আবদুল্লাহ » পঁচিশ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০০:৫৪
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৫৪
দৃষ্টিপাত
বরিহাটীতে ফিরিয়া আসিয়া আবদুল কাদের দেখিল তাহার পিতা আসিয়াছেন। দেখিয়াই তো তাহার চক্ষুস্থির! এক্ষণে হালিমার চিকিৎসার কী উপায় হইবে, তাহাই ভাবিতে গিয়া পিতার কদমবুসি করিতে সে যেটুকু বিলম্ব করিয়া ফেলিল, তাহা নিতান্তই দর্শনটুকু হইয়া উঠিল। পিতা যথাসম্ভব ক্রোধ চাপিয়া কহিলেন, তোমরা বাকি কিছু রাখলে না, দেখছি! আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, ...

বরিহাটীতে ফিরিয়া আসিয়া আবদুল কাদের দেখিল তাহার পিতা আসিয়াছেন। দেখিয়াই তো তাহার চক্ষুস্থির! এক্ষণে হালিমার চিকিৎসার কী উপায় হইবে, তাহাই ভাবিতে গিয়া পিতার কদমবুসি করিতে সে যেটুকু বিলম্ব করিয়া ফেলিল, তাহা নিতান্তই দর্শনটুকু হইয়া উঠিল।

পিতা যথাসম্ভব ক্রোধ চাপিয়া কহিলেন, তোমরা বাকি কিছু রাখলে না, দেখছি!

আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, কেন, আব্বা?

ডাক্তারকে নাকি দেখানো হয়েছে?

হ্যাঁ, তা চাদর মুড়ি দিয়ে তো ছিল!

থাকলই-বা! কোন্ শরীফের ঘরের বউ-ঝিকে এমন করে ডাক্তারকে দিয়ে পরীক্ষে করাতে দেখেছ? আর কি মুখ দেখাবার যো রইল? আবার শুনছি গা ছুঁড়ে দাওয়াই দেওয়া হবে–ওই ডাক্তারের সামনে বউ-মা গা আলগা করে দেবেন?

হাতের উপরটা একটুখানি আগা করে…

তা হলে বে-আবরু হল না? তোমরা কি জ্ঞান-বুদ্ধি একেবারে ধুয়ে খেয়েছ? আমি যদ্দিন আছি, বাবা, তদ্দিন এসব বে-চাল দেখতে পারব না। যা হবার তা হয়ে গেছে– ওসব ডাক্তারি-ফাক্তারির কাজ নেই, বাড়ি নিয়ে চল, আমি হাকিম সাহেবকে আনাচ্ছি– হযরতের কাছ থেকেও দোয়া-তাবিজ আনিয়ে দিচ্ছি, খোদা চাহে তো তাতেই আরাম হয়ে যাবে।

তার কাছে গিয়াছিলাম…

গিয়েছিলে? তবু ভালো! তা তিনি কী বললেন?

সুফী সাহেবকে পাঠিয়ে দিয়েছেন…

সুফী সাহেবকে?–কই, কোথায় তিনি?

বাইরের ঘরে আছেন।

সৈয়দ সাহেব তাড়াতাড়ি সুফী সাহেবের সঙ্গে দেখা করিতে চলিলেন।

আবদুল্লাহ কহিল, এখন উপায়?

তাই তো, কী করি!

চল ডাক্তারবাবুর কাছে যাওয়া যাক, দেখি তিনি কী বলেন।

ব্যাপার শুনিয়া ডাক্তারবাবু কহিলেন, কেসের এখনো প্রথম অবস্থা, কোনো খারাপ টার্ন নেয় নি। তবে ভবিষ্যতের জন্যে সাবধান হওয়া দরকার। কেবল ওষুধেও ফল যে না হয়। এমন কথা নয়–ওষুধ আর শুশ্রূষা। কিন্তু ইনজেকশন কয়েকটা দিতে পাল্লে অনেকটা নিশ্চিন্ত হওয়া যেত।

তাহার পর একটু ভাবিয়া তিনি আবার কহিলেন, এক কাজ কল্লে হয়। আপনারা কেউ দিতে সাহস করবেন?

আবদুল্লাহ্ কহিল, কী, ইনজেকশন?

আবদুল কাদের তাড়াতাড়ি কহিলেন, না, না, তার কাজ নেই…

ডাক্তারবাবু কহিলেন, কেন, ভয় কী? ইনজেকশন দেওয়া অতি সহজ। আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।

আবদুল্লাহ কহিল, আমাদের হাতে আবার কোনো বেকায়দা না হয়ে পড়ে…

না, না, কিছু হবে না। আপনি বরং আমার হাতেই দিয়ে একবার প্র্যাকটিস করে নেন!

এই বলিয়া ডাক্তারবাবু যন্ত্রপাতি বাহির করিলেন এবং সেগুলি যথারীতি পরিষ্কার করিয়া আবদুল্লাহকে কহিলেন, আসুন, আপনার হাতে একবার ছুঁড়ে দেখিয়ে দি।

আবদুল্লাহর বাহুমূলে হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জের সুচটি ফুটাইয়া দিয়া ডাক্তারবাবু প্রক্রিয়াগুলি বেশ করিয়া বুঝাইয়া দিলেন। তাহার পর সেটি বাহির করিয়া আবার পরিষ্কার করিলেন, এবং নিজের বাহুমূল বাহির করিয়া দিয়া কহিলেন, –এখন দিন দেখি আমাকে একটা ইনজেকশন।

আবদুল্লাহ্ নির্দেশমতো সাবধানে ডাক্তারবাবুর বাহুমূলে রীতিমতো টিংচার-আইওডিন মালিশ করিয়া সুচটি প্রবেশ করাইয়া দিল। তাহার পর যেই নলদণ্ডটি টিপিতে যাইবে, অমনি ডাক্তারবাবু বাধা দিয়া কহিলেন, থাক থাক, ওটা আর এখন টিপে অনর্থক খানিকটা বাতাস ঢুকিয়ে দেবেন না।

আবদুল্লাহ নিরস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, ঠিক হয়েছে তো?

ডাক্তারবাবু হাসিয়া কহিলেন, হ্যাঁ, ঠিক হয়েছে, ওতেই চলবে। তবে আমার হাতে হলে ব্যথাটা কম লাগত।

যাহা হউক, ডাক্তারবাবুর প্রদর্শিত প্রণালীতে যথারীতি সতর্কতা অবলম্বন করিয়া আবদুল্লাহ্ হালিমার বাহুমূলে ইনজেকশন করিয়া দিল।

ঔষধাদি রীতিমতো চলিতে লাগিল। এদিকে সৈয়দ সাহেব এবং সুফী সাহেব উভয়ে পীরসাহেবের আদেশমতো তদবির করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। হালিমার গলায় এবং বাহুতে তাবিজ বাধিয়া দেওয়া হইল, এবং দুই বেলা পীর সাহেবের দোয়া লেখা কাগজ ধুইয়া ধুইয়া খাওয়ানো হইতে লাগিল।

কিন্তু রোগীর শুশ্রূষা যেরূপ হওয়া উচিত সেরূপ হওয়া অসম্ভব হইয়া পড়িল। আবদুল্লাহর মাতা একে রুগ্ণা, বৃদ্ধা; এই রমজানের সময় তিনি আর কতই-বা খাটিতে পারেন! রান্নার কাজ প্রায় সব তাহাকেই করিতে হয়, নইলে রোগীর পথ্য পর্যন্ত প্রস্তুত হয় না। পুলটিস দেওয়া যেরূপ বৃহৎ ব্যাপার তাহাতেই দুই জন লোককে ক্রমাগত নিযুক্ত থাকিতে হয়; কিন্তু লোকাভাবে তাহা রীতিমতো দেওয়া ঘটে না; আবদুল্লাহ একটু বাহিরে গেলে ঔষধ খাওয়াইবারও সময় বহিয়া যায়। আবদুল কাদেরের কাজ অনেক, বেলা দশটা। হইতে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত তাহাকে আপিসে থাকিতে হয়। সালেহার তো জায়নামাজ আর তসবি আছেই; তাহার ওপর সন্ধ্যার পর তারাবির নামাযে খাড়া হইলে আর তাহাকে পাওয়া। যায় না; সুতরাং পরিচর্যা চলিতে পারে না। বাঁদীগুলা তো কেবল চিৎকার করা ছাড়া অন্য কোনো কাজ জানেই না!

ভাবিয়া চিন্তিয়া আবদুল্লাহ আবদুল খালেকের নিকট পত্র লিখিল।

এদিকে রোগীর অবস্থার আর বিশেষ কোনো পরিবর্তন দেখা যাইতেছে না– কোনোদিন জ্বরের বৃদ্ধি, কোনোদিন কাশির বৃদ্ধি–কিন্তু ডাক্তারবাবু বলিতেছেন, ভয়ের এখনো কোনো কারণ নাই। তবু আর একবার ফুসফুঁসের অবস্থাটা দেখিতে পারিলে ডাক্তারবাবু নিশ্চিন্ত হইতে পারিতেন; কিন্তু তাহার উপায় নাই। তিনি কদিন আর এ বাড়িতে আসেনই নাই; আবদুল্লাহ্ গিয়া অবস্থা জানাইতেছে এবং তিনি শুনিয়া ও টেম্পারেচার-চার্ট দেখিয়া ব্যবস্থা দিতেছেন।

সেদিন শুক্রবার। সুফী সাহেব জুমার নামায পড়িবার জন্য মসজিদে যাইতে চাহিলেন। মসজিদ বলিয়া একটা কিছু বরিহাটীর সদরে নাই। তবে মুসলমান পাড়ায় নিষ্ঠাবান পিয়াদা চাপরাসীরা আকবর আলী সাহেবের নেতৃত্বে চাদা তুলিয়া একটা টিনের জুমা-ঘর প্রস্তুত করিয়া লইয়া আজ কয়েক বৎসর হইতে তাহাতেই জুমা ও ঈদের নামায পড়িয়া। আসিতেছে। সৈয়দ সাহেব পিয়াদা-চাপরাসীদের সঙ্গে নামায পড়িতে যাইবার জন্য মোটেই উৎসুক ছিলেন না; কিন্তু সুফী সাহেবের প্রস্তাবে অমত করিতেও পারিলেন না। সুতরাং তাহাকে বিরস মনেই যাইতে হইল।

জুমা-ঘরে পৌঁছিয়া তাঁহারা দেখিলেন, প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ জন লোক জমিয়াছে। কেহ কালাল-জুমা পড়িতেছে, কেহ-বা পড়া শেষ করিয়া বসিয়া আছে। সৈয়দ সাহেবকে অনেকেই চিনিত, তাহাকে দেখিয়া তাহারা তটস্থ হইয়া তাড়াতাড়ি সরিয়া গিয়া সম্মুখের কাতারে তাঁহাদিগের জন্য স্থান করিয়া দিল। তাহারা অগ্রসর হইয়া কালাল-জুমা পড়িতে আরম্ভ করিলেন। আর আর সকলে পশ্চাতে বসিল, প্রথম কাতারে কেহই বসিতে সাহস করিল না।

কিছুক্ষণ পরে আকবর আলী সাহেবের সহিত একজন পাগড়িওয়ালা মৌলবী এবং আরো কয়েকজন মুসল্লি মসজিদে প্রবেশ করিতে করিতে উপস্থিত সকলকে মৃদুস্বরে সালাম সম্ভাষণ করিল। অনেকেই ঘাড় ফিরাইয়া তাহাদিগকে দেখিল এবং যথারীতি প্রতি-সম্ভাষণ করিল। সৈয়দ সাহেবের কাবলাল-জুমা তখনো শেষ হয় নাই।

পাগড়িওয়ালা মৌলবী সাহেব অগ্রসর হইয়া সৈয়দ সাহেবের পার্শ্ব দিয়া, সম্মুখস্থ পেশ নামাজের উপর গিয়া কালাল-জুমা পড়িতে লাগিলেন। আকবর আলী সঙ্গী কয়জনকে লইয়া সৈয়দ সাহেবের সহিত প্রথম কাতারে স্থান লইলেন। সৈয়দ সাহেব নামায শেষ করিয়া একমনে মাথা নিচু করিয়া বসিয়া নীরবে দোয়া-দরুদ পড়িয়া যাইতে লাগিলেন।

সানি আযান হইয়া গেল। এক্ষণে জুমার নামায শুরু হইবে। পাগড়িওয়ালা মৌলবী সাহেব খোবা পাঠ করিবার জন্য কেতাব হাতে লইয়া, মুসল্লিগণের দিকে ফিরিয়া দাঁড়াইলেন। সৈয়দ সাহেব তাহাকে এক নজর দেখিয়া লইবার জন্য মাথা উঁচু করিলেন।

সেই পাগড়িওয়ালা মৌলবী সাহেবকে দেখিবামাত্র সৈয়দ সাহেবের চেহারা ভয়ঙ্কর রকম বদলাইয়া গেল! ঘৃণায় ও রাগে কাপিয়া কাপিয়া কেয়া হায়, এত্তা বাৎ! বলিতে বলিতে বৃদ্ধ উঠিয়া দাঁড়াইলেন।

না জানি কী ঘটিয়াছে মনে করিয়া অনেকেই সেইসঙ্গে উঠিয়া দাঁড়াইল। আকবর আলী সাহেব ব্যস্ত সমস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কী, কী সৈয়দ সাহেব, কী হয়েছে?

সৈয়দ সাহেব ক্রোধে উন্মত্তের ন্যায় হইয়া চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন, এত বড় আস্পর্ধা ওর! ব্যাটা জোলা, পাগড়ি বেঁধে এমামতি কত্তে এসেছে?

আকবর আলী দৃঢ়স্বরে কহিলেন, কেন, তাতে কী দোষ হয়েছে? উনি তো দস্তুরমতো পাস-করা মৌলবী, ওঁর মতো আলেম এদেশে কয়টা আছে, সৈয়দ সাহেব?

এঃ! আলেম হয়েছে! ব্যাটা জোলার ব্যাটা জোলা, আজ আলেম হয়েছে, ওর চৌদ্দ পুরুষ আমাদের জুতো বয়ে এসেছে, আর আজ কিনা ও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে এমামতি করবে, আর আমরা ওই ব্যাটার পেছনে দাঁড়িয়ে নামায পড়ব?

পাগড়িওয়ালা মৌলবী সাহেব ধীরভাবে কহিলেন, এটা আপনার বাড়ি নয়, সৈয়দ সাহেব, এটা মসজিদ, সে-কথা আপনি ভুলে যাচ্ছেন।

সৈয়দ সাহেব রুখিয়া উঠিয়া কহিলেন, চুপ রহ্, হারামজাদা! আভি তুঝকো জুতা মাকে নেকাল দেঙ্গে।

মুসল্লিগণের মধ্য হইতে এক ব্যক্তি বলিয়া উঠিলেন, উনি কোহাকার লাট সাহেব গো? আমাগোর মৌলবী সাহেবের গালমন্দ দিতি লাগলেন যে বড়! এ আমারগোর জুমা ঘর, দে তো দেহি কেমন করে ওনারে বার করে দিতি পারেন উনি!

আর একজন কহিল, ওনারেই দেও বার করে–ওসব সয়েদ ফয়েদের ধার আমরা ধারি নে–

আকবর আলী তাহাদিগকে নিরস্ত করিয়া কহিলেন, সৈয়দ সাহেব, এটা আপনার অন্যায়। কেতাবমতো ধত্তে গেলে মুসলমানের সমাজেই উঁচু-নীচু বিচার নেই; তাতে আবার এটা খোদার ঘর–

সৈয়দ সাহেব বাধা দিয়া কহিলেন, তাই বলে জোলা তাঁতি নিকেরি যে-সে জাতের পেছনে দাঁড়িয়ে নামায পড়তে হবে? ভালো চাও তো ওকে এক্ষুনি বের করে দাও, ওর পেছনে আমরা নামায পড়ব না।

সমবেত লোকের মধ্য হইতে একটা প্রতিবাদের কলরব উঠিল। একজন চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, উনি না পড়েন উনিই বেরিয়ে যান না কেন? আমরা মৌলবী সাহেবকে দিয়ে নামায পড়াবই।

চলে আইয়ে সুফী সাহেব। শালা জোহা-লোক জাহা মৌলভী বন্‌কে ইমাম হোতা হায়, ওহ ভালে আদ্মী কা রান্না দোরস্ত নেহী। এই বলিয়া সৈয়দ সাহেব সুফী সাহেবকে টানিয়া বাহিরে লইয়া আসিলেন। সুফী সাহেব বাহিরে আসিয়া একবার খাক–থু করিলেন এবং সৈয়দ সাহেবের পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিয়া গেলেন। অতঃপর নির্বিবাদে জুমার নামায শুরু হইয়া গেল।

গরম মেজাজে বাসায় আসিয়া সৈয়দ সাহেব যাহা দেখিলেন, তাহাতে তাহার মেজাজে একেবারে আগুন লাগিয়া গেল। তিনিও ঘরে ঢুকিতেছেন, ডাক্তারবাবুও স্টেথসকোপ গুটাইয়া পকেটে ভরিতে ভরিতে বাহির হইতেছেন। পশ্চাতে আবদুল্লাহ্ এবং বারান্দায় খোদা নেওয়াজ।

সৈয়দ সাহেব থমকিয়া দাঁড়াইয়া চক্ষু লাল করিয়া একবার প্রত্যেকের মুখের দিকে চাহিয়া দেখিলেন। ডাক্তারবাবু বরাবর বাহির হইয়া চলিয়া গেলেন।

তোমাদের নিতান্তই কপাল পুড়েছে, আমি দেখছি। যা খুশি তাই কর তোমরা কিন্তু আমি এখানে আর এক দণ্ডও নয়। খোদা নেওয়াজ, যাও, নৌকা ঠিক কর গিয়ে। সওয়ারী যাবার নৌকা চাই।

খোদা নেওয়াজ ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করিল, সওয়ারী কেন, হুজুর?

সৈয়দ সাহেব চটিয়া উঠিয়া কহিলেন, যা বলি তাই কর, কৈফিয়ত তলব কোরো না।

খোদা নেওয়াজ চলিয়া গেল। সৈয়দ সাহেব গুম হইয়া বসিয়া রহিলেন। কিছুক্ষণ পরে আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, এদের সকলকে কি নিয়ে যাবেন?

সৈয়দ সাহেব কহিলেন, না। কেবল সালেহাকে নিয়ে যাব। তোমাদের এসব বে-পরদা কারবারের মধ্যে ওকে আমি রাখতে চাই নে। বউমাকে নিয়ে তোমরা যা খুশি তাই কর। ছেলেই যখন অধঃপাতে গেছে তখন বউ নিয়ে কি আমি ধুয়ে খাব?

আবদুল্লাহ্ বলিতে যাইতেছিল যে তাহার স্ত্রীকে সে যাইতে দিবে না। কিন্তু আবার ভাবিল, তাহাকে রাখিয়াও যে বড় কাজের সুবিধা হইবে, এমন নয়; বরং তাহাকে ধরিয়া রাখিতে গেলেই শ্বশুরের সঙ্গে একটা মনোবিবাদের সৃষ্টি হইয়া যাইবে, এবং স্ত্রীরও মনে কষ্ট দেওয়া হইবে। সুতরাং সে স্থির করিল, বাধা দিয়া কাজ নাই।

এক্ষণে আবদুল কাদেরকে সংবাদ দেওয়া উচিত বিবেচনা করিয়া আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি আপিসের দিকে চলিল। পথেই আবদুল কাদেরের সহিত তাহার দেখা হইল। খোদা নেওয়াজ তাহাকে আগে খবর দিয়া পরে নৌকা ঠিক করিতে গিয়াছিল।

আবদুল কাদের ব্যস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, আব্বা নাকি সকলকে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন?

কেবল সালেহাকে।

তাকে তুমি নিয়ে যেতে দেবে?

তা যাক না সে; সে তো কোনো কাজেই লাগছে না। আর ছোট তরফের ভাইজানকেও চিঠি লিখেছি; তিনিও হয়তো এসে পড়বেন–নেওয়াজ ভাইকেও বলে দেবখন তাকে শিগগির পাঠিয়ে দিতে। তোমার আর এখন বাসায় গিয়ে কাজ নেই–অনর্থক একটা বকাবকি মন-কষাকষি হবে। উনি যে যাচ্ছেন, এটা খোদার তরফ থেকেই হচ্ছে; থাকলে কেবল হাঙ্গামা কত্তেন বৈ তো নয়।

আবদুল্লাহর পরামর্শমতো আবদুল কাদের আবার আপিসে চলিয়া গেল। খোদা নেওয়াজ নৌকা ঠিক করিয়া আসিল। বৈকালেই সৈয়দ সাহেব সালেহাকে লইয়া রওয়ানা হইলেন। যাইবার সময় আবদুল্লাহর মাতা আপত্তি করিয়াছিলেন, কিন্তু আবদুল্লাহ্ তাঁহাকে বুঝাইয়া নিরস্ত করিয়াছিল। সুফী সাহেব রহিয়া গেলেন।

ঠিক সন্ধ্যার সময় আবদুল খালেক আসিয়া পৌঁছিলেন। সঙ্গে স্ত্রী রাবিয়া, পুত্র এবং মালেকা, একজন মামা এবং একজন চাকর।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান