আবদুল্লাহ » চৌদ্দ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০০:২৭
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৩৪
দৃষ্টিপাত
বৈকালে একটু বেড়াইতে যাইবে মনে করিয়া আবদুল্লাহ্ আবদুল মালেকের সন্ধানে তাহার মহলে গিয়া উপস্থিত হইল। কিন্তু দেখিল সে নাক ডাকাইয়া ঘুমাইতেছে এবং গৃহের অপর পার্শ্বে বৃদ্ধ মৌলবী সাহেব তাহার দুই তিনটি ছাত্রী লইয়া নিম্নস্বরে সবক দিতেছেন। আবদুল্লাহ্ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, ইনি ওঠেন কখন? মৌলবী সাহেব কহিলেন, –অঃ, আসরের আগে উঠতাই ...

বৈকালে একটু বেড়াইতে যাইবে মনে করিয়া আবদুল্লাহ্ আবদুল মালেকের সন্ধানে তাহার মহলে গিয়া উপস্থিত হইল। কিন্তু দেখিল সে নাক ডাকাইয়া ঘুমাইতেছে এবং গৃহের অপর পার্শ্বে বৃদ্ধ মৌলবী সাহেব তাহার দুই তিনটি ছাত্রী লইয়া নিম্নস্বরে সবক দিতেছেন। আবদুল্লাহ্ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, ইনি ওঠেন কখন?

মৌলবী সাহেব কহিলেন, –অঃ, আসরের আগে উঠতাই না–গুমানের বাতে বড় মিঞা সাব এক্কালে সত্ লইছেন বলিয়া তিনি মৃদু হাস্য করিলেন।

অগত্যা আবদুল্লাহ একেলাই বেড়াইতে বাহির হইল। সৈয়দ সাহেবদের বিস্তীর্ণ বাগানটির পশ্চাতেই আবদুল খালেকদের বৃহৎ পুষ্করিণী; তাহার ওপারে তাহাদের পুরাতন মসজিদটি মেরামতের দরুন তক্ত করিতেছে দেখিয়া আবদুল্লাহ্ ভাবিল, যাই, একবার। দেখিয়া আসি।

বাগানের পথটি ধরিয়া, পুষ্করিণীর তীর দিয়া আবদুল্লাহ্ মসজিদের ঘাটে গিয়া উপস্থিত হইল। সিঁড়ির উপর আবদুল খালেকের দশমবর্ষীয় পুত্র আবদুস সামাদ একাগ্রচিত্তে বসিয়া মাছ ধরিতেছিল, কেহ যে আসিয়া তাহার পিছনে দাঁড়াইয়া আছে তাহা সে টের পায় নাই। আবদুল্লাহ্ কহিল, –কিরে, সামু, কটা মাছ পেলি!

হঠাৎ ডাকে সামু ওরফে আবদুস সামাদ চমকিয়া ফিরিয়া চাহিল এবং বাঃ! চাচাজান। কখন এলেন? বলিয়া ছিপ ফেলিয়া উঠিয়া আসিয়া আবদুল্লাহর কদমবুসি (পদচুম্বন) করিল।

এই কাল এসেছি। তোরা ভালো আছিস্ তো?

জি হ্যাঁ–অ্যাঁ! ভালো আছি। বলিয়া সামু ঘাড়টা অনেকখানি কাত করিয়া দিল! আবদুল্লাহ্ তাহার মাথায় হাত রাখিয়া কহিল, –ক্রমেই যে লম্বা হয়ে চলেছি, সামু! গায়ে তো গোশত্ নেই। কেবল রোদে রোদে খেলে বেড়াস্ বুঝি আর মাছ ধরিস্–কেমন, না?

সামু মুখ নিচু করিয়া ঘাড় নাড়িয়া কহিল, –না, –আঃ—

কী মাছ পেয়েছিস দেখি?

বেশি পাই নি, দু-তিনটে বাটা আর একটা ফলুই…

ওঃ, তবে তো বড় পেয়েছিস দেখছি!

পাছে আবদুল্লাহ তাহার ক্ষমতা সম্বন্ধে ভুল ধারণা করিয়া বসেন, এই ভয়ে সামু তাড়াতাড়ি দুই হাতে এক বৃহৎ মৎস্যের আকার দেখাইয়া চোখ পাকাইয়া গম্ভীর আওয়াজে বলিয়া উঠিল, –আর একটা মস্ত মোটা মাছ, বোধ হয় রুই কি কাতলা হবে–আর একটু হলেই তুলেছিলাম আর কি!

তুলতে পাল্লিনে কেন?

সামু ক্ষুণ্ণস্বরে কহিল, –যে জোর কল্লে, কেটে গেল!

আবদুল্লাহ্ কহিল, –ভাগ্যি কেটে গেল, নইলে হয়তো তোকেসুদ্ধ টেনে পানির ভেতর নিয়ে যেত।

সামু আপনাকে যথেষ্ট অপমানিত জ্ঞান করিয়া কহিল, –ইস্, টেনে নিয়ে গেল আর কি! আমি কত বড় মাছ ধরি, ছিপে!

ওঃ, তাই নাকি? তবে তো খুব বাহাদুর হয়ে উঠেছি। স্কুলেটুলে যাস, না খালি মাছ মারিস?

সামু খুব সপ্রতিভভাবে কহিল–বা স্কুলে যাইনে বুঝি? এখন যে বন্ধ।

কোন্ ক্লাসে পড়িস?

গম্ভীরভাবে সামু কহিল, সিকসথ ক্লাস, দি পশ্চিমপাড়া শিবনাথ ইনস্টিটিউশন!

এই সাড়ম্বর নামোল্লেখ শুনিয়া আবদুল্লাহ্ মনে মনে একটু হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, তোদের স্কুল খুলবে কবে?

ওঃ, সে ঢের দেরি। সামনের সোমবারের পরের সোমবার।

এ ছুটির মধ্যে পড়াশুনা কিছু করিছিস?

বাঃ, করি নি বুঝি? রোজ সক্কালে উঠে পড়া করি। আজ দাদাজান আমার একজামিন নিলেন।

দাদাজান? কোন দাদাজান?

রসুলপুরের দাদাজান! আবার কে?

ও তিনি এসেছেন?

হ্যাঁ, আজ সক্কালে, আমি যখন পড়া কচ্ছিলাম, সেই তখন।

বাড়িতে আছেন?

নাঃ–আব্বার সঙ্গে তিনি ক্ষেতে গেছেন।

কোথায় ক্ষেত?

উ-ই যে ওদিকে–বলিয়া সামু আঙুল দিয়া বাড়ির পশ্চাৎদিক দেখাইয়া দিল। আবদুল্লাহ্ সেই দিকে প্রস্থান করিল এবং সামু পুনরায় তাহার বড়শিটোপে মন দিল।

ক্ষেতের কাছে গিয়া আবদুল্লাহ্ দেখিতে পাইল, জন দুই কৃষাণ জমি পাইট করিতেছে এবং তাহার এক পার্শ্বে দাঁড়াইয়া মীর সাহেব ও আবদুল খালেক তাহাদের কাজ দেখিতেছেন। দূর হইতে আবদুল্লাহকে দেখিতে পাইয়া তাহারা উভয়ে উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিলেন, বাঃ আবদুল্লাহ্ যে!

মীর সাহেব কহিলেন, আমি তোমাদের ওখানেই চলেছি। তা এখানে কবে এলে?

আবদুল্লাহ্ উভয়ের কদমবুসি করিয়া কহিল, কাল সন্ধেবেলা এসেছি।

ভালো তো সব?

হ্যাঁ, এক রকম ভালোই–আপনি পীরগঞ্জে যাবেন বলছিলেন…

হ্যাঁ, বাবা, তোমার চিঠি পেলাম তরশু দিন বাড়ি এসে–প্রায় মাসেক কাল আগের চিঠি, মনে করলাম একবার খবরটা নিয়ে আসি। তা ভালোই হল, তোমার সঙ্গে এইখানেই দেখা হয়ে গেল। এখন খবর কী, বল।

আবদুল্লাহ্ কহিল খবর আর কী, পড়াশুনোর আর কোনো সুবিধে করে উঠতে পাচ্ছিনে, ফুফাজান।

কেন, খরচপত্রের অভাবে?

জি হ্যাঁ।

তোমার শ্বশুরকে বলে দেখেছ?

তাই বলতেই তো আম্মা আমাকে ঠেলেঠুলে পাঠিয়ে দিলেন; কিন্তু যা ভেবেছিলাম তাই– তিনি কোনো সাহায্য কত্তে পারবেন না।

মীর সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন পারবেন না, তা কিছু বললেন কি?

বললেন যে মসজিদটায় তার অনেক খরচ পড়ে যাচ্ছে, এ সময় হাত বড় টানাটানি কিন্তু এ-দিকে আর এক ব্যাপার দেখলাম।

কী?

শুনবেন? তবে আসুন এই গাছতলায় বসি–বসে বসে সব বলছি, সে বড় মজার কথা।

তিন জনে আমগাছের ছায়ায় ঘাসের উপর বসিয়া পড়িলেন। আবদুল্লাহ্ কহিল– পশ্চিমপাড়ার ভোলানাথবাবু এসেছিলেন একটা সুপারিশ কত্তে।

আবদুল খালেক কহিল, ওঃ বুঝেছি! মহেশ বোসের জন্যে তো?

হ্যাঁ তারই জন্যে–আপনি তা হলে জানেন সব?

কতক কতক জানি–ওসমানের মুখে শুনেছি। দেখুন মামুজান, আমার খালুজানের কাণ্ড, কোনো দিনও হিসেবপত্র দেখেন না, গোমস্তারা যা খুশি তাই করে। মহেশ বোস যে কতকাল থেকে টাকা লুটছে, তার ঠিক নেই। এবার ওসমান ধরেছে, গেল বছরের হিসেবে আট শ টাকারও ওপর তসরুফ হয়ে গেছে। এইবার মহেশটা জব্দ হবে।

মীর সাহেব কহিলেন, সে তার কাজ গুছিয়ে নিয়েছে, এখন তাকে আর কী জব্দ করবেন? না হয় টাকাটা ঘর থেকে আবার বার করে দেবে, এই তো? তা সে কত টাকাই তো নিচ্ছে, না হয় এ টাকাটা ফসকেই গেল।

আবদুল্লাহ কহিল, না, না, ফুফাজান, তাও ফসকায় নি। সে ব্যাটা গিয়ে ধরছে ভোলানাথবাবুকে, তিনি এসে একটু আমড়াগাছি কত্তেই আর কি! কর্তা অমনি খসখস করে লিখে দিলেন– মাফ!

আবদুল খালেক অতিশয় আশ্চর্যান্বিত হইয়া কহিল, –মাফ করে দিলেন, –সব?

আবদুল্লাহ্ কহিল, সব।

এই কথায় আবদুল খালেক ক্রোধ ও ঘৃণায় উত্তেজিত হইয়া উঠিল। যদিও তাহারা সৈয়দ আবদুল কুদ্দুসদিগের শরিক, তথাপি অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হইয়া পড়ায় তাহাকে অনন্যোপায় হইয়া সৈয়দ সাহেবের সেরেস্তায় কয়েক বৎসর গোমস্তাগিরি করিতে হইয়াছিল। ঘটনাক্রমে এক সময়ে তাহার তহবিল হইতে আশিটি টাকা চুরি যায়; সৈয়দ সাহেব ওই টাকা উহার বেতন হইতে কাটিয়া লইবার আদেশ দেন। সেই কথা মনে করিয়া আবদুল খালেক চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, দেখুন তো মামুজান, এঁদের কী অবিচার! আমার বেলায় সিকি পয়সা ছাড়লেন না, আর এ ব্যাটাকে একেবারে আট আট শ টাকা মাফ। করে দিলেন।

মীর সাহেব কহিলেন, আস্তে কথা, আস্তে! এইটুকুতেই কি অতটা চটলে চলে! এই রকমই তো আমাদের সমাজে ঘটে আসছে, নইলে কি আর আমাদের এমন দুর্দশা হয়? তোমাকে মাফ কল্লে তো লোকের কাছে ওঁর মান বাড়ত না, শুধু শুধু টাকাগুলোই বরবাদ যেত। আর এক্ষেত্রে দেখ দেখি, বাবা, হিন্দু সমাজে ওঁর কেমন নাম চেতে গেল!

আবদুল্লাহ্ কহিল, সে কথা ঠিক, ফুফাজান। সেইখানেই বসে বসেই নবাব বংশটংশ বলে ওঁকে খুব তারিফ করে গেল। যে ভোলানাথ বাবু ইচ্ছে কল্লে ওঁকে এক হাটে সাত বার বেচাকেনা কত্তে পারে, সে-ই বলতে লাগল, আমরা তো আপনাদেরই খেয়ে মানুষ! আর। উনি তাই সব শুনে এক্কেবারে গলে গেলেন!

মীর সাহেব কহিলেন, সে তো ঠিকই বলেছে! ওঁদের খেয়েই তো মানুষ ওরা।

কী রকম? ওরা যে মস্ত টাকাওয়ালা লোক!

মস্ত টাকাওয়ালা আজকাল হয়েছে; আগে ছিল না; সেসব কথা বোঝাতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয়। আবদুল খালেক–-বোধ হয় জান কিছু কিছু…

আবদুল খালেক কহিল, শুনেছি কিছু কিছু, কিন্তু সব কথা ভালো করে জানি নে।

আবদুল্লাহ্ সাগ্রহে কহিল, বলুন না, ফুফাজান, শুনি।

মীর সাহেব আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করিয়া কহিতে লাগিলেন, ভোলানাথের বাপ শিবনাথ তোমার পর-দাদাশ্বশুরের নায়েব ছিল। তিনি যখন মারা যান, তখন তোমার দাদাশ্বশুর সৈয়দ আবদুস সাত্তার ছিলেন ছেলেমানুষ, এই ষোল-আঠার বছর বয়েস হবে, আর আবদুল খালেকের দাদা মাহতাবউদ্দীন তো নিতান্ত শিশু-তারও বাপ কিছু আগেই মারা। গিয়েছিলেন। এরা দুই জন মামাতো-ফুফাতো ভাই ছিলেন, তা বোধহয় জান। এখন। শিবনাথ দেখলে যে দুই শরিকের দুই কর্তাই নাবালক; কাজেই সে পাকেচক্রে একটাকে দিয়ে আর একটার ঘাড় ভাঙতে আরম্ভ কল্লে। এর ভেতরে আরো একটু কথা ছিল। সেটুকু খুলে বলতে হয়।

এঁদের সকলের পূর্বপুরুষ ছিলেন সৈয়দ আবদুল হাদি। তার বিস্তর লাখেরাজ সম্পত্তি ছিল–আজ তার দাম লাখো টাকার উপর। তা ছাড়া ছোট বড় অনেক তালুকটালুকও ছিল। যাক সে কথা–সৈয়দ আবদুল হাদির কেবল দুই মেয়ে ছিল, ছেলে ছিল না। তাদের বিয়ে দিয়ে তিনি দুটো ঘরজামাই পুষলেন। এই দুই পক্ষই হল গিয়ে দুই শরিক… বড়টির অংশে হলেন গিয়ে তোমার শ্বশুর, আর ছোটটির হল আবদুল খালেক।

আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, তবে এক শরিক সৈয়দ হলেন আর এক শরিক হলেন না কেন?

মীর সাহেব হাসিয়া কহিলেন, ঠিক ধরেছ বাবা! মা সৈয়দের মেয়ে হলে ছেলে সৈয়দ সচরাচর হয় না বটে, কিন্তু কেউ কেউ সেক্ষেত্রে সৈয়দ কওলান, কেউ কেউ কওলান না। আবদুল খালেকদের পূর্বপুরুষেরা বোধহয় একটু sensible ছিলেন, তাই তারা সৈয়দ কওলাতেন না।

যা হোক, এখন সৈয়দ আবদুল হাদি তার বিষয়-সম্পত্তি সমস্ত সমান দুই ভাগ করে দুই মেয়েকে বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। তিনি গত হলে মেয়েরা ভিন্ন হলেন–অবিশ্যি বাপের সেই রকমই হুকুম ছিল, –তা সত্ত্বেও দু বোনের মধ্যে ভারি ভাব ছিল। বড়টি পৈতৃক বসতবাটী, পুকুর, বাগান, মসজিদ, সমস্ত ছোট বোনকে দিয়ে নিজে একটু সরে গিয়ে নতুন বাড়ি করে রইলেন।

এদিকে ছোট বোনের একটিমাত্র ছেলে, তার বিয়ে হল খালাতো বোনের সঙ্গে। খালার ছেলে মাত্র একটি, তোমার পর-দাদাশ্বশুর তিনি। শিবনাথ ছিল তাঁরই নায়েব। দুই শরিকেরই নায়েব বলতে হবে, শুধু তার কেন–কেননা ও-শরিকের বিষয় দেখাশুনার ভার ছিল তোমার পর-দাদাশ্বশুরের ওপর। তিনি খুব কাজের লোক ছিলেন–তার আমলে শিবনাথ কোনো দিকে হাত চালাতে পারে নি। যা হোক, তিনি আর তার ভগ্নীপতি প্রায় এক সময়েই মারা গেলেন–রইলেন ও-ঘরে তোমার দাদাশ্বশুর, আর এ-ঘরে আবদুল খালেকের দাদা–দুই মামাতো-ফুফাতো ভাই।

আগেই বলেছি আবদুল খালেকের দাদা তখন নিতান্ত শিশু। তার বিষয় আশয় দেখাশুনার ভার তোমার দাদাশ্বশুরকেই নিতে হল। তিনিও একরকম ছেলেমানুষ, কাজেই শিবনাথের উপর ষোল আনা নির্ভর। আর তিনি বাপের আমলের নায়েব বলে শিবনাথকে মানতেনও খুব–আর ওদিকে বুদ্ধিসুদ্ধিও খোদার ফজলে ছিল একটু মোটা, তাই সে যা বলত তাই শুনতেন, যা বোঝাত তাই বুঝতেন। এখন এঁদের সম্পত্তি খানিকটা এর ফুফুর সঙ্গে ও-ঘরে গিয়ে পড়াতে ওরা সম্পর্কে ছোট শরিক হয়েও কাজে বড় শরিক হয়ে দাঁড়িয়েছে, এইটেই শিবনাথ বেশ ভালো করে আবদুস সাত্তারকে বুঝিয়ে দিলে। আর ওদের একটু খাটো করবার উপায়ও বাতলে দিলে, মাহতাবউদ্দীনের বড় দুই বোন আছে, তার অন্তত একটাকে বিয়ে করা আর যদ্দিন মাহতাব ছোট আছে, তদ্দিনের মধ্যে ওদের দু-চারটে মহালের খাজনা সেস্-টেস সব বাকি ফেলে ফেলে সেগুলো নিলেম করিয়ে বেনামীতে খরিদ করা। তোমাকে বলে রাখি আবদুল্লাহ্, হয়তো তুমি জানও, মাহতাবউদ্দীনের আর এক বোনকে তোমার দাদা নজিবউল্লাহ বিয়ে করেছিলেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, জি–হাঁ, তা জানি।

মীর সাহেব কহিতে লাগিলেন, কিন্তু তিনি একদম ফাঁকিতে পড়েছিলেন, বিষয়ের ভাগ এক কানাকড়িও পান নি। যা হোক, সৈয়দ আবদুস্ সাত্তার শিবনাথের পরামর্শমতোই কাজ করতে লাগলেন–আর কাজ তো আসলে শিবনাথই করত, তিনি খালি হাঁ করে বসেই থাকতেন। শেষটাতে বেচারা মাহতাবউদ্দীনের অনেকগুলো লাখেরাজ সম্পত্তি শিবনাথ কতক নিজের নামে, কতক তার স্ত্রীর নামে খরিদ করে ফেল্লে। আবদুস সাত্তার তার কিছুই জানতে পারলেন না।

শেষটা মাহতাবউদ্দীন যখন বড় হয়ে দেখলেন যে, তিনি প্রায় পথে দাঁড়িয়েছেন, তখন মামাতো ভাইয়ের নামে নালিশ কল্লেন। তখন শিবনাথও নেই, কিছুদিন আগেই মারা গেছে। মোকদ্দমা প্রায় তিন-চার বচ্ছর ধরে চলল, কিন্তু কোনো পক্ষেই কিছু প্রমাণ হল না, মাহতাবউদ্দীন হেরে গেলেন। লাভের মধ্যে তার যেটুকু সম্পত্তি অবশিষ্ট ছিল, তারও কতকটা মোকদ্দমার খরচ যোগাতে বিকিয়ে গেল।

এখন এই মোকদ্দমার সময় আর একটা মজার কথা প্রকাশ হয়ে পড়ল। শিবনাথ যে কেবল এ-শরিকেরই সর্বনাশ করে গিয়েছে, তা নয়, ওঁর নিজের মাথায়ও বেশ করে হাত বুলিয়ে গিয়েছে! কিন্তু যা হোক সব নিতে পারে নি। বেচারা হঠাৎ মারা গেল কিনা, আর কিছুদিন বেঁচে গেলে ও-শরিককেও হাতে মালা নিতে হত।

আবদুল খালেক কহিল, তারও বড় বেশি বাকি নেই, মামুজান। আমি তো এদ্দিন কাজ করে এলাম, সব জানি। তার ওপর আবার এই মসজিদ দেবার ঝেকে দেখুন না কী দাঁড়ায়।

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা যাক্, এখন দেখছি ভোলানাথ বাবুরা এদের সম্পত্তি নিয়েই বড় মানুষ হয়েছেন…

মীর সাহেব কহিলেন, আর এঁরা হাঁ করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন–তা একরকম ভালোই হয়েছে বলতে হবে।

কেন?

ও সম্পত্তিগুলো এদের হাতে থাকলে নাস্তাখাস্তা হয়ে যেত এদ্দিনে–দেখ না, যা আছে তারই দশা কী! আর দেখ তো ওদের দিকে চেয়ে, যেমন আয়ও ঢের বাড়িয়েছে, তেমনি সম্পত্তিও দিন দিন বাড়াচ্ছে–ছেলেগুলো সব মানুষ করেছে, বড় বড় চাকরি কচ্ছে।

আবদুল্লাহ্ কহিল, সুদের জোরেই তো ওরা বাড়ে, আমাদের যে সেটা হবার যো নেই।

মানি, সুদের জোরে বাড়ে কিন্তু ছেলেপিলে মানুষ হয়, সেও কি সুদের জোরে? এদিকে মহালের বন্দোবস্ত ভালো করেও তো আয় বাড়ানো যায়–তাই-বা কই? এঁরা কি কিছু দেখেন শোনেন? নায়েব-গোমস্তার হাতে খান, তারা যা হাতে তুলে দেয়, তাতেই খোশ!–এমন জুত পেয়ে যে ব্যাটা নায়েব কি গোমস্তা শিবনাথের মতো দু হাতে না লোটে, সে নেহাত গাধা।

এমন সময় সামু, আব্বা, দাদাজানকে আর চাচাজানকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির মধ্যে আসুন বলিতে বলিতে দৌড়িয়া আসিল। মীর সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন ভাইজান, আম্মা কি নাশতা করাবেন আমাদের!

সামু কহিল, হ্যাঁ–হ্যাঁ। শিগগির আসুন বলিয়া সে দাদাজানের হাত ধরিয়া টানিয়া উঠাইল। অতঃপর সকলে বৈঠকখানার দিকে চলিলেন।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান