আবদুল্লাহ » সাতাশ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০০:৫৮
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৫৮
দৃষ্টিপাত
বেলা দেড় প্রহর হইতে না হইতেই আবদুল্লাহরা নিকারিপাড়ার ঈদগাহে আসিয়া উপস্থিত হইল। তখন ঈদগাহ প্রায় ভরিয়া উঠিয়াছে। নিকটবর্তী বহু গ্রাম হইতে লোকে এইখানে ঈদ-বকরীদের নামায পড়িতে আসে, প্রায়-ছয় সাত শত লোকের জমাত হইয়া থাকে। তাহারা আসিতেই সকলে ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল, এবং তাহাদের সালাম-সম্ভাষণের যুগপৎ প্রতি-সম্ভাষণে একটা সমুচ্চ গুঞ্জন উপস্থিত হইল। ...

বেলা দেড় প্রহর হইতে না হইতেই আবদুল্লাহরা নিকারিপাড়ার ঈদগাহে আসিয়া উপস্থিত হইল। তখন ঈদগাহ প্রায় ভরিয়া উঠিয়াছে। নিকটবর্তী বহু গ্রাম হইতে লোকে এইখানে ঈদ-বকরীদের নামায পড়িতে আসে, প্রায়-ছয় সাত শত লোকের জমাত হইয়া থাকে।

তাহারা আসিতেই সকলে ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল, এবং তাহাদের সালাম-সম্ভাষণের যুগপৎ প্রতি-সম্ভাষণে একটা সমুচ্চ গুঞ্জন উপস্থিত হইল। সকলেই বসিয়া ছিল–কেহ-বা মাদুর, কেহ-বা ছোট জায়নামাজ বা শতরঞ্জ পাতিয়া, কেহ-বা রঙিন রুমাল ঘাসের উপর বিছাইয়া স্থান করিয়া লইয়াছিল। মৌলবী সাহেব গ্রামের কয়েকজন মাতব্বর লোকসহ। ভিড়ের মধ্যে নড়িয়াচড়িয়া, যে দুই-এক জন লোক তখনো আসিতেছিল, তাহাদিগকে বসাইবার বন্দোবস্ত করিতেছিলেন। তিনি একটু অগ্রসর হইয়া কহিলেন, তশরীফ লাইয়ে, হুজুর! আপনাদের দেরি দেখে ভাবছিলাম, বুঝি আর আসা হল না।

আবদুল্লাহ্ কহিল, না, না, মৌলবী সাহেব, না আসবার তো কোনো কারণই নেই। ওখান থেকে সবাইকে আনবার জন্যে চেষ্টা কচ্ছিলাম কিনা, তাই একটু দেরি হয়ে গেল।

আর কেউ কি আসবেন?

না; তারা বলেন, এখানকার জুমা-ঘরে বরাবর নামায হয়ে আসছে, কাজেই সেটা বন্ধ করা ভালো দেখায় না।

মৌলবী সাহেব কহিলেন, তবে আর দেরি করে কাজ কী?

জমাতের মধ্য হইতে এক ব্যক্তি বলিয়া উঠিল, নামায শুরু হয়ে যাক–রোদ তেতে উঠল!

আর এক ব্যক্তি দূর-প্রান্ত হইতে কহিল, এট্টু দেরেঙ্গ করেন আপনারা, ওই যে আরো কজন মুসল্লি আসতিছেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, ঈদগাহটি এঁরা বেশ সুন্দর জায়গায় করেছেন কিন্তু! চারদিকে বড় বড় গাছ, সবটা জায়গা ছায়াতে ঢেকে পড়েছে। আরামে নামায পড়া যাবেখন।

মৌলবী সাহেব কহিলেন, কিন্তু দেরি হয়ে গেলে আর আরাম থাকবে না। ইমামের মাথার উপরেই রোদ লাগবে আগে!

আবদুল্লাহ এবার হাসিয়া কহিল, সেইজন্যেই বুঝি আপনি তাড়াতাড়ি কচ্ছেন?

মৌলবী সাহেব কহিলেন, তাও বটে, আর ঈদের নামাযে বেশি দেরি করা জায়েজ নয়, সেজন্যেও বটে।

এদিকে গ্রামের মোড়ল আর একজন মুসল্লি সঙ্গে লইয়া, দুই জনে একখানা বড় রুমালের দুই প্রান্ত ধরিয়া প্রত্যেকের নিকট হইতে ফেত্রার পয়সা আদায় করিতে আরম্ভ করিল। সেই মুসল্লিটি কহিতে লাগিল, ফেত্রার পয়সা দেন, মেয়া সাহেবরা! পোনে দু সের গমের দাম চোদ্দ পয়সা। ছোট বড়, কারো মাফ নেই। ছোট, বড় আওরত, মরদ। সলকার জন্যি ফেত্রা দেওয়া ওয়াজেব! হর হর বাড়ির মালিক জনে জনে হিসেব করে দেবেন! ফেত্রা না দিলি রোজার পুরা সওয়াব মেলে না!

রুমাল ঘুরিয়া চলিল এবং সঙ্গে সঙ্গে ঝনঝন পয়সা পড়িতে লাগিল। কেহ কহিল, এই নেন আমার পাঁচ জোনের ফেতরা এক ট্যাহা ছয় পয়সা; কেহ আমি একলা মানুষ বলিয়া সাড়ে তিন আনা পয়সা ফেলিয়া দিল; কেহ-বা কহিল, আমি বড় গরিব, মেয়া সাহেব। খোদায় মাফ করবি!

ক্রমে টাকা পয়সা সিকি দুআনিতে ভরিয়া রুমালখানি দারুণ ভারী হইয়া উঠিল। তখন সেখানি বেশ করিয়া বাধিয়া মেম্বারের পার্শ্বে রাখিয়া দিয়া আর একখানি রুমাল আনা হইল। এইরূপে তিন-চারিখানি রুমাল ভরিয়া ফেত্রা আদায় করা হইয়া গেলে মৌলবী সাহেব নামাযে খাড়া হইলেন। তখন ঈদগাহের পশ্চিম প্রান্ত রৌদ্রে ভরিয়া গেলেও মেন্বর প্রান্তস্থিত ভরা রুমালগুলি তাহাকে সূর্যতাপ অনুভব করিবার অবসর দিল না।

সকলে উঠিয়া কেবলামুখী হইয়া দাঁড়াইল। মৌলবী সাহেব চিৎকার করিয়া কহিলেন কাতার ঠিক করে দাঁড়াবেন, মিয়া সাহেবরা! পায়ের দিকে চেয়ে দেখবেন।

অমনি সকলে পার্শ্ববর্তীগণের পায়ের দিকে চাহিয়া দেখিয়া নড়িয়াচড়িয়া কাতার সোজা করিয়া লইল। নামায শুরু হইল।

নিয়ত করা হইয়া গেলে মৌলবী সাহেব সমুচ্চকণ্ঠে চারবার তীর উচ্চারণ করিলেন। অতঃপর সকলে তহরিমা বাধিয়া নতমস্তকে দাঁড়াইয়া ইমামের সুরা-পাঠ শ্রবণ করিতে লাগিল। ইমাম সাহেব বড়ই সুকণ্ঠ; প্রান্তর মুখরিত করিয়া তাহার মধুর কেরাত নামাযীগণের হৃদয়ে যেন প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। ক্রমে সুরা পাঠ শেষ হইলে আবার গম্ভীর রবে তীর উচ্চারিত হইল; অমনি সকলে যুগপৎ অর্ধঅবনমিত দেহে রুকু করিল–সুশিক্ষিত সেনাদল যেমন নায়কের ইঙ্গিতমাত্রে যন্ত্রচালিতের ন্যায় একযোগে আদেশ-পালনে তৎপর হয়, তেমনি তৎপরতার সহিত সকলে একযোগে রুকুতে অবনত হইল। আবার তীর উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তেমনই সকলে একযোগে দণ্ডায়মান হইল, এবং একযোগে ভূ-তলে জানু পাতিয়া ভূ-পৃষ্ঠ-মস্তকে সেজদা করিল। আল্লাহ্ যেমন এক তেমনি নামাযরত জনসংঘেরও যেন একই প্রাণ, একই দেহ!

দুই রাকাত নামায় দেখিতে দেখিতে শেষ হইয়া গেল; ইমামের সালাম পাঠের সঙ্গে সঙ্গে সকলে দক্ষিণে ও বামে মস্তক হেলাইয়া সমগ্র মোসলেম-জগতের প্রতি মঙ্গল আশীর্বাদ বর্ষণ করিল।

তাহার পর ইমাম মোনাজাত করিলেন এবং সকলে দুই হাত তুলিয়া তাহার সহিত যোগদান করিল। মোনাজাত হইয়া গেলে তিনি দণ্ডায়মান হইয়া আরবি কেতাব হাতে লইয়া খোবা পড়িতে লাগিলেন। যদিও তাহার এক বর্ণও কাহারো বোধগম্য হইল না, তথাপি সকলে ধর্মবুদ্ধিপ্রণোদিত হইয়া গভীর মনোযোগের সহিত খোত্বা শ্রবণ করিতে লাগিল।

খোৎবার পর আবার মোনাজাত হইল। তাহার পর আলিঙ্গনের পালা। প্রত্যেকে একবার ইমামের সহিত এবং আর একবার পরস্পরের সহিত কোলাকুলি করিবার জন্য ব্যগ্রতা দেখাইতে লাগিল। যেন সকলেই ভাই ভাই, এক প্রাণ, এক আত্মা! একতার এমন নিদর্শন। শার কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় না; কার্যক্ষেত্রে এমন নিদর্শনের এমন ব্যর্থতাও আর। সমাজে ঘটিয়াছে কি না সন্দেহ।

ঈদের নামায খতম হইল, যে যাহার ঘরে চলিল। মৌলবী সাহেবের রুমালে বাধা টাকা-পয়সার মোটগুলিও মোড়লের হাতে ঘরে চলিল! মৌলবী সাহেব তাহার ঘরে গিয়া সেখানে গনিয়া বাক্সবন্দি করিয়া আসিলেন, এবং আবদুল্লাহদের সঙ্গে নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে চলিলেন।

বেলা প্রায় দ্বিপ্রহরের সময় বাসায় পৌঁছিয়া যে-যাহার মুরব্বিগণের কদমবুসি করিল। মুরব্বিরাও সকলকে প্রাণ ভরিয়া দোয়া করিতে লাগিলেন।

তাহার পর আহারের পালা। ডাক্তারবাবুকে ডাকিয়া আনিবার জন্য সামুকে পাঠানো হইল। একটু পরেই ডাক্তারবাবু হসপিটাল অ্যাসিট্যান্ট বাবুকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসিলেন। কহিলেন, এঁকে ধরে নিয়ে এলাম। একা একাই জাতটা খুইয়ে লেজকাটা শেয়াল হব? আরো যতগুলার পারি লেজ কেটে দি!

আবদুল্লাহ সবিনয়ে কহিল, বড়ই সুখের বিষয় যে আপনি এসেছেন। আপনার প্রেজুডিস নেই তা তো জানিনে, কাজেই বলতে সাহস করি নি।

ডাক্তারবাবু কহিলেন, আরে, এর আর বলাবলি কী? যারা মুরগি-মাটনের স্বাদ একবার পেয়েছে, তাদের আর বলতে-কইতে হয় না কিছু। কী বল, ভায়া? আর এ আমার নিজের বাড়ি–আমিই তো ওঁকে নিমন্ত্রণ করে এনেছি।

বৈঠকখানা-ঘরে দস্তরখান বিছানো হইল। অন্দর হইতে খাঞ্চা ভরিয়া খানা আসিতে লাগিল এবং আবদুল খালেকের চাকর সলিম রেকাবিগুলি যথাস্থানে সাজাইয়া দিল। চিলমচি, বদনা প্রভৃতি আসিল। আবদুল্লাহ্ প্রথমেই ডাক্তারবাবুয়ের হাত ধোয়াইয়া দিল। তৎপরে মৌলবী সাহেবকে হাত ধুইবার জন্য অনুরোধ করিলে তিনি কহিলেন যে, আর আর সকলের হাত ধোয়া হইয়া গেলে তিনি ধুইবেন। কিন্তু আবদুল্লাহ্ ছাড়িল না, আপনি আগে ধোন। আপনারা আগে ধুয়ে নেন ইত্যাদি শিষ্টাচার কলহের পর মৌলবী সাহেবকেই হারিতে হইল–তিনিই সর্বাগ্রে হাত ধুইয়া লইলেন। এমনকি আবদুল্লাহ নিজেই তাহার হাতে জল ঢালিয়া দিল।

দস্তরখানে লোক বেশি নহে বলিয়া আর স্বতন্ত্র খাদেমের দরকার হইল না। আবদুল খালেক বসিয়া বসিয়াই সকলের রেকাবিতে তাম্বখশ করিয়া পোলাও পৌঁছাইয়া দিল এবং চামচে করিয়া কাবাব ও কোফতা বাটিতে লাগিল।

সুফী সাহেব আবদুল্লাহকে কহিলেন, উওহ্ নিমকদানঠো জারা বাঢ়া দিজিয়ে। আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি নিমকদান বাড়াইয়া দিল। তখন প্রত্যেকেই নিমক চাহিলেন, সুতরাং নিমকদানটা এবার সব হাত ঘুরিয়া আসিল।

সুফী সাহেব একবার সকলের মুখের দিকে চাহিতে চাহিতে জিজ্ঞাসুভাবে কহিলেন, বিসমিল্লাহ্? আবদুল্লাহ্ কহিল, জি হাঁ, বিসমিল্লাহ। খানা শুরু হইল।

সুফী সাহেব লোকটি বেশ ভোজনবিলাসী। দুই-এক লোকমা পোলাও খাইয়া তিনি বলিয়া উঠিলেন, ওঃ বড়া ওদা খানা পাক্কা! কাবাব ভি বহোৎ জায়েকাদার হুয়া!

ডাক্তারবাবু কহিলেন, বাস্তবিক, রান্নাটা খাসা হয়েছে কিন্তু। আমি অনেক জায়গায় খেয়েছি, কিন্তু এমনটি কোথাও খাই নি।

সামু খাইতে খাইতে জল চাহিল। সলিম এক গ্লাস জল ঢালিয়া তাহার হাতে দিল। কয়েক চুমুক খাইয়া সামু গেলাসটি দস্তরখানের উপর রাখিল। সুফী সাহেব চটিয়া উঠিয়া কহিলেন, বাড়া বে-তামিজ লাড়কা! দস্তরখান পর পানি কা গিলাস রাখতা হায়।

আবদুল খালেক কহিল, সামু, গেলাসটা তুলে সলিমের হাতে দাও বাবা।

খানা চলিতে লাগিল। আবদুল্লাহ কোরমার পেয়ালাটি বাম হস্তে তুলিয়া আনিয়া কাছে রাখিল এবং বাম হস্তে চামচ ধরিয়া কয়েকজনকে কোরমা তুলিয়া দিয়া, পেয়ালাটি আবদুল কাদেরের দিকে বাড়াইয়া দিয়া কহিল, দাও তো ভাই ওদিকে…ডাক্তারবাবুদের পাতে বেশি করে দিও!

দেবনাথবাবু আপত্তি করিয়া কহিলেন, ঢের রয়েছে যে, কত আর খাব! কিন্তু বলিতে বলিতেই দুই-তিন চামচ করিয়া কোরমা তাহাদের পাতে পড়িয়া গেল।

সুফী সাহেব কহিলেন, লাইয়ে তো পিয়ালা ইধার, নরম, এক বোটি চুন্ লে। আবদুল কাদের কোরমার পেয়ালা তাহার দিকে বাড়াইয়া দিল। সুফী সাহেব পেয়ালার ভিতর দক্ষিণ হস্তের অঙ্গুলি ডুবাইয়া দিয়া মাংসের টুকরা টিপিয়া টিপিয়া কয়েকখানি বাছিয়া তুলিয়া লইলেন।

আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি সলিমকে ডাকিয়া কানে কানে কহিয়া দিল, দৌড়ে আর একটা পেয়ালায় করে কোরমা নিয়ে আয় তো! আর একটা চামচও আনি।

সলিম দরজার কাছে গিয়া মামাকে ডাকিয়া কহিতেই সে আর এক পেয়ালা কোরমা চামচসহ আনিয়া দিল।–সলিম উহা লইয়া ভিতরে আসিলে আবদুল্লাহ্ তাহাকে কহিল, ওটা ডাক্তারবাবুদের সুমুখে রেখে দে।

কিছুক্ষণ পূর্বে সুফী সাহেব জল খাইয়া গেলাসটি কাছেই রাখিয়া দিয়াছিলেন। এক্ষণে আবার জলের আবশ্যক হওয়াতে তিনি গেলাসটি উঠাইয়া সলিমের হাতে দিয়া কহিলেন, পানি দেও।

গেলাসের তলায় সামান্য একটু জল ছিল, সলিম তাহাতেই আবার জল ঢালিয়া দিল। সুফী সাহেব চটিয়া উঠিয়া কহিলেন, জুঠা পানিমে পানি ডালতা হায়? ফেঁক দেও উওহ পানি।

সলিম সে জল ফেলিয়া দিয়া আবার এক গ্লাস ঢালিয়া দিল।

সামু আবদুল্লাহর পাশেই বসিয়াছিল। সে ফিসফিস করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ফুপাজান, জুঠা পানিতে পানি ঢাললেই দোষ, আর ভরা পিয়ালায় জুঠা হাত ডুবালে দোষ হয় না?

আবদুল্লাহ্ কহিল, চুপ, ওকথা এখন থাক্।

ক্রমে আহার শেষ হইল। তাহার পর হাত ধুইবার পালা। সলিম চিলমচি, বদনা, তোয়ালে প্রভৃতি লইয়া আসিল। ডাক্তারবাবুদেরই আগে হাত ধোয়ানো হইল। তাহারা সাবান দিয়া হাত ধুইলেন। তাহার পর মৌলবী সাহেব, তিনিও সাবান লইলেন। কিন্তু বিলাতি সাবানে হারাম বস্তু থাকা সম্ভব মনে করিয়া সুফী সাহেব তাহা স্পর্শ করিলেন না; কেবল জল দিয়া হাত ধুইয়াই–খ্যাক–থু করিতে করিতে বেশ করিয়া তোয়ালে দিয়া মুছিয়া ফেলিলেন। হাতের আঙুলে যত চর্বি, ঘি প্রভৃতি জড়াইয়া ছিল, তাহাতে তোয়ালেখানি সুন্দর বাসন্তী রঙে রঞ্জিত হইয়া গেল! আবদুল্লাহ্ বাড়ির ভিতর গিয়া তাড়াতাড়ি আর একখানি পরিষ্কার তোয়ালে লইয়া আসিল।

পান আসিল এবং সঙ্গে সঙ্গে আবদুল কাদের দশ টাকার করিয়া পাঁচখানি নোট আনিয়া দেবনাথবাবুর সম্মুখে রাখিয়া দিল।

ডাক্তারবাবু একটু আশ্চর্য বোধ করিয়া কহিলেন, ও কী?

আবদুল কাদের কহিল, আপনার ভিজিট বাবদ আমরা এতদিন কিছু দিতে পারি নি, ডাক্তারবাবু। তা ছাড়া আপনি আরো যে উপকার করেছেন, তার তো কোনো তো মূল্যই হয় না। তবে মেহেরবানি করে যদি এটা অন্তত সামান্য নজর বলে কবুল করেন…

ডাক্তারবাবু কহিলেন, না, না; ওসব আবার কী! আমি তো এখানে ডাক্তার বলে আসিনে, বন্ধুভাবেই এসেছি। আর আপনারা তো ধওে গেলে হসপিটালেই আছেন–আমার বাড়িতে জায়গা ছিল, তাই ওয়ার্ডে না রেখে এইখেনেই রেখেছি…

তা হোক, হসপিটালই হোক আর যাই হোক, আমরা আপনার কাছে যে কতদূর ঋণী তা এক ঈশ্বর জানেন, আর আমরা জানি। এ সামান্য নজরটা অবশ্য সে ঋণের পরিশোধ হতেই পারে না–তবে আমার সাধ্যে যেটুকু কুলোয় তাই দিচ্ছি, ওটা আপনাকে নিতেই হবে।

ডাক্তারবাবু একটু ভাবিয়া কহিলেন, না নিলে পাছে আপনারা বেজার হন, তাই নিচ্ছি–কিন্তু আর না… বলিয়া তিনি দুখানি নোট উঠাইয়া লইলেন। কিছুতেই অধিক লইতে চাহিলেন না।

এমন সময়, ম্যা সাএব শ্যালাম, শ্যালাম বলিতে বলিতে, এবং সুদীর্ঘ হাতখানি সম্মুখের দিকে হঠাৎ বাড়াইয়া দিয়া আবার টানিয়া লইয়া কপালে ঠেকাইতে ঠেকাইতে, নিকারিপাড়ার মোড়ল আসিয়া ঘরে ঢুকিল।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান