আবদুল্লাহ » চব্বিশ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০০:৫২
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৫২
দৃষ্টিপাত
ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টারটি পাওয়া গিয়াছে শুনিয়াও সৈয়দ সাহেব প্রথমটা রাজি হন নাই। কিন্তু আবদুল্লাহ্ একেবারে নাছোড়বান্দা হইয়া জেদ করিয়া হালিমাকে পরদিন বেলা দেড় প্রহরের মধ্যেই নৌকায় তুলিয়া ফেলিল। কেবল সে হালিমাকে লইয়াই ছাড়িল, এমন নহে। প্রবল বাধা ও গুরুতর আপত্তি খণ্ডন করিয়া সে সালেহাকেও লইয়া চলিল। নহিলে রোগীর শুশ্রূষা করিবে কে? ...

ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টারটি পাওয়া গিয়াছে শুনিয়াও সৈয়দ সাহেব প্রথমটা রাজি হন নাই। কিন্তু আবদুল্লাহ্ একেবারে নাছোড়বান্দা হইয়া জেদ করিয়া হালিমাকে পরদিন বেলা দেড় প্রহরের মধ্যেই নৌকায় তুলিয়া ফেলিল। কেবল সে হালিমাকে লইয়াই ছাড়িল, এমন নহে। প্রবল বাধা ও গুরুতর আপত্তি খণ্ডন করিয়া সে সালেহাকেও লইয়া চলিল। নহিলে রোগীর শুশ্রূষা করিবে কে? আবদুল্লাহর মাতাও সঙ্গে গেলেন।

মাঝিরা নৌকা খুব টানিয়া বাহিয়া লইয়া চলিল! আসরের পূর্বেই তাহারা বরিহাটীর ঘাটে পৌঁছিলেন। নদীর তীরেই ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টার। হালিমাকে সাবধানে পালকিতে করিয়া বাসায় উঠানো হইল। ডাক্তারবাবু বলিয়া পাঠাইলেন রোগীকে এখন একটু বিশ্রাম করিতে দেওয়া হউক; যদি একটু নিদ্রা হয় ভালোই, যদি না হয়, সন্ধ্যার পরই তিনি একবার ভালো করিয়া পরীক্ষা করিবেন।

আবদুল কাদেরের নিকট সংবাদ দেওয়া হইল; সে তৎক্ষণাৎ ছুটিয়া আসিল; এবং আবদুল্লাহ্ কেমন করিয়া এমন অসাধ্য সাধন করিল তাহা ভাবিয়া আশ্চর্য হইয়া গেল। সে হাসপাতালে গিয়া ডাক্তারবাবুকেও অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাইয়া আসিল।

ডাক্তারবাবুর ঝি দ্বিপ্রহরে বাড়ি চলিয়া গিয়াছিল; সন্ধ্যার পূর্বেই সে আসিল। পরিবার নাই; ডাক্তারবাবু ছোট ডাক্তারবাবুর বাড়িতে খান। কাজেই ঝট-পাট দেওয়া ছাড়া তাহার আজকাল বড় একটা কাজ নাই। সে ধীরেসুস্থে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করিয়া লোকজন দেখিয়া মনে করিল, বুঝি গিন্নি মা-রা আসিয়াছেন। তাই সে একগাল হাসিয়া ঘরে উঠিয়া গেল; কিন্তু ঘরের ভিতর সব অপরিচিত মুখ দেখিয়া অবাক হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, আপনারা কারা গো?

আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, কেন?

না, তাই জিজ্ঞেস কচ্ছি, আপনাদের নতুন দেখনু কিনা…

এমন সময় হালিমা ক্ষীণস্বরে কহিল, ভাইজান, একটু পানি!

ঝি দুয়ারের বাহিরে কপাট ধরিয়া দাঁড়াইয়াছিল। হালিমার কথা শুনিয়া সে তাড়াতাড়ি। কপাট ছাড়িয়া দিয়া পায়ের আঙুলের উপর ভর করিয়া বলিয়া উঠিল, –মা গো! এরা যে মোচম্মান! ডাক্তারবাবু কেমন নোক গো! মোচম্মান ঘরে এনেচে! আমি এই চনু, আর এস্বনি, এদের বাড়ি আর কাজ করবনি! মা গো! কী হবে গো–এই সন্ধেবেলা নাইতে হবে গিয়ে…।

এরূপ বকিতে বকিতে এবং ডিঙ্গী মারিয়া পা ফেলিতে ফেলিতে সে উঠান পার হইয়া চলিয়া গেল।

ঠিক সন্ধ্যার সময় বাবু আসিলেন।

আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি ইফতার করিয়া বাহিরে গেল এবং আবদুল কাদের খাটের উপর একটা মশারি লটকাইয়া তাহার উপর দুই পার্শ্বে দুইটি মোটা চাদর ফেলিয়া পরদা করিয়া দিল। একখানি চেয়ার আনিয়া বিছানার পার্শ্বে রাখিল। আবদুল্লাহ্ ডাক্তারবাবুকে লইয়া ভিতরে আসিল।

আবার পরদার হাঙ্গামা দেখিয়া ডাক্তারবাবু কহিলেন, এর ভেতর থেকে তো স্টেথসকোপ ইউস্ করা যাবে না!

আবদুল কাদের উৎকণ্ঠিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কেন?

ডাক্তারবাবু একটু হাসিয়া কহিলেন, হার্ট আর লাংস-এর শব্দ অত্যন্ত মৃদু, খুব সাবধানে শুনতে হয়। এত কাপড়ের ভেতর থেকে স্টেথসকোপের নল চালিয়ে দিলে কেবল কাপড়ের ঘষার শব্দই শুনতে পাওয়া যাবে–লাংসের অবস্থা কিছুই বোঝা যাবে না। বাড়িতেও তো ওই রকম করা হয়েছিল, জিজ্ঞেস করুন আপনাদের দুলামিয়াকে।

আবদুল কাদের চিন্তিত হইয়া কহিল, তবে উপায়!

ডাক্তারবাবু কহিলেন, ওসব মশারি-টশারি তুলে ফেলুন, রোগীকে ভালো করে দেখতে দিন। না দেখে কি আন্দাজে চিকিৎসা চলে? আপনারা এজুকেটেড হয়েও যে এসব ওল্ড ফগিইজম ছাড়তে পারেন না, এ বড় আশ্চর্য!

আবদুল্লাহ্ কহিল, কি জানেন, ডাক্তারবাবু–পরদার মারামারিটা আমাদের ভেতর এত বেশি যে, এর একটু এদিক ওদিক হলেই মনে হয় বুঝি এক্ষণি আকাশ ভেঙ্গে মাথায় বাজ পড়বে! কিন্তু দরকারমতো পরদার একটু-আধটু ব্যতিক্রম কল্লে যে সত্যি সত্যিই বাজ পড়ে, সংসার যেমন চলছে তেমনিই চলতে থাকে, এটুকু পরীক্ষা করে দেখবার সাহস কারুর নেই!

ডাক্তারবাবু কহিলেন, তবে কি আমাকে আন্দাজেই চিকিৎসা কত্তে হবে?

আবদুল্লাহ্ কহিল, না, তা কল্লে চলবে কেন? এক কাজ করা যাক; রোগীর গায়ে আগাগোড়া একটা মোটা চাদর দিয়ে দিই, আপনি কাপড়ের উপর উপর থেকে স্টেথকোপ লাগিয়ে দেখুন। আবদুল কাদের কী বল?

আবদুল কাদের আমতা আমতা করিতে লাগিল। আবদুল্লাহ আবার দৃঢ়স্বরে কহিল, নেও, ওসব গোঁড়ামি রেখে দাও। ডাক্তারবাবু, আপনি মেহেরবানি করে একটু বাইরে দাঁড়ান, আমি সব বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি।

ডাক্তারবাবু বাহিরে চলিয়া গেলেন। আবদুল্লাহর মাতা অনেক আপত্তি করিলেন। আবদুল কাদেরও লোকে শুনলে কী বলবে, আব্বা ভয়ানক চটে যাবেন, ইত্যাদি অনেক ওজর করিতে লাগিল, কিন্তু আবদুল্লাহ্ কাহারো কথায় কান দিল না। অবশেষে হালিমাও ক্ষীণ স্বরে আপত্তি জানাইল, কহিল, ভাইজান, কাজটা কি ভালো হবে? সকলেই নারাজ…

আবদুল্লাহ্ কহিল, নে, নে, তুই থাম; আমি যা কচ্ছি তা তোর ভালোর জন্যেই কচ্ছি…।

উনি যে অমত কচ্ছেন ভাইজান!

হ্যাঁঃ, ওর আবার মতামত! ওকে আমি ঠিক করে নেব, তুই ভাবিস নে। থাক পড়ে এই চাদর মুড়ি দিয়ে, নড়ি চড়ি নে। আম্মা, আপনি ও-ঘরে যান। আবদুল কাদের, ডাক ডাক্তারবাবুকে।

আবদুল্লাহ্ এরূপ দৃঢ়তার সহিত কথা বলিয়া এবং কাজ করিয়া গেল যে, কেউ আর বাধা দিবার সুযোগ পাইলেন না। কর বাবা যা ভালো বোঝ! এখন বিপদের সময়–খোদা। মা কবৃনেওয়ালা।

ডাক্তারবাবু আসিয়া যথারীতি পরীক্ষাদি করিয়া কহিলেন, একবার চোখ-মুখের ভাবটা দেখতে পাল্লে ভালো হত।

আবদুল্লাহ্ কহিল, আর কাজ নেই ডাক্তারবাবু; আজ এই পর্যন্ত থাক। এরপর যদি দরকার হয়, না হয় দেখবেন। লাংসের অবস্থা কেমন দেখলেন?

চলুন, বলছি বলিয়া ডাক্তারবাবু বাহিরে আসিলেন। আবদুল কাদের ও আবদুল্লাহ্ পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিল। ডাক্তারবাবু কহিলেন, নিউমোনিয়া!

আবদুল্লাহ্ শঙ্কিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, একধারে, না দুইধারেই?

ডান দিকটায় তো খুব স্পষ্ট, বাঁ-দিকটাতেও একটু কনজেশ্চান্ বোধ হচ্ছে।

তা হলে তো ভয়ের কথা!

হ্যাঁ একটু ভয়ের কথা বৈকি! তবে শুশ্রূষা ভালো রকম চাই। ওষুধ তো চলবেই; সঙ্গে সঙ্গে বুকে পিঠে অনবরত পুলটিস দিতে হবে। ঠিক যেমন যেমন বলে দেব, তার যেন একটুও ব্যতিক্রম না হয়। নার্সিঙের উপরেই সমস্ত নির্ভর কচ্ছে। আর একটা কথা ইনজেকশন ট্রিটমেন্ট কত্তে পাল্লে ভালো হয়—

আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, সে কী রকম?

এক রকম সিরাম বেরিয়েছে, সেটা চামড়া ফুঁড়ে পিচকারি করে দিতে হয়। রোগের প্রথম অবস্থায় দিতে পাল্লে খুবই ফল পাওয়া যায়। এখনো সময় আছে, –কিন্তু সিরাম। কলকেতা থেকে আনাতে হবে। চিঠি লিখে সুবিধে হবে না; কি তার করেও সুবিধে হবে না–কার দোকানে পাওয়া যায় না-যায়, অনর্থক দেরি হয়ে যেতে পারে। কাউকে যেতে হবে–আজ রাত্রের গাড়িতেই…

আবদুল্লাহ কহিল, তা বেশ, আমিই না হয় যাচ্ছি–এখনো ট্রেনের সময় আছে।

তাই যান। আমি লিখে দিচ্ছি–স্মিথ কি বাথগেট কি আর কোনো সাহেব-বাড়ি থেকে নেবেন–ফ্রেশ পাওয়া যাবে। আর নিতান্তই ওদের ওইখানে না পান, তো অগত্যা বটকৃষ্ণ পালের ওখানে দেখবেন। কালকের গাড়িতেই ফেরা চাই কিন্তু পরশু সকালেই ইনজেকশন দিতে হবে।

ডাক্তারবাবু প্রেসক্রিপশন লিখিয়া এবং শুশ্রষার বিষয়ে ভালো রূপ উপদেশাদি দিয়া সব-অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জনের বাসায় চলিয়া গেলেন। আবদুল কাদের কহিল, দেখ ভাই, তুমি থাক, আমিই কলকেতায় যাই…।

আবদুল্লাহ্ একটু আশ্চর্য হইয়া কহিল, কেন?

তুমি না থাকলে আমার দ্বারা ওসব হাঙ্গামা হয়ে উঠবে না ভাই–বড় ভয় হয়, কী কত্তে কী করে বসব–আমি ওসব বড় একটা বুঝি-সুঝি নে…।

আবদুল্লাহ্ একটু ভাবিয়া কহিল, তুমি যাবে কী করে? ছুটি যদি না পাও?

কাল যে রবিবার!

ওহ হো? তাও তো বটে। আচ্ছা, তুমিই যাও, আমি থাকছি।

পরদিন প্রাতে কলিকাতায় পৌঁছিয়া আবদুল কাদের বরাবর তাহার পিতার পীর সাহেবের বাড়িতে গিয়া উঠিল, এবং সাক্ষাতে যথারীতি তাঁহার কদমবুসি করিয়া হালিমার অবস্থা এবং তাহার আগমনের কারণ সমস্ত আরও করিল। শুনিয়া তিনি কহিলেন, –আচ্ছা, বাবা, দাওয়া করো আওর দোআ-ভি করো! মায় সুফী কো তোহারে সাথ ভেজ দেতা, যো যো তদ্বির মায় বাতা দেউঙ্গা উওহ্ ঠিক ঠিক করে গা—এন্‌শা আল্লাহ্ আওর কোই খাওফ নেহি রহে গা।

পীর সাহেব যাহাকে সুফী বলিয়া নির্দেশ করিলেন তিনি তাহার একজন প্রধান মুরীদ। তাহার প্রকৃত নাম সফিউল্লাহ্; কিন্তু ধার্মিক লোক বলিয়া সকলে তাহাকে সুফী সাহেব বলিয়া ডাকিত। পোশাক তিনি ঠিক সুফী ধরনেরই পরিতেন; কখনো রঙিন লুঙ্গি, কখনো ঢিলা পায়জামা, তাহার উপর আগুলফ লম্বিত ঢিলা কোর্তা, এবং সর্বোপরি ঘন-ঘুণ্টি দেওয়া দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো গোল পকেটওয়ালা বেগুনি মখমলের সদৃরিয়া আঁটা, মাথায় কলপ দেওয়া রেশমি সুতার কাজ-করা সাদা টুপি, পায়ে দিল্লিওয়ালা নাগরা–দেখিলে লোকে তাহাকে পরম সুফী বলিয়া ভক্তি না করিয়া থাকিতে পারিত না। লেখাপড়া বড় কিছু শেখেন নাই; তবে মছলেকায় কোরান মজিদের পারা দশেক মুখস্থ করিয়া নিম-হাফেজ হইয়াছিলেন। দেশে তাহার বড় কিছু নাই–এইখানেই পড়িয়া থাকেন আর হযরতের হুকুম তামিল করেন। কলিকাতাতেই জনৈক পীর-ভাইয়ের এক বিধবা আত্মীয়াকে পীর সাহেবের হুকুমেই বিবাহ করিয়াছেন। সংসারের কোনো চিন্তা-ভাবনা নাই, নিশ্চিন্ত মনে এবাদত বন্দেগি করেন আর পীর সাহেবের মজলিসে বসিয়া অবসর কাল কাটাইয়া দেন।

আবদুল কাদের ঔষধ ক্রয় করিতে যাইবার জন্য বাহির হইবে মনে করিতেছে এমন সময় তাহার খালাতো ভাই মজিলপুরের ফজলুর রহমান আসিয়া উপস্থিত হইল। সে আবদুল কাদেরকে দেখিয়া কহিল, বাঃ, ভাই সাহেব যে! কখন এলেন? বলিয়া কদমবুসি করিল।

আবদুল কাদের কহিল, এই সকালে। তুমি এখানে কদ্দিন?

বলছি, থামুন বলিয়া ফজলুর রহমান আবদুল কাদেরকে পার্শ্ববর্তী কামরায় লইয়া গেল। সেখানে তক্তপোশের উপর বসিয়া ফজলু কহিতে লাগিল, আমি এবার ডেপুটিশিপের জন্য ক্যান্ডিডেট হয়েছি। বি-এটা পাস করতে পাল্লে কোনো কথাই ছিল না–তবে হযরত আশা দিচ্ছেন, বলছেন, চেষ্টা কর, খোদার মরজিতে হয়ে যাবে। তা উনি যখন এতটা বলছেন তখন আমার তো খুবই ভরসা হয়–কী বলেন ভাই সাহেব?

আবদুল কাদের কহিল, সে তো বটেই–ওঁর দোয়ার বরকতে কী না হতে পারে!

হ্যাঁ–ভাই, একবার চেষ্টা করে দেখছি–অনেক সাহেব-সুবার সঙ্গে দেখাও করেছি। সেদিন আমাদের কমিশনার ল্যাংলি সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তিনি খুব খাতির-টাতির করলেন–উঠে দাঁড়িয়ে শেকহ্যান্ড করে বসলেন–উঠে দাঁড়িয়ে, বুঝলেন ভাই সাহেব?

তা হলে বোধহয় তোমার চান্স আছে। ম্যাজিস্ট্রেট নমিনেশন দিয়েছে?

কমিশনার সাহেব বললেন, আমার কেসে সেসব লাগবে টাগবে না–একেবারে গভর্নমেন্ট থেকে হয়ে যাবে বোধহয়। তিনি আমাকে চিফ সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করতে বললেন…

করেছ দেখা?

না–করব এই দুই-এক দিনের মধ্যে। কমিশনার সাহেবের সঙ্গে দেখা করে এই পরশু কলকেতায় এসেছি। হযরত যেদিন যেতে বলবেন সেইদিন যাব। উনি যখন দোয়া কচ্ছেন, তখন হয়ে যাবে নিশ্চয়–কী বলেন ভাই সাহেব?

খুব সম্ভব হয়ে যাবে…

সম্ভব কেন! হবেই নিশ্চয়–আমার খুব বিশ্বাস।

বেশ তো, হয় যদি, সে খুব সুখের বিষয় হবে।

ফজলুর রহমান জিজ্ঞাসা করিল, তা আপনি এখন কী মনে করে?

তোমার ভাবীর বড্ড অসুখ…

কী–কী অসুখ?

নিউমোনিয়া…

বাপ্ রে! নিউমোনিয়া! কে দেখছে?

ডাক্তার দেবনাথ সরকার–বরিহাটীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন। বেশ ভালো ডাক্তার আমাদের ওদিকেই বাড়ি–তিনি এই ওষুধ লিখে দিয়েছেন, আজই কিনে নিয়ে রাত্রের গাড়িতে ফিরতে হবে। আবদুল কাদের প্রেসক্রিপশন বাহির করিয়া দেখাইল।

ওঃ–নিউমোনিটিক সিরাম। হ্যাঁ, আজকাল সিরাম ট্রিটমেন্টই হচ্ছে। তা কোত্থেকে নেবেন?

কোনো সাহেব-বাড়ি থেকে নিতে হবে।

চলুন তবে বাথগেটের ওখান থেকে কিনে দেবখন।

তা হলে তো ভালোই হয়, আমি ওসব সাহেব-টাহেবদের দোকানে কখনো যাই। নি, –তুমি সঙ্গে গেলে ভালোই হয়।

আচ্ছা যাবখন খেয়েদেয়ে দুপুরবেলা।

দ্বিপ্রহরের আহারাদির পর দুই জনে ট্রামে চড়িয়া বাথগেটের দোকানে গেল। সেখান হইতে ঔষধ কিনিয়া চাঁদনী হইতে আরো কিছু জিনিসপত্র সগ্রহ করিয়া বাসায় ফিরিবার জন্য তাহারা ট্রামে চড়িল। ট্রাম চলিতে লাগিল; কিন্তু কন্ডাক্টর টিকিট নিতে আসিল না। ক্রমে যখন ট্রাম তাহাদের নামিবার স্থানের নিকটবর্তী হইয়া আসিল, তখন সে আসিল। আবদুল কাদের পয়সা বাহির করিতেছিল, কিন্তু ফজলুর রহমান তাড়াতাড়ি দুয়ানি বাহির করিয়া কহিল, –থাক থাক, আমিই দিচ্ছি– বলিয়া দুয়ানিটা কন্ডাকটরের হাতে দিয়া একটু ইশারা করিল। কন্ডাক্টর চলিয়া গেল।

আবদুল কাদের কহিল, ও কী! টিকিট না দিয়েই চলে গেল যে?

যাকটিকিট নিতে গেলে আরো চারটে পয়সা দিতে হত–ছ পয়সা করে কিনা। ও দু আনা ওরই লাভ–আমাদেরও কম লাগল।

সেটা কি ভালো হল? ঠকানো হল যে!

ওঃ! আপনি পাড়াগায় থাকেন কিনা! এমন ঠকানো তো সব্বাই ঠকাচ্ছে… বলিতে। বলিতে উভয়ে ট্রাম হইতে নামিয়া বাসার দিকে চলিল।

সন্ধ্যার পর খানা খাইবার সময় পীর সাহেব সুফী সাহেবকে হালিমার রোগের জন্য যে যে তদ্বির করিতে হইবে তাহা বুঝাইয়া দিলেন। রাত্রি নয়টার সময় আবদুল কাদের তাহাকে লইয়া একখানি গাড়ি করিয়া স্টেশনের দিকে রওয়ানা হইল। ফজলুর রহমানও তাহাদিগকে গাড়িতে তুলিয়া দিবার জন্য সঙ্গে আসিল। গাড়ির ছাদে একটা বড় গোছের ট্রাংক, প্রকাণ্ড একটা বিছানার মোট, এবং কতকগুলি পোটলা-পুঁটলি দেখিয়া কুলিরা আসিয়া ঘিরিয়া দাঁড়াইল। সকলে গাড়ি হইতে নামিলে একটা কুলি আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কৌ কিলাস কে টিকিট মুন্সীজী?

ফজলুর রহমান কহিল, ইন্টার।

কুলি জিজ্ঞাসা করিল, টিকিট হায়, না করূনা হোগা? করুনা হোয় তো জলদি কিজিয়ে, পয়লা ঘণ্টা হো গিয়া।

আচ্ছা, আচ্ছা, হাম জানতা হায়। বলিয়া ফজলুর রহমান গাড়োয়ানকে জিনিসপত্র নামাইতে কহিল। কুলি নিম্নস্বরে কহিল, কেয়া বখশিশ মিলেগা কহিয়ে, বিনা ওজনকে চড়া দেগা।

আবদুল কাদের কহিল, আরে নেই, নেই, হামলোগ ওজন করা লেগা।

ফজলুর রহমান কহিল, আপনি আসুন না ভাই সাহেব, আমি দিচ্ছি সব ঠিক করে। এই কুলি, কেন্যা লেগা বোলো।

কুলি কহিল, –একঠো রুপিয়া মিল যায়, নবাব সাব!

আরে নেই নেই, আট আনা দেগা, চড়া দেও।

নেই সাব–-আপ লোক আমীর আমী, একঠো রুপিয়া দে দিজিয়েগা।

তব্‌ নেহি হোগা, যাও…।

কুলি যাইতে যাইতে কহিল, যাইয়ে ওজন করাইয়ে, দো তিন রুপিয়া লাগ্‌ জায়েগা।

আবদুল কাদের কহিল, তা লাগে লাগুক, ওসব ঠকামি দিয়ে কাজ নেই।

ফজলুর রহমান একটু অগ্রসর হইয়া কহিল, –এই কুলি, আরে চল কুছ কম লেও…

বারে আনা দিজিয়েগা?

আচ্ছা চল।

নেই, ঠিক ঠিক কহ্ দিজিয়ে–বারে আনা পয়সা লেঙ্গে, ইস্ সে কমতি নেহি হোগা!

আচ্ছা আচ্ছা, দেঙ্গে চল! জারা ঠারো, হাম্‌ টিকিট লে আতে হেঁ।

আবদুল কাদেরের রিটার্ন টিকিট ছিল, কেবল সুফী সাহেবেরই জন্য টিকিট কিনিতে হইবে। ফজলুর রহমান ভিড়ের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। তাহার পর প্রায় পনের মিনিট হইয়া গেল, তবু সে ফিরিতেছে না দেখিয়া আবদুল কাদের উদ্বিগ্ন হইয়া তাহাকে খুঁজিতে গেল! কিন্তু টিকিটঘরে তাহাকে কোথাও দেখিতে পাইল না। এদিক-ওদিক খুঁজিয়া না পাইয়া ব্যস্ত হইয়া ফিরিয়া আসিতেছে, এমন সময় ফজলুর রহমান অন্য একদিক হইতে আসিয়া পড়িল। আবদুল কাদের কহিল, এত দেরি হল? আমি আরো তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম।

ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? গাড়ির এখনো ঢের সময় আছে। চলুন।

সুফী সাহেব খাক-থু করিয়া থুতু ফেলিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, টিকিট হো গিয়া, ফজলু মিয়া?

হ্যাঁ, চলিয়ে, দেতে হেঁ বলিয়া ফজলু সকলকে লইয়া গাড়িতে গিয়া উঠিল। গেটের ভিতর দিয়া আসিবার সময় আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, কুলিরা কোথায় গেল? ফজলর রহমান হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিল, চুপ, আসুন, তারা আচে।

ইন্টার ক্লাস কামরার ধারে তাঁহারা দাঁড়াইয়া আছেন, এমন সময় কুলিরা অন্যপথে প্ল্যাটফর্মে ঢুকিয়া তাহাদের সম্মুখে আসিল। জিনিসপত্র তুলিয়া কুলি বিদায় করিয়া ফজলু নিম্নস্বরে কহিল, দেখুন, একটা লোকের কাছে একখানা রিটার্ন হাফ পাওয়া গেল। আজ শেষ তারিখ। তার যাওয়া হল না। আট গণ্ডা পয়সায় দিয়ে ফেলে। বেচারার সবটাই মারা যাচ্ছিল, আমাদেরও প্রায় ডেট্টাকা বেঁচে গেল।

সুফী সাহেব একবার খাক–থু করিয়া একগাল হাসিয়া কহিলেন, ও ফজলু মিয়া, আপ তো বড়া চালাক হায়। আপনে আজ বহুত পয়সা বাঁচা দিয়া।

ঘণ্টা পড়িল। তাড়াতাড়ি দুই জনে গাড়িতে চড়িয়া বসিলেন। ফজলুর রহমান বিদায় লইয়া গেল। গাড়ি ছাড়িয়া দিল।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান