আবদুল্লাহ » চার

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৬, ২০২০; ১৯:৪৬
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৩২
দৃষ্টিপাত
বহু কষ্টে বৃদ্ধ কাসেম গোলদারের সরল ভক্তিজাল ছিন্ন করিয়া পরদিন বৈকালে আবদুল্লাহ্ একবালপুরে পৌঁছিল। আবদুল্লাহর বড় সম্বন্ধী আবদুল মালেক এইমাত্র নিদ্রা হইতে উঠিয়া বৈঠকখানার বারান্দার এক প্রান্তে জলচৌকির উপর বসিয়া ওযু করিতেছিলেন। লোকটি হাফেজ এবং উকট পরহেজগার; ওযুর সময় কথা বলিলে গোনাহ্ হইবে বলিয়া, কেবল একটুখানি মুচকি হাসিয়া তিনি আপাতত ...

বহু কষ্টে বৃদ্ধ কাসেম গোলদারের সরল ভক্তিজাল ছিন্ন করিয়া পরদিন বৈকালে আবদুল্লাহ্ একবালপুরে পৌঁছিল।

আবদুল্লাহর বড় সম্বন্ধী আবদুল মালেক এইমাত্র নিদ্রা হইতে উঠিয়া বৈঠকখানার বারান্দার এক প্রান্তে জলচৌকির উপর বসিয়া ওযু করিতেছিলেন। লোকটি হাফেজ এবং উকট পরহেজগার; ওযুর সময় কথা বলিলে গোনাহ্ হইবে বলিয়া, কেবল একটুখানি মুচকি হাসিয়া তিনি আপাতত ভগ্নীপতির অভ্যর্থনার কাজ সারিয়া লইলেন এবং পুনরায় সযত্নে ওযু ক্রিয়ায় মনোনিবেশ করিলেন। ওযু শেষে উঠিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তারপর দুলা মিঞা ধরগে’ তোমার কী মনে করে? খবর ভালো তো?

আবদুল্লাহ্ তাহার কদমবুসি করিয়া কহিল, জি হাঁ, ভালোই। আপনি কেমন আছেন?

আমি ভালো। একটু বোস ভাই, আমি আসরের নামায পড়ে নিই। এই বলিয়া আবদুল মালেক নামায পড়িতে গেল।

এদিকে চাকর মহলে দুলা মিঞা এয়েছেন, দুলা মিঞা এয়েছেন বলিয়া একটা কলরব উঠিল এবং দেখিতে দেখিতে উহা অন্দরমহল পর্যন্ত সংক্রামিত হইয়া পড়িল। কয়েকটা বাঁদী দরজার প্রান্তদেশ হইতে মুখ বাড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কোন্ দুলা মিঞা রে? চাকরেরা জবাব দিল, পীরগঞ্জের দুলা মিঞা।

বাঁদীরা সেই সংবাদ লইয়া অন্দরের দিকে দৌড়িয়া গেল।

দুলা মিঞার আগমন-সংবাদে, অন্দর হইতে একদল ঘোট ঘোট শ্যালক ছুটিয়া আসিল, –কেহ কেহ আবদুল্লাহর নিকটে আসিয়া কদমবুসি করিল, এবং নিতান্ত ছোটগুলি একটু তফাতে দাঁড়াইয়া মুখে আঙুল দিয়া চাহিয়া রহিল।

আবদুল্লাহ্ ইহাদিগের সহিত একটু মিষ্টালাপ করিতেছে, এমন সময় আবদুল মালেক নামায পড়িয়া উঠিয়া একজন চাকরকে ডাকিয়া কহিলেন, ওরে, দুলা মিঞার ওযুর পানি দে।

আবদুল্লাহ্ ওযু করিতে করিতে জিজ্ঞাসা করিল, আবদুল কাদের কোথায়?

আবদুল মালেক কহিল, ওঃ, সে আজ ধরগে’ তোমার মাস তিনেক হল বাড়ি ছাড়া।

কেন কোথায় গেছে?

খোদা জানে, কোথায় গেছে! আব্বার সঙ্গে ধরগে’ তোমার একরকম ঝগড়া করেই চলে গেছে।

আবদুল্লাহ্ একটু শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কেন, কেন, কী নিয়ে ঝগড়া কল্লে?

আবদুল্লাহ্ পায়ের ধুলা-মাটি ভালো করিয়া ধুইয়া ফেলিবার জন্য একজন চাকরকে আর এক বদনা পানির জন্য ইশারা করিল। ছোকরার দলের মধ্যে একজন খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। বিরক্ত হইয়া আবদুল মালেক জিজ্ঞাসা করিলেন, হাসছিস কেন রে?

একজন কহিল, ঐ দেখুন, ভাইজান, দুলাভাই নাঙ্গল চষে এয়েছেন, তাই এক হাঁটু ধুলো-কাদা লেগে রয়েছে!

আবদুল মালেক এক ধমক দিয়া কহিলেন, যা–যাঃ! ছেঁড়াগুলো ধরগে’ তোমার ভারি বেতমিজ হয়ে উঠেছে! যা-না তোরা, ওযু করে আয় গে, নামাযের ওক্ত হয়ে গেছে, এখনো ধরগে’ তোমার দাঁত বার করে হাসছে আর ফাজলামি কচ্ছে! যাঃ

ছেলের দল তাড়া খাইয়া চলিয়া গেলে আবদুল মালেক কহিলেন, সত্যি, দুলা মিঞা, এমন করে হেঁটে আসাটা ধরগে’ তোমার ভালো হয় নি। নিদেনপক্ষে একখানা গরুর গাড়ি করে তোমার আসা উচিত ছিল।

আবদুল্লাহ্ কহিল, আমার মতো গরিবের পক্ষে অতটা আমীরি পোষায় না, ভাই সাহেব!

আরে না, না; এ ধরগে’ তোমার আমীরির কথা হচ্ছে না। লোকের মান-অপমান আছে তো। এতে ধরগে’ তোমার লোকে বলবে কী?

লোকে কী বলে না বলে, তা হিসেব করে সকল সময় কি চলা যায়? লোকে কেবল বলতেই জানে, কিন্তু গরিবের মান বাঁচাবার পয়সা যে কোত্থেকে আসবে তা বলে দেয় না!

একখানা গরুর গাড়ি করে আসতে ধরগে’ তোমার কতই-বা খরচ হত?

তা যতই হোক, গরিবের পক্ষে সেটা মস্ত খরচ বৈকি!

তবু, ধরগে’ তোমার খোদা যে ইজ্জতটুকু দিয়াছেন, সেটুকু ধরগে’ তোমার বজায় রাখতে তো হবে!

যে ইজ্জতের সঙ্গে খোদা পয়সা দেন নি, সেটা ইজ্জতই নয় ভাই সাহেব! বরং তার উল্টো। সেটাকে যে হতভাগা জোর করে ইজ্জত বলে চালাতে চায়, তার কেসমতে অনেক দুঃখ লেখা থাকে।

কথাটা আবদুল মালেকের ঠিক বোধগম্য হইল না; সুতরাং কী জবাব দিবেন স্থির করিতে না পারিয়া তর্কটা ঘুরাইয়া দিবার জন্য কহিলেন, তোমরা ভাই দু পাতা ইংরেজি পড়ে কেবল ধরগে’ তোমার তর্ক করতেই শেখ; তোমাদের সঙ্গে তো আর কথায় পারা যাবে না! ধরগে’ তো–

আবদুল্লাহ বাধা দিয়া কহিল, যাকগে, ও সব বাজে তর্কে কাজ নেই। আমি নামাযটা পড়ে নিই। নামায শেষে আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, আপনি যে বলছিলেন, আবদুল কাদের বাড়ি থেকে ঝগড়া করে বেরিয়েছে…

আবদুল মালেক কহিলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে গোঁ ধরেছে, চাকরি করবে। আব্বা বলেন, না, আবার মাদ্রাসায় পড়;–তা তিনি ধরগে’ তোমার ভালো কথাই বলেন; দু-তিন বছর ঘরে বসে বসে নষ্ট কল্লে, পড়াশুনা কিচ্ছু কল্লে না–তদ্দিনে সে ধরগে’ তোমার পাস-করা মৌলবী হতে পারত–দীনী এলম হাসেল করত। তা সেদিকে তো তার মন নেই; বলে চাকরি করবে।

তা বেশ তো চাকরি কল্লেই বা তাতে ক্ষেতিটা কী হত?

আবদুল মালেক বিরক্ত হইয়া কহিলেন, হ্যাঁঃ, চাকরি করবে। আমাদের খান্দানে ধরগে’ তোমার কেউ কোনো কালে চাকরি কল্লে না। আর আজ সে যাবে চাকরি কত্তে? তা যদি ধরগে’ তোমার তেমন বড় চাকরি টাকরি হত, না হয় দোষ ছিল না;-উনি যে কটর মটর একটু ইংরেজি শিখেছেন, তাতে ধরগে’ তোমার ছোট চাকরি ছাড়া আর কী জুটবে? তাতে মান থাকবে? তাতে বাপ-দাদার নাম ধরগে’ তোমার–

সে গেছে কোথায়, ভাই সাহেব?

গেছে সদরে, আর যাবে কোথায়? মোল্লার দৌড় ধরগে’ তোমার মসজিদ পর্যন্ত কিনা! বলিয়া আবদুল মালেক একটু হাসিয়া দিলেন।

আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, সেখানে বসে কী কচ্ছে, তার কোনো খবর পেয়েছেন?

করবে আর কী? সেখানে আকবর আলী বলে একজন আমলা আছে তার বাপ ধরগে’ তোমার প্যাদাগিরি কত্ত–তারই ছেলে পড়ায় আর সে চাট্টি খেতে দেয়। সে নাকি বলেছে। ওকে সব্‌রেজিস্ট্রার করে দেবে!

আবদুল্লাহ কহিল, বেশ তো, যদি সব্‌রেজিস্ট্রার হতে পারে তো মন্দ কী?

আবদুল মালেক নিতান্ত তাচ্ছিল্যের সহিত কহিলেন, হ্যাঃ, সব্‌রেজিস্ট্রার চাকরি ধরগে’ তোমার অনি মুখের কথা আর কি! তাতে আবার প্যাদারপোকে মুরব্বি ধরেছেন, দুনিয়ায় আর লোক পান নি!

এই প্যাদার পো’টি কে, জানিবার জন্য আবদুল্লাহ্ বড়ই উৎসুক হইল, কিন্তু তাহার প্রতি আবদুল মালেকের যেরূপ অবজ্ঞা দেখা গেল তাহাতে তাহার নিকট হইতে সঠিক খবর পাওয়া যাইবে, এরূপ বোধ হইল না। পরে এ সম্বন্ধে অনুসন্ধান করিলেই জানা যাইবে মনে করিয়া আবদুল্লাহ্ চুপ করিয়া রহিল।

কিছুক্ষণ পরে আবদুল্লাহ্ কহিল, আমি তাকে বাড়ির ঠিকানায় একখানা পত্র লিখেছিলাম, তার কোনো জবাব পেলাম না। বোধহয় সে চিঠি সে পায় নি।

আবদুল মালেক জিজ্ঞাসা করিলেন, কবে লিখেছিলে?

আব্বার ব্যারামের সময়।

আবদুল মালেক যেন একটু বিচলিত হইয়া উঠিয়া কহিলেন, তা–তা–তা ধরগে’ তোমার ঠিক বলতে পারিনে।

আবদুল্লাহ্ আবার কিছুক্ষণ ভাবিয়া পরে জিজ্ঞাসা করিল, শ্বশুর সাহেব এখন ভালো আছেন তো?

আবদুল মালেক কহিলেন, নাঃ, ভালো আর কোথায়! তিনি ব্যারামে পড়েছেন এই ধরগে’ তোমার প্রায় মাসাবধি হল–

ব্যারামটা কী? এখন কেমন আছেন?

এই জ্বর আর কি! এখন ধরগে’ তোমার একটু ভালোই আছেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, ও জ্বর তো আপনাদের বাড়িতে লেগেই আছে! দুদিন ভালো থাকেন তো পাঁচ দিন জ্বরে ভোগেন। কাউকে তো বাদ পড়তে দেখিন…

না, না, এবার আবা বড় শক্ত ব্যারামে পড়েছিলেন। জ্বরটা ধরগে’ তোমার দশ-বার দিন ছিল। বড় কাহিল হয়ে গেছেন। একেবারে ধরগে’ তোমার বাচবারই আশা ছিল না। চাচাজানের ফাতেহার সময় ধরগে’ তোমার সে হাঙ্গামেই আমরা কেউ যেতে পারি নি। ধরগে’ তোমা–

তা ফাতেহার সময় যেন যেতে পারেন নি, কিন্তু আবার ব্যারামের সময় যখন আমি খবর পাঠাই, তখন আমার স্ত্রীকে পর্যন্ত পাঠালেন না, হালিমাকেও না। মরণকালে তিনি ওদের একবার দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আপনাদের মেহেরবানিতে তার ভাগ্যে আর সেটা ঘটল না।

আবদুল মালেক একটু উষ্ণ হইয়া উঠিয়া কহিল, বাঃ, কেমন করে পাঠাই? আবদুল কাদের তখন বাড়িতে ছিল না, আব্বাও ছিলেন না, কার হুকুমে ধরগে’ তোমার পাঠাই!

আবদুল্লাহ একটু শ্লেষের সহিত কহিল, আঁ, বাপ মরে, এমন সময় তো হুকুম ছাড়া পাঠানো যেতেই পারে না! তা হালিমা আপনাদের বউ তাকে না হয় আটকে রাখলেন, কিন্তু আমার স্ত্রীকে কেন পাঠালেন না। তার বেলায় তো আর কারুর হুকুমের দরকার ছিল না।

কার সঙ্গে পাঠাব? বাড়িতে আর কেউ ছিল না, আমি তো আর ধরগে’ তোমার বাড়ি ফেলে যেতে পারি নে!

কেন, আবদুল খালেকের সঙ্গে পাঠালেই তো হত।

আবদুল মালেক যেন একেবারে আকাশ হইতে পড়িল। বলিল, সে কী! তার সঙ্গে? সে হল ধরগে’ তোমার গায়ের মহরুম…

আবদুল্লাহ্ একটু আশ্চর্য হইয়া কহিল, আবদুল খালেক গায়ের মরুম হয়ে গেল!

বাঃ, হবে না? সে হল ধরগে’ তোমার খালাতো ভাই বৈ তো নয়।

কেন, কেবল কি সে খালাতো ভাই? চাচাতো ভাইও তো বটে–বাপের আপন মামাতো ভাইয়ের ছেলে–আবার ধরতে গেলে একই বংশ…

তা হলই-বা, তবু শরীয়তমতো সে ধরগে’ তোমা….

এমন নিকট জ্ঞাতি যে, তার বেলাতেও আপনারা শরীয়তের পোকা বেছে মহরুম, গায়ের মহরুমের বিচার করতে বসবেন, বিশেষ আমার এমন বিপদের সময়, এতটা আমার বুদ্ধিতে জুয়ায় নি।

তা জুয়াবে কেন? তোমরা ধরগে’ তোমার ইংরেজি পড়েছ, শরা-শরীয়ত তো মান না, সে জন্যে ধরগে’ তোমার…

অত শরীয়তের ধার ধারি নে ভাই সাহেব; এইটুকু বুঝি যে মানুষের সুখ-সুবিধারই জন্য শরা-শরীয়ত জারি হয়েছে; বে-ফায়দা কালে-অকালে কড়াকড়ি করে মানুষকে দুঃখ দেবার জন্যে হয় নি। যাক গে যাক, আপনার সঙ্গে আর সেসব কথা নিয়ে মিছে তর্ক করে কোনো ফল নেই। আযানও পড়ে গেল, চলুন নামায পড়া যাক।

বহির্বাটীর এক কোণে ইহাদের বৃহৎ নূতন পারিবারিক মসজিদ নির্মিত হইতেছিল। উহার গম্বজগুলির কাজ শেষ হইয়া গিয়াছিল; কিন্তু মেঝে, বারান্দা, কপাট, এসকল বাকি থাকিলেও কিছুদিন হইতে উহাতে রীতিমতো নামায আরম্ভ হইয়া গিয়াছিল। আবদুল কুদ্দুস সাহেবের বাঁদী-পুত্র খোদা নেওয়াজ এই নূতন মসজিদের খাদেম। সে-ই আযান দিতেছিল। আযান শুনিয়া আবদুল মালেক আবদুল্লাহূকে লইয়া তাড়াতাড়ি মসজিদের দিকে চলিলেন; সঙ্গে সঙ্গে তাহার ছোট ছোট কয়েকটি বৈমাত্রেয় ভাই, দুই-এক জন গোমস্তা এবং চাকরদের মধ্যে কেহ কেহ মসজিদে গিয়া উঠিল। প্রতিবেশীরাও অনেকে মগরেবের সময় এইখানে আসিতে আরম্ভ করিয়াছিল; সুতরাং জামাত মন্দ হইল না। আবদুল মালেক ভিড় ঠেলিয়া পেশনামাজের উপর গিয়া খাড়া হইলেন এবং কৃচ্ছ্বসাধ্য কেরাত ও বহুবিধ শিরশ্চালনার সহিত সুরা ফাতেহার আবৃত্তি আরম্ভ করিলেন।

নামায শেষে আবদুল্লাহ্ বাহিরে আসিয়া মসজিদটি দেখিতে লাগিল। একটু পরেই আবদুল মালেক বাহিরে আসিলে কহিল, এখনো তো মসজিদের ঢের কাজ বাকি আছে, দেখছি।

আবদুল মালেক কহিল, হ্যাঁ, এখনো ধরগে’ তোমার অর্ধেক কাজই বাকি।

উভয়ে বৈঠকখানার দিকে অগ্রসর হইল। আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, কত খরচ পড়ল?

ওঃ, সে ঢের। ধরগে’ তোমার প্রায় হাজার আষ্টেক খরচ হয়ে গেছে।

মসজিদটি নির্মাণ করিতে সৈয়দ সাহেবকে যথেষ্ট বেগ পাইতে হইয়াছে। হাতে নগদ। টাকা কিছুই ছিল না; সুতরাং কয়েকটি তালুক বিক্রয় করা ভিন্ন তিনি টাকা সংগ্রহের কোনো উপায় খুঁজিয়া পান নাই। আবদুল মালেক কিন্তু এই বিক্রয় ব্যাপারে মনে মনে পিতার ওপর চটিয়া গিয়াছিল। সে ভাবিতেছিল, পিতা নিজের আখেরাতের জন্য পুত্রদিগকে তাহাদের হক হইতে বঞ্চিত করিতেছেন। তাই মসজিদের খরচের কথায় সে তাহার মনের বিরক্তিটুকু চাপিয়া রাখিতে পারিল না। সে বলিয়া ফেলিল, খান কয়েক তালুকও ধরগে’ তোমার এই বাবদে উড়ে গেছে।

কী রকম?

বিক্রি হয়ে গেছে।

শেষটা তালুক বেচতে হল! কেন, বন্ধক রেখে টাকা ধার নিলেও তো হত।

না; তাতে ধরগে’ তোমার সুদ লাগে যে!

কিন্তু তালুক বিক্রয় করিয়া মসজিদ নির্মাণের কথায় আবদুল্লাহ্ বড়ই আশ্চর্য বোধ করিল। সে কহিল, নিকটেই যখন আবদুল খালেকদের একটা মসজিদ রয়েছে, তখন এত টাকা নষ্ট করে আর মসজিদ দেওয়ার কী দরকার ছিল, তা তো আমি বুঝি নে!

আবদুল মালেক ছোটখাটো একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিল, যার আখেরাতের কাজ সেই করে রে ভাই; ও মসজিদ যিনি দিয়ে গেছেন, তাঁর কাজ তিনিই করে গেছেন; তাতে করে ধরগে’ তোমার আর কারুর আকবতের কাজ হবে না।

আবদুল্লাহ্ কহিল, এক মসজিদের আযান যত দূর যায়, তার মধ্যে আর একটা মসজিদ দেওয়া নিতান্তই ফজুল। এতে আকবতের কোনো কাজ হল বলে তো আমার বিশ্বাস হয় না। তার ওপর এমন করে তালুক বেচে মসজিদ দেওয়া, এ যে খামাখা টাকা নষ্ট করা।

নষ্ট ঠিক না; আবার কাজ আব্বা করে গেলেন, কিন্তু আমাদের ধরগে’ তোমার.. একরকম ভাসিয়ে দিলেন। তালুক কটা কিনেছে কে, জান?

না, কে কিনেছে?

আবদুল খালেকের বেনামীতে মামুজান কিনেছেন।

কোন্ মামুজান?

রসুলপুরের মামুজান–তিনি ছাড়া ধরগে’ তোমার আবদুল খালেকের, বেনামীতে আবার কে কিনবে?

আবদুল্লাহর খেয়াল হইল রসুলপুরের মামুজান আবদুল খালেকদেরই আপন মাতুল, আবদুল মালেকদিগের বৈমাত্রেয় মাতুল। কিন্তু সে বুঝিতে পারিল না, নিজের নামে না কিনিয়া ভাগিনেয়ের নামে বেনামী কেন করিলেন। সুতরাং ঐ কথা আবদুল মালেককে জিজ্ঞাসা করিল।

আবদুল মালেক কহিল, কী জানি! হয়তো ধরগে’ তোমার কোনো মতলব টতলব আছে।

তা হবে বলিয়া আবদুল্লাহ্ চুপ করিয়া রহিল। এমন সময় অন্দর হইতে তাহার তলব হইল।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান