আবদুল্লাহ » ছাব্বিশ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০০:৫৬
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৫৬
দৃষ্টিপাত
রাবিয়া আসিয়া যখন হালিমার শুশ্রূষার ভার লইল, তখন সে বেচারির দুঃখ ঘুচিল। আবদুল্লাহর মাতাও রান্নাঘর হইতে নিষ্কৃতি পাইলেন–রাবিয়ার মামা সেখানে তাহার স্থান। গ্রহণ করিল। ডাক্তারবাবু এক্ষণে প্রত্যহ আসিয়া দেখিয়া যাইতে লাগিলেন। রোগীর অবস্থা সম্বন্ধে এখনো নিশ্চয় করিয়া কিছু বলা যায় না। ফুসফুঁসের অবস্থা আর বেশি খারাপ হয় নাই; খুব সম্ভব ...

রাবিয়া আসিয়া যখন হালিমার শুশ্রূষার ভার লইল, তখন সে বেচারির দুঃখ ঘুচিল। আবদুল্লাহর মাতাও রান্নাঘর হইতে নিষ্কৃতি পাইলেন–রাবিয়ার মামা সেখানে তাহার স্থান। গ্রহণ করিল।

ডাক্তারবাবু এক্ষণে প্রত্যহ আসিয়া দেখিয়া যাইতে লাগিলেন। রোগীর অবস্থা সম্বন্ধে এখনো নিশ্চয় করিয়া কিছু বলা যায় না। ফুসফুঁসের অবস্থা আর বেশি খারাপ হয় নাই; খুব সম্ভব একুশ দিনে জ্বর ছাড়িতে পারে। কিন্তু সেই দিনটাই সঙ্কটের দিন। যদি ভালোয় ভালোয় কাটিয়া যায়, তবেই রক্ষা। ক্রমে কয়েক দিনের মধ্যে ডাক্তারবাবু আরো দুইবার ইনজেকশন দিলেন।

আবদুল খালেক দুই দিন পরেই চলিয়া গেলেন বাড়িতে কেহই নাই, একজন না। থাকিলে সেখানকার কাজকর্ম নষ্ট হইয়া যাইবে। যাইবার সময় বারবার করিয়া বলিয়া গেলেন যেন প্রত্যহ পত্র লেখা হয়, এবং সময় পাইলেই সত্বর অন্তত এক দিনের জন্যও একবার আসিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুত হইলেন।

আবদুল্লাহ্ বা আবদুল কাদের কাহাকেও আর এখন রোগিণীর শুশ্রূষা সম্বন্ধে কিছুই দেখিতে হয় না। তাহারা ঔষধাদি আনিয়া দিয়া এবং ডাক্তারবাবুর আদেশগুলি শুনাইয়া খালাস। রাবিয়া ও মালেকা পালা করিয়া রাত্রি জাগে। আবদুল্লাহ একবার রাত্রি জাগরণের। ভাগ লইতে চাহিয়াছিল; কিন্তু রাবিয়া তাহাকে আমল দেয় নাই। বলিয়াছিল, মেয়েমানুষের শুশ্রষা কি পুরুষমানুষ দিয়ে হয়?

একুশ দিনের দিন ডাক্তারবাবু বলিলেন, আজ বড় সাবধানে থাকতে হবে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় খবর দিবেন। রাত্রে আমার এইখানেই থাকা দরকার হতে পারে।

বৈকালের দিকে একটু একটু ঘাম দিয়া জ্বর কমিতে আরম্ভ করিল। সন্ধ্যার পর দেখা গেল, জ্বর ১০০ ডিগ্রির নিচে নামিয়াছে। ডাক্তারবাবুকে খবর দেওয়া হইল। তিনি তাড়াতাড়ি আহারাদি সারিয়া ব্যাগ হাতে করিয়া আসিলেন, এবং একবার হালিমার অবস্থা নিজে দেখিতে চাহিলেন। গিয়া দেখিলেন, হাত-পা বেশ একটু ঠাণ্ডা হইয়া গিয়াছে। জ্বর আরো কমিয়াছে এবং বেশ একটু ঘামও হইতেছে। কহিলেন, একটু পরেই জ্বর একেবারে ত্যাগ হইবে; কিন্তু যদি টেম্পারেচার বেশি নামে, তবেই বিপদ। দেখা যাক, কী হয়। যদি বেশি ঘাম হয়, তবে তৎক্ষণাৎ আমাকে ডাকবেন।

সে রাত্রে আর কাহারো ঘুম হইল না। দারুণ উৎকণ্ঠায় সকলে বসিয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাইতে লাগিলেন। রাত্রি প্রায় একটার সময় হালিমার অত্যন্ত ঘাম হইতে লাগিল এবং শরীর এলাইয়া পড়িল। ডাক্তারবাবুকে ডাকা হইল। তিনি কহিলেন, যা ভেবেছিলাম কিন্তু ভয় নেই, ও ঠিক হয়ে যাবেখন। আর একটা ইনজেকশন দিতে হবে।

নূতন একটা ইনজেকশন দেওয়া হইল। কিছুক্ষণ পরে রোগীর অবস্থা একটু ফিরিল, শরীরে উত্তাপ বাড়িল, হাত-পা বেশ গরম হইয়া উঠিল, ঘাম বন্ধ হইল। সকলের মনে আশা হইল এ যাত্রা হালিমা বাঁচিয়া যাইবে।

কিন্তু শেষরাত্রের দিকে আবার ঘাম ছুটিল। ডাক্তারবাবু আবার ইনজেকশন দিলেন। ব্যাগ হইতে একটা তীব্র ঔষধ বাহির করিয়া একটু খাওয়াইয়াও দিলেন, এবং কহিলেন, ওঁকে এখন চুপ করে পড়ে থাকতে দিন, যদি একটু ঘুম হয়। আর ভয় নেই, হার্টের অবস্থা ভালো।

যাহা হউক, উদ্বেগে দুর্ভাবনায় রাত্রিটা একরকম কাটিয়া গেল। ভোরের দিকে হালিমার বেশ গাঢ় নিদ্রা হইল। ডাক্তারবাবু কহিলেন, আর কোনো ভয় নেই, এ যাত্রা উনি রক্ষা পেয়ে গেলেন। এখন ওঁর সেবা-শুশ্রূষার দিকেই একটু বেশি নজর রাখতে হবে।

পরদিন হইতে হালিমার অবস্থা ভালোই দেখা যাইতে লাগিল। কিন্তু শরীর এত দুর্বল যে কথা কহিতে কষ্ট হয়। কাশিও একটু রহিয়া গেল। ডাক্তারবাবু বলকারক ঔষধের এবং দুবেলা মুরগির সুরুয়ার ব্যবস্থা করিলেন। রাবিয়া এবং মালেকার সযত্ন ও সস্নেহ শুশ্রূষায় হালিমা দেখিতে দেখিতে সুস্থ হইয়া উঠিল। আগের দিন ডাক্তারবাবু তাহাকে অন্ন-পথ্য করিবার অনুমতি দিলেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, ডাক্তারবাবু, কাল আমাদের ঈদ, বড়ই আনন্দের দিন। তার উপর আমার বোনটি ঈশ্বরেচ্ছায় আর আপনার চিকিৎসার গুণে বেঁচে উঠেছে, কাজেই আমাদের পক্ষে ডবল আনন্দ। যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে, তবে…

তবে কী?

আপনাকে নেমন্তন্ন কত্তে চাই?

ডাক্তারবাবু অতি আনন্দে বলিয়া উঠিলেন, বাঃ! হলে তো দেখছি তে-ডবল আনন্দ।

আবদুল্লাহ্ একটু দ্বিধার সহিত জিজ্ঞাসা করিল, খেতে আপনার আপত্তি নেই?

কিছু না! আমার ওসব প্রেজুডিস নেই, বিশেষ করে আপনাদের ঘরের পোলাও কোরমা-কো–কাবাব–এইসবের কথা মনে উঠলে সব প্রেজুডিস পগার পার হয়ে যায়!

আবদুল্লাহ্ আহ্লাদিত হইয়া কহিল, তবে কাল দুপুরবেলা আমাদের এখানে চাট্টি নুন ভাত খাবেন…

ডাক্তারবাবু যেন আকাশ হইতে পড়িলেন। নুন-ভাত? সে কী মশায়! আপনাদের বাড়িতে শেষটা নুন-ভাত খেয়েই জাতটা মারব?

আবদুল্লাহ্ হাসিয়া কহিল, তা মাল্লেনই যখন, তখন না হয় গরিবের বাড়ির নুন-ভাত খেয়েই এবার মারুন।

না, না, সেসব হবে না, মুরগি-মুসাল্লাম চাহিয়ে। একবার যা খেয়েছিলাম মশায়… বলিয়া ডাক্তারবাবু কবে কোন মুসলমান বাড়িতে কী কী খাইয়াছিলেন তাহার ইতিহাস সবিস্তারে বর্ণনা করিতে লাগিলেন। পরিশেষে রায় দিয়া ফেলিলেন, মাংসটা আপনাদের ঘরে খাসা রান্না হয়–অমন আমাদের ঘরে হয় না।

এমন সময় পাশের বাড়িতে একটা চিৎকার ছোটাছুটি গোলমাল শোনা গেল। ব্যাপার কী, জানিবার জন্য সকলে উৎকণ্ঠিত হইয়া বৈঠকখানা হইতে নামিয়া বাহিরে আসিলেন। ডাক্তারবাবুর বাসাটি হাসপাতালের হাতার এক প্রান্তে অবস্থিত। হাতার বাহিরে ছোট একটি বাগান, তাহার পর জনৈক উকিলের বাসাবাটী। সেইখানেই গোলমাল হইতেছিল। একজন চাকর হেই হেই দূর দূর রবে চিৎকার করিতে করিতে বাগানের দিকে ছুটিয়া আসিল; ইহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ একটা ঝি, এবং তাহারও পশ্চাতে ছোট ছোট কয়েকটা ছেলেমেয়ে ঢিল হাতে দৌড়াইয়া আসিতেছিল। একটা মুরগি কটুকটুকটাআশ রবে ক্রন্দন করিতে করিতে তাহাদের সম্মুখে উড়িয়া হাসপাতালের হাতার মধ্যে আসিয়া পড়িল। বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, কী হয়েছে রে রামা?

রামা নামক চাকরটি হাঁপাইতে হাঁপাইতে কহিল, হবে আর কী বাবু, মুরগি ঢুকেছে। বাড়িতে।

তারই জন্যে এত চেঁচামেচি? আমি বলি বুঝি-বা ডাকাত পড়েছে।

ঝি কহিল, বাঃ, রান্নাঘরের দোরে গে উঠল যে! ভাত-তরকারি সব গেল! বাবুর কাছারি যাবার সময় হল, কখন আবার ব্রাধবে? না খেয়েই বাবুকে কাছারি যেতে হবে। আর তাও বলি, আপনিই-বা কেমন ধারা মানুষ বাপু, বাড়িতে মুরগি পুষছে, তা কিছু বলচ না! আমাদের বাবু কত বকাবকি করে…

আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি বাড়ির ভিতর গিয়া মামাটার ওপর তম্বি করিতে লাগিল! এত করে বলি, এ হিন্দুপাড়া, মুরগিগুলো বেঁধে রাখতে, তা কেউ সে কথা কানে করে না…

মামা কহিল, বাধাই তো ছিল ঠ্যাঙ্গে দড়ি দে। কম্নে যে খুলে পলায়ে গেছে তা ঠাওর কত্তি পারি নি।

তা নেও, এখন ওটাকে ধরে ভালো করে বেঁধে রাখ। আমাদের জন্যে ডাক্তারবাবুকে পর্যন্ত কথা শুনতে হচ্ছে। ভদ্দরলোক মনে করবে কী?

বাহিরে আসিয়া আবদুল্লাহ্ বলিল, ডাক্তারবাবু আপনাকে তো অনেক কষ্ট দিলামই, তার উপর আমাদের জন্যে আপনাকে অপদস্থ পর্যন্ত…

আরে রামঃ! এসব কথা কি গ্রাহ্য কত্তে আছে? আপনি বুঝি ভেবেছেন এ বাড়িতে মুরগির চাষ এই প্রথম? তা নয়; আমারই একপাল মুরগি ছিল। এদ্দিন ওরা কিছু বলতে সাহস করে নি–এখন আপনারা রয়েছেন কিনা, তাই একবার ঝালটা ঝেড়ে নিলে। আচ্ছা আমি এটা বুঝতে পারি নে, কাক ঢুকলে হাঁড়ি মারা যায় না, মুরগি ঢুকলে যায় কেমন করে? কাকে তো খায় না, এমন ময়লাই নেই!

আবদুল্লাহ্ কহিল, মুরগিটা যে আপনাদের সাংঘাতিক রকম অখাদ্য…

গোমাংসের চেয়েও?

তা না হতে পারে, কিন্তু অপবিত্র তো বটে।

আর কাকটা বুঝি ভারি পবিত্র হল? ওসব কোনো কথাই নয়। আমার মনে হয়, এর মূলে একটা বিদ্বেষ ভাব আছে। তা মরুক গে যাক–অপবিত্র হোক আর অখাদ্যই হোক, কাল কিন্তু ওটা চাই, নইলে সহজে জাত খোয়াচ্ছি নে…

এই বলিয়া ডাক্তারবাবু হাসিতে হাসিতে বিদায় লইলেন।

বৈকাল হইতেই রাবিয়ার পুত্র আবদুস সামাদ চাঁদ দেখিবার জন্য নদীর ধারে গিয়া দাঁড়াইল। কাছারির ফেরতা পিয়াদা-চাপরাসীরাও নদীর ধার দিয়া আকাশের দিকে চাহিতে চাহিতে চলিয়াছে। সন্ধ্যার একটু পূর্বেই ঈদের ক্ষীণ চন্দ্র-লেখা পশ্চিম আকাশের গায়ে ফুটিয়া উঠিল। দেখিতে পাইয়াই সামু আসিয়া চিৎকার করিয়া সকলকে ডাকিয়া কহিতে লাগিল, আম্মা, দাদু, চাঁদ উঠেছে, ওই দেখুন।

কই? কই? বলিতে বলিতে সকলে বাহিরে আসিয়া আকাশের দিকে চাহিয়া চাঁদ খুঁজিতে লাগিলেন! হালিমাও রাবিয়ার কাঁধে ভর করিয়া আস্তে আস্তে বাহিরে আসিয়া তাহাদের সঙ্গে যোগ দিল।

রাবিয়া প্রথমেই দেখিতে পাইল এবং ফুপু-আম্মাকে দেখাইবার জন্য বৃথা চেষ্টা করিতে লাগিল। চাঁদ এত ক্ষীণ যে কিছুতেই তাহার নজরে আসিল না। অবশেষে তিনি দুঃখিতচিত্তে কহিলেন, আর মা! সে চোখ কি আর আছে, যে দেখতে পাব? তোমরা দেখেছ, তাইতে আমার হয়েছে।

অতঃপর যে যাহার গুরুজনের কদমবুসি করিল। আবদুল্লাহ্ এবং আবদুল কাদেরও বাড়ির ভিতরে আসিয়া মুরব্বিগণের কদমবুসি করিয়া গেল। আবদুল্লাহর মাতা সকলকে দোয়া করিতে লাগিলেন, খোদা চিরদিন তোমাদের ঈদ মোবারক করুন!

হালিমা কদমবুসি করিতে আসিলে মাতা গদগদকণ্ঠে কহিলেন, থাক থাক, ব্যারাম নিয়ে আর সালাম করিস্ নে। এ ঈদে যে তুই আবার সালাম করবি, এ ভরসা ছিল না মা! শোকর তোর দরগায় খোদা! এই বলিয়া তিনি অঞ্চলে চক্ষু মুছিলেন।

সন্ধ্যার পরেই আকবর আলী সাহেব আসিয়া কহিলেন, সব্‌রেজিস্ট্রার সাহেব, কাল নামাযে ইমামতি করতে হবে আপনাকে।

আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, কেন, আপনাদের মৌলবী সাহেব কোথায় গেলেন!

আকবর আলী কহিলেন, তিনি তো সেদিনকার সেই গোলমালের পর থেকে আর এ-মুখো হন নি! সৈয়দ সাহেব সেদিন বেচারাকে সকলের সামনে যে অপমানটা করলেন, অমন কোনো ভদ্রলোক করে না। বেচারার মনে বড় চোট লেগেছে!

আবদুল্লাহ্ কহিল, আহা, তা লাগবারই কথা। আমার শ্বশুরের সেটা ভারি অন্যায় হয়ে গেছে। তিনি মস্ত বড় শরীফ, এই অহঙ্কারেই তিনি একেবারে অন্ধ।

আকবর আলী কহিলেন, সে মৌলবী সাহেবকে তো আর পাওয়া যাবে না; এখন আপনাদের একজনকে ইমামতি কত্তে হচ্ছে। আপনার ওয়ালেদ সাহেবই যখন তাকে তাড়িয়েছেন, তখন আপনারই উচিত ক্ষতিপূরণ করা, সব্‌রেজিস্ট্রার সাহেব।

আবদুল্লাহ্ কহিল, ক্ষতিপূরণ ও-ভাবে কলে তো হবে না–সেই মৌলবী সাহেবকে ডেকে যদি আমরা সকলে তার পিছনে নামায পড়ি, তবে কিছুটা হয় বটে।

আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, তিনি থাকেন কোথায়?

আকবর আলী কহিলেন, বেশি দূর নয়, ওপারে নিকারিপাড়ায়।

তবে তাকে খবর দিন না, কাল ঈদের নামাযে ইমামতি কত্তে।

আমি গত জুমায় তার কাছে লোক পাঠিয়েছিলাম, তা তিনি আসলেন না।

আবদুল্লাহ কহিল, তবে এক কাজ করি না কেন? আমরা নিজেরা গিয়ে তাকে অনুরোধ করে আসি…

আবদুল কাদের কহিল, দোষ কী? কয়েকজন একসঙ্গে দু-তিনটে হেরিকেন নিয়ে যাবখন।

আকবর আলী কহিলেন, নিতান্তই যদি যেতে চান তবে আমি কয়েকজন লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি, তাদের সঙ্গে করে নিয়ে যান। কিন্তু একথা সৈয়দ সাহেব জানতে পারলে আপনাদের আর আস্ত রাখবেন না…

আবদুল্লাহ্ বাধা দিয়া কহিল, ইঃ! কী করবেন আমাদের? ওঁর ও ফাঁকা আওয়াজের আমরা আর বড় তোয়াক্কা রাখি নে।

সেই রাত্রেই আবদুল্লাহ্ এবং আবদুল কাদের ওপারে নিকারিপাড়ায় গিয়া উপস্থিত হইল। মৌলবী সাহেব যে বাড়িতে ছিলেন, তাহা খুঁজিয়া বাহির করিতে বেশি বেগ পাইতে হইল না। তাহারা ঘরে উঠিয়া সালাম-সম্ভাষণ করিতেই মৌলবী সাহেব যেন আকাশ হইতে পড়িলেন। বলিয়া উঠিলেন, এ কী আপনারা! এখানে!…

আবদুল্লাহ্ কহিলেন, জি হ্যাঁ, আমরাই, আপনারই কাছে এসেছি।

মৌলবী সাহেব কহিলেন, আপনাদের মতো লোকের আমার কাছে আসাটা একটু তাজ্জবের কথা বটে। কী মনে করে আপনাদের আসা হয়েছে?

কাল ঈদের নামায পড়াবার জন্যে আপনাকে বরিহাটী যেতে হবে।

মৌলবী সাহেব আশ্চর্য হইয়া কহিলেন, আমাকে পড়াতে হবে? আবার?

সে কথা মনে করে আর কষ্ট করবেন না, মৌলবী সাহেব। যা হবার তা হয়ে গেছে। বুড়ো মানুষ–শরাফতের গুমোর ওঁদের হাড়ে-মাংসে জড়িয়ে আছে–ওঁর কথা ছেড়ে দিন। আমরা আছি–ওঁর মেজ ছেলে এই সব্‌রেজিস্ট্রার সাহেবও আছেন–আমরাই আপনাকে অনুরোধ কচ্ছি, মেহেরবানি করে এসে আমাদের ইমামতি করুন।

মৌলবী সাহেব চুপ করিয়া রহিলেন। আবদুল্লাহ্ আবার জিজ্ঞাসা করিল, কী বলেন, মৌলবী সাহেব?

মৌলবী সাহেব হাত দুটি জোড় করিয়া কহিলেন, আমাকে মাফ করুন। আমরা ছোটলোক হলেও একটা মান-অপমান জ্ঞান তো আছে! ধরুন, আপনাকেই যদি কেউ কোনোখানে অপমান করে, সেখানে কি আর আপনার যেতে ইচ্ছা করে? তার উপর এরা আবার আমাকে যত্ন করে রেখেছে–এদের ফেলে তো যাওয়া যেতেই পারে না।

এ কথার আর কি জওয়াব দেওয়া যায়? অথচ এ-বেচারার উপর যে অত্যাচারটা হইয়া গিয়াছে, তাহার একটা প্রতিকার করিবার জন্য আবদুল্লাহ্ উদ্বিগ্ন হইয়া রহিয়াছে। সে ভাবিতে লাগিল।

হঠাৎ আবদুল্লাহর মাথায় একটা খেয়াল আসিল। সে বলিয়া উঠিল, তবে আমরাও আসব আপনার সঙ্গে নামায পড়তে…

মৌলবী সাহেব যেন একটু সঙ্কোচের সহিত কহিলেন, আপনারা এতদূরে আসবেন কষ্ট করে…

কষ্ট আর কী, মৌলবী সাহেব, এই রাত্রে যখন আসতে পেরেছি, তখন দিনে এর চেয়েও সহজে আসতে পারব। কী বল, আবদুল কাদের?

আবদুল কাদের কহিল, তা তো বটেই! আমরা ঠিক আসব।

মৌলবী সাহেব একটু আমতা আমতা করিয়া তা–তবে– ইত্যাদি কী যেন বলিতে যাইতেছিলেন। আবদুল্লাহ বাধা দিয়া কহিল, আপনি মনে কিছু দ্বিধা করবেন না, মৌলবী সাহেব। আমাদের কোনো কু-মতলব নেই। সরলভাবেই বলছি, আপনি একজন আলেম লোক বলে আমরা আপনাকে মনে মনে শ্রদ্ধা করি আপনার পিছনে নামায পড়া আমরা গৌরবের কথা বলেই মনে করব।

মৌলবী সাহেব যাহার বাড়িতে ছিলেন, সে লোকটা নিকারিদের মোড়ল। সেও সেখানে উপস্থিত ছিল। সে বলিল, বেশ তো, আপনারা যেতি আমাগোর সাতে নোমায পড়তি আসেন, সে তো ভালো কতা!

আবদুল্লাহ্ কহিল, কেন আসব না? আমরা সব্বাই মুসলমান, ভাই ভাই। যত বেশি ভাই মিলে একসঙ্গে নামায পড়া যায়, ততই সওয়াব বেশি হয়। ঈদের নামায যেখানে বড় জমাত হয়, সেইখানেই গিয়ে পড়া উচিত–কী বলেন, মৌলবী সাহেব?

মৌলবী সাহেব কহিলেন, সে তো ঠিক কথা!

আবদুল্লাহ্ কহিল, ওপারে জমাত ছোট হয়। কজনই-বা লোক আছে বরিহাটীতে। আমি চেষ্টা করব, যাতে ওখানকার সকলেও এপারে এসে নামায পড়েন।

এ প্রস্তাবে সকলেই খুশি হইয়া উঠিল। মোড়ল কহিল, আমাগোর হ্যাঁপারে যে জোমাত হয়, মানুষির মাথা গুনে শ্যাষ করা যায় না। এই গেরদের বিশ তিরিশ হান্ গেরামের লোক আসে আমাগোর ঈদগায়ে নোমায পড়তি। মাঠহাও পেল্লায়–বহুত লোক বসতি পারে। এত বড় ঈদগা এ-গেরুদের মদ্দি নেই!

আবদুল্লাহ্ কহিল, আপনার কাছে আরো একটা অনুরোধ আছে, মৌলবী সাহেব। নামায পড়াতে যাবার অনুরোধ তো রাখলেন না; তার বদলে আমরাই আসছি। কিন্তু এ অনুরোধটা রাখতেই হবে।

মৌলবী সাহেব কুণ্ঠিতভাবে কহিলেন, আমাকে এমন করে বলে কেন লজ্জা দিচ্ছেন আপনারা…

না, না, ওরকম কেন মনে কচ্ছেন আপনি! আমার অনুরোধ এই যে, কাল দুপুরবেলা আমাদের বাসায় আপনাকে দাওৎ কবুল কত্তে হবে।

মৌলবী সাহেব মোড়লের মুখের দিকে চাহিলেন। মোড়ল কহিল, তা ক্যামন করে হবে, মেয়া সাহেব, ঈদির দিন উনি আমাগোর বাড়ি না খালি হবে ক্যান্?

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা উনি রাত্রে এখানে খাবেনখন। উনি তো কেবল আপনাদেরই মৌলবী সাহেব নন, আমাদেরও মৌলবী সাহেব। আমরাও ওঁকে একবেলা খাওয়াব।

মোড়ল কহিল, না, ঈদের দিন ওনারে আমরা যাতি দি ক্যাম্নয়? আপনারা ওনারে পাছে খাওয়াবিন।

আমরা যে দুই-এক দিনের মধ্যে চলে যাচ্ছি মোড়লসাহেব। কাল ছাড়া আর আমাদের দিনই নেই।

কাজেই মোড়ল সাহেবকে হাল ছাড়িতে হইল। স্থির হইল যে, কাল নামায বাদ মৌলবী সাহেব ওখানে খাইতে যাইবেন, কিন্তু রাত্রে উহাদিগকে মোড়ল বাড়ির দাওয়াদ কবুল করিতে হইবে। অবশ্য কাল দ্বিপ্রহরে মোড়ল স্বয়ং গিয়া রীতিমতো দাওয়াদ করিয়া আসিবে। আবদুল্লাহ্ রাজি হইয়া গেল।

রাত্রে বাসায় ফিরিয়া আবদুল্লাহ্ দেখিল, আবদুল খালেক আসিয়াছেন, তিনি কাজের ঝঞ্ঝাটে অনেক চেষ্টা করিয়াও এ কয়দিন আসিতে পারেন নাই বলিয়া কৈফিয়ত দিলেন। কিন্তু সে-সকল কৈফিয়তে কান দিবার মতো মনের স্থিরতা আবদুল্লাহর ছিল না। শ্বশুর কর্তৃক অপমানিত মৌলবীটিকে লইয়া কাল যে ব্যাপার ঘটাইতে হইবে, তাহারই ভাবনায় উন্মনা হইয়া ছিল। সে আবদুল খালেককে সকল কথা খুলিয়া বলিল। তিনিও অনুমোদন করিলেন দেখিয়া আবদুল্লাহ্ বড়ই খুশি হইয়া গেল।

পরদিন ভোরে উঠিয়াই আবদুল্লাহ্ আকবর আলী সাহেবের নিকটে উপস্থিত হইয়া ওপারে নামায পড়িতে যাইবার প্রস্তাব উত্থাপন করিল; কিন্তু আকবর আলী তাহাতে রাজি হইতে পারিলেন না। কহিলেন, যখন তাহারই চেষ্টায় ইহারা সকলে একটা জুমা-ঘর প্রস্তুত করিয়াছে, এবং কয় বৎসর ধরিয়া এখানে রীতিমতো নামায হইয়া আসিতেছে, তখন এ-স্থান ছাড়িয়া অন্যত্র নামায পড়িতে যাওয়া কর্তব্য হইবে না। বিশেষত একবার নামায বাদ পড়িলে ভবিষ্যতে ইহার স্থায়িত্ব সম্বন্ধে গোল ঘটিতে পারে।

অগত্যা আবদুল্লাহ্ স্থির করিল, কেবল তাহারাই কয়জন ওপারে যাইবে। আকবর আলী নিরস্ত করিতে চেষ্টা করিলেন। কিন্তু সে কহিল, যখন কথা দিয়া আসা হইয়াছে, তখন যাইতেই হইবে।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান