আবদুল্লাহ » আটাশ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০১:০০
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০১:০০
দৃষ্টিপাত
স্কুল খুলিবার কয়েক দিন পরে আবদুল্লাহ্ একদিন ক্লাসে পড়াইতেছে, এমন সময় হেডমাস্টার তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। ক্লাসে কাজ করিবার সময় এমন করিয়া হঠাৎ ডাকিয়া পাঠানো স্কুলের রীতিবিরুদ্ধ–তবে কোনো বিশেষ জরুরি কারণ থাকিলে অবশ্য স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু সে জরুরি কারণটি এক্ষেত্রে কী? কিছু একটা গুরুতর অপরাধ হইয়া গিয়াছে, না কোনো অপ্রত্যাশিত শুভ ...

স্কুল খুলিবার কয়েক দিন পরে আবদুল্লাহ্ একদিন ক্লাসে পড়াইতেছে, এমন সময় হেডমাস্টার তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। ক্লাসে কাজ করিবার সময় এমন করিয়া হঠাৎ ডাকিয়া পাঠানো স্কুলের রীতিবিরুদ্ধ–তবে কোনো বিশেষ জরুরি কারণ থাকিলে অবশ্য স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু সে জরুরি কারণটি এক্ষেত্রে কী? কিছু একটা গুরুতর অপরাধ হইয়া গিয়াছে, না কোনো অপ্রত্যাশিত শুভ সংবাদ আসিয়াছে? এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে স্পন্দিত হৃদয়ে আবদুল্লাহ্ হেডমাস্টারের কামরায় গিয়া প্রবেশ করিল।

তাহাকে দেখিয়াই হেডমাস্টার স্মিতমুখে, গুড় নিউজ ফর ইউ, মৌলভী, লেটু মি কগ্রাচুলেট ইউ! বলিয়া আবদুল্লাহর হাতখানি ধরিয়া প্রবলবেগে দুই-তিনটা ঝকা দিয়া দিলেন।

আবদুল্লাহর বুকের ভিতর টিপটিপ করিতে লাগিল। সে ঔৎসুক্যে অধীর হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, ব্যাপার কী, স্যার?

হেডমাস্টার কহিলেন, কবে খাওয়াচ্ছেন তা আগে বলুন, –খোশ-খবর কি অম্‌নি অনি বলা যায়?

বেশ তো, যদি এমনই খোশ-খবর হয় তা হলে খাওয়াব বৈকি! অবিশ্যি আমার সাধ্যে যদ্র কুলোয়।

তা আর কুলোবে না? বলেন কী! যে খবর দিচ্ছি, তার দাম নেমন্তন্ন খাওয়ার চাইতে অনেক বেশি। আচ্ছা আপনি আঁচ করুন দেখি, এমন কী খবর হতে পারে?

সংবাদটি জানিবার জন্য আবদুল্লাহর প্রাণ অস্থির হইয়া উঠিয়াছিল–অতি কষ্টে ঔৎসুক্য দমন করিয়া কহিল, বোধ করি একটা প্রমোশন পেয়ে থাকব।

হেডমাস্টার অবজ্ঞাভরে কহিলেন, না, আপনার সাধ্যই নেই সে আসল কথাটা আঁচ করা। যদি বলি আপনি হেডমাস্টার হয়েছেন, বিশ্বাস করবেন?

কোথাকার হেডমাস্টার?

রসুলপুর হাইস্কুলের।

রসুলপুরের! আমি?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, বিশ্বাস হচ্ছে না? এই দেখুন ইনস্পেক্টরের চিঠি। ও স্কুলটা যে এখন প্রভিন্সিয়ালাইজড় হয়ে গেল। আপনাকে সত্বর রিলিভ করবার জন্যেও কড়া হুকুম এসেছে!

আবদুল্লাহ্ কম্পিতহস্তে পত্রখানি লইল এবং তাড়াতাড়ি তাহার উপর দিয়া চোখ বুলাইয়া গেল। সত্যই তো তাহাকে রসুলপুরের নূতন গভর্নমেন্ট হাইস্কুলের হেডমাস্টার নিযুক্ত করা হইয়াছে।–একশত টাকা বেতন। তৎক্ষণাৎ ইনস্পেক্টর সাহেবের শেষ কথা কয়টি তাহার মনে পড়িয়া গেল, আপনার যাতে সুবিধে হয়ে যায়, তার জন্য আমি চেষ্টা করব এবং কৃতজ্ঞতায় তাহার হৃদয় ভরিয়া উঠিল। পত্রখানি হেডমাস্টারকে ফিরাইয়া দিয়া সে গদগদকণ্ঠে কহিল, স্যার, এ কেবল আপনার সুনজর ছিল বলে…

হেডমাস্টার যথেষ্ট গাম্ভীর্য অবলম্বন করিয়া কহিলেন, সাহেব সেদিন ইনস্পেকশনের সময় আমাকে বলেছিলেন, রসুলপুর স্কুল প্রভিন্সিয়ালাইজড় হবে, আর সেখানে একজন ভালো হেডমাস্টার নিযুক্ত করা হবে। আমি তক্ষনি তাকে বললাম, আমার স্টাফে একজন খুব উপযুক্ত লোক আছেন। বুঝতেই পাচ্ছেন, আপনার কথাই আমি তাকে বলেছিলাম–তা তিনি আপনার নাম নোট করে নিয়েছিলেন। আচ্ছা, আপনাকে কোনো হিন্দু দেন নি?

না, স্যার। আমি স্কুলে একজন মৌলবী দেবার কথা বলতে গিয়েছিলাম, অন্য কোনো কথা হয় নি তো।

বড়ই আশ্চর্য! সাহেবের এ্যাটিচুড দেখে কিন্তু আমার তখনই মনে হয়েছিল যে, আপনাকেই সিলেক্ট করবেন–আর করেছেন তাই। যা হোক, আমার রেকমেন্ডেশনটা যে তিনি রেখেছেন, এতে আজ আমার ভারি আনন্দ হচ্চে, মৌলবী সাহেব!

আবদুল্লাহ্ বিনয়ের সাথে কহিল, আপনার অনুগ্রহ!

তা হলে আপনি কবে যাচ্ছেন?

যখন আপনার সুবিধে হবে…

আমার সুবিধের তো কথা হচ্ছে না–মৌলবী সাহেব, আপনাকে এ্যাটওয়ান্স রিলি করবার জন্যে যে অর্ডার আছে। বিলম্ব করা তো আপনার পক্ষে উচিত হবে না।

তবে কবে আমাকে রিলিভ করবেন?

বলেন তো কালই।

আচ্ছা, স্যার।

কিন্তু আপনি যত শিগগির পারেন, ওখানে গিয়ে জয়েন করবেন। যেতেও তো দিন দুই লাগবে–কমুনিকেশন ওখানকার বড়ই বিশ্রী। আপনি আজই গিয়ে সব গুছিয়েটুছিয়ে নিন।…

আবদুল্লাহ্ একটু ভাবিয়া কহিল, তা হলে হোস্টেলের চার্জ কাকে দেব?

হেডমাস্টার যেন একটু চমকিয়া উঠিয়া কহিলেন, ওঃ হো! সে কথা তো আমি আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছি। এই জানুয়ারি থেকে একজন মৌলবী আসচেন যে!

আবদুল্লাহ্ একটু আশ্চর্য হইয়া কহিল, অর্ডার এসেচে নাকি?

ইনস্পেক্টর সাহেব যে একেবারে এতখানি অনুগ্রহ করিয়া ফেলিবেন, ইহা স্বপ্নেরও অতীত। যাহা হউক, নিজের পদোন্নতিতে তো আবদুল্লাহ্ সুখী হইলই, তাহার ওপর মৌলবী নিযুক্ত করা সম্বন্ধে যে তাহার অনুরোধ রক্ষা করা হইয়াছে, ইহাতেও সে যথেষ্ট আত্মপ্রসাদ লাভ করিল।

দেখিতে দেখিতে স্কুলময় এই আশ্চর্য সংবাদ রাষ্ট্র হইয়া গেল। যে যে ঘণ্টায় যাহাদের বিশ্রাম, তখন তাহারা নানাপ্রকারে ইহার সমালোচনা করিতে লাগিলেন। কোথায় কোন স্কুলে কজন বিশেষ বিশেষ যোগ্য লোক আছেন, বরিহাটীর স্টাফেও আবদুল্লাহ্ অপেক্ষা সর্বাংশে শ্রেষ্ঠ কে কে আছেন, একে একে তাঁহাদের নাম হইতে লাগিল, এবং সকলেই একবাক্যে মত প্রকাশ করিলেন যে, এ লোকটা কেবল মুসলমান বলিয়াই হঠাৎ এমন বড় চাকরিটা পাইয়া গেল। ইহাও সকলে স্থির করিয়া ফেলিলেন যে, ও স্কুলের হেডমাস্টারি করা আবদুল্লাহর কর্ম নয়; দুদিনের মধ্যেই একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড ঘটিয়া যাইবেই যাইবে।

আবার কেহ কেহ কহিলেন, মুসলমানের আজকাল সাতখুন মাপ। আবদুল্লাহর আমলে স্কুলটি গোল্লা-নামধেয় স্থানবিশেষের প্রতি দুর্জয় ঝোঁক দেখাইলেও তাহার কোনো ভয়ের কারণ নাই। রসুলপুরের ভূতপূর্ব হেডমাস্টার বরদাবাবু কী-ই বা অপরাধ করিয়াছিলেন– কতকগুলো দুষ্ট ছেলে একটা কাণ্ড করিল, আর তাহার জন্য কিনা বেচারা বরদাবাবুর চাকরিটাই গেল। বরদাবাবু যদি মুসলমান হইতেন, তাহা হইলে স্কুলে স্বদেশীর হাট বসাইলেও গভর্নমেন্ট তাহাকে একটা খা বাহাদুরি না দিয়া ছাড়িতেন না। আর পড়াশুনা? আপনারা পাঁচজনে দেখিয়া লইবেন, যদি সাত বৎসরেও একটি ছেলে রসুলপুর হইতে এনট্রান্স পাস না করে, তথাপি আবদুল্লাহর প্রমোশন স্থগিত থাকিবে না।

যাহা হউক, আবদুল্লাহর এই সৌভাগ্যে আকবর আলী এবং আবদুল কাদের, এই দুই জন আন্তরিক সুখী হইলেন, এবং বারবার খোদার নিকট শোকর করিতে লাগিলেন। আকবর আলী কহিলেন, দেখুন খোনকার সাহেব, আপনার মুখের উপর বলাটা যদিও ঠিক নয়, তবু বলি যে, যোগ্য লোকের উন্নতি খোদা যে কোন দিক থেকে জুটিয়ে দেন, তা বলা যায় না। বাস্তবিক এখানে যার সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে, সকলেই আপনার প্রশংসা করে। বিশেষ আপনার খোশ-আখলাকে সকলেই মুগ্ধ। আপনি যাচ্ছেন বটে, খোদা করুন দিন দিন আপনার উন্নতি হোক–কিন্তু আমাদের আপনি কাঁদিয়ে যাচ্ছেন।

আবদুল্লাহ্ আজ্রকণ্ঠে কহিল, মুন্সী সাহেব, আপনি আমাকে বড্ড বেশি স্নেহ করেন বলেই এসব বলছেন…

আবদুল কাদের রহস্য করিয়া কহিল, নেও নেও; উনি স্নেহ করেন, আর আমি বুঝি করি নে? আমি কিন্তু ওয়াদা কচ্ছি, তুমি চলে গেলে এখানকার কেউ তোমার জন্য কাঁদবে না–আমিও না…

বলিতে গিয়া সত্য সত্যই আবদুল কাদেরের দুই চোখ ভরিয়া উঠিল। আবদুল্লাহ্ তাহাকে বক্ষের উপর টানিয়া ধরিয়া রুদ্ধকণ্ঠে কহিতে লাগিল, ভাই, প্রথম চাকরি পেয়ে অবধি আমরা দুজনে এক জায়গাতেই ছিলাম–বড়ই আনন্দে ছিলাম। এখন প্রমোশন পেলাম। বটে, কিন্তু তোমাদের ছেড়ে যেতে হবে, এই কথা মনে করে প্রাণটা অস্থির হচ্ছে। এ আড়াইটা বছর কী নির্ভাবনায়, কী আনন্দেই কেটে গেছে! বুঝি জীবনের এই কটা দিনই শ্রেষ্ঠ দিন গেল, এমন সুখের দিন আর হবে না, ভাই!

সন্ধ্যার কিছু পরে যখন আবদুল্লাহ্ বোর্ডিঙে ফিরিয়া আসিল, তখন দেখিল, স্কুলের অনেকগুলি ছাত্র সেখানে তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। তাহাকে আসিতে দেখিয়া সেকেন্ড ক্লাসের ছাত্র সতীশ অগ্রসর হইয়া নমস্কার করিল এবং কহিল, স্যার, আপনি হেডমাস্টার হয়ে চলে যাচ্ছেন, তাতে আমরা খুব খুশি হয়েছি; কিন্তু আমাদের ছেড়ে যাচ্ছেন বলে মনে বড় দুঃখ হচ্চে। তা আমরা আপনাকে একটা address দেব বলে হেডমাস্টার মহায়শকে বললাম, কিন্তু তিনি বললেন, ওটা নাকি rule-এর against-এ। এখন আপনি যদি বলেন, তবে অন্য কোনো জায়গায় মিটিং করে আপনাকে address দিই।

আবদুল্লাহ্ কহিল, না হে, যখন ওটা rule-এর against-এ তখন ওসবে কাজ নেই। তোমরা সকলে যে আজ আমার সঙ্গে এখানে দেখা কত্তে এসেছ, এতেই address-এর চাইতে আমাকে ঢের বেশি সম্মান করা হয়েছে।

অবনী নামক আর একটি ছাত্র নিরাশাব্যঞ্জক স্বরে কহিল, তবে কি স্যার, আমাদের address দেওয়া হবে না?

এই তো দিচ্ছ ভাই আমাকে address! সভা করে ধুমধাম না কলে কি আর মনের ভালবাসা জানানো হয় না? আজ সত্যিই আমি বুঝতে পাচ্ছি, তোমরা আমাকে কতখানি ভালবাস! এই বেশ; আমার সঙ্গে তোমাদের কেমন ভাব, লোকে তা নাই-বা জানল! শুধু তোমরা আর আমি জানলাম। এই বেশ।

আবদুল্লাহর কথাগুলি ছাত্রদের মর্মে গিয়া স্পর্শ করিল-–কয়েকজন আবেগভরে বলিয়া উঠিল, থাক, স্যার, address দিতে চাই নে–তবে ভগবান করুন যেন আপনি শিগগিরই আমাদের হেডমাস্টার হয়ে আসেন।

আবদুল্লাহ্ হাসিয়া কহিল, দেখ, পাগলগুলো বলে কী! কেন, আমাদের হেডমাস্টার তো চমৎকার লোক। তিনিই ইনস্পেক্টার সাহেবের কাছে আমার জন্যে সুপারিশ করে এই চাকরি করে দিয়েছেন, এমন লোককে কি অশ্রদ্ধা কত্তে হয়!

তা হোক স্যার, আপনি গেলে আপনার মতো স্যার আমরা আর পাব না।

দেখ, তোমরা আমাকে ভালবাস বলেই এমন কথা বলছ। আমার মতো শিক্ষক পাও আর না পাও–আশীর্বাদ করি যেন আমার অপেক্ষা শত সহস্রগুণ ভালো শিক্ষক তোমরা পাও।–কিন্তু তোমাদের কথাবার্তা শুনে আমি যে বুঝতে পাচ্ছি আমি তোমাদের ভালবাসা লাভ কত্তে পেরেছি, এতেই আমার মনে যে কত আনন্দ হচ্ছে, তা বলে শেষ করা যায় না। আশীর্বাদ করি, তোমরা মানুষ হও, প্রকৃত মানুষ হও–যে মানুষ হলে পরস্পর পরস্পরকে ঘৃণা কত্তে ভুলে যায়, হিন্দু মুসলমানকে, মুসলমান হিন্দুকে আপনার জন বলে মনে কত্তে পারে। এই কথাটুকু তোমরা মনে রাখবে ভাই, –অনেকবার তোমাদের বলেছি, আবার বলি, হিন্দু মুসলমান ভেদজ্ঞান মনে স্থান দিও না। আমাদের দেশের যত অকল্যাণ, যত দুঃখকষ্ট, এই ভেদজ্ঞানের দরুনই সব। এইটুকু ঘুচে গেলে আমরা মানুষ হতে পারব– দেশের মুখ উজ্জ্বল কত্তে পারব।

এইরূপ কিঞ্চিৎ উপদেশ দিয়া মিষ্ট কথায় তুষ্ট করিয়া আবদুল্লাহ্ সকলকে বিদায় দিল। যাইবার পূর্বে তাহারা জানিয়া গেল যে, আগামীকল্যই আবদুল্লাহ স্কুলের কাজ হইতে অবকাশ লইবেন এবং পরশু শুক্রবার বাদজুমা বিকালের ট্রেনে রওয়ানা হইবেন।

কিন্তু রওয়ানা হইবার সময় স্টেশনে ছাত্রদের কেহই আসিল না। আবদুল্লাহ্ মনে করিয়াছিল, তাহাকে বিদায় দিবার জন্য দুই-চারি জন ছাত্র নিশ্চয়ই স্টেশনে আসিবে, তাই প্ল্যাটফর্মের উপর দাঁড়াইয়া উৎসুক নেত্রে এদিক-ওদিক চাহিতে লাগিল। শেষ ঘণ্টা পড়িল, তবু কেহ আসিল না। আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি আকবর আলী এবং আবদুল কাদেরের সহিত কোলাকুলি করিয়া গাড়িতে চড়িয়া বসিল।

গাড়ি ছাড়িয়া দিল।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান