিল–আচ্ছা আমি দেখি…

আকবর আলী কহিলেন, শুধু দেখি বললে হবে না ডাক্তারবাবু–আপনাকে যেতেই হবে।

আচ্ছা আমি একবার সাহেবের সঙ্গে আর অমূল্যবাবুর সঙ্গে দেখা করে আসি ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আপনার আপিসে খবর পাঠাবখন…

আবদুল কাদের কহিল–নৌকা তয়ের আছে–আমি যে নৌকোয় এসেছি, আপনি সেইটেতেই যেতে পারবেন। আর দেখি যদি আমি ছুটির যোগাড় করতে পারি, তো আমিও যাবখন সঙ্গে।

ডাক্তারবাবু আশ্বাস দিয়া উঠিয়া পড়িলেন। একদিকে সৌভাগ্যক্রমে ডাক্তার সাহেব অনুমতি দিলেন এবং অমূল্যবাবুও কেস দুটি একবার দেখিয়া আসিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুত হইলেন; কিন্তু অন্যদিকে দুর্ভাগ্যক্রমে আবদুল কাদের ছুটি পাইল না। ম্যাজিস্ট্রেট নূতন। সাহেব, লোকটা সুবিধার নহে।

যাহা হউক খোদা নেওয়াজ ডাক্তার লইয়া বেলা প্রায় দুইটার সময় রওয়ানা হইয়া গেল। খোদা নেওয়াজ মাল্লাদিগকে ডবল ভাড়া কবুল করিয়া জোরে বাহিবার জন্য উৎসাহিত করিতে লাগিল। তাহারাও প্রাণপণে বাহিয়া সন্ধ্যার পরেই একবালপুরের ঘাটে নৌকা ভিড়াইয়া দিল।

যথাসময়ে ডাক্তারবাবুকে রোগিণীর ঘরে লইয়া যাওয়া হইল। কবিরাজ মহাশয়কে যে উপায়ে হাত দেখানো হইয়াছিল, তাহাকেও সেই উপায়ে দেখানো হইল। তাহার পর তিনি থার্মোমিটার বাহির করিয়া আবদুল্লাহর হাতে দিলেন। আবদুল্লাহ্ টেম্পারেচার লইয়া আসিলে দেখা গেল, জ্বর ১০৪ ডিগ্রি উঠিয়াছে। নানারূপ জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া ডাক্তারবাবু জানিতে পারিলেন যে, জ্বর বৈকালের দিকেই বাড়ে এবং সকালে একটু কম থাকে। নিদ্রা, কোষ্ঠ, কোষ্ঠাশ্রিত বায়ু, শরীরের কোনো স্থানে বেদনা আছে কি না, কাশি ইত্যাদি সম্বন্ধে তিনি তন্নতন্ন করিয়া জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন।

তাহার পর একটু ভাবিয়া ডাক্তারবাবু কহিলেন, চেস্ট-টা একটু এজামিন করা দরকার।

আবদুল মালেক জিজ্ঞাসা করিলেন, কী?

আবদুল্লাহ্ বুঝাইয়া দিতেই তিনি চোখমুখ উল্টাইয়া বলিয়া উঠিলেন, না, না, সে ধরগে’ তোমার কেমন করে হবে!

ডাক্তারবাবু দৃঢ়স্বরে কহিলেন, তা নইলে তো আমি কিছু বুঝতে পাচ্ছি নে। না বুঝে চিকিৎসাও তো করা যায় না।

আবদুল্লাহ্ কহিল তবে উপায়?

ডাক্তারবাবু কহিলেন, এক কাজ করুন। স্টেথসকোপটা কানে দিয়ে পরদার কাছে বসি, আপনারা কেউ ওধারটা নিয়ে যেখানে যেখানে বসাতে বলি, ঠিক সেইখানে সেইখানে চেপে ধরুন।

এখন হালিমার বুকে স্টেথসূকোপ বসাইতে যাইবে কে? সকলে এ উহার মুখের দিকে চাহিতে লাগিলেন। আবদুল মালেক আবদুল্লাহর কানে কানে জিজ্ঞাসা করিলেন, সালেহা পারবে না?

আবদুল্লাহ্ কহিল, দেখুন বলে।

আবদুল মালেক পরদার পার্শ্বে দাঁড়াইয়া সালেহাকে ইশারা করিয়া ডাকিয়া, কী করিতে হইবে, ফিসফিস করিয়া বুঝাইয়া দিলেন। ডাক্তারবাবু নলটি কানে দিয়া পরদা ঘেঁষিয়া বসিলেন, এবং প্রথমেই বুকের যেখানটায় ধুকধুক করে, সেইখানে বসাইতে বলিলেন।

কিন্তু নল কানে দিয়া মিনিট দুই বসিয়া থাকিয়াও তিনি কোনো শব্দ শুনিতে পাইলেন না; আবার কহিলেন, ভালো করে চেপে ধরুন। তবু কোনো ফল হইল না।

নাঃ, আর কাউকে বলুন বলিয়া ডাক্তারবাবু কান হইতে স্টেথকোপ নামাইয়া ফেলিলেন। ক্রমে বাড়ির স্ত্রী-পরিজন, বালক ইত্যাদি যে যেখানে ছিল, সকলকে দিয়া চেষ্টা করা হইল; কোনো ফল হইল না। যদিও-বা এক আধবার একটু শব্দ শুনিতে পাওয়া যায়, তাহাও মশারির, পরদার কাপড়ের, এবং ধবৃনেওয়ালার হাতের ঘষায় সব গুলাইয়া যায়।

নাঃ, কিছু হল না বলিয়া অবশেষে ডাক্তারবাবু উঠিয়া পড়িলেন। পরে আবদুল্লাহর দিকে চাহিয়া একটু বিরক্তির স্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনিও কি পারেন না?

আবদুল্লাহ্ মৃদুস্বরে ইংরেজিতে কহিল, যতক্ষণ এ-বাড়িতে আছি ততক্ষণ পারি না।

শ্‌শ্‌শ্‌–ননসেন্স বলিয়া ডাক্তারবাবু বাহিরে যাইবার জন্য উঠিয়া দাঁড়াইলেন।

বাহিরে আসিয়া আবদুল্লাহকে একটু আড়ালে ডাকিয়া লইয়া ডাক্তারবাবু কহিলেন, কেস সম্বন্ধে ডেফিনিট কিছু বুঝতে পারা গেল না, তবে ভাবে বোধ হচ্ছে, নিউমোনিয়া সেটু-ইন করেছে। আবদুল্লাহ্ একটু ভীত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, তবে উপায়?

উপায় সাবধানে চিকিৎসা! কিন্তু এখানে রাখলে তো চিকিৎসা চলবে না– বরিহাটীতে নিয়ে যেতে হবে।

আপনি একটু দয়া করে আসতে পারবেন না কি?

আমি আসতে পারি, কিন্তু রোজ তো পারব না! অথচ এ রোগীকে দুবেলা দেখা দরকার।

ওঃ! তবে তো বড় বিপদের কথা হল দেখি!

হ্যাঁ, তা এখানে রাখতে চাইলে বিপদের কথা বৈকি!

দেখি একবার বলে; কিন্তু এরা যেরকম গোঁড়া, তাতে যে ওকে সদরে নিয়ে যেতে দেবেন, এমন তো ভরসা হয় না।

কেন? আপনি জোর করে বলবেন; যদি বাঁচাতে চান, তবে কাল সকালেই নিয়ে যাবার বন্দোবস্ত করবেন। এর পরে কিন্তু ওঁকে রিমুভ করা আনসেফ হয়ে পড়বে।

আচ্ছা দেখি কদ্দূর কী কত্তে পারি।

তবে আমি এখন বাড়ি চলোম। কাল সকালেই একবার দেখে রওয়ানা হব। ভিজিটের টাকা লইয়া ডাক্তারবাবু চলিয়া গেলেন।

হালিমাকে সদরে লইয়া যাইবার প্রস্তাবে বৃদ্ধ সৈয়দ সাহেব তো একেবারে আকাশ হইতে পড়িলেন। বসিয়া ছিলেন–একেবারে আধ হাত উঁচু হইয়া চক্ষু কপালে তুলিয়া উঠিলেন সে কী! মান-সম্ভ্রম তোমরা আর কিছু রাখলে না দেখছি!

আবদুল্লাহ্ বেশ একটুখানি প্রতিবাদের সুরে কহিল, মান-সম্ভ্রমের কথা পরে, জান। বাঁচান আগে। ডাক্তারবাবু যেমন বললেন, তাতে এখানে রেখে চিকিৎসা চলতে পারে না, অথচ রোগ কঠিন।

সৈয়দ সাহেব বিরক্ত হইয়া কহিলেন, নাঃ, এখানে তো আর কারো কোনোদিন চিকিৎসা হয় নি, তোমরা খোদার উপর ভরসা করতে শেখ নিওটা ইংরেজি পড়ারই দোষ। খোদা যদি হায়াত রেখে থাকেন, তবে যেখানেই থাকুক না কেন, চিকিৎসা হবেই। তগদির কখনো রদ হবার নয়।

তাই বলে কি তদ্বির কত্তে খোদা মানা করেছেন?

না, তা মানা করবেন কেন? বেশ তো, তদবির কর। কবিরাজ মশায় দেখছেন, না হয় কলকাতা থেকে হাকিম সাহেবকেও আনাও। তিনি আমাদের হযরতের ঘরেও দাওয়া করে থাকেন–আর আমাদের পীর ভাই–খুব যত্ন করে দাওয়া করবেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, আজকালকার হাকিমদের চিকিৎসার উপর আমার বিশ্বাস নেই। ওদের সেই চৌদ্দ পুরুষের তৈরি কতকগুলো নোকা আছে, সেইগুলো আন্দাজে চালায়, যেটা খাটে সেটাতে রোগ সারে, আর যেটা না খাটে, তাতে কিছুই হয় না। হালিমার যে অবস্থা, তাতে হাকিমের হাতে দিতে আমার ভরসা হয় না। ডাক্তারি চিকিৎসাই করাতে চাই।

তা ডাক্তারি করাতে হয়, এইখানেই করাও–ও সদরে যাওয়া হবে না। আর সেখানে। নিয়ে গেলেই বা রাখবে কোথায়? বাড়ি দেবে কে তোমাকে?

কেন আকবর আলী সাহেবদের ওখানে…

কীহ্! আকবর মুন্সীর বাড়ি? তারা কোনকালের কুটুম আমাদের যে বউমাকে সেখানে পাঠাব? দু পাতা ইংরেজি পড়ে জ্ঞান-বুদ্ধি সব ধুয়ে খেয়েছ? কী বলে তুমি ওদের বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে! ওরা কে, তা জান? ওদের সঙ্গে যে তোমরা বসা-ওঠা কর, সেই ঢের, তার উপর আবার অন্দর নিয়ে সেখানে যাওয়া! এ কি একটা কথা হল?

বৃদ্ধের ভাবগতিক দেখিয়া আবদুল্লাহ্ প্রমাদ গনিল। সত্যই তো সেখানে আর বাড়ি পাওয়া যাইবে না। এক আকবর আলীর আশ্রয় গ্রহণ ভিন্ন কোনো উপায় নাই; কিন্তু সৈয়দ সাহেব তাহার আভিজাত্যের গর্বে হালিমাকে সেখানে লইয়া যাইতে দিবেন না। আবদুল্লাহ্ দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া উঠিয়া গেল।

অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া কোনো উপায় স্থির করিতে না পারিয়া অবশেষে আবদুল্লাহ্ সেই রাত্রেই পশ্চিম পাড়ায় সরকার মহাশয়ের বাড়ির দিকে চলিল। সেখানে উপস্থিত হইয়া ডাক্তারবাবুর সহিত দেখা করিতে চাহিল। দেবনাথ তখন আহারে বসিয়াছিলেন। সংবাদ পাইয়া তাড়াতাড়ি আহার সারিয়া বাহিরে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, খবর কী? এত রাত্রে যে!

আবদুল্লাহ্ দুঃখিত চিত্তে কহিল, খবর বড় ভালো নয় ডাক্তারবাবু। হালিমাকে তো বরিহাটীতে নিয়ে যেতে পাচ্ছি নে।

কেন, কর্তার বুঝি অমত?

অমত বলে অমত! শুনে একেবারে চটেই উঠেছেন। সেখানে এক আমাদের মুন্সী সাহেবের বাড়ি ছাড়া আর উঠবার জায়গা নেই, কিন্তু সেখানে তিনি কিছুতেই নিয়ে যেতে দেবেন না।

কেন?

তারা নাকি ছোটলোক!

ওঃ! তবে একটা বাড়ি ভাড়া নেবেনখন।

বাড়ি কোথায় পাব? মুসলমানকে কেউ বাড়ি দেয় না।

বাঃ! কেন দেবে না? চেষ্টা কল্লে নিশ্চয়ই পাবেন। ভাড়া পাবে–বাড়ি দেবে না কেন?

চেষ্টা এর আগে ঢের করে দেখা গেছে। কোনোমতেই পাওয়া গেল না। আবদুল কাদের তো আজ ক বছর মুন্সী সাহেবদের বাড়িতেই কাটিয়ে দিলে।

দেবনাথ একটু চিন্তা করিয়া কহিলেন, আচ্ছা, আমার কোয়ার্টার ছেড়ে দিই যদি তা হলে আসতে পারবেন?

আবদুল্লাহ্ একটু আশ্চর্যান্বিত হইয়া কহিল, আপনার কোয়ার্টার ছেড়ে দেবেন? আর আপনি?

আমার ফ্যামিলি তো এখন ওখানে নাই; স্বচ্ছন্দে ছেড়ে দিতে পারব। আমি হয়। বাইরের কামরাটায় থাকবখন, না হয় হসপিটাল এসিস্টেন্টের ওখানে…

সত্যিই বলছেন ডাক্তারবাবু?

বাঃ! সত্যি বলছি নে তো কি আর মিথ্যে বলছি? আমার ওসব প্রেজুডিস নেই।

আবদুল্লাহ্ আবেগভরে দেবনাথের হাত ধরিয়া কহিল, ডাক্তারবাবু, কী বলে আপনাকে ধন্যবাদ দেব তা আমি ভেবে পাচ্ছি নে। বাস্তবিক আমি…

থাক, থাক। আপনি এখন যান; গিয়ে সব বন্দোবস্ত ঠিক করে ফেলুন; কাল সকালেই রওয়ানা হতে হবে। দেরি হয়ে গেলে রোগীর অবস্থা সঙ্কট হয়ে দাঁড়াবে।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান