আবদুল্লাহ » এগার

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০০:১২
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৩৩
দৃষ্টিপাত
বৈঠকখানার এক প্রান্তে তখন এ বাটীর পারিবারিক মক্তব বসিয়া গিয়াছে। একখানি বড় অনতিউচ্চ চৌকির উপর ফরুশ পাতা; তাহারই উপর বসিয়া পূর্বাঞ্চল-নিবাসী বৃদ্ধ মৌলবী সাহেব আরবি, ফারসি এবং উর্দু সবকের রাশিতে ছোট ছোট ছেলেদের মাথা ভরাট করিয়া দিতেছেন। বাটীর ছোট ও মাঝারি পাঁচ-ছয়টি, প্রতিবেশীদিগের মাঝারি ও বড় আট দশটি ছেলে সুরে-বেসুরে ...

বৈঠকখানার এক প্রান্তে তখন এ বাটীর পারিবারিক মক্তব বসিয়া গিয়াছে। একখানি বড় অনতিউচ্চ চৌকির উপর ফরুশ পাতা; তাহারই উপর বসিয়া পূর্বাঞ্চল-নিবাসী বৃদ্ধ মৌলবী সাহেব আরবি, ফারসি এবং উর্দু সবকের রাশিতে ছোট ছোট ছেলেদের মাথা ভরাট করিয়া দিতেছেন। বাটীর ছোট ও মাঝারি পাঁচ-ছয়টি, প্রতিবেশীদিগের মাঝারি ও বড় আট দশটি ছেলে সুরে-বেসুরে সবক ইয়াদ করিতে লাগিয়া গিয়াছে। বাড়ির ছেলেগুলি মৌলবী সাহেবের সহিত একাসনে বসিয়াছে, কিন্তু অপর সকলকে ফশের সম্মুখে মেঝের উপর মাদুর পাতিয়া বসিতে হইয়াছে।

মৌলবী সাহেব প্রত্যহ এখানে বসিয়া এই ক্ষুদ্র মক্তবটি চালাইয়া থাকেন। এতদ্ভিন্ন। তাহাকে বৈকালে আরো একটি ক্ষুদ্র বালিকা-মক্তব চালাইতে হয়। যে ঘরটিতে আবদুল মালেক আজকাল অধিষ্ঠিত হইয়া আছেন, সেটি একটু নিরালা জায়গায় বলিয়া বাড়ির খুব ছোট ছোট মেয়েরা সেইখানে বসিয়া মৌলবী সাহেবের নিকট সবক গ্রহণ করে। এইজন্য বহির্বাটীর অপর কোনো পুরুষের সেখানে গতিবিধি একেবারে নিষিদ্ধ। মৌলবী সাহেব একে বৃদ্ধ, তাহাতে বহুকাল যাবৎ বাটীর লোকের মধ্যেই গণ্য হইয়া উঠিয়াছেন বলিয়া আট বৎসরের অধিক বয়স্কা বালিকাদিগকে সবক দিবার অধিকারটুকু প্রাপ্ত হইয়াছেন। পরম দীনদার লোক বলিয়া সকলেই এমনকি খোদ্ সৈয়দ সাহেব পর্যন্ত তাহার খাতির করেন।

আবদুল্লাহ্ বৈঠকখানায় প্রবেশ করিয়া আসোলামু আলায়কুম বলিয়া মৌলবী সাহেবকে সম্ভাষণ করিল। মৌলবী সাহেব তাড়াতাড়ি উঠিয়া ওয়ালায়কুম সালাম বলিয়া প্রতিসম্ভাষণ করিলেন, সঙ্গে সঙ্গে বালকেরাও দাঁড়াইয়া উঠিয়া সমস্বরে ওস্তাদজীর অনুকরণে অভ্যাগতের সংবর্ধনা করিল। অতঃপর মৌলবী সাহেব আবদুল্লাহর সহিত মোসাফা করিতে করিতে জিজ্ঞাসা করিলেন।

কবে আসলেন দুলহা মিঞা? তবিয়ত বালো তো?

এই কাল সন্ধ্যাবেলায় এসেছি। ভালোই আছি। আপনি কেমন আছেন মৌলবী সাহেব?

ভালোই! শুনলাম আপনার ওয়ালেদ সাহেব এন্তেকাল ফর্মাইছেন?

জি হাঁ।

আচানক? খি বেমারী আসর খছিল তানিরে?

এই জ্বর আর কি?

মৌলবী সাহেব তাঁহার সুদীর্ঘ শ্বেত শ্মশ্রুরাশির মধ্যে অঙ্গুলি চালনা করিতে করিতে গভীর দুঃখ ও সহানুভূতির সুরে কহিলেন, আহা, বরো নেক বান্দা আছিলেন তিনি। আমারে বরো বালা জানাতেন। এ বারি আইলেই আমার লগে এক বেলা বইস্যা আলাপ না কইর‍্যা যাইতেন না!

এদিকে বালকগুলি দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া হাঁ করিয়া ইহাদের আলাপ শুনিতেছিল। হঠাৎ সেদিকে মৌলবী সাহেবের মনোযোগ আকৃষ্ট হওয়ায় তিনি ধমক দিয়া কহিলেন, বহ, বহ্, তরা সবক পর। বইঅ্যান, দুলহা মিঞা, খারাইয়া রইল্যান?

আবদুল্লাহ্ ফরশের উপর উঠিয়া বসিল, মৌলবী সাহেবও তাহার পার্শ্বে বসিলেন। ওদিকে বালকের দল আরবি, ফারসি এবং উর্দুর যুগপৎ আবৃত্তির অদ্ভুত সম্মিলিত কলরবে বৈঠকখানাটি মুখরিত করিয়া তুলিল।

আবদুল্লাহ্ কিছুক্ষণ মনোযোগের সহিত উহাদের পাঠ শ্রবণ করিল। পরে কে কী কেতাব পড়ে, কোন ছেলেটি কেমন, ইত্যাদি বিষয় মৌলবী সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। বাড়ির ছেলেগুলি বয়সে ছোট হইলেও, অপর ছেলেদের অপেক্ষা অনেক বেশি পড়িয়া ফেলিয়াছে দেখিয়া আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, ও বেচারারা এত পিছনে পড়ে আছে। কেন, মৌলবী সাহেব?

মৌলবী সাহেব নিতান্ত অবজ্ঞাভরে কহিলেন, অঃ, অরা? অরা আর খি খম্‌ ফারে? অরূগো কি জেহেন আছে দুলহা মিঞা সাব! বচ্ছর বচ্ছর খায়দা বোগদাদী আর আম্‌ফারা লইয়া গঁাগোর গ্যাগোর খরুতে আছে। সবক এয়াদই খতাম্ ফারে না…।

আচ্ছা দেখি বলিয়া আবদুল্লাহ উহাদের নিকটে গিয়া দুই একটি বালককে পরীক্ষা করিতে আরম্ভ করিল। দেখিল উহারা যে সবকটুকু পাইয়াছে, সেটুকু মন্দ শিখে নাই। নানারূপ জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া আবদুল্লাহ্ বুঝিতে পারিল যে, ইহারা বহুদিন অন্তর নূতন সবক পাইয়া থাকে; তাও যেটুকু পায়, সে অতি সামান্য। এই হতভাগ্য বালকগুলি ওস্তাদজীর চেষ্টাকৃত অবহেলায় মারা যাইতেছে দেখিয়া আবদুল্লাহ্ উঠিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ওদের বুঝি রীতিমতো সবক দেন না, মৌলবী সাহেব?

মৌলবী সাহেব চট করিয়া বলিয়া উঠিলেন, দিমু না কিয়েল্লাই? ইয়াদ খরতাম্ ফারে না তো!

আবদুল্লাহ্ প্রতিবাদ করিল, কেন পারবে না, মৌলবী সাহেব, আমি তো যে কয়টাকে দেখলাম, তারা তো কয়েকটা সুরা বেশ শিখেছে!

বৃদ্ধ একটু চঞ্চল হইয়া কহিলেন, হে, যে ইয়াদ খরতাম্ ফারে, হে ফারে! আর হগ্‌গোলে ফারে চীখার ফারবার। আয় তো দেহি কলিমুদ্দীন তর সবক লইয়া।

কলিমুদ্দীন নামক একটি দশ কি এগার বৎসরের বালক আম্পারা ও পান্দেনামা হাতে লইয়া মাদুরাসন হইতে উঠিয়া আসিল। মৌলবী সাহেব তাহাকে আদেশ করিলেন, ক তো দেহি, খয় সুরা ইয়াদ খছস?

বালকটি গড়গড় করিয়া অনেকগুলি সুরা মুখস্থ বলিয়া গেল। পরে আবদুল্লাহর নির্দেশক্রমে পান্দেনামা হইতেও কয়েকটি বয়েত আবৃত্তি করিল। ছেলেটি মেধাবী বলিয়া মৌলবী সাহেব যে তাহাকে ঠেকাইয়া রাখিতে পারেন নাই, তাহা বেশ বুঝা গেল।

আবদুল্লাহ জিজ্ঞাসা করিল, এরা এসবের মানেটানে কিছু বোঝে?

মৌলবী সাহেব দারুণ তাচ্ছিল্যের সহিত কহিলেন, হঃ, মানি বুজবো! হেজেমতনই খরুতে মুণ্ডু গুইর্যা যায়, তা আবার মানি বুজবো! খি বা খন্ দুলহা মিঞা! ইয়ার মইদ্দে আরো খতা আছে দুলহা মিঞা, বোজলেন? খতা আছে! বলিয়া মৌলবী সাহেব গূঢ়ার্থসূচক ভঙ্গিসহকারে মস্তক সঞ্চালন করিলেন।

আবদুল্লাহ্ কৌতূহলী হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কী কথা, মৌলবী সাহেব?

কলিমুদ্দীন তাহাদের সম্মুখে এতক্ষণ দাঁড়াইয়া ছিল। মৌলবী সাহেব তাহাকে এক ধমক দিয়া কহিলেন, যা-যাঃ–সবক ইয়াদ কর্‌ গিয়া।…

তাড়া খাইয়া বেচারা গিয়া স্বস্থানে বসিয়া আবার অপরাপর বালকগণের কলরবে যোগদান করিল।

মৌলবী সাহেব আবদুল্লাহর আরো কাছে ঘেঁষিয়া আসিয়া ফিসফিস করিয়া কহিতে লাগিল, খতাড়া খি, বোজুলেননি, দুলহা মিঞা? অরা অইলো গিয়া আাফগোর ফোলাফান, অরা এইসব মিয়াগোরের হমান হমান চলতাম্ ফারে? অবৃগো জিয়াদা সবক দেওয়া মানা আছে, বোজুলেননি?

কার মানা?

খোদ্ সাবের! তিনি আইস্যা দহলিজে বইস্যা বইস্যা হুনেন, খারে খি সবক দি না দি।

এতক্ষণে আবদুল্লাহ্ এই পাঠদান-কৃপণতার মর্ম হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইল। পাছে প্রতিবেশী সাধারণ লোকের ছেলেরা নিজের ছেলেদের অপেক্ষা বেশি বিদ্যা উপার্জন করিয়া বসে, সেই ভয়ে তাহার শ্বশুর এইরূপ বিধান করিয়াছেন। সে আবার জিজ্ঞাসা করিল, তা ওদের পড়তে আসতে দেন কেন? একেবারেই যদি ওদের না পড়ানো হয়, সেই ভালো নয় কি?

এই কথায় মৌলবী সাহেবের হৃদয়ে করুণা উথলিয়া উঠিল। তিনি কহিলেন, অহহঃ, হেডা কাম বালা অয় না, দুলহা মিঞা! গরিব তাবেলম হিক্রবার চায়, এক্কেকালে নৈরাশ করলে খোদার কাছে কী জবাব দিমু? গোম্রারে এলেম দেওনে বহুত সওয়াব আছে কেতাবে ল্যাহে।

মৌলবী সাহেবের কেতাবের জ্ঞানের বহর এবং তাহার প্রয়োগের প্রণালী দেখিয়া আবদুল্লাহ্ মনে মনে যথেষ্ট কৌতুক অনুভব করিতেছিল, এমন সময় কর্তা সৈয়দ আবদুল কুদ্দস সাহেব ধীরে ধীরে লাঠি ভর করিয়া বৈঠকখানায় প্রবেশ করিলেন।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান