আবদুল্লাহ » পাঁচ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৬, ২০২০; ১৯:৪৭
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৩২
দৃষ্টিপাত
অন্দরে প্রবেশ করিয়া আবদুল্লাহ্ তাহার শাশুড়িদ্বয় এবং অপরাপর মুরব্বিগণের নিকট সালাম আদাব বলিয়া পাঠাইল। তাহার পর হালিমার কক্ষে গিয়া উপস্থিত হইতেই হালিমা তাহার শিশুপুত্রটি ক্রোড়ে লইয়া কাঁদিতে কাদিতে আসিয়া ভ্রাতার কদমবুসি করিল। পিতার মৃত্যু-সংবাদ পাওয়া অবধি সে অনেক কাদিয়াছে। তাহার স্বামী বিদেশে; এ বাটীতে তাহাকে প্রবোধ দিবার আর কেহ নাই, ...

অন্দরে প্রবেশ করিয়া আবদুল্লাহ্ তাহার শাশুড়িদ্বয় এবং অপরাপর মুরব্বিগণের নিকট সালাম আদাব বলিয়া পাঠাইল। তাহার পর হালিমার কক্ষে গিয়া উপস্থিত হইতেই হালিমা তাহার শিশুপুত্রটি ক্রোড়ে লইয়া কাঁদিতে কাদিতে আসিয়া ভ্রাতার কদমবুসি করিল। পিতার মৃত্যু-সংবাদ পাওয়া অবধি সে অনেক কাদিয়াছে। তাহার স্বামী বিদেশে; এ বাটীতে তাহাকে প্রবোধ দিবার আর কেহ নাই, সুতরাং সে নির্জনে বসিয়া নীরবে কাদিয়াই মনের ভার কিঞ্চিৎ লঘু করিয়া লইয়াছে। কিন্তু আজ ভ্রাতার আগমনে তাহার রুদ্ধ শোক আবার উথলিয়া উঠিল; সে আবদুল্লাহর সম্মুখে দাঁড়াইয়া ফুঁপাইয়া ফুঁপাইয়া কাঁদিতে লাগিল।

উচ্ছ্বসিত শোকাবেগে আবদুল্লাহরও হৃদয় তখন মথিত হইতেছিল; তাই অন্যমনস্ক হইবার জন্য সে হালিমার ক্রোড় হইতে শিশুটিকে তুলিয়া লইয়া তাহার মুখচুম্বন করিল এবং ধীরে ধীরে দোল দিতে দিতে কহিল, আর মিছে কেঁদে কী হবে বোন! যা হবার হয়ে গেছে, সবই খোদার মরজি।

এদিকে হালিমার পুত্রটি অপরিচিত ব্যক্তির অযাচিত আদরে বিরক্ত হইয়া খুঁতখুঁত করিতে লাগিল দেখিয়া হালিমা তাহাকে ক্রোড় হইতে ফিরাইয়া লইল এবং অনিরুদ্ধ কণ্ঠে কহিতে লাগিল, মরণকালে আব্বা আমাকে দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এমন কেসমত নিয়ে এসেছিলাম যে, সে সময়ে তার একটু খেদমত কত্তেও পেলাম না–এ কষ্ট কি আর জীবনে ভুলতে পারব, ভাইজান!

আবদুল্লাহ্ দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া কহিল, তা আর কী করবে বোন! তখন তোমার স্বামী, শ্বশুর, কেউ বাড়ি ছিলেন না…

কেন, বড় মিঞা তো ছিলেন?

তিনি বললেন যে, বাড়িতে তিনি তখন একলা, কী করে সব ফেলে যাবেন! আর তা ছাড়া তোমার স্বামীর কি শ্বশুরের বিনা হুকুমে…

হ্যাঁ! গরিবের বেলাতেই যত হুকুমের দরকার। কেন?–সেবার আমার বড় জার মার ব্যারামের সময় তো কেউই বাড়ি ছিলেন না, আর উনি তো তখন কলকেতায় পড়েন। বুবুর এক ভাই হঠাৎ একদিন এসে তাকে নিয়ে চলে গেলেন, আমার শাশুড়ি-টাশুড়ি কেউ তো টু শব্দটি কল্লেন না! তারা বড়লোক কিনা তাই আর কারো হুকুম নেবার দরকার হল না…

হয়তো তারা আগে থেকে হুকুম নিয়ে রেখেছিলেন…

না–তা হবে কেন? ওঁরা যেদিন চলে গেলেন, তার এক দিন বাদেই তো আমার শ্বশুর বাড়ি এলেন। বাড়ি এসে তবে সব কথা শুনে চুপ করে থাকলেন।

আবদুল্লাহ্ দুঃখিত চিত্তে কহিতে লাগিল, তা আর কী হবে বোন! বড়লোকের সঙ্গে কুটুম্বিতা কল্লে এ-রকম অবিচার সইতেই হয়। দেখ, তোমার বেলা না হয় দুলা মিঞার হুকুমের দরকার ছিল, কিন্তু আমি তো তোমার ভাবীকে পাঠাতে লিখেছিলাম, তাও তো পাঠালেন না! আবদুল খালেকের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে পাঠাতে পাত্তেন, কিন্তু ভাই সাহেব বললেন, সে গায়ের মহরুম কাজেই তার সঙ্গে পাঠানো যায় না…

হালিমা বাধা দিয়া কহিল, কিসের গায়ের মহরুম? ও-সব আমার জানা আছে। কেবল না পাঠাবার একটা বাহানা! কেন? মজিলপুরের ফজলু মিঞাকে তো এঁরা সকলেই দেখা দেন, তিনিও তো খালাতো ভাই!

আবদুল্লাহ কহিল, ফজলু হল গিয়ে মায়ের আপন বোনের ছেলে, আর আবদুল খালেক সতাত বোনের ছেলে…

তা হলই-বা সতাত বোনের ছেলে; ইনি যদি গায়ের মরুম হন তবে উনিও হবেন। ওসব কোনো কথা নয়, ভাইজান, আসল কথা, ফজলু মিঞারা বড়লোক আর এ বেচারা গরিব।

আবদুল্লাহ্ গম্ভীর-বিষণভাবে মাথা নাড়িয়া কহিল, তা সত্য! গরিবকে এরা বড়ই হেকারত করেন–তা সে এগানাই হোক, আর বেগানাই হোক।

হালিমা একটু ভাবিয়া আবার কহিল, আচ্ছা, ওঁর সঙ্গে যেন না পাঠালেন; কিন্তু বড় মিঞা তো নিজেও নিয়ে যেতে পাত্তেন…

তিনি বাড়ি ফেলে যেতে পাল্লেন না যে!

ওঃ। ভারি তো তিনি বাড়ি আগলে বসে রয়েছেন কিনা! তিনি তো আজকাল বাইরেই থাকেন, অন্দরের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

কেন, কেন! কী হয়েছে?

কথাবার্তা নিম্ন স্বরেই চলিতেছিল; কিন্তু এক্ষণে হালিমা আরো গলা নামাইয়া কহিল, হবে আর কী? ওই গোলাপী ছুঁড়িটেকে উনি নিকে করেছেন কিনা তাই।

এই অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ এইখানেই শেষ করিবার জন্য আবদুল্লাহ্ কহিল, যাক্ গে যাক। ওসব কথায় আর কাজ নেই। তোমার ভাবী কোথায়?

তিনি আম্মার ঘরে নামায পড়ছেন।

তখন এশার ওক্ত ভালো করিয়া হয় নাই; সুতরাং আবদুল্লাহ্ ভাবিল, বুঝি এখনো মগরেবের জের চলিতেছে। তাই জিজ্ঞাসা করিল, এত লম্বা নামায যে?

হালিমা কহিল ওঃ! তা বুঝি আপনি জানেন না! এবার আমার শ্বশুরের ব্যারামের সময় পীর সাহেব এসেছিলেন কিনা, তাই তখন ভাবী তার কাছে মুরীদ হয়েছেন। সেই ইস্ত আমার শ্বশুরের মতো সেই মগরেবের সময় জায়নামাজে বসেন, আর এশার নামায শেষ করে তবে ওঠেন।

আবদুল্লাহ্ সকৌতুকে তাহার স্ত্রীর আচার-নিষ্ঠার বিবরণ শুনিতেছিল। শুনিয়া সে কহিল, বটে নাকি? তা হলে তোমার ভাবী তো দেখছি এই বয়েসেই বেহেশতের সিঁড়ি গাঁথতে লেগে গেছেন…।

হালিমা কহিল, না না, ঠাট্টা নয়; ভাবী আমার বড়ই দীনদার মানুষ। তার পর আবার পীর সাহেবের কাছে সেদিন মুরীদ হয়েছেন…

তা তুমিও সেইসঙ্গে মুরীদ হলে না কেন?

হালিমা হঠাৎ বিষাদ-গম্ভীর হইয়া ধীরে ধীরে কহিল, আমি যে আব্বার কাছেই আর বছর মুরীদ হয়েছিলাম, ভাইজান!

এই কথায় উভয়ের মনে পিতার স্মৃতি জাগিয়া উঠিল। উভয়ে কিয়ৎকাল নীরব হইয়া রহিল।

আবদুল্লাহ্ হাত বাড়াইয়া কহিল, খোকাকে দেও তো আর একবার আমার কাছে…

ইতিমধ্যে খোকা মাতার স্কন্ধে মাথা রাখিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। হালিমা তাহাকে দুই বাহুর উপর নামাইয়া কহিল, এখন থাক, আবার জেগে উঠে চেঁচাবে। শুইয়ে দিই।

আবদুল্লাহ কহিল, আচ্ছা হালিমা, ও-বেচারার বুকের ওপর একটা আধমনি পাথর চাপিয়ে রেখেছ কেন?

হালিমা পুত্রকে শোয়াইতে শোয়াইতে জিজ্ঞাসা করিল, আধমনি পাথর আবার কোথায়?

ঐ যে মস্ত বড় একটা তাবিজ।

ওঃ! ও একখানা হেমায়েল-শরিফ তাবিজ করে দেওয়া হয়েছে।

আবদুল্লাহ্ চক্ষু কপালে তুলিয়া কহিল, এ্যাঁ! একেবারে আস্ত কোরান!

হালিমা কহিল, কী করব ভাইজান, সকলে মিলে ওর দু হাতে, গলায় একরাশ তাবিজ বেঁধে দিয়েছিলেন। তার কতক রুপোর, কতক সোনার–সেগুলোর জন্যে কোনো কথা ছিল না। কিন্তু কাপড়ের মোড়ক করে যেগুলো দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোতে তেল-ময়লা জড়িয়ে এমন বিশ্রী গন্ধ হয়ে উঠেছিল যে, উনি একদিন রাগ করে সব খুলে ফেলে দিয়েছিলেন। আম্মা, বুবু, এঁরা সব ভারি রাগারাগি কত্তে লাগলেন। তাইতে উনি বললেন যে, একখানা কোরান-মজিদই তাবিজ করে দিচ্ছি–তার চাইতে বড় আর কিছুই নেই! তাই একটা আসী কোরান দেওয়া হয়েছে।

এমন সময় একটা বাঁদী নাশতার খাঞ্চা লইয়া আসিল, এবং শাশুড়ি প্রভৃতি মুরব্বিগণের দোয়া আবদুল্লাহকে জানাইল। আবদুল্লাহ্ কহিল, এখন নাশতা কেন?

হালিমা কহিল, এখন না তো কখন আবার নাশতা হবে?

একেবারে ভাত খেলেই হত।

ওঃ, এ-বাড়ির ভাতের কথা ভুলে গেছেন ভাইজান? রাত দুপুরের তো এদিকে না, ওদিকে বরং যতটা পারে।

তা বটে! তবে নাশতা একটু করেই নেওয়া যাক। এই বলিয়া আবদুল্লাহ দস্তরখানে গিয়া বসিল। একটা বাঁদী সেলাচী লইয়া হাত ধোয়াইতে আসিল। তাহার পরিধানে একখানি মোটা ছেঁড়া কাপড়, তাহাতে এত ময়লা জমিয়া আছে যে, বোধহয় কাপড়খানি ক্রয় করা অবধি কখনো ক্ষারের মুখ দেখে নাই! উহার দেহটিও এমন অপরিষ্কার যে, তাহার মূল বর্ণ কী ছিল, কাহার সাধ্য তাহা ঠাহর করে!

আবদুল্লাহ্ অত্যন্ত বিরক্তির সহিত কহিল, আচ্ছা হালিমা, তোমরা এই ছুঁড়িগুলোকে একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে পার না? ওদের দেখলে যে বমি আসে। আর এই ময়লা গা হাত নিয়ে ওরা খাবার জিনিসপত্র নাড়ে-চাড়ে, ছেলে-পিলে কোলে করে, তাদের খাওয়ায় দাওয়ায়, এতে শরীর ভালো থাকবে কেন?

ঘরে জন দুই বাঁদী ছিল; আবদুল্লাহর এই কথায় উহারা ফিক্‌ ফিক্‌ করিয়া হাসিতে হাসিতে মুখ ঘুরাইয়া চলিয়া গেল–যেন দুলা মিঞা তাহাদের লইয়া ভারি একটা রসিকতা করিতেছেন।

হালিমা কহিল, কী করব ভাইজান, এ বাড়ির ঐ রকমই কাণ্ডকারখানা। প্রথম প্রথম আমারও বড়ড় ঘেন্না করত, কিন্তু কী করব, এখন সয়ে গেছে! অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু হারামজাদীগুলোর সঙ্গে কিছুতেই পেরে উঠি নি। চিরকেলের অভ্যেস, তাই পরিষ্কার থাকাটা ওদের ধাতেই সয় না।

একখানি পরোটার এক প্রান্ত ভাঙিতে ভাঙিতে আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, কাপড় ওদের কখানা করে আছে?

ও, তা বড় বেশি না; কারুর ঐ একখানা, কারুর-বা দেড়খানা—

দেড়খানা কেমন?

একখানা গামছা কারুর কারুর আছে, কালেভদ্দরে সেইখানা পরে তালাবে গিয়ে একটা ডুব দিয়ে আসে।

চামচে করিয়া এক টুকরা গোশত ও একটুখানি লোআব তুলিয়া লইয়া আবদুল্লাহ্ কহিল, তা বেচারাদের খানকয়েক করে কাপড় না দিলে কেমন করেই-বা পরিষ্কার রাখে, এতে ওদেরই-বা এমন দোষ কী!

আর খানকয়েক করে কাপড়! আপনিও যেমন বলেন! ও শুয়োরের পালগুলোকে অত কাপড় দিতে গেলে এঁরা যে ফতুর হয়ে যাবেন দুদিনে!

তবু এতগুলো বাঁদী রাখতেই হবে!

হালিমা কহিল, তা না হলে আর বড়মানুষি হল কিসে ভাইজান!–ও কী? হাত তুলে বসলেন যে? কই, কিছুই তো খেলেন না!…

নাশতা আর কত খাব?

না, না, সে হবে না; নিদেন এই কয়খানা মোরব্বা আর এই হালুয়াটুকু খান। এই বলিয়া হালিমা মিষ্টান্নের তশতরিগুলি ভ্রাতার সম্মুখে বাড়াইয়া দিল। অগত্যা আরো কিছু খাইতে হইল।

নাশতা শেষ করিয়া হাত ধুইতে ধুইতে আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, আবদুল কাদেরের কোনো চিঠিপত্র পেয়েছ এর মধ্যে?

হালিমা মাথা নিচু করিয়া আঙুলে শাড়ির আঁচল জড়াইতে জড়াইতে কহিল, আমার কাছে চিঠি লেখা তো উনি অনেকদিন থেকে বন্ধ করেছেন।

আবদুল্লাহ্ আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কেন?

হালিমা কহিল, এ বাড়ির কেউ ওসব পছন্দ করেন না। বলেন–জানানাদের পক্ষে লেখাটেখা হারাম। তাতেও বাধত না–উনি ওসব কথা গ্রাহ্য কত্তেন না; কিন্তু চিঠি হাতে পেলেই বড় মিঞা সব খুলে খুলে পড়েন, তাই উনি চিঠিপত্র লেখা ছেড়ে দিয়েছেন।

এ বাটীর মহিলাগণ চিঠিপত্রের ধার বড় একটা ধারিতেন না। পড়াশুনার মধ্যে কোরান শরীফ, তাহার উপর বড়জোর উর্দু মেহুল জেন্নত পর্যন্ত; ইহার অধিক বিদ্যা তাহাদিগের পক্ষে নিষিদ্ধ ফল। লেখা–তা সে উর্দুই হোক আর বাঙলাই হোক, আর বাঙলা পড়া, এ সকল তো একেবারেই হারাম। হালিমা যদিও পিত্রালয়ে থাকিতে এই হারামগুলি কিঞ্চিৎ আয়ত্ত করিয়া লইয়াছিল এবং বিবাহের পর স্বামীর উৎসাহে প্রথম প্রথম উহাদের চর্চাও কিছু কিছু রাখিয়াছিল, কিন্তু অল্পকালমধ্যেই শ্বশুরালয়ের কুশাসনে তাহার এই কু-অভ্যাসগুলি দূরীভূত হইয়া গিয়াছিল। আবদুল্লাহ্ হালিমাকে পত্র লিখিলে, সে অপরাপর অন্দরবাসিনীদের ন্যায় বাটীর কোনো বালককে দিয়া অথবা বাহিরের কোনো গোমস্তার নিকট বাঁদীদের মারফত খবর দেওয়াইয়া জবানী-পত্র লিখাইয়া লইত। এইরূপ জবানীপত্র পাইলে আবদুল্লাহ্ ভগ্নীকে লেখাপড়ার চর্চা ছাড়িয়া দিয়াছে বলিয়া ভর্ৎসনা করিয়া পত্র লিখিত এবং সাক্ষাৎ হইলে হালিমা সময় পায় না ইত্যাদি বলিয়া কাটাইয়া দিত। এতদিন সে আসল কথাটি অনাবশ্যক বোধে ভ্রাতাকে বলে নাই, কিন্তু সম্প্রতি তাহার মন এ বাটীর সকলের উপর তিক্ত হইয়া উঠিয়াছিল বলিয়া সে কথায় কথায় অনেক কিছু বলিয়া ফেলিয়াছে। আবদুল্লাহও আজ বুঝিতে পারিল, হালিমা কেন স্বহস্তে পত্রাদি লেখে না। মনে মনে তাহার রাগটা পড়িল গিয়া আবদুল মালেকের ওপর। তিনি কেন পরের চিঠি খুলিয়া পড়েন–তাহার কি একটুও আক্কেল নাই? ছোট ভাই তাহার স্ত্রীর নিকট পত্র লিখিবে, তাহাও খুলিয়া পড়িবেন? কী আশ্চর্য!

এই কথাটি মনে মনে আলোচনা করিতে করিতে আবদুল্লাহর সন্দেহ হইল, বোধহয় সে কলিকাতা হইতে আসিবার সময় পিতার রোগের সংবাদ দিয়া আবদুল কাদেরকে যে পত্র লিখিয়াছিল, তাহাও আবদুল মালেকের কবলে পড়িয়া মারা গিয়াছে। তাহার এই সন্দেহের কথা সে হালিমাকে খুলিয়া বলিল। হালিমা জিজ্ঞাসা করিল, সেটা কি ইংরেজিতে লেখা ছিল?

আবদুল্লাহ্ কহিল, হ্যাঁ ইংরেজিতে। অনেক দিন আবদুল কাদের আমাকে পত্র লেখে নি; আমিও জানতাম না যে, সে চাকরির সন্ধানে বরিহাটে গেছে। তাই বাড়ির ঠিকানাতেই লিখেছিলাম।

হালিমা একটু ভাবিয়া কহিল, একদিন বড় মিঞার ছেলে জানু ইংরেজি চিঠির মতো কী একটা কাগজ নিয়ে খেলা করছিল। আমি মনে করলাম, এ ইংরেজি লেখা কাগজ ওনার ছাড়া আর কারুর হবে না; কোনো কাজের কাগজ হতে পারে বলে আমি সেটা জানুর হাত থেকে নিয়ে তুলে রেখেছিলাম।

আবদুল্লাহ্ আগ্রহের সহিত কহিল, কোথায় রেখেছিলে আন তো দেখি।

তার খানিকটা নেই, জানু ছিঁড়ে ফেলেছিল। আনছি এখনই– এই বলিয়া হালিমা সেই ছেঁড়া কাগজখানি বাক্স খুলিয়া বাহির করিল।

কাগজের টুকরাটি দেখিয়াই আবদুল্লাহ্ বলিয়া উঠিল, বাঃ, এ তো দেখছি আমারই সেই চিঠি।

হালিমা কহিল, তবে নিশ্চয়ই বড় মিঞা ওটা খুলেছিলেন, তারপর ইংরেজি লেখা দেখে ফেলে দিয়েছিলেন।

একটু আগেই যখন আবদুল্লাহ আবদুল মালেককে সেই চিঠির কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিল তখন হঠাৎ তাহার চোখে-মুখে একটু বিচলিত ভাব দেখা গিয়াছিল। সেটুকু আবদুল্লাহর দৃষ্টি না এড়াইলেও তাহার নিগূঢ় কারণটুকু বুঝিতে না পারিয়া তখন সে সেদিকে ততটা মন দেয় নাই। এক্ষণে উহার অর্থ বেশ পরিষ্কার হইয়া গেল, তাই সে বড়ই আফসোস করিয়া কহিতে লাগিল, দেখ তো কী অন্যায়! চিঠিখানা না খুলে যদি উনি ঠিকানা ঘুরিয়ে দিতেন, তবে সে নিশ্চয়ই পেত। ইংরেজি চিঠি দেখেও সেটা খুলে যে তার কী লাভ হল, তা খোদাই জানেন! আবদুল কাদের আমার চিঠির জবাবও দিলে না, একবার এলও না; তাই ভেবে আমি তার ওপর চটেই গিয়েছিলাম। ফাতেহার সময় হয়ে গেছে! সে হয়তো এদ্দিন আব্বার এন্তেকালের কথা শুনেছে; আর আমি তাকে একটা খবর দিলাম না মনে করে সে হয়তো ভারি বেজার হয়ে আছে…

হালিমা কহিল না, না ভাইজান, বেজার হবেন কেন? এই চিঠির টুকরাই তো আপনার সাক্ষী! বললে তিনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন, কার জন্যে এটা ঘটেছে। আপনি তাকে একখানা লিখে দিন না।

আবদুল্লাহ্ কহিল, হ্যাঁ কালই লিখতে হবে।

এমন সময় একজন বাঁদী পানের বাটা লইয়া ঘরে প্রবেশ করিল। হালিমা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, পান কে দিল রে বেলা?

ছোট বুবুজী দিয়েছেন।

তাঁর নামায হয়ে গেছে?

হ্যাঁ, নামায পড়ে উঠেই পান তয়ের কল্লেন।

হালিমা ভ্রাতাকে কহিল, তবে এখন একবার ও-ঘরে যান। রাতও হয়েছে, দেখি গে ভাতের কদ্দূর হল।

দুয়ারের নিকট হইতে ফিরিয়া আসিয়া হালিমা জিজ্ঞাসা করিল, এবার কদিন থাকবেন, ভাইজান?

কেন বল দেখি?

যাবার সময় আমাকে নিয়ে যেতে হবে কিন্তু।

আমার তো তাই ইচ্ছে আছে; এখন দেখি কর্তারা কী বলেন। যদি তারা দুলা মিঞার হুকুম চেয়ে বসেন, তবেই তো মুশকিল হবে…

না, এবার না গিয়ে কিছুতেই ছাড়ব না, তা বলে রাখচি।

আচ্ছা, আচ্ছা দেখি তো একবার বলে কয়ে।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান