আবদুল্লাহ » ঊনিশ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০০:৩৯
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৩৯
দৃষ্টিপাত
একবালপুরে সৈয়দ-বাড়িতে আজ মহা ধুম পড়িয়া গিয়াছে। আবদুল মালেকের শ্বশুর শরীফাবাদের হাজী বরকতউল্লাহ সম্প্রতি মক্কা শরীফ হইতে ফিরিয়া বৈবাহিকের সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছেন। হাজী সাহেব বড় যে-সে লোক নহেন; কি ভূসম্পত্তিতে, কি বংশমর্যাদায়, বরিহাটী জেলায় আশরাফ সমাজে তাহার সমকক্ষ আর কেহ নাই। এমনকি, আমাদের সৈয়দ আবদুল কুদ্দুসও তাহার সহিত কুটুম্বিতা ...

একবালপুরে সৈয়দ-বাড়িতে আজ মহা ধুম পড়িয়া গিয়াছে। আবদুল মালেকের শ্বশুর শরীফাবাদের হাজী বরকতউল্লাহ সম্প্রতি মক্কা শরীফ হইতে ফিরিয়া বৈবাহিকের সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছেন।

হাজী সাহেব বড় যে-সে লোক নহেন; কি ভূসম্পত্তিতে, কি বংশমর্যাদায়, বরিহাটী জেলায় আশরাফ সমাজে তাহার সমকক্ষ আর কেহ নাই। এমনকি, আমাদের সৈয়দ আবদুল কুদ্দুসও তাহার সহিত কুটুম্বিতা করিতে পারিয়া আপনাকে ধন্য মনে করিয়াছিলেন। করিবারই কথা; কেননা হাজী সাহেবের পিতা শরীয়তুল্লাহ্ মাত্র পনের দিনের দারোগাগিরির দৌলতে যখন এক বিপুল সম্পত্তি খরিদ করিয়া দেশের মধ্যে একজন গণ্যমান্য লোক হইয়া উঠিয়াছিলেন, তখন সঙ্গে সঙ্গে তাহার শরাফতের দরজাও অতিমাত্রায় বাড়িয়া গিয়াছিল, এবং যদিও লোকে বলে যে, পঞ্চদশ দিবসে ভোরবেলায় ওযু করিবার সময় এক মস্ত বড় ডাকাতি-ব্যবসায়ী জমিদার সদ্য-খুন-করা লাশ সমেত তাহার নিকট ধরা পড়িয়া হাজার। টাকা ঘুষ কবুল করিয়াছিল এবং টাকার তোড়া আনিবার জন্য যে লোকটিকে সে বাড়িতে পাঠাইয়াছিল, সে দিশাহারা হইয়া টাকার পরিবর্তে মোহরের তোড়া আনিয়া নূতন দারোগা সাহেবকে দিয়া ফেলিয়াছিল এবং তাহারই বলে শরীয়তুল্লাহ পঞ্চদশ দিনের চাকরিতে ইস্তফা দিয়া হঠাৎ জমিদারি ক্রয় করিয়া বসিয়াছিলেন, তথাপি তাহার সাহেবজাদা বরকল্লাহ্র পক্ষে বরিহাটী জেলায়, এমনকি বঙ্গদেশের মধ্যে একেবারে অতি-আদি শরীফতম ঘর বলিয়া পরিচিত হইতে কোনোই বাধা-বিঘ্ন ঘটে নাই!

সুতরাং একে তো বরকতউল্লাহ্ মস্ত বড় মানী লোক, তাহার উপর আবার এক্ষণে হাজী হইয়া সমাজে তাঁহার সম্ভ্রম আরো বাড়িয়া গিয়াছে; কাজেই তাহার শুভাগমনে সৈয়দ-বাড়ি আজ পবিত্র হইয়াছে এবং মনিব-চাকর, ছোট-বড় সকলেই তাহার উপযুক্ত খাতির-তোয়াজ করিতে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়া গিয়াছে।

বেলা প্রায় তিন প্রহরের সময় আহারাদি শেষ করিয়া সৈয়দ সাহেব বৈবাহিকের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত শুনিতে বসিলেন। হাজী সাহেব মক্কা মওয়াজ্জমা, মদিনা মনুওয়ারা, দামেস্ক, বাগদাদ প্রভৃতি আরবের বহু পবিত্র স্থান দর্শন করিয়া আসিয়াছিলেন, একে একে সে সকলের বর্ণনা করিয়া তিনি সৈয়দ সাহেবকে চমকৃত ও ঈর্ষান্বিত করিয়া তুলিলেন। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবকে দান করিয়া তাহাদের জীবন ধন্য করিবার জন্য হাজী সাহেব পুণ্যভূমি হইতে নানা প্রকার পবিত্র বস্তু সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিলেন। বৈবাহিক তাহা হইতে বঞ্চিত হইলেন না; হাজী সাহেব তোরঙ্গ খুলিয়া তাহাকে কিঞ্চিৎ শুনা উটের গোশত, একটুখানি জমজমের পানি এবং কাবার গেলাফের এক টুকরা বাহির করিয়া দিলেন। সৈয়দ সাহেব এই সকল পবিত্র বস্তু পাইয়া যে কী অপার আনন্দ লাভ করিলেন, তাহা আর বলিয়া শেষ করিতে। পারিলেন না। তিনি কহিতে লাগিলেন, –ভাই সাহেব, আপনি এ গরিবের কথা মনে করে। যে কষ্ট করে এ-সব পাক চিজ বয়ে এনেছেন, তাতে আমি বড়ই সরফরাজ হলাম। কী বলে আর দোয়া করব ভাইজান, খোদা আপনার নসিব কোশাদা করুন! খাস করে এই যে গেলাফ-পাকের কাপড়টুকু আপনি দিলেন, এতে আমাদের ঘর আজ পাক হয়ে গেল! এ চিজ যার ঘরে থাকে তার যত মুসিবত সব কেটে যায়। এমন চিজ কি আর দুনিয়াতে আছে? আহা, চ বলিয়া তিনি কাপড়ের টুকরাটিতে বহুত তাজিমের সঙ্গে বোসা (চুম্বন) দিলেন, এবং উহা দুই চক্ষে, কপালে এবং বক্ষে ঠেকাইয়া অতি যত্নে তুলিয়া রাখিলেন।

তাহার পর জমজমের পানি একটুখানি শিশি হইতে ঢালিয়া লইয়া পান করিলেন এবং দেহে ও মনে পরম তৃপ্তি ও এক অভিনব পবিত্রতা অনুভব করিয়া আপনাকে ধন্য জ্ঞান করিলেন।

কিন্তু এক্ষণে উটের গোশতটুকু লইয়া কী করা যায়? উহা তো শুকাইয়া একেবারে হাড় হইয়া গিয়াছে; খাওয়া যাইবে না। হাজী সাহেব কহিলেন, –ইহা কোরবানির গোশত; খাস মক্কা মওয়াজ্জমাতেই কোরবানি হয়েছিল, এর বরকতই আলাদা। এটুকু ঘরে রাখাই ভালো, কারুর ব্যারাম-পীড়ার সময় কাজে লাগবে।

সৈয়দ সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, –কী করতে হয়?

হাজী সাহেব কহিলেন–কিছু না, একটুখানি ঘষে বিসমিল্লাহ্ বলে খাইয়ে দিলেই হল।

সৈয়দ সাহেব শুকনা মাংসখণ্ডটিও সযত্নে তুলিয়া রাখিলেন।

কথায়-বার্তায় ক্রমে আসর-এর আযান পড়িয়া গেল। উভয়ে ওযু করিয়া মসজিদের দিকে চলিলেন। মসজিদটি এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়িয়া আছে দেখিয়া হাজী সাহেব একটু আশ্চর্যান্বিত হইয়া কহিলেন, –এ কী! আপনি এ কাজ এতদিন ফেলে রেখে দিয়েছেন?

সৈয়দ সাহেব একটু বিষাদের সুরে কহিলেন, –না, ভাই সাহেব, ফেলে রেখে দিই নি, পেরে উঠছি নে।

বাঃ, আপনার মতো লোকের না পেরে ওঠার তো কথাই নয়। এতে যে আপনার গোনাহ্ হচ্ছে তা কি বুঝতে পাচ্ছেন না! খোদার কাজে হাত দিয়ে এমন করে ফেলে রাখা এতে যে হেকারত করা হচ্ছে।

তা তো বুঝি ভাই সাহেব; আজ প্রায় তিন বৎসর হল কাজে হাত দিইছি, বছরখানেক কাজ চালিয়ে এই পর্যন্ত করে তুলেছি। কিন্তু গেল দুই বছর থেকে আমার যে কী দশা ধরেছে, কিছুতেই গুছিয়ে উঠতে পাচ্ছি নে। কী বলব ভাই সাহেব, এর জন্যে আমার রাত্রে ঘুম হয় না। এ দিকে ব্যারাম-পীড়ায় কাতর হয়ে পড়েছি, কেবল ভয় হয়, কোন দিন দম বেরিয়ে যাবে, এ-কাজটা খোদা আমার দ্বারা বুঝি আর করাতে দেবেন না–কী যে কেসমতে আছে, তা সেই পরওয়ারদেগারই জানেন!

হাজী সাহেব গম্ভীর হইয়া কহিলেন, –আপনার মুখে এমন কথা শোভা পায় না, ভাই সাহেব। খোদা আপনাকে যা দিয়েছেন, তা যদি খোদার কাজে না লাগালেন, তবে আখেরাতে কী জবাব দেবেন? বিষয়-সম্পত্তিই বলুন, আর ধন-দৌলতই বলুন, কিছুই তো আর সঙ্গে যাবে না। ও-সব খোদার কাজেই লাগানো উচিত।

সৈয়দ সাহেব গভীর নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন, –ঠিক বলেছেন ভাই সাহেব, এত দিন আমি বড়ই গাফেলী করেছি–আল্লাহ্ মাফ কবৃনেওয়ালা–আমি আর দেরি করব না, যেমন করে পারি, কাজটা শেষ করে ফেলব।

আসরের নামায বাদ হাজী সাহেব মসজিদের ভিতরে দাঁড়াইয়া উহার কোথায় কিরূপ কাজ হইয়াছে, তাহার সমালোচনা করিতে লাগিলেন! তিনি আরবের কোথায় কোন্ মসজিদে কবে নামায পড়িয়াছিলেন, তাহার কোন্ জায়গাটিতে কিরূপ ধরনের কারুকার্যের বাহার দেখিয়াছেন, সে সকল তন্নতন্ন করিয়া বলিতে আরম্ভ করিলেন এবং সৈয়দ সাহেব একাগ্রমনে শুনিতে শুনিতে সেই সকলের চিত্র মনের মধ্যে আঁকিয়া তুলিতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাহার পর বাহিরে আসিয়া বারান্দাটি কত বড় হওয়া উচিত, তাহার ছাদ কিরূপ হইবে এবং কয়টি থাম দিলে মানাইবে; বারান্দার সম্মুখে বেশ কোশাদা রকম একটা রোয়াক দিলে ভালো হয়–এই রকমই তিনি অনেক ভালো ভালো জায়গার মসজিদে দেখিয়া আসিয়াছেন– এইরূপ নানাপ্রকার মত প্রকাশ করিলেন।

বৈবাহিকের সহিত এই সকল বিষয়ের আলোচনার পর হইতে এই মসজিদটিই সৈয়দ সাহেবের একমাত্র চিন্তনীয় বিষয় হইয়া উঠিল। পরদিন হাজী সাহেব রওয়ানী হইয়া গেলে পরই তিনি আবদুল মালেককে ডাকিয়া কহিলেন, বাবা, মসজিদটা তো আর ফেলে রাখা। যায় না।

আবদুল মালেক কহিল, –তা কী করবেন, এরাদা করেছেন?

আরো গোটা দুই তালুক বেচা ছাড়া তো আর উপায় দেখছি নে। ওই রসুলপুরের তোমার আম্মার দরুন তালুকটা আর মাদারগঞ্জেরটা বেচব মনে কচ্ছি।

আবদুল মালেক মনে মনে ভারি চটিয়া গেল। পিতা আর কিছুদিন বাঁচিয়া থাকিলে তালুক-মুলুক সবই ছারেখারে যাইবে, তাহাদের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট থাকিবে না। সে একটু হতাশভাবে কহিল, –তা হলে ধরুন গে আপনার থাকবে কী?

পিতা একটু বিরক্ত হইয়া কহিলেন, –কেন? যা থাকবে, তা বুঝেসুঝে চালাতে পাল্লে তোমাদের আর ভাবনা কী? আর কদ্দিন! এ কাজটা আমি শেষ করেই যাব, বাকি খোদার মরজি।

আবদুল মালেক আবার কহিল, –যা আছে, তাই ধরুন গে আপনার ভাগ হয়ে গেলে আমরা কীই-বা পাব, তার ওপর আবার…

পিতা অসহিষ্ণুভাবে বাধা দিয়া কহিলেন, তোমরা খোদার ওপর তওয়াক্কল রাখতে একেবারেই ভুলে যাও। সেই জন্যেই তোমাদের মন থেকে ভাবনা ঘোচে না। তোমার ভাবনা কী বাবা? তোমার শ্বশুরের বিষয়-আশয়ের খবর রাখ কি? খোদা চাহে তো বড় বউমার যেটা পাওয়া যাবে, তাতেই তো খোশ-হালে জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে। আর তোমার বোনেরা তো একরকম পার হয়ে গিয়েছে–ছোট যে দুটো আছে, আমি যদি বিয়ে দিয়ে না যেতে পারি, তবে তোমরাই দেখেশুনে দিও। তেমন ঘরে পলে হয়তো তোমাদের সম্পত্তিতে হাত নাও পড়তে পারে–একটু বুঝেসুঝে সংসার কত্তে হয়, বাবা! আর তোমার ভাইদের–আবদুল কাদেরের কথা ছেড়ে দাও, সে তো সবুরেজিস্ট্রার হয়েছে, তার এক রকম চলে যাবে। আর ওই ছোট ছেলেগুলো রয়েছে, তোমরা দেখেশুনে ওদের বিয়ে দিও, তা হলে আর কারুর কোনো ভাবনা থাকবে না, বাকি খোদার মরজি।

পুত্রকে এইরূপে বুঝাইয়া, খোদার উপর তওয়াক্কল রাখিয়া সংসার চালাইবার কৌশল শিখাইয়া দিয়া সৈয়দ সাহেব দুইটি তালুক বিক্রয়ের বন্দোবস্তে লাগিয়া গেলেন। এবার যাহাতে বিক্রয়ের পূর্বে জানাজানি হয়, সেইজন্যে তিনি ভোলানাথ সরকারকে গোপনে ডাকিয়া তাহার হস্তে তালুক দুইটি ন্যস্ত করিবেন, স্থির করিলেন। তিনি মনে মনে আশা করিয়া রাখিয়াছিলেন যে, তালুক দুইটির মূল্য যে দশ হাজার টাকা হইবে, তাহাতে আর ভুল নাই। কিন্তু সরকার মহাশয় আসিয়া কাগজপত্র দেখিয়া সাত হাজার পর্যন্ত দিতে রাজি হইলেন। সৈয়দ সাহেব অনেক ঝুলাঝুলি করিলেন, কিন্তু ভোলানাথ সেই সাত হাজারই তাহার শেষ কথা বলিয়া উঠিয়া গেলেন।

সৈয়দ সাহেব ভাবিতে লাগিলেন, আর কোনো খরিদ্দারের সন্ধান করা কর্তব্য কি না। তালুক দুটি নিতান্ত মন্দ নহে; বৎসরে প্রায় চার-পাঁচ শত টাকা আয় আছে; এত সস্তায় উহা ছাড়িয়া দিতে তাহার মন সরিতেছিল না। কিন্তু অন্যত্র খরিদ্দার দেখিতে গেলে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে সহজেই জানাজানি হইয়া পড়িবে; পাছে তাহাদের মধ্য হইতে কেহ কৌশলে খরিদ করিয়া বসে, তাহা হইলে আর সৈয়দ সাহেবের মুখ দেখাইবার যো থাকিবে না। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া অবশেষে তিন তিনটি হাজার টাকার লোভ তাহাকে সংবরণ করিতেই হইল এবং সাত হাজারেই সম্মত হইয়া দলিল রেজিস্টারি করিবার জন্য তিনি ভোলানাথ সরকারকে সঙ্গে লইয়া স্বয়ং বরিহাটী রওয়ানা হইলেন।

সদরে সম্প্রতি একটি জয়েন্ট আপিস খোলা হইয়াছে, সেইখানেই তাহাদিগকে দলিল রেজিস্টারি করিতে হইবে। যেদিন প্রাতে তাহাদের নৌকা বরিহাটীর ঘাটে আসিয়া ভিড়িল, সেই দিনই বেলা সাড়ে দশটার সময় তাহারা দলিলাদি লইয়া জয়েন্ট আপিসে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। আপিসের আমলাগণ তাহাদিগকে চিনিল; সুতরাং তাহারা এজলাসের এক পার্শ্বে দুইখানি চেয়ার আনাইয়া যত্ন করিয়া তাহাদিগকে বসাইল। সবুরেজিস্ট্রার তখনো আসেন নাই; আসিবার বড় বিলম্বও নাই।

একটু পরেই সব্‌রেজিস্ট্রার আসিলেন। এজলাসে উঠিয়াই চেয়ারে উপবিষ্ট মূর্তি দুইটি দেখিয়া তিনি একটুখানি থমকাইয়া দাঁড়াইলেন; পরক্ষণেই অগ্রসর হইয়া তিনি সৈয়দ সাহেবকে কদমবুসি করিয়া ফেলিলেন!

কে কে! আবদুল কাদের? তুমি? তুমি এখানে? অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হইয়া সৈয়দ সাহেব এই কথা কয়টি বলিয়া উঠিলেন।

ভোলানাথ সরকার কহিলেন, বাঃ আপনি এখানে এসেছেন, তা তো আমরা কেউই জানি নে! কর্তাও তো জানেন না দেখতে পাচ্ছি!

আবদুল কাদের কহিল, –আমি আজ মাত্র তিন দিন হল বদলি হয়ে এসেছি। আপনার তবিয়ত ভালো তো, আব্বা? কিন্তু আবার মনে এতক্ষণে একটা তুমুল আন্দোলন উঠিয়া পড়িয়াছে। আজ প্রায় তিন বৎসর পরে পিতা-পুত্রের সাক্ষাৎ হইয়াছে; কুশল-প্রশ্নের উত্তর দেওয়া দূরে থাকুক, তিনি ভয়েই অস্থির হইয়া উঠিয়াছেন। আবদুল কাদের ছেলেটি যেরূপ বেতরো গোছের, তাহাতে হয়তো সে বিষয়-বিক্রয় লইয়া একটা গণ্ডগোল উপস্থিত করিবে এবং তাহাতে অনর্থক একটা জানাজানি কেলেঙ্কারি ব্যাপার দাঁড়াইবে, এই ভাবিয়া তিনি তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিলেন, আমাদের একটা কাজ ছিল; কিন্তু কথাটা তোমাকে একটু নিরালা বলতে চাই আগে…

আবদুল কাদের কহিল, –কাজটা কী আব্বা? কোনো দলিলটলিল রেজিস্টারি কত্তে হবে কি?

হ্যাঁ, তাই বটে, তবে…

তা হলে আমার বাসাতেই চলুন…

ভোলানাথ জিজ্ঞাসা করিলেন, –কোথায় বাসা?

এই কাছেই বোর্ডিঙে আবদুল্লাহর ওখানে এখন আপাতত আছি, এখনো বাসা পাই নি।

আচ্ছা আমি কর্তার সঙ্গে একটু পরামর্শ করে পরে যাচ্ছি, এই বলিয়া ভোলানাথ সৈয়দ সাহেবকে বারান্দার এক প্রান্তে লইয়া গেলেন।

আবদুল কাদেরের সন্দেহ হইল, ইহার ভিতর এমন কোনো কথা আছে, যাহা ইহারা তাহার নিকট প্রকাশ করিতে ইতস্তত করিতেছেন। দলিল রেজিস্টারি করিতে গেলে তো সব কথাই জানা যাইবে; কিন্তু যদি ইহারা অতিরিক্ত ফী দিয়া অন্যত্র রেজিস্টারি করিতে যান? সরকার মহাশয় বুঝি আব্বার সঙ্গে সেই পরামর্শই করিতে গেলেন। আবদুল কাদের এইরূপ চিন্তা করিতেছে, এমন সময় ভোলানাথ আসিয়া কহিলেন, দেখুন মেজ মিঞা, কর্তার মত বদলে গিয়েছে। তিনি একখানা দলিল রেজিস্টারি কত্তে এসেছিলেন বটে কিন্তু সেটা আর করবেন না।

কেন?

এর ভেতরে অনেক কথা আছে, তা অন্য সময় বলব। এখন আমাকে নৌকায় ফিরে। যেতে হচ্ছে–কর্তা চলে গিয়েছেন, তিনি আমাকে বলে গেলেন, এখনই নৌকা খুলতে হবে।

বাঃ এসেই অমনি চলে যাবেন। সে কেমন কথা!

বাড়িতে অনেক জরুরি কাজ ফেলে এইছি–দলিলখানা রেজিস্টারি হলেই আমরা নৌকা খুলতাম। এখন যখন রেজিস্টারি হলই না, তখন আর দেরি করে ফল নেই; যত শিগগির বাড়ি পৌঁছুতে পারি, ততই ভালো!

আচ্ছা, তা যেন হল; কিন্তু হঠাৎ দলিল রেজিস্টারি করতে আসা আবার হঠাৎ মত ফিরিয়ে চলে যাওয়া, এর মানে তো কিছু বুঝতে পাচ্ছি নে; বোধহয় আমাকে দেখেই আপনারা মত ফিরিয়ে ফেললেন…

সরকার মশায় তাড়াতাড়ি কহিলেন, –আপনাকে দেখে কেন মত ফেরাব? তবে কি জানেন, কর্তার মতের ঠিক নেই…।

আবদুল কাদের বাধা দিয়া কহিল, –না, নিশ্চয়ই এর ভেতর এমন কোনো কথা আছে, যা আমাকে আপনারা লুকুচ্ছেন–কোনো বিষয় বিক্রি টিক্রি নয় তো?

এই কথায় ভোলানাথ একটু হাসিয়া উঠিলেন; কিন্তু সে হাসির একান্ত শুষ্কতা উপলব্ধি করিয়া আবদুল কাদেরের মনে সন্দেহ বদ্ধমূল হইয়া গেল। ভোলানাথ কহিলেন, –আপনি মিছে সন্দেহ কচ্ছেন, মেজ মিঞা…।

না না, মিছে নয়। সেবার কয়েকটা তালুক বিক্রি করবার সময় আমি আবার সঙ্গে খুব একচোট চটাচটি করেছিলাম কিনা, তাই বোধহয় এবার আমার কাছ থেকে কথাটা লুকুচ্ছেন। নইলে বেশ ভালো মানুষটির মতো দলিল রেজিস্টারি করবার জন্য আপিসে এসে বসে রয়েছেন, আর আমাকে দেখবামাত্রই যেন কেমন একরকম হয়ে গেলেন, আর মতও বদলে গেল! আমি এখানে বদলি হয়ে এসেছি জানলে, আপনারা কখনো এখানে আসতেন না! কেমন কি না, বলুন।

সরকার মহাশয় একটু ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া আমতা আমতা করিতে লাগিলেন। চক্রী ব্যবসায়ী ভোলানাথের সত্য গোপনের চেষ্টা আবদুল কাদেরের নির্ভীক সরল স্পষ্টবাদিতার সম্মুখে ব্যর্থ হইয়া গেল। তবু একবার শেষ চেষ্টা করিবার জন্য তিনি কহিলেন, –আচ্ছা, আমার কথা আপনার বিশ্বাস না হয়, কর্তাকেই জিজ্ঞেস করে দেখবেন।

আবদুল কাদের তৎক্ষণাৎ কহিল, –তাই চলুন।

ভোলানাথ কহিলেন, –আপনি এগোন, আমি আসছি! নৌকা থানার ঘাটে আছে।

সৈয়দ সাহেব আবদুল কাদেরকে এড়াইয়া সরিয়া পড়িতে চাহিয়াছিলেন। তাই আগে আগে নৌকায় আসিয়া উৎকণ্ঠিতচিত্তে প্রতি মুহূর্তে ভোলানাথের আগমন প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। তাহার মনে মনে ভয়ও হইতেছিল, পাছে-বা সঙ্গে সঙ্গে আবদুল কাদেরও আসিয়া পড়ে। পরে ভোলানাথের পরিবর্তে তাহাকেই নৌকায় উঠিতে দেখিয়া তাহার মন এমন বিক্ষুব্ধ হইয়া পড়িল যে, যখন আবদুল কাদের সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করিয়া বসিল– আব্বা, আপনি বুঝি আবার তালুক বিক্রি কচ্ছেন?–তখন তিনি কী বলিবেন ঠিক করিতে নাপারিয়া, কেবল না, হাঁ, তা কি জান ইত্যাদি অসংলগ্ন দুই-চারিটি শব্দ উচ্চারণ করিলেন।

আবদুল কাদের কহিতে লাগিলেন, –আব্বা, আপনাকে একটা কথা বলি। সেবারে তালুক বিক্রি করবার সময় আমি অনেক আপত্তি করেছিলাম, তাতে আপনি আমার ওপর। নারাজ হয়েছিলেন। কিন্তু তখন আমার বাধা দেবার কোনো ক্ষমতা ছিল না–আপনার টাকার দরকার পড়েছিল, আমার যদি তখন সে টাকা দেবার উপায় থাকত, তবে কিছুতেই বিক্রি কত্তে দিতাম না। আর আপনারও বিক্রি করবার দরকার হত না। এখন খোদার ফজলে আমি কিছু কিছু রোজগার কচ্ছি–আমার যতদূর সাধ্য আপনাকে সাহায্য করব, আপনি আর তালুক বিক্রি করবেন না…

সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –কী করি বাপ, ওই মসজিদটা পড়ে রয়েছে, খোদার কাজ একবার আরম্ভ করে যদি শেষ না করে মরি, তবে আখেরাতে খোদার কাছে কী জবাব দেব?

সে মসজিদ এখনো শেষ হয় নি?

কই আর হল! তিন বছরের বেশি হল তুমি বাড়িছাড়া, সংসারের খবর তো আর রাখ না–টাকা-পয়সা কোথে কে আসবে যে কাজ শেষ করব? তালুক বিক্রি ছাড়া আর উপায়। কী?

মসজিদ শেষ কত্তে আর কত টাকা লাগবে?

এখনো তো ঢের বাকি–বারান্দা আর সামনের একটা রোয়াক, বাইরের আস্তর, উপরকার মিনারা…

তা কোন তালুকটা বিক্রি কচ্ছেন?

এই দেখ বাবা, দলিলটাই দেখ, তোমার কাছে আর লুকিয়ে কী হবে!

দলিল দেখিয়া আবদুল কাদের আশ্চর্য হইয়া কহিল, –এই দুটো ভালো ভালো মহাল মাত্র সাত হাজারে ছেড়ে দিচ্ছেন আবা? আর ও দুটো গেলে থাকবেই-বা কী!

তা কী করি, ভোলানাথ বাবু ওর বেশি আর দিতে চাইলেন না…

সাত হাজার টাকাই কি মসজিদে লাগবে?

তা লাগবে বৈকি! মেজেতে সঙ্গে মমর দেবার ইচ্ছে আছে, ভেতরেও কিছু পাথরের কাজ, উপরে মিনারা, বারান্দায় থাম, পাথরের কাজ দিতে হবে, তাতে করে অনেক টাকা। পড়ে যাবে।

এত না কল্লেও তো চলে আব্বা…

না, না, তাও কি হয় বাবা! নিয়ত যা করিছি খোদার নামে, তা আদায় না কল্লে যে খোদার কাছে বেইমানি হবে।

আমার মনে হয়, আহ্বা, নিয়ত, কল্লেই যে সেটা সম্পূর্ণ আদায় কত্তে হবে, তার কোনো মানে নেই। যদি এখন সাধ্যে না কুলোয়, তবে? যতটা পারা যায়, তাই কল্লেই খোদা রাজি থাকেন। এখন আমি যদি নিয়ত, করে বসি যে, পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে মসজিদ। দেব, তা কি কখনো আদায় করা আমার পক্ষে সম্ভব হতে পারে? মসজিদ দেওয়া আপনার নিয়ত; এখন সাধ্যে যতদূর কুলোয়, তাই খরচ করে ওটা শেষ করে ফেলুন। আমি বলি, রসুলপুরের ওটা থাক্‌, মাদারগঞ্জেরটা বরং বন্ধক রেখে হাজার দুই টাকা নেন; ও টাকা খোদা চাহে তো আমিই পরিশোধ করব। আপনার কিছু ভাবতে হবে না; খোদার ফজলে বিষয়েও আঁচ লাগবে না, আপনার মসজিদও শেষ হয়ে যাবে।

সৈয়দ সাহেব একটু ভাবিয়া কহিলেন, দু হাজার টাকায় কি হবে বাবা?

যাতে হয়, তাই করুন; বেশি আড়ম্বর করে কাজ নেই, আব্বা। এই যে সরকার মহাশয়ও এসে পড়েছেন…

সরকার মহাশয় উঠিতে উঠিতে জিজ্ঞাসা করিলেন, –নৌকা এখন খোলা হবে না?

সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –আবদুল কাদেরকে সব কথা খুলে বললাম, ও তো বিক্রি কত্তে দিতে চায় না–আর আমার বড় ছেলেরও মত নয় যে বিক্রি করি। এখন ছেলেরা সব লায়েক হয়েছে, ওদের অমতে কাজটা করা ভালো দেখায় না, সরকার মশায়…।

ভোলানাথ কহিলেন, –তা বেশ তো। বিক্রি নাই-বা কল্লেন। আমি তো আর জোর করে কিনতে চাই নি…

নারাজ হবেন না, সরকার মশায়…

না, না, আপনার সম্পত্তি আপনি ইচ্ছে হয় বিক্রি করুন, ইচ্ছে হয় না করুন, তাতে আমি নারাজ হব কেন, সৈয়দ সাহেব!

কিন্তু আমার টাকার দরকার যে! আপনি মেহেরবানি করে যদি বন্ধক রাখেন…

ওই সাত হাজার টাকায়! সে কি হয়?

আবদুল কাদের কহিল, –না, না, সাত হাজার টাকা কেন! আমরা কেবল মাদারগঞ্জের তালুকটা বন্ধক রাখব; আপনি মেহেরবানি করে কেবল ওইটা রেখেই যদি দু হাজার টাকা দেন…

সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –না না, দু হাজারে আমার চলবে না তো! নিদেনপক্ষে তিন হাজার চাই যে।

ভোলানাথ একটু ভাবিয়া কহিলেন, –বন্ধক রেখে তিন হাজার দিতে গেলেও দুটো তালুক চাই; তা নইলে তিন হাজার দিতে পারব না।

আবদুল কাদের অনেক আপত্তি করিল; কিন্তু সৈয়দ সাহেব দু হাজারে সন্তুষ্ট হইতে চাহিলেন না, এবং ভোলানাথও দুইটি সম্পত্তি না হইলে তিন হাজার দিতে রাজি হইলেন না। অবশেষে ভোলানাথেরই জয় হইল।

সেই দিনই দলিল লেখাপড়া হইয়া গেল। সুদের হার লইয়া আবদুল কাদেরকে অনেক লড়ালড়ি করিতে হইয়াছিল; অবশেষে ভোলানাথ বার্ষিক শতকরা ১২ টাকাতেই রাজি হইয়া গেলেন। বন্দোবস্ত হইল যে, আবদুল কাদের প্রতি মাসে সুদে-আসলে ৬০ টাকা করিয়া ভোলানাথকে পাঠাইতে থাকিবে। ইহাতে প্রায় ছয় বৎসরে সমস্ত টাকা পরিশোধ হইতে পারিবে। কিন্তু ভোলানাথ আরো শর্ত করিয়া লইলেন যে, কিস্তি কোনো সময়ে খেলাফ হইলে, সুদের হার শতকর ২৫ টাকায় দাঁড়াইবে, এবং খেলাফকালীন সুদ আসলে পরিণত হইয়া চক্রবৃদ্ধি হারে গণ্য হইবে।

সদর আপিসেই দলিল রেজিস্টারি করা হইল। আবদুল্লাহ্ও তাহাতে একজন সাক্ষী হইয়া রহিল। সৈয়দ সাহেব ও ভোলানাথ সেইদিনই সন্ধ্যার পর নৌকা খুলিলেন।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান