আবদুল্লাহ » এক

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৬, ২০২০; ১৯:৩৯
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৩২
দৃষ্টিপাত
বি. এ. পরীক্ষার আর কয়েক মাস মাত্র বাকি আছে, এমন সময় হঠাৎ পিতার মৃত্যু হওয়ায় আবদুল্লাহর পড়াশুনা বন্ধ হইয়া গেল। পিতা ওলিউল্লাহর সাংসারিক অবস্থা সচ্ছল ছিল না। পৈতৃক সম্পত্তি যাহা ছিল, তাহা অতি সামান্য; শুধু তাহার উপর নির্ভর করিয়া থাকিতে হইলে সংসার চলিত না। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তিনি পৈতৃক খোন্দকারী ...

বি. এ. পরীক্ষার আর কয়েক মাস মাত্র বাকি আছে, এমন সময় হঠাৎ পিতার মৃত্যু হওয়ায় আবদুল্লাহর পড়াশুনা বন্ধ হইয়া গেল।

পিতা ওলিউল্লাহর সাংসারিক অবস্থা সচ্ছল ছিল না। পৈতৃক সম্পত্তি যাহা ছিল, তাহা অতি সামান্য; শুধু তাহার উপর নির্ভর করিয়া থাকিতে হইলে সংসার চলিত না। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তিনি পৈতৃক খোন্দকারী ব্যবসায়েরও উত্তরাধিকার পাইয়াছিলেন বলিয়া নিতান্ত অন্ন-বস্ত্রের জন্য তাহাকে বড় একটা ভাবিতে হয় নাই।

ওলিউল্লাহ্ পীরগঞ্জের পীর-বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। পূর্বে পরিগঞ্জের চতুষ্পার্শ্বে বহু গ্রামে ইহাদের মুরীদান ছিল বলিয়া পূর্বপুরুষগণ নবাবি হালে জীবন কাটাইয়া গিয়াছেন। কিন্তু কালক্রমে মুরীদানের সংখ্যা কমিয়া কমিয়া এক্ষণে সামান্য কয়েক ঘর মাত্র অবশিষ্ট থাকায় ইহাদের নিদারুণ অবস্থা বিপর্যয় ঘটিয়াছে। সে প্রতিপত্তিও আর নাই, বার্ষিক সালামীরও সে প্রতুলতা নাই; কাজেই ওলিউল্লাহকে নিতান্ত দৈন্যদশায় দিন কাটাইতে হইয়াছে। তথাপি যে দুই-চারি ঘর মুরীদান তিনি পাইয়াছিলেন, তাহাদের নিকট প্রাপ্য বার্ষিক সালামীর উপর নির্ভর করিয়াই তিনি একমাত্র পুত্রকে কলিকাতায় রাখিয়া লেখাপড়া শিখাইতেছিলেন। সুতরাং তাহার অকালমৃত্যুতে আবদুল্লাহর আর খরচ চালাইবার কোনো উপায়ই রহিল না; বরং এক্ষণে কী উপায়ে সংসার চালাইবে, সেই ভাবনায় সে আকুল হইয়া উঠিল।

আবদুল্লাহর বিবাহ অনেক দিন পূর্বে হইয়া গিয়াছিল। তাহার শ্বশুরালয় একবালপুরে; শ্বশুর সৈয়দ আবদুল কুদ্দুস তাহার পিতার আপন খালাতো এবং মাতার আপন ফুফাতো ভাই ছিলেন। আবার সেই ঘরেই তাহার এক শ্যালক আবদুল কাদেরের সহিত, আবদুল্লাহর একমাত্র ভগ্নী হালিমারও বিবাহ হইয়াছিল। এই বদল-বিবাহ আবদুল্লাহর পিতামহীর জীবদ্দশায় তাঁহারই আগ্রহে সম্পন্ন হয়।

সৈয়দ আবদুল কুদ্‌সের মাতা আবদুল্লাহ্ পিতামহীর সহোদরা ছিলেন। এই দুই ভগ্নীর মধ্যে অত্যন্ত সম্প্রীতি ছিল; এবং তাহারা পরস্পরের নাতি-নাতিনীর বিবাহ দিবার জন্য বড়ই আগ্রহান্বিত ছিলেন। কিন্তু তাহাদের এ সম্প্রীতি সন্তানদিগের মধ্যে প্রসারিত হয় নাই; কেননা সৈয়দরা সম্পন্ন গৃহস্থ, এবং খোন্দকারেরা এক সময়ে যথেষ্ট ঐশ্বর্য ও সম্ভ্রমের অধিকারী থাকিলেও, আজ নিতান্ত দরিদ্র, ধরিতে গেলে একরূপ ভিক্ষোপজীবী। তাই আবদুল কুদ্দুস প্রথমে ওলিউল্লাহর সহিত বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপনে নারাজ ছিলেন; কিন্তু অবশেষে মাতার সনির্বন্ধ অনুরোধ এড়াইতে না পারিয়া তাহাকে এই বদল-বিবাহে সম্মত হইতে হইয়াছিল।

বিবাহের পর হইতে হালিমা বৎসরের অধিকাংশ কালই শ্বশুরালয়ে থাকিত; কিন্তু আবদুল্লাহর শ্বশুর কন্যাকে অধিক দিন পীরগঞ্জে রাখিতেন না। তাই বলিয়া আবদুল্লাহর পিতামাতার মনে যে বিশেষ ক্ষোভ ছিল, এমত নহে। তাহারা বড় ঘরে একমাত্র পুত্রের বিবাহ দিয়া এবং না-খাইয়া না-পরিয়া তাহাকে লেখাপড়া শিখিতে দিয়া, এই ভরসায় মনে মনে সুখী হইতেন যে, খোদা যদি দিন দেন, তবে পুত্র কৃতবিদ্য হইয়া যখন প্রচুর অর্থ উপার্জন করিবে, তখন বউ আনিয়া সাধ-আহ্লাদে মনের বাসনা পূর্ণ করিবেন। এখন সে। বড়লোকের মেয়েকে আনিয়া কেবল খাওয়া-পরার কষ্ট দেওয়া বৈ তো নয়!

কিন্তু আবদুল্লাহর পিতার সে সাধ আর পূর্ণ হইল না; এমনকি মৃত্যুকালেও তিনি পুত্রবধূর মুখ দেখিতে পাইলেন না। আবদুল্লাহ্ বাটী আসিয়াই পিতার কঠিন রোগের সংবাদ শ্বশুরালয়ে পাঠাইয়াছিল এবং হালিমাকে ও তাহার স্ত্রীকে সত্বর পাঠাইয়া দিতে অনুরোধ করিয়াছিল। কিন্তু তাহারা সে অনুরোধ রক্ষা করেন নাই।

আবদুল্লাহর সংসারে এখন এক মাতা এবং তাহার পিতামহের বাঁদী-পুত্রের বিধবা স্ত্রী করিমন ভিন্ন অন্য কোনো পরিজন নাই। করিমন বাঁদী হইলেও আপনার জনের মতোই এই সংসারে জীবন কাটাইয়া বুড়া হইয়াছে। সে গৃহকর্মে আবদুল্লাহর মাতার সাহায্য করে, এবং আবশ্যকমতো বাজারবেসাতিও করিয়া আনে।

এই ক্ষুদ্র সংসারটির খরচপত্র ওলিউল্লাহ্ যে ব্যবসায়ের আয় হইতে কষ্টেসৃষ্টে নির্বাহ করিতেন, আবদুল্লাহর সে ব্যবসায় অবলম্বনে একেবারেই প্রবৃত্তি ছিল না। সে ভাবিতেছিল, চাকরি করিতে হইবে। যদিও সে বি. এ.-টা পাস করিতে পারিল না, তথাপি উপস্থিত ক্ষেত্রে সামান্য যে কোনো চাকরি তাহার পক্ষে প্রাপ্য হইতে পারে, তাহারই দ্বারা সে সংসারের অসচ্ছলতা দূর করিতে সমর্থ হইবে।

এইরূপ স্থির করিয়া আবদুল্লাহ তাহার মাতাকে গিয়া কহিল যে, সে আর পড়াশুনা করিবে না, কলিকাতায় গিয়া যাহা হোক একটা চাকরির চেষ্টা করিবে।

হঠাৎ পুত্রের এইরূপ সঙ্কল্পের কথা শুনিয়া মাতার মন বড়ই দমিয়া গেল। বি. এ. পাস করিয়া বড় চাকরি করিবে কিংবা জজের উকিল হইবে–ইহাই আবদুল্লাহ্ চিরদিনের আশা; কী গভীর দুঃখে যে সে আজ সেই চিরদিনের আশা ত্যাগ করিয়া চাকরির সন্ধানে বাহির হইবার প্রস্তাব করিতেছে, মাতা তাহা বুঝিতে পারিলেন। তাই নিতান্ত ব্যাকুল-কাতর দৃষ্টিতে পুত্রের মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন, কোনো কথা কহিতে পারিলেন না।

আবদুল্লাহ্ তাহার মাতার কাতর দৃষ্টি সহিতে পারিত না। এক্ষণে কী বলিয়া তাহাকে সান্ত্বনা দিবে ঠিক করিতে না পারিয়া কহিতে লাগিল, তা আর কী করব আম্মা, এখন সংসার-খরচই চলবে কেমন করে তাই ভেবে দিশে পাচ্ছি নে। যদি সুবিধেমতো একটা চাকরি পাই, তা হলে সংসারটাও চলে যাবে, ঘরে বসে পড়ে পাস করাও যাবে…

মাতার বুক ফাটিয়া একটা গভীর নিশ্বাস পড়িল। তিনি ধীরে ধীরে কহিলেন, যা ভালো বোঝ, কর বাবা। সবই খোদার মরজি।

এই বলিয়া তিনি চুপ করিলেন। আবদুল্লাহ মনে মনে কলিকাতায় যাইবার দিন স্থির করিয়া কথা কী করিয়া পড়িবে, তাহাই ভাবিতেছে, এমন সময় মাতা আবার কথা কহিলেন, একটা কাজ কল্লে হয় না, বাবা?

আবদুল্লাহ্ সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করিল, কী কাজ আম্মা?

একবার মুরীদানে গেলে হয় না? তারা কি কিছু সাহায্য করবে না তোর পড়াশুনার জন্যে?

মাতা জানিতেন, আবদুল্লাহ্ খোন্দকারী ব্যবসায়ের ওপর অত্যন্ত নারাজ; তবু যদি এই দুঃসময়ে তাহার মন একটু নরম হয়, এই মনে করিয়া তিনি একটু ভয়ে ভয়েই মুরীদানে যাইবার কথা তুলিলেন, কিন্তু তিনি যাহা ভয় করিয়াছিলেন, তাহাই হইল; আবদুল্লাহ্ একটু চঞ্চল হইয়া বলিয়া উঠিল, না আম্মা সে আমাকে দিয়ে হবে না!

মাতা নীরব হইলেন। আবদুল্লাহ্ দেখিল, সে তাহার মাতার মনে বেশ একটু আঘাত দিয়া ফেলিয়াছে। কিন্তু সে যখন নিজের বিশ্বাস ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে কোনো কাজ করিতে প্রস্তুত নহে, তখন তাহার মতের সমর্থন করিয়া মাতাকে একটু বুঝাইবার জন্য কহিতে লাগিল, আব্বাও ও-কাজটা বড় পছন্দ করতেন না; তবে আর উপায় ছিল না বলেই তিনি নিতান্ত অনিচ্ছায় মুরীদানে যেতেন। সেই জন্যই তো আমাকে তিনি ইংরেজি পড়তে দিয়েছিলেন, যাতে ও ভিক্ষের ব্যবসায়টা আর আমাকে না করতে হয়।

পুত্র যখন তর্ক উঠাইল, তখন মাতাও আর ছাড়িতে চাহিলেন না। তিনি তাহার যুক্তি খাইবার জন্য কহিলেন, তাই বুঝি? তোকে না তিনি মাদ্রাসায় দিয়েছিলেন! তারপর তুই-ই তো নিজে ইচ্ছে করে মাদ্রাসা ছেড়ে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হলি।

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা হয়েছিলাম বটে, কিন্তু তাতে কোনো দিনই আবার অমত ছিল না। তিনি বরাবর বলতেন, মাদ্রাসা পাস করে বেরুলে আমাকে ইংরেজি পড়তে দেবেন। ইংরেজি না পড়লে আজকাল–

মাতা বাধা দিয়া কহিলেন, তার ইচ্ছে ছিল, তুই মৌলবী হবি, তারপরে একটু ইংরেজি শিখবি; তা না, ফস্ করে মাদ্রাসা ছেড়ে ইংরেজি পড়া শুরু করে দিলি। এ-দিকও হল না, ও-দিকও হল না। আজ যদি তুই মৌলবী হতিস তবে আর ভাবনা ছিল কী! এখন কি আর মুরীদানরা তোকে মানবে?

আবদুল্লাহ্ অবজ্ঞাভরে কহিল, তা নাই-বা মানল; আমি তো আর তাদের দুয়ারে ভিখ মাগতে যাচ্ছি নে!

মাতা অনুযোগ করিয়া কহিলেন, ছি বাবা, অমন কথা বলতে নেই। মুরুব্বিরা সকলেই তো ঐ কাজ করে গেছেন। যারা অবুঝ, তাদের হেদায়েত করার মতো সওয়াবের কাজ কি আর আছে বাবা!

হ্যাঁ, হেদায়েত করা সওয়াবের কাজ বটে, কিন্তু তাতে পয়সা নেওয়াটা কোনোমতেই সওয়াব হতে পারে না। বরং তার উল্টো।

তারা খুশি হয়ে সালামী দেয়, ওতে দোষ নেই বাবা! সব দেশে, সকল জাতেই এ রকম দস্তুর আছে;–কেন, হিন্দুদের মধ্যে কি নেই!

তা থাকলই-বা; তাদের আছে বলেই যে আমাদের সেটা থাকতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই, আম্মা! আর এই পীর-মুরীদি ব্যবসায়টা হিন্দুদের পুরুতগিরির দেখাদেখিই শেখা, নইলে হযরত তো নিজেই মানা করে গেছেন, কেউ যেন ধর্ম সম্বন্ধে হেদায়েত করে পয়সা না নেয়।

আবদুল্লাহর এই বক্তৃতায় মাতা একটু অসহিষ্ণু হইয়া উঠিয়া কহিলেন, ওই তো ইংরেজি পড়ার দোষ, কেবল বাজে তর্ক করতে শেখে; শরীয়ত মানতে চায় না। তুই যে পীরগোষ্ঠীর নাম-কাম বজায় রাখতে পারবি নে, তা আমি সেই কালেই বুঝেছিলাম। সে যাকগে, যা হবার তা হয়ে গেছে, এখন কী করবি, তাই ঠিক কর।

আবদুল্লাহ একটু চিন্তা করিয়া কহিল, পরীক্ষেটা যদি পাস করতে পারতাম, তবে একটা ভালো চাকরি জুটত। এখন চেষ্টা কল্লে বড়জোড় ত্রিশ কি চল্লিশ টাকা মাইনে পাওয়া যায় বটে, কিন্তু তার জন্যেও মুরুব্বি চাই যে, আম্মা! কাকে যে ধরব তাই ভাবছি।

যদিও ওলিউল্লাহ পুত্রকে প্রথমে মাদ্রাসায় দিয়াছিলেন, তথাপি তাহাকে ইংরেজি পড়াইবার ইচ্ছা তাহার খুবই ছিল। ইংরেজি না শিখিলে দুরবস্থা ঘুচিবে না, তাহা তিনি বেশ বুঝিতে পারিয়াছিলেন। এদিকে ইংরেজি শিখিয়া লোকের আকিদা খারাপ হইয়া যাইতেছে, তাহাও তিনি স্বচক্ষে দেখিয়াছিলেন; কাজেই প্রথমে মাদ্রাসায় পড়াইয়া পুত্রের আকিদা পাকা করিয়া লইয়া তাহাকে ইংরেজি পড়িতে দিবেন মনে মনে তাহার এইরূপ সঙ্কল্প ছিল। কিন্তু জমাতে চাহরম পড়িয়াই যখন আবদুল্লাহ্ মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগে গিয়া ভর্তি হইল, তখন তিনি আর বাধা দেন নাই। তাহার পর ক্রমে এন্ট্রান্স ও এফ. এ. পাস করিয়া যখন সে বি. এ. পড়িতে লাগিল, তখন পুত্র হয় খুব দরের চাকরি পাইবে, না হয় উকিল হইয়া জেব ভরিয়া টাকা উপায় করিয়া আনিবে, এই আশা আবদুল্লাহর পিতামাতার অন্তরে জাগিয়া উঠিয়াছিল। তাহারা এই বলিয়া মনকে প্রবোধ দিলেন যে, ইংরেজি পড়িয়া সচরাচর ছেলেরা যেমন বিগড়াইয়া যায়, আবদুল্লাহ তেমন বিগড়ায় নাই। সে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে, রোজা রাখে; পাকা মুসল্লির মতো সকল বিষয়েই বেশ পরহেজ করিয়া চলে। এক্ষেত্রে ইংরেজি পড়িয়া পুত্র যদি বড়লোক হইতে পারে, তাহাতে বাধা দিবেন কেন? খোদা উহাকে যেদিকে চালাইয়াছেন, ভালোর জন্যেই চালাইয়াছেন।

এক্ষণে স্বামীর অকালমৃত্যুতে পুত্রের বি. এ. পাসের এবং বড়লোক হওয়ার আশা ভঙ্গ হইল; তাই আবদুল্লাহর জননীর মন বড়ই দমিয়া গিয়াছিল। যে হাকিম হইতে অথবা অন্তত জেলার একজন বড় উকিল হইতে পারিত, তাহার পক্ষে এখন সামান্য চাকরিও মিলা দুষ্কর হইয়া পড়িয়াছে, ইহাই মনে করিয়া তাহার অশ্রু ঝরিয়া পড়িল। অঞ্চলে চক্ষু মুছিতে মুছিতে তিনি কহিলেন, বাবা একটা কাজ কল্লে হয় না?

মাতার অনিরুদ্ধ কণ্ঠ আবদুল্লাহকে বিচলিত করিয়া তুলিল। সে যেন মাতার আদেশ তৎক্ষণাৎ পালন করিবার জন্যে প্রস্তুত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কী কাজ আম্মা।

মাতা কহিলেন, আমাদের এখন যেমন অবস্থা, তাতে তো আর অভিমান করে থাকলে চলবে না, বাবা! তোর শ্বশুরের কাছে গিয়ে কথাটা একবার পেড়ে দেখ, –তিনি বড়লোক, ইচ্ছে কল্লে অনায়াসে এই কটা মাস তোর পড়ার খরচটা চালিয়ে দিতে পারেন।

এই প্রস্তাবে আবদুল্লাহর মন দমিয়া গেল। সে কী উত্তর দিবে ঠিক করিতে না পারিয়া হঠাৎ বলিয়া ফেলিল, পরের কাছে হাত পাততে ইচ্ছে করে না, আম্মা।

মাতা আশ্চর্য হইয়া কহিলেন, পর কী রে! তার সঙ্গে যে তোর কেবল শ্বশুর-জামাই সম্পর্ক, এমত তো আর নয়।

আবদুল্লাহ্ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। মাতা আবার কহিলেন, কী বলিস?

আবদুল্লাহ্ কহিল, বলব আর কী, আম্মা; তিনি যে সাহায্য করবেন, এমন তো আমার মনে হয় না।

তিনি সাহায্য করবেন না, আগে থেকেই তুই ঠিক করে রাখলি কী করে? একবার বলেই দ্যাখ না?

আবদুল্লাহ্ কহিল, তিনি নিজের ছেলের সঙ্গে সে-বার কেমন ব্যবহার করেছিলেন, তা কি আপনি জানেন না আম্মা? আবদুল কাদের আর আমি যখন মাদ্রাসা ছেড়ে স্কুলে ভর্তি হই, তখন আব্বাকে আমি জানিয়েছিলাম, কিন্তু সে তার বাপের কাছে গোপন রেখেছিল। সে খুবই জানত যে, তার বাবা একবার জানতে পারলে আর কিছুতেই পড়ার খরচ দেবেন না; কেননা তিনি ইংরেজি শেখার উপর ভারি নারাজ। ফলে ঘটলও তাই; কয়েক বৎসর কথাটা গোপন ছিল, তারপর যখন আমরা ফার্স্ট ক্লাসে উঠলাম, তখন কেমন করে যেন আমার শ্বশুর সে কথা জানতে পারলেন, আর অমনি বেচারার পড়া বন্ধ করে দিলেন! আর আমি ইংরেজি পড়ি বলে আমার উপরও তিনি সেই অবধি নারাজ হয়ে আছেন। হয়তো-বা মনে করেন যে, আমিই কুপরামর্শ দিয়ে তার ছেলেকে খারাপ করে ফেলেছি।

মাতা কহিলেন, তা তিনি দীনদার পহেজগার মানুষ, তার ইচ্ছে ছিল ছেলেকে আরবি পড়িয়ে মৌলবী করেন। ছেলে যখন বাপের অবাধ্য হল, আবার কথাটা এদ্দিন গোপন রাখল, তখন তো তার রাগ হবারই কথা! তুই তো আর বাপের অমতে ইংরেজি পড়তে যাস নি, তোর উপর তিনি কেন নারাজ হতে যাবেন?

আবদুল্লাহ্ কহিল, কিন্তু আমার মনে হয় আম্মা, তিনি আমাকে বড় ভালো চোখে দেখেন না। দেখুন, আব্বার ব্যারামের সময় নিজে তো কোনো খবর নিলেনই না, আবার হালিমাকে কি আপনাদের বউকে, –কাউকে পাঠালেন না…

মাতা বাধা দিয়া কহিলেন, সে তো তার দোষ নয়, বাবা! তিনি যে তখন বাড়ি ছিলেন না। তারপর যদিই-বা বাড়ি এলেন, নিজেই শয্যাগত হয়ে পড়লেন, নইলে কি আর তিনি আসতেন না!

বড় আদরের একমাত্র মেয়ে-পুত্রবধূকে স্বামী মৃত্যুকালে দেখিতে চাহিয়াও দেখিতে পান নাই, এই কথা মনে করিয়া আবদুল্লাহ্-জননীর শোক আবার উথলিয়া উঠিল। তিনি ভগ্নকণ্ঠে কহিতে লাগিলেন, যাক সেসব কথা–বরাতে যা ছিল হয়ে গেছে, তা নিয়ে এখন মন ভার করে থেকে আর কী হবে! দোষ কারুরই নয় বাবা, সবই খোদার মরজি। তুই অনর্থক অভিমান করে থাকিস নে। আর তোর শ্বশুর যে আমাদের নিতান্ত আপনার জন। তার সঙ্গে আর অভিমান কী বাবা!

আবদুল্লাহর শ্বশুর যে বাস্তবিকই একজন বড়লোক ছিলেন, তাহা নহে। কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত গৃহস্থ হইয়াও তাহার মনে বড়লোকের আত্মম্ভরিতাটুকু পুরামাত্রায় বিরাজ করিত। তার অপেক্ষা কিঞ্চিৎ হীনাবস্থার লোককেই তিনি কৃপার চক্ষে দেখিতেন। এরূপ চরিত্রের লোক পিতার খালাতো এবং মাতার ফুফাতো ভাই হলেও তাহাকে নিতান্ত আপনার জন বলিয়া মনে করিয়া লইতে আবদুল্লাহর প্রবৃত্তি ছিল না। কিন্তু সে তাহার স্নেহপরায়ণা মাতার বড়ই অনুগত ছিল; তাহার নিজের ফুফাতো ভাইয়ের প্রতি সনির্বন্ধ বিরাগ দেখাইলে পাছে তাহার মনে কষ্ট হয়, এই ভাবিয়া সে অবশেষে কহিল, তা আপনি যখন বলছেন আম্মা, তখন একবার তার কাছে গিয়েই দেখি।

মাতা প্রীত হইয়া কহিলেন, হ্যাঁ বাবা তাই যা, আর দেরি করিস নে। আমি বলি কাল ভোরেই বিসমিল্লাহ্ বলে রওয়ানা হও।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান