আবদুল্লাহ » পনের

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০০:২৯
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৩৪
দৃষ্টিপাত
এদিকে আসরের ওক্ত হইয়া গিয়াছে দেখিয়া মীর সাহেব বৈঠকখানায় প্রবেশ করিতে করিতে সামুকে ডাকিয়া কহিলেন, আম্মাকে বল গে, ভাইজান, আমরা নামায পড়ে যাচ্ছি। জি আচ্ছা বলিয়া সামু দৌড়িয়া মাকে বলিতে গেল। নামায বাদ তিন জনে অন্দরে আসিলেন। শয়নঘরের বারান্দায় ছোট একটি তক্তপোশের উপর ফর পাতা হইয়াছিল। মীর সাহেব গিয়া তাহার ...

এদিকে আসরের ওক্ত হইয়া গিয়াছে দেখিয়া মীর সাহেব বৈঠকখানায় প্রবেশ করিতে করিতে সামুকে ডাকিয়া কহিলেন, আম্মাকে বল গে, ভাইজান, আমরা নামায পড়ে যাচ্ছি।

জি আচ্ছা বলিয়া সামু দৌড়িয়া মাকে বলিতে গেল।

নামায বাদ তিন জনে অন্দরে আসিলেন। শয়নঘরের বারান্দায় ছোট একটি তক্তপোশের উপর ফর পাতা হইয়াছিল।

মীর সাহেব গিয়া তাহার উপর বসিলেন এবং আবদুল খালেক আবদুল্লাহকে ঘরের ভিতর লইয়া গেল।

আবদুল খালেকের পত্নী রাবিয়া মেঝের উপর বসিয়া পান সাজিতেছিল। আবদুল্লাহকে দেখিয়া আঁচলটা মাথার উপর তুলিয়া দিয়া হাসি-হাসি মুখে রাবিয়া কহিল, বাঃ, আজ কী ভাগ্যি! কবে এলেন, খোকার সাহেব?

আবদুল্লাহ্ রাবিয়ার কদমবুসি করিয়া কহিল, কাল সন্ধেবেলায় এসেছি। আপনি ভালো আছেন তো, ভাবী সাহেবা?

হ্যাঁ ভাই, আপনাদের দোয়াতে ভালোই আছি…

আবদুল খালেক ঠাট্টা করিয়া কহিল, আঃ, ওর দোওয়াতে আবার ভালো থাকবে! ও খখানকার হলে কী হয়, খোনকারী তো আর ও করে না যে, ওর দোয়াতে কোনো ফল হবে।

রাবিয়া কহিল, তা নাই-বা কল্লেন খোনকারী, ভালবেসে মন থেকে দোওয়া কল্লে সবারই দোয়াতে ফল হয়। বলুন না খোনকার সাহেব!

আবদুল খালেক আবদুল্লাহকে লইয়া খাটের সম্মুখস্থ তক্তপোশের উপর বসিলে রাবিয়া জিজ্ঞাসা করিল, বাড়ির সব ভালো তো ভাই? ফুফু-আম্মা কেমন আছেন?

তাঁর শরীরটা ভালো নেই…

তা তো না থাকবারই কথা; তা হালিমাকে আর বউকে এবার নিয়ে যান, ওরা কাছে গেলে ওঁর মনটা একটু ভালো থাকবে।

আবদুল্লাহ্ কহিল, তাই মনে কচ্ছি। কিন্তু আপনাদের বউকে হয়তো ওঁরা এখন পাঠাতে চাইবেন না।

কেন?

তাকে নিয়ে যেতে চাইলে আমার শ্বশুর তো বরাবরই একটা ওজর করেন–আর। আবার ব্যারামের সময়েই পাঠাইলেন না…

রাবিয়া একটু বিরক্তির স্বরে কহিল, বাঃ, তাই বলে বউকে আপনারা নিয়ে যাবেন না, বাপের বাড়িতেই চিরকাল রেখে দেবেন?

তাই রেখে দিতে হবে, দেখতে পাচ্ছি। আর তাকে নিয়ে যাওয়াও তো কম হাঙ্গামের কথা নয়, সঙ্গে বাঁদী তো নিদেনপক্ষে জন তিনেক যাবে–তা ছাড়া তার তো নড়ে বসতেই ছ মাস–হ্যাঁতে করে সংসারের কুটো গাছটিও নাড়ে না। এখন তাকে নিয়ে গেলে কেবল আম্মারই খাটুনি বাড়ানো হবে। তা ছাড়া আমাদের যে অবস্থা এখন, তাতে এতগুলো বাঁদী। পোষা-ও পেরে ওঠা যাবে না! তার চেয়ে এখন ওর এইখেনেই থাকা ভালো।

রাবিয়া একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিল, ও মেয়ে যে কখনো সংসার করতে। পারবে, তা বোধ হয় না! আপনার কপালে অনেক দুঃখ আছে দেখতে পাচ্ছি, খোনকার সাহেব!

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা আর কী করব, ভাবী সাহেবা!

আবদুল খালেক কহিল, এখন আর কিছু করে কাজ নেই, চল নাশতাটা করা যাক। এই বলিয়া সে আবদুল্লাহকে বারান্দায় লইয়া গিয়া ফশের উপর ছোট্ট একটি দস্তরখান পাতিয়া দিল। রাবিয়া রেকাবিগুলি আনিয়া তাহার উপর সাজাইতে লাগিল।

নাশতার আয়োজন দেখিয়া আবদুল্লাহ্ কহিল, এ কী করেছেন ভাবী সাহেবা!

মীর সাহেব কহিলেন, ও তোমার ভাবী সাহেবার দোষ নয়, বাবা। আমারই অত্যাচার। তাহার পর একটু ভারী গলায় কহিতে লাগিলেন, আমার এই আম্মাটি ছাড়া আমাকে আদর করে খাওয়াবার আর কেউ নেই! তাই যখন এখানে আসি, ফরমাশের চোটে আমার আম্মাকে হয়রান করে দিই। খেতে পারি আর না-পারি, আমাকে পাঁচ রকম তয়ের করে খাওয়ানোর জন্যে উনি হাসিমুখে যে খাটুনিটা খাটেন, তাই দেখেই আমার প্রাণটা ভরে। যায়। আমার আম্মার আদরে সংসারের যত অনাদর-অবহেলা সব আমি ভুলে যাই। তাই ছুটে ছুটে আমার আম্মার কাছে আসি।

মীর সাহেবের কথায় সকলেরই চোখ ছলছল করিয়া উঠিল। রাবিয়া তাড়াতাড়ি জল আনিবার ছলে সরিয়া পড়িয়াছিল।

এই মেয়েটিকে মীর সাহেব ছেলেবেলা হইতেই অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। ইহার মাতা তাহার দূরসম্পর্কের চাচাতো বোন, কিন্তু সম্পর্ক দূর হইলেও তিনি ইহাদিগকে আপনার জন বলিয়াই মনে করিতেন। তাই রাবিয়ার বিবাহের অল্প কাল পরেই যখন তাহার পিতার মৃত্যু হয় এবং তাহার মাতা শিশু-কন্যা মালেকাকে লইয়া অকূল সাগরে ভাসিলেন, তখন মীর সাহেবই তাহাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল ছিলেন। মীর সাহেবেরই চেষ্টায় অসহায় বিধবার এবং কন্যা দুইটির সম্পত্তিটুকু অপরাপর অংশীদারগণের কবল হইতে রক্ষা পাইয়াছিল। সম্প্রতি তিনি মালেকারও বেশ ভালো বিবাহ দিয়া দিয়াছেন–জামাতা মঈনুদ্দীন একজন সব্‌ডিপুটি, তাহার ভ্রাতা মহিউদ্দীন ডিপুটি, পৈতৃক সম্পত্তিও ইহাদের মন্দ নহে। নূরপুর গ্রামের মধ্যে এই বংশই শ্রেষ্ঠ বংশ–পুরাতন জমিদার ঘর হইলেও নিতান্ত ভগ্নদশা নহে।

মীর সাহেবের এই সকল অযাচিত অনুগ্রহে রাবিয়া এবং তাহার মাতা ও ভগ্নী তাহার নিকট সর্বদা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য উৎসুক। উপকার করিয়া মীর সাহেব যদি কাহারো নিকট আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালবাসা পাইয়া থাকেন তবে সে এইখানেই।

নাশতার পর মীর সাহেব উঠিয়া বাহিরে গেলে আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, তারপর ভাইজান, আপনার কাজকর্ম চলছে কেমন?

আবদুল খালেক কহিল, তা খোদার ফজলে মন্দ চলছে না। মামুজানের মেহেরবানিতে আমার দুখখু ঘুচেছে! আজ প্রায় তিন বছর আম্মার এন্তেকাল হয়েছে, এরই মধ্যে মামুজানের পরামর্শমতো চলে আমার অবস্থা ফিরে গিয়েছে। আহা, এদ্দিন যদি মামুজানকে পেতাম, তবে কি আর শরিকের ঘরে গোলামি করতে যেতে হত? তা আম্মা ওঁর ওপরে এমন নারাজ ছিলেন যে, বাড়িতে পর্যন্ত আসতে দিতেন না।

কেন, সুদ খান বলেই তো!

তা ছাড়া আর কী? কিন্তু এমন লোক আর দেখি নি! সকলেই চায় গরিব আত্মীয়স্বজনের ঘাড় ভেঙে নিজের নিজের পেট ভরতে–কিন্তু ইনি গায়ে পড়ে এসে উপকার করেন। খালুজান যখন আমার মাইনে বন্ধ করে দিলেন, তখন উনিই তো এসে আমার সব দেনা। পরিশোধ করে আমাকে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে আনলেন, তারপর এইসব ক্ষেত-খামার, জমি-জারাত সব গুছিয়ে নিতেও তো আমাকে উনি কম টাকা দেন নি…।

আবদুল্লাহ্ কহিল, ওঁর যে সুদের টাকা, ওইখানটাতেই তো একটু গোল রয়েছে।

আবদুল খালেক কহিল, তা থাকলই-বা গোল, তাতে কিছু আসে যায় না। আর সুদ নিয়ে ওঁর যে গোনাহ্ হচ্ছে তার ঢের বেশি সওয়াব হচ্ছে পরের উপকার করে। এতেই আল্লাহতালা আখেরাতে ওঁর সব গোনাহ মাফ করে দেবেন বলে আমার বিশ্বাস।

এই কথাটি লইয়া আবদুল্লাহ্ কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিতে লাগিল, কিন্তু কোনো সন্তোষজনক। মীমাংসায় উপনীত হইতে পারিল না। একটু পরে আবদুল খালেক আবার কহিতে লাগিল, দেখ ভাই, উনি যে শুধু টাকা দিয়েই লোকের উপকার করেন, তা নয়; সৎপরামর্শ দিয়ে বরং তার চেয়ে ঢের বেশি উপকার করেন। আজকাল যে আমি এই ক্ষেত-খামার-গরু ছাগল-হাঁস-মুরগি–এই-সব নিয়ে আছি, আগে কখনো স্বপ্নেও আমার খেয়ালে আসে নি যে, এ-সব করে মানুষ সুখে-স্বচ্ছন্দে থাকতে পারে। এই পানের বরজ একটা জিনিস, যাতে বেশ দু পয়সা আয় হয়, এ তো বারুইদেরই একচেটে; কোনো শরীফজাদাকে বলে দেখো পানের বরজ করতে, অমনি সে আড়াই হাত জিভ বার করে বলবে, সর্বনাশ, ওতে জাত থাকে! ক্ষেতি-টেতির বেলাতেও সেই রকম; তাতে যে একটু নড়েচড়ে বেড়াতে হয়, সেই জন্যেই শরীফজাদাদের ওসব দিকে মন যায় না। ঘরে ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাং দিয়ে দুমুঠো মোটা ভাত জুটলেই তারা বিেশ থাকেন। নিতান্ত দায়ে ঠেকলে পরের গোলামি করে জুতো-লাথি খাবেন তাও স্বীকার, তবু ও-সব ছোটলোকের কাজে হাত দিয়ে জাত খোয়াতে চান না। এই আমার কী দশা ছিল, দেখ না; বিষয় যা পেয়েছিলাম, তাতে তো আর সংসার চলে না। কী করি, গেলাম ওঁদের গোলামি করতে–জমি-জারাত যা ছিল, সেগুলো যে খাঁটিয়ে খাব, সে চিন্তাই মনে এল না! তারপর মামুজান এসে যখন পথে তুলে দিলেন তখন চোখ ফুটল।

আবদুল্লাহ্ তন্ময় হইয়া কথাগুলি শুনিতেছিল। শুনিতে শুনিতে প্রতি মুহূর্তে তাহার মনের ভিতর নানাপ্রকার চিন্তা বিদ্যতের ন্যায় খেলিয়া যাইতেছিল। আর পড়া কি চাকরি-বাকরির দিকে না গিয়া ভাইজানেরই পথ অবলম্বন করিবে–কিন্তু তাহার উপযুক্ত জমি তেমন নাই, নগদ টাকাও নাই, কেমন করিয়া আরম্ভ করিবে? ফুফাজানের সাহায্য চাহিবে? আম্মা তাতে নারাজ হইবেন। তবে কিছুদিন চাকরি করিয়া টাকা জমাইয়া ওই সব কাজ শুরু করিয়া দিবে। সে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিয়া বসিল, আচ্ছা, ভাইজান, আজকাল আপনি কী কী কাজ নিয়ে আছেন? আর কোন্ কোন্‌টায় বেশ লাভ হচ্ছে?

আবদুল খালেক কহিতে লাগিল, আমি হাত দিয়েছি তো ঢের কাজে–তা কোনোটাতেই লাভ মন্দ হচ্ছে না। আমার জমি বেশি নেই, ধান যা পাই, তাতে একরকম করে বছরটা কেটে যায়। তা ছাড়া আমার ক্ষেতগুলোতে হলুদ, –এটাতে খুবই লাভ আদা, মরিচ, সর্ষে, কয়েক রকম কলাই, তারপর পিঁয়াজ, রসুন, তরিতরকারি–এসব যথেষ্ট হয়, খেয়েদেয়েও ঢের বিক্রি করতে পারি। গোটা চারেক বরজ করিছি, তাতেও বেশ আয় হচ্ছে। সুপুরি নারিকেলের গাছ আমার বেশি নেই, আরো কিছু জমি নিয়ে বেশি করে লাগাব মনে কচ্ছি। যে জমিতে এগুলো দেব, সেখানে কলার বাগান করা যাবে, যদ্দিন ফসল না পাওয়া যায়, তদ্দিন কলা থেকেও কিছু কিছু আয় হবে। তারপর দেখ, মাছ তো আমাকে। আর এখন কিনতেই হচ্ছে না, কাজেই বাজার খরচ বলে একটা খরচ আমার একরকম করতেই হয় না বললে চলে। ছাগল, মুরগি, হাঁস এ-সব দেদার খেয়েও এ-বছর বেচেছি প্রায় শ দেড়েক টাকার, ক্রমে আরো বেশি হবে। একটু ভেবে দেখলে এই রকম আরো ঢের উপায় বার করা যায়, যাতে কারুর গোলামি না করে সুখে-স্বচ্ছন্দে দিন কাটানো যেতে পারে।

এই সকল বিবরণ শুনিয়া আবদুল্লাহর মনে বড়ই আনন্দ হইল। সে কহিল, আচ্ছা, ভাইজান, চোখের উপর উপায় করবার এমন এমন সুন্দর পন্থা থাকতে কেউ যায় গোলামি করতে আর কেউ-বা হাত-পা কোলে করে ঘরে বসে আকাশ পানে চেয়ে হা-হুঁতাশ করে। কী আশ্চর্য!

আবদুল খালেক কহিল, আমার নিজের জীবনে যা ঘটেছে, তাতে বুঝতে পাচ্ছি যে, আমাদের শরাফতের অভিমান, দারুণ আলস্য, আর উপযুক্ত উপদেষ্টার অভাব, এই তিনটে কারণে আমরা সংসারের সুপথ খুঁজে পাই নে। কোনো রকমে পেটটা চলে গেলেই আল্লাহ্ আল্লাহ করে জীবনটাকে কাটিয়ে দিই। আর নেহাত পেট যদি না চলে, তো ঝুলি কাঁধে নিয়ে সায়েলী কত্তে বেরুই।

এইরূপ কথাবার্তা কহিতে কহিতে মগরেবের সময় হইয়া আসিল দেখিয়া আবদুল্লাহ্ কহিল, তবে এখন উঠি, ভাইজান!

আবদুল খালেক স্ত্রীকে ডাকিয়া কহিল, ওগো, শুনছ, আবদুল্লাহ্ রোখসৎ হচ্ছে– একবার এদিকে এস।

রাবিয়া রান্নাঘরে ছিল, তাড়াতাড়ি হাতের কাজ ফেলিয়া বাহিরে আসিয়া কহিল, এখনই রোখৃসৎ হচ্চেন কী, খখানকার সাহেব! আজ রাত্রে আমাদের বাড়িতে খেতে হবে যে।

আবদুল খালেক কহিল, না গো না, তার আর কাজ নেই। এখানে যে ও বেড়াতে এসেছে, তাতেই ওর শ্বশুরবাড়িতে কত কথা হবে এখন।

আবদুল্লাহ্ সোৎসুকে জিজ্ঞাসা করিল, কেন–কেন?

আবদুল খালেক কহিল, আমাদের সঙ্গে যে ওঁদের আজকাল মনান্তর চলছে।

মনান্তর হল কিসে?

ওই যে কটা তালুক খালুজান বিক্রি কল্লেন, সে কটা মামুজান আমারই নামে বেনামী করে খরিদ করেছেন কিনা, তাই।

হ্যাঁ তা তো শুনেছি। কিন্তু তাতে আপনার সঙ্গে মনান্তর হল কেন?

খালুজানের ইচ্ছে ছিল, কোনো আত্মীয়স্বজন কথাটা না জানতে পারে। বরিহাটীর দীনেশবাবু ওঁয়াদের উকিল কিনা, তাকে দিয়ে গোপনে বিক্রি করবার বন্দোবস্ত করেছিলেন। কিন্তু এদিকে দীনেশবাবুর সঙ্গে মামুজানের খুব ভাব; তাই যখন মামুজান জানতে পেরে নিজেই নিতে চাইলেন, তখন দীনেশবাবু আর আপত্তি কল্লেন না। খালুজান কিন্তু মনে

করলেন যে, আমিই পাকেচক্রে মামুজানকে সন্ধান দিয়ে খরিদ করিয়েছি।

আবদুল্লাহ জিজ্ঞাসা করিল, আচ্ছা, উনি যখন বেচলেনই তখন আপনিই না হয় কিনলেন, তাতে আপনার অপরাধ!

আবদুল খালেক কহিল, ওই তো কথা ঘোরে রে ভাই! অপরাধ যে আমার কী, সেটা আর বুঝলে না? ছিলাম ওঁদের গোলাম হয়ে আর আজ কিনা দু পয়সা উপায় কচ্ছি, তার ওপর আবার ওঁদের তালুক কিনে ফেললাম, এতে আমার স্পর্ধা কি কম হল?

আবদুল্লাহ্ ব্যঙ্গ করিয়া কহিল, তা তো বটেই!

সেইজন্যেই তো বলছিলাম, তুমি আমাদের সঙ্গে মেলামেশা খাওয়াদাওয়া কল্লে তোমার শ্বশুরবাড়িতে কথা উঠবে।

তা উঠলই বা! ওঁরা চটলেন তো ভারি বয়েই গেল! এমনিই বড় ভালবাসেন কিনা…

আরে না, না। তুমি তো আজ বাদে কাল চলে যাবে, তারপর এর ঝক্কি সইতে হবে আমাদেরই।

রাবিয়া এবং আবদুল্লাহ্ উভয়েই প্রায় সমবয়সী। আবদুল খালেকের বিবাহ হওয়া অবধি তাহাদের অনেকবার দেখা-সাক্ষাৎ হইয়াছে এবং স্বাভাবিক স্নেহশীলতাগুণে রাবিয়া আবদুল্লাহকে অত্যন্ত আপনার করিয়া লইয়াছে। আবদুল্লাহও তাহাকে আপন ভগ্নীর ন্যায় ভক্তি করে এবং ভালবাসে; বিশেষত রাবিয়ার নিপুণ হস্তের রন্ধন এবং পরিবেশন-কালে ততোধিক নিপুণ আদর-কুশলতা এমনি লুব্ধ করিয়া রাখিয়াছে যে, ভ্রাতার প্রত্যাখ্যানে সে আজ বড়ই মনঃক্ষুণ্ণ হইয়া গেল। অগত্যা সে কহিল, তবে থাক এ যাত্রা ভাবী সাহেবা! আমি কিন্তু কাল ভোরেই রওয়ানা হব।

রাবিয়া কহিল, সে কী, ভাই!–বাড়ি এসে কি এক দিন থেকেই চলে যেতে আছে?

না ভাবী সাহেবা, এবার আর থাকতে পারছি নে। আম্মা ও-দিকে পথ চেয়ে আছেন, পড়াশুনার তো কোনো বন্দোবস্ত এখনো হয়ে উঠল না, অন্তত কাজ-কর্মের চেষ্টা তো দেখতে হবে। মনটা বড় অস্থির হয়ে আছে। খোদা যদি দিন দেন, তবে কত আসব যাব, আপনাকে বিরক্ত করব। এখন তবে আসি।

এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ রাবিয়ার কদমবুসি করিয়া বিদায় লইল।

বাহিরে আসিয়া মীর সাহেবের নিকট বিদায় লইবার সময় তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তবে এখন তোমার পড়াশুনার কী করবে আবদুল্লাহ?

কিছু তো ঠিক করে উঠতে পাচ্ছি নে কী করব। ভাবছি মাস্টারি করে প্রাইভেট পড়ব।

সে কি সুবিধে হবে? তা হলে ল-টা আর পড়া হবে না…

তা জিজ্ঞাসা করবে ছিল

বছর দুই তিন মাস্টারি করে কিছু টাকা জমিয়ে শেষে ল পড়তে পারি।

ও, সে অনেক দূরের কথা। তার কাজ নেই, আমিই তোমার পড়ার খরচ দেব, তুমি কলেজে পড় গিয়ে!

আবদুল্লাহ্ তাহার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দৃষ্টি স্থাপিত করিয়া কহিল, তা হলে তো বড়ই ভালো হয়, ফুফাজান। কিন্তু আম্মাকে একবার জিজ্ঞাসা করে দেখতে হবে।

তা জিজ্ঞাসা করবে বৈকি!

আবদুল্লাহ্ একটু ভাবিয়া কহিল, কিন্তু তিনি যদি আপনার টাকা নিতে না দেন?

মীর সাহেব একটু চিন্তিত হইয়া কহিলেন, তাও তো বটে! আমার টাকা নিতে আপত্তি করা তাঁর পক্ষে আশ্চর্য নয়। না হয় তুমি তাকে বোলো যে এ টাকা কর্জ নিচ্ছ, পরে যখন রোজগার করবে, তখন শোধ দেবে।

কিন্তু আবদুল্লাহর মনে খটকা রহিয়া গেল। তাহার মাতা যে সুদখোরের টাকা কর্জ লইতেও রাজি হইবেন, এরূপ সম্ভবে না। একটু ভাবিয়া অবশেষে সে কহিল, –আচ্ছা তাই বলে দেখব। নিতান্তই যদি আম্মা রাজি না হন, তখন মাস্টারি করতে হবে, আর কোনো উপায় দেখছি নে!

আবদুল খালেক কহিল, আরে তুমি আগে থেকেই এত ভাবছ কেন? বলে দেখ গে তো! রাজি হবেন এখন। মামুজান তো কর্জ দিচ্ছেন, তাতে আর দোষ কী!

মীর সাহেব কহিলেন, না, ভাববার কথা বৈকি! এঁরা সব পাক্কা দীনদার মানুষ, আমার সঙ্গে এদের ব্যবহার কেমন, তা জান তো!

আবদুল্লাহ্ কহিল, সেই জন্যেই তো আমি ভাবছি। তবু একবার বলে দেখি। তারপর আপনাকে জানাব।

এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ বিদায় গ্রহণ করিল।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান