আবদুল্লাহ » সতের

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০০:৩৬
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৩৬
দৃষ্টিপাত
গৃহত্যাগ করিয়া আবদুল কাদের বরিহাটীর সদরে আসিয়া তাহার সহপাঠী ওয়াহেদ আলীর বাটীতে আশ্রয় লইল। ওয়াহেদ আলী তখন বাটীতে ছিল না; কিছুদিন পূর্বে সে পুলিশের সব্‌-ইনস্পেক্টারি চাকরি পাইয়া ট্রেনিঙের জন্য ভাগলপুরে চলিয়া গিয়াছিল। তাহার পিতা আকবর আলী আবদুল কাদেরের পরিচয় পাইয়া সযত্নে তাহাকে নিজ বাটীতে স্থান দিলেন এবং চাকরি সম্বন্ধেও তাহাকে ...

গৃহত্যাগ করিয়া আবদুল কাদের বরিহাটীর সদরে আসিয়া তাহার সহপাঠী ওয়াহেদ আলীর বাটীতে আশ্রয় লইল। ওয়াহেদ আলী তখন বাটীতে ছিল না; কিছুদিন পূর্বে সে পুলিশের সব্‌-ইনস্পেক্টারি চাকরি পাইয়া ট্রেনিঙের জন্য ভাগলপুরে চলিয়া গিয়াছিল। তাহার পিতা আকবর আলী আবদুল কাদেরের পরিচয় পাইয়া সযত্নে তাহাকে নিজ বাটীতে স্থান দিলেন এবং চাকরি সম্বন্ধেও তাহাকে যথাসাধ্য সাহায্য করিতে প্রতিশ্রুত হইলেন।

বরিহাটী জেলায় মোটের উপর মুসলমান অধিবাসীর সংখ্যা অধিক হইলেও শহরে মুসলমান বাসিন্দা বড় একটা দেখিতে পাওয়া যায় না। মুসলমান জমিদারগণের ভগ্নাবশেষ যে দুই-চারি ঘর এখনো টিকিয়া আছেন, সদরে বাড়ি করিয়া থাকিবার আবশ্যকতাও তাঁহাদের নাই, আর ক্ষমতাও নাই বলিলে চলে। তাহাদের বিষয়-সংক্রান্ত কাজকর্ম নায়েব গোমস্তা ও উকিলবাবুরাই করিয়া থাকেন, কৃচিৎ স্বয়ং হাজির হইবার দরকার পড়িলে নৌকায় আসেন এবং নৌকাতে থাকেন। তাই বলিয়া মুসলমান বাসিন্দা যে একেবারে নাই, তাহা নহে। শহরের এক প্রান্তে কয়েক ঘর পেয়াদা ও চাপরাসী শ্রেণীর লোক বাস করে; সেইটাই এখানকার মুসলমান পাড়া! আকবর আলী কালেক্টারির একজন প্রধান আমলা ছিলেন; চাকরি উপলক্ষে তাহাকে এখানে অনেক দিন হইতে বাস করিতে হইতেছে। কিন্তু অন্য কোথাও স্থান না পাইয়া তিনি এই মুসলমান পাড়াতেই বাসের উপযুক্ত খানকয়েক ঘর বাঁধিয়া লইয়াছেন।

যাহা হউক মুসলমানদিগের মধ্যে হিন্দু মহলে যা কিছু খাতির তা একশ্চন্দ্ৰস্তমো হন্তি গোছ আকবর আলীই পাইয়া থাকেন। কিন্তু সে খাতিরটুকুর মূলে, তাহার কার্যদক্ষতার গুণে সাহেব-সুবার সুনজর ব্যতীত আর কিছু ছিল কি না, তাহা সঠিক বলা যায় না।

বিদেশে অপরিচিত স্থানে একাধারে এহেন আশ্রয় ও সহায় পাইয়া আবদুল কাদের কতকটা আশ্বস্ত হইল বটে কিন্তু চাকরি কবে জুটিবে, ততদিন কেমন করিয়া নিজের খরচ চালাইবে, আর কতদিনই-বা বসিয়া পরের অন্ন ধ্বংস করিবে, ইহাই ভাবিয়া সে উতলা হইয়া উঠিল। সে আকবর আলীকে কহিল যে, যতদিন তাহার চাকরি না হয়, ততদিনের জন্য তাহাকে একটা প্রাইভেট টুইশন যোগাড় করিয়া দিলে বড় উপকৃত হইবে।

আকবর আলী তাহাকে বুঝাইয়া কহিলেন, –যদিও বরিহাটীতে অনেক শিক্ষিত লোকের বাস আছে, কিন্তু সকলেই হিন্দু; তাহাদের বাড়িতে টুইশন পাওয়া অসম্ভব, কেননা, একে তো তাহারা স্বজাতীয় লোক পাইতে অপরকে ও-কাজ দিতে রাজি হইবেন না, তাহার উপর আবার হিন্দু গ্রাজুয়েট, আণ্ডার-গ্রাজুয়েটের অভাব নাই, সুতরাং মাত্র এন্ট্রান্স পর্যন্ত পড়া মুসলমানের পক্ষে এ শহরে টুইশনের প্রত্যাশা করা ধৃষ্টতা বৈ আর কিছু নহে। তবে নিতান্ত যদি আবদুল কাদের বেকার থাকিতে অনিচ্ছুক হন, তবে আকবর আলী সাহেবের পুত্রটিকে মাঝে মাঝে লইয়া বসিলে তিনি বড়ই উপকৃত হইবেন।

এ প্রস্তাবে আবদুল কাদের সানন্দে সম্মত হইল এবং আকবর আলী সাহেবকে বহু। ধন্যবাদ দিয়া সেই দিন হইতেই তাহার পুত্রের শিক্ষকতায় লাগিয়া গেল। তাহার আগ্রহ এবং তৎপরতা দেখিয়া আকবর আলী মনে মনে সন্তুষ্ট হইলেন এবং যাহাতে সত্বর বেচারার একটা চাকরির যোগাড় করিয়া দিতে পারেন, তাহার চেষ্টা করিতে লাগিলেন।

সৌভাগ্যক্রমে মাস দুইয়ের মধ্যেই একটি এপ্রেন্টিস্ সব্‌রেজিস্ট্রারের পদ খালি হইতেছে বলিয়া সংবাদ পাওয়া গেল। আকবর আলী অবিলম্বে আবদুল কাদেরকে লইয়া ম্যাজিস্ট্রেট করবেট সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গেলেন। করবেট সাহেব লোকটি বড় ভালো, যেমন কার্যদক্ষ, তেমনি খোশমেজাজ। অধীনস্থ কর্মচারীগণের ওপর তাহার মেহেরবানির সীমা নাই। দরিদ্র প্রজার সুখ-দুঃখও তাহার দৃষ্টি এড়াইতে পারে না এবং তাহাদের কিঞ্চিৎ উপকারের সুযোগ পাইলে তিনি তাহার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করিয়া থাকেন।

আকবর আলী তাহার সম্মুখে নীত হইয়া যথারীতি সালাম করিলে সাহেব বলিয়া উঠিলেন, –গুডমর্নিং, মুন্সী, খবর কী?

আকবর আলী কহিলেন, থ্যাংক ইউ সার, খবর ভালোই। আজ একটা দরবার নিয়ে হুজুরে হাজির হয়েছি…।

বলা বাহুল্য, কথাবার্তা ইংরেজিতেই হইতেছিল।

সাহেব কহিলেন, –কেন, আপনার ছেলের চাকরি তো সেদিন হয়ে গেল, আবার কিসের দরবার?

আপনার দয়াতেই আমার ছেলের চাকরি জুটেছে, সেজন্য কী বলে আমি আমার হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা জানাব, তা ভেবে পাই নে…

না না, মুন্সী, দয়াটয়া কিছু নয়, তবে উপযুক্ত লোক পেলে আমি অবশ্যই চাকরি দিয়ে থাকি…।

সেই ভরসাতেই আজ একজন দুস্থ মুসলমান উমেদারকে সঙ্গে করে এনেছি, স্যার! যদি হুকুম হয়…

আচ্ছা, তাকে আসতে বল, দেখি।

আকবর আলী তৎক্ষণাৎ বাহিরে গিয়া আবদুল কাদেরকে সঙ্গে করিয়া আনিলেন। আবদুল কাদের সালাম করিয়া দাঁড়াইলেন, করবেট সাহেব তাহার নাম, যোগ্যতা প্রভৃতি জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন, –ওয়েল মুন্সী, এ তো এনট্রান্স পাস করে নাই। পাস না হলে আজ-কাল তো গভর্নমেন্ট আপিসে চাকরি হওয়া কঠিন–তবে বিশেষ ক্ষেত্রের কথা অবশ্য স্বতন্ত্র।

আকবর আলী কহিলেন, –ইনি আপিসে কোনো চাকরি চান না স্যার; সব্‌রেজিস্ট্রারির জন্যে এপ্রেন্টিসী প্রার্থনা করেন…

সাহেব কহিলেন, –সে তো আরো কঠিন কথা! আজকাল যেসব গ্রাজুয়েট, আন্ডার গ্রাজুয়েট এসে সব্‌রেজিস্ট্রারির জন্যে উমেদার হচ্ছে…।

এন্ট্রান্স ফেলও তো আপনার কৃপায় পেয়ে যাচ্ছে, স্যার!

সাহেব একটু হাসিয়া বলিয়া উঠিলেন, –ও! আপনি উমাশঙ্কর বাবুর ছেলের কথা বলছেন? সে যে খুব সম্ভ্রান্ত বংশের লোক…

ইনিও কম সম্ভ্রান্ত বংশের লোক নন, স্যার! একবালপুরের জমিদারেরা যে কেমন পুরাতন ঘর তা স্যারের জানা আছে…

সাহেব কহিলেন, –ওঃ আপনি একবালপুরের সৈয়দ বংশের লোক বটে?–আপনার সঙ্গে আজ পরিচয় হওয়ায় বড়ই সুখী হলাম! তা আপনাদের মতো বড় ঘরের ছেলের চাকরির দরকার কী?

আবদুল কাদের কহিল, –আমাদের ঘরের অবস্থা আর আজ-কাল তেমন ভালো নেই, স্যার। এখন অন্য উপায়ে উপার্জন না কত্তে পাল্লে সংসারই চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। আপনি একটু দয়া কল্লে, স্যার, আমার কষ্ট দূর হতে পারে।

সাহেব একটু আশ্চর্য হইয়া কহিলেন, –মুসলমান জমিদার ঘরের ছেলে হয়ে আপনি এমন কথা বলছেন! আমি দেখেছি, আপনাদের শ্রেণীর মধ্যে এমন লোকও আছে যে, ক্রমে দুরবস্থায় পড়েও গুমোর ছাড়ে না। লেখাপড়া শেখা, কি কোনো ব্যবসায় করা, ছোটলোকের কাজ বলে মনে করে–শেষটা তাদের বংশাবলীর ভাগ্যে হয় ভিক্ষা, না হয় জাল-জুয়াচুরি ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

আকবর আলী কহিলেন, –আমাদের ভিতরকার অবস্থা সম্বন্ধে আপনার চমৎকার বহুদর্শিতা আছে, স্যার।

হ্যাঁ, আমি অনেক ঘুরে ঘুরে দেখেছি বটে। দেখেশুনে সত্যই আমার মনে বড় দুঃখ হয় এদের জন্যে। কিন্তু যতদিন এরা লেখাপড়ার দিকে মন না দিচ্ছে, ততদিন কিছুতেই কিছু হতে পারবে না। দেখ, হিন্দুরা লেখাপড়া শিখে কেমন উন্নতি করে ফেলেছে– আপিসে আদালতে কি ব্যবসায়-বাণিজ্যে, যেখানে যেখানে দেশীয় লোক দেখতে পাই, কেবলই হিন্দু–ক্বচিৎ কালে-ভদ্রে একজন মুসলমান নজরে পড়ে। ক্রমে ওরাই দেশের সর্বেসর্বা হয়ে উঠবে, দেখতে পাবেন, আপনারা কেবল কাঠ কাটবার জন্যে পড়ে থাকবেন।

আকবর আলী কহিলেন, –আজ কাল দুই-একজন করে লেখাপড়া শিখতে আরম্ভ করেছে, স্যার, এই তো একজন আপনার কাছে হাজির করেছি…

ওঃ, এক-আধ জন একটু শিখলে তাতে তো ফল হয় না, আর ইনি তো পাসও কত্তে পারেন নি…

প্রথম অবস্থায় এইটুকুতেই একটু উৎসাহ না পেলে লেখাপড়ার দিকে লোকের উৎসাহ বাড়বে কেন, স্যার? প্রথম প্রথম তো আমরা হিন্দুদের সঙ্গে সমান সমান হয়ে প্রতিযোগিতা কত্তে পারব না, কাজেই গভর্নমেন্টের একটু বিশেষ নজর এ গরিবদের উপর থাকবে বলে ভরসা করি।

সাহেব কহিলেন, –কিন্তু এ কথা মনে রাখবেন, মুন্সী সাহেব, চিরদিন যদি আপনারা ওই বিশেষ নজরের ওপর নির্ভর করে থাকেন, তবে কখনই উন্নতি করে অন্যান্য সম্প্রদায়ের সমকক্ষ হতে পারবেন না।

সে কথা খুবই ঠিক, স্যার। তবে বর্তমানে লেখাপড়ায় একটু কম থাকলেও, স্যার বোধহয় দেখেছেন, মুসলমান কর্মচারীরা কাজকর্মে নিতান্ত মন্দ দাঁড়ায় না…

তা দেখেছি বটে। আবার অনেক সময় বি-এ পাস হিন্দু দেখে লোক নিযুক্ত করে আমাকে ঠকতে হয়েছে। অবশ্য কেবল পাস হলেই যে লোক যোগ্য হল তা নয়, তবু গভর্নমেন্টের পক্ষে বাছাই করবার ওটা একটা সহজ উপায় বটে। সেইজন্যেই পাসটা আমাদের দেখতে হয়।

তবু স্যার, এর বেলায় আপনি একটু বিশেষ দয়া না করলে ভদ্রলোকের মারা পড়বার দশা। লেখাপড়া শিখবার এর খুবই আগ্রহ ছিল, কিন্তু এদিকে বয়সও বেড়ে চলল, অবস্থাতেও আর কুলাল না, কাজেই চাকরির চেষ্টা কত্তে হচ্ছে। গরিবের ওপর আপনার যেমন মেহেরবানি, তাতেই একে আজ আনতে সাহস করেছি…।

সাহেব কহিলেন, –আচ্ছা, আচ্ছা, আপনি একটা দরখাস্ত পাঠিয়ে দেবেন–এপ্রেন্টিসী খালি হলে আপনার বিষয় বিবেচনা করা যাবে। আর, মুন্সী, আপনি একটু নজর রাখবেন, সময়মতো আমাকে স্মরণ করিয়ে দিবেন।

আকবর আলী কহিলেন, –সম্প্রতি একটা এপ্রেন্টিসী খালি হবার কথা শুনছি, স্যার। যদি হুকুম হয়, তবে আজই দরখাস্ত পেশ করি…

আচ্ছা, করতে পারেন, আমি আপিসে সন্ধান নিয়ে দেখব, খালি হচ্ছে কি না। যদি খালি হয়, তবে হয়তো পেতেও পারেন, কিন্তু আমি কোনো অঙ্গীকার কত্তে পারি নে, মুন্সী।

আপনি আশা দিলেন স্যার, তার জন্যেই আমরা কৃতজ্ঞ।

অল রাইট, মুন্সী, গুডমর্নিং! বলিয়া কিঞ্চিৎ ঘাড় নাড়িয়া তাহাদিগকে সাহেব বিদায়সূচক সম্ভাষণ করিলেন। তাঁহারাও থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ, স্যার, গুডমর্নিং! বলিয়া এক সেলাম করিয়া বিদায় লইলেন।

বাহিরে বারান্দায় কয়েকজন ডেপুটি বাবু, পেশকার, উমেদার প্রভৃতি সাহেবের সহিত সাক্ষাতের প্রতীক্ষায় বসিয়া ছিলেন। আকবর আলী তাহাদিগকে স্মিতমুখে সালাম করিলেন; কেহ কেহ সে সালাম গ্রহণ করিলেন, কেহ কেহ করিলেন না। তাহারা চলিয়া গেলে একজন জিজ্ঞাসা করিলেন–এ আর এক ব্যাটা নেড়ে এল কোত্থেকে হে?

পেশকার বাবু কহিলেন, সব মুন্সী কোত্থেকে জোটাচ্ছে, কে জানে! এক নেড়ে যখন ঢুকেছে, তখন নেড়েয় নেড়েয় মক্কা হয়ে যাবে দেখতে পাবেন;–আর আজকাল মুন্সীর তো পোয়াবারো! সাহেবের ভারি সুনজর! এই দেখুন না, কারু সঙ্গে সাহেব দুই-তিন মিনিটের বেশি আলাপ করেন না, আর মুন্সী প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে সাহেবের সঙ্গে খোশআলাপ করে এল! অপর এক বাবু কহিলেন, –তা হবে না? আজকাল যে ওরা গভর্নমেন্টের পুষ্যি পুত্তুর হয়ে উঠেছে। তাহার পর তিনি চক্ষু দুইটি ঘুরাইয়া কহিলেন, –সার্কুলার বেরুচ্ছে চাকরি খালি হলে এখন নেড়েরাই পাবে। নেড়ে এ্যাঁপয়েন্ট না করতে পারলে আবার কৈফিয়তও দিতে হবে!…

এমন সময় বাবুটির তলব হইল; তিনি তাড়াতাড়ি চেয়ার হইতে লাফাইয়া উঠিয়া পকেট হাতড়াইয়া রুমাল বাহির করিয়া এক হাতে মুখ মুছিতে মুছিতে এবং আর এক হাতে চাপকানের দাম পাট করিতে করিতে দরজার চৌকাঠে ছোটখাটো একটা হোঁচট খাইয়া সেটা সামলাইতে সামলাইতে সাহেবের কামরায় গিয়া প্রবেশ করিলেন।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান